তথাকথিত “আহলে কুরআন” নামের বর্ণচোরা খ্রিস্টান মিশনারীদের স্বরূপ উন্মোচন

(আজকে সংক্ষিপ্ত কিছু বিষয় নিয়ে লিখব। লিখাটি মনযোগ সহ অবশ্যই পড়বেন)।

√ বর্তমান যুগের আহলে কুরআন কারা?

উত্তর, এরা মূলত খ্রিস্টান মিশনারী চক্র। এরা পরিচয় গোপন রেখে উপরে উপরে মুসলমান সেজে সাধারণ মানুষদের বিভ্রান্ত করতে নিজেদের “ঈসায়ী মুসলিম” বলেও পরিচয় দিয়ে থাকে।

√ তারা এই নামে প্রসিদ্ধি লাভ করতে চায় কেন?

উত্তর, তারা এই নামে প্রসিদ্ধি লাভ করতে চায় এজন্য যে, যাতে তারা খুব সহজে মুসলমানদের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে এবং মুসলিম সেজে অপর মুসলিমকে প্রতারিত করে সুকৌশলে ইসলাম থেকে বের করে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করতে পারে।

√ তাদের উদ্দেশ্য কী?

উত্তর, তাদের উদ্দেশ্য হল, বিশেষ করে সাধারণ মানুষদের অন্তরে ইসলাম সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করে মনস্তাত্ত্বিক ভাবে দুর্বল করা এবং খ্রিস্টান ধর্মে কনভার্ট করা।

√ তাদের মৌলিক দাবী কী?

উত্তর, তাদের মৌলিক দাবী হল, হাদীস মানা যাবেনা, কুরআনই যথেষ্ট। আর সেজন্য তারা নানা বনিতা করে হাদীসের প্রতি সাধারণদের মনে সংশয় তৈরি করার কাজ করে যাচ্ছে। তারা নানা জাল ও দুর্বল হাদীসের ঘাড়ে বন্দুক রেখে কূটকৌশলে সহীহ হাদীসের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলার স্পর্ধা দেখায়। সে সাথে মিথ্যা আর জালিয়াতি তো আছেই।

√ তাদের দাবীতে তারা জঘন্য মিথ্যাবাদী কিভাবে প্রমাণিত হয়?

উত্তর, তারা মূলত মুসলিম উম্মাহার মাঝে বিভক্তি ও ফাটল সৃষ্টি করতেই এই নিকৃষ্ট পন্থা বেছে নিয়েছে। এরা ইসলাম বিরোধী অপশক্তির সুদূরপ্রসারী এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী। একজন সচেতন সাধারণ শিক্ষতরাও তাদের এই হীন চক্রান্তের মুখোশ উন্মোচন করার জন্য যথেষ্ট। তারা নিজেদের দাবীতে নিজেরাই মিথ্যাবাদী! কেননা, তাদের উক্ত দাবী অনুসারে, ঈমানের পর ইসলামের প্রধান স্তম্ভ সালাতেরও রক্ষা হবেনা! তার কারণ, পবিত্র কুরআনের কোথাও সালাতের অন্তর্গত নিচে উল্লিখিত কাজগুলোর সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। যথা-

১. তাকবীরে তাহরিমাহ বলে সালাত শুরু করা।
২. সালাতের কাজ গুলোর তারতীব বা শৃংখলা।
৩. প্রথমে রুকু তারপর সেজদা করা।
৪. সালাতে তাশাহহুদ পড়া।
৫. দুই সেজদার মাঝখানে বসা।
৬. আখেরি বৈঠক।
৭. ডানে বামে সালাম ফেরানো।
৮. দৈনিক সালাত ৫ ওয়াক্ত ফরজ হওয়া।
৯. যোহর, আসর, এশার এর ফরজ চার রাকাত। ফজরের ফরজ দুই রাকাত। মাগরীবের ফরজ তিন রাকাত, ইত্যাদি। এভাবে বলতে গেলে শেষ হবেনা। এর কোনো একটাও কুরআন থেকে প্রমাণ করা যাবেনা। অথচ এগুলোর সমাধান শুধুমাত্র সহীহ হাদীস, ইজমায়ে উম্মত আর মুজতাহিদগণের কিয়াস দ্বারাই সম্ভব!

সুতরাং তথাকথিত আহলে কুরআন নামের এই ছদ্মবেশী খ্রিস্টানরা চমকদার বুলির আড়ালে স্লোগান যতই সুন্দর দেয় না কেন, তারা নিজেদের কথায় নিজেরাই ফেঁসে যাচ্ছে এবং মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হচ্ছে।

√ তাদের উদ্দেশ্যে গুটিকয়েক প্রশ্ন!

উত্তর, তাদের উদ্দেশ্যে আমি নিচে গুটিকয়েক প্রশ্ন রাখছি।

  • প্রশ্ন ১. রাসূল (সা:) চল্লিশ বছর বয়সের পূর্বে জাতির সাধারণ মানুষদের মতই জীবনযাপন করতেন। আল্লাহতায়ালা তাঁকে নির্বাচিত করে পথভ্রষ্ট সমগ্র মানবজাতিকে সঠিক পথে আহবানের জন্য রাসুল হিসেবে প্রেরণ করলেন। শিক্ষা দিলেন কোরআন ও ঈমান। তারপর দায়িত্ব দিলেন সে পথে মানুষকে আহবানের। যেমন এরশাদ হচ্ছে ‘এভাবে আমি আপনার প্রতি ওহী করেছি রূহ (কোরআন) আমার নির্দেশে; আপনি তো জানতেন না কিতাব ও ঈমান কি? পক্ষান্তরে আমি একে করেছি আলো। যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে হেদায়াত করে দিই। আর আপনি অবশ্যই সরল সঠিক পথে মানুষকে আহবান করতেই থাকবেন।’ (সুরা শুরা : ৫২)।

এখানে আল্লাহতায়ালা রাসুল (সা:)-কে আদেশ করলেন মানুষকে হেদায়াত করার। আল্লাহতায়ালা মানুষকে আদেশ করলেন, তিনি (রাসূল) যা বলেন, তা গ্রহণ করার। আমরা জানি যে, রাসুল (সা:) যা আদেশ করেছেন তা-ই হল হাদীস। এমতাবস্থায় হাদীস অস্বীকারকারী ব্যক্তি একই সাথে পবিত্র কুরআনেরও অস্বীকারকারী বলে সাব্যস্ত হল না কিভাবে?

  • ২. অন্যত্রে আরো এরশাদ হচ্ছে ‘রাসুল তোমাদের যা দিয়েছেন, তা তোমরা গ্রহণ করো। আর তিনি যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো।’ (সুরা হাশর : ৭)।

এখানে এ আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, রাসুল (সা:) আমাদেরকে যেমন কোরআন দিয়েছেন, সেই সঙ্গে কোরআনকে কিভাবে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে তাও আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক শিখিয়েছেন। আর বাস্তব জীবনের ঐ প্রয়োগটাই হচ্ছে বিদগ্ধ বিদ্বানদের ভাষায় হাদীস। এমতাবস্থায় হাদীস অস্বীকারকারী ব্যক্তি একই সাথে পবিত্র কুরআনেরও অস্বীকারকারী বলে সাব্যস্ত হল না কিভাবে?

  • ৩. কুরআনে যা নিষেধ করা হয়েছে তার মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাসূল (সা:)-ও কিছু বিষয় নিষেধ করেছেন। রাসুল (সা.)-এর আদেশ-নিষেধের কোনো দরকার না থাকলে আল্লাহতায়ালা তাঁর কথা উল্লেখ করলেন কেন? আল্লাহ তো বলতে পারতেন, “এই কোরআনে যা আছে তোমরা তা মেনে নাও; যা নিষেধ করা হয়েছে, তা থেকে দূরে থাকো”। অথচ কুরআনকে মেনে নেওয়ার ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা বহু জায়গায় নির্দেশ দিয়েছেন আর এ স্থানে বিশেষভাবে রাসূল (সা:)-এর আদেশ-নিষেধের কথা উল্লেখ করায় বোঝা যায়, তিনিও আদেশ কিবা নিষেধ করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত। তবে অবশ্যই তা আল্লাহর অনুমতিক্রমে হয়ে থাকে।

আর বিদগ্ধ বিদ্বানদের ভাষায় তাঁর এই আদেশ-নিষেধই হচ্ছে হাদীস। এমতাবস্থায় হাদীস অস্বীকারকারী ব্যক্তি একই সাথে পবিত্র কুরআনেরও অস্বীকারকারী বলে সাব্যস্ত হল না কিভাবে?

  • ৪. দ্বীনি কোনো বিষয়ে মতভেদ হলে আল্লাহর কুরআন এবং রাসূল (সা:)-এর হাদীস থেকে সমাধান নিতে হবে, এমনি নির্দেশ রয়েছে পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ৫৯ নং আয়াতে। অসংখ্য আয়াতে আল্লাহর কথা মেনে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাসূল (সা:)-এর কথাকেও মানতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহতায়ালা বলেন ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুল (সা.)-এর আনুগত্য করো।’ (সূরা মুহাম্মদ : ৩৩; সুরা নূর : ৫৪)।

এখানে প্রশ্ন হল, রাসূল (সা:)-এর কোনো কথা মাননীয় না হলে আলাদাভাবে তাঁর আনুগত্য করার জন্য ইতা’আতের শব্দ ব্যবহারের দরকার কী? লক্ষ্য করার বিষয় হলো, অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা তাঁর এবং রাসূল (সা:)-এর আনুগত্য করার পাশাপাশি উলিল আমর তথা সমসাময়িক দায়িত্বশীল ফুকাহে কেরাম এবং মুসলিম শাসকেরও আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসূলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের উলিল আমরের।’ (সুরা নিসা : ৫৯)। এ থেকে আরো প্রমাণিত হয় যে, দ্বীনের মতভেদপূর্ণ বিষয়ের সমাধানের জন্য ইজতিহাদ করার সুযোগ রয়েছে। চার মাযহাবের চারজন বিশিষ্ট ফকিহ আলেমের ফিকহ তথা মাযহাব এই আয়াতেরই ফসল। যেজন্য চারো মাযহাবই আহলে সুন্নাহর গন্ডিভুক্ত হওয়ায় তাকে আলাদা আলাদা চারটি ফেরকায় চিত্রিত করা ভুল এমনকি প্রথম পর্যায়ের মূর্খতার শামিল। সে যাইহোক, এখন তথাকথিত আহলে কুরআন নামের এই ছদ্মবেশী খ্রিস্টান মিশনারীরা নিজেদের দাবীতেই নিজেরা মিথ্যাবাদী হওয়াটা দ্বিপ্রহরের মত পরিষ্কার হল কিনা?

শেষকথা, আমি মূলত কাদিয়ানী ফেতনার মুখোশ উন্মোচনেই লিখে থাকি। ভিন্ন প্রসঙ্গে লিখার তেমন কোনো আগ্রহ এই মুহূর্তে আমার নেই। কিন্তু ইদানীং কথিত আহলে কুরআন নামের এই ছদ্মবেশী খ্রিস্টান মিশনারীদের ভন্ডামি আর অপতৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিব সামান্য একটু লিখতে বাধ্য হয়েছি। আল্লাহতালা আমাদেরকে এই ফেতনার যুগে ঈমান রক্ষায় হাক্কানী উলামায়ে কেরামের সাথে সব সময় সুসম্পর্ক কায়েম রাখার তাওফিক দিন। আমীন।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক।
প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী এম.এ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here