Home ইসলামী আকীদা সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৪ মতে “সমস্ত রাসূল” গত হয়ে গেছেন?

সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৪ মতে “সমস্ত রাসূল” গত হয়ে গেছেন?

0
সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৪ মতে “সমস্ত রাসূল” গত হয়ে গেছেন?

সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৪ মতে “সমস্ত রাসূল” গত হয়ে গেছেন?

একটি ভাষাতাত্ত্বিক, তাফসীরভিত্তিক ও আকীদাগত পর্যালোচনা

আলোচনার ভূমিকা:

সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৪-এর একটি অংশকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক বিদ্যমান। বিশেষত আহমদীয়া/কাদিয়ানী ব্যাখ্যায় দাবি করা হয় যে:

قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ

“তাঁর পূর্বে সকল রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন।”

এবং সেখান থেকে সিদ্ধান্ত টানা হয় যে হযরত ঈসা (আ.)-ও অবশ্যই মৃত্যুবরণ করেছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—আয়াতটির ভাষাগত গঠন কি সত্যিই এমন সিদ্ধান্তকে বাধ্যতামূলক করে?

এই আলোচনায় আমরা আরবি ভাষা, ইংরেজি ব্যাকরণ, তাফসীর, শানে নুযূল, হাদীস এবং আকীদাগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি পর্যালোচনা করব।

মূল আয়াত:

আরবি:

«وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ ۚ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ ۚ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَىٰ أَعْقَابِكُمْ ۚ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَىٰ عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا ۗ وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ»

বাংলা অনুবাদ:

“মুহাম্মাদ তো একজন রাসূল মাত্র। তাঁর পূর্বেও রাসূলগণ অতিবাহিত হয়ে গেছেন। সুতরাং তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পেছনে ফিরে যাবে? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যাবে, সে আল্লাহর কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন।”

— সূরা আলে ইমরান, ৩:১৪৪

“বহু রাসূল” ও “সমস্ত রাসূল” — অর্থগত পার্থক্য

এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো বহুবচনের ব্যাপ্তি (Generality) এবং অন্তর্ভুক্তি (Inclusion)।

দুটি বাক্য লক্ষ্য করুন:

১. বহু রাসূল (Many Messengers)

২. সমস্ত রাসূল (All Messengers)

দুটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অর্থগত পার্থক্য রয়েছে।

Many Messengers

অনেক রাসূলকে বোঝায়।

কিন্তু এতে প্রত্যেক রাসূলকে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক নয়।

All Messengers

সকল রাসূলকে বোঝায়।

এখানে একজনও বাদ থাকে না।

ইংরেজি ব্যাকরণের উদাহরণ

Many students came to the seminar.

অনেক ছাত্র সেমিনারে এসেছে।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সকল ছাত্র এসেছে।

অন্যদিকে—

All students came to the seminar.

সমস্ত ছাত্র এসেছে।

এখানে একজনও বাদ নেই।

অতএব:

  • Many = বহু, অনেক
  • All = সমস্ত, সকল

দুইটির অর্থ এক নয়।

“الرسل” শব্দের ভাষাগত বিশ্লেষণ

আয়াতে এসেছে:

«وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ»

এখানে الرسل (আর-রুসুল) অর্থ “রাসূলগণ” বা “রাসূলবৃন্দ”।

কিন্তু আরবি ভাষায় ال যুক্ত বহুবচন সবসময় একই ধরনের অর্থ দেয় না।

এর ব্যবহার প্রসঙ্গভেদে পরিবর্তিত হয়।

প্রথম ব্যবহার: معنى استغراقى (Istighrāqī Meaning)

Universal / Comprehensive Meaning

অর্থ:

  • সকল
  • সমস্ত
  • কোনো ব্যতিক্রম নয়

উদাহরণ:

الحمد لله এর অর্থ:

All praise belongs to Allah.

এখানে প্রশংসার সকল প্রকার অন্তর্ভুক্ত।

এটি একটি সর্বব্যাপী (Universal) অর্থ।

দ্বিতীয় ব্যবহার: معنى عهد خارجى (ʿAhd Khārijī Meaning) Context-Specific Meaning

এক্ষেত্রে শব্দটি বাহ্যিকভাবে ব্যাপক হলেও বাস্তবে প্রসঙ্গ ও অন্যান্য দলিলের কারণে তার অন্তর্ভুক্তি সীমিত হতে পারে।

উদাহরণ:

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ

(সূরা মায়িদা ৫:৩)

অর্থ: “তোমাদের জন্য মৃত প্রাণী হারাম করা হয়েছে।”

আক্ষরিক অর্থে সব মৃত প্রাণী হারাম।

কিন্তু সহীহ হাদীস দ্বারা আমরা জানি:

  • মৃত মাছ বৈধ,
  • মৃত পঙ্গপাল (টিড্ডি) বৈধ।

অতএব সাধারণ শব্দ ব্যবহৃত হলেও ব্যতিক্রম থাকতে পারে।

ইংরেজি উদাহরণ:

All vehicles are prohibited in the park. (পার্কে সব ধরনের যানবাহন নিষিদ্ধ)।

পরে বলা হলো:

Emergency vehicles are exempt. (জরুরি সেবার যানবাহনগুলোকে ছাড় দেওয়া হয়েছে)।

তাহলে “All vehicles” বলা হলেও বাস্তবে একটি ব্যতিক্রম রয়ে গেল। অর্থাৎ “All” বলা হলেও বাস্তবে সব ক্ষেত্রে ১০০% একরকম প্রযোজ্য নাও হতে পারে—প্রসঙ্গ অনুযায়ী ব্যতিক্রম থাকতে পারে।

গবেষক আলেমদের নিশ্চয়ই জানা আছে যে,

মির্যায়ী প্রধান শিষ্য হেকিম নূর উদ্দিনও এক জায়গায় লিখে গেছেন:

الف و لام اگرچہ عموم اور استغراق کے معنی بھی دیتا ہے مگر خصوصیت کے معنی بھی دیتا ہے- ہر دو معنی اپنے اپنے موقع پر لے جاتے ہیں

“আলিফ-লাম কখনও عموم (সার্বজনীনতা) ও استغراق (সকলকে অন্তর্ভুক্ত করা) বোঝায়, আবার কখনও خصوص (নির্দিষ্ট বা সীমাবদ্ধ অর্থ) বোঝায়; প্রসঙ্গ অনুযায়ী অর্থ নির্ধারণ করতে হবে।” (তাসদীকে বারাহীনে আহমদীয়া : ১০৪)।

এই নীতির ভিত্তিতেও যুক্তি দাঁড়ায়:

যদি اَلرُّسُلُ-কে “সমস্ত রাসূল” অর্থে নেওয়া হয়, তাহলেও ঐ একই নীতিমালা অনুসারে কিছু রাসূলকে (যেমন, ঈসা মসীহ) সেই সাধারণ হুকুমের ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা কি সম্ভব নয়?

অর্থাৎ, “সব রাসূল গত হয়েছেন”—এখানে “সব” শব্দটি কি প্রসঙ্গগতভাবে সীমাবদ্ধ হতে পারে না?

উসূলী (নীতিগত) দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, শুধু আলিফ-লাম থাকা মাত্রই সর্বদা শতভাগ استغراق (সকলকে অন্তর্ভুক্ত করা) প্রমাণিত হয় না—এ কথা আরবি ভাষাবিদ ও উসূলবিদদের অনেকেই স্বীকার করেন। তাই কোনো শব্দ عام (সাধারণ) না خاص (বিশেষ), কিংবা عام হলেও তাতে تخصيص (ব্যতিক্রম) আছে কি না—তা নির্ধারণ করতে অতিরিক্ত قرينة (প্রাসঙ্গিক প্রমাণ) দরকার হয়।


আলোচ্য আয়াতে এই নীতির প্রয়োগ

যারা বলেন—

«الرسل = All Messengers»

তারা শব্দটিকে Universal অর্থে নিচ্ছেন।

ফলে তাদের অনুবাদ দাঁড়ায়:

“তাঁর পূর্বে সমস্ত রাসূল চলে গেছেন।”

কিন্তু অন্য ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যদি কুরআনের অন্যান্য আয়াত এবং সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে ঈসা (আ.)-কে এই সাধারণ অন্তর্ভুক্তি থেকে ব্যতিক্রম ধরা হয়, তাহলে আয়াতটি নিম্নরূপ বোঝা যায়:

Many messengers before him had passed away.

অথবা

Messengers before him had passed on.

এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে রাসূলদের একটি বৃহৎ দল অতিবাহিত হয়েছে—এ তথ্য প্রদান করা।

প্রত্যেক ব্যক্তির পৃথক অবস্থা নির্ধারণ করা নয়।


৩:১৪৪-এর শানে নুযূল:

এই আয়াত উহুদের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে রাসূলুল্লাহ (সা.) শহীদ হয়ে গেছেন।

এই সংবাদে কিছু সাহাবী বিচলিত হয়ে পড়েন।

তখন আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করেন।

মূল বার্তা ছিল:

রাসূল (সা.)-এর মৃত্যু হলেও দ্বীন ত্যাগ করা যাবে না।

অতএব আয়াতটির মূল উদ্দেশ্য:

  • ঈসা (আ.)-এর জীবন-মৃত্যু নির্ধারণ নয়।
  • মুসলমানদের ঈমানে দৃঢ় রাখা।

“خلت” শব্দের ভাষাগত বিশ্লেষণ:

আহমদীয়া ব্যাখ্যার একটি মূল ভিত্তি হলো “خلت”।

কিন্তু আরবি অভিধানে “خلا” ধাতুর অর্থ কেবল “মারা যাওয়া” নয়।

বরং:

  • চলে যাওয়া
  • অতিবাহিত হওয়া
  • পূর্বে সংঘটিত হওয়া
  • যুগ পার হয়ে যাওয়া

ইত্যাদি অর্থও রয়েছে।


কুরআনের উদাহরণ

تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ

(সূরা বাকারা ২:১৩৪)

অর্থ:

“এটি এমন এক জাতি যা অতিবাহিত হয়ে গেছে।”

এখানে “خلت” শুধু মৃত্যু বোঝাচ্ছে না।

বরং যুগ অতিক্রম করাকে বোঝাচ্ছে।

সুতরাং:

قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ

থেকে “সকল রাসূল অবশ্যই মৃত্যুবরণ করেছেন”—এ সিদ্ধান্ত ভাষাগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়।

একটি সূক্ষ্ম বিষয়:

এখানে আরও একটি সূক্ষ্ম বিষয় বিবেচ্য। যদি এই আয়াতের উদ্দেশ্য কেবল পূর্ববর্তী সমস্ত রাসূলের মৃত্যুকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হতো, তাহলে “ماتت” বা “ماتوا” জাতীয় শব্দ ব্যবহার করা অধিক প্রত্যক্ষ ও দ্ব্যর্থহীন হতো। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সে শব্দ ব্যবহার না করে “خَلَتْ” শব্দ প্রয়োগ করেছেন, যা মৃত্যুর পাশাপাশি স্থানান্তর, প্রস্থান অথবা অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার অর্থও বহন করে।

ফলে এই শব্দচয়ন এমন সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত রাখে যে, পূর্ববর্তী রাসূলদের মধ্যে এমন কেউ থাকতে পারেন যিনি সাধারণ মানুষের ন্যায় মৃত্যুবরণ না করে আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থায় অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছেন। বিশেষত হযরত ঈসা (আ.)-এর প্রসঙ্গে এ বিষয়টি অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে পরিষ্কার ইংগিতে তাঁর আসমানে উত্তোলিত হওয়া এবং শেষ যুগে পুনরাগমন করার বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে। সূরা নিসা, ১৫৭-৫৮, সূরা আলে ইমরান ৮১, সূরা যুখরূফ ৬১ ইত্যাদী।


সাহাবীগণ কি এ আয়াতকে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর দলীল হিসেবে ব্যবহার করেছেন?

ইসলামী পদ্ধতিতে সাহাবীদের উপলব্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু কোনো সহীহ বর্ণনায় পাওয়া যায় না যে:

  • আবু বকর (রা.)
  • উমর (রা.)
  • ইবনে আব্বাস (রা.)

এই আয়াতকে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর দলীল হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

বরং তাঁদের যুগে ঈসা (আ.)-এর ভবিষ্যৎ নুযূলের বিশ্বাস সুপরিচিত ছিল।


আবু বকর (রা.)-এর ঐতিহাসিক প্রয়োগ

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবীগণ গভীর শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন।

তখন আবু বকর (রা.) ঘোষণা করেন:

“যে ব্যক্তি মুহাম্মাদের ইবাদত করত, সে জেনে রাখুক মুহাম্মাদ ইন্তেকাল করেছেন। আর যে আল্লাহর ইবাদত করে, সে জেনে রাখুক আল্লাহ চিরঞ্জীব।”

এরপর তিনি সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৪ তিলাওয়াত করেন।

এখানে তিনি আয়াতটি ব্যবহার করেছেন:

  • রাসূল (সা.)-এর মৃত্যুর বাস্তবতা বোঝাতে
  • দ্বীনের স্থায়িত্ব বোঝাতে

ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর দলীল হিসেবে নয়।


ঈসা (আ.)-এর নুযূল সম্পর্কে সহীহ হাদীস

সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম এবং অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে এসেছে:

“ইবনে মরিয়ম তোমাদের মধ্যে অবতরণ করবেন…”

হাদীসগুলোতে বর্ণিত হয়েছে:

  • তিনি আকাশ থেকে অবতরণ করবেন।
  • দাজ্জালকে হত্যা করবেন।
  • ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন।
  • জিযিয়া রহিত করবেন।

উম্মাহর বহু মুহাদ্দিস এই বর্ণনাগুলোকে মুতাওয়াতির বলেছেন।

শপথযুক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় “রূপক অর্থ” গ্রহণ—মির্যা কাদিয়ানীর নিজস্ব নীতির আলোকে একটি প্রশ্ন:

সহীহ বুখারীর বিখ্যাত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) শপথ করে বলেছেন—

وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَيُوشِكَنَّ أَنْ يَنْزِلَ فِيكُمْ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَدْلًا

অর্থাৎ, “সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! অচিরেই তোমাদের মাঝে মরিয়মপুত্র ঈসা (আ.) ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে অবতরণ করবেন…”।

-সহীহ বুখারী, হাদীস ৩২০৫।

মির্যা কাদিয়ানীর নিজস্ব উসূল কী বলে?

মির্যা গোলাম আহমদ তাঁর গ্রন্থে স্পষ্টভাবে লিখেছেন—

وَالْقَسْمُ يَدُلُّ عَلَى أَنَّ الْخَبَرَ مَحْمُولٌ عَلَى الظَّاهِرِ لَا تَأْوِيلَ فِيهِ وَلَا اسْتِثْنَاءَ

অর্থাৎ, শপথযুক্ত সংবাদ অবশ্যই বাহ্যিক (literal) অর্থে গ্রহণ করতে হবে; এতে কোনো রূপক ব্যাখ্যা (তাবীল) বা ব্যতিক্রম গ্রহণযোগ্য নয়।

-রূহানী খাযায়েন: ৭/১৯২, হামামাতুল বুশরা: পৃষ্ঠা ২৭ বাংলা অনূদিত।

এখন প্রশ্ন হলো—

যদি মির্যার এই নীতি সত্য হয় যে—

শপথযুক্ত সংবাদে রূপক ব্যাখ্যা চলবে না,

সব শপথযুক্ত ভবিষ্যদ্বাণী বাহ্যিক অর্থেই সত্য হতে হবে।

তাহলে সহীহ বুখারী সহ অসংখ্য হাদীসগ্রন্থের এই হাদীস—

“ইবনে মরিয়ম তোমাদের মাঝে অবতরণ করবেন”।

এখানে “ইবনে মরিয়ম” শব্দকে যদি অন্য কারো (রূপক অর্থে) প্রয়োগ করা হয়, তবে কি তা তার নিজেরই উসূলের বিরোধী নয়?

অতএব “ইবনে মরিয়ম”–কে রূপকভাবে ব্যাখ্যা করা তার নিজের উসূলের সাথেই সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। চিন্তাশীল পাঠকের জন্য প্রশ্ন থেকে যায়, যে নীতিতে রূপক ব্যাখ্যা নিষিদ্ধ, সেই নীতির আলোকে “ঈসা ইবনে মরিয়ম”–কে অন্য কারো উপর প্রয়োগ করা কতটা যৌক্তিক?

এবার ঈসা মসীহ (আ.) এর আগমনী সংক্রান্ত সামান্য কয়েকটি হাদীসকে এক লাইনে সংক্ষেপ করে রেফারেন্সসহ তুলে ধরা হল—

ঈসা (আ.) ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে অবতরণ করবেন, ক্রুশ ভাঙবেন ও দাজ্জালকে ধ্বংসের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি করবেন — (সহীহ বুখারী: ৩২০৫)।

ঈসা (আ.) অবতরণ করলে মুসলিম ইমামের পেছনে ইমামতি করতে বলা হলেও তিনি উম্মতের সম্মান দেখিয়ে নিজে ইমাম হবেন না — (সহীহ মুসলিম: ২৮৬)।

ঈসা (আ.) নেমে আসবেন, তখন মুসলিমদের ইমাম তাদের মধ্য থেকেই থাকবেন — (সহীহ বুখারী: ৩২০৬)।

কিয়ামতের আগে রোমের যুদ্ধ, দাজ্জাল ও ঈসা (আ.)-এর অবতরণ একসাথে ঘটবে — (সহীহ মুসলিম: ৭০১৪)।

ঈসা (আ.)-কে জীবিত অবস্থায় আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে — (তাফসীরে ইবনে কাসীর: সূরা নিসা ৪:১৫৮)।

ঈসা (আ.) দামেস্কের সাদা মিনারের কাছে ফেরেশতার ডানায় ভর করে অবতরণ করবেন — (সহীহ মুসলিম: কিতাবুল ফিতান)।

ঈসা (আ.)-কে কিয়ামতের আগে পুনরাগমনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন — (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০৮১)।

ঈসা (আ.) আকাশ থেকে নেমে এসে দাজ্জালকে হত্যা করবেন এবং ইয়াজুজ-মাজুজ ধ্বংস হবে — (মুসনাদে বাজ্জার: ৯৬৪২)।

ঈসা (আ.) রাওহা উপত্যকায় হজ/উমরার তালবিয়া পাঠ করবেন — (সহীহ মুসলিম: ২৯০০)।

দাজ্জাল, ঈসা (আ.)-এর অবতরণ, ইয়াজুজ-মাজুজ ও কিয়ামতের বিস্তৃত ধারা বর্ণিত হয়েছে — (সহীহ মুসলিম: ৭১১৪)।

শামে ঈসা (আ.) অবতরণ করবেন এবং সেখানেই দাজ্জালকে ধ্বংস করবেন — (তারীখে দিমাশক / ফাযায়েলুশ শাম)।

ঈসা (আ.) মারা যাননি; কিয়ামতের আগে তিনি পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসবেন — (তাফসীর তাবারী ও ইবনে আবী হাতিম; সনদ দুর্বল)।

“বুরূযী ঈসা” ধারণার সমস্যা:

আহমদীয়া ব্যাখ্যায় বলা হয়:

প্রকৃত ঈসা (আ.) নন, বরং তাঁর সদৃশ একজন ব্যক্তি আসবেন।

কিন্তু কুরআন ও সহীহ হাদীসে কোথাও:

  • بروزي عيسى
  • مثيل عيسى
  • রূপক ঈসা

জাতীয় কোনো পরিভাষা নেই।

বরং স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:

«عيسى ابن مريم»

অর্থাৎ:

“মরিয়ম-পুত্র ঈসা”

যা একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম।


ঈসা (আ.)-এর উত্থান সম্পর্কে কুরআনের আয়াত

সূরা নিসা ৪:১৫৮

بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ

অর্থ:

“বরং আল্লাহ তাঁকে নিজের দিকে উঠিয়ে নিয়েছেন।”


সূরা আলে ইমরান ৩:৫৫

إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ

অর্থ:

“আমি তোমাকে গ্রহণ করব এবং আমার দিকে উঠিয়ে নেব।”

প্রাচীন মুফাসসিরদের বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এই আয়াতসমূহকে ঈসা (আ.)-এর বিশেষ উত্থানের দলীল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

আহমদীয়া সাহিত্য অনুযায়ী “توفى” শব্দের ব্যাখ্যা:

আহমদীয়া সাহিত্যেও উল্লেখ আছে যে, “توفى” শব্দ থেকে শুধুমাত্র ‘মৃত্যু’ অর্থ গ্রহণ করা সঠিক নয়। বরং শব্দটির আরও কিছু অর্থ রয়েছে— যেমন প্রাণ নিয়ে নেয়া, অচেতন করা ইত্যাদি। (দৈনিক আল-ফযল: ২১.০৮.১৯১৭)।

কুরআনে “توفى” শব্দের ব্যবহার:

কুরআনে এই শব্দটি বিভিন্ন প্রসঙ্গে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে—

ঘুমের ক্ষেত্রে: (৬:৬০) — ঘুমন্ত অবস্থায় আত্মা গ্রহণ করা।

মৃত্যুর ক্ষেত্রে: (৩৯:৪২) — মৃত্যু বোঝাতে।

সশরীরে উঠিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে: (৩:৫৫ ও ৫:১১৭) — ঈসা (আ.)কে সশরীরে উঠিয়ে নেয়া বুঝাতে। – তাফসীরে কাবীর ইমাম রাজী, তাফসীরে ফাতহুল কাদীর শাওকানী, আল জাওয়াবুস সহীহ ইবনু তাইমিয়াহ প্রমুখ দ্রষ্টব্য।

অর্থের প্রকৃতি:

উপরের প্রতিটি ক্ষেত্রে “توفى” শব্দের অর্থকে অনেকেই রূপক (মাজাজ) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
কিন্তু এর মূল বা প্রকৃত অর্থ হলো—

পূর্ণ করা,

সম্পূর্ণভাবে নিয়ে নেয়া,

তুলে নেওয়া / গ্রহণ করা,

ইত্যাদী।

একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ:

সূরা নিসা, আয়াত ১৫-এ “توفى” শব্দটি তার মূল অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।

সূরা আন-নিসা (৪), আয়াত ১৫:

আরবি: وَاللَّاتِي يَأْتِينَ الْفَاحِشَةَ مِن نِّسَائِكُمْ فَاسْتَشْهِدُوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعَةً مِّنكُمْ ۖ فَإِن شَهِدُوا فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّىٰ يَتَوَفَّاهُنَّ الْمَوْتُ أَوْ يَجْعَلَ اللَّـهُ لَهُنَّ سَبِيلًا

বাংলা অর্থ (অনুবাদ):

“আর তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা অশ্লীল কাজ (ব্যভিচার) করে, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করো। যদি তারা সাক্ষ্য দেয়, তবে তাদেরকে ঘরবন্দি করে রাখো, যতক্ষণ না মৃত্যু তাদেরকে নিয়ে যায় অথবা আল্লাহ তাদের জন্য কোনো পথ নির্ধারণ করেন।”

আয়াতের অংশ (৪:১৫):

حَتَّىٰ يَتَوَفَّاهُنَّ الْمَوْتُ

শব্দ-ভিত্তিক অর্থ:

يَتَوَفَّى (yatawaffā) পূর্ণভাবে গ্রহণ করা / পুরোপুরি নিয়ে যাওয়া।

هُنَّ (hunna) তাদেরকে (স্ত্রীলিঙ্গ বহুবচন)।

الْمَوْتُ (al-mawt) মৃত্যু।

সহজ অর্থ:

“যতক্ষণ না মৃত্যু তাদেরকে পুরোপুরি নিয়ে যায়।”


কাদিয়ানী মতবাদের একটি স্ববিরোধিতা:

কাদিয়ানীরা সাধারণত ঈসা (আ.)-এর আকাশে জীবিত থাকা বিশ্বাসকে অযৌক্তিক বলে সমালোচনা করেন।

কিন্তু ইসলামী বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হলো—মির্যা গোলাম আহমদের কিছু লেখায় হযরত মূসা (আ.) সম্পর্কে এমন বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে যেখানে তাঁর জীবিত থাকা বা আকাশে অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন,

গোলাম আহমদ কাদিয়ানী নিজ ‘নূরুলহক’ (আরবী) গ্রন্থে লিখেছেন,

أِنَّ عِيْسَى أِلَّا نَبِىُّ اللهِ كَأَنْبِيَاءِ آخَرِيْنَ وَ إِنْ هُوَ إِلَّا خَادِمُ شَرِيْعَةِ النَّبِىِّ الْمَعْصُوْمِ الَّذِىْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْمَرَاجِعَ حَتَّى أَقْبَلَ عَلَى ثَدْىِ أُمِّهِ وَ كَلَّمَهُ رَبُّهُ عَلَى طُوْرِ سِيْنِيْنَ وَ جَعَلَهُ مِنَ الْمَحْبُوْبِيْنَ. هَذَا هُوَ مُوْسَى فَتَى اللهُ الَّذِىْ أَشَارَ اللهُ فِىْ كِتَابِهِ إِلَى حَيَاتِهِ وَ فُرِضَ عَلَيْنَا أَنْ نُؤْمِنَ بِأّنَّهُ حَىٌّ فِىْ السَّمَاءِ وَ لَمْ يَمُتْ وَ لَيْسَ مِنَ الْمَيِّتِيْنَ

অর্থাৎ, নিশ্চয় ঈসা (আ.) আল্লাহর একজন নবী ছাড়া আর কিছুই নন, যেমন অন্যান্য নবীগণও (আল্লাহর নবী)। তিনি কেবলমাত্র সেই নিষ্পাপ নবীর শরীয়তের একজন খাদিম, যার জন্য আল্লাহ (শৈশবে) অন্য দুধপানকারিণীদের দুধ পান করা নিষিদ্ধ করেছিলেন, এমনকি তিনি নিজ মায়ের স্তনের দিকেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর সাথে তূর সাইনাইয়ে তাঁর প্রভু কথা বলেছেন এবং তাঁকে প্রিয়জনদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এ হলেন মূসা (আ.)—আল্লাহর একজন বিশেষ বান্দা—যার জীবিত থাকার প্রতি আল্লাহ তাঁর কিতাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন। আর আমাদের ওপর এটি বিশ্বাস করা ফরজ করা হয়েছে যে তিনি আকাশে জীবিত আছেন, তিনি মৃত্যুবরণ করেননি এবং তিনি মৃতদের অন্তর্ভুক্ত নন।

গোলাম আহমদের রচনাসমগ্র রূহানী খাযায়েন : ৮/৬৮-৬৯ দ্রষ্টব্য।

তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়:

  • যদি ঈসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে এমন বিশ্বাস অগ্রহণযোগ্য হয়, তবে মূসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে কেন গ্রহণযোগ্য?
  • যদি এক ক্ষেত্রে রূপক ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়, অন্য ক্ষেত্রেও কি একই নীতি প্রয়োগ করা উচিত নয়?

এই প্রশ্নগুলোর দলিলভিত্তিক উত্তর অনুসন্ধান করা জরুরি।


প্রধান তাফসীর গ্রন্থসমূহের সারকথা

তাফসীরে তাবারী, ইবনে কাসীর, কুরতুবী এবং অন্যান্য প্রধান তাফসীর গ্রন্থে আয়াতটির আলোচনায় মূলত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো উঠে এসেছে:

১. উহুদের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট।

২. রাসূল (সা.)-এর মানবীয় বৈশিষ্ট্য।

৩. রাসূলের মৃত্যুতে দ্বীন বাতিল হয় না।

৪. ঈমানে অবিচল থাকার শিক্ষা।

৫. ব্যক্তিপূজার অসারতা।


শিক্ষণীয় বিষয়:

১. ইসলাম কোনো ব্যক্তির জীবনের ওপর নির্ভরশীল নয়।

২. নেতা বা আলেমের মৃত্যুতে দ্বীন ত্যাগ করা যাবে না।

৩. সংকটের সময় ঈমানের দৃঢ়তা পরীক্ষা হয়।

৪. আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অবিচলতা সফলতার কারণ।

৫. মুসলমানের প্রকৃত সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে।

উপসংহার:

সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৪-এর “قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ” থেকে:

  • ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু সরাসরি প্রমাণিত হয় না।
  • “الرسل” বহুবচন হওয়া সকল সদস্যের পৃথক অবস্থা নির্ধারণ করে না।
  • আয়াতের মূল প্রসঙ্গ উহুদের যুদ্ধ ও মুসলমানদের দৃঢ়তা।
  • সাহাবী ও প্রাচীন মুফাসসিরগণ এই আয়াতকে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর দলীল হিসেবে ব্যবহার করেননি।
  • “বুরূযী ঈসা” ধারণা কুরআন ও সহীহ হাদীসের ভাষায় অনুপস্থিত।
  • সহীহ ও মুতাওয়াতির হাদীসসমূহ প্রকৃত ঈসা (আ.)-এর নুযূলের দিকেই নির্দেশ করে।

অতএব, ৩:১৪৪ নম্বর আয়াত থেকে “ঈসা (আ.) অবশ্যই মৃত্যুবরণ করেছেন, তাই রূপক ঈসা আগমন করবেন”—এ সিদ্ধান্ত ভাষাগত, তাফসীরগত ও হাদীসগতভাবে সর্বসম্মত বা বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় প্রসঙ্গ, ভাষা, তাফসীর এবং সংশ্লিষ্ট সমস্ত দলিল একত্রে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

লিখক, অ্যাডমিন: রদ্দে কাদিয়ানী অ্যাপস ডাউনলোড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here