ঈসা মসীহ এসে হজ্জ উমরাহ করবেন!
প্রশ্ন হল, শেষ যামানায় হযরত ঈসা মসীহ আকাশ থেকে দুনিয়ায় ফিরে এসে হজ্জ উমরাহ করবেন বলে সহীহ মুসলিম শরীফের একটি হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বর্ণনায় হজ্জ উমরাহ এর কথাগুলোয় ‘অথবা’ সংযোগ দ্বারাই রয়েছে। এর অন্তর্নিহিত কারণ সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর :
আপনার প্রশ্নটি খুব সূক্ষ্ম এবং মুহাদ্দিসরাও এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এভাবে ‘অথবা’ সংযোগ দ্বারা হাদীসে একাধিক সম্ভাব্যতার ইংগিত কয়েক কারণে থাকতে পারে। তেমনি এ হাদীসটিতে এসেছে—
حَاجًّا أَوْ مُعْتَمِرًا أَوْ لَيَثْنِيَنَّهُمَا
অর্থাৎ “হজ্জকারী অথবা উমরাহকারী অথবা উভয়ই করবেন।”
পুরো হাদীসটি এরকম, রাসূল (সা.) ঈসা (আ.) এর পুনরায় আগমনী ভবিষ্যৎবাণীতে ইরশাদ করেছেন,
وَالَّذِىْ نَفْسِىْ بِيَدِهِ لَيُهِلَّنَّ اِبْنُ مَرْيَمَ بِفَجِّ الرَّوْحَاءِ حَاجًّا اَوْ مُعْتَمِرًا اَوْلَيَثْنِيَنَّهُمَا
অর্থঃ “মরিয়মপুত্র ঈসা নিশ্চয়ই রাওহা উপত্যকায় হজ্জ্ব অথবা উমরাহ কিংবা উভয়েরই তালবিয়াহ পাঠ করবেন।”
এই বর্ণনাটি পাওয়া যায় সহীহ মুসলিমের ২৮৯৬ নম্বর হাদীসে। এটি বলেছেন হযরত মুহাম্মদ (সা.), যেখানে ভবিষ্যতে অবতরণকারী হযরত ঈসা মসীহ (আ.)-এর কথা বলা হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা :
ভবিষ্যতে কিয়ামতের আগে মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মতের মধ্যে হযরত ঈসা মসীহ (আ.) পুনরায় পৃথিবীতে অবতরণ করবেন। তখন তিনি ইসলামের শরীয়ত অনুযায়ী জীবনযাপন করবেন। এই হাদীসে বলা হয়েছে যে তিনি মক্কার পথে “রাওহা” (মক্কা এবং মদীনার মাঝামাঝি স্থান) নামক উপত্যকায় (পাহাড়ের মধ্যবর্তী রাস্তা) হজ্জ বা উমরাহ এর তালবিয়াহ (লাব্বাঈক আল্লাহুমা লাব্বাঈক) পাঠ করবেন। অর্থাৎ তিনি আল্লাহর ঘর মাসজিদুল হারামে হজ্জ বা উমরাহ আদায় করবেন।
গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা :
হাদীসটির আলোকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আ.) কেয়ামতের আগে আকাশ থেকে পৃথিবীতে নেমে আসবেন।
তিনি ইসলাম মেনে চলবেন এবং নবী মুহাম্মদ (সা.) এর শরীয়তের অনুসরণ করবেন।
তিনি হজ্জ ও উমরাহ একই ইহরামের সাথে একত্রে আদায় করবেন।
কেন ‘অথবা’ (أَوْ) ব্যবহার করা হয়েছে? এর উত্তরে
আলেমরা কয়েকটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন,
১️। বর্ণনাকারীর সন্দেহ (شكّ من الراوي)। অর্থাৎ হাদীসশাস্ত্রে অনেক সময় أو (অথবা) ব্যবহৃত হয় তখন যখন রাবী বা বর্ণনাকারী নিশ্চিত না হন যে, ঠিক কোন শব্দটি রাসূল (সা.) বলেছিলেন।
অর্থাৎ রাসূল (সা.) হয়তো নির্দিষ্ট করে বলেছেন, কিন্তু রাবী দ্বিধায় পড়ে ‘অথবা’ সংযোগে কয়েকটি বলেছেন। যেমন এ হাদীসটিতে রাবী তিনটি সম্ভাবনা উল্লেখ করেছেন। হজ্জ অথবা উমরাহ কিংবা উভয় একত্রে। এই ব্যাখ্যাটি অনেক মুহাদ্দিস গ্রহণ করেছেন। মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাকারক ইমাম নববী (রহ.) তাঁর শরহে মুসলিম গ্রন্থেও এটি উল্লেখ করেন।
২। সম্ভাব্যতার অর্থে কোনো কোনো আলেম এও বলেছেন যে, ঈসা (আ.) এমন সময় অবতরণ করবেন যখন হয়তো তিনি শুধু হজ্জ করবেন, হয়তো শুধু উমরাহ করবেন অথবা দুটোই করবেন। তার মানে ভবিষ্যতের কাজটি নিশ্চিতভাবে কোনো এক রূপে ঘটবে, কিন্তু কোনটি হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।
৩️। এ ক্ষেত্রে একাধিকবার ইহরাম গ্রহণের প্রতি ইঙ্গিতও হতে পারে। হযরত ঈসা মসীহ (আ.) হয়তো এক সফরে উমরাহ এবং পরে হজ্জ করবেন। তাই “অথবা উভয়ই” কথাটি এসেছে।
মোটকথা হচ্ছে, হাদীসের মতন বা মূল টেক্সটে “অথবা” ব্যবহারের প্রধান দুই ব্যাখ্যা হলো, রাবীর স্মরণে সামান্য সন্দেহ ছিল। অথবা ভবিষ্যতে কাজটি একাধিক সম্ভাব্য রূপে ঘটতে পারে এদিকে ইংগিত দেয়া। তবে মূল বিষয়টি নিশ্চিত। অর্থাৎ ঈসা (আ.) আকাশ থেকে অবতরণের পর তালবিয়া পাঠ করে হজ্জ বা উমরাহ কিংবা উভয়ের একত্রে ইহরাম বাঁধবেন। হজ্জের এ পদ্ধতির নাম হজ্জে কিরান।
লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী