প্রশ্ন : ইজমায়ে সাহাবা তথা সাহাবায়ে কেরামগণের সর্বসম্মত আমল অনুসারে তারাবীহ কত রাকাত পড়া সাব্যস্ত? তাহকীক সহ লিখুন।
উত্তর : সাহাবায়ে কেরামগণের সর্বসম্মত আমল অনুসারে তারাবীহ বিশ (২০) রাকাত পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। তবে ওজর-বশত এ সংখ্যায় কমবেশি করাও জায়েজ। কেননা রাসূল (সা.) থেকে এই সালাতের সুনির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত কোনো রাকাতের উল্লেখ পাওয়া যায় না। কিন্তু হযরত উমর (রা.) এর যুগে জামাতের সাথে ২০ রাকাত পড়ার নিয়মটি চালু হয় এবং পরবর্তীতে সমগ্র উম্মতে মুহাম্মদীয়ার মধ্যে এই নিয়মটি প্রতিষ্ঠিত ও ব্যাপক আমল হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
(ক) উমর (রা.)-এর আমল :
ইমাম মালেক (রহ.) মুয়াত্তা-তে বর্ণনা করেছেন,
رَوَى الْإِمَامُ مالك بن أنس فِي الموطأ فَقَالَ: حَدَّثَنِي يَحْيَى عَنْ مَالِكٍ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يُوسُفَ، عَنْ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ أَنَّهُ قَالَ:
أَمَرَ عمر بن الخطاب بْنُ الْخَطَّابِ أبي بن كعب وَتميم الداري أَنْ يَقُومَا لِلنَّاسِ بِإِحْدَى وَعِشْرِينَ رَكْعَةً
বাংলা অনুবাদ : “হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) উবাই ইবনে কা‘ব ও তামীম আদ-দারীকে লোকদের নিয়ে একুশ রাকাত (তারাবীহ ২০+ বিতর ১) পড়াতে নির্দেশ দেন।”
রাবীদের অবস্থা :
(১) ইয়াহইয়া (ইয়াহইয়া ইবন ইয়াহইয়া আল-লাইসি) –
ইমাম মালিকের নির্ভরযোগ্য ছাত্র। একজন
ছিকাহ (বিশ্বস্ত) রাবী।
(২) ইমাম মালিক (রহ.) –
তিনি ইমাম, হাফিয, সর্বসম্মতভাবে সিকাহ।
(৩) মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ (মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ আল-ফিরিয়াবি নন; এখানে মাদানী রাবী) –
অধিকাংশ মুহাদ্দিসের নিকট তিনিও একজন সিকাহ রাবী।
(৪) সায়িব ইবন ইয়াযীদ (রা.) –
তিনি একজন সাহাবী, আর সাহাবীর বর্ণনা স্বীকৃত (সকল সাহাবী আদিল তথা ন্যায়পরায়ণ)।
হাদীসের মান :
এই বর্ণনাটি মাওকূফ (সাহাবীর বক্তব্য/কর্ম) — কারণ এটি عمر بن الخطاب (রা.)-এর নির্দেশ সংক্রান্ত।
সনদটি সহীহ (صحيح) — কারণ সকল রাবী সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য এবং সনদ মুত্তাসিল (সংযুক্ত)। ইমাম বায়হাক্বী (রহ.) একে সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন। ইবনু আবী শাইবাহ (রহ.)-এর রেওয়ায়েতেও এর সমর্থন পাওয়া যায়।
(খ) ইমাম বায়হাক্বীর ‘আস সুনানুল কোবরা লিল-বায়হাক্বী’ গ্রন্থে হযরত ইয়াযীদ ইবনে সায়িব (রা.) থেকে, (সনদ সহ) নিম্নরূপ,
رَوَاهُ الْإِمَامُ البيهقي فَقَالَ: أَخْبَرَنَا أَبُو عَبْدِ اللَّهِ الْحُسَيْنُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ الْحُسَيْنِ بْنِ فَنْجُوَيْهِ الدِّينَوَرِيُّ بِالدَّامِغَانِ، ثَنَا أَحْمَدُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَاقَ السُّنِّيُّ، أَنْبَأَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ الْبَغَوِيُّ، ثَنَا عَلِيُّ بْنُ الْجَعْدِ، أَنْبَأَ ابْنُ أَبِي ذِئْبٍ، عَنْ يَزِيدَ بْنِ خُصَيْفَةَ، عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ قَالَ: كَانُوا يَقُومُونَ عَلَى عَهْدِ عمر بن الخطاب رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً. قَالَ: وَكَانُوا يَقْرَءُونَ بِالْمِئِينَ، وَكَانُوا يَتَوَكَّؤُونَ عَلَى عِصِيِّهِمْ فِي عَهْدِ عثمان بن عفان رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ مِنْ شِدَّةِ الْقِيَامِ.
বাংলা অনুবাদ : ইবনে আবী যি’ব থেকে, তিনি ইয়াযীদ ইবনে খুসায়ফা থেকে তিনি ইয়াযীদ ইবনে সায়িব (রা.) থেকে….হযরত উমর (রা.)-এর যুগে রমযান মাসে লোকজন বিশ রাকাত তারাবীহ আদায় করতেন। তিনি আরও বলেন, তাঁরা সালাতে শতাধিক আয়াত বিশিষ্ট সূরা সমূহ পড়তেন এবং উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর যুগে দীর্ঘ সালাতের কারণে তাদের (কেউ কেউ) লাঠিসমূহে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন। (আস সুনানুল কোবরা লিল-বায়হাক্বী ২/৪৯৬, মুসনাদে ইবনে জা’দ হাদীস নং ২৮২৫)।
সনদের মান :
ইমাম তকি উদ্দীন সুবকি, ওলীউদ্দীন ইরাকী, বদরুদ্দীন আইনী, সুয়ূতী, ইমাম নববী এমনকি আধুনিক যুগের মুহাদ্দিস আলবানী প্রমুখ সবার মতে হাদীসটির সনদ সহীহ। (শারেহে মুসলিম ইমাম নববীর ‘আল মাজমু শারহুল মুহায্যাব’ ৩:৫২৭, সালাতুত তারাবীহ লিল আলবানী, পৃষ্ঠা ৫০ দ্রষ্টব্য)।
(গ) বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত ইয়াযীদ ইবনে রুমান (রহ.) বলেছেন,
حَدَّثَنِي يَحْيَى عَنْ مَالِكٍ، عَنْ يَزِيدَ بْنِ رُومَانَ أَنَّهُ قَالَ
كَانَ النَّاسُ يَقُومُونَ فِي زَمَانِ عمر بن الخطاب فِي رَمَضَانَ بِثَلَاثٍ وَعِشْرِينَ رَكْعَةً.
বাংলা অনুবাদ : “উমর (রা.)-এর যুগে মানুষ ২৩ রাকাত (২০ তারাবীহ + ৩ বিতর) পড়তেন।” (اسناده صحيح مع الانقطاع)। (মুয়াত্তা মালিক হা/৪০, বায়হাক্বী ২:৪৯৬, ফাতহুল বারী শরহে বুখারী, ৪র্থ খন্ড পৃষ্ঠা নং ৩১৬)।
সনদের অবস্থা:
ইয়াযীদ ইবনে রুমান (রহ.) একজন তাবেয়ী। তিনি সরাসরি উমর (রা.)-এর সাক্ষাৎ পাননি। তাই এটি মুরসাল (مرسل) রেওয়ায়েত। কিন্তু এ রেওয়ায়েতটি মুরসাল হলেও একাধিক উৎস সমর্থন করায় যেমন বায়হাক্বী, ইবনু আবী শায়বাহ, ইমাম মালিকের মুয়াত্তা ইত্যাদি একত্রিত হয়ে এ উৎসটিকে শক্তিশালী করেছে।
মুরসাল রেওয়ায়েতের হুকুম:
‘মুরসাল‘ হাদীস এককভাবে প্রমাণযোগ্য নয়, কারণ সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। তবে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.) প্রমুখ ফুকাহা শর্তসাপেক্ষে মুরসাল গ্রহণ করেছেন। যদি একাধিক সূত্রে সমর্থন থাকে (متابعات/شواهد), অথবা বিষয়টি ঐতিহাসিক ঘটনা হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং প্রমাণশক্তি বৃদ্ধি পায়। ইমাম ইবনু আব্দিল বার (রহ.) তারাবীহ এর রাকাত সংখ্যা সংক্রান্ত মুরসাল বর্ণনাটি সম্পর্কে লিখেছেন,
قالَ إِمَامُ ابْنُ عَبْدِ الْبَرِّ: وَإِنْ كَانَ هَذَا الْحَدِيثُ مُرْسَلًا، فَإِنَّهُ مَدْعُومٌ بِأَمَلِ الْأُمَّةِ وَغَيْرِهَا مِنَ الْآثَارِ، وَقَدْ قَبِلْتُهُ كَأَمَلٍ مُؤَسَّسٍ تَارِيخِيًّا.
অর্থাৎ ইমাম ইবনু আব্দিল বার (রহ.) লিখেছেন “যদিও এই হাদীস মুরসাল, তবুও এটি উম্মাহর আমল ও অন্যান্য আসার দ্বারা সমর্থিত। আর আমি এটিকে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত আমল হিসেবে গ্রহণ করেছি।”
ইমাম নববী ‘আল-মাজমু‘-এ বলেছেন,
قالَ إِمَامُ النَّوَوِيُّ فِي الْمَجْمُوعِ: إِنَّ صَلَاةَ التَّرَاوِيحِ عِشْرُونَ رَكْعَةً فِي زَمَانِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ مُقَرَّرَةٌ، وَقَدْ بَلَغَتْ مَسْتَوَى إِجْمَاعِ الصَّحَابَةِ، وَرَأَى كَثِيرٌ مِنَ الْعُلَمَاءِ ذَلِكَ.
অর্থাৎ উমর (রা.) এর যুগে তারাবীহ ২০ রাকাত প্রতিষ্ঠিত ছিল, এবং এটি সাহাবায়ে কেরামের ইজমার পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে অনেক আলেম মত দিয়েছেন।
ইমাম ইবনু কুদামাহ হাম্বলীও একই উক্তি ব্যক্ত করেছেন। যেমন তার সম্পর্কে উদ্ধৃত হয়েছে যে,
وَقَالَ إِمَامُ ابْنُ قُدَامَةَ فِي كِتَابِ الْمُغْنِي: وَقَدْ اعْتُمِدَتْ صَلَاةُ التَّرَاوِيحِ عِشْرُونَ رَكْعَةً كَعَمَلٍ مَقْبُولٍ وَمُتَعَاوَدٍ.
অর্থাৎ ইমাম ইবনু কুদামাহ হাম্বলী ‘আল-মুগনী’ কিতাবে লিখেছেন, “২০ রাকাত তারাবীহই গ্রহণযোগ্য ও প্রচলিত আমল হিসেবে নির্ধারিত।”
(ঘ) মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবাহ গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে,
حَدَّثَنَا وَكِيعٌ، عَنْ حَسَنِ بْنِ صَالِحٍ، عَنْ أَبِي الْحَسَنِ
أَنَّ علي بن أبي طالب رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَمَرَ رَجُلًا يُصَلِّي بِالنَّاسِ فِي رَمَضَانَ عِشْرِينَ رَكْعَةً.
অর্থাৎ “আলী (রা.) রমযানে একজনকে লোকদের নিয়ে বিশ (২০) রাকাত পড়াতে নির্দেশ দেন।”
সনদ বিশ্লেষণ :
এর সনদ ‘মুনকাতে’ তথা সূত্রে রাসূল (সা.) এর সরাসরি সংযোগ নেই। তাই বর্ণনার উক্ত টেক্সট (Text) এককভাবে অথেনটিক না হলেও উম্মাহর আমল বা অন্যান্য সহীহ সনদ দ্বারা সমর্থিত থাকায় এটি ‘প্রমাণ’ হিসেবে গণ্য। বিশেষ করে মালিকি, হাম্বলি ও হানাফি মাযহাবের আলেমদের মধ্যে এটি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
(ঙ) চার মাযহাবের অবস্থান হিসেবেও যদি বলা হয় তাহলে বলা যায় যে, হানাফী মাযহাব মতে, ২০ রাকাত এবং মালিকি মাযহাব মতেও ২০ রাকাত (কিছু স্থানে ৩৬), ইমাম শাফেয়ীর মাযহাবে ২০ রাকাত, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের মাযহাবেও ২০ রাকাত (অধিক পড়াও জায়েজ)। অতএব, ২০ রাকাত হলো সাহাবী ও তাবেয়ীদের যুগের ব্যাপকভাবে প্রচলিত আমল, এবং উম্মাহর জমহুর (অধিকাংশ) আলেমের মত।
(চ) শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) তারাবীহ এর কত রাকাত সুন্নাহ সে সম্পর্কে লিখেছেন,
إِنَّهُ قَدْ ثَبَتَ أَنَّ أبي بْنَ كَعْبٍ كَانَ يَقُومُ بِالنَّاسِ عِشْرِينَ رَكْعَةً فِي قِيَامِ رَمَضَانَ وَيُوتِرُ بِثَلَاثِ. فَرَأَى كَثِيرٌ مِنْ الْعُلَمَاءِ أَنَّ ذَلِكَ هُوَ السُّنَّةُ؛ لِأَنَّهُ أَقَامَهُ بَيْن الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَلَمْ يُنْكِرْهُ مُنْكِرٌ
বাংলা অনুবাদ : একথা প্রমাণিত যে, উবাই ইবনে কা’আব (রা.) রমযানে তারাবীহ-তে লোকদের নিয়ে বিশ (২০) রাকাত পড়তেন এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন। তাই অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত মতে এটাই ‘সুন্নত’। কেননা তিনি (উমর) মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণের উপস্থিতিতেই তা আদায় করেছিলেন, কেউ তাতে আপত্তি করেননি। (মাজমূ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়াহ ২৩:১১২)।
সর্বশেষ কথা হচ্ছে, তারাবীহ সালাতের রাকাত সংখ্যা রাসূল (সা.) থেকে চূড়ান্ত ছিলনা। তাই পরবর্তীতে হযরত উমর (সা.) সাহাবীদের ঐক্যমতে জামাতের সাথে বিশ রাকাত তারাবীহ প্রচলন করেন। মুজতাহিদ চারো ইমামের সকলেই উক্ত বিশ রাকাতের পদ্ধতিকে সমর্থন দিয়ে গেছেন।
প্রাসঙ্গিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেল। তারাবীহ কত রাকাত পড়া সুন্নাহ?
লিখক, মুহাম্মদ নূরুন্নবী এম.এ