মুসলমান এবং কাদিয়ানী বিতর্ক
বিষয় : কেবলা পরিবর্তনের ঘটনাকে গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর নিজেস্ব রায় পরিবর্তন করার প্রসঙ্গে টেনে আনা গ্রহণযোগ্য কতটুকু?
মুসলমান :
হযরত ঈসা (আ.) আকাশে জীবিত আছেন, তিনি কেয়ামতের পূর্বে যথাসময় আবার আসবেন। গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ১৮৯১ সাল পর্যন্ত উক্ত আকিদাই রাখত। কিন্তু পরবর্তীতে সে বয়ান পালটে ফেলল।
সে তার আগের বয়ান থেকে সরে এসে বলল,
ঈসা (আ.) জীবিত নেই, তিনি আবার আসবেন না। হ্যাঁ, তার প্রতীকী সত্তা হিসেবে যার আসার কথা আমিই সে মসিহ মওউদ। (গোলাম আহমদের বক্তব্যের সারমর্ম)। এখন প্রশ্ন হল, একজন নবী দাবিদার ধাপে ধাপে নিজের মত পরিবর্তন করা কিসের ইংগিত? আগে বললেন এক রকম, পরে বললেন আরেক রকম!! এটি কি তার স্ববিরোধ কথা হল না?
কাদিয়ানী :
ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) প্রথমাবস্থায় বায়তুল মাকদাসের দিকে ফিরে সালাত আদায় করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি নতুন ওহীর ভিত্তিতে বায়তুল্লাহ এর দিকে সালাত পড়তে আরম্ভ করেন। এখন আপনি তাঁর কিবলা পরিবর্তনের ঘটনাকে কিভাবে ব্যাখ্যা দেবেন? আপনি কি এ জন্য তাঁকেও স্ববিরোধী বক্তা বলবেন?
মুসলমান :
আপনার পালটা জবাব হিসেবে উদাহরণটি সঠিক নয়। কারণ, কিবলা পরিবর্তনের ঘটনা এবং হযরত ঈসা (আ.)-এর পুনরাগমন বিষয়ে মত পরিবর্তন—এ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির বিষয়।
প্রসঙ্গতঃ প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় হিজরতের পর প্রায় ১৬ বা ১৭ মাস বায়তুল মাকদাস-এর দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেন। এরপর আল্লাহ তাআলা কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ দেন এবং মুসলমানরা মসজিদুল হারাম-এর দিকে মুখ করে সালাত আদায় শুরু করেন।
এ বিষয়ে কুরআনের দলিল:
“আমি অবশ্যই আপনাকে সেই কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেব, যা আপনি পছন্দ করেন। অতএব আপনি আপনার মুখমণ্ডল মসজিদুল হারামের দিকে ফিরিয়ে নিন।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৪৪)।
কিবলা পরিবর্তনের ঘটনা ছিল শরিয়তের একটি আমলী (প্র্যাকটিক্যাল) বিধানের পরিবর্তন। আল্লাহ তাআলা প্রথমে বায়তুল মাকদাসকে কিবলা নির্ধারণ করেছিলেন, পরে ওহীর মাধ্যমে কাবা শরীফকে কিবলা বানিয়েছেন। এটি নাসেখ-মানসুখের অন্তর্ভুক্ত একটি শরয়ী বিধান। ইসলামের ইতিহাসে সালাতের রাকাত, রোজার বিধান, জিহাদের বিভিন্ন হুকুমসহ বহু আমলী বিষয়ে ধাপে ধাপে বিধান নাযিল হয়েছে।
কিন্তু হযরত ঈসা (আ.) জীবিত আছেন কি না এবং তিনি পুনরায় আগমন করবেন কি না—এটি একটি আকিদাগত (বিশ্বাসগত) বিষয়। আকিদা এমন কোনো বিষয় নয়, যা আজ এক রকম হবে, কাল আরেক রকম হবে। আল্লাহ, রাসূল, আখিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম, ফেরেশতা, নবুওয়াত ইত্যাদি মৌলিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নাসেখ-মানসুখ চলে না।
