Home আপত্তি খন্ডন তোমরা তা কামড়ে ধরো: একটি আপত্তির উত্তর,

তোমরা তা কামড়ে ধরো: একটি আপত্তির উত্তর,

0
তোমরা তা কামড়ে ধরো: একটি আপত্তির উত্তর,

তোমরা তা কামড়ে ধরো: হাদীসের বিশেষ শব্দ ও একটি আপত্তির একাডেমিক বিশ্লেষণ

ভূমিকা:

ইসলামবিরোধী ও সমালোচনামূলক লেখালেখিতে হাদীসের কিছু আরবী শব্দ—বিশেষ করে রূপক ও অলঙ্কারধর্মী (بلاغي) বাক্য—প্রায়ই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়।

এর একটি উদাহরণ হলো সহীহ হাদীসে ব্যবহৃত একটি অভিব্যক্তি, যেখানে বলা হয়েছে—

مَنْ تَعَزَّى بِعَزَاءِ الْجَاهِلِيَّةِ فَأَعِضُّوهُ وَلاَ تُكَنُّوهُ

এই হাদীসের কিছু শব্দকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। অথচ আরবী ভাষা, প্রাচীন বাগধারা এবং মুহাদ্দিসদের ব্যাখ্যা একে একটি স্পষ্ট নৈতিক নির্দেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।

মূল হাদীস (ইমাম বুখারীর আদাবুল মুফরাদ থেকে)

আরবী (হরকতসহ):

حَدَّثَنَا عُثْمَانُ الْمُؤَذِّنُ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَوْفٌ، عَنِ الْحَسَنِ، عَنْ عُتَيِّ بْنِ ضَمْرَةَ قَالَ: رَأَيْتُ عِنْدَ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ رَجُلًا تَعَزَّى بِعَزَاءِ الْجَاهِلِيَّةِ، فَأَعَضَّهُ أُبَيٌّ وَلَمْ يُكَنِّهِ، فَقَالَ: إِنِّي لَا أَهَابُ فِي هٰذَا أَحَدًا أَبَدًا، إِنِّي سَمِعْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَقُولُ: مَنْ تَعَزَّى بِعَزَاءِ الْجَاهِلِيَّةِ فَأَعِضُّوهُ وَلَا تُكَنُّوهُ

এর সহজ ও সাধারণ বাংলা অনুবাদ হতে পারে:

উতাই ইবনু দামরাহ (রহ.) বলেন, আমি উবাই ইবনু কা’ব (রা.)-এর কাছে এক ব্যক্তিকে দেখলাম, যে জাহেলি যুগের বংশগৌরব ও গোত্রীয় স্লোগান দিচ্ছিল। তখন উবাই (রা.) তাকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করলেন এবং কোনো পরোক্ষ বা মার্জিত শব্দ ব্যবহার করলেন না। এরপর তিনি বললেন,
“এ ব্যাপারে আমি কাউকে পরোয়া করি না। আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি:
‘যে ব্যক্তি জাহেলি যুগের বংশীয় গৌরব ও গোত্রীয় আহ্বানকে আঁকড়ে ধরে, তোমরা তাকে কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করবে এবং ভদ্রতা বা ঘুরিয়ে কথা বলার আশ্রয় নেবে না।’

আরও আক্ষরিক অনুবাদ করলে শেষ অংশটি হবে:

“যে ব্যক্তি জাহেলি যুগের বংশগৌরবের ডাক দেয়, তাকে বলো যেন সে তার পিতার পুরুষাঙ্গ কামড়ে ধরে; এবং এ কথা ইঙ্গিতপূর্ণ বা ঘুরিয়ে না বলে স্পষ্টভাবেই বলো।”

নোট: তবে অধিকাংশ ব্যাখ্যাকার ব্যাখ্যা করেছেন যে, এর উদ্দেশ্য অশ্লীলতা নয়; বরং জাহেলি অহংকার ও গোত্রীয় গর্বের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভর্ৎসনা প্রকাশ করা। তাই সাধারণ পাঠকের জন্য ভাবানুবাদে “কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করো” অর্থটি বেশি বোধগম্য।

অন্য বর্ণনা (শব্দগত ভিন্নতা)

আরবী (হরকতসহ):

إِذَا الرَّجُلُ تَعَزَّى بِعَزَاءِ الْجَاهِلِيَّةِ فَأَعِضُّوهُ بِهَنِ أَبِيهِ وَلَا تُكَنُّوا.

শব্দ ও অর্থের মূল আপত্তি:

সমালোচকরা বিশেষ করে নিম্নোক্ত বাক্যাংশ নিয়ে আপত্তি তোলে—

فَأَعِضُّوهُ بِهَنِ أَبِيهِ

তারা এটিকে আক্ষরিক অর্থে “অশালীন বাক্য” হিসেবে উপস্থাপন করে।

একাডেমিক বিশ্লেষণ (ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি):

১. “أَعِضُّوهُ” শব্দের প্রকৃতি

আরবী ভাষায় এটি একটি রূপক ও বাগধারাগত (مجازي / بلاغي) অভিব্যক্তি।

এর অর্থ:

“তাকে কঠোরভাবে লজ্জিত করো / তার ভ্রান্ত অহংকার ভেঙে দাও”

২. “بِهَنِ أَبِيهِ” প্রসঙ্গ

এটি আরবী ভাষায় প্রচলিত একটি অতিশয়োক্তি ও তিরস্কারমূলক রূপক বাক্য, যার উদ্দেশ্য শাব্দিক অশ্লীলতা নয়, বরং—

বংশীয় অহংকার ও জাহিলি গর্বকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়া

৩. ইমাম মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর ব্যাখ্যা

তিনি বলেন—

مَعْنَاهُ مَنِ انْتَسَبَ إِلَى الْجَاهِلِيَّةِ… فَاذْكُرُوا لَهُ قَبَائِحَهُ… صَرِيحًا لَا كِنَايَةً

অনুবাদ (শুদ্ধ ও সহজ):

“এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি জাহিলি যুগের অহংকার ও গর্বকে পুনরুজ্জীবিত করে, তাকে তার বা তার পূর্বপুরুষদের নিন্দনীয় কাজসমূহ সরাসরি স্মরণ করিয়ে দাও, যাতে সে তা থেকে বিরত হয়।”

মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?

এই হাদীসের উদ্দেশ্য ছিল—

বংশীয় অহংকার ধ্বংস করা

সামাজিক বৈষম্য রোধ করা

ইসলামি ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা

আরবী ভাষার অলংকার (بلاغة) প্রসঙ্গ:

আরবী ভাষায় এমন বহু বাগধারা আছে যেখানে শাব্দিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়।

যেমন—

“رَغِمَ أَنْفُهُ”

অর্থ: “তার নাক ধূলায় ধূসরিত হোক”

প্রকৃত অর্থ: “সে অপমানিত/ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে”

একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত:

সহীহ মুসলিমে রাসূল (সা.) বলেন—

رَغِمَ أَنْفُهُ، ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُهُ…

এখানেও শাব্দিক অর্থ নয়, বরং রূপক অর্থ গ্রহণ করা হয়।

আপত্তির জবাব (একাডেমিকভাবে):

আপত্তি: “এটি অশালীন ভাষা”

জবাব:

১. আরবী ভাষায় এটি বাগধারা
২. মুহাদ্দিসগণ এর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন
৩. উদ্দেশ্য গালি নয়, সামাজিক সংশোধন
৪. প্রাচীন আরব সমাজে এটি প্রচলিত অলংকার

হাদীসের ব্যাখ্যাগত নীতি:

উসূলুল হাদীস অনুযায়ী—

কোনো শব্দকে শুধু আক্ষরিক অর্থে নয়,
বরং প্রসঙ্গ, ভাষা ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী বুঝতে হবে

উপসংহার:

এই হাদীসে ব্যবহৃত শব্দগুলোকে অশালীন বলা ভাষাগত ও গবেষণাগতভাবে সঠিক নয়।

বরং এটি ছিল—

সামাজিক সংস্কারমূলক নির্দেশ

বংশীয় অহংকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান

আরবী ভাষার স্বাভাবিক অলংকারিক অভিব্যক্তি

সুতরাং, এই হাদীসকে “অশালীনতা” হিসেবে উপস্থাপন করা মূলত ভাষাগত অজ্ঞতা ও প্রসঙ্গ বিচ্যুত ব্যাখ্যার ফল।

লেখক:
মুহাম্মদ নূরুন্নবী এম.এ
অ্যাডমিন- রদ্দে কাদিয়ানী অ্যাপস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here