ঈসা (আ:)-এর ‘কবর’ সম্পর্কে মির্যা কাদিয়ানীর চার (৪) ধরণের বিভ্রান্তিকর তথ্য

মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর বইসমূহে জীবিত ঈসা (আ:)-এর ‘কবর’-এর স্থান সম্পর্কে চার ধরণের বিভ্রান্তিকর তথ্য। যথা :

(১) ‘সিরিয়া’ এর গ্যালীলে। (দেখুন রূহানী খাযায়েন খণ্ড নং ৩ পৃষ্ঠা নং ৩৫৩)।

(২) ‘ফিলিস্তিন’ এর বায়তুল মুকাদ্দাসের আঙ্গিনায়। (দেখুন রূহানী খাযায়েন খণ্ড নং ৮ পৃষ্ঠা নং ২৯৬-৩০০ [টিকা দ্রষ্টব্য])।

(৩) ‘কাশ্মীর’ অথবা তার আশপাশে [তথা তিব্বতের কোনো শহরে]। (দেখুন রূহানী খাযায়েন খণ্ড নং ১০ পৃষ্ঠা নং ৩০২)। উল্লেখ্য, এখানে ‘অথবা’ বলে কী বুঝালেন? তবে কি মির্যা সাহেব নিজেও কনফিউজড ছিলেন? এই তথ্যটি ইলহামি হলে আবার কনফিউজড কেন?

(৪) ‘কাশ্মীর’ এর শ্রীনগরের ‘খান-ইয়ার মহল্লা’তে। (দেখুন রূহানী খাযায়েন খণ্ড নং ১৪ পৃষ্ঠা নং ১৭২)।

এবার বিস্তারিত আলোচনা :

১. সিরিয়ার গ্যালীল এর কবর :

সিরিয়া এর গ্যালীলের কথিত কবর সম্পর্কে মির্যা কাদিয়ানীর বাণী : “সত্য তো এটাই যে, মসীহ আপনা মাতৃভুমি গ্যালীলেই মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু সেখানে তাঁর যে দেহ দাফন হয়েছিল সেটি আবার জীবিত হয়ে গিয়েছিল একথা কোনোভাবেই সত্য নয় । বরং (লূক এর ইঞ্জিলের) ঐ অধ্যায়ের তৃতীয় আয়াত দ্বারা প্রকাশ রয়েছে যে, মৃত্যুবরণ করার পর কাশফ (দিব্যি দর্শন) অবস্থায় মসীহ চল্লিশ দিন পর্যন্ত আপনা শিষ্যদের দর্শন করেছেন। এখানে কেউ যেন একথা মনে না করে যে, মসীহ শূলিবিদ্ধ হওয়ার কারণেই মৃত্যুবরণ করেছেন। কেননা আমরা প্রমাণ করে আসছি যে, খোদাতায়ালা মসীহকে শূলি হতে প্রাণে বাঁচিয়েছেন। বরং ‘আমলের প্রথম অধ্যায়’ এর এই তৃতীয় আয়াত সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, মসীহ’র স্বাভাবিক মৃত্যুই হয়েছিল যা গ্যালীলেই সংঘটিত হয়েছে। ঐ মৃত্যুর পরেই মসীহ আপনা শিষ্যদের চল্লিশ দিন পর্যন্ত কাশফ অবস্থায় দর্শন করেছিলেন।”

স্ক্রিনশট নং ১

সতর্কতা : এখানে কোনো ধুর্ত কাদিয়ানী হয়ত একথা বলতে পারে যে, উক্ত কথাগুলো মির্যা সাহেবের নিজেস্ব নয় বরং তিনি অন্য কারো কথাকে উদ্ধৃত করে এখানে উল্লেখ করে দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হল, যে কেউই পড়ে বুঝতে সক্ষম যে কথাগুলো সম্পূর্ণ তারই। পাঠকবৃন্দ! আমার এ লিখাটি কোনো ব্রেইন ওয়াশ কাদিয়ানীর জন্য নয়, বরং সেসব সত্যানুসন্ধানীবন্ধুদের জন্যই যারা আখেরাতে নিজের নাজাতের পূর্ণ আশাবাদী ও জাহান্নাম থেকে মুক্ত হয়ে জান্নাতবাসী হতে চান। আমি আশা করব, নিরপেক্ষতার সাথে মির্যা সাহেবের স্ববিরোধ কথাবার্তাগুলো নিয়ে সামান্য একটু চিন্তা করবেন! তবেই মির্যা সাহেব ঈসা (আ:)-কে মৃত সাব্যস্ত করার জন্য এতটা উদগ্রীব কেন ছিলেন তার প্রকৃত রহস্য খুবই তাড়াতাড়ি উন্মোচন হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। অপ্রিয় হলেও সত্য কথা, মির্যা সাহেব মূলত নিজেকে ‘মসীহ’ রূপে প্রতিষ্ঠিত করতেই তিনি ঈসা (আ:)-কে মৃত প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন।

২. ‘ফিলিস্তিন’ এর বায়তুল মুকাদ্দাসের কবর :

বায়তুল মুকাদ্দাসের কথিত কবর সম্পর্কে মির্যা কাদিয়ানীর বাণী : “আর বাস্তবতা এই যে, হযরত ঈসার কবরও শামে বিদ্যমান। আর আমি অত্যধিক সমাধানের জন্য এখানে টিকাতে আমার ভ্রাতা সাইয়েদ মৌলভী মুহাম্মদ সাঈদী তরাবলিসি’র সাক্ষ্য উল্লেখ করে দিয়েছি। তিনি শামের তরাবলিসের অধিবাসী। তথায় হযরত ঈসার কবর বিদ্যমান। যদি বল যে, ঐ কবর একখানা জা’লি (কৃত্রিম) কবর তাহলে সেটি যে কৃত্রিম কবর তার প্রমাণ দিতে হবে এবং সাব্যস্ত করতে হবে যে, এই কৃত্রিম কবর কবে তৈরী করা হয়েছিল! এই অবস্থায় তো অন্যান্য নবীর কবরের ব্যাপারেও কোনো শান্তনা থাকেনা, নিরাপত্তা উঠে যাবে। বলতে পারে যে, সে সকল নবীর কবরগুলোও হয়ত জা’লি (কৃত্রিম) কবরই!” (রূহানী খাযায়েন ৮/২৯৬-৯৭)।

স্ক্রিনশট নং
স্ক্রিনশট নং ৩

উল্লেখ্য, প্রাচীন ভৌগলিক সীমানা অনুযায়ী ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাসও শাম এর অন্তর্ভুক্ত। মির্যা সাহেব এখানে শামের কবর বলতে বায়তুল মুকাদ্দাসের কবরকেই বুঝিয়েছেন। তার প্রমাণ তারই মুরিদের উক্ত পত্র। যেখানে উল্লেখ আছে “হযরত ঈসা (আ:) বেথেলহামে জন্মগ্রহণ করেন। বেথেলহাম আর কুদ্স এই দুয়ের মধ্যবর্তী তিন কোছ তথা ছয় মাইল দূরত্ব এবং হযরত ঈসা (আ:) এর কবর কুদ্স শহরেই রয়েছে এবং তা এখনো বিদ্যমান। তথায় একটি গির্জা তৈরী করা হয়েছে যেটি সমস্ত গির্জা অপেক্ষা বড়। তার অভ্যন্তরে ঈসা (আ:) এর কবর রয়েছে এবং হযরত মরিয়ম সিদ্দিকার কবরও রয়েছে। দু’নো কবর পৃথক পৃথক। বনী ইসরাঈলী যুগে ‘কুদ্স’ এর নাম ছিল ইউরোসলম, তাকে উরসলমও বলা হত। ঈসা (আ:)-এর মৃত্যুর পর ঐ শহরের নাম ‘ইলিয়া’ রাখা হয়েছিল। অতপর ইসলামী সাফল্যের পরবর্তীতে বর্তমান সময় পর্যন্ত শহরটি ‘কুদ্স’ নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করে। অনারবীরা সেটিকে ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ বলে।” (রূহানী খাযায়েন ৮/২৯৯-৩০০)।

সর্তকতা : হয়ত মির্যাকে স্ববিরোধ কথাবার্তার অভিযোগ থেকে বাঁচাতে কোনো কাদিয়ানী বলতে পারে যে, এটি মির্যা সাহেবের নিজের কোনো কথা নয়, বরং তিনি তার জনৈক মুরিদের কথা উদ্ধৃত করেছেন মাত্র। এমন ব্যক্তির উদ্দেশ্যে আমার জিজ্ঞাসা হল, মির্যা সাহেব তো তার মুরিদের কথার উদ্ধৃতি দেয়ার আগেই লিখেছেন : ‘আর বাস্তবতা এই যে, হযরত ঈসার কবরও শামে বিদ্যমান’। মির্যা সাহেব তার উক্ত দাবীকে সঠিক প্রমাণ করতে আপনা মুরিদের পাঠানো পত্রের বিবরণকে সাক্ষ্য-প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাহলে এটি কিভাবে মির্যার নিজের কোনো কথা নয়, বলতে পারলেন? আর শামের তথা বায়তুল মুকাদ্দাসের ঐ কবরটি কৃত্রিম কোনো কবরই নয় বরং এটি ঈসা (আ:) এর প্রকৃত কবরই ছিল বলে দাবী করেন মির্যা সাহেব। তারই ভাষ্য : “যদি বল যে, ঐ কবর একখানা জা’লি (কৃত্রিম) কবর তাহলে সেটি যে কৃত্রিম কবর তার প্রমাণ দিতে হবে এবং সাব্যস্ত করতে হবে যে, এই কৃত্রিম কবর কবে তৈরী করা হয়েছিল!” সুতরাং বুদ্ধিমানদের জন্য গভীর চিন্তা করা দরকার যে, মির্যা সাহেব একজন মুলহাম দাবীদার হওয়া সত্ত্বেও ঈসা (আ:) এর কবর সম্পর্কে বরাবরই স্ববিরোধ বক্তব্য দিয়ে গেছেন। তার মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য কি এইটুকুই যথেষ্ট নয়?

৩. ‘কাশ্মীর’ এর আশপাশে তথা তিব্বত এর কবর :

‘তিব্বত’ এর কথিত কবর সম্পর্কে মির্যা কাদিয়ানীর বাণী : “কোনো আশ্চর্যের ব্যাপার নয় যে, তিনি (ঈসা) সেই পর্যটন যুগে তিব্বতেও আগমন করেছিলেন যেমনটি আজকাল কোনো কোনো ইংরেজ লিটারেচারদের রচনা দ্বারা বুঝা যায়। ডক্টর বার্নায়ার এবং কতিপয় ইউরোপীয় বিদ্যানদের মত হল, কোনো আশ্চার্যের বিষয় নয় যে, কাশ্মীরের অধিবাসীরা প্রকৃতই ইহুদীজাত। সুতরাং এই মতটিও একদমই আশ্চার্যের নয় যে, হযরত মসীহ সেসব (ইহুদীজাত) লোকদের নিকট আগমন করেছেন অতপর তিনি তিব্বত অভিমুখে যাত্রা করেছেন। তো আশ্চার্যের কি আছে যে, মসীহ এর কবর কাশ্মীর অথবা তার আশপাশে (যেমন তিব্বত ইত্যাদী) রয়েছে। ইহুদী রাষ্ট্রগুলো থেকে তাদের বেরিয়ে আসাই ইংগিত করে যে, নবুওয়তেরধারা তাদের বংশ থেকে বেরিয়ে গেছে।” (রূহানী খাযায়েন ১০/৩০২)।

স্ক্রিনশট নং

সতর্কতা : হয়ত এখানেও কাদিয়ানীরা মির্যাকে তার স্ববিরোধ বক্তব্যের অভিযোগ থেকে বাঁচাতে বলবে যে, না না; এসব মোল্লাদের বানোয়াট আর মিথ্যা। এগুলোর সাথে মির্যা সাহেবের কোনোই সম্পর্ক নেই। আমি সেসব কপাল পোড়া আর ব্রেইন ওয়াশ মানুষগুলোকে বলব, আমার পক্ষ হতে কোটি টাকার চ্যালেঞ্জ রইল এখানে যা লিখেছি তার একটি বাক্যও মিথ্যা প্রমাণ করতে পারবেনা। পারলে চ্যালেঞ্জ কবুল কর।

৪. ‘কাশ্মীর’ এর শ্রীনগরের ‘খান-ইয়ার মহল্লা’ এর কবর :

শ্রীনগরের ‘খান-ইয়ার মহল্লা’ এর কথিত কবর সম্পর্কে মির্যা কাদিয়ানীর বাণী : “খোদা তায়ালার দয়ায় বিরুদ্ধবাদীদের অপদস্থ করার জন্য এবং লিখকের (মির্যা) সত্যতা প্রমাণিত করার জন্য একথা সাব্যস্ত হয়ে গেছে যে, শ্রীনগরের খান-ইয়ার মহল্লাতে ইউজ আসেফ নামীয় ব্যক্তির যে কবর বিদ্যমান আছে সেটি প্রকৃতপক্ষে ও নিঃসন্দেহে হযরত ঈসা আলাইহে ওয়া সাল্লামের কবর।” তিনি একই পৃষ্ঠায় একদম শেষ দুই লাইনে লিখেছেন : “বরং আমরা প্রমাণ করেছি যে, ইউজ আসেফ এটি হযরত ঈসা আলাইহে ওয়া সাল্লামেরই নাম। ভাষাগত বিবর্তনের ফলেই শব্দের এই পরিবর্তন সাধিত হয়। এখনো কোনো কোনো কাশ্মীরী ইউজ আসেফ এর স্থলে ঈসা ছাহেব’ই বলে থাকে।” (রূহানী খাযায়েন ১৪/১৭২ [উর্দূ]; মূল গ্রন্থ ‘রাজে হাকীকত’ দ্রষ্টব্য)।

স্ক্রিনশট নং

অথচ মির্যা সাহেবের দাবী হল,

“আমি জমিনের কথা বলিনা। কেননা আমি জমিন থেকে নই বরং আমি সেটাই বলে থাকি যা খোদা আমার মুখে ঢেলে দেন।” (পয়গামে ছুলহি, রূহানী খাযায়েন ২৩/৪৮৫)।

এমতাবস্থায় কাদিয়ানীরা মির্যার উক্ত স্ববিরোধ বক্তব্যের কী জবাব দেবে? তার মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য কি এইটুকুই যথেষ্ট নয়?

মন্তব্য, আমি কোনো মন্তব্য করতে চাইনা। পাঠকবৃন্দ! এবার নিজেরাই ভাবুন! এই ধরণের কেউ নিজেকে ইমাম মাহদী, মসীহ ইত্যাদি দাবী করলে তা কতটুকু নির্ভরযোগ্য হতে পারে! পরন্তু মির্যা সাহেব নিজেই নিজের কথায় একজন জঘন্য মিথ্যাবাদীও প্রমাণিত হলেন কিনা?

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here