হাফস ইবনু সোলাইমান ক্বারীকে ‘মিথ্যাবাদী’ ও ‘হাদিস জালকারী’ বলে অভিযুক্ত করার বিষয়ে
কিছু মানুষ বলে, আপনারা কীভাবে কুরআনের ক্বারী আবু উমর হাফস ইবন সুলাইমান আল-আসাদি আল-কুফী (রহ.) এর বর্ণনার উপর ভরসা করেন, অথচ ইবনু খারাশ তাকে মিথ্যাবাদী বলেছেন এবং বলেছেন যে, সে হাদিস জাল করত? যদি সে হাদিস জাল করে, তাহলে তার কিরাআত বর্ণনার উপর কীভাবে আস্থা রাখা যায়?
আমি ড. আব্দুল্লাহ আশ-শাহরীর একটি গবেষণা পড়েছি, যেখানে তিনি ইয়াহইয়া ইবনু মাঈনের পক্ষ থেকে হাফসকে ‘দুর্বল’ বলা ও মিথ্যাবাদী বলার বিষয়ে ভালো জবাব দিয়েছেন। কিন্তু ইবনু খারাশের এই অভিযোগ—যে হাফস হাদিস জাল করত—এর যথেষ্ট জবাব সেখানে পাইনি।
আরও বলা হয়, ইবনু খারাশ রাফেজি ছিলেন; আবার কেউ বলেন তিনি তা ছিলেন না। এ বিষয়ে মতভেদ আছে। যদি এই সন্দেহের বিস্তারিত জবাব দেয় এমন কোনো বই থাকে, অনুগ্রহ করে জানাবেন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর :
ইমাম হাফছ ইবনু সোলাইমান কুরআন তিলাওয়াতে নির্ভরযোগ্য ইমাম। কিন্তু হাদিস বর্ণনায় তিনি গ্রহণযোগ্য নন (দুর্বল)। তাকে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাবাদী বলা সঠিক নয়। একজন আলেম কোনো একটি বিষয়ে খুব পারদর্শী হতে পারেন, কিন্তু অন্য বিষয়ে দুর্বল হতে পারেন—এটি স্বাভাবিক।
ক্বারী হাফছ (রহ.)—এর পূর্ণ নাম হাফছ ইবনু সোলাইমান। পবিত্র কুরআনের কিরাআতের জগতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ তাঁর বর্ণিত কিরাআত “হাফছ ‘আন আছিম” (حفص عن عاصم) এর জন্য, যা বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।
ক্বারী হাফছ (রহ.)—এর সংক্ষিপ্ত পরিচয়:
পূর্ণ নাম: হাফছ ইবনু সোলাইমান আল-কুফি।
শিক্ষক: আছিম ইবনু আবি আন নাজুম।
সম্পর্ক: তিনি আসিম (রহ.)-এর সৎপুত্র (step-son) ও শিষ্য ছিলেন।
সময়কাল: প্রায় ৯০ হিজরি – ১৮০ হিজরি
ক্ষেত্র: কিরাআত (কুরআন তিলাওয়াতের পদ্ধতি)
তাওসীক্ব (توثيق) কী?
“তাওসীক্ব” বলতে বুঝায় কোনো বর্ণনাকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা, নির্ভরযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা—বিশেষ করে হাদিস বা কিরাআতের বর্ণনায়।
১. কিরাআতের ক্ষেত্রে হাফছ ইবনু সোলাইমানের মর্যাদা:
কিরাআতের ইমামগণ সর্বসম্মতিক্রমে হাফছ (রহ.)-কে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য মনে করেছেন।
ইমাম হাফিয যাহাবী (রহ.) বলেন: “হাফছ কিরাআতে সাবলীল ও নির্ভরযোগ্য (ثقة في القراءة)।”
ইমাম ইবনুল জাজারি (রহ.) উল্লেখ করেন: “তিনি কিরাআতে ইমাম আসিম (রহ.)-এর সবচেয়ে সঠিক ও নির্ভুল বর্ণনাকারী।” অর্থাৎ, কুরআনের তিলাওয়াত ও কিরাআতের ক্ষেত্রে তাঁর বর্ণনা অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য এবং বিশ্বজুড়ে অনুসৃত।
২. হাদিসের ক্ষেত্রে তার অবস্থান:
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। হাদিসবিদগণ যেমন, ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মা’ঈন, ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল প্রমুখ হাফছ (রহ.)-কে হাদিস বর্ণনায় দুর্বল (ضعيف) বলেছেন। এমনকি কেউ কেউ বলেছেন: “হাদিসে তিনি নির্ভরযোগ্য নন।” কারণ, হাদিস বর্ণনায় তাঁর ভুল (errors) ছিল। সংরক্ষণ (memory) ও নির্ভুলতার ঘাটতি ছিল।
হাফছ (রহ.)-এর তাওসীক্ব দ্বিমাত্রিক:
কুরআনের কিরাআতে তিনি শীর্ষস্থানীয় ও গ্রহণযোগ্য। কিন্তু হাদিসে গ্রহণযোগ্য নয় বা দুর্বল।
কেন এই পার্থক্য?
এটা ইসলামী জ্ঞানশাস্ত্রে অস্বাভাবিক নয়। অনেক আলেম এক ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও অন্য ক্ষেত্রে দুর্বল হতে পারেন। ক্বারী হাফছ (রহ.) কুরআনের তিলাওয়াত শেখা ও শেখানোর উপর বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন—যা তাঁকে সেই ক্ষেত্রে অনন্য করেছে।
সমালোচকদের যুক্তি হচ্ছে, একই রাবী এক ক্ষেত্রে নির্ভুল বর্ণনাকারী হলে তবে অন্য ক্ষেত্রেও তো একই মানের হওয়ার কথা! অথচ ইমাম ইবনু মা’ঈন ক্বারী হাফছকে ‘মিথ্যাবাদী’ও বলেছেন। এমতাবস্থায় ক্বারী হাফছ এর বর্ণিত কুরআনের কিরাআত গ্রহণযোগ্য হয় কী করে?
সমালোচকদের এই যুক্তিটা প্রথম দেখায় শক্তিশালী মনে হলেও, বাস্তবে এটি ইসলামী রিওয়ায়াত-শাস্ত্রের (হাদিস ও কিরাআত) মৌলিক নীতির সঙ্গে মেলে না। বিষয়টা পরিষ্কার করতে কয়েকটি স্তরে আলোচনা করা দরকার।
১. “এক ক্ষেত্রে নির্ভুল হলে সব ক্ষেত্রেই নির্ভুল”—এই ধারণা সঠিক নয়।
ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে (বিশেষ করে ‘ইলমুল হাদিস’ ও ‘ইলমুল কিরাআত’) একটি স্বীকৃত নীতি হলো, একজন বর্ণনাকারী এক বিষয়ে শক্তিশালী (ثقة) হতে পারেন, আবার অন্য বিষয়ে দুর্বল (ضعيف) হতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে,
ইমাম মালিক (রহ.) ফিকহে ইমাম, কিন্তু সব হাদিসে সর্বোচ্চ স্তরের হাফেজ নন। ইমামে আ’যম আবূ হানীফা (রহ.) ফিকহে শীর্ষস্থানীয়, কিন্তু হাদিসে তাঁর অবস্থান নিয়ে মতভেদ আছে। অর্থাৎ “সব ক্ষেত্রে একই মান”—এটা বাস্তবসম্মত বা শাস্ত্রসম্মত দাবি নয়।
২. কিরাআত বনাম হাদিস দুইটি আলাদা সিস্টেম।
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট।
কিরাআত (Qira’at) শেখানো হয় মুখে মুখে (oral transmission)। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সরাসরি তিলাওয়াত যাচাই করা হয়। একাধিক স্তরে তথা মুতাওয়াতির (متواتر) ভাবে কিরাআত সংরক্ষিত। তাই এখানে একজন ব্যক্তির দুর্বলতা পুরো সিস্টেমকে ভেঙে দেয় না।
অপরদিকে হাদিস (Hadith) বর্ণনা হয় ব্যক্তিগত সনদ (isnad) দিয়ে। একজন রাবীর ভুল পুরো হাদিসকে দুর্বল করতে পারে। তাই হাদিসে ব্যক্তির নির্ভুলতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৩. ইমাম ইবনু মা‘ঈনের বক্তব্য—প্রসঙ্গ ও ব্যাখ্যা:
ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) “কাযযাব” শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, জারহের কিছু শব্দ আছে যেগুলো কখনো literal অর্থে নয়, বরং রাবীর বর্ণনার অতি দুর্বলতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। (ফাতহুল বারী ও তাকরীবুত তাহযীবের আলোচনায় এ ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়)।
যাইহোক, ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মা’ঈন থেকে হাফছ ইবনু সোলাইমান সম্পর্কে “كذاب” (মিথ্যাবাদী) কথাটি উদ্ধৃত করা হয়। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই জারহ (criticism) হাদিসের ক্ষেত্রে, কিন্তু কিরাআতের ক্ষেত্রে নয়। একই ব্যক্তি কিরাআতে তাঁর প্রশংসাও করেছেন বা অন্তত সেই ক্ষেত্রে আপত্তি তোলেননি। সে হিসেবে এখানেও “كذاب” শব্দটি অতিশয় দুর্বল (very weak) বোঝাতেই ব্যবহৃত হয়েছে, সরাসরি ইচ্ছাকৃত মিথ্যুক সাব্যস্ত করতে নয়। তাই এটাকে সরাসরি “কিরাআত বিকৃত করেছেন”—এই সিদ্ধান্তে নিয়ে যাওয়া অতিরঞ্জন।
৪. হাফছ ‘আন আসিম—কেন গ্রহণযোগ্য রইলো? হাফছ ইবনু সোলাইমান (রহ.) এর বর্ণিত কিরাআত গ্রহণযোগ্য থাকার কারণ হলো,
(১) শুধু হাফছ একা নন। একই কিরাআত এসেছে আছিম ইবনু আবি আন নাজুম (Asim ibn Abi al-Najud) থেকেও। আছিম (রহ.)-এর আরও ছাত্র ছিলেন (যেমন: শু’বাহ ইবনু আয়্যাশ)। অর্থাৎ হাফছ এর প্রচলিত কিরাআত single-chain (খবরে ওয়াহিদ) এর মাধ্যমে হয়নি, বরং এটি একাধিক চেইনে প্রমাণিত। ফলে উক্ত কিরাআতের ভিত্তি খুবই সুদৃঢ় ও শক্তিশালী।
(২) মুতাওয়াতির কিরাআত:
ইমাম ইবনুল জাজারি (রহ.) স্পষ্টভাবে বলেছেন: “যে কিরাআত আরবি, রসমে উসমানি ও সহীহ সনদে প্রমাণিত—তা গ্রহণযোগ্য।” অধিকন্তু “হাফছ ‘আন আছিম” এই তিন শর্তই পূরণ করে।
(৩) উম্মাহর ইজমা (consensus):
শত শত বছর ধরে পুরো মুসলিম বিশ্ব এই কিরাআত তিলাওয়াত করছে—এটা নিছক একজন দুর্বল রাবীর উপর দাঁড়িয়ে নেই।
এখন হাফছ ইবনু সোলাইমান ক্বারীকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলার আরেকটি জবাব হচ্ছে,
ক্বারী হাফছকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে মূলত দুইজনের মাধ্যমে। একজন হলেন, ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন আর অপরজন হলেন, ইবনু খারাশ।
এখন ইয়াহইয়া ইবন মাঈন সম্পর্কে যদি বলি, তার থেকে তিন ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি “বিশ্বাসযোগ্য নন”। তিনি “কিছুই নন”। তিনি “মিথ্যাবাদী”। তবে গবেষণায় দেখা যায়, “মিথ্যাবাদী” বলার বর্ণনাটি দুর্বল সূত্রে এসেছে। শক্তিশালী বর্ণনা অনুযায়ী তিনি শুধু হাদিসে দুর্বল ছিলেন, এটুকু রয়েছে।
তারপর ইবনু খারাশের উক্তি সম্পর্কেও যদি বলি, তার বক্তব্যটি দুই কারণে গ্রহণযোগ্য নয়।
(ক) তার বক্তব্যের বর্ণনাটির সূত্র (সনদ) দুর্বল — এর সনদে অপরিচিত (مجهول) ব্যক্তি রয়েছে।
(খ) তিনি নিজেই পক্ষপাতদুষ্ট (রাফেজি) হিসেবে অভিযুক্ত। তিনি সাহাবীদের বিরুদ্ধে বই লিখেছেন বলেও প্রমাণ রয়েছে। তাই তার সমালোচনায় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
৫. সমালোচনার মূল ভুল কোথায়?
সমালোচকরা মূলত তিনটি ভুল করেছেন।
১. হাদিসের মানদণ্ড কিরাআতে প্রয়োগ করা। অথচ এই দুই শাস্ত্রের পদ্ধতি আলাদা।
২. একজন রাবীর উপর পুরো কিরাআত নির্ভর ধরে নেওয়া। বাস্তবে এটি সমষ্টিগত (collective transmission)।
৩. জারহের প্রসঙ্গ উপেক্ষা। “কাজ্জাব” আখ্যা দান সব ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য—এটা ভুল সাধারণীকরণ।
উপসংহার:
সমালোচকদের যুক্তি মূলত একটি ভুল অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে। “এক ব্যক্তি দুর্বল, তাই তার সব বর্ণনা বাতিল”। কিন্তু ইসলামী শাস্ত্রে বাস্তবতা হলো, ব্যক্তি নয়, পুরো ট্রান্সমিশন সিস্টেম বিবেচিত হয়। কিরাআত এসেছে মুতাওয়াতিরভাবে, শুধু হাফছের মাধ্যমে নয়। হাফছ (রহ.) কিরাআতে নির্ভুল—এটা ইমামদের স্বীকৃত। তাই হাফছ (রহ.)-এর হাদিসে দুর্বলতা থাকলেও, তার বর্ণিত কুরআনের কিরাআত অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়—এটা শাস্ত্রসম্মত সিদ্ধান্ত নয়।
লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী