Tuesday, February 7, 2023
Home Blog Page 2

রাসূল (সা.)-এর নাম শুনে আঙ্গুলে চুমো দিয়ে চোখে লাগানো

আযান ও ইকামতে আঙ্গুলে চুমো দিয়ে চোখে লাগানোর শরয়ী হুকুম কী?

উত্তর, প্রশ্নে উল্লিখিত আমলটি কোনো কোনো মুসলিম সমাজে এখনো দেখা যায়। তারা রাসূল (সা.)-এর নামের প্রতি অত্যাধিক সম্মান প্রদর্শন হেতু এটি করে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশই জীবনেও চিন্তা করে দেখেন না যে, উনাদের ঐ আমলের কোনো বিশুদ্ধ দলিল কুরআন বা হাদীস দ্বারা প্রমাণিত কিনা? আজকে এখানে ভারতবর্ষের প্রখ্যাত বুযূর্গ ও বহু গ্রন্থপ্রণেতা আ’লা হযরত আহমদ রেজাখাঁ বেরেলী (রহ.) এর রচনা থেকে উল্লিখিত প্রশ্নের উত্তর পেশ করব, ইনশাআল্লাহ। আযান ও ইকামতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নাম শুনে আঙ্গুলে চুমু দিয়ে চোখে লাগানোর শরয়ী হুকুম নিয়ে মাসলাকে বেরেলীর প্রধান, মওলানা আহমদ রেজাখাঁ বেরেলী (রহ.) লিখেছেন, ‘প্রথমত আযানের সময়ে (রাসূলুল্লাহ সা.-এর নাম শুনে) আঙ্গুলে চুমো দেয়া কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত নয়। আর এ ব্যাপারে লোকেরা যা কিছুই বর্ণনা করে থাকে তা বিশেষজ্ঞদের নিকট প্রমাণিত নয়। এছাড়া আল্লামা শামী (রহ.) এইরূপ কিছু রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করার পর লিখেন, ইমাম জাররাহী (إِسْماعيلُ بْنُ مُحَمَّد الجَرّاحيّ) এই ব্যাপারে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন অতঃপর বলেছেন, এগুলোর মধ্য হতে কোনো হাদীসই মারফূ পর্যায়ে বিশুদ্ধতার স্তরে পৌঁছেনি’। (রদ্দুল মুহতার খণ্ড ১ পৃষ্ঠা ২৬৭, আযান অধ্যায়)। কিন্তু ইকামতের সময় (আঙ্গুলে চুমো দেয়ার) তো কোনো ভাঙাচুরা হাদীসও নেই। তাই ইকামতের সময় (রাসূলূল্লাহ সা.-এর নাম শুনে) আঙ্গুলে চুমো দেয়া আযানের সময়ে দেয়ার চেয়েও বড় বিদয়াত এবং ভিত্তিহীন আমল। এ কারণেই ফকিহগণ এটিকে একেবারেই পরিত্যাগ করেছেন।’ (ফাতাওয়ায়ে রিজভিয়্যাহ খণ্ড ৫ পৃষ্ঠা নং ৬৩৪)। {উর্দূ থেকে বাংলা অনুবাদ সমাপ্ত হল}। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি –

প্রামাণ্য স্ক্যানকপি
  • ফাতাওয়ায়ে রিজভিয়্যাহ কিতাবটি ডাউনলোড লিংক

টিকা– জাররাহী বলতে ইমাম ইসমাঈল ইবনে মুহাম্মদ আল জাররাহী আল-আজলুনী (রহ.) উদ্দেশ্য। উনার পূর্ণ নাম, ইসমাঈল ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল হাদী ইবনে আব্দুল গণী আল জাররাহী (إسماعيل العجلوني هو إسماعيل بن محمد بن عبد الهادي بن عبد الغني الشهير بالجراحي)। তিনি ফিকহে শাফেয়ীর একজন ফকিহও। ইরাক বংশোদ্ভূত। জন্ম ১৬৭৬ খ্রিস্টাব্দ এবং মৃত্যু ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দ। উসমানীয়া খেলাফত যুগেকার, শামে বসবাস করতেন। তিনি অনেক বড়মাপের একজন হাদীস বিশারদও।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

ঈসা (আ.) এসে এতগুলো ক্রুশ আর শুয়োর কিভাবে নিধন করবেন?

ঈসা (আ.) সম্পর্কে অজ্ঞদের একটা হটকারিতামূলক ওয়াস ওয়াসার জবাব :

মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল (সা.) শিরিক উৎখাতের অংশ হিসেবে কাবাঘরের অভ্যন্তরে থাকা ৩৬০টি মূর্তি ভেঙে ফেলার নির্দেশ জারি করেন। রাসূল (সা.) তখন পবিত্র কুরআনের এই আয়াত পাঠ করলেন, جاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْباطِلُ إِنَّ الْباطِلَ كانَ زَهُوقاً অর্থাৎ সত্য এসেছে আর মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ারই। সহীহ বুখারীতে এসেছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (সা.) থেকে বর্ণিত, (আরবী) عن ‌عبد الله رضي الله عنه قال: «دخل النبي صلى الله عليه وسلم مكة يوم الفتح، وحول البيت ستون وثلاثمائة نصب، فجعل يطعنها بعود في يده ويقول: {جاء الحق وزهق الباطل} {جاء الحق وما يبدئ الباطل وما يعيد} অর্থাৎ (মক্কা বিজয়ের দিন) রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কায় প্রবেশ করলেন। তখন কাবাঘরের চারপাশে তিনশ ৩৬০ টি মূর্তি ছিল। তাঁর হাতের ছড়ি দিয়ে তিনি এগুলোকে ঠোকা দিতে লাগলেন এবং বলছিলেন, “সত্য এসেছে আর মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ারই” (৩৪ঃ ৪৯) “বল সত্য এসেছে আর অসত্য না পারে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে এবং না পারে পুনরাবৃত্তি করতে”। (বুখারী কিতাবুল মাগাজী, হাদীস নং ৪২৮৭)। এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে, রাসূল (সা.) যদিও শিরিক উৎখাতের অংশ হিসেবে মূর্তি ধ্বংস করতে আদিষ্ট ছিলেন, তথাপি ইতিহাস প্রমাণ করে যে, রাসূল (সা.) সেদিন কাবাঘরের সবগুলো মূর্তি একাই ভাঙ্গেননি, বরং উদ্বোধন হিসেবে মাত্র কয়েকটা ভেঙ্গেছিলেন আর বাদ বাকি মূর্তিগুলো নিধনের ফরমান জারি করেন। কথামত তাই হল। তবে সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ যে কয়টি মূর্তি যেসব সাহাবী ভেঙে ফেলেছিলেন তা হচ্ছে, নাখলাতে উয্যা (عزى), যা হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ভেঙে ফেলেন। বনী হোযায়েলের প্রসিদ্ধ মূর্তি ছু’আ (سواع), যা হযরত আমর ইবনুল আস (রা.) ভেঙে ফেলেন। আউস, খাযরাজ ও গাসসানের প্রসিদ্ধতম মূর্তি মানাত (مناة), যা হযরত সাদ ইবনে যায়েদ (রা.) ধ্বংস করেন। তায়েফের প্রসিদ্ধতম মূর্তি ইয়াউক (يعوق), যা হযরত আলী (রা.) ভেঙে ফেলেন। লাত (لات), ইয়াগুছ (يغوث), হুবল (هبل), উদ (ود) এবং নাসর (نسر) ইত্যাদিও তন্মধ্যে অন্যতম।

মূল আলোচনায় ফিরে আসছি, কেয়ামতের পূর্বে যথাসময়ে আল্লাহতালা ফেরেশতার মাধ্যমে দামেস্কে হযরত ঈসা (আ.)-কে পাঠাবেন। মির্যা কাদিয়ানী নিজেও তার রচনায় স্বীকার করে লিখেছে, ہاں دمشق میں অর্থাৎ হ্যাঁ, ঈসা (আ.) দামেস্কেই নাযিল হবেন (রূহানী খাযায়েন ৩/১৭২)। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, দামেস্কের পূর্বপ্রান্তে বলতে সিরিয়া ভূখণ্ড ভিন্ন অনেক দূরের কোনো দেশ (ইরাক, ইরান, হিন্দুস্তান) উদ্দেশ্য নয়। নতুবা মসীহ দাবীদার বাহাউল্লাহ ইরানীর সাথেও হাদীসটি তার অনুসারীরা ইচ্ছে করলে প্রয়োগ করতে পারে! যা নিতান্তই বিকৃত কনসেপ্ট বৈ নয়। অধিকন্তু মুসলিম শরীফের (كتاب الفتن و اشراط الساعة অধ্যায়) হাদীস বলছে, ঈসা (আ.) দুইজন ফেরেশতার দুইডানায় আপনা দুই বাহু রেখে দামেস্কের পূর্বপ্রান্তে (দামেস্কের একদম পূর্বসীমানায় অবস্থিত উমাইয়া মসজিদের সন্নিকটে–ইবনে কাসীর) নাযিল হবেন। তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক এবং সুপথপ্রাপ্ত ইমাম হবেন। তিনি খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদি বিশ্বাসের মূলোৎপাটন করতে ক্রুশ ভেঙে ফেলবেন এবং শুয়োর হত্যার মাধ্যমে কার্যত সেটি বেচা-বিক্রি ও লালনপালনের উপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন। দুর্ভাগা কাদিয়ানী সম্প্রদায় এসব বিষয়ে সাধারণদের বিভ্রান্ত করতে বেশকিছু হটকারিতামূলক প্রশ্নের পেছনে দৌঁড়ায়। তারা যুক্তি দেয়, ঈসা (আ.)-এর পক্ষে দুনিয়ার সমস্ত ক্রুশ আর শুয়োর নিধন করা কি সম্ভব? আসলে তারা এই সংক্রান্ত হাদীসের শব্দগুলোর প্রতি ভালো মত দৃষ্টি দেয়না। হাদীসে ক্রুশ আর শুয়োর শব্দগুলোর আরবী (الصليب ; الخنزير) একবচনে এসেছে। ফলে দুনিয়ার সমস্ত ক্রুশ আর শুয়োর নিধনের প্রশ্ন তোলা একদিকে যেমন অজ্ঞতা, আরেকদিকে হাদীসকে প্রকৃত অর্থ থেকে সরিয়ে মনগড়া রূপক অর্থে প্রয়োগ করার শামিল! জ্ঞানীদের নিকট গোপন থাকেনি যে, অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল (সা.) কাবাঘরের ৩৬০ টি মূর্তি সবগুলো নিজ হাতেই ভাঙ্গেননি, বরং মাত্র কয়েকটি ভেঙ্গেছেন আর বাদ বাকিগুলো ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ জারি করেন। সুতরাং রাসূল (সা.)-এর ফতেহ মক্কার দিনে মূর্তি ভেঙে ফেলার ইতিহাস থেকে আমরা যে শিক্ষা পাই সেটির আলোকে ঈসা (আ.)-এর বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। কাজেই নির্বোধদের উচিত, অন্ধকারে না থেকে আলোতে বেরিয়ে আসা এবং কাজ্জাব আর দাজ্জাল মির্যায়ী চশমার ফাঁক দিয়ে ইসলামকে বুঝার ব্যর্থ চেষ্টা বাদ দিয়ে বরং ইসলামের আদিম ও সহজ সরল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের দিকে ফিরে যাওয়া। আর ব্রেইন ওয়াশ কাল্টদের আল্লাহর নিকট সোপর্দ করছি। ওয়াসসালাম।

লিখক, প্রিন্সিপাল মুহাম্মদ নূরুন্নবী এম.এ

মৃত ব্যক্তিকে দাফনকালে ‘মিনহা খালাক্বনাকুম’ পড়ার বিধান কী?

জানাযাকে কবর দেয়ার সময় ‘মিনহা খালাক্বনাকুম…’ আয়াতটিকে ৩ ভাগ করে পড়া এবং তিন মুষ্টি করে মাটি দেয়ার শরয়ী বিধান সম্পর্কে,

প্রশ্ন, উল্লিখিত পদ্ধতি নাকি ভিত্তিহীন ও বিদয়াত? জনৈক ব্যক্তি বলেছেন, এ সম্পর্কে নাকি কোনো হাদীস পাওয়া যায় না!

উত্তর, আলোচ্য বিষয়ে বলা হয় যে, উপরে উল্লিখিত জিজ্ঞাসায় ‘কোনো হাদীসই পাওয়া যায় না’ একথা সঠিক নয়। তবে ইনসাফের দৃষ্টিতে বলা যেতে পারে যে, এ সংক্রান্ত কোনো বর্ণনাই সূত্রের বিচারে সহীহ নয়, বড়জোর দুর্বল। বলাবাহুল্য, কখনো কখনো কোনো হাদীসের প্রতি সহীহ হওয়ার হুকুম লাগানো হয় যখন তা উম্মাহার আয়েম্মায়ে কেরাম ও মুহাদ্দিসীন কবূলের দৃষ্টিতে গ্রহণ করেন। যদিও তার কোনো সহীহ সনদ না থেকে থাকে। হাফেয সাখাবী (রহ.) ফাতহুল মুগীছ (فتح المغيث بشرح ألفية الحديث) গ্রন্থে এ সম্পর্কে লিখেছেন, إذا تلقت الأمة الضعيف بالقبول يعمل به على الصحيح حتى أنه ينزل منزلة المتواتر في أنه ينسخ المقطوع به ولهذا قال الشافعي رحمه الله في حديث لا وصية لوارث إنه لا يثبته أهل الحديث ولكن العامة تلقته بالقبول وعملوا به حتى جعلوه ناسخا لآية الوصية له অর্থাৎ উম্মত যখন কোনো জঈফ হাদীসকে কবূলের দৃষ্টিতে গ্রহণ করে তখন তার উপর আমল করা হবে বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী। এমনকি তা মুতাওয়াতের এর পর্যায়ে পৌছে যায়। ফলে তা অটাক্যভাবে প্রমাণিত কোনো বিষয়কেও রহিত করে দেয়। এজন্যই ইমাম শাফেয়ী (রহ.) “ওয়ারিসের জন্য কোনো ওসিয়ত নেই” এই হাদীসের ব্যপারে বলেছেন, মুহাদ্দিসীনে কেরাম উক্ত হাদীসটি সহীহ সনদে মেনে নেননি। তবে উম্মত তা গ্রহণ করেছেন এবং তার উপর আমল করেছেন। এমনকি কুরআনের ওসিয়তের আয়াতকে পর্যন্ত তা রহিত করে দিয়েছে “। (হাফেয সাখাবী, ফাতহুল মুগীছ খণ্ড ১ পৃষ্ঠা নং ৩১২)। মূলত সেই উসূল বা নীতির প্রেক্ষিতে আরব বিশ্বের বিখ্যাত মুফতিয়ে আজম, শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বাজ (রহ.) লিখেছেন, মৃত ব্যক্তিকে কবরে নামিয়ে মাটি দেয়া মুহূর্তে পবিত্র কুরআনের সূরা ত্বহা আয়াত নং ৫৫ এর ‘মিনহা খালাক্বনাকুম ওয়া ফীহা নুঈদুকুম ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তা-রাতান উখরা’ তিন ভাগ করে পড়া এবং সে সাথে ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার’ (مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَى) পড়া সুন্নাহ। (মাজমু ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতে শায়খ বিন বাজ খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ১৯৬)। সুতরাং বুঝা গেল, উম্মাহার মাঝে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা আমলটিকে যারা বিদয়াত বলছেন তারা স্বল্প জ্ঞান, সংকীর্ণ গবেষণা ও চিন্তার চরম দুর্বলতার শিকার। অন্যথা যেখানে বরেণ্য ইমাম শায়খ বিন বাজ (রহ.) এর মত বিখ্যাত মুফতিয়ে আজমের ফতুয়া বিদ্যমান, সেখানে পরবর্তীতে নতুন করে এ বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য দেয়া উম্মাহকে বিভ্রান্ত করার শামিল বৈ নয়।

  • এবার সম্পর্কিত আরও যা উল্লেখ করতে যাচ্ছি তা হল,

উল্লিখিত মাসয়ালাটি বর্তমানে যে বা যারা বিদয়াত বলে জনমনে সংশয় তৈরি করার চেষ্টা করছে তাদের বিপরীতে নির্ভরযোগ্য ইমামগণের রচনায় কী উল্লেখ আছে দেখুন! (১) ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) তাফসীরে ইবনে কাসীর গ্রন্থে লিখেছে, (আরবী) وفي الحديث الذي في السنن أن رسول الله صلى الله عليه وسلم حضر جنازة ، فلما دفن الميت أخذ قبضة من التراب فألقاها في القبر ثم قال ( منها خلقناكم ) ثم أخذ أخرى وقال : ( وفيها نعيدكم ) . ثم أخذ أخرى وقال : ( ومنها نخرجكم تارة أخرى ) অর্থাৎ সুনান গ্রন্থগুলোর হাদীসে উল্লেখ আছে যে, রাসূল (সা.) অবশ্যই জানাযায় হাজির হতেন অত:পর মাইয়্যেতকে দাফন করতে মুষ্টিময় মাটি নিতেন। এরপর তিনি যখনি কবরে মাটি ঢালতেন তখন পড়তেন منها خلقناكم এরপর আবার মাটি নিতেন এবং পড়তেন وفيها نعيدكم এরপর তিনি আবার মাটি নিতেন এবং পড়তেন ومنها نخرجكم تارة أخرى {তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা ত্বহা ৫৫ দ্রষ্টব্য }। (২) ইমাম শায়খ বিন বাজ (রহ.) লিখেছেন, (আরবী) س: ما حكم قول: مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَى. [طه:٥٥] عند الدفن؟ ج: هذا سنة، ويقول معه: بسم الله والله أكبر. (مجموع فتاوى ومقالات الشيخ ابن باز ١٣/ ١٩٦) অর্থাৎ প্রশ্ন, দাফনের সময় ‘মিনহা খালাক্বনাকুম’…পড়ার শরয়ী বিধান কী? উত্তর, এটি সুন্নাহ, আর সে সাথে বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার পড়বে। (৩) এবার বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু উমামাহ (রা.) হতে বর্ণিত একটি মারফূ হাদীস উল্লেখ করছি। (আরবী) لما وضعت أم كلثوم بنت رسول الله صلى الله عليه وسلم في القبر قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : منها خلقناكم وفيها نعيدكم ومنها نخرجكم تارة أخرى অর্থাৎ, রাসূল (সা.)-এর কন্যা উম্মে কুলছুমকে যখন কবরে রাখলেন তখন রাসূল (সা.) ‘মিনহা খালাক্বনাকুম ওয়া ফীহা নুঈদুকুম ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তা-রাতান উখরা’ পড়েছেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৬৫১৭)। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) হাদীসটি স্বীয় মুসনাদ গ্রন্থে যে সনদে এনেছেন সেটি জঈফ (দুর্বল) বলে উল্লেখ রয়েছে। তথাপি হানাফী, শাফেয়ী এবং মালেকি মাযহাবের ফাকিহগণ হাদীসটির কন্টেন্টকে আমলে নিয়েছেন এবং আমল ও ফাজায়েল সংক্রান্ত বিষয়ে সূত্রে কিছুটা দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও সেটিকে শর্তমতে ন্যূনতম মুস্তাহাব হবার দলিল হিসেবেই বেছে নিয়েছেন। আমরা এই সংক্রান্ত অপরাপর আরও বহু দলিল প্রমাণ পেশ করতে পারব। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) স্বীয় ‘মুসনাদে শাফেয়ী’ গ্রন্থে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন এইরূপ (আরবী) وعن جعفر بن محمد عن أبيه , { أن رسول الله صلى الله عليه وسلم حثى على الميت ثلاث حثيات بيديه جميعا } অর্থাৎ নিশ্চয়ই রাসূল (সা.) মৃত ব্যক্তিকে উভয় হাতে তিন মুষ্টি করে মাটি দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকেও একই আমল প্রমাণিত। হাদীসের ভাষ্য হল (আরবী) وروي عن ابن عباس , أنه لما دفن زيد بن ثابت حثى في قبره ثلاثا অর্থাৎ ইবনে আব্বাস (রা.) যায়েদ বিন সাবেতকে দাফন করতে যখন আসলেন তিনি তখন তাঁর কবরের উপর তিন মুষ্টি করে মাটি ঢেলেছেন। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক হাদীস নং ৬৪৭৯)। কাজেই এই বিষয়ে উম্মাহার সর্বজন বরেণ্য ফকিহগণের ফতুয়া থাকায় বর্তমান এই ফেতনার যুগে ঐ মীমাংসিত ফিকহের বিপরীতে নতুনভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করা প্রকারান্তরে ফেতনা করারই নামান্তর। এবার শারেহে মুসলিম ইমাম নববী (রহ.) এর রচিত ‘আল-মাজমু’ শরহুল মুহাজ্জাব’ (المجموع شرح المهذب) থেকে উদ্ধৃত করছি, তিনি লিখেছেন (আরবী) يستحب لكل من على القبر أن يحثي عليه ثلاث حثيات تراب بيديه جميعا بعد الفراغ من سد اللحد, وهذا الذي ذكرته من الحثي باليدين جميعا نص عليه الشافعي في الأم, واتفق الأصحاب عليه অর্থাৎ কবরের উপর প্রত্যেকের জন্য এটি বাঞ্ছনীয় যে কবর সমাপ্ত করার পরে উভয় হাতে তিন মুঠো মাটি ঢেলে দেওয়া। আর উভয় হাতে মাটি ঢেলে দেয়ার পুরো যে ব্যাপারটা আমি উল্লেখ করলাম তা ইমাম শাফেয়ী (রহ.) স্বীয় “আল-উম্ম” (الام) কিতাবে প্রমাণ করেছেন। তাঁর এই প্রমাণের উপর সমস্ত হাদীসবিশারদ একমত পোষণ করেছেন। (৪) ইমাম ইবনুল কুদামাহ আল হাম্বলী (রহ.) স্বীয় আল-মুগনী (المغنى) কিতাবে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সম্পর্কে লিখেছেন, (আরবী) أنه حضر جنازة , فلما ألقي عليها التراب , قام إلى القبر , فحثى عليه ثلاث حثيات অর্থাৎ “তিনি (আহমদ ইবনে হাম্বল) একদা একটি জানাযায় হাজির হন, যখন মাটি দেয়ার সময় হল তিনি কবরের নিকটে দাঁড়ান এবং তিন মুষ্টি করে কবরে মাটি দেন।” এভাবে আরও বহু দলিল প্রমাণ পেশ করা যাবে। সুতরাং সালফে সালেহীনের আমল দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, আলোচ্য বিষয়ে নস বা দলিল প্রমাণ অবশ্যই মজুদ রয়েছে। নইলে সালাফদের ঐ সমস্ত কাজকেও কি বিদয়াত বলবেন? লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!

প্রমাণ্য স্ক্রিনশট

ফাতহুল মুগীছ, ইমাম সাখাবী ১/৩১২
শায়খ বিন বাজ (রহ.) এর ফতুয়া
তাফসীরে ইবনে কাসীর

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

শিক্ষাবিদ ও গবেষক।

মির্যা কাদিয়ানী ঈসা (আ.)-এর কথিত কবরস্থান নিয়ে নিজেও কনফিউজড

সিজোফ্রেনিয়া রোগী মির্যা কাদিয়ানী ঈসা (আ.)-এর তথাকথিত কবর নিয়ে নিজেও পুরো কনফিউজড! সাধারণদের বুঝার সুবিধার্থে তার বইয়ের নির্দিষ্ট উর্দূ অংশটির বাংলা উচ্চারণ এবং অর্থসহ তুলে ধরা হল,

اور پھر تبت کی طرف رخ کر لیا ہو اور کیا تعجب کہ حضرت مسیح کی قبر کشمیر یا اس کے نواح میں ہو۔ یہودیوں کے ملکوں سے انکا نکلنا اس بات کی طرف اشارہ تہا کہ ۔۔۔۔

(উচ্চারণ) অওর পের তিব্বত কি তরফ রুখ কর লিয়া হো অওর কেয়া তা’জ্জব কেহ হযরত মসীহ কি কবর কাশ্মীর ইয়া উসকে নাওয়াহ মে হো….! অর্থাৎ অত:পর (ঈসা) তিব্বতের দিকে চলে গেলেন। কি যে আশ্চর্যের ব্যাপার যে, হযরত মসীহ’র কবর কাশ্মীর অথবা তার আশপাশে (তিব্বতে) অবস্থিত। ইহুদী রাষ্ট্রসমূহ হতে তাঁর বেরিয়ে যাওয়া এ দিকেই ইংগিত করে যে…..! (রূহানী খাযায়েন খণ্ড ১০ পৃষ্ঠা নং৩০২)। কী বুঝলা সিজোফ্রেনিয়া রোগীর মুরিদরা? কে জানি প্রশ্ন করল যে, উপরের লাইনের ‘তিব্বতের’ সাথে নিচের লাইনের কবরের স্থানের সম্পর্ক কোথায়? উত্তরে বলব, এটা বুঝার জন্যই তো আগের লাইন ভালো করে পড়তে হবে যেখানে মির্যার বয়ানে ঈসা (আ.) তিব্বতের দিকে চলে গিয়েছিল—কথাটি উল্লেখ রয়েছে। আর পরের লাইনে “অথবা ঈসার কবর কাশ্মীরের আশপাশে” বলতে ঐ তিব্বতকে বুঝানো না হলে তবে কী বুঝাতে পারে বলে আপনি মনে করেন? (স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য)

মির্যায়ী রচনা

উল্লেখ্য, তিব্বত গণচীনের একটি স্বশাসিত অঞ্চল। মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত এ অঞ্চলটি তিব্বতীয় জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। কাশ্মীরের শ্রীনগর থেকে ভারত শাসিত অঞ্চল লাদাখের দূরত্ব মোটর গাড়ী দিয়ে ৪২২ কিলোমিটার, পায়ে হেঁটে চললে চারদিনের পথ। এর পূর্বে তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, দক্ষিণে হিমাচল প্রদেশ রাজ্য, ভারতীয় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীর। তিব্বতী সংস্কৃতি দ্বারা লাদাখ প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত বলে এই অঞ্চলকে ক্ষুদ্র তিব্বত বলা হয়ে থাকে। মির্যা কাদিয়ানীর দাবী, ঈসা (আ.) জেরুজালেম থেকে পালিয়ে কাশ্মীর হয়ে তিব্বতে চলে যান। তার ‘মসীহ হিন্দুস্তান মে’ বইয়ের ভাষ্যমতে, ঈসা (আ.) সেখানে বৌদ্ধভিক্ষুদের সাহচর্যে এসে তাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু মির্যা কাদিয়ানীর এ সমস্ত বাণী শতভাগ মনগড়া এবং ঐতিহাসিকভাবেও অপ্রমাণিত।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক
প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী এম.এ

ঈসা (আ.) খোঁজে খোঁজে সমস্ত ক্রুশ আর শুয়োর কিভাবে নিধন করবেন?

কাদিয়ানী ললিপপ || ঈসা (আ.) এর পক্ষে আবার এসে সারা দুনিয়া ঘুরে ঘুরে খ্রিস্টানদের ক্রুশগুলো ভাঙ্গা এবং জঙ্গল থেকে সমস্ত শুয়োর খোঁজে খোঁজে হত্যা করা কীভাবে সম্ভব?

আজকে কাদিয়ানীদের আরেকটা ললিপপ নিয়ে আপনাদের সাথে কথা বলব। সেটি হচ্ছে, তাদের বই-পুস্তকে ঈসা (আ.)-এর পুনঃ আগমনের বিশ্বাসকে অহেতুক সাব্যস্ত করতে এবং আগত ঈসা সম্পর্কিত বর্ণনার কথাগুলোকে রূপক অর্থে উদ্দেশ্য নিতে প্রায় একটা যুক্তি দেয়া হয়। তা হল, ঈসা (আ.) এর পক্ষে আবার এসে সারা দুনিয়া ঘুরে ঘুরে খ্রিস্টানদের ক্রুশগুলো ভাঙ্গা এবং জঙ্গল থেকে সমস্ত শুয়োর খোঁজে খোঁজে হত্যা করা কীভাবে সম্ভব? আর এই সব কাজের জন্য তাঁর আসার দরকারটাও বা কী? ললিপপ দেখেন! কিভাবে মগজধোলাই দেয়া হল! একটি সত্যকে মাটিচাপা দিতে কত চাতুর্যপূর্ণ গাল-গল্প রচনা করল! সিজোফ্রেনিয়া রোগী মির্যা কাদিয়ানীর রচনাবলীর প্রায় চ্যাপ্টারে এই ডায়লগ দেখতে পাবেন। অনলাইনে তার অন্ধভক্ত কাল্টদেরও বিভিন্ন পোস্ট-কমেন্টে একই ললিপপ কপচাতে দেখবেন। এবার আসুন, আজকে তাদের এই ললিপপটারও হাকীকত উন্মোচন করব, ইনশাআল্লাহ। সর্বপ্রথম সম্পর্কিত পুরো হাদীসটি নিচে পেশ করছি, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত আছে,

وَالَّذِي نَفْسِي بيَدِهِ، لَيُوشِكَنَّ أَنْ يَنْزِلَ فِيكُمُ ابنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَدْلًا، فَيَكْسِرَ الصَّلِيبَ، وَيَقْتُلَ الخِنْزِيرَ، وَيَضَعَ الجِزْيَةَ، وَيَفِيضَ المَالُ حتَّى لا يَقْبَلَهُ أَحَدٌ، حتَّى تَكُونَ السَّجْدَةُ الوَاحِدَةُ خَيْرًا مِنَ الدُّنْيَا وَما فِيهَا. ثُمَّ يقولُ أَبُو هُرَيْرَةَ: وَاقْرَؤُوا إنْ شِئْتُمْ: {وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلَّا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا} [النساء: ১৫৯].

অর্থাৎ হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কসম সেই সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ, অচিরেই তোমাদের মাঝে মরিয়ামের পুত্র ঈসা (আ.) শাসক ও ন্যায় বিচারক হিসেবে অবতরণ করবেন। তিনি ‘ক্রুশ’ ভেঙ্গে ফেলবেন, শুয়োর হত্যা করবেন এবং তিনি যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটাবেন। তখন সম্পদের স্রোত বয়ে চলবে। এমনকি কেউ তা গ্রহণ করতে চাইবে না। তখন আল্লাহকে একটি সিজ্‌দা করা সমগ্র দুনিয়া এবং তার মধ্যকার সমস্ত সম্পদ থেকে বেশী মূল্যবান বলে গণ্য হবে। এরপর আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, তোমরা ইচ্ছা করলে এর সমর্থনে এ আয়াতটি পড়তে পারো, কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে তাঁর মৃত্যুর পূর্বে তাঁকে বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামতের দ্বীন তিনি তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেন। [সহীহ বুখারী (ইফা.) অধ্যায় ৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আ.) (كتاب أحاديث الأنبياء) হাদীস নং ৩২০৫, ঈসা ইবন মারিয়াম (আ.) এর অবতরণের বর্ণনা]।

প্রথম কথা হল, ক্রুশ ভাঙ্গা আর শুয়োর হত্যা সম্পর্কিত হাদীসে শব্দ দুটির আরবী হল فَيَكْسِرَ الصَّلِيبَ، وَيَقْتُلَ الخِنْزِيرَ অর্থাৎ তিনি ক্রুশ ভাঙ্গবেন এবং শুয়োর হত্যা করবেন। দেখুন, সহীহ বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া অধ্যায়। পাঠকবৃন্দ খুব খেয়াল করুন, হাদীসে ‘ক্রুশ’ (الصَّلِيبَ) আর ‘শুয়োর’ (الخِنْزِيرَ) শব্দ দুটি একবচনে এসেছে। ফলে ঈসা (আ.)-এর জন্য সিজোফ্রেনিয়া পাড়ার অসুস্থ কাল্টদের ঐ ললিপপ পুরোদমে মেয়াদ উত্তীর্ণ বলে সাব্যস্ত হল। উল্লেখ্য, হাদীসে উল্লিখিত الصَّلِيبَ বা ছলীব এর বহুবচন হচ্ছে صلب (ছুলুব) অথবা صلبان (ছুলবান)। الصَّلِيبَ বা ছলীব অর্থ, ক্রুশ, ক্রস। আর الخِنْزِيرَ (খিঞ্জির) এর বহুবচন হচ্ছে, الخنازير বা আল খানাজীর। الخِنْزِيرَ (খিঞ্জির) অর্থ শুয়োর। এখন প্রশ্ন রইল, তাহলে ভবিষ্যৎবাণী কীরূপে পূর্ণ হবে? এর উত্তর হল, যেহেতু হাদীসে উক্ত শব্দদুটি একবচনেই এসেছে, সেহেতু ঈসা (আ.) দুনিয়ায় আবার যখন আসবেন তখন তাঁর সম্পর্কে খ্রিস্টান জাতি ইতিপূর্বে যে ভ্রান্ত ক্রুশীয় মতবাদ রটিয়েছিল তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মাত্র ২/১টা ক্রুশ ভঙ্গ করার মাধ্যমে সেই মতবাদের অবসান ঘটাবেন। অনুরূপ খ্রিস্টান জাতির মধ্যকার প্রচলিত শুয়োর বেচা-বিক্রি ও পোষণের উপর আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে নিজ হাতে ২/১টা শুয়োর হত্যা করবেন (أي يبطل دين النصرانية بأن يكسر الصليب حقيقة ويبطل ما تزعمه النصارى من تعظيمه ويستفاد منه تحريم اقتناء الخنزير وتحريم أكله وأنه نجس لان الشئ المنتفع به لا يشرع اتلافه وقد تقدم ذكر شئ من ذلك في أواخر البيوع) দেখুন, ফাতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী, খণ্ড ৬ পৃষ্ঠা ৩৫৬, ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)। আর এ কাজগুলো সম্পূর্ণভাবে আক্ষরিক অর্থেই ঘটবে। এটিকে কোনোভাবেই রূপক অর্থে উদ্দেশ্য নেয়া যাবেনা। তার কারণ, সহীহ বুখারীর উক্ত হাদীসটি শুরুই হয়েছে وَالَّذِي نَفْسِي بيَدِهِ (সে সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ) শপথ বাক্য সহকারে। আর শপথ বাক্য সহ যে সমস্ত হাদীসে কোনো ভবিষ্যৎবাণী থাকে সেটি কখনো রূপক অর্থে উদ্দেশ্য হয়না। অন্যথা শপথ করে লাভ কী হল? একথা খোদ সিজোফ্রেনিয়া রোগী মির্যা কাদিয়ানীরও। (দেখুন, তার রচনা ‘হামামাতুল বুশরা‘ (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ২৭, পুনঃ প্রকাশ নভেম্বর ২০১১ ইং)। এরপরেও যদি আপনার কাছে ললিপপ মজা লাগে তাহলে যত ইচ্ছে খেতে থাকুন!

দ্বিতীয় কথা হল, হাদীসে বর্ণিত শব্দগুলো فَيَكْسِرَ الصَّلِيبَ، وَيَقْتُلَ الخِنْزِيرَ (অর্থাৎ তিনি ক্রুশ ভাঙ্গবেন এবং শুয়োর হত্যা করবেন) থেকেও পরিষ্কার ইংগিত পাওয়া যায় যে, ঈসা (আ.) এসে রাষ্ট্র প্রধানের পদমর্যাদায় আসীন হবেন। কারণ রাষ্ট্র প্রধান ছাড়া এই কাজগুলো সাধারণ মানুষদের পক্ষে অসম্ভব। ফাতহুল বারী-তে আসছে, وَيَضَعَ الحربَ {ওয়া ইয়াদ্বাউল হারবা} অর্থাৎ তিনি যুদ্ধ রহিত করবেন। সহীহ বুখারীর একই বর্ণনায় রয়েছে وَيَضَعَ الجِزْيَةَ {ওয়া ইয়াদ্বাউল জিজিয়াতা} অর্থাৎ তিনি জিজিয়া (রাষ্ট্রীয়-ট্যাক্স) মওকুফ করবেন। খুব গভীরভাবে চিন্তা করুন তো, শপথ বাক্য সহকারে বর্ণিত হাদীসের এই কথাগুলো যদি আক্ষরিক অর্থেই পূর্ণতা পেতে হয় তাহলে ঈসা (আ.) সম্পর্কে একই হাদীসে উল্লিখিত حكما عدلا (অর্থ ন্যায়পরায়ণ শাসক) বলতে কথিত রূপক কোনো রূহানী সত্তা উদ্দেশ্য হতে পারে কিভাবে? আসলে যারা ইসলামকে মির্যায়ী চশমার ফাঁক দিয়ে দেখতে অভ্যস্ত কিংবা মির্যায়ী সিলেবাসের বাহিরে ইসলাম সম্পর্কে কোনো জ্ঞানই রাখেন না, তারা মূলধারার ইসলামী শিক্ষাদীক্ষা হতে পুরোপুরি অন্ধকারেই থাকবেন, থাকাটাই স্বাভাবিক।

মির্যায়ী রচনা, হামামাতুল বুশরা পৃ-২৭

শেষকথা হল, এত সহজ করে বিষয়টি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার পরেও যেসব কাল্ট সিজোফ্রেনিয়া রোগীর মতই আচরণ করতে চান তাদেরকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করছি। আল্লাহই উত্তম ফয়সালকারী।

  • প্রিয় দ্বীনি ভাইয়েরা! খুবই দলিলিভিত্তিক লিখাটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক
প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

বিতিরের সালাতে উলটো তাকবীরের শরয়ী হুকুম

প্রশ্নকর্তা

বিতিরের নামাজে তৃতীয় রাকাতে উল্টো নিয়ত বাঁধার সমর্থনে সহীহ হাদীস আছে কি না?

জবাব : আপনি প্রশ্ন করেছেন, তৃতীয় রাকাতে যে উল্টো নিয়ত বাঁধা হয় তা কোন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত? জবাবে বলব, জ্বী হ্যাঁ, এর সমর্থনে মোটামুটি নিচের হাদীস গুলো দেখা যেতে পারে! শরহু মুশকিলিল আছার ১১/৩৭৪; ইমাম আবু জা’ফর আত-ত্বহাবী (রহ.)। কিতাবটি মোট ১৬ খন্ডে প্রকাশিত। ইমাম বুখারীর দাদা উস্তাদ ইবনে আবী শায়বা সংকলিত ‘মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা’ ২/৩০৭। জুযউ রাফয়িল ইয়াদাইন ৬৮; ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ঈসমাইল আল- বুখারী (রহ.)। আস-সুনানুল কুবরা ২/২১১; ইমাম বায়হাকী (রহ.)। ইমাম আবু বাকর আহমদ ইবনে হুসাইন আল-বায়হাকী (রহ.)। এখন আপনি হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন যে, এখানে তো সিয়াহ সিত্তা’র কোনো কিতাবই দেখতে পাচ্ছিনা! জবাবে বলব, সনদের বিশুদ্ধতার ভিত্তিতেই হাদীস গ্রহণযোগ্যতা পায়, সিয়াহ সিত্তা’র ভিত্তিতে নয়। কারণ, সমস্ত সহীহ হাদীস কিন্তু সিয়াহ সিত্তা’র ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে নি। ইমাম বুখারী (রহ.) থেকে উদ্ধৃত আছে, তিনি বলেছেন “আমি প্রায় ১ লক্ষ সহীহ হাদীস থেকে মাত্র হাজার সাতেক (মোট হাদীস সংখ্যা ৭,৩৭৫) হাদীস সহীহ বুখারীর মধ্যে এনেছি।” উল্লেখ্য, ইমাম বুখারী তিনি তাঁর বুখারী শরীফে শুধুমাত্র সে সমস্ত হাদীসই সংকলন করেছেন সহীহ হাদীসের মাঝে যেগুলো তার নির্ধারিত শর্তে উন্নীত হয়েছে। অতএব বুঝা গেল, অসংখ্য সহীহ হাদীস সেই সিয়াহ সিত্তা’র বাহিরেও নানা কিতাবে উল্লেখ রয়েছে।

মূলকথায় ফিরে এলাম, এখানে প্রশ্নটি যেরকম ঠিক সেরকমই আমি উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব, ইনশা-আল্লাহ। তাই প্রশ্নকারী ভাইটি যেহেতু জানতে চাচ্ছেন, তৃতীয় রাকাতে উল্টো নিয়ত (এখানে ‘উল্টো নিয়ত’ শব্দের বদলে ‘রাফউল ইয়াদাইন’ অর্থাৎ দুইহাত উঠানো, লিখা উচিত ছিল – লিখক) বলে হাত বাঁধার দলিল আছে কিনা, সেহেতু তার আগে তার এই বিষয়ের জ্ঞান থাকাও প্রয়োজন যে, কুনূত এটি কত প্রকার ও কী কী? রাসূল (সা.) কোন প্রকারের কুনূত কিভাবে পড়তেন এবং কোনটি সব সময় পড়তেন আর কোনটি সারা জীবনে মাত্র একবার পড়েছিলেন? তবেই পরবর্তী আলোচনা বুঝতে তার পক্ষে সহজ হবে। যাইহোক, প্রশ্নকারীর অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, কুনূত দুই প্রকার। যথা – কুনূতে নাজেলা আর অপরটি দোয়ায়ে কুনূত বা বিতিরের কুনূত। সংক্ষেপে নিচে উল্লেখ করছি। কুনূতে নাজেলা সেই কুনূত যেটি রাসূল (সা.) সারা জীবনে একবার পড়েছিলেন এবং ফজরের নামাজে দ্বিতীয় রাকাতে রূকুর পর সোজা হয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় পড়েছিলেন। তারপর বিতিরের কুনূত। এটিকে দোয়ায়ে কুনূতও বলা হয়। আলোচ্য প্রশ্নমতে উত্তরে আসার আগে আমাদের যেই বিষয়টি পরিষ্কার করা জুরুরি সেটি হল, দোয়ায়ে কুনূত রুকুর আগে, না পরে? এর সহজ উত্তর হচ্ছে, এ বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে ইজতিহাদগত মতের ভিন্নতা রয়েছে। হানাফী মাযহবের ফকিহগণ বলেছেন, রুকুর আগে পড়তে হবে। এর দলিল হল, সহীহ বুখারী (১/১৩৬) ‘বাবুল কুনূত কাবলার রুকু ওয়া বা’দাহ’ শীর্ষক পরিচ্ছেদে আছে, আসিম আহওয়াল (রহ.) হতে বর্ণিত আছে, سَأَلْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ، عَنِ الْقُنُوتِ؟ فَقَالَ: قَدْ كَانَ الْقُنُوتُ، قُلْتُ: قَبْلَ الرُّكُوعِ أَوْ بَعْدَهُ؟ قَالَ: قَبْلَهُ، قُلْتُ: فَإِنَّ فُلَانًا أَخْبَرَنِي عَنْكَ، أَنَّكَ قُلْتَ : بَعْدَ الرُّكُوعِ، فَقَالَ: كَذَبَ، إِنَّمَا قَنَتَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ بَعْدَ الرُّكُوعِ شَهْرًا অর্থাৎ আমি আনাস ইবনে মালিক (রা.)-কে কুনূত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, কুনূত আছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, রুকুর আগে, না পরে? তিনি বললেন, রুকুর আগে। আমি বললাম, জনৈক ব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে, আপনি রুকুর পরে কুনূত পড়ার কথা বলেছেন? তিনি বললেন, সে ভুল বলেছে। রুকুর পরে তো নবী করীম (সা.) শুধু এক মাস কুনূত (কুনূতে নাজেলা) পড়েছেন। (অনুবাদ শেষ হল)।

তবে রুকুর পরে কুনূতের কথাও হাদীসে আছে। হানাফী ফকিহগণ উভয় বর্ণনার মাঝে সমন্বয় এভাবে করেন যে, কুনূতে নাযেলা রুকুর পরে ও বিশেষ বিশেষ অবস্থায় পড়া হবে। আর বিতিরের কুনূত রুকুর আগে ও সব সময় পড়া হবে। কেননা, আনাস (রা.) থেকেই অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমৃত্যু কুনূত পড়েছেন। (দেখুন, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১৩৯) এই বর্ণনায় বিতিরের কুনূতই উদ্দেশ্য। কারণ ফজরের কুনূত সর্বদা পড়ার প্রমাণ পাওয়া যায় না।

এবার কুনূতের আগে উল্টো তাকবীর অর্থাৎ রাফউল ইয়াদাইন (হাত উত্তোলন) সম্পর্কে বলব। এই পর্যায় তৃতীয় রাকাতে কুনূত পড়ার দলিল তো পেলেন। এবার কুনূতের আগে উল্টো তাকবির (অর্থাৎ রাফউল ইয়াদাইন) করার প্রমাণ আছে কিনা দেখা যাক। হ্যাঁ, এ সম্পর্কে ত্বাহাবী শরীফের ভাষ্যমতে বুঝা যায়, যারা উপরোক্ত হাদীস সমূহের ভিত্তিতে রুকুর আগে কুনূত পড়ার কথা বলেন তাদের নিকট কিরাত এবং কুনূতের মাঝে (উল্টো) তাকবীর বলা সুন্নাত। এই তাকবীরের সাথে রাফউল ইয়াদাইন (হাত উত্তোলন) আছে। যেমন ইমাম ত্বাহাবী (রহ.) লিখেছেন وقد أجمع الذين يقنتون قبل الركوع على الرفع معها অর্থাৎ যারা রুকুর পূর্বে কুনূত পড়ার কথা বলেন তাদের ইজমা বা ঐক্যমত্য রয়েছে যে, এই তাকবীরের সাথে রাফউল ইয়াদাইনও করতে হবে।’ (ত্বাহাবী শরীফ ১/৩৩২)। আরব বিশ্বের প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ শায়খ মুহাম্মদ বিন ছালেহ আল উসাইমিন (রহ.)-এর ফতুয়া এই যে, তিনি লিখেছেন, وكذلك صح عن أمير المؤمنين عمر بن الخطاب رضي الله عنه رفع اليدين فِي قنوت الوتر ، وهو أحد الخلفاء الراشدين الذين أمرنا باتباعهم অর্থাৎ তেমনিভাবে আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা.) সম্পর্কে বিশুদ্ধসূত্রে উল্লেখ আছে, বিতিরের কুনূতের মধ্যে তিনি রাফউল ইয়াদাইন (উল্টো নিয়ত) করতেন। অধিকন্তু তিনি খোলাফায়ে রাশেদীনের অন্যতম ছিলেন যাদের আনুগত্য করার ব্যাপারে আমরা আদিষ্ট। (দেখুন, মাজমুউল ফাতাওয়া ১৪/১৩৬)। এরপর সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে কিছু দলিল উল্লেখ করব। কেননা, সাহাবায়ে কেরামের আমল নিশ্চয় নবী করীম (সা.)-এর সুস্পষ্ট শিক্ষা থেকেই গৃহীত আমল। নিচে দলিলসহ উল্লেখ করছি।

(১) আবু ইসহাক থেকে বর্ণিত, মাসরূক (রহ.), আসওয়াদ (রহ.) এবং ইবনে মাসউদ (রা:)-এর অন্য শাগরিদগণ বলেছেন وَكَانَ عَبْدُ اللَّهِ لا يَقْنُتُ إلا فِي الْوِتْرِ وَ كَانَ يَقْنُتُ قَبْلَ الرُّكُوعِ يُكَبِّرُ إِذَا فَرَغَ مِنْ قِرَاءَتِهِ حِينَ يَقْنُتُ অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) শুধু বিতির নামাযে কুনূত পড়তেন আর তিনি কুনূত পড়তেন রুকুর আগে এবং কিরাআত সমাপ্ত হওয়ার পর কুনূত পড়ার সময় [উল্টো] তাকবীর দিতেন। (শরহু মুশকিলিল আছার ১১/৩৭৪ মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা ২/৩০৭)।

(২) ইমাম বুখারী (রহ.) তিনিও তাঁর রচিত একটি কিতাব ‘জুযউ রাফয়িল ইয়াদাইন’ এর ৬৮ নং পৃষ্ঠাতে উল্লেখ করেছেন عن أبي عثمان كان عمر رضي الله عنه يرفع يديه في القنوت অর্থাৎ আবু উছমান বলেছেন ‘উমর (রা.) কুনূতের মধ্যে রাফউল ইয়াদাইন [অর্থাৎ উল্টো তাকবীর] করতেন। তারপর ইমাম বুখারী (রহ.) তার উল্লিখিত হাদীসটির সনদ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেন هذه الأحاديث صحيحة عن رسول الله صلى الله عليه وسلم و أصحابه অর্থাৎ এই হাদীসগুলো রাসূল (সা.) আর তাঁর সাহাবীদের পক্ষ হতে সহীহ তথা বিশুদ্ধ।

(৩) ইমাম বায়হাকী (রহ.) উল্লেখ করেছেন إن عدداً من الصحابة رضي الله عنهم رفعوا أيديهم في القنوت অর্থাৎ নিশ্চয় সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই কুনূতের মধ্যে রাফউল ইয়াদাইন [অর্থাৎ উল্টো তাকবীর] করতেন।’ (দেখুন, আস-সুনানুল কুবরা ২/২১১; ইমাম বায়হাকী রহ: সংকলিত হাদীসের অন্যতম কিতাব)।

রাফউল ইয়াদাইন (হাত উত্তোলন)’র পর হাত কী করবে? এর জবাবে বলা হয়েছে যে, এর তিনটি পদ্ধতি হতে পারে। যথা – (১) দোয়ার মতো হাত উঠিয়ে রাখবে (২) রাফউল ইয়াদাইন (হাত উত্তোলন) করার পর কওমার মত হাত ছেড়ে দিবে (৩) রাফউল ইয়াদাইনের পর দাঁড়ানো অবস্থার মত দুই হাত বেঁধে নিবে। প্রথম পদ্ধতিটি হানাফী ফকিহগণের নিকট পছন্দনীয় নয়। কেননা, যদিও হাত তুলে দোয়া করাই দোয়ার সাধারণ নিয়ম কিন্তু নামাযের যত জায়গায় দোয়া আছে কোথাও হাত ওঠানোর নিয়ম নেই। সুতরাং দোয়ায়ে কুনূতের সময়ও এর ব্যতিক্রম হবে না। এজন্যই ইবনে উমর (রা.) এই পদ্ধতিকে বিদআত বলেছেন। তিনি বলেন : أرأيتم قيامكم عند فراغ الإمام من السورة هذا القنوت والله إنه لبدعة ما فعله رسول الله ﷺ غير شهر ثم تركه أرأيتم رفعكم في الصلاة والله إنه لبدعة ما زاد رسول الله ﷺهذا قط فرفع يديه حيال منكبيه অর্থাৎ দেখ! তোমরা যে ফজরের নামাযেও ইমামের কিরাত শেষে কুনূতের জন্য দাঁড়াও, আল্লাহর কসম! এটা বিদআত। নবী (সা.) তা শুধু এক মাস করেছেন। দেখ! তোমরা যে নামাযে হাত তুলে কুনূত পড়, আল্লাহর কসম; এটিও বিদআত। নবী (সা.) তো শুধু কাঁধ পর্যন্ত হাত তুলতেন। (আল-মু’জামুল কাবীর লিত-তবারানী; মাজমাউয যাওয়াইদ ২/১৩৭)। উপরোক্ত রেওয়ায়েতের সরল অর্থ এটাই যে, নবী করীম (সা.) কুনূতের জন্য যদিও রাফউল ইয়াদাইন [অর্থাৎ উল্টো তাকবীর] করতেন কিন্তু দোয়ার মতো হাত উঠিয়ে কুনূত পড়তেন না।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় পদ্ধতি সম্পর্কে কথা এই যে, কুনূত যদি রুকুর আগে পড়া হয়, যেমন বিতরের কুনূত; তো রুকুর আগের অবস্থা যেহেতু দাঁড়ানো অবস্থা, আর দাঁড়ানো অবস্থায় হাত বাঁধা সুন্নত, তাই এ সময়ও হাত বাঁধা থাকবে। পক্ষান্তরে কুনূতে নাজেলা যেহেতু রুকুর পর কওমার হালতে পড়া হয় আর কওমার হালতে হাত বাঁধা সুন্নত নয়; তাই এটিও (কুনূতে নাজেলা) হাত না বেঁধে বরং ছেড়ে দেয়া অবস্থাতেই পড়া হবে। সংক্ষেপে এইটুকু লিখলাম। নতুবা আরো অনেক দলিল দেয়া যেত। আল্লাহ আমাদের মুহাম্মদে আরাবীর আনীত সহীহ দ্বীন বুঝার তাওফিক দিন। আমীন।

লিখক ও গবেষক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী এম.এ

সম্মিলিত মুনাজাতের শরয়ী হুকুম

সম্মিলিত মুনাজাত, পর্যালোচনা ও সমাধান :

ফরজ সালাতের পরপর আল্লাহর রাসূল (সা.) সম্মিলিত মুনাজাত করেছিলেন মর্মে কোনো হাদীস বা রেওয়ায়েত সহীহ সনদে পাওয়া যায়না, একথা সঠিক। কিন্তু তিন শর্তে এধরণের সম্মিলিত মুনাজাত বড়জোর জায়েজ হতে পারে। তবে যেহেতু সুন্নাত নয় সেহেতু মাঝেমধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে মুনাজাত ছেড়ে দেয়া উত্তম। যাতে অন্যরা এটিকে জরুরি মনে না করে।

• তিনটি শর্ত হল :
১. ফরজ নামাযের পর সম্মিলিত মুনাজাতকে জরুরী মনে করা যাবেনা।
২. সম্মিলিত মুনাজাতকে নামাযের অংশ মনে করা যাবেনা।
৩. সম্মিলিত মুনাজাত ছাড়া নামায পূর্ণ হয় না, এরূপ আকিদা রাখা যাবেনা।

  • সতর্কতা : ফরজ সালাতের পর মুনাজাতের শরয়ী বিধান থাকা প্রমাণ করতে কেউ কেউ ‘মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ’ {مصنف ابن أبى شيبة} থেকে একখানা হাদীস পেশ করে থাকেন। আসলে ইনসাফের দৃষ্টিতে তাকালে হাদীসটির কোনোই গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণিত নয়। কেননা হাদীসের মতনে مضطرب বা বিশৃঙ্খল সৃষ্টি হয়ে আছে। কারণ ইমাম ইবনে হাযম (রহ.) সংকলিত ‘আল মুহাল্লা‘ কিতাবে বর্ণনাটিতে ورفع يديه ودعا অংশটুকু নেই। এতদ্ব্যতীত ইমাম ইবনে আবী শাইবাহ (রহ.)-এর সংকলন ‘মুসান্নাফ‘ কিতাবে বর্ণনাটি বর্ণিত হয়েছে সনদ (সূত্র) বিহীন। ফলে বর্ণনার কথাটি আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর মুখনিঃসৃত হওয়া সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয়না। অন্তত জঈফ বা দুর্বল পর্যায়ের হলেও কোনোমতে ফাজায়েল বা আমলের ক্ষেত্রে গ্রহণ করা যেত। এবার বর্ণনাটির মতন সহ অর্থ পড়ুন, হযরত আসওয়াদ আল আ’মেরী {الأسود العامري} (রা.) স্বীয় পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, صليت مع النبي صلي الله عليه وسلم الفجر فلما سلم انحرف ورفع يديه و دعا অর্থাৎ আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ফজরের সালাত আদায় করেছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) সালাম ফেরানোর পর পাশ ফেরালেন এবং দুই হাত তুলে দোয়া করলেন। (তিরমিজি শরীফের আরবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ তুহফাতুল আহওয়াযী খণ্ড নং ২ পৃষ্ঠা নং ১৬৮, শায়খ আল্লামা আবদুর রহমান মুবারকপুরী (১৮৬৫-১৯৩৫ খ্রি.)।

তবে হ্যাঁ, সাধারণভাবে সম্মিলিত মুনাজাতকেও যারা নাজায়েজ বা বিদয়াত বলতে চান তারা নিঃসন্দেহে ভুলের মধ্যে রয়েছেন। কারণ, একাধিক সহীহ হাদীস দ্বারাই সাধারণভাবে সম্মিলিত মুনাজাত জায়েজ, প্রমাণিত। আর এটি এখন আমাদের আহলে হাদীসবন্ধুরাও কার্যত মেনে নিয়েছেন। কেননা আমরা দেখেছি, ১৬ ই অক্টোবর ২০২১ ইং মুতাবেক সাভারের বাইপাইলে জমঈয়তে আহলে হাদীস-এর দশম কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অধিবেশনে সংগঠনটির নতুন সভাপতি ড. আব্দুল্লাহ ফারুক এবং সাধারণ সম্পাদক ড. শহীদুল্লাহ খান মাদানী মনোনীত হন। অনুষ্ঠানে তখন সবাইকে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করতেও দেখা গিয়েছে। (দৈনিক ইনকিলাব, ১৭-১০-২০২১)। এবার তাহলে একজন সাহাবীর একটা ঘটনা বলি, শুনুন!

(১) আল্লাহর প্রিয় একজন সাহাবী ছিলেন, নাম আ’লা বিন হাযরামী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)। তিনি একজন ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়া’ সাহাবী ছিলেন। একবারের ঘটনা,  তিনি এবং তাঁর সহযোদ্ধারা বাহরাইনের জিহাদ থেকে মদীনা ফেরার পথে একস্থানে যাত্রাবিরতি করলেন। ইত্যবসরে তাঁদের একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেল, তাঁদের উটগুলো তাদের রসদপত্রসহ হঠাৎ কোথাও পালিয়ে গেল। তখন গভীর রাত। তাদের দুশ্চিন্তার শেষ ছিলনা।  ফজরের সময় হল। মুয়াজ্জিন আজান দিল। সবাই জামাতে সালাত আদায় করলো। সালাত শেষে নবীজী (সা.)-এর প্রিয় সাহাবী হযরত আ’লা বিন হাযরামী উপস্থিত সাথীদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে হাত তুলে মুনাজাত শুরু করলেন। আল্লাহর সমীপে কাকুতি মিনতি সহকারে এমন মুনাজাত করলেন সূর্য উদিত হয়ে গেল, সূর্যের কিরণ এসে গায়ে পড়ল, তাদের সম্মিলিত মুনাজাতটি এত দীর্ঘ ছিল। সাহাবীদের সম্মিলিত মুনাজাতের এই ঘটনাটি ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) বিশুদ্ধ সনদে তার সংকলন ‘আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া’ এর ষষ্ঠ খণ্ডের ৩২৮-৩২৯ নং পৃষ্ঠায় এনেছেন। হাদীসটির আরবী সংক্ষেপে – فلمَّا قَضَى الصَّلاة جَثَا عَلَى رُكْبَتَيْهِ وَجَثَا النَّاس، وَنَصِبَ فِي الدُّعاء وَرَفَعَ يَدَيْهِ وَفَعَلَ النَّاس مِثْلَهُ حَتَّى طَلَعَتِ الشَّمْسُ

(২) সম্মিলিত মুনাজাতের প্রচলিত আমলের জায়েজের পক্ষে একদম টাটকা বিশুদ্ধ সনদে আরেকটি বর্ণনা এরকম, নবীজী (সা.)-এর আরেকজন সাহাবী ছিলেন, হযরত হাবীব বিন মাসলামা আলফিহরী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, (আরবী) لَا يَجْتَمِعُ مَلَأٌ فَيَدْعُو بَعْضُهُمْ وَيُؤَمِّنُ سَائِرُهُمْ، إِلَّا أَجَابَهُمُ اللَّهُ  অর্থাৎ “যখনি কোনো দল একত্র হয়, তারপর তাদের কেউ দোয়া করে, আর কেউ আমীন বলে, তখন আল্লাহতালা তাদের সে দোয়া কবুল করেন”। (রেফারেন্স, মুস্তাতাদরাক আলাস সহীহাইন, হাদীস নং-৫৪৭৮)। তাহকীক, ইমাম নূরুদ্দীন আল-হায়ছামী (রহ.) বলেন, (আরবী) وَرِجَالُهُ رِجَالُ الصَّحِيحِ غَيْرَ ابْنِ لَهِيعَةَ، وَهُوَ حَسَنُ الْحَدِيثِ অর্থ- উক্ত হাদীসের সূত্রের প্রতিটি রাবী সহীহ’র রাবী। ইবনে লাহিয়াহ ছাড়া। কিন্তু সেও হাসান পর্যায়ের রাবী। (মাযমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস নং ১৭৩৪৭)।

আপাদত এ পর্যন্ত। শেষ কথা হল, এ সমস্ত সাধারণ বিষয়ে মুসলমানদের ঝগড়াঝাটি করা এখন মোটেও সমুচিত নয়। এখন উম্মাহার সামনে অনেক বড় বড় বিপর্যয়। এখন আমল নিয়ে যতটা চিন্তার বিষয় তার চেয়ে কোটিগুণ বেশি ঈমান টিকিয়ে রাখার বিষয়। কাজেই আসুন, ঈমান আকীদার সংগ্রামে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই, ছোটোখাটো বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে সময় নষ্ট না করি।

মক্কার সম্মানিত ইমাম শায়খ আল্লামা আব্দুর রহমান আস সুদাইসী (হাফিঃ) এর সম্মিলিত মুনাজাত
মুহাম্মদ বিন সালমান মসজিদে নববীতে
বিশিষ্ট স্কলার ডা. জাকির নায়েক
জমঈয়তে আহলে হাদীস-এর দশম কেন্দ্রীয় কাউন্সিল অধিবেশনে সম্মিলিত মুনাজাতের দৃশ্য

লিখক, প্রিন্সিপাল মুহাম্মদ নূরুন্নবী এম.এ

কাদিয়ানী কারা? এক নজরে পড়ে নিন

Who are Qadiani?

কাদিয়ানী কারা? ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ হাইকোর্ট থেকে তাদের বইপুস্তক বাজেয়াপ্ত করে কেন?

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
১. কাদিয়ানী কারা?

কাদিয়ানীরা সাধারণ মানুষকে ধোকা দেয়ার উদ্দেশ্যে বলে যে, তারাও নাকি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে “শেষনবী” বিশ্বাস করে। অথচ তাদের বই-পুস্তকে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে “শেষনবী” বলে লিখা আছে। তারা মানুষকে দলে টানার সময় যুগ-ইমাম কিংবা ইমাম মাহদী, মসীহ শব্দগুলো খুব বেশি আওড়ায় কিন্তু মির্যা কাদিয়ানীর “শেষনবী” দাবীর বিষয়ে মুখ খুলেনা, কৌশলে এড়িয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হয়ে নিজেদের অজান্তেই ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়। এই ধরণের কুফুরী আকীদায় বিশ্বাসী তথাকথিত ‘আহমদীয়া মুসলিম জামা’ত’-এর অনুসারীরাই কাদিয়ানী নামে পরিচিত। বর্তমানে এ কাদিয়ানী-জামাত ১৪ দলে বিভক্ত (এখানে ক্লিক করে দেখুন, www.markajomar.org/?p=1558)।

বিচারপতি সুলতান হোসেন খান এবং বিচারপতি এ.এম মাহমুদুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ১৯৭২ আর্টিকেলের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে ও ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৯৯(ক) মতে ১৯৮৫ সালের ৮ই আগস্ট সর্বসম্মত রায়ে কাদিয়ানীদের ‘ইসলামে নবুওয়ত’ প্রকাশনাকে মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত ও বিদ্বেষপূর্ণ আখ্যা দিয়ে বাজেয়াপ্ত করে। তথ্যসূত্র (৪৫ ডি.এল.আর, ১৯৯৩)। পাকিস্তান সহ ২৫টি রাষ্ট্র তাদেরকে আইনী প্রক্রিয়ায় অমুসলিম রায় দেয়। এদের ‘কাদিয়ানী’ বলার কারণ এদের (ভণ্ড) নবী মির্যা গোলাম আহমদ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাসপুর জেলার ‘কাদিয়ান’ নামক গ্রামে ১৮৩৯ সালে জন্ম নিয়েছিল। তার অনুসারীরা সারা বিশ্বে সেই গ্রামের নামেই ‘কাদিয়ানী’ পরিচিতি লাভ করে। সে ছিল ১৪শ শতকের একজন মোঙ্গল সেনাধ্যক্ষ তৈমুর বরলাসের বংশধর, পিতা গোলাম মর্তুজা আর মাতা চেরাগ বিবি। তার জীবনে কোনোদিন হজ্জ করার সৌভাগ্য হয়নি (সীরাতে মাহদী বর্ণনা ৬৭২)। ১৯০৮ সালের ২৬ শে মে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে পাকিস্তানের লাহোরে টাট্টিতে মৃত্যুবরণ করে। গুগোলে Top 10 people who died in toilet লিখে সার্চ দিয়ে দেখুন।

২. তাদের আসল ধর্ম-পরিচয় কী?

কাদিয়ানীরা সাধারণ মানুষকে দলে টানতে অন্যের সমালোচনায় খুব বেশি ব্যস্ত থাকে। শুধু তারাই সভ্য আর বাদ-বাকি সবাই অসভ্য! এ হল তাদের প্রোপাগাণ্ডার সারকথা। কিন্তু এভাবে যতই মুখরোচক বুলি আওড়ায় না কেন, তারা বরাবরই তাদের আসল ধর্ম-পরিচয় গোপন রাখে। অথচ একজন সাধারণ ব্যক্তিও বুঝতে পারে, যাদের ধর্মবিশ্বাস ইসলামের মৌলিক শিক্ষা-বিরোধী তাদের বাহ্যিক আচরণ ও ব্যবস্থাপনা যতই সুন্দর হোক না কেন, তা কখনোই তাদের জন্য সত্যতার দলিল হয় না।

আমরা জানি, ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০১৮-’২০ প্রতিবেদন মতে ফিনল্যান্ডের নাগরিকগণ নাকি বিশ্বের এক নাম্বার সুখী ও সভ্য। আমার প্রশ্ন, তাই বলে কি দেশটির সভ্য অমুসলিমরাও আল্লাহর নিকট ‘মুসলিম’ বলে গণ্য হয়ে যাবে? অবশ্যই না। তাহলে একই কারণে কথিত সভ্য ও ভালো মানুষ দাবীদার কাদিয়ানীরা খতমে নবুওয়ত অস্বীকার করেও আল্লাহর নিকট মুসলমান গণ্য হতে পারে কিভাবে? অথচ আখেরাতে আল্লাহর নিকট ঈমান ব্যতীত মানুষের বাহ্যিকতার কোনো মূল্যই নেই। এবার কথিত সভ্যতার মুখোশধারী আহমদী (কাদিয়ানী) পরিচয়ধারীদের কলেমা সম্পর্কিত কুফুরী আকীদা জানুন,

মির্যাপুত্র মির্যা বশির আহমদ এম.এ লিখেছে, “কলেমার মধ্যে একটি পার্থক্য অবশ্যই রয়েছে, সেটি হচ্ছে মসীহ মওউদ (তথা মির্যা কাদিয়ানী) চলে আসায় ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ অর্থে একজন রাসূল বৃদ্ধি হয়ে গেছে।” (কালিমাতুল ফছল, ষষ্ঠ অধ্যায় পৃ-৬৮, পিডিএফ-৬৯ [উর্দু], সম্পূর্ণ বক্তব্যের সারাংশ)। এরপর মির্যা কাদিয়ানীর নবী, রাসূল দাবী এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সম্পর্কে কতেক অবমাননাকর বক্তব্য দেখুন,

১। আল্লাহতালা সম্পর্কে মির্যা কাদিয়ানী লিখেছে, আল্লাহ নাকি তার প্রতি ওহী করে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি রাসূলগণের সাথেই রয়েছি, আমি ভুলও করি এবং ঠিকও করি।’ নাউযুবিল্লাহ। (রূহানী খাযায়েন ২২/১০৬)।

২। মির্যা কাদিয়ানী লিখেছে, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দ্বিতীয় আবশ্যিক দায়িত্ব ছিল হিদায়াতের প্রচারকার্য সম্পূর্ণ করা। কিন্তু ঐ যুগে মিডিয়া না থাকায় তাঁর পক্ষে তা সম্পূর্ণকরা নাকি সম্ভব হয়নি। (ঐ ১৭/২৬৩)।

৩। কাদিয়ানীরা বিশ্বাস করে মির্যা কাদিয়ানী একজন ‘নবী, রাসূল ও শেষনবী’ ছিল। নাউযুবিল্লাহ! এটি উল্লেখ আছে তাদের রচিত, একটি ভুল সংশোধন পৃ-৩ হতে ১০ (অক্টোবর ২০০১), দাফেউল বালা পৃ-১২ (জুন ২০১৮), আল ওসীয়্যাত পৃ-২০ (জুন ২০১৪), হাকীকাতুল ওহী পৃ-৩৩০, তাযকেরাতুশ শাহাদাতাইন পৃ-৮২ (জুন ২০১৮), উম্মতিনবী পৃ-৯ (মার্চ ২০১১) ইত্যাদী বইগুলোতে। স্ক্যানকপি সহ অনলাইন থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন! www.markajomar.org/?p=1516

৪। মির্যা কাদিয়ানীর মতে, সে মুহাম্মদ (সা.)-এর এমন এক রূহানীসত্তা যা মুহাম্মদ (সা.) চেয়েও অধিক শক্তিশালী, স্বয়ংসম্পন্ন আর সুদৃঢ়। (খোৎবাতুল ইলহামিয়্যাহ, রূহানী খাযায়েন ১৬/২৭১-৭২)। অন্য জায়গায় লিখা আছে, বর্তমান সময়টি নাকি মুহাম্মদ (সা.)-এর নামের জ্যোতি বিকাশের সময় নয়। নাউযুবিল্লাহ! দেখুন, আরবা’ঈন পৃ-১১১ [বাংলা] (অক্টোবর ২০১৮)। এ হল তাদের ধর্মপরিচয়ের সংক্ষেপে চারখানা পয়েন্ট!

৩. ইসলামের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে তারা কী কী উপায়ে ধোকা দিয়ে থাকে?

দেশের বিভিন্ন এলাকা সফর করে স্থানীয় মানুষদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, কাদিয়ানীরা সাধারণ মানুষকে বুঝায়, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান আর তাদের মধ্যকার পার্থক্য নাকি শুধুই একজন ইমাম মাহদীকে বিশ্বাস করা নিয়ে। তাদের বক্তব্য, ইমাম মাহদী অলরেডি এসে গেছেন আর মির্যা গোলাম আহমদই হচ্ছে সেই ইমাম মাহদী। যাইহোক, তারা স্থানীয় দরিদ্র মানুষদের আর্থিক সহযোগিতা আর ফ্রি চিকিৎসা সেবার আড়ালেও কাদিয়ানী বানায়। প্রতি বৃহঃস্পতি এবং শুক্রবারে গরু যবেহ করে খাবার-দাবারের আয়োজন, বাড়ী বাড়ী গিয়ে দাওয়াত, মুসলিম শিশুদের তাদের মিশনারী স্কুলে ভর্তি ও কাদিয়ানী সিলেবাসের সমন্বয়ে পাঠদানের মাধ্যমেও কাদিয়ানী বানায়। যারা কাদিয়ানী হয় কিছুদিন পরপরই তাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির সর্বনির্ম্ন দশভাগের একভাগ মূল্যের বিনিময়ে বেহেশ্ত-টিকেট কিনতে আর আয়ের ষোল পার্সেন্ট হারে আমৃত্যু চাঁদা দিতে সুকৌশলে বাধ্য করে। আর যদি কখনো কোনো সদস্য ছুটে যায় তখন তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করে, দলে ফিরে আসতে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে। আলেম উলামার বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো চলে সমানতালে; ধর্মব্যবসায়ী, জঙ্গী আরও কত কি! নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনকেও ছাড় দেয়না, ভুলভাল বুঝিয়ে তাঁদেরকেও অপব্যবহার করে থাকে। কেননা ইমাম মাহদী সংক্রান্ত সহীহ হাদীসগুলোয় পরিষ্কার উল্লেখ আছে, ইমাম মাহদীর নাম হবে মুহাম্মদ, পিতা আব্দুল্লাহ, জন্মগ্রহণ করবেন নবী-বংশে হযরত ফাতেমা (রা.)-এর ঔরসে (আরবে), মদীনা থেকে মক্কায় হিজরত করবেন, বয়’আত নেবেন মক্কায়; হাজরে আসওয়াদের পাশে, তিনি আরবের শাসক নিযুক্ত হবেন (আবুদাউদ কিতাবুল মাহদী, মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, ইবনে মাজাহ)। অথচ এর কোনোটাই মির্যা কাদিয়ানীর মধ্যে পাওয়া যায়না। সহীহ বুখারীতে এসেছে, ঈসা (আ.) দ্বিতীয় আকাশে অবস্থান করছেন (হাদীস নং ৩৮৮৭, মানাকিবুল আনসার দ্রষ্টব্য)। তিনি (আ.) শাম-দেশে (দামেস্ক) নাযিল হবেন। (তারীখে দামেস্ক ১/১৭০ ইবনু আসাকীর, রূহানী খাযায়েন ৩/১৭২)। বলে রাখা দরকার, ইমাম মাহদী সংক্রান্ত সহীহ হাদীসসমূহে যা যা পরিচিতি রয়েছে তার কোনো একটিও মির্যা কাদিয়ানীর সাথে মিলেনা। তা সত্ত্বেও সে কিভাবে ইমাম মাহদী হল তা আমাদের বোধগম্য নয়।…..লিখক।

এবার ইমাম মাহদীসংক্রান্ত হাদীসসমূহ সম্পর্কে মির্যা কাদিয়ানীর মন্তব্য পড়ুন, (সে লিখেছে) ‘মাহদীর আগমন সংক্রান্ত হাদীসসমূহ বিতর্কিত।’ (হাকীকাতুল মাহদী-২৭, প্রকাশ অক্টোবর ২০০১)। আরেক জায়গায় লিখেছে, ‘এ ধরণের হাদীসসমূহ কোনো মতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ (হাকীকাতুল মাহদী পৃ-৭)। আরেক জায়গায় লিখেছে ‘মাহদীর হাদীসসমূহের এই অবস্থা যে, ইহাদের কোনোটিই ক্রটিমুক্ত নহে। কোনোটিকেই সহীহ হাদীস বলা যায় না।’ (হাকীকাতুল ওহী পৃ-১৭৩ [বাংলা], নভেম্বর ১৯৯৯ইং)। সুতরাং পরিষ্কার প্রমাণিত হয়ে গেল যে, মির্যা কাদিয়ানী নিজেই নিজের মাহদী দাবীতে একজন মিথ্যাবাদী ও প্রতারক। যেহেতু সে একদিকে মাহদী দাবী করেছে, আরেকদিকে বলছে হাদীসগুলো বিশ্বাসযোগ্য নয়! খুবই চিন্তার বিষয়!

৪. তাদের মুকাবিলায় স্থানীয় সাধারণ মুসলমান ও সচেতন নাগরিকদের করণীয় কী?

কাদিয়ানীরা দেশের যেখানেই আস্তানা গড়ে সেখানেই তারা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা আর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিভ্রান্ত করে পক্ষে নিয়ে থাকে। কখনো মুসলমানদের নতুন আরেক ফেরকা নামে, কখনো পীর-মুরিদী তরিকা নামেও মুসলমানদের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারা সাধারণ মানুষের সমর্থন পেতে গালভরা হুংকার ছেড়ে বলে, এমন কোনো বাপের বেটা নেই যে আমাদের সাথে বিতর্কে এক মিনিটও টিকতে পারবে! মূলত, ইসলামের আকায়েদ নিয়ে কিংবা তাদের বইপুস্তকগুলোও যাদের পড়া আছে তারা এ সমস্ত হুংকারে মোটেও চিন্তিত হন না। কারণ তাদের বইপুস্তকগুলোই তাদের জন্য মহা মসিবত। এবার দেখা যাক তাদের বইপুস্তকে কী লিখা আছে,

মির্যা কাদিয়ানীর পরিষ্কার বক্তব্য, ‘যারা তার আহবানে সাড়া দেবেনা তারা মুসলমান নয়।’ (তাযকিরাহ-৫১৯, ৪র্থ এডিশন)। আর তার পুত্র মির্যা বশির উদ্দীন লিখেছে ‘যারা মির্যা কাদিয়ানীর নামও শুনেনি এমন ব্যক্তিও কাফের।’ (মির্যাপুত্রের রচনা আনওয়ারুল উলূম-৬/১১০ অনলাইন এডিশন)। একই পুস্তকের ৩নং খণ্ডের ১৪৮ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে, ‘আমাদের জন্য ফরজ হল, আমরা গয়ের আহমদীদের (অর্থাৎ অ-কাদিয়ানীদের) যেন মুসলমান মনে না করি, তাদের পেছনে নামায না পড়ি; কেননা তারা খোদাতালার একজন নবীকে অস্বীকারকারী।’ নাউযুবিল্লাহ।

একই ব্যক্তির রচনা ‘বারাকাতে খিলাফত’-এর ৮৮ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে ‘কোনো আহমদী যেন গয়ের আহমদীর নিকট কন্যা দান না করে, এটি হযরত মসীহে মওউদের (অর্থাৎ মির্যা কাদিয়ানীর) কড়া নির্দেশ।’ বলে রাখা দরকার, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আর প্রশাসনিক দায়িত্বশীলবৃন্দ আগে যদিও বা পরিচয় গোপনকারী এ গোষ্ঠী সম্পর্কে ধারণা না থাকায় এদের মুসলিম ভেবেছিলেন! সে হিসেবে উদারমনে সহযোগিতাও করেছিলেন। অথচ এদের বই-পুস্তকের বিবরণ মতে শুধুমাত্র এরা ছাড়া আপনারা-আমরা কেউই কিন্তু মুসলমান নই! অতএব আপনাদের দ্বারা আর যেন ভুল না হয় সে প্রত্যাশাই করছি। নইলে প্রিয়নবী মুহাম্মদে আরাবী (সা.)-এর নবুওয়ত আর রেসালতের সিংহাসন জবরদখলকারী কাদিয়ানী জামাতকে সহযোগিতা করার গুনাহের দরুন আখেরাতে খুবই লজ্জিত হতে হবে, যে লজ্জার কোনো সীমা থাকবেনা। এবার স্থানীয় সাধারণ মুসলমানদের ঈমান-হেফাজতের উদ্দেশ্যে একজন মুসলমান হিসেবে সবার কয়েকটি করণীয় উল্লেখ করছি,

সবার করণীয় :
১. আক্রান্ত এলাকায় মক্তব-মাদরাসা না থাকলে তাহলে দ্রুততার সাথে তা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানীয়দের জন্য ইসলামী তা’লীমের ব্যবস্থা করা ও একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দাঈ নিযুক্ত করা।
২. ইতিমধ্যে যারা বিভ্রান্ত হয়ে কাদিয়ানী হয়েছে তাদেরকে উত্তমভাবে দাওয়াত দেয়া এবং ইসলামে ফিরে আনতে চেষ্টা করা।
৩. নিকটতম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)-কে বিষয়টি যুক্তিপ্রমাণসহ বুঝিয়ে দেয়া, প্রয়োজনে প্রশাসনিক সহযোগিতাও নেয়া।
৪. প্রসিদ্ধ ইসলামী গবেষণা সেন্টার ‘মারকাযুদ দাওয়া আলইসলামিয়া’ (হযরতপুর, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা)-এর সাথে যোগাযোগ রাখা।

দীর্ঘ আলোচনার ইতিটানার আগে দুইটি প্রশ্নোত্তর :

১। প্রশ্ন : ‘শেষনবী’ অর্থ কী? ঈসা (আ.) কোথায় ও কী হিসেবে নাযিল হয়ে আসবেন?

উত্তর : ‘শেষনবী’-এর সংজ্ঞায় বরেণ্য ইমাম যামাখশারী (মৃত. ৫৩৮ হিজরী) বলেছেন, فإن قلت: كيف كان آخر الأنبياء وعيسى ينزل في آخر الزمان؟ قلت: معنى كونه آخر الأنبياء أنه لا ينبأ أحد بعده، وعيسى ممن نبئ قبله، وحين ينزل ينزل عاملا على شريعة محمد، مصليا إلى قبلته، كأنه بعض أمّته অর্থাৎ….আমি উত্তরে বলি, ‘শেষনবী বলে যাঁর পরে আর কাউকে নবী বানানো হবেনা আর ঈসা (আ.)-কে তো আগেই নবী বানানো হয়েছে। আর তিনি যখন নাযিল হবেন তখন তিনি মুহাম্মদ (সা.)-এর শরীয়তের অধীনে ও তাঁরই ক্বেবলামুখী হয়ে তাঁরই একজন উম্মত হিসেবে সালাত আদায়কারী হবেন।’ (তাফসীরে কাশশাফ-[تفسير كشاف] খণ্ড নং-২২, সূরা আহযাব-৪০)। সহীহ মুসলিম কিতাবুল ফিতান অধ্যায়ের হাদীস নং ৭০৭৮ অনুসারে “শেষযুগে হযরত ঈসা (আ.) দু’জন ফেরেশতার মাধ্যমে দামেস্কে নাযিল হবেন“, কিন্তু তিনি মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত হিসেবেই নাযিল হবেন; তাঁর আগমনে নবুওয়তের দরজায় কোনো প্রকারেরই ধাক্কা লাগবেনা। কেননা তিনি নতুন করে নবুওয়তপ্রাপ্তির দাবী করবেন না এমনকি নবুওয়তের দায়িত্বেও থাকবেন না। যে কারণে ‘ঈসা (আ.) আবার আসলে মুহাম্মদ (সা.) কিভাবে শেষনবী থাকেন’—কাদিয়ানীদের এ ধরণের উল্টাপাল্টা প্রশ্নের কোনো মূল্যই নেই।

২। প্রশ্ন : ঈসা (আ.)-কে ‘আকাশে সশরীরে উঠিয়ে নেয়া’ এবং দ্বিতীয়বার ‘আকাশ থেকে’ নাযিল হওয়া সম্পর্কিত সহীহ হাদীসগুলোর কয়েকটির রেফারেন্স দিন!

উত্তর : দেখুন-আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে সা’আদ (মৃত. ২৩০ হিজরী)-এর ১১ খণ্ডে সংকলিত প্রাচীনতম হাদীসগ্রন্থ ‘আত-তবকাতুল কোবরা’ খ-১ পৃ-৩৫-৩৬ (رَفَعَهُ بِبَدَنِهِ); শায়খ আহমদ আব্দুর রহমান আলবান্না (১৮৮২-১৯৫৮)-এর ২৪ খণ্ডে সংকলিত ‘আল ফাতহুর রব্বানী লি তারতীবে মুসনাদে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল আশ-শায়বানী’ খ-২০ পৃ-১৪১ দ্রষ্টব্য (لَمَّا اَرَادَ اللهُ اَنْ يَّرْفَعَ عِيْسَي اِلَى السَّمَاءِ); ইমাম আবুবকর আহমদ আল-বাজ্জারের ১৮ খণ্ডে সংকলিত ‘মুসনাদে বাজ্জার’ হাদীস নং ৯৬৪২ (يَنْزِلُ عِيْسَى بْنُ مَرْيَمَ مِنَ السَّمَاءِ); ইমাম নূরুদ্দীন আল-হাইসামীর ১২ খণ্ডে সংকলিত ‘মাজমাউয যাওয়ায়েদ’ খ-৭ পৃ-৩৪৯ (يَنْزِلُ عِيْسَى بْنُ مَرْيَمَ مِنَ السَّمَاءِ); ইমাম বায়হাক্বীর ২ খণ্ডে সংকলিত ‘আল আসমা ওয়াস সিফাত’ খ-১ পৃ-৩৩১, হাদীস নং ৮৯৫ (مِنَ السَّمَاءِ); সহীহ মুসলিম হাদীস নং ২৮৯৬ ঈসা ইবনে মরিয়ম এসে হজ্জ করবেন (وَالَّذِىْ نَفْسِىْ بِيَدِهِ لَيُهِلَّنَّ اِبْنُ مَرْيَمَ بِفَجِّ الرَّوْحَاءِ حَاجًّا اَوْ مُعْتَمِرًا اَوْ لَيَثْنِيَنَّهُمَا); ইমাম আলী আল মুত্তাকি আলহিন্দী-এর ১৮ খণ্ডে সংকলিত ‘কাঞ্জুল উম্মাল’ খ-১৪ পৃ-৬১৯ (مِنَ السَّمَاءِ); সহীহ মুসলিমের সূত্রে মির্যায়ী রচনাসমগ্র ‘রূহানী খাযায়েন’ খ-৩ পৃ-১৪২ (صحیح مسلم کی حدیث میں جو یہ لفظ موجود ہے کہ حضرت مسیح جب آسمان سے اتریں گے)؛ মালফুযাত খ-৫ পৃ-৩৩ (آپ نے فرمایا تھا کہ مسیح آسمان پر سے جب اترےگا)। সংক্ষেপে। বিস্তারিত অনলাইন থেকে পড়তে এখানে ক্লিক করুন। www.markajomar.org/?p=2102

পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ’র আলোকে আকীদায়ে খতমে নবুওয়ত :

১। আল্লাহতালা বলেন (আরবী) مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا অর্থ, “মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন, তবে আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী। আর আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (সূরা আহযাব, আয়াত নং ৪০)। প্রকাশ থাকে যে, মির্যা কাদিয়ানীর ২৩ খণ্ডে প্রকাশিত রচনাসমগ্র ‘রূহানী খাযায়েন’-এর ৩য় খণ্ডের ৪৩১ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে, ‘খাতামান নাবিয়্যীন’ অর্থ নবীগণের সমাপ্তকারী। যদিও সে পরবর্তীতে নবী দাবী করে তার উক্ত বয়ান পাল্টে ফেলে এবং উদ্দেশ্যমূলক মনগড়া ব্যাখ্যার পেছনে দৌঁড়ায়।

২। শেষনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আকীদায়ে খতমে নবুওয়তের সঠিক শিক্ষা প্রদান করে আমাদের জন্য কত চমৎকার উপমা পেশ করে গেছেন দেখুন! তিনি (সা.) ইরশাদ করেন (আরবী), أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِنَّ مَثَلِيْ وَمَثَلَ الأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِيْ كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بَيْتًا فَأَحْسَنَهُ وَأَجْمَلَهُ إِلَّا مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ زَاوِيَةٍ فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُوْنَ بِهِ وَيَعْجَبُوْنَ لَهُ وَيَقُوْلُوْنَ هَلَّا وُضِعَتْ هَذِهِ اللَّبِنَةُ قَالَ فَأَنَا اللَّبِنَةُ وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ

(অর্থ) “আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণের অবস্থা এমন যে, এক ব্যক্তি যেন একটি গৃহ নির্মাণ করল। তাকে সুশোভিত ও সুসজ্জিত করল। কিন্তু এক পাশে একটি ইটের জায়গা খালি রয়ে গেল। অতঃপর লোকজন এর চারপাশে ঘুরে আশ্চর্য হয়ে বলতে লাগল ঐ শূন্যস্থানের ইটটি লাগানো হল না কেন! নবী (সা.) বলেন, আমিই সে ইট। আর আমিই সর্বশেষ নবী।” (বুখারী, হাদীস নং ৩৫৩৫)। জ্ঞানীদের বুঝার জন্য এই হাদীসটুকুই যথেষ্ট। (কোনো তথ্য মিথ্যা প্রমাণ করতে পারলে উপযুক্ত পুরষ্কার দেয়া হবে)।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
শিক্ষাবিদ ও গবেষক

ইলিয়াসি তাবলীগ

ইলিয়াসি তাবলীগ

(১) আহ! মানুষ কতটা দলান্ধ আর ব্যক্তি-অন্ধ হলে দ্বীনের এই আশীমুশশান খেদমতকে ইলিয়াসি তাবলীগ বলে কটাক্ষ করতে পারে! আল্লাহ এ সব ভাইদের হিদায়াত দিন। আমার ভাইদের মধ্যে কেউ কেউ চটকদার বাচনভঙ্গিতে আরও বলে থাকেন—তাবলীগ মানি কিন্তু ইলিয়াসি তাবলীগ মানিনা। আমি সেসব ভাইদের ঐ একই বাচনভঙ্গিতে যদি পালটা প্রশ্ন করি, মনে করুন কেউ বলল, আমরা আল্লাহর ইসলাম মানি, মোল্লার ইসলাম মানিনা! আমরা নবীর হাদীস মানি, বুখারী মুসলিমের হাদীস মানিনা! আমরা নবীর সালাত মানি, শায়খদের লেখিত কিতাবের সালাত মানিনা। এইবার আহেন, জবাব দেন! জবাব দিতে না পারলে হুদামিছা এই সমস্ত ভাঙ্গা টেপ রেকর্ড বাজানো বন্ধ রাখুন! মওলানা ইলিয়াস সাহেব তো তাবলীগের খেদমতকে সহজসাধ্য করতে গবেষণাধর্মী একটা তারতীব (ডিসিপ্লিন) দিলেন মাত্র, যেমনিভাবে আজানের আওয়াজকে আরও বেশি উচ্চতায় পৌঁছাতে আমরা মাইকের প্রচলন করি।

(২) ইজতিমাহ-কে বিদয়াত বলা হঠাৎ থেমে গেল কেন? আমি এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েও রীতিমতো টাস্কি খাইলাম….। তাবলীগ জামাতের “বিশ্ব ইজতিমাহ“-কে (বিশ্ব সম্মেলন) বিদয়াত বলতেন যারা তাদেরকেও আমরা একটি সময়ের ব্যবধানে “ইজতিমাহ” করতে দেখেছি। যদিও তা বেরেলী-রেজভী মাসলাকের ভাইদের ক্ষেত্রে “সুন্নী ইজতিমাহ” নামে (রাজধানীর এয়ারপোর্টে সিভিল এভিয়েশনের প্রায় একশ’ একর খোলা ময়দানে- ০৬ মার্চ ২০১৯ ইং) আর আহলে হাদীস মাসলাকের ভাইদের ক্ষেত্রে “তাবলীগী ইজতিমাহ” নামে ছিল (রাজধানীর সুরিটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ২৭-২৮ জানুয়ারী ২০২২ ইং)! আমাদের আহলে হাদীস ভাইয়েরা খুব চালাক, উনারা ইদানীং “ইজতিমাহ” (আরবী) শব্দ হঠাৎ বাদ দিয়ে সেটির প্রতিশব্দ কনফারেন্স বা Conference (ইংলিশ) শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করেছেন! হায়রে আমাগো মুমিন মুসলমান ভাই-বেরাদার! কেউ নাচায় আর কেউ নাচি..! যত দোষ নন্দ ঘোষ।

কনফারেন্স

অপ্রিয় হলেও সত্য, এগুলো প্রতিহিংসা ছাড়া আর কিছুনা। এইসব কারণে আজ সারা দেশে মুসলমান নিজেরা নিজেদের সাথে মারামারি, দাঙ্গাহাঙ্গামা আর তর্কবিতর্কে লিপ্ত, আর ঐ দিকে কাদিয়ানী খ্রিস্টান মিশনারীরা ময়দান ফাঁকা পেয়ে সহজ সরল মানুষগুলোর ঈমানের বারোটা বাজাচ্ছে! আসুন! দ্বীনের জন্য, উম্মাহার কল্যাণের জন্য সহযোগী হই, অন্তত বিরোধিতা না করি। সব পক্ষকে কথাগুলো মনে রাখতে হবে।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

বিনিময় নিয়ে ধর্মকর্ম

বিনিয়ম নিয়ে ধর্ম-কর্ম

না না, ট্রেডিশনাল কোনো কথা লিখতে বসিনি। একটু সমালোচনার ঢঙ্গে আবার একটু বিজ্ঞান আর যুক্তি যুক্ত সহকারে লিখব, যেখানে কুরআন সুন্নাহ থেকেও রসদ থাকবে, ইনশাআল্লাহ। যারা ইতিপূর্বে সজল রোশনদের খপ্পরে পড়ে খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন লিখাটি তাদের জন্য। অনেক লম্বা লিখা পাঠকদের ধৈর্য্য কুলায়না। তাই যথাসাধ্য সংক্ষেপ করে লিখব, তবু দীর্ঘ হয়ে গেলে আমি দায়ী নই। কারণ পাঠকদের তাগিদেই কিন্তু লিখতে বসেছি!

কথায় আছে, যত দোষ হুজুরের! হুজুর এত খায় কেন? হুজুর এত সাজগোছ করে কেন? হুজুরের বৌ অত সুন্দরী কেন? হুজুরের ঘর পাকা কেন? হুজুরের জামাটা এত দামী কেন? হুজুর এত দৌড়াচ্ছে কেন? হুজুর মানুষ, এত টাকা দিয়ে করবেটা কী? হুজুর ইংলিশ বলে কেন? হুজুর এত হাদিয়া নেয় কেন? হুজুর হেলিকপ্টার চড়ে কেন?….এই কেন কেন….তালিকাটা যে কবে শেষ পর্যন্ত পৌছবে আমার জানা নেই! সত্য বলতে এগুলো এক ধরনের প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ। যাদের মন অতিব সংকীর্ণ এগুলো তাদের কথা। কসম করে কেউ বলতে পারবেনা, উপরের কোনো একটি “কেন?” এর ভেতর হুজুরের দোষ ধরার কোনো সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষে অপর একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার মত আইনী কোনো ধারা আছে কিনা, সেটাও প্রশ্ন রাখবে। চলি মূল কথায়,

সজল রোশনদের খপ্পরে পড়েছেন অনেক যুবক। তারা হয়ত ভেবেছেন, সজল রোশন আমেরিকা বসে বসে যেগুলো ইউটিউবে আপলোড দিচ্ছেন তা তার নিজের আবিষ্কার। আসলে সজল রোশন সহ আরও যতজনের নাম বলিনা কেন প্রায় প্রত্যেকে ইসলামী ইতিহাস এবং কুরআনের তাফসির আর উসূলে হাদীস বিষয়ে পুরোদস্তুর অজ্ঞ ও নেহাত মূর্খ তো বটে, সে সাথে চরম মিথ্যাবাদীও। আমি তার অনেকগুলো ক্লিপ দেখেছি। তার আলোচনার সাথে আমি আমার সুদীর্ঘ ১৬ বছরের একাডেমিক শিক্ষা-দীক্ষার কোনো রকম মিল খোঁজে পাই না। তারা হাদীসকে পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহের মুখোমুখি দাঁড় করে যে কায়দায় হাদীসের উপর আঙুল উঠায়, সেই একই কায়দায় কুরআনের আয়াতকেও অপরাপর আয়াতের মুখোমুখি দাঁড় করে নাস্তিক আর খ্রিস্টান মিশনারীরাও কুরআনকে বাতিল করার জোর চেষ্টা চালায়। কাজেই সজল রোশনদের উদ্দেশ্যমূলক এ সমস্ত ভুজুংভাজুং যুক্তি থেকে যারা সবক নিচ্ছেন তাদের উচিত, ইসলামের মূলধারার শিক্ষা-দীক্ষায় ফিরে এসে ইসলামকে আহলে সুন্নাহর স্কলারদের নির্দেশিত পন্থায় বুঝতে পড়াশোনা শুরু করা। বিশেষ করে কুরআনের প্রসিদ্ধ তাফসীর আর উসূলে হাদীস নিয়ে। তবেই সজল রোশনদের যাদুবিদ্যার মুখোশ উন্মোচন করতে দেরি হবেনা।

পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটির কেমন বিকৃত উপস্থাপন দ্বারা দরাকে সরা বানিয়ে সজল রোশনরা সাধারণদের বিভ্রান্ত করতে চাইছে, দেখুন। প্রথমে আয়াতের আরবী অংশ সহ সঠিক অনুবাদ, আল্লাহতালা বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّ کَثِیۡرًا مِّنَ الۡاَحۡبَارِ وَ الرُّہۡبَانِ لَیَاۡکُلُوۡنَ اَمۡوَالَ النَّاسِ بِالۡبَاطِلِ وَ یَصُدُّوۡنَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ؕ وَ الَّذِیۡنَ یَکۡنِزُوۡنَ الذَّہَبَ وَ الۡفِضَّۃَ وَ لَا یُنۡفِقُوۡنَہَا فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ ۙ فَبَشِّرۡہُمۡ بِعَذَابٍ اَلِیۡمٍ অর্থ, হে মুমিনগণ! নিশ্চয় অনেক পন্ডিত-পুরোহিত মানুষের ধন-সম্পদ অন্যায় উপায়ে ভক্ষণ করে এবং আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে থাকে। [১] আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তুমি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দাও (কুরআন/৯:৩৪)। [২]

সংক্ষিপ্ত তাফসীর,

[১] أحبَار শব্দটি حِبْر এর বহুবচন। এটা এমন ব্যক্তিকে বলা হয়, যে কথাকে খুব সুন্দর করে পেশ করার দক্ষতা রাখে। আর সুন্দর ও নকশাদার পোশাককেও ثَوبٌ مُحَبِّر বলা হয়ে থাকে। এখানে উদ্দেশ্য ইয়াহুদী উলামা। رُهبَان শব্দটি رَاهِب এর বহুবচন যার উৎপত্তি رهبنة শব্দ থেকে। এ থেকে উদ্দেশ্য নাসারা উলামা। কারো কারো নিকটে এ থেকে উদ্দেশ্য হল, নাসারাদের সুফীগণ। উলামার জন্য তাদের নিকট বিশেষ শব্দ قسّيسين রয়েছে। এই উভয় শ্রেণীর ধর্মধ্বজীরা এক তো আল্লাহর কালামকে বিকৃত ও পরিবর্তিত করে লোকদেরকে তাদের ইচ্ছা মোতাবেক ফতোয়া ও বিধান দিত এবং এইভাবে তাদেরকে আল্লাহর পথ হতে বাধা প্রদান করত। আর দ্বিতীয়তঃ এই পন্থায় তারা তাদের নিকট হতে অর্থ উপার্জন করত; যা তাদের জন্য হারাম ও বাতিল ছিল।

[২] আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) বলেন যে, এটা যাকাত ফরয হওয়ার পূর্বের আদেশ। যাকাতের হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার পর যাকাত দ্বারা আল্লাহ তাআলা মাল-ধনকে পবিত্র করার মাধ্যম বানিয়েছেন। এই জন্য উলামাগণ বলেন, যে মাল থেকে যাকাত বের করা হবে সে মাল (আয়াতে নিন্দনীয়) ‘জমা করে রাখা’ মাল নয়। আর যে মাল থেকে যাকাত বের করা হবে না, সে মালই হবে ‘জমা করে রাখা’ ধনভান্ডার; যার জন্য রয়েছে এই কুরআনী ধমক।

  • প্রশ্ন হল, আয়াতের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে হাদীস অস্বীকারকারী মিশনারী সদস্য সজল রোশনরা যেগুলো বললেন অর্থাৎ ইমামতি, মুয়াজ্জিনি, মক্তব-মাদরাসায় পড়িয়ে, ওয়াজ করে বিনিময় গ্রহণ হারাম বা কুরআনী শিক্ষার পরিপন্থী ইত্যাদি; এসবের সাথে পবিত্র কুরআনের উক্ত আয়াতের الۡاَحۡبَارِ وَ الرُّہۡبَانِ শব্দদ্বয়ের সম্পর্ক কোথায়? (পোস্টের লিংক) এটা তো এক জায়গার পানি আরেক জায়গায় ঢালা হল! কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে কি সজল রোশনদের এ সমস্ত তেলেসমাতি ধরতে পারা সম্ভব!?
হাদীস অস্বীকারকারী সজল রোশনদের জনৈক অনুসারীর পোস্ট থেকে নেয়া

পাঠকবৃন্দ! কুরআনের উপর একাডেমিক শিক্ষা যার নেই তার পক্ষেই সম্ভব এরকম কিছু আয়াত কালেক্ট করে নিজের মতকে আয়াতের উপর চাপিয়ে দেয়া। কোনো ঘটনার যেমন প্রেক্ষাপট থাকে তেমনি আয়াতগুলোর সাথেও নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট আর শর্ত যুক্ত রয়েছে। যেজন্য সজল রোশনদের দৃষ্টিতে আয়াতগুলো মুক্ত অর্থে ধর্ম-কর্ম-এর বিনিময় গ্রহণকে নিন্দা করার নির্দেশ দিলেও বিশেষজ্ঞ মুফাসসিরগণের দৃষ্টিতে এগুলো ভিন্ন রকম তাৎপর্য ও ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর মাযহাবের মুফতাবিহি কওল সহ প্রায় সকল মুজতাহিদ ইমামের মতে, ইসলামি খিলাফত যখন কায়েম থাকবেনা তখন স্থানীয় মুসল্লিদের উপরই দায়িত্ব বর্তাবে সালাতের ইমামতের জন্য বেতনভুক্ত একজন নিয়মিত ইমাম নিয়োগ দেয়া। নইলে ফরজ সালাতের জামাতের শৃঙ্খলা অটুট থাকবেনা। দেখুন, হাশিয়ায়ে রদ্দুল মুহতার, ইবনে আবেদীন আশ-শামী (আরবী) ৬/৩৩৯,


আরবী- قال في الهداية: وبعض مشايخنا رحمهم الله تعالى استحسنوا الاستئجار على تعليم القرآن اليوم لظهور التواني في الأمور الدينية، ففي الامتناع تضييع حفظ القرآن، وعليه الفتوى اه‍. وقد اقتصر على استثناء تعليم القرآن أيضا في متن الكنز و مواهب الرحمن وكثير من الكتب، وزاد في مختصر الوقاية ومتن الاصلاح تعليم الفقه، وزاد في متن المجمع الإمامة، ومثله في متن الملتقى ودرر البحار، وزاد بعضهم: الأذان والإقامة والوعظ، وذكر المصنف

সারকথা হল, ইসলামী শরীয়াহ’র বিশেষজ্ঞগণ কতেক ধর্মকর্মে বিনিময় বা اجرة নেয়া বৈধ বলেছেন কেবল ঐ সব ক্যাটাগরির ক্ষেত্রে, যা ضروريات دين তথা দ্বীনের আবশ্যকীয় বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত। যেমন, দ্বীন শিখানো (মক্তব-মাদরাসা), ইমামতি, মুয়াজ্জিনি, ওয়াজ-মাহফীল। এছাড়া আর কোনো ধরণের ধর্মকর্মে বিনিময়ে বা اجرة গ্রহণ বৈধ নয়। এ হচ্ছে, সঠিক ও মীমাসিংত মাসয়ালা।

এখন প্রশ্ন হল, সজল রোশনরা আরো যেসব আয়াত দ্বারা মুক্তভাবে ভুজুংভাজুং ব্যাখ্যা দিয়ে হারাম হারাম কইয়া মুখে ফেনা তুলছে, সে সমস্ত আয়াত কি ঐ ইসলামী শরীয়াহ’র বিশেষজ্ঞ ইমামদের সময় পবিত্র কুরআনে ছিলনা? নাকি ইমামগণ আয়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন বলবেন? আমি সজল রোশনদের অনুরোধ করছি, আপনারা আমেরিকায় বিলাসবহুল জীবনযাপন রেখে মসজিদগুলোর ইমামতি গ্রহণে সূরা-ক্বেরাত শুদ্ধ করে ও প্রয়োজনীয় মাসয়ালা-মাসায়েল শিক্ষালাভ করে এগিয়ে আসুন অথবা আপনাদের ফলোয়ারদের এগিয়ে আসতে বলুন। তবেই এ নিয়ে আর কোনো বিতর্ক থাকবেনা, হুজুররাও আর নিজের খেয়েদেয়ে অন্যের বকুনি শুনতে হবেনা। আপনাদের জন্য শুধু শুধু ধর্মব্যবসায়ী বলে হুজুরদের মানহানি করা ও পেছনে লেগে মজা করারও প্রয়োজন পড়বেনা।

শেষ কথা হল, একাডেমিক শিক্ষা না থাকলে অবস্থা এমনি হয়। আল্লাহ এদের ধোকা থেকে আমাদের রক্ষা করুন।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক
প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী এম.এ

- Advertisement -

Recent Posts