তাই যদি কেউ প্রথমে বলে, “ঈসা (আ.) জীবিত আছেন এবং সশরীরে পুনরায় আসবেন”, পরে আবার বলে, “ঈসা (আ.) জীবিত নন, আসবেনও না; বরং আমিই সেই প্রতিশ্রুত মসীহ”—তাহলে এটি কিবলা পরিবর্তনের মতো শরয়ী বিধানের পরিবর্তন নয়; বরং একই আকিদাগত বিষয়ে পরস্পরবিরোধী দুটি অবস্থান গ্রহণ করা।
বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য কয়েকটি উদাহরণ দেখুন,
১. নবী (সা.) প্রথমে বায়তুল মাকদাসের দিকে নামাজ পড়েছেন, পরে কাবার দিকে পড়েছেন। এটি আমলের পরিবর্তন।
কিন্তু কেউ যদি প্রথমে বলে, “আল্লাহ এক”, পরে বলে, “আল্লাহ এক নন”—তাহলে কি বলা যাবে যে এটিও কিবলা পরিবর্তনের মতো স্বাভাবিক পরিবর্তন? কখনোই নয়। কারণ প্রথমটি আমল, দ্বিতীয়টি আকিদা।
২. রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে মুসলমানরা সে বিধানে আবদ্ধ ছিলেন না; পরে ফরজ হয়েছে। এটি শরয়ী হুকুমের পরিবর্তন।
কিন্তু কেউ যদি প্রথমে বলে, “আখিরাত আছে”, পরে বলে, “আখিরাত নেই”—তাহলে সেটি আকিদার স্ববিরোধিতা, শরয়ী হুকুমের পরিবর্তন নয়।
৩. মদের ব্যাপারে ইসলামে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এটি বিধানগত পরিবর্তন।
কিন্তু কেউ যদি প্রথমে বলে, “মুহাম্মদ (সা.) শেষ নবী”, পরে বলে, “তিনি শেষ নবী নন”—তাহলে এটি আকিদাগত বিরোধিতা, নাসেখ-মানসুখ নয়।
সুতরাং কিবলা পরিবর্তনের উদাহরণ এনে ঈসা (আ.)-এর পুনরাগমন সংক্রান্ত আকিদায় অবস্থান পরিবর্তনকে বৈধ প্রমাণ করা যুক্তিগতভাবে সঠিক নয়। কারণ শরিয়তের আমলী বিধানে পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু আকিদার মৌলিক সত্যে পরস্পরবিরোধী অবস্থান গ্রহণকে নাসেখ-মানসুখ বা ওহীর মাধ্যমে বিধান পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করা যায় না।
শেষ কথা:
কিবলা পরিবর্তনের উদাহরণ দ্বারা হযরত ঈসা (আ.)-এর জীবন ও পুনরাগমন সম্পর্কিত আকিদাগত বক্তব্যের পরিবর্তনকে সমর্থন করা যায় না। কারণ কিবলা ছিল শরিয়তের একটি আমলী বিধান, যা আল্লাহর হুকুমে পরিবর্তিত হয়েছে। পক্ষান্তরে ঈসা (আ.)-এর জীবিত থাকা বা পুনরায় আগমন করা একটি আকিদাগত বিষয়। আকিদার ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী দুটি বিশ্বাস একই সঙ্গে সত্য হতে পারে না। সুতরাং প্রথমে ঈসা (আ.)-এর সশরীরে পুনরাগমনে বিশ্বাস করা, পরে তা অস্বীকার করে সম্পূর্ণ বিপরীত দাবি করা—এটিকে কিবলা পরিবর্তনের মতো শরয়ী বিধানের তানসীখ বলা যুক্তিসঙ্গত নয়। বরং এটি একই আকিদাগত বিষয়ে দুই বিপরীত অবস্থান গ্রহণের প্রশ্ন, যার জন্য স্বতন্ত্র ও সুস্পষ্ট দলিল প্রয়োজন। তাই কিবলা পরিবর্তনের উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক নয় এবং উক্ত আপত্তি মূল আলোচ্য বিষয়ের জবাব হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয় না।
লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
শিক্ষাবিদ ও গবেষক