Friday, December 2, 2022
Home Blog

সহজে কাদিয়ানী চেনার উপায়

মির্যা কাদিয়ানী ও অনুসারী

সহজে কাদিয়ানী চেনার উপায় :

কাদিয়ানীরা সাধারণত খুবই ধূর্ত ও জঘন্য প্রতারক হয়ে থাকে। তাদের বেশিরভাগই মাথায় কালো টুপি পরে আর মুখে ফ্রেঞ্চ কাটিং দাড়ি রাখে। তাদের ৯০% ফেইসবুক ইউজারের প্রোফাইল লক থাকে, খুব বেশি তর্কপ্রিয় ও ঝগড়াটে হয়ে থাকে। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য একদম সাধারণ বিষয়কেও দুর্বোধ্যভাবে পেশ করে থাকে। তাদের খুব কমন একটা ডায়লগ ঈসা আ. আবার আসলে তখন শেষনবী কে থাকছেন? তাদের আরেকটা ডায়লগ হল, যদি ‘শেষনবী’ বলতে এই অর্থ উদ্দেশ্য হয় যে, ‘তাঁর (সা.) পর আর কাউকে নবী বানানো হবেনা’ তখন প্রশ্ন আসবে যে, ‘আমি তখনও খাতামান নাবিয়্যীন ছিলাম যখন আদম পানি এবং কাদার মাঝে সৃষ্টির সূচনায় ছিলেন‘—হাদীসটির কী অর্থ উদ্দেশ্য? আসলে তারা এ সমস্ত প্রশ্ন ও তর্কের আড়ালে মির্যা কাদিয়ানীর মসীহ ও নবী দাবীর বৈধতা খুঁজতে চায়। কিন্তু হাস্যকর ব্যাপার হল, এদের কাউকেই আমি আজ পর্যন্ত স্বীকার করাতে পারিনি যে, তারা কি তাহলে নিজেদের মির্যা কাদিয়ানীর ‘উম্মত’ বলে স্বীকার করবে? কেননা যে কাউকে ‘নবী’ মানবে সে নিজেকে নির্বিঘ্নে তার ‘উম্মত’ বলেও স্বীকারোক্তি দিবে—এটাই স্বাভাবিক! আর এমনটা তো নয় যে, আমরা আগত ঈসা (আ.)-এর পুনরায় আগমনকে স্রেফ ‘উম্মতি‘ হিসেবেই বিশ্বাস করে কোনো ভুল করছি! আমরা কুরআন এবং হাদীস হতে আমাদের মুসলিম উম্মাহার বিশ্বাসের সমর্থনে মজবুত দলিলও দিয়ে থাকি, এমনকি মির্যা কাদিয়ানীর রচনাবলি হতেও। জেনে আশ্চর্য হবেন, আগত ঈসা নবুওয়তের দায়িত্বে থাকবেন না, তিনি স্রেফ ‘উম্মত’ হিসেবে থাকবেন; এ কথা খোদ মির্যা কাদিয়ানীর-ও। যেমন সে তার রচনার এক স্থানে লিখেছে, “কুরআন শরীফ দ্বারা তো সাব্যস্তই আছে যে, প্রত্যেক নবীই হযরত (সা.)-এর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহতালা বলেন, لتؤمن به و لتنصرنه (তোমরা অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে)। সুতরাং এইভাবেই সমস্ত আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম) হযরত (সা.) এর উম্মত হয়ে যান।” (বারাহীনে আহমদীয়া খ-৫, রূহানী খাযায়েন ২১/৩০০)। বলাবাহুল্য, ‘সমস্ত আম্বিয়া’ বলতে কিন্তু ঈসা (আ.)-ও তার মধ্যে শামিল। জানি না এখন তার ঝগড়াটে উম্মতেরা এর প্রতিউত্তরে কী বলবে! এদের প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েরা সাধারণত নেকাব পরে নাকের নিচ দিয়ে। এদের ধর্মীয় পড়াশোনার হাতেগড়ি নির্দিষ্ট দুটি সাবজেক্ট—ঈসা (আ.) জীবিত না মৃত আর মুহাম্মদ (সা.)-এর পরেও নবুওয়তের সিলসিলা (ধারাক্রম) চালু না বন্ধ, এই দুটো নিয়ে। তারা মূলত মির্যা গোলাম আহমদকে একজন রূপক মসীহ সাব্যস্ত করতেই হযরত ঈসা (আ.)-কে আল্লাহ সশরীরে জীবিত আকাশে উঠিয়ে নেয়ার কুরআন সুন্নাহভিত্তিক আকিদার অস্বীকারকারী। অথচ সহীহ মুসলিম, তারীখে দামেস্ক, কাঞ্জুল উম্মাল ইত্যাদি গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনায় এসেছে যে, ঈসা (আ.) শেষযুগে দামেস্কে নাযিল হবেন। আল্লাহ তাঁকে ফেরেশতার মাধ্যমে আকাশ থেকে পাঠাবেন। তেমনিভাবে ইসলামের গত চৌদ্দশত বছরের ইতিহাসে গত হয়ে যাওয়া সমস্ত পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যুগের ইমামগণেরও বিশ্বাস হচ্ছে, ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু এখনো হয়নি। কিন্তু কাদিয়ানীধর্মের বিশ্বাসমতে, ঈসা (আ.)-এর ১২০ বছর বয়সে কাশ্মীরে মৃত্যু হয়ে গেছে, কাশ্মীরের খান ইয়ার মহল্লায় সমাহিত ইউজ আসেফ (1,2) নামীয় ব্যক্তির কবরটিই ঈসা (আ.)-এর কবর (নাউযুবিল্লাহ)। মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীই মূলত ‘কাদিয়ানী জামাত’-এর প্রতিষ্ঠাতা। তাকে তার সাধারণ অনুসারীরা ইমাম মাহদী বিশ্বাস করার দাবী করলেও ‘নবী’ বিশ্বাস করেনা বলেই সাফ বলে দেয়ার চেষ্টা করে। আসলে এরা নিজেদের অজ্ঞতার জন্যই তাকে যেমন ইমাম মাহদী বিশ্বাস করে নিয়েছে, ঠিক একই রকম অজ্ঞতার জন্যই তারা তার নবী দাবী করা সম্পর্কেও বেখবর। এরা খুব সাধারণ ও জেনারেল মানুষদের ধোকা দিয়ে থাকে। সম্প্রতি জেনারেল শিক্ষিতরাও এদের ব্যাপারে খুবই সাবধান হচ্ছেন। চট্টগ্রামের জনৈক চিকিৎসক একদা আমার কাছ থেকে জানতে চাইলেন যে, সাধারণদের জন্য কাদিয়ানীদের সাথে ডিবেট করার পন্থা কী? অর্থাৎ কোন নিয়মনীতি মান্য করলে তাদের সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক সফল হওয়া যাবে।? যাইহোক, কাদিয়ানীরা ছলেবলে কৌশলে তাদেরকে কাছে টেনে নেয়ার চেষ্টা করে। তাদের কাছ থেকে বাইয়েত নিয়ে অত:পর ব্রেইন ওয়াশ করে ফেলে, যাতে তাদের বলয়ের বাহিরে ছুটে না যায়। তবে এরপরেও অনেকে বাস্তবতা বুঝতে পেরে কেটে পড়েন। এমনি একজন যুবকের ফোনালাপ থেকে আমি একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা স্যোসাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছি। দেখুন এখানে। আগের আলোচনায় আবার ফিরে এলাম। সাধারণ কাদিয়ানী যুবক-যুবতীরা মির্যা কাদিয়ানীর দাবীগুলো সম্পর্কে পুরোপুরি অন্ধকারে। বিশেষ করে তার ‘শেষনবী’ হবার দাবীটি সম্পর্কে। এই বিষয়ে স্ক্রিনশট সহ কয়েকটি সিরিজ ভিডিও দেখুন। মির্যা কাদিয়ানীর নবী-রাসূল দাবী, সিরিজ (১), (২), (৩), (৪)। (এলাকায় প্রচারের উপযোগী দুই পৃষ্ঠার একটি লিফলেট) অপ্রিয় হলেও সত্য হল, তাদের শীর্ষনেতাদের তৈরিকৃত সিলেবাসের বাহিরে তাদের অধীনস্থদের মন-মগজে ইসলামের ফান্ডামেন্টাল শিক্ষার ছিটেফোঁটাও থাকেনা। এদের প্রাধানতম বৈশিষ্ট্য, কুরআন শরীফ অশুদ্ধ পড়া আর নিজের মত করে ব্যাখ্যা দেয়া। এরা মুসলমানদের মসজিদে যায় না, মুসলমানদের জানাজাতেও অংশগ্রহণ করেনা। এদের পিতা মাতার জানাজাতেও অংশগ্রহণ করতে জোরালো ভাবে নিষেধাজ্ঞা থাকে, বড়জোর জানাজায় কাঠের পুতুলের ন্যায় সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে তবেই সে পর্যন্ত অনুমতি রয়েছে। কত পাষণ্ড আর হতভাগা এরা!ছোটবেলা থেকেই এদেরকে চরম আলেম উলামা বিদ্বেষী করে তোলা হয় বলে এরা আলেম উলামার কাছ থেকেও দূরে থাকে। আলেম উলামার প্রতি এদের মজ্জাগত বিদ্বেষ আর দুশমনির ফলে এদের বেশিরভাগ Ex ahmadi দুর্ভাগ্যবশত মুলহেদ হয়ে যায়, তবু ইসলাম গ্রহণ করতে চায় না। কারণ এদের মন মগজে সেই ছোট বেলা থেকেই ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যে, বর্তমান ইসলাম মোল্লা মৌলভীদের বানানো ইসলাম। নাউযুবিল্লাহ। অথচ ইসলামের বুনিয়াদ হচ্ছে, পবিত্র কুরআন এবং কুরআনের মর্মার্থ সুস্পষ্টকারী সহায়ক সংকলন রাসূল (সা.)-এর সীরাত তথা সুন্নাহ।

এরা জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ এবং খেলাফত রাষ্ট্রের চরম বিরোধী। স্বভাবতই ব্রিটিশপ্রিয় হয়। কুরআন হাদীসকে সরাসরি অস্বীকার করার পরিবর্তে রূপক কিবা অপব্যাখ্যার মাধ্যমে ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে অস্বীকারকারী হয়। আর নিজ মতবাদের পক্ষে এমন সব বর্ণনা বা উদ্ধৃতিও উপস্থাপন করে থাকে যেগুলোর বেশিরভাগই জাল, জঈফ বা মুনকার পর্যায়ের অগ্রহণযোগ্য বর্ণনা; কোনো অথেনটিক সোর্স থেকেও সংগৃহীত নয়। এদের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল, এদের বইপুস্তক অগণিত স্ববিরোধ কথাবার্তায় ভর্তি, যা এদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও এরা মেনে নিতে চায় না। এগুলো আমার দীর্ঘ অবিজ্ঞতা থেকেই লিখলাম। আরও জানার বিষয় হল, সারা দুনিয়ায় এদের দাবী হচ্ছে, সংখ্যায় এরা ২০ কোটি। অথচ নিরপেক্ষ গণনামতে এরা কোনো ভাবেই ১৫-২০ লাখের বেশি হবেনা। বাংলাদেশে এদের সংখ্যা এদেরই দাবী অনুসারে ১ লক্ষ। তবে আমাদের জরিপ বলছে, এরা কোনো ভাবেই ২৫ হাজারের বেশি হবেনা। বিবাড়িয়া, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, সাতক্ষীরার সুন্দরবন, জামালপুরের সরিষাবাড়ি আর বান্দরবন, যশোর এবং খুলনায় এদের সংখ্যাটা তুলনামূলক বেশি। প্রাণ, আর.এফ.এল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা মেজর (অব.) আমজাদখান চৌধুরী আর বাংলাদেশের বর্তমান কাদিয়ানীদের ন্যাশনাল আমীর জনাব আব্দুল আউয়াল সাহেব দুইজনই মামাতো আর ফুফাতো ভাই। জনাব আমজাদখানের পিতা আলী কাশেমখান চৌধুরী আর কাদিয়ানী আমীরের মাতা মাসুদা সামাদ আপন ভাই বোন। কাদিয়ানীদের একটি বই ‘সীরাতে মাহদী’-তে ইসলাম বিরোধী ১৬টি চরম বিভ্রান্তিকর ধর্মবিশ্বাস এর উল্লেখ রয়েছে, যা তারা সাধারণ মানুষ থেকে বরাবরই গোপন রাখে। আমি তাদের ডজনখানেক বই থেকে স্ক্রিনশট সহ মির্যা কাদিয়ানীর নবী ও রাসূল দাবীর প্রমাণও অত্র রচনায় দিয়ে রেখেছি। পাঠকদের জন্য আরও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেলও অত্র রচনায় সন্নিবেশিত করে দিয়েছি। তন্মধ্যে কাদিয়ানীদের কলেমার গোপন রহস্যপ্রতিশ্রুত মসীহ্‌ এর পরিচয় এবং প্রতীক্ষিত মাহ্‌দী এর পরিচয় অন্যতম। অধিকন্তু তাদের কেউই এখনো দুনিয়ায় আবির্ভূত হননি। ইমাম মাহদী সংক্রান্ত হাদীসগুলোর মধ্যে পরিষ্কার লিখা আছে যে, তিনি নবীজী (সা.)-এর কন্যা ফাতেমার পুত্র হযরত হাসান (রা.)-এর বংশে জন্মগ্রহণ করবেন। সে হিসেবে তিনি সাইয়েদ এবং কুরাইশীও হবেন তার নাম হবে মুহাম্মদ, পিতার নাম আব্দুল্লাহ, জন্মস্থান হবে আরব (মদীনা), মাহদীয়তের উপর বাইয়েত শুরু করবেন মক্কায়। তিনি আরবে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করবেন। আবুদাউদ শরীফে (কিতাবুল, মাহদী অধ্যায়) এসেছে, ‘ইমাম মাহদী সাত বছর রাষ্ট্রকার্য পরিচালনা শেষে ইন্তেকাল করবেন।’ শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী (রহ.) তার ‘আল জামেউস সহীহ’ কিতাবে হাদীসটিকে “হাসান” (حسن) বলেছেন। উল্লিখিত পরিচিতির আলোকে দৃঢ়ভাবে বলা যায় যে, রাসূল (সা.) শেষ যামানায় আগমনকারী যে ইমাম মাহদীর সুসংবাদ দিয়ে গেছেন আজকের এই দিন (২০২২ ইং, এই আর্টিকেল লিখার সময়) পর্যন্ত সেই ইমাম মাহদী এবং প্রতিশ্রুত ঈসা (আ.) দুইজনের কেউই আবির্ভূত হননি। আল্লাহ চাহিলে দুইজনই যথাসময়ে আসবেন। মির্যা গোলাম আহমদ এর দাবী একই সাথে ইমাম মাহদী এবং ঈসা, দুটোই। কিন্তু রাসূল (সা.) উক্ত দুই মহা পুরুষ সম্পর্কে সহীহ হাদীসগুলোতে যেই পরিচিতি রেখে গেছেন তার ছিটেফোঁটাও মির্যা গোলাম আহমদের সাথে মিল পাওয়া যায় না। এটি পড়ুন, এক নজরে মির্যা কাদিয়ানী। উল্লেখ্য, প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদী এবং হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম আলাদা দুই ব্যক্তিই। বহু সহীহ হাদীসে দুইজনের ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় একদম সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। কাদিয়ানীদের বইতে দুই ঈসা’র বিভ্রান্তিকর কনসেপ্ট এর জবাব এখানে। তাদের ‘ওয়া লাল মাহদী ইল্লা ঈসা ইবনু মরিয়ম’ এর বর্ণনা দিয়ে বিভ্রান্তিকর কনসেপ্ট এর জবাবও এখান থেকে দেখে নিন। ইমাম মাহদী একই সাথে ফাতেমি, আব্বাসী, হাসানী, হোসাইনী সব কিভাবে হতে পারেন? মাহদীয়তের নিদর্শনের নামে কাদিয়ানীদের উপস্থাপিত চন্দ্রসূর্য গ্রহণের বর্ণনাটি কেন গ্রহণযোগ্য নয়?। একটি সতর্কবার্তা, একটি ঈমান বিধ্বংসী ও মুসলিম নাম ব্যবহারকারী কাদিয়ানী গোষ্ঠীর অপতৎপরতা থেকে সবাইকে সতর্ক করতে কয়েকটি কথা বিনীতভাবে উপস্থাপন করছি। এই কাদিয়ানী গোষ্ঠীটি তাদের মতের বাহিরে সমস্ত মুসলমানকে অমুসলিম, কাফের, জাহান্নামী মনে করে থাকে। এরা অন্যান্য মুসলমানের মত হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মত দাবী করা সত্ত্বেও বিশ্বের সমস্ত মুসলিম স্কলারদের সর্বসম্মতিক্রমে কাফের ও ইসলাম থেকে খারিজ। তার কারণ এরা খতমে নবুওয়ত এবং হায়াতে মসীহ সহ ইসলামের বহু মৌলিক বিশ্বাসকে কুরআন এবং সুন্নাহর অপব্যাখ্যার আড়ালে অস্বীকার করে থাকে। এরা আজ থেকে শতাধিক বছর আগে ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে তথা ১২৫৬ হিজরী সনে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের কাদিয়ান নামক গ্রামে জন্মগ্রহণকারী এক ব্যক্তিকে নবী বলে বিশ্বাস করে। তার নাম ছিল মির্যা গোলাম আহ্‌মদ (১৮৩৯-১৯০৮)। সে নিজেকে প্রতিশ্রুত ঈসা (আ.)-এর রূপক সত্তা এবং শেষ যুগে আগমনকারী ইমাম মাহদী হবার দাবীও করে। অথচ কুরআনের আয়াত ও সহীহ্ হাদীসের মানদণ্ডে এই লোকের দাবীগুলোর একটিও টিকেনা। তাই কোনো সন্দেহ নেই যে, এই ব্যক্তি নিজ দাবীতে একজন জঘন্য মিথ্যাবাদী ও প্রতারক। এখানে তার কয়েকটি উক্তি তুলে ধরছি, যা পড়ার পর যে কেউই তার আসল পরিচয় পর্যন্ত সহজে পৌঁছতে পারবে! যথা- ১. মির্যা কাদিয়ানী ১৮৯৮ সালের দিকে ব্রিটিশ-ভারত রাণী আলেকজান্ড্রিনা ভিক্টোরিয়াকে সম্বোধন করে লিখেছিল, ‘নিজেদের হাতে রোপিত এই চারাগাছটির ব্যাপারে খুব সতর্কতা ও অনুসন্ধানের সাথে অগ্রসর হবেন এবং আপনার অধীনস্তদের বলবেন তারা যেন এই পরিবারের ত্যাগ ও নিষ্ঠার কথা মনে করে আমার দলের প্রতি সদয় দৃষ্টি জ্ঞাপন করেন। আমাদের পরিবার ইংরেজ সরকারের কল্যাণে নিজেদের খুন বইয়ে দিতে ও জীবন দিতেও দ্বিধা করেনি আর না এখনো দ্বিধা করছে।’ (মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত ৩/২১-২২; নতুন এডিশন)। তার এই কথা পরিষ্কার প্রমাণ যে, সে ব্রিটিশদেরই সৃষ্টি ছিল। ২. ‘আমার বিশ্বাস, যে হারে প্রতিদিন আমার অনুসারির সংখ্যা বাড়ছে সেই হারে জিহাদের পক্ষাবলম্বীর সংখ্যাও কমছে।’ (মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত ৩/১৯)। এখানে তার এই বক্তব্য ব্রিটিশ ভারতের ১৮৫৭ সালের আযাদী আন্দোলন ও সিপাহী বিদ্রোহকেই স্মরণ করে দিচ্ছে। মূলত ঐ সমস্ত আন্দোলন সংগ্রাম দমিয়ে রাখতেই পরবর্তীতে এই মির্যায়ী তথা কাদিয়ানী জামাতের সৃষ্টি। ৩. ‘ব্রিটিশ সরকারের আনুগত্য ইসলামেরই একটি অংশ’ (রূহানী খাযায়েন ৬/৩৮০)। মির্যা কাদিয়ানীর এই বক্তব্য আমার উপরোক্ত সবগুলো দাবীকে দ্বিপ্রহরের সূর্যের মত একদম পরিষ্কার করে দেয়। যাইহোক ২৫ শে মে ১৮৯৩ সালে অমৃতসর নামক স্থানে মির্যা কাদিয়ানীর সাথে তৎকালীন মুসলিম নেতা শায়খ আব্দুলহক গজনভী (রহ.)-এর একটি মুবাহালা অনুষ্ঠিত হয়। (দেখুন, রূহানী খাযায়েন ৬/৩৭২)। উক্ত মুবাহালায় উভয়পক্ষ নিজের উপর নিজে বদ দোয়া করেন এবং মুবাহালাকারী দুইপক্ষের সত্যবাদীর জীবদ্দশায় যিনি প্রকৃতপক্ষে একজন মিথ্যাবাদী তিনি যেন ধ্বংস হন, এইরূপ কামনাও করেন (দেখুন, মালফূজাত ৫/৩২৭; চতুর্থ এডিশন)। ইতিহাস সাক্ষী, পরবর্তীতে শায়খ গজনভী (রহ.) মারা যান ১৬ই মে ১৯১৭ সালে। আর মির্যা কাদিয়ানী শায়খের জীবদ্দশায় প্রায় ৯ বছর পূর্বেই ১৯০৮ সালে লাহোরে ২৬ শে মে বুধবার সকাল সাড়ে দশটায় কলেরায় আক্রান্ত হয়ে টাট্টিতে নিপতিত হয়ে মারা যায়। তার লেখিত প্রায় ৮৩টি বইয়ের সমষ্টির নাম ‘রূহানী খাযায়েন‘ (আধ্যাত্মিক ভাণ্ডার), যা আনুমানিক ১৯৬০ সালের দিকে ২৩ খণ্ডে প্রকাশ করা হয়। বইগুলো দ্বারা সেসব মানুষ খুব বিভ্রান্ত হয় যাদের পূর্ব থেকে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে আলোচ্য বিষয়ে গভীর কোনো জ্ঞান নেই। একটি হাদীসে এসেছে, মহানবী (সা.) তাঁর পরবর্তী সময়ে ত্রিশ জন নবুওয়তের মিথ্যা দাবীদারের আবির্ভাব হবার ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে গেছেন (সুনান তিরমিজী (ইফা) অধ্যায়ঃ ৩৬/ কিতাবুল ফিতনা)। সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাকারক ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) (মৃত. ৮৫২ হিজরী) হাদীসটির ব্যাখ্যায় লিখেছেন, এই ত্রিশজন মিথ্যাবাদী বলতে বিশেষভাবে ওরাই উদ্দেশ্য যাদের দাপট প্রতিষ্ঠা পাবে এবং (সাধারণ মানুষের ভেতর) তাদের তৎপরতার কারণে মারাত্মক সন্দেহ সৃষ্টি হবে। (ফাতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী : খণ্ড ১২ পৃষ্ঠা ৩৪৩)। সমস্ত ইসলামি বিশেষজ্ঞ একমত যে, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী তাদেরই মধ্য হতে একজন। পাঠকদের উদ্দেশ্যে এখানে কয়েকটি লিখার লিংক দিচ্ছি। গুরুত্ব সহ পড়ার অনুরোধ থাকল, কাদিয়ানীরা কাফের কেন? মির্যা কাদিয়ানীর ৫টি মিথ্যা ভবিষ্যৎবাণী। তথাকথিত উম্মতিনবী কাদিয়ানী জামা’তের প্রতিষ্ঠাতার কিছু দাবী দাওয়া। মির্যা কাদিয়ানীর কিছু মিথ্যাচার, প্রতারণা ও জালিয়াতি। পবিত্র কুরআনের ত্রিশ আয়াতে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে যাওয়ার দাবী কেন ডাহা মিথ্যা? আমাদের ওয়েবসাইট ও আমাদের ভিডিও সমূহ। ইউটিউব থেকে (markajTV by PNN) (হেদায়েতের পথিক)। লিখকের ফেইসবুক পেইজ (ধারাবাহিক লাইভ পর্ব) থেকে ভিডিও। আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার করতে আমাদের Telegram চ্যানেলে যুক্ত হতে পারেন। আমার সবগুলো বই (১২টি) এক সাথে অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী এম.এ

যোগাযোগ 01629941773 (What’sapp, Telegram & Imo)

কুরআনের মাপকাঠিতে হাদীস গ্রহণের নীতি কেন পরিত্যাজ্য

এই বিষয়ে লিখতে হবে আগে কখনো ভাবিনি। সম্প্রতি কথিত আহলে কুরআন তথা হাদীস অস্বীকারকারী এক নব্য ফেতনার উদ্ভব হয়েছে, যদিও এই ফেতনা আগেও ছিল; তবে তারা আগে একদমই বিস্তার লাভ করেনি, বড়জোর ইতিহাসের পাতায় কালো অক্ষরের ফ্রেমে বন্দী ছিল। স্যোসাল মিডিয়ার এই সময়টিতে এই ফেতনা যেন কোমরে গামছা বেঁধে ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে হাদীসকে বাতিল সাব্যস্ত করতে।

এবার দেখুন, হাদীস বিরোধী অপপ্রচারকারীদের সম্পর্কে যুগশ্রেষ্ঠ আয়েম্মায়ে কেরাম কী বলে গেছেন। ইমাম খাত্তাবী (রহ.) তার শরহে সুন্নাহ কিতাবে বিখ্যাত হাদীস বিশারদ ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন যে, যারা বলে কুরআনের মাপকাঠিতে হাদীস গ্রহণ করতে হবে, নিশ্চয়ই তাদের এইধরণের কথা যিনদীক তথা ধর্মদ্রোহীরাই গড়েছে (দেখুন, শরহে সুন্নাহ ৪/২৯৯, ইমাম খাত্তাবী)। অর্থাৎ তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, এধরণের অপপ্রচার আজ নতুন নয়, প্রত্যেক যুগেই হাদীসের উপর আক্রমণ হয়েছিল, সামনেও হতে থাকবে, শুধু আক্রমণের ধরন পাল্টিবে। কাজেই কোনো মুসলমানের জন্য উচিত হবেনা তাদের অপপ্রচারে কান দেয়া। এ বিষয়ে অনেক পূর্ব থেকে আয়েম্মায়ে কেরাম দুনিয়াকে সাবধান করে গেছেন। ইমাম খাত্তাবী (রহ.)-এর কিতাব থেকে স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য।

(আরবী) وفي الحديث دلالة على أنه لا حاجة بالحديث إلى أن يعرض على الكتاب؛ فإنه مهما ثبت عن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان حجة بنفسه، و اما ما رواه بعضهم انه قال اذا جاءكم الحديث فأعرضوه على كتاب الله فإن وافقه فخذوه و إن خالفه فدعوه فإنه حديث باطل لا اصل له. و قد حكى زكريا ابن يحيى الساجى عن يحيى ابن معين انه قال هذا حديث وضعته الزنادقة.

অর্থাৎ হাদীসের প্রামাণিকতার জন্য তাকে কুরআনের মুকাবিলায় উপস্থাপন করার কোনোই প্রয়োজন নেই। নিশ্চয়ই এটি রাসূল (সা.) হতে যখনি সাব্যস্ত হয়ে যাবে তখনি তা নিজেই প্রমাণযোগ্য হয়ে যাবে। তবে কেউ কেউ বলেছে যে, যখন তোমাদের নিকট হাদীস পেশ হবে তখন তোমরা তা কিতাবুল্লাহ’র মুকাবিলায় উপস্থাপন করবে। তারপর সেটি কিতাবুল্লাহ’র মুতাবেক হলে তোমরা গ্রহণ করবে আর যদি বিরোধী হয় তখন তোমরা তা পরিত্যাগ করবে, কেননা এমতাবস্থায় এই হাদীস বাতিল ও ভিত্তিহীন। অথচ ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (রহ.) হতে যাকারিয়া ইবনে ইয়াহইয়া আস সাজি বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই এইধরণের কথা যিনদীক তথা ধর্মদ্রোহীরাই গড়েছে

ইমাম ইবনে হাজম (রহ.)ও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে কোনো সহীহ হাদীসই কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।

(আরবী) : ليس في الحديث الذي صح شيء يخالف القرآن الكريم ولا سبيل إلى وجود خبر صحيح مخالف لما في القرآن أصلاً، وكل خبر شريعة فهو إما مضاف إلى ما في القرآن ومعطوف عليه ومفسر لجملته، وإما مستثنى منه لجملته، ولا سبيل إلى وجه ثالث

অর্থাৎ সহীহ হাদীসের কোনো কিছুই কুরআনুল কারীমের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কুরআনের বিপরীতে এমন কোনো সহীহ হাদীসের কখনো অস্তিত্বই থাকার সুযোগ নেই। শরীয়ত সংক্রান্ত যত বর্ণনা রয়েছে তা হয়ত কুরআনের বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্কযুক্ত ও সংযোজিত এবং বিশ্লেষণকারী, অথবা কুরআনের বিষয়বস্তুর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। এর বাহিরে তৃতীয় আর কোনো পথ নেই। (দেখুন, আল আহকাম ফী উসূলিল আহকাম ২/২১৫-২১৬)।

সর্বসাধারণ মুসলিম উম্মাহার খেদমতে কিছু কথা বলে রাখা জরুরি। তা হচ্ছে, ইসলাম মানে শুধু কুরআন হলে আল্লাহ বলতেন না ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো।’ (সূরা মায়িদাহ, আয়াত ৯২)। ‘যে রাসূলের আনুগত্য করলো সে আল্লাহর আনুগত্য করলো।’ (সূরা নিসা, আয়াত ৮০)। আমাদের অবশ্যই চিন্তা করা উচিত যে, মহান আল্লাহ শুধু কিতাব পাঠাননি, তিনি কিতাবের সাথে ব্যাখ্যাতাও (রাসূল সা.) পাঠিয়েছেন। সুতরাং একটি মেনে অপরটি অস্বীকার করা মানে ইসলামকে আংশিক মানা আর আংশিক অস্বীকার করা। বরং হাদীস অস্বীকার করলে কুরআন অস্বীকারের রাস্তাই খুলে যায়। হাদীস অস্বীকারকারীরা কুরআনের সাথে যেভাবে হাদীসের সাংঘর্ষিকতা প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা করেন, ঠিক একইভাবে কুরআনের এক আয়াতের সাথে অন্য আয়াতের সাংঘর্ষিকতা দেখানো যায়। একজন কোনো বই থেকে শিখেছে, দুই যোগ দুই চার হয়। হঠাৎ সে একই বইয়ে তিন যোগ এক চার হওয়ার কথা জেনে আশ্চর্য হওয়া মানুষের মতো অনেকটা হাদীস অস্বীকারকারীদের দশা। হাদীস অস্বীকারকারীদের একটা ধূর্ততা হলো, তারা সরাসরি হাদীস অস্বীকারের কথা বলে না। কুরআনের সাথে হুবহু মিলে এমন হাদীসগুলো মানার কথা বলেন তারা। মূলত শুধু এই শ্রেণীর হাদীস গ্রহণ করা আর না করার মধ্যে পার্থক্য থাকে না। শুধু কুরআন থেকে সালাতের কোনো বিবরণ তো পরের কথা সালাতের আগের কাজ—আযান ও পবিত্রতার পদ্ধতিও প্রমাণ করা যাবে না। প্রয়োজন হবে হাদীসের। যাকাত ও অন্য সব বিষয়েও একই কথা প্রযোজ্য। মূলত, কুরআনকে যদি থিওরি বলা হয় তাহলে হাদীসকে তার প্র্যাক্টিক্যাল বলা যায়। সারা বিশ্বের সব যুগের সব আলিম ও ইমাম হাদীস অস্বীকারকারীদের ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার ব্যাপারে একমত। হাদীস সংকলন, রিজালশাস্ত্র ও জরাহ-তা’দীল প্রভৃতি সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা রাখা কোনো মানুষ হাদীসের প্রামাণ্যতা অস্বীকার করতে পারে না। ইসলামের প্রথম দুই শতকে কেউ হাদীসকে শরীয়তের দলিল হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানায়নি। হিজরী দ্বিতীয় শতকের শেষের দিকে এসে সর্বপ্রথম মুতাযিলা সম্প্রদায় হাদিসকে অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখায়। পরবর্তী যুগের অস্বীকারকারীরা এক্ষেত্রে মূলত মুতাযিলাদেরকেই অনুসরণ করছে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে হাদীস অস্বীকারকারী নামধারী আহলে কুরআনের ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

মুহাম্মদ (সা.) দ্বিতীয়বার জীবিত হয়ে দুনিয়ায় আসা

মির্যা কাদিয়ানীর পুত্র ও তার তথাকথিত মুসলেহ মওউদ মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এ কি লিখলেন দেখুন, بلکہ قرآنی اصطلاح میں ہم کہہ سکتے ہیں کہ محمد صلی الله علیہ وسلم دوبارہ زندہ ہو کر تشریف لے آئے اور یہ ایک بہت بڑے عزت کی بات ہے অর্থাৎ বরং কুরআনের পরিভাষায় আমরা বলে থাকি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয়বার জীবিত হয়ে (দুনিয়ায়) আগমন করবেন এবং এটি (তাঁর জন্য) অনেক বড় সম্মানের ব্যাপার। (খুতুবাতে মাহমুদ পৃ-২৭৫, সন ১৯৪০ ইং, মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ)। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি এই,

স্ক্রিনশট – খুতুবাতে মাহমুদ (উর্দু ভার্সন)

পরিশেষে আমি শপথ করে বলতে পারি, কাদিয়ানী মতবাদের সাধারণ অনুসারীরা কাদিয়ানীবাদের এ সমস্ত কুফুরী সম্পর্কে জানেই না। ফলে তারা ইমাম মাহদীর কনসেপ্ট-এর উপর সম্পূর্ণ চোখবন্ধ করেই মির্যায়ীদের দলে যোগ দিয়েছে। অথচ আল্লাহর রাসূল (সা.) ইমাম মাহদী সংক্রান্ত যতগুলো হাদীসে ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে গেছেন তন্মধ্যে একটি হাদীসও মির্যা কাদিয়ানীর সাথে যায়না। মোটকথা, কাদিয়ানী মতবাদ এক দিকে জঘন্য কুফুরী মতবাদ, অপরদিকে ইসলামের মূলধারার শিক্ষা থেকে পুরোপুরি খারিজ। আমার অনুরোধ রইল, দয়া করে ব্যাপারটিতে সবাই সিরিয়াস হবেন এবং সত্যটা যাচাই-বাছাই করে তাবৎ ধোকা এবং প্রতারণার পথ থেকে ফিরে আসবেন। ওয়ামা আ’লাইনা ইল্লাল বালাগ।

  • মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী থেকে পবিত্র কুরআনের সূরা জুম’আ এর ২ এবং ৩ নং আয়াতের অপব্যাখ্যা দ্বারাও মুহাম্মদ (সা.) দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে আসার দলিল ও আমাদের পক্ষ হতে তার খণ্ডনমূলক উত্তর এখানে দেখুন!

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

শিক্ষাবিদ ও গবেষক

বঙ্গবন্ধুর দুই সুযোগ্য উত্তরসূরীর দৃষ্টিভঙ্গীর বিরুদ্ধে কাদিয়ানীবাদ

মরহুম প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান :

মরহুম জিল্লুর রহমান (জন্ম: ৯ মার্চ, ১৯২৯ – মৃত্যু: ২০ মার্চ, ২০১৩) বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে এ যাবৎ দেশের সবকয়টি আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি এম এম রহুল আমিন তাঁকে বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনে শপথ বাক্য পাঠ করান। তিনি একজন সাধারণ শিক্ষিত হয়েও ফতুয়াবাজীর বিরুদ্ধে সময়োপযোগী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একখানা উক্তি করে গেছেন। তিনি হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “যে নিজের মুখে মুসলমান হবার দাবী করে তাকে আমার জন্য মুসলমানদের তালিকাভুক্ত কর”। হাদীস শরীফে আছে, “যে স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে কালেমা তৈয়বা পাঠ করেন এবং তার উপর সার্বিক অর্থে বিশ্বাস স্থাপন করে তিনি মুসলমান।” (দৈনিক সংগ্রাম, মঙ্গলবার, ১৯শে কার্তিক, ১৩৯৯ বাংলা, ৩রা নবেম্বর, ১৯৯২ ইং)।

  • মুসলমান এবং কাদিয়ানীদের মধ্যকার পার্থক্য (লিফলেট), ডাউনলোড লিংক
দৈনিক সংগ্রাম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা :

মাননীয় শেখ হাসিনা ওয়াজেদ (জন্ম: ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭) বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী। তিনিও সমসাময়িক একখানা মহামূল্যবান উক্তি করেছেন। তার এই উক্তি সাম্প্রতিক সময়ে কতিপয় ফতুয়াবাজ মৌলভি আর ভণ্ডনবী মির্যা কাদিয়ানীর লাগামহীন ‘কাফের ফতুয়াবাজি’-এর বিরুদ্ধে সমুচিত শিক্ষা। তিনি (ক্ষমতার বাহিরে থাকাকালীন ২০০৪ সালের দিকে) বলেছিলেন, “কে মুসলমান আর কে নয় তার বিচার করবেন আল্লাহ।” (দৈনিক প্রথম আলো, সোমবার ১২ জানুয়ারী ২০০৪, ২৯ পৌষ ১৪১০ বাংলা)।

উল্লেখ্য, তিনি আহমদীয়া (কাদিয়ানী) সম্প্রদায়ের প্রকাশনা নিষিদ্ধের নিন্দা জানিয়ে ও তৎকালীন কাদিয়ানীদের ‘ইসলামে নবুওয়ত‘ নামীয় একটি বিভ্রান্তিকর বইয়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রায়ের প্রতিবাদে ঐ বক্তব্য দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তখনও জানতেন না যে, কাদিয়ানীদের চেপে রাখা কুফুরী বিশ্বাসগুলো কী কী? তাদের ধর্মবিশ্বাস মতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও যে কাফের, তখন হয়ত তাঁর নিজেরও জানা ছিলনা। (কাদিয়ানীদের ধর্মবিশ্বাস তাদেরই বইয়ের স্ক্রিনশট সহ দেখুন)।

প্রথম আলো, সম্পাদক- মতিউর রহমান (সিপিবি নেতা)

কাদিয়ানীদের বিভিন্ন রচনায় অ-কাদিয়ানীদের কাফের ফতুয়াবাজী :

(১) আহমদীয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী লিখেছেন, ‘খোদাতালা আমার উপর প্রকাশ করে দিয়েছেন যে, যাদের নিকট আমার দাওয়াত পৌঁছেছে আর তারা তা কবুল করেনি এমন ব্যক্তি মুসলমান নয় এবং এরা (পরকালে) পাকড়াও হবে।’ (মির্যা কাদিয়ানীর কথিত ওহী-সমগ্র গ্রন্থ তাযকিরাহ পৃষ্ঠা নং ৫১৯; ইলহাম, মার্চ ১৯০৬ ইং, চতুর্থ এডিশন)।

(২) কাদিয়ানী জামাতের তথাকথিত দ্বিতীয় খলীফা মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ লিখেছেন, ‘যে সমস্ত মুসলমান মির্যা কাদিয়ানীর নিকট বাইয়েত নেয়নি, তারা যদি তার নামও না শুনে থাকে তবুও তারা কাফের এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে বাহিরে।’ (আয়নায়ে সাদাকাত, আনওয়ারুল উলূম খণ্ড নং ৬ পৃষ্ঠা নং ১১০; মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ)।

স্ক্রিনশট সহ দেখতে ক্লিক করুন এখানে। পরিশেষে আমরা প্রমাণ পেলাম যে, কাদিয়ানীদের অথেনটিক সিদ্ধান্ত মতে যে বা যারা তাদের দলভুক্ত নয়, অর্থাৎ মির্যা কাদিয়ানীকে নবী রাসূল ইত্যাদি বিশ্বাস করেনা; তারা কাফের এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে বাহিরে। সুতরাং বলা যায় যে, বর্তমানে মুসলমানরা তাদেরকে কাফের ও অমুসলিম মাইনরিটি বলে রাষ্ট্রীয়ভাবে রায় ঘোষণার দাবী জানানোরও শত বছর আগ থেকে তারাই বরং অন্যদের “কাফের” এবং “জাহান্নামী” বলে লিখে গেছে। এখানে তাদের একটি বাংলা রচনা (মূল লিখক, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী) থেকে শুধুমাত্র একখানা প্রামাণ্য স্ক্যানকপি উল্লেখ করছি।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

ঈসা (আ.) এই টেকনোলজির যুগে আসলে এগুলো শিখবেন কার কাছ থেকে?

প্রশ্নকর্তা : আগের সেই ঈসা (আ.) পৃথিবীতে আবার যদি আসেন তাহলে তো তাঁকে আধুনিক যুগের সব নিয়ম-কানুন নতুন করে শিখতে হবে, তিনি হিব্রু ভাষায় কথা বলতেন, আর এখন সেই ভাষা প্রায় বিলুপ্ত; তাহলে তিনি আবার এলে নতুন কোনো ভাষা শিখবেন কার কাছ থেকে? ইত্যাদি ইত্যাদি!

উত্তর : প্রথমত, প্রশ্নকারীর প্রশ্নটাই সঠিক নয়। কেননা কোনো ধার্মিক বা বিশ্বাসীর পক্ষে এমন ধরণের চিন্তা করাই অসম্ভব, বরং এধরণের প্রশ্ন শুধুই নাস্তিক কিবা ধর্মদ্রোহী অবিশ্বাসীদের পক্ষেই মানায়। জনৈক প্রশ্নকর্তা কাদিয়ানী মতবাদের অনুসারী হয়ে এধরণের প্রশ্ন যখন করেন তখন তিনি কিজন্য নিজেদের ঐ বিশ্বাসটিও ভুলে যান যে, ঈসা (আ.) জেরুজালেম ছেড়ে ভারতের কাশ্মীরের শ্রীনগরেও গিয়েছিলেন এবং আমৃত্যু সেখানেই ছিলেন। এমতাবস্থায় তাদের উদ্দেশ্যে একই প্রশ্ন তো আমাদেরও যে, হিব্রুভাষী হযরত ঈসা (আ.) কাশ্মীরে গিয়ে কোন ভাষায় কথা বলেছিলেন? অবশ্যই হিব্রু ভাষায় নয় বরং কাশ্মীরীদের ভাষায় কথা বলেছিলেন! তো কাশ্মীরী ভাষা তিনি কার কাছ থেকে শিখলেন?

  • প্রসঙ্গত, ১৯২২ সালে হিব্রু ব্রিটিশ প্যালেস্টাইনের সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়। ইসরায়েলে প্রায় ৫০ লক্ষের বেশি লোক হিব্রু ভাষায় কথা বলেন। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রায় কয়েক লক্ষ লোক হিব্রুতে কথা বলেন। বর্তমানে আরবির পাশাপাশি হিব্রু ইসরায়েলের সরকারি ভাষা। সুতরাং হিব্রু ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে এমন দাবী কাদিয়ানীদের হয়ত অজ্ঞতা আর নয় কাঁচা মিথ্যাচার! (ফেইসবুক থেকে)।

আসুন, প্রশ্নকারীর যুক্তির প্রতিউত্তরে এবার দুই-এক্কান কথা বলি! আল্লাহতালা এক রাত্রিতেই প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদীকে নেতৃত্বের যোগ্য করে পাঠানোর কথা সহীহ হাদীসে (ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩৩১৬) (يُصْلِحُهُ اللَّهُ فِي لَيْلَةٍ) বর্ণিত থাকাই কি ইংগিত করেনা যে, তিনি হযরত ঈসা (আ.)-কেও যুগের দাবী মোতাবেক যোগ্য করে যথাসময়ে আকাশ থেকে ফেরেশতাদ্বয়ের মাধ্যমে দুনিয়ায় পাঠাবেন! জ্ঞানীদের জন্য নবীকরীম (সা.)-এর ইংগিতপূর্ণ বাণীসমূহের আলোকে শিক্ষা লাভ করা যথেষ্ট নয় কি? আহা! নির্বোধরা আল্লাহর কুদরতেরও পরীক্ষা নিতে চায়! নাউযুবিল্লাহ।

তর্কের খাতিরে মানলাম যে, ঈসা (আ.) আধুনিক এই যান্ত্রিক যুগে আগমন করলে তিনি এগুলা শিখবেন কার কাছ থেকে? প্রশ্নকারীর উদ্দেশ্য হল, এইধরণের যুক্তি দিয়ে বনী ইসরাইলের প্রতি প্রেরিত ঈসা (আ.)-কে মৃত বলে সাব্যস্ত করা ও তদস্থলে মির্যা কাদিয়ানীকে রূপক ঈসা বলে প্রতিষ্ঠিত করা। মনে হচ্ছে যুক্তিতে তিনি অক্করে শিরোপা জিত্তা ফেলাইছেন!

এবার আপনাকে আমার প্রশ্ন, হযরত ঈসা (আ.)-এর আগমন যে আধুনিক এই যান্ত্রিক যুগেই হবে, আপনি এই সংবাদটা আমদানি করলেন কোত্থেকে? আধুনিক এই যান্ত্রিক সভ্যতার যে কখনো বিলুপ্তি হবেনা এবং এই যুগটা যে তীর ধনুক আর বর্শার যুগে উপনীত হবেনা; আপনারে এমন গ্যারান্টি কে দিল?

ঈসা (আ.) তীর ধনুক আর বর্শার সভ্যতার যুগেই দুনিয়ায় ফিরে আসবেন বলে হাদীস শরীফে পরিষ্কার ইংগিত দেয়া হয়েছে। যেমন, হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সূত্রে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, فعند ذلك ينزل أخي عيسى ابن مريم من السماء على جبل أفيق، إماماً هادياً، وحكماً عادلاً، عليه برنس له بيده حربة يقتل الدجال فإذا قتل الدجال تضع الحرب أوزارها অর্থাৎ এমন সময় হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.) আকাশ থেকে একজন সুপথপ্রাপ্ত ইমাম আর ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে (দামেস্কের পূর্বপ্রান্তে শ্বেত মিনারার নিকটে) সমতল একটি পাহাড়ের উপর অবতরণ করবেন। যার পরণে থাকবে লৌহবর্ম এবং হাতে থাকবে (বর্শা বা বল্লম ধরনের) যুদ্ধাস্ত্র। তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন। তিনি যখন দাজ্জালকে হত্যা করবেন তখন যুদ্ধ তার সমস্ত সরঞ্জাম গুটিয়ে নেবে। (তারীখে দামেস্ক ৪৭/৫০৫ ইবনে আসাকীর, কাঞ্জুল উম্মাল ১৪/৪১৯)। এখন আমরা কি আপনার যুক্তি মেনে রাসূল (সা.)-এর উক্ত তীর ধনুক আর বর্শার সভ্যতার যুগেই (عليه برنس له) ঈসার আগমনী কনসেপ্ট বা ভবিষ্যৎবাণীকে মিথ্যা আখ্যা দেব? নাউযুবিল্লাহ। স্ক্রিনশট :-

تاريخ دمشق لابن عساكر

জাবালে আফিক বা সমতল পাহাড় প্রসঙ্গ :
উল্লিখিত হাদীসে ‘জাবালে আফিক’ একখানা উপবাক্য রয়েছে। আসুন জেনে নিই এটির ভৌগোলিক অবস্থান কোথায়? উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়্যাহ (রা.) এর বর্ণনা হতে এর পরিষ্কার একটা ধারণা পাওয়া যায়। সেখানে বর্ণিত আছে যে, এটি এমন একটি সমতল পাহাড় যেখান থেকে আল্লাহতালা ঈসা (আ.)-কে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। অনুবাদসহ হাদীসটি এই যে,

عن صفية أم المؤمنين رضي الله عنها أنها كانت إذا زارت بيت المقدس، وفرغت من الصلاة في المسجد الأقصى: صعدت على جبل زيتا فصلت عليه وقالت: هذا الجبل هو الذي رفع منه عيسى عليه السلام إلى السماء، وكانت النصارى يعظمون ذلك الجبل، وكذلك اليوم يعظمونه. {التصريح بما تواتر في نزول المسيح (ص: 258) للهندي}

অর্থাৎ একদা উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়্যাহ (রা.) বায়তুল মোকাদ্দাস পরিদর্শনে যান। মসজিদে আকসায় সালাত শেষে তিনি সুদূর দিগন্তে অবস্থিত একটি সমতল পাহাড়ে আরোহন করে সেখানেও সালাত আদায় করেন। তিনি (সাক্ষ্য দিয়ে) বলেন, এটি সেই পাহাড় যেখান থেকে ঈসা (আ.)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল। খ্রিস্টান জাতি এই পাহাড়টির খুবই সম্মান করেন এবং বর্তমানেও তারা পাহাড়টিকে সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন। {আত তাসরীহ বিমা তাওয়াতারা ফী নুযূলিল মাসীহ, পৃষ্ঠা নং ২৫৮ (সাইয়েদ আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. আল-হিন্দী)}।

উম্মুল মুমিনীন (রা.)-এর উল্লিখিত সাক্ষ্য হতেও সুস্পষ্ট হয় যে, ঈসা (আ.)-এর অবতরণ স্থল দামেস্কের ভূখণ্ডেই ও বায়তুল মোকাদ্দাস এলাকার সুদূর দিগন্তে অবস্থিত একখানা সমতল পর্বতমালা। সত্যান্বেষণকারীদের জন্য সত্য উপলব্ধি করতে এটুকুই যথেষ্ট নয় কি?

সহীহ বুখারীর কিতাবুল আম্বিয়া পর্বে এসেছে, আল্লাহর রাসূল (সা.) শপথ বাক্য সহ (والذى نفسي بيده) ঈসা (আ.) এর আগমন সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী দিয়েছেন। এখন আপনি কি বলতে চান যে, তিনি (সা.) ঐ ভবিষ্যৎবাণী দ্বারা দুনিয়াকে মিথ্যা বার্তা দিয়ে গেছেন? নাউযুবিল্লাহ। গত দুই হাজার বছরধরে পৃথিবীর প্রায় সবাই নবীগণের কবর সম্পর্কে তথ্য দিয়ে গেলেও সবাই ঈসা (আ.)-এর কবর না থাকা সম্পর্কে একমত। এতে কী বুঝা যায়? এখন দুনিয়ার এই শেষ সময় এসে এমন কোনো মতবাদ দাঁড় করতে চাওয়া কতটুকু যুক্তিসঙ্গত যা পূর্বেকার প্রতিটি যুগের মানুষের সর্বসম্মত বিশ্বাসের বিরোধী! আছে কি কেউ এই কথাগুলোর যৌক্তিক জবাব দেবেন?

কিন্তু এরপরেও যারা বুঝতে চায় না, বুঝার ইচ্ছেও নেই যাদের; আমি তাদেরকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করছি।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

ইমামগণের রচনায় খতমে নবুওয়ত প্রসঙ্গ ও ভ্রান্তি নিরসন

ইমামগণের কিতাব থেকে কাদিয়ানীদের কিছু প্রসঙ্গবহির্ভূত উদ্ধৃতি ও আমাদের পর্যবেক্ষণ

কাদিয়ানীদের রচনা হতে,

[১] হযরত ইমাম আব্দুল ওয়াহাব শি’রানি (রহ.) বলেন, قَوْلُہٗ صَلَّی اللّٰہُ عَلَیْہِ وَ سَلَّمَ فَلَا نَبِیَّ بَعْدِیْ وَلَا رَسُوْلَ الْمُرَادُ بِہٖ مُشْرِعَ بَعْدِیْ অর্থ নবীকরীম (সা.)-এর “আমার পর আর কোনো নবী নেই, রাসূলও নেই” (فَلَا نَبِیَّ بَعْدِیْ وَلَا رَسُوْلَ) একথার অর্থ হল, আমার পর শরীয়তধারী আর কোনো নবী নেই। (আল-ইয়াওয়াকিত ওয়াল জাওয়াহির, খণ্ড ২ পৃষ্ঠা ২৪)।

[২] সাইয়েদ আব্দুল করিম জিলানী (রহ.) বলেন, فَانْقَطَعَ حُکْمُ نُبُوَّۃِ التَّشْرِیْعِ بَعْدَہٗ وَکَانَ مُحَمَّدٌ ﷺ خَاتَمَ النَّبِیّیْنَ لِاَنَّہٗ جَآءَ بِالْکَمَالِ وَلَمْ یَجِیئْ اَحَدٌ بِذٰلِکَ অর্থ নবুওয়তে তাশরিয়ীর বিধান তাঁর (সা.) পরে শেষ হয়ে গেছে। অধিকন্তু মুহাম্মদ (সা.) নবীগণের খাতাম (সমাপ্তি) ছিলেন। কারণ তিনি শরীয়তের পূর্ণতা দিতে এসেছেন। এভাবে আর কেউই (ইতিপূর্বে) আসেনি। (আল ইনসানুল কামেল ১/৭৫, অধ্যায় নং ৩৬)।

[৩] হযরত মোল্লা আলী কারী (রহ.) বলেন, فَلاَ یُنَاقِضُ قَوْلُہٗ خَاتَمَ النَّبِیِّیْنَ اِذِ الْمَعْنَی اَنَّہٗ لاَ یَاتِیْ نَبِیٌّ یَنْسَخُ مِلَّتَہٗ وَ لَمْ یَکُنْ مِنْ اُمَّتِہٖ অর্থ… তাঁর (সা.) ঐ ভবিষ্যৎবাণী খাতামান্নাবীঈনের অর্থে কোনো বিরোধ সৃষ্টি করেনা। কেননা এর অর্থ হল, নবীকরীম (সা.) এর পর এমন কোনো নবী আসবেন না যিনি মহানবী (সা.)-এর দ্বীনকে রহিত করবেন, যেহেতু তিনি (অর্থাৎ ঈসা) তাঁর উম্মতের মধ্য থেকে নন। (মওযুআতে কবীর [তথা জাল হাদীসের বিশাল সংকলন ভাণ্ডার], পৃষ্ঠা: ৫৮-৫৯)।

[৪] হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.) বলেন, خُتِمَ بِہِ النَّبِیُّوْنَ اَیْ لَا یُوْجَدُ بَعْدَہٗ مَنْ یَأمُرُہُ اللّٰہُ سُبْحَانَہٗ بِالتَّشْرِیْعِ عَلَی النَّاسِ অর্থ নবীকরীম (সা.) এর মাধ্যমে সকল নবীর (আগমনী ক্রমধারা) শেষ হয়ে গেছে অর্থাৎ, তাঁর পর কোনো এমন ব্যক্তি আর হবেনা যাকে আল্লাহতালা শরীয়তসহ মানুষের কাছে প্রেরণ করবেন। (তাফহীমাতে ইলাহিয়াহ, তাফহীম নং ৫৪, পৃষ্ঠা ৮৫)।

[৫] হযরত মুহিউদ্দিন ইবনে আরবী (রহ.) বলেন, وَ ھٰذَا مَعْنٰی قَوْلِہٖ ﷺ اِنَّ الرَّسَالَۃَ وَالنُّبُوَّۃَ قَدِ انْقَطَعَتْ فَلَا رَسُوْلَ بَعْدِیْ وَ لَا نَبِیَّ اَیْ لَا نَبِیَّ بَعْدِیْ یَکُوْنُ عَلٰی شَرْعٍ یُخَالِفُ شَرْعِیْ بَلْ اِذْ کَانَ یَکُوْنُ تَحْتَ حُکْمِ شَرِیْعَتِیْ۔ অর্থ নবুওয়ত এবং রিসালাতের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। সুতরাং আমার পর কোনো রসূল নেই, নবীও নেই। এর মর্মার্থ হল, আমার পর এমন কোনো নবী নেই, যে আমার শরীয়তের বিপরীতে (নতুন শরীয়তের অনুসারী) হবেন। বরং যখন হতে যাবে (ঈসার আগমনের দিকে ইংগিত) তাহলে তিনি আমার শরীয়তের অধীনে হবেন। (ফতুহাতে মক্কীয়াহ্, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩)।

[৬] ইমাম তাহের পাটনী (রহ.) বলেছেন, وَھٰذَا اَیْضًا لَا یُنَافِیْ حَدِیْثَ لَانَبِیَّ بَعْدِیْ لِاَ نَّہٗ اَرَادَ لَا نَبِیَّ یَنْسَخُ شَرْعَہٗ অর্থ এই হাদীসও ‘আমার পর আর কোনো নবী নেই’ কথাটির বিরোধী নহে। কেননা একথার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাঁর শরীয়ত রহিত করতে পারে এমন নবী নেই। (মাজমাউল বিহারিল আনওয়ার পৃষ্ঠা ৮৫)।

ইমামগণের খণ্ডিত উক্তি সমূহ হতে কাদিয়ানীদের প্রমাণ করা উদ্দেশ্য হল, মির্যা কাদিয়ানীও একজন নবী, তবে তিনি শরীয়তবাহক নবী নন। যেহেতু হাদীসে শুধুমাত্র শরীয়তবাহক নবী আগমনকেই নিষেধ করে! নাউযুবিল্লাহ।

আমাদের পর্যবেক্ষণ :

এবার আমরা তাদের উল্লিখিত উদ্ধৃতিগুলোর উপর পাঠকদের সাথে পর্যবেক্ষণমূলক প্রাসঙ্গিক আলোচনায় ফিরে যেতে চাই! তার আগে নবুওয়তের ধারাক্রম অব্যাহত থাকার দাবীদার কাদিয়ানীদের উদ্দেশ্যে কয়েকটি সহীহ হাদীস পেশ করব এবং তারই ভিত্তিতে কয়েকটি প্রশ্ন রাখব!

১. হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, وَأُرْسِلْتُ اِلی الْخَلْقِ کَافَّةً، وَخُتِمَ بِیَ النَّبیُّوْنَ অর্থ আমি সমগ্র সৃষ্টির জন্য প্রেরিত হয়েছি এবং আমার মাধ্যমে নবীগণের সমাপ্তি ঘটেছে। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল মাসাজিদ, হাদীস নং ১০৫৪)।

২. হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, كَانَتْ بَنُوْ إِسْرَائِيْلَ تَسُوْسُهُمْ الأَنْبِيَاءُ كُلَّمَا هَلَكَ نَبِيٌّ خَلَفَهُ نَبِيٌّ وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِيْ وَسَيَكُوْنُ خُلَفَاءُ فَيَكْثُرُوْنَ অর্থ বনী ইসরাঈলের নবীগণ তাঁদের উম্মাতকে শাসন করতেন। যখন কোনো একজন নবী মারা যেতেন, তখন অন্য একজন নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোনো নবী নেই। তবে অনেক খলীফাহ্ হবে। (সহীহ বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া হাদীস নং ৩৪৫৫, তাওহিদ প্রকাশনী)।

৩. হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেছেন, سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ لَمْ يَبْقَ مِنْ النُّبُوَّةِ إِلاَّ الْمُبَشِّرَاتُ অর্থ আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, মুবাশশ্বিরাত ব্যতীত নবুওয়তের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৯০)। এই ‘মুবাশ্বশিরাত’ (مُبَشِّرَاتِ) এর মর্মার্থ সুস্পষ্ট করে আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, لَمْ يَبْقَ مِنَ النُّبُوَّةِ إلَّا المُبَشِّراتُ. قالوا: وما المُبَشِّراتُ؟ قالَ: الرُّؤْيا الصَّالِحَةُ অর্থাৎ মুবাশ্বশিরাত ব্যতীত নবুওয়তের আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! মুবাশ্বশিরাত কী? তিনি (সা.) বললেন, সত্য স্বপ্ন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৯০)।

৪. হযরত আবু যর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, یٰا أَبَا ذَرٍ أَوَّلُ الْاَنْبِیَاء آدَمُ وَآخِرُہ مُحَمَّدٌ অর্থ ‘হে আবু যর! সর্বপ্রথম নবী ছিলেন আদম আর সর্বশেষ নবী হচ্ছে মুহাম্মদ।’ ইমাম দায়লামী (রহ.) সংকলিত আল-ফেরদাউস বি-মাছূরিল খিতাব (الفردوس بمأثور الخطاب للدیلمی), ১/৩৯, হাদীস নং ৮৫।

[৫] হযরত উকবাহ ইবনে আমের (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, لَوْ كَانَ بَعْدِي نَبِيٌّ لَكَانَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ অর্থ আমার পরবর্তীতে কেউ নবী হলে অবশ্যই উমর ইবনুল খাত্তাবই নবী হতেন। (তিরমিযি হাদীস নং ৩৬৮৬, সহীহ)।

আকীদায়ে খতমে নবুওয়ত সম্পর্কিত ২০টি সহীহ হাদীস পড়তে এখানে ক্লিক করুন!

প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলো :

প্রশ্নগুলো এই যে, উপরে উল্লিখিত হাদীসগুলোর উপর আপনাদের যদি বিশ্বাস থাকে তাহলে বলুন তো, রাসূল (সা.) খোদ নিজেই যেখানে মুক্ত অর্থে নিজেকে শেষনবী বলে আমাদের সংবাদ দিয়ে গেলেন, সেখানে নবুওয়তের ক্রমধারা অব্যাহত বলার স্পর্ধা দেখাতে পারে এমন সাধ্য কার? আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শিক্ষার বিরুদ্ধে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ কোমর বেঁধে দাঁড়িয়ে গেলেও তাতে কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শিক্ষা বাতিল হয়ে যাবে? নিশ্চয়ই না। তাহলে আপনারা রাসূল (সা.)-এর শিক্ষার বিপরীতে এমন সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উপর কিভাবে আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারলেন যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শিক্ষাকে বাতিল করে দেয়? বলাবাহুল্য, রাসূল (সা.) এর যুগেও কয়েকজন নবুওয়তের দাবী করেছিল। মুসায়লামা তন্মধ্যে একজন। তার সম্পর্কে বর্ণনায় এসেছে যে, তার অনুসারীদের আযান এবং সালাতেও ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ‘ উচ্চারিত হত (প্রমাণ এখানে)। এর মানে এটা পরিষ্কার কথা যে, মুসায়লামা নিজেও শরীয়তবিহীন নবী দাবীদার ছিল। তা সত্ত্বেও সাহাবায়ে কেরাম তাকে ক্ষমা করেননি, তার নবুওয়ত দাবীর ব্যাখ্যা চাননি; তলোয়ারের ভাষায় তাকে সমুচিত জবাব দেয়া হয়। কাজেই, এবার শরীয়তবিহীন নবী আসার এই কাদিয়ানী-কনসেপ্ট উক্ত ঘটনা হতেও বাতিল হয়ে গেল কিনা? (সহজে কাদিয়ানী চেনার উপায় জানুন)।

এবার হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন যে, তাহলে কি ইমামগণ ঐ সমস্ত ব্যাখ্যায় ভুল করেছেন? উত্তরে বলব, আপনি কি ঐ সকল ইমামের সম্পূর্ণ বক্তব্য পড়ে দেখেছেন? দেখেননি! এমনকি আপনি ঐ সমস্ত ইমামের কিতাবগুলো থেকে আকীদায়ে খতমে নবুওয়ত সংক্রান্ত আলোচনাও পড়ে দেখেননি যে, তারা খতমে নবুওয়তের উপর উম্মতে মুহাম্মদীয়ার ইজমা কীরূপ শব্দচয়নে লিখে গেছেন! তাহলে জেনে নিন, মুহাম্মদ (সা.)-এর পর নবুওয়ত দাবীদারগণ উম্মতে মুসলিমার ইজমা মতে ‘কাফের’ হওয়া সম্পর্কে,

ইমাম ইবনে হাজার আল হাইছামী (الإمام ابن حجر الهيتمي) (রহ.) উম্মতে মুসলিমার ইজমা উল্লেখপূর্বক লিখেছেন, من اعتقد وحيًا من بعد محمد صلى الله عليه وآله وسلم كان كافرًا بإجماع المسلمين অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা.)-এর পর যে ব্যক্তি নবুওয়তে ওহী লাভ করার বিশ্বাস পোষণ করবে সে মুসলিম উম্মাহার সর্বসম্মতভাবে কাফের। (আল ফাতাওয়াল ফিকহিয়্যাতুল কোবরা [الفتاوى الفقهية الكبرى] ৪/১৯৪, আল মাকতাবাতুল ইসলামিয়া হতে প্রকাশিত)।

সব চেয়ে মজার ব্যাপার হল, যাদের খণ্ডিত বক্তব্যে আপনি/আপনারা বিভ্রান্তি ছড়ান তাদের প্রত্যেকের বিশ্বাস ছিল যে, ঈসা (আ.) জীবিত, আল্লাহ তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। শেষযুগে তিনিই যথাসময়ে ফিরে আসবেন। মূলত সে কথারই খোলাসা করতে তারা উপরিউক্ত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অবতারণা করেছেন! আফসোস যে, আপনারা প্রসঙ্গ এড়িয়ে তাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে যাচ্ছেন! আপনারা শায়খ ইবনে আরাবী (রহ.)-এর ‘ফতুহাতে মাক্কিয়াহ’ গ্রন্থের যে পৃষ্ঠার খণ্ডিত বক্তব্যে নবুওয়তের ক্রমধারা অব্যাহত থাকার দলিল দেন সেই একই পৃষ্ঠার সম্পূর্ণ বক্তব্যটি পড়ে দেখলে যে কেউই বুঝতে পারবে যে, আপনারা (অর্থাৎ কাদিয়ানীরা) কিভাবে দরাকে সরা বানিয়ে দুনিয়ার সহজ সরল মানুষদের ঈমান নষ্ট করছে!

শায়খ ইবনে আরাবী (রহ.) লিখেছেন, وهذا معنى قوله صلى الله عليه وسلم إن الرسالة والنبوة قد انقطعت فلا رسول بعدي ولا نبي أي لا نبي بعدي يكون على شرع يخالف شرعي بل إذا كان يكون تحت حكم شريعتي ولا رسول أي لا رسول بعدي إلى أحد من خلق الله بشرع يدعوهم إليه فهذا هو الذي انقطع وسد بابه لا مقام النبوة فإنه لا خلاف إن عيسى عليه السلام نبي ورسول وأنه لا خلاف أنه ينزل في آخر الزمان حكما مقسطا عدلا بشرعنا لا بشرع آخر ولا بشرعه الذي تعبد الله به بني إسرائيل من حيث ما نزل هو به بل ما ظهر من ذلك هو ما قرره شرع محمد صلى الله عليه وسلم ونبوة عيسى عليه السلام ثابتة له محققة فهذا نبي ورسول قد ظهر بعده صلى الله عليه وسلم وهو الصادق في قوله إنه لا نبي بعده

অর্থাৎ রাসূল (সা.)-এর বাণী إن الرسالة والنبوة قد انقطعت فلا رسول بعدي ولا نبي (অর্থাৎ নিশ্চয়ই নবুওয়ত এবং রেসালতেরধারা বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং আমার পর আর কোনো রাসূল নেই, নবীও নেই)—একথার অর্থ হচ্ছে, আমার পর কোনো প্রকারের শরীয়তবাহক নবী নেই যে আমার শরীয়তের বর-খেলাফ করবেন বরং যখনই হতে যাবে তখন সে আমার শরীয়তের বিধিবিধানের অধীনে হবে এবং ‘ওয়া লা রাসূলা বা’দী’—একথার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ’র সৃষ্টির প্রতি এমন কোনো রাসূলও আর নেই যিনি স্বতন্ত্র শরীয়ত দ্বারা তাদেরকে তাঁর দিকে দাওয়াত দেবেন। যেহেতু এটি (নবুওয়ত এবং রেসালতেরধারা) বন্ধ এবং তার দ্বারও চিরতরে রূদ্ধ, (এখন) নবুওয়তের আর কোনো প্রকারের মাক্বাম (স্তর)-ই অবশিষ্ট নেই। ফলে ঈসা (আ.) একজন নবী ও রাসূল থাকাটা (লা নাবিয়্যা বা’দী’ শীর্ষক হাদীস অংশের) বিরুদ্ধে যায় না। নিশ্চয়ই ঈসা (আ.) একজন ন্যায়পরায়ন শাসক হিসেবে শেষ যামানায় আমাদের শরীয়তের উপরই নাযিল হবেন। তিনি ভিন্ন কোনো শরীয়ত কিবা ওই শরীয়ত নিয়েও আসবেন না, যা তার প্রতি নাযিল হয়েছিল এবং ইসরাইল জাতি যেই শরীয়তের উপর আল্লাহ’র ইবাদত বন্দেগী করেছিল। বরং তাঁর পক্ষ থেকে শরীয়তে মুহাম্মদী-ই প্রকাশ পাবে যেটি তাঁর জন্য (পূর্ব থেকে) স্থির রয়েছে। পক্ষান্তরে নবুওয়তে ঈসা (তাঁর দ্বিতীয়বার আগমনের পর) স্থির ও বহাল থাকবে। কেননা তিনি-ও একজন নবী ও রাসূল ছিলেন। তাঁর পরেই হযরত সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আবির্ভাব ঘটেছিল। যিনি স্বীয় বাণী : إنه لا نبي بعده (অর্থাৎ নিশ্চয়ই তাঁর পরে আর কোনো নবী নেই) বাণীতে একজন সত্যবাদী।” (অনুবাদ শেষ হল)। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি :-

শায়খ মহী উদ্দিন ইবনে আরাবী (রহ.) এর সম্পূর্ণ বক্তব্যের খোলাসা দাঁড়ায় :

(ক) فهذا هو الذي انقطع وسد بابه لا مقام النبوة অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের পর নবুওয়তের আর কোনো প্রকারের মাক্বাম (স্তর)-ই অবিশিষ্ট নেই। কেননা তাঁর নবুওয়তপ্রাপ্তির মাধ্যমে বর্তমানে সকল প্রকারের নবুওয়ত ও রেসালতের দ্বার চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।

(খ) فإنه لا خلاف إن عيسى عليه السلام نبي ورسول وأنه لا خلاف أنه ينزل في آخر الزمان حكما مقسطا عدلا بشرعنا لا بشرع آخر ولا بشرعه الذي تعبد الله به بني إسرائيل من حيث ما نزل هو به অর্থাৎ ফলে ঈসা (আ.) একজন নবী ও রাসূল থাকাটা (লা নাবিয়্যা বা’দী’ শীর্ষক হাদীস অংশের) বিরুদ্ধে যায় না। নিশ্চয়ই ঈসা (আ.) একজন ন্যায়পরায়ন শাসক হিসেবে শেষ যামানায় আমাদের শরীয়তের উপরই নাযিল হবেন। তিনি ভিন্ন কোনো শরীয়ত কিবা ওই শরীয়ত নিয়েও আসবেন না, যা তার প্রতি নাযিল হয়েছিল এবং ইসরাইল জাতি যেই শরীয়তের উপর আল্লাহ’র ইবাদত বন্দেগী করেছিল।

পাঠকবৃন্দ! ইবনে আরাবীর সম্পূর্ণ বক্তব্য কাদিয়ানীরা কিজন্য আপনাদের সামনে পেশ করতে চায় না তা এবার নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন!

পরিশেষে আমি বলতে পারি যে, ইবনে আরাবীর বক্তব্যটিকে প্রসঙ্গ ছাড়াই কাদিয়ানীরা পেশ করে থাকে। যাতে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে দলে টানতে পারে ও মির্যা কাদিয়ানীর নবুওয়ত দাবীকে হালাল করতে পারে! আমি এখানে শুধুমাত্র ইবনে আরাবী (রহ.)-এর নামে তারা যে ভ্রান্তি ছড়ায় সেটিরই জবাব দিয়েছি। সত্য কথা হল, কাদিয়ানীরা এভাবেই অন্য প্রায় সকল উলামায়ে কেরামের বক্তব্যের আগপাছ বাদ দিয়ে কিংবা প্রসঙ্গ এড়িয়ে উদ্ধৃতি পেশ করে থাকে। যাতে অল্প শিক্ষিত ও জেনারেল শ্রেণীর মানুষদের বিশ্বাসে সন্দেহ তৈরি করে কাছে টানতে পারে! আল্লাহ আমাদের সবাইকে এদের যাবতীয় অপপ্রচার থেকে রক্ষা করুন। আমীন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
শিক্ষাবিদ ও গবেষক
তাং ১৩/১১/২০২২ইং

শাহজাদা ইউয আসেফ

আজকের এই লিখাটি পড়ে বুঝার আগে পাঠকের জন্য আরেকটি বিষয়ে জ্ঞান রাখা অপরিহার্য। সেটি হল, মির্যা কাদিয়ানীর দাবী হচ্ছে হযরত ঈসা মৃত্যুবরণ করেছেন এবং তাঁর কবর হল কাশ্মীরের শ্রীনগরে! প্রশ্ন করা হল, তাহলে সেখানকার কোন কবরটি ঈসা (আ.)-এর কবর? মির্যা কাদিয়ানীর ভাষ্যমতে, সেখানকার খানইয়ার মহল্লায় সমাহিত ‘ইউজে আসেফ’ নামীয় ব্যক্তিটাই মূলত ঈসা (আ.); তার কবরটাই হযরত ঈসা (আ.)-এর কবর! কিন্তু মির্যা কাদিয়ানী সাহেব পরবর্তীতে নিজেই নিজের ঐ সমস্ত কথাবার্তার কারণে কিভাবে পাকড়াও হলেন তা জানতে সংক্ষিপ্ত লিখাটি পড়ুন!

কে এই ইউজে আসেফ?

প্রাচীন যুগের কিছু বইপুস্তক হতে এই ইউজে আসেফ (Yuz Asef) নামীয় ব্যক্তির ধারণা পাওয়া যায়! সে একজন মুসলিম ধর্মপ্রাণ ও বুযূর্গ খোদাভীরু হিন্দুস্তানী রাজপুত্র (কামালুদ্দিন পৃ-৫২৭, আরবী নোসখা)। হিন্দুস্তানের প্রাচীন ইতিহাস বলে, তার পিতা ছিল ভারতবর্ষের প্রভাবশালী একজন মূর্তিপূজক। সে ছিল পিতার একমাত্র পুত্র যে কিনা পিতার পৌত্তলিক ধর্ম ত্যাগ করে একত্ববাদী খোদারধর্ম ইসলাম গ্রহণ করে। তার একত্ববাদী ধর্মের প্রতি ঝোঁকটা ছিল প্রাকৃতিকভাবে। যদিও কাকতালীয়ভাবে শ্রান্দিপ অধিবাসী হাকিম বলোহর নামীয় একজন ধর্ম-পণ্ডিত দ্বারা তিনি পরে খুব বেশি প্রভাবিত হন। আনুমানিক হিজরী প্রথম বা দ্বিতীয় শতাব্দীর এই ঘটনা।

বলাবাহুল্য, মির্যা কাদিয়ানী সাহেব ইউজে আসেফ বা ইউযে আসেফ নামীয় ব্যক্তিটির বিস্তারিত পরিচয় জানতে যে কিতাব দুটির রেফারেন্স দিয়ে গেলেন তন্মধ্যে ফার্সি ভাষার ‘আ’ইনুল হায়াত‘ কিতাবটি অন্যতম। সেটির এক স্থানে উল্লেখ আছে যে, اسی زمانہ میں بادشاہ کے فرزند نرینہ تولد ہوا اور اتنی مسرت ہوئی کہ قریب مرگ ہوگیا۔ اور یقین ہوگیا کہ بت پرستی کا عطا کردہ یہ انعام ہے – ملک کا تمام خزانہ زینت و آرائش میں ختم کردیا – لوگوں کو ایک سال تک خوشی٫ شادی عیش و نشاط کا حکم عام ہو گیا – فرزند ارجمند کا نام یوز آسف رکھا۔ অর্থাৎ এমন সময় রাজার একটি হৃষ্টপুষ্ট পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। এতে তিনি এতই খুশি হন যে, যেন মারা যাবেন! তার বিশ্বাস এই যে, এটি তার মূর্তিপূজার জন্য প্রদত্ত পুরস্কার। তিনি রাজ্যের সমস্ত ধন-সম্পদ ভোগ বিলাসে উজাড় করে দেন। জনগণের জন্য পূর্ণ এক বছর আমোদ ফুর্তি আর খুশি উদযাপনের ফরমান জারি করেন। সেই নাদুসনুদুস সন্তানটির নাম রাখা হয় ইউজে আসেফ। (রূহুল হায়াত উর্দু তরজুমা আ’ইনুল হায়াত, পৃষ্ঠা ৩৬৪, মূল-মোল্লা মুহাম্মদ বাকের মজলিসি)। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি :-

  • প্রশ্ন, মির্যা কাদিয়ানী সাহেবের কোন বইতে তিনি লিখেছেন যে, ইউযে আসেফ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ‘কামালুদ্দিন’ (كمال الدين و تمام النعمة) কিতাবটি পড়ে দেখ!?

উত্তর, ইউযে আসেফ সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা লাভ করতে হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে রচিত প্রাচীনকালের একখানা কিতাব ‘কামালুদ্দীন ওয়া তামামুন নি’মাহ‘ পড়তে পরামর্শ দেন মির্যা কাদিয়ানী সাহেব। যেমন তার বইতে লিখা আছে, و ان كنت تطلب التفضيل فاقرأ كتابا سمى بإكمال الدين تجد فيه كل ما تسكن الغليل অর্থাৎ “আর তুমি যদি বিস্তারিত জানতে চাও তাহলে ‘কামালুদ্দীন‘ নামীয় কিতাবটি পড়তে পার! তুমি সেখানে এমন সব (তথ্য) পাবে যা প্রবল তৃষ্ণাকেও শান্ত করে দেবে।” (‘আল-হুদা’ এবং রূহানী খাযায়েন ১৮/৩৬২ দ্রষ্টব্য)। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি :-

আসলে মির্যা কাদিয়ানী সাহেব স্বপ্নেও ভাবেননি যে, একটা সময় তিনি তার যাবতীয় গোজামিল আর মিথ্যার জন্য পাকড়াও হবেন! তিনি হয়ত ভেবেছিলেন, আজ থেকে এগার/বারো শত বছর আগেকার রচিত বইগুলো সংগ্রহ করে তার উদ্ধৃতির সত্য-মিথ্যা যাচাই করে দেখবে এমন সাধ্য কার! কারই বা এত সময় আছে! মুরিদদের ব্রেইন ওয়াশ করে দেয়ার পর সে কি কখনো চিন্তাও করতে পরে যে, আমার এসমস্ত দাবী দাওয়ায় কোনো রূপ ভেজাল আছে কিনা?

৩০শে এপ্রিল ২০১০ ইং তারিখে প্রকাশিত বিবিসি (আরবী)-এর একটি অনুসন্ধানী নিউজ দেখলাম। সেখানে ইউজে আসেফ এর কবরের ছবি উল্লেখ করে নিচে লিখা হয়েছে, اما السكان المحليون فيتعبرون ان المزار هو قبر لاثنين من العلماء المسلمين توفيا منذ قرون: يوزا آصف والسيد نصير الدين. অর্থাৎ, এখানকার স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন যে, নিশ্চয়ই এই দুটো কবর দুইজন মুসলিম দরবেশের, এঁরা কতেক শতাব্দীতে মৃত্যুবরণ করেছেন। একজন ইউজে আসেফ আর অন্যজন সাইয়েদ নাসির উদ্দীন। বিবিসি (আরবী) নিউজ পোর্টালের লিংক দেখুন (নিচে স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য)। বর্তমান ভারতের কাশ্মীরের খানইয়ার মহল্লায় সাইয়েদ নাসির উদ্দীন শাহ (রহ.)-এর কবরের পাশেই তার সমাধি। এ সম্পর্কে পড়া যেতে পারে ‘কামালুদ্দীন ওয়া তামামুন নি’মাহ’ (আরবী) এবং ‘আ’ইনুল হায়াত’ (রূহুল হায়াত নামীয় ফার্সি বইয়ের উর্দূ অনুবাদ) দুইখানা কিতাব। আরো বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন এই লিংকটিতে

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক
প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

হাদীস অস্বীকারকারীদের ব্যাপারে স্বয়ং নবীজীর সতর্কবাণী

হাদীস অস্বীকারকারী | কথিত আহলে কুরআন দাবীদার

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।

ইন্নাল হামদা লিল্লাহ ওয়াসসালাতু ওয়াস-সালামু আ’লা রাসূলিল্লাহ! আম্মাবা’দূ…..! প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোনেরা! আমরা এখন পুরোপুরি একটি ফেতনার যুগে অবস্থান করছি! আজকে আপনাদের খেদমতে আমার একটি সতর্কবার্তা! তা হল, হাদীস অস্বীকারকারী (আহলে কুরআনদের) থেকে সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। নইলে ওরা যে কোনো মুহূর্তে হাদীসে নববীর প্রতি আপনার মনে সংশয় তৈরি করে আপনাকে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে পারে। আর কখনো যদি এমন পরিস্থিতিতে পড়ে যান তাহলে আপনাকে অবশ্যই কোনো বিজ্ঞ ও গবেষক আলেমের সান্নিধ্যে গিয়ে সঠিকটা বুঝে নিতে হবে। আসলে যারা হাদীসে নববীর অস্বীকারকারী তারা মূলত ওহীর এক বিরাট অংশ ‘অপঠিত ওহী’ (وحى غير متلو) এবং একি সাথে রাসূল (সা.)-এর সীরাতেরও অস্বীকারকারী। অথচ কুরআন আমাদের ডেকে ডেকে বলছে, তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ (لقد كان لكم فى رسول الله اسوة حسنة)। সুবহানাল্লাহ!

বলাবাহুল্য, ইদানীং মুসলমান ছদ্মবেশী খ্রিস্টান (কথিত ঈসায়ী মুসলিম দাবীদার), শীয়া-রাফেজী, বাহায়ী ও কাদিয়ানীরাও হাদীস অস্বীকারকারীদের পেছন থেকে মদদ জোগাচ্ছে। অনলাইনে হাদীস অস্বীকারকারী লিখক ও প্রচারকদের ৯০% শীয়া এবং খ্রিস্টান মিশনারী! কিন্তু কিছুই বুঝে উঠার সুযোগ নেই। সে যাইহোক, এদের সম্পর্কে রাসূল (সা.) নিজেই চৌদ্দশত বছর আগেই সতর্ক করে গেছেন। এখানে শুধুমাত্র একখানা সহীহ হাদীস উল্লেখ করছি। হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِي رَافِعٍ، وَغَيْرُهُ، رَفَعَهُ قَالَ ‏ “‏ لاَ أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ يَأْتِيهِ أَمْرٌ مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ أَوْ نَهَيْتُ عَنْهُ فَيَقُولُ لاَ أَدْرِي مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ “

অর্থ, আবূ রাফে‘ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আমি যেন তোমাদের মধ্যে কাউকে এমন অবস্থায় না পাই যে, সে তার সুসজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে বসে থাকবে এবং তার নিকট যখন আমার আদিষ্ট কোনো বিষয় অথবা আমার নিষেধ সম্বলিত কোনো হাদীস উত্থাপিত হবে তখন সে (তাচ্ছিল্যভরে) বলবে, আমি তা জানি না, আল্লাহতালার কিতাবে আমরা যা পাই, তারই অনুসরণ করবো।’ (জামে’ আত তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৬৩; আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬০৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৩২৪৯)।

আল্লাহতালা আমাদেরকে হাদীস অস্বীকারকারী এই নিকৃষ্ট ফেতনাবাজদের তাবৎ বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুক। কুরআন এবং সহীহ হাদীসের আলোকে জীবনকে পরিচালনা করার তাওফিক দান করুক। আমীন।

  • এই বইগুলো ডাউনলোড করুন,

আমরা হাদীস মানতে বাধ্য (আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাক)

হাদীস সংকলনের ইতিহাস (মওলানা আব্দুর রহীম)

হাদীস কেন মানতে হবে? (কামাল আহমাদ)

হাদীস কি আল্লাহর ওহী? (মুহাম্মদ ইকবাল ফাখরুল)

হাদীসের প্রামাণিকতা (সানাউল্লাহ নজির আহমদ)

হাদীসের প্রামাণিকতা (ডক্টর মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল গালিব)

লিখক,
শিক্ষাবিদ ও গবেষক
প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

নবীপুত্র ইবরাহীম যদি জীবিত থাকত

সিজোফ্রেনিয়া পাড়ার আরেকটা প্রতারণা, ইবরাহীম বেঁচে থাকলে তিনিই নবী হতেন….

এই প্রতারকদের সাহস হয়না মির্যা কাদিয়ানীকে মুক্ত অর্থে “নবী” বলতে। ইনিয়েবিনিয়ে আর শব্দের বক্রব্যাখ্যার মারপ্যাঁচ দিয়ে মির্যার নবী দাবীর বদনাম ঘোচাতে চেষ্টা করে। উম্মতি, বুরুজি আর জিল্লি সহ নানা শ্রেণীতে নবী-এর কনসেপশন তারা ভাগ করে ফেলে। উম্মতে মুসলিমার প্রতিষ্ঠিত ও সর্বসম্মত বিশ্বাসের হাত পা ভেঙে বিকলাঙ্গ করে ছাড়ে। এই একই মানুষগুলো মির্যার নবী দাবীকে বৈধতা দেয়ার জন্য خاتم النبيين (খাতামান নাবিয়্যিন) এর “খাতাম” শব্দকে আক্রমণের নিশানা বানিয়ে থাকে। শব্দটি থেকে আংটি, মোহর ইত্যাদি অভিনব অর্থ গ্রহণ করার মাধ্যমে নিজেদের রক্ষা করার-ও আপ্রাণ চেষ্টা করে। অথচ উম্মাহার সর্বান্তকরণে বিশ্বাস হচ্ছে, মুহাম্মদ (সা.)-এর পর নবুওয়তের দরজায় সীল লেগে গেছে। কেয়ামত পর্যন্ত এই সীল আর কারো জন্য খোলা হবেনা। কাজেই “খাতাম” শব্দের সাধারণ আরও যত অর্থই থাকুক না, এটি মুহাম্মদ (সা.)-এর ক্ষেত্রে ‘শেষ’ বা ‘সমাপ্তি’ অর্থেই ধর্তব্য হবে। আহা! এই নির্বোধদের বুঝানোর সাধ্য কার!

এদেরকে ঠান্ডা মাথায় জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় যে, মুহাম্মদ (সা.) শেষনবী—তা তো আমরাও বিশ্বাস করি। কিন্তু এই নির্বোধরা তাদের মূলধারার রচনাবলি সম্পর্কে এতই বেখবর যে, তারা কখনো খোঁজ করেও দেখেনা সেসব রচনায় মুহাম্মদ (সা.)-এর খতমে নবুওয়তের সিংহাসনকে কত জঘন্যভাবে আক্রমণের নিশানা বানানো হয়েছে! নতুবা তারা কীজন্য নবুওয়তে মুহাম্মদীর ‘সীল’ ভাঙ্গতে অনবরত যুদ্ধ করে যাবে! কেন অগণিত সহীহ হাদীসের বিপরীতে শাজ, মুনকার রেওয়ায়েতের পেছু নিতে চাইবে!

উম্মতে মুহাম্মদীয়ার সিলসিলায় শেষনবী মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, নাউযুবিল্লাহ।

ইউটিউবে তাদের একটা ভিডিও চোখে পড়লো। সেখানে তারা খতমে নবুওয়তের সীল ভাঙ্গার জবরদস্ত আক্রমণ চালিয়েছে। যদিও প্রতিটি আক্রমণই ব্যর্থ সাব্যস্ত হয়েছে। সূরা নিসা আয়াত নং ৬৯ দ্বারাও মির্যা কাদিয়ানীর নবী দাবীকে হালাল করতে যারপরনাই চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ আয়াতটির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে যিনি সামান্যতমও জ্ঞাত তিনি সহজেই ধরতে পারবেন যে, কাদিয়ানী নেতা ফিরোজ আলম আয়াতটির কত জঘন্যতম অপব্যাখ্যার পেছনে দৌঁড়াচ্ছেন! তিনি উক্ত ভিডিওতে আরও একখানা রেওয়ায়েত দিয়ে প্রমাণ করতে চাইছেন যে, মুহাম্মদ (সা.)-এর পরেও নবুওয়তের দরজা খোলা। নাউযুবিল্লাহ। রেওয়ায়েতটি হল, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, لو عاش ابراهيم لكان صديقا نبيا অর্থাৎ যদি ইবরাহীম [তথা হুজুর (সা:) এর সন্তান] জীবিত থাকত তবে সে সত্যবাদী ও নবী হতো।” (সুনানু ইবনে মাজাহ ১/১০৮; ‘তারীখু ইবনে আসাকীর ৩/২৯৫)।

রেওয়ায়েতটি উল্লেখ করার পর যুক্তি দিয়ে তিনি যেন বলতে চাচ্ছেন যে, যদি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরেও নবুওয়তের দরজায় সীল লেগে যেত তাহলে নবীজী কিজন্য আপনা সন্তান সম্পর্কে এইরূপ সংবাদ দিলেন? সুতরাং বিষয়টি ক্লিয়ার যে, নবুওয়তের দরজায় সীল লেগে যাওয়া সত্য নয়, বরং নবী আরও আসবে! (নাউযুবিল্লাহ)।

অথচ রেওয়ায়েতটির সনদ খুবই দুর্বল। কেননা এর সূত্রে ইবরাহীম ইবনে উসমান নামীয় রাবীকে মুহাদ্দিসগণ মুনকার (منكر الحديث) এবং মাতরূক (متروك الحديث) বলে আখ্যা দিয়েছেন। (দেখুন, তাহযীযুত তাহযীব ১/১৪৫)। আরও একটি সমস্যা হল, সনদে ইনকিতা (সূত্র-বিচ্ছিন্নতার ক্রুটি) বিদ্যমান। কেননা এর আরেকজন রাবী হিকাম ইবনে উতাইবাহ (الحكم بن عتيبة) সম্পর্কে লিখা আছে যে, ইবরাহীম ইবনে উসমান বর্ণনাটি তার কাছ থেকে শ্রবণ করা প্রমাণিত নয় (দেখুন, তাহযীযুত তাহযীব ২/৪৩৪)। যার ফলে সনদে তাদলীস-এর ক্রুটিও বিদ্যমান। তাই রেওয়ায়েতটি দলিল প্রমাণে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং প্রত্যাখ্যাত। সে যাইহোক, এই মুহূর্তে ‘বর্ণনার তাহকিক’ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি নির্বোধদের বলতে চাই, তোমাদের কি নিচের হাদীস গুলো চোখে পড়ে না?

১। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে (হাদীসে কুদসীতে আল্লাহতালা বলেন) : لو لم أختم به النبيين لجعلت له ولدا يكون بعده نبيا অর্থাৎ যদি তাঁর (মুহাম্মদ) মাধ্যমে নবীগণের আগমনীধারা সমাপ্ত করে না দিতাম তাহলে আমি তাঁর পুত্রকে (নবী হিসেবে) অবশ্যই মনোনীত করতাম। যাতে সে তাঁর পর নবী হতে পারে। (ইমাম ইবনে জাওযি রহ. রচিত, যাদুল মাছীর ফী ইলমিত তাফসীর, সূরা আল আহযাব ৫/১৩৯ দ্রষ্টব্য)। স্ক্যানকপি

২। অন্য আরেকটি হাদীসে হযরত ওক্ববাহ ইবনে আমের (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: لَوْ كَانَ بَعْدِي نَبِيٌّ لَكَانَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ، فصححه الحاكم ووافقه الذهبي وحسنه الترمذيالترمذي، وكذا حسنه الألباني في صحيح الترمذي অর্থাৎ আমার পর যদি আর কোনো নবী থাকত তাহলে অবশ্যই উমর-ই নবী হত! (জামে তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং ৩৬৮৬; হাদীসের মান, সহীহ ও হাসান)।

এখন প্রশ্ন হল, এমতাবস্থায় আলোচ্য হাদীসটি দ্বারা কিভাবে নবুওয়তের দরজা খোলা রয়েছে, এমন কোনো মর্মার্থ দাঁড় করানো সঠিক হয়?

তর্কের খাতিরে মানলাম যে, আলোচ্য হাদীসটি (আপনাদের মতে) নবুওয়তের দরজা খোলা থাকার পক্ষেই ইংগিত। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, হাদীসটির কোন শব্দে বলা আছে যে, শুধুমাত্র কথিত জিল্লি বুরুজি শ্রেণীর নবুওয়তের দরজাই খোলা, অন্য শ্রেণীর (মুস্তাকিল, হাকিকি/শরীয়তবিহীন, শরীয়তবাহক) নবুওয়তের দরজা বন্ধ!?

কোনো উত্তর নেই!

শেষ আরেকটা প্রশ্ন করব! আলোচ্য মুনকার রেওয়ায়েতের “যদি ইবরাহীম [তথা হুজুর (সা:) এর সন্তান] জীবিত থাকত…” বলা দ্বারা যদি নবুওয়তের দরজা খোলা—একথা বুঝায় তাহলে আল্লাহতালার বাণী (সূরা আম্বিয়া-২২) “যদি আসমান-জমিনে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ থাকত…” (لَوْ كَانَ فِيهِمَآ ءَالِهَةٌ إِلَّا ٱللَّهُ لَفَسَدَتَا ۚ فَسُبْحَٰنَ ٱللَّهِ رَبِّ ٱلْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ) একথা থেকে কী ব্যাখ্যা নেবেন? আল্লাহ ছাড়া আরও অনেক বৈধ ইলাহ থাকার ইংগিত রয়েছে… এমন ব্যাখ্যাও কি নেবেন? নাউযুবিল্লাহ। জ্ঞানীদের নিশ্চয়ই বিষয়টি ভাবিয়ে তুলবে!

মহান আল্লাহর নিকট আপনাদের সবাইকে সোপর্দ করছি। তিনিই আপনাদের ভালো মত দেখে নেবেন! ওয়া মা আ’লাইনা ইল্লাল বালাগ!

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
শিক্ষাবিদ ও গবেষক

শীয়া-ইমামিয়াদের একটি বিশ্বাস

যে সব আকীদা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ইমামিয়া বা ইসনা আশারিয়া (১২ ইমামপন্থী) তথা ইরান-তেহরানের শিয়ারা একমত, তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, কুরআনে তাহরীফ হওয়া! নাউযুবিল্লাহ। পাকিস্তানের শিয়া সম্প্রদায়ের প্রখ্যাত আলেম মকবুল হোসাইন দেহলবী পবিত্র কুরআনের তরজমা করেছেন উর্দু ভাষায়, যার সত্যায়ন করেছেন সেই সময়ের ১২ জন প্রখ্যাত শিয়া গবেষকবৃন্দ! এই তরজমার ১২ পারা ১৬ রুকুতে ও পৃষ্ঠা নং ৪৭৯ -তে হাশিয়া (টিকা) যুক্ত করে তিনি লিখেছেন, أن الخلفاء شاربي الخمر حرفوا القرآن لمقاصدهم অর্থ, মদখোর খোলাফারা নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই কুরআনকে তাহরীফ তথা বিকৃত করেছে! (Click) সেখানে আরও লিখা আছে, যতক্ষণ আমাদের ইমাম মাহদী গুহা থেকে আত্মপ্রকাশ করবেননা ততক্ষণ আমরা এই গলদ কুরআনই তিলাওয়াত করব! (নাউযুবিল্লাহ)। অপ্রিয় হলেও সত্য, এই সম্প্রদায়ের যারা এধরণের মতবাদ পোষণ করেন তারা নিঃসন্দেহে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত ও কাফের জাতির অন্তর্ভুক্ত। শিয়াদের প্রখ্যাত গবেষক ও মুহাদ্দিস মির্যা হোসাইন নূরী আত তবারসী আমাদের এই কুরআন বিকৃতির দলিলে স্বতন্ত্র কিতাবও রচনা করেছেন! সেখানে তিনি দাবী করেছেন, আলী রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু যেই কুরআন লিখেছেন সেটি শায়খাইন (হযরত আবু বকর ও উমর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহুমা) গ্রহণ করেননি! (নাউযুবিল্লাহ)। তার ভাষ্যটি এইরূপ, أن الشيخين لم يقبلا القرآن الذي كتبه علي (তথ্যসূত্র-ফাসলুল খিতাব ফী তাহরীফি কিতাবি রব্বিল আরবাব, তবারসী পৃ-৬৪)। এই কথাগুলো তাদের মৌলিক গ্রন্থগুলোতেও রয়েছে, ইনশাআল্লাহ সুযোগ হলে এই সম্পর্কে আরও তথ্যসহ লেখা হবে।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক।

নুযূলে ঈসা সম্পর্কে ইবনে হাজম আল-জাহেরী

প্রশ্ন, হযরত ঈসা (আ.) জীবিত নাকি মৃত এ সংক্রান্ত বিষয়ে ইমাম ইবনে হাজম জাহেরী আল উন্দুলুসী (রহ.)-এর আকীদা কেমন ছিল?

উত্তর, উনার আকীদাও আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অনুরূপ ছিল। আর তার প্রমাণ অনেক ভাবে দেয়া যাবে। আজকে এখানে এই বিষয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করব। তবে আলোচনার পূর্বে একটি প্রশ্নের উত্তর ক্লিয়ার করতে চাই। নির্বোধ কাদিয়ানী সম্প্রদায় ইবনে হাজম (রহ.)-এর আল মুহাল্লা (المحلى) কিতাব থেকে একটি উদ্ধৃতি পেশ করে বলে যে, এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে তিনিও ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে গেছে মর্মে বিশ্বাস করতেন। ইবনে হাজম (রহ.) এর দীর্ঘ বক্তব্যের খণ্ডাংশটি এই রকম, وَلَمْ يُرِدْ عِيسَى – عَلَيْهِ السَّلَامُ – بِقَوْلِهِ {فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي} [المائدة: ١١٧] وَفَاةَ النَّوْمِ، فَصَحَّ أَنَّهُ إنَّمَا عَنَى وَفَاةَ الْمَوْتِ، অর্থাৎ আয়াতে উল্লিখিত فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي হতে ঈসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে وَفَاةَ النَّوْمِ উদ্দেশ্য নয়, সঠিক হল, নিশ্চয়ই (এখানে) ওফাত থেকে وفاة الموت ই উদ্দেশ্য। (ক্লিক)।

পাঠকবৃন্দ! এই নির্বোধরা কতটা সিলেক্টিভ আর প্রতারক হলে ইবনে হাজম (রহ.)-এর উপর এমন কথাও রটাতে পারে, চিন্তা করুন। আমি ইবনে হাজম (রহ.)-এর অন্যান্য রচনা হতে ঈসা (আ.) সম্পর্কে তাঁর প্রকৃত আকীদা কেমন ছিল তা আজ আপনাদের দেখাব। তবেই ইবনে হাজম (রহ.)-এর উল্লিখিত বক্তব্যের সঠিক মর্মার্থ আপনাদের নিকট পানির মত স্বচ্ছ এবং পরিষ্কার হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

এবার ‘আল মুহাল্লা‘ কিতাবে ইমাম ইবনে হাজমের উল্লিখিত ব্যাখ্যার তাৎপর্য কী তা জেনে নিন! তারপরেই তাঁর অপরাপর রচনার আলোকে আকীদায়ে হায়াতে মসীহ নিয়ে লিখব, ইনশাআল্লাহ। ইবনে হাজম (রহ.)-এর ভাষ্যমতে,

  • “আমার দৃষ্টিতে (এখানে) ওফাত এর সঠিক অর্থ হল ‘ওফাতুল মওত’ (দুনিয়াতে পুন. আগমনের পর তাঁকে মৃত্যুর মাধ্যমে নিয়ে নেয়া)-ই বুঝানো উদ্দেশ্য (ইবনে হাজমের এই উক্তি ইবনে আব্বাসের و فى آخر الزمان তথা ঈসার মৃত্যু শেষযুগে হবে, উক্তির সাথে মিলে যায়)। (তিনি আরো লিখেছেন) যারা বলবে ঈসা (আ:)-কে হত্যাকরা হয়েছে এবং ক্রুশে ছড়ানো হয়েছে তারা কাফের, মুরতাদ এমনকি কুরআনকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করায় এবং ইজমার বিপরীতে আকীদা রাখায় তাদের রক্ত হালাল [তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া বৈধ]।”

(রেফারেন্স, ইবনে হাজম রচিত ‘আল-মুহাল্লা বিল আছার’ খ-১/মাসয়ালা নং ৪১)। নিচে আল মুহাল্লা (المحلى) কিতাবটির সংশ্লিষ্ট স্ক্যানকপি :-

ইবনে হাজমের আকীদা :

ইমাম ইবনে হাজম (রহ.)-এর একই রচনা ‘আল মুহাল্লা’ (المحلى لابن حزم) কিতাবের ৯ম খণ্ডের ৩৮৭ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে, وإنما الإنجيل عند جميع النصارى لا نحاشي منهم أحدا أربعة تواريخ: ألف أحدها: متى وألف الآخر: يوحنا وهما عندهم حواريان. وألف الثالث: مرقس وألف الرابع: لوقا، وهما تلميذان لبعض الحواريين عند كل نصراني على ظهر الأرض. ولا يختلفون: أن تأليفها كان على سنين من رفع عيسى عليه السلام

অর্থাৎ ‘ইঞ্জিল বা গসপেল সমস্ত খ্রিস্টানদের নিকট বিশ্বাসযোগ্য, আমরা তার রচিতা ইতিহাসের চারজনের কাউকেই এড়িয়ে চলি না। রচয়িতাদের একজন মথি এবং অন্যজন ইউহান্না বা জন, তারা দুজনই যিশুর শিষ্য। তৃতীয়জন মার্ক এবং চতুর্থজন লুক এবং তারা পৃথিবীর প্রতিটি খ্রিস্টানদের মতে যিশুর কোনো না কোনো শিষ্যের শিষ্য, এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য নেই। এই গসপেল ঈসা মসীহ (আ.)-কে উঠিয়ে নেয়ার বছরগুলিতে রচিত হয়েছিল।’

  • এখানে ইমাম ইবনে হাজমের সর্বশেষ কথাটি নিয়ে চিন্তা করুন। তিনি ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে গেছে বলে মনে করলে তবে কেন বললেন أن تأليفها كان على سنين من رفع عيسى عليه السلام (এই গসপেল ঈসা মসীহ-কে উঠিয়ে নেয়ার বছরগুলিতে রচিত হয়েছিল)। উল্লেখ্য, গসপেল রচনাকারীদের উল্লিখিত সবাই ১২০ খ্রিস্টাব্দের অনেক পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেন (উইকিপিডিয়া দ্রষ্টব্য)। কাজেই কাদিয়ানীদের মতে ঈসা (আ.)-এর রাফা (উঠিয়ে নেয়া) ১২০ খ্রিস্টাব্দে হলে তখন আমাদেরকে এটিও মেনে নিতে হয় যে, গসপেলের উক্ত লিখকগণ ১২০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী বছরগুলোতেই গসপেল লিখেছিলেন! অথচ গবেষক মাত্রই জানেন, এইরূপ বিশ্বাসের সাথে সত্যের লেশমাত্র সম্পর্কও নেই। অপ্রিয় হলেও সত্য, ইতিহাসের বাস্তবতাকেও অস্বীকার করা ছাড়া কাউকেই কাদিয়ানী মতবাদ গিলানো সম্ভব না। তারপর তিনি একই গ্রন্থের (المحلى لابن حزم) ১ম খণ্ডের ৯ নং পৃষ্ঠায় আরও লিখেছেন,
  • مسألة: إلا أن عيسى ابن مريم عليه السلام سينزل وقد كان قبله عليه السلام أنبياء كثيرة ممن سمى الله تعالى ومنهم لم يسم ; والإيمان بجميعهم فرض. برهان ذلك ؛ ماحدثنا عبد الله بن يوسف, حدثنا أحمد بن فتح, حدثنا عبد الوهاب بن عيسى, حدثنا أحمد بن محمد, حدثنا أحمد بن علي, حدثنا مسلم بن الحجاج, حدثنا الوليد بن شجاع وهارون بن عبد الله وحجاج بن الشاعر ; قالوا: “حدثنا حجاج, و, هو ابن محمد, عن ابن جريج قال: أخبرنا أبو الزبير أنه سمع جابر بن عبد الله يقول: “سمعت النبي صلى الله عليه وسلم يقول: “لا تزال طائفة من أمتي يقاتلون على الحق ظاهرين إلى يوم القيامة”. قال: ” فينزل عيسى ابن مريم صلى الله عليه وسلم فيقول أميرهم: تعال صل لنا. فيقول: لا, إن بعضكم على بعض أمراء, تكرمة الله هذه الآمة”
  • অর্থাৎ ঈসা (যীশু) অচিরেই নেমে আসবেন শীর্ষক অধ্যায় (باب الا ان عيسى سينزل)। মাসয়ালা : মরিয়ম পুত্র ঈসা (আ.) অচিরেই অবতরণ করবেন। তাঁর পূর্বেও অনেক নবী ছিলেন, আল্লাহতালা যাদের কারো কারো পরিচয় ব্যক্ত করেছেন আবার কারো কারো পরিচয় ব্যক্ত করেননি। তবে তাদের সকলের প্রতি ঈমান রাখা ফরজ তথা আবশ্যক। (ইমাম ইবনে হাজম উপরিউক্ত মাসয়ালা দেয়ার পর প্রমাণ হিসেবে সহীহ মুসলিম থেকে ঈসা মসীহ’র পৃথিবীতে নেমে আসার একটি বর্ণনাও উল্লেখ করেন। দীর্ঘ হাদীসটির শেষে এসেছে, فينزل عيسى ابن مريم صلى الله عليه وسلم অর্থ-অতপর ঈসা ইবনে মরিয়ম নেমে আসবেন)।

এখানে ইবনে হাজমের বক্তব্য أن عيسى ابن مريم عليه السلام سينزل وقد كان قبله عليه السلام أنبياء كثيرة (মরিয়ম পুত্র ঈসা অচিরেই অবতরণ করবেন। তাঁর পূর্বেও অনেক নবী ছিলেন)। এখন তিনি ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে গেছে বলে মনে করলে তবে কি তিনি তথাকথিত রূপক ঈসার আগমনের মাসয়ালা দিলেন? কথিত রূপক ঈসা’র মতবাদের ফেরিওয়ালাদের জন্য দুঃসংবাদ হল, ইবনে হাজম (রহ.) কিন্তু তার অপর আরেকটি রচনা ‘আল ফসলু ফিল মিলালি ওয়াল আহওয়ায়ি ওয়ান নাহলি’ (الفصل في الملل والأهواء والنحل) নামীয় কিতাবে আগমনকারী ঈসাকে পরিষ্কার শব্দে ‘বনী ইসরাইলী’ ঈসা (من نزُول عِيسَى عَلَيْهِ السَّلَام الَّذِي بعث إِلَى بني إِسْرَائِيل) বলেই আখ্যা দিয়েছেন। এই যে তিনি লিখেছেন, وَقد صَحَّ عَن رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم بِنَقْل الكواف الَّتِي نقلت نبوته واعلامه وَكتابه أَنه أخبر أَنه لَا نَبِي بعده إِلَّا مَا جَاءَت الْأَخْبَار الصِّحَاح من نزُول عِيسَى عَلَيْهِ السَّلَام الَّذِي بعث إِلَى بني إِسْرَائِيل وَادّعى الْيَهُود قَتله وصلبه فَوَجَبَ الْإِقْرَار بِهَذِهِ الْجُمْلَة وَصَحَّ أَن وجود النُّبُوَّة بعده عَلَيْهِ السَّلَام بَاطِل لَا يكون الْبَتَّةَ وَبِهَذَا يبطل أَيْضا قَول من قَالَ بتواتر الرُّسُل وَوُجُوب ذَلِك أبدا وَبِكُل مَا قدمْنَاهُ مِمَّا أبطلنا بِهِ قَول من قَالَ بامتناعهما الْبَتَّةَ إِذْ عُمْدَة حجَّة هَؤُلَاءِ هِيَ قَوْلهم إِن الله حَكِيم والحكيم لَا يجوز فِي حكمته أَن يتْرك عباده هملاً دون إنذار

অর্থাৎ রসূল (সা.) থেকে অতিব দৃঢ়তার সাথে ও বিশুদ্ধাকারে তাঁর নবুওয়ত, নিদর্শনাদি এবং তার কিতাবের (কুরআন) বিষয়ে বর্ণিত আছে যে, তিনি সংবাদ দিয়েছেন, তাঁর পরে আর কোনো নবী নেই; তবে বহু বিশুদ্ধ হাদীস বনী ইসরাইলের প্রতি প্রেরিত হযরত ঈসা (আ.)-এর নেমে আসা (নুযূল) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, ইহুদীরা যাঁকে হত্যা এবং ক্রুসে ছড়ানোর দাবী করে থাকে। সুতরাং এই বাক্যটি দ্বারা এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা আবশ্যক হয়ে গেছে। (আল ফসলু ফিল মিলালি ওয়াল আহওয়ায়ি ওয়ান নাহলি খ-১/পৃ-৭৭, ইবনে হাজম)। কিতাবটির স্ক্রিনশট :-

রচয়িতা ইমাম ইবনে হাজম (রহ.)। মৃত্যু ৪৫৬ হিজরী।

তিনি একই রচনার ৪নং খণ্ডের ১৩৮ নং পৃষ্ঠায় আরও লিখেছেন,

هذا مع سماعهم قول الله تعالى {ولكن رسول الله وخاتم النبيين} وقول رسول الله صلى الله عليه وسلم لا نبي بعدي فكيف يستجيزه مسلم أن يثبت بعده عليه السلام نبيا في الأرض حاشا ما استثناه رسول الله صلى الله عليه وسلم في الآثار المسندة الثابتة في نزول عيسى بن مريم عليه السلام في آخر الزمان

অর্থাৎ এটা তাদের (জানা) শোনা আছে যে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ’র বাণী {কিন্তু তিনি আল্লাহ’র রসূল এবং নবীদের সমাপ্তি} এবং রাসূল (সা.)-এর বাণী, আমার পরে আর কোনো নবী নেই। এমতাবস্থায় কিভাবে একজন মুসলিম তাঁকে (ঈসাকে) তাঁর পরে পৃথিবীতে একজন নবী প্রতিষ্ঠা করার অনুমতি দিতে পারে? শেষ যুগে মরিয়ম তনয় ঈসা (আ.)-এর নেমে আসার ব্যাপারে আল্লাহ’র রসূল (সা.) ব্যতিক্রম যা বলে গেছেন তা প্রমাণিত।

এখানে ইবনে হাজম (রহ.) কতটা সুস্পষ্ট করে নিজের আকীদা পেশ করেছেন তা চিন্তা করুন! আগমনকারী ঈসা আবার এসে নবীর দায়িত্বে থাকবেন না বা একজন নবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের অনুমতি পাবেন না, তিনি বিষয়টি ক্লিয়ার করে যেন কাদিয়ানীদের বিশ্বাসের গোড়ায় কুঠারাঘাত করলেন! তিনি তার পরই লিখলেন, الآثار المسندة الثابتة في نزول عيسى بن مريم عليه السلام في آخر الزمان (শেষ যুগে মরিয়ম তনয় ঈসা (আ.)-এর নেমে আসার ব্যাপারে আল্লাহ’র রসূল (সা.) ব্যতিক্রম যা বলে গেছেন তা প্রমাণিত)। এখন বলুন, ইবনে হাজম (রহ.)-এর আকীদা সুস্পষ্ট করতে এর চেয়ে বেশি আর কী হতে পারে? কিন্তু সাধারণ কাদিয়ানীরা তো বটে, অধিকাংশ মু’আল্লিম বা মুরুব্বি পর্যায়ের কাদিয়ানীরাও ইবনে হাজম (রহ.)-এর উল্লিখিত আকীদা সম্পর্কে পুরোই অন্ধকারে। আল্লাহ তাদের সঠিক জ্ঞান বুদ্ধি দান করুন।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

- Advertisement -

Recent Posts