নিচে ১ থেকে ৩০ নং পর্যন্ত আয়াতগুলো কাদিয়ানীদের বই থেকে নেয়া আর খন্ডনমূলক জবাবগুলো আমার।

:: ত্রিশ (৩০) আয়াতের ভুল ব্যাখ্যার খন্ডনমূলক জবাব ::

প্রশ্ন : কাদিয়ানীদের মাঝে প্রচলিত আছে যে, কুরআনের ত্রিশ আয়াত দ্বারা নাকি প্রমাণিত ঈসা (আ:) মারা গেছেন! তাদের দাবীটি কতটুকু বাস্তবসম্মত?

উত্তর : না, তাদের এ দাবী সম্পূর্ণরূপে মির্যা কাদিয়ানী থেকে ধারকরা। তাদের এ দাবী বাস্তবতার সাথে লেশমাত্রও সম্পর্ক নেই। নিচে তাদের পেশকৃত আয়াতগুলোর ভুল ব্যাখ্যার খন্ডনমূলক জবাব তুলে ধরছি :

হযরত ঈসা (আ:) স্বীয় প্রভুর নিকট এই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হতে চেয়ে প্রার্থনা করেছিলেন কি? অথবা তিনি শুধুই “উম্মত” হিসেবে আসবেন এইরূপ কোনো হাদীস রয়েছে কি? জানতে ক্লিক করুন : (ফেইসবুক থেকে) Click

  • আয়াত ১ : ‘হে ঈসা নিশ্চয় আমি তোমাকে নিয়ে নিচ্ছি এবং তোমাকে নিজের কাছে তুলিয়া লইতেছি…।’ (কুরআন ০৩:৫৫; অনুবাদ, মির্যায়ী প্রথম খলিফা হেকিম নূরুদ্দিন কৃত তাসদীকে বারাহীনে আহমদিয়া ১/৮)।

জবাব : এই আয়াতে متوفيك [মুতাওয়াফ্ফীকা] শব্দটি ইস্মে ফায়েল এর ছিগাহ; মূল হচ্ছে وَفْيُ [ওয়াফ্ইউ]। এটি বাবে তাফা’উল (تفعل)’র মধ্যে থেকে অর্থ দেবে ‘নিয়ে নেয়া’। আর এই নিয়ে নেয়ার ঘটনা কিরূপে সংঘটিত হয়েছিল তাও আল্লাহতালা সূরা নিসার ১৫৮ নং আয়াতে ‘রাফা’আহুল্লাহু ইলাইহি’ দ্বারা সুস্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁকে উপরে উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমেই নিয়ে নেয়া হয়েছে। তাই আয়াতটি দ্বারা ঈসা (আ:)-কে মৃত প্রমাণ করা ঠিক হবেনা। তবে হ্যাঁ ‘তাওয়াফ্ফা’ এর রূপক অর্থ ‘মৃত্যু’ নেয়া হলে তখন তা বিশিষ্ট সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস (রা:)-এর তাফসীর অনুসারে বাক্যের মধ্যে শব্দের তাকদিম-তাখিরের ধারা-বিন্যাস জরুরী। আর তখন আয়াতটির অর্থ দাঁড়াবে, ‘ইয়ানী রাফেউকা ছুম্মা মুতাওয়াফ্ফীকা ফী আখিরিয্ যামান’ (يعني رافعك ثم متوفيك فى آخر الزمان) অর্থাৎ তোমাকে উঠিয়ে নেব অতপর শেষ যুগে তোমাকে ওফাত (মৃত্যু) দেব। (ইমাম সুয়ূতী রচিত দুররে মানছূর ৩/৫৯৮; সূরা আলে ইমরান)।

এই একই মর্মার্থের আরেকটি হাদীস হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) এর সূত্রে ‘তারিখে ইবনে আসাকীর’ নামক গ্রন্থেও রয়েছে। ইমাম ইবনে আসাকীর (ابن عساكر) [জন্ম-মৃত্যু:৪৯৯-৫৭১হিজরী] তিনি জাওহার (جوهر) থেকে তিনি যাহহাক (الضحاك) থেকে তিনি হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, رافعك ثم متوفيك فى آخر الزمان অর্থাৎ তোমাকে উঠিয়ে নেব অতপর শেষ যুগে তোমাকে মৃত্যু দেব।  (তারিখে ইবনে আসাকী, সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ৫৫ এর তাফসীর দ্রষ্টব্য)। সারকথা হল, ক্বারীনা বশত ‘তাওয়াফফা’ এর রূপক অর্থ মৃত্যু বটে, কিন্তু মৃত্যু অর্থে খাস নয়। নতুবা মির্যা সাহেব তার একটি রচনায় متوفيك অর্থ ‘সেই ঈসার জন্ম হইয়া গিয়াছে’ নিলেন কিভাবে? (কিশতিয়ে-নূহ [বাংলা] ৬৩)।

কাদিয়ানী সম্প্রদায় যে কয়টি হাদীসের মনগড়া ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে ঈসা (আ:)-কে মৃত প্রমাণ করে থাকে তার দালিলিক ও যুক্তিক খন্ডনমূলক জবাব এখানে Click

শেষ যুগে ঈসা (আ:) আবার ফিরে আসলে তখন “শেষনবী” কে হচ্ছেন—কাদিয়ানীদের প্রশ্নের জবাব : Click

আল-কুরআনে লোহা, পোশাক, গবাদিপশু ইত্যাদি  নাযিল হওয়ার আয়াত ও কাদিয়ানীদের ভ্রান্তি নিরসন : ডকুমেন্ট সহ ওয়েবসাইট থেকে পড়ুন : Click

উল্লেখ্য, মির্যা কাদিয়ানী নিজেই লিখেছেন : ‘তাওয়াফফী’ এমন কোনো শব্দ নয় যার তাফসীর কেউ নিজ ইচ্ছেমতো করতে পারে। (হামামাতুল বুশরা ৯৯ [বাংলা])। তিনি এর ব্যাখ্যাকারী হিসেবে কুরআন, হাদীস এবং সাহাবাদের তাফসীরসহ যুগ-ইমামগণের মতের প্রয়োজন রয়েছে বলে লিখে গেছেন। কুরআন মাজীদে এমনি ধরণের বিশেষ বিশেষ রহস্যের কারণে শব্দ আগে-পিছে হওয়ার ভুরি ভুরি নজির রয়েছে। তন্মধ্যে সূরা আলে ইমরান এর ৪৩ নং আয়াত অন্যতম। আল্লাহতালা মরিয়ম (আ:) সম্পর্কে বলেন, واسجدى واركعى مع الراكعين অর্থাৎ তুমি সিজদা কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর। এখানে প্রথমে সেজদা তারপর রুকুর কথা আসছে। কাদিয়ানীরা কি নামাযে প্রথমে সেজদা তারপর রুকুকরে?

  • আয়াত ২ : ‘বরং আল্লাহ তাহাঁকে তাঁহার নিকট তুলিয়া লইয়াছেন।’ (কুরআন ০৪:১৫৮/ইফা)।

জবাব : এই আয়াতে ঈসা (আ:) এর মৃত্যু সম্পর্কে ইংগিতেও কোনো কথা নেই। বরং এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাব হয় যে, আল্লাহতালা নিজের অলৌকিক শক্তি দ্বারা ঈসা (আ:)-কে জীবিত অবস্থায় সশরীরে আকাশে তুলে নিয়েছেন।

আপনি বলতে পারেন, আয়াতের কোথাও তো ‘আকাশ’ শব্দের উল্লেখ নেই। তার জবাব হল, আয়াতটিতে আপনাদের বিশ্বাসমতে ‘ঈসা (আ:)-এর রাফা কাশ্মীরে’ হয়েছিল, এই কথাও তো নেই! অধিকন্তু তাঁর ‘রাফা’ সশরীরে আকাশে হওয়ার সমর্থনে অসংখ্য মুতাওয়াতির হাদীস এবং তার শানে নুযূল বিদ্যমান রয়েছে। মির্যা সাহেব নিজেও শানে নুযূল সম্পর্কে চিন্তা করতে বলে গেছেন। (দেখুন ‘হামামাতুল বুশরা’ [বাংলা] পৃষ্ঠা নং ১০৩)।

এই পর্যায় ঈসা (আ:) এর অবতরণ ‘আকাশ থেকে’ হওয়ার দলিল ‘মিনাস সামায়ি’ শব্দে যেসব হাদীস ও তাফসীর গ্রন্থে রয়েছে নিচে তার কয়েকটির রেফারেন্স দেয়া হল। যথা, ইমাম বায়হাক্বীর ‘আল আসমা ওয়াস সিফাত’ ২/৩৩১ হা/৮৯৫, মসনাদে বাজ্জার ১৭/৯৬ হা/৯৬৪২, ইমাম ইবনে আসাকির এর ‘তারিখে দামেস্ক’ ৪৭/৫০৪-৫, কাঞ্জুল উম্মাল ১৪/৬১৮-১৯ হা/৩৯৭২৬, ইমাম আল-মুক্বরী আদ-দানী’র ‘আস-সুনানুল ওয়ারিদাহ ফিল ফিতানি ওয়া গাওয়ায়িলুহা ওয়াস সা’আতু ওয়া ইশরাতুহা’ ৫/১১০৫, ইমাম শাহরাস্তানীর ‘আল মিলালু ওয়ান নাহাল’ ৩/৯, ইমাম সুয়ূতীর ‘আল আরফুল ওয়ারদী’ পৃষ্ঠা নং ১৩৮, ইমাম ইউসুফ ইবনে ইয়াহ্ইয়া ইবনে আলী ইবনে আব্দুল আজীজ আল মাকদিসি আশ-শাফেয়ীর ‘ইক্বদুদ দুরারি ফী আখবারিল মুনতাজির’ ১/২৯৫, ইমাম সুয়ূতীর ‘তাফসীরে দুররে মানছুর’ ৫/৩৫০, সূরা মায়েদা দেখা যেতে পারে। আর হ্যাঁ, ‘বাল’ শব্দের তাৎপর্য একটু পরেই আলোচিত হবে। সেখান থেকে দেখে নেবেন।

কাদিয়ানীদের উদ্দেশ্যমূলক একটি প্রশ্ন ও আমার ডকুমেন্টারি জবাব! ওয়েবসাইট থেকে Click

যাইহোক, ইহুদীরা যখন ঈসার (আ:) বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র করলো (কুরআন ০৩:৫৪) এবং পাকড়াও করতে তাঁকে ঘিরে সমবেত হলো (তারিখে ইবনে আসাকীর ৪৭/৪৭২; দুররে মানছূর ৩/৫৯৫ দ্রষ্টব্য); ঠিক সেই মুহূর্তে সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী মহান আল্লাহ তাঁকে উঠিয়ে নেন (কুরআন  ০৪:১৫৮)। তিনি জিবরাইল (আ:)-এর মাধ্যমে এইভাবেই তাঁকে সাহায্য করেছিলেন এবং আকাশে সশরীরে উঠিয়ে নিতে নির্দেশ করেছিলেন (কুরআন ০৫:১১০; তারীখে ইবনে আসাকীর ৪৭/৩৭৯)। সুতরাং উক্ত আয়াতের ‘রাফা’ অর্থ শুধুমাত্র রূহ উঠিয়ে নেয়ার দাবী আয়াতটির শানে নুযূল বা প্রেক্ষাপটের বিচারে একেবারেই প্রত্যাখ্যাত।

মির্যা কাদিয়ানীর বইতে বাইবেলের বক্তব্যকে বিকৃত করে উদ্ধৃত করার একখানা  ডকুমেন্টারি প্রমাণ: Click

আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, তবে কেন আল্লাহতালা মুহাম্মদ (সা:)-কে আকাশে নেননি?

এর জবাব মির্যা কাদিয়ানীর বই থেকে দিচ্ছি। মির্যা সাহেব লিখেছেন : “মুহাম্মদ (সা:)-কে মে’রাজের রাতে সশরীরে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল। সকল সাহাবীর এটাই বিশ্বাস।” (রূহানী খাযায়েন ৩/২৪৭)। সুতরাং বুঝা গেল, আল্লাহতালা তাঁর প্রিয় হাবীবকেও আকাশে নেননি বলা আপনার পুরোপুরি অজ্ঞতা ছাড়া কিছুই না।

আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, আল্লাহতালা ঈসা (আ:)-এর মত মুহাম্মদ (সা:)-কেও কিজন্য আকাশে নিয়ে রাখলেন না?

তার জবাব হল, মুহাম্মদ (সা:) এমন সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী নবী যদি উনার জীবদ্দশায় অন্য কোনো নবী বেঁচে থাকতেন তবে তাঁর জন্যও মুহাম্মদ (সা:)-এর আনুগত্য করা আবশ্যক হয়ে যেত। সূরা আহযাবের ৭ নং আয়াতে আল্লাহতালা সকল নবী থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার নেয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে। মূলত সেই অঙ্গীকার পূর্ণ করতেই আল্লাহতালা ঈসা (আ:)-কে মুহাম্মদ (সা:)-এর উম্মত করে দুনিয়াতে দ্বিতীয়বার পাঠাতে ইহুদীদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করে আকাশে উঠিয়ে নেন। এতে ঈসা (আ:)-এর নয় বরং মুহাম্মদ (সা:)-এরই শ্রেষ্ঠত্বের নজির স্থাপন করা হয়েছে।

আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে আল্লাহতালা বিশেষভাবে ঈসা (আ:)-কে কেন এজন্য নির্বাচিত করলেন?

আমরা এর জবাব বিখ্যাত মুফাসসির আবুল লাইস সামরকন্দী (রহ:)-এর কিতাব থেকে জেনে নেব যিনি আজ থেকে হাজার বছর পূর্বে ৩৭৩ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। এই মহান ইমাম কর্তৃক আরবী ভাষায় রচিত ‘তাফসীরে সামরকন্দী’ এর ১ম খন্ডের ২৭২ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে ‘ঈসা (আ:) আল্লাহর নিকট শেষনবীর উম্মত হতে চেয়ে দোয়া করেছিলেন। তাই আল্লাহতালা তাঁর উক্ত দোয়া কবুল করেছেন।’ (সূরা আলে ইমরান আয়াত নং ৫৫ এর তাফসীর অংশ দ্রষ্টব্য)।

এবার আপনি বলতে পারেন, ‘আল্লাহর দিক কোন্টি? তিনি তাঁকে তাঁর কোন্ দিকে তুলিয়া লইয়াছেন?’

জবাব এই যে, পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে تعرج الملائكة و الروح اليه (তা’রুজুল মালা-ইকাতু ওয়াররূহু ইলাইহি) অর্থাৎ ফেরেশতারা এবং রূহ (জিবরাইল) আল্লাহর দিকে আরোহন করেন এমন একটি দিনে যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর (সূরা মা’আরিজ/৭০:০৪)। এখানে ফেরেশতারা আল্লাহর কোন্ দিকে আরোহন করে বলা হল, বলুন! আশা করি জবাব পেয়ে গেছেন।

প্রশ্নটির আরেকটি উত্তর হল, মির্যা কাদিয়ানীর রচনাবলীর সমষ্টি ‘রূহানী খাযায়েন’ (১৭:১০৮) এর মধ্যে পরিষ্কার লিখা আছে,  خدا کی طرف اور وہ اونچی ہے جسکا مقام انتہائے عرش ہے۔ -(বাংলা উচ্চারণ) : খোদা কি তরফ আওর উয়ো উঁচি হে জেসকা মোক্বাম ইনতিহায়ে আ’রশ হে। অর্থাৎ “খোদার দিক আর তা উপর দিক। যেটির শেষ সীমানা আরশে আজীম।” ওহে কাদিয়ানীবন্ধুরা! জবাব আর লাগবে?

এতদ্ব্যতীত হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) সহ প্রায় সমস্ত তাফসীরকারক অসংখ্য সহীহ হাদীসের আলোকে বলেছেন, ঈসা (আ:)-কে ‘আল্লাহর দিকে’ উঠিয়ে নেয়া হয় বলতে ‘আকাশে’ উঠিয়ে নেয়াই উদ্দেশ্য। যেমন ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, ঈসাকে যখন পাকড়াও করতে ইহুদীরা একত্রিত হল তখন আল্লাহতালা তাঁকে উদ্দেশ্য করে জানিয়ে দিলেন : بانه يرفعه الى السماء و يطهره من صحبة اليهود  অর্থাৎ নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে আকাশে তুলে নেবেন এবং ইহুদীদের নাগাল পাওয়া থেকে তাঁকে মুক্ত রাখবেন। (ইমাম নাসায়ী সংকলিত হাদীসের কিতাব আস-সুনানুল কোবরা, হাদীস নং ১১৫৯০; তাফসীরে বায়দ্বাভী ২/১৮১)।

  • আয়াত ৩ : ‘কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলিয়া লইলে তখন তুমিই তো ছিলে তাহাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক এবং তুমিই সর্ববিষয়ে সাক্ষী।’ (কুরআন ০৫:১১৭/ইফা)।

জবাব : কেয়ামত দিবসে মহান আল্লাহ’র একটি প্রশ্নের প্রতিউত্তরে হযরত ঈসা (আ:) বলবেন : فلما توفيتنى অর্থাৎ যখন তুমি আমাকে তাওয়াফ্ফা করলে তথা তুলিয়া লইলে। মির্যা কাদিয়ানীর নিকটেও যুগ ইমাম ও মুজাদ্দিদ হিসেবে স্বীকৃত ইমাম আল্লামা শাওক্বানী (রহ:) তিনি উক্ত আয়াতাংশের তাফসীরে লিখে গেছেন : و إنما المعنى فلما رَفَعْتَنِىْ إلى السماء অর্থাৎ ‘আয়াতাংশের শুধু এ অর্থই যে আপনি যখন আমাকে আকাশে তুলিয়া লইলেন।’ কেননা পবিত্র কুরআনে ‘তাওয়াফ্ফা’ শব্দটি তিনখানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যথাক্রমে মৃত্যু [যুমার/৩৯ : ৪২], ঘুম [আন’আম/০৬ : ৬০] এবং ‘সশরীরে তুলিয়া নেয়া’ [আলে ইমরান/০৩:৫৫, আল-মায়েদা/০৫ : ১১৭]। (ফাতহুল ক্বাদীর ৭/৪০৬; সূরা মায়েদা ১১৭)। এই ক্ষেত্রে ঘুম, মৃত্যু এবং সশরীরে তুলিয়া নেয়া, এই সমস্ত অর্থ রূপক আর ‘নিয়ে নেয়া বা পূর্ণকরা’ [নিসা/০৪: ১৫] তার  আভিধানিক ও প্রকৃত অর্থ।

  • এখানে বলে রাখা জরুরী, ইমাম শাওক্বানী (রহ:) কাদিয়ানীদের মতেও হিজরী দ্বাদশ শতকের একজন যুগশ্রেষ্ঠ মুজাদ্দিদ হিসেবে স্বীকৃত। (সূত্র, আছলে মুছাফফা ১/১৬৫; মির্যা খোদাবখশ কাদিয়ানী, রচনাকাল ১৯০১ ইং)। আর মির্যা কাদিয়ানী মুজদ্দিদ সম্পর্কে লিখে গেছেন, ‘মুজাদ্দিদগণ কুরআনের বুঝ-প্রাপ্ত হয়ে থাকেন।’ (রূহানী খাযায়েন ১৪/২৮৮ দ্রষ্টব্য)।

আপনি হয়ত বলবেন, যদি মসীহ বর্তমান যুগ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ না করে থাকেন সেক্ষেত্রে এটাও সাব্যস্ত হবে, খ্রিস্টানরা আজ পর্যন্ত শিরিকে এবং পথ ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হয়নি যেভাবে ‘ফালাম্মা তাওয়াফফাইতানী কুনতা আন্তার রাকীবা আলাইহিম’ আয়াত থেকে প্রতিভাব হয়।

আমি এর জবাবে বলব, এটি সম্পূর্ণ একটি আজগুবি প্রশ্ন; সত্যের সাথে এর লেশমাত্র সম্পর্কও নেই। কেননা, ঈসা (আ:) সংক্রান্ত توفى হতে যুগ-ইমামগণের কেউই ‘মৃত্যু’ অর্থ নেননি। তাছাড়া আয়াতটির পরেই উল্লেখ আছে ‘ওয়া ইন তাগফিরলাহুম ফা-ইন্নাকা আন্তাল আজীজুল হাকীম’ (অর্থাৎ যদি তুমি তাহাদিগকে ক্ষমা কর তাহা হইলে নিশ্চয় তুমিই মহা পরাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়)। কাদিয়ানী নির্বোধরা এই আয়াতের ‘তাগফিরলাহুম’ (تغفرلهم) শব্দ নিয়ে কিজন্য চিন্তা করেনা? এখান থেকে তারা কেন শিক্ষা লাভ করেনা যে, ঈসা (আ:) যাদের উপর সাক্ষী তারা শুধুমাত্র তাঁর সমসাময়িক একত্ববাদী ঈসায়ীগণই উদ্দেশ্য! কারণ ঈসা (আ:) এমন কারো পক্ষে কখনোই আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হবেন না যে মুশরিক কিংবা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী! সুতরাং আপনার উল্লিখিত প্রশ্ন এইজন্যই গ্রহণযোগ্য নয়। যাইহোক, এই আয়াতটিও কাদিয়ানীদের দাবীর পক্ষে দলিল হয়নি।

  • আয়াত ৪ : ‘কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে তাঁর (ঈসা) মৃত্যুর পূর্বে তাঁহাকে বিশ্বাস করিবেই এবং কিয়ামতের দিন সে (যাহারা তাঁহাকে তাঁর প্রথম জীবনে অস্বীকার করেছিলো) তাহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে’ (কুরআন ০৩:১৫৯; অনুবাদ, ফছলুল খেতাম [উর্দূ]; লিখক কাদিয়ানীদের প্রথম খলীফা হেকিম নূর উদ্দীন, বলে রাখতে চাই ‘তাফসীরে তাবারী গ্রন্থকার সহ বিশিষ্ট তাফসীরকারকদের মতানুসারে এই অর্থটিই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও বিশুদ্ধ)।

জবাব : এই আয়াতটিও হযরত ঈসা (আ:) বর্তমানে জীবিত থাকার পক্ষেই শক্তিশালী দলিল। কারণ, যদি বলা হয় যে, ঈসা (আ:) পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছেন তখন প্রশ্ন আসবে যে, তবে কি বর্তমানে আহলে কিতাবীদের প্রত্যেকে ঈমান আনয়ন করে মুসলমান হয়ে গেল? সুতরাং গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত!

কাদিয়ানীরা এই ধরণের প্রশ্ন থেকে বাঁচার জন্য আয়াতের অর্থ নেয় এইরূপ ‘আহলে কিতাবীদের প্রত্যেকে নিজ নিজ ধারণা অনুযায়ী ক্রুশীয় ঘটনার উপর তারা ঈমান আনবে।’ কিন্তু প্রকৃত সত্য হল, তারা নিজ নিজ ক্রুশীয় ঘটনার উপর তো এখনো বিশ্বাসী হয়ে আছে। তাহলে তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ মৃত্যুর পূর্বে ক্রুশীয় ঘটনার উপর ঈমান আনয়নের অর্থ কি ওই একই বিশ্বাসের উপর অটল থাকা? যদি তাই হয় তাহলে নিজেদের মৃত্যুর পূর্বের ঈমান আর জীবদ্দশাতে ধারণকৃত ঈমান, এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রইল কোথায়?

সুতরাং কাদিয়ানীদের কৃত অর্থ ও বিশ্লেষণ ইজমায়ে উম্মত ও যুক্তির নিরিখে এমনকি তাদের কথিত প্রথম খলীফা হেকিম নূরউদ্দীনের কৃত অনুবাদের বিচারেও সর্বোতভাবে পরিত্যাজ্য। এই সম্পর্কে পেছনে বিস্তারিত লিখা রয়েছে। প্রয়োজনে আবার দেখা যেতে পারে।

  • জনৈক কাদিয়ানী বলল, মওলানা সাহেব আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দিন! প্রশ্নটি হল, আল্লাহতালার বাণী: (অনুবাদ) সমস্ত আহলে কিতাব তাঁর (ঈসা) মৃত্যুর আগে আগেই তাঁর (ঈসা) প্রতি ঈমান আনবে (সূরা নিসা, আয়াত নং ১৫৯)। কিন্তু একথা সঠিক নয়। কেননা হাদীসে আছে যে, দাজ্জালের সাথে ৭০,০০০ আহ্‌লে কিতাব যোগ দেবে, আর সে নিজেও আহ্‌লে কিতাবের অন্তর্গত হবে। সে মসীহ্‌র প্রতি ঈমান আনবে না এবং কাফির অবস্থাতেই মারা যাবে। অতএব এ যুক্তি ভ্রান্ত, পক্ষান্তরে এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, হযরত ঈসা (আ.) ইন্তেকাল করেছেন। এখন এর কী উত্তর দেবেন! উত্তর এই লিংকে দেখুন : Click

এবার কাদিয়ানীদের উদ্দেশ্যে আমার দু’টি প্রশ্ন এই যে,

ক. ঈসা (আ:) ইতিপূর্বে ইন্তেকাল করে থাকলে উক্ত আয়াতে ভবিষ্যৎবাচক ক্রিয়াপদ দ্বারা “আহলে কিতাবীরা ঈমান আনবে” এ কথার কী মানে?

খ. আয়াতের ‘মওতিহি’ (موته) এর “হি” (هِ) (ইংরেজি : his) একবচনের সর্বনামপদটি ‘আহলে কিতাবী’র জন্য হয়ে থাকলে তবে ঐ আহলে কিতাবীর জন্য পরের আয়াতে ‘আলাইহিম শাহীদা’ (عَلَيْهِمْ شَهِيدًا)-এর মধ্যে কেন “হিম” (هم)  (ইংরেজি : they) বহুবচনাত্মক সর্বনাম নেয়া হল? অতএব যেহেতু একই বাক্যে একই উদ্দেশ্যের সর্বনাম বিভিন্ন হওয়া ব্যাকরণিক নীতির অন্তরায়, সেহেতু নিশ্চিতভাবে বলা যায় আয়াতে قَبْلَ مَوْتِهِ   অংশের শেষোক্ত “হি” সর্বনামটি দ্বারা আহলে-কিতাবীদের বুঝানো হয়নি, বরং এককভাবে হযরত ঈসা (আ:)-কেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে।

আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, ঈসা (আ:)-এর যুগে এবং তাঁরই মৃত্যুর আগে সমস্ত আহলে কিতাবী (ইহুদ-খ্রিস্টান) মুমিন হয়ে গেলে তখন পবিত্র কুরআনের ০৫:৬৪ আয়াত অনুসারে আহলে কিতাবীদের মাঝে الى يوم القيامة তথা ‘কেয়ামত পর্যন্ত’ শত্রুতা সঞ্চারিত থাকে কিভাবে?

এর জবাব হল, এখানে ‘কেয়ামত পর্যন্ত’ বলে মূলত ‘সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত’ সময়ের বিশালতাকেই বুঝানো উদ্দেশ্য। যেহেতু সময়ের বিশালতাকে বুঝাতে ‘কেয়ামত পর্যন্ত’ কথাটি একধরণের বাগধারা। যেমন, সাজেদ তার পরম বন্ধু মাজেদকে বলল, তুই ‘কেয়ামত পর্যন্ত’ চেষ্টা করলেও চেয়ারম্যান নির্বাচনে জয়ী হতে পারবিনা। খেয়াল করুন, ‘কেয়ামত পর্যন্ত’ বলতে সাজেদ মোটেও এটা বুঝাতে চায়নি যে, সে প্রকৃতপক্ষে কেয়ামতের শিঙ্গাফুঁক দেয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকবে! কারণ বাগ্ধারাকে সাধারণ অর্থে বিচার করা যায়না। এবার আরেকটু খোলাসা করছি!

হাদীসে আছে, বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা:) হতে বর্ণিত রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন الجهادُ مَاضٍ إلى يوم القيامة অর্থাৎ ‘জিহাদ কেয়ামত পর্যন্ত চলমান থাকবে’। (আবুদাউদ হা/২৫৩২)। এখানেও ‘কেয়ামত পর্যন্ত’ শব্দ চয়িত হয়েছে। পক্ষান্তরে অপর একটি হাদীসের শেষাংশে উল্লেখ আছে যে, যখন ঈসা (আ:) দ্বিতীয়বার আসবেন তখন و تضع الحرب اوزارها অর্থাৎ যুদ্ধ আপনা সমস্ত সমরাস্ত্র গুটিয়ে নেবে (মুসনাদে আহমদ হা/৯১১৭)। এবার তাহলে জিহাদ ‘কেয়ামত পর্যন্ত’ চলবে, এর কী অর্থ? যে জিহাদ কেয়ামত পর্যন্ত অবিরাম চলতে থাকবে বলা হল, সেই জিহাদ হযরত ঈসা (আ:)-এর যুগে কোনো কাফের বাহিনী না থাকায় আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যাবে; এইরূপ উল্লেখ থাকাটাই কি প্রমাণ করে না যে ‘কেয়ামত পর্যন্ত’ বলে মূলত ‘সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত’ সময়ের বিশালতাই উদ্দেশ্য! অতএব পবিত্র কুরআন আর অসংখ্য সহীহ হাদীসের বিরুদ্ধে গিয়ে কারো জন্য এমন কোনো যুক্তি দাঁড় করা ঠিক হবেনা যা ইজমায়ে উম্মতের সুপ্রতিষ্ঠিত ও তাওয়াতূর পর্যায়ের আকীদার পরিপন্থী।

আপনি বলতে পারেন, ঈসা (আ:)-এর নাযিল হওয়ার সময় তো পূর্বেকার আহলে কিতাবীরা থাকবেনা! এমতাবস্থায় তাদের পক্ষেও ঈসা (আ:)-এর প্রতি ঈমান আনয়ন করা কিভাবে সম্ভব?

আপনার প্রশ্নের উত্তরটি বিশিষ্ট যুগ ইমাম শাহ ওয়ালী উল্লাহ আদ-দেহলভী (রহ:) ফার্সী ভাষায় এভাবে দিয়েছেন, “ই’য়ানী ইয়াহুদী কেহ্ হাজের শাওয়ান্দ নুযূলে ঈসা রা আলবাত্তা ঈমান আ-রন্দ” অর্থাৎ আয়াতের তাৎপর্য হল, ঈসা (আ:)-এর অবতরণ হওয়ার সময়টিতে যেসব ইহুদী বিদ্যমান থাকবে (পৃথিবীতে জীবিত থাকবে) তাঁর প্রতি শুধুমাত্র তাদেরই ঈমান আনয়ন করার কথা বুঝানো উদ্দেশ্য। (তাফসীরে ফতহুর রহমান, সূরা নিসা আয়াত নং ১৫৯ দ্রষ্টব্য)। কারণ মৃতরা আদিষ্ট হন না। আশাকরি জবাব পেয়েছেন।

  • আয়াত ৫ : ‘মারইয়াম তনয় মসীহ তো কেবল একজন রাসূল। তাহার পূর্বেও রাসূলই আগমন করিত।’ (কুরআন ০৫:৭৫/অনুবাদ, রূহানী খাযায়েন [উর্দূ] খন্ড ৬ পৃষ্ঠা ৮৯)।

জবাব : এই আয়াতে ঈসা (আ:) এর মৃত্যু সম্পর্কে সরাসরি কিংবা ইংগিতেও কিছু বলা কওয়া নেই। বরং তার পরের আয়াতগুলো দ্বারা বুঝা যায় যে, খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদী মতবাদ খন্ডন করার জন্য এই আয়াতে ঈসা আর তাঁর মায়ের পানাহারের কথা উল্লেখ করেছেন। কেননা খ্রিস্টানরা তাঁদেরকে উপাস্য হিসেবে বিশ্বাস করে। অথচ সত্যিকারের উপাস্য যিনি তিনি সব সময় পানাহারের ঊর্ধ্বে; বরং ঊর্ধ্ব থেকেও ঊর্ধ্বে। মির্যা কাদিয়ানী সাহেব এখানে ‘আর-রসুল’ এর অর্থ করেছেন : ‘উস চে ফহেলে বিহি রাসূল হি আ-তে রাহে হেঁ’। অর্থাৎ তাহার পূর্বে রাসূলই আগমন করিত। এতে বুঝানো হয়েছে যে, ঈসা ‘রাসূল’ বৈ ভিন্ন কেউ নন, বরং রাসূলগণের আসা-যাওয়া তো তাঁর পূর্বেও ছিল! এককথায় ত্রিত্ববাদ খন্ডনই আয়াতটির উদ্দেশ্য, কাউকে মৃত প্রমাণ করার কোনো রসদ এখানে নেই।

  • আয়াত ৬ : ‘এবং আমি তাহাদেরকে এমন দেহবিশিষ্ট করি নাই যে, তাহারা আহার্য গ্রহণ করিত না; তাহারা চিরস্থায়ীও ছিল না।’ (কুরআন ২১:০৮/ইফা)।

জবাব : এই আয়াতেও ঈসা (আ:) এর মৃত্যু সম্পর্কে সরাসরি কিংবা ইংগিতেও কিছু বলা কওয়া নেই। বড়জোর এটি মক্কার মুশরিকদের একখানা প্রশ্নের জবাব মাত্র। তারা বলত যে, এই লোক কেমন নবী যে, খাওয়া-দাওয়া করেন! তাদের আজগুবি কথাবার্তার জবাবে সূরা আল ফুরকান আয়াত নং ২০ দেখুন।

  • আয়াত ৭ : ‘মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র; তাহার পূর্বে বহু রাসূল গত হইয়াছে।’ (কুরআন ০৩:১৪৪/ইফা, কাদিয়ানীদের খলিফা হেকিম নূরুদ্দীনও আর-রসুল হতে ‘বহু রাসূল’ অর্থ নিয়েছেন; ফাছলুল খিতাব লি-মুকাদ্দিমাতি আহলিল কিতাব [উর্দূ] পৃষ্ঠা নং ২৮ দ্রষ্টব্য)।

জবাব: মনে রাখতে হবে যে, গত হওয়া মানে মরে যাওয়াই নয়, দায়িত্বে বর্তমান নেই অথবা কোথাও স্থানান্তরিত হয়ে গেছে এমন ব্যক্তিকেও এই অর্থে অন্তর্ভুক্ত করবে (দেখুন পবিত্র কুরআন ০২:১৪, ৩৫:২৪)। কিন্তু কাদিয়ানীরা আয়াতটির ‘ক্বদ খালাত’ শব্দ দ্বারা ‘মারা গিয়াছে’ উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে এমনকি ‘আর-রসুল’ দ্বারা ‘সমস্ত রাসূল’ অর্থও নিয়ে থাকে। তাদের এও দাবী, এই আয়াত দ্বারা নাকি ঈসা (আ:)ও বেঁচে নেই, মৃত্যুবরণ করিয়াছেন মর্মে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে ইজমা (ঐক্যমত) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু তাদের এসমস্ত দাবী অসত্য ও উম্মতে মুসলিমার ইজমা তথা সর্বসম্মত মতের ঘোর-বিরোধী। তাদের জন্য দুঃসংবাদ এইজন্য যে, এই আয়াত নাযিল হওয়ার ছয় বছর পর অর্থাৎ হিজরী নবম বর্ষে যখন নাজরানের খ্রিষ্টান প্রতিনিধি দল রাসূল (সা:)-এর নিকট এলেন, তখন তিনি বললেন : আপনারা কি জানেন যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব এবং মৃত্যু ঈসার নিকট আসবে? (তাফসীরে তাবারী ৬/১৫৪, তাফসীরে ইবনে আবী হাতিম ৯/৪০৮ দ্রষ্টব্য)। এছাড়াও হযরত আলী (রা:) এর খাস শিষ্য ও বিশিষ্ট তাবেয়ী ইমাম হাসান বছরী (রহ:) থেকে একদম সুস্পষ্টরূপে বর্ণিত আছে তিনি বলেছেন :  قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لليهود إن عيسى لم يمت، وإنه راجع إليكم قبل يوم القيامة ‘রাসূল (সা:) জনৈক ইহুদীকে বলেছেন নিশ্চয় ঈসা মসীহ তিনি মৃত্যুবরণ করেননি। তিনি নিশ্চয় কেয়ামতের পূর্বে তোমাদের নিকট ফিরে আসবেন।’ (সূত্র সুনানে তাবারী ৩৩৩৮, হাদীস নং ৫৭৪৭; তাফসীরে দুররে মানছূর ২৬৪; ইমাম সুয়ূতী)।

  • সূরা আলে ইমরানের ১৪৪ নং আয়াতটির পরিপ্রেক্ষিতে কাদিয়ানীদের প্রশ্নের উত্তর এখানে
  • আয়াত ৮ : ‘আমি তোমার পূর্বেও কোন মানুষকে অনন্ত জীবন দান কনি নাই; সুতরাং তোমার মৃত্যু হইলে উহারা কি চিরস্থায়ী হইয়া থাকিবে?’ (কুরআন ২১:৩৪/ইফা)।

জবাব: এই আয়াত নাযিল হওয়ার কারণ হচ্ছে মক্কার কাফেররা নবী করীম (সা:) এর ব্যাপারে বলত, সে তো একদিন মারাই যাবে। আয়াতটি তারই প্রতিউত্তর। আল্লাহতায়ালা বলেন, মৃত্যু তো প্রত্যেক মানুষের জন্য অবধারিত। মুহাম্মদ (সা:)ও এই নিয়ম বহির্ভূত নয়। কারণ সেও একজন মানুষ। আর আমি কোনো মানুষকে অমরত্ব দান করিনি। সেযাইহোক কোনোরূপ প্রাসঙ্গিকতার তোয়াক্কা না করে দাবী করা ঠিক হবেনা যে, এই আয়াত ঈসা (আ:) এর মৃত্যুর পক্ষে দলিল!

  • আয়াত ৯ : ‘সেই ছিল এক উম্মত, তাহা অতীত হইয়াছে। তাহারা যাহা অর্জন করিয়াছে তাহা তাহাদের। তোমরা যাহা অর্জন কর তাহা তোমাদের।’ (কুরআন ০২:১৪১/ইফা)।

জবাব: এই আয়াতের আগের এবং পরের আয়াত দেখলে বুঝা যায়, এখানে একথাগুলো ইয়াহুদীদের উদ্দেশ্যে ছিল। তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, তোমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে যারা আম্বিয়া ও সৎলোক ছিলেন তাদের সাথে সম্পর্ক জুড়ে তোমাদের কোনো লাভ নেই। সেযাইহোক, তাদের উদ্ধৃত এই আয়াতও কোনোভাবেই ঈসা (আ:)-কে মৃত প্রমাণ করেনা।

  • আয়াত ১০ : ‘যেখানেই আমি (ঈসা) থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করিয়াছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন যত দিন জীবিত থাকি তত দিন সালাত ও যাকাত আদায় করিতে।’ (কুরআন ১৯:৩১/ইফা)। 

জবাব: এই আয়াতে ঈসা (আ:) এর মৃত্যুর কোনো উল্লেখই নেই। এখানে যে বিষয়টি বলে রাখা জরুরি তা হল, আয়াতটিতে ঈসা (আ:) এর প্রতি সালাত আর যাকাতের ওসিয়ত পালনের হুকুম শুধুমাত্র পার্থিব জীবনের সাথেই সম্পর্কিত। কেননা সালাত আর যাকাত পালনের কোনো যোগ্যতাই আকাশে নেই। তাই যারা ঈসা আকাশে থাকলে তিনি সেখানে সালাত কিভাবে পড়ছেন, যাকাত কিভাবে দিচ্ছেন; ইত্যাদী যুক্তির অন্তরালে ঈসাকে মৃত দাবী করছেন তাদের নিকট আমার প্রশ্ন হচ্ছে, সালাতের জন্য নির্দিষ্ট সময় আর যাকাতের জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা জুরুরি কিনা? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে বলুন, আকাশে কি সময় গতিশীল নাকি স্থীর? যদি সময় স্থীর হয় তাহলে ঈসা (আ:) সালাত কেন পড়বেন? আর তিনি যে আকাশে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে আছেন, আপনার কাছে এমন কী প্রমাণ আছে? কে জানি বলেছিল, ঈসা (আ:) আবার পৃথিবীতে আসলে তখন কি তাঁর বয়স কয়েক হাজার বছর হয়ে যাবেনা? এমন প্রশ্নকারীকে আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, তিরমীযী ও মসনাদে আহমদ কিতাবে সহীহসূত্রে হাদীসে এসেছে, বেহেশতে প্রত্যেকটি পুরুষ (ابناء ثلاث و ثلاثين উচ্চারণ, আবনা-উ ছালা-ছিউঁ ওয়া ছালা-ছীনা) তেত্রিশ বছরের যুবক থাকবে। এখন বলুন, এরা বেহেশতে কোটি কোটি বছর পরেও তেত্রিশ বছরের যুবক কিভাবে থাকবে? সুতরাং বুঝা গেল, ঈসা (আ:)ও পৃথিবীতে আবার যখন আসবেন তখন তিনি ঐ বয়সেই বহাল থাকবেন যেই বয়সে তাঁকে উর্ধ্ব জগতে তুলে নেয়া হয়েছিল। সংক্ষেপে জবাব দিলাম।

  • আয়াত ১১ : ‘আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মলাভ করিয়াছি, যেদিন আমার মৃত্যু হইবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি উত্থিত হইব।’ (কুরআন ১৯:৩৩/ইফা)।

জবাব: বিশিষ্ট যুগ ইমাম হযরত ইবনে কাসীর (রহ:) বলেন, ঈসা (আ:) মূলত এই কথাগুলোর মাধ্যমে খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদী মতবাদের খন্ডন করে নিজেকে তাঁর বান্দা হওয়ার ঘোষণা দিতে চেয়েছিলেন। সংক্ষেপে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর)। কিন্তু কাদিয়ানীরা আয়াতের প্রসঙ্গ গোপন রেখে ভিন্নকিছু সাব্যস্ত করতে চাইলে তখন আমাদের আফসোস করা ছাড়া আর কী বা করার থাকতে পারে!

  • আয়াত ১২ : ‘তোমাদের মধ্যে কাহারও কাহারও মৃত্যু ঘটান হয় এবং তোমাদের মধ্যে কাহাকেও কাহাকেও প্রত্যাবৃত্ত করা হয় হীনতম বয়সে, যাহার ফলে উহারা যাহা কিছু জানিত সে সম্বন্ধে উহারা সজ্ঞান থাকে না।’ (কুরআন ২২:০৫/ইফা)।

জবাব: উল্লিখিত আয়াত দ্বারা পার্থিব জীবনে মানুষের সৃষ্টির সূচনা ও শারিরীক হ্রাস বৃদ্ধির সাধারণ নিয়ম সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। আমরাও বিশ্বাস করি যে, হযরত ঈসা (আ:) তিনিও এই নিয়মের বাহিরে নন। বরং পৃথিবীতে পুনরায় আগমন করার পর তিনিও একটা সময় ইন্তেকাল করবেন। সুতরাং এই আয়াত দ্বারা মোটেও সাব্যস্ত হয় না যে, তিনি বর্তমানেও মৃত, জীবিত নেই।

  • আয়াত ১৩ : ‘আমি বলিলাম, তোমরা একে অন্যের শত্রুরূপে নামিয়া যাও, পৃথিবীতে কিছুকালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রহিল।’ (০২:৩৬/ইফা)।

জবাব: উক্ত আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য, ইবলিশ শয়তান কর্তৃক আদম হাওয়াকে জান্নাতে পদস্খলন করার বিষয়ে জানান দেয়া। আয়াতটিতে এও উল্লেখ রয়েছে যে, বনী আদম পৃথিবীতে এসেছে সামান্য কিছুদিনের জন্য। তাই আমরাও বিশ্বাস করি যে, ঈসা (আ:) তিনিও ঐশী সফর শেষে পৃথিবীতে পুনরায় ফিরে এসে হাদীসের ফরমান অনুযায়ী চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে (আবুদাউদ, কিতাবুল মালাহিম অধ্যায়) ইন্তেকাল করবেন। সুতরাং এই আয়াত দ্বারা তিনি বর্তমানেই মৃত, তা মোটেও সাব্যস্ত হয় না।

  • আয়াত ১৪ : ‘আমি যাহাকে দীর্ঘ জীবন দান করি প্রকৃতিগতভাবে তাহার অবনতি ঘটাই। তবুও কি উহারা বুঝে না?’ (কুরআন ৩৬:৬৮/ইফা)।

জবাব: এই আয়াতে পার্থিব জীবনে মানুষের শারিরীক হ্রাস বৃদ্ধির সাধারণ নিয়ম সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। আমরাও বিশ্বাস করি যে, হযরত ঈসা (আ:) তিনিও ফিরে এসে একদিন না একদিন উক্ত নিয়মের মুখোমুখি হবেন কিন্তু তার আগ পর্যন্ত তো তাঁকে প্রকৃতির উক্ত নিয়মের ঊর্ধ্বেই বিবেচনা করতে হবে, তাই নয় কি? মজার ব্যাপার হল, মির্যা কাদিয়ানী মুলহাম দাবিদার অবস্থায় স্বীয় কথিত ইলহামী কিতাব ‘বারাহিনে আহমদিয়া’ এর মধ্যে লিখেছেন: ‘ঈসা (আ:) এর দ্বিতীয়বারে আগমন করা এবং তাঁর মাধ্যমে ইসলাম সমগ্র দুনিয়ায় প্রচার প্রসার লাভ করার প্রতিশ্রুতিতে ফোরকানী ইশারা এই আয়াতে (সূরা আত-তওবাহ : ৩৩) রয়েছে।’ (দেখুন রূহানী খাযায়েন ১/৫৯৩)। এবার কী বলবেন? কারণ, তখন প্রশ্ন আসবে যে, আগত সেই ঈসা যদি রূপক ঈসা তথা মির্যা কাদিয়ানী হন তাহলে তার অনুসারীদের একথাও স্বীকার করতে হবে যে, মির্যা কাদিয়ানীর পৃথিবীতে আগমন দ্বিতীয়বারের আগমনই ছিল! অথচ তার অনুসারীদের কেউই আজ পর্যন্ত এটি স্বীকার করেনি।

  • আয়াত ১৫ : ‘আল্লাহ, তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেন দুর্বল অবস্থায়, দুর্বলতার পর তিনি দেন শক্তি; শক্তির পর আবার দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য।’ (কুরআন ৩০:৫৪/ইফা)।

জবাব: উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) এর শিষ্য বিশিষ্ট তাবেয়ী কাতাদাহ (রহ:) বলেছেন, প্রথম দুর্বলতা হচ্ছে শুক্র আর শেষ দুর্বলতা হচ্ছে বৃদ্ধ বয়স তখন তার চুল সাদা হয়ে যেতে থাকে। (তাফসীরে তাবারী)। সেযাইহোক, আমরাও বিশ্বাস করি যে, ঈসা (আ:) আবার যখন পার্থিব জগতে ফিরে আসবেন তখন আল্লাহ চাইলে তিনিও প্রকৃতির উক্ত নিয়মের বাহিরে থাকবেন না। উল্লেখ্য, ঐশী জগতের নিয়ম-কানূন ইহজগত দিয়ে বিচার করা নেহাত মূর্খতা বৈ কিছুই না। সংক্ষেপে।

  • আয়াত ১৬ : ‘বস্তুত পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত এইরূপ : যেমন আমি আকাশ হইতে বারি বর্ষণ করি যদ্দ্বারা ভূমিজ উদ্ভিদ ঘন-সন্নিবিষ্ট হইয়া উদ্গত হয়, যাহা হইতে মানুষ ও জীবজন্তু আহার করিয়া থাকে।’ (কুরআন ১০:২৪/ইফা)।

জবাব: এই আয়াতে পার্থিব জগতের দৃষ্টান্ত হিসেবে বৃষ্টির উদাহরণ দেয়া হয়েছে। সেযাইহোক অন্তত এইটুকু তো দৃঢ়ভাবে বলতে পারি যে, আয়াতটি কোনোভাবেই ঈসা (আ:)-কে বর্তমানে মৃত প্রমাণ করেনা।

  • আয়াত ১৭ : ‘ইহার পর তোমরা অবশ্যই মরিবে।’ (কুরআন ২৩:১৫/ইফা)।

জবাব: জ্বী হ্যাঁ, একথা সবাই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে, জন্মিলে একদিন মরণ হবেই হবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, কারো মৃত্যু হওয়ার আগেই জোর করে তাকে মৃত আখ্যা দিয়ে অন্য একজনকে তারই স্থলাভিষিক্ত ও রূপক মসীহ্ মানতে হবে! উল্লেখ্য, বাহায়ী জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা হোসাইন আলী নূরী (১৮১৭-১৮৯২) তিনিও নিজেকে নবুওয়ত ও রেসালতের দাবী করার পাশাপাশি ১৮৬৩ সালে ইরান থেকে বাগদাদে নির্বাসনে থাকাবস্থায় ‘মসীহ’ হওয়ার দাবীও করেছিলেন। (কিতাবুল আকদাস ৭১ দ্রষ্টব্য; লিখক বাহাউল্লাহ)। উক্ত দাবীর উপর তিনি প্রায় ২৯ বছর বেঁচে ছিলেন, ধ্বংস হননি। সংক্ষেপে।

  • আয়াত ১৮ : ‘তুমি কি দেখ না, আল্লাহ আকাশ হইতে বারি বর্ষণ করেন, অতঃপর উহা ভূমিতে নির্ঝররূপে প্রবাহিত করেন এবং তদ্দ্বারা বিবিধ বর্ণের ফসল উৎপন্ন করেন, অতঃপর ইহা শুকাইয়া যায়। ফলে তোমরা ইহা পীতবর্ণ দেখিতে পাও, অবশেষে তিনি উহা খড়-কুটায় পরিণত করেন? ইহাতে অবশ্যই উপদেশ রহিয়াছে বোধশক্তিসম্পন্নদের জন্য।’ (কুরআন ৩৯:২১/ইফা)।

জবাব: এই আয়াত দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, দুনিয়ার মুহাব্বত একদমই অনর্থক। কারণ অতি অল্প সময়ের মধ্যে এটি ধ্বংস হয়ে যাবে। তার চাকচিক্য ও সতেজতা, তার শ্যামলতা ও সৌন্দর্য এবং তার আমোদ-প্রমোদ, আরাম-আয়েশ ক্ষণকালের জন্য। সুতরাং এসকল বস্তুকে মানুষের মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসা উচিত নয়। কিন্তু এই আয়াত কিভাবে ঈসা (আ:)-কে মৃত প্রমাণ করে তা আমাদের বোধগম্য নয়।

  • আয়াত ১৯ : ‘তোমার পূর্বে আমি যে সকল রাসূল প্রেরণ করিয়াছি তাঁহারা সকলেই তো আহার করিত ও হাটেবাজারে চলাফেরা করিত। হে মানুষ! আমি তোমাদের মধ্যে এক-কে অপরের জন্য পরীক্ষা-স্বরূপ করিয়াছি। তোমরা ধৈর্যধারণ করিবে কি? তোমার প্রতিপালক সমস্ত কিছু দেখেন।’ (কুরআন ২৫:২০/ইফা)।

জবাব: এই আয়াতের প্রেক্ষাপট বলছে যে, আয়াতটি ইসলামের প্রাথমিকযুগের মুশরিকদের কতেক ধারণাকে অহেতুক আখ্যা দিতেই নাযিল হয়েছিল। কারণ মুশরিকদের ধারণা ছিল, যিনি নবী হন তিনি খাবার গ্রহণ করেন না! হাটে-বাজারে চলাফেরা করেন না! প্রতিউত্তরে আল্লাহ বলেন, মুহাম্মদ (সা:) সহ পূর্বেব সমস্ত নবী রাসূল মানুষই ছিলেন, খাবারও গ্রহণ করেছেন; সাংসারিক প্রয়োজনে হাটে-বাজারেও গিয়েছেন। কাজেই এগুলো কোনোভাবেই নবুওয়তী মর্যাদার পরিপন্থী নয়, যেমনটি তোমরা অজ্ঞতাবশত ভাবছো (তাফসীরে কুরতুবী)! আর হ্যাঁ, প্রেক্ষাপটের বিচারে আয়াতের কথাগুলো যেহেতু পার্থিক জগতের সাথেই খাস সেহেতু ঈসা (আ:) পার্থিব জগতে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তাঁর সাথে খাবার গ্রহণের প্রশ্ন তোলা-ই বেমানান।

কাদিয়ানীদের নিকট আমার প্রশ্ন, মহান আল্লাহ যদি আসহাবে কাহাফ-কে ৩০৯ বছর খানা-পিনা ছাড়াই আপনা কুদরতি কারিশমাতে জীবিত রাখতে পারেন সেই আল্লাহ কি বর্তমানে দুর্বল হয়ে গেছেন? নতুবা ঈসা (আ:)-কে নিয়ে কেন আপনাদের এত দুশ্চিন্তা? অধিকন্তু দীর্ঘ একটি হাদীসের খন্ডাংশে উল্লেখ আছে রাসূল (সা:) বলেছেন, يُجْزَئ اَهلُ السماءِ مِن التسبيحِ وَالتَقديسِ [ইউয্জা আহলুস্ সামায়ি মিনাত তাসবীহ্ ওয়াত তাক্বতীস] অর্থাৎ ‘তাসবীহ্ এবং তাকদীস (আল্লাহর নামে যিকির-আয্কার) আসমানবাসীর খাবারের জন্য যথেষ্ট হয়ে থাকে।’ (দেখুন মেশকাত শরীফ, হা/৬২৯৪)। ইমাম ইবনু কাইয়ুম (রহ:) লিখেছেন ‘মসীহ ইবনে মরিয়ম জীবিত, ইন্তেকাল করেননি আর (আকাশে) তাঁর খাবার-দাবার ফেরেশতার মতই।’ (দেখুন আত-তিবইয়ান ফী আক্বসামিল কুরআন পৃষ্ঠা ২৫৫)।  সংক্ষেপে।

  • আয়াত ২০ : ‘উহারা আল্লাহ্ ব্যতীত অপর যাহাদেরকে আহবান করে তাহারা কিছুই সৃষ্টি করে না, তাহাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়। তাহারা নিষ্প্রাণ নির্জীব এবং কখন তাহাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করা হইবে সে বিষয়ে তাহাদের কোনো চেতনা নাই।’ (কুরআন ১৬:২০-২১/ইফা)।

জবাব: এই আয়াত দ্বারা বুঝা গেল, গায়রুল্লাহ্গণ কখনো বন্দেগীর হকদার হতে পারেনা। কেননা বন্দেগী একমাত্র সৃষ্টিকর্তারই হয়ে থাকে, সৃষ্টির নয়। অথচ গায়রুল্লাহ্গুলো নিজেরাই অন্যদের দ্বারা সৃষ্ট; এমনকি এদের কতক নিষ্প্রাণ, নির্জীব পদার্থ; পুনরুত্থান সম্পর্কেও যাদের কোনো খবর নেই। এখানে বলে রাখা দরকার যে, ঈসা (আ:)-কে খ্রিস্টানরা উপাস্য মান্য করে বিধায় আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনের অন্য জায়গায় (সূরা আম্বিয়া ১০১) তাদের রদও করেছেন। কিন্তু এই আয়াতে ‘মিন-দূনিল্লাহ’ বলে ঈসা (আ:) ব্যতীত শুধুমাত্র মুশরিকদের সেসমস্ত উপাস্যদের বুঝানো উদ্দেশ্য যেগুলো নিষ্প্রাণ ও নির্জীব পদার্থ। কেননা হযরত ঈসা (আ:) না নিষ্প্রাণ ছিলেন আর না নির্জীব পদার্থ ছিলেন। কাদিয়ানীদের দাবীমতে আয়াতটির ‘আমওয়াত’ (মৃতগণ) শব্দে ঈসা (আ:)ও শামিল হলে তখন প্রশ্ন আসবে, তাহলে শব্দটির পরেই ‘গয়রু আহ্ইয়া’ (সবই নিষ্প্রাণ) শব্দও উল্লেখ হল কেন? ভাবিয়ে তুলে কিনা? আরো প্রশ্ন আসবে, সূরা আম্বিয়ার ৯৮ নং আয়াতে আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাসনা করা হয় তাদেরকে ‘হাছাবু জাহান্নামা’ তথা জাহান্নামের জ্বালানীও বলা হয়েছে। এমতাবস্থায় কাদিয়ানীরা কি ঈসা (আ:)-কেও জাহান্নামের জ্বালানী মনে করে? নাউযুবিল্লাহ। সংক্ষেপে। অতএব, এই আয়াতকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে যারা ঈসা (আ:)-কেও মৃত, জীবিত নন; দাবী করেন তাদের ঐ দাবী মূলত এইজন্যই ভ্রান্ত ও প্রত্যাখ্যাত।

  • আয়াত ২১ : ‘মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নয়; বরং সে আল্লাহর রাসূল এবং নবীগণের আগমনীধারা সমাপ্তকারী।’ (কুরআন ৩৩:৪০; অনুবাদ, খতম করনে ওয়ালা নাবিয়ূঁ-কা (ختم کرنے والا نبیوں کا); মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর ৮৩টি বইয়ের সমষ্টি ২৩ খন্ডে প্রকাশিত ‘রূহানী খাযায়েন’ [ঊর্দূ] ৩/৪৩১ হতে চয়িত)।

জবাব: কাদিয়ানীদের প্রশ্ন হল, কেয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ঈসা (আ:) এর আগমন সংক্রান্ত বিশ্বাস কিভাবে সঠিক হয়? তখন তো ঈসা (আ:)-ই শেষনবী হয়ে যাচ্ছেন, তাই নয় কি? তার জবাবে বলা হবে যে, হযরত ঈসা (আ:) দ্বিতীয়বার আগমনকালে নবুওয়তের দায়িত্বে থাকবেন না। কেননা সূরা আলে ইমরানে উল্লেখ আছে, ‘রাসূলান ইলা বানী ইসরাঈলা’ অর্থাৎ ‘তিনি (শুধুমাত্র) বনী ইসরাঈলের জন্যই একজন রাসূল হিসেবে প্রেরিত’। তাই তাঁকে ‘শেষনবী’ মনে করার কোনো কারণ নেই।

শেষনবী এর সংজ্ঞা কী?

ইমাম যামাখশারী (মৃত: ৪৬৭ হিজরী) ‘শেষনবী’ এর সংজ্ঞায় লিখেছেন : ‘মুহাম্মদ (সা:) সর্বশেষ নবী, তার অর্থ হল তাঁর পরে আর কাউকে নবী বানানো হবেনা; আর ঈসা (আ:)-কে তো উনার আগেই নবী বানানো হয়েছে।’ [তাফসীরে কাশশাফ খন্ড ২২, সূরা আহযাব ৪০]। তাছাড়া তাফসীরে সমরকন্দী এর ১ম খন্ডের ২৭২ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে ‘ঈসা (আ:) আল্লাহর নিকট শেষনবীর উম্মত হতে চেয়ে দোয়া করেছিলেন। তাই আল্লাহতায়ালা তাঁর উক্ত দোয়া কবুল করেছেন।’ (সূরা আলে ইমরান আয়াত নং ৫৫ এর তাফসীর অংশ দ্রষ্টব্য)।
মির্যা কাদিয়ানী সাহেব লিখেছেন ‘আনে ওয়ালে মসীহ কেলিয়ে হামারে সাইয়েদ ওয়া মওলা নে নবুওয়ত শর্ত নিহি ঠেহরায়ি (آنیوالے مسیح کے لیے ہمارے سید و مولا  نے نبوت شرط نہیں ٹہرائ )।’ অর্থাৎ আগমনকারী মসীহ’র জন্য আমাদের নবী করীম (সা:) নবুওয়ত শর্ত করেননি। (রূহানী খাযায়েন ৩/৫৯)। যাইহোক, একাধিক নির্ভরযোগ্য তাফসীর এমনকি খোদ্ মির্যার লিখনী দ্বারাও প্রমাণ করলাম যে, ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ:) এর পুনঃআগমন নবুওয়তের দায়িত্ব সহকারে হবেনা, বরং একজন ‘উম্মতে মুহাম্মদী’ রূপেই হবে। অতএব, এই আয়াত দ্বারাও ঈসা (আ:)-কে মৃত প্রমাণ করতে চাওয়া ঠিক হবেনা।

একটি প্রশ্নের উত্তর : তাহলে আরও জীবিত “বহু রাসূল” কে কে আছেন? উত্তর পড়ুন Click

  • আয়াত ২২ : ‘তোমার পূর্বে আমি ওহীসহ পুরুষই প্রেরণ করিয়াছিলাম, তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীগণকে জিজ্ঞাসা কর।’ (কুরআন ১৬:৪৩/ইফা)।

জবাব: এই আয়াত দ্বারা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, ইতিপূর্বে যত রাসূলই প্রেরিত হয়েছিলেন তারা প্রত্যেকে মানুষ ছিলেন। অতএব যদি মুহাম্মদও একজন মানুষ হয় তাহলে এটা কোনো নতুন কথা নয় যে, তোমরা তার মানুষ হওয়ার কারণে তার রেসালতকেই অস্বীকার করবে! শেষকথা হল, আয়াতটি আর যাইহোক ঈসা (আ:)-কে মৃত প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে নাযিল হয়নি।

  • য়াত ২৩ : ‘হে প্রশান্তচিত্ত! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়া আস সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হইয়া।’ (কুরআন ৮৯: ২৭-৩০/ইফা)।

জবাব: এই আয়াত দ্বারা নেককার বান্দাদের দুনিয়াতেই সুসংবাদ দান করা উদ্দেশ্য। মুত্যুর সময় ফেরেশতারা নেককার বান্দাদের একথাগুলো বলে সুসংবাদ দেবেন। আফসোস! আহমদীবন্ধুদের নিকট এটিও ঈসা (আ:) এর মৃত্যুর দলিল!

  • আয়াত ২৪ : ‘আল্লাহই তোমাদেরকে সৃষ্টি করিয়াছেন, অতঃপর তোমাদেরকে রিযিক দিয়াছেন, তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাইবেন ও পরে তোমাদেরকে জীবিত করিবেন।’ (কুরআন ৩০:৪০/ইফা)।

জবাব: এই আয়াত কাউকে মৃত সাব্যস্ত করার উদ্দেশ্যে নাযিল হয়নি, বরং মুশরিকদের অহেতুক কর্মকান্ডকে রদ করতেই নাযিল হয়েছে। (দেখুন তাফসীরে তাবারী)। সংক্ষেপে।

  • আয়াত ২৫ : ‘ভূপৃষ্ঠে যাহা কিছু আছে সবই নশ্বর (ধ্বংসশীল), অবিনশ্বর কেবল তোমার প্রতিপালকের সত্তা যিনি মহিমাময় মহানুভব।’ (কুরআন ৫৫:২৬-২৭/ইফা)।

জবাব: জ্বী হ্যাঁ। তাই আমাদেরও বিশ্বাস যে, হযরত ঈসা (আ:) আবার যখন পার্থিব জগতে ফিরে আসবেন তখন যথাসময় অবশ্যই তিনিও মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবেন। কিন্তু তাই বলে মৃত্যুর আগেই কাউকে মৃত আখ্যা দেয়া কি ঠিক? অবশ্যই না। সংক্ষেপে।

  • আয়াত ২৬ : ‘মুত্তাকীরা থাকিবে স্রোতস্বিনী বিধৌত জান্নাতে।’ (কুরআন ৫৪: ৫৪/ইফা)।

জবাব: এই আয়াত নিশ্চয়ই মুমিনদের জন্য একটি ঐশী সুসংবাদ। তাদের জন্য প্রস্তুতকৃত জান্নাতে বিভিন্ন প্রকারের দৃষ্টিনন্দন বাগান থাকবে। সেযাইহোক, আহমদীবন্ধুদের জন্য উচিত হবেনা এইধরণের ভিন্ন প্রসঙ্গের কোনো আয়াত দিয়ে ঈসা (আ:)-কে মৃত প্রমাণ করতে চাওয়া।

  • আয়াত ২৭ : ‘যাহাদের জন্য আমার নিকট হইতে পূর্ব হইতে কল্যাণ নির্ধারিত রহিয়াছে তাহাদেরকে উহা [জাহান্নাম] হইতে দূরে রাখা হইবে।’ (কুরআন ২১:১০১/ইফা)।

জবাব: কোনো কোনো মানুষের মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে বা মুশরিকদের পক্ষ হতে এ প্রশ্ন উঠতে পারে; বরং বাস্তবে উঠেও থাকে যে, যেমন ঈসা, উযায়ের, ফেরেশতা ও বহু সৎলোকেরও তো ইবাদত করা হয়ে থাকে, তাহলে এরাও কি তাদের ইবাদতকারীর সাথে জাহান্নামে প্রবেশ করবে? এই আয়াতে তারই উত্তর দেওয়া হয়েছে। আর তা এইভাবে যে, তাঁরা ছিলেন আল্লাহর নেক বান্দা, যাঁদের নেকীর কারণে আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁদেরকে চিরস্থায়ী সুখী জীবন বা জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা জাহান্নাম হতে দূরে থাকবেন। যাইহোক, এই আয়াত দ্বারাও ঈসা (আ:)-কে মৃত প্রমাণ করা কোনোভাবেই ঠিক নয়। নতুবা ঈসা (আ:)-কেও জাহান্নামের জ্বালানী বলতে হয়। নাউযুবিল্লাহ। কাদিয়ানীদের উচিত, বেহুঁশ না হয়ে হুঁশে থাকা! নিজের আক্বলকে অন্যের নিকট বর্গা না রেখে বরং ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করা! তবেই ইনশাআল্লাহ, আলো আর অন্ধকার এই দুইয়ের একটিকে অপরটি থেকে ভালোভাবে পার্থক্য করতে পারবেন।

  • আয়াত ২৮ : ‘তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাইবেই, এমনকি সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করিলেও।’ (কুরআন ০৪:৭৮/ইফা)।

জবাব: এই আয়াতের সার হচ্ছে, মৃত্যু অনিবার্য একটি জিনিস যা ঘটবেই। হয়ত কারো আগে, কারো বা অনেক পরে। কিন্তু তাই বলে ঈসা (আ:)-কে পার্থিব জগতে পুনরায় ফিরে আসার আগেই জবরদস্তিমূলক মৃত সাব্যস্ত করতে চাওয়া কি ঠিক? অবশ্যই না।

  • আয়াত ২৯ : ‘রাসূল তোমাদিগকে যাহা দেয় তাহা তোমরা গ্রহণ কর এবং যাহা হইতে তোমাদিগকে নিষেধ করে তাহা হইতে বিরত থাক এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ তো শাস্তিদানে কঠোর।’ (কুরআন ৫৯:০৭/ইফা)।

জবাব: বিজ্ঞপাঠকবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এই আয়াতটিও মির্যা কাদিয়ানী হযরত ঈসা (আ:)-কে মৃত প্রমাণ করার জন্য তার ১৮৯১ সালে রচিত ‘ইযালায়ে আওহাম’ বইতে লিখে যান। অথচ এতে উক্ত বিষয়ে কোনো কথা ইংগিতেও উল্লেখ নেই। এই হচ্ছে তাদের দাবীর পক্ষে তথাকথিত দলিল-প্রমাণ!

  • আয়াত ৩০ : ‘অথবা তোমার একটি স্বর্ণ নির্মিত গৃহ হইবে, অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করিবে, কিন্তু তোমার আকাশ আরোহণে আমরা কখনও ঈমান আনিব না যতক্ষণ তুমি আমাদের প্রতি এক কিতাব অবতীর্ণ না করিবে যাহা আমরা পাঠ করিব। বল  (হে মুহাম্মদ!), পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক। আমি তো হইতেছি কেবল একজন মানুষ; একজন রাসূল।’ (কুরআন ১৭:৯৩)।

জবাব: রাসূল (সা:) এর প্রতি মক্কার কাফেরদের দাবী কিন্তু শুধুই আকাশে আরোহন করা ছিলনা; বরং প্রায় সাতটি দাবী ছিল। তন্মধ্যে একটি ছিল ‘আও তারক্বা ফিস-সামায়ি’ অর্থাৎ অথবা তুমি আকাশে আরোহন করবে। বাদ-বাকী দাবীগুলো এই যে, “ভূমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করা, খেজুর ও আংগুরের বাগানের ফাঁকে ফাঁকে অজস্রধারায় নদী-নালা প্রবাহিত করা, আকাশকে খন্ড-বিখন্ড করে তাদের (কুরাইশদের) উপর ফেলা, আল্লাহ এবং ফেরেশতাদেরকে তাদের সামনে উপস্থিত করা, নবীজির একখানা স্বর্ণ নির্মিত ঘর থাকা। আবার নবীজি (সা:) আকাশে আরোহণ করলেও যথেষ্ট হবেনা যে পর্যন্ত নবীজি তাদের প্রতি কোনো কিতাব অবতীর্ণ না করবেন।” তার পরেই আল্লাহতায়ালা আয়াত নাযিল করেছেন ‘কুল সুবহানা রাব্বী’। অর্থাৎ হে নবী! বলুন নিশ্চয়ই আমার প্রভূ পবিত্র। অতএব উল্লিখিত যুক্তি : ‘মুশরিকরা নবীকে আকাশে আরোহণ করতে প্রস্তাব দেয়া সত্ত্বেও তিনি যখন আকাশে আরোহণ করলেন না, তখন বুঝা গেল কোনো মানুষের পক্ষে আকাশে আরোহণ করা আল্লাহর নিয়মেরই পরিপন্থী কাজ…’—সম্পূর্ণরূপে ভুল ও ভ্রান্ত যুক্তি।

পরিশেষে কাদিয়ানীদের উক্ত যুক্তির মুকাবিলায় স্রেফ একটি প্রশ্ন করব, পবিত্র কুরআনে (০৭:২৭) আদি পিতামাতা আদম হাওয়া দু’জনের জান্নাত থেকে পৃথিবীতে আগমন করা সম্পর্কে ‘কামা আখরাজা আবাওয়াইকুম মিনাল জান্নাতি’ [অর্থাৎ যেভাবে তোমাদের পিতামাতাকে সে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করেছিল—অনুবাদ ইফা] উল্লেখ রয়েছে। তাই প্রশ্ন হল, পৃথিবী থেকে আকাশে যাওয়া সম্ভব না হলে এমতাবস্থায় আমাদের আদি পিতামাতার পক্ষে জান্নাত (আকাশ) থেকে পৃথিবীতে নেমে আসা কিভাবে সম্ভব হল? তবে আমরা আশ্চর্য হব না যদি দেখি যে, আয়াতটির “জান্নাত” শব্দকেও আপনারা রূপক বলে আখ্যা দিচ্ছেন। কারণ আপনাদের দৌড় যেখানে শেষ সেখানটাই অনায়াসে রূপক হয়ে যায়! যাইহোক, আপনাদের উচিত, আল্লাহর ক্ষমতাকে যুক্তি দিয়ে বিচার না করা।

এই পর্যায় আমি কাদিয়ানীদের সমুদয় ভুল ও অপব্যাখ্যার খন্ডনমূলক জবাব দেয়া শেষে তাদের প্রতি আমি শুধুমাত্র ২টি প্রশ্ন করছি। প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়ে চিন্তা করলেই আশাকরি কাদিয়ানী ধর্ম-মতের অসারতা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে।

(এক.) প্রশ্ন. ঈসা আলাইহিস-সালামের ‘রাফা’ ( উঠিয়ে নেয়া) কোথায় এবং কোন ফেরেশতার মাধ্যমে হয়েছিল? (ক) আজরাইল! (খ) জিবরাইল!

নোট : মুসলমানদের বিশ্বাস, ঈসা (আ:)-এর ‘রাফা’ হযরত জিবরাইল (আ:)-এর মাধ্যমে জেরুজালেমেই হয়েছিল। পবিত্র কুরআনের ০৩:৫৫ আয়াতের পটভূমিও আমাদের ডেকে ডেকে বলছে, ঈসা (আ:)-এর উক্ত ‘রাফা’ সেই সময় হয়েছিল যখন জেরুজালেমের ইহুদী সন্ত্রাসীরা হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে ঈসার বাড়ীর আশেপাশে সমবেত হয়েছিল। এ সম্পর্কে হাদীসটি অনুবাদসহ এই, রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন, لما اجتمع اليهود على عيسى عليه السلام ليقتلوه و أتاه جبرائيل … فاَوْحَى اللهُ الى جبرائيلَ اَنِ ارْفَعْ اِلَيَ عَبْدِيْ অর্থাৎ যখন ইহুদীরা ঈসা (আ:)-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে সমবেত হয়েছিল তখন জিবরাইল (আ:) তাঁর নিকট আগমন করেন….. আল্লাহতায়ালা তাঁকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, তুমি আমার বান্দা [ঈসা]-কে আমার নিকট উঠিয়ে নিয়ে এসো। (রেফারেন্স,ইমাম ইবনে আসাকীর এর তারীখে দামেস্ক ৪৭/৪৭২; তারীখে বাগদাদ ১১/৩৭৯)। অতএব বুঝাই যাচ্ছে যে, আজরাইল আর জিবরাইল এঁদের দুইজনের ‘রাফা’ এর তাৎপর্য একই নয়, বরং ভিন্ন!

(দুই.) প্রশ্ন. ঈসা আলাইহিস-সালামের ‘রাফা‘ কখন হয়েছিল? (ক) ক্রুশীয় ষড়যন্ত্রের ৮৭ বছর পর! (খ) ক্রুশীয় ষড়যন্ত্র চলা অবস্থায়!

নোট : মুসলমানদের বিশ্বাস, ঈসা (আ:)-এর ‘রাফা’ তথা উঠিয়ে নেয়ার ঘটনা ক্রুশীয় ঘটনা চলা অবস্থায় ঘটেছিল। কেননা বিশিষ্ট যুগ ইমাম আল্লামা জালালুদ্দিন আস-সুয়ূতী (রহ:) সংকলিত ‘দুররে মানছূর’ কিতাবে সুস্পষ্টভাবে লিখা আছে, ورفع وهو ابن أربع وثلاثين سنة من ميلاده অর্থাৎ ঈসাকে উঠিয়ে নেয়া হয় যখন তিনি ৩৪ বছর বয়সী যুবক (সূরা আলে ইমরান আয়াত নং ৫৬ এর তাফসীর দ্রষ্টব্য)। এতদ্ব্যতীত আরবী মা/مَا (না-বোধক) যুক্ত বাক্যের পর যেখানে-ই ইহুদীদের খন্ডন করার নিমিত্তে ‘বাল’ (بل/বরং) শব্দটি ব্যবহার হয়েছে সেখানে-ই দেখা যায় ‘বাল’ (بل) শব্দের পূর্বের বাক্যের কর্ম আর পরের বাক্যের কর্ম একইকালে সংঘটিত হয়েছিল। এমতাবস্থায় ঈসা (আ:)-এর বিরুদ্ধে ইহুদী কর্তৃক হত্যা আর ক্রুশে লটকানোর ষড়যন্ত্র যদি ফিলিস্তিনেই হয়ে থাকে তখন তাঁর মৃত্যুও পরবর্তী আরো ৮৭ বছর পর কাশ্মীরের শ্রীনগরে কিভাবে হতে পারে? সমীকরণ তো মিলেনা!

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী || শিক্ষাবিদ ও গবেষক
nabifeni44@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here