বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আহমদীয়া মুসলিম (?) জামাত তথা কাদিয়ানী সম্প্রদায় অমুসলিম হওয়ার কারণ
আল্লাহ তায়ালার নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্ম হলো ইসলাম। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম আল্লাহ তাআলার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামের সর্বপ্রথম শিক্ষাই হলো ঈমান ও আকীদা। নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা যে দ্বীন ও শরীয়ত এবং কুরআন ও সুন্নাহ দিয়েছেন, এককথায় তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু পেশ করেছেন সব কিছু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা এবং নিঃসংকোচে মেনে নেওয়া, এর নামই ঈমান এবং এর নামই হল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা। যে ব্যক্তি দ্বীনে ইসলামের কোনো স্বতঃসিদ্ধ, সর্বজনবিদিত ও যুগ পরম্পরায় প্রতিষ্ঠিত কোনো বিষয়কে অস্বীকার করবে বা তার স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত অর্থের বিপরীত কোনো অর্থ করবে সে কাফের ও বেঈমান।
মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ও তার অনুসারী কাদিয়ানী সম্প্রদায় দ্বীনের অনেক স্বতঃসিদ্ধ ও সর্বজনবিদি বিষয় অস্বীকার করে নিজেরাই মুসলিম উম্মাহ থেকে আলাদা হয়ে গেছে। ইসলামের সাথে যে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই তা তাদের গুরুরা (পাদ্রীরা) স্পষ্টভাবেই স্বীকার করেছে। এ বিষয়ে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর একটি বক্তব্য তার বড় ছেলে (কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় খলিফা) মির্যা বশীর উদ্দিন মাহমুদ এভাবে উদ্ধৃত করেছে যে,
“হযরত মাসীহে মাওউদ (মির্যা কাদিয়ানী) তো সত্য বলেছেন, তাদের ইসলাম ভিন্ন আর আমাদের ইসলাম ভিন্ন। তাদের খোদা ভিন্ন আর আমাদের খোদা ভিন্ন। আমাদের হজ্জ ভিন্ন আর তাদের হজ্জ ভিন্ন। এমনিভাবে প্রতিটি বিষয়ে তাদের (তথা অ-আহমদীদের) সাথে আমাদের পার্থক্য রয়েছে।” – কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের মুখপত্র দৈনিক আল ফযল তারিখ ২১ আগস্ট ১৯১৭ ইং, পৃ.৮ কলাম নং ১।
কাদিয়ানী সম্প্রদায় কাফের হওয়ার মৌলিক কিছু কারণ
এক. খতমে নবুওয়াতের আকীদা অস্বীকার ও মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী কর্তৃক নবুওয়াতের মিথ্যা দাবি করা :
দ্বীনে ইসলামের অন্যতম মৌলিক আকীদা হলো, খতমে নবুওয়াতের আকীদা। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুক্ত ও স্বাধীন শেষনবী। তাঁর পরে কাউকে নবুওয়াত দান করা হবে না। আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নবুওয়াতের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন।
মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ‘খতমে নবুওয়াতে’র এই মৌলিক আকীদাকে অস্বীকার করে ১৯০১ সালে সরাসরি নবুওয়াত দাবি করে। নিচে তার নবুওয়াত দাবির দু’টি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হলো-
“আমি ওই খোদার কসম করে বলছি, যার হাতে আমার জীবন, তিনিই আমাকে পাঠিয়েছেন এবং তিনিই আমার নাম নবী রেখেছেন।” – তাতিম্মায়ে হাকীকাতুল ওহী, রূহানী খায়ায়েন ২২/৫০৩ (মির্যা কাদিয়ানীর রচনাসমগ্র)।
“আল্লাহর আদেশ মোতাবেক আমি একজন নবী। আমি এই দাবী অস্বীকার করলে আমার পাপ হবে। যেহেতু আল্লাহ আমাকে নবী নাম দিয়েছেন আমি তা কিভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারি। আমি মরণ পর্যন্ত এই বিশ্বাস আঁকাড়ে থাকব।” – নবুয়ত ও খিলাফত (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ৭৬ ; বাংলাদেশের কাদিয়ানীদের মূলকেন্দ্র বকশী বাজার, ঢাকা থেকে প্রকাশিত; আরও দেখুন, মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত ২/৭২৫।
দুই. মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী কর্তৃক নিজেকে স্বয়ং মুহাম্মাদূর রাসূলুল্লাহ দাবি করা :
মির্যা কাদিয়ানীর দাবি, সে স্বয়ং মুহাম্মাদূর বাসুলুল্লাহ। তার মাঝে স্বয়ং মুহাম্মাদূর রাসূলুল্লাহর সত্তা বিরাজমান। গোটা কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের আকীদা ও বিশ্বাস হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে দুইবার আবির্ভূত হয়েছেন। প্রথমবার মক্কায়, দ্বিতীয়বার কাদিয়ানে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর স্বরূপে।। (নাউযুবিল্লাহ)
মির্যা কাদিয়ানী লিখেছে,
“এর মধ্যে আমার নিজস্ব সত্তা নেই, পরন্তু মুহাম্মদ (সঃ) বিরাজমান। এ কারণে আমার নাম মুহাম্মদ (সঃ) এবং আহমদ (সঃ) হয়েছে। সুতরাং নবুওয়াত এবং রেসালাত অপর কারও নিকট গেল না, মুহাম্মদ (সঃ)-এর বস্তু মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট রইল।” – একটি ভুল সংশোধন (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ১৫ (বাংলাদেশে কাদিয়ানীদের মূলকেন্দ্র বকশী বাজার, ঢাকা হতে অনূদিত)।
মির্যা কাদিয়ানীর মেজো ছেলে মির্যা বশীর আহমদ এম. এ লিখেছে,
“সুতরাং মাসীহে মাওউদ (মির্যা কাদিয়ানী) স্বয়ং মুহাম্মাদূর রাসুলুল্লাহ। ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে আগমন করেছেন।” – কালিমাতুল ফসল পৃষ্ঠা নং ৬৬, মির্যাপুত্র বশীর আহমদ এম.এ রচিত।
তিন. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবমাননা করা :
কাদিয়ানী সম্প্রদায় কাফের হওয়ার বড় একটি কারণ হলো রাসূল (সা.) এর অবমাননা করা। মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী অত্যন্ত জঘন্য পন্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে বেয়াদবী করেছে। এ বিষয়ে অনেক প্রমাণ রয়েছে। মির্যা কাদিয়ানী তার বইপত্রের বিভিন্ন স্থানে দাবি করেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য তার মাঝে বিদ্যমান। (নাউযুবিল্লাহ) মির্যা কাদিয়ানী এক জায়গায় বলেছে-
“বিচ্ছিন্নভাবে সকল নবীর মাঝে যে গুণ-বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল তার সমষ্টি আরও অধিকহারে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে বিদ্যমান ছিল। এখন ঐ সকল গুণ-বৈশিষ্ট্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিচ্ছায়ারূপে আমাকে দেওয়া হয়েছে।” – মালফুযাত (মির্যা কাদিয়ানীর বাণী সংকলন) খন্ড ২ পৃষ্ঠা ২০১ নতুন সংস্করণ।
এ কারণে কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের নিকট রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মির্যা কাদিয়ানীর মর্যাদা একেবারে বরাবর। বিষয়টি উল্লেখ করতে গিয়ে তারা তাদের মুখপত্র ‘দৈনিক আল ফযল’ পত্রিকায় এভাবে লিখেছে –
“আল্লাহ তায়ালার নিকট হযরত মসীহে মওউদের (তথা মির্যা কাদিয়ানীর) সত্তাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই সত্তা। অর্থাৎ আল্লাহর খাতায় হযরত মাসীহে মাওউদ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে কোনো বৈপরীত নেই, বরং উভয়ের একই অবস্থান, একই মর্তবা, একই মর্যাদা ও একই নাম। শাব্দিকভাবে দুইজন মনে হলেও বাস্তবে একজন।” – কাদিয়ানীদের মুখপত্র দৈনিক আল ফযল, আরিখ ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯১৫ ইং, পৃষ্ঠা ৭ কলাম ২।
চার, নবীগণের শানে চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করা :
মির্যা কাদিয়ানী হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে লিখেছে,
“ইউরোপের লোকদের মদ যত অনিষ্ট করিয়াছে, তাহার কারণ এই যে, ঈসা (আ.) মদ্যপান করিয়াছেন।” – কিশতিয়ে নূহ (বাংলা অনূদিত) পৃষ্ঠা নং ৮৭ সপ্তম সংস্করণ।
“হযরত ঈসা আলাইহিসরালাম নিজে নৈতিক শিক্ষার ওপর আমল করেননি। আঞ্জির (ডুমুর) গাছ ফলবিহীন দেখে তার ওপর বদ-দোয়া করেছেন। অথচ অন্যদেরকে দোয়া করতে শিখিয়েছেন। অন্যদেরকে এ আদেশও করেছেন যে, তোমরা কাউকে আহমক (বোকা) বলবেনা। অথচ নিজে মুখ-খারাপে এতটাই লাগামহীন হয়ে পড়েছেন যে, ইহুদীদের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গকে হারামজাদা পর্যন্ত বলে ছেড়েছেন। তিনি প্রতিটি ওয়াজে ইহুদী উলামাদেরকে কঠিন কঠিন গালি দিয়েছেন এবং তাদের বিভিন্ন খারাপ নাম রেখেছেন। নৈতিক শিক্ষকের জন্য ফরজ প্রথমে নিজে উত্তম চরিত্র দেখানো।” – চশমায়ে মাসীহী, রূহানী খাযায়েন ২০/৩৪৬; (মির্যা কাদিয়ানীর রচনাসমগ্র)।
পাঁচ, কাদিয়ানী সম্প্রদায় কর্তৃক কালিমায়ে তায়্যিবাকে অস্বীকার করা :
কাদিয়ানী সম্প্রদায় কালিমা তায়্যিবা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” এর শব্দ-বাক্য ঠিক রেখে তার অর্থ ও মর্মের মাঝে চরম বিকৃতি ঘটিয়ে তারা মূলত কালিমা তায়্যিবাকেই অস্বীকার করেছে। যেহেতু মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী নিজেকে স্বয়ং মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ দাবি করেছে, তাই কাদিয়ানীরা কালিমার মাঝে ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ বলে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে উদ্দেশ্য নেয়। কাদিয়ানীরা মির্যা কাদিয়ানীকে নবী মানা সত্ত্বেও তার কালিমা না গড়ে মুসলমানদের মতোই কালিমা কেন পড়ে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে মির্যা কাদিয়ানীর মেঝো ছেলে মির্যা বশীর আহমদ এম.এ লিখেছে,
“সুতরাং মাসীহে মওউদ (তথা মির্যা কাদিয়ানী) স্বয়ং মুহাম্মাদূর রাসূলুল্লাহ। ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে আগমন করেছেন। অতএব আমাদের নতুন কোনো কালিমার প্রয়োজন নেই। তবে মুহাম্মাদূর রাসূলুল্লাহর পরিবর্তে অন্য কারও আগমন ঘটলে নতুন কালিমার প্রয়োজন হত।” – কালিমাতুল ফসল পৃষ্ঠা ৬৮।
ছয়. বিশ্বের সকল মুসলমানকে কাফের আখ্যা দেওয়া :
কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের আকীদা ও বিশ্বাস হলো, যারা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর উপর ঈমান আনবে না তারা সকলেই কাফের ও বেঈমান। তাদের পেছনে নামায পড়া জায়েয নেই, তাদের কাছে মেয়ে বিবাহ দেয়া জায়েয নেই। তাদের জানাযা পড়াও জায়েয নেই। (নাউযুবিল্লাহ)। মির্যা কাদিয়ানীর একটি বক্তব্য লক্ষ্য করুন,
“আল্লাহ তায়ালা আমাকে জানিয়েছেন, যে ব্যক্তির নিকট আমার দাওয়াত পৌঁছলো কিন্তু সে আমাকে গ্রহণ করল না সে মুসলমান না।” – তাযকিরাহ পৃষ্ঠা ৫১৯ (চতুর্থ এডিশন), হাকীকাতুল ওহী (বাংলা) পৃষ্ঠা ১৩০।
মির্যা বশীর আহমদ এম.এ (মির্যা কাদিয়ানীর মেজো ছেলে) লিখেছে,
“প্রত্যেক ওই ব্যক্তি যে মুসাকে মানে কিন্তু ঈসাকে মানে না, অথবা ঈসাকে মানে কিন্তু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মানে না, অথবা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মানে কিন্তু মাসীহে মাওউদকে (তথা মির্যা কাদিয়ানীকে) মানে না, সে শুধু কাফের নয় বরং পাক্কা কাফের এবং ইসলামের গণ্ডিবহির্ভূত।” – কালিমাতুল ফসল পৃষ্ঠা ২০।
ওপরে অতি সংক্ষেপে কদিয়ানীদের অমুসলিম হওয়ার মৌলিক কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হলো। এ জাতীয় আরো অনেক উদ্ধৃতি রয়েছে যা প্রমাণ করে কাদিয়ানীরা নিকৃষ্টতম কাফের। তাই আসুন এই ভয়াবহ কুফুরী ফেতনা সম্পর্কে নিজেরা সচেতন হই এবং অন্যকে সচেতন করি। কোনো মুসলমান ভাই যেন কাদিয়ানীদের খপ্পরে পড়ে ঈমানহারা না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলের ঈমানকে হেফাজত করুন, আমীন।
সার্বিক যোগাযোগ :
তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত প্রকাশনী
হযরতপুর, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা-১৩১৩
মোবাইল: 01646-373084 (আসরের পর থেকে মাগরিব, রাত ৯ টার পর থেকে ১০ টার মধ্যে কল দেয়ার অনুরোধ)।