সজোরে বা আস্তে ‘আমীন’ বলা প্রসঙ্গে

হানাফীদের দলিল সহীহ হাদীস থেকে

নামাযে ‘আমীন’ বলা বিষয়ক রেওয়ায়েত দু’দিকেরই রয়েছে, সজোরে এবং আস্তে। বলে রাখা দরকার, ‘আমীন’ একটি দোয়া ও মোনাজাত, যা আল্লাহতালার দরবারে পেশ করা হয়। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা, উম্মে সালমাহ, আবু হোরায়রা ও ইবনে আব্বাসের শাগরেদ বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত আতা ইবনে আবী রাবাহ (عطاء ابن ابى رباح) এর বর্ণনায় এসেছে যে, ‘আমীন হচ্ছে একটি দোয়া’ (آمين دعاء)। সহীহ বুখারী ১/১০৭ দ্রষ্টব্য। আর আল্লাহ (নাউযুবিল্লাহ) না বধির, না অনুপস্থিত—যেমনটি বুখারী শরীফেও এসেছে যে, لا تدعون أصمَّ ولا غائباً অর্থাৎ ‘তোমরা কোনো বধির কিংবা অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছো না।’ (সহীহ বুখারী হাদীস নং ৭৩৮৬)। তাই গবেষকদের বিশাল একটি অংশ মনে করেন, দোয়া যখন আস্তে করাই উত্তম, তখন নামাযে ‘আমীন’ও আস্তে বলা উত্তম। আর সজোরে বলা বড়জোর মুবাহ, যেহেতু বিভিন্ন রেওয়ায়েত বলছে, সজোরে ‘আমীন’ বলা শিক্ষাদানের জন্যই ছিল (ما اراه الا ليعلمنا), Just as a Teaching, Not Continuously; নও মুসলিম হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.) বলেন, ثلاث مرات অর্থাৎ রাসূল (সা.) ‘আমীন’ সজোরে তিনবার বলেছেন। এখন তো ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়ে গেল! যাইহোক, আমি এখানে আস্তে ‘আমীন’ বলার একটি মাত্র রেওয়ায়েত পেশ করছি,

হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, إذا أمَّنَ الإمام فأمِّنوا অর্থাৎ ইমাম যখন ‘আমীন’ বলবে তখন তোমরাও আমীন বলো (তবে এ থেকে সজোরে না আস্তে—এর কোনোটাই পরিষ্কার করে বোঝা যায়না-লিখক)। فإنه مَن وافَقَ تأمينُه تأمينَ الملائكة غُفِرَ له ما تقدَّم من ذنبه অর্থাৎ কেননা যার ‘আমীন’ বলা ফেরেশতাদের ‘আমীন’ বলার সাথে মিলে যাবে তার পেছনের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (সহীহ বুখারী, মুসলিম, কিতাবুস সালাত)।

প্রশ্ন আসতে পারে যে, তাহলে এই হাদীস আস্তে আমীন বলার সমর্থনে দলিল কিভাবে হল?

উত্তর এই যে, হাদীসটিতে বলা হয়েছে—ইমাম যখন আমীন বলবে…. (إذا أمَّنَ الإمام)। তাই এখন দেখতে হবে যে, এই বর্ণনানুসারে ইমামের (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ’র) ‘আমীন’ জোরে ছিল, না আস্তে ছিল! সহীহ মুসলিম এবং সুনানে আবুদাউদ শরীফে উক্ত হাদীসের রাবী (বর্ণনাকারী) শিহাব ইবনে জুহরীর রেওয়ায়েত শেষে পরিষ্কার করে এই বাক্যটিও বর্ণিত হয়েছে যে, و كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول آمين অর্থাৎ ‘আর রাসূল (সা.)ও আমীন বলতেন।’ এখন এখানে প্রশ্ন আসে, এই হাদীসের إذا أمَّنَ الإمام (ইমাম যখন আমীন বলবে) দ্বারা রাসূল (সা.)ও আমীন ‘উঁচু আওয়াজে’-ই বলতেন, এমনটা বুঝালে তবে ইমাম জুহরী (রহ.) সেটিকে স্বতন্ত্র বাক্যে পুনরায় উল্লেখ করার কী অর্থ? অতএব, বুঝা যায় যে নিশ্চয়ই রাসূল (সা.)-এর ‘আমীন’ বলাটা সজোরে ছিলনা। অন্যথা রাবীর এমন কর্মকে تحصيل حاصل (তাহছীলে হাছেল) বা পুনঃবৃত্তি (tautology) বলতে হয়, যা ব্যাকরণের নীতিবিরুদ্ধ ও নিন্দনীয়। হযরত সামুরা ইবনুল জুনদুব (রা.) এবং হযরত ইমরান ইবনুল হোসাইন (রা.) দুইজন একবার হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর নিকট গেলেন। সামুরা (রা.) হাদীস বর্ণনা করে বললেন যে, রাসূল (সা.) নামাযে তাকবীরে তাহরিমার পরে এবং ‘ওয়ালাদ-দাললীন” (ولا الضالين)-এর পরেও কিছু সময় চুপ থাকতেন। হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) শুনলেন এবং সামুরা (রা.)-এর রেওয়ায়েতের সাথে সহমত ব্যক্ত করলেন। তিনি বললেন, সামুরার স্মরণই যথার্থ। (আস-সুনানুল কোবরা লিল বায়হাক্বী খণ্ড নং ২, কিতাবুস সালাত; হাদীস নং ৩০৭৫)। এই থেকেই পরিষ্কার বুঝা যায় যে, রাসূল (সা.)-এর ‘ওয়ালাদ-দাললীন” (ولا الضالين)-এর পরেও চুপ থাকতেন মানে তিনি ‘আমীন’ নিঃশব্দে বলতেন। অতএব, সহীহ বুখারীর হাদীসের অস্পষ্ট বিবরণ ও সাহাবীর সুস্পষ্ট সাক্ষ্য সহ প্রমাণিত হয় যে, নামাযে ‘আমীন’ আস্তে বলার দলিলও খুব শক্তিশালী। এমন শক্তিশালী দলিল পেয়ে এবার আপনার নিশ্চয়ই মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে, তাই নয় কি? হ্যাঁ, সত্য এটাই; যা ব্যাপক পড়াশোনা না থাকার দরুন আমাদের অধিকাংশই জানত না।

এই পর্যায় উল্লেখ করা জরুরি যে, ‘আমীন’ বলার যতগুলো সহীহ হাদীস রয়েছে সেগুলোর একটিও ‘সজোরে’ বলার মর্মে সরীহ বা সুস্পষ্ট নয়, বরং অস্পষ্ট। আবার যেগুলো সরীহ—দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সেগুলো সনদের বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনা।

শেষকথা, উত্তম-অনুত্তম বিষয়ক রেওয়ায়েত নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা থেকে সবাই বিরত থাকতে হবে। যেখানে দুই দিকেরই সহীহ রেওয়ায়েত বিদ্যমান সেখানে উভয় রেওয়ায়েতের উপরই উম্মাহার বৈচিত্র্যময় আমল জারি থাকুক, এই প্রত্যাশা। তবে যেই সমাজে-এলাকায় পূর্ব থেকে যেটি চালু রয়েছে সেখানে সেটির মুকাবিলায় অন্যটিতে জোর না দিই। নচেৎ ফেতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার আপনাকেই নিতে হবে, উম্মাহার মাঝে দলাদলি সৃষ্টির গুনাহও আপনাকেই বহন করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সহীহ বুঝ দিন।

নামাযে রাফউল ইয়াদাইন (ফেইসবুক থেকে)

সজোরে বা আস্তে ‘আমীন’ বলা প্রসঙ্গে (ফেইসবুক থেকে)

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

Previous articleনামাযে রাফউল ইয়াদাইন করার হুকুম
Next articleনামাযে কোথায় হাত বাঁধা উত্তম?
প্রিয় পাঠকবৃন্দ! এটি সম্পূর্ণ দ্বীনি ও অলাভজনক একটি ওয়েবসাইট। প্রতি বছর এটির ডোমেইন ও হোস্টিং ফি হিসেবে আমাকে এর ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। যদি উক্ত ব্যয় বহন করতে অপারগ হই তাহলে এই সাইটটি নিশ্চিত বন্ধ হয়ে যাবে। সেহেতু আপনাদের সবার নিকট আবেদন থাকবে যে, আপনারা সাইটটির উক্ত ব্যয় বহনে এতে বিজ্ঞাপন দিতে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করবেন এবং নিজেরাও সহযোগিতায় এগিয়ে আসবেন। বিনীত এডমিন! বিকাশ : ০১৬২৯-৯৪১৭৭৩ (পার্সোনাল)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here