‘ক্বদ খালাত মিন কবলিহির রসুল’ এর সঠিক তাৎপর্য ও কিছু প্রশ্ন

আল্লাহতালা বলেন : ‘মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র; তাহার পূর্বে বহু রাসূল গত হইয়াছে।’ (কুরআন ০৩:১৪৪/ইফা; কাদিয়ানীদের খলীফা হেকিম নূরউদ্দীনও ‘আর-রসুল’ (الرسل) হতে ‘বহু রাসূল’ অর্থ নিয়েছেন; ফাছলুল খিতাব লি-মুকাদ্দিমাতি আহলিল কিতাব [উর্দূ] পৃষ্ঠা ২৮; রচনা ১৮৮৭-৮৮ইং দ্রষ্টব্য)।

  • এখানে বলে রাখতে চাই, হেকিম সাহেব বইটি জম্মুর মহারাজার রাজপুত্রকে চিকিৎসা দেয়ার উদ্দেশ্যে পুঞ্চে অবস্থানকালে খ্রিস্টানদের রদ করতে লিখেছিলেন। বইটি লিখার সময় তিনি সকল বিষয়ে মির্যা কাদিয়ানীর পরামর্শ চাইতেন। একথা লিখা আছে ‘হযরত মৌলভী নূরউদ্দীন (রা.) খলীফাতুল মসীহ আউয়াল’ নামীয় পুস্তকের ৭৪-৭৫ পৃষ্ঠায়।

এবার প্রশ্নোত্তর পর্বে যাওয়া যাক!

প্রশ্ন : কাদিয়ানীদের ‘আহমদীয়া মুসলিম জামা’ত এর পরিচিতি’ নামক প্রচারপত্রে সূরা আলে ইমরানের ১৪৪ নং আয়াতটি উল্লেখপূর্বক লিখা আছে “মানুষ মাত্রই মরণশীল-এ চিরন্তন নিয়ম এবং কুরআনের উপরোক্ত আয়াত ও অন্যান্য স্থানের ঘোষণামতে হযরত ঈসা (আ:) স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন।” একথা কি ঠিক?

জবাব : না, এ আয়াত দ্বারাও ঈসা (আ:) স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন, একথা সাব্যস্ত হয়না। কারণ ‘খালাত’ (ক্রিয়ামূল : খুলূ/خُلُوُّ) শব্দটি মৃত্যু অর্থের জন্য নির্দিষ্ট নয় বরং এমন সব ব্যক্তিকেও ‘গত হইয়া গিয়াছে’ অর্থে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে যারা জীবিত আছে বটে তবে দায়িত্বে বর্তমান নেই অথবা একস্থান থেকে অন্যস্থানে জীবিত চলে গেছেন। যেমন, কেউ বলল এলাকার বর্তমান চেয়ারম্যানের আগেও বহু চেয়ারম্যান গত হয়ে গেছেন। তো এর অর্থ কিন্তু এ নয় যে, আগের সব চেয়ারম্যানই মৃত্যুবরণ করেছেন। কেননা সাবেক দু’-একজন চেয়ারম্যান বর্তমান চেয়ারম্যানের আমলেও জীবিত থাকতে পারে, শুধু দায়িত্বে থাকেন না।

তেমনিভাবে ‘খালাও’ (ক্রিয়ামূল : খুলূ/خُلُوُّ) শব্দটি পবিত্র কুরআনের একাধিক জায়গায় জীবিত ব্যক্তির জন্যও উল্লেখ রয়েছে। যেমন ‘ওয়া ইযা-খালাউ ইলা-শাইয়াতীনিহিম কা-লূইন্না-মা’আকুম’ অর্থাৎ আর যখন তাহারা নিভৃতে তাহাদের শয়তানদের (মুনাফিক দলপতিদের) সঙ্গে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই রহিয়াছি’ (০২:১৪ অনুবাদ-ইফা)। অনুরূপ ‘ওয়া ইম মিন উম্মাতিন ইল্লাখালা-ফীহা-নাযীর’ অর্থাৎ এমন কোন সম্প্রদায় নাই যাহার নিকট সতর্ককারী প্রেরিত হয় নাই’ (৩৫:২৪ অনুবাদ-ইফা)। এখানে একদম পরিষ্কার যে, আয়াত দুটিতে যথাক্রমে ‘খালাউ’ এবং ‘খালা’ (خَلَوْا; خَلًا) শব্দদু’টি আর যাইহোক অন্ততপক্ষে ‘মৃত্যু’ অর্থ বুঝাতে আসেনি।

মজার ব্যাপার হল, ‘লিসানুল আরব’ অভিধানগ্রন্থে এসেছে قد خلت امرأة من زوجها অর্থাৎ মহিলাটি নিজ স্বামী থেকে পৃথক হয়ে গেল। এর মানে বুঝাতে চাচ্ছি, ‘খালাত’ শব্দের প্রকৃত অর্থ ‘মৃত্যু’ নয়। তবে বিভিন্ন ক্বারীনা বা নিদর্শন পাওয়া গেলে শুধুমাত্র তখনি সেটি রূপক অর্থে মৃত্যু অর্থ প্রদান করবে। অভিধানে এর অনেক উদারহরণ রয়েছে।

এরপর তারা আয়াতটির ‘আর-রসুল’ (الرسل) হতে ‘সমস্ত রাসূল’ অর্থও নিয়ে থাকে। এমতাবস্থায় তাদের নিকট নিচের প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব থাকেনা।

প্রশ্নগুলো এই

(১) তাদের কৃত অর্থানুসারে ‘সমস্ত রাসূল মৃত্যুবরণ করেছে’ উদ্দেশ্য হলে তখন জিবরাইল আলাইহিস্-সালামও এখন আর বেঁচে নেই, মানতে হবে! কেননা পবিত্র কুরআনে জিবরাইলও ‘রাসূল’ নামে ভূষিত। যেমন বিবি মরিয়মের উদ্দেশ্যে জিবরাইল (আ:) বলেছিলেন : ‘ক্বা-লা ইন্নামা আনা রাসূলু রাব্বিকি লিআহাবা লাকি গুলা-মান ঝাকিইইয়া’ অর্থাৎ সে বলল আমি তো কেবল তোমার রবের একজন রাসূল (তথা বার্তাবাহক), তোমাকে একজন পবিত্র পুত্র সন্তান দান করার জন্য এসেছি। (মরিয়াম/১৯:১৯)। এখন এর কী জবাব?

(২) আমাদের বিশ্বাস, আয়াতটির ‘আর-রসুল’ এর আলিফ-লাম হল ‘আহ্দে খারেজি’। যেহেতু কুরআনের বহু ইংগিত আর অসংখ্য মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা ঈসা (আ:) এর পুনঃআগমনী বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণিত। যে কারণে ‘গত হইয়া গিয়াছে’ বলতে ‘মৃত্যুবরণ করা’ উদ্দেশ্য নিতে হলে, তখন ঈসা (আ:)-কে ঠিক সেভাবে উক্ত আয়াতের ‘আর-রসুল’ এর অন্তর্ভুক্তির বাহিরে রাখতে হবে যেভাবে সূরা আল-হুজুরাত এর ১৩ নং আয়াত “হে মানবমন্ডলী! নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি” ঘোষণার ‘ইয়া-আইয়ুহান্নাস’ (হে মানবমন্ডলী) এর অন্তর্ভুক্তির বাহিরে রাখা হয়েছে। নতুবা প্রত্যেক কাদিয়ানী হযরত ঈসা (আ:)-কেও ‘মানবমন্ডলী’র অন্তর্ভুক্ত হিসেবে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকেই সৃষ্ট বলে স্বীকার করতে বাধ্য। অথচ ঈসা (আ:) শুধুমাত্র একজন নারী থেকে সৃষ্ট, তার কোনো পিতা ছিল না।

(৩) আচ্ছা মানলাম, তাদের ‘সমস্ত রাসূল মৃত্যুবরণ করেছে’ এ অর্থই সঠিক; তাহলে তারা সূরা মায়েদার ৭৫ নং আয়াতের ‘আর-রসুল’ হতেও কি ‘সমস্ত রাসূল মৃত্যুবরণ করেছে’ এমন অর্থ নেবে? যদি এমন অর্থ নেয়া হয় তখন কি মুহাম্মদ (সা:) এর নবুওয়ত ও রেসালতেরও অস্বীকার করা হল না? কেননা যদি বলা হয় যে, মসীহ ইবনে মরিয়মের পূর্বে সমস্ত রাসূল মৃত্যুবরণ করিয়াছে, তখন মসীহ (আ:)-এর পর আগমনকারী মুহাম্মদে আরাবী (সা:)-কে তারা একজন রাসূল হিসেবে কিভাবে স্বীকার করল?

(৪) মির্যা কাদিয়ানীর ৮৩টি বইয়ের সমষ্টি ২৩ খন্ডে প্রকাশিত রূহানী খাযায়েন নামক বইয়ের অষ্টম খন্ডের ৬৮-৬৯ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে بانه حى فى السماء و لم يمت و ليس من الميتين অর্থাৎ ‘নিশ্চয় তিনি (অর্থাৎ মূসা) আকাশে জীবিত, তিনি মৃত্যুবরণ করেননি এবং তিনি মৃতদের অন্তর্ভুক্তও নন।’ সংক্ষেপে। আরো দেখুন, রূহানী খাযায়েন ৭/২২১।

এখন উক্ত আয়াত দ্বারা সমস্ত রাসূল মৃত্যুবরণ করা উদ্দেশ্য হলে তখন মূসা আলাইহিস্-সালামও বেঁচে থাকেন কিভাবে? বিশ্বাস না হলে রেফারেন্স মিলিয়ে দেখুন! উদ্ধৃতিটির শুরুতে মূসা (আ:)-এর নাম সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। মির্যায়ী রচনা ‘হামামাতুল বুশরা’র বাংলা অনূদিত কপিও (পৃষ্ঠা নং ৬২; প্রকাশকাল নভেম্বর ২০১১ইং) দেখুন। তিনি লিখেছেন ‘তুমি জানো এ আয়াত (আস সেজদা : ২৪) মূসা (আ:) সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে আর এটি তাঁর জীবিত থাকার স্পষ্ট প্রমাণ।’ এখন এর কী জবাব

(৫) কাদিয়ানীদের দাবী অনুসারে উক্ত আয়াত দ্বারা ঈসা (আ:) বেঁচে নেই, মৃত্যুবরণ করিয়াছেন মর্মে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে ইজমা (ঐক্যমত) প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকলে বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকারক বরেণ্য স্কলার ও যুগ ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) ঈসা (আ:)-এর সশরীরে আকাশে জীবিত থাকা মর্মে ‘আন্নাহু রাফা’আহু বি-বাদানিহি হাইয়ান’ অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা নিশ্চয়ই তাঁকে সশরীরে জীবিত উঠিয়ে নিয়েছেন, কেন লিখে গেলেন? (রেফারেন্স, ইবনে হাজার রচিত ‘আত-তালখীছুল হাবীর’ কিতাবুত তালাক: খন্ড ৩ পৃষ্ঠা ৪৬২)। তেমনিভাবে শায়খ ইবনে তাইমিয়াহ (রহ:) তিনিও বা কেন লিখলেন যে ‘ওয়াজমা’আতুল উম্মাতু আ’লা আন্নাল্লাহা আ’জ্জা ওয়া জাল্লা রাফা’আ ঈসা ইলাইহি ফীস-সামায়ি’ অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মদীয়া এইমর্মে সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন যে, নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা ঈসা (আ:)-কে নিজের নিকট আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন? (রেফারেন্স, ইমাম ইবনে তাইমিয়া রচিত ‘বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যা’ ২/৪১৯)।

  • মজারব্যাপার হল, ইবনে হাজার আসকালানী আর শায়খ ইবনে তাইমিয়াহ তারা দুইজনই মির্যা কাদিয়ানীর নিকটেও মুজাদ্দিদ ও যুগ ইমাম হিসেবে স্বীকৃত। (দেখুন, মির্যা কাদিয়ানীর শিষ্য মির্যা খোদাবক্স কাদিয়ানী রচিত ‘আছলে মুছাফফা’ [উর্দূ] খন্ড ১ পৃষ্ঠা নং ১৪২-৪৫; প্রথমপ্রকাশ ১৯০১ইং, কাদিয়ান থেকে)। উল্লেখ্য, মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন, মুজাদ্দিদগণ দ্বীনের মধ্যে কোনোরূপ বেশকম করেননা বরং হারানো দ্বীন পুন: প্রতিষ্ঠা করে থাকেন। রূহানী খাযায়েন ৬/৩৪৪ দেখুন। এখন এর কী হবে?
কাদিয়ানীদের স্বীকৃত কিতাব ‘আছলে মুছাফফা‘ (উর্দূ)। রচনাকাল ১৯০১ ইং

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

Previous articleওয়াহদাতুল উজূদ এর সঠিক ব্যাখ্যা
Next articleঈসা (আ:) কি কাশ্মীরে এসেছিলেন?
প্রিয় পাঠকবৃন্দ! এটি সম্পূর্ণ দ্বীনি ও অলাভজনক একটি ওয়েবসাইট। প্রতি বছর এটির ডোমেইন ও হোস্টিং ফি হিসেবে আমাকে এর ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। যদি উক্ত ব্যয় বহন করতে অপারগ হই তাহলে এই সাইটটি নিশ্চিত বন্ধ হয়ে যাবে। সেহেতু আপনাদের সবার নিকট আবেদন থাকবে যে, আপনারা সাইটটির উক্ত ব্যয় বহনে এতে বিজ্ঞাপন দিতে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করবেন এবং নিজেরাও সহযোগিতায় এগিয়ে আসবেন। বিনীত এডমিন! বিকাশ : ০১৬২৯-৯৪১৭৭৩ (পার্সোনাল)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here