Tuesday, February 7, 2023
Home Blog Page 3

হাইকোর্টের রায়ে কাদিয়ানীদের প্রকাশিত বই বাজেয়াপ্ত

বিচারপতি সুলতান হোসেন খান এবং বিচারপতি এ.এম মাহমুদুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের পূর্নাঙ্গ বেঞ্চ ১৯৮৫ সালের ৮ই আগস্ট সর্বসম্মত রায়ে কাদিয়ানীদের প্রকাশিত ‘ইসলামে নবুয়ত‘ নামক বইটি বাজেয়াপ্ত করে। (৪৫ ডিএলআর, ১৯৯৩)। সংবিধানের ১৯৭২ আর্টিকেলের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে ও ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৯৯(ক) অনুসারে ০৮ই-আগস্ট-১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ হাইকোর্ট ডিভিশন থেকে উক্ত রায়ের মাধ্যমে যে বইটি বাজেয়াপ্ত করা হয় সেটি কাদিয়ানী মতাবলম্বী জনাব মুহম্মদ আমীর কর্তৃক বাংলাদেশ আনজুমান-ই-আহমদীয়া’র পক্ষে রচিত ছিল। উক্ত রায়ে বিজ্ঞ আদালত ৪১ নং আর্টিকেলে বলেন,

  • “আহমদীয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস প্রচারের অধিকার দেশের আইন, জনশৃঙ্খলা এবং নীতি নৈতিকতার অধীন (অর্থাৎ এতে কোনো প্রকারের ধোকা, প্রতারণা ও মিথ্যার আশ্রয় নেয়া যাবেনা)। বইটিতে (ইসলামে নবুয়ত) এমন বিষয় রয়েছে যা ইচ্ছাকৃতভাবে এবং বিদ্বেষপূর্ণভাবে মুসলমানদের বেশিরভাগ ধর্মীয় বিশ্বাসকে ক্ষুব্ধ করার উদ্দেশ্যেই ছিল। তাই সরকারের জন্য বইটি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ ন্যায়সঙ্গত ছিল।” (অনলাইন থেকে হাইকোর্টের নিজেস্ব ওয়েবসাইট থেকে আর্টিকেল নং ৪১ দ্রষ্টব্য)।
হাইকোর্টের নিজেস্ব ওয়েবসাইট থেকে
  • উল্লেখ্য, সুলতান হোসেন খান ছিলেন একজন বাংলাদেশী বিচারক। তিনি ১৯৯০ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। দুর্নীতি দমন ব্যুরো ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনে রূপান্তর হলে কমিশনের চেয়ারম্যান হন তিনি। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি। তিনি ৫ই জুলাই ২০১৫ সালে ঢাকায় স্কয়ার হসপিটালে ইন্তেকাল করেন।

Constitution of Bangladesh, 1972 Article 102

Forfeiture of book—Defect in the order is no ground for exercise of writ jurisdiction—For enforcers ment of fundamental right and for cancellation of order, the Court should look to the equity and good conscience in passing the impugned order (forfeiting the book in question). When the book contains materials justifying the government’s action, the impugned order cannot be struck down on the ground that it does not mention the facts in support of the action. ……. (5 & 7).

Code of Criminal procedure (V of 1898) Section 99A

Forfeiture of book—Government is not required to issue notice–The provision may be invoked when the writing and publishing of a book constituted a penal offence. The order of forfeiture is a preventive action requiring no notice to the author or the publisher to give them opportunity of being heard. ….. (8)

Constitution of Bangladesh, 1972 Article 102

The right to hear is a personal right–the writ petitioner being not the author or publisher of the forfeited book is not entitled to prior notice asking him to show cause against the impugned order…… (8)

Article 41

Right to profess religious–The right of the Ahmadiyya community to preach their religious beliefs is subject to law, public order and morality. The book having contained matters which are deliberately and maliciously intended to outrage the religious beliefs of the bulk of the Muslims, the Government was justified in forfeiting the book….. (11, 12, & 15)

ASM Wahidul Momin Chowdhury, Advocate —For the Petitioner.

MM Hoque, Deputy Attorney General—For the Respondent.

Judgment : Sultan Hossain khan J : This application under article 102 of the constitution as revived is directed an order dated 8.8.85 forfeiting the book in Bengali, styled “Islam-i-Nabuat” written by Moulvi Muhammed Ameer, Bangladesh Anjuman-e-Ahmadiyya, Dhaka, under section 99A of the Code of Criminal Procedure.The petitioner has alleged that the book was first written and published circulated in this country and that the forfeited book is its 10th edition. It have been stated that the views expressed in the book have not outraged the religious feeling of the Muslims of Bangladesh and has not created any ill-feeling or hatred between communities. In the petition it has been stated. “The book itself is a researchical one on religious thoughts and beliefs, i.e. a systematic investigation towards the development of Quaranic knowledge” It has been Stated that the petitioner has faith and belief in the spiritual writings as contained in the book and there is nothing in it which would create hatred or ill feeling between classes of citizens of Bangladesh and it has not outraged the religious faith or belief of any class of citizens by insulting their religious beliefs and faith. The petitioner has submitted that every citizen has a right to follow, practice and preach his own thoughts on religious beliefs and faith within the bounds of low, public order and morality and as such the order of forfeiture of the book must be held to have been made and passed illegally and without lawful authority, and should be set aside and cancelled. It has been stated, the theme in the book is purely a religious one and is based on the petitioner’s religious faiths and beliefs and that the writings in the book are expression of religious beliefs of Ahmadiyya sect of the Muslim Community ; the book cannot be said to have been written and published to promote a feeling of hatred and ill feeling between different classes of citizens of Bangladesh, or has not deliberately and maliciously intended to outrage the religious feelings of the Muslims of Bangladesh by insulting their religious beliefs. The petitioner has asserted that tolerance towards other religious faiths and belief is a fundamental basis of Islam and hence the writings and expression in the book in support of the religious beliefs of the Ahmadiyya sect of the Muslim cannot be said to be offensive as contemplated under section 99A CrPC and that the impugned order is illegal and was made and issued without any lawful authority and is of no legal effect. ((DLR [Dhaka law Reports], 45:185-86 by Justice Sultan Hossain khan and AM Mahmudur Rahman Vs Bangladesh Anjuman-e- Ahmadiyya, represented by its Secretary, Umoor-e Ama…..petitioner [Write Petition No. 407 of 1985)).

Screenshot, (Pdf)

Vol- 45, Page 185-86 Date 08-08-1985
Page No. 186

তথ্যসংগ্রহকারী ও লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী এম.এ

মাহদী কাদ’আ গ্রাম থেকে বের হওয়া

একটি ভ্রান্তি নিরসন ও তাথ্যিক আলোচনা

আমার আহমদী তথা কাদিয়ানীবন্ধুরা এতই সরল যে, মির্যা গোলাম আহমদ সাহেবকে ইমাম মাহদী সাব্যস্ত করতে উদারতার কোনো ক্রুটি করেন না। মিস্টার নরেদ্র মোদিও যদি ভুলক্রমে মির্যা কাদিয়ানীর নামের সাথে ‘ইমাম মাহদী’ বলে ফেলে তাদের জন্য প্রমাণ হিসেবে সেটিও মজবুত দলিল হয়ে যায়। আসলে একটা গোষ্ঠী অথেনটিক দলিল-প্রমাণের দিক থেকে কতটা দেউলিয়া হলে তাদের মানসিক অবস্থা এমন হতে পারে তা ভাবতেও অবাক হই! অথচ বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত ইমাম মাহদী সংক্রান্ত হাদীসগুলো আমাদের জন্য যথেষ্ট। (১২টি সহীহ হাদীসের আলোকে ইমাম মাহদীর পরিচয়)। চলুন, প্রসঙ্গে যাই…! কয়েকদিন আগের কথা। এক কাদিয়ানী কাল্ট একটা আরবী টেক্সট (يخرج المهدي من قرية يقال لها كدعه) পাঠিয়ে বললেন, এ দেখেন! হাদীস বলছে, মাহদী এমন একটি গ্রাম থেকে বেরুবে যেটির নাম হবে কাদ’আ। এর মানে কাদিয়ান নামক গ্রাম থেকে ইমাম মাহদী আবির্ভূত হবেন।

কাদিয়ানীদের পাঠানো ইমেজ

আমি কিছুক্ষণ মনে মনে হাসলাম। চিন্তা করলাম, কিভাবে বুঝাই যে এটা জাল হাদীস। শীয়া পণ্ডিত শেখ আলী হামযা আত-তূসি (১৩৮২-১৪৬২ খ্রিস্টাব্দ) (علي حمزة بن علي بن ملک بن الحسن الزمجي الهاشمي الطوسي المروزي) এর রচনা ‘জাওয়াহেরুল আসরার‘ (جواهر الأسرار) ছাড়া এইরূপ শব্দচয়নে কোথাও পাওয়া যায় না। তিনি কিতাবটির ৫৮ নং পৃষ্ঠায় উক্ত কথাটি উল্লেখ করে একই পৃষ্ঠার শেষ লাইনের আগের লাইনে ফার্সী ভাষায় সে মাহদীর পরিচয় হিসেবে লিখেছেন, (ফার্সী) نام او محمد بن حسن عسکری باشد তার অর্থ হল, “সেই মাহদীর নাম হবে মুহাম্মদ ইবনে হাসান আসকারী।” স্ক্রিনশট দেখুন,

‘জাওয়াহেরুল আসরার ৫৮

আমার আফসোস লাগে এই সরলমনা মানুষগুলোর জন্য। আহা! কত নিকৃষ্ট প্রতারণার জালে এরা বাক্সবন্দি। এই বেচারাগুলোর এ করুণ অবস্থা শুধুই ধর্মীয় শিক্ষা-দীক্ষার অভাবেই নয়, গোঁড়ামির কারণেও বলতে হয়। এরা একদিকে ঈমানের সদাই করে নিঃস্ব, আরেকদিকে কথিত ওসীয়্যতের ধাঁধায় পড়ে বেহেশতি টিকেট ইত্যাদির জাঁতাকলে নিষ্পেষিত। এখানে সাধারণ কাদিয়ানী মানুষগুলাকে আমি কয়েকটি প্রশ্ন শিখিয়ে দিতে চাই, আপনারা দয়া করে আপনাদের নেতাদের প্রশ্ন করুন যে, শীয়া পণ্ডিত আত-তূসীর রচনায় উল্লিখিত কথাটি গ্রহণযোগ্য হলে একই ব্যক্তির একই কিতাবের একই পৃষ্ঠার অপরাপর কথাগুলো কিজন্য আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি? আত-তূসীর ‘জাওয়াহেরুল আসরার’-এর কথামতে কিছুক্ষণের জন্য মানলাম যে, ইমাম মাহদীর গ্রামের নাম ‘কাদ’আ‘ (কাদিয়ান), কিন্তু একই পৃষ্ঠায় তো মাহদীর নাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান আসকারী-ও লিখা আছে! এখন আমরা একই ব্যক্তির বক্তব্যের কিছু অংশ গ্রহণ করলে আর কিছু অংশ বর্জন কেন করি? এটি কি সুবিধাবাদ জিন্দাবাদ হয়ে গেল না?

দ্বিতীয় প্রশ্নটি করবেন, হাদীস হিসেবে প্রমাণের জন্য মতনের আগে তার সনদ (ধারাবাহিক সূত্র) থাকতে হয়। হাদীসের সবগুলো সংকলনেই সনদ উল্লেখ রয়েছে, যাতে মতনে উল্লিখিত কথাটি ভেরিফাই করে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, এটি প্রকৃতপক্ষে রাসূল (সা.)-এর বাণী হবার গ্যারান্টি কতখানি? নতুবা যার তার কথাকে হাদীস বলে চালিয়ে দেয়া এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ থেকেই যাবে। কিন্তু শীয়া পণ্ডিত আত-তূসী রচিত কিতাবের উক্ত কথাটির কোনো সনদ নেই। তার মানে ভিত্তিহীন কথা। এখন এধরণের কোনো সনদ বিহীন আন-ভেরিফাইড কথা প্রতিপক্ষের কেউ হাদীস হিসেবে পেশ করলে তখন কি কাদিয়ানী নেতারা সেটি মেনে নেবে?

তৃতীয় প্রশ্ন হল, ইমাম জালালুদ্দিন আস-সুয়ূতী (রহ.)-এর একটি রচনাতেও (العرف الوردي في أخبار المهدي) এধরণের কাছাকাছি একটি বর্ণনা এসেছে। ইমাম আবু যুর’আ (রহ.) সহ বহু মুহাদ্দিস বলেছেন, বর্ণনাটির অন্যতম রাবী আব্দুল ওহাব বিন আল-জাহহাক একজন মিথ্যাবাদী, সে হাদীস জাল করত। দেখুন, মীযানুল ই’তিদাল ২/৬৭৯; রাবী নং ৫৩১৬; ইমাম যাহাবী (রহ.)। এবার বর্ণনার কথাটি খেয়াল করুন, (يخرج المهدي من قرية باليمن يقال لها كرعة) এখানে পরিষ্কার করে গ্রামের নাম ‘কার’আ‘ (كَرِعَةٌ) বলা হয়েছে এবং দেশের নাম ইয়েমেন (اليمن) বলেও উল্লেখ রয়েছে। বর্ণনার অনুবাদ, “মাহদী ইয়েমেন এর কার’আ নামক গ্রাম থেকে বেরুবেন” (পৃষ্ঠা নং ৫৬ দ্রষ্টব্য)। এখন এই ‘ইয়েমেন’ শব্দের বর্ণনার কী হবে?

আল-আরফুল ওয়ারদি-৫৬

চতুর্থ প্রশ্ন হল, ইমাম তাবারানী’র রচনাতেও (معجم ابن المقري) শব্দটি কার’আ (كَرِعَةٌ)। মানে শব্দটি ‘কাদ’আ’ হওয়াটা সুনিশ্চিত নয়। তারপর আরেকটি শব্দ এসেছে, ইয়েমেন। তার মানে বুঝানো হয়েছে যে, (يَخْرُجُ الْمَهْدِيُّ مِنْ قَرْيَةٍ بِالْيَمِينِ يُقَالُ لَهَا: كَرِعَةٌ، وَعَلَى رَأْسِهِ عِمَامَةٌ فِيهَا مُنَادٍ يُنَادِي: أَلا إِنَّ هَذَا الْمَهْدِيُّ فَاتَّبِعُوهُ”) মাহদী ইয়েমেনের কার’আ নামক গ্রাম/পল্লী থেকে আবির্ভূত হবেন। সকল মুহাদ্দিস বলেছেন, সনদের বিচারে এটিও অগ্রহণযোগ্য। (পৃষ্ঠা ৮৫)। এই বর্ণনায় সনদ উল্লেখ আছে বটে, কিন্তু সনদের বিচারে বর্ণনাটি সহীহ নয়। এখন এই ইয়েমেন বা কার’আ যুক্ত বর্ণনার কী হবে?

পঞ্চম প্রশ্ন হল, মির্যা কাদিয়ানী সাহেবের রচিত ‘হাকীকাতুল মাহদী’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, “মাহদী ও প্রতিশ্রুত মসীহ সম্বন্ধে আমার ও আমার জামাতের বিশ্বাস এই যে, মাহদীর আগমন সংক্রান্ত এ ধরণের হাদীসসমূহ কোনো মতেই আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমার মতে এই গুলোর উপর তিন ধরণের আপত্তি আছে।” দেখুন, হাকীকাতুল মাহদী (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ০৭; অনুবাদক সালেহ আহমদ, মুরব্বী সিলসিলাহ্ আলীয়া আহমদীয়া। প্রকাশকাল, অক্টোবর ২০০১ ইং। এখন প্রশ্ন হল, মির্যা কাদিয়ানীর কথা অনুসারে মাহদীর আগমন সংক্রান্ত হাদীসসমূহ কোনো মতেই আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্য না হলে তখন ‘কার’আ’ বা ‘কাদ’আ’ শব্দযুক্ত বর্ণনা যার কোনো সনদও নেই, কিভাবে দলিল হতে পারে? (স্যোসাল মিডিয়া – ফেইসবুক থেকে)।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

পণ্ডিত লেখরামের মৃত্যু নিয়ে আল্লাহতালার নামে মির্যার মিথ্যাচার

আল্লাহতালাকে নিয়ে মিথ্যাচার!

আর্য সমাজের জনপ্রিয় ধর্মগুরু ও পণ্ডিত লেখরাম সম্পর্কে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ২০-০২-১৮৯৩ ইং ভবিষ্যৎবাণী করেছিল এভাবে যে, اگر اس شخص پر چھ برس کے عرصہ میںؔ آج کی تاریخ سے کوئی ایسا عذاب نازل نہ ہوا جو معمولی تکلیفوں سے نرالا اور خارق عادت اور اپنے اندر الٰہی ہیبت رکھتا ہو تو سمجھو کہ میں خدا تعالیٰ کی طرف سے نہیں অর্থাৎ এই ব্যক্তির উপর আজকের এই তারিখ থেকে আগামী ছয় বছরের মধ্যে যদি এমন কোনো আজাব নাযিল না হয়, যেটি সাধারণ যে কোনো শাস্তির উর্ধ্বে ও নজিরবিহীন (রহস্যময়) হবে আর তার অভ্যন্তরে ইলাহি ভীতি সঞ্চার করবে, তাহলে জেনে রেখো আমি খোদার পক্ষ হতে প্রেরিত নই। (রূহানী খাযায়েন ৫/৬৫০-৫১)। কিন্তু লেখরামের মৃত্যু হয় মির্যার এক দুর্বৃত্ত মুরিদের ছুরিকাঘাতে। এবার দেখা যাক, মির্যা সাহেব দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে লেখরামের মৃত্যুকে তারই কথিত ভবিষ্যৎবাণী মুতাবেক সম্পন্ন হয়েছে বলে কিভাবে দাবী করেছিল এবং কিরকম ব্যাখ্যার পেছনে দৌঁড়ঝাপ করে গেল? মির্যা কাদিয়ানী সাহেব লিখেছেন, (অনুবাদ) ‘স্মরণ রাখা চাই যে, লেখরাম সম্পর্কিত আমার কৃত ভবিষ্যৎবাণী বিশেষ ধরনের একটি ভবিষ্যৎবাণীই ছিল। সেখানে খোদাতালা এটাই প্রকাশ করেছেন যে, সে (লেখরাম) হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমেই মারা যাবে।’ (রূহানী খাযায়েন ১৯/১২২)। পাঠকবৃন্দ! একটু নিরপেক্ষভাবে মির্যা সাহেবের আগের বক্তব্য আর এই বক্তব্য দুটি মিলিয়ে চিন্তা করুন তো! লেখরাম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমেই মারা গেলে তখন সেটি খারেক্বে আদত বা নজিরবিহীন আর সাধারণ যে কোনো শাস্তির উর্ধ্বে বলে বিবেচিত হল কিভাবে? মির্যা সাহেব আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত একজন ‘নবী রাসূল’ দাবী করা সত্ত্বেও এত চাতুর্যপূর্ণ মিথ্যা কিভাবে বলতে পারলেন? এটি সাধারণদের সাথে সুস্পষ্ট ধোকাবাজি নয় কি? (স্ক্রিনশট দেখুন) :-

মির্যা কাদিয়ানীর লিখায় পণ্ডিত লেখরামের মৃত্যু নিয়ে তারই ভবিষ্যৎবাণীর মধ্যে ‘খারেক্বে আদাত’-এর শর্তযুক্ত ছিল কিনা সেটি পাঠকবৃন্দ একটু আগেই দেখে এসেছেন। এবার ‘খারেক্বে আদত’ বলতে কী বুঝায় তা জেনে নিন! মির্যা কাদিয়ানী সাহেব ‘খারেক্বে আদত’ (خارق عادت) এর সংজ্ঞায় লিখেছেন, ظاہر ہے کہ جس امر کی کوئی نظیر نہ پائی جائے اسی کو دوسرے لفظوں میں خارق عادت بھی کہتے ہیں. অর্থাৎ প্রকাশ থাকে যে, যে ঘটনা নজিরবিহীন তাকে অন্য শব্দে খারেক্বে আদতও বলা হয়। (সুরমা চশমায়ে আরিয়া, রূহানী খাযায়েন ২/৬৭)। তিনি আরেক জায়গায় লিখেন, خارق عادت اسی کو تو کہتے ہیں کہ اس کی نظیر دنیا میں نہ پائی جائے অর্থ, খারেক্বে আদত বলা হয় যার কোনো দৃষ্টান্ত দুনিয়ায় পাওয়া যায় না। (হাকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন ২২/২০৪)। এরপরেও মির্যা সাহেবের ভেল্কিবাজি বুঝতে যাদের কষ্ট হচ্ছে তাদের বিবেক জাগ্রত হোক, এই দোয়া করছি। আর যারা ব্রেইন ওয়াশ তাদের মু’আমালা আল্লাহর নিকট সোপর্দ করে গেলাম।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

ইমামের পেছনে সূরা ফাতেহা পড়া ও বিতর্ক সমাধান

প্রশ্ন : ইমামের পেছনে ফাতেহা না পড়লে সালাত হবে না—কথাটি কি ঠিক?

উত্তর : ইমামের পেছনে দাঁড়িয়ে সুরা ফাতেহা না পড়লে সালাত হবে না—কথাটা একদম ঠিক না। ছোট্ট একটা উপমা দিলে বুঝতে সহজ হবে। মনে করুন, আপনি অজু করে মসজিদে ঢুকেই দেখলেন যে ইমাম সাহেব রুকুতে চলে গেছেন। আপনিও ইমামের সাথে রুকুতে শামিল হয়ে গেলেন। এমতাবস্থায় ইমাম সাহেব যখন সালাত শেষ করবেন তখন কি আপনি প্রথম রাকাত পাননি মনে করে দাঁড়িয়ে যান? নিশ্চয়ই না। এখন যদি বিভিন্ন টিভি মিডিয়ার আলখেল্লা পরা কথিত অমুক-তমুকের কথা আমরা সঠিক মেনেও নিই তখন স্রেফ রুকু পাওয়া মুসল্লির সালাতের কী হবে? কারণ সে তো প্রথম রাকাত না পাওয়ার কারণে ফাতেহাও পড়তে পারেনি! সুতরাং বুঝতেই পারছেন যে, সূরা ফাতেহা ছাড়া সালাত হবেনা—কথাটি সবক্ষেত্রে নয়, বরং শুধুমাত্র একাকী সালাত আদায়কারী ব্যক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একথা কোনো মোল্লামুন্সীর নয়, বরং একথা একদম টনটনে সহীহ হাদীস থেকেই নেয়া। দেখুন (হাদীস) إذا صلى احدكم خلف الإمام فحسبه قراءة الامام অর্থাৎ তোমাদের মধ্য থেকে যখন কেউ ইমামের পেছনে সালাত পড়বে তার জন্য ইমামের ক্বেরাতই যথেষ্ট। (আল মুয়াত্তা-এর শরাহ ‘আত-তামহীদ‘ ১২/৩৭, ইমাম ইবনে আব্দিল বার আল মালেকী, হাদীস সহীহ)! স্ক্রিনশট :

মুয়াত্তার শরাহ ইবনে আব্দিল বার রহ.-এর আত-তামহীদ

এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, টিভি মিডিয়ার কতিপয় আলখেল্লা পরা অমুক-তমুক সাহেবদের উপস্থাপনায় পদস্খলনটা কোথায়? আপনি তাদেরকে একটা কথা সচরাচর বলতে শুনবেন যে, সুরা ফাতেহা হলো সালাতের রুকুন। রাসুল (সা.) হাদীসে বলেছেন, যে ব্যক্তি সুরা ফাতেহা পড়ল না তার সালাত হবে না। সুতরাং ঈমামের পেছনে হোক আর একা হোক সূরা ফাতেহা আপনাকে পড়তেই হবে। এটিই সঠিক বক্তব্য। যা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এটা নিয়ে আলেমদের যত কথাই থাকুক না কেন রাসুল (সা.)-এর বক্তব্যটাই অবশ্যই আগে। তিনি স্পস্ট করে দিয়েছেন বিষয়টি। তাই সুরা ফাতেহা পড়াটা বাধ্যতামূলক। (বক্তব্য শেষ হল)। আমি প্রতিউত্তরে বলি, ঠিক আছে; আপনার কথা মত, আলেমদের কথাই বাদ দিলাম। আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে “তোমরা যখন ক্বেরাত শুনবে তখন ধ্যান লাগিয়ে তোমরা তা চুপ থেকে শ্রবণ করবে”।তাফসীরে ইবনে কাসীরে আয়াতটি সম্পর্কে পরিষ্কার লিখা আছে, وقال علي بن أبي طلحة ، عن ابن عباس قوله : ( وإذا قرئ القرآن فاستمعوا له وأنصتوا ) يعني : في الصلاة المفروضة. অর্থাৎ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, وإذا قرئ القرآن فاستمعوا له وأنصتوا আয়াতটি ফরজ সালাত সমূহে ক্বেরাত পাঠ (মুহূর্তে চুপচাপ থেকে শ্রবণ করা) সম্পর্কে নাযিল হয়েছে (ইবনে কাসীর, সূরা আ’রাফ আয়াত নং ২০৪)। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) এবং ইবনে তাইমিয়া (রহ.) দুইজনও বলেছেন যে, এই আয়াত নামায সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। (মুগনী, ইবনে কুদামাহ ১/৬০৫; ফতুয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া ২/৪১২)। উল্লেখ্য, ১৫ খণ্ডে রচিত আল মুগনী (المغنى لابن القدامة) কিতাবের রচয়িতা আল্লামা ইবনে কুদামাহ আল-মাকদীসী মুয়াফফাক আল দ্বীন আবু মুহাম্মদ-আবদুল্লাহ বিন আহমদ বিন মুহাম্মদ (জন্ম-মৃত্যু : ১১৭৪-১২২৩ খ্রিস্টাব্দ) যাকে প্রায়শই ইবনে কুদামাহ বা সংক্ষেপে ইবনে কুদামা নামে অভিহিত করা হয়, ছিলেন একজন আহলে সুন্নাহ’র স্কলার ও ফকীহ আলেম। জন্ম ফিলিস্তিনে। হাম্বালী মাযহাবের গুরুত্বপূর্ণ রচনাসহ ফিকহ ও ধর্মীয় মতবাদের উপর অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। যাইহোক, এবার কি কুরআনের উপরও আমল বাদ দিতে সাধারণদের নসিহত করবেন?

  • সূরা আ’রাফ আগে নাযিল হয় নাকি নামাযের ফরজিয়ত সংক্রান্ত হুকুম আগে নাযিল হয়?

এবার একটি সম্পূরক প্রশ্নের উত্তর দেব, এ বিষয়ে জ্ঞান লাভ করার জন্য একটু ইতিহাসে ফিরে যাওয়া যাক। হযরত খাদিজা (রা.) মারা যান ৬১৯ খ্রিস্টাব্দের ১০ ই রমাযান। আবু তালিব মারা যান ৬২০ খ্রিস্টাব্দের ৭ ই রামাযান। সূরা আ’রাফ নাযিল হয় মক্কায় সূরা আন’আমের পরে অথবা সমসাময়িক একই বছর। আর একথা পরিষ্কার যে, সূরা আন’আম যে বছর নাযিল হয় সে বছরটি ছিল হিজরতে খুব সন্নিকটবর্তী এবং সে সময় হযরত খাদিজা এবং আবু তালিব তাদের কেউই জীবিত ছিলেন না। আর রাসূল (সা.)-এর মেরাজের মধ্য দিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ফরজিয়ত সংক্রান্ত হুকুম নাযিল হয়েছিল আবু তালিবের মৃত্যুর পূর্বে ৬২০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ শে রজব। এখন এই ইতিহাস যদি ভুল না হয় তাহলে প্রমাণিত হবে যে, সূরা আ’রাফ নাযিল হবার অনেক আগেই মেরাজ সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ফরজিয়ত উম্মাহার উপর বিধিবদ্ধ হয়ে যায়। সুতরাং একথা দাবী করা সঠিক হবেনা যে, সূরা আ’রাফ বা সূরাটির ২০৪ নং আয়াত নাযিলের আগে নামায ফরজ ছিলনা। অধিকন্তু ইবনে আব্বাস (রা.) থেকেও পরিষ্কার বর্ণিত আছে যে, সূরা আ’রাফের ২০৪ নং আয়াত জুমার সালাত অনুষ্ঠিতকালে মক্কায় নাযিল হয়।

আসুন, এবার টিভি মিডিয়ার ঐ আলখেল্লা পরা অমুক ইবনে তমুক সাহেবদের চরম ইলমি দৈন্যতার কারণ জেনে নিই। এরা যদিও নিজেদের কথিত সালাফি বলে দাবী করে (অথচ চার মাযহাবের মুকাল্লিদগণই প্রকৃত সালাফী দাবী করার হকদার-লিখক) কিন্তু আসলে এরা সালাফীদের পথ থেকেও ষোল আনা বিচ্যুত। কারণ জানলে আকাশটা আপনার মাথার উপর ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা হবে। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর একটা বক্তব্য পেশ করে চলমান টপিকে আলোচনার ইতি টানছি। তিনি বলেছেন, ما سمعنا أحداً من أهل الإسلام يقول: إن الإمام إذا جهر بالقراءة لا تجزئ صلاة من خلفه إذا لم يقرأ অর্থ-“আমরা কোনো আহলে ইসলামকে (বিশেষজ্ঞকে) এটা বলতে শুনিনি যে, যখন ইমাম উচ্চঃস্বরে ক্বেরাত পাঠ করেন এবং মুক্তাদী তার পেছনে ক্বেরাত পাঠ না করেন তাহলে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে।” (আল মুগনী, ইবনে কুদামাহ ১/৬০)। আল্লামা জফর আহমাদ উসমানী (রহ.) রচিত ইলাউস সুনান (৪/১২৮) কিতাব থেকে স্ক্রিনশট :-

ইলাউস সুনান (اعلاء السنن)

এবার সহজেই প্রশ্ন আসবে যে, আজকের দিনে যেসব আলখেল্লা পরা কথিত অমুক ইবনে তমুকরা ইমামের পেছনে সূরা ফাতেহা না পড়লে সালাত বাতিল বলে ফতুয়া কপচে বেড়াচ্ছেন তাদের ইলম, তাকওয়া আর যোগ্যতা কি ইসলামের প্রথম তিন-চার শতাব্দীর বরেণ্য আয়েম্মায়ে কেরাম থেকেও বেশি হয়ে গেল? অপ্রিয় হলেও সত্য, ডিজিটাল ক্যামরার সামনে আর স্যোসাল মিডিয়ায় একাকী পাণ্ডিত্য জাহির করা খুব সহজ হলেও টেবিল টকশো অত সহজ না। যেজন্য ঐ সমস্ত অমুক ইবনে তমুকদের কখনোই টেবিল টকশোতে দেখা মেলেনা, আর যাদেরই ভুলক্রমে একবার টেবিল টকশোতে দেখা মেলে তাদেরকে একপর্যায়ে বলতে শুনা যায় : আমরা কি আর এত প্রস্তুতি নিয়ে আইছি! এই নির্বোধরা কি তাহলে পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই ফতুয়া কপচাইত? রঙ্গিন দুনিয়ার এই সমস্ত শায়খরা তারপর থেকে দ্বিতীয়বার টেবিল টকশোর নামও আর মুখে নেন না! কিন্তু রঙ্গিন দুনিয়ার এই সমস্ত ডিজিটাল শায়খদের ইলমি দৌড় যে কতটা লজ্জাজনক তা আমাদের জেনারেল শিক্ষিতদের বুঝানোর সাধ্য কার? আমাদের অজপাড়া গাঁয়ের নান্নুমিয়া আর চক্ষুমিয়াদের কথা আর না হয় না-ই বললাম! এতক্ষণ যা কিছু লিখলাম তা সাধারণদের জন্য। এবার আলেমদের জন্য একটু ইলমি আলোচনা করতে চাই, দয়া করে এই আলোচনায় যাদের উসূলে হাদীসের উপর একাডেমিক পড়াশোনা নেই তারা প্রবেশ করবেন না!

  • কিন্তু কোনো কোনো বর্ণনাতে তো خلف الإمام (ইমামের পেছনে) শব্দযোগেও বর্ণনায় এসেছে যে, لا صلوة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب অর্থাৎ যে ফাতেহাতুল কিতাব ছাড়া….। এর সমাধান কী?

এর উত্তরে আমি আমার শিক্ষার আলোকে বলতে পারি যে, হাদীস পড়া আর হাদীস বুঝা দুটো দুই জিনিস। যেজন্য হাদীস সংকলনকারীদের মুহাদ্দিস বলা হয় আর হাদীসের উপর জ্ঞানগর্ভ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দাঁড় করার যোগ্যতাসম্পন্নদের ফকিহ বলা হয়। যুগে যুগে মুহাদ্দিস অগণিত থাকলেও ফকিহ ছিলেন হাতেগনে অল্পকয়জন। এদের মধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন আবু হানিফা, ইমাম মালেক, সুফিয়ান আস ছাওরী, আওযায়ী, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান, ইমাম যুফার, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং ইমাম শাফেয়ী প্রমুখ। সাধারণদের বুঝার সহজার্থে এভাবেও বলা যায় যে, মুহাদ্দিসগণ হলেন ঔষধ দোকানদারগণের মত আর ফকিহগণ হলেন প্রেসক্রিপশন সহ ঔষধ সরবরাহকারী এমবিবিএস ডাক্টারের মত। যেজন্য হাদীসের বুঝ বা ব্যাখ্যার জন্য ফকিহদের উপর উম্মাহ যুগে যুগে নির্ভর করতেন। উপরের দুই শ্রেণীর বাহিরে তৃতীয় আরেকটা শ্রেণীও ছিলেন তাদেরকে ‘আয়েম্মায়ে জারহু ওয়াত তা’দীল’ বলা হয়। অর্থাৎ হাদীসের সনদ বিশেষজ্ঞ স্কলারশিপ। তাদের মধ্যে ইমাম যাহাবী, ইবনে হাজার আসকালানী, নূরুদ্দীন হাইছামী, আবু যুর’আ, ইবনে হাব্বান, ইবনে জওযী, ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন প্রমুখ অন্যতম। এবার মূলকথায় ফিরে আসছি। ঐ যে একটা বর্ণনায় ‘ইমামের পেছনে সূরা ফাতেহা পড়া...’ সংক্রান্ত দলিল পেশ করা হয় সেটি সম্পর্কে কিতাবে লিখা আছে যে, বর্ণনাটির সূত্রে ইমাম যুহরী (রহ.) রয়েছেন। তিনি নিজেই পরের দিকের আরেকটি বর্ণনায় বলেছেন যে, সূরা আ’রাফ আয়াত ২০৪ (وإذا قرئ القرآن فاستمعوا له وأنصتوا) নাযিল হওয়ার পূর্বে সাহাবায়ে কেরাম ইমামের পেছনে ক্বেরাত পড়তেন। ইমাম যুহরী (রহ.) সহীহ বুখারীর অন্যতম একজন শক্তিশালী রাবী। তাঁর উক্ত বক্তব্য হতে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ পাওয়া গেল যে, ইমামের পেছনে ইতিপূর্বে ফাতেহা পড়া প্রচলিত থাকলেও ঐ আয়াত নাযিলের পর ইমামের পেছনে সূরা ফাতেহা পড়ার আগেকার নিয়ম রহিত হয়ে যায় অর্থাৎ আগে পড়লেও পরবর্তীতে কেউ আর পড়তেন না, বরং আয়াতের শিক্ষা অনুযায়ী সবাই ইমামের পেছনে চুপচাপ থেকে ক্বেরাত শ্রবণ করতেন। এই হচ্ছে মুটামুটি কথা। এখানে বিজ্ঞ আলেমদের জ্ঞাতার্থে আরেকটু ইলমি আলোচনা করা জরুরি। সুনানে বায়হাক্বী থেকে ইমাম যুহরী (রহ.)-এর সনদে যে রেওয়ায়েতটি পেশ করা হয় সেটি ইমাম যুহরী থেকে তার ছাত্রদের আরও প্রায় ১৩ জন বর্ণনা করেছেন কিন্তু তাদের কারো বর্ণনায় خلف الأمام (ইমামের পেছনে) শব্দটি নেই। সেই একমাত্র ছাত্র ইউনুসই এটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু একই সনদে ইমাম দারেমী তার সুনান গ্রন্থে বর্ণনাটি উল্লেখ করা সত্ত্বেও তিনি সেখানে বর্ণনাটিতে خلف الإمام শব্দ আনেননি। ইমাম বায়হাক্বী (রহ.) একই কিতাবের ২৩ নং পৃষ্ঠায় ইউনুস ইবনে উমরের সূত্রে প্রায় একই বর্ণনা উল্লেখ করা সত্ত্বেও তিনিও خلف الإمام শব্দ আনেননি (Click)। এখানে আরও অবাককরা বিষয় হল, ইউনুসের সূত্রে তারও ছাত্রদের যে ৩জন এটি বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে শুধুমাত্র উসমান বিন উমর ছাড়া বাকি কারো বর্ণনাতেও শব্দটি নেই। আবার উসমান বিন উমর-এর সূত্রে তার দুই ছাত্র এটি বর্ণনা করেছেন। কিন্তু সে দুইজনের একজন হাসান ইবনে মুকরিমের বর্ণনাতেও শব্দটি নেই। শুধুমাত্র আবু ইবরাহীম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আছ-ছিপার (ابو ابراهيم محمد بن يحيى الصفار) নামীয় তার এক ছাত্র অতিরিক্ত শব্দটি সহ বর্ণনা করতে দেখা যায়। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি :

বায়হাক্বী : হাদীসের মান শাজ

মজার ব্যাপার হল, সনদ বিশেষজ্ঞ স্কলারশিপ (রিজালশাস্ত্রের ইমামগণ) কেউ তাকে (মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া) সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য বলেননি (ইমাম ইবনে হাজার আসকালানীর ‘ফাতহুল বারী’ দ্রষ্টব্য)। এমতাবস্থায় কুরআনের শিক্ষার বিপরীতে এবং অন্যান্য অসংখ্য হাদীসের বিরুদ্ধে ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের উল্লিখিত সাক্ষ্যপ্রমাণ উপেক্ষা করে কিভাবে এমন একটি বর্ণনার অতিরিক্ত ঐ উপবাক্যটির উপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়? অথচ বর্ণনার অতিরিক্ত শাজ (شاذ) অংশটি রাসূল (সা.)-এর মুখনিঃসৃত বাণী হওয়াও নিশ্চিত নয়। তাকওয়ার দাবী তো প্রবৃত্তির অনুসরণ না করে বরং সালফে সালেহীনের পথ অনুসরণ করা, দলাদলির উর্ধ্বে থেকে শুধুই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য দ্বীন পালন করা, তাই নয় কি? বলাবাহুল্য, এই নাতিদীর্ঘ বিচার বিবেচনা আর সমন্বয় করে মুটামুটি সমস্ত হাদীসের উপর আমল করার বিস্তৃত এই বৈচিত্র্যকেই এককথায় ফিকহ বলা হয়। যাকে আরেক কথায় ‘মাযহাব‘ (ইখতিলাফি বিষয়ে গবেষণালব্ধ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত) বলা হয়।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

জানাযার সালাতে সূরা ফাতেহা

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি প্রশ্নোত্তরে ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে

  • জানাযার সালাতে সূরা ফাতেহা পড়া নিয়ে মতভেদ কী?

প্রশ্নের উত্তরে বলা হবে যে, একটা শ্রেণী প্রচার করে থাকেন যে, সূরা ফাতেহা ছাড়া অন্যান্য সালাত যেমন হয়না তেমনি জানাযার সালাতও সূরা ফাতেহা না পড়লে শুদ্ধ হবেনা। কিন্তু তাদের এই বিশ্বাস সঠিক নয়। প্রথমত, যে হাদীসে সূরা ফাতেহা ছাড়া সালাত হবেনা বলে উল্লেখ আছে সেটি একাকী সালাত আদায়কারী ব্যক্তির সালাত সম্পর্কে। (হাদীস) إذا صلى احدكم خلف الإمام فحسبه قراءة الامام অর্থাৎ তোমাদের মধ্য থেকে যখন কেউ ইমামের পেছনে সালাত পড়বে তার জন্য ইমামের ক্বেরাতই যথেষ্ট। (আল মুয়াত্তা-এর শরাহ ‘আত-তামহীদ‘ ১২/৩৭, ইমাম ইবনে আব্দিল বার আল মালেকী, হাদীস সহীহ)! স্ক্রিনশট :

আত তামহীদ, ইবনে আব্দিল বার

ছোট্ট একটা উপমা দিলে বুঝতে সহজ হবে। মনে করুন, আপনি অজু করে মসজিদে ঢুকেই দেখলেন যে ইমাম সাহেব রুকুতে চলে গেছেন। আপনিও ইমামের সাথে রুকুতে শামিল হয়ে গেলেন। এমতাবস্থায় ইমাম সাহেব যখন সালাত শেষ করবেন তখন কি আপনি প্রথম রাকাত পাননি মনে করে দাঁড়িয়ে যাবেন? নিশ্চয়ই না। সুতরাং বুঝতেই পারছেন যে, সূরা ফাতেহা ছাড়া সালাত হবেনা—কথাটি সবক্ষেত্রে নয়, বরং শুধুমাত্র একাকী সালাত আদায়কারী ব্যক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। দ্বিতীয়ত, জানাযার সালাত মূলত একটি দোয়া মাত্র, অন্যান্য সালাতের মত কোনো সালাত নয়। যেজন্য সূরা ফাতেহা পড়ার আবশ্যকতা প্রমাণের জন্য অন্যান্য সালাতের প্রসঙ্গ টেনে আনা সম্পূর্ণ জেহালত বৈ কিছুই না। এবার দ্বিতীয় শ্রেণীর মতামত জানা যাক। দ্বিতীয় শ্রেণীর মতামত হচ্ছে, সূরা ফাতেহা পড়ার প্রমাণে সহীহ বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে একটি বর্ণনা উল্লেখ আছে। অনুরূপ আরও কয়েক জন সাহাবী থেকেও উল্লেখ আছে। তেমনিভাবে খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর (রা.) হযরত আলী (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) এবং হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে একদম টনটনে একাধিক সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, উনারা কেউই জানাযার সালাতে সূরা ফাতেহা পড়তেন না। এমনকি রাসূল (সা.) হতেও কোনো মারফু সূত্রে বর্ণিত একটি হাদীসও পাওয়া যায়না যেখানে সূরা ফাতেহা পড়া সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়! সুতরাং এতে প্রমাণিত হয় যে, সূরা ফাতেহা পড়া ফরজ বা ওয়াজিব বা সুন্নাহ এধরণের কিছুই না; বড়জোর শুধুই হামদ-ছানাহ’র নিয়তে জায়েজ হতে পারে। কারণ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ব্যক্তিগত একখানা আমল দ্বারা তা প্রমাণিত। তবে ইবনে আব্বাস (রা.) সূরা ফাতেহাকে ক্বেরাত ধরেই পড়তেন না, বরং হামদ-ছানাহ (আল্লাহর প্রশংসা ও বন্দনা) স্বরূপ পড়তেন। আর একথার প্রমাণও একাধিক সহীহ সূত্র থেকে পাওয়া যায়। সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাকারক ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) রচিত ‘ফাতহুল বারী’-তে এর প্রমাণ হিসেবে যে তথ্যটি উঠে এসেছে তাতে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, তিনি জানাযায় একদা ‘فاتحة الكتاب’ (সূরা ফাতেহা) পাঠ করলেও সেটি মূলত হামদ-ছানাহ হিসেবেই করেছিলেন, ক্বেরাত হিসেবে নয়। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) লিখেন, ইমাম হাম্মাদ (রহ.) তিনি বিশিষ্ট তাবেয়ী আবু হামজাহ (রহ.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি (আবু হামজাহ) বলেন, আমি তাঁকে (ইবনে আব্বাসকে) জিজ্ঞাসা করলাম, কা‘বার ভেতরে নামায কীভাবে পড়ব? তিনি উত্তরে বললেন, (আরবী) كما تصلي في الجنازة تسبح وتكبر ولا تركع ولا تسجد ثم عند أركان البيت سبح وكبر وتضرع واستغفر، ولا تركع ولا تسجد অর্থাৎ তুমি (সেভাবেই পড়বে) যেভাবে সালাতুল জানাযা পড়। (তথায়) তাসবীহ পড়বে, তাকবীর দিবে, তবে রুকু-সিজদা করবে না। এরপর বাইতের রোকনগুলোর কাছে তাসবীহ পাঠ করবে, তাকবীর দিবে, রোনাজারি করবে এবং ইস্তিগফার করবে। তবে রুকু-সিজদা করবে না। (ফাতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী ৩ : ৪০৪ কিতাবুল হাজ্জ)। ইবনে হাজার আসকালানী লিখেন, এ বর্ণনার সনদ সহীহ। লক্ষণীয় হল, ইবনে আব্বাস (রা.) জানাযার সালাতের নিয়ম পদ্ধতি কেমন তা ব্যক্ত করার ক্ষেত্রে সূরা ফাতেহার উল্লেখ করেননি। আশাকরি প্রকৃত বিষয়টি এবার বুঝতে পেরেছেন। এ সম্পর্কে ডক্টর আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.)-এর লেকচারটি শুনা যেতে পারে। (প্রামাণ্য স্ক্রিনশট)

ফাতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী
  • জানাযায় সূরা ফাতেহা পড়ার শরয়ী হুকুম কী? জানাযার সালাতে যারা সূরা ফাতেহা পড়তেন তাঁরা কী হিসেবে পড়তেন আর যাঁরা পড়তেন না তাঁদের বক্তব্য কেমন?

আগেই এর উত্তর দেয়া হয়ে গেছে অর্থাৎ, এর শরয়ী হুকুম বড়জোর জায়েজ, তবে শর্ত হচ্ছে হামদ-ছানাহ (supplication) স্বরূপ পড়বে কিন্তু তেলাওয়াত স্বরূপ পড়বেনা। কেননা সালাতুল জানাযা প্রকৃতপক্ষে সালাত নয়? তাহলে সালাতুল জানাযা কী? এর উত্তর হল, সালাতুল জানাযা (صلاة الجنازة) এর আভিধানিক অর্থ دعاء الميت বা মৃতের জন্য প্রার্থনা। অভিধানে সালাত (صلاة) শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে দোয়া বা প্রার্থনা। আর জানাযা অর্থ মাইয়্যেত বা মৃত ব্যক্তি। কিন্তু তথাপি এটিকে ‘সালাত‘ নামে নামকরণ করার কারণ হিসেবে ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, قال ابنُ حَجر: (قوله سمَّاها صلاة، أي: يُشتَرَط فيها ما يُشتَرَط في الصلاة، وإنْ لم يكن فيها ركوعٌ ولا سجودٌ، فإنَّه لا يُتكلَّم فيها، ويُكبَّر فيها، ويُسلَّم منها بالاتِّفاق). ((فتح الباري)) (3/190). অর্থাৎ এর নাম সালাত রাখার কারণ হচ্ছে, এতেও সেসব কর্ম শর্ত যা প্রকৃত সালাতের জন্য শর্ত, যদিও তার মধ্যে রুকু এবং সেজদা নেই। আর তাতে কথা বলা হয়না এবং সর্বসম্মতিক্রমে তার মধ্যে তাকবির বলা হবে এবং সালাম বলা হবে। (ফাতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী খ-৩ পৃ-১৯০)। সালাতুল জানাযা (صلاة الجنازة) সম্পর্কে ইমাম মালেক (রহ.) একদম পরিষ্কার করে বলেছেন, إنما هو الدعاء অর্থাৎ ‘এ তো দোয়া মাত্র’! (সূত্র, আল মুদাওয়ানাতুল কোবরা [الكتاب: المدونة المؤلف: مالك بن أنس بن مالك بن عامر الأصبحي المدني (ت ١٧٩هـ)] ১ : ২৫১)। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত সালাফ ও বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত আবুল আলিয়া (ابو الْعَالِيَةِ) (রহ.)-এর একটি বক্তব্য পেশ করছি। আবুল মিনহাল আল বছরী (ابو المنهال سيار بن سلامة البصري) বলেছেন, سَأَلْتُ أَبَا الْعَالِيَةِ عَنِ الْقِرَاءَةِ فِي الصَّلَاةِ عَلَى الْجِنَازَةِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ فَقَالَ: “مَا كُنْتُ أَحْسَبُ أَنَّ فَاتِحَةَ الْكِتَابِ تُقْرَأُ إِلَّا فِي صَلَاةٍ فِيهَا رُكُوعٌ وَسُجُودٌ অর্থাৎ আমি আবুল আলিয়া (রা.)-কে সালাতুল জানাযায় ফাতেহা পাঠ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি (আশ্চর্য হয়ে) বললেন, আমার তো ধারণাই ছিল না যে, সূরা ফাতেহা রুকু-সিজদা বিশিষ্ট সালাত ছাড়া অন্য কোনো সালাতেও পড়া যেতে পারে! (সূত্র, আল-মুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং ১১৫২৪)। ইমাম ত্বহাবী (রহ.)-এর উপর আল্লাহ অজস্র ধারায় রহমতের বারিধারা বর্ষণ করুন। তিনি এই হাদীসের অংশবিশেষ থেকে অত্যন্ত চমৎকার একটি ফিকহের গোড়াপত্তন করতে সামর্থ্য হয়েছেন। তিনি এর রহস্য উদঘাটন করে লিখে গেছেন, لعل، قراءة من قرأ الفاتحة من الصحابة كان على وجه الدعاء لا على وجه التلاوة অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কেউ কেউ (জানাযায়) ফাতেহা পাঠ করেছেন বলে যে নস (প্রমাণ) পাওয়া যায় সম্ভবত সেটি ছিল দোয়া হিসেবে, কুরআন তেলাওয়াত হিসেবে নয়। (সূত্র, উমদাতুল ক্বারী শরহে সহীহ বুখারী ৮/১৪১)। স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য :

উমদাতুল ক্বারী কিতাবুল জানায়েজ

তিনি যেন বুঝাতে চাচ্ছেন, সাহাবী ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ঐ কর্মটা মূলত As a face of supplication বা বন্দনামূলক-ই ছিল, not on the face of recitation তথা তেলাওয়াতের নিয়তে ছিল না। সুতরাং বরেণ্য সালাফদের আমল দ্বারা বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, গুটিকয়েক সালফে সালেহীনকে বাদ দিলে বেশিরভাগেরই আমল ছিল খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলের মত যাঁরা জানাযায় ক্বেরাত পাঠ থেকে বিরত ছিলেন। সালাফদের যে বা যারাই জানাযায় সূরা ফাতেহা পড়তেন তারা কেউই জোরে জোরে পড়তেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না, বরং চুপেচুপে পড়ার কথাই বর্ণিত আছে। যেমন হযরত আবু উমামাহ (রা.) থেকে ‘দোয়া অধ্যায়ে‘ বর্ণিত আছে, أَخْبَرَنَا قُتَيْبَةُ، قَالَ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ أَبِي أُمَامَةَ، أَنَّهُ قَالَ السُّنَّةُ فِي الصَّلاَةِ عَلَى الْجَنَازَةِ أَنْ يَقْرَأَ فِي التَّكْبِيرَةِ الأُولَى بِأُمِّ الْقُرْآنِ مُخَافَتَةً ثُمَّ يُكَبِّرَ ثَلاَثًا وَالتَّسْلِيمُ عِنْدَ الآخِرَةِ অর্থাৎ কুতায়বা (রহ.) … আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জানাযার সালাতে সুন্নাহ হল প্রথম তাকবীরে সূরা ফাতেহা চুপেচুপে তেলাওয়াত করবে। অতঃপর আরো তিনটি তাকবীর বলবে; শেষ তাকবীরে সালাম ফিরাবে। (সূত্র, সুনানে নাসাঈ, কিতাবুল জানায়েজ হাদীস নং ১৯৯৩, হাদীস সহীহ)।

  • সূরা ফাতেহা পড়া ছাড়া জানাযার সালাত শুদ্ধ হবে কি?

উত্তরে বলা হবে, অবশ্যই শুদ্ধ হবে। কেননা সহীহ বুখারীতে ইবনে আব্বাস (রা.) হতে এ সম্পর্কে যে হাদীসটি রয়েছে সেখানে পরিষ্কার করে লিখা আছে যে, لِيَعْلَمُوا أَنَّهَا سُنَّةٌ অর্থাৎ যাতে লোকেরা বুঝতে পারে যে, নিশ্চয়ই এটি সুন্নাহ। (সহীহ বুখারী হাদীস নং ১২৫৪; ইফা)। তবে এটি ঐরকম সুন্নাহ নয় যা রাসূল (সা.)-এর কর্ম দ্বারা সাব্যস্ত হয়। সুনানু তিরমিজি গ্রন্থে এই ‘সুন্নাহ’ শব্দটির ওয়াজাহাত (সুস্পষ্টকরণ) রয়েছে এভাবে যে, فَقَالَ إِنَّهُ مِنَ السُّنَّةِ أَوْ مِنْ تَمَامِ السُّنَّةِ ‏.‏ অর্থাৎ তিনি বললেন, এ হলো সুন্নাহ অথবা বলেন, এ হলো সুন্নাহ’র পরিপূর্ণতা বিধানের অন্তর্ভূক্ত। (তিরমিজী হাদীস নং ১০২৭ ;আল মাদানী প্রকাশনী)। বলাবাহুল্য যে, সুন্নাহ তরক করা দ্বারা কখনো কোনো আমল বাতিল হয়না, বেশি থেকে বেশি আমলটি ক্রুটিপূর্ণ হয়। অধিকন্তু রাসূল (সা.) নিজ সত্তার বাহিরে শুধুমাত্র খোলাফায়ে রাশেদীনের কর্মকে ‘সুন্নাহ’ বলেছেন, ঢালাওভাবে সব সাহাবীর কর্মকে আর যাইহোক অন্তত ‘সুন্নাহ’ বলেননি। ইবনে আব্বাসের উক্ত কথা থেকে সূক্ষ্মভাবে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জানাযায় সূরা ফাতেহা পড়ার নিয়মটি পূর্ব থেকে প্রচলিত ছিলনা বলেই ইবনে আব্বাস (রা.)-এর জন্য জানাযার সালাত শেষে ‘নিশ্চয়ই এটি সুন্নাহ’ (لِيَعْلَمُوا أَنَّهَا سُنَّةٌ) এভাবে বলে উপস্থিত সাহাবীদের সংশয় দূরীকরণ আবশ্যক হয়ে পড়েছিল।

  • সাহাবীদের মধ্যে যাঁরা জানাযায় সূরা ফাতেহা পড়তেন তাঁরা কারা? আর যাঁরা পড়তেন না তাঁরা কারা?

যারা সূরা ফাতেহা জানাযায় পড়তেন : সাহাবীদের মধ্যে যাঁদের থেকে জানাযায় সূরা ফাতেহা পড়ার বর্ণনা পাওয়া যায় তাদের মধ্যে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হযরত জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রা.) এবং হযরত আবু উমামাহ আল বাহিলী (রা.) অন্যতম। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হাদীসটি ইমাম তিরমিজি (রহ.) নিজেও তাঁর সুনান গ্রন্থে এনেছেন। হাদীসটি এইরকম, عَنْ طَلْحَةَ بْنِ عَوْفٍ، أَنَّ ابْنَ عَبَّاسٍ، صَلَّى عَلَى جَنَازَةٍ فَقَرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ فَقُلْتُ لَهُ فَقَالَ إِنَّهُ مِنَ السُّنَّةِ أَوْ مِنْ تَمَامِ السُّنَّةِ ‏.‏ অর্থাৎ মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহ.) ….. আবদুল্লাহ ইবনু আওফ (রহ.) থেকে বর্ণিত যে, ইবনু আব্বাস (রা.) একবার সালাতুল জানাযা পড়েন এবং এতে সূরা ফাতেহা পাঠ করেন। এই বিষয়ে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, এ হলো সুন্নাহ অথবা বলেন, এ হলো সুন্নাহ’র পরিপূর্ণতা বিধানের অন্তর্ভূক্ত। (তিরমিজী হাদীস নং ১০২৭; আল মাদানী প্রকাশনী)। ইমাম আবু ঈসা (রহ.) বলেন, হাদীসটি হাসান ও সহীহ্।

ইমাম তিরমিজি (রহ.) বলেছেন, কতেক সাহাবী ও অপরাপর উলামায়ে কেরাম অনুরূপ আমল করেছেন (এতে বুঝা যাচ্ছে সবাই জানাযায় ফাতেহা পড়তেন না-লিখক)। প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতেহা পাঠের বিধান তাঁরা গ্রহণ করেছেন। এটি ইমাম শাফেয়ী, আহমদ ও ইসহাক (রহ.)-এর অভিমত। আবার কতেক উলামায়ে কেরাম বলেছেন, সালাতুল জানাযায় (সূরা ফাতেহা) পাঠ করা হবে না। এতো কেবল আল্লাহর হামদ-ছানাহ এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠ ও মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা। এটি ইমাম সুফিয়ান আস ছাওরী আর কুফাবাসী ফোকাহায়ে কেরামের অভিমত। ইমাম ইবনে বাত্তাল (রহ.) বলেন, وَمِمَّنْ كَانَ لَا يقْرَأ فِي الصَّلَاة على الْجِنَازَة وينكر: عمر بن الْخطاب وَعلي بن أبي طَالب وَابْن عمر وَأَبُو هُرَيْرَة، وَمن التَّابِعين: عَطاء وطاووس وَسَعِيد بن الْمسيب وَابْن سِيرِين وَسَعِيد بن جُبَير وَالشعْبِيّ وَالْحكم، وَقَالَ ابْن الْمُنْذر: وَبِه قَالَ مُجَاهِد وَحَمَّاد وَالثَّوْري، وَقَالَ مَالك: قِرَاءَة الْفَاتِحَة لَيست مَعْمُولا بهَا فِي بلدنا فِي صَلَاة الْجِنَازَة، অর্থাৎ যাঁরা জানাযায় ফাতেহা পড়তেন না, বরং পড়া থেকে বিরত থাকতেন, তাঁদের মধ্যে খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব, আলী ইবনে আবী তালিব, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আবু হুরাইরা প্রমুখ অন্যতম। আর তাবেয়ীগণের মধ্যে ছিলেন, হযরত আত্বা ইবনে আবী রাবাহ, তা‘উস, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, ইবনে সিরীন, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, শা‘বী, হাকাম প্রমুখ অন্যতম। ইবনুল মুনযির (রহ.) বলেছেন, জানাযায় সূরা ফাতেহা না পড়ার এই মত পোষণ করতেন ইবনে আব্বাসের শিষ্য তাবেয়ী হযরত মুজাহিদ, হাম্মাদ ও সুফিয়ান আস ছাওরী প্রমুখও। ইমাম মালেক (রহ.) বলেছেন, ليس ذلك بمعمول به ببلدنا إنما هو الدعاء، أدركت أهل بلدنا على ذلك অর্থাৎ জানাযায় ফাতেহা পড়ার এরকম কোনো আমল আমাদের শহরে (মদীনায়) নেই, যেহেতু এটি নিছক একটা দোয়া আর আমি আমাদের শহরবাসীকে এরই উপর পেয়েছি। (ইমাম বদরুদ্দীন আইনী রচিত ‘উমদাতুল কারী’ শরহে বুখারী ৮/১৩৯)।

যাঁরা সূরা ফাতেহা জানাযায় পড়তেন না : (১) চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা.)-এর জানাযার সালাত পড়ার নিয়ম সহীহ হাদীস থেকে, قال ابن أبي شيبة : حدثنا محمد بن فضيل عن العلاء بن المسيب عن أبيه عن علي أنه كان إذا صلى على ميت يبدأ يحمد الله ويصلى على النبي صلى الله عليه وسلم ثم يقول : اللهم اغفر لأحيائنا و أمواتنا وألف بين قلوبنا وأصلح ذات بيننا واجعل قلوبنا على قلوب خيارنا অর্থাৎ হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি যখন কোনো মৃত ব্যক্তির জানাযার সালাত পড়তেন তখন প্রথমে আল্লাহর হামদ-ছানাহ (প্রশংসা-জ্ঞাপন) করতেন তারপর নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর দরূদ পড়তেন অতপর এই বলে দোয়া করতেন, اللهم اغفر لأحيائنا وأمواتنا وألف بين قلوبنا وأصلح ذات بيننا واجعل قلوبنا على قلوب خيارنا (সূত্র, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং ১১৪৯৪)। তাহকীক, এই বর্ণনার রাবীগণ সকলেই নির্ভরযোগ্য। হযরত আলী (রা.)-এর এই আমল (آثار) দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে, জানাযার সালাতে সূরা ফাতেহা পড়া আবশ্যক নয়, সুন্নাহ-ও নয়।

(২) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর জানাযার সালাত পড়ার নিয়ম সহীহ হাদীস থেকে, مالك عن نافع أن عبد الله بن عمر كان لا يقرأ في الصلاة على الجنازة অর্থাৎ হযরত নাফে (রহ.) বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) জানাযার সালাতে (ক্বেরাত/কুরআন) পড়তেন না। (সূরা মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং ৫২৩; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং ১১৫২২)। তাহকীক, এই আমটিও (آثار) বিশুদ্ধতম সনদে বর্ণিত। এখানেও স্পষ্টভাবে বলা হল, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) জানাযার সালাতে ক্বেরাত পড়তেন না।

(৩) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর জানাযার সালাত পড়ার নিয়ম সহীহ হাদীস থেকে, لم يوقت لنا في الصلاة على الميت قراءة ولا قول كبر ما كبر الإمام وأكثر من طيب الكلام. أورده الهيثمي في مجمع الزوائد وقال : رواه أحمد ورجاله رجال الصحيح অর্থাৎ আমাদের জন্য জানাযার সালাতে কোনো ক্বেরাত (ফাতেহা) কিংবা কোনো বাক্য নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। ইমাম যখন তাকবির বলে তখন তুমিও তাকবির বল। আর অধিক পরিমাণে তার জন্য ভালো কথা বল। (সূত্র, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস নং ৪১৫৩)। তাহকীক, ইমাম নূরউদ্দীন আল হাইছামী (রহ.) বলেছেন, হাদীসটি ইমাম আহমদ উদ্ধৃত করেছেন এবং এর বর্ণনাকারীগণ সহীহ বুখারীর বর্ণনাকারী।

(৪) হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর জানাযার সালাত পড়ার নিয়ম সহীহ হাদীস থেকে, سَأَلَ أَبَا هُرَيْرَةَ كَيْفَ تُصَلِّي عَلَى الْجَنَازَةِ ؟ فَقَالَ أَبُو هُرَيْرَةَ : ” أَنَا ، لَعَمْرُ اللَّهِ أُخْبِرُكَ . أَتَّبِعُهَا مِنْ أَهْلِهَا . فَإِذَا وُضِعَتْ كَبَّرْتُ ، وَحَمِدْتُ اللَّهَ . وَصَلَّيْتُ عَلَى نَبِيِّهِ ” . ثُمَّ أَقُولُ : ” اللَّهُمَّ إِنَّهُ عَبْدُكَ وَابْنُ عَبْدِكَ وَابْنُ أَمَتِكَ كَانَ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ . وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُكَ وَرَسُولُكَ . وَأَنْتَ أَعْلَمُ بِهِ . اللَّهُمَّ إِنْ كَانَ مُحْسِنًا ، فَزِدْ فِي إِحْسَانِهِ . وَإِنْ كَانَ مُسِيئًا ، فَتَجَاوَزْ عَنْ سَيِّئَاتِهِ . اللَّهُمَّ لَا تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ ، وَلَا تَفْتِنَّا بَعْدَهُ ” অর্থাৎ আবু সাঈদ মাকবুরী থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কীভাবে জানাযার সালাত পড়েন? আবু হুরাইরা (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম অবশ্যই আমি তোমাকে বলব। আমি মৃত ব্যক্তির (ঘর থেকে) পরিবারের সাথে জানাযার সাথে সাথে যেতে থাকি। অতপর যখন জানাযাকে (মৃতকে) রাখা হয় আমি তাকবীর দিই এবং আল্লাহর হামদ-ছানাহ (বন্দনা) করি। তারপর নবীর উপর দরূদ পড়ি। অতপর এই দুআ করি… اللهم। (সূত্র, মুয়াত্তা মালেক, হাদীস নং ৫২১; মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৬৪২৫; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং ১১৪৯৫)। তাহকীক, এই বর্ণনার-ও (آثار) সকল রাবী তথা বর্ণনাকারী সিকাহ বা নির্ভরযোগ্য। এতেও সাব্যস্ত হয় যে, জানাযায় সূরা ফাতেহা পড়ার হুকুম হামদ-ছানাহ (বন্দনা) রূপে বড়জোর জায়েজ, কিন্তু সুন্নাহ (সুন্নাতে রাসূল) নয়। যেজন্য আমাদের বাংলাদেশে প্রচলিত জানাযার সালাতকে ভুল আখ্যা দেয়া কোনোভাবেই সুবিচার হবেনা, বরং অবিচার এবং জনমনে ফেতনা সৃষ্টি হিসেবেই গণ্য হবে।

মাসিক আল কাউসার এবং হাদীস বিডি.কম থেকে উপরে উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর বস্তুনিষ্ঠভাবে ও সহজ ভাষায় তুলে ধরা হল! পাঠকবৃন্দ! ভালো মত বুঝার চেষ্টা করবেন, যাতে এধরণের নতুন নতুন যে কোনো মাসয়ালায় বিভ্রান্ত হতে না হয়! লিখাটি উপকারী মনে হলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে দিন বা কপি (Copy) করে পোস্ট করুন!

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী | লিখক ও গবেষক

কেয়ামতে শিঙ্গা ফুঁকা : দু’বার না তিনবার?

0

কেয়ামতে শিঙ্গা ফুঁকা : একটা পর্যালোচনা

বিশুদ্ধ মতানুসারে ২টা শিঙ্গা ফুঁকা হবে। প্রথম শিঙ্গা ফুঁকার সাথে সাথে সমগ্র বিশ্বে মহাপ্রলয় ঘটে যাবে, সব কিছু ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়ে যাবে শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যা অক্ষত রাখতে চান তা ব্যতীত। সূরা আত তাকভীর (৮১:১-২৯) পড়লে এ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি এটা পছন্দ করে যে, কেয়ামতের দৃশ্যকে স্বচক্ষে দেখবে সে যেন সূরা তাকভীর, সূরা ইনফিতার ও সূরা ইনশিকাক পাঠ করে। (তিরমিযী হাদীস নং ৩৩৩৩ সহীহ, السلسلة الصحيحة لالبانى হাদীস নং ১০৮১ তাহকীক, শায়খ আলবানী রহ.)। কারণ সূরা তাকভীরে এসেছে- (পড়তে ক্লিক করুন)।

(আয়াতের অনুবাদ) ‘যখন সূর্যকে গুটিয়ে নেয়া হবে {আবু হোরাইরাহ রা. হতে বর্ণিত নবী করিম (সা.) বলেছেন, الشَّمْسُ وَالقَمَرُ مُكَوَّرَانِ يَوْمَ القِيَامَةِ অর্থাৎ কেয়ামতের দিন সূর্য ও চন্দ্রকে গুটিয়ে নেয়া হবে। সহীহ বুখারী হাদীস নং ৩২০০}, আর নক্ষত্ররাজি যখন পতিত হবে, আর পর্বতগুলোকে যখন সঞ্চালিত করা হবে (এর উদ্দেশ্য, তখন পাহাড় সমূহ মাটির উপর ভেঙ্গে পড়বে ও সারা পৃথিবী প্রকম্পিত হবে), আর যখন দশমাসের গর্ভবতী উটনীগুলো উপেক্ষিত হবে (এখানে দশমাসের গর্ভবতী উটনীকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হল, যদি কেয়ামতের দিন কোনো মানুষের এরূপ মূল্যবান সম্পদ থাকত তাহলে এরূপ মূল্যবান সম্পদও ছেড়ে দিত, কেয়ামতের ভয়াবহতা দেখে তার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করত না।), যখন বন্য পশুগুলিকে একত্রিত করা হবে (এখানে এর উদ্দেশ্য হল, পশুগুলোকে কিসাস আদায় করার জন্য পুনর্জীবিত করে একত্রিত করা হবে । ফলে দুনিয়াতে যে পশুর শিং ছিল না আর তাকে শিংওয়ালা পশু শিং দ্বারা আঘাত করেছিল সে পশু কেয়ামতের দিন শিংওয়ালা পশুকে অনুরূপ আঘাত করে কিসাস আদায় করে নেবে। পরে তারা আবার মাটিতে পরিণত হয়ে যাবে), যখন সমুদ্রগুলোকে অগ্নিউত্তাল করা হবে, আর যখন আত্মাগুলোকে (সমগোত্রীয়দের সাথে) মিলিয়ে দেয়া হবে, আর যখন জীবন্ত কবরস্থ কন্যাকে (জাহেলিয়াতের যুগে কন্যাশিশুকে মাটিতে জীবন্ত পুঁতিয়া ফেলা হত) জিজ্ঞাসা করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে? আর যখন আমলনামাগুলো প্রকাশ করে দেয়া হবে (মৃত্যুর সময় মানুষের আমলনামা গুটিয়ে দেওয়া হয়। পুনরায় কেয়ামতের দিন হিসাবের জন্য তা খোলা হবে। যা প্রতিটি ব্যক্তি তা প্রত্যক্ষ করবে। বরং প্রত্যেকের হাতে তা ধরিয়ে দেওয়া হবে, সূরা ইসরা আয়াত নং ১৪-তেও একই কথা বলা হয়েছে), আর যখন আসমানকে আবরণমুক্ত করা হবে (অর্থাৎ আকাশ ভেঙ্গে ফেলা হবে যেমন ছাদ ভেঙ্গে ফেলা হয়)… ইত্যাদি’ (আয়াত নং ১-১১ অনুবাদ সমাপ্ত হল)।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহতালা দুটি শিঙ্গা ফুঁকা সম্পর্কে বলেন, وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الأَرْضِ إِلا مَنْ شَاءَ اللَّه ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ অর্থ- আর শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে। ফলে আল্লাহ যাদেরকে ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া আসমানসমূহে যারা আছে এবং পৃথিবীতে যারা আছে সকলেই বেহুঁশ হয়ে পড়বে। তারপর আবার শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, তখন তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে। (সূরা যুমার, আয়াত ৬৮)। অধিকন্তু সহীহ বুখারী মুসলিম সহ বিশুদ্ধ সনদে প্রাপ্ত অন্যান্য হাদীস সমূহ দ্বারাও মাত্র ২টা শিঙ্গা ফুঁকা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, ما بين النفختين أربعون অর্থাৎ (কেয়ামতে শিঙ্গা দুইবার ফুঁকা হবে) দুই শিঙ্গার মধ্যবর্তী সময়ের বিশালতা চল্লিশ। (সহীহ বুখারী হাদীস নং ৪৬৫১, সহীহ মুসলিম হাদীস নং ২৯৫৫)। হাদীসটির ‘চল্লিশ’ সংখ্যাটির প্রকৃত তাৎপর্য অস্পষ্ট। তাই বিশেষজ্ঞ মুহাদ্দিসগণের মাঝে এর মর্মার্থ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। চল্লিশ দিন, মাস কিবা বছর ইত্যাদি যে কোনোটা হতে পারে। এ সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান মহান আল্লাহই রাখেন।

তবে কুরআন এবং গুটিকয়েক হাদীসের ইংগিতসমূহ একত্রিত করে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলেছেন, কেয়ামতে ৩টা শিঙ্গা ফুঁকা হবে। প্রথমটির মাধ্যমে পৃথিবীব্যাপী এক মহা ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি হবে। কিন্তু সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাকারক ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) ৩টা শিঙ্গা ফুঁকা সংক্রান্ত রেওয়ায়েত সম্পর্কে লিখেছেন وهو حديث ضعيف مضطرب অর্থাৎ এই বর্ণনা দুর্বল এবং মুদতরিব [বিশৃঙখল জনিত] (ফাতহুল বারী ১১/৩৬৯, ইমাম কুরতুবী সংকলিত তাযকিরাহ পৃ-১৮৪)। সুতরাং কেয়ামতে শিঙ্গা দুইবার ফুঁকা সংক্রান্ত শিক্ষাই বিশুদ্ধ ও অথেনটিক। আল্লাহু আ’লাম।

  • টিকা– হাদীসে মুদতরিব বলে, যে হাদীসের মাঝে সাধারণত রাবীর পরিবর্তন নিয়ে অর্থাৎ সনদের এ স্তরে প্রকৃত রাবী কে—এ নিয়ে অথবা মতন নিয়ে অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে প্রকৃত মতন কোনটি অথবা উভয়ের পরিবর্তন নিয়ে বিরোধ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় আর এ ব্যাপারে দৃঢ়তার দিক থেকে সবগুলো রেওয়ায়েতই সমান মর্যাদার; কোনো একটিকে অপরটির উপর অগ্রাধিকার দেয়া যায় না, এমন হাদীসকে مضطرب বা মুদতরিব বলা হয়। দেখুন, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) রচিত شرح نخبة الفكر বা শরহে নুখবাতুল ফিকার। সকল মুহাদ্দিসীন একমত যে, মুদতরিব হাদীস অথেনটিক নয়।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

আব্দুর রহমান লখভী ও মির্যা কাদিয়ানী

মির্যা কাদিয়ানীর মিথ্যাচার

মির্যা কাদিয়ানী অতি চালাকি করে নিজেই নিজের কথায় কিভাবে ধরা খেল দেখেন….

মরহুম মওলানা আব্দুর রহমান লখভীর সাথে মির্যা কাদিয়ানীর ঐতিহাসিক একটি চমৎকার বিতর্ক নিয়ে একটু লিখব। আব্দুর রহমান লখভী (রহ.) মির্যার সমসাময়িক একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আলেম ছিলেন। ১৮৯১ সাল। মির্যা কাদিয়ানী যখন মানুষকে বিভ্রান্ত করতে শুরু করলো, কখনো মাহদী কখনো বা মসীহ মওউদ আবার কখনো নবী দাবী, কখনো বা নবী দাবী অস্বীকার করে নবী শব্দকে ‘মুহাদ্দাস’ অর্থে উদ্দেশ্য ইত্যাদি বলে একেক সময় একেক রকম বয়ান দিতে লাগলো এবং মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খেলতে শুরু করলো তখন মওলানা আব্দুর রহমান লখভী (রহ.) মির্যার নিকট পত্র প্রেরণ করে জানালেন, আমার নিকট ইলহাম হয়েছে যে, ان فرعون و هامان و جنودهما كانوا خاطئين (অর্থাৎ নিশ্চয়ই ফেরাউন আর হামান আর তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা মিথ্যা) এই ইলহামে ইলাহিতে ফেরাউন দ্বারা মির্যাকে এবং হামান দ্বারা (মির্যার উপদেষ্টা) নুরউদ্দীনকে বুঝানো উদ্দেশ্য । পত্রের কথাগুলো মির্যা কাদিয়ানী সাহেবের লিখনীতেও স্থান পেয়েছে। দেখুন, রূহানী খাযায়েন ২২/৩৬৭-৬৮ (নিচে স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য)। মির্যা কাদিয়ানী পত্রটি হাতে নিয়ে পড়লেন এবং মন্তব্য করে বললেন যে, এই ইলহামের ভেতর তো আমার নাম নেই! তারপর মওলানা আব্দুর রহমান লখভী সাহেব কিছুদিন পর মির্যাকে নতুন আরেকটা ইলহামের সংবাদ দিলেন। তিনি মির্যাকে পরিষ্কার করে জানিয়ে দিলেন, আমার নিকট ইলহাম আসছে যেখানে একদম পরিষ্কার করে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, “মির্যা কাদিয়ানী ফেরাউন আর মিয়া নূরউদ্দিন হামান”। আর একথাগুলো মুসলিম উম্মাহার কল্যাণকামীতার উদ্দেশ্যে জানিয়ে দেয়া আমার জন্য জরুরী ছিল। একথার পর মির্যা কাদিয়ানী চুপ হয়ে যান। তারপরের ইতিহাস আরও দারুন। ১৩১৪ হিজরী। মওলানা আব্দুর রহমান লখভী সাহেবের ইন্তেকাল হয়ে গেল। মির্যা কাদিয়ানী খুশিতে বগলদাবা করতে লাগলেন। তিনি সাথে সাথে আব্দুর রহমান লখভী সাহেবের উপর একটা টাটকা মিথ্যাচার শুরু করে দিলেন। তিনি বললেন, লখভী সাহেব আমাকে ফেরাউন আখ্যা দিয়েছেন আর নিজেকে মূসা সাব্যস্ত করেছেন। মির্যা সাহেব এবার উপরের মিথ্যাচারের উপর যুক্তি পেশ করে বলতে লাগলেন, আশ্চর্যের ব্যাপার হল, ফেরাউন এখনো বেঁচে আছে অথচ মূসা মরে কবরে চলে গেছে, দুনিয়ায় তার নাম নিশানাও বাকি নেই! মির্যা কাদিয়ানী কত ধূর্ত প্রকৃতির মিথ্যাবাদী হলে এধরণের মিথ্যাও প্রচার করতে পারে, তা চিন্তা করতেও মাথা নিচু হয়ে যায়! আহা! একজন ইমাম মাহদী দাবীদার কিভাবে এত জঘন্য মিথ্যাবাদী হয়!! অথচ মওলানা আব্দুর রহমান লখভী সাহেবের পত্রের কোথাও নিজেকে “মূসা” শব্দ ইংগিতেও উল্লেখ নেই। যাইহোক মির্যা সাহেব বোধহয় ধরেই নিয়েছিলেন যে, কেউ কাউকে ফেরাউন আখ্যা দিলে বা ইলহামের মাধ্যমে কারো পক্ষ হতে কেউ ফেরাউন আখ্যা ফেলে তখন প্রতিপক্ষ আপনাপনি মূসা সাব্যস্ত হয়ে যাবেন, যদিও তিনি মূসা দাবী করেন বা না করেন ! কিন্তু বিপত্তি বাধে অন্যখানে। মির্যা কাদিয়ানী সাহেব থেকেও অন্যকে ফেরাউন আখ্যা দেয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। দুঃসংবাদ হল, মির্যা সাহেবের মৃত্যুটা আগে হয়ে যায় আর তার ফেরাউন আখ্যা পাওয়া ব্যক্তি তার মৃত্যুর পর আরও প্রায় ১০ বছরেরও অধিক সময় বেঁচে ছিলেন। মির্যা কাদিয়ানী সাহেব অতি পাণ্ডিত্ব দেখাতে গিয়ে এভাবেই নিজের কথায় নিজে পাকড়াও হন। তিনি অতি চালাকি দেখাতে গিয়ে বহু স্থানে আরও বহু ধরা খেয়েছেন। ইউজে আসেফ সম্পর্কে তিনি সারা দুনিয়ার চোখে ধূলো দিয়ে পরে এমনভাবে ধরা খেয়েছেন যা বর্ণনাতীত। এ সম্পর্কে বিস্তারিত এখান থেকে পড়ুন (ক্লিক)। তিনি ভুলেও চিন্তা করেননি যে, স্যোসাল মিডিয়ার যুগ আসন্ন। তখন তথ্য-উপাত্তের সয়লাব হবে। মিথ্যাবাদীরা সহজেই ধরা পড়তে থাকবে।

আগের কথায় আবার ফিরে আসলাম, মওলানা আব্দুর রহমান লখভী সাহেবের ইলহামকে ভুল সাব্যস্ত করতে মির্যা সাহেব মিথ্যার আশ্রয় তো নিলেন, মনগড়া যুক্তিও পেশ করে নিজেকে রক্ষায় চেষ্টা করলেন। কিন্তু আল্লার মাইর দুনিয়ার বাহির—বাংলায় এই প্রবাদটি তার সাথে এভাবে একাকার হয়ে যাবে তা স্বপ্নেও ভাবেনি কেউ! মির্যা সাহেব তার লিখনীর এক জায়গায় মওলানা হোসাইন বাটালভি (রহ.)-কে “ফেরাউন” আখ্যা দিয়েছেন এবং সেই যুগের অন্য আরেক বিজ্ঞ আলেম মওলানা নজির হোসাইন (রহ.)-কে “হামান” আখ্যা দিয়েছিলেন। (রূহানী খাযায়েন ১২/১৩০, মালফুযাত ৪/২৪৪)। মজার ব্যাপার হল, মির্যা সাহেব তার লিখনীর এক স্থানে নিজেকে সুস্পষ্টভাবে মূসা বলেও দাবী করে লিখে গেছেন। (রূহানী খাযায়েন ১৮/৫৩০)। এখন প্রশ্ন হল, এমতাবস্থায় মির্যা কাদিয়ানী সাহেব নিজেই নিজের মিথ্যাচার আর মনগড়া যুক্তির কারণে নিজেই ধরা খেলেন কিনা? মওলানা আব্দুর রহমান লখভী সাহেব নিজে মূসা দাবী না করেও তিনি যদি মির্যার মৃত্যুর আগে ইন্তেকাল করাটা আপত্তিকর হয় তাহলে মির্যা কাদিয়ানী সাহেব নিজেকে “মূসা” দাবী করা সত্ত্বেও তারই ফেরাউন আখ্যা পাওয়া মওলানা হোসাইন বাটালবী (রহ.)-এর অনেক আগেই তিনি মারা গেলেন কেন? মিথ্যাবাদীর উপর আল্লাহর অভিশাপ। আল্লাহ আমাদের ঈমান ও দ্বীনকে এইরকম জঘন্য মিথ্যাবাদী থেকে রক্ষা করুন। আমীন।

রূহানী খাযায়েন ২২/৩৬৭-৬৮

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

কুরআনের মাপকাঠিতে হাদীস গ্রহণের নীতি কেন পরিত্যাজ্য

এই বিষয়ে লিখতে হবে আগে কখনো ভাবিনি। সম্প্রতি কথিত আহলে কুরআন তথা হাদীস অস্বীকারকারী এক নব্য ফেতনার উদ্ভব হয়েছে, যদিও এই ফেতনা আগেও ছিল; তবে তারা আগে একদমই বিস্তার লাভ করেনি, বড়জোর ইতিহাসের পাতায় কালো অক্ষরের ফ্রেমে বন্দী ছিল। স্যোসাল মিডিয়ার এই সময়টিতে এই ফেতনা যেন কোমরে গামছা বেঁধে ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে হাদীসকে বাতিল সাব্যস্ত করতে।

এবার দেখুন, হাদীস বিরোধী অপপ্রচারকারীদের সম্পর্কে যুগশ্রেষ্ঠ আয়েম্মায়ে কেরাম কী বলে গেছেন। ইমাম খাত্তাবী (রহ.) তার শরহে সুন্নাহ কিতাবে বিখ্যাত হাদীস বিশারদ ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন যে, যারা বলে কুরআনের মাপকাঠিতে হাদীস গ্রহণ করতে হবে, নিশ্চয়ই তাদের এইধরণের কথা যিনদীক তথা ধর্মদ্রোহীরাই গড়েছে (দেখুন, শরহে সুন্নাহ ৪/২৯৯, ইমাম খাত্তাবী)। অর্থাৎ তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, এধরণের অপপ্রচার আজ নতুন নয়, প্রত্যেক যুগেই হাদীসের উপর আক্রমণ হয়েছিল, সামনেও হতে থাকবে, শুধু আক্রমণের ধরন পাল্টিবে। কাজেই কোনো মুসলমানের জন্য উচিত হবেনা তাদের অপপ্রচারে কান দেয়া। এ বিষয়ে অনেক পূর্ব থেকে আয়েম্মায়ে কেরাম দুনিয়াকে সাবধান করে গেছেন। ইমাম খাত্তাবী (রহ.)-এর কিতাব থেকে স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য।

(আরবী) وفي الحديث دلالة على أنه لا حاجة بالحديث إلى أن يعرض على الكتاب؛ فإنه مهما ثبت عن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان حجة بنفسه، و اما ما رواه بعضهم انه قال اذا جاءكم الحديث فأعرضوه على كتاب الله فإن وافقه فخذوه و إن خالفه فدعوه فإنه حديث باطل لا اصل له. و قد حكى زكريا ابن يحيى الساجى عن يحيى ابن معين انه قال هذا حديث وضعته الزنادقة.

অর্থাৎ হাদীসের প্রামাণিকতার জন্য তাকে কুরআনের মুকাবিলায় উপস্থাপন করার কোনোই প্রয়োজন নেই। নিশ্চয়ই এটি রাসূল (সা.) হতে যখনি সাব্যস্ত হয়ে যাবে তখনি তা নিজেই প্রমাণযোগ্য হয়ে যাবে। তবে কেউ কেউ বলেছে যে, যখন তোমাদের নিকট হাদীস পেশ হবে তখন তোমরা তা কিতাবুল্লাহ’র মুকাবিলায় উপস্থাপন করবে। তারপর সেটি কিতাবুল্লাহ’র মুতাবেক হলে তোমরা গ্রহণ করবে আর যদি বিরোধী হয় তখন তোমরা তা পরিত্যাগ করবে, কেননা এমতাবস্থায় এই হাদীস বাতিল ও ভিত্তিহীন। অথচ ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (রহ.) হতে যাকারিয়া ইবনে ইয়াহইয়া আস সাজি বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই এইধরণের কথা যিনদীক তথা ধর্মদ্রোহীরাই গড়েছে

ইমাম ইবনে হাজম (রহ.)ও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে কোনো সহীহ হাদীসই কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।

(আরবী) : ليس في الحديث الذي صح شيء يخالف القرآن الكريم ولا سبيل إلى وجود خبر صحيح مخالف لما في القرآن أصلاً، وكل خبر شريعة فهو إما مضاف إلى ما في القرآن ومعطوف عليه ومفسر لجملته، وإما مستثنى منه لجملته، ولا سبيل إلى وجه ثالث

অর্থাৎ সহীহ হাদীসের কোনো কিছুই কুরআনুল কারীমের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কুরআনের বিপরীতে এমন কোনো সহীহ হাদীসের কখনো অস্তিত্বই থাকার সুযোগ নেই। শরীয়ত সংক্রান্ত যত বর্ণনা রয়েছে তা হয়ত কুরআনের বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্কযুক্ত ও সংযোজিত এবং বিশ্লেষণকারী, অথবা কুরআনের বিষয়বস্তুর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। এর বাহিরে তৃতীয় আর কোনো পথ নেই। (দেখুন, আল আহকাম ফী উসূলিল আহকাম ২/২১৫-২১৬)।

সর্বসাধারণ মুসলিম উম্মাহার খেদমতে কিছু কথা বলে রাখা জরুরি। তা হচ্ছে, ইসলাম মানে শুধু কুরআন হলে আল্লাহ বলতেন না ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো।’ (সূরা মায়িদাহ, আয়াত ৯২)। ‘যে রাসূলের আনুগত্য করলো সে আল্লাহর আনুগত্য করলো।’ (সূরা নিসা, আয়াত ৮০)। আমাদের অবশ্যই চিন্তা করা উচিত যে, মহান আল্লাহ শুধু কিতাব পাঠাননি, তিনি কিতাবের সাথে ব্যাখ্যাতাও (রাসূল সা.) পাঠিয়েছেন। সুতরাং একটি মেনে অপরটি অস্বীকার করা মানে ইসলামকে আংশিক মানা আর আংশিক অস্বীকার করা। বরং হাদীস অস্বীকার করলে কুরআন অস্বীকারের রাস্তাই খুলে যায়। হাদীস অস্বীকারকারীরা কুরআনের সাথে যেভাবে হাদীসের সাংঘর্ষিকতা প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা করেন, ঠিক একইভাবে কুরআনের এক আয়াতের সাথে অন্য আয়াতের সাংঘর্ষিকতা দেখানো যায়। একজন কোনো বই থেকে শিখেছে, দুই যোগ দুই চার হয়। হঠাৎ সে একই বইয়ে তিন যোগ এক চার হওয়ার কথা জেনে আশ্চর্য হওয়া মানুষের মতো অনেকটা হাদীস অস্বীকারকারীদের দশা। হাদীস অস্বীকারকারীদের একটা ধূর্ততা হলো, তারা সরাসরি হাদীস অস্বীকারের কথা বলে না। কুরআনের সাথে হুবহু মিলে এমন হাদীসগুলো মানার কথা বলেন তারা। মূলত শুধু এই শ্রেণীর হাদীস গ্রহণ করা আর না করার মধ্যে পার্থক্য থাকে না। শুধু কুরআন থেকে সালাতের কোনো বিবরণ তো পরের কথা সালাতের আগের কাজ—আযান ও পবিত্রতার পদ্ধতিও প্রমাণ করা যাবে না। প্রয়োজন হবে হাদীসের। যাকাত ও অন্য সব বিষয়েও একই কথা প্রযোজ্য। মূলত, কুরআনকে যদি থিওরি বলা হয় তাহলে হাদীসকে তার প্র্যাক্টিক্যাল বলা যায়। সারা বিশ্বের সব যুগের সব আলিম ও ইমাম হাদীস অস্বীকারকারীদের ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার ব্যাপারে একমত। হাদীস সংকলন, রিজালশাস্ত্র ও জরাহ-তা’দীল প্রভৃতি সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা রাখা কোনো মানুষ হাদীসের প্রামাণ্যতা অস্বীকার করতে পারে না। ইসলামের প্রথম দুই শতকে কেউ হাদীসকে শরীয়তের দলিল হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানায়নি। হিজরী দ্বিতীয় শতকের শেষের দিকে এসে সর্বপ্রথম মুতাযিলা সম্প্রদায় হাদিসকে অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখায়। পরবর্তী যুগের অস্বীকারকারীরা এক্ষেত্রে মূলত মুতাযিলাদেরকেই অনুসরণ করছে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে হাদীস অস্বীকারকারী নামধারী আহলে কুরআনের ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

মুহাম্মদ (সা.) দ্বিতীয়বার জীবিত হয়ে দুনিয়ায় আসা

মির্যা কাদিয়ানীর পুত্র ও তার তথাকথিত মুসলেহ মওউদ মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এ কি লিখলেন দেখুন, بلکہ قرآنی اصطلاح میں ہم کہہ سکتے ہیں کہ محمد صلی الله علیہ وسلم دوبارہ زندہ ہو کر تشریف لے آئے اور یہ ایک بہت بڑے عزت کی بات ہے অর্থাৎ বরং কুরআনের পরিভাষায় আমরা বলে থাকি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয়বার জীবিত হয়ে (দুনিয়ায়) আগমন করবেন এবং এটি (তাঁর জন্য) অনেক বড় সম্মানের ব্যাপার। (খুতুবাতে মাহমুদ পৃ-২৭৫, সন ১৯৪০ ইং, মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ)। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি এই,

স্ক্রিনশট – খুতুবাতে মাহমুদ (উর্দু ভার্সন)

পরিশেষে আমি শপথ করে বলতে পারি, কাদিয়ানী মতবাদের সাধারণ অনুসারীরা কাদিয়ানীবাদের এ সমস্ত কুফুরী সম্পর্কে জানেই না। ফলে তারা ইমাম মাহদীর কনসেপ্ট-এর উপর সম্পূর্ণ চোখবন্ধ করেই মির্যায়ীদের দলে যোগ দিয়েছে। অথচ আল্লাহর রাসূল (সা.) ইমাম মাহদী সংক্রান্ত যতগুলো হাদীসে ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে গেছেন তন্মধ্যে একটি হাদীসও মির্যা কাদিয়ানীর সাথে যায়না। মোটকথা, কাদিয়ানী মতবাদ এক দিকে জঘন্য কুফুরী মতবাদ, অপরদিকে ইসলামের মূলধারার শিক্ষা থেকে পুরোপুরি খারিজ। আমার অনুরোধ রইল, দয়া করে ব্যাপারটিতে সবাই সিরিয়াস হবেন এবং সত্যটা যাচাই-বাছাই করে তাবৎ ধোকা এবং প্রতারণার পথ থেকে ফিরে আসবেন। ওয়ামা আ’লাইনা ইল্লাল বালাগ।

  • মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী থেকে পবিত্র কুরআনের সূরা জুম’আ এর ২ এবং ৩ নং আয়াতের অপব্যাখ্যা দ্বারাও মুহাম্মদ (সা.) দ্বিতীয়বার দুনিয়ায় ফিরে আসার দলিল ও আমাদের পক্ষ হতে তার খণ্ডনমূলক উত্তর এখানে দেখুন!

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

শিক্ষাবিদ ও গবেষক

বঙ্গবন্ধুর দুই সুযোগ্য উত্তরসূরীর দৃষ্টিভঙ্গীর বিরুদ্ধে কাদিয়ানীবাদ

মরহুম প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান :

মরহুম জিল্লুর রহমান (জন্ম: ৯ মার্চ, ১৯২৯ – মৃত্যু: ২০ মার্চ, ২০১৩) বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ। ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে এ যাবৎ দেশের সবকয়টি আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি এম এম রহুল আমিন তাঁকে বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনে শপথ বাক্য পাঠ করান। তিনি একজন সাধারণ শিক্ষিত হয়েও ফতুয়াবাজীর বিরুদ্ধে সময়োপযোগী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একখানা উক্তি করে গেছেন। তিনি হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “যে নিজের মুখে মুসলমান হবার দাবী করে তাকে আমার জন্য মুসলমানদের তালিকাভুক্ত কর”। হাদীস শরীফে আছে, “যে স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে কালেমা তৈয়বা পাঠ করেন এবং তার উপর সার্বিক অর্থে বিশ্বাস স্থাপন করে তিনি মুসলমান।” (দৈনিক সংগ্রাম, মঙ্গলবার, ১৯শে কার্তিক, ১৩৯৯ বাংলা, ৩রা নবেম্বর, ১৯৯২ ইং)।

  • মুসলমান এবং কাদিয়ানীদের মধ্যকার পার্থক্য (লিফলেট), ডাউনলোড লিংক
দৈনিক সংগ্রাম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা :

মাননীয় শেখ হাসিনা ওয়াজেদ (জন্ম: ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭) বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী। তিনিও সমসাময়িক একখানা মহামূল্যবান উক্তি করেছেন। তার এই উক্তি সাম্প্রতিক সময়ে কতিপয় ফতুয়াবাজ মৌলভি আর ভণ্ডনবী মির্যা কাদিয়ানীর লাগামহীন ‘কাফের ফতুয়াবাজি’-এর বিরুদ্ধে সমুচিত শিক্ষা। তিনি (ক্ষমতার বাহিরে থাকাকালীন ২০০৪ সালের দিকে) বলেছিলেন, “কে মুসলমান আর কে নয় তার বিচার করবেন আল্লাহ।” (দৈনিক প্রথম আলো, সোমবার ১২ জানুয়ারী ২০০৪, ২৯ পৌষ ১৪১০ বাংলা)।

উল্লেখ্য, তিনি আহমদীয়া (কাদিয়ানী) সম্প্রদায়ের প্রকাশনা নিষিদ্ধের নিন্দা জানিয়ে ও তৎকালীন কাদিয়ানীদের ‘ইসলামে নবুওয়ত‘ নামীয় একটি বিভ্রান্তিকর বইয়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রায়ের প্রতিবাদে ঐ বক্তব্য দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তখনও জানতেন না যে, কাদিয়ানীদের চেপে রাখা কুফুরী বিশ্বাসগুলো কী কী? তাদের ধর্মবিশ্বাস মতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও যে কাফের, তখন হয়ত তাঁর নিজেরও জানা ছিলনা। (কাদিয়ানীদের ধর্মবিশ্বাস তাদেরই বইয়ের স্ক্রিনশট সহ দেখুন)।

প্রথম আলো, সম্পাদক- মতিউর রহমান (সিপিবি নেতা)

কাদিয়ানীদের বিভিন্ন রচনায় অ-কাদিয়ানীদের কাফের ফতুয়াবাজী :

(১) আহমদীয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী লিখেছেন, ‘খোদাতালা আমার উপর প্রকাশ করে দিয়েছেন যে, যাদের নিকট আমার দাওয়াত পৌঁছেছে আর তারা তা কবুল করেনি এমন ব্যক্তি মুসলমান নয় এবং এরা (পরকালে) পাকড়াও হবে।’ (মির্যা কাদিয়ানীর কথিত ওহী-সমগ্র গ্রন্থ তাযকিরাহ পৃষ্ঠা নং ৫১৯; ইলহাম, মার্চ ১৯০৬ ইং, চতুর্থ এডিশন)।

(২) কাদিয়ানী জামাতের তথাকথিত দ্বিতীয় খলীফা মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ লিখেছেন, ‘যে সমস্ত মুসলমান মির্যা কাদিয়ানীর নিকট বাইয়েত নেয়নি, তারা যদি তার নামও না শুনে থাকে তবুও তারা কাফের এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে বাহিরে।’ (আয়নায়ে সাদাকাত, আনওয়ারুল উলূম খণ্ড নং ৬ পৃষ্ঠা নং ১১০; মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ)।

স্ক্রিনশট সহ দেখতে ক্লিক করুন এখানে। পরিশেষে আমরা প্রমাণ পেলাম যে, কাদিয়ানীদের অথেনটিক সিদ্ধান্ত মতে যে বা যারা তাদের দলভুক্ত নয়, অর্থাৎ মির্যা কাদিয়ানীকে নবী রাসূল ইত্যাদি বিশ্বাস করেনা; তারা কাফের এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে বাহিরে। সুতরাং বলা যায় যে, বর্তমানে মুসলমানরা তাদেরকে কাফের ও অমুসলিম মাইনরিটি বলে রাষ্ট্রীয়ভাবে রায় ঘোষণার দাবী জানানোরও শত বছর আগ থেকে তারাই বরং অন্যদের “কাফের” এবং “জাহান্নামী” বলে লিখে গেছে। এখানে তাদের একটি বাংলা রচনা (মূল লিখক, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী) থেকে শুধুমাত্র একখানা প্রামাণ্য স্ক্যানকপি উল্লেখ করছি।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

- Advertisement -

Recent Posts