আলেমগণ বানর আর শূয়োরের আকৃতিতে পরিণত হওয়ার প্রেক্ষিত ও পর্যালোচনা

প্রশ্ন: আমাদের আহমদী (কাদিয়ানী) মুরুব্বীদের বলতে প্রায় শুনা যায় যে, শেষ যামানার আলেমদের ব্যাপারে হাদীসে নাকি এসেছে যে, তারা সবাই বানর আর শূয়োরের আকৃতিতে পরিণত হবে! একথা সত্য হলে তখন আমরা সত্য জানার উদ্দেশ্যে আলেমদের নিকট কেন যাব?

জবাব:

হাদীসটির গ্রহণযোগ্য সম্পর্কে “ইতহাফুল জামা’ত বি মা জায়া ফিল-ফিতানি ওয়াল মালাহিম ওয়া আশরাতিস সা’আহ (إتحاف الجماعة)” -কিতাবের রচয়িতা শায়খ আত-তাভিযরী (পূর্ণ নাম হুমুদ ইবনে আব্দিল্লাহ ইবনে হুমুদ ইবনে আব্দির রহমান আত তুওয়াইজরী-حمود بن عبد الله بن حمود بن عبد الرحمن التويجري) (মৃত. ১৪১৩ হিজরী) রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, হাদীসটি ইমাম হাকিম আত-তিরমিযি (রহ.) সংকলিত ‘নাওয়াদিরুল উসূল’ কিতাবটি ছাড়া অন্য আর কোনো কিতাবে পাওয়া যায়না। আর এর সনদ জঈফ বা দুর্বল। হযরত আবু উমামাহ (রা:) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, تكون في أمتي فزعة، فيصير الناس إلى علمائهم، فإذا هم قردة وخنازير অর্থাৎ আমার উম্মতের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করবে। তারই প্রেক্ষিতে লোকজন তাদের উলামা-(য়ে  ছূ)দের নিকট যাবে। ইত্যবসরে তারা তাদেরকে বানর আর শূয়োরের আকৃতিতে বিকৃত চেহারার দেখতে পাবে। (সূত্র, নাওয়াদিরুল উসূল, হাকীম তিরমিযী রহ.)। হাদীসের মান, দুর্বল। (আল-জামেউল কাবীর এর ভুমিকা দ্রষ্টব্য, ইমাম সুয়ূতী রহ.)।

জ্ঞানীদের নিকট গোপন নয় যে, বর্ণনাটিতে উল্লিখিত ‘বানর’ আর ‘শূয়োরে’ পরিণত হওয়ার সাবধানবাণী শুধুমাত্র উলামায়ে ছূ-দের সাথেই সম্পর্কিত এবং সেটি কেয়ামতের বড় আলামতগুলো যখন একেরপর এক প্রকাশিত হতে থাকবে সেই সময়ের সাথেই সম্পৃক্ত। যেমন ইমাম সুয়ূতী (রহ.) ‘দুররে মানসূর’ নামক কিতাবে একই বিষয়ে এই হাদীসটিও উল্লেখ করেছে, أن ريحا تكون في آخر الزمان وظلمة فيفزع الناس إلى علمائهم، فيجدونهم قد مسخوا অর্থাৎ শেষ যামানায় বায়ুপ্রবাহ এবং অন্ধকারের ঘটনা ঘটবে। অতপর লোকজন (অস্থিরতার সমাধান খুঁজতে) উলামা (য়ে ছূ-)দের নিকট অস্থির হয়ে ছুটবে। অতপর তারা তাদেরকে বিকৃত চেহারার দেখতে পাবে। (সূত্র: যাম্মুল মালাহী, ইবনে আবি আদ-দুনিয়া)। দুররে মানসূর-এর স্ক্যানকপি নিম্নরূপ,

এ বর্ণনার সমর্থনে আরও বহু হাদীস বিদ্যমান। যেমন “মুসনাদে আহমদ” গ্রন্থে রয়েছে, و يبعث على إحياء من احيائهم ريح فتنسفهم অর্থাৎ তখন তিনি (আল্লাহতালা) তাদের নানা প্রান্তে বায়ু প্রেরণ করবেন ফলে সেটি তাদের গ্রাস করবে। ইবনে আবিদ-দুনিয়া (রহ.) হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে একটি দলকে বানর আর শূয়োরের আকৃতি করে দেয়া হবে এবং আরেকটি দলকে ভুমিতে ধসিয়ে দেয়া হবে ও সেই মুহূর্তে প্রবল বায়ু ওই দলটির নিকট প্রেরণ করা হবে। কেননা তারা মদ পান করবে, রেশমি কাপড় পরবে আর দফ এবং বাদ্যযন্ত্র অবলম্বন করবে। বহু হাদীস দ্বারা এও জানা যায় যে, সেই সময় জিন্দিক আর কদরিয়াহ মতবাদে বিশ্বাসীসহ শরাবী, গান বাদ্যকারী আর হালাল হারাম মিশ্রিতকারীদের চেহারাও বানর আর শূয়োরের আকৃতিতে পরিণত হয়ে যাবে (সূত্র: ইগাছাতুল লাহফান, ইমাম ইবনু কাইয়্যুম)।

বর্ণনাগুলোর শিক্ষাঃ বর্ণনাগুলোর আলোকে ঢালাওভাবে সব আলেমকে অভিযুক্ত করা ঠিক নয়। অনুরূপ বর্তমান সময়ের সাথেও সম্পর্কযুক্ত বলা যাবেনা। অন্যথা চ্যালেঞ্জ থাকলো বর্তমানে দুনিয়ার কোথাও কোনো একজন উলামায়ে ছূ-র চেহারা বানর বা শূয়োরের আকৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে—এমন একটি প্রমাণও কেউ দেখাতে পারবেনা। বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করতে চাই, ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) লিখেছেন, والنسخ يكون حقيقيا و يكون معنويا و هذا القول هو الراجح و هو ما ذهب إليه ابن عباس وغيره من أئمة التفسير অর্থাৎ বিকৃতিটা প্রকৃতপক্ষে এবং রূপক দুইভাবেই হতে পারে। এটাই অগ্রাধিকার প্রাপ্ত মত। ইবনে আব্বাস সহ সমস্ত তাফসীরকারকের একই মত। পক্ষান্তরে রাসূল (সা.) হক্কানী উলামায়ে কেরামকে সুনানে আবুদাউদ এবং তিরমীজীর হাদীসে ‘ওরাসাতুল আম্বিয়া’ (নবীগণের উত্তরসূরী) শব্দে ভূষিত করেছেন এমনকি সুনানে দারেমীর ৩৭০ নং হাদীসে ওয়া ইন্না খাইরাল খিয়ারি খিয়ারুল উলামা’ (এবং নিশ্চয়ই আলেমগণই সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী) শব্দেও মর্যাদাবান করেছেন। কাজেই সবাইকে এক করে দেখা প্রকারান্তরে রাসূল (সা.)-এর হাদীসগুলোরই সুস্পষ্ট অবমাননা বৈ নয়।

মূল আলোচনাঃ মূল-কথায় ফেরা যাক। প্রকৃতপক্ষে রাসূল (সা.) আলেমদেরকে হাদীসে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। উলামায়ে ছূ অর্থাৎ মন্দ ও নিকৃষ্ট আলেম এবং উলামায়ে হক অর্থাৎ সত্যপন্থী আলেম। হাদীসে উলামায়ে হক যারা তাদের বহু মর্যাদার উল্লেখ রয়েছে। এখানে বিপত্তির জায়গাটা হল, কাদিয়ানীরা আগুন পানি দুটোকে এক ও একাকার করে গুলিয়ে ফেলে আর তাদের সরলমনা ও অবোধ প্রকৃতির অনুসারীদের বিকৃত শিক্ষা দিয়ে আলেমদের প্রতিও বিদ্বেষী করে তুলে। আসুন এবার উল্লিখিত হাদীসটির সূত্র তথা সনদ সম্পর্কে মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম কী লিখেছেন তা জানা যাক!

  • হাদীসটির ব্যাখ্যায় বিখ্যাত ‘ইসলাম ওয়েব ডট নেট’ (আরবী) থেকে একটি ফাতাওয়া উল্লেখপূর্বক বঙ্গানুবাদ,

[আরবী]  فأما هذا الحديث فلم نجده إلا في (نوادر الأصول) للحكيم الترمذي، وضعفه التويجري في (إتحاف الجماعة). وقد نبه السيوطي في مقدمة (الجامع الكبير) على أن ما عزي للحكيم الترمذي في نوادر الأصول، أو الحاكم في تاريخه، أو الديلمي في مسند الفردوس، فهو ضعيف، فليستغن بالعزو إليها، أو إلى بعضها، عن بيان ضعفه. اهـ. وعلى افتراض صحته، فإن ذلك يكون في آخر الزمان مع ظهور العلامات الكبرى للساعة؛ فقد روى ابن أبي الدنيا في (ذم الملاهي) عن مالك بن دينار قال: بلغني أن ريحا تكون في آخر الزمان وظلمة، فيفزع الناس إلى علمائهم، فيجدونهم قد مسخوا

অর্থাৎ এই হাদীসটি আমরা শুধু কেবল ইমাম হাকিম আত-তিরমিযি’র (নাওয়াদিরুল উসূল) কিতাবে পেয়েছি। ইমাম হুমূদ ইবনু আব্দিল্লাহ আত-তুওয়াইজরী (মৃত: ১৪১৩ হিজরী) তিনি ‘ইতহাফুল জামা’আহ বি-মা জা-আ ফিল ফিতান ওয়াল মালাহিম ওয়া আশরাতিস সা’আহ’ (সংক্ষেপে, ইতহাফুল জামা’আহ) নামক গ্রন্থে একে দুর্বল বলেছেন।  আল-হাকিম আত-তিরমিযী স্বীয় ‘নাওয়াদিরুল উসূল’ গ্রন্থে এবং ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আল-হাকেম স্বীয় ‘তারীখে নিশাপুর’ গ্রন্থে এবং ইমাম দাঈলামী তিনি তার মসনাদে ফেরদাউস গ্রন্থে যেটি এনেছেন সেটি সম্পর্কে ইমাম আস-সুয়ুতি (রহ.) ‘আল-জামেউল কাবীর’ এর ভুমিকায় সতর্ক করেছেন। কারণ এটি দুর্বল হাদীস। সুতরাং তার কারণ চিহ্নিত করে তা হতে বিরত থাকা উচিত। অধিকন্তু এর বৈধতা ধরে নিয়ে বলা যেতে পারে যে, এটি শেষ যামানায় কেয়ামতের বড় আলামত সমূহ সংঘটিত মুহুর্তে ঘটবে। ইমাম ইবনে আবিদ দুনিয়া (রহ.) তিনি তার যাম্মুল মালাহী গ্রন্থে মালিক বিন দিনার (রহ.) হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি আমাকে বলেছেন: আমাকে অবহিত করা হয়েছে যে, শেষ যামানায় বায়ুপ্রবাহ এবং অন্ধকার এর ঘটনা ঘটবে। অতপর লোকজন (অস্থিরতার সমাধান খুঁজতে) উলামা (য়ে ছূ-)দের নিকট অস্থির হয়ে ছুটবে। অতপর  তারা তাদেরকে বিকৃত চেহারার দেখতে পাবে। (অনুবাদ শেষ হল)।

শেষকথা, ইমাম ইবনে আবিদ-দুনিয়া (রহ.)-এর রচিত “যাম্মুল মালাহী” গ্রন্থে হযরত মালিক বিন দিনার (রহ.)-এর বর্ণনাকৃত হাদীসের আলোকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, শেষ যামানার যেসব আলেমকে লোকজন বানর আর শূয়োরের আকৃতিতে দেখবে সেটি প্রথমত: আলেমদের মধ্যে শুধুই উলামায়ে ছূ-য়ের সাথে খাস বা নির্দিষ্ট, দ্বিতীয়তঃ এইধরণের ঘটনা কেবল নির্ধারিত একটি সময় ঘটবে আর সেই সময়টি কেয়ামতের বড় বড় নিদর্শনগুলো সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেই হবে। আশাকরি এখন থেকে আর কেউই গোমরাহ হবেনা।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here