Home Blog Page 23

মির্যার স্ববিরোধীতা-১০

কোথাও লিখা আছে, শুধু নবী করীম (সা.)-এর আনুগত্যেই নবুওয়তের মোকাম পাওয়া যায়, কোথাও লিখা আছে, ঈসা (আ.)ও মূসা নবীর আনুগত্যে খোদার নৈকট্য অর্জন ও নবী’র মোকাম পেয়েছেন!

এমন ব্যক্তিও কী করে আপনা দাবীতে সত্য হন?

এই পর্বে মির্যা কাদিয়ানী আর তার ছেলে বশীর আহমদ (এম.এ) এবং অনুসারীদের মধ্যকার স্ববিরোধী কথাবার্তার আরেকটি প্রমাণ দেখানো হবে। যেমন মির্যার ছেলে বশীর আহমদ (এম.এ) লিখেছেন,

এমন একজন কামেল মানুষের পূর্ণ আনুগত্য দ্বারা মির্যা সাহেবের নবুওয়ত অর্জিত হয়েছে যাঁর পূর্ণ অনুসরণ নবুওয়তের স্তরে পৌঁছে দিয়ে থাকে। সুস্পষ্ট আছে যে, এমন নবুওয়ত নবী করীম (সা.)-এর পূর্বে সম্ভব ছিলনা। কেননা উনার (সা.) পূর্বে এমন কেউই গত হননি যার কামেল আনুগত্য দ্বারা আল্লাহর কাছ থেকে নবুওয়ত পেতে পারে।’ (কালিমাতুল ফছল ২২, হার্ডকপি, প্রথমপ্রকাশ ১লা মে ১৯১৫ ইং)। এই একই কথা এদেশীয় কাদিয়ানীদের বইগুলোতেও রয়েছে। উম্মতিনবী পৃষ্ঠা নং ৯ দ্রষ্টব্য।

  • জ্ঞাতব্য, কালিমাতুল ফসল বইটি গ্রন্থবদ্ধ হওয়ার আগে ‘রিভিউ অফ রিলিজন্স‘ (ریویو آف ریلیجنز) নামীয় কাদিয়ানীদের একটি উর্দূ অফিসিয়াল পত্রিকারই অংশ ছিল। মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯৪। ভাষা উর্দূ। বইটি এখনও বাংলায় অনুবাদ হয়নি।

স্ববিরোধী কথা :

‘মির্যা কাদিয়ানীর বইতে লিখা আছে, ‘যেমন খোদার বান্দা ঈসা যাকে হিব্রু ভাষায় ইসোয়া বলে, (তিনি) ত্রিশ বছর পর্যন্ত মূসা (আ.)-এর আনুগত্য করে খোদার ঘনিষ্ঠ হয়ে যান এবং নবুওয়তের মর্যাদাপ্রাপ্ত হন।’ (চশমায়ে মসীহ [উর্দূ] পৃষ্ঠা নং ৬৭, রূহানী খাযায়েন: ২০/৩৮১-৮২; রচনাকাল মার্চ, ১৯০৬ইং)। আরও পরিষ্কার করে জানতে চশমায়ে মসীহি (বাংলা) এর ৫২ নং পৃষ্ঠাটিও দেখুন। (নিচ থেকে ২নং স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য)।

শেষকথা : মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন: মিথ্যাবাদীর কথায় অবশ্যই স্ববিরোধীতা হয়ে থাকে। (রূহানী খাযায়েন: ২১/২৭৫)।

অতএব এবার মির্যা কাদিয়ানী তারই স্ববিরোধী কথার কারণে কী সাব্যস্ত হলেন একটু ভেবে দেখবেন কি? এমন একজন মিথ্যাবাদীকে দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান কিজন্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন তা এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। আল্লাহ আমাদের ঈমানকে রক্ষা করুন। আমীন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

মির্যার স্ববিরোধীতা-৯

একবার বলল ‘নবীর ইজতিহাদি ভুল হয়, আবার বলল নবীর ইজতিহাদি ভুল মূলত ওহীরই ভুল…(অর্থাৎ নবীর কখনো ইজতিহাদি ভুল হবারও সম্ভবনা নেই)!!

এখন এমন ব্যক্তিও কী করে আপনা দাবীতে সত্য হন?

(মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন), ‘নবী’র ইজতিহাদী (গবেষণালব্ধ মত) ভুল মূলত ওহীরই ভুল। কেননা নবী কখনো ওহী থেকে কোনো অবস্থাতেই বিরত থাকেন না।’ (রূহানী খাযায়েন: ৫/৩৫৩; রচনাকাল ১৮৯২ইং)।

স্ববিরোধী কথা :

‘নবী(ও) নিজ ইজতিহাদে ভুল করে থাকেন কিন্তু খোদার ওহীতে ভুল হয় না।’ (রূহানী খাযায়েন: ২২/৫৭৩; রচনাকাল ১৯০৭ইং)। স্ক্যান সংযুক্তি:-

শেষকথা : মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন: মিথ্যাবাদীর কথায় অবশ্যই স্ববিরোধীতা হয়ে থাকে। (রূহানী খাযায়েন: ২১/২৭৫)।

অতএব এবার মির্যা কাদিয়ানী তারই স্ববিরোধী কথার কারণে কী সাব্যস্ত হলেন একটু ভেবে দেখবেন কি? এমন একজন মিথ্যাবাদীকে দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান কিজন্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন তা এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। আল্লাহ আমাদের ঈমানকে রক্ষা করুন। আমীন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

মির্যার স্ববিরোধীতা-৮

শেষ যুগে আত্মপ্রকাশকারী ‘দাব্বাতুল আরদ’ সম্পর্কে

এখন এমন ব্যক্তিও কী করে আপনা দাবীতে সত্য হন?

(মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন), ‘দাব্বাতুল আরদ (دابة الارض) হচ্ছে, ধর্মতত্ত্ব আর ফিলোসোফি তথা দর্শনশাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জনকারী উলামায়ে কেরাম যারা ইসলামের সাহায্যে সমস্ত বাতিল মতবাদের উপর হামলা করতে দাঁড়িয়ে যাবে।’ (রূহানী খাযায়েন: ৩/৩৭০; রচনাকাল ১৮৯১ইং)।

স্ববিরোধী কথা :

‘দাব্বাতুল আরদ (دابة الارض) হল বিভিন্ন আকৃতির সেসব জন্তু জানোয়ার যারা কাশফে আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে এবং অন্তরে উদয় হয়েছে যে, এরা প্লেগের পোকামাকড়।’ (রূহানী খাযায়েন: ১৮/৪১৬; রচনাকাল ১৮৯২ইং)।

দুঃখজনক হলেও সত্য, কুরআন হাদীস মির্যা কাদিয়ানীর নিকট একদমই সস্তা জিনিস, বরং তার চেয়েও অতি সাধারণ বস্তু ছিল। নইলে কিভাবে সম্ভব যে, এমন হটকারিতামূলক অপব্যাখ্যার তুফান ঘটানো!

স্ক্যান সংযুক্তি –

শেষকথা : মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন: মিথ্যাবাদীর কথায় অবশ্যই স্ববিরোধীতা হয়ে থাকে। (রূহানী খাযায়েন: ২১/২৭৫)।

অতএব এবার মির্যা কাদিয়ানী তারই স্ববিরোধী কথার কারণে কী সাব্যস্ত হলেন একটু ভেবে দেখবেন কি? এমন একজন মিথ্যাবাদীকে দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান কিজন্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন তা এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। আল্লাহ আমাদের ঈমানকে রক্ষা করুন। আমীন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

মির্যার স্ববিরোধীতা-৭

একবার বললেন, পবিত্র কুরআন দ্বারা ঈসার মৃত্যু সাব্যস্ত; আবার বললেন, কুরআনে ‘ইবনে মরিয়ম’ বলে যে মসীহ’র আগমনী সংবাদ রয়েছে তা হতে মির্যা কাদিয়ানীই উদ্দেশ্য!

এমন ব্যক্তিও কী করে আপনা দাবীতে সত্য হন?

(মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন), ‘এখন একথা সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, পবিত্র কুরআনে যেই মসীহ মওউদের আসার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে সে এই অধমই।’ (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন ৩/৪৬৮)।

স্ববিরোধ কথা :

‘যদি কুরআন দ্বারা ইবনে মরিয়মের মৃত্যু সাব্যস্ত না হয় তাহলে আমি মিথ্যুক সাব্যস্ত হব।’ (রূহানী খাযায়েন ১৯/৯৭, রচনাকাল ১৯০২ ইং)।

মির্যা কাদিয়ানীর নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে এবার আমার জিজ্ঞাসা, পবিত্র কুরআনে ঈসা ইবনে মরিয়ম নামটি দ্বারা কয়জন ব্যক্তি উদ্দেশ্য? যদি শুধুই এক ব্যক্তি উদ্দেশ্য হন আর তিনি মরিয়ম পুত্র ঈসা (আ.)-ই হন (অবশ্য মরিয়ম পুত্র ঈসাই উদ্দেশ্য-লিখক) তাহলে সেই মরিয়ম পুত্র ঈসা-ই আবার কুরআন দ্বারা মৃত সাব্যস্ত কিভাবে হন? অধিকন্তু রাসূল (সা.) শপথ বাক্য সহকারেই (والذى نفسى بيده ليوشكن ان ينزل فيكم ابن مريم الخ) ইবনে মরিয়মের আগমনী ভবিষ্যৎবাণী করে গেছেন (সহীহ বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া)। ফলে এইরূপ ভবিষ্যৎবাণী দ্বারা কোনোভাবেই রূপক অর্থ উদ্দেশ্য হবেনা, বরং প্রকৃত অর্থই উদ্দেশ্য নিতে হবে। মির্যা কাদিয়ানী নিজেও এমন কথা তার ‘হামামাতুল বুশরা’ বইতে লিখে গেছেন। (হামামাতুল বুশরা হতে স্ক্রিনশট)।

মোটকথা, মির্যা কাদিয়ানী সাহেব জঘন্য স্ববিরোধী কথার নজির স্থাপন করে গেছেন।

স্ক্যানকপি সংযুক্তি –

শেষকথা : মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন: মিথ্যাবাদীর কথায় অবশ্যই স্ববিরোধীতা হয়ে থাকে। (রূহানী খাযায়েন: ২১/২৭৫)।

অতএব এবার মির্যা কাদিয়ানী তারই স্ববিরোধী কথার কারণে কী সাব্যস্ত হলেন একটু ভেবে দেখবেন কি? এমন একজন মিথ্যাবাদীকে দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান কিজন্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন তা এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। আল্লাহ আমাদের ঈমানকে রক্ষা করুন। আমীন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

মির্যার স্ববিরোধীতা-৬

একবার বলল, আনুগত্যের নবীর ধারাক্রম সর্বদা বিদ্যমান থাকবে; আবার বলল, মুহাম্মদী ধারাবাহিকতায় শেষনবী সে নিজেই।

এমন ব্যক্তিও কী করে আপনা দাবীতে সত্য হন?

মির্যা কাদিয়ানীর বই থেকে (তিনি লিখেছেন),

مگر اس بات کو بحضور دل یاد رکھنا چاہیے کہ یہ نبوت جس کا ہمیشہ کے لئے سلسلہ جارى رہیگا نبوت تامہ نہیں ہے۔ بلکہ جیساکہ میں ابھی بیان کر چکا ہوں وہ صرف ایک جزئ نبوت ہے

অর্থাৎ কিন্তু এই কথা খুব মন দিয়ে স্মরণ রাখা চাই যে, এই নবুওয়ত যার ধারাক্রম সর্বদা বিদ্যমান থাকবে, তা পরিপূর্ণ নবুওয়ত নয়, বরং আমি যেভাবে এখন বলছি যে, তা শুধুই একটি আংশিক নবুওয়ত।’ (তাওযিহুল মারাম, রূহানী খাযায়েন ৩/৬০)।

স্ববিরোধ কথা :

(তিনি আরেক জায়গায় লিখেছেন), “আল্লাহর বিধান, তাঁর দুই ধরনের প্রেরিত পুরুষ নিহত হন না। (১) প্রথমত: ঐ নবী–যিনি সিলসিলার সূচনাতে আগমন করেন, যেমন মুসায়ী সিলসিলায় হযরত মুসা আলায়হিস সালাম এবং মুহাম্মদীয়া সিলসিলায় আমাদের প্রভু ও মওলা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। (২) দ্বিতীয়ত: ঐ সকল নবী ও আল্লাহর প্রেরিতগণ যারা সিলসিলার শেষে আগমন করেন- যেমন, মুসায়ী সিলসিলায় হযরত ঈসা আলায়হিস সালাম এবং মুহাম্মদী সিলসিলায় এই অধম।” (রূহানী খাযায়েন [উর্দূ] খন্ড ২০ পৃষ্ঠা নং ৬৯-৭০; রচনাকাল ১৯০৩ইং, তাযকেরাতুশ শাহাদাতাইন [বাংলা] পৃষ্ঠা নং ৮২)।

এখানে তিনি পরিষ্কার শব্দে লিখেছেন যে, তিনি (অর্থাৎ মির্যা সাহেব নিজেই) মুহাম্মদী ধারাবাহিকতায় একজন শেষনবী! এবার তাহলে তারই উপরিউক্ত কথামতে ‘আংশিক নবুওয়তের ক্রমধারাও সর্বদা বিদ্যমান থাকল কোথায়?‘ স্ক্যান সংযুক্তি :-

শেষকথা : মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন: মিথ্যাবাদীর কথায় অবশ্যই স্ববিরোধীতা হয়ে থাকে। (রূহানী খাযায়েন: ২১/২৭৫)।

অতএব এবার মির্যা কাদিয়ানী তারই স্ববিরোধী কথার কারণে কী সাব্যস্ত হলেন একটু ভেবে দেখবেন কি? এমন একজন মিথ্যাবাদীকে দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান কিজন্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন তা এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। আল্লাহ আমাদের ঈমানকে রক্ষা করুন। আমীন।

লিখক শিক্ষাবিদ ও গবেষক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

মির্যার স্ববিরোধীতা-৫

একবার লিখলেন, শেষ যুগে আগমনকারী ঈসা ইবনে মরিয়ম ‘নবী’ হবেন না; আবার লিখলেন, তিনি একজন নবীও হবেন এবং উম্মতিও হবেন! এখন কাদিয়ানীদের উদ্দেশ্যে আমার প্রশ্ন, আগমনকারী ঈসা ‘নবী’ হিসেবে আগমন করলে তখন তার ‘উম্মত’ হিসেবে গণ্য হবেন কারা? ঈসা দাবীদার কাজ্জাব মির্যা কাদিয়ানী ‘নবী‘ হলে তখন ‘আহমদীরা’ কি তার ‘উম্মত‘ হওয়াও স্বীকার করবেন??

পড়ুন: মির্যার স্ববিরোধীতা-

এমন ব্যক্তিও কী করে আপনা দাবীতে সত্য হন?

মির্যা কাদিয়ানীর বই থেকে (তিনি লিখেছেন), ‘হাদীস সমূহ মতে আরেকটি অর্থ এই দাঁড়ায় যে, আগমনকারী ইবনে মরিয়ম (মসীহ) নবী হবেন না, বরং শুধুই একজন উম্মতি হবেন।’ (রূহানী খাযায়েন: ৩/২৪৯; রচনাকাল ১৮৯১ইং)।

স্ববিরোধী কথা :

‘আগমনকারী মসীহ মওউদ সম্পর্কে হাদীস সমূহ দ্বারা বুঝা যায় ও পরিচয় পাওয়া যায় যে, তিনি নবীও হবেন এবং উম্মতিও হবেন।’ (রূহানী খাযায়েন: ২২/৩১; রচনাকাল ১৯০৭ ইং)। স্ক্যান সংযুক্তি :

শেষকথা : মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন: মিথ্যাবাদীর কথায় অবশ্যই স্ববিরোধীতা হয়ে থাকে। (রূহানী খাযায়েন: ২১/২৭৫)।

অতএব এবার মির্যা কাদিয়ানী তারই স্ববিরোধী কথার কারণে কী সাব্যস্ত হলেন একটু ভেবে দেখবেন কি? এমন একজন মিথ্যাবাদীকে দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান কিজন্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন তা এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। আল্লাহ আমাদের ঈমানকে রক্ষা করুন। আমীন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

মির্যার স্ববিরোধীতা-৪

মির্যার কথিত ইলহামী গ্রন্থে ঈসা (আ.) আকাশ থেকে নাযিল হবার আকীদা প্রকাশ করা সত্ত্বেও পরবর্তীতে সেই আকীদা থেকে নতুন আরেক কথিত ইলহামের নামে সরে আসা!

পড়ুন: মির্যার স্ববিরোধীতা-

এমন ব্যক্তিও কী করে আপনা দাবীতে সত্য হন?

মির্যা কাদিয়ানী লিখেন, “আমি ‘বারাহীনে আহমদীয়া’ নামক বইতে লিখেছিলাম মসীহ ইবনে মরিয়ম আকাশ থেকে নাযিল হবেন। তবে পরবর্তীতে আমি লিখেছি, আগত মসীহ (ঈসা) আমি নিজেই।” (রূহানী খাযায়েন ২২/১৫২-৫৩; হাকীকাতুল ওহী বাংলা অনূদিত কপি পৃষ্ঠা নং ১১৭)।

‘বারাহীনে আহমদীয়া’ নামক কিতাব সম্পর্কে মির্যার বক্তব্য এই যে,

১. “আমি কিতাবটি আল্লাহর পক্ষ হতে একজন মুলহাম (খোদার পক্ষ হতে অদৃশ্যের জ্ঞান লাভকারী) এবং মামূর (আদিষ্ট) হয়েই লিখেছি।” (আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, রূহানী খাযায়েন ৫/৬৫৭)।

২. আরো লিখা আছে, “প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ উভয় দিক থেকে কিতাবটির পরিচালক মহান আল্লাহ।” (মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত ১/৫৬; আমি এবং আমার বই’ শীর্ষক শিরোনাম)।

৩. তিনি নিজের সম্পর্কে দাবী করে এক জায়গায় লিখেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহতালা আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলের উপর ছাড়েন না এবং আমাকে রক্ষা করেন প্রত্যেক ভুলভ্রান্তি থেকে এবং শয়তানি পথ থেকে আমাকে হেফাজত করেন।” (রূহানী খাযায়েন ৮/২৭২)।

৪. “আমার কথাবার্তায় কোনো অসঙ্গতি নেই। আমি তো খোদার ওহীরই অনুসরণকারী।” (রূহানী খাযায়েন ২২/১৫৪)।

৫. “মিথ্যাবাদীর কথায় অবশ্যই স্ববিরোধীতা হয়ে থাকে।” (রূহানী খাযায়েন ২১/২৭৫)।

এবার কিছু প্রশ্ন করতে চাই….। যেহেতু আপনাদেরই বিশ্বাস অনুসারে…!

ঈসা (আ.) আকাশ থেকে নাযিল হবেন, এটা কুরআনের ঐ ত্রিশ আয়াত বিরোধী, তাই না?

এই সংক্রান্ত হাদীস যত আছে সবগুলোই বাতিল, যেহেতু কুরআন বিরোধী কথা সহীহ হাদীসে থাকার কথা না, তাই না?

‘আহমদ চরিত’ বইয়ের ৮ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে, ১৮৯১ সালের দিকে একটি ইলহামের মাধ্যমে মির্যা সাহেবকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন, তাই না?

এমতাবস্থায় নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন!

(ক) ঈসা (আ.) আকাশ থেকে নাযিল হবেন, কথাটি মির্যা সাহেব ওহীর মাধ্যমেই লিখে যাওয়ার পরেও সেটি পরবর্তীতে কেন মিথ্যা হল? (দেখুন, উপর থেকে নিচে ৪ নং উক্তি)।

(খ) যে বিষয়টি তার আগের ওহী দ্বারা ‘হ্যাঁ’ সাব্যস্ত হল সেটাই পরে তার আরেক ওহী (ইলহাম) দ্বারা ‘না’ সাব্যস্ত হলে, তবে কি আল্লাহ মির্যাকে আগে মিথ্যা বলে তারপর সত্য বললেন? নাউযুবিল্লাহ।

(গ) যদি ঈসা (আ.) আকাশ থেকে নাযিল হওয়ার বিশ্বাস ভুল বা মিথ্যা হয়, তাহলে বারাহীনে আহমদীয়া বইটি সম্পর্কে মির্যা কাদিয়ানীর উক্ত (নং ১,২) বক্তব্য দুটিও কি মিথ্যা সাব্যস্ত হল না? কারণ আল্লাহর পক্ষ হতে আদিষ্ট বলে দাবী রত অবস্থায় কোনো ব্যক্তি অদৃশ্যের এমন কোনো বিষয়ে ভবিষ্যৎবাণী কিভাবে দিতে পারেন, যদি আল্লাহ সেটি তাকে বলে না দেন? আবার এমন কোনো ভবিষ্যৎবাণী এধরণের বইতে কিভাবে লিখতে পারেন যা সঠিক নয়, (মির্যার আরেক বক্তব্যানুসারে) সেটি শিরিকও? আবার নাকি বইটি তিনি আল্লাহর পক্ষ হতে নির্দেশ পেয়ে লিখেছেন!

(ঘ) আরো প্রশ্ন জাগে যে, যার দাবী হল—’আল্লাহ আমাকে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলের উপর ছাড়েন না’। তাহলে তিনি ১৮৮১-‘৮২ সালে ‘বারাহীনে আহমদীয়া’ বইতে যে কথা লিখলেন তারপর ১৮৯১ সালের দিকে তিনি সে কথা থেকে সরে যাওয়ার মানে কি দীর্ঘ ১০টি বছর ভুলের উপর থাকা নয়? তবে কি আল্লাহ তাকে এমন ভুলের উপরও ছেড়ে দিলেন, যা তার মতে শিরিকি বিশ্বাস?

শেষকথা হল, এমতাবস্থায় মির্যা সাহেব কি সীমাহীন মিথ্যা আর অসঙ্গতির জন্ম দিয়ে গেলেন না? এখন তাহলে মির্যা সাহেবকে তারই কথা অনুসারে আমি যদি একজন নাম্বার ওয়ান ‘কাজ্জাব-মিথ্যাবাদী‘ আখ্যা দিই তবে কি অন্যায় হবে? যেহেতু তিনি খোদ লিখেছেন, “মিথ্যাবাদীর কথায় অবশ্যই স্ববিরোধীতা হয়ে থাকে।” (রূহানী খাযায়েন ২১/২৭৫)। আপনার নিরপেক্ষ বিবেকের কাছে প্রশ্নগুলো রেখে দিলাম।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

মির্যার স্ববিরোধীতা-৩

ঈসা (আ.) উম্মতি হতে পারা, না পারা!

এখন এমন ব্যক্তিও কী করে আপনা দাবীতে সত্য হন?

১। (মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন), “যে ব্যক্তি উম্মতি-এর বাস্তবতার প্রতি তীক্ষ্ণদৃষ্টি দেয় সে পরিষ্কার বুঝতে পারে যে, হযরত ঈসা (আ.)-কে ‘উম্মতি’ সাব্যস্ত করা একটি কুফুরি।” (বারাহীনে আহমদীয়া খ-৫, রূহানী খাযায়েন ২১/৩৬৪)।

এবার স্ববিরোধ কথা :

২। আরেক জায়গায় লিখেছেন, “কুরআন শরীফ দ্বারা তো সাব্যস্তই আছে যে, প্রত্যেক নবীই হযরত (সা.)-এর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহতালা বলেন, لتؤمن به و لتنصرنه (তোমরা অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে)। সুতরাং এইভাবেই সমস্ত আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম) হযরত (সা.) এর উম্মত হয়ে যান।” (বারাহীনে আহমদীয়া খ-৫, রূহানী খাযায়েন ২১/৩০০)।

আমার প্রশ্ন, সমস্ত আম্বিয়া হযরত (সা.)-এর উম্মত হওয়া পবিত্র কুরআন দ্বারাই সাব্যস্ত হয়ে থাকলে তবে কিজন্য ঈসা (আ.)-কে ‘উম্মতি‘ সাব্যস্ত করা কুফুরি হবে?

শেষকথা : মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন: মিথ্যাবাদীর কথায় অবশ্যই স্ববিরোধীতা হয়ে থাকে। (রূহানী খাযায়েন: ২১/২৭৫)।

অতএব এবার মির্যা কাদিয়ানী তারই স্ববিরোধী কথার কারণে কী সাব্যস্ত হলেন একটু ভেবে দেখবেন কি? এমন একজন মিথ্যাবাদীকে দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান কিজন্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন তা এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। আল্লাহ আমাদের ঈমানকে রক্ষা করুন। আমীন।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

নামাযে কোথায় হাত বাঁধা উত্তম?

নামাযে কোথায় হাত বাঁধা উত্তম?

হানাফীদের দলিল সহীহ হাদীস থেকে

নামাযের মধ্যে হাত কোথায় বাঁধা উত্তম, এ নিয়ে ফোকাহায়ে কেরাম (ইসলামি আইনশাস্ত্রবিদ)গণের মাঝে শুধুমাত্র উত্তম-অনুত্তম প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়েছে। সেটি হল, হাত নাভীর নিচে বাঁধবে নাকি উপরে! শায়খ মুবারকপুরী (রহ.) তার তিরমিজি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ تحفة الأحوذى (তুহফাতুল আহওয়াজি)-তেও (২/৭৪-৭৮) একথাই লিখেছেন। যেমন তিনি লিখেন, أَنَّ الِاخْتِلَافَ بَيْنَهُمْ في الْوَضْعِ فَوْقَ السُّرَّةِ وَتَحْتَ السُّرَّةِ إنما هو في الِاخْتِيَارِ وَالْأَفْضَلِيَّةِ অর্থাৎ ‘এই ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্যকার মতপার্থক্য হচ্ছে, নামাযে দুইহাত নাভীর নিচে রাখা উত্তম নাকি উপরে রাখা উত্তম!’ তবে ‘বুকের উপর বাঁধা’ সংক্রান্ত চূড়ান্ত কোনো মতের উল্লেখ প্রসিদ্ধ চার ইমামের কারো থেকে পাওয়া যায় না। যেহেতু ইমাম শাফেয়ীর মত (ফতুয়া) ‘আল-মাজমূ শরহুল মুহাজ্জাব’ গ্রন্থে (المجموع شرح المهذب) পরিষ্কার লিখা আছে এইভাবে যে, و يجعلها تحت صدره و فوق سرته، هذا هو الصحيح المنصوص অর্থাৎ ‘উভয় হাত বুকের নিচে ও নাভীর উপরে বাঁধবে, শাফেয়ী মাযহাবের প্রকৃত ও সুস্পষ্ট মত এটাই।’ একথা লিখেছেন, ইমাম মহীউদ্দীন আন-নববী আশ-শাফেয়ী। আর ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের চূড়ান্ত ও অগ্রগণ্য মত কীরকম—সে সম্পর্কেও অনুসন্ধান করে পাওয়া যায় যে, ‘মুখতাসারে খিরাকি’ (مختصر الخرقى) কিতাবে পরিষ্কার লিখা আছে, و يجعلها تحت سرته অর্থাৎ দুই হাত নাভীর নিচে বাঁধবে। (লিখক, ইমাম আবুল কাশেম উমর ইবনুল হুসাইন ইবনু আব্দিল্লা ইবনে আহমদ আল খিরাকি)। কিতাবটির ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘আল মুগনী’-তে (১/৫১৪) হাম্বলী মাযহাবের পক্ষ হতে অবশ্য মোট তিনখানা মত উল্লেখ রয়েছে। তবে চূড়ান্ত মত ‘নাভীর নিচে বাঁধা’ই। আর ইমাম মালেকের মতে তো و ندب إرسالهما অর্থাৎ হাত ছেড়ে দাঁড়ানোই মুস্তাহাব। (দেখুন, আল্লামা দারদী আল-মালেকী কৃত শরহে সগীর)। আর ইমাম আবু হানীফা’র মত তো সবারই জানা, নাভীর নিচে এমনভাবে হাত বাঁধা যেন নাভী হাতের উপরের অংশে লেগে থাকে। এটাই উত্তম।

পক্ষান্তরে আহলে হাদীসবন্ধুদের মতে, হাত বাঁধতে হবে বুকের উপর। তাঁদের মতের পক্ষেও দলিল রয়েছে। তাদের সব চেয়ে শক্তিশালী দলিল হল, হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.) বলেছেন, আমি রাসূল (সা.)-এর পেছনে নামায পড়েছি। (আমি দেখলাম) فوضع يده اليمنى على يده اليسرى على صدره অর্থাৎ তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের উপর রেখেছেন। (সহীহ ইবনে খুযাইমা ৩/৩১৩)। তাহকীক, এর সনদে ‘মু’আম্মাল ইবনে ইসমাইল’ নামীয় রাবীকে ইমাম বুখারী (রহ.) ‘মুনকারুল হাদীস’ (منكر الحديث) বলেছেন, ইমাম আবু যুর’আ আর-রাজী বলেছেন, في حديثه خطأ كثير অর্থাৎ হাদীস বর্ণনায় সে খুব বেশি ভুল করত। (তাহযীবুল কামাল ১৮/৫২৬; তাযীবুত তাহযীব ১০/৩৪০; মীযানুল ইতিদাল ৮৯৪৯ দ্রষ্টব্য)। কিন্তু শায়খ ইবনুল কাইয়ুম (রহ.)-এর ‘ইলামুল মুয়াক্কিয়ীন’ গ্রন্থে লিখা আছে, উক্ত রেওয়ায়েতে على صدره (বুকের উপর) এই অংশটি ঐ রাবীরই নিজেস্ব বৃদ্ধি, যার অন্যতম প্রমাণ সহীহ মুসলিমেও বর্ণনাটি ওয়ায়েল ইবনে হুজর থেকে ভিন্ন সহীহ সনদে এসেছে, কিন্তু সেখানে على صدره (বুকের উপর) এই অংশটি নেই। যাইহোক, সনদ যেমনই হোক; বুকের উপর হাত বাঁধা’র একাধিক বর্ণনাও যে রয়েছে তা কিন্তু ঠিক। মোটকথা, ইমাম চতুষ্টয় আর আহলে হাদীস দু’দিকেই দলিল-প্রমাণ থাকা সাব্যস্ত।

এবার হানাফীদের মতের সমর্থনে শুধু একখানা টাটকা সহীহ হাদীস পেশ করা হবে, ‘সাইয়্যেদুল হুফফাজ’ (سيد الحفاظ) উপাধিখ্যাত ও ইমাম বুখারী, মুসলিম সহ সিয়াহ সিত্তা’র চারজন মুহাদ্দিসের উস্তাদ, ইমাম আবুবকর আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবী শায়বাহ (১৫৯-২৩৫ হিজরী) সংকলিত হাদীসগ্রন্থ ‘মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ’ থেকে। সনদ নিম্নরূপ,

শায়খ ইবনে আবী শায়বাহ, ওয়াকী ইবনুল জাররাহ, মূসা ইবনে উমায়ের, আ’লক্বামাহ ইবনে ওয়ায়েল, সাহাবী হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.)। (রাবীদের সবাই ছিকাহ)। এবার হাদীসের অনুবাদ,

(হাদীস) সাহাবী ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.) বলেছেন, رأيت النبي صلى الله عليه وسلم يَضَعُ يَمِينَهُ على شِمَالِهِ تَحْتَ السُّرَّةِ অর্থাৎ ‘আমি নবী করীম (সা.)-কে দেখেছি, তিনি তাঁর ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভীর নিচে রেখেছেন।‘ (হাদীসের মান, সহীহ; রাবীদের সবাই বুখারীর রাবী)। এবার কয়েকজন হাদীস বিশারদের উক্তি পেশ করছি,

(১) মিশর বংশোদ্ভূত ইমাম আবুল ফিদা যায়নুদ্দীন কাশেম ইবনে কুতলুবুগা (الْحَافِظُ الْقَاسِمُ بن قُطْلُوبُغَا) (৪০২-৪৭৯ হিজরী) তার تَخْرِيجِ أَحَادِيثِ الِاخْتِيَارِ شَرْحِ الْمُخْتَارِ নামীয় গ্রন্থে লিখেছেন, هذا سَنَدٌ جَيِّدٌ অর্থাৎ এই সনদটি খুবই ভালো

(২) শায়খ শামসুদ্দীন আবু তাইয়েব আল মাদানী আল মালেকী (মৃত. ৯৬৩ হিজরী) (أبو الطَّيِّبِ الْمَدَنِيُّ) তার شَرْحِ التِّرْمِذِيِّ নামীয় গ্রন্থে লিখেছেন, هذا حَدِيثٌ قَوِيٌّ من حَيْثُ السَّنَدِ অর্থাৎ এই হাদীস সনদের দিক থেকে খুবই শক্তিশালী

(৩) শায়খ মুহাম্মদ আবেদ আস সিন্দী আল আনসারী (১১৯০-১২৫৭) (عَابِدٌ السِّنْدِيُّ) তার طَوَالِعِ الْأَنْوَارِ নামীয় গ্রন্থে লিখেছেন, رِجَالُهُ ثِقَاتٌ অর্থাৎ এর সমস্ত রাবী সিকাহ বা বিশ্বস্থ।

  • তবে এর সনদের উপরেও আপত্তি তোলার চেষ্টা করা হয়। শায়খ মুহাম্মদ হায়াত আস সিন্দী তার ‘ফাতহুল গাফূর’ পুস্তকে লিখেছেন, যদিও এর সনদ সহীহ কিন্তু বর্ণনায় تَحْتَ السُّرَّةِ অংশটুকু মুসনাদে আহমদ গ্রন্থের বর্ণনায় নেই। অথচ একই রাবী থেকে বর্ণিত। হতে পারে ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে উল্লিখিত ইমাম ইবরাহীম নাখয়ী (রহ.) কৃত একটি আছার (বর্ণনা)-এর মধ্যে تَحْتَ السُّرَّةِ অংশটুকু থাকায় কাতেব ভুল করে ঐ রেওয়ায়েতেও লিখে ফেলেন!

উত্তরে বলা হবে যে, (ক) ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (১৬৪-২৪১ হিজরী) ছিলেন মুসান্নাফ-এর সংকলকের একজন ছাত্র। ‘মুসান্নাফ’ (المصنف) কিতাব যখন সংকলন হয় তখন আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) কলমও ধরেননি। এমতাবস্থায় আহমদ ইবনে হাম্বলের সংকলনে ঐ অংশটুকু উল্লেখ না থাকার দরুন একথা কিভাবে বলা যায় যে ‘অতএব মুসান্নাফ কিতাবে অংশটুকু কাতেব ভুল করে লিখে ফেলেন’! এ সংক্রান্ত আরও যত উদ্দেশ্যমূলক ছিদ্রান্দ্বেষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে তার জবাব দেয়া হয় আবুদাউদ শরীফের আরবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘বাজলুল মাজহূদ’-এর (২/২৩) মধ্যে।

(খ) সহীহ ইবনে খুযাইমা’র রেওয়ায়েতে على صدره উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সহীহ মুসলিমের রেওয়ায়েতে على صدره অংশটুকু নেই। বরং সেখানে وضع يده اليمنى على اليسرى পর্যন্ত এসেই শেষ। অথচ একই রাবী থেকে বর্ণিত। এখন যারা উসূলে হাদীস (علم المصطلحات الاحاديث) না বুঝার দরুন এধরণের আপত্তি তুললেন তারা হুবহু ঐ একই যুক্তিতে على صدره অংশটুকুও সহীহ মুসলিমে না আসার কারণ কী ব্যাখ্যা দেবেন? তবে কি ‘ইবনে খুযাইমা’র রেওয়ায়েতেও কাতেবের ভুল হয়ে গিয়েছিল বলবেন? কোনো উত্তর থাকেনা।

(গ) ‘মুসান্নাফ’ কিতাব সংকলনের আগ থেকেই ইমাম চতুষ্টয় নাভির উপর বা নিচে হাত রাখা সুন্নাহ ও উত্তম বলে রায় দেয়াই প্রমাণ করে যে, “নাভির নিচে” শব্দটি মুসান্নাফের বর্তমান নুসখার ন্যায় মূল নুসখাতেও ছিল। যদি কোনো কোনো নুসখায় সত্যিই এই অংশটি না থাকার অভিযোগ সত্য-ও হয় তাতে ইমাম চতুষ্টয়ের সম্মিলিত ফতুয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বেনা। যেহেতু একই সাথে চার চারজন দুনিয়া বিখ্যাত ও সুপ্রসিদ্ধ ইমাম নামাযে হাত ‘নাভির নিচে’ রাখার মত ব্যক্ত করে ভ্রান্তির শিকার হয়েছেন, এটা বিবেক-বহির্ভূত কথা। একই সাথে চারজন ইমামের চোখ কখনো ফাঁকি দেয়া যায় না। এটাই যুক্তিযুক্ত।

শেষকথা, দু’দিকেরই যার যার মতের পক্ষে দলিল প্রমাণ থাকা সাব্যস্ত। কাজেই ‘শুধু একটাকে ধরো আর আরেকটা ছাড়ো’—নীতিটাই ঠিক না। বরং উভয়টাই রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ মনে করে আঁকড়ে ধরতে হবে। রাসূল (সা.)-এর কোনো কোনো সুন্নাহর ন্যায় এই সুন্নাতেও বৈচিত্র্য আনতে হবে। যে যেটা ইচ্ছে আমলে নিবে, তবে অন্যটাকেও স্বীকার করতে হবে। নইলে রাসূল (সা.)-এর অনেকগুলো সুন্নাহর মধ্যে কোনো একটি সুন্নাহর প্রতি নিজেরই অজান্তে বিদ্বেষ রাখার দরুন বিচারদিবসে নিঃসন্দেহে আমাকে-আপনাকে পাকড়াও হতে হবে। মা’আজাল্লাহ। আল্লাহ আমাদের বুঝার তাওফিক দিন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী এম.এ

সজোরে ‘আমীন’ বলা উত্তম-অনুত্তম সম্পর্কে

সজোরে বা আস্তে ‘আমীন’ বলা প্রসঙ্গে

হানাফীদের দলিল সহীহ হাদীস থেকে

নামাযে ‘আমীন’ বলা বিষয়ক রেওয়ায়েত দু’দিকেরই রয়েছে, সজোরে এবং আস্তে। বলে রাখা দরকার, ‘আমীন’ একটি দোয়া ও মোনাজাত, যা আল্লাহতালার দরবারে পেশ করা হয়। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা, উম্মে সালমাহ, আবু হোরায়রা ও ইবনে আব্বাসের শাগরেদ বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত আতা ইবনে আবী রাবাহ (عطاء ابن ابى رباح) এর বর্ণনায় এসেছে যে, ‘আমীন হচ্ছে একটি দোয়া’ (آمين دعاء)। সহীহ বুখারী ১/১০৭ দ্রষ্টব্য। আর আল্লাহ (নাউযুবিল্লাহ) না বধির, না অনুপস্থিত—যেমনটি বুখারী শরীফেও এসেছে যে, لا تدعون أصمَّ ولا غائباً অর্থাৎ ‘তোমরা কোনো বধির কিংবা অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছো না।’ (সহীহ বুখারী হাদীস নং ৭৩৮৬)। তাই গবেষকদের বিশাল একটি অংশ মনে করেন, দোয়া যখন আস্তে করাই উত্তম, তখন নামাযে ‘আমীন’ও আস্তে বলা উত্তম। আর সজোরে বলা বড়জোর মুবাহ, যেহেতু বিভিন্ন রেওয়ায়েত বলছে, সজোরে ‘আমীন’ বলা শিক্ষাদানের জন্যই ছিল (ما اراه الا ليعلمنا), Just as a Teaching, Not Continuously; নও মুসলিম হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা.) বলেন, ثلاث مرات অর্থাৎ রাসূল (সা.) ‘আমীন’ সজোরে তিনবার বলেছেন। এখন তো ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়ে গেল! যাইহোক, আমি এখানে আস্তে ‘আমীন’ বলার একটি মাত্র রেওয়ায়েত পেশ করছি,

হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, إذا أمَّنَ الإمام فأمِّنوا অর্থাৎ ইমাম যখন ‘আমীন’ বলবে তখন তোমরাও আমীন বলো (তবে এ থেকে সজোরে না আস্তে—এর কোনোটাই পরিষ্কার করে বোঝা যায়না-লিখক)। فإنه مَن وافَقَ تأمينُه تأمينَ الملائكة غُفِرَ له ما تقدَّم من ذنبه অর্থাৎ কেননা যার ‘আমীন’ বলা ফেরেশতাদের ‘আমীন’ বলার সাথে মিলে যাবে তার পেছনের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (সহীহ বুখারী, মুসলিম, কিতাবুস সালাত)।

প্রশ্ন আসতে পারে যে, তাহলে এই হাদীস আস্তে আমীন বলার সমর্থনে দলিল কিভাবে হল?

উত্তর এই যে, হাদীসটিতে বলা হয়েছে—ইমাম যখন আমীন বলবে…. (إذا أمَّنَ الإمام)। তাই এখন দেখতে হবে যে, এই বর্ণনানুসারে ইমামের (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ’র) ‘আমীন’ জোরে ছিল, না আস্তে ছিল! সহীহ মুসলিম এবং সুনানে আবুদাউদ শরীফে উক্ত হাদীসের রাবী (বর্ণনাকারী) শিহাব ইবনে জুহরীর রেওয়ায়েত শেষে পরিষ্কার করে এই বাক্যটিও বর্ণিত হয়েছে যে, و كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول آمين অর্থাৎ ‘আর রাসূল (সা.)ও আমীন বলতেন।’ এখন এখানে প্রশ্ন আসে, এই হাদীসের إذا أمَّنَ الإمام (ইমাম যখন আমীন বলবে) দ্বারা রাসূল (সা.)ও আমীন ‘উঁচু আওয়াজে’-ই বলতেন, এমনটা বুঝালে তবে ইমাম জুহরী (রহ.) সেটিকে স্বতন্ত্র বাক্যে পুনরায় উল্লেখ করার কী অর্থ? অতএব, বুঝা যায় যে নিশ্চয়ই রাসূল (সা.)-এর ‘আমীন’ বলাটা সজোরে ছিলনা। অন্যথা রাবীর এমন কর্মকে تحصيل حاصل (তাহছীলে হাছেল) বা পুনঃবৃত্তি (tautology) বলতে হয়, যা ব্যাকরণের নীতিবিরুদ্ধ ও নিন্দনীয়। হযরত সামুরা ইবনুল জুনদুব (রা.) এবং হযরত ইমরান ইবনুল হোসাইন (রা.) দুইজন একবার হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.)-এর নিকট গেলেন। সামুরা (রা.) হাদীস বর্ণনা করে বললেন যে, রাসূল (সা.) নামাযে তাকবীরে তাহরিমার পরে এবং ‘ওয়ালাদ-দাললীন” (ولا الضالين)-এর পরেও কিছু সময় চুপ থাকতেন। হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) শুনলেন এবং সামুরা (রা.)-এর রেওয়ায়েতের সাথে সহমত ব্যক্ত করলেন। তিনি বললেন, সামুরার স্মরণই যথার্থ। (আস-সুনানুল কোবরা লিল বায়হাক্বী খণ্ড নং ২, কিতাবুস সালাত; হাদীস নং ৩০৭৫)। এই থেকেই পরিষ্কার বুঝা যায় যে, রাসূল (সা.)-এর ‘ওয়ালাদ-দাললীন” (ولا الضالين)-এর পরেও চুপ থাকতেন মানে তিনি ‘আমীন’ নিঃশব্দে বলতেন। অতএব, সহীহ বুখারীর হাদীসের অস্পষ্ট বিবরণ ও সাহাবীর সুস্পষ্ট সাক্ষ্য সহ প্রমাণিত হয় যে, নামাযে ‘আমীন’ আস্তে বলার দলিলও খুব শক্তিশালী। এমন শক্তিশালী দলিল পেয়ে এবার আপনার নিশ্চয়ই মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে, তাই নয় কি? হ্যাঁ, সত্য এটাই; যা ব্যাপক পড়াশোনা না থাকার দরুন আমাদের অধিকাংশই জানত না।

এই পর্যায় উল্লেখ করা জরুরি যে, ‘আমীন’ বলার যতগুলো সহীহ হাদীস রয়েছে সেগুলোর একটিও ‘সজোরে’ বলার মর্মে সরীহ বা সুস্পষ্ট নয়, বরং অস্পষ্ট। আবার যেগুলো সরীহ—দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সেগুলো সনদের বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনা।

শেষকথা, উত্তম-অনুত্তম বিষয়ক রেওয়ায়েত নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা থেকে সবাই বিরত থাকতে হবে। যেখানে দুই দিকেরই রেওয়ায়েত বিদ্যমান সেখানে উভয় রেওয়ায়েতের উপরই উম্মাহার বৈচিত্র্যময় আমল জারি থাকুক, এই প্রত্যাশা। তবে যেই সমাজে-এলাকায় পূর্ব থেকে যেটি চালু রয়েছে সেখানে সেটির মুকাবিলায় অন্যটিতে জোর না দিই। নচেৎ ফেতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার আপনাকেই নিতে হবে, উম্মাহার মাঝে দলাদলি সৃষ্টির গুনাহও আপনাকেই বহন করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সহীহ বুঝ দিন।

নামাযে রাফউল ইয়াদাইন (ফেইসবুক থেকে)

সজোরে বা আস্তে ‘আমীন’ বলা প্রসঙ্গে (ফেইসবুক থেকে)

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী