Home বাহাউল্লাহ বাহাউল্লাহ ইরানীর মসীহ মওউদ দাবী

বাহাউল্লাহ ইরানীর মসীহ মওউদ দাবী

0
কাদিয়ানীদের লিটারেচার হতে বাহাউল্লাহর মসীহ দাবির প্রমাণ
প্রশ্ন:

বাহাউল্লাহ ইরানি সাহেব মসীহ মওউদ দাবি করেছিলেন—এর প্রমাণ কী?

উত্তর:

আপনার প্রশ্নের উত্তরে আসার আগে কাদিয়ানি মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর একটি মৌলিক নীতির কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন।

কাদিয়ানীদের তথাকথিত মূলনীতি

কাদিয়ানি বা মির্যায়ী লিটারেচারে একটি বহুল প্রচারিত মূলনীতি হলো—“যদি কোনো ব্যক্তি মিথ্যা নবী হওয়ার ও আল্লাহর প্রত্যাদিষ্ট হওয়ার দাবী করে তাহলে সে মহানবী (সা.) এর নবুওয়াতের সময়কালের সমান জীবন কখনো লাভ করবেনা।” (আরবাঈন ৯৭, গোলাম আহমদ কাদিয়ানী)।

তাদের যুক্তি হলো, পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হাক্কাহ (৬৯:৪৪-৪৬)-এ আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, যদি রাসূল (সা.) আল্লাহর নামে কোনো কথা রচনা করতেন, তবে আল্লাহ তাঁকে কঠোরভাবে পাকড়াও করতেন। কাদিয়ানীদের মতে, এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোনো মিথ্যা দাবিদারকে আল্লাহ দীর্ঘ সময় অবকাশ দেন না।

এরপর তারা দাবি করে যে, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী তার দাবির পর প্রায় ২৩ বছরেরও বেশি সময় জীবিত ছিলেন; সুতরাং তিনি মিথ্যাবাদী নন, বরং সত্যবাদী।

আমি এখানে তাদের এই মনগড়া মূলনীতির জবাব উপস্থাপন করব।

সূরা আল-হাক্কাহর আয়াত দ্বারা কি এই মূলনীতি প্রমাণিত হয়?

প্রথমত, কাদিয়ানীদের উক্ত মূলনীতি আদৌ সঠিক নয়; বরং তা ভিত্তিহীন।

দ্বিতীয়ত, সূরা আল-হাক্কাহর ৪৪-৪৬ নম্বর আয়াত কোনোভাবেই এমন একটি সর্বজনীন নীতি প্রতিষ্ঠা করে না, যেভাবে কাদিয়ানীরা দাবি করে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ ۝ لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ ۝ ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ

অর্থাৎ, “সে যদি আমার নামে কিছু রচনা করে চালাতে চেষ্টা করত, তবে অবশ্যই আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম এবং তার জীবন-ধমনী কেটে দিতাম।”

এই আয়াত মূলত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সত্যতার প্রমাণস্বরূপ বর্ণিত হয়েছে। এখানে কোনো সাধারণ নীতি বর্ণিত হয়নি যে, ভবিষ্যতে নবুওয়তের প্রত্যেক মিথ্যা দাবিদারকে সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

যদি কাদিয়ানীদের ব্যাখ্যা মেনে নেওয়া হয়, তাহলে ইতিহাসে যেসব মিথ্যা নবুওয়ত-দাবিদার দীর্ঘ সময় জীবিত থেকেছে, তাদেরও সত্য নবী বলে স্বীকার করতে হবে। অথচ এটি স্পষ্টতই অযৌক্তিক।

বাহাউল্লাহ: কাদিয়ানীদের জন্য একটি বড় প্রশ্ন

এই প্রসঙ্গে বাহাই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা হোসাইন আলী নূরী (বাহাউল্লাহ)-এর উদাহরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাহাউল্লাহ (১৮১৭–১৮৯২) নিজেকে নবী, রাসূল এবং প্রতিশ্রুত মসীহ হিসেবে দাবি করেছিলেন। অথচ তিনি তার দাবি প্রকাশের পর আরও প্রায় চল্লিশ বছর জীবিত ছিলেন।

কাদিয়ানীদের নিজস্ব পত্রিকা দৈনিক আল-হিকাম (১৭ নভেম্বর ১৯০৪, পৃ. ১৯)-এ এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

যদি কাদিয়ানীদের তথাকথিত “২৩ বছরের নীতি” সত্য হয়, তাহলে বাহাউল্লাহও সত্যবাদী বলে গণ্য হওয়ার কথা। তখন মির্যা গোলাম আহমদের পক্ষে এককভাবে এই যুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।

বাহাউল্লাহর মসীহ ও ওহির দাবি

বাহাই ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাহাউল্লাহ নিজেকে যিশু (আ.)-এর “দ্বিতীয় আগমন” বা “খ্রিস্টের প্রত্যাবর্তন”-এর পূর্ণতা বলে দাবি করেন। তবে তিনি এটিকে আক্ষরিক পুনরাগমন নয়; বরং আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী প্রত্যাবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

১. প্রত্যাবর্তনের ধারণা

বাহাউল্লাহ তাঁর কিতাব-ই-ইকান-এ যুক্তি দেন যে, নবীদের “ফিরে আসা” বলতে তাদের শারীরিক পুনরাগমন বোঝায় না; বরং তাদের ঐশী গুণাবলি ও মিশনের পুনরাবির্ভাব বোঝায়।

২. ইলিয়াস ও ইয়াহইয়া (আ.)-এর উদাহরণ

বাহাই ব্যাখ্যায় বলা হয়, যিশু (আ.) জন দ্য ব্যাপ্টিস্টকে প্রত্যাশিত ইলিয়াস হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, যদিও তিনি আক্ষরিক অর্থে ইলিয়াস ছিলেন না। এখান থেকে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, “খ্রিস্টের প্রত্যাবর্তন”ও প্রতীকী অর্থে বোঝা উচিত।

৩. বাহাউল্লাহর নিজস্ব ঘোষণা

বাহাই ধর্মমতে, বাহাউল্লাহ সেই প্রতিশ্রুত ব্যক্তিত্ব, যার আগমনের সংবাদ বাইবেল, ইসলামি মসীহ-সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী এবং বাবের ঘোষণায় উল্লেখিত হয়েছে।

তবে উল্লেখ্য, এগুলো বাহাই ধর্মের নিজস্ব ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। মূলধারার ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম কিংবা সুন্নি-শিয়া ঐতিহ্য বাহাউল্লাহকে মসীহ মওউদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।

আহমদিয়া সূত্রে বাহাউল্লাহর দাবি

আহমদিয়া লিটারেচারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাহাউল্লাহ ১২৬৯ হিজরিতে নিজেকে “প্রতিশ্রুত মসীহ” বলে দাবি করেন এবং ১৩০৯ হিজরি পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।

এছাড়া কাদিয়ানীদের অফিসিয়াল উর্দু দৈনিক আল-হিকাম-এ আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাহাউল্লাহ দাবি করেছিলেন—

“আল্লাহ আমার প্রতি ওহি নাজিল করেছেন।”

(দৈনিক আল-হিকাম, ভলিউম ৮, নং ৯, ১৭ নভেম্বর ১৯০৪, পৃ. ১৯)

একজন আহমদি পাঠক পত্রিকায় প্রশ্ন করেন:

“বাহাউল্লাহ ওহি লাভের দাবি করার পরও চল্লিশ বছর জীবিত ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তার দাবিতে অটল ছিলেন। তাহলে ‘ওয়া লাও তাকাওয়ালা আলাইনা’ আয়াতের ব্যাখ্যা কী হবে?”

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পত্রিকার সম্পাদক এই প্রশ্নের কোনো প্রত্যক্ষ উত্তর দেননি। ফলে বাহাউল্লাহর দীর্ঘকাল জীবিত থাকা এবং তার দাবিতে অবিচল থাকার বিষয়টি কার্যত অস্বীকারও করা হয়নি।

উপসংহার

প্রিয় পাঠক!

যদি কাদিয়ানীদের উপস্থাপিত “২৩ বছরের নীতি” গ্রহণ করা হয়, তাহলে একই যুক্তিতে বাহাউল্লাহ এবং বাহাই ধর্মকেও সত্য বলে স্বীকার করতে হবে। কারণ বাহাউল্লাহ তার দাবি প্রকাশের পর প্রায় চল্লিশ বছর জীবিত ছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নিজের দাবিতে অটল ছিলেন।

অতএব, কাদিয়ানীদের এই যুক্তি তাদের নিজেদের জন্যই একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এই যুক্তি গ্রহণ করলে কেবল মির্যা গোলাম আহমদের দাবিই নয়, ইতিহাসের অন্যান্য নবুওয়ত-দাবিদারদের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।

সুতরাং, সূরা আল-হাক্কাহর উক্ত আয়াতকে কেন্দ্র করে যে মূলনীতি কাদিয়ানীরা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তা কুরআন, ইতিহাস এবং যুক্তি—কোনোটির সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্য উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

(প্রামাণ্য স্ক্রিপ্ট নিম্নরূপ)

লেখক: প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here