জনৈক আহমদী মু‘আল্লিম আব্দুল মাবুদের কুরআনের আয়াতের অপব্যাখ্যার জবাবে পড়ুন!
জনাব আব্দুল মাবুদ সাহেব!
কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যায় নিজের মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি আয়াতের ভাষা, প্রসঙ্গ ও শানে নুযূলকে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে সেটি কি প্রকৃতপক্ষে কুরআনের ব্যাখ্যা থাকে, নাকি কুরআনের ওপর নিজের মতবাদ চাপিয়ে দেওয়া হয়? আহমদী জামাতের ‘মাছীলে ঈসা’ বা ‘রূপক ঈসা’ সংক্রান্ত ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আমার প্রশ্নটি ঠিক এখানেই।
আপনার বক্তব্যের ভুলটি ধরিয়ে দিতে আমি অসংখ্য কথা নয়, বরং একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনতে চাই। অনুগ্রহ করে প্রশ্নটির উত্তর কুরআনের ভাষা, আয়াতের ধারাবাহিকতা এবং নির্ভরযোগ্য তাফসিরের আলোকে দিন।
প্রথম প্রশ্ন: সূরা যুখরূফের ৫৮ নম্বর আয়াতে ‘তারা’ কারা?
সূরা যুখরূফের ৫৭ নম্বর আয়াতে ঈসা (আ.)-কে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপনের প্রসঙ্গ এসেছে। এর পরের, অর্থাৎ ৫৮ নম্বর আয়াতে রয়েছে বহুবচনাত্মক ক্রিয়াপদ قالوا (কালূ—তারা বলল)। সেখানে বলা হয়েছে:
أَآلِهَتُنَا خَيْرٌ أَمْ هُوَ
অর্থ: “আমাদের উপাস্যরা শ্রেষ্ঠ, নাকি সে?” — সূরা আয-যুখরূফ, ৪৩:৫৮।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়: আয়াতটির বক্তব্যে ‘আমাদের উপাস্যরা’ এবং ‘সে’—এই তুলনা কারা করছে, তা নির্ধারণ করতে হলে আয়াতের পূর্বাপর প্রসঙ্গ ও সংশ্লিষ্ট তাফসির বিবেচনা করতে হবে। প্রচলিত তাফসিরি ব্যাখ্যায় এ বক্তব্য মক্কার মুশরিকদের আপত্তি ও বিতর্কের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এখন প্রশ্ন হলো, যারা বলছে, “আমাদের উপাস্যরা শ্রেষ্ঠ, নাকি সে?”, তারা কি ঈসা (আ.)-এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করছে, নাকি তাঁকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করার প্রসঙ্গে আপত্তি ও বিতর্ক করছে?
দুটি বিষয় এক নয়। একটি হলো আয়াতের বক্তব্যের ঐতিহাসিক ও ভাষাগত প্রেক্ষাপট; অন্যটি হলো সেই আয়াত থেকে পরবর্তী কোনো ব্যক্তির আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী বের করা। দ্বিতীয় দাবিটি প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমটির সঙ্গে তার যৌক্তিক ও দলিলভিত্তিক সম্পর্ক দেখাতে হবে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: ‘مثلاً’ শব্দ থেকে ‘মাছীলে ঈসা’ কীভাবে প্রমাণিত হয়?
এখানেই আপনার ব্যাখ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে।
কুরআনে ব্যবহৃত مثلاً (মাসালান) শব্দটি প্রসঙ্গভেদে দৃষ্টান্ত, উপমা বা উদাহরণ বোঝাতে পারে। কিন্তু কোনো স্থানে ‘দৃষ্টান্ত’ অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হলেই সেখান থেকে ‘মাছীলে ঈসা’ নামে ভবিষ্যতে আরেক ব্যক্তির আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী প্রমাণিত হয়ে যায় না।
প্রশ্ন হলো:
১. আয়াতের কোন শব্দ বা বাক্যাংশে ভবিষ্যতে ‘মাছীলে ঈসা’ বা ‘রূপক ঈসা’ নামের কোনো ব্যক্তির আগমনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে?
২. ‘مثلاً’ শব্দের অর্থ ‘দৃষ্টান্ত’ হওয়া থেকে কীভাবে ‘ঈসার সদৃশ আরেক ব্যক্তি ভবিষ্যতে আসবেন’—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হলো?
৩. এই ব্যাখ্যা কি আরবি ভাষার স্বাভাবিক নিয়ম, আয়াতের পূর্বাপর প্রসঙ্গ এবং নির্ভরযোগ্য তাফসির দ্বারা সমর্থিত? নাকি আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত একটি মতবাদকে আয়াতের ওপর আরোপ করে এই অর্থ বের করা হচ্ছে?
৪. যদি সত্যিই এখানে ভবিষ্যৎবাণী উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে সেই ভবিষ্যৎবাণী নির্দেশকারী নির্দিষ্ট শব্দ, বাক্যগঠন ও প্রামাণ্য ব্যাখ্যা দেখানো সম্ভব কি?
মনে রাখতে হবে, কোনো শব্দের সম্ভাব্য অর্থ আর কোনো নির্দিষ্ট মতবাদের পক্ষে সেই শব্দের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া এক বিষয় নয়। শব্দের অর্থ নির্ধারণ করতে হয় বাক্য, প্রসঙ্গ ও ভাষাগত প্রয়োগের ভিত্তিতে।
তৃতীয় প্রশ্ন: আয়াতের শানে নুযূল ও তাফসির কী বলে?
আপনার ব্যাখ্যা যদি সঠিক হয়, তাহলে সেটি যাচাই করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মূল দলিল সামনে আনা।
আপনার প্রতি আমার সরাসরি প্রশ্ন:
- সূরা যুখরূফের ৫৭–৬১ নম্বর আয়াতের নির্ভরযোগ্য তাফসিরে কোথায় বলা হয়েছে যে, ৫৮ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের মধ্যে ‘মাছীলে ঈসা’ বা ‘রূপক ঈসা’ নামের কোনো ব্যক্তির আগমনের সংবাদ দেওয়া হয়েছে?
- এ বিষয়ে কোনো সহিহ হাদিস থাকলে তার সুনির্দিষ্ট সূত্র ও বক্তব্য কী?
- গ্রহণযোগ্য মুফাসসিরদের বক্তব্যে যদি এমন ব্যাখ্যা থাকে, তাহলে তাঁদের মূল উদ্ধৃতি, গ্রন্থের নাম এবং প্রাসঙ্গিক অংশ দেখানো যাবে কি?
- আর যদি এমন কোনো সুস্পষ্ট দলিল না থাকে, তাহলে কোন ভিত্তিতে এই ব্যাখ্যাকে কুরআনের উদ্দেশ্য বলে দাবি করা হচ্ছে?
এখানে বিষয়টি খুব পরিষ্কার: যে ব্যক্তি কুরআনের একটি আয়াতকে নিজের মতবাদের পক্ষে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করবেন, সেই ব্যাখ্যার পক্ষে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ দেওয়ার দায়িত্বও তাঁর।
শুধু একটি শব্দের ওপর বিশেষ অর্থ আরোপ করলেই একটি ধর্মীয় দাবি প্রমাণিত হয় না।
চতুর্থ প্রশ্ন: ‘আমাদের উপাস্যরা’—এই বক্তব্যের তাৎপর্য কী?
আয়াতের أَآلِهَتُنَا خَيْرٌ أَمْ هُوَ বাক্যাংশে ‘আমাদের উপাস্যরা’ কথাটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এটি বক্তাদের অবস্থান ও বিতর্কের প্রকৃতি বুঝতে সহায়তা করে। এ কারণে আয়াতটিকে বিচ্ছিন্নভাবে পড়ার পরিবর্তে এর পূর্বাপর বক্তব্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।
আমার বক্তব্য হলো, এই বাক্যাংশকে সামনে রেখে যদি আয়াতটির বক্তাদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়, তাহলে একই সঙ্গে ব্যাখ্যা করতে হবে—কীভাবে সেই বক্তব্যকে ‘রূপক ঈসা’র ভবিষ্যৎ আগমনের সংবাদ হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব?
এখানে কেবল ‘ঈসা’, ‘দৃষ্টান্ত’ কিংবা ‘মাছালান’ শব্দের উল্লেখ যথেষ্ট নয়। বরং দেখাতে হবে, আয়াতের বক্তব্য থেকে ভবিষ্যৎ আগমনের সিদ্ধান্তটি কীভাবে অনিবার্য বা অন্তত নির্ভরযোগ্যভাবে সমর্থিত হয়।
অন্যথায় ব্যাখ্যাটি দলিলের চেয়ে অনুমাননির্ভর হয়ে পড়বে।
আমার মূল প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিন
জনাব আব্দুল মাবুদ সাহেব!
সূরা যুখরূফের ৫৭–৬১ নম্বর আয়াতের কোন নির্দিষ্ট শব্দ, বাক্য, শানে নুযূল, সহিহ হাদিস কিংবা গ্রহণযোগ্য ইমামের তাফসিরের ভিত্তিতে প্রমাণ করা যায় যে, এখানে মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের মধ্যে ‘মাছীলে ঈসা’ বা ‘রূপক ঈসা’ নামে কারও আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে?
আমি আপনার কাছে আবেগনির্ভর বক্তব্য চাই না; চাই সুনির্দিষ্ট দলিল। আমি কোনো অস্পষ্ট ইঙ্গিতকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে বলছি না; বরং যে দাবি করা হচ্ছে, সেটির পক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপনের আহ্বান জানাচ্ছি।
আপনি যদি দলিল দিতে পারেন, তাহলে সেটি সামনে আনুন। আর যদি দলিল না থাকে, তাহলে আয়াতের স্বাভাবিক ভাষাগত ও প্রসঙ্গগত অর্থের বাইরে গিয়ে একটি নির্দিষ্ট মতবাদকে কুরআনের বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করার যৌক্তিকতা কী?
শেষ কথা
আপনার প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ, সূরা যুখরূফের ৫৭ থেকে ৬১ নম্বর আয়াতের অনুবাদসহ পুরো অংশটি আবার পড়ুন। আরবি শব্দগুলোর অর্থ, আয়াতের ধারাবাহিকতা, শানে নুযূল এবং নির্ভরযোগ্য তাফসির—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করুন।
নিজের পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসকে সাময়িকভাবে পাশে রেখে প্রশ্নটি বিচার করুন: আয়াতটি নিজে যা বলছে, আর আমরা আয়াতটির ওপর যে অর্থ আরোপ করছি—দুটির মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু পার্থক্য রয়েছে?
আল্লাহর ওয়াস্তে, কুরআনের ব্যাখ্যায় এমন কোনো বক্তব্যকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করবেন না, যার পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মতবাদকে কুরআনের মানদণ্ডে যাচাই করুন; কুরআনকে মতবাদের সঙ্গে মেলানোর জন্য তার বক্তব্যকে টেনে-হিঁচড়ে নতুন অর্থ দেবেন না।
লেখক: প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী