কাদিয়ানীদের ধর্মপালন ও প্রচার করা তাদের নাগরিক অধিকার হলে তবে আপত্তি কোথায়?
প্রশ্ন: কাদিয়ানীরাও তো বাংলাদেশের নাগরিক, তাদেরও অন্য সবার মতোই নাগরিক অধিকার এবং ধর্ম পালনের স্বাধীনতা রয়েছে। তাহলে তাদের ধর্ম বিশ্বাস এবং ধর্ম পালন নিয়ে আপনাদের আপত্তি কেন? যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিন!
উত্তর :
কাদিয়ানীদের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস নিয়ে আমাদের মুসলমানদের কোনো আপত্তি নেই। কে কী বিশ্বাস করবেন, কীভাবে ধর্ম পালন করবেন—তা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৪১(১)(ক) অনুচ্ছেদেও আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতা সাপেক্ষে ধর্মীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
সুতরাং, কাদিয়ানীরা তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস লালন করবেন কিংবা নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয়ে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবেন—এ নিয়ে আমাদের আপত্তির কোনো প্রশ্নই আসে না।
তবে আমাদের আপত্তি একটি নির্দিষ্ট জায়গায়। আর তা হলো—নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও মতাদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে ইসলামের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করা।
আমাদের বক্তব্য হলো, কাদিয়ানীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আকীদা ইসলামের মূলধারার বিশ্বাস ও আকীদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় বজায় রেখে নিজেদের বিশ্বাস প্রচার করাই অধিকতর স্বচ্ছ ও যুক্তিসংগত। কারণ, ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসকে ইসলামের পরিচয়ে উপস্থাপন করা হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও আকীদা সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
ধর্মীয় স্বাধীনতা যেমন প্রত্যেকের অধিকার, তেমনি নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় স্পষ্ট রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের আপত্তি কারও ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা ধর্ম পালনের স্বাধীনতায় নয়; বরং ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস প্রচারের ক্ষেত্রে ইসলামের পরিচয় ব্যবহারের বিষয়টিতে।
কাদিয়ানীদের প্রধান প্রধান কিছু ধর্মবিশ্বাস যা ইসলামের আদিম ও সর্বসম্মত মুসলিম বিশ্বাসের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
নিচে উল্লিখিত ১-১০টি কাদিয়ানী ধর্মবিশ্বাসের প্রামাণ্য স্ক্যানকপি দেখতে আমার ভিডিওটি দেখুন!
১. মুহাম্মদ (সা.) শুধুমাত্র শরীয়তবাহক শেষনবী নবী, তিনি মুক্ত ও স্বাধীন “সর্বশেষ নবী” নন। তারপরেও একজন নবী আসার বাকি ছিল, গোলাম আহমদ কাদিয়ানী সেই শেষনবী। (তাযকিরাতুশ শাহাদাতাইন-৮২, দৈনিক আল ফজল, তারিখ ০৮/০৬/১৯১৪, পৃ ১৪, কলাম ৩ দ্রষ্টব্য)।
২. মুহাম্মদ (সা.) দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব পরিপূর্ণ করে যেতে পারেননি, তাই তার অসম্পূর্ণ দ্বীনের কাজগুলো সম্পূর্ণ করার জন্য শেষ যুগে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে বুরূজি মুহাম্মদ বা “মুহাম্মদ (সা.) এর দ্বিতীয় সত্তা” রূপে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। তিনিই প্রকৃতপক্ষে মুহাম্মদ, আল্লাহ তাকে পৃথিবীতে পুনরায় পাঠিয়েছেন। (নাউজুবিল্লাহ)। (রূহানী খাযায়েন ১৭/২৬৩, মালফুযাত (বাংলা) পৃষ্ঠা ২০)।
৩. কলেমায় “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” হতে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীও শামিল। এ নাম হতে তিনিও উদ্দেশ্য। (কালিমাতুল ফসল পৃষ্ঠা ৬৮, মির্যাপুত্র বশির আহমদ এম.এ)।
৪. পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত “ঈসা ইবনে মরিয়ম” দ্বারা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীই উদ্দেশ্য। (রূহানী খাযায়েন ১৯/৯৮)।
৫. পবিত্র কুরআনে মক্কা, মদীনার মত তৃতীয় আরেকটি শহর “কাদিয়ান” এর উল্লেখও রয়েছে। (রূহানী খাযায়েন ৩/১৪০)।
৬. কাদিয়ান (পাঞ্জাব, ভারত) শহরে অনুষ্ঠিত “সালানা জলসা” বা বাৎসরিক কাদিয়ানী ইজতিমাহ হজ্জের মতই। হজ্জের মাধ্যমে যে উপকারীতা উদ্দেশ্য, সেটি সালানা জলসায় এসেও লাভ করতে পারে। (খুতুবাতে মাহমুদ ৪/২৫৪, তাং ২৫-১২-১৯১৪ খ্রিস্টবর্ষ)।
৭. গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর হাতে বয়াত নেতা সকল কাদিয়ানী (আহমদীয়া) হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে প্রবেশকারী অর্থাৎ সাহাবীদের সমমর্যাদার। (খুতবাতুল ইলহামিয়্যাহ ১৭১, রূহানী খাযায়েন ১৬/২৫৮)।
৮. ঈসা (আ.)-কে আল্লাহ উঠিয়ে নিয়েছেন, তিনি এখনো জীবিত—এটি শিরিকি আকীদা। (রূহানী খাযায়েন ২২/৬৬০)। তবে মূসা (আ.) এখনো জীবিত, তিনি মৃত্যুবরণ করেননি—এই বিশ্বাস আমাদের উপর ফরজ। (রূহানী খাযায়েন ৮/৬৮-৬৯)।
৯. ঈসা (আ.) মদ্যপায়ী ছিলেন, হয়ত অসুস্থতার কারণে কিংবা তার পুরনো অভ্যাসের কারণে। মূলত তাঁর মদ্যপানের কারণেই ইউরোপের মানুষকে মদ যত অনিষ্ট করেছে। (রূহানী খাযায়েন ১৯/৭১, কিশতিয়ে নূহ পৃষ্ঠা ৮৫ বাংলা)।
১০. যে সকল মুসলমান মির্যা গোলাম কাদিয়ানীর নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ (বয়াত) না হবে, তারা যদি তার নামও না শুনে থাকে তবুও তারা কাফের এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে বাহিরে। (আয়নায়ে সাদাকাত, আনওয়ারুল উলূম ৬/১১০, মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ, কাদিয়ানী জামাতের দ্বিতীয় খলিফা)।
এখন প্রশ্ন হলো, যারা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর হাতে বয়াত গ্রহণ না করার কারণে নিজেদের বাইরে থাকা অন্য সবাইকে ‘কাফের’ এবং ‘ইসলামের গণ্ডির বাইরে’ বলে মনে করেন, তাঁদের কাছে কি এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে?
একই সঙ্গে, তাঁদের ধর্মবিশ্বাসের যেসব দিক ইসলামের মূলধারার মুসলমানদের আকীদা ও প্রচলিত ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচিত, সেসব বিষয়ে তাঁদের অবস্থান ও ব্যাখ্যা কী?
রাষ্ট্রপক্ষের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের কাছে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। তাঁদের ধর্মীয় গ্রন্থ, বিশ্বাস ও মতাদর্শের আলোকে এসব প্রশ্নের জবাব জনসমক্ষে পরিষ্কার করা প্রয়োজন, যাতে এ বিষয়ে বিদ্যমান বিভ্রান্তি ও বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে।
অন্যথায়, তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় গ্রন্থ ও মতাদর্শে বর্ণিত বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাঁদের ধর্মীয় পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাঁদের ইসলামের মূলধারার বাইরে স্বতন্ত্র ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে—আহমদীয়া বা মির্যায়ী সম্প্রদায় নামে—আইনগত স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিটি সংসদে আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা যেতে পারে।
আমাদের বক্তব্যের মূল কথা হলো, ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। একদিকে যেমন প্রত্যেকের নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, অন্যদিকে তেমনি ধর্মীয় পরিচয় ও বিশ্বাসের পার্থক্যগুলোও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে যেকোনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত প্রাসঙ্গিক আইন, সাংবিধানিক অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করে।
লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
অ্যাডমিন: রদ্দে কাদিয়ানী অ্যাপ
ওয়েবসাইট : www.markajomar.org