Home Blog Page 24

নামাযে রাফউল ইয়াদাইন করার হুকুম

রাফউল ইয়াদাইন

হানাফীদের দলিল সহীহ হাদীস থেকে

নামাযে তাকবীরে তাহরিমা ছাড়া হাত আর কোথাও না উঠানোর পাঁচটি স্পষ্ট রেওয়ায়েত আছে। সেগুলোর একটি হচ্ছে, হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি তোমাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামায পড়ে দেখাব কি? একথা বলে তিনি فصلى فلم يرفع يديه الا فى اول مرة অর্থাৎ নামায পড়লেন এবং শুধুই প্রথমবার তাকবীরে তাহরিমায় হাত উঠালেন। (তিরমিজি হাদীস নং ২৫৭, আবুদাউদ হাদীস নং ৭৪৮)।

তাহকীক : ইমাম তিরমিজি বলেছেন, এই হাদীস হাসান, ইমাম ইবনে হাযম বলেছেন, এটি সহীহ, (আল মুহাল্লা ৪/৮৮)। আল্লামা আহমদ মুহাম্মদ শাকের (রহ.) লিখেছেন, و هذا الحديث صحيح صححه ابن حزم و غيره من الحفاظ، وما قالوا فى تعليله ليس بعلة অর্থাৎ এই হাদীসের সনদ সহীহ। ইবনে হাযম সহ অনেক হাফেজে হাদীস এটিকে সহীহ বলেছেন। অন্যরা এতে যেসব ইল্লত (ত্রুটির কারণ) সাব্যস্ত করেছেন সেগুলো আদৌ কোনো ইল্লতই নয়। (শরহে জামে তিরমিজি ২/৪১)।

শেষকথা, নামাযে হাত বিভিন্ন জায়গায় উঠানোর পক্ষে যেমন রেওয়ায়েত রয়েছে, হাত না উঠানোরও রয়েছে। এই সম্পর্কে যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দেস সাইয়েদ আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) বলেছেন, تواتر العمل بهما من عهد الصحابة و التابعين و اتباعهم على كلا النحوين و انما بقى الاختلاف فى افضل من الامرين. অর্থাৎ উভয়ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্নভাবে আমল হয়ে আসছে—সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ীদের যুগ থেকেই; তবে মতপার্থক্য শুধু এতটুকুতেই যে, এর কোনটি উত্তম।

অতএব, উত্তম-অনুত্তম বিষয়ক রেওয়ায়েত নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা থেকে সবাই বিরত থাকতে হবে। যেখানে দুই দিকেরই সহীহ রেওয়ায়েত বিদ্যমান সেখানে উভয় রেওয়ায়েতের উপরই উম্মাহার বৈচিত্র্যময় আমল জারি থাকুক, এই প্রত্যাশা। তবে যেই সমাজে-এলাকায় পূর্ব থেকে যেটি চালু রয়েছে সেখানে সেটির মুকাবিলায় অন্যটিতে জোর না দিই। নচেৎ ফেতনা (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার আপনাকেই নিতে হবে, উম্মাহার মাঝে দলাদলি সৃষ্টির গুনাহও আপনাকেই বহন করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সহীহ বুঝ দিন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

কাদিয়ানীদের ধারাবাহিক প্রশ্নগুলোর জবাব

0

খুব সাধারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয়া হল যেগুলো সচরাচর করা হয়ে থাকে। পাঠকবৃন্দ, উত্তরগুলো আমার ফেইজবুক পেইজ থেকে পড়তে ক্লিক করুন!

আপনার জিজ্ঞাসার উত্তরে….
কিস্তি ১ https://www.facebook.com/226066450926065/posts/1831556610377033/
কিস্তি ২ https://www.facebook.com/226066450926065/posts/1831969627002398/
কিস্তি ৩ https://www.facebook.com/226066450926065/posts/1831995306999830/
কিস্তি ৪ https://www.facebook.com/226066450926065/posts/1832536086945752/
কিস্তি ৫
https://www.facebook.com/226066450926065/posts/1835901869942507/

উত্তরদাতা, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী, লিখক ও গবেষক।

আয়েশা (রা.)-এর বিবাহ কত বছর বয়সে?

ঐতিহাসিক একটি প্রামাণ্য তথ্য ও সমালোচকদের দাঁতভাঙা জবাব!

এঁরাও বিখ্যাত মহামনীষী! কিন্তু এঁদের বিয়ে সংক্রান্ত বয়স নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলেনা! প্রশ্ন তুলবে-ই বা কেন? সময় আর অঞ্চল ভেদে বিবাহের আদর্শ বয়স যে বিভিন্ন হয়ে থাকে, যদিও সময়ের পরিক্রমায় সেই নিয়মেও পরিবর্তন আসতে থাকে! বলতে ছিলাম, ইতিহাসবিখ্যাত অনেকের জীবন ঘাটলে আমরা দেখি,

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিয়ে করেছিলেন ১৪ বছর বয়সে তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল ৮ বছর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন ২২ বছর বয়সে তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল ১১ বছর।

বঙ্কিমচন্দ্র বিয়ে করেছিলেন ১১ বছর বয়সে তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন ১৪ বছর বয়সে তখন তাঁর স্ত্রী সারদা দেবীর বয়স ছিল মাত্র ৬ বছর।

শিবনাথ শাস্ত্রী বিয়ে করেছিলেন ১৩ বছর বয়সে, তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল ১০ বছর।

রাজনারায়ণ বসু বিয়ে করেছিলেন ১৭ বছর বয়সে তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল ১১ বছর।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন ১৯ বছর বয়সে, তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর।

সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন ১৭ বছর বসে তখন তাঁর স্ত্রীর বয়স ছিল মাত্র ৭ বছর।

লিনা মেদিনা! ৫ বছর ৭ মাস ২১ দিন বয়সে সন্তানের জন্ম দেয়ায় বিশ্বরেকর্ড করা সর্বকনিষ্টা মা উল্লেখ করে তার বন্ধনা করা হয়।

দ্বিতীয় কিং রিচার্ড ৩০ বছর বয়সে ফরাসি রাজকুমারী ৭বছর বয়সী ইসাবেলাকে বিয়ে করেন।

পর্তুগালে রাজা ডেনিস ১২ বছর বয়সী সেন্ট এলিজাবেথকে বিবাহ করেছিলেন।

নরওয়ের ষষ্ঠ রাজা হাকোন ১০ বছরের রাণী মার্গারেটকে বিবাহ করেছিলেন।

এসেক্সের কাউন্ট আগ্নেসের বিয়ের পাকা কথা হয় মাত্র ৩ বছর বয়সে। ১২ বছর বয়সে তার বিবাহ হয় পঞ্চাশ বছর বয়সী সঙ্গির সাথে।

রোমানোস ইতালির রাজকন্যা ৪ বছর বয়সী বার্থা ইউডোকিয়াকে বিবাহ করেন। ইতিহাসের পাতায় এরকম অসংখ্য নজির আছে। এগুলো আমাদের ইতিহাসের অংশ। এসব আমাদের ভুলে যাওয়া সমীচিন নয়।

একসময় সতীদাহ প্রথা ছিল। জীবন্ত নারীকে সহমরণে তার মৃত স্বামীর সঙ্গে চিতায় আত্মহুতি দিতে হতো। কিন্তু সতীদাহ বা সহমরণই হিন্দু ধর্মের বৈশিষ্ট্য বলার অর্থ হিন্দুর প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ চর্চা করা। হিন্দু শাস্ত্রের ধূয়া তুলে হিন্দুর প্রতি ঘৃণা ও সহিংসতা একালে কেউ প্রদর্শন করে না। কারণ, সমাজ, আইন, সংস্কৃতি ও ইতিহাস ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের চেতনা উপলব্ধি ও বিচার ক্ষমতা অনেক বিকশিত হয়েছে। আগের মতো নাই। ইতিহাস ও সমাজ স্থির কিছু নয়, বদলায়। ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু দেশ ও কাল বিবেচনায় না নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে দোষী করলে সেটা কাণ্ডজ্ঞানের অভাব হবে। তাই না?

তাহলে ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে এত বিতর্ক কেন?

এই তো মাত্র গত শতাব্দীর কথাই ধরে নেয়া যাক। প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বয়স যখন ১৩ ও বেগম ফজিলাতুন্নেসার বয়স যখন মাত্র তিন, তখন পরিবারের বড়রা তাদের বিয়ে ঠিক করেন। ১৯৩৮ সালে বিয়ে হবার সময় বেগম ফজিলাতুন্নেসা রেনুর বয়স ছিল ৮ বছর ও শেখ মুজিবের ১৮ বছর। এখানে কারো সাথে কারো তুলনা টানা উদ্দেশ্য নয়, আর এটি সম্ভবও না; কারণ মহানবীর সাথে শেখ সাহেবের তুলনা করতে চাওয়াই বোকামি! বড়জোর এখানে আজ থেকে ১৪শ বছর আগেকার বিয়ের আদর্শ বয়স যে মাত্র ৮-১২ এর ভেতরই ছিল সেটা তুলে ধরতে চাচ্ছিলাম।

বলা হয় যে, হযরত আয়েশা (রা.) ৯ বছর বয়সে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে সংসার শুরু করেছিলেন। ব্যাস আর কী লাগে!! মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় তুফান শুরু! কিন্তু এটা কেমন ন্যায় বিচার? মহানবীর সেই সময়টিতে বিবাহের আদর্শ বয়স যদি ওটাই হয়ে থাকে তবে তো উচিত ছিল, সেটিকে সেই সময়ের প্রচলিত আইনেই বিচারকরা! মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে কন্যা আর কন্যাপক্ষের কিংবা সে সময়কার প্রচলিত নিয়ম ভঙ্গের যদি কোনো অভিযোগ না থাকে, তবে তো তিনি ন্যায়বিচার পাওয়ারই যোগ্য, তাই নয় কি?

  • অপ্রিয় হলেও সত্য, হযরত আয়েশা (রা.)-এর বয়স তখন ৬-৯ বছর ছিল মর্মে তথ্যটিও কোনো কোনো গবেষকের বিচারে সুনিশ্চিত নয়। এমনকি সহীহ বুখারীরই সূত্র পরম্পরায় দু’টি মতই প্রথম থেকে প্রচলিত। কারণ সহীহ বুখারীসহ আরও বহু ঐতিহাসিক প্রামাণ্য তথ্য মতে সুস্পষ্ট আছে যে, হযরত আয়েশা (রা.)-এর বিয়ের সময় বয়স কম চে কম ১৩-১৯ এর ভেতরেই ছিল। অধিকন্তু ৬ আর ৯ বছরের বর্ণনার সূত্রে উল্লিখিত হিশাম ইবনে উরওয়াহ নামের রাবী (হাদীসের বর্ণনাকারী জনৈক তাবেয়ী) সম্পর্কে ইমাম মালেক (রহ.) আজ থেকে ১২’শ বছর আগেই বলে গেছেন যে, তিনি শেষ বয়সে (তথা ৭১ বছর বয়সে উপনীত হলে) মদিনা থেকে ইরাক চলে যাওয়ার পর স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। ফলে তার বর্ণনায় অনেক কিছুই উল্টোপাল্টা হয়ে যেত। সেজন্য তার থেকে কোনো ইরাকী রাবী যত হাদীসই বর্ণনা করবে, সেগুলো গ্রহণযোগ্য হবেনা।

উল্লেখ্য, বুখারী শরীফে হযরত হিশাম ইবনে উরওয়াহ তিনি ইরাকি রাবী থেকেই এটি বর্ণনা করেন। দেখুন, তাহযীবুত তাহযীব, লেখক ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.)। প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম আবুল হাসান ইবনে ক্বাত্তান (রহ.) ‘বায়ানুল ওয়াহাম ওয়াল ইবহাম‘ (بيان الوهم و الإبهام) কিতাবের ৫ম খন্ডের ৫০৪ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন: أن هشام اختلط في آخر عمره অর্থ হিশাম ইবনে উরওয়াহ শেষ বয়সে উল্টাপাল্টা করে ফেলত।’

  • ইমাম যাহাবী (রহ.) ‘মিযানুল ই’তিদাল‘ কিতাবের ৪র্থ খন্ডের ৩০১-৩০২ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন, هشام بن عروة أحد الأعلام، حجة إمام، لكن في الكبر تناقض حفظه و لم يختلط أبداً অর্থ হিশাম ইবনে উরওয়াহ (রহ.) তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। নির্ভরযোগ্য ইমাম ছিলেন। তবে বৃদ্ধাবস্থায় তার স্মৃতিলোপ পায় অথচ (ইতিপূর্বে) তিনি কখনো উল্টাপাল্টা করেননি।’ আরো দেখুন, আল-জারহু ওয়াত তা’দীল ৬/৪৯০, ইমাম যাহাবী (রহ.)।

আসলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নিয়ে অহেতুক সমালোচনার প্রধান কারণ হলো তার অতুলনীয় উত্তম চরিত্র মাধুরী। যে চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে দেড় হাজার বছর ধরে মানুষ অনবরত ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিতর্কিত করে তারা বিশ্বব্যাপী ইসলাম গ্রহণের অগ্রযাত্রা রুখে দিতে চায়।

বিজেপি নেতা নেত্রি ও নূপুর শর্মাগং যা-ই বলুক না কেন, স্বয়ং আল্লাহতালা তাঁর প্রিয় হাবীবের চরিত্রের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, اِنَّکَ لَعَلٰی خُلُقٍ عَظِیۡمٍ (ইন্নাকা লা’আলা খুলুকিন আযীম)। অর্থ-নিশ্চয়ই আপনি সর্বোৎকৃষ্ট চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত। (আল কুরআন)। কিয়ামত পর্যন্ত এই চরিত্র মাধুরী পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে প্রধান আকর্ষণ হয়ে থাকবে। দলে দলে মানুষ মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত হবার সৌভাগ্য অর্জন করতে থাকবে, ইনশাআল্লাহ। তোমাকে ভালোবাসি হে প্রিয়নবী! তোমার চরণে উৎসর্গ করছি আমার স্বর্গ-নরক প্রিয় বাবা-মা।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

কাদিয়ানীরা মুসলমানদের ব্যাপারে কেমন ধারণা রাখে?

দ্বিমুখী নীতি ও প্রতারণার আরেক নাম ‘কাদিয়ানী জামাত’!

অপ্রিয় হলেও সত্য, সারা দুনিয়ার মুসলিম উম্মাহা কাদিয়ানীদের ‘কাফের-অমুসলিম-জিন্দিক’ আখ্যা দেয়ার অনেক পূর্ব থেকে ওরাই বরং সমস্ত ‘অ-কাদিয়ানী’কে (অর্থাৎ যারা কাদিয়ানী মতের অনুসারী নয় এমন প্রত্যেককে) কাফের আখ্যা দিয়ে রেখেছে। বরং ইহুদী, খ্রিস্টান, অমুসলিম, মুরতাদ, জাহান্নামী ইত্যাদী শব্দেও আখ্যা দিয়েছে। আমি আজ এখানে রেফারেন্স সহ কিছু উদ্ধৃতি সংক্ষেপে তুলে ধরছি। তা পড়ার আগে কাদিয়ানী জামাতের পাক্ষিক আহমদী (তাং ১৫ ডিসেম্বর ২০১২, পাতা ৬) নামীয় ম্যাগাজিনের এই পাতাটি পড়ে নেবেন! এবার নিশ্চয়ই চমকে উঠেছেন, তাই না! হ্যাঁ, চমকে উঠারই কথা। কারণ, পাক্ষিক আহমদী পত্রিকায় এত সুন্দর করে কথাগুলো যারা লিখেছেন তাদেরই পূর্বসূরীরা কিন্তু এত সুন্দর করে মুসলমানদের নিয়ে লিখেনি।

মির্যা কাদিয়ানী আর তার দুই পুত্রের রচনাবলি থেকে নিম্নরূপ :

(১) ‘খোদাতালা আমার উপর প্রকাশ করে দিয়েছেন যে, যাদের নিকট আমার দাওয়াত পৌঁছেছে আর তারা তা কবুল করেনি এমন ব্যক্তি মুসলমান নয় এবং এরা (পরকালে) পাকড়াও হবে।’ (মির্যা কাদিয়ানীর কথিত ওহী-সমগ্র গ্রন্থ তাযকিরাহ পৃষ্ঠা নং ৫১৯; ইলহাম, মার্চ ১৯০৬ ইং, চতুর্থ এডিশন)।

  • মির্যা কাদিয়ানী সাহেব জনৈক প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তরে পরিষ্কার করে লিখে গেছেন যে, এখন যারা তাকে অস্বীকার করে সে কাফের। তিনি তার ‘কাফের’ ফতুয়ার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। সুতরাং সাব্যস্ত হল যে, অ-কাদিয়ানীদের কেউই তাদের দৃষ্টিতে মুসলমান নয়। হোক সে মসজিদুল হারামাইনের ইমাম-খতিবগণ কিংবা আমাদের দেশের সেসব রাজনৈতিক ব্যক্তিগণ-ও যারা কাদিয়ানীদের প্রতি এতই উদার যে, তারা তাদেরকে অমুসলিম বা কাফের মানতে নারাজ। বলাবাহুল্য, আমাদের দেশের জাতীয় নেতৃবৃন্দ কেউই কাদিয়ানীদের দৃষ্টিতে মুসলমান নন, এমনকি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুও তাদের মৌলিক বিশ্বাসের দিক থেকে অমুসলিম, জাহান্নামী। নাউযুবিল্লাহ। মির্যার বইয়ের বাংলা অনূদিত কপি হাকীকাতুল ওহী থেকে স্ক্রিনশট দেখুন,


(২) ‘প্রত্যেক মুসলমান এই বইগুলোকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখে এবং এগুলোতে পরিবেশিত তত্ত্ব ও তথ্য দ্বারা উপকৃত হয় এবং আমার ইসলামের দিকে আহবান করাকে সমর্থন দেয়, ইল্লা যুররিয়্যাতুল বাগাইয়া তথা বেশ্যার সন্তানরা ছাড়া, আল্লাহ এদের উপর মোহর মেরে দিয়েছেন তারা ঈমান আনবেনা।’ (আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, রূহানী খাযায়েন খন্ড নং ৫ পৃষ্ঠা নং ৫৪৭-৪৮)।

(৩) মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ লিখেছেন, ‘আমাদের জন্য ফরজ হচ্ছে, আমরা যেন গয়ের আহমদীদেরকে (অর্থাৎ অ-কাদিয়ানীদেরকে) মুসলমান মনে না করি এবং তাদের পেছনে সালাত না পড়ি। কেননা আমাদের দৃষ্টিতে তারা খোদাতালার একজন নবীকে অস্বীকারকারী। এটি ধর্মীয় মু’আমালা (অর্থাৎ ধর্মীয় পারস্পরিক সম্পর্ক), এতে কিছু করার মত কারো কোনো ইখতিয়ার বা সুযোগ নেই।’ (আনওয়ারুল উলূম খণ্ড নং ৩ পৃষ্ঠা নং ১৪৮; মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ)।

মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এর ‘আনওয়ারে খিলাফাত’ থেকে প্রামাণ্য স্ক্যানকপি

মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এর ‘বারাকাতে খিলাফত‘ গ্রন্থে লিখা আছে, কোনো আহমদী যেন গয়ের আহমদীর নিকট কন্যাদান না করে। এটি হযরত মসীহ মওউদের কড়া নির্দেশ। এই নির্দেশ সম্পন্ন করা প্রত্যেক আহমদীর উপর ফরজ। স্ক্রিনশট দেখুন।

(৪) ‘যে সমস্ত মুসলমান মির্যা কাদিয়ানীর নিকট বাইয়েত নেয়নি, তারা যদি তার নামও না শুনে থাকে তবুও তারা কাফের এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে বাহিরে।’ (আয়নায়ে সাদাকাত, আনওয়ারুল উলূম খণ্ড নং ৬ পৃষ্ঠা নং ১১০; মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ ও কাদিয়ানীদের দ্বিতীয় খলিফা)। নিচের সম্পূর্ণ পাতাটির বাংলা অনুবাদ দেখানে এখানে

(৫) মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘আমি মসীহ মওউদ (মির্যা) এর নানা উদ্ধৃতি দ্বারা সাব্যস্ত করছি যে, যে তাকে অস্বীকার করবে সে তার দৃষ্টিতে একজন কাফের।’ (আয়নায়ে সাদাকাত, আনওয়ারুল উলূম খণ্ড নং ৬ পৃষ্ঠা নং ১৫১)।

(৬) ‘যারা তাকে কাফের মনে করে তিনি শুধু তাদেরকেই কাফের বলেননি, বরং যারা তাকে কাফের তো বলেনা কিন্তু তার দাবীগুলো স্বীকার করেনা, এমন ব্যক্তিদেরও তিনি কাফের আখ্যা দিয়েছেন।’ (আয়নায়ে সাদাকাত, আনওয়ারুল উলূম খণ্ড নং ৬ পৃষ্ঠা নং ১৫১)।

(৭) ‘সর্বশেষে তিনি (মির্যা) কুরআনুল কারীমের একখানা আয়াত দ্বারা দলিল দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি মির্যা সাহেবকে রাসূল মানবেনা, সে যদিও তাকে মুখে মুখে একজন সত্যবাদী মেনে নেয় না কেন; সেও পাক্কা কাফের।’ (আয়নায়ে সাদাকাত, আনওয়ারুল উলূম খণ্ড নং ৬ পৃষ্ঠা নং ১৫১)। ৫, ৬ এবং ৭ নং এর স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য।

(৮) মির্যাপুত্র মির্যা বশির আহমদ এম.এ লিখেছেন,

پس اس آیات کے ماتحت ہر ایک ایسا شخص جو موسی کو تو مانتا ہے مگر عیسی کو نہیں مانتا یا عیسی کو مانتا ہے مگر محمد صلعم کو نہیں مانتا اور محمد صلعم کو مانتا ہے پر مسیح موعود کو نہیں مانتا وہ نہ صرف کافر بلکہ پکا کافر اور دائرہ اسلام سے خارج ہے۔

অর্থাৎ সুতরাং এই আয়াত হতে বুঝা গেল যে, প্রত্যেক ব্যক্তি যে মূসাকে মান্য করে কিন্তু ঈসাকে মান্য করল না, অথবা ঈসাকে মান্য করে কিন্তু মুহাম্মদ (সা.)-কে মান্য করল না; অথবা মুহাম্মদ (সা.)-কে মান্য করে কিন্তু মসীহ মওউদ (দাবীদার মির্যা কাদিয়ানী)-কে মান্য করল না, সে শুধুই কাফের নয়, বরং পাক্কা কাফের এবং ইসলামের গণ্ডি থেকে বাহিরে।’ (কালিমাতুল ফছল পৃষ্ঠা নং ২০; পিডিএফ থেকে পৃষ্ঠা নং ২১)। উল্লেখ্য, বইটি উর্দূ ভাষায় রচিত, এর এখনো বাংলায় অনুবাদ হয়নি। এটির মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৯৪; বইটি প্রথম দিকে কাদিয়ানীদের অফিসিয়াল উর্দূ ভাষার একটি সাময়িকী ‘রিভিউ অফ রিলিজন্স’ এর অংশবিশেষ। স্ক্রিনশট প্রদত্ত হল,

(৯) ‘হযরত মির্যা সাহেবের ইলহাম হচ্ছে,…যে লোক তোমার আনুগত্যকারী নয় এবং তোমার বাইয়েতে দাখিল হবেনা ও তোমার বিরোধী সে খোদা এবং রাসূলের নাফরমান এবং জাহান্নামী।’ (কালিমাতুল ফসল, তৃতীয় অধ্যায় পৃষ্ঠা নং ৩৯ [হার্ডকপি]; লিখক, মির্যা  কাদিয়ানীর পুত্র মির্যা বশির আহমদ এম. এ, প্রকাশকাল  ১লা মে ১৯১৫ ইং, কাদিয়ান থেকে প্রকাশিত)।

(১০) মির্যাপুত্র মির্যা বশির আহমদ এম.এ তার পিতা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘অতপর নুযূলে মসীহ গ্রন্থের ৪ নং পৃষ্ঠার একটি টিকায় হুযূর (মির্যা কাদিয়ানী) লিখেছেন, শেষ যুগের জন্য খোদা নির্ধারণ করেছিলেন যে, এটি একটি সাধারণ ফেরা’র (পুনঃজন্মের) যুগ হবে (کہ وہ ایک عام رجعت کا زمانہ ہوگا)। যাতে এই দয়াপ্রাপ্ত উম্মত অন্যান্য উম্মত অপেক্ষা কোনো দিক দিয়ে কম না থাকে। সুতরাং তিনি আমাকে সৃষ্টি করলেন এবং বিগত সমস্ত নবীর সাথে আমাকে সদৃশ্যতা দিলেন এইভাবে যে, তাদের সবার নামে আমার নামকরণ করলেন। আর তাই বারাহীনে আহমদিয়া গ্রন্থে খোদাতালা আদম, ইব্রাহিম, নূহ, মূসা, দাউদ, সুলায়মান, ইউসুফ, ইয়াহিয়া এবং ঈসা প্রমুখ সবার নামে আমার নাম রেখে দিলেন। আর এইভাবেই বিগত সমস্ত নবী এই উম্মতের মাঝে যেন দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করলেন। এমনকি সর্বশেষে মসীহ (আ.)-এরও জন্ম হয়ে গেল। আর যে বা যারাই আমার বিরোধিতাকারী, খোদাতালা তাদের নাম রেখে দিয়েছেন ঈসায়ী, ইহুদী এবং মুশরিক।’ (কালিমাতুল ফসল পৃষ্ঠা নং ৪৩-৪৪)।

(১১) ‘যে লোক মসীহ মওউদের দিকে না আসবে (অর্থাৎ তার দলভুক্ত হবেনা) সে ঈমানহারা।’ (কালিমাতুল ফসল, পৃষ্ঠা নং ৫২)।

(১২) ‘কালিমাতুল ফসল’ বইতে মির্যা কাদিয়ানীর একটি ইলহামের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখা আছে, ‘এই ইলহাম দ্বারা পরিষ্কার বুঝা গেল যে, আল্লাহতালা এই যামানায়  মুমিন হওয়ার মানদণ্ড স্থির করেছেন মসীহ মওউদ [অর্থাৎ মির্যা কাদিয়ানী]’র উপর ঈমান আনয়ন করাকে। সুতরাং মসীহ মওউদকে যেই অস্বীকার করে তার পূর্বের ঈমান–ও যাবে।’ (কালিমাতুল ফসল, তৃতীয় অধ্যায়, পৃষ্ঠা নং ৫২)।

(১৩) ‘এই সমস্ত উদ্ধৃতি দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, (পবিত্র কুরআনের ৬১ নং সূরা) সূরা আস-সাফ (الصف)-এর মধ্যে ঈসা (আ.) ‘আহমদু রাসূলুল্লাহ‘ বলে যার আগমন সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করে গেছেন সেই আহমদ (সা.) মসীহ মওউদ-ই।’ (কয়েক লাইন পরে লিখেন) ‘এই জন্যই তার (অর্থাৎ মির্যা কাদিয়ানীর দাবীসমূহ) অস্বীকারকারী একজন কাফের।’ (কালিমাতুল ফসল, পৃষ্ঠা নং ৫১)।

(১৪) ‘অতএব ঐ ইলহাম দ্বারা প্রমাণিত হয়ে গেল যে, যে সমস্ত ব্যক্তি মির্যা সাহেবকে সত্যবাদী বিশ্বাস করবেনা এবং তার দাবীগুলোর উপর ঈমান রাখবেনা তারা কাফের।’ (কালিমাতুল ফসল, পৃষ্ঠা নং ৫৩, তৃতীয় অধ্যায়)।

(১৫) ‘মির্যা কাদিয়ানী মুহাম্মদ (সা.)-এর একজন খাতামুল খোলাফা বা খলিফা বা মুত্তাবি। ফলে তাকে অস্বীকারকারীও কাফের (সারমর্ম)।’ (কালিমাতুল ফসল, পৃষ্ঠা নং ৬১)।

(১৬) ‘এই যুগে নবী করীম (সা.)-এর অনুসরণ করার জন্য মসীহ মওউদ (মির্যা)-এর প্রতি ঈমান আনা জরুরী।’ (কালিমাতুল ফসল, পৃষ্ঠা নং ৬৬)।

মুসলিম-অমুসলিম প্রসঙ্গ :

পবিত্র কুরআন এবং হাদীসের অনেক স্থানে মুসলমানকে মুসলমান পরিচয়ে থাকতে ও মুসলিম হয়েই মৃত্যুবরণ করতে পরিষ্কার বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে সূরা আলে ইমরান আয়াত নং ১০২ দেখুন। “হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো আর তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।” এখন ‘কে মুসলমান আর কে মুসলমান না‘ তা শুধুই আল্লাহর উপর চাপিয়ে দেয় যারা, তারা কি উক্ত আয়াতের উপর ঈমান রাখবে না? কেননা ‘মুসলমানিত্বের’ দায়ভার শুধুই আল্লাহর উপর চাপাতে গেলে তখন কারো পক্ষেই সম্ভব নয় যে, সে শরয়ী বিধানানুযায়ী জীবনযাপনের জন্য নিজেকে বাহ্যিকভাবে ‘মুসলমান’ হিসেবে প্রমাণ করা। আর এ জন্যই ‘কে মুসলিম আর অমুসলিম’ সেটি পুরোপুরি নির্ভর করবে ব্যক্তির বিশ্বাস কিবা সেসব দর্শনের উপর যেগুলোকে সে বিশ্বাসের উৎসমূল হিসেবে মনেপ্রাণে ধারণ করে থাকে। এমতাবস্থায় কারো ধর্মপরিচয়ের জন্য ‘বুক ছিড়ে ঈমানের ঝলক’ দেখা বা না দেখার আর কোনো ফালতু বিতর্কের অবকাশ থাকেনা। যাইহোক, এভাবে বললেও যেসব কাদিয়ানীবাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থকদের বুঝে আসেনা তাদের উদ্দেশ্যে মির্যা কাদিয়ানীর একখানা উক্তি পেশ করছি। তার ‘হাকীকাতুল ওহী’ গ্রন্থের এক জায়গায় লিখা আছে “শরীয়তের একটি মাসয়ালা হল মুমিনকে কাফের বলা ব্যক্তিটি অবশেষে নিজেই কাফের হয়ে যাবে….এবং কাফেরকে মুমিন বলা ব্যক্তিও কাফের হয়ে যাবে।” (দেখুন, রূহানী খাযায়েন ২২/১৬৮)। এখন তাদের জন্য চিন্তা করে দেখা উচিত যারা উম্মতে মুসলিমার সর্বসম্মত ফাতাওয়ার বিরোধিতা করেন এবং কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে গৃহীত ‘তাকফিরি’ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে যুক্তি ও জোরালো প্রচারণার পেছনে দৌঁড়ান তাদের গন্তব্য কোথায়? কাদিয়ানীরা ‘অমুসলিম’ একথা যখন পরিষ্কার ও পূর্বমীমাংসিত তখন তাদেরকে ‘মুসলিম’ আখ্যা দেয়ার ফলে প্রকারান্তরে নিজেকেই কোথায় নিয়ে দাঁড় করছি? আল্লাহ আমাদের সহীহ বুঝ দান করুন।

(কাদিয়ানীদের রচনাবলী থেকে উদ্ধৃত কোনো রেফারেন্স বা উদ্ধৃতি মিথ্যা প্রমাণ করতে পারলে উপযুক্ত পুরষ্কার দেয়া হবে।)

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
শিক্ষাবিদ ও গবেষক

কুরআনের ‘ইবনে মরিয়ম’ হতে মির্যা কাদিয়ানীই উদ্দেশ্য?

মির্যা কাদিয়ানী সাহেবের বই থেকে প্রথমে দুটি উদ্ধৃতি দেব। তিনি তার ‘তুহফাতুন নদওয়াহ’ বইতে লিখেছেন,

  • ‘যদি কুরআন দ্বারা ইবনে মরিয়মের মৃত্যু সাব্যস্ত না হয় তাহলে আমি মিথ্যুক সাব্যস্ত হব।’ (রূহানী খাযায়েন ১৯/৯৭)। রচনাকাল ১৯০২ ইং।
  • ‘যদি কুরআন আমার নাম ‘ইবনে মরিয়ম’ না রাখে তাহলে আমি মিথ্যুক সাব্যস্ত হব।’ (রূহানী খাযায়েন ১৯/৯৮) এবার প্রমাণের জন্য স্ক্যানকপি দেখুন,

এবার প্রশ্নটি বুঝে নিন! এখানে সাধারণভাবে যে প্রশ্নটি উঠে আসে সেটি হল, মির্যা গোলাম আহমদের দাবী অনুযায়ী পবিত্র কুরআনের ‘ইবনে মরিয়ম’ (অর্থাৎ মরিয়মপুত্র) হতে যদি তিনি নিজেই উদ্দেশ্য হন, তাহলে পবিত্র কুরআনের সেই ত্রিশ আয়াত দ্বারা বনী ইসরাইলের জন্য আগমনকারী সেই ঈসা ইবনে মরিয়মের মৃত্যু কিভাবে সাব্যস্ত হল? আহা! এমন একজন সিজোফ্রেনিয়া রোগীকে আজকের এই তথ্যপ্রযুক্তি আর জ্ঞানবিজ্ঞানের যুগেও যারা বিশ্বাস করেন তাদের জন্য আমাদের দুঃখ আর শত আফসোস!

বিশেষ দ্রষ্টব্য, রূপক-টুপক বাদ দিয়ে সোজাসাপ্টা উত্তর দিতে হবে! কেননা, কোনো প্রেরিত মহাপুরুষের দাবী, ভবিষ্যৎবাণী আর মু’জিজা এই ৩টি কখনো “রূপক” বা মাজাজ হয় না।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

ইমাম মাহদীকে আলেমরা তাকফির করা

প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদীকে সমসাময়িক যুগের আলেমগণ তাকফির করবেন, এভাবে উক্তিটি নবাব সিদ্দিক হাসান খান ভূপালী (রহ.)-এর গ্রন্থে সম্পূর্ণরূপে যেভাবে উল্লেখ রয়েছে সেভাবে কাদিয়ানীরা জীবন চলে গেলেও পেশ করতে চাইবেনা। তার কারণ কী তা বুঝতে হলে চলুন, পুরো উক্তিটি একবার দেখে আসি!

আল্লামা নবাব সিদ্দিক হাসান খান ভূপালী (রহ.) রচিত হিজাজুল কিরামাহ ফী আসারিল কিয়ামাহ’ (ফার্সি) গ্রন্থের ৩৬৩ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে,

چہ مہدی و عیسی ہر دو ناصر دین اسلام و تابع سنت خیر الانام و محی سنن رسول کریم باشند۔ پس فعل و عمل ہریکی گویا صینع دیگری سے بلاتفاوت و چوں مہدی علیہ السلام مقاتلہ بر احیاء سنت و اماتت بدعت فرماید علماء وقت کہ خوگر تقلید فقہاء و اقتداء مشائخ و آباء خود باشند گویند ایں مرد خانہ بر انداز دین و ملت ماست وبمخالفت برخیز و بحسب عادت خود حکم بتکفیر و تضلیل وی کنند۔کنند۔ اما از سطوت سیف او و جلال شوکتش کار ایشاں پیش نرود و دو دمان تقلید بی چراغ گردد و دولت کده سنت بوجود باوجود وی منور شود سنیان متبع غالب و بدعتیاں مقلد مغلوب گردند. و یوئده ما اخرج نعیم بن حماد عن ابی جعفر قال یظهر المهدی بمکة عند العشاء.

অর্থাৎ “তেমনি মাহদী এবং ঈসা ইসলামধর্মের দুই সাহায্যকারী এবং নবীজীর সুন্নাহ’র অনুসারী ও তাঁর সুন্নাতসমূহ পুনরুজ্জীবিতকারী হবেন। ফলে তাদের উভয়ের কাজ ও কর্ম অপরাপর শৈল্পিক দিক থেকে যেন এক ও অভিন্নই। আর যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং বিদয়াত নির্মূল করতে হযরত মাহদী (আ.) লড়াই অব্যাহত রাখবেন তখন সমসাময়িক আলেমগণ যারা ফোকাহাদের তাকলিদকারী এবং মাশায়েখ ও নিজ পূর্ব পুরুষদের আনুগত্যকারী তারা বলবে যে, এই পুরুষটি দ্বীন ও উম্মাহাকে নষ্ট করে দিচ্ছে আর নিজ স্বভাবের দরুন তাকে তাকফির করবে এবং ভ্রষ্ট বলবে। তাঁর তরবারির দাপট আর ক্ষমতার প্রভাবে তাদের কর্মকান্ড অগ্রসর হতে পারবেনা। বংশপরম্পরায় চলে আসা তাকলীদ আলোহীন হয়ে পড়বে। সুন্নতের রাজ্য আলোকিত হবে। মুত্তাবীয়ে শরীয়ত সুন্নীরা বিজয়ী হবে। মুকাল্লিদ বিদয়াতিরা পরাজিত হবে। আবু জা’ফরের সূত্রে ইমাম আবু ন’ঈম ইবনে হাম্মাদ (রহ.)-এর বর্ণনাও একথা দৃঢ়ভাবে সমর্থন করছে যে, তিনি বলেছেন, ইমাম মাহদী এ’শার-এর সময় মক্কায় আত্মপ্রকাশ করবেন।”

সম্পূর্ণ বক্তব্যের খোলাসা : (১) ইমাম মাহদী এবং মসীহ ঈসা তারা ভিন্ন ভিন্ন দুইজন (২) ইমাম মাহদী লড়াই (শস্ত্র যুদ্ধ-জিহাদ) করবেন (৩) তাঁর হাতে তরবারি থাকবে (৪) তিনি ক্ষমতাধর প্রশাসক হবেন (৫) তাঁর সময়টিতে আহলে সুন্নাহর মতাদর্শের উম্মতে মুহাম্মদীয়ারই বিজয়ী হবে (৬) তাঁর আত্মপ্রকাশ হবে মক্কায় এবং এ’শার সময়। (৭) এই গুণে গুণান্বিত প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদী সম্পর্কেই নবাব সিদ্দিক হাসান খান সাহেব বলেছেন যে, তৎ সমসাময়িক কতিপয় বিদয়াতি আলেমরাই ইমাম মাহদী সম্পর্কে প্রচার চালাবে যে, এই লোক আমাদের দ্বীন বরবাদ করছে। তারা তাঁকে তাকফির করবে এবং ভ্রষ্ট আখ্যা দেবে। এখন এর সাথে ভণ্ড কাদিয়ানীর কী সম্পর্ক? উপরের একটি বৈশিষ্ট্যও কি তার সাথে যায়? আপনার নিরপেক্ষ বিবেক কী বলে?

সংযুক্ত স্ক্যানকপি :-

আফসোস! কাদিয়ানীরা কাটছাঁট উদ্ধৃতি পেশ করার মাধ্যমে গ্রন্থকারের উদ্ধৃত অংশের সম্পূর্ণ কনসেপ্টই পরিবর্তন করে ফেলতে চেয়েছে, যা নিকৃষ্টতর প্রতারণা ছাড়া কিছুই না। এমতাবস্থায় এদের অন্যান্য উদ্ধৃতি গুলোও মূল কিতাবের সাথে ভালো ভাবে মিলিয়ে দেখা ব্যতীত সত্য মিথ্যা কিভাবে নিশ্চিত হতে পারি?

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

নবাব সিদ্দিক হাসান খান সাহেবের বই থেকে

নবাব সিদ্দিক হাসান খান সাহেবের বই ‘হিজাজুল কিরামাহ ফী আসারিল কিয়ামাহ‘ হতে ইমাম মাহদী, মসীহ, দাজ্জাল ইত্যাদি বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হিদায়াত! বিজ্ঞ পাঠকদের উদ্দেশ্যে নিম্নরূপ :-

আল্লামা নবাব সিদ্দিক হাসান খান ভূপালী (রহ.) লিখেছেন, “আমি বলি, জহূরে মাহদী (মাহদীর আত্মপ্রকাশ), নুযূলে ঈসা (ঈসা আ. এর অবতরণ), খুরুজে দাজ্জাল কিবা এগুলো ছাড়া আরও যত ঘটনাবলি এবং ফিতনা-বিশৃংখলা রয়েছে যা শেষ যামানায় সংঘটিত হওয়া সম্পর্কে হাদীস এবং আছার সমূহ বর্ণিত আছে, সেগুলোর সময় তারিখ নিজ থেকে নির্ধারণ করা নবী করীম (সা.)-এর হাদীসকেই বিকৃতি করার শামিল, তা যে কোনোভাবেই হোক; কাশফের নামে হোক, জ্যোতির্বিজ্ঞানের নামে হোক, নিজেস্ব রায়ের ভিত্তিতে হোক কিবা কোনো অভিধান আর কুরআন সুন্নাহর ইংগিতের নামে হোক; প্রত্যেক দিক থেকেই এটি নবী (সা.)-এর বাণীর তাহরিফ বলে গণ্য হবে। তবে হ্যাঁ, এর সবগুলো ঘটনাই নিসন্দেহে ঘটবে, কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউই এ সম্পর্কে জানে না, এমনকি অচিরেও কারো জানা থাকবেনা। কাজেই যে ব্যক্তি এগুলোর নির্দিষ্ট সময়ের জ্ঞান রাখার দাবী করবে সে মিথ্যাবাদী এবং যারা এ প্রকৃতির লোকদের সমর্থন এবং সত্যায়ন করবে তারা বিভ্রান্ত।” (হিজাজুল কিরামাহ পৃষ্ঠা নং ৪৩০)। (কিতাবটি অনলাইন থেকে সরাসরি পড়ুন বা ডাউনলোড করুন)।

সংযুক্ত স্ক্যানকপি –

হযরত ইমাম মাহদী, মসীহ এবং দাজ্জাল সম্পর্কে নবাব সিদ্দিক হাসানখান (১৮৩২-১৮৯০ইং) এর উক্ত কিতাব থেকে সামান্য তুলে ধরছি,

  • (হযরত ইমাম মাহদীর সমসাময়িক আলেমরা তাঁকে “তাকফির” করা সম্পর্কে নবাব সিদ্দিক হাসানখান সাহেবের একটি উক্তিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে কিভাবে জানতে ক্লিক করুন)।

আল্লামা নবাব সিদ্দিক হাসানখান (রহ.) ইমাম মাহদী সম্পর্কে নিজেরই রায় ও বিশ্বাস হিসেবে লিখেছেন, ইমাম মাহদীর প্রকৃত নাম হবে মুহাম্মদ, পিতার নাম হবে আব্দুল্লাহ। আর ‘মাহদী’ হচ্ছে তাঁর উপাধী। (দেখুন, পৃষ্ঠা নং ৩৫২, মূল ফার্সি সংস্করণ)। ইমাম মাহদী যখন বাইয়েত নেবেন তখন তাঁর বয়স ৪০ বছর পূর্ণ হবে। তাঁর জন্মস্থান হবে মদীনা, তিনি ইমাম হাসানের বংশে হবেন। (পৃষ্ঠা নং ৩৫৩)। ইমাম মাহদী হযরত ফাতেমার সন্তানদের থেকে হযরত ঈসার নুযূলের আগে আগে শেষ যামানায় জন্মগ্রহণ করবেন। তিনি বেলায়তে মুহাম্মদীয়ার সমাপ্তি ঘটাবেন। (পৃষ্ঠা নং ৩৫৫)। ইমাম মাহদী মদীনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করবেন, আহলে বাইয়েতের সদস্য থাকবেন, বায়তুল মোকাদ্দাসে হিজরত করবেন (ও সেখানে সেনা ছাউনি প্রতিস্থাপন করবেন) এবং সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবেন। (পৃষ্ঠা নং ৩৫৮)। সুনানু আবু দাউদের কিতাবুল মাহদীর উম্মে সালমা হতে বর্ণিত সহীহ হাদীসটি দ্বারা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, ইমাম মাহদী মদীনা হতেই আসবেন, যেহেতু তিনি সেখানেই জন্মলাভ করবেন। এই হাদীসের পরিপ্রেক্ষিতে (মাহদীর জন্মস্থান সংক্রান্ত বিচ্ছিন্ন) অপরাপর সমস্ত বর্ণনা পরিত্যাজ্য, আর তাঁর আত্মপ্রকাশ হবে মক্কায়, এটি সকলের ঐক্যমত। আর তিনি সেখান থেকেই পৃথিবীব্যাপী ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মিশন বাস্তবায়ন করবেন। (পৃষ্ঠা নং ৩৫৮)।

এখন হিজাজুল কিরামাহ (حجج الكرامة فى آثار القيامة) গ্রন্থটিতেও উল্লিখিত ইমাম মাহদীর ঐ সমস্ত আলামতের সাথে মির্যা কাদিয়ানীকে মিলিয়ে দেখা যাক। সে সত্যিই ইমাম মাহদী ছিল কিনা? তবে রূপক টুপক চলবেনা!

সংযুক্তি স্ক্যানকপি:-

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ রমাজানের ১৩ আর ২৮ তারিখে হওয়া

চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ রমাজানের ১৩ এবং ২৮ তারিখে হওয়ার যুক্তিতর্ক কতটুকু সন্তোষজনক!

এ নিয়ে আগেও দুটি লিখা লিখেছি। সেখানে রেওয়ায়তটির সনদ তথা বর্ণনাসূত্র সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ হাদীসবিশারদদের মতামত তুলে ধরেছি। এছাড়া আরও অনেক বিষয়ে আলোকপাত করেছি। জানতে পড়ুন! আজকে ভিন্ন আরেকটা বিষয় নিয়ে লিখতে চাই, ইনশাআল্লাহ।

চন্দ্রসূর্য গ্রহণ -১

চন্দ্রসূর্য গ্রহণ -২

চন্দ্রসূর্য গ্রহণ -৩

প্রথমে দেখা যাক তাবেয়ী মুহাম্মদ বিন আলী’র নামে বর্ণিত দারে কুতনি’র রেওয়ায়েতটিতে চন্দ্র আর সূর্যগ্রহণ সংক্রান্ত কথা দু’খানা কীরূপ শব্দে এসেছে! আমরা দেখি, চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে এসেছে و تنكسف القمر لاول ليلة من رمضان (অর্থাৎ চন্দ্রগ্রহণ লাগবে রমাজানের প্রথম রাত্রিতে)। এতে সুস্পষ্ট যে, চন্দ্রগ্রহণের সম্পর্ক তারিখের সাথে নয়, বরং মাসের প্রথম রাত্রির সাথে। হ্যাঁ, যদি এটি তারিখের সাথে সম্পর্ক হত তাহলে বাক্যটি হত لاول ليلة من ليالى الكسوف তথা চন্দ্রগ্রহণ লাগবে গ্রহণের পহেলা রাত্রিতে। কিন্তু বর্ণনায় কথাটি এইরূপ আসেনি।

সুতরাং বুঝা গেল, চন্দ্রগ্রহণ চাঁদের ১৩, ১৪ আর ১৫ তারিখের প্রথম তারিখে সংঘটিত হওয়ার উল্লিখিত কাসুন্দি অত্র বর্ণনার لاول ليلة من رمضان কথাটির সম্পূর্ণ বিরোধী। কারণ রমাজানের তের তারিখ আর রমাজানের প্রথম রাত্রি দুটো এক জিনিস না, যা একজন বাচ্চা ছেলেও বুঝে!

নির্বোধরা নতুন চাঁদ আর সাধারণ চাঁদের কাসুন্দি টানার আগে কেন চিন্তা করে দেখেনা যে, হেলাল (هلال) বা নতুন চাঁদ হল চাঁদের সূচনাকালীন সময় থেকে ৩য়-৭ম রাত্রির চাঁদ। আর তার পরবর্তী ধাপ সূচিত হয় قمر বা সাধারণ চাঁদের মাধ্যমে। আর সে হিসেবে সাধারণ চাঁদে গ্রহণ লাগতে হলে তখন لاول ليلة من ليالى الكسوف অর্থাৎ চন্দ্রগ্রহণের পহেলা রাত্রিতে (অর্থাৎ প্রকৃতির সাধারণ নিয়মেই) হতে হয়। আর তখন বর্ণনাটির বাহ্যিক অর্থ কোনোভাবেই ঠিক রাখা সম্ভব হয়না। তাই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, চন্দ্রগ্রহণের সম্পর্ক যদি গ্রহণের তারিখের সাথেই সম্পর্কিত হত তবে কিজন্য বর্ণনাটি لاول ليلة من ليالى الكسوف এইরূপ শব্দচয়নে আসেনি? আমি এখানে শুধুমাত্র চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে বললাম। সূর্যগ্রহণ নিয়ে আজ না-ই বা বললাম। কিন্তু মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী সহ ইতিপূর্বে আরও যতজন ইমাম মাহদী দাবীদার ছিল তাদের সময়টিতে চন্দ্রগ্রহণ এই নিয়মে ঘটেনি; বরং ১৩ ই রমাজানে ঘটেছিল। যা অত্যন্ত প্রকৃতির সাধারণ ঘটনা।

বলে রাখা দরকার, মির্যা কাদিয়ানীর মাহদী দাবীর পূর্বে ১৮৫১ সালেও একই রমাজানের ১৩ তারিখে চন্দ্রগ্রহণ লেগেছিল, তখন আলী মুহাম্মদ বাব ইরানী ছিলেন ইমাম মাহদী দাবীদার। এনসাক্লোপিডিয়া অফ ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী প্রতি ২২৩ বছর অন্তর চন্দ্রসূর্য গ্রহণের ঘটনা উল্লিখিত নিয়মেই ঘটতে থাকবে। মরক্কোর বারঘৌতা বারবার রাজ্যের শাসক সালেহ বিন তারিফ ৭৪৪ সালে “নবী” দাবী করেন। ৭৯১ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তিনি নিজেকে ইমাম মাহদীও দাবী করেন। সে বছরই একই রমাজানের ১৩ এবং ২৮ তারিখে চন্দ্রগ্রহণ এবং সূর্যগ্রহনের ঘটনা ঘটে। আর এইরূপ ঘটনা তার জীবদ্দশায় প্রায় চার-চার বার ঘটেছিল। যথাক্রমে ৭৪৪, ৭৪৫, ৭৮৭ এবং ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে। তার ‘সালেহুল মুমিনীন’ নামীয় জামাত প্রায় সাড়ে তিন’শ বছর পর্যন্ত আফ্রিকায় টিকে ছিল। পরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

কাদিয়ানী ম্যাগাজিন ‘পাক্ষিক আহমদী’ (পাতা ২৪ তাং ১৫ এপ্রিল ২০১৫ইং) এর একটি প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ আছে, রাসূল (সা.)-এর যুগ হতে বর্তমান যুগ (২০০১ইং) পর্যন্ত একই রমাজানের ১৩ এবং ২৮ তারিখে চন্দ্রগ্রহণ এবং সূর্যগ্রহনের ঘটনা প্রায় ১০৯ বার ঘটে আসছে। আমেরিকার গবেষণা বিভাগ “নাসা”-এর তথ্যমতে এইরূপ গ্রহণের ঘটনা ইতিপূর্বে আরও প্রায় ৫০০০ বার ঘটেছিল। অথচ ঐ বর্ণনার শেষেই রয়েছে যে, و لم تكونا منذ خلق الله السموات و الارض অর্থাৎ এই দুটি নিদর্শন ইতিপূর্বে আল্লাহ যখন থেকে আসমান জমিন সৃষ্টি করেছেন তখন অব্দি সংঘটিত হয়নি। জ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলে কিনা?

অতএব স্পষ্টত বুঝা যাচ্ছে, এইধরনের গ্রহণ শুধুই প্রাকৃতিক, এর সাথে কোনো প্রেরিত মহাপুরুষের আবির্ভাবের সম্পর্ক নেই। নইলে একই রমাজানের ১৩ তারিখে চন্দ্রগ্রহণ এবং ২৮ তারিখে সূর্যগ্রহনের উক্ত ঘটনা ইতিপূর্বে এত হাজার বার ঘটতে পারেনা। কাজেই, মির্যার সময়টিতে এমন ঘটনা ঘটেছিল বলে সাধারণদের এত অবাক হবার কোনো কারণ নেই।

জ্ঞানীদের জন্য বিষয়টির বুঝার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট হবে বলে আমি মনে করি।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

যিনি ঈসা তিনিই মাহদী?

যিনি ঈসা তিনিই মাহদী, মহা বিভ্রান্তি ও ভয়ংকর অপব্যাখ্যা!!

তোমরা এই কাদিয়ানী মতের অনুসারী ভদ্রলোকটাকে এগুলো জিজ্ঞেস করে দেখ, জবাব দিতে পারবেনা!

একটি প্রশ্নোত্তরে এই সুলায়মান নামের সোনার ছেলেটা একদম সিলেক্টিভ ভাবে ঈসা (আ.) আর ইমাম মাহদী, দুইজনকে একই সত্তা বানিয়ে দেয়। এমনকি সে দলিলও দেয়! আহা! এই কোন দুনিয়ায় এলাম!! অথচ তার পাশেই বসা ছিল তাদের আহমদীয়া (কাদিয়ানী) জামাতের ন্যাশনাল আমীর আব্দুল আউয়াল সাহেব। কিন্তু তিনিও তার এই সুস্পষ্ট বিকৃত ব্যাখ্যাকে সাপোর্ট দিয়ে গেছেন, থামিয়ে দেননি। আফসোস! সিফাত মওসূফের ব্যবহারিক নিয়ম কেমন, সে সম্পর্কেও যার বিন্দুমাত্র একাডেমিক জ্ঞান নেই সে কিনা اماما مهديا (ইমামান মাহদীয়্যান)-এর অর্থ করতে আসছে ‘ইমাম মাহদীরূপে’! অথচ সিফাত মওসূফ হিসেবে এখানে ‘মাহদীয়্যান’ এর অর্থ আগে তারপর ‘ইমামান’ এর অর্থ। ফলে সঠিক অর্থ হল ‘একজন সুপথপ্রাপ্ত ইমাম‘। অতএব স্পষ্টত বুঝা গেল যে, মসনাদে আহমদ এর এই হাদীস দ্বারাও ঈসা আর ইমাম মাহদী দুইজনকে একজন বুঝায়না।

  • হাদীসে এসেছে, রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন,
  • يوشك من عاش منكم ان يلقى عيسى بن مريم إماما مهديا وحكما عدلا فيكسر الصليب ويقتل الخنزير ويضع الجزية وتضع الحرب أوزارها
  • অর্থ: তোমাদের মধ্য হতে যারা বেঁচে থাকবে তারা অচিরেই ঈসা (আ.)-কে একজন সুপথপ্রাপ্ত ইমাম ও ন্যায়পরায়ণ শাসকরূপে দেখতে পাবে। তিনি ক্রুশ ভাঙবেন এবং শূয়োর হত্যা করবেন। জিজিয়া (কর) তুলে দেবেন তখন যুদ্ধ আপনা সরাঞ্জামগুলোকে ভারমুক্ত করবে (মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং ৯১১৭)।

একজন ব্যাকরণের ছাত্র হিসেবে অবশ্যই জানার কথা যে, আরবী থেকে বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রে সিফাত (বিশেষণপদ)’র অর্থ আগে হয় আর মওসূফ (বিশেষিতপদ)’র অর্থ পরে হয়। যেমন ১. আজরান কারীমা [اجرا كريماً] অর্থাৎ উত্তম প্রতিদান। এখানে প্রথমে ‘কারীমা’ এর অর্থ নিতে হয়েছে। কেননা এটি সিফাত (বিশেষণপদ)। তারপর ‘আজরা’ এর অর্থ নিতে হয়েছে। একই নিয়মে ২. ফাদ্বলান কাবীরা [فضلاً كبيراً] অর্থাৎ মহা অনুগ্রহ। ৩. আযাবান মুহীনা [عذابا مهينا] অর্থাৎ লাঞ্চনাদায়ক শাস্তি। (সূরা আহযাব : ৪৪, ৪৭, ৫৭)। সংক্ষেপে।

জনাব সুলায়মান পঞ্চগড়ী! যদি লজ্জাশরম কিছু থাকে তবে এধরণের ছাগলামি আর কখনো করতে আসবেননা। আল্লাহকে ভয় করুন আর তওবা করুন।

যাইহোক আমি তখনি ঐ ভিডিও ক্লিপের নিচে কমেন্টে তার/তাদের ইচ্ছাকৃত ইসলামী শিক্ষার সুস্পষ্ট বিকৃতির স্বরূপ তুলে ধরি। আমি লিখলাম,

জনাব সুলায়মান পঞ্চগড়ী! আপনি হাদীসের অপব্যাখ্যা দিচ্ছেন কেন? কোনো ব্যক্তি গুণগত কারণে ‘মাহদী’ তথা সুপথপ্রাপ্ত হওয়ার মানে কি সেই লোকটি আর ‘প্রকৃত ইমাম মাহদী’ দুইজন একই সত্তা হয়ে যাওয়া?

যেমন ধরুন, কেউ বলল; যায়েদ বাঘেররূপে আবির্ভূত হয়েছে!! এখানে যায়েদ আর বাঘ কি একই সত্তা? চাঁদেররূপে সুন্দরী মেয়ে। এখন মেয়েটি আর চাঁদ কি একই সত্তা? মির্যা গোলাম আহমদ তার বইয়ের এক জায়গায় লিখেছেন, সে দুই বছর পর্যন্ত মরিয়মিরূপে লালিতপালিত হয়েছে। (হাকীকাতুল ওহী, বাংলা অনূদিত কপি দেখুন)। এখন মরিয়ম আর মির্যা কাদিয়ানী কি একই সত্তা?

কাদিয়ানীদের কী হল যে, তারা মির্যা কাদিয়ানীকে একই সাথে ইমাম মাহদী আর ঈসা সাব্যস্ত করার জন্য অসংখ্য সহীহ হাদীসকে পর্যন্ত চোখবুঁজে এড়িয়ে যাচ্ছে! তাদের কলিজায় কি মরণের ভয় নেই? অথচ সহীহ মুসলিম শরীফের কিতাবুল ফিতান অংশে আছে, ঈসা (আ.) দুইজন ফেরেশতার দুই পাখার উপর হাত রেখে দামেস্কে অবতরণ করবেন (واضعا كفيه على اجنحة ملكين)।

আবুদাউদ কিতাবুল মাহদী অংশে আছে, ইমাম মাহদী রাসূল (সা.)-এর বংশে বিবি ফাতেমার সন্তানদের মধ্য থেকে হবেন (المهدي من عترتي من ولد فاطمة)।

স্পষ্টত বুঝা যায় যে, দুইজন ভিন্ন ভিন্ন দুই ব্যক্তি। এরপরেও ইবনে মাজাহ শরীফের হাদীসের,

ولا المهدى الا عيسى ابن مريم

অংশটি হতে আপনারা কিভাবে এমন অর্থ নিতে পারেন যে অর্থ অগণিত সহীহ হাদীসের বিরুদ্ধে যায়!? আপনারা কি ইবনে মাজাহ’র এই খণ্ডিতাংশের শুরুতেই ‘ওয়াও’ (و) বর্ণ দেখেন না, যেটিকে আরবী ব্যকরণের ভাষায় ‘ওয়ায়ে হালিয়া (الواو )’ তথা সময়-নির্দেশক-ওয়াও বলা হয়? যদ্দরুন এই বাক্যাংশের শুধুমাত্র এই অর্থই দাঁড়ায় যে,

أنه لا مهدي كاملاً معصوماً إلا عيسى عليه السلام

অর্থাৎ “তখন ঈসা ইবনে মরিয়মই নিষ্পাপ ও পরিপূর্ণ সুপথপ্রাপ্ত ব্যক্তি।” (ইমাম কুরতুবী, শায়খ ইবনুল কাইয়ুম এবং ইমাম ইবনে কাসীর প্রমুখ সকলে এভাবেই এর অর্থ করেছেন—লিখক)।

এ কথা বলে শেষ যুগের সেই সময়টির প্রতি ইংগিত করা উদ্দেশ্য; যে সময়টিতে সমগ্র দুনিয়ায় শুধুমাত্র ঈসা ইবনে মরিয়মই পরিপূর্ণ একজন সুপথপ্রাপ্তির মর্যাদা লাভ করবেন। যেহেতু ঈসা (আ.)-এর আগমনের কয়েক বছরের মাথায় হযরত ইমাম মাহদীও ইন্তেকাল করবেন।

মোটকথা, হাদীসের ঐ অংশটি সমস্ত মুহাদ্দেসীনের মতানুসারে খুবই জঈফ বা দুর্বল এবং মুনকার বা অগ্রহণযোগ্য হলেও (দেখুন, মীযানুল ই’তিদাল ৩/৫৩৫; ইমাম যাহাবী/حديثه: ولا المهدى إلا عيسى بن مريم وهو خبر منكر، أخرجه ابن ماجه) সেটি দ্বারা মূলত ঈসা (আ.)-এর অন্যতম একটি গুণ বা বৈশিষ্ট্য বুঝানোই উদ্দেশ্য, ভিন্ন ভিন্ন দুই ব্যক্তিকে একই ব্যক্তি বুঝানো মোটেও উদ্দেশ্য নয়; যা একটু আগেই আমি উপমা দিয়ে বলে এসেছি।

নির্বোধরা কি মির্যা কাদিয়ানীর বইপুস্তক পড়েনা? যদি পড়ে থাকে তাহলে তারা কিজন্য মির্যার ১৯০২ সালের দিকে রচিত ‘তুহফায়ে গোলড়বিয়া’ নামীয় বইটিতে খেয়াল করেনা যে, সে নিজেই ঈসা (আ.) এবং ইমাম মাহদী দুইজনকে ভিন্ন ভিন্ন সত্তা হওয়া লিখে গেছেন। তার ভাষ্যমতে,

اور ہم ثابت کر چکے ہیں کہ وہی رجل فارسی  مہدی ہے اس لئے ماننا پڑا کہ مسیح موعود اور مہدی اور دجال تینوں مشرق میں  ہی ظاہر ہوں گے اور وہ ملک ہند ہے۔ 

অর্থাৎ এবং আমি প্রমাণ করেছি যে, সেই পারস্যের পুরুষটি-ই মাহদী। যেজন্য মানতে হবে যে, মসীহ মওঊদ, মাহদী এবং  দাজ্জাল তিনোজন পূর্বদিকেই প্রকাশিত হবে আর সেই রাষ্ট্রটি হচ্ছে হিন্দুস্থান। (রূহানী খাযায়েন ১৭/১৬৭)।

স্পষ্টত বুঝা যাচ্ছে যে, ঈসা আর ইমাম মাহদী কখনোই একই সত্তা হবেন না। আর এটি মির্যা কাদিয়ানীরও কলম থেকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যেভাবেই হোক, বেরিয়ে গেছে। কথায় আছে না, চোর যতই চালাক হোক; সে কোনো না কোনো আলামত নিশ্চয়ই ছেড়ে যায়। যার ফলে দেরিতে হলেও তাকে পাকড়াও হতেই হয়। এটাই প্রকৃতির নিয়তি। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি

এবার যে কথাটি বলে প্রাসঙ্গিক বিতর্কের ইতি টানতে চাই তা হচ্ছে, আক্ষরিক অর্থে ইসলামের প্রথম চারো খলীফাও خلفاء الراشدين المهديين তথা ‘আল মাহদিয়্যীন’ তথা সুপথপ্রাপ্তগণ। [তিরমিযী শরীফ, কিতাবুল ইলম হা/২৬৭৬]। এই দিক থেকে নবীগণ সবাই ‘মাহদী’। এমনকি হযরত মুহাম্মদ (সা:)-ও ‘মাহদী’। মজার ব্যাপার হল, এই কথাগুলো মির্যা কাদিয়ানী নিজেই লিখে গেছে। (রূহানী খাযায়েন ১৪/৩৯৪)।

সুতরাং বুঝা গেল, আক্ষরিক অর্থে ঈসা (আ:)-কে ‘মাহদী’ সম্বোধন করা হলেও সমস্যা নেই। তাতে দুইজনকে একই ব্যক্তি বুঝাবেনা।

এরপরেও যার বুঝে আসবেনা তার জন্য জাহান্নামের আগুনই যথেষ্ট। তাকে আল্লাহর সোপর্দ। আল্লাহর সাথে সে বুঝাপড়া করুক। আল্লাহ হাফেজ!

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

কে এই ইউজে আসেফ?

চেপে রাখা ইতিহাস | কাদিয়ানী তথা আহমদীদের জন্য মহা সুসংবাদ! কাশ্মীরের খান ইয়ার মহল্লায় সমাহিত ইউজে আসেফ এর আসল পরিচয় প্রকাশিত হল। এবার কাদিয়ানী জামাতে অস্থিরতা শুরু | মহা ভাঙ্গনের মুখোমুখি ‘আহমদী-জামাত’ | মির্যায়ীয়ত তথা আহমদীয়ত মিথ্যা ও বাতিল সাব্যস্ত!

  • ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তির সঠিক পরিচয় সম্পর্কে কাশ্মীরের স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাক্ষ্য দেয়ার দলিলপত্র এখানে। ডাউনলোড করুন।
  • সম্পূর্ণ ২১ পর্ব ফেইসবুক থেকে পড়তে ক্লিক করুন।

ইউজে আসেফ প্রসঙ্গ :

প্রাক-কথন : আমি যখন মির্যা কাদিয়ানীর পরামর্শ মাফিক হাজার বছর পূর্বে লেখিত শায়খ আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনুল হুসাইন বাবওয়াইহি আল-কিম্মি (মৃত. ৩৮১ হিজরী)-এর কিতাব ‘কামালুদ্দীন’ এর পৃষ্ঠা নং ৩৬১ হতে ৪০৩ পর্যন্ত ইউজে আসেফ এর পুরো কাহিনী পড়লাম তখন আমার মুখ দিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবেই বেরিয়ে গেল ‘শতাব্দীর নিকৃষ্ট মিথ্যুক মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী’। কেননা আমি দেখেছি সেখানে ইউজে আসেফকে ষাট (৬০) বারেরও অধিক জায়গায় ابن الملك তথা বাদশাহ’র পুত্র (Son of a King) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু মির্যা গোলাম আহমদ বিষয়টি অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে এড়িয়ে গেছেন। কেননা মির্যা গোলাম আহমদ সাহেব খুব ভালো করেই জানতেন যে, ইউজে আসেফের পিতা থাকা সাব্যস্ত হয়ে গেলে তখন আর তার পক্ষে ইউজে আসেফ আর ঈসা মসীহ দুইজনকে একই ব্যক্তি বলিয়া সাব্যস্ত করা সম্ভব হবেনা।

১৯৯৬ সালে কাদিয়ানীদের চতুর্থ খলীফা মির্যা তাহের আহমদ জনৈক এক আহমদী প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, even if this grave is not that of Eisa (as), it makes no difference. অর্থাৎ এই কবরটি ঈসা (আ.)-এর না হলেও তাতে কোনো পার্থক্য নেই।

  • বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন। ভিডিও শুনুন।
  • আমি ২৭ মার্চ ২০১০ ইং তারিখের বিবিসি (ইংলিশ) আরেকটি নিউজ পোর্টালে দেখলাম, সেখানে কাশ্মীরে ঈসা (আ.) এর আগমনের আহমদীদের প্রচলিত ধারণাকে হাসিরছলে উড়িয়ে দিয়েছে। লিখা আছে, Professional historians tend to laugh out loud when you mention the notion that Jesus might have lived in Kashmir. অর্থাৎ পেশাদার ইতিহাসবিদরা উচ্চস্বরে হাসতে থাকেন যখন আপনি এই ধারণাটি উল্লেখ করেন যে, যীশু (ঈসা) হয়তো কাশ্মীরে থাকতেন! বিবিসি ইংলিশ নিউজ পোর্টাল দেখুন।

এই আর্টিকেলের মাধ্যমে দুইটি বিষয় সুস্পষ্ট করব, ইনশাআল্লাহ।

(ক) কাশ্মীরের খান ইয়ার মহল্লায় সমাহিত ‘ইউজে আসেফ’ নামীয় ব্যক্তিটি আসলে কে? (খ) এই বিষয়ে কেন জানা দরকার?

একটি মতভিন্নতা :

হযরত ঈসা (আ.) বিষয়ে মুসলিম উম্মাহ আর কাদিয়ানী সম্প্রদায় উভয়ের ধর্মবিশ্বাস সংক্ষেপে বলতে গেলে, মুসলিম উম্মাহ বিশ্বাস করে যে, ঈসা (আ.)-কে আল্লাহতালা দ্বিতীয় আসমানে সশরীরে জীবিত উঠিয়ে নিয়েছেন (কুরআন ০৪:১৫৮ তাফসীরে ইবনে কাসীর)। তিনি এখনো জীবিত, শেষ যুগে পৃথিবীতে যথাসময়ে আবার আগমন করবেন। তবে নবুওয়তের দায়িত্বে থাকবেন না, শুধুমাত্র একজন উম্মতী হবেন। ‘সহীহ বুখারীর কিতাবুল আম্বিয়া’ পর্বে এসেছে حكما عدلا অর্থাৎ মরিয়ম পুত্র (ঈসা) একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক হবেন। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। অত:পর মৃত্যুবরণ করবেন। সেই সময়টিতে ইমাম মাহদীও থাকবেন। তবে ইমাম মাহদী সাত বা নয় বছর বেঁচে থাকবেন। ঈসা (আ.)-এর জীবদ্দশাতেই তিনি মারা যাবেন। কিন্তু কাদিয়ানীদের বিশ্বাস হচ্ছে, হাদীসে ভবিষ্যৎবাণীকৃত ঈসা আর ইমাম মাহদী দুইজনের কেউই আসল হবেন না, বরং দুইজনই রূপক। আর এ দুইজনই মূলত একজন। আর তিনি মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (১৮৩৯-১৯০৮), যিনি আজ থেকে শত বছর আগেই চলে এসেছেন ভারতের পাঞ্জাবে। আহমদীয়া (অ)মুসলিম জামাত তারই প্রতিষ্ঠিত। এই দলে যারা অন্তর্ভুক্ত হবেনা তারা অমুসলিম এবং জাহান্নামী। কাদিয়ানীরা বিশ্বাস করে, ইহুদীদের পাকড়াও থেকে আল্লাহ ঈসাকে রক্ষা করেননি, বরং তিনি তাকে তাদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফলে ইহুদীরা তাঁকে ক্রুসে উঠাতে সক্ষম হয়। তবে ক্রুসে তিনি মারা যাননি, বরং প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। শিষ্যদের সহযোগিতায় তিনি পালিয়ে ভারতের কাশ্মীরে চলে যান। সেখানে অনেক বছর জীবনযাপন করেন অত:পর ১২০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। কাশ্মীরের খান ইয়ার মহল্লায় ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তিটির কবরই মূলত ঈসা (আ.)-এর কবর। নাউযুবিল্লাহ। (এ হচ্ছে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহার বিশ্বাসের পরিপন্থী কাদিয়ানীদের বিশ্বাস)। (পবিত্র কুরআন সাক্ষী, ঈসা (আ.) জীবিত এবং তিনি পুনরায় আগমন করবেন)।

প্রথমে বলে রাখি, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী থেকে হযরত ঈসা (আ.)-এর কথিত কবর সম্পর্কে পরস্পর বিরোধী দুই রকম বক্তব্য পাওয়া যায়। তার কোনো কোনো বক্তব্য হতে বুঝা যায় যে, ঈসা (আ.)-এর কবর সম্পর্কে তার প্রদত্ত তথ্যটি শুধুমাত্র গবেষণাধর্মী। যেমন তার ভাষ্যমতে,

کشمیر میں مسیح کی قبر کا معلوم ہونے سے بہت قریب ہی فیصلہ ہو جاتا ہے

অর্থাৎ কাশ্মীরে মসীহ’র কবরের অনুসন্ধান দ্বারা অতিসত্বরই বিষয়টি মীমাংসা হয়ে যাবে। (মালফুযাত ২/৫২৭, নতুন এডিশন)। আবার কোনো কোনো বক্তব্য হতে বুঝা যায়, এটি ইলহামী। যেমন তার শিষ্য মির্যা খোদাবক্স কাদিয়ানী লিখেছেন,

اور جیسے کہ اللہ تعالی نے انہیں بتایا کہ محلہ خانیار سرینگر کشمیر میں ان کی قبر موجود ہے۔

অর্থাৎ আল্লাহতালা তাঁকে (মির্যাকে) জানিয়ে দিয়েছেন যে, কাশ্মীরের খান ইয়ার মহল্লায় তাঁর (ঈসা) কবর বিদ্যমান। (আছলে মুসাফফা ২/২; লিখক মির্যায়ী মুরিদ মির্যা খোদাবক্স কাদিয়ানী, প্রকাশকাল ১৯০১ ইং)।

দ্বিতীয়ত, ঈসা (আ.)-এর কথিত কবরের স্থান নিয়েও তার পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায়। যথা-

১। ঈসা (আ.)-এর কবর ‘সিরিয়া’ এর গালীলে বিদ্যমান। (দেখুন রূহানী খাযায়েন খন্ড নং ৩ পৃষ্ঠা নং ৩৫৩)। বলে রাখা দরকার, গালীল হচ্ছে সিরিয়ার (শাম) একটি জনপদ এলাকা। মির্যা কাদিয়ানী ‘ইতমামুল হুজ্জত’ বইয়ের মধ্যেও এ একই কথা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি লিখেন,

اور لطف تو یہ کہ حضرت عیسی کی بھی بلاد شام میں قبر موجود ہے۔

অর্থাৎ সূক্ষ্ম একটি বিষয় এই যে, হযরত ঈসার কবরও শাম দেশে বিদ্যমান। (দেখুন, রূহানী খাযায়েন ৮/২৯৬)।

একটি সংশয় নিরসন :

কাদিয়ানী নেতারা জ্ঞান আর শিক্ষার দুর্বলতা হেতু এখানে একটা তাবীল করেন। বলেন, এই কবরটি মূলত সেই কবর যেখানে মসীহ ক্রুশীয় ঘটনা হতে পরিত্রাণ পেয়ে পালিয়ে এসে তিন দিন পর্যন্ত আত্মগোপনে থেকে চিকিৎসা করে সুস্থ্য হন। তিনি পরে সেখান থেকে বেরও হয়ে যান। ফলে এটি রূপকার্থে কবর, প্রকৃত কবর নয়। তাদের জন্য আফসোস একারণে যে, তারা অন্ততঃ মির্যার ‘মসীহ হিন্দুস্তান মে’ বইটিও ভালো মত পড়েনি, পড়লেও মনে রাখেনি। বইটির ২৩ নং পৃষ্ঠায় (বাংলা অনূদিত – মার্চ, ২০১২ ইং) সুস্পষ্ট লিখা আছে যে, ‘এসব শ্লোক থেকে নিশ্চিত জানা যায়, হযরত মসীহ কখনও আকাশে যান নি, বরং কবর থেকে বের হয়ে গালীলের দিকে যান।‘ স্ক্রিনশট –

তিনি বাইবেলের আলোকেই কথাগুলো লিখেন এবং নিজেও তা বিশ্বাস করতেন। মির্যা সাহেব আরেক জায়গায় লিখেছেন, ‘ফিলিস্তিন’ এর বায়তুল মুকাদ্দাসের আঙ্গিনায় ঈসা (আ.)-এর কবর রয়েছে।’ (দেখুন, রূহানী খাযায়েন ৮/২৯৬-৩০০ ; টিকা দ্রষ্টব্য)।

সুতরাং পরিষ্কার হয়ে গেল যে, মির্যা সাহেব একজন ‘মামূর মিনাল্লাহ‘ দাবীকরা অবস্থাতেও ঈসা (আ.)-এর কথিত কবরের সন্ধান দেয়ার নামে মারাত্নক স্ববিরোধ তথ্য দিয়েছেন! আর তার অন্ধ অনুসারীরা সেটির উপর পর্দা ফেলার জন্য কাসুন্দির পথ বেছে নেন, যা মির্যারই ‘হযরত মসীহ কবর থেকে বের হয়ে গালীলের দিকে যান’ এইরূপ লিখার কারণে সামনে বাড়তে পারেনা, থেমে যেতে হয়!!

বড়ই আশ্চর্যের বিষয় হল, মির্যা কাদিয়ানী সাহেব লিখেছেন “আমার কথাবার্তায় কোনো অসঙ্গতি নেই। আমি তো খোদার ওহীরই অনুসরণকারী।” (রূহানী খাযায়েন ২২/১৫৪)।

একটু লক্ষ্য করুন!

সত্যানুসন্ধিৎসু বিজ্ঞ ভাই ও বোনেরা! এবার লক্ষ্য করুন মির্যা সাহেব গ্যালীলের উক্ত কবর সম্পর্কে আরও কী লিখেছেন,

اور اگر کہو کہ وہ قبر جعلی ہے تو اس جعلی کا ثبوت دینا چاہیے اور ثابت کرنا چاہئے کہ کس وقت یہ جعلی بنایا گیا ہے اور اس صورت میں دوسرے انبیاء کی قبروں کی نسبت بھی تسلی نہیں رہے گی اور امان اٹھ جائے گا اور کہنا پڑے گا کہ شاید وہ تمام قبریں جعلی ہی ہوں۔

অর্থাৎ আর যদি বলতে চাও যে, এই কবর কৃত্রিম, তাহলে এই কৃত্রিমতার প্রমাণ দেয়া চাই এবং সাব্যস্ত করা চাই যে, কখন এই কৃত্রিম কবর তৈরি করা হয়েছিল! আর এই কৃত্রিমতার দাবীর ক্ষেত্রে অন্যান্য নবীর কবরগুলো ক্ষেত্রেও কোনো শান্তনা থাকেনা, দৃঢ়তা হ্রাস পাবে এবং বলতেই হবে যে, হতে পারে এই সমস্ত কবর কৃত্রিমই। (দেখুন, রূহানী খাযায়েন ৮/২৯৭)।

২। ঈসা (আ.)-এর কবর ‘কাশ্মীর’ অথবা তার আশপাশে (তথা তিব্বতে)। দেখুন রূহানী খাযায়েন ১০/৩০২। মির্যা কাদিয়ানী সাহেব ঈসা (আ.)-এর কবর কাশ্মীরে কিনা সে ক্ষেত্রেও খুবই কনফিউজড তথা দ্বিধান্বিত। নইলে ‘অথবা‘ বলার কী অর্থ?

৩। ঈসা (আ.)-এর কবর ‘কাশ্মীর’ এর শ্রীনগরের ‘খান-ইয়ার মহল্লা’তে। (দেখুন রূহানী খাযায়েন ১৪/১৭২)। এত বৈপরীত্য হলে কেমনে কী? খুবই মজার ব্যাপার হল, মির্যা সাহেবের দাবী হল, তিনি নাকি কাশফীভাবে কয়েকবার হযরত মসীহ (আ.)-কে দেখেছেনও। (স্ক্রিনশট দেখুন)। এখন প্রশ্ন হল, তার এই দাবী সত্য হলে তিনি মসীহ (আ.) হিন্দুস্তানে সত্যিই এসেছিলেন কিনা, মৃত্যু কাশ্মীরেই হয়েছিল কিনা; তা তো মসীহ (আ.) থেকেই জেনে নিলে হয়ে যেত, তাই নয় কি? এত এত গবেষণা আর কাসুন্দি করার দরকার কী ছিল?

ছোট্ট একটি প্রশ্ন :

মির্যা কাদিয়ানী সাহেব লিখেছেন, ‘ইঞ্জিলে হযরত মসীহ’র আগমন সম্পর্কে দু’ধরণের ভবিষ্যৎবাণী রয়েছে। (এক) শেষ যুগে তাঁর আগমনের যে ওয়াদা তা হচ্ছে রূহানীভাবে আগমনের ওয়াদা।’ (দেখুন, মসীহ হিন্দুস্তান মে, বাংলা ৩৬; পুনর্মুদ্রণ মার্চ, ২০১২ খ্রিস্টাব্দ)। কিন্তু আমি বাইবেল পড়তে গিয়ে দেখলাম সেখানে লিখা আছে, “যীশু যখন জৈতুন পর্বতমালার ওপর বসেছিলেন, তখন তাঁর শিষ্যরা একান্তে তাঁর কাছে এসে তাঁকে বললেন, ‘আমাদের বলুন, কখন এসব ঘটবে, আর আপনার আসার এবং এযুগের শেষ পরিণতির সময় জানার চিহ্নই বা কি হবে?’ এর উত্তরে যীশু তাদের বললেন, ‘দেখো! কেউ যেন তোমাদের না ঠকায়৷ আমি তোমাদের একথা বলছি কারণ অনেকে আমার নামে আসবে আর তারা বলবে, ‘আমি খ্রীষ্ট৷’ আর তারা অনেক লোককে ঠকাবে৷” (বাইবেল, মথি ২৪:৩-৫)।

এখন প্রশ্ন হল, ‘অনেকে আমার নামে আসবে আর বলবে, ‘আমি খ্রিষ্ট’ আর তারা অনেক লোককে ঠকাবে’ এত পরিষ্কার করে উল্লেখ থাকার পরেও শেষ যুগে আগমনকারী মসীহ সম্পর্কে ‘রূপক’ বা রূহানী মসীহ এর কনসেপ্ট কিভাবে সত্য হতে পারে? মির্যা সাহেব কি এখানেও মিথ্যার আশ্রয় নিলেন না?

(ক) এবার কাশ্মীরের খান ইয়ার মহল্লায় সমাহিত ‘ইউজে আসেফ’ নামীয় ব্যক্তিটি আসলে কে? এ সম্পর্কে জানুন!

আপনি নিশ্চয়ই কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের নাম শুনে থাকবেন। এরা অমুসলিম, এতে কারো কোনো সন্দেহ নেই। বাহায়ীরা যেমন অমুসলিম, ঠিক এরাও। এদের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তি হচ্ছে, হযরত ঈসা (আ.) মারা গিয়েছেন। (নাউযুবিল্লাহ)।

কোথায় মারা গেছেন?

এমন প্রশ্নের উত্তরে তারা বলবে, কাশ্মীরে। কাশ্মীরের খান ইয়ার মহল্লায়। সেখানে যে দুই ব্যক্তির কবর রয়েছে তাদের একজন হলেন, পীর নাসিরুদ্দীন শাহ সাহেব। দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন, ইউজে আসেফ। পুরো নাম, শাহজাদা ইউজে আসেফ। কেউবা বলেন, ইউজে ইস্পাহান নাবীরায়ে ইরান।

কাশ্মীরে এটি কার কবর?

মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ঈসা (আ.)-কে মৃত দাবী করে গ্যাঁড়াকলে আটকে যান। কারণ তিনি যদি মারা গিয়ে থাকেন তাহলে তো তাঁর কবরও থাকবে, তাই নয় কি? কিন্তু জীবিত মানুষের কি কখনো কবর থাকতে পারে! পারেনা। আল্লাহতালা ঈসা (আ.)-কে তাঁরই তেত্রিশ বছর বয়সে জীবিত সশরীরে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে ইংগিতে আর বহু সহীহ হাদীসে সুস্পষ্টভাবে এর প্রমাণ রয়েছে। বিপরীতে মির্যা কাদিয়ানীর দাবী হল, ঈসা আর তাঁর মা মরিয়ম দুইজনই কাশ্মীরে এসেছিলেন (কিশতিয়ে নূহ ২৯; টিকা – বাংলা অনূদিত) এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আর বর্তমানে কাশ্মীরে ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তির কবরই প্রকৃতপক্ষে হযরত ঈসা (আ.)-এর কবর।

  • পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত ‘রাবওয়া‘ (ربوة) হতে উদ্দেশ্য কী? ঈসা (আ.)-এর কাশ্মীরে আগমন করার কোনো ইংগিত কি কুরআনে আছে? ক্লিক করুন।

ঈসা (আ.)-কে বাইবেলে ‘আসেফ’ নামে আখ্যা দেয়া কি সত্য?

এখন একটা তথ্য দেব যা শুনে একজন কট্টর কাদিয়ানীও অবাক হবেন। মির্যা সাহেব ‘মসীহ হিন্দুস্তান মেঁ’ বইটির কোথাও ‘শাহজাদা ইউজে আসেফ’ নামটিও উল্লেখ করেননি বা উল্লেখ করার মত গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ পাননি। অথচ তিনি বইটি রচনাই করেছিলেন হযরত ঈসা (আ.)-এর হিন্দুস্তানে আসা এবং কাশ্মীরের খান ইয়ার মহল্লায় তাঁর কবরের অস্তিত্ব থাকার প্রমাণে। শুনে নিশ্চয়ই হবাক হচ্ছেন, তাই তো! জ্বী জনাব, এবার আপনি আরও বেশি অবাক হবেন যখন জানতে পারবেন যে, তিনি নিজ দাবীকে সত্য প্রমাণ করতে বাইবেলের নামেও কত জঘন্য মিথ্যা উদ্ধৃতি দিলেন! স্ক্রিনশট দুটি ভালোভাবে দেখুন। যেমন তিনি লিখেছেন “এখন উল্লিখিত গ্রন্থের উক্ত বর্ণনা এ দৃঢ়বিশ্বাস সৃষ্টি করে যে, আল্লাহতালা এ লোকদের হেদায়েতের উদ্দেশ্যে দু’দিক থেকে উপকরণ সৃষ্টি করেছিলেন। প্রথমত হযরত মসীহর সেই নামের কারণে, যা ‘আদিপুস্তক‘ ৩:১০ (অর্থাৎ অধ্যায় নং ৩ শ্লোক নং ১০) থেকে প্রতীয়মান হয় অর্থাৎ ‘আসেফ‘ (নাম) যার অর্থ জাতিকে একত্রকারী। এ কারণে সেই দেশে তাঁর আগমন জরুরী ছিল যেখানে ইহুদীরা এসে বসবাস করছিল।” আহা! এ কেমন ইমাম মাহদী আর বুরুজী মুহাম্মদ!! কিভাবে সম্ভব হল এত জঘন্য মিথ্যার আশ্রয় নেয়া!!! এখন প্রশ্ন হল, যে মানুষটি আড়াই শত কোটি মানুষের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের নামেও প্রতারণা করতে ভয় করেনি, সে মানুষটির অন্যান্য উদ্ধৃত রেফারেন্স আর তথ্য-উপাত্ত ইত্যাদির উপর আপনি-আমি আস্থা রাখতে পারি কিভাবে? এমন ব্যক্তিকে তো সর্বাগ্রে সত্যতার মানদণ্ডেই উঠানো জরুরি, তাই নয় কি? বিচারের ভার আপনার নিরপেক্ষ বিবেকের উপর ছেড়ে দিলাম।

ঈসা (আ.)-কে মৃত সাব্যস্ত করার উদ্দেশ্য?

মির্যা গোলাম আহমদ নিজেকে ‘প্রতিশ্রুত ঈসা’ হবার দাবী করেন। তখন প্রয়োজন দেখা দিল, যে কোনো মূল্যে হোক মরিয়ম পুত্র ঈসা (আ.)-এর কবর আবিষ্কার করতে হবে। যেই প্ল্যান সেই কাজ। তিনি দাবী করলেন, কাশ্মীরের খান ইয়ার মহল্লায় সমাহিত ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তিটিই মূলত ঈসা (আ.)। তাঁর কবরই ঈসা (আ.)-এর কবর।

তাহলে প্রমাণ?

তিনি তার উক্ত দাবী কিভাবে প্রমাণ করলেন সে সম্পর্কে স্বীয় রচিত ‘মসীহ হিন্দুস্তান মে’ বইয়ের ভুমিকায় লিখে গেছেন। অর্থাৎ তিনি হিন্দুস্তানের ঐতিহাসিক প্রাচীনতম নানা পত্র-পুস্তক, পণ্ডিতদের বিভিন্ন রচনাবলী আর কাশ্মীরের স্থানীয়দের সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা সাব্যস্ত করেছেন যে, ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তির কবরই ঈসা (আ.)-এর কবর। আর এটি তার মতে অকাট্য প্রমাণ। অথচ ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তি আর হযরত ঈসা (আ.) দুইজন যে আলাদা দুই ব্যক্তি, তা একদমই পরিষ্কার ও ঐতিহাসিকভাবেও প্রমাণিত। তার কারণ, মির্যা কাদিয়ানী সাহেব ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তিটির বিস্তারিত পরিচয় জানতে যে কিতাব দুটির রেফারেন্স দিয়ে গেলেন তন্মধ্যে ফার্সি ভাষার ‘আ’ইনুল হায়াত‘ কিতাবটি অন্যতম। সেটির এক স্থানে উল্লেখ আছে যে,

اسی زمانہ میں بادشاہ کے فرزند نرینہ تولد ہوا اور اتنی مسرت ہوئی کہ قریب مرگ ہوگیا۔ اور یقین ہوگیا کہ بت پرستی کا عطا کردہ یہ انعام ہے – ملک کا تمام خزانہ زینت و آرائش میں ختم کردیا – لوگوں کو ایک سال تک خوشی٫ شادی عیش و نشاط کا حکم عام ہو گیا – فرزند ارجمند کا نام یوز آسف رکھا۔

অর্থাৎ এমন সময় রাজার একটি নাদুসনুদুস পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। এতে তিনি এতই খুশি হন যে, যেন মারা যাবেন! তার বিশ্বাস এই যে, এটি তার মূর্তিপূজার জন্য প্রদত্ত পুরস্কার। তিনি রাজ্যের সমস্ত ধন-সম্পদ ভোগ বিলাসে উজাড় করে দেন। জনগণের জন্য পূর্ণ এক বছর আমোদ ফুর্তি আর খুশি উদযাপনের ফরমান জারি করেন। সেই নাদুসনুদুস সন্তানটির নাম রাখা হয় ইউজে আসেফ। (রূহুল হায়াত উর্দু তরজুমা আ’ইনুল হায়াত, পৃষ্ঠা ৩৬৪, মূল-মোল্লা মুহাম্মদ বাকের মজলিসি)।

ইউজে আসেফ সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা লাভ করতে মির্যা কাদিয়ানী সাহেবের পরামর্শটা কেমন?

ইউজে আসেফ সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা লাভ করতে হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে রচিত প্রাচীনকালের একখানা কিতাব ‘কামালুদ্দীন ওয়া তামামুন নি’মাহ‘ পড়তে পরামর্শ দেন মির্যা গোলাম আহমদ সাহেব। যেমন তার বইতে লিখা আছে,

و ان كنت تطلب التفضيل فاقرأ كتابا سمى بإكمال الدين تجد فيه كل ما تسكن الغليل

অর্থাৎ “আর তুমি যদি বিস্তারিত জানতে চাও তাহলে ‘কামালুদ্দীন‘ নামীয় কিতাবটি পড়তে পার! তুমি সেখানে এমন সব (তথ্য) পাবে যা প্রবল তৃষ্ণাকেও শান্ত করে দেবে।” তারই রচনা ‘আল-হুদা’ এবং রূহানী খাযায়েন ১৮/৩৬২ দ্রষ্টব্য।

তিনি তার উক্ত রচনার আগের পৃষ্ঠায় বিষয়টি আরও চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। যেমন তিনি লিখেছেন,

والتواتر على لسان اهلها انه قبر نبي كان ابن ملك وكان من بني اسرائيل وكان اسمه يوذ آسف فليسالهم من يطلب الدليل واشتهر بين عامتهم ان اسمه الاصلي عيسى صاحب وكان من الانبياء و هاجر الى كشمير في زمان مضى عليه من نحو ١٩٠٠ سنة و اتفقوا على هذه الانباء بل عندهم كتب قديمه توجد فيها هذه القصص في العربيه والفارسيه ومنها كتاب سمي كمال الدين وكتب اخرى كثير الشهره

অর্থাৎ তার (কাশ্মীরের) অধিবাসীদের নিকট ক্রমাগতভাবে চালু আছে এই কথা যে, এটি একজন নবীর কবর যিনি রাজপুত্র ছিলেন এবং বনী ইসরাইলি ছিলেন। তার নাম ছিল ইউজে আসেফ। অতএব, যে প্রমাণ চাইতে ইচ্ছুক সে যেন তাদেরকে জিজ্ঞেস করে। তাদের সাধারণদের মাঝে প্রসিদ্ধ আছে যে, তার প্রকৃত নাম ঈসা সাহেব। তিনি একজন নবী। তিনি প্রায় ১৯’শ বছর বিগত যুগে কাশ্মীরে হিজরত করেছেন। সবাই এই সংবাদের উপর একমত আছেন, বরং তাদের নিকট প্রাচীন গ্রন্থাবলিও আছে যেখানে আরবী এবং ফার্সি ভাষায় এই ঘটনাবলি উল্লেখ রয়েছে। তন্মধ্যে ‘কামালুদ্দীন’ কিতাবটি অন্যতম এবং আরো বহু সুপ্রসিদ্ধ বইও রয়েছে। (আল হুদা, রূহানী খাযায়েন ১৮/৩৬১)।

মির্যা সাহেব তার ঐ রচনায় ইউজে আসেফ সম্পর্কে ঐতিহাসিক প্রাচীনগ্রন্থটিতে যেসব তথ্য উপাত্ত থাকার দাবী করেছেন তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে, ইউজে আসেফের একটি কিতাবের নাম ছিল ইঞ্জিল। তিনি সাধারণদের নিকট ‘ঈসা সাহেব’ নামে সম্বোধিত হতেন। তিনি একজন নবী ছিলেন, বনী ইসরাইলি ছিলেন। প্রায় ১৯’শ বছর আগেকার ব্যক্তি ছিলেন। কাশ্মীরের সাধারণ মানুষদের মাঝে এই বিশ্বাস ক্রমাগতভাবে চলে আসছিল। ইত্যাদী। কিন্তু বাস্তব কথা হল, এর সবগুলোই মির্যা কাদিয়ানীর মিথ্যাচার। কারণ প্রাচীন ঐ কিতাবটিতেও এসমস্ত কথা ইংগিতেও উল্লেখ নেই। কেউ চাইলে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। যদি আমি চ্যালেঞ্জে হেরে যাই তাহলে ১০ লক্ষ টাকা পুরষ্কার দেব। আর যদি প্রতিপক্ষ হেরে যায় তাহলে সে শুধুমাত্র তওবা পড়ে মির্যার ন্যায় এই নিকৃষ্ট মিথ্যুককে ত্যাগ করে ইসলামের মূলধারায় ফিরে আসলেই হবে।

ঈসা (আ.) কি কোনো বাদশাহ’র পুত্র ছিলেন? তাঁর কি পিতা ছিল?

মির্যার অন্যান্য উদ্ধৃতিগুলো আরেকটু পর উল্লেখ করছি। তার আগে ‘কামালুদ্দীন’ কিতাব থেকে ইউজে আসেফ সম্পর্কে জেনে নিন! ক্রমানুসারে নিম্নরূপ :-

১। ‘কামালুদ্দীন’ কিতাবের ৫২৭ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে,

وولد للملك في تلك الايام بعد اياسه من الذكور غلام لم يرى الناس مولودا مثله قط حسنا وجمالا وضياء…وسمي الغلام يوز اسف وجمع العلماء والمنجمين لتقديم ميلاده

অর্থ “এবং সেই দিনগুলোতে বাদশাহ হতাশ হবার একটি সময়ের ব্যবধানে তার এমন একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হল, মানুষ তার মতো সুন্দর এবং দীপ্তিমান শিশু আগে কখনও দেখেনি।… তার নাম রাখা হয় ইউজে আসেফ। তিনি (বাদশাহ) তার জন্মদিন উদযাপনের উদ্দেশ্যে রাজ্যের সকল বিদ্যান এবং জ্যোতিষিকে একত্রিত করেন।”

এতে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তিটি হিন্দুস্থানের জনৈক মূর্তিপূজক বাদশাহর একমাত্র পুত্র সন্তান ছিলেন। মূলত তাঁকে এ কারণেই ‘শাহজাদা বা রাজপুত্র ইউজে আসেফ’ বলা হত। এটি তার উপাধি নয়, বরং বাস্তবেই তিনি তাই ছিলেন।

মির্যা গোলাম আহমদ বিষয়টি একান্ত উদারতার সাথে ১৯০২ সালের তার একটি রচনায় স্বীকারও করেছেন। যেমন তিনি লিখেছেন,

وانعقد عليه اجماع سكان تلك الناحية وتواتر على لسان اهلها انه قبر نبي كان ابن ملك وكان من بني اسرائيل وكان اسمه يوزآسف

অর্থ- সেই এলাকার (কাশ্মীরের) স্থানীয়রা একমত এবং সেখানকার একই ভাষাভাষী গোষ্ঠীও পরম্পরায় এই বিষয়ে একমত যে, এটি একজন নবীর কবর যিনি বাদশাহ’র পুত্র এবং বনী ইসরাইলী ছিলেন। তার নাম ছিল ইউজে আসেফ। (আল-হুদা, রূহানী খাযায়েন ১৮/৩৬১; মূল মির্যা কাদিয়ানী)।

২। ‘কামালুদ্দীন’ (আরবী) কিতাবের ৫৭১ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে,

فبعث الملك فى الارض يطلب و يلتمس له امرأة فوجدت له امرأة من احسن الناس و اجملهم فزوجها منه.

অর্থাৎ “বাদশাহ (তার পুত্রের বিয়ের জন্য) একজন স্ত্রী খোঁজতে লোক পাঠান। অত:পর পুত্রের জন্য একজন স্ত্রী পাওয়া গেল। যে খুবই সুন্দরী এবং রূপসী। অত:পর তিনি স্ত্রীলোকটিকে তার সাথে বিয়ে দিয়ে দেন।” এখানে ‘কামালুদ্দীন’ কিতাব থেকে আমরা জানতে পারলাম, বাদশাহ তাঁকে এক অনিন্দ্য সুন্দরি স্ত্রীলোকের সাথে বিয়েও দিয়ে ছিলেন। অধিকন্তু আমরা জানি যে, ঈসা (আ.) বিয়ে করেননি। তার আগেই আল্লাহ তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে গেছেন। (সূরা নিসা ১৫৮)।

৩। ইউজে আসেফ এর শিষ্যের নাম ছিল আইয়াবেজ। এ সম্পর্কে শায়খ আল কিম্মি লিখেছেন,

ودعا قبل موته تلميذا له اسمه أيابذ الذي كان يخدمه ويقوم عليه

অর্থাৎ তিনি মৃত্যুর পূর্বে তাঁর শিষ্যকে ডাকলেন যার নাম ছিল আইয়াবেজ। সে তাঁর সেবা করত এবং পরিচালনা করত। (কামালুদ্দীন ২/৫৭৯)।

৪। ইউজে আসেফ এর ধর্মগুরু ‘হাকিম বলোহার’ তাঁকে পথপ্রদর্শন করে বলেন, وكن صديقا مقسطا، فانك تكون امام الناس تدعوهم الى الجنه অর্থাৎ এবং তুমি একজন ন্যায়পরায়ণ সত্যবাদী হবে। কেননা তুমি মানুষের ইমামে পরিণত হয়ে তাদেরকে জান্নাতের দিকে দাওয়াত দেবে। (কামালুদ্দীন ২/৫৭৬)।

৫। জনাব ইউজে আসেফ আপনা রাজপ্রাসাদ ছেড়ে কাশ্মীরে আগমন করা সম্পর্কে গ্রন্থকার লিখেছেন,

ثم انتقل من ارض سولابط وسار في بلاد ومدائن كثيرة أتى ارضا تسمى قشمير– فسار فيها واحيا ميتها و مكث حتى اتاه الأجل الذي خلع الجسد وارتفع الى النور

অর্থাৎ অতঃপর তিনি শান্তি ও সমৃদ্ধির দেশ ছেড়ে স্থানান্তর হন এবং বহু দেশ ও শহর ভ্রমণ করে কাশ্মীর নামক ভূমিতে চলে যান। তিনি এখানে ভ্রমণ করেন এবং আমৃত্যু জীবনযাপন করেন। মৃত্যু পর্যন্ত অবস্থান করেন। (কামালুদ্দীন ৫৭৯; শায়খ বাবওয়াইহি আল কিম্মি)।

বর্ণিত উদ্ধৃতিগুলোর সারাংশ :

  • শাহজাদা ইউজে আসেফের বাড়ী হিন্দুস্থানে।
  • তিনি ভূতপূজারী ও প্রতাপশালী জনৈক বাদশাহ’র একমাত্র পুত্র।
  • বাদশাহ তাকে দেশের এক শীর্ষস্থানীয় জ্যোতিষীর পরামর্শে এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত লোকালয়ের বাহিরে গৃহবন্দী করে রাখেন যাতে সত্য দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে না পারে।
  • বাদশাহ পরবর্তীতে তাকে মুক্ত করে দেন এবং যথাসময় অনিন্দ্য সুন্দরি একটি মেয়ের সাথে বিয়েও দেন।
  • তিনি সমসাময়িক একজন শ্রেষ্ঠতম ধার্মীক ও বুযূর্গ ব্যক্তি ছিলেন।
  • তিনি শ্রান্দিপ অধিবাসী হাকিম বলোহার (حكيم بلوهر) নামীয় একজন বিজ্ঞ ধর্মগুরুর শিষ্য ছিলেন।
  • তিনি আইয়াবেজ () নামীয় আপনা একজন শিষ্যকে সাথে নিয়ে নিজ শহর ছেড়ে কাশ্মীর চলে যান এবং সেখানকার মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেন।
  • তিনি কখনো নবী ছিলেন না, বড়জোর একজন ন্যায়নিষ্ঠ ও সত্যবাদী ছিলেন।
  • কাশ্মীরে জীবনযাপন করেন অত:পর সেখানেই ইন্তেকাল করেন।
  • খান ইয়ার মহল্লায় তাকে দাফন করা হয়। এখন এরপরেও কিভাবে এমন দাবী করা যেতে পারে যে, ইনি আসলে উনিই!? সুতরাং মির্যা কাদিয়ানীর গবেষণা এবং কথিত ইলহামী দাবী সবই অসত্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রত্যাখ্যাত। সত্যিকারের জ্ঞানী ও সত্যানুসন্ধিৎসু ব্যক্তির পক্ষে বিষয়টি উপলব্ধি করতে এটুকুই যথেষ্ট।

এবার কাশ্মীরের ইউজে আসেফ এর কবরের তদন্ত সম্পর্কে

মির্যা গোলাম আহমদ শীয়াদের প্রাচীনতম একটি ফার্সীভাষার কিতাব ‘আ’ইনুল হায়াত’ থেকেও ইউজে আসেফ সম্পর্কে তথ্য উদ্ধৃত করে গেছেন। তিনি লিখেছেন,

شیعوں نے مجھے ایک کتاب بھی دکھلائی جس کا نام عین الحیات ہے اس کتاب میں میں بہت سا قصہ بصفحہ مأة و تسعة عشر ابن بابویہ اور کتاب کمال الدین اور اتمام النعمہ کے حوالہ سے لکھا ہے لیکن وہ تمام بے ہودہ اور لغو قصے ہیں صرف اس کتاب میں اس قدر سچ بات ہے کہ صاحب کتاب قبول کرتا ہے کہ یہ نبی سیاح تھا اور شہزادہ تہا جو کشمیر میں آیا تھا۔

অর্থাৎ “শীয়ারা আমাকে এমন একটা কিতাবও (বই) দেখিয়েছিল যার নাম আ’ইনুল হায়াত’। সেই কিতাবে ১১৯ পৃষ্ঠাব্যাপী ইবনে বাবওয়াইহি এবং ‘কামালুদ্দীন ওয়া তামামুন নি’মাহ’ কিতাবের উদ্ধৃতিতে বহু ঘটনা লিখা আছে। কিন্তু তার সমস্ত ঘটনা অনর্থক এবং বেহুদা। তবে গ্রন্থকারের গৃহীত অনুসারে সেখানে এই কথাগুলোই সত্য যে, সে (ইউজে আসেফ) একজন পর্যটক নবী ছিল, একজন রাজপুত্র ছিল যে কাশ্মীরে এসেছিল।” (রাযে হাকীকত, রূহানী খাযায়েন ১৪/১৭০)।

সারকথা হল, ঐ কিতাবে উল্লিখিত মাত্র তিনখানা কথাই সত্য, এ ছাড়া বাকি সবই অনর্থক। সেই তিনখানা কথা হল, (১) ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তিটি একজন পর্যটক নবী ছিলেন। (২) একজন শাহজাদা ছিলেন। (৩) তিনি কাশ্মীর এসেছিলেন। কিন্তু সত্য এটাই যে, ‘কামালুদ্দীন’ কিতাবটিতে ইউজে আসেফকে একবারের জন্যও ‘নবী’ শব্দে উল্লেখ করা হয়নি। আমি চ্যালেঞ্জ দিচ্ছি, কেউ ইউজে আসেফ সম্পর্কে ‘নবী’ শব্দের উল্লেখ থাকা দেখাতে পারবেনা। কোনো কাদিয়ানী নেতার সাহস থাকলে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন!

তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নিই যে, স্থানীয়দের সবাই তাকে ‘নবী’ হিসেবে মনে করত তারপরেও দুটি প্রশ্নের আদৌ কোনো উত্তর থাকেনা।

(এক) তখন আল্লাহর ঐ নবী আর যেই হোন না কেন, অন্ততপক্ষে ঈসা (আ.) হতে পারেন না। কারণ ঈসা (আ.)-এর পিতা ছিলনা এবং তিনি রাজপুত্র বলেও সম্বোধিত হতেন না।

(দুই) মির্যা সাহেব স্থানীয়দের নামে এমন দাবী মূলত আ’ইনুল হায়াত’ কিতাবের উদ্ধৃতিতে করেছেন। এখন সেটির সত্যতা কতটুকু তার খোঁজ মিলবে যদি কিতাবটি খোলে দেখা যায়! কিন্তু কিতাবটির কোথাও একবারের জন্যও লিখা নেই যে, ইউজে আসেফ একজন নবী কিংবা বনী ইসরাইলি ছিলেন! কাজেই মির্যা কাদিয়ানী একজন প্রতারক ছিল বলে আর কোনো সন্দেহ থাকতে পারে কি?

মির্যা সাহেব তার উক্ত রচনায় এও লিখলেন,

اس شہر کے شیعہ لوگ بھی کہتے ہیں کہ یہ کسی نبی کی قبر ہیں جو کسی ملک سے بطور سیاحت آیا تھا اور شہزادہ کے لقب سے موسوم تھا۔

অর্থাৎ “এই শহরের শীয়া লোকজনও বলেছে যে, এটি কোনো এক নবীর কবর যিনি কোনো এক দেশ থেকে ভ্রমণ করে এসেছিলেন এবং শাহজাদা উপাধিতে ভূষিত ছিলেন।” কিন্তু সত্য এটাই যে, এ ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তিকে ‘নবী’ বলে মনে করার উক্ত দাবীরও কোনো ভিত্তি নেই। সত্য বলতে মির্যা সাহেব তার প্রতিটি লিখার পরতে পরতে এভাবে মিথ্যা আর জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। অপ্রিয় হলেও সত্য এটাই যে, তার এ মিথ্যা আর জালিয়াতির কারণেই তার মুরিদ আব্দুল্লাহ কাশ্মীরী তাকে ত্যাগ করেছিল।

আব্দুল্লাহ কাশ্মীরীর তদন্ত রিপোর্ট :

মির্যায়ী মুরিদ আব্দুল্লাহ কাশ্মীরীকে ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তিটির কবর প্রকৃতপক্ষে ঈসা (আ.)-এরই কবর কিনা, তা ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে তথ্য সংগ্রহ করতে কাশ্মীরের খান ইয়ার মহল্লায় পাঠানো হয়। তিনি সেখানকার স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে নানা সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সেখানকার কবরটি সম্পর্কে অনুসন্ধান চালান। অত:পর মির্যার নিকট পত্রের মাধ্যমে রিপোর্ট প্রেরণ করেন।

মির্যা কাদিয়ানী রিপোর্টটিকে তারই রচিত ‘রাযে হাকীকত’ (রচনাকাল, নভেম্বর ১৮৯৮ইং) বইতে ছাপিয়ে প্রকাশ করেন। বইটি আব্দুল্লাহ কাশ্মীরীর হাতে গিয়ে পৌঁছে। তিনি তার পত্রটি পড়ামাত্রই হতভম্ব হয়ে যান। কারণ পত্রের অনেক জায়গায় মির্যা সাহেব নিজ থেকে পরিবর্তন করে ফেলেন। আব্দুল্লাহ কাশ্মীরী’র প্রেরিত রিপোর্টে যা ছিলনা তিনি তাও ঐ রিপোর্টের নামে চালিয়ে দেন। এ সম্পর্কে একটু পরেই লিখছি।

প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্ন :

মির্যা সাহেবের দাবী অনুসারে যদি ‘আ’ইনুল হায়াত’ কিতাবটির ঐ তিনখানা বক্তব্যের বাহিরে বাকি সব কথা অনর্থক আর বেহুদা হয় তাহলে ইউজে আসেফ ‘শাহজাদা’ নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন, এটি মির্যা কাদিয়ানী সাহেব কিভাবে জানলেন?

আরো প্রশ্ন আসে, শুধু ঐ তিনটি কথাই কিজন্য সত্য হবে? বাকিগুলো কেন সত্য নয়?

আরো প্রশ্ন আসে, কাশ্মীরে আগমনকারী যুবকই ইউজে আসেফ, এটি মির্যা সাহেব জানলেন কিভাবে? যেহেতু তার দৃষ্টিতে ইউজে আসেফ নামীয় গল্পের সম্পূর্ণ কনসেপ্ট ঐ তিন জিনিসের বাহিরে।

আরো প্রশ্ন আসে, কাদিয়ানী জামেয়াগুলোতে ইউজে আসেফ নামীয় গল্পের কনসেপ্টের উপর নিয়মিত পাঠদান হয়ে থাকে। ইউজে আসেফ কে ছিল? কাশ্মীর কিভাবে এসেছিল? কিভাবে মারা গিয়েছিল? তিনি কার শিষ্য ছিলেন? তার গুরু মহোদয় হাকিম বলোহর সাহেব থেকে তিনি কী কী তালিম নিয়েছিলেন ইত্যাদী? এখন গল্পের বাকি অংশগুলো অনর্থক আর বেহুদা হলে তারা কিজন্য এমন বেহুদা বিষয়েও পাঠদান করে থাকেন?

জনৈক কাদিয়ানী মুরুব্বীর রচিত একটি কিতাব عيسى در ايں كشمير এর মধ্যে ইউজে আসেফ নামীয় গল্পের প্রায় পুরোটাই আলোকপাত করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশত তিনিও সেখানে ইউজে আসেফ যে একজন বাদশাহ’র পুত্র ছিলেন, একথা এড়িয়ে গেছেন। এখন এই এড়িয়ে যাওয়ার কারণটা ব্যাখ্যা করে দিতে পারবেন এমন কেউ আছেন?

জ্ঞানীদের নিশ্চয়ই জানা থাকবে যে, ঈসা শব্দটি আরমেনীয় এবং হিব্রু উভয় ভাষাতেই ব্যবহৃত একটি শব্দ। এখন ইউজে আসেফ নামটিও যদি ঈসা (আ.)-এর হয় তবে কেন কিতাব দুটির একটিতেও ইউজে আসেফ নামীয় গল্পে ঈসা, মসীহ, জেসাস কিবা ইসো এই জাতীয় একটি শব্দও তার সুস্পষ্ট পরিচয় বহনের উদ্দেশ্যে উল্লেখ নেই?

এই পর্যায় আরেকটি প্রশ্ন করতে চাই যে, জীবিত আর মৃত এক সাথ হতে পারেনা, কাদিয়ানী মতের অনুসারীদের পক্ষ হতে এধরণের যুক্তি দেখানো হয় যাতে দ্বিতীয় আসমানে হযরত ইয়াহিয়া (আ.)-এর সাথে হযরত ঈসা (আ.)-এর অবস্থানকে শুধুমাত্র রূহানী অবস্থান বলে সাব্যস্ত করা যায়। তাহলে প্রশ্ন আসে যে, মির্যা কাদিয়ানী সাহেব জাগ্রত অবস্থায়ও বহু নবী রাসূলের সাক্ষাৎ লাভ করতে পেরেছেন বলে দাবী কিভাবে করতে পারলেন? এই যে তার “মসীহ হিন্দুস্তান মেঁ” (পৃষ্ঠা নং ৩৫) বইতে লিখা আছে। এখন এর কী রূপক ব্যাখ্যা দেবেন? স্ক্যানকপি :-

মির্যার বই থেকে আরও কিছু উদ্ধৃতি নিম্নরূপ :

মির্যা গোলাম আহমদ সাহেব লিখেছেন, শাহজাদা ইউজে আসেফের কবরকে নবীর কবর বলা হত, কেউ কেউ ঈসা সাহেব নবী’র কবর, এভাবেও বলত। (রূহানী খাযায়েন ১৪/২১২)। আহা! কত নিকৃষ্টতর ধোকা আর মিথ্যা! দুর্ভাগা আর কপালপোড়া কাদিয়ানী সম্প্রদায় এতই ব্রেইন ওয়াশ যে, তারা সত্য-মিথ্যা যাচাই করারও প্রয়োজন মনে করেনা। অথচ যার একটি কথায় মিথ্যা প্রমাণিত হবে তার বাদ-বাকি কোনো কথারই গ্রহণযোগ্যতা থাকেনা, এটাই প্রকৃত কথা। (দেখুন, রূহানী খাযায়েন ২৩/২৩১)।

মির্যায়ী কতিপয় জালিয়াতি :

মির্যা কাদিয়ানী নিজের কথাকে ঐতিহাসিক প্রাচীন গ্রন্থের নামে চালিয়ে লিখলেন,

بل عندهم كتب قديمه توجد فيها هذه القصص في العربيه والفارسيه ومنها كتاب سمي كمال الدين وكتب اخرى كثيرة الشهرة.

অর্থাৎ বরং তাদের (কাশ্মীরের স্থানীয়দের) নিকট আরবী এবং ফার্সী ভাষায় এমন সব কিতাবও রয়েছে যেখানে এই ঘটনাবলী বিদ্যমান। তন্মধ্যে ‘কামালুদ্দীন’ কিতাব সহ অন্যান্য অনেক প্রসিদ্ধ কিতাব অন্যতম। (আল হুদা, রূহানী খাযায়েন ১৮/৩৬১)।

মির্যা কাদিয়ানী একই বিষয়ে আরও লিখেছেন,

کشمیر کے تمام باشندوں کا اس بات پر اتفاق دیکھ کر کہ یہ نبی جس کی کشمیر میں قبر ہے ہمارے نبی صلی اللہ علیہ وسلم سے چھہ سو برس پہلے گزرا ہے صاف طور پر حضرت عیسی کو متعین کر رہا ہے۔ 

অর্থাৎ কাশ্মীরে এই নবীর কবরের ব্যাপারে সেখানকার সমস্ত স্থানীয়দের একমত হওয়া যে, তিনি আমাদের নবী (সা.)-এরও ছয় শত বছর পূর্বেই গত হয়ে গেছেন, তা হযরত ঈসাকেই পরিষ্কার নির্দেশ করছে। (কাশফুল গুতা, রূহানী খাযায়েন ১৪/২০২)।

মির্যায়ী মুরিদ আব্দুল্লাহ কাশ্মীরীর নামে মির্যার মিথ্যা ও জালিয়াতির বিষয়ে ‘ফোরকান’ সাময়িকীতে স্বীকারোক্তি : –

মির্যা কাদিয়ানী আপনা মুরীদ আব্দুল্লাহ কাশ্মীরীর পাঠানো রিপোর্টে কাটছাঁট করে লিখলেন,

اس خاکسار نے حسب الحکم سرینگر میں عین موقع پر یعنی روضہ مزار شریف شہزادہ یوز آصف نبی اللہ علیہ الصلوۃ والسلام پر پہنچ کر جہاں تک ممکن تھا بکوشش تحقیق کئی۔

অর্থাৎ এই অধম অর্থাৎ আব্দুল্লাহ কাশ্মীরী (মির্যার) আদেশক্রমে শ্রীনগরের নির্দিষ্ট স্থানে তথা মাজার শরীফের ইউজে আসেফ নবীউল্লাহ আলাইহিস সালামের রওজায় এসে পৌঁছে যথাসাধ্য (কবরের প্রকৃত তথ্য) অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছি। (রাযে হাকীকত, রূহানী খাযায়েন ১৪/১৬৭)। অপ্রিয় হলেও সত্য, আব্দুল্লাহ কাশ্মীরী যা লিখেনি মির্যা তা তার নামে নিজ বইতে চালিয়ে দেন! এ সম্পর্কে তাদেরই ‘ফোরকান’ সাময়িকী থেকে দেখুন,

  • কাদিয়ানীদের অফিসিয়াল একখানা উর্দূ সাময়িকীর নাম ‘ফোরকান‘। এটির ১৯৪৬ সালের জুলাই সংখ্যায় মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ নিজেই স্বীকার করে লিখেছেন যে, মির্যার রচিত ‘রাযে হাকীকত’ বইতে (রূহানী খাযায়েন ১৪/১৬৭) মির্যায়ী মুরিদ আব্দুল্লাহ কাশ্মীরী’র পাঠানো পত্রের নামে যা যা উদ্ধৃত করা হয়েছে—সত্য হল সেটি হুবহু সেরকম ছিলনা। মির্যা কাদিয়ানী সাহেব ইউজে আসেফ সম্পর্কে নিজ দাবীর সমর্থনে যে সকল সাক্ষীর তালিকা দিয়ে রেখেছেন তন্মধ্য হতে ১৯৪৬ সালেও দুইজন জীবিত ছিলেন। মির্যা কাদিয়ানীর রচনা ‘আল হুদা‘ (আরবী) বই থেকে মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ সেই দু’জনকে তাদের নামও দেখান; যেখানে তারা ২ আর ৩ নং সিরিয়ালে রয়েছেন। তারা সেই তালিকায় নিজেদের নাম দেখে খুবই অবাক হন এবং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, এ সম্পর্কে তারা কিছুই জানতেন না। তাদের একজন মওলানা সা’আদ উদ্দীন আ’তিক (খান ইয়ার মহল্লার বাসিন্দা), অপরজন মওলভী আহমদ উল্লাহ ওয়ায়েজ কাশ্মীরী। তালিকাটি দেখার জন্য ‘রূহানী খাযায়েন’ ১৮/৩৭৩ দ্রষ্টব্য। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, সাক্ষী হিসেবে উক্ত তালিকায় আরও যাদের নাম উল্লেখ রয়েছে তারাও যদি তখন জীবিত থাকত; তবে বিচিত্র নয় যে, তারা প্রত্যেকে ঐ তালিকা দেখে এই দু’জনের মতই হতবাক হতেন।

আব্দুল্লাহ কাশ্মীরী মির্যা কাদিয়ানীর জালিয়াতির প্রতিবাদ করে ‘শু’লাতুন নার ফী মাক্ববেরায়ে খানইয়ার’ নাম দিয়ে একটি বইও রচনা করেন। বইটিতে তিনি জোরগলায় প্রতিবাদ করেন এভাবে যে,

پس خان یار کے مقبرے کے متعلق ان باتوں میں سے کوئی بات میرے خط میں موجود نہیں۔ جو خط میں نے حضرت مرزا صاحب کو لکھا اور جس کو انہوں نے شائع کر دیا اور نہ کوئی بات مطابق واقعہ ہے بلکہ یہ تمام باتیں حضرت مرزا صاحب نے اپنی خیال سے ایجاد کر کے بڑے زور کے ساتھ دنیا میں شائع کر دی

  • অর্থ- “অতএব খান ইয়ার মহল্লার সমাধি সম্পর্কে এ সবের কিছুই আমার চিঠিতে নেই। হজরত মির্যা সাহেবকে আমি যে চিঠি লিখেছিলাম এবং যা তিনি প্রকাশ করেছেন তার কোনোটিই বাস্তব সম্মত নয়, বরং এর সবই হযরত মির্যা সাহেবের মনগড়া সৃষ্টি, যা সারা বিশ্বে প্রবল শক্তির সাথে তিনি প্রচার করেছেন।” (শু’লাতুন নার ফী মাক্ববেরায়ে খানইয়ার, আব্দুল্লাহ উকিল কাশ্মীরী)।

প্রামাণ্য স্ক্যানকপি

উল্লেখ্য, উক্ত ঘটনার পরপরেই মির্যা কাদিয়ানীর উপর আব্দুল্লাহ কাশ্মীরী আর আস্থা রাখতে পারলেন না। তিনি বেরিয়ে গেলেন মির্যায়ী বাইয়েত থেকে। যোগ দিলেন অন্য আরেক মসীহ দাবীদার বাহাউল্লাহ ইরানীর (১৮১৭-১৮৯২ইং) ‘বাহায়ী জামাতে’। কিন্তু আফসোস, কাদিয়ানী নেতারা আব্দুল্লাহ কাশ্মীরীর মির্যার বাইয়েত ভঙ্গ করার অন্তর্নিহিত কারণ প্রকাশ করে না।

মির্যা কাদিয়ানী আরও লিখেছেন,

کشمیر کی پرانی تاریخ سے ثابت ہے کہ صاحب قبر ایک اسرائیلی نبی تھا اور شہزادہ کہلا تھا۔

অর্থাৎ কাশ্মীরের পুরনো ইতিহাস দ্বারা সাব্যস্ত আছে যে, কবরের ব্যক্তিটি একজন ইসরাইলী নবী ছিল এবং তাঁকে শাহজাদা বলা হত। (তুহফায়ে গোলডবিয়া, রূহানী খাযায়েন ১৭/১০১)।

মির্যা কাদিয়ানী সাহেব আরও লিখেছেন,

اور نبی کا لفظ جو اس صاحب قبر کے نسبت کشمیر کے ہزارہا لوگوں کی زبان پر جاری ہے یہ بھی ہمارے مدعا کے لیے ایک دلیل ہے۔

অর্থাৎ এবং এই কবরের ব্যক্তিটি সম্পর্কে কাশ্মীরের হাজারো মানুষের জবানে ‘নবী’ শব্দ প্রচলন থাকাই আমাদের দাবীর সত্যতার একটি প্রমাণ। (কাশফুল গুতা, রূহানী খাযায়েন ১৪/২১২)।

তিনি আরো লিখেছেন,

شہزادہ یوز آسف نبی کی قبر اور بعض عیسی صاحب نبی کی قبر کہتے ہیں۔

অর্থাৎ শাহজাদা ইউজে আসেফ নবীর কবর এবং কেউ কেউ ঈসা সাহেব নবীর কবরও বলে থাকে। (কাশফুল গুতা, রূহানী খাযায়েন ১৪/২১২)।

আমরা তার বইগুলো থেকে আরও দেখতে পাই, তিনি লিখেছেন,

حال میں جو روسی سیاح نے ایک انجیل لکھی ہے جن کو لندن سے میں نے منگایا ہے وہ بھی اس رائے میں ہم سے متفق ہے کہ ضرور حضرت عیسی علیہ السلام اس ملک میں آئے تھے۔

অর্থাৎ সম্প্রতি একজন রুশ অভিযাত্রী (নটোভিচ) একটি ইঞ্জিল লিপিবদ্ধ করেন, আমি সেটি লণ্ডন থেকে সংগ্রহ করেছি। সেও ঈসা (আ.) এই দেশে (কাশ্মীরে) এসেছিলেন মর্মে আমাদের দাবীর সাথে একমত। (রূহানী খাযায়েন ১৪/১৬৯)।

মির্যার সম্পূর্ণ দাবীর খোলাসা :

  • ইউজে আসেফ একজন নবী, ইসরাইলী নবী।
  • কাশ্মীরের প্রাচীনতম ঐতিহাসিক সুত্র দ্বারাও সাব্যস্ত যে, এই কবর একজন ইসরাইলী নবীর কবর।
  • স্থানীয়রাও একথার সাক্ষী, বরং হাজার মানুষ এটি মনে করেন।
  • রুশ সাংবাদিক নটোভিচের একটি ইঞ্জিলও ঈসা (আ.) কাশ্মীর এসেছিলেন বলে সাক্ষী।

এবার আমার বক্তব্য :
মির্যা সাহেব ইউজে আসেফ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হিন্দুস্তানের যে ঐতিহাসিক প্রাচীন বইদুটি পড়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন, উপরে সে দুটি বই থেকেই প্রমাণ করা হয়েছে যে, ঈসা (আ.) আর ইউজে আসেফ তারা আলাদা দুই ব্যক্তি। আর কাশ্মীরের স্থানীয়দের সম্পর্কে মির্যা সাহেব যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণের কথা লিখে গেছেন তা ইংগিতেও বই দুটিতে পাওয়া যায় না। কেউ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলে করতে পারেন।

এবার বাকি রইল রুশ সাংবাদিক নটোভিচ। পুরো নাম নিকোলাস নটোভিচ (১৮৫৮-১৯৬১ইং)। তার সম্পর্কে একটি পুরনো তিব্বতি পুঁথিকে রুশ ভাষায় অনুবাদ করার কথা জানা যায়। কথিত আছে, তিনি নাকি ঐ তিব্বতি পুঁথি থেকে যীশুর ভারতে আসার ধারণা আবিষ্কার করেন। আমি উইকিপিডিয়া (ইংলিশ) সূত্রে তথ্যটি এভাবে পেলাম যে, নটোভিচ উল্লেখ করেন, ‘উনত্রিশ বছর বয়সে যিশু নিজের দেশে ফিরে তাঁর শিক্ষা প্রচার করতে শুরু করেন। তিনি জেরুজালেম যান। সেখানে পীলাত তাঁকে নিয়ে ভীত হয়ে পড়েন। তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং হত্যা করা হয়।’ নটোভিচের দাবী ছিল যিশু হিন্দুস্তানে এসেছিলেন। তবে নবুওয়ত প্রাপ্তির আগে, পরে নয়। তিনি উনত্রিশ বছর বয়সে পুনরায় জেরুজালেমে ফিরেও গিয়েছিলেন। এখন নটোভিচের কথা অনুসারে ঈসা (আ.)-এর হিন্দুস্তানে আসা তাঁর নবুওয়তের পূর্বেকার সময়ে, পরবর্তীতে তিনি ফিরেও যান; কাদিয়ানীরা কি বিশ্বাস করবে? নটোভিচ কিন্তু পরবর্তীতে স্বীকারও করেছেন যে, তার পূর্ব ধারণাটি সত্য নয়।

ঈসা (আ.) আর ইউজে আসেফ দুইজনই আলাদা ছিল বলে স্বয়ং মির্যা কাদিয়ানীর সাক্ষ্য :

মির্যা গোলাম আহমদ এক দিকে ইউজে আসেফকে ঈসা মসীহ সাব্যস্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন আবার আরেক দিকে নিজেই লিখলেন যে, ‘আরও আশ্চর্যের বিষয় ইউয আসফের পুরাতন ধর্ম গ্রন্থের সাথে (যা অধিকাংশ বিজ্ঞ ইংরেজ পণ্ডিতদের মতে যিশুখ্রিষ্টের জন্মের পূর্বেই লিখিত হয়েছিল এবং যা বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়ে নানা দেশে প্রচারিত হয়েছে) ইঞ্জিলের অধিকাংশ কথায় এত সামঞ্জস্য আছে যে বহু স্থানে বর্ণনাগুলোতে বাক্যসমূহ এর সাথে সম্পূর্ণ একরূপ। ইঞ্জিলে বর্ণিত উপাখ্যান সমূহ অক্ষরে অক্ষরে উক্ত পুস্তকেও বর্ণিত আছে।” (চশমায়ে মসীহি ১২-১৩; বাংলা চতুর্থ প্রকাশ জুলাই ২০১৮ ইং; মূল মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী)।

এখান থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণিত হল যে, ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তিটি তারই কথা অনুসারে ঈসা ভিন্ন দ্বিতীয় এমন এক ব্যক্তি যার জীবনকাল ঈসা (আ.)-এরই পূর্বে গত হয়ে গেছে এবং তার কিতাব আর ইঞ্জিল দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এমন স্ববিরোধ কথাবার্তায় যে ব্যক্তি অভ্যস্ত তার মিথ্যাবাদী হতে আর কী বাকি?

এবার প্রাচীনতম কিতাব দুটি থেকে আরও কিছু উদ্ধৃতি :

মির্যা গোলাম আহমদ এর দাবী হচ্ছে, ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তিটি সম্পর্কে নাকি ‘নবী’ হওয়ার কথা কিতাব দুটিতে লিখা আছে! অথচ কিতাব দুটির কোথাও একবারের জন্যও তার সম্পর্কে ‘নবী’ শব্দটি উল্লেখ নেই। বড়জোর তার সম্পর্কে লিখা আছে, তিনি সমসাময়িককালের সর্বশ্রেষ্ঠ একজন সম্মানিত ও শ্রেষ্ঠতম বুযূর্গ ব্যক্তি, খোদাভীরু ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তি। শ্রান্দীপ অধিবাসী হাকিম বলোহর নামীয় তার একজন গুরু ছিলেন। তিনি তাঁর কাছ থেকে দ্বীনের সমস্ত তালিম, নসিহত ও হেকমত সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করতেন। কিন্তু ধূর্ত মির্যা গোলাম আহমদ এর কোনো একটিও তার বইতে উল্লেখ করেনি। এই তো কয়দিন আগের কথা। ৩০শে এপ্রিল ২০১০ ইং তারিখে প্রকাশিত বিবিসি (আরবী)-এর একটি অনুসন্ধানী নিউজ দেখলাম। সেখানে ইউজে আসেফ এর কবরের ছবি উল্লেখ করে নিচে লিখা হয়েছে,

اما السكان المحليون فيتعبرون ان المزار هو قبر لاثنين من العلماء المسلمين توفيا منذ قرون: يوزا آصف والسيد نصير الدين.

অর্থাৎ, এখানকার স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন যে, নিশ্চয়ই এই দুটো কবর দুইজন মুসলিম আলেমের, এঁরা কতেক শতাব্দীতে মৃত্যুবরণ করেছেন। একজন ইউজে আসেফ আর অন্যজন সাইয়েদ নাসির উদ্দীন। বিবিসি (আরবী) নিউজ পোর্টালের লিংক দেখুন।

মির্যা সাহেবের মতে, মোল্লা মুহাম্মদ বাকের মজলিসি বিরচিত ‘আ’ইনুল হায়াত’ (ফার্সি) কিতাবে ইউজে আসেফ এর কিতাবের নাম ‘ইঞ্জিল’ রাখা হয়েছে। হায় হায়, কত জঘন্য মিথ্যা কথা! অথচ সেখানে এমন কোনো কথা ইংগিতেও নেই। এমনকি ইউজে আসেফ সম্পর্কিত দীর্ঘ আলোচনায় ‘ঈসা বা ইবনে মরিয়ম বা মসীহ বা জেসাস’ এই সমস্ত শব্দেরও উল্লেখ নেই।

‘মির্যা কাদিয়ানীর জন্য দুঃসংবাদ :

মির্যা কাদিয়ানীর জন্য দুঃসংবাদ এইজন্য যে, আরবী ভাষায় লেখিত ‘কামালুদ্দীন’ নামীয় কিতাব অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আমার পক্ষেও বইটি সংগ্রহে কষ্ট করতে হয়নি। আইনুল হায়াত কিতাবের উর্দূ অনুবাদ ‘রূহুল হায়াত’ কিতাবটিও ডাউনলোড করেছি। মির্যা গোলাম আহমদ সাহেব হয়ত ভেবেছিলেন, তিনি যাইচ্ছেতাই লিখে গেলেও সেটির সত্যমিথ্যা যাচাই করার প্রয়োজন মনে করবে সে আবার কে! কার এত সময় আছে!! তাছাড়া শীয়াদের প্রাচীন যুগেকার রচিত এই সমস্ত দুর্লভ কিতাব সংগ্রহ করবে এমন সাধ্য কার!!! তাই তিনি ভেবেছিলেন, দুনিয়াকে চিরকাল মিথ্যার বেসাতি করে অন্ধকারেই রেখে যেতে পারবেন!

তার জন্য দুঃসংবাদ হল, সে জানত না যে, একটা সময় আসবে যখন তথ্যপ্রযুক্তির সহজ আদানপ্রদান হবে। মানুষ পৃথিবীটাকে পকেটে নিয়ে ঘুরবে। মুহূর্তের মধ্যে যে কেউ গুগল নামক সার্চ-ইঞ্জিল থেকে যে কোনো দুষ্প্রাপ্য কিতাবও ডাউনলোড করে পড়তে পারবে। আর সেই সময় দুনিয়ার সমস্ত মিথ্যাবাদী, প্রতারকরা উপর্যুপরি পাকড়াও হতে থাকবে। আজকে যেমনিভাবে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী প্রতিনিয়ত দুনিয়ার সামনে পাকড়াও হতে চলেছে।

(খ) এই বিষয়ে কেন জানা দরকার?

এই সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি জানা প্রয়োজন এ কারণেই যে, মির্যা কাদিয়ানীর দাবীগুলোর মূল ভিত্তিই হচ্ছে, ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু এবং কাশ্মীরের খান ইয়ার মহল্লায় সমাহিত ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তিটিই প্রকৃতপক্ষে ঈসা (আ.)। এখন আমি যখন তাঁর উক্ত দাবীর মূল ভিত্তিটাই তারই বাতলানো অথেনটিক সোর্স দ্বারা নড়বড়ে করে দিলাম তখন তো যে কেউই মানতে বাধ্য হবে যে, অন্তত আর যাইহোক ইউজে আসেফ আর ঈসা (আ.) দুইজনই আলাদা দুই ব্যক্তি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। মোটকথা, কেবল এই একটি তথ্যবহুল লিখাই তার ইউজে আসেফ নামীয় ব্যক্তির কবর হযরত মসীহ ঈসা (আ.)-এরই কবর হবার বিশ্বাসকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য যথেষ্ট। পাঠক সমীপে প্রত্যাশা, আপনারা যেন এই লিখাটি গভীর মনোযোগ সহকারে পড়েন। অহেতুক কু-ধারণার বশবর্তী হয়ে এতে পরিবেশিত এই সব সত্যকে দূরে ঠেলে না দেন। স্মরণ রাখবেন, এটি ভাসা-ভাসা তথ্যের উপর লেখিত গতানুগতিক কোনো লিখা নয়, বরং এতে উপস্থাপিত সকল কন্টেন্ট অত্যন্ত গভীর অনুসন্ধান আর আমানতের সাথে গৃহীত। প্রয়োজনে এর যে কোনো তথ্যের উপর আপনারা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারেন। আশাকরি, এই সত্য উদঘাটন হওয়ার মাধ্যমে কাদিয়ানী মতবাদের দম্ভ চূর্ণবিচূর্ণ হতে মাত্র সময়ের অপেক্ষা।

ডঃ বার্নিয়ারের উদ্ধৃতি, ‘মারহামে ঈসা’ বা ঈসার মলম এবং বনী ইসরাইলি হারানো দশটি গোত্রের দিকে গমন ইত্যাদী কিছু প্রসঙ্গ ও তার সংক্ষিপ্ত উত্তর :

এই পর্যায় কয়েকটি বিষয়ের জবাব না দিলে মনে সংশয় থেকে যাবে, তা হচ্ছে মির্যা কাদিয়ানী সাহেব দাবী করে লিখেছেন, ডঃ বার্নিয়ার রচিত ‘সফরবৃত্তান্ত’ বইতে উল্লেখ আছে, কাশ্মিরের বাসিন্দারা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে ইহুদী, যারা এসুর (Assur) সম্রাট কর্তৃক সংঘটিত বিপর্যয়ের সময়ে এ দেশে চলে এসেছিল। (মসীহ হিন্দুস্তান মেঁ ১৯)। আমি উত্তরে বলি, ডঃ বার্নিয়ার এ সমস্ত কথা যদি উল্লেখ করেনও তবে তা কখনো সঠিক হয়ে যাবেনা, যে পর্যন্ত সেটির নির্ভরযোগ্য সনদ ও ভিত্তি পরিষ্কার জানা না যাবে। কেননা ডঃ বার্নিয়ার নিজেও কথাগুলো বিভিন্ন পণ্ডিতের উদ্ধৃতিতে লিখেছেন মর্মে মির্যা নিজেই লিখে গেছেন। ফলে ‘দশ চক্রে ভগবান ভূত’ প্রবাদটি একদমই উড়িয়ে দেয়া যায় না।

তিনি দাবী করে আরও লিখেছেন, মসীহ (আ.) জেরুজালেমের কবরটিতে তিন দিন অবস্থান করে ক্রুশের ক্ষতগুলো নিরাময় করেন। তিনি বহু চিকিৎসাশাস্ত্রের গ্রন্থে ‘মারহামে ঈসা’ নামের একটি মলমের ব্যবস্থাপত্র উল্লেখ থাকার পুঁতিও তুলে ধরেছেন। এই মলমটির ব্যবহারে নাকি মসীহ (আ.)-এর ক্ষতগুলো কয়েক দিনেই ভালো হয়ে গিয়েছিল। আর এ থেকেও নাকি প্রমাণিত হয় যে, ঈসা (আ.) ক্রুশবিদ্ধ হওয়াটা সত্য, যেমনটি ইঞ্জিলের কোনো কোনো কপিতেও উল্লেখ রয়েছে। আমি এর উত্তরে মির্যা সাহেবের এ কথাটিরই পুনরাবৃত্তি করতে চাই যে, বার্নাবাসের ইঞ্জিলে পরিষ্কার লিখা আছে, মসীহ (আ.) ক্রুশবিদ্ধ হন নি এবং মারাও যাননি। (মসীহ হিন্দুস্তান মেঁ ২২)। তার স্বীকারোক্তি মতেও এটি একখানা প্রাচীন ইঞ্জিলগ্রন্থ, যা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। এখন এই গ্রন্থ পাঠে আমরা কি অন্তত এ কথা বলতে পারিনা যে, পবিত্র কুরআন যেরূপভাবে মসীহ (আ.) সম্পর্কে ক্রুশবিদ্ধ হবার খ্রিস্টীয় বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ মিথ্যা সাব্যস্ত করছে, অনুরূপভাবে বার্নাবাসের ইঞ্জিলও মিথ্যা সাব্যস্ত করে থাকে।

এতেই সাব্যস্ত হয় যে, মসীহ (আ.) ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে তখনকার সকল মানুষ একমত ছিলেন না। তাই প্রশ্ন আসে, যার ক্রুশবিদ্ধ হওয়াটাও সর্বসম্মত কোনো বিশ্বাসের মধ্যে পড়েনা তার আবার কোন জখমের আরোগ্যলাভ হয়েছিল কথিত ‘মারহামে ঈসা’ নামের মলম দ্বারা? নির্বোধদের মগজে এই প্রশ্নটি কেন জাগেনা যে, মসীহ তো অন্যদের আরোগ্য করতেন, কিন্তু তিনি নিজেকে আরোগ্য করতে অপারগ ছিলেন বলেই কি সামান্য একটি মলম তাঁর আরোগ্য করেছিল! তবে কি জাগতিক সামান্য এই মলম হযরত মসীহ’র চাইতেও অনেকগুণ বেশি শক্তিশালী ছিল? নাউযুবিল্লাহ।

তারপর মির্যা সাহেব লিখেছেন, মসীহ (আ.) কবর থেকে বের হয়ে বনী ইসরাইলের হারানো দশটি গোত্রের দিকে যান, যারা কাশ্মীর ও তিব্বত ইত্যাদি প্রাচ্য দেশগুলোতে বসবাসরত ছিলো। মির্যার দাবী হল, এই দশটি গোত্রের দিকে গমন করবেন বলে খোদ মসীহ (আ.)ই ইংগিত দিয়েছিলেন। আমি এর উত্তরটিও মির্যা কাদিয়ানীর প্রতি পালটা একটি প্রশ্নের মাধ্যমে দিতে চাই। গোটা বাইবেলের কোথাও ইংগিতেও একথা উল্লেখ নেই যে, মসীহ (আ.) গালীল থেকে কাশ্মীর বা তিব্বত ইত্যাদি কোনো প্রাচ্য দেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন। বড়জোর এটুকু পাওয়া যায় যে, যীশুর একাদশ শিষ্য গালীলে যীশুর (মসীহর) সাথে শেষ সাক্ষাত করেন। তখন যীশু নিকটে আসিয়া তাহাদের সাথে কথা কহিলেন, আর বলিলেন, স্বর্গে ও পৃথিবীতে সমস্ত কর্তৃত্ব আমাকে দত্ত হইয়াছে। অতএব তোমরা গিয়া সমুদয় জাতিকে শিষ্য কর; পিতার ও পুত্রের ও পবিত্র আত্মার নামে তাহাদিগকে বাপ্তাইজ কর। (বাইবেল, মথি ২৮: ১৬-২০ দ্রষ্টব্য)।

বাইবেলের এই শ্লোক সত্যি হলে, একজন শিক্ষিত খ্রিস্টানও মানতে বাধ্য হবে, যীশু (ঈসা)-কে গ্যালিল থেকেই দ্বিতীয় আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়। ইসলামিক কোনো কোনো আন-অথেনটিক ইসরাইলি রেওয়ায়েতেও খ্রিস্টীয় উক্ত শ্লোকের স্বীকারোক্তির চাপ রয়েছে। যেমন বিচ্ছিন্ন একটি সূত্রে ওয়াহাব বিন মুনাব্বেহ বলেন, মসীহ শুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর তিন ঘন্টা পর পুনরুজ্জীবিত হন অত:পর ইশ্বর তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নেন (কিন্তু ওয়াহাবের এই বর্ণনা তাফসীরকারকগণ শুধুই সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গ্রন্থবদ্ধ করেছেন, অথেনটিক সোর্স হিসেবে নয় – লিখক)।

পূর্বের বক্তব্যে আবার ফিরে আসছি, আমরা বাইবেল থেকেও জানলাম যে, তিনি (যীশু) শিষ্যদেরকে সমগ্র দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দেন, যাতে সমগ্র জাতিকে শিষ্য বানিয়ে নিতে পারে। এমতাবস্থায় মির্যায়ী দাবী—‘এই দশটি গোত্রের দিকে গমন করবেