Home Blog Page 2

তারাবীহ কত রাকাত পড়া সুন্নাহ?

তারাবীহ কত রাকাত পড়া সুন্নাহ? ইখতিলাফ, সনদ ও ইমামগণের মাযহাব পর্যালোচনা :

প্রশ্ন : তারাবীহ এর সালাতের হুকুম কী? বিশেষতঃ ইমামে আ’যম হযরত আবূ হানীফা (রহ.) এর মাযহাব মতে তারাবীহ কত রাকাত? রাকাত সংখ্যা নিয়ে এখতিলাফ, সনদ এবং সনদের তাহকীক (বিশ্লেষণ) সহ জানাবেন!

উত্তর : তারাবীহ (تراويح) এর সালাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ তথা অনিবার্য সুন্নাহ। শায়খ ইবনু তাইমিয়াহ (রহ.) থেকেও এমনটাই ফাতাওয়া রয়েছে। তিনি লিখেছেন,

أَنَّ ذَلِكَ هُوَ السُّنَّةُ؛ لِأَنَّهُ أَقَامَهُ بَيْن الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَلَمْ يُنْكِرْهُ مُنْكِرٌ

অর্থাৎ “অবশ্যই সুন্নাহ এটাই। কারণ তিনি (উমর) আনসার এবং মুহাজিরদের মাঝে এটি (তথা ২০ রাকাতের এ পদ্ধতি) প্রচলন করেন, তখন কেউই এটি অস্বীকার করেননি। (মাজমূ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়াহ ২৩:১১২)। কাজেই এ তারাবীহ’র সালাত গ্রহণযোগ্য কোনো ওজর ছাড়া ত্যাগ করা গুনাহ। রাসূল (সা.) থেকেও তারাবীহ’র প্রমাণ রয়েছে। যদিও সে সময় রাকাত সংখ্যা চূড়ান্ত ছিলনা, তিনি কখনো ১০ কখনো ১২ কখনো বা ২০ রাকাত পড়েছিলেন (তবে ইবনু আব্বাস থেকে ২০ রাকাতের মারফু বর্ণনায় একজন রাবী দুর্বল-লিখক)। যেজন্য খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর (রা.) সমস্ত সাহাবীর উপস্থিতিতে ‘তারাবীহ’কে জামাতে রূপায়ণ করেন এবং ২০ রাকাতের পদ্ধতিতে প্রথম প্রচলন করেন। যা তখন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। যার ব্যত্যয় ঘটানো প্রকারান্তরে সাহাবায়ে কেরামের ঐক্যবদ্ধ সীদ্ধান্তের বিরোধিতা করারই নামান্তর।

নিচে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ ইমাম জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (রহ.) এর “আল হাভী লিল ফাতাওয়া” কিতাব থেকে তারাবীহ সংক্রান্ত একটি আলোচনা তুলে ধরছি-

وَفِي سُنَنِ الْبَيْهَقِيِّ وَغَيْرِهِ بِإِسْنَادٍ صَحِيحٍ عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ الصَّحَابِيِّ قَالَ: كَانُوا يَقُومُونَ عَلَىٰ عَهْدِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً، وَلَوْ كَانَ ذٰلِكَ عَلَىٰ عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَذَكَرَهُ؛ فَإِنَّهُ أَوْلَىٰ بِالْإِسْنَادِ وَأَقْوَىٰ فِي الِاحْتِجَاجِ. الرَّابِعُ: أَنَّ الْعُلَمَاءَ اخْتَلَفُوا فِي عَدَدِهَا، وَلَوْ ثَبَتَ ذٰلِكَ مِنْ فِعْلِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يُخْتَلَفْ فِيهِ كَعَدَدِ الْوِتْرِ وَالرَّوَاتِبِ. فَرُوِيَ عَنِ الْأَسْوَدِ بْنِ يَزِيدَ أَنَّهُ كَانَ يُصَلِّيهَا أَرْبَعِينَ رَكْعَةً غَيْرَ الْوِتْرِ، وَعَنْ مَالِكٍ: التَّرَاوِيحُ سِتٌّ وَثَلَاثُونَ رَكْعَةً غَيْرَ الْوِتْرِ؛ لِقَوْلِ نَافِعٍ: أَدْرَكْتُ النَّاسَ وَهُمْ يَقُومُونَ رَمَضَانَ بِتِسْعٍ وَثَلَاثِينَ رَكْعَةً، يُوتِرُونَ مِنْهَا بِثَلَاثٍ. الْخَامِسُ: أَنَّهَا تُسْتَحَبُّ لِأَهْلِ الْمَدِينَةِ سِتًّا وَثَلَاثِينَ رَكْعَةً تَشْبِيهًا بِأَهْلِ مَكَّةَ، حَيْثُ كَانُوا يَطُوفُونَ بَيْنَ كُلِّ تَرْوِيحَتَيْنِ طَوَافًا وَيُصَلُّونَ رَكْعَتَيْهِ، وَلَا يَطُوفُونَ بَعْدَ الْخَامِسَةِ، فَأَرَادَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ مُسَاوَاتَهُمْ فَجَعَلُوا مَكَانَ كُلِّ طَوَافٍ أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ، وَلَوْ ثَبَتَ عَدَدُهَا بِالنَّصِّ لَمْ تَجُزِ الزِّيَادَةُ عَلَيْهِ.

বাংলা অনুবাদ : ইমাম বায়হাক্বীর সুনানসহ অন্যান্য গ্রন্থে সহীহ সনদে সাহাবী সাঈব ইবনু ইয়াযীদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে লোকেরা রমজান মাসে বিশ রাকাত (তারাবীহ) আদায় করতেন। যদি এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে প্রতিষ্ঠিত থাকত, তবে তা অবশ্যই উল্লেখ করা হতো; কারণ তাঁর যুগের বর্ণনা সনদের দিক থেকে অধিক উপযুক্ত এবং দলীল হিসেবে অধিক শক্তিশালী। চতুর্থ প্রমাণ: আলেমগণ তারাবীহ এর রাকাত সংখ্যা নিয়ে মতভেদ করেছেন। যদি এটি নবী (সা.)-এর আমল হিসেবে নির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হতো, তবে এতে মতভেদ হতো না— যেমন বিতর ও সুন্নাতে রাওয়াতিবের (নামাযের আগে-পরের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাতগুলোকে ‘রাওয়াতিব’ বলা হয়) রাকাত সংখ্যায় মতভেদ নেই। বর্ণিত আছে, আসওয়াদ ইবনু ইয়াযীদ (রহ.) বিতর ছাড়া চল্লিশ রাকাত পড়তেন। আর ইমাম মালিক (রহ.)-এর মতে, বিতর ছাড়া তারাবীহ ছত্রিশ রাকাত। কারণ নাফি‘ (রহ.) বলেন: আমি লোকদের পেয়েছি, তারা রমজানে ঊনচল্লিশ রাকাত পড়তেন, যার মধ্যে তিন রাকাত ছিল বিতর। পঞ্চম প্রমাণ: মদিনাবাসীদের জন্য ছত্রিশ রাকাত মুস্তাহাব গণ্য করা হয়েছে— মক্কাবাসীদের অনুসরণে। কারণ মক্কার লোকেরা প্রতি দুই তারাবীহর মাঝে একটি করে তাওয়াফ করতেন এবং তার দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন; তবে পঞ্চম তারাবীহর পর তারা তাওয়াফ করতেন না। মদিনাবাসীরা তাদের সমতা রক্ষা করতে প্রত্যেক তাওয়াফের স্থলে চার রাকাত নামাজ নির্ধারণ করেন। যদি তারাবীহর রাকাত সংখ্যা কুরআন-হাদীসের সুস্পষ্ট نص (দলীল) দ্বারা নির্ধারিত হতো, তবে তাতে বাড়ানো বৈধ হতো না। (আল হাভী লিল ফাতাওয়া, কিতাবুত সালাত অধ্যায় নং ৪০, ইমাম সুয়ূতী)।

ইমাম মালিক আর ইমাম বুখারীর তারাবীহ :

‘মুয়াত্তা মালিক’ আর ‘সহীহ বুখারী’ সহ নানা সোর্স থেকে কতেক সহীহ হাদীসের নামে যারা তারাবীহ আট (৮) রাকাত বলে দাবী করেন তারা ইমাম মালিক আর ইমাম বুখারী ‘তারাবীহ’ কত রাকাত পড়তেন সে বিষয়ে একটু খোঁজ নিতে পারেন। কারণ ইমাম মালিকের তারাবীহ বিতর সহ ২৩ থেকে ৩৯ রাকাত ছিল, মোটেও ৮ ছিল না। তেমনি ইমাম বুখারীর তারাবীহও ছিল ২০ রাকাত। তিনি তারাবীহ শেষ করে পৃথকভাবে ‘তাহাজ্জুদ’ পড়তেন। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানীর ”ফাতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী”র ভূমিকা هدى السارى (হাদীউস সারী) গ্রন্থে এ কথা উল্লেখ রয়েছে। আর ইমাম বায়হাক্বী (রহ.) নিজ ‘সুনান’ গ্রন্থে ‘হাদীউস সারী’ কিতাবের উক্ত বর্ণনার সনদ (সূত্র) উল্লেখ করেছেন এবং টিকায় পরিষ্কার লিখে দিয়েছেন যে, لَا بَأْسَ فِيهِ অর্থাৎ “এর সনদে কোনো সমস্যা নেই।” (শু’আবুল ঈমান লিল বায়হাক্বী, খ-৩, পৃ-৫২৪-৫২৫)।

ইমাম বুখারীর তারাবীহ সম্পর্কে :

“এ প্রসঙ্গে সহীহ সনদে ইমাম বুখারী (রহ.)-এর “হাদিউস সারী” নামক ‘ফাতহুল বারী’ কিতাবের ভূমিকাতে উল্লেখ রয়েছে, كَانَ مُحَمَّدُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ الْبُخَارِيُّ: إِذَا كَانَ أَوَّلُ لَيْلَةٍ مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ يَجْتَمِعَ إِلَيْهِ أَصْحَابُهُ فَيُصَلِّي بِهِمْ، فَيَقْرَأُ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ عِشْرِينَ آيَةً، وَكَذَلِكَ إِلَى أَنْ يَخْتِمَ الْقُرْآنَ অর্থাৎ “ইমাম বুখারী (রহ.) রমাযান মাসে রাতের প্রথম ভাগে নিজ শিষ্য/ছাত্রদের একত্রিত করতেন এবং তাদের নিয়ে (তারাবীহর) সালাত পড়তেন। সে সালাতে প্রতি রাকাতে তিনি ২০ আয়াত পড়তেন। আর এভাবে তিনি পবিত্র কুরআন খতম করতেন। আর যখন সাহরীর (তাহাজ্জুদের) সময় হয়ে যেত, তখন তিনি অর্ধেক থেকে কুরআনের একতৃতীয়াংশ পাঠ করতেন। এভাবে সাহরীতে তিন দিনে (কুরআন) খতম করতেন।” (هَدِي السَّارِي لِمُقَدِّمَةِ فَتْحِ الْبَارِي; শু’আবুল ঈমান লিল-বায়হাক্বী ৩/৫২৪ হাদীছ ২০৫৮, ফাতহুল বারী ১/৪৮১, তাগলীক্ব আত তালীক আ’লা সহীহিল বুখারী ৫/৩৯৯, তাহযীবুল কামাল ২৪/৪৪৬, তারীখে বাগদাদ ২/১২, তবাকাতুস শাফিয়াতুল কুবরা ২/২২৪)।

হিসেব কষে যা পাওয়া গেল :

এবার এই বর্ণনা অনুসারে আমরা হিসেব কষে যা ফেলাম তা এই যে, ইমাম বুখারী (রহ.) তারাবীহ’র প্রতি রাকাতে ২০ আয়াত পড়তেন। আর এভাবে তিনি পবিত্র কুরআন খতম দিতেন। এখন মাস যদি ৩০ দিনে হয় আর তিনি যদি ৮ রাকাত হিসেবে পড়েন তাহলে হিসাব দাঁড়ায়- তিনি প্রতিদিন পড়তেন (৮x২০) = ১৬০ আয়াত। সে হিসেবে ৩০ দিনে পড়তেন, (৩০x১৬০) = ৪৮০০ আয়াত। আমরা জানি, পবিত্র কুরআনে সর্বমোট আয়াত রয়েছে ৬২৩৬ টি। তাহলে ৮ রাকাত করে তারাবীহ পড়লে ৩০ দিনে কমবেশি মাত্র ৪৮০০ আয়াত পড়া সম্ভব। বাকি থাকলো আরও ১৪৩৬ টি আয়াত। তাই প্রশ্ন জাগবে, ইমাম বুখারী (রহ.) বাকি আরও ১৪৩৬ আয়াত না পড়েই কি কুরআন খতম দিতেন? অবশ্যই না। সুতরাং প্রমাণিত হল, স্বয়ং ইমাম বুখারী (রহ.) নিজেও ৮ রাকাত তারাবীহ পড়তেন না। তার কারণ, সহীহ রেওয়ায়েত সমূহে ৮+৩=১১ রাকাতের যে উল্লেখ রয়েছে তা হতে তারাবীহ উদ্দেশ্য ছিলনা, বরং তাহাজ্জুদ’ই উদ্দেশ্য । সহীহ বর্ণনামতে হযরত উমর (রা.) মূলত এ কারণেই আনসার এবং মুহাজির সাহাবীগণের উপস্থিতিতে তারাবীহ ২০ রাকাতের পদ্ধতি যখন প্রচলন করছিলেন তখন কেউই সেটিকে প্রত্যাখ্যান করেননি বা কোনো ধরনের আপত্তি উত্থাপন করেননি। হযরত আয়েশা (রা.)-এর কাছ থেকেও ২০ রাকাতের বিরুদ্ধে কোনো অভজেকশন (বিরোধিতা) আসেনি। অথচ ৮+৩=১১ রাকাতের হাদীসটি তিনি নিজেও বর্ণনা করেছিলেন। অতএব, অনুসন্ধিৎসু জ্ঞানীদের বিষয়টি অবশ্যই ভাবিয়ে তুলবে।

বলাবাহুল্য, বর্তমান যামানার কতিপয় সহীহ(?) ডিলারদের মতো পূর্ববর্তী গবেষকগণ এখতিলাফি কোনো বিষয়ে একে অন্যকে আক্রমণ করে মত প্রকাশ করেননি, নিজের মতকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেননি। উম্মাহার মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি করেননি। আলাদা মসজিদ নির্মাণ করতে তারা কাউকে কখনো উত্তেজিত করেননি, বরং তাঁরা প্রত্যেকে এধরণের এখতিলাফি বিষয়গুলোকে সীমিত কাঠামোর ভেতরে ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চর্চা করে গেছেন। মজার ব্যাপার হল, নিজ নিজ মতভিন্নতার ঊর্ধ্বে উঠে তারা সকলেই স্ব স্ব মাযহাবের প্রধান ইমামের মাযহাব (চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত/ফতুয়া) অনুসারেই আমল করে গেছেন।

প্রথমতঃ

ইমামে আ’যম হযরত আবূ হানীফা (রহ.) এর বর্ণনামতে তারাবীহ ২০ রাকাত পড়া সাব্যস্ত। ইমাম বুখারীর (জন্ম-মৃত্যু ১৯৪–২৫৬ হি.) সমসাময়িক বিখ্যাত হাফিযুল হাদীস হযরত আবূ বকর আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবী শাইবাহ আল-আবসী আল-কূফী (রহ.) {জন্ম ১৫৯- মৃত্যু ২৩৫ হি.} হতে বর্ণিত, (তিনি বলেন)

حَدَّثَنَا وَكِيعٌ، عَنْ أَبِي حَنِيفَةَ، عَنْ حَمَّادٍ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، أَنَّ النَّاسَ كَانُوا يُصَلُّونَ خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ فِي رَمَضَانَ

বাংলা অনুবাদ : ওয়াকী‘ আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: আবু হানীফা থেকে, তিনি হাম্মাদ থেকে, তিনি ইবরাহীম (নাখঈ) থেকে বর্ণনা করেন যে—
“নিশ্চয়ই মানুষরা রমযান মাসে পাঁচ ‘তরওয়ীহা’ আদায় করত।”

(রেফারেন্স :- মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবাহ, কিতাবুস সালাত, অধ্যায় কিয়ামু রমাযান ২য় খন্ড, হাদীস নম্বর ৭৬৯২)।

পাঁচ ‘তরওয়ীহা’ এর ব্যাখ্যা :

এক “তরওয়ীহা” বলতে চার রাকাতের পর বিশ্রামের অংশ বোঝানো হয়। অতএব, পাঁচ তরওয়ীহা = ৫ × ৪ = ২০ রাকাত।

সনদ বিশ্লেষণ :

১. وكيع بن الجراح (মৃ. ১৯৭ হি.) সম্পর্কে
ইমাম আহমদ (রহ.) বলেছেন, ثقة ثبت তথা নির্ভরযোগ্য ও সাব্যস্ত। ইমামু জারহু ওয়াত তা’দীল ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন (রহ.) বলেছেন, ثقة তথা নির্ভরযোগ্য। তিনি সর্বসম্মতিক্রমে নির্ভরযোগ্য হাফিযুল হাদীস। হানাফী ফিকহের চল্লিশ সদস্যের হেভিওয়েট সদস্যের অন্যতম ফকীহ কেবিনেট।

২. أبو حنيفة النعمان (মৃ. ১৫০ হি.) সম্পর্কে ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন (রহ.) বলেছেন, لَيْسَ بِهِ بَأْسٌ তথা তাঁর বর্ণনায় কোনো সমস্যা নেই।

ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মা’ঈন (রহ.) আরও বলেছেন, ثِقَةٌ مَا سَمِعْتُ أَحَدًا ضَعَّفَهُ هَذَا شُعْبَةُ بْنُ الْحَجَّاجِ يَكْتُبُ إِلَيْهِ أَنْ يحدث ويأمره وَشعْبَة شُعْبَة অর্থাৎ “তিনি একজন সিকাহ (নির্ভরযোগ্য)। কেউ তাঁকে দুর্বল বলেছেন বলে আমি শুনিনি। এ তো শু’বাহ ইবনুল হাজ্জাজ, তিনি আবূ হানীফাকে হাদীস বর্ণনা করতে লিখে পাঠান এবং অনুরোধ করেন। আর শু’বাহ তো শু’বাহ-ই।” (ইমাম ইবনু আব্দিল বার, আল-ইনতিকা পৃ. ১২৭, সনদ সহীহ)।

ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন (রহ.) আরও বলেন, ثِقَةٌ، لَا يُحَدِّثُ بِالْحَدِيثِ إِلَّا بِمَا يَحْفَظُهُ، وَلَا يُحَدِّثُ بِمَا لَا يَحْفَظُ. هٰكَذَا قَالَ يَحْيَى ابْنُ مَعِينٍ. سِيَرُ أَعْلَامِ النُّبَلَاءِ لِلذَّهَبِيِّ অর্থাৎ “তিনি একজন সিকাহ (বিশ্বস্ত)। তিনি সেসব হাদীসই বর্ণনা করতেন যা তাঁর মুখস্ত আর তিনি সেসব হাদীস বর্ণনা করতেন না যা তিনি মুখস্ত রাখতেন না।” (সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইমাম যাহাবী ৬/৩৯৫)।

ইমাম মক্কি বিন ইবরাহীম (রহ.) বলেছেন, كَانَ أَبُو حَنِيفَةَ أَعْلَمَ أَهْلِ زَمَانِهِ অর্থাৎ “আবু হানীফা তার সময়কালের শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন।” (মানাকীবে ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম যাহাবী পৃ-৩২)।

ইমাম নাসাঈ (রহ.) বলেছেন, لَيْسَ بِالْقَوِيِّ فِي الْحَدِيثِ অর্থাৎ “তিনি হাদীস বর্ণনায় শক্তিশালী নন।” (আদ্ব-দু’আফা ওয়াল মাতরূকীন)।

শারেহে বুখারী ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) ইমাম নাসাঈ (রহ.) এর মতের প্রতিউত্তরে বলেছেন, “নাসাঈ হাদীসশাস্ত্রের একজন ইমাম। তিনি ইমাম আবূ হানীফা সম্পর্কে যা বলেছেন, সেটি তাঁর নিজেস্ব মত। অথচ একমাত্র রাসূল (সা.) ব্যতীত এমন কেউ নেই, যার সব কথা গ্রহণযোগ্য।…..ইমাম আবূ হানীফার দৃষ্টিতে শ্রবণের পর থেকে হুবহু মুখস্ত রাখা ছাড়া কোনো হাদীস বর্ণনা করা উচিত নয়। এ কারণেই তাঁর সূত্রে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা কম। অন্যথায়, প্রকৃতপক্ষে তিনি অধিক হাদীস বর্ণনাকারী ছিলেন। সারকথা হচ্ছে, এ ধরনের বিষয়ে ডুবে থাকা ও অনর্থক কথাবার্তা ত্যাগ করাই উত্তম। কারণ ইমাম আবূ হানীফা এবং তাঁর মতো ইমামগণ প্রশংসা কিংবা সমালোচনার সেতু পার করে ফেলেছেন। অতএব, তাঁদের ব্যাপারে কারো কোনো সমালোচনা প্রভাব ফেলবে না, বরং তাঁরা সেই উঁচু স্তরে রয়েছেন, যেই স্তরে আল্লাহতালাই তাঁদের উঠিয়েছেন, তাঁদেরকে মানুষের অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় বানানোর মাধ্যমে! অতএব তুমি এটিতেই বিশ্বাসী থাকো। আর আল্লাহই একমাত্র সফলতাদানকারী।” (আল-জাওয়াহির ওয়াদ দুরার ফী তারজিমাতি ইবনি হাজার খ-২ পৃ-৯৪৫-৯৪৬, ইমাম সাখাবী রহঃ)।

ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন, النَّاسُ عِيَالٌ عَلَى أَبِي حَنِيفَةَ فِي الفِقْهِ مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَفْقَهَ مِنْ أَبِي حَنِيفَةَ অর্থাৎ “মানুষ ফিকহে আবূ হানীফার উপর নির্ভরশীল। আমি আবূ হানীফা চেয়ে কাউকে অধিক শ্রেষ্ঠ ফকীহ দেখিনি।” (তারীখে বাগদাদ ১৫/৪৭৪, খতীবে বাগদাদী)। উদ্ধৃতিটি হাদীসের মতো সহীহ হিসবে গণ্য না হলেও, এটি ঐতিহাসিক মন্তব্য (اثر معتبر تاريخي) হিসেবে গ্রহণযোগ্য। পরবর্তী অনেক আলেম ও গবেষক এতে সালাফদের উচ্চ শ্রদ্ধা ও আবূ হানীফা (রহ.) এর জ্ঞান‑গুণ সম্পর্কে প্রতিপন্ন করেছেন।

খতীবে বাগদাদী (রহ.) বর্ণনা করেছেন, قِيلَ لِمَالِكِ بْنِ أَنَسٍ: هَلْ رَأَيْتَ أَبَا حَنِيفَةَ؟ قَالَ: نَعَمْ، رَأَيْتُ رَجُلًا لَوْ كَلَّمَكَ فِي هَذِهِ السَّارِيَةِ أَنْ يَجْعَلَهَا ذَهَبًا لَقَامَ بِحُجَّتِهِ অর্থাৎ “ইমাম মালেক ইবনে আনাস (রহ.)-কে প্রশ্ন করা হল, আপনি আবূ হানীফা (রহ.)-কে কেমন দেখেছেন? তিনি উত্তরে বলেছেন, হ্যাঁ; আমি তাঁকে এমন এক ব্যক্তিরূপে দেখেছি যে, তিনি যদি এই খুঁটিটাকে ‘সোনা’ সাব্যস্ত করতে চাইতেন তিনি তা সাব্যস্ত করতে অবশ্যই প্রমাণ দাঁড় করতে পারতেন।” (তারীখে বাগদাদ ১৩:৩৩৭-৩৩৮, তাহযীবুল কামাল ২৯:৪২৯, সিয়ারু আলামিন নুবালা ৬:৩৯৯)।

ইমাম ইবনু আব্দিল বার (রহ.) তাঁর কিতাব জামে‘ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদ্বলিহি-তে লিখেছেন, ٱلَّذِينَ رَوَوْا عَنْ أَبِي حَنِيفَةَ وَوَثَّقُوهُ وَأَثْنَوْا عَلَيْهِ أَكْثَرُ مِنَ ٱلَّذِينَ تَكَلَّمُوا فِيهِ অর্থাৎ “যারা ইমামে আ‘যম থেকে বর্ণনা করেছেন তারা তাঁকে সিকাহ (ثقة) বলেছেন এবং তাঁর প্রশংসা করেছেন— তাদের সংখ্যা ঐ সকল লোকের চেয়ে বেশি, যারা তাঁর সমালোচনা করেছেন।”

শিদ্দাদ ইবনু হাকিম (রহ.) বলেছেন, قَالَ شِدّادُ بْنُ حَكِيم مَا رَأَيْتُ أَحَدًا أَعْلَمَ مِنْ أَبِي حَنِيفَةَ অর্থাৎ “আমি কাউকে আবূ হানীফা‑র চেয়ে বেশি জ্ঞানী দেখিনি।” (তারীখে বাগদাদ ১৫/৪৭৩-৭৫, খতীবে বাগদাদী)।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেছেন, إِنَّهُ كَانَ مِنَ العِلْمِ وَالوَرَعِ وَالزُّهْدِ وَإِيثَارِ الآخِرَةِ بِمَحَلٍّ لَا يُدْرِكُهُ أَحَدٌ، وَلَقَدْ ضُرِبَ بِالسِّياطِ لَيْلِيَّ القَضَاءِ فَلَمْ يَفْعَلْ অর্থাৎ “তিনি ছিলেন জ্ঞান, ধার্মিকতা, দুনিয়াবিমুখ এবং পরকালের লাভকে অগ্রাধিকার দানকারী হিসেবে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন যা কেউই লাভ করতে পারবে না। তাঁকে বিচারক পদে মনোনীত করতে চাবুক দিয়ে আঘাত করা হলেও তিনি তাতে সাড়া দেননি।” (হাশিয়ায়ে রদ্দুল মুহতার ১/৬৪, ইবনুল আবেদীন, মানাকিবুল ইমাম আবী হানীফা লিয-যাহাবী, পৃষ্ঠা ৪৩)।

ইমাম বুখারীর উস্তাদের উস্তাদ ইমাম ইবনুল মুবারক (রহ.) {জন্মমৃত্যু ১০২-১৮৯ হি.} বলেছেন, قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ عِنْدَنَا أَثَرٌ إِذَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ أَثَرٌ অর্থাৎ “আবূ হানীফার বক্তব্য (রায়ের ক্ষেত্রে) হাদীসের মতো গ্রহণযোগ্য, যখন হাদীস না থাকবে।” (মানাকিবুল ইমাম আবু হানীফা ওয়া আসহাবাইহি-২১১, ইমাম যাহাবী)।

ইমাম আলী ইবনুল মাদীনি (রহ.) বলেন, وَقَالَ عَلِيُّ بْنُ الْمَدِيْنِيْ: أَبُوْ حَنِيْفَةَ رُوِيَ عَنْهُ الثَّوْرِيُّ وَاِبْنُ الْمُبَارَكِ وَحَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ وَهَشِيْمٌ وَوَكِيْعُ بْنُ الْجَرَّاحِ وَعَبَّادُ بْنُ الْعَوَّامِ وَجَعْفَرُ بْنُ عَوْنٍ وَهُوَ ثِقَةٌ لَا بَأْسَ بِهِ অর্থাৎ “আবূ হানীফা (রহ.)-এর কাছ থেকে সুফিয়ান আস-সওরী, আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক, হাম্মাদ ইবনে যায়িদ, হাশিম, ওয়াকী’ ইবনে জাররাহ, আব্বাদ ইবনুল আ’ওয়াম প্রমুখ সকলে (হাদীস-আছার) রেওয়ায়েত করেছেন। তিনি একজন সিকাহ (বিশ্বস্ত), তার ব্যাপারে কোনো সমস্যা নেই।” (জামে’ বায়ানিল ইলম ওয়া ফাদ্বলিহি, ইমাম ইবনে আব্দিল বার মালেকি ২/১৪৯)।

ইমাম শু’বাহ (রহ.) বলেছেন, أَبُو حَنِيفَةَ ثِقَةٌ فِي فِقْهِ وَعِلْمِهِ অর্থাৎ “আবূ হানীফা তাঁর ফিকহ ও জ্ঞানে বিশ্বাসযোগ্য।” (তারীখে বাগদাদ ১৫/৪৭৪, বাগদাদী)।

শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রহ.) বলেছেন, إِنَّ أَبَا حَنِيفَةَ، وَإِنْ كَانَ النَّاسُ خَالَفُوهُ فِي أَشْيَاءَ، وَأَنْكَرُوهَا عَلَيْهِ، فَلَا يَسْتَرِيبُ أَحَدٌ فِي فِقْهِهِ وَفَهْمِهِ وَعِلْمِهِ، وَهُوَ مِنْ أَئِمَّةِ الْعُلَمَاءِ فِي الْفِقْهِ وَالرَّأْيِ وَالْإِجْمَاعِ عَلَى أَثَرِهِ অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আবু হানীফা যদিও মানুষ তাঁকে কিছু বিষয়ে বিরোধীতা করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনা করেছে, তবু কেউ তাঁর ফিকহ, বুঝ এবং জ্ঞান সম্পর্কে সন্দেহ করতে পারে না। তিনি ফিকহ, রায় বিষয়ে বিজ্ঞ ইমামগণের অন্যতম। তাঁর অনুসরণের ব্যাপারে ইজমা (ঐক্যমত) রয়েছে।” (মিনহাজুস সুন্নাতুন নাবাবিয়্যাহ, শায়খ ইবনু তাইমিয়াহ-২/৬১৯)।

এভাবে আরও অসংখ্য তা’দীল রয়েছে ইমামে আ’যম আবূ হানীফা (রহ.) সম্পর্কে।

৩. حماد بن أبي سليمان (মৃ. ১২০ হি.) সম্পর্কে ইমামগণ বলেছেন, ثقة فقيه তথা নির্ভরযোগ্য ও ফকীহ। তিনি হযরত ইবরাহীম নাখঈ (রহ.) এর প্রধান শাগরেদ ও নির্ভরযোগ্য।

৪. إبراهيم النخعي (মৃ. ৯৬ হি.) তিনি একজন
كبار التابعين তথা প্রবীণ তাবেয়ীগণের অন্তর্ভুক্ত। তিনি
সর্বসম্মতভাবে ثقة তথা নির্ভরযোগ্য। তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) নিকট শৈশবে দ্বীন শিক্ষা করেছেন। তিনি অসংখ্য সাহাবীর কাছ থেকেও হাদীস শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।

সনদের সামগ্রিক মূল্যায়ন :

সনদ মুত্তাসিল (সংযুক্ত)। এখানে কোনো মাতরূক বা মিথ্যুক রাবী নেই। তাই এই আসার/আছারটির সনদকে বলা যায়: حسن الإسناد (হাসানুল ইসনাদ) বা গ্রহণযোগ্য।

সমর্থনকারী দলীল :

ইবরাহীম নাখ’ঈ কুফার ফকীহ। কুফাবাসীদের আমল ২০ রাকাত ছিল—অন্যান্য আসারেও পাওয়া যায়। হযরত উমর (রা.)-এর যুগে তারাবীহ ২০ রাকাতের উপর সাহাবায়ে কেরামের ‘ইজমা’ (ঐক্যমত) প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত বর্ণনা উক্ত আসারকে ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী করে।

বর্ণনাটির ধরণ :

বিশিষ্ট তাবেয়ী, ফকীহ ও হাফিযুল হাদীস ইবরাহীম নাখ’ঈ (রহ.) এর বর্ণিত রেওয়ায়েতটি ‘মাকতু’ তথা একজন তাবেয়ীর বক্তব্য। বলাবাহুল্য যে, বিশিষ্ট তাবেয়ী ও ফকীহ ইবরাহীম নাখ’ঈ (রহ.) এর মাকতু পর্যায়ের রেওয়ায়েতটি দলীল প্রমাণ হিসেবে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য। তার কারণ এই যে, তিনি এমন একজন মর্যাদাপ্রাপ্ত রাবী বা হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে মুহাদ্দিসগণের নিকট প্রসিদ্ধ যে, তিনি শুধু বিশ্বস্ত (সিক্বাহ) রাবীদের কাছ থেকে রেওয়ায়েত নেন। ফলে তাঁর ‘তাদলীস’ (সনদের প্রচ্ছন্ন ত্রুটিসহ কৃত রেওয়ায়েত) বা ‘মুরসাল’ (সনদের শুরুর দিক থেকে সাহাবী বা তাবেয়ীর নাম বাদ দিয়ে রাসূল সা. থেকে সরাসরি কৃত রেওয়ায়েত) গ্রহণযোগ্য। এ সম্পর্কে ইমাম ইবনু আব্দিল বার মালেকী (রহ.) ‘আত তামহীদ’ কিতাবে লিখেছেন,

وَكُلُّ مَنْ عُرِفَ أَنَّهُ لَا يَأْخُذُ إِلَّا عَنْ ثِقَةٍ فَتَدْلِيسُهُ وَمُرْسَلُهُ مَقْبُولٌ فَمَرَاسِيلُ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ وَمُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ وَإِبْرَاهِيمَ النَّخَعِيِّ عِنْدَهُمْ صِحَاحٌ.

বাংলা অনুবাদ : প্রত্যেক ঐ রাবী যার সম্পর্কে এটা প্রসিদ্ধ যে, তিনি শুধু সিক্বাহ রাবীদের থেকেই রেওয়ায়েত নেন, তার তাদলীস এবং মুরসাল রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য। এজন্য সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহ.), ইমাম মুহাম্মদ ইবনে শিরীন (রহ.) এবং ইবরাহীম নাখ’ঈ (রহ.) এঁদের মুরসাল রেওয়ায়েত-সমূহ মুহাদ্দিসদের নিকট সহীহ। (আত-তামহীদ ১:৩০, ইমাম আবূ উমর ইবনে আব্দিল বার আল মালেকী রহঃ)।

দ্বিতীয়তঃ

ইমামে আ’যম আবূ হানীফা (রহ.) এর ‘কিতাবুল আসার’ থেকে পূর্ণ সনদ সহ আরেকটি রেওয়ায়েত নিম্নরূপ, ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ.) বর্ণনা করেছেন,

أَبُو حَنِيفَةَ عَنْ حَمَّادٍ عَنْ إِبْرَاهِيمَ أَنَّ النَّاسَ كَانُوا يُصَلُّونَ خَمْسَ تَرْوِيحَاتٍ فِي رَمَضَانَ

বাংলা অনুবাদ : হযরত ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তিনি হযরত হাম্মাদ বিন আবু সুলাইমান থেকে, তিনি হযরত ইবরাহীম আন নাখ’ঈ তাবেয়ী (মৃত্যু-৯৬ হিজরী) থেকে, তিনি বলেছেন,

“নিশ্চয় লোকেরা (সাহাবী ও তাবেয়ীগণ) রমযান মাসে পাঁচ তারবীহার সাথে (অর্থাৎ বিশ রাকাত) তারাবীহ সালাত পড়তো।” (কিতাবুল আসার, ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. বর্ণনাকৃত)। আরও দেখুন, আল মওসুআতুল হাদীসিয়্যাহ খন্ড ৯ পৃষ্ঠা ১০।

কিতাবুল আসার (كتاب الآثار) সম্পর্কে :

ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর অনবদ্য সংকলন কিতাবুল আসার/কিতাবুল আছার (كتاب الآثار) প্রসঙ্গে কিছু তথ্য পেশ করা হল,

বিশিষ্ট মুহাদ্দিস শায়খ ডক্টর খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) লিখেছেন, ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর যুগের আলিমগণ সাধারণত প্রচলিত পরিভাষায় গ্রন্থ রচনা করতেন না, বরং তাঁরা যা বলতেন তা ছাত্ররা লিখতেন। এজন্য তাবিয়ী যুগে বা ১৫০ হিজরী সালের মধ্যে মৃত্যুবরণকারী আলিমদের লেখা বা সংকলিত পৃথক গ্রন্থাদির সংখ্যা খুবই কম। তাঁদের ছাত্রগণের লেখায় তাঁদের বক্তব্য সংকলিত। কখনো কোনো ছাত্র তাঁদের বক্তব্য একক পুস্তিকায় সংকলন করতেন। কখনো তাঁরা নিজেরাই কিছু তথ্য সংকলন করতেন। ইমাম আবূ হানীফার লেখা বলতে কখনো তাঁর নিজের সংকলন এবং কখনো তাঁর কোনো ছাত্র কর্তৃক তাঁর বক্তব্য বা তাঁর বর্ণিত হাদীস সংকলন বুঝানো হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই তা ‘ইমাম আবূ হানীফা’-র নামে প্রচারিত হতে পারে। এ মূলনীতির ভিত্তিতে ইমাম আবূ হানীফা রচিত ও সংকলিত প্রধান গ্রন্থ ‘কিতাবুল আসার’।

মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় ‘আসার’ (الآثار) বলতে সাহাবী, তাবিয়ী ও তাবি-তাবিয়ীগণের বক্তব্য বা কর্ম বুঝানো হয়। সাধারণভাবে ‘আসার’ এর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীসও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। দ্বিতীয় হিজরী শতকে মুহাদ্দিসগণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীসের সাথে সাহাবীগণের বক্তব্যও সংকলন করতেন এবং ফিকহী পদ্ধতিতে বিন্যাস করতেন। এরূপ গ্রন্থগুলো ‘মুআত্তা’, ‘মুসান্নাফ’ বা ‘কিতাবুল আসার’ নামে পরিচিত।

ইমাম আবূ হানীফা সংকলিত ‘কিতাবুল আসার’ তাঁর কয়েকজন ছাত্র বর্ণনা করেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন: যুফার ইবন হুযাইল (১৫৮ হি.), আবূ ইউসুফ (১৮২ হি.), মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান (১৮৯ হি.), হাসান ইবন যিয়াদ লুলুয়ী (২০৪ হি.)। তন্মধ্যে আবূ ই্উসূফ এবং মুহাম্মাদ বর্ণিত ‘কিতাবুল আসার’ দুটো পৃথক গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত। এ গ্রন্থদুটোতে ইমাম আবূ ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ ইমাম আবূ হানীফা বর্ণিত হাদীসে নববী এবং সাহাবী-তাবিয়ীগণের বক্তব্য সংকলন করেছেন। উল্লেখ্য যে, উভয় গ্রন্থের অধিকাংশ ‘আসার’ বা হাদীস একই। মূলত গ্রন্থদুটো ইমাম আবূ হানীফা সংকলিত কিতাবুল আসারের পৃথক বর্ণনা মাত্র। ইমাম মালিকের মুআত্তা গ্রন্থটি যেমন বিভিন্ন ছাত্র বিভিন্ন সময়ে শ্রবণ ও বর্ণনা করার কারণে অনেকগুলো মুআত্তার সৃষ্টি হয়েছে। অনুরূপভাবে ইমাম আবূ হানীফা সংকলিত কিতাবুল আসার ইমাম মুহাম্মাদ ও ইমাম আবূ ইউসুফ পৃথকভাবে বর্ণনা করার কারণে উভয়ের মধ্যে কিছু ব্যতিক্রম সৃষ্টি হয়েছে।

‘কিতাবুল আসার’ (كتاب الآثار) ছাড়াও ইমাম আবূ হানীফা সংকলিত হাদীসগুলো ‘মুসনাদে আবী হানীফা’ নামে বর্ণিত ও গ্রন্থায়িত। তাঁর কয়েকজন ছাত্র তাঁর মুসনাদ বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন:

১. ইমাম আবূ হানীফার পুত্র হাম্মাদ ইবন আবূ হানীফা (১৮০ হি.)

২. মুহাম্মাদ ইবন খালিদ ওয়াহবী (২০০ হি.)

৩. আবূ আলী হাসান ইবন যিয়াদ লু’লুয়ী (২০৪ হি.)

চতুর্থ হিজরী শতক থেকে ষষ্ঠ হিজরী শতক পর্যন্ত সময়ে কয়েকজন মুহাদ্দিস ইমাম আবূ হানীফার সূত্রে বর্ণিত হাদীসগুলো তাঁদের সনদে সংগ্রহ করে ‘মুসনাদ আবী হানীফা’ নামে সংকলন করেন। তাঁদের অন্যতম,

(১) উমার ইবনুল হাসান ইবনুল আশনানী বাগদাদী (৩৩৯ হি.)

(২) আবূ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন ইয়াকূব ইবনুল হারিস আল-হারিসী আল-বুখারী আল-উসতাদ (৩৪০ হি.)

(৩) আবূ আহমদ আব্দুল্লাহ ইবন আদী জুরজানী (৩৬৫ হি.)

(৪) আবুল কাসিম তালহা ইবন মুহাম্মাদ ইবন জা’ফার মুআদ্দিল শাহিদ বাগদাদী (৩৮০ হি.)

(৫) আবুল হুসাইন মুহাম্মাদ ইবনুল মুযাফ্ফার ইবন মূসা ইবন ঈসা ইবন মুহাম্মাদ বাগদাদী (৩৭৯ হি.)

(৬) আবূ নুআইম ইসপাহানী আহমদ ইবন আব্দুল্লাহ (৪৩০ হি.)

(৭) আবূ বকর আহমদ ইবন মুহাম্মাদ কালায়ী কুরতুবী (৪৩২ হি.)

(৮) আবূ বাকর মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল বাকী ইবন মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ আনসারী খাযরাজী (৫৩৫ হি.)

(৯) আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন ইবন মুহাম্মাদ ইবন খসরু বালখী বাগদাদী (৫২৬ হি.)

(১০) আবুল কাসিম আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবিল আওয়াম সা’দী।

তিনি মিসরের বিচারপতি ছিলেন। তাঁর মৃত্যু তারিখ জানা যায় না। তবে তিনি ইমাম নাসায়ীর (৩০৩ হি.) ছাত্র ছিলেন (সিয়ারু আলামিন নুবালা ১৪/১২৭, ইমাম যাহাবী)। এছাড়া তাঁর পৌত্র মিসরের বিচারপতি আহমদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আবিল আওয়াম হিজরী ৩৪৯ সালে জন্মগ্রহণ এবং ৪১৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এ হিসেবে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি চতুর্থ হিজরী শতকের প্রথমার্ধে ৩৩০-৩৪০ হিজরী সালের দিকে মৃত্যুবরণ করেন। (তারাজিমুল হানাফিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১৪৯-১৫০ ইমাম তকি উদ্দীন ইবনে আব্দিল কাদির আত তামিমি আল গায্যী (মৃত. ১০১০ হি.); তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১০৬-১০৭ ইমাম আবুল ওয়াফা আল কারশী (৬৯৬-৭৭৫ হি.); আল-আ’লাম ১/২১১, ইমাম খায়রুদ্দীন আয যিরকলী আল দামেস্কী মৃত. ১৩৯৬ হি.)।

এগুলোর মধ্যে আবূ মুহাম্মাদ হারিসী সংকলিত মুসনাদ এবং আবূ নুআইম ইস্পাহানি সংকলিত মুসনাদ গ্রন্থ দুটি মুদ্রিত।

সপ্তম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ আলিম ইমাম আবুল মুআইয়িদ মুহাম্মাদ ইবন মাহমূদ খাওয়ারিযমী (৬৬৫ হি.) ‘জামিউল মাসানীদ’ বা ‘মুসনাদগুলোর সংকলন’ নামক একটি গ্রন্থে ‘মুসনাদ আবী হানীফা’ নামে প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোতে বিদ্যমান হাদীসগুলো একত্রে সংকলন করেন।

সুতরাং সাব্যস্ত হচ্ছে যে, ইসলামী শরীয়ত তারাবীহকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা হিসেবে বিবেচনা করে। আর বিশিষ্ট ফকীহ ও তাবেয়ী ইমাম ইবরাহীম নাখ’ঈ’র কথাটি সাহাবীদের যুগে মুসলমানগণ তারাবীহ বিশ (২০) রাকাত পড়তেন বলেই ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণ করে। কাজেই আট (৮) রাকাত সম্পর্কিত রেওয়ায়েতগুলো হতে ‘তারাবীহ’ উদ্দেশ্য হবেনা, বরং ‘তাহাজ্জুদ’ উদ্দেশ্য। কেননা ঐ সকল রেওয়ায়েতের মধ্যে উক্ত আট রাকাত রমাযান এবং রমাযানের বাহিরেও পড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। অথচ রমাযানের বাহিরে শুধু ‘তাহাজ্জুদ’ থাকতে পারে কিন্তু ‘তারাবীহ’ নয়। আর যারা উক্ত আট রাকাতকেই ‘তারাবীহ’ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন তাদের মতে ‘তারাবীহ’ নামে স্বতন্ত্র কোনো সালাত নেই। তাদের মতে তারাবীহ আর তাহাজ্জুদ দুটো একই সালাত। কিন্তু এ লোকগুলোকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, ‘তাহাজ্জুদ’ কি ইশার সালাতের পরেই পড়া যাবে? তখন আর তাদের কোনো উত্তর থাকেনা।

চলবে।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু আর্টিকেল। সাহাবায়ে কেরামগণের সর্বসম্মত আমল অনুসারে তারাবীহ কত রাকাত? | তারাবীহ আট রাকাত পড়লে সুন্নাহ আদায় হবে কি? | তারাবীহ কত রাকাত পড়া সুন্নাহ? | মুয়াত্তা মালিক গ্রন্থের আট রাকাত কিয়ামুল লাইলের জবাব

লিখক, মুহাম্মদ নূরুন্নবী এম.এ

ইমাম মাহদী বনাম মির্যা কাদিয়ানী বই থেকে

মুসলমান এবং কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের মাঝে ২০টি পার্থক্য ও প্রামাণ্য স্ক্যানকপি নিম্নরূপ

লিফলেট : আহমদীয়া (অ)মুসলিম জামাত তথা কাদিয়ানীরা কেন মুসলিম নয়?

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

আহমদীয়া মুসলিম (?) জামাত তথা কাদিয়ানী সম্প্রদায় অমুসলিম হওয়ার কারণ

আল্লাহ তায়ালার নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্ম হলো ইসলাম। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম আল্লাহ তাআলার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামের সর্বপ্রথম শিক্ষাই হলো ঈমান ও আকীদা। নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা যে দ্বীন ও শরীয়ত এবং কুরআন ও সুন্নাহ দিয়েছেন, এককথায় তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু পেশ করেছেন সব কিছু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা এবং নিঃসংকোচে মেনে নেওয়া, এর নামই ঈমান এবং এর নামই হল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা। যে ব্যক্তি দ্বীনে ইসলামের কোনো স্বতঃসিদ্ধ, সর্বজনবিদিত ও যুগ পরম্পরায় প্রতিষ্ঠিত কোনো বিষয়কে অস্বীকার করবে বা তার স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত অর্থের বিপরীত কোনো অর্থ করবে সে কাফের ও বেঈমান।

মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ও তার অনুসারী কাদিয়ানী সম্প্রদায় দ্বীনের অনেক স্বতঃসিদ্ধ ও সর্বজনবিদি বিষয় অস্বীকার করে নিজেরাই মুসলিম উম্মাহ থেকে আলাদা হয়ে গেছে। ইসলামের সাথে যে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই তা তাদের গুরুরা (পাদ্রীরা) স্পষ্টভাবেই স্বীকার করেছে। এ বিষয়ে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর একটি বক্তব্য তার বড় ছেলে (কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় খলিফা) মির্যা বশীর উদ্দিন মাহমুদ এভাবে উদ্ধৃত করেছে যে,

“হযরত মাসীহে মাওউদ (মির্যা কাদিয়ানী) তো সত্য বলেছেন, তাদের ইসলাম ভিন্ন আর আমাদের ইসলাম ভিন্ন। তাদের খোদা ভিন্ন আর আমাদের খোদা ভিন্ন। আমাদের হজ্জ ভিন্ন আর তাদের হজ্জ ভিন্ন। এমনিভাবে প্রতিটি বিষয়ে তাদের (তথা অ-আহমদীদের) সাথে আমাদের পার্থক্য রয়েছে।” – কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের মুখপত্র দৈনিক আল ফযল তারিখ ২১ আগস্ট ১৯১৭ ইং, পৃ.৮ কলাম নং ১।

কাদিয়ানী সম্প্রদায় কাফের হওয়ার মৌলিক কিছু কারণ

এক. খতমে নবুওয়াতের আকীদা অস্বীকার ও মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী কর্তৃক নবুওয়াতের মিথ্যা দাবি করা :

দ্বীনে ইসলামের অন্যতম মৌলিক আকীদা হলো, খতমে নবুওয়াতের আকীদা। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুক্ত ও স্বাধীন শেষনবী। তাঁর পরে কাউকে নবুওয়াত দান করা হবে না। আল্লাহ তাআলা হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নবুওয়াতের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন।

মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ‘খতমে নবুওয়াতে’র এই মৌলিক আকীদাকে অস্বীকার করে ১৯০১ সালে সরাসরি নবুওয়াত দাবি করে। নিচে তার নবুওয়াত দাবির দু’টি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হলো-

“আমি ওই খোদার কসম করে বলছি, যার হাতে আমার জীবন, তিনিই আমাকে পাঠিয়েছেন এবং তিনিই আমার নাম নবী রেখেছেন।” – তাতিম্মায়ে হাকীকাতুল ওহী, রূহানী খায়ায়েন ২২/৫০৩ (মির্যা কাদিয়ানীর রচনাসমগ্র)।

“আল্লাহর আদেশ মোতাবেক আমি একজন নবী। আমি এই দাবী অস্বীকার করলে আমার পাপ হবে। যেহেতু আল্লাহ আমাকে নবী নাম দিয়েছেন আমি তা কিভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারি। আমি মরণ পর্যন্ত এই বিশ্বাস আঁকাড়ে থাকব।” – নবুয়ত ও খিলাফত (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ৭৬ ; বাংলাদেশের কাদিয়ানীদের মূলকেন্দ্র বকশী বাজার, ঢাকা থেকে প্রকাশিত; আরও দেখুন, মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত ২/৭২৫।

দুই. মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী কর্তৃক নিজেকে স্বয়ং মুহাম্মাদূর রাসূলুল্লাহ দাবি করা :

মির্যা কাদিয়ানীর দাবি, সে স্বয়ং মুহাম্মাদূর বাসুলুল্লাহ। তার মাঝে স্বয়ং মুহাম্মাদূর রাসূলুল্লাহর সত্তা বিরাজমান। গোটা কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের আকীদা ও বিশ্বাস হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে দুইবার আবির্ভূত হয়েছেন। প্রথমবার মক্কায়, দ্বিতীয়বার কাদিয়ানে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর স্বরূপে।। (নাউযুবিল্লাহ)

মির্যা কাদিয়ানী লিখেছে,

“এর মধ্যে আমার নিজস্ব সত্তা নেই, পরন্তু মুহাম্মদ (সঃ) বিরাজমান। এ কারণে আমার নাম মুহাম্মদ (সঃ) এবং আহমদ (সঃ) হয়েছে। সুতরাং নবুওয়াত এবং রেসালাত অপর কারও নিকট গেল না, মুহাম্মদ (সঃ)-এর বস্তু মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট রইল।” – একটি ভুল সংশোধন (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ১৫ (বাংলাদেশে কাদিয়ানীদের মূলকেন্দ্র বকশী বাজার, ঢাকা হতে অনূদিত)।

মির্যা কাদিয়ানীর মেজো ছেলে মির্যা বশীর আহমদ এম. এ লিখেছে,

“সুতরাং মাসীহে মাওউদ (মির্যা কাদিয়ানী) স্বয়ং মুহাম্মাদূর রাসুলুল্লাহ। ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে আগমন করেছেন।” – কালিমাতুল ফসল পৃষ্ঠা নং ৬৬, মির্যাপুত্র বশীর আহমদ এম.এ রচিত।

তিন. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবমাননা করা :

কাদিয়ানী সম্প্রদায় কাফের হওয়ার বড় একটি কারণ হলো রাসূল (সা.) এর অবমাননা করা। মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী অত্যন্ত জঘন্য পন্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে বেয়াদবী করেছে। এ বিষয়ে অনেক প্রমাণ রয়েছে। মির্যা কাদিয়ানী তার বইপত্রের বিভিন্ন স্থানে দাবি করেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য তার মাঝে বিদ্যমান। (নাউযুবিল্লাহ) মির্যা কাদিয়ানী এক জায়গায় বলেছে-

“বিচ্ছিন্নভাবে সকল নবীর মাঝে যে গুণ-বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল তার সমষ্টি আরও অধিকহারে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে বিদ্যমান ছিল। এখন ঐ সকল গুণ-বৈশিষ্ট্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিচ্ছায়ারূপে আমাকে দেওয়া হয়েছে।” – মালফুযাত (মির্যা কাদিয়ানীর বাণী সংকলন) খন্ড ২ পৃষ্ঠা ২০১ নতুন সংস্করণ।

এ কারণে কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের নিকট রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মির্যা কাদিয়ানীর মর্যাদা একেবারে বরাবর। বিষয়টি উল্লেখ করতে গিয়ে তারা তাদের মুখপত্র ‘দৈনিক আল ফযল’ পত্রিকায় এভাবে লিখেছে –

“আল্লাহ তায়ালার নিকট হযরত মসীহে মওউদের (তথা মির্যা কাদিয়ানীর) সত্তাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই সত্তা। অর্থাৎ আল্লাহর খাতায় হযরত মাসীহে মাওউদ ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে কোনো বৈপরীত নেই, বরং উভয়ের একই অবস্থান, একই মর্তবা, একই মর্যাদা ও একই নাম। শাব্দিকভাবে দুইজন মনে হলেও বাস্তবে একজন।” – কাদিয়ানীদের মুখপত্র দৈনিক আল ফযল, আরিখ ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯১৫ ইং, পৃষ্ঠা ৭ কলাম ২।

চার, নবীগণের শানে চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করা :

মির্যা কাদিয়ানী হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে লিখেছে,

“ইউরোপের লোকদের মদ যত অনিষ্ট করিয়াছে, তাহার কারণ এই যে, ঈসা (আ.) মদ্যপান করিয়াছেন।” – কিশতিয়ে নূহ (বাংলা অনূদিত) পৃষ্ঠা নং ৮৭ সপ্তম সংস্করণ।

“হযরত ঈসা আলাইহিসরালাম নিজে নৈতিক শিক্ষার ওপর আমল করেননি। আঞ্জির (ডুমুর) গাছ ফলবিহীন দেখে তার ওপর বদ-দোয়া করেছেন। অথচ অন্যদেরকে দোয়া করতে শিখিয়েছেন। অন্যদেরকে এ আদেশও করেছেন যে, তোমরা কাউকে আহমক (বোকা) বলবেনা। অথচ নিজে মুখ-খারাপে এতটাই লাগামহীন হয়ে পড়েছেন যে, ইহুদীদের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গকে হারামজাদা পর্যন্ত বলে ছেড়েছেন। তিনি প্রতিটি ওয়াজে ইহুদী উলামাদেরকে কঠিন কঠিন গালি দিয়েছেন এবং তাদের বিভিন্ন খারাপ নাম রেখেছেন। নৈতিক শিক্ষকের জন্য ফরজ প্রথমে নিজে উত্তম চরিত্র দেখানো।” – চশমায়ে মাসীহী, রূহানী খাযায়েন ২০/৩৪৬; (মির্যা কাদিয়ানীর রচনাসমগ্র)।

পাঁচ, কাদিয়ানী সম্প্রদায় কর্তৃক কালিমায়ে তায়্যিবাকে অস্বীকার করা :

কাদিয়ানী সম্প্রদায় কালিমা তায়্যিবা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” এর শব্দ-বাক্য ঠিক রেখে তার অর্থ ও মর্মের মাঝে চরম বিকৃতি ঘটিয়ে তারা মূলত কালিমা তায়্যিবাকেই অস্বীকার করেছে। যেহেতু মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী নিজেকে স্বয়ং মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ দাবি করেছে, তাই কাদিয়ানীরা কালিমার মাঝে ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ বলে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে উদ্দেশ্য নেয়। কাদিয়ানীরা মির্যা কাদিয়ানীকে নবী মানা সত্ত্বেও তার কালিমা না গড়ে মুসলমানদের মতোই কালিমা কেন পড়ে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে মির্যা কাদিয়ানীর মেঝো ছেলে মির্যা বশীর আহমদ এম.এ লিখেছে,

“সুতরাং মাসীহে মওউদ (তথা মির্যা কাদিয়ানী) স্বয়ং মুহাম্মাদূর রাসূলুল্লাহ। ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে আগমন করেছেন। অতএব আমাদের নতুন কোনো কালিমার প্রয়োজন নেই। তবে মুহাম্মাদূর রাসূলুল্লাহর পরিবর্তে অন্য কারও আগমন ঘটলে নতুন কালিমার প্রয়োজন হত।” – কালিমাতুল ফসল পৃষ্ঠা ৬৮।

ছয়. বিশ্বের সকল মুসলমানকে কাফের আখ্যা দেওয়া :

কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের আকীদা ও বিশ্বাস হলো, যারা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর উপর ঈমান আনবে না তারা সকলেই কাফের ও বেঈমান। তাদের পেছনে নামায পড়া জায়েয নেই, তাদের কাছে মেয়ে বিবাহ দেয়া জায়েয নেই। তাদের জানাযা পড়াও জায়েয নেই। (নাউযুবিল্লাহ)। মির্যা কাদিয়ানীর একটি বক্তব্য লক্ষ্য করুন,

“আল্লাহ তায়ালা আমাকে জানিয়েছেন, যে ব্যক্তির নিকট আমার দাওয়াত পৌঁছলো কিন্তু সে আমাকে গ্রহণ করল না সে মুসলমান না।” – তাযকিরাহ পৃষ্ঠা ৫১৯ (চতুর্থ এডিশন), হাকীকাতুল ওহী (বাংলা) পৃষ্ঠা ১৩০।

মির্যা বশীর আহমদ এম.এ (মির্যা কাদিয়ানীর মেজো ছেলে) লিখেছে,

“প্রত্যেক ওই ব্যক্তি যে মুসাকে মানে কিন্তু ঈসাকে মানে না, অথবা ঈসাকে মানে কিন্তু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মানে না, অথবা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মানে কিন্তু মাসীহে মাওউদকে (তথা মির্যা কাদিয়ানীকে) মানে না, সে শুধু কাফের নয় বরং পাক্কা কাফের এবং ইসলামের গণ্ডিবহির্ভূত।” – কালিমাতুল ফসল পৃষ্ঠা ২০।

ওপরে অতি সংক্ষেপে কদিয়ানীদের অমুসলিম হওয়ার মৌলিক কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হলো। এ জাতীয় আরো অনেক উদ্ধৃতি রয়েছে যা প্রমাণ করে কাদিয়ানীরা নিকৃষ্টতম কাফের। তাই আসুন এই ভয়াবহ কুফুরী ফেতনা সম্পর্কে নিজেরা সচেতন হই এবং অন্যকে সচেতন করি। কোনো মুসলমান ভাই যেন কাদিয়ানীদের খপ্পরে পড়ে ঈমানহারা না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলের ঈমানকে হেফাজত করুন, আমীন।

সার্বিক যোগাযোগ :

তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত প্রকাশনী

হযরতপুর, কেরানীগঞ্জ, ঢাকা-১৩১৩

মোবাইল: 01646-373084 (আসরের পর থেকে মাগরিব, রাত ৯ টার পর থেকে ১০ টার মধ্যে কল দেয়ার অনুরোধ)।

মুসলিম নামডাক শুনবা এত লোল পরে কেন?

কাফের, মুসলিম, মুমিন এগুলো কার পরিভাষা? ইসলামের পরিভাষা। ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে কী বলে? মুসলিম বলে। ঈমান আনলে কী বলে? মুমিন বলে। কুফুরি করলে কী বলে? কাফের বলে। তো আপনি ইসলাম গ্রহণ করবেন, আপনাকে মুসলমান বলা যাবে। আপনি ঈমান আনবেন, আপনাকে মুমিন বলা যাবে। তাহলে কুফুরি করলে কাফের বলা যাবেনা? কি হাস্যকর লজিক! এটা কেমন হাস্যকর লজিক!! কুফুরি / কাফের শুনতে যদি কষ্ট লাগে, তাহলে কুফুরি করেন কেন? কুফুরি ছেড়ে দাও, তওবা করো, ইসলাম গ্রহণ কর। তোমাকে কেউ কাফের বলবেনা। তুমি ইসলামের কাজ করবানা, কুফুরি করবা, আবার মুসলিম নামডাক শুনবা, এত লোল পরে কেন?

আবু মুহাম্মদ রহমানী (হাফিজাহুল্লাহ)।

নবীর শ্রেষ্ঠ গুণ সততা

‘সততা’ ও ‘বিশ্বস্ততা’ নবীর শ্রেষ্ঠ গুণ,

‘আ কুন্তুম মুসাদ্দিকিয়্যা?’ বাক্যের এ খন্ডাংশটি একটি বিখ্যাত হাদীসের অংশ এবং এটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম সহ অন্যান্য প্রামাণিক হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এটি নবুওয়াতের প্রাথমিক যুগে নবী মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক মক্কার সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে কুরাইশদের প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার ঘটনার অংশ।

হাদীসের প্রাসঙ্গিক অংশ ও বাংলা অনুবাদ :

হাদীসের মূল বার্তা হলো, শেষনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর নবুওয়াতের সত্যতা ও বিশ্বস্ততা প্রমাণ করার জন্য এই উপমাটি ব্যবহার করেছিলেন। তিনি ইরশাদ করেছিলেন,

أرَأَيْتَكُمْ لو أخْبَرْتُكُمْ أنَّ خَيْلًا بالوَادِي تُرِيدُ أنْ تُغِيرَ علَيْكُم؛ أكُنْتُمْ مُصَدِّقِيَّ؟ قالوا: نَعَمْ، ما جَرَّبْنَا عَلَيْكَ إلَّا صِدْقًا، قالَ: فإنِّي نَذِيرٌ لَكُمْ بيْنَ يَدَيْ عَذَابٍ شَدِيدٍ

অনুবাদ, “তোমরা কি মনে করো, যদি আমি তোমাদের জানাই যে, এই উপত্যকার ওপার থেকে একদল অশ্বারোহী (শত্রু) তোমাদের আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছে, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে? উত্তরে উপস্থিত সবাই বলেছিল, “হ্যাঁ, আমরা আপনাকে বিশ্বাস করব, কারণ আমরা আপনাকে সবসময় সত্যবাদী হিসেবেই পেয়েছি” (অন্য বর্ণনায়, “আমরা আপনার কাছ থেকে কখনও মিথ্যা শুনিনি”)। এরপর তিনি বলেছিলেন, “তবে আমি তোমাদের আসন্ন কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করছি”। (সহীহ বুখারী, ইবনে আব্বাস থেকে)।

এই হাদীসের তাৎপর্য হচ্ছে, এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্ব থেকেই মক্কার লোকেরা, এমনকি তাঁর কট্টর বিরোধীরাও শেষনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সর্বোচ্চ বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী (আল-আমিন) হিসেবে গণ্য করত।

দাওয়াতের পদ্ধতি : তিনি তাদের বিশ্বাস ও আস্থার মানদণ্ড ব্যবহার করে ইসলামের মৌলিক বার্তা – তাওহীদ (একত্ববাদ) এবং আখিরাতের শাস্তি সম্পর্কে সতর্কবাণী পেশ করেছিলেন। আল্লাহ্‌র নির্দেশে (সূরা শু’আরা, ২৬:২১৪) গোপনে দাওয়াতের পরিবর্তে প্রকাশ্যে দাওয়াত শুরু করার এটি ছিল প্রথম ধাপ। এই হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মতো হাদীস গ্রন্থে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।

হাদীসটি হতে বুঝা গেল, নবীর সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ গুণ সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। যদি কেউ সততা এবং নির্ভরযোগ্যতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হয় তাহলে তার বিষয়টি সেখানেই সমাপ্ত। সামনে আর বাড়তে দেয়া যাবেনা। কারণ কোনো মিথ্যাবাদী নবুওয়ত ও রেসালত দাবী করার যোগ্যতাই রাখেনা। সুতরাং, আল্লাহর রাসূল (সা.) এর জীবন তথা সীরাত থেকেই আমাদের সবক নিতে হবে।

বলাবাহুল্য যে, ভারতীয় বংশোদ্ভূত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী সহ ইতিপূর্বে যতজনই নবী রাসূল দাবী করেছিল তাদের জীবন-দর্শন থেকে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেছে যে, তারা প্রত্যেকে ছিল চরম মিথ্যাবাদী ও ধোকাবাজ। সুতরাং তারা প্রত্যেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার জন্য তাদের ঐ নেতিবাচক ক্যারেক্টারই যথেষ্ট।

মির্যা কাদিয়ানী নিজেকে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ হওয়ার দাবী করার প্রমাণ তারই ‘একটি ভুল সংশোধন’ পুস্তক থেকে নিম্নরূপ,

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী এম এ

কাদিয়ানীদের বয়ানের উপর পালটা বয়ান তৈরি

কাদিয়ানীদের প্রতি এবার এ বয়ানটিও ছুড়ে দিন,

((বয়ান-৩))

মির্যা কাদিয়ানীর বইতেও ঈসা মসীহের পুনরায় আগমনের বয়ান,

সে লিখেছে, “এই আয়াতে (অর্থাৎ সূরা তওবাহ আয়াত নং ৩৩) ইঙ্গিত রয়েছে যে, ঈসা মসীহ সশরীরে ও রাজনৈতিক দর্পণে পৃথিবীতে পুনরায় আসবেন।”

মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর রচিত ‘বারাহীনে আহমদীয়া’ চতুর্থ খন্ড; কাদিয়ানীর রচনাসমগ্র ২৩ খন্ডে প্রকাশিত- রূহানী খাযায়েন ১/৫৯৩

এখন কাদিয়ানীদের প্রশ্ন করতে চাই, যার সশরীরে পুনরায় আগমনী ইঙ্গিত কুরআনেই রয়েছে, সে কুরআনই তাঁকে মৃত সাব্যস্ত করে কিভাবে? প্রামাণ্য স্ক্যানকপি নিম্নরূপ,

কাদিয়ানী বয়ানের উপর পালটা বয়ান তৈরি

কাদিয়ানীদের প্রতি “বয়ান” ছুড়ে দিন এভাবে যে,

((বয়ান-২))

মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী তার বইতে লিখেছে, ঈসা (আ.) একজন শরাবী (মদখোর) ছিল, পতিতা মহিলাদের সাথে তার দহরম মহরম সম্পর্ক ছিল! নাউযুবিল্লাহ। (রেফারেন্স সহ পোস্টের নিচে দীর্ঘ-বাক্যে দেখুন)।

বলে রাখা জরুরি যে, ঈসা (আ.) সম্পর্কে উল্লিখিত উক্তিগুলি তার নিজের বিশ্বাসের জায়গা থেকেই ছিল। এটি শুধুমাত্র খ্রিস্টানদের খন্ডনে পালটা জবাবি তথা ‘ইলজামি জবাব’ রূপে ছিল, এ কথা মোটেও ঠিক না। যদিও কোনো কোনো কাদিয়ানী মতের অনুসারী মির্যা কাদিয়ানীর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে এমনটা প্রতিউত্তর করার চেষ্টা করে থাকে।

তাই কাদিয়ানী মতের অনুসারীদের প্রতি আমার চ্যালেঞ্জ রইল, ঈসা (আ.) সম্পর্কে মির্যা কাদিয়ানী নিজ বিশ্বাসের জায়গা থেকে উপরে উল্লিখিত যে আপত্তিকর উক্তি নিজ বইতে লিখে গেছে তা সঠিক এবং বাস্তব প্রমাণ করে দেখান। যদি তা কুরআন হাদীসের আলোকে সঠিক এবং বাস্তব প্রমাণ করে দেখাতে পারেন, তাহলে আমরা মির্যা কাদিয়ানীকে সত্য বলেই মেনে নেব।

আর যদি তা প্রমাণ করতে না পারেন, তাহলে নির্দ্বিধায় আপনারাও মেনে নিতে বাধ্য থাকবেন যে, মির্যা কাদিয়ানী একজন চরম মিথ্যাবাদী ছিল। আর আল্লাহ তায়ালা কোনো মিথ্যাবাদীকে “নবী” তো দূরের কথা; সাধারণ একজন ওলী-আউলিয়াও বানাবেন না, এটাই চূড়ান্ত কথা।

দীর্ঘ-বাক্যে সম্পূর্ণ উদ্ধৃতি :

  • মির্যা কাদিয়ানী লিখেছে, “ইউরোপের লোকদের মদ এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার কারণ হল, হযরত ঈসা (আ.) মদ পান করত। তা কোন রোগের কারণে বা পুরাতন অভ্যাস থাকার কারণে।” (কিশতিয়ে নূহ পৃষ্ঠা ৮৫ বাংলা অনূদিত, রূহানী খাযায়েন ১৯:৭১)।

আচ্ছা পাঠকবৃন্দ, ঈসা (আ.) সম্পর্কে উল্লিখিত উক্তিটি যার সে একই সাথে ঈসা (আ.)-এর মদ পান করার “কারণ”ও কিন্তু নিজ জবানে বলে দেয়ার পরেও ব্যাপারটি সম্পূর্ণরূপে তার নিজের বিশ্বাসের জায়গা থেকেই নয়, একথা কিভাবে বলা যায়??

  • মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী উলামায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে রচিত তার ‘দাফেউল বালা’ নামক বইতে লিখেছে, ‘‘মাসীহের সততা তার সময়কার অন্যান্য সৎ লোকের চেয়ে বেশি বলে প্রমাণিত হয় না; বরং তার চেয়ে ইয়াহইয়া নবীর মর্যাদা এক গুণ বেশি। কেননা, সে মদপান করত না এবং কোনো ব্যভিচারিণী নারী নিজের ব্যভিচার থেকে উপার্জিত অর্থ দ্বারা সুগন্ধি ক্রয় করে তার মাথায় মালিশ করেছে এমন কোনো কথা তার ব্যাপারে শোনা যায়নি। অথবা এমনও জানা যায়নি যে, এরূপ কোনো নারী নিজের হাত বা মাথার চুল দ্বারা তার শরীর স্পর্শ করেছিল অথবা কোনো আনাত্মীয় যুবতী নারী তার সেবা করত। এ কারণে আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইয়াহইয়াকে হাসূর (নারী বিরাগী) বলেছেন। কিন্তু মাসীহের এ নামকরণ করা হয়নি। কেননা, উক্তরূপ ঘটনাবলী এরূপ নামকরণের অন্তরায় ছিল।’’ (দাফেউল বালা [উর্দূ] হতে অনুবাদ, মির্যা কাদিয়ানী)।

গোলাম আহমদ কায়িদানীর উক্ত রচনায় হযরত মাসীহ ইবনে মরিয়ম (আ.)-এর প্রতি কয়েকটি অপবাদ পরিদৃষ্ট হয়। (১) তিনি মদ পান করতেন। (২) তিনি ব্যভিচারিণী নারীদের অবৈধ পন্থায় উপার্জিত অর্থ দ্বারা ক্রয়কৃত সুগন্ধি মাথায় লাগাতেন এবং তাদের হাত ও চুল দ্বারা নিজের শরীর স্পর্শ করাতেন। (৩) অনাত্মীয় যুবতী নারীদের থেকে সেবা নিতেন।

অথচ হযরত মসীহ ইবনে মরিয়ম (আ.)-এর মত একজন মহান নবীর প্রতি এসব অশ্লীল ও কদর্য অপবাদ আরোপ করার পর সে এ রায়ও দিয়েছে যে, এসব ঘটনার কারণেই আল্লাহ তাআলা তাকে পবিত্র কুরআনে ‘হাসূর’ (নারী বিরাগী) বিশেষণ দ্বারা বিশেষায়িত করেননি। এতে দৃঢ়ভাবে সাব্যস্ত হচ্ছে যে, উক্ত মানহানিকর কথাগুলো ‘ইলজামি জবাব’ হিসেবে ছিলনা, বরং তার নিজেস্ব বিশ্বাসের জায়গা থেকেই ছিল।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

কাদিয়ানী বয়ানের উপর পালটা বয়ান তৈরি

কাদিয়ানী বয়ানের উপর পালটা কিছু বয়ান

((বয়ান-১))

আপনি যখনি কাদিয়ানীদের সাথে কথা বলবেন তারা তখনি আপনার প্রতি যে বয়ানটি ছুড়ে দেবে সেটি হচ্ছে, কুরআন থেকে ঈসা (আ.)-কে জীবিত প্রমাণ করে দিন। প্রমাণ করতে পারলে আমরা কাদিয়ানীয়ত ছেড়ে দেব। ধারণা করা হয় যে, কাদিয়ানীদের সো-কল্ড চতুর্থ খলীফা মির্যা তাহের আহমদই এ বয়ানের প্রবর্তক ছিল। তার আগে কাদিয়ানীদের বয়ান ছিল, ইস্তিখারা করে আল্লাহর কাছ থেকে সমাধান চেয়ে নিন। তিনিই উত্তম সমাধানকারী। বর্তমানেও মাঝেমধ্যে তাদের অনেককে পুরনো এ বয়ানের পেছনে ছুটতে দেখা যায়। আসুন, এবার তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের পালটা কিছু বয়ান এখানে উত্থাপন করছি। আমাদের বয়ানগুলো এই যে,

(১) নবুওয়তের দাবীদার গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে শুধুমাত্র একজন ‘সত্যবাদী’ ও ‘আমানতদার’ সাব্যস্ত করে দেখান। তাহলে আর কিছুই করতে হবেনা। আমরা তার সততা আর যোগ্যতার ভিত্তিতেই তার নবুওয়ত দাবীর বৈধতা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) এর শিক্ষার আলোকে যাচাই করে দেখব। যদি সে নবী হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে যায় তাহলে সে ঈসা (আ.) সম্পর্কে যা যা লিখে গেছে আমরা তার সবকিছু বিনাবাক্যে মেনে নেব। তাই আসুন, আপনারা গোলাম আহমদ ইবনে চেরাগবিবিকে শুধুমাত্র একজন ‘সত্যবাদী’ ও ‘আমানতদার’ সাব্যস্ত করতে সংলাপে বসুন। আমরা তার বইপুস্তক থেকে তাকে চরম মিথ্যাবাদী এবং ধোকাবাজ সাব্যস্ত করব আর আপনারা সেগুলো খন্ডন করে তাকে ন্যূনতম একজন সত্যবাদী সাব্যস্ত করে দেখাবেন।

(২) আপনারা কথায় কথায় ঈসা (আ.) এর বাঁচা-মরা প্রসঙ্গ টেনে আনেন, যা আপনাদের শেষনবী গোলাম আহমদ ইবনে চেরাগবিবির শিক্ষারই বিপরীত। কেননা গোলাম আহমদ ইবনে চেরাগবিবি ‘দাফেউল বালা’ বইতে লিখে গেছে, “ঈসা ইবনে মরিয়মের আলোচনা বাদ দাও, তার চাইতে উত্তম গোলাম আহমদ কাদিয়ানী”। দেখুন, সে ঈসা (আ.) এর আলোচনা বাদ দিতে বলছে আর আপনারা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর শিক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে ঈসা (আ.) এর আলোচনা টেনে আনছেন! এটা আপনাদের কেমন লজিক! তাহলে সর্বপ্রথম মির্যাকে ত্যাগ করুন!

(৩) ঈসা (আ.)-কে কুরআন দ্বারা জীবিত প্রমাণ করতে বলছেন। আরে ভাই, মির্যা গোলাম আহমদ ইবনে চেরাগবিবি তো নিজেই ১৮৮৪ সালে তার ‘বারাহীনে আহমদীয়া’ (৪র্থ খন্ড) গ্রন্থে পবিত্র কুরআনের সূরা তওবাহ, আয়াত নম্বর ৩৩ (هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ) দ্বারা দলীল দিয়ে লিখে গেছে যে, এই আয়াতে ইংগিতে একখানা ভবিষ্যৎবাণী রয়েছে যে, মসীহ (ঈসা) এই পৃথিবীতে সশরীরে (جسمانى) এবং রাজনৈতিক দর্পনেই (سياست ملكى) পুনরায় আসবেন।

বারাহীনে আহমদীয়া গ্রন্থে গোলাম আহমদ ইবনে চেরাগবিবির লিখাটি এইরূপ,

اور فرقانی اشارہ اس آیات میں ہیں : هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ یہ آیات جسمانی اور سیاست ملکی کے طور پر حضرت مسیح کی حق میں پیشگوئی ہیں اور جس غلبہ کاملہ دین اسلام کا وعدہ دیا گیا ہے وہ غلبہ مسیح کے ذریعہ سے ظہور میں آئے گا اور جب حضرت مسیح علیہ السلام دوبارہ اس دنیا میں تشریف لائیں گے تو ان کے ہاتھ سے دین اسلام جمیع آفاق اور اقطار میں پھیل جائے گا لیکن اس عاجز پر ظاہر کیا گیا ہے کہ یہ خاکسار اپنی غربت اور انکسار اور توکل اور ایثار اور آیات اور انوار کے رو سے مسیح کی پہلی زندگی کا نمونہ ہے اور اس عاجز کی فطرت اور مسیح کی فطرت باہم نہایت ہی متشابہ واقع ہوئی ہے گو ایک ہی جوہر کے دو ٹکرے یا ایک ہی درخت کے دو پہل ہیں۔ براہین احمدیہ حصہ چہارم ؛ روحانی خزائن ۱:۵۹۳

(অর্থ-…..) ঐশী ইংগিত এই আয়াতগুলিতে রয়েছে যে, “তিনিই তাঁর রাসূলকে হেদায়েত এবং সত্য ধর্ম সহকারে প্রেরণ করেছেন, যাতে এটিকে সকল ধর্মের উপর প্রকাশ করা যায়, যদিও মুশরিকরা এটিকে অপছন্দ করে।” এই আয়াতগুলি শারীরিক এবং রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই মসীহের পক্ষে একটি ভবিষ্যদ্বাণী। আর ইসলাম ধর্মের পরিপূর্ণ বিজয় প্রতিশ্রুত মসীহের বিজয়ের মাধ্যমেই প্রকাশিত হবে। আর হযরত মসীহ (ঈসা) দুনিয়ার বুকে আবার যখন আসবেন তখন তাঁর হাত ধরেই ইসলাম ধর্ম পৃথিবীর সকল প্রান্তে এবং সকল দেশে ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু এই অধমের নিকট এটা প্রকাশ পেয়েছে যে, এই অধম মানুষটি তার দারিদ্র্য, নম্রতা, আস্থা, ত্যাগ, নিদর্শন এবং নূর সমূহের মাধ্যমে মসীহের প্রথম জীবনেরই একটি নমুনা। আর এই নম্র মানুষের স্বভাব এবং মসীহের স্বভাব খুবই মিল, যেন তারা একই সত্তার দুটি টুকরো অথবা একই গাছের দুটি শাখা। (বারাহীনে আহমদীয়া, ৪র্থ খন্ড, রূহানী খাযায়েন : ৩/৫৯৩)।

এখন কথা হল, আপনারা কুরআন থেকে যে জিনিসটা সাব্যস্ত করতে বলছেন সেটা তো আপনাদের সো-কল্ড মসীহ গোলাম আহমদ ইবনে চেরাগবিবি অনেক আগেই করে দিয়ে গেছেন। তাহলে এখন আবার নতুন করে কী প্রমাণ করার কথা বলছেন? আসুন, যেটা প্রমাণ করতে বলছেন সেটা যখন প্রমাণ হয়েই আছে তখন আমরা আপনাদের নিকট জানতে চাইব যে, গোলাম আহমদ কাদিয়ানী “ইবনে চেরাগবিবি” থেকে কিভাবে “ঈসা ইবনে মরিয়ম” হলেন?

(৪) আপনি বললেন, ঈসা (আ.)-কে কুরআন থেকে জীবিত প্রমাণ করে দিতে। আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি তর্কের খাতিরে আপনার সাথে একমত হলাম যে, ঈসা (আ.) বেঁচে নেই। এখন আপনি আমাকে বলুন, ঈসা (আ.) বাঁচা-মরার সাথে গোলাম আহমদ ইবনে চেরাগবিবির “ঈসা” দাবী করার কী সম্পর্ক? সে কিভাবে ঈসা ইবনে মরিয়ম হল? ইতিপূর্বে তো বাহাউল্লাহ ইরানীও নিজেকে ঈসা দাবী করেছে। কাজেই কেউ ঈসা দাবী করলেই যদি সত্যিকার অর্থে সে ঈসা হয়ে যেত তাহলে তো বাহাউল্লাহ ইরানীকেও “ঈসা মসীহ” মানতে হবে!

(৫) ঈসা (আ.) যদি আপনাদের বিশ্বাসমতে মৃত্যুবরণ করে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন হল বর্তমানে ঈসা মসীহ (আ.) এর সমাধি তথা কবর কোথায়? আসুন দেখা যাক গোলাম আহমদ ইবনে চেরাগবিবির রচনাবলীতে ঈসা মসীহ (আ.) এর কবরের সন্ধান কিভাবে দেয়া হয়েছে!

সে এক জায়গায় লিখেছে,

اور کیا تعجب کہ حضرت مسیح کی قبر کشمیر یا اس کے نواح میں ہو

অর্থাৎ কি যে আশ্চর্যের ব্যাপার যে, হযরত মসীহ’র কবর কাশ্মীর অথবা তার আশপাশে (তিব্বতে) অবস্থিত। (রূহানী খাযায়েন খণ্ড ১০ পৃষ্ঠা নং ৩০২)।

এতে বুঝা গেল, সে নিজেও কনফিউশানে ছিল। সে তিব্বতে নাকি কাশ্মীরে, কোনটা বলবে নিজেও ঠিক পায়নি।

সে আরেক জায়গায় লিখেছে,

یہ تو سچ ہے کہ مسیح اپنے وطن گلیل میں جا کر فوت ہو گیا ۔ لیکن یہ ہرگز سچ نہیں کہ وہی جسم جو دفن ہو چکا تھا پھر زندہ ہو گیا۔

‘সত্য তো এটাই যে, মসীহ (ঈসা) আপনা মাতৃভুমি গ্যালীলে (সিরিয়া) গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু তাঁর ঐ দেহ যেটি (সেখানে) দাফন হয়েছিল তা আবার জীবিত হয়ে যাওয়া একদমই সত্য নয়।’ (ইযালায়ে আওহাম ২য় খন্ড, রূহানী খাযায়েন: ৩/৩৫৩; রচনাকাল ১৮৯১ইং)।

সে আরেক জায়গায় লিখেছে,

حضرت عیسی علیہ السلام بیت اللحم میں پیدا ہوئے اور بیت اللحم اور بلدہ قدس میں تین کوس کا فاصلہ ہے اور حضرت عیسی علیہ السلام کے قبر بلدہ قدس میں ہیں اور اپ تک موجود ہیں اور اس پر ایک گرجا بنا ہوا ہے اور وہ گرجا تمام گرجاؤں سے بڑا ہیں اور اس کے اندر حضرت عیسی کی قبر ہے اور اسی گرجا میں حضرت مریم صدیقہ کی قبر ہے اور دونوں قبرین علیحدہ علیحدہ ہیں۔ اتمام الحجہ روحانی خزائن ۸: ۲۹۹

অর্থাৎ…. হযরত ঈসা (আ.) এর কবর ‘ফিলিস্তিন’ এর বায়তুল মোকাদ্দাসের আঙ্গিনায়। (দেখুন, ইতমামুল হুজ্জাত, রূহানী খাযায়েন খণ্ড নং ৮ পৃষ্ঠা নং ২৯৯ [টিকা দ্রষ্টব্য])।

এখন প্রশ্ন হল, ঈসা (আ.) গোলাম আহমদ ইবনে চেরাগবিবির দাবীমতে মৃত্যুবরণ করার বিশ্বাস সঠিক হলে, তখন ঈসা (আ.) এর কবর সম্পর্কে সে যা যা লিখে গেছে সবগুলোকে সঠিক বলতে হবে। এখন আপনারা কি ঈসা (আ.) এর কবর ‘বায়তুল মোকাদ্দাসের আঙ্গিনায়, সিরিয়ার গ্যালিল জনপদে, তিব্বত এলাকায় কিংবা কাশ্মীরের শ্রীনগরে’ অর্থাৎ একসাথে সবখানে মানেন? হাস্যকর!

(৬) আপনারা গোলাম আহমদ ইবনে চেরাগবিবিকে ‘নবী’ মানেন, কিন্তু কিসের ভিত্তিতে তা মানেন সেটা ক্লিয়ার করেন না। কখনো বলেন, শেষ যামানায় ঈসা মসীহ আসবেন আর হাদীসে তাঁকে চার-চার বার نبى الله عيسى (আল্লাহর নবী ঈসা) অর্থাৎ “নবী” শব্দে সম্বোধন করা হয়েছে। গোলাম আহমদ ইবনে চেরাগবিবি নিজেকে ঐ ঈসা মসীহ দাবী করায় নাকি আপনারা তাকে নবী মানেন! আবার কখনো সূরা নিসার ৬৯ নম্বর আয়াতের من النبيين و الصديقين দ্বারাও আনুগত্যরূপে নবী হওয়া যায় বলে তাকে ‘নবী’ আখ্যা দেন। আবার দেখা যায় যে, সূরা জুমা’র وآخرين منهم لما يلحقوبهم দ্বারাও ব্যাখ্যা দেন এ বলে যে, এ আয়াতে শেষ যামানায় মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহ নাকি জীবিত করে দুনিয়ায় আরেকবার পাঠানোর কথা বুঝিয়েছেন (নাউজুবিল্লাহ), সে হিসেবে নাকি গোলাম আহমদ ইবনে চেরাগবিবিকে আপনারা ‘নবী’ এমনকি মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ-ও মানেন! এমনিভাবে তার ‘মালফুযাত’ গ্রন্থে লিখা আছে যে, আল্লাহ তায়ালা তার সাথে অধিক পরিমাণে বাক্যালাপ করেছেন এবং তার অগণিত ভবিষ্যৎবাণী প্রতিফলিত হয়েছে। এমন ব্যক্তিও নাকি তার মতানুসারে ‘নবী’ নাম প্রাপ্ত হন। মির্যা কাদিয়ানী সে হিসেবেই একজন নবী (নাউযুবিল্লাহ)। আমার জানা নেই যে, আসলে এখানে আপনাদের শেষ কথাটা কী!

সে যাইহোক; তাকে যে দিক থেকেই হোক ‘নবী’ মানেন এটি যখন সাব্যস্ত হয়ে গেল, তখন আপনাদের একখানা প্রশ্ন করা উচিত বলে মনে করছি তা হচ্ছে,

আপনারা মৃত্যুর পর কবরের ফেরেশতার و من نبيك অর্থাৎ তোমার নবী কে? প্রশ্নের উত্তরে কার নাম বলবেন? গোলাম আহমদ ইবনে চেরাগবিবির নাম বলবেন? নাকি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম বলবেন? যেহেতু গোলাম আহমদ নিজেকে শেষনবী হওয়ার দাবীও করেছে, (দেখুন, তাযকিরাতুশ শাহাদাতাই-৮২ বাংলা অনূদিত) সেহেতু তাকে ছাড়া আপনারা দ্বিতীয় কারো নাম ফেরেশতার প্রশ্নের উত্তরে উত্থাপন করতে পারেন না।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক
প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী এম.এ

কাদিয়ানী খলীফাদের নানা বয়সী ছবির দৃশ্যাবলি

কাদিয়ানীদের তথাকথিত খলীফাদের শিশু, কিশোর, তরুণ ও মধ্যবয়সী সহ নানা সময়ের বৈচিত্র্যময় ফটো।

মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ। মাহমুদ আহমদ মোট ৭টি বিবাহ করেছিলেন। তারা হলেন, মাহমুদা বেগম, আমতুল হাই, সৈয়দা মরিয়ম নিসা বেগম, সারা বেগম, আজিজা বেগম, মরিয়ম সিদ্দিকা, বুশরা বেগম। এই স্ত্রীদের থেকে তাঁর মোট আঠাশজন সন্তান ছিল, যাদের মধ্যে পাঁচজন শৈশবেই মারা যান। ১৯১৪ সালে হেকিম নূর উদ্দিনের মেয়ে আমতুল হাইকে বিয়ে করেন। কিন্তু পরবর্তীতে সাংসারিক বিবাদে জড়িয়ে তিনি তাকে বিষ পানে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার পুত্র মির্যা নাসের আহমেদ এর মৃত্যুর পর তার আরেক পুত্র মির্যা রফি আহমেদ তাদের জামাতের খলীফা হবার দাবী করেন। পরে তিনি খলীফা না হতে পেরে ‘গ্রীন আহমদীয়ত’ নামে নতুন জামাত প্রতিষ্ঠা করেন।
মির্যা মাসরূর আহমেদ (৫ম খলীফা অফ কাদিয়ানী)। তার মাতার নাম সাহেবজাদী নাসেরা বেগম, যিনি কাদিয়ানী তথা আহমদীয়া সম্প্রদায়ের সো-কল্ড দ্বিতীয় খলিফা মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদের পুত্র মির্যা মনসুর আহমদের স্ত্রী। সে হিসেবে মির্যা মাসরূর আহমেদ হচ্ছেন, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর বংশধর এবং তারই পৌত্র।
মির্যা মাসরূর আহমেদ
মির্যা মাসরূর আহমেদের সাথে বাংলাদেশি কতিপয় কাদিয়ানী মিশনারীর লন্ডনে সাক্ষাৎকার।
মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ এর দ্বিতীয় সংসার মরিয়ম বেগমের গর্ভে জন্মগ্রহণকারী মির্যা তাহের আহমদ (চতুর্থ খলীফা অফ কাদিয়ানী)। তার কবর লন্ডনের টিলফোর্ড শহরে অবস্থিত।
মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ এর প্রথম সংসার মাহমুদা বেগমের গর্ভে জন্মগ্রহণকারী মির্যা নাসের আহমেদ, (তৃতীয় খলীফা অফ কাদিয়ানী), তার সময়ে এবং তারই উপস্থিতিতে পাক ভুট্টো সরকারের আমলে ১৯৭৪ সালের ৭ ই অক্টোবর কাদিয়ানীদের উভয় অংশের ধর্মবিশ্বাসের উপর প্রায় ১৩ দিন ব্যাপী দ্বিপাক্ষিক বাহাস শেষে পাক আইন সভায় সর্বদলীয় ও সম্মিলিত সিদ্ধান্তক্রমে ‘অমুসলিম’ সংখ্যালঘু বলিয়া শুনানি করে। তার পর থেকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদের জন্য মুসলিম পরিচয় দেয়া, ইসলামি পরিভাষা সমূহ ব্যবহার করা এবং হজ্জের জন্য ভিসার আবেদন করা ইত্যাদির উপর সাংবিধানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এ রায়ের পর থেকে তারা পাকিস্তান থেকে তাদের সদরদপ্তর ইংল্যান্ডে গুটিয়ে নেয়।
মির্যা নাসের আহমেদ এর পাশে কাদিয়ানীদের প্রধান মুনাজির জালাল উদ্দীন শামস দাঁড়িয়ে আছেন।
মুলহিদ আব্দুল লতিফ, আফগান সরকারের আমীর হাবীবুল্লাহ খানের নির্দেশে ১৯০৩ সালে তার বিরুদ্ধে মির্যা কাদিয়ানীর সাথে তার যোগসংযোগ প্রমাণিত হলে এবং ইসলাম ত্যাগ করে কাদিয়ানী হওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত ব্লাসফেমি আইন অনুসারে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।
যিকরে হাবীব (প্রিয়বন্ধুর আলোচনা) বইয়ের লিখক, মোহাম্মদ সাদিক। মির্যা কাদিয়ানীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে প্রসিদ্ধ। ১৯১৩ সালে বিবাড়ীয়া সদর জেলার কান্দিপাড়া গ্রামে তৎকালীন একই গ্রামের স্থানীয় পীর আব্দুল ওয়াহিদকে আমীর বানিয়ে প্রথম বঙ্গীয় আহমদীয়া জামাত আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে। উক্ত অনুষ্ঠানে ভারতের কাদিয়ান থেকে আগত প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্ব দেন মোহাম্মদ সাদিক। তিনিই উক্ত অনুষ্ঠানের সভাপতিত্বের ভুমিকা রাখেন।

কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা কতটুকু সম্ভব?

কাদিয়ানীদেরকে রাষ্ট্রীয় ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা কতটুকু সম্ভব তা নির্ভর করবে এন্টি কাদিয়ানী মুভমেন্ট কাদিয়ানীদের মুকাবিলায় কতটুকু শক্তিশালী তার উপর। কাদিয়ানীরা একতা, সাহসিকতা, কাঠামোগত, একাডেমিক এবং কর্মতৎপরতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যতটা অগ্রগামী, তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি অগ্রগামী থাকা জরুরি এন্টি কাদিয়ানী মুভমেন্টের জন্য।

কাদিয়ানীদের রয়েছে শিশু, যুবক, বয়স্ক এবং মহিলা কর্মী বাহিনী। এদের প্রত্যেকের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালার ব্যবস্থাও থাকে। ৭ থেকে ১৫ বছরের ছেলে শিশু কর্মীদের বলা হয় আতফাল, আর মেয়ে শিশু কর্মীদের বলা হয় নাসেরাহ (১৯৩৮ ইং)। ১৫ থেকে ৪০ বছরের যুবকদের কর্মী বাহিনীকে বলা হয় খুদ্দাম (১৯৩৮ ইং) আর মহিলা কর্মীদের বলা হয় লাজনা (১৯২২ ইং) আর চল্লিশ বছরের বেশি বয়স্কদের বলা হয় আনসার (১৯৪০ ইং)। মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ কর্তৃক উল্লিখিত সহায়ক সংগঠনগুলো প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

এদের প্রত্যেকের কার্যক্রমগুলো স্ব স্ব অবস্থান থেকে পৃথকভাবে পরিচালিত হয়। প্রত্যেককে নিজ নিজ কার্যক্রমের উপর রিপোর্ট জমা দিতে হয়। প্রত্যেকটি কর্মী সদস্যের সাপ্তাহিক, পাক্ষিক এবং মাসিক কার্যক্রমের উপর মূল্যায়নধর্মী আলাদা ম্যাগাজিন, বুলেটিন প্রকাশ করা হয়। যারা কৃতিত্বের সাক্ষর রাখতে পারেন তাদেরকে কেন্দ্র থেকে বিশেষ সম্মাননা সহ পুরষ্কৃত করা হয়।

এদের ভি টিম হিসেবে যত শাখাপ্রশাখাই থাকুক না কেন, প্রত্যেকেই কেন্দ্রীয়ভাবে অভিন্ন নির্দেশনার মধ্য দিয়েই পরিচালিত হয় এবং সুনির্দিষ্ট টার্গেটেই এগিয়ে যায়।

এদের পুরো সত্তাটাই নির্দিষ্ট একটি কাঠামোর উপর দন্ডায়মান। হাইকমান্ড থেকে যখন যা নির্দেশ আসে তারা তা সুশৃঙ্খলভাবেই তা আঞ্জাম দিয়ে থাকে। তাদের প্রত্যেকটি কাজের জন্য পৃথকভাবে যোগ্য ও অভিজ্ঞ দায়িত্বশীল রয়েছেন। তারা হোম ওয়ার্ক ছাড়া কোনো কাজ করেন না। ফলে তাদের কর্মপদ্ধতি থাকে নিখুঁত। অবশ্যই তাদের কাজ গুলো প্রফেশনালি কর্মীদের মাধ্যমেও আঞ্জাম দেয়া হয়। তাদের প্রতিটি বিভাগ প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনী দ্বারা যেমন পরিচালিত, তেমনি সবাই হাইকমান্ডের নিকট জবাবদিহিতার আওতাভুক্ত।

তাদের নিজেস্ব অভিজ্ঞ ব্যক্তি বিশেষ দ্বারা আইটি সেক্টর পরিচালিত। তাদের রয়েছে একাধিক একাডেমিক ওয়েবসাইট। যেখানে তাদের গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলো সহ গোলাম আহমদ কাদিয়ানী আর তার সো-কল্ড খলীফাদের রচিত বইগুলোর পিডিএফ পাওয়া যায়। তাদের ওয়েব সাইট গুলোতে আরবি, উর্দু এবং বাংলা সহ সব ধরনের বই, ম্যাগাজিন, বুলেটিন, লিফলেট আপলোড থাকে। তারা তাদের বিরোধীদের সমালোচনার উপর খন্ডনমূলক আর্টিকেলও রেখে দিয়েছে।

এ তো গত ১৫ ই নভেম্বর ২০২৫ এর ঢাকা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে খতমে নবুওয়ত সম্মেলনের বক্তাদের বক্তব্যগুলোর উপর তারা তাদের পালটা জবাবি ভিডিও প্রকাশ করেছে। যা স্যোসাল মিডিয়ায় পাওয়া যায়। তারা কতটা পূর্ব থেকে সুপরিকল্পিত প্লানিং নিয়ে অগ্রসরমান তা তাদের কাজের ধরণ দেখেই বুঝা যায়।

কাজেই কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা করানোর সক্ষমতা তাদের বিরোধী পক্ষের কতটুকু আছে বা নেই তা পুরোপুরি নির্ভর করছে বিরোধী পক্ষের কার্যক্রমের টোটাল কাঠামোটা কী রকম! কাদিয়ানীদের সমপর্যায়ের? নাকি তার চেয়েও কম কিংবা বেশি?

খতমে নবুওয়ত এর ব্যানারে যারা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করতে চাই যে,

১। সারা দেশে কাদিয়ানী আস্তানাগুলোতে কি আপনাদের পদচারণা রয়েছে? কাদিয়ানী মতবাদ যারা গ্রহণ করেছেন তারাও তো ইতিপূর্বে আমাদেরই ভাই বোন ছিলেন। তারা কিজন্য ভুল পথে গেলেন? তারা কি বুঝেশুনে কাদিয়ানী হন নাকি টাকা পয়সার লোভে বা আবেগে কাদিয়ানী হন? কোনো কারণ তো অবশ্যই আছে, তাই নয় কি? একটু ভেবে দেখেছেন?

২। কাদিয়ানীদের দাওয়াতি কর্মপন্থা কী? তারা সাধারণ মানুষকে কেমন বয়ান দ্বারা বুঝায় বা দাওয়াত দেয়? আপনারা কি সে বয়ানগুলো নোট করেছেন? সেসব বয়ানের বিপরীতে আপনারা কি আরও শক্তিশালী কোনো বয়ান তৈরি করতে পেরেছেন? আপনারা কি সেই শক্তিশালী বয়ানের উপর তারবিয়ত তথা প্রশিক্ষণ কর্মশালার ব্যবস্থা করেছেন? কিছু দাঈ তৈরি করে আক্রান্ত এলাকাগুলোয় দাওয়াতি কাজের কোনো উদ্যোগ নিতে পেরেছেন?

৩। কাদিয়ানীদের মত আপনাদের সুনির্দিষ্ট কোনো দক্ষ, যোগ্য, প্রশিক্ষিত, সাহসী এবং কর্মঠ কোনো লিডারশীপ কি আছেন যার সিদ্ধান্তকে সবাই সুপ্রিম সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন? অন্যথা আপনাদের সাপ্তাহিক, পাক্ষিক এবং মাসিক কার্যক্রমগুলো কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে? দাঈদের কার্যক্রম গুলো কয়টা শাখায় বিভক্ত? তাদের কার্যক্রমের উপর মনিটরিং সেলে কতজন দায়িত্বশীল রয়েছেন? আইটি সেকশনে কাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদের মাধ্যমে ওয়েবসাইট, ইউটিউব, স্যোসাল মিডিয়ায় কী কী আপডেট রয়েছে?

৪। বাংলাদেশে কাদিয়ানীরা জাতীয় দৈনিক গুলোতে সম্পূর্ণ পৃষ্ঠা ব্যাপী ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে থাকে। খতমে নবুওয়তের হাইকমান্ড থেকে সেটির প্রতিউত্তরে আমরা কেন কোনো আপডেট দেখিনা। জাতীয় দৈনিক গুলোতে কি খতমে নবুওয়তের হাইকমান্ড থেকে পাঠানো কোনো ডকুমেন্ট প্রকাশ করতে অনিহা প্রকাশ করেছিল?

এভাবে অনেক কিছুই জিজ্ঞেস করার আছে। আমাদের সম্মানিত উলামায়ে কেরামের উচিত, কাদিয়ানীদের মুকাবিলায় যদি সম্ভব হয় যুৎসই উদ্যোগ গ্রহণ করুন। কাঠামোগত ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজের ময়দানে সুশৃঙ্খলভাবে কার্যক্রম অব্যাহত রাখুন। অন্যথা শুধুশুধু লোকদেখানো কাজ করে কোনো লাভ নেই। ২০০৩ সালে বেগম জিয়ার আমলে কাদিয়ানীদের কিছু বইপুস্তক সে সময় সরকার নিষিদ্ধ করা মাত্রই সারা দুনিয়া থেকে সরকারের উপর অনবরত চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। প্রায় ১৫শ নিন্দাসূচক ফ্যাক্স এসে জমা হয়েছিল বেগম জিয়া বরাবর। বিশ্বব্যাপী কাদিয়ানীদের হাত কতটা লম্বা তা বোধহয় বেগম জিয়া সে সময় কিছুটা টের পেয়েছিলেন। তারপর থেকে বেগম জিয়া একদম সাইজ হয়ে যান। কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে ভুলেও আর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তার সরকার। সুতরাং এখন বুঝতেই পারছেন যে, তাহলে এ মুহূর্তে আমাদের আসল করণীয় কাজটা কী? হ্যাঁ, ইউসুফ বিন্নুরী (রহ.), আব্দুস সালাম চাটগামী (রহ.) দুজন মহান ব্যক্তিত্ব খুবই চমৎকার বলে গেছেন। সেটি হচ্ছে, কাদিয়ানীদের নিকট যাওয়া, তাদেরকে ধরে ধরে বুঝাতে থাকা। তাদেরকে মোহাব্বত করে দ্বীনের পথে ডাকা। জবরদস্তি না করা। মাদ্রাসা স্কুলের মেধাবী ছাত্রদের তারবিয়ত দিয়ে আক্রান্ত এলাকাগুলোয় পাঠিয়ে দেয়া। আর এ কাজের জন্য যত টাকা পয়সা দরকার তা সবাই মিলে আঞ্জাম দেয়া।

রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান দায়িত্বশীল যারা তাদের কাছে যাওয়া। সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী প্রত্যেককে বুঝানো এবং কাদিয়ানীরা কেন ভুল পথে আছে তা তাদের সামনে তুলে ধরা। এ জন্য যত টাকার বইপুস্তক কেনা দরকার তা কিনে লাইব্রেরী আকারে বন্দোবস্তো করা। তাহলে মাত্র দশ বছরও লাগবেনা, এরই মধ্যে প্রায় সব কাদিয়ানীই ভুল বুঝতে পেরে ইসলামে ফিরে আসবে, ইনশাআল্লাহ। ফলে রাষ্ট্রীয় ভাবে তাদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করার দরকারও পড়বেনা।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী