হাদীস শরীফ বাতিল ও গুরুত্বহীন সাব্যস্ত করতে কাদিয়ানী এবং মুনকিরীনে হাদীস গোষ্ঠী কর্তৃক পবিত্র কুরআনের আয়াতের বিকৃত অনুবাদ ও নিকৃষ্টতর অপব্যাখ্যা আর তার খন্ডন :

খন্ডনমূলক জবাব : প্রথমে ওদের পক্ষ হতে আয়াতটির বিকৃত অনুবাদ উল্লেখ করছি। তারপর ইসলামিক ফাউণ্ডেশন হতে প্রকাশিত কুরআনুল কারীমের অনুবাদগ্রন্থ হতে সূরা জাশিয়া’র ৬ নং আয়াতটিসহ উপর থেকে কয়েকটি আয়াতের অনুবাদ-ও তুলে ধরা হবে যাতে পূর্বাপর সবগুলো আয়াতের সমন্বিত সারকথা উপলব্ধি করতে সহজ হয়। আসুন, প্রথমে ৬ নং আয়াতটি দেখে নিই। আল্লাহতালা বলেন, تِلۡکَ اٰیٰتُ اللّٰہِ نَتۡلُوۡہَا عَلَیۡکَ بِالۡحَقِّ ۚ فَبِاَیِّ حَدِیۡثٍۭ بَعۡدَ اللّٰہِ وَ اٰیٰتِہٖ یُؤۡمِنُوۡنَ কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বইতে এর বিভিন্ন অনুবাদ দেখা যায়। একটি জায়গায় তারা এর অর্থ করেছে, “ওই সব আল্লাহ’র আয়াত, যা আমি আপনার নিকট যথাযথভাবে উল্লেখ করছি। অতএব, আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর তারা কোন হাদীসকে বিশ্বাস করবে?” কিন্তু মজার ব্যাপার হল, তাদের প্রকাশিত কুরআনের অনুবাদকৃত কপিতে উক্ত আয়াতটির অনুবাদ করা হয় আরেক ভাবে যেটি ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত’ তথা মূলধারার মুসলমানদের অনুবাদের একদমই কাছাকাছি কিংবা হুবহু একই। এই যে তাদের সেই অনুবাদ নিম্নরূপ:-

“এইগুলি আল্লাহ’র নিদর্শন যাহা আমরা তোমার প্রতি যথাযথভাবে বর্ণনা করিতেছি। অতএব তাহারা আল্লাহ ও তাহার নিদর্শনাবলীর (অস্বীকার করার) পর কোন কথার উপর ঈমান আনিবে।” স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য:-

কাদিয়ানীদের অনূদিত কুরআন

এবার যুক্তিক খন্ডনমূলক জবাব :

হাদীস অস্বীকারকারীরাই মূলত পবিত্র কুরআনের উল্লিখিত আয়াতের উদ্দেশ্যমূলক ও বিকৃত অনুবাদ দাঁড় করে বলে থাকে যে, “দেখ দেখ! আল্লাহতালা নিজেই বলছেন, তারা আয়াত বাদ দিয়ে কোন হাদীসের উপর বিশ্বাস রাখতে চায়!” বুঝা গেল, হাদীস গুরুত্বহীন, বরং কুরআনই সব। শুধু কুরআন হলেই চলবে, হাদীসের গুরুত্ব নেই। নাউযুবিল্লাহ। এরা আসলে দলিল প্রমাণের দিক থেকে পুরোপুরি দেউলিয়া, সম্পূর্ণ মিসকিন। হাদীসের কষ্টিপাথরেই এরা বাতিল সাব্যস্ত হয়ে যায় বলেই এরা এইরকম বিকৃত অনুবাদ আর শয়তানি যুক্তি দিয়ে হাদীসের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলার স্পর্ধা দেখায়। সত্যি বলতে সব বাতিল পন্থীর এই একই বৈশিষ্ট্য, হাদীসকে তারা পথের কাঁটা হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে।

তো এবার সূরা আল-জাশিয়ার ঐ ৬ নং আয়াতের তাৎপর্য কী?

উত্তরে বলতে চাই, সূরা আল জাশিয়ার ৬ নং আয়াতে ‘আয়াত’ এবং ‘হাদীস’ শব্দ দুইখানা আক্ষরিক অর্থে যথাক্রমে ‘নিদর্শনাবলী‘ এবং ‘কথা বা বাণী‘ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যার দরুন, ঐ ‘আয়াত’ (ايات) শব্দকে ‘আয়াতে কুরআনী’ আর ‘হাদীস’ (حديث) শব্দকে ‘হাদীসে নববী’ উদ্দেশ্য নেয়া সম্পূর্ণ ভুল। উক্ত সূরার ৩ থেকে ৫ নং আয়াতের বর্ণনাভঙ্গি আর সেটি নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপটের বিচারে হাদীস অস্বীকারকারীদের ঐ ধরনের মর্থার্থ শতভাগ কুরআনের ভেতর তাহরিফ তথা বিকৃতিরই শামিল।

এবার জানার বিষয় হল, উক্ত সূরার আয়াত নং ৩ হতে ৫ এর মধ্যেও কি “আয়াত” (ايات) শব্দ রয়েছে?

উত্তরে বলা হবে যে, জ্বী হ্যাঁ রয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সেগুলোর কোনো একটিও ‘আয়াতে কুরআনী’ অর্থে উদ্দেশ্য নেয়া হয়না। তদ্রূপ ৬ নং আয়াত (فَبِاَیِّ حَدِیۡثٍۭ بَعۡدَ اللّٰہِ وَ اٰیٰتِہٖ یُؤۡمِنُوۡنَ)-এর মধ্যেও যে ‘আয়াত’ (ايات) শব্দ রয়েছে সেটিও একইভাবে ‘আয়াতে কুরআনী’ অর্থে উদ্দেশ্য হবেনা। এবার সূরা আল-জাশিয়ার আয়াত নং ৩-৬ পর্যন্ত সবগুলোর অনুবাদ দেখুন! ইসলামিক ফাউণ্ডেশন থেকে প্রকাশিত অনুবাদ কপি দ্রষ্টব্য।

আয়াতগুলোর অনুবাদ :-

  • সূরা আল জাশিয়া আয়াত নং ৩। “নিশ্চয় আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে নিদর্শন (আয়াত/اٰیٰتُ) রয়েছে মুমিনদের জন্য।”
  • সূরা আল জাশিয়া আয়াত নং ৪। “তোমাদের সৃষ্টিতে এবং জীবজন্তুর বিস্তারে নিশ্চিত নিদর্শন (আয়াত/اٰیٰتُ) রয়েছে বিশ্ববাসীর জন্য।”
  • সূরা আল জাশিয়া আয়াত নং ৫। “নিদর্শন (আয়াত/اٰیٰتُ) রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য, দিবারাত্রির পরিবর্তনে এবং আল্লাহ আকাশ থেকে রিযিক (বৃষ্টি) বর্ষণ দ্বারা; জমিনকে তার মৃত্যুর পর তদ্দারা পুনর্জীবিত করেন এবং বায়ুর পরিবর্তনে।”

খেয়াল করুন, সূরা আল-জাশিয়ার ৬ নং আয়াতের উপরোল্লিখিত ৩-৫ নং পর্যন্ত সবগুলো আয়াতের মধ্যে “আয়াত” শব্দের উল্লেখ রয়েছে। যেখানে সবগুলোর “আয়াত” শব্দ দ্বারা ‘নিদর্শন বা নিদর্শনাবলী’-ই উদ্দেশ্য। এরপরের লাইনেই অর্থাৎ ৬ নং আয়াতেই আল্লাহতালা বলেন, تِلۡکَ اٰیٰتُ اللّٰہِ نَتۡلُوۡہَا عَلَیۡکَ بِالۡحَقِّ ۚ فَبِاَیِّ حَدِیۡثٍۭ بَعۡدَ اللّٰہِ وَ اٰیٰتِہٖ یُؤۡمِنُوۡنَ যার সঠিক অনুবাদ হল, ওই সব আল্লাহ’র নিদর্শন (আয়াত), যা আমি আপনার নিকট যথাযথভাবে আবৃত্তি করছি। অতএব, আল্লাহ ও তাঁর নিদর্শনাবলীর পর তারা (কাফেররা) কোন কথায় বিশ্বাস করবে?

প্রিয় কাদিয়ানী অবুঝ ভাই ও বোনেরা! এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, আপনাদের তথাকথিত আহমদী মুরুব্বী নামের ভদ্রলোকগুলো হাদীসকে গুরুত্বহীন সাব্যস্ত করতে কুরআনের আয়াতকে কত নিষ্ঠুরভাবে বিকৃত করে উপস্থাপন করে দরাকে সরা বানাচ্ছেন!

পরিশেষে আমার একটি প্রশ্ন!

আমরা আয়াতটির শানে নুযূল দ্বারা বুঝতে পারলাম যে, আয়াতটির ঐ কথাগুলো বিশেষ করে মক্কার মুশরিকদের উদ্দেশ্যেই ছিল। তাদেরকেই বলা হয়েছিল যে,

“আল্লাহর নাযিল করা এই কুরআন, যাতে রয়েছে তাঁর একত্ববাদের বহু প্রমাণাদি, যদি তারা এর উপরও ঈমান না আনে, তবে আল্লাহর কথাকে বাদ দিয়ে কার কথার উপর এবং তাঁর নিদর্শনাবলীকে ছেড়ে আর কোন্ এমন নিদর্শন আছে যার উপর তারা ঈমান আনবে?” (তাফসীর দ্রষ্টব্য)। এখন প্রশ্ন হল,

  • কাফের আর মুশরিকরা যে জায়গায় কুরআনের বাণীই অমান্য করে যাচ্ছে, অবাধে আল্লাহর সাথে কুফুরি আর শিরকে লিপ্ত রয়েছে সেখানে তাদেরকে হাদীস শরীফের গুরুত্ব দেখানোর যুক্তিকতা কিসের? আল্লাহ’র বাণী فَبِاَیِّ حَدِیۡثٍۭ بَعۡدَ اللّٰہِ وَ اٰیٰتِہٖ یُؤۡمِنُوۡنَ এর মধ্যে…… তারা কোন হাদীসের উপর বিশ্বাস করবে, এখন এর কী তাৎপর্য দাঁড়াল? এতে কি কাদিয়ানীদের কথা অনুসারে একথা বোধগম্য হচ্ছেনা যে, মনে হয় কাফের আর মুশরিকদের নিকট তখন আয়াতে কুরআনী অপেক্ষা হাদীসের প্রতি টানটা বেশি ছিল! যার দরুন তাদের উদ্দেশ্যে সতর্কতা জারি করে বলতে হল যে, “আল্লাহ’র আয়াতকে বাদ দিয়ে তারা কোন হাদীসকে বিশ্বাস করবে!!

খুবই হাস্যকর!!

কথা এখানেই সমাপ্ত করছি। সত্যের অনুসন্ধানীদের জন্য প্রকৃত বিষয়টি এতটুকুতেই যথেষ্ট হবে বলেই আমার বিশ্বাস। ওয়াসসালাম।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here