Home Blog Page 24

নামাযে কোথায় হাত বাঁধা উত্তম?

নামাযে কোথায় হাত বাঁধা উত্তম?

হানাফীদের দলিল সহীহ হাদীস থেকে

নামাযের মধ্যে হাত কোথায় বাঁধা উত্তম, এ নিয়ে ফোকাহায়ে কেরাম (ইসলামি আইনশাস্ত্রবিদ)গণের মাঝে শুধুমাত্র উত্তম-অনুত্তম প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়েছে। সেটি হল, হাত নাভীর নিচে বাঁধবে নাকি উপরে! শায়খ মুবারকপুরী (রহ.) তার তিরমিজি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ تحفة الأحوذى (তুহফাতুল আহওয়াজি)-তেও (২/৭৪-৭৮) একথাই লিখেছেন। যেমন তিনি লিখেন, أَنَّ الِاخْتِلَافَ بَيْنَهُمْ في الْوَضْعِ فَوْقَ السُّرَّةِ وَتَحْتَ السُّرَّةِ إنما هو في الِاخْتِيَارِ وَالْأَفْضَلِيَّةِ অর্থাৎ ‘এই ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্যকার মতপার্থক্য হচ্ছে, নামাযে দুইহাত নাভীর নিচে রাখা উত্তম নাকি উপরে রাখা উত্তম!’ তবে ‘বুকের উপর বাঁধা’ সংক্রান্ত চূড়ান্ত কোনো মতের উল্লেখ প্রসিদ্ধ চার ইমামের কারো থেকে পাওয়া যায় না। যেহেতু ইমাম শাফেয়ীর মত (ফতুয়া) ‘আল-মাজমূ শরহুল মুহাজ্জাব’ গ্রন্থে (المجموع شرح المهذب) পরিষ্কার লিখা আছে এইভাবে যে, و يجعلها تحت صدره و فوق سرته، هذا هو الصحيح المنصوص অর্থাৎ ‘উভয় হাত বুকের নিচে ও নাভীর উপরে বাঁধবে, শাফেয়ী মাযহাবের প্রকৃত ও সুস্পষ্ট মত এটাই।’ একথা লিখেছেন, ইমাম মহীউদ্দীন আন-নববী আশ-শাফেয়ী। আর ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের চূড়ান্ত ও অগ্রগণ্য মত কীরকম—সে সম্পর্কেও অনুসন্ধান করে পাওয়া যায় যে, ‘মুখতাসারে খিরাকি’ (مختصر الخرقى) কিতাবে পরিষ্কার লিখা আছে, و يجعلها تحت سرته অর্থাৎ দুই হাত নাভীর নিচে বাঁধবে। (লিখক, ইমাম আবুল কাশেম উমর ইবনুল হুসাইন ইবনু আব্দিল্লা ইবনে আহমদ আল খিরাকি)। কিতাবটির ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘আল মুগনী’-তে (১/৫১৪) হাম্বলী মাযহাবের পক্ষ হতে অবশ্য মোট তিনখানা মত উল্লেখ রয়েছে। তবে চূড়ান্ত মত ‘নাভীর নিচে বাঁধা’ই। আর ইমাম মালেকের মতে তো و ندب إرسالهما অর্থাৎ হাত ছেড়ে দাঁড়ানোই মুস্তাহাব। (দেখুন, আল্লামা দারদী আল-মালেকী কৃত শরহে সগীর)। আর ইমাম আবু হানীফা’র মত তো সবারই জানা, নাভীর নিচে এমনভাবে হাত বাঁধা যেন নাভী হাতের উপরের অংশে লেগে থাকে। এটাই উত্তম।

পক্ষান্তরে আহলে হাদীসবন্ধুদের মতে, হাত বাঁধতে হবে বুকের উপর। তাঁদের মতের পক্ষেও দলিল রয়েছে। তাদের সব চেয়ে শক্তিশালী দলিল হল, হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.) বলেছেন, আমি রাসূল (সা.)-এর পেছনে নামায পড়েছি। (আমি দেখলাম) فوضع يده اليمنى على يده اليسرى على صدره অর্থাৎ তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর রেখেছেন। (সহীহ ইবনে খুযাইমা ৩/৩১৩)। তাহকীক, এর সনদে ‘মু’আম্মাল ইবনে ইসমাইল’ নামীয় রাবীকে ইমাম বুখারী (রহ.) ‘মুনকারুল হাদীস’ (منكر الحديث) বলেছেন, ইমাম আবু যুর’আ আর-রাজী বলেছেন, في حديثه خطأ كثير অর্থাৎ হাদীস বর্ণনায় সে খুব বেশি ভুল করত। (তাহযীবুল কামাল ১৮/৫২৬; তাযীবুত তাহযীব ১০/৩৪০; মীযানুল ইতিদাল ৮৯৪৯ দ্রষ্টব্য)। কিন্তু শায়খ ইবনুল কাইয়ুম (রহ.)-এর ‘ইলামুল মুয়াক্কিয়ীন’ গ্রন্থে লিখা আছে, উক্ত রেওয়ায়েতে على صدره (বুকের উপর) এই অংশটি ঐ রাবীরই নিজেস্ব বৃদ্ধি, যার অন্যতম প্রমাণ সহীহ মুসলিমেও বর্ণনাটি ওয়ায়েল ইবনে হুজর থেকে ভিন্ন সহীহ সনদে এসেছে, কিন্তু সেখানে على صدره (বুকের উপর) এই অংশটি নেই। যাইহোক, সনদ যেমনই হোক; বুকের উপর হাত বাঁধা’র একাধিক বর্ণনাও যে রয়েছে তা কিন্তু ঠিক। মোটকথা, ইমাম চতুষ্টয় আর আহলে হাদীস দু’দিকেই দলিল-প্রমাণ থাকা সাব্যস্ত।

এবার হানাফীদের মতের সমর্থনে শুধু একখানা টাটকা সহীহ হাদীস পেশ করা হবে, ‘সাইয়্যেদুল হুফফাজ’ (سيد الحفاظ) উপাধিখ্যাত ও ইমাম বুখারী, মুসলিম সহ সিয়াহ সিত্তা’র চারজন মুহাদ্দিসের উস্তাদ, ইমাম আবুবকর আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবী শায়বাহ (১৫৯-২৩৫ হিজরী) সংকলিত হাদীসগ্রন্থ ‘মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ’ থেকে। সনদ নিম্নরূপ,

শায়খ ইবনে আবী শায়বাহ, ওয়াকী ইবনুল জাররাহ, মূসা ইবনে উমায়ের, আ’লক্বামাহ ইবনে ওয়ায়েল, সাহাবী হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.)। (রাবীদের সবাই ছিকাহ)। এবার হাদীসের অনুবাদ,

(হাদীস) সাহাবী ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.) বলেছেন, رأيت النبي صلى الله عليه وسلم يَضَعُ يَمِينَهُ على شِمَالِهِ تَحْتَ السُّرَّةِ অর্থাৎ ‘আমি নবী করীম (সা.)-কে দেখেছি, তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভীর নিচে রেখেছেন।‘ (হাদীসের মান, সহীহ; রাবীদের সবাই বুখারীর রাবী)। এবার কয়েকজন হাদীস বিশারদের উক্তি পেশ করছি,

(১) মিশর বংশোদ্ভূত ইমাম আবুল ফিদা যায়নুদ্দীন কাশেম ইবনে কুতলুবুগা (الْحَافِظُ الْقَاسِمُ بن قُطْلُوبُغَا) (৪০২-৪৭৯ হিজরী) তার تَخْرِيجِ أَحَادِيثِ الِاخْتِيَارِ شَرْحِ الْمُخْتَارِ নামীয় গ্রন্থে লিখেছেন, هذا سَنَدٌ جَيِّدٌ অর্থাৎ এই সনদটি খুবই ভালো

(২) শায়খ শামসুদ্দীন আবু তাইয়েব আল মাদানী আল মালেকী (মৃত. ৯৬৩ হিজরী) (أبو الطَّيِّبِ الْمَدَنِيُّ) তার شَرْحِ التِّرْمِذِيِّ নামীয় গ্রন্থে লিখেছেন, هذا حَدِيثٌ قَوِيٌّ من حَيْثُ السَّنَدِ অর্থাৎ এই হাদীস সনদের দিক থেকে খুবই শক্তিশালী

(৩) শায়খ মুহাম্মদ আবেদ আস সিন্দী আল আনসারী (১১৯০-১২৫৭) (عَابِدٌ السِّنْدِيُّ) তার طَوَالِعِ الْأَنْوَارِ নামীয় গ্রন্থে লিখেছেন, رِجَالُهُ ثِقَاتٌ অর্থাৎ এর সমস্ত রাবী সিকাহ বা বিশ্বস্থ।

  • তবে এর সনদের উপরেও আপত্তি তোলার চেষ্টা করা হয়। শায়খ মুহাম্মদ হায়াত আস সিন্দী তার ‘ফাতহুল গাফূর’ পুস্তকে লিখেছেন, যদিও এর সনদ সহীহ কিন্তু বর্ণনায় تَحْتَ السُّرَّةِ অংশটুকু মুসনাদে আহমদ গ্রন্থের বর্ণনায় নেই। অথচ একই রাবী থেকে বর্ণিত। হতে পারে ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে উল্লিখিত ইমাম ইবরাহীম নাখয়ী (রহ.) কৃত একটি আছার (বর্ণনা)-এর মধ্যে تَحْتَ السُّرَّةِ অংশটুকু থাকায় কাতেব ভুল করে ঐ রেওয়ায়েতেও লিখে ফেলেন!

উত্তরে বলা হবে যে, (ক) ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (১৬৪-২৪১ হিজরী) ছিলেন মুসান্নাফ-এর সংকলকের একজন ছাত্র। ‘মুসান্নাফ’ (المصنف) কিতাব যখন সংকলন হয় তখন আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) কলমও ধরেননি। এমতাবস্থায় আহমদ ইবনে হাম্বলের সংকলনে ঐ অংশটুকু উল্লেখ না থাকার দরুন একথা কিভাবে বলা যায় যে ‘অতএব মুসান্নাফ কিতাবে অংশটুকু কাতেব ভুল করে লিখে ফেলেন’! এ সংক্রান্ত আরও যত উদ্দেশ্যমূলক ছিদ্রান্দ্বেষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে তার জবাব দেয়া হয় আবুদাউদ শরীফের আরবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘বাজলুল মাজহূদ’-এর (২/২৩) মধ্যে।

(খ) সহীহ ইবনে খুযাইমা’র রেওয়ায়েতে على صدره উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সহীহ মুসলিমের রেওয়ায়েতে على صدره অংশটুকু নেই। বরং সেখানে وضع يده اليمنى على اليسرى পর্যন্ত এসেই শেষ। অথচ একই রাবী থেকে বর্ণিত। এখন যারা উসূলে হাদীস (علم المصطلحات الاحاديث) না বুঝার দরুন এধরণের আপত্তি তুললেন তারা হুবহু ঐ একই যুক্তিতে على صدره অংশটুকুও সহীহ মুসলিমে না আসার কারণ কী ব্যাখ্যা দেবেন? তবে কি ‘ইবনে খুযাইমা’র রেওয়ায়েতেও কাতেবের ভুল হয়ে গিয়েছিল বলবেন? কোনো উত্তর থাকেনা।

(গ) ‘মুসান্নাফ’ কিতাব সংকলনের আগ থেকেই ইমাম চতুষ্টয় নাভির উপর বা নিচে হাত রাখা সুন্নাহ ও উত্তম বলে রায় দেয়াই প্রমাণ করে যে, “নাভির নিচে” শব্দটি মুসান্নাফের বর্তমান নুসখার ন্যায় মূল নুসখাতেও ছিল। যদি কোনো কোনো নুসখায় সত্যিই এই অংশটি না থাকার অভিযোগ সত্য-ও হয় তাতে ইমাম চতুষ্টয়ের সম্মিলিত ফতুয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বেনা। যেহেতু একই সাথে চার চারজন দুনিয়া বিখ্যাত ও সুপ্রসিদ্ধ ইমাম নামাযে হাত ‘নাভির নিচে’ রাখার মত ব্যক্ত করে ভ্রান্তির শিকার হয়েছেন, এটা বিবেক-বহির্ভূত কথা। একই সাথে চারজন ইমামের চোখ কখনো ফাঁকি দেয়া যায় না। এটাই যুক্তিযুক্ত।

শেষকথা, দু’দিকেরই যার যার মতের পক্ষে দলিল প্রমাণ থাকা সাব্যস্ত। কাজেই ‘শুধু একটাকে ধরো আর আরেকটা ছাড়ো’—নীতিটাই ঠিক না। বরং উভয়টাই রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ মনে করে আঁকড়ে ধরতে হবে। রাসূল (সা.)-এর কোনো কোনো সুন্নাহর ন্যায় এই সুন্নাতেও বৈচিত্র্য আনতে হবে। যে যেটা ইচ্ছে আমলে নিবে, তবে অন্যটাকেও স্বীকার করতে হবে। নইলে রাসূল (সা.)-এর অনেকগুলো সুন্নাহর মধ্যে কোনো একটি সুন্নাহর প্রতি নিজেরই অজান্তে বিদ্বেষ রাখার দরুন বিচারদিবসে নিঃসন্দেহে আমাকে-আপনাকে পাকড়াও হতে হবে। মা’আজাল্লাহ। আল্লাহ আমাদের বুঝার তাওফিক দিন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী এম.এ

সজোরে ‘আমীন’ বলা উত্তম-অনুত্তম সম্পর্কে

সজোরে বা আস্তে ‘আমীন’ বলা প্রসঙ্গে

হানাফীদের দলিল সহীহ হাদীস থেকে

নামাযে ‘আমীন’ বলা বিষয়ক রেওয়ায়েত দু’দিকেরই রয়েছে, সজোরে এবং আস্তে। বলে রাখা দরকার, ‘আমীন’ একটি দোয়া ও মোনাজাত, যা আল্লাহতালার দরবারে পেশ করা হয়। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা, উম্মে সালমাহ, আবু হোরায়রা ও ইবনে আব্বাসের শাগরেদ বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত আতা ইবনে আবী রাবাহ (عطاء ابن ابى رباح) এর বর্ণনায় এসেছে যে, ‘আমীন হচ্ছে একটি দোয়া’ (آمين دعاء)। সহীহ বুখারী ১/১০৭ দ্রষ্টব্য। আর আল্লাহ (নাউযুবিল্লাহ) না বধির, না অনুপস্থিত—যেমনটি বুখারী শরীফেও এসেছে যে, لا تدعون أصمَّ ولا غائباً অর্থাৎ ‘তোমরা কোনো বধির কিংবা অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছো না।’ (সহীহ বুখারী হাদীস নং ৭৩৮৬)। তাই গবেষকদের বিশাল একটি অংশ মনে করেন, দোয়া যখন আস্তে করাই উত্তম, তখন নামাযে ‘আমীন’ও আস্তে বলা উত্তম। আর সজোরে বলা বড়জোর মুবাহ, যেহেতু বিভিন্ন রেওয়ায়েত বলছে, সজোরে ‘আমীন’ বলা শিক্ষাদানের জন্যই ছিল (ما اراه الا ليعلمنا), Just as a Teaching, Not Continuously; নও মুসলিম হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.) বলেন, ثلاث مرات অর্থাৎ রাসূল (সা.) ‘আমীন’ সজোরে তিনবার বলেছেন। এখন তো ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়ে গেল! যাইহোক, আমি এখানে আস্তে ‘আমীন’ বলার একটি মাত্র রেওয়ায়েত পেশ করছি,

হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, إذا أمَّنَ الإمام فأمِّنوا অর্থাৎ ইমাম যখন ‘আমীন’ বলবে তখন তোমরাও আমীন বলো (তবে এ থেকে সজোরে না আস্তে—এর কোনোটাই পরিষ্কার করে বোঝা যায়না-লিখক)। فإنه مَن وافَقَ تأمينُه تأمينَ الملائكة غُفِرَ له ما تقدَّم من ذنبه অর্থাৎ কেননা যার ‘আমীন’ বলা ফেরেশতাদের ‘আমীন’ বলার সাথে মিলে যাবে তার পেছনের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (সহীহ বুখারী, মুসলিম, কিতাবুস সালাত)।

প্রশ্ন আসতে পারে যে, তাহলে এই হাদীস আস্তে আমীন বলার সমর্থনে দলিল কিভাবে হল?

উত্তর এই যে, হাদীসটিতে বলা হয়েছে—ইমাম যখন আমীন বলবে…. (إذا أمَّنَ الإمام)। তাই এখন দেখতে হবে যে, এই বর্ণনানুসারে ইমামের (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ’র) ‘আমীন’ জোরে ছিল, না আস্তে ছিল! সহীহ মুসলিম এবং সুনানে আবুদাউদ শরীফে উক্ত হাদীসের রাবী (বর্ণনাকারী) শিহাব ইবনে জুহরীর রেওয়ায়েত শেষে পরিষ্কার করে এই বাক্যটিও বর্ণিত হয়েছে যে, و كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول آمين অর্থাৎ ‘আর রাসূল (সা.)ও আমীন বলতেন।’ এখন এখানে প্রশ্ন আসে, এই হাদীসের إذا أمَّنَ الإمام (ইমাম যখন আমীন বলবে) দ্বারা রাসূল (সা.)ও আমীন ‘উঁচু আওয়াজে’-ই বলতেন, এমনটা বুঝালে তবে ইমাম জুহরী (রহ.) সেটিকে স্বতন্ত্র বাক্যে পুনরায় উল্লেখ করার কী অর্থ? অতএব, বুঝা যায় যে নিশ্চয়ই রাসূল (সা.)-এর ‘আমীন’ বলাটা সজোরে ছিলনা। অন্যথা রাবীর এমন কর্মকে تحصيل حاصل (তাহছীলে হাছেল) বা পুনঃবৃত্তি (tautology) বলতে হয়, যা ব্যাকরণের নীতিবিরুদ্ধ ও নিন্দনীয়। হযরত সামুরা ইবনুল জুনদুব (রা.) এবং হযরত ইমরান ইবনুল হোসাইন (রা.) দুইজন একবার হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর নিকট গেলেন। সামুরা (রা.) হাদীস বর্ণনা করে বললেন যে, রাসূল (সা.) নামাযে তাকবীরে তাহরিমার পরে এবং ‘ওয়ালাদ-দাললীন” (ولا الضالين)-এর পরেও কিছু সময় চুপ থাকতেন। হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) শুনলেন এবং সামুরা (রা.)-এর রেওয়ায়েতের সাথে সহমত ব্যক্ত করলেন। তিনি বললেন, সামুরার স্মরণই যথার্থ। (আস-সুনানুল কোবরা লিল বায়হাক্বী খণ্ড নং ২, কিতাবুস সালাত; হাদীস নং ৩০৭৫)। এই থেকেই পরিষ্কার বুঝা যায় যে, রাসূল (সা.)-এর ‘ওয়ালাদ-দাললীন” (ولا الضالين)-এর পরেও চুপ থাকতেন মানে তিনি ‘আমীন’ নিঃশব্দে বলতেন। অতএব, সহীহ বুখারীর হাদীসের অস্পষ্ট বিবরণ ও সাহাবীর সুস্পষ্ট সাক্ষ্য সহ প্রমাণিত হয় যে, নামাযে ‘আমীন’ আস্তে বলার দলিলও খুব শক্তিশালী। এমন শক্তিশালী দলিল পেয়ে এবার আপনার নিশ্চয়ই মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে, তাই নয় কি? হ্যাঁ, সত্য এটাই; যা ব্যাপক পড়াশোনা না থাকার দরুন আমাদের অধিকাংশই জানত না।

এই পর্যায় উল্লেখ করা জরুরি যে, ‘আমীন’ বলার যতগুলো সহীহ হাদীস রয়েছে সেগুলোর একটিও ‘সজোরে’ বলার মর্মে সরীহ বা সুস্পষ্ট নয়, বরং অস্পষ্ট। আবার যেগুলো সরীহ—দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সেগুলো সনদের বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনা।

শেষকথা, উত্তম-অনুত্তম বিষয়ক রেওয়ায়েত নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা থেকে সবাই বিরত থাকতে হবে। যেখানে দুই দিকেরই রেওয়ায়েত বিদ্যমান সেখানে উভয় রেওয়ায়েতের উপরই উম্মাহার বৈচিত্র্যময় আমল জারি থাকুক, এই প্রত্যাশা। তবে যেই সমাজে-এলাকায় পূর্ব থেকে যেটি চালু রয়েছে সেখানে সেটির মুকাবিলায় অন্যটিতে জোর না দিই। নচেৎ ফেতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার আপনাকেই নিতে হবে, উম্মাহার মাঝে দলাদলি সৃষ্টির গুনাহও আপনাকেই বহন করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সহীহ বুঝ দিন।

নামাযে রাফউল ইয়াদাইন (ফেইসবুক থেকে)

সজোরে বা আস্তে ‘আমীন’ বলা প্রসঙ্গে (ফেইসবুক থেকে)

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

নামাযে রাফউল ইয়াদাইন করার হুকুম

রাফউল ইয়াদাইন

হানাফীদের দলিল সহীহ হাদীস থেকে

নামাযে তাকবীরে তাহরিমা ছাড়া হাত আর কোথাও না উঠানোর পাঁচটি স্পষ্ট রেওয়ায়েত আছে। সেগুলোর একটি হচ্ছে, হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামায পড়ে দেখাব কি? একথা বলে তিনি فصلى فلم يرفع يديه الا فى اول مرة অর্থাৎ নামায পড়লেন এবং শুধুই প্রথমবার তাকবীরে তাহরিমায় হাত উঠালেন। (তিরমিজি হাদীস নং ২৫৭, আবুদাউদ হাদীস নং ৭৪৮)।

তাহকীক : ইমাম তিরমিজি বলেছেন, এই হাদীস হাসান, ইমাম ইবনে হাযম বলেছেন, এটি সহীহ, (আল মুহাল্লা ৪/৮৮)। আল্লামা আহমদ মুহাম্মদ শাকের (রহ.) লিখেছেন, و هذا الحديث صحيح صححه ابن حزم و غيره من الحفاظ، وما قالوا فى تعليله ليس بعلة অর্থাৎ এই হাদীসের সনদ সহীহ। ইবনে হাযম সহ অনেক হাফেজে হাদীস এটিকে সহীহ বলেছেন। অন্যরা এতে যেসব ইল্লত (ত্রুটির কারণ) সাব্যস্ত করেছেন সেগুলো আদৌ কোনো ইল্লতই নয়। (শরহে জামে তিরমিজি ২/৪১)।

শেষকথা, নামাযে হাত বিভিন্ন জায়গায় উঠানোর পক্ষে যেমন রেওয়ায়েত রয়েছে, হাত না উঠানোরও রয়েছে। এই সম্পর্কে যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দেস সাইয়েদ আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) বলেছেন, تواتر العمل بهما من عهد الصحابة و التابعين و اتباعهم على كلا النحوين و انما بقى الاختلاف فى افضل من الامرين. অর্থাৎ উভয়ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্নভাবে আমল হয়ে আসছে—সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীদের যুগ থেকেই; তবে মতপার্থক্য শুধু এতটুকুতেই যে, এর কোনটি উত্তম।

অতএব, উত্তম-অনুত্তম বিষয়ক রেওয়ায়েত নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা থেকে সবাই বিরত থাকতে হবে। যেখানে দুই দিকেরই সহীহ রেওয়ায়েত বিদ্যমান সেখানে উভয় রেওয়ায়েতের উপরই উম্মাহার বৈচিত্র্যময় আমল জারি থাকুক, এই প্রত্যাশা। তবে যেই সমাজে-এলাকায় পূর্ব থেকে যেটি চালু রয়েছে সেখানে সেটির মুকাবিলায় অন্যটিতে জোর না দিই। নচেৎ ফেতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার আপনাকেই নিতে হবে, উম্মাহার মাঝে দলাদলি সৃষ্টির গুনাহও আপনাকেই বহন করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সহীহ বুঝ দিন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

কাদিয়ানীদের ধারাবাহিক প্রশ্নগুলোর জবাব

0

খুব সাধারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয়া হল যেগুলো সচরাচর করা হয়ে থাকে। পাঠকবৃন্দ, উত্তরগুলো আমার ফেইজবুক পেইজ থেকে পড়তে ক্লিক করুন!

আপনার জিজ্ঞাসার উত্তরে….
কিস্তি ১ https://www.facebook.com/226066450926065/posts/1831556610377033/
কিস্তি ২ https://www.facebook.com/226066450926065/posts/1831969627002398/
কিস্তি ৩ https://www.facebook.com/226066450926065/posts/1831995306999830/
কিস্তি ৪ https://www.facebook.com/226066450926065/posts/1832536086945752/
কিস্তি ৫
https://www.facebook.com/226066450926065/posts/1835901869942507/

উত্তরদাতা, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী, লিখক ও গবেষক।

আয়েশা (রা.)-এর বিবাহ কত বছর বয়সে?

ঐতিহাসিক একটি প্রামাণ্য তথ্য ও সমালোচকদের দাঁতভাঙা জবাব!

এঁরাও বিখ্যাত মহামনীষী! কিন্তু এঁদের বিয়ে সংক্রান্ত বয়স নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলেনা! প্রশ্ন তুলবে-ই বা কেন? সময় আর অঞ্চল ভেদে বিবাহের আদর্শ বয়স যে বিভিন্ন হয়ে থাকে, যদিও সময়ের পরিক্রমায় সেই নিয়মেও পরিবর্তন আসতে থাকে! বলতে ছিলাম, ইতিহাসবিখ্যাত অনেকের জীবন ঘাটলে আমরা দেখি,

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিয়ে করেছিলেন ১৪ বছর বয়সে তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল ৮ বছর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন ২২ বছর বয়সে তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল ১১ বছর।

বঙ্কিমচন্দ্র বিয়ে করেছিলেন ১১ বছর বয়সে তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন ১৪ বছর বয়সে তখন তাঁর স্ত্রী সারদা দেবীর বয়স ছিল মাত্র ৬ বছর।

শিবনাথ শাস্ত্রী বিয়ে করেছিলেন ১৩ বছর বয়সে, তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল ১০ বছর।

রাজনারায়ণ বসু বিয়ে করেছিলেন ১৭ বছর বয়সে তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল ১১ বছর।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন ১৯ বছর বয়সে, তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর।

সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন ১৭ বছর বসে তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল মাত্র ৭ বছর।

লিনা মেদিনা! ৫ বছর ৭ মাস ২১ দিন বয়সে সন্তানের জন্ম দেয়ায় বিশ্বরেকর্ড করা সর্বকনিষ্টা মা উল্লেখ করে তার বন্ধনা করা হয়।

দ্বিতীয় কিং রিচার্ড ৩০ বছর বয়সে ফরাসি রাজকুমারী ৭বছর বয়সী ইসাবেলাকে বিয়ে করেন।

পর্তুগালে রাজা ডেনিস ১২ বছর বয়সী সেন্ট এলিজাবেথকে বিবাহ করেছিলেন।

নরওয়ের ষষ্ঠ রাজা হাকোন ১০ বছরের রাণী মার্গারেটকে বিবাহ করেছিলেন।

এসেক্সের কাউন্ট আগ্নেসের বিয়ের পাকা কথা হয় মাত্র ৩ বছর বয়সে। ১২ বছর বয়সে তার বিবাহ হয় পঞ্চাশ বছর বয়সী সঙ্গির সাথে।

রোমানোস ইতালির রাজকন্যা ৪ বছর বয়সী বার্থা ইউডোকিয়াকে বিবাহ করেন। ইতিহাসের পাতায় এরকম অসংখ্য নজির আছে। এগুলো আমাদের ইতিহাসের অংশ। এসব আমাদের ভুলে যাওয়া সমীচিন নয়।

একসময় সতীদাহ প্রথা ছিল। জীবন্ত নারীকে সহমরণে তার মৃত স্বামীর সঙ্গে চিতায় আত্মহুতি দিতে হতো। কিন্তু সতীদাহ বা সহমরণই হিন্দু ধর্মের বৈশিষ্ট্য বলার অর্থ হিন্দুর প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ চর্চা করা। হিন্দু শাস্ত্রের ধূয়া তুলে হিন্দুর প্রতি ঘৃণা ও সহিংসতা একালে কেউ প্রদর্শন করে না। কারণ, সমাজ, আইন, সংস্কৃতি ও ইতিহাস ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের চেতনা উপলব্ধি ও বিচার ক্ষমতা অনেক বিকশিত হয়েছে। আগের মতো নাই। ইতিহাস ও সমাজ স্থির কিছু নয়, বদলায়। ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু দেশ ও কাল বিবেচনায় না নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে দোষী করলে সেটা কাণ্ডজ্ঞানের অভাব হবে। তাই না?

তাহলে ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে এত বিতর্ক কেন?

এই তো মাত্র গত শতাব্দীর কথাই ধরে নেয়া যাক। প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বয়স যখন ১৩ ও বেগম ফজিলাতুন্নেসার বয়স যখন মাত্র তিন, তখন পরিবারের বড়রা তাদের বিয়ে ঠিক করেন। ১৯৩৮ সালে বিয়ে হবার সময় বেগম ফজিলাতুন্নেসা রেনুর বয়স ছিল ৮ বছর ও শেখ মুজিবের ১৮ বছর। এখানে কারো সাথে কারো তুলনা টানা উদ্দেশ্য নয়, আর এটি সম্ভবও না; কারণ মহানবীর সাথে শেখ সাহেবের তুলনা করতে চাওয়াই বোকামি! বড়জোর এখানে আজ থেকে ১৪শ বছর আগেকার বিয়ের আদর্শ বয়স যে মাত্র ৮-১২ এর ভেতরই ছিল সেটা তুলে ধরতে চাচ্ছিলাম।

বলা হয় যে, হযরত আয়েশা (রা.) ৯ বছর বয়সে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে সংসার শুরু করেছিলেন। ব্যাস আর কী লাগে!! মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় তুফান শুরু! কিন্তু এটা কেমন ন্যায় বিচার? মহানবীর সেই সময়টিতে বিবাহের আদর্শ বয়স যদি ওটাই হয়ে থাকে তবে তো উচিত ছিল, সেটিকে সেই সময়ের প্রচলিত আইনেই বিচারকরা! মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে কন্যা আর কন্যাপক্ষের কিংবা সে সময়কার প্রচলিত নিয়ম ভঙ্গের যদি কোনো অভিযোগ না থাকে, তবে তো তিনি ন্যায়বিচার পাওয়ারই যোগ্য, তাই নয় কি?

  • অপ্রিয় হলেও সত্য, হযরত আয়েশা (রা.)-এর বয়স তখন ৬-৯ বছর ছিল মর্মে তথ্যটিও কোনো কোনো গবেষকের বিচারে সুনিশ্চিত নয়। এমনকি সহীহ বুখারীরই সূত্র পরম্পরায় দু’টি মতই প্রথম থেকে প্রচলিত। কারণ সহীহ বুখারীসহ আরও বহু ঐতিহাসিক প্রামাণ্য তথ্য মতে সুস্পষ্ট আছে যে, হযরত আয়েশা (রা.)-এর বিয়ের সময় বয়স কম চে কম ১৩-১৯ এর ভেতরেই ছিল। অধিকন্তু ৬ আর ৯ বছরের বর্ণনার সূত্রে উল্লিখিত হিশাম ইবনে উরওয়াহ নামের রাবী (হাদীসের বর্ণনাকারী জনৈক তাবেয়ী) সম্পর্কে ইমাম মালেক (রহ.) আজ থেকে ১২’শ বছর আগেই বলে গেছেন যে, তিনি শেষ বয়সে (তথা ৭১ বছর বয়সে উপনীত হলে) মদিনা থেকে ইরাক চলে যাওয়ার পর স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ফলে তার বর্ণনায় অনেক কিছুই উল্টোপাল্টা হয়ে যেত। সেজন্য তার থেকে কোনো ইরাকী রাবী যত হাদীসই বর্ণনা করবে, সেগুলো গ্রহণযোগ্য হবেনা।

উল্লেখ্য, বুখারী শরীফে হযরত হিশাম ইবনে উরওয়াহ তিনি ইরাকি রাবী থেকেই এটি বর্ণনা করেন। দেখুন, তাহযীবুত তাহযীব, লেখক ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)। প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম আবুল হাসান ইবনে ক্বাত্তান (রহ.) ‘বায়ানুল ওয়াহাম ওয়াল ইবহাম‘ (بيان الوهم و الإبهام) কিতাবের ৫ম খন্ডের ৫০৪ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন: أن هشام اختلط في آخر عمره অর্থ হিশাম ইবনে উরওয়াহ শেষ বয়সে উল্টাপাল্টা করে ফেলত।’

  • ইমাম যাহাবী (রহ.) ‘মিযানুল ই’তিদাল‘ কিতাবের ৪র্থ খন্ডের ৩০১-৩০২ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, هشام بن عروة أحد الأعلام، حجة إمام، لكن في الكبر تناقض حفظه و لم يختلط أبداً অর্থ হিশাম ইবনে উরওয়াহ (রহ.) তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। নির্ভরযোগ্য ইমাম ছিলেন। তবে বৃদ্ধাবস্থায় তার স্মৃতিলোপ পায় অথচ (ইতিপূর্বে) তিনি কখনো উল্টাপাল্টা করেননি।’ আরো দেখুন, আল-জারহু ওয়াত তা’দীল ৬/৪৯০, ইমাম যাহাবী (রহ.)।

আসলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নিয়ে অহেতুক সমালোচনার প্রধান কারণ হলো তার অতুলনীয় উত্তম চরিত্র মাধুরী। যে চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে দেড় হাজার বছর ধরে মানুষ অনবরত ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিতর্কিত করে তারা বিশ্বব্যাপী ইসলাম গ্রহণের অগ্রযাত্রা রুখে দিতে চায়।

বিজেপি নেতা নেত্রি ও নূপুর শর্মাগং যা-ই বলুক না কেন, স্বয়ং আল্লাহতালা তাঁর প্রিয় হাবীবের চরিত্রের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, اِنَّکَ لَعَلٰی خُلُقٍ عَظِیۡمٍ (ইন্নাকা লা’আলা খুলুকিন আযীম)। অর্থ-নিশ্চয়ই আপনি সর্বোৎকৃষ্ট চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত। (আল কুরআন)। কিয়ামত পর্যন্ত এই চরিত্র মাধুরী পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে প্রধান আকর্ষণ হয়ে থাকবে। দলে দলে মানুষ মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত হবার সৌভাগ্য অর্জন করতে থাকবে, ইনশাআল্লাহ। তোমাকে ভালোবাসি হে প্রিয়নবী! তোমার চরণে উৎসর্গ করছি আমার স্বর্গ-নরক প্রিয় বাবা-মা।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

কাদিয়ানীরা মুসলমানদের ব্যাপারে কেমন ধারণা রাখে?

দ্বিমুখী নীতি ও প্রতারণার আরেক নাম ‘কাদিয়ানী জামাত’!

অপ্রিয় হলেও সত্য, সারা দুনিয়ার মুসলিম উম্মাহা কাদিয়ানীদের ‘কাফের-অমুসলিম-জিন্দিক’ আখ্যা দেয়ার অনেক পূর্ব থেকে ওরাই বরং সমস্ত ‘অ-কাদিয়ানী’কে (অর্থাৎ যারা কাদিয়ানী মতের অনুসারী নয় এমন প্রত্যেককে) কাফের আখ্যা দিয়ে রেখেছে। বরং ইহুদী, খ্রিস্টান, অমুসলিম, মুরতাদ, জাহান্নামী ইত্যাদী শব্দেও আখ্যা দিয়েছে। আমি আজ এখানে রেফারেন্স সহ কিছু উদ্ধৃতি সংক্ষেপে তুলে ধরছি। তা পড়ার আগে কাদিয়ানী জামাতের পাক্ষিক আহমদী (তাং ১৫ ডিসেম্বর ২০১২, পাতা ৬) নামীয় ম্যাগাজিনের এই পাতাটি পড়ে নেবেন! এবার নিশ্চয়ই চমকে উঠেছেন, তাই না! হ্যাঁ, চমকে উঠারই কথা। কারণ, পাক্ষিক আহমদী পত্রিকায় এত সুন্দর করে কথাগুলো যারা লিখেছেন তাদেরই পূর্বসূরীরা কিন্তু এত সুন্দর করে মুসলমানদের নিয়ে লিখেনি।

মির্যা কাদিয়ানী আর তার দুই পুত্রের রচনাবলি থেকে নিম্নরূপ :

(১) ‘খোদাতালা আমার উপর প্রকাশ করে দিয়েছেন যে, যাদের নিকট আমার দাওয়াত পৌঁছেছে আর তারা তা কবুল করেনি এমন ব্যক্তি মুসলমান নয় এবং এরা (পরকালে) পাকড়াও হবে।’ (মির্যা কাদিয়ানীর কথিত ওহী-সমগ্র গ্রন্থ তাযকিরাহ পৃষ্ঠা নং ৫১৯; ইলহাম, মার্চ ১৯০৬ ইং, চতুর্থ এডিশন)।

  • মির্যা কাদিয়ানী সাহেব জনৈক প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তরে পরিষ্কার করে লিখে গেছেন যে, এখন যারা তাকে অস্বীকার করে সে কাফের। তিনি তার ‘কাফের’ ফতুয়ার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। সুতরাং সাব্যস্ত হল যে, অ-কাদিয়ানীদের কেউই তাদের দৃষ্টিতে মুসলমান নয়। হোক সে মসজিদুল হারামাইনের ইমাম-খতিবগণ কিংবা আমাদের দেশের সেসব রাজনৈতিক ব্যক্তিগণ-ও যারা কাদিয়ানীদের প্রতি এতই উদার যে, তারা তাদেরকে অমুসলিম বা কাফের মানতে নারাজ। বলাবাহুল্য, আমাদের দেশের জাতীয় নেতৃবৃন্দ কেউই কাদিয়ানীদের দৃষ্টিতে মুসলমান নন, এমনকি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুও তাদের মৌলিক বিশ্বাসের দিক থেকে অমুসলিম, জাহান্নামী। নাউযুবিল্লাহ। মির্যার বইয়ের বাংলা অনূদিত কপি হাকীকাতুল ওহী থেকে স্ক্রিনশট দেখুন,


(২) ‘প্রত্যেক মুসলমান এই বইগুলোকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখে এবং এগুলোতে পরিবেশিত তত্ত্ব ও তথ্য দ্বারা উপকৃত হয় এবং আমার ইসলামের দিকে আহবান করাকে সমর্থন দেয়, ইল্লা যুররিয়্যাতুল বাগাইয়া তথা বেশ্যার সন্তানরা ছাড়া, আল্লাহ এদের উপর মোহর মেরে দিয়েছেন তারা ঈমান আনবেনা।’ (আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, রূহানী খাযায়েন খন্ড নং ৫ পৃষ্ঠা নং ৫৪৭-৪৮)।

(৩) মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ লিখেছেন, ‘আমাদের জন্য ফরজ হচ্ছে, আমরা যেন গয়ের আহমদীদেরকে (অর্থাৎ অ-কাদিয়ানীদেরকে) মুসলমান মনে না করি এবং তাদের পেছনে সালাত না পড়ি। কেননা আমাদের দৃষ্টিতে তারা খোদাতালার একজন নবীকে অস্বীকারকারী। এটি ধর্মীয় মু’আমালা (অর্থাৎ ধর্মীয় পারস্পরিক সম্পর্ক), এতে কিছু করার মত কারো কোনো ইখতিয়ার বা সুযোগ নেই।’ (আনওয়ারুল উলূম খণ্ড নং ৩ পৃষ্ঠা নং ১৪৮; মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ)।

মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এর ‘আনওয়ারে খিলাফাত’ থেকে প্রামাণ্য স্ক্যানকপি

মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এর ‘বারাকাতে খিলাফত‘ গ্রন্থে লিখা আছে, কোনো আহমদী যেন গয়ের আহমদীর নিকট কন্যাদান না করে। এটি হযরত মসীহ মওউদের কড়া নির্দেশ। এই নির্দেশ সম্পন্ন করা প্রত্যেক আহমদীর উপর ফরজ। স্ক্রিনশট দেখুন।

(৪) ‘যে সমস্ত মুসলমান মির্যা কাদিয়ানীর নিকট বাইয়েত নেয়নি, তারা যদি তার নামও না শুনে থাকে তবুও তারা কাফের এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে বাহিরে।’ (আয়নায়ে সাদাকাত, আনওয়ারুল উলূম খণ্ড নং ৬ পৃষ্ঠা নং ১১০; মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ ও কাদিয়ানীদের দ্বিতীয় খলিফা)। নিচের সম্পূর্ণ পাতাটির বাংলা অনুবাদ দেখানে এখানে

(৫) মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘আমি মসীহ মওউদ (মির্যা) এর নানা উদ্ধৃতি দ্বারা সাব্যস্ত করছি যে, যে তাকে অস্বীকার করবে সে তার দৃষ্টিতে একজন কাফের।’ (আয়নায়ে সাদাকাত, আনওয়ারুল উলূম খণ্ড নং ৬ পৃষ্ঠা নং ১৫১)।

(৬) ‘যারা তাকে কাফের মনে করে তিনি শুধু তাদেরকেই কাফের বলেননি, বরং যারা তাকে কাফের তো বলেনা কিন্তু তার দাবীগুলো স্বীকার করেনা, এমন ব্যক্তিদেরও তিনি কাফের আখ্যা দিয়েছেন।’ (আয়নায়ে সাদাকাত, আনওয়ারুল উলূম খণ্ড নং ৬ পৃষ্ঠা নং ১৫১)।

(৭) ‘সর্বশেষে তিনি (মির্যা) কুরআনুল কারীমের একখানা আয়াত দ্বারা দলিল দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি মির্যা সাহেবকে রাসূল মানবেনা, সে যদিও তাকে মুখে মুখে একজন সত্যবাদী মেনে নেয় না কেন; সেও পাক্কা কাফের।’ (আয়নায়ে সাদাকাত, আনওয়ারুল উলূম খণ্ড নং ৬ পৃষ্ঠা নং ১৫১)। ৫, ৬ এবং ৭ নং এর স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য।

(৮) মির্যাপুত্র মির্যা বশির আহমদ এম.এ লিখেছেন,

پس اس آیات کے ماتحت ہر ایک ایسا شخص جو موسی کو تو مانتا ہے مگر عیسی کو نہیں مانتا یا عیسی کو مانتا ہے مگر محمد صلعم کو نہیں مانتا اور محمد صلعم کو مانتا ہے پر مسیح موعود کو نہیں مانتا وہ نہ صرف کافر بلکہ پکا کافر اور دائرہ اسلام سے خارج ہے۔

অর্থাৎ সুতরাং এই আয়াত হতে বুঝা গেল যে, প্রত্যেক ব্যক্তি যে মূসাকে মান্য করে কিন্তু ঈসাকে মান্য করল না, অথবা ঈসাকে মান্য করে কিন্তু মুহাম্মদ (সা.)-কে মান্য করল না; অথবা মুহাম্মদ (সা.)-কে মান্য করে কিন্তু মসীহ মওউদ (দাবীদার মির্যা কাদিয়ানী)-কে মান্য করল না, সে শুধুই কাফের নয়, বরং পাক্কা কাফের এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে বাহিরে।’ (কালিমাতুল ফছল পৃষ্ঠা নং ২০; পিডিএফ থেকে পৃষ্ঠা নং ২১)। উল্লেখ্য, বইটি উর্দূ ভাষায় রচিত, এর এখনো বাংলায় অনুবাদ হয়নি। এটির মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯৪; বইটি প্রথম দিকে কাদিয়ানীদের অফিসিয়াল উর্দূ ভাষার একটি সাময়িকী ‘রিভিউ অফ রিলিজন্স’ এর অংশবিশেষ। স্ক্রিনশট প্রদত্ত হল,

(৯) ‘হযরত মির্যা সাহেবের ইলহাম হচ্ছে,…যে লোক তোমার আনুগত্যকারী নয় এবং তোমার বাইয়েতে দাখিল হবেনা ও তোমার বিরোধী সে খোদা এবং রাসূলের নাফরমান এবং জাহান্নামী।’ (কালিমাতুল ফসল, তৃতীয় অধ্যায় পৃষ্ঠা নং ৩৯ [হার্ডকপি]; লিখক, মির্যা  কাদিয়ানীর পুত্র মির্যা বশির আহমদ এম. এ, প্রকাশকাল  ১লা মে ১৯১৫ ইং, কাদিয়ান থেকে প্রকাশিত)।

(১০) মির্যাপুত্র মির্যা বশির আহমদ এম.এ তার পিতা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘অতপর নুযূলে মসীহ গ্রন্থের ৪ নং পৃষ্ঠার একটি টিকায় হুযূর (মির্যা কাদিয়ানী) লিখেছেন, শেষ যুগের জন্য খোদা নির্ধারণ করেছিলেন যে, এটি একটি সাধারণ ফেরা’র (পুনঃজন্মের) যুগ হবে (کہ وہ ایک عام رجعت کا زمانہ ہوگا)। যাতে এই দয়াপ্রাপ্ত উম্মত অন্যান্য উম্মত অপেক্ষা কোনো দিক দিয়ে কম না থাকে। সুতরাং তিনি আমাকে সৃষ্টি করলেন এবং বিগত সমস্ত নবীর সাথে আমাকে সদৃশ্যতা দিলেন এইভাবে যে, তাদের সবার নামে আমার নামকরণ করলেন। আর তাই বারাহীনে আহমদিয়া গ্রন্থে খোদাতালা আদম, ইব্রাহিম, নূহ, মূসা, দাউদ, সুলায়মান, ইউসুফ, ইয়াহিয়া এবং ঈসা প্রমুখ সবার নামে আমার নাম রেখে দিলেন। আর এইভাবেই বিগত সমস্ত নবী এই উম্মতের মাঝে যেন দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করলেন। এমনকি সর্বশেষে মসীহ (আ.)-এরও জন্ম হয়ে গেল। আর যে বা যারাই আমার বিরোধিতাকারী, খোদাতালা তাদের নাম রেখে দিয়েছেন ঈসায়ী, ইহুদী এবং মুশরিক।’ (কালিমাতুল ফসল পৃষ্ঠা নং ৪৩-৪৪)।

(১১) ‘যে লোক মসীহ মওউদের দিকে না আসবে (অর্থাৎ তার দলভুক্ত হবেনা) সে ঈমানহারা।’ (কালিমাতুল ফসল, পৃষ্ঠা নং ৫২)।

(১২) ‘কালিমাতুল ফসল’ বইতে মির্যা কাদিয়ানীর একটি ইলহামের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখা আছে, ‘এই ইলহাম দ্বারা পরিষ্কার বুঝা গেল যে, আল্লাহতালা এই যামানায়  মুমিন হওয়ার মানদণ্ড স্থির করেছেন মসীহ মওউদ [অর্থাৎ মির্যা কাদিয়ানী]’র উপর ঈমান আনয়ন করাকে। সুতরাং মসীহ মওউদকে যেই অস্বীকার করে তার পূর্বের ঈমান–ও যাবে।’ (কালিমাতুল ফসল, তৃতীয় অধ্যায়, পৃষ্ঠা নং ৫২)।

(১৩) ‘এই সমস্ত উদ্ধৃতি দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, (পবিত্র কুরআনের ৬১ নং সূরা) সূরা আস-সাফ (الصف)-এর মধ্যে ঈসা (আ.) ‘আহমদু রাসূলুল্লাহ‘ বলে যার আগমন সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করে গেছেন সেই আহমদ (সা.) মসীহ মওউদ-ই।’ (কয়েক লাইন পরে লিখেন) ‘এই জন্যই তার (অর্থাৎ মির্যা কাদিয়ানীর দাবীসমূহ) অস্বীকারকারী একজন কাফের।’ (কালিমাতুল ফসল, পৃষ্ঠা নং ৫১)।

(১৪) ‘অতএব ঐ ইলহাম দ্বারা প্রমাণিত হয়ে গেল যে, যে সমস্ত ব্যক্তি মির্যা সাহেবকে সত্যবাদী বিশ্বাস করবেনা এবং তার দাবীগুলোর উপর ঈমান রাখবেনা তারা কাফের।’ (কালিমাতুল ফসল, পৃষ্ঠা নং ৫৩, তৃতীয় অধ্যায়)।

(১৫) ‘মির্যা কাদিয়ানী মুহাম্মদ (সা.)-এর একজন খাতামুল খোলাফা বা খলিফা বা মুত্তাবি। ফলে তাকে অস্বীকারকারীও কাফের (সারমর্ম)।’ (কালিমাতুল ফসল, পৃষ্ঠা নং ৬১)।

(১৬) ‘এই যুগে নবী করীম (সা.)-এর অনুসরণ করার জন্য মসীহ মওউদ (মির্যা)-এর প্রতি ঈমান আনা জরুরী।’ (কালিমাতুল ফসল, পৃষ্ঠা নং ৬৬)।

মুসলিম-অমুসলিম প্রসঙ্গ :

পবিত্র কুরআন এবং হাদীসের অনেক স্থানে মুসলমানকে মুসলমান পরিচয়ে থাকতে ও মুসলিম হয়েই মৃত্যুবরণ করতে পরিষ্কার বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে সূরা আলে ইমরান আয়াত নং ১০২ দেখুন। “হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো আর তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।” এখন ‘কে মুসলমান আর কে মুসলমান না‘ তা শুধুই আল্লাহর উপর চাপিয়ে দেয় যারা, তারা কি উক্ত আয়াতের উপর ঈমান রাখবে না? কেননা ‘মুসলমানিত্বের’ দায়ভার শুধুই আল্লাহর উপর চাপাতে গেলে তখন কারো পক্ষেই সম্ভব নয় যে, সে শরয়ী বিধানানুযায়ী জীবনযাপনের জন্য নিজেকে বাহ্যিকভাবে ‘মুসলমান’ হিসেবে প্রমাণ করা। আর এ জন্যই ‘কে মুসলিম আর অমুসলিম’ সেটি পুরোপুরি নির্ভর করবে ব্যক্তির বিশ্বাস কিবা সেসব দর্শনের উপর যেগুলোকে সে বিশ্বাসের উৎসমূল হিসেবে মনেপ্রাণে ধারণ করে থাকে। এমতাবস্থায় কারো ধর্মপরিচয়ের জন্য ‘বুক ছিড়ে ঈমানের ঝলক’ দেখা বা না দেখার আর কোনো ফালতু বিতর্কের অবকাশ থাকেনা। যাইহোক, এভাবে বললেও যেসব কাদিয়ানীবাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থকদের বুঝে আসেনা তাদের উদ্দেশ্যে মির্যা কাদিয়ানীর একখানা উক্তি পেশ করছি। তার ‘হাকীকাতুল ওহী’ গ্রন্থের এক জায়গায় লিখা আছে “শরীয়তের একটি মাসয়ালা হল মুমিনকে কাফের বলা ব্যক্তিটি অবশেষে নিজেই কাফের হয়ে যাবে….এবং কাফেরকে মুমিন বলা ব্যক্তিও কাফের হয়ে যাবে।” (দেখুন, রূহানী খাযায়েন ২২/১৬৮)। এখন তাদের জন্য চিন্তা করে দেখা উচিত যারা উম্মতে মুসলিমার সর্বসম্মত ফাতাওয়ার বিরোধিতা করেন এবং কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে গৃহীত ‘তাকফিরি’ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে যুক্তি ও জোরালো প্রচারণার পেছনে দৌঁড়ান তাদের গন্তব্য কোথায়? কাদিয়ানীরা ‘অমুসলিম’ একথা যখন পরিষ্কার ও পূর্বমীমাংসিত তখন তাদেরকে ‘মুসলিম’ আখ্যা দেয়ার ফলে প্রকারান্তরে নিজেকেই কোথায় নিয়ে দাঁড় করছি? আল্লাহ আমাদের সহীহ বুঝ দান করুন।

(কাদিয়ানীদের রচনাবলী থেকে উদ্ধৃত কোনো রেফারেন্স বা উদ্ধৃতি মিথ্যা প্রমাণ করতে পারলে উপযুক্ত পুরষ্কার দেয়া হবে।)

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
শিক্ষাবিদ ও গবেষক

কুরআনের ‘ইবনে মরিয়ম’ হতে মির্যা কাদিয়ানীই উদ্দেশ্য?

মির্যা কাদিয়ানী সাহেবের বই থেকে প্রথমে দুটি উদ্ধৃতি দেব। তিনি তার ‘তুহফাতুন নদওয়াহ’ বইতে লিখেছেন,

  • ‘যদি কুরআন দ্বারা ইবনে মরিয়মের মৃত্যু সাব্যস্ত না হয় তাহলে আমি মিথ্যুক সাব্যস্ত হব।’ (রূহানী খাযায়েন ১৯/৯৭)। রচনাকাল ১৯০২ ইং।
  • ‘যদি কুরআন আমার নাম ‘ইবনে মরিয়ম’ না রাখে তাহলে আমি মিথ্যুক সাব্যস্ত হব।’ (রূহানী খাযায়েন ১৯/৯৮) এবার প্রমাণের জন্য স্ক্যানকপি দেখুন,

এবার প্রশ্নটি বুঝে নিন! এখানে সাধারণভাবে যে প্রশ্নটি উঠে আসে সেটি হল, মির্যা গোলাম আহমদের দাবী অনুযায়ী পবিত্র কুরআনের ‘ইবনে মরিয়ম’ (অর্থাৎ মরিয়মপুত্র) হতে যদি তিনি নিজেই উদ্দেশ্য হন, তাহলে পবিত্র কুরআনের সেই ত্রিশ আয়াত দ্বারা বনী ইসরাইলের জন্য আগমনকারী সেই ঈসা ইবনে মরিয়মের মৃত্যু কিভাবে সাব্যস্ত হল? আহা! এমন একজন সিজোফ্রেনিয়া রোগীকে আজকের এই তথ্যপ্রযুক্তি আর জ্ঞানবিজ্ঞানের যুগেও যারা বিশ্বাস করেন তাদের জন্য আমাদের দুঃখ আর শত আফসোস!

বিশেষ দ্রষ্টব্য, রূপক-টুপক বাদ দিয়ে সোজাসাপ্টা উত্তর দিতে হবে! কেননা, কোনো প্রেরিত মহাপুরুষের দাবী, ভবিষ্যৎবাণী আর মু’জিজা এই ৩টি কখনো “রূপক” বা মাজাজ হয় না।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

ইমাম মাহদীকে আলেমরা তাকফির করা

প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদীকে সমসাময়িক যুগের আলেমগণ তাকফির করবেন, এভাবে উক্তিটি নবাব সিদ্দিক হাসান খান ভূপালী (রহ.)-এর গ্রন্থে সম্পূর্ণরূপে যেভাবে উল্লেখ রয়েছে সেভাবে কাদিয়ানীরা জীবন চলে গেলেও পেশ করতে চাইবেনা। তার কারণ কী তা বুঝতে হলে চলুন, পুরো উক্তিটি একবার দেখে আসি!

আল্লামা নবাব সিদ্দিক হাসান খান ভূপালী (রহ.) রচিত হিজাজুল কিরামাহ ফী আসারিল কিয়ামাহ’ (ফার্সি) গ্রন্থের ৩৬৩ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে,

چہ مہدی و عیسی ہر دو ناصر دین اسلام و تابع سنت خیر الانام و محی سنن رسول کریم باشند۔ پس فعل و عمل ہریکی گویا صینع دیگری سے بلاتفاوت و چوں مہدی علیہ السلام مقاتلہ بر احیاء سنت و اماتت بدعت فرماید علماء وقت کہ خوگر تقلید فقہاء و اقتداء مشائخ و آباء خود باشند گویند ایں مرد خانہ بر انداز دین و ملت ماست وبمخالفت برخیز و بحسب عادت خود حکم بتکفیر و تضلیل وی کنند۔کنند۔ اما از سطوت سیف او و جلال شوکتش کار ایشاں پیش نرود و دو دمان تقلید بی چراغ گردد و دولت کده سنت بوجود باوجود وی منور شود سنیان متبع غالب و بدعتیاں مقلد مغلوب گردند. و یوئده ما اخرج نعیم بن حماد عن ابی جعفر قال یظهر المهدی بمکة عند العشاء.

অর্থাৎ “তেমনি মাহদী এবং ঈসা ইসলামধর্মের দুই সাহায্যকারী এবং নবীজীর সুন্নাহ’র অনুসারী ও তাঁর সুন্নাতসমূহ পুনরুজ্জীবিতকারী হবেন। ফলে তাদের উভয়ের কাজ ও কর্ম অপরাপর শৈল্পিক দিক থেকে যেন এক ও অভিন্নই। আর যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং বিদয়াত নির্মূল করতে হযরত মাহদী (আ.) লড়াই অব্যাহত রাখবেন তখন সমসাময়িক আলেমগণ যারা ফোকাহাদের তাকলিদকারী এবং মাশায়েখ ও নিজ পূর্ব পুরুষদের আনুগত্যকারী তারা বলবে যে, এই পুরুষটি দ্বীন ও উম্মাহাকে নষ্ট করে দিচ্ছে আর নিজ স্বভাবের দরুন তাকে তাকফির করবে এবং ভ্রষ্ট বলবে। তাঁর তরবারির দাপট আর ক্ষমতার প্রভাবে তাদের কর্মকান্ড অগ্রসর হতে পারবেনা। বংশপরম্পরায় চলে আসা তাকলীদ আলোহীন হয়ে পড়বে। সুন্নতের রাজ্য আলোকিত হবে। মুত্তাবীয়ে শরীয়ত সুন্নীরা বিজয়ী হবে। মুকাল্লিদ বিদয়াতিরা পরাজিত হবে। আবু জা’ফরের সূত্রে ইমাম আবু ন’ঈম ইবনে হাম্মাদ (রহ.)-এর বর্ণনাও একথা দৃঢ়ভাবে সমর্থন করছে যে, তিনি বলেছেন, ইমাম মাহদী এ’শার-এর সময় মক্কায় আত্মপ্রকাশ করবেন।”

সম্পূর্ণ বক্তব্যের খোলাসা : (১) ইমাম মাহদী এবং মসীহ ঈসা তারা ভিন্ন ভিন্ন দুইজন (২) ইমাম মাহদী লড়াই (শস্ত্র যুদ্ধ-জিহাদ) করবেন (৩) তাঁর হাতে তরবারি থাকবে (৪) তিনি ক্ষমতাধর প্রশাসক হবেন (৫) তাঁর সময়টিতে আহলে সুন্নাহর মতাদর্শের উম্মতে মুহাম্মদীয়ারই বিজয়ী হবে (৬) তাঁর আত্মপ্রকাশ হবে মক্কায় এবং এ’শার সময়। (৭) এই গুণে গুণান্বিত প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদী সম্পর্কেই নবাব সিদ্দিক হাসান খান সাহেব বলেছেন যে, তৎ সমসাময়িক কতিপয় বিদয়াতি আলেমরাই ইমাম মাহদী সম্পর্কে প্রচার চালাবে যে, এই লোক আমাদের দ্বীন বরবাদ করছে। তারা তাঁকে তাকফির করবে এবং ভ্রষ্ট আখ্যা দেবে। এখন এর সাথে ভণ্ড কাদিয়ানীর কী সম্পর্ক? উপরের একটি বৈশিষ্ট্যও কি তার সাথে যায়? আপনার নিরপেক্ষ বিবেক কী বলে?

সংযুক্ত স্ক্যানকপি :-

আফসোস! কাদিয়ানীরা কাটছাঁট উদ্ধৃতি পেশ করার মাধ্যমে গ্রন্থকারের উদ্ধৃত অংশের সম্পূর্ণ কনসেপ্টই পরিবর্তন করে ফেলতে চেয়েছে, যা নিকৃষ্টতর প্রতারণা ছাড়া কিছুই না। এমতাবস্থায় এদের অন্যান্য উদ্ধৃতি গুলোও মূল কিতাবের সাথে ভালো ভাবে মিলিয়ে দেখা ব্যতীত সত্য মিথ্যা কিভাবে নিশ্চিত হতে পারি?

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

নবাব সিদ্দিক হাসান খান সাহেবের বই থেকে

নবাব সিদ্দিক হাসান খান সাহেবের বই ‘হিজাজুল কিরামাহ ফী আসারিল কিয়ামাহ‘ হতে ইমাম মাহদী, মসীহ, দাজ্জাল ইত্যাদি বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হিদায়াত! বিজ্ঞ পাঠকদের উদ্দেশ্যে নিম্নরূপ :-

আল্লামা নবাব সিদ্দিক হাসান খান ভূপালী (রহ.) লিখেছেন, “আমি বলি, জহূরে মাহদী (মাহদীর আত্মপ্রকাশ), নুযূলে ঈসা (ঈসা আ. এর অবতরণ), খুরুজে দাজ্জাল কিবা এগুলো ছাড়া আরও যত ঘটনাবলি এবং ফিতনা-বিশৃংখলা রয়েছে যা শেষ যামানায় সংঘটিত হওয়া সম্পর্কে হাদীস এবং আছার সমূহ বর্ণিত আছে, সেগুলোর সময় তারিখ নিজ থেকে নির্ধারণ করা নবী করীম (সা.)-এর হাদীসকেই বিকৃতি করার শামিল, তা যে কোনোভাবেই হোক; কাশফের নামে হোক, জ্যোতির্বিজ্ঞানের নামে হোক, নিজেস্ব রায়ের ভিত্তিতে হোক কিবা কোনো অভিধান আর কুরআন সুন্নাহর ইংগিতের নামে হোক; প্রত্যেক দিক থেকেই এটি নবী (সা.)-এর বাণীর তাহরিফ বলে গণ্য হবে। তবে হ্যাঁ, এর সবগুলো ঘটনাই নিসন্দেহে ঘটবে, কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউই এ সম্পর্কে জানে না, এমনকি অচিরেও কারো জানা থাকবেনা। কাজেই যে ব্যক্তি এগুলোর নির্দিষ্ট সময়ের জ্ঞান রাখার দাবী করবে সে মিথ্যাবাদী এবং যারা এ প্রকৃতির লোকদের সমর্থন এবং সত্যায়ন করবে তারা বিভ্রান্ত।” (হিজাজুল কিরামাহ পৃষ্ঠা নং ৪৩০)। (কিতাবটি অনলাইন থেকে সরাসরি পড়ুন বা ডাউনলোড করুন)।

সংযুক্ত স্ক্যানকপি –

হযরত ইমাম মাহদী, মসীহ এবং দাজ্জাল সম্পর্কে নবাব সিদ্দিক হাসানখান (১৮৩২-১৮৯০ইং) এর উক্ত কিতাব থেকে সামান্য তুলে ধরছি,

  • (হযরত ইমাম মাহদীর সমসাময়িক আলেমরা তাঁকে “তাকফির” করা সম্পর্কে নবাব সিদ্দিক হাসানখান সাহেবের একটি উক্তিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে কিভাবে জানতে ক্লিক করুন)।

আল্লামা নবাব সিদ্দিক হাসানখান (রহ.) ইমাম মাহদী সম্পর্কে নিজেরই রায় ও বিশ্বাস হিসেবে লিখেছেন, ইমাম মাহদীর প্রকৃত নাম হবে মুহাম্মদ, পিতার নাম হবে আব্দুল্লাহ। আর ‘মাহদী’ হচ্ছে তাঁর উপাধী। (দেখুন, পৃষ্ঠা নং ৩৫২, মূল ফার্সি সংস্করণ)। ইমাম মাহদী যখন বাইয়েত নেবেন তখন তাঁর বয়স ৪০ বছর পূর্ণ হবে। তাঁর জন্মস্থান হবে মদীনা, তিনি ইমাম হাসানের বংশে হবেন। (পৃষ্ঠা নং ৩৫৩)। ইমাম মাহদী হযরত ফাতেমার সন্তানদের থেকে হযরত ঈসার নুযূলের আগে আগে শেষ যামানায় জন্মগ্রহণ করবেন। তিনি বেলায়তে মুহাম্মদীয়ার সমাপ্তি ঘটাবেন। (পৃষ্ঠা নং ৩৫৫)। ইমাম মাহদী মদীনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করবেন, আহলে বাইয়েতের সদস্য থাকবেন, বায়তুল মোকাদ্দাসে হিজরত করবেন (ও সেখানে সেনা ছাউনি প্রতিস্থাপন করবেন) এবং সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবেন। (পৃষ্ঠা নং ৩৫৮)। সুনানু আবু দাউদের কিতাবুল মাহদীর উম্মে সালমা হতে বর্ণিত সহীহ হাদীসটি দ্বারা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, ইমাম মাহদী মদীনা হতেই আসবেন, যেহেতু তিনি সেখানেই জন্মলাভ করবেন। এই হাদীসের পরিপ্রেক্ষিতে (মাহদীর জন্মস্থান সংক্রান্ত বিচ্ছিন্ন) অপরাপর সমস্ত বর্ণনা পরিত্যাজ্য, আর তাঁর আত্মপ্রকাশ হবে মক্কায়, এটি সকলের ঐক্যমত। আর তিনি সেখান থেকেই পৃথিবীব্যাপী ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মিশন বাস্তবায়ন করবেন। (পৃষ্ঠা নং ৩৫৮)।

এখন হিজাজুল কিরামাহ (حجج الكرامة فى آثار القيامة) গ্রন্থটিতেও উল্লিখিত ইমাম মাহদীর ঐ সমস্ত আলামতের সাথে মির্যা কাদিয়ানীকে মিলিয়ে দেখা যাক। সে সত্যিই ইমাম মাহদী ছিল কিনা? তবে রূপক টুপক চলবেনা!

সংযুক্তি স্ক্যানকপি:-

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ রমাজানের ১৩ আর ২৮ তারিখে হওয়া

চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ রমাজানের ১৩ এবং ২৮ তারিখে হওয়ার যুক্তিতর্ক কতটুকু সন্তোষজনক!

এ নিয়ে আগেও দুটি লিখা লিখেছি। সেখানে রেওয়ায়তটির সনদ তথা বর্ণনাসূত্র সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ হাদীসবিশারদদের মতামত তুলে ধরেছি। এছাড়া আরও অনেক বিষয়ে আলোকপাত করেছি। জানতে পড়ুন! আজকে ভিন্ন আরেকটা বিষয় নিয়ে লিখতে চাই, ইনশাআল্লাহ।

চন্দ্রসূর্য গ্রহণ -১

চন্দ্রসূর্য গ্রহণ -২

চন্দ্রসূর্য গ্রহণ -৩

প্রথমে দেখা যাক তাবেয়ী মুহাম্মদ বিন আলী’র নামে বর্ণিত দারে কুতনি’র রেওয়ায়েতটিতে চন্দ্র আর সূর্যগ্রহণ সংক্রান্ত কথা দু’খানা কীরূপ শব্দে এসেছে! আমরা দেখি, চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে এসেছে و تنكسف القمر لاول ليلة من رمضان (অর্থাৎ চন্দ্রগ্রহণ লাগবে রমাজানের প্রথম রাত্রিতে)। এতে সুস্পষ্ট যে, চন্দ্রগ্রহণের সম্পর্ক তারিখের সাথে নয়, বরং মাসের প্রথম রাত্রির সাথে। হ্যাঁ, যদি এটি তারিখের সাথে সম্পর্ক হত তাহলে বাক্যটি হত لاول ليلة من ليالى الكسوف তথা চন্দ্রগ্রহণ লাগবে গ্রহণের পহেলা রাত্রিতে। কিন্তু বর্ণনায় কথাটি এইরূপ আসেনি।

সুতরাং বুঝা গেল, চন্দ্রগ্রহণ চাঁদের ১৩, ১৪ আর ১৫ তারিখের প্রথম তারিখে সংঘটিত হওয়ার উল্লিখিত কাসুন্দি অত্র বর্ণনার لاول ليلة من رمضان কথাটির সম্পূর্ণ বিরোধী। কারণ রমাজানের তের তারিখ আর রমাজানের প্রথম রাত্রি দুটো এক জিনিস না, যা একজন বাচ্চা ছেলেও বুঝে!

নির্বোধরা নতুন চাঁদ আর সাধারণ চাঁদের কাসুন্দি টানার আগে কেন চিন্তা করে দেখেনা যে, হেলাল (هلال) বা নতুন চাঁদ হল চাঁদের সূচনাকালীন সময় থেকে ৩য়-৭ম রাত্রির চাঁদ। আর তার পরবর্তী ধাপ সূচিত হয় قمر বা সাধারণ চাঁদের মাধ্যমে। আর সে হিসেবে সাধারণ চাঁদে গ্রহণ লাগতে হলে তখন لاول ليلة من ليالى الكسوف অর্থাৎ চন্দ্রগ্রহণের পহেলা রাত্রিতে (অর্থাৎ প্রকৃতির সাধারণ নিয়মেই) হতে হয়। আর তখন বর্ণনাটির বাহ্যিক অর্থ কোনোভাবেই ঠিক রাখা সম্ভব হয়না। তাই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, চন্দ্রগ্রহণের সম্পর্ক যদি গ্রহণের তারিখের সাথেই সম্পর্কিত হত তবে কিজন্য বর্ণনাটি لاول ليلة من ليالى الكسوف এইরূপ শব্দচয়নে আসেনি? আমি এখানে শুধুমাত্র চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে বললাম। সূর্যগ্রহণ নিয়ে আজ না-ই বা বললাম। কিন্তু মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী সহ ইতিপূর্বে আরও যতজন ইমাম মাহদী দাবীদার ছিল তাদের সময়টিতে চন্দ্রগ্রহণ এই নিয়মে ঘটেনি; বরং ১৩ ই রমাজানে ঘটেছিল। যা অত্যন্ত প্রকৃতির সাধারণ ঘটনা।

বলে রাখা দরকার, মির্যা কাদিয়ানীর মাহদী দাবীর পূর্বে ১৮৫১ সালেও একই রমাজানের ১৩ তারিখে চন্দ্রগ্রহণ লেগেছিল, তখন আলী মুহাম্মদ বাব ইরানী ছিলেন ইমাম মাহদী দাবীদার। এনসাক্লোপিডিয়া অফ ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী প্রতি ২২৩ বছর অন্তর চন্দ্রসূর্য গ্রহণের ঘটনা উল্লিখিত নিয়মেই ঘটতে থাকবে। মরক্কোর বারঘৌতা বারবার রাজ্যের শাসক সালেহ বিন তারিফ ৭৪৪ সালে “নবী” দাবী করেন। ৭৯১ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তিনি নিজেকে ইমাম মাহদীও দাবী করেন। সে বছরই একই রমাজানের ১৩ এবং ২৮ তারিখে চন্দ্রগ্রহণ এবং সূর্যগ্রহনের ঘটনা ঘটে। আর এইরূপ ঘটনা তার জীবদ্দশায় প্রায় চার-চার বার ঘটেছিল। যথাক্রমে ৭৪৪, ৭৪৫, ৭৮৭ এবং ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে। তার ‘সালেহুল মুমিনীন’ নামীয় জামাত প্রায় সাড়ে তিন’শ বছর পর্যন্ত আফ্রিকায় টিকে ছিল। পরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

কাদিয়ানী ম্যাগাজিন ‘পাক্ষিক আহমদী’ (পাতা ২৪ তাং ১৫ এপ্রিল ২০১৫ইং) এর একটি প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ আছে, রাসূল (সা.)-এর যুগ হতে বর্তমান যুগ (২০০১ইং) পর্যন্ত একই রমাজানের ১৩ এবং ২৮ তারিখে চন্দ্রগ্রহণ এবং সূর্যগ্রহনের ঘটনা প্রায় ১০৯ বার ঘটে আসছে। আমেরিকার গবেষণা বিভাগ “নাসা”-এর তথ্যমতে এইরূপ গ্রহণের ঘটনা ইতিপূর্বে আরও প্রায় ৫০০০ বার ঘটেছিল। অথচ ঐ বর্ণনার শেষেই রয়েছে যে, و لم تكونا منذ خلق الله السموات و الارض অর্থাৎ এই দুটি নিদর্শন ইতিপূর্বে আল্লাহ যখন থেকে আসমান জমিন সৃষ্টি করেছেন তখন অব্দি সংঘটিত হয়নি। জ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলে কিনা?

অতএব স্পষ্টত বুঝা যাচ্ছে, এইধরনের গ্রহণ শুধুই প্রাকৃতিক, এর সাথে কোনো প্রেরিত মহাপুরুষের আবির্ভাবের সম্পর্ক নেই। নইলে একই রমাজানের ১৩ তারিখে চন্দ্রগ্রহণ এবং ২৮ তারিখে সূর্যগ্রহনের উক্ত ঘটনা ইতিপূর্বে এত হাজার বার ঘটতে পারেনা। কাজেই, মির্যার সময়টিতে এমন ঘটনা ঘটেছিল বলে সাধারণদের এত অবাক হবার কোনো কারণ নেই।

জ্ঞানীদের জন্য বিষয়টির বুঝার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট হবে বলে আমি মনে করি।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী