ঈসা (আ.) কি কাশ্মীরে এসেছিলেন? কাদিয়ানীরা এসমস্ত আজগুবি কথাবার্তা কোত্থেকে আমদানি করে?

খন্ডনমূলক জবাব,

আপনি যদি কোনো কাদিয়ানী নেতাকে এই নিয়ে প্রশ্ন করেন তখন সে হয়ত উত্তরে বলবে, সূরা মুমিনূন এর ৫০ নং আয়াত و آويناهما الى ربوة ذات قرار و معين দ্বারা মির্যা কাদিয়ানী সাহেব ‘ঈসা (আ.) কাশ্মীরে এসেছিলেন’ মর্মে উক্ত মতবাদ উদ্ভাবন করে গেছেন! সেযাইহোক কাদিয়ানীদের বিকৃত ব্যাখ্যাটি খুব সহজে বুঝতে চাইলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে অনূদিত কুরআনের কপি থেকে অত্র আয়াতের অনুবাদটুকু পড়ে নেয়ার অনুরোধ থাকল।

প্রিয় পাঠকবৃন্দ! পবিত্র কুরআনের সূরা মুমিনূন এর ৫০ নং আয়াতে উল্লিখিত (و آويناهما الى ربوة)-এর “রাবওয়া” শব্দ দ্বারা কাদিয়ানীদের কাশ্মীর উদ্দেশ্য নেয়া ঠিক হয়নি। কেননা হাদীসে রাবওয়া দ্বারা এর ভৌগোলিক অবস্থান সুস্পষ্টভাবে নির্ণীত। আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর পবিত্র জবানে ‘রাবওয়া’ দ্বারা ফিলিস্তিনের একটি শহর “রামাল্লাহ“ই উদ্দেশ্য নেয়া প্রমাণিত। বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ রয়েছে তাফসীরে ইবনে কাসীর সহ বহু জায়গায়। সহীহ হাদীসে ‘রাবওয়া’ দ্বারা এর ভৌগোলিক অবস্থান সুস্পষ্টভাবে নির্ণীত হওয়ার প্রমাণ এখানে, (হাদীসের আরবী ইবারতসহ তাফসীরে ইবনে কাসীর গ্রন্থ থেকে) :-

وقال ابن أبي حاتم : حدثنا أبي ، حدثنا إبراهيم بن محمد بن يوسف الفريابي ، حدثنا رواد بن الجراح ، حدثنا عباد بن عباد الخواص أبو عتبة ، حدثنا السيباني ، عن ابن وعلة ، عن كريب السحولي ، عن مرة البهزي قال : سمعت النبي صلى الله عليه وسلم يقول لرجل : “ إنك ميت بالربوة ” فمات بالرملة . وهذا حديث غريب جدا .

وأقرب الأقوال في ذلك ما رواه العوفي ، عن ابن عباس في قوله : ( وآويناهما إلى ربوة ذات قرار ومعين ) ، قال : المعين الماء الجاري ، وهو النهر الذي قال الله تعالى : ( قد جعل ربك تحتك سريا ) [ مريم : 24 ] .

وكذا قال الضحاك ، وقتادة : ( إلى ربوة ذات قرار ومعين ) : هو بيت المقدس . فهذا والله أعلم هو الأظهر; لأنه المذكور في الآية الأخرى . والقرآن يفسر بعضه بعضا . وهو أولى ما يفسر به ، ثم الأحاديث الصحيحة ، ثم الآثار .

তাফসীরে ইবনে কাসীর (দশম খন্ড)

এমতাবস্থায় আমরা কিভাবে রাসূল (সা.)-এর নির্ণীত স্থানের পরিচয় পরিত্যাগ করে কাদিয়ানীদের নিজেস্ব মনগড়া ব্যাখ্যা মতে রাবওয়া হতে ভারতের “কাশ্মীর” উদ্দেশ্য নিতে পারি? কাদিয়ানীরা এর কী উত্তর দেবেন?

  • উল্লেখ্য, রামাল্লাহ পশ্চিম তীরে অবস্থিত ফিলিস্তিনের একটি শহর। এটি জেরুজালেম থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে এবং সমুদ্র সমতল থেকে ৮৮০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। আয়াতটিতে রামাল্লাহ শহরকে ‘রাবওয়া’ শব্দে বিশেষিত করার কারণ এটাই। কেননা রাবওয়া বলতে বুঝায় আশপাশের এলাকা হতে তুলনামূলক উচ্চতায় অবস্থিত এমন স্থান।

তারপর আয়াতটির معين শব্দ হতে যে ঝর্ণা বা ছোট নহর-এর উল্লেখ রয়েছে তা হতে ঐ নহরই উদ্দেশ্য যেটি আল্লাহ ঈসা (আ.)-এর জন্মগ্রহণ মুহূর্তে বিবি মরয়মের পদতলে জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন। একথা বলেছেন, রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-ও। আর সূরা মরিয়ম আয়াত নং ২৪ এর মধ্যে এর পরিষ্কার ইংগিতও দেয়া হয়েছে। (দেখুন, তাফসীরে ইবনে কাসীর, দশম খন্ড)। ঈসা (আ.)-এর প্রসব হওয়ার পর তিনি সন্তানটিকে সাথে নিয়ে পুনরায় নিজ কওমের নিকট ফিরেও আসেন।

  • কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যনীয় :-

১- রাবওয়া তথা রামাল্লাহ-তে বিবি মরিয়ম আর তাঁর সন্তানটি সহ যখন গিয়েছিলেন তখন তাঁর সন্তান তথা ঈসা (আ.) মায়ের গর্ভে ছিলেন, তিনি সেখানেই ভূমিষ্ঠ হন।

২- সেখানে যে ঝর্ণাটি সৃষ্টি হয়েছিল সেটি তখন মরিয়মের পদতলে আল্লাহর কুদরতে সৃষ্টি হয়েছিল, معين অর্থ ছোট নহর বা ঝর্ণা।

৩- ঈসা (আ.)-এর মাতা সেখান থেকে নিজ কওমে ফিরিয়েও যান। উল্লেখ্য, কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা অপর আয়াত দ্বারা হয়ে গেলে তখন তার বিপরীত ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তাফসীরে ইবনে কাসীর (রহ.) থেকেও একথা পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে। وَالْقُرْآنُ يُفَسِّرُ بَعْضُهُ بَعْضًا. وَهُوَ أَوْلَى مَا يُفَسَّرُ بِهِ، ثُمَّ الْأَحَادِيثُ الصَّحِيحَةُ، ثُمَّ الْآثَارُ অর্থাৎ সর্বোত্তম তাফসীর সেটাই যে তাফসীর কুরআনের অপরাপর আয়াত দ্বারা হয়ে যাবে, তারপর সেটিই উত্তম তাফসীর যেটা সহীহ হাদীস দ্বারা হয়ে যাবে, এরপর সেটাই যেটা সাহাবায়ে কেরাম এর বিশ্লেষণ দ্বারা হয়ে যাবে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, দশম খন্ড)।

এখন এতে ঈসা (আ.) কাশ্মীর যাওয়ার বিষয়টি কিভাবে সাব্যস্ত হয়? আপনারা যেরকম ঈসা (আ.)-কে আকাশে নিয়ে থাকলে সরাসরি ‘আকাশ’ শব্দটি কুরআনের মধ্যে পরিষ্কার করে নেই কেন, বলেই প্রশ্ন তুলেন ঠিক অনুরূপ “কাশ্মীর” শব্দটাও তো অত্র আয়াতে নেই! এমনকি জেরুজালেম থেকে কাশ্মীরের দুরত্বও প্রায় ৪৬৬০ কিলোমিটার দূরে। ফলে ঈসা (আ.)-এর আম্মা গর্ভবতী অবস্থায় এতদূর পথ পাড়ি দিয়ে কাশ্মীর যাওয়ার কী অর্থ? আপনার সুস্থ্য বিচারবোধ কী বলে? সুতরাং কাদিয়ানীরা কুরআন থেকে রাবওয়া’র যে ব্যাখ্যা নিয়ে ‘কাশ্মীর’ এর কনসেপ্ট উদ্ভাবন করে থাকে সেটি সুস্পষ্ট বিকৃতি ও বাতিল; সত্যের সাথে যার লেশমাত্র সম্পর্কও নেই।

ঈসা (আ.) এক স্থান থেকে আরেক স্থানে স্থানান্তর হওয়া সম্পর্কে

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here