
- কাদিয়ানীদের প্রশ্ন ও আমার জবাব :
প্রশ্ন : ঈসা (আ:) জীবিত থাকলে তাঁর ঈসায়ী শরীয়তও বর্তমানে জীবিত, রহিত নয়; মানতে হবে। কারণ কোনো নবী যতক্ষণ পর্যন্ত জীবিত থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁর আনীত শরীয়তও কোনোভাবেই বাতিল হতে পারেনা, এটাই যুক্তিসংগত। সুতরাং অ-কাদিয়ানী মুসলমানদের বিশ্বাস যেহেতু ঈসা (আ:) বর্তমানে জীবিত ও আকাশে আছে, সেহেতু তারা তাঁর শরীয়তের অনুসারী হওয়াই যুক্তিযুক্ত! অন্যথা তাদেরকেও আহমদীদের (কাদিয়ানীদের) ন্যায় বিশ্বাস করতে হবে যে, ঈসা (আ:) মৃত, জীবিত নন!
আমার জবাব : প্রশ্নকারীর উল্লিখিত প্রশ্ন থেকে মোটামুটি যে কয়টি পয়েন্ট আমি দাঁড় করতে পারি তা হল, প্রশ্নকারী যেন বুঝাতে চাচ্ছে, (১) শরীয়তধারী নবীগণের শরীয়ত শুধুমাত্র তাঁদের মৃত্যুর মাধ্যমেই রহিত বা বাতিল হয়; আর কোনোভাবেই বাতিল হয়না! (২) হযরত ঈসা (আ:)-কে মৃত বলে বিশ্বাস করার অর্থই হল, শরীয়তে মুহাম্মদীয়াকে জীবিত বিশ্বাস করা। অন্যথা শরীয়তে মুহাম্মদীকে মৃত ও বাতিল বলেই বিশ্বাস করার শামিল! (৩) ঈসা (আ:)-কে যারা মৃত বিশ্বাস করেনা তাদের জন্য উচিৎ, তারা যেন ঈসায়ী ধর্মমত গ্রহণ করে নেয়। নতুবা তারা ঈসায়ী ধর্মকে প্রকারান্তরে জীবিত বিশ্বাস করা সত্ত্বেও সেটি গ্রহণ না করাই সুস্পষ্ট কুফুরীর শামিল।
- এমতাবস্থায় নিচের প্রশ্নগুলোর কী জবাব?
(১) সহীহ হাদীসে আছে, রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন:
- ولو كان موسى حيا ما وسعه إلا اتباعي رواه أحمد والبيهقي في كتاب شعب الإيمان، وهو حديث حسن
অর্থাৎ যদি মূসাও জীবিত থাকত তবে তার জন্য আমার আনুগত্য করা ছাড়া উপায় ছিলনা।” (সুনানে আহমদ, বায়হাক্বী ফী শু’আবিল ঈমান। হাদীসের মান : হাসান)। উপরের হাদীস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, মূসা (আ:) জীবিত থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র তাঁর জীবদ্দশায় আমাদের প্রিয় নবী ও শেষনবী মুহাম্মাদে আরাবী (সা:)-এর আবির্ভাবের মাধ্যমে মূসোয়ী শরীয়ত বাতিল হয়ে যাবে। যার ফলে তাঁর (আ:) জন্য আমাদের প্রিয় নবীর শরীয়তের আনুগত্য করা আবশ্যক হয়ে পড়বে। এমতাবস্থায় কাদিয়ানীদের দাবী, ঈসা (আ:) জীবিত থাকা সত্ত্বে বর্তমানে তাঁর শরীয়তও জীবিত থাকবে, এইধরণের কথাবার্তার ভিত্তি কী? তবে কি উল্লিখিত হাদীস মিথ্যা হয়ে যাবে?
(২) তাদের উল্লিখিত দাবী সত্য হলে, তখন তো তাদেরই যুক্তি অনুসারে মুহাম্মদ (সা:) এর মৃত্যুতে শরীয়তে মুহাম্মদীয়াও বাতিল হয়ে যাচ্ছে! নাউযুবিল্লাহি। এর কী জবাব?
(৩) ঈসায়ী ধর্মকে মৃত সাব্যস্ত করতে ঈসা (আ:)-কে মৃত বিশ্বাস করতে হবে, কাদিয়ানীদের এইধরণের দাবীর ভিত্তি কোথায়? ঈসায়ীদের বর্তমান ধর্ম-গ্রন্থ (নিউ টেস্টামেন্ট) বাইবেল ঈসা (আ:)-এর আকাশে উত্থিত হওয়ার বহু বছর পরে সেন্ট পৌল নামক এক ব্যক্তি কর্তৃক রচিত, ঈসা (আ:)-এর সাথে যার কোনোই সম্পর্ক নেই; এগুলো প্রমাণ করার মাধ্যমেও কি বর্তমান ঈসায়ীধর্ম বাতিল সাব্যস্ত হবেনা?
(৪) মির্যা কাদিয়ানীর জন্ম ১৮৩৯ সালে। সে নিজেকে ১৮৬৫ সালে মুলহাম এবং ১৮৮১ সালে মুজাদ্দিদ ও মামূর মিনাল্লাহ দাবী করার পর থেকে ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত টানা ২৯ বছর পর্যন্ত মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে আসছিল যে, ঈসা (আ:) জীবিত ও আকাশে। (বারাহীনে আহমদিয়া দ্রষ্টব্য)। তবে কি মির্যা কাদিয়ানীও এই ২৯ বছর যাবৎ ঈসায়ী ধর্মকে সত্য আর শরীয়তে মুহাম্মদীকে বাতিল বিশ্বাস করে আসছিল?
(৫) ঈসা (আ:)-কে জীবিত ও আকাশে বিশ্বাস করার আকীদা উম্মতে মুহাম্মদীয়ার একটি সর্বসম্মত আকীদা। একথার স্বীকারোক্তি মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদের বইতেও পরিষ্কার উল্লেখ আছে (আনওয়ারুল উলূম ২/৪৬৩; মির্যা বশির উদ্দিন)। অপরদিকে রাসূল (সা:)-এর হাদীস বলছে, উম্মতে মুহাম্মদীয়া কখনো কোনো ভুল-ভ্রান্তির উপর একমত হবেনা। যেমন হাদীসে এসেছে, রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন :
- إِنَّ أُمَّتِي لَا تَجْتَمِعُ عَلَى ضَلَالَةٍ فَإِذَا رَأَيْتُمْ اخْتِلَافًا فَعَلَيْكُمْ بِالسَّوَادِ الْأَعْظَمِ.” (رواه ابن ماجة في السنن رقم 3950)
অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমার উম্মত গোমরাহির উপর কখনোই একমত হবেনা। অতএব তোমরা যখনই মতানৈক্য দেখতে পাবে তখন তোমরা বড় দলটিকে আঁকড়ে ধরবে। (দেখুন, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩৯৫০)। তাই কাদিয়ানীদের উল্লিখিত দাবী সঠিক হলে, তখন কি রাসূল (সা:)-এর উপরিউক্ত হাদীস মিথ্যা হয়ে যাচ্ছেনা? আমরা কি রাসূল (সা:)-এর হাদীসগুলো ত্যাগ করে কাদিয়ানীদের দাবীকে সত্য মেনে নেব?? সংক্ষেপে। কাদিয়ানীদের নিকট আমার এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর আছে কি?
- লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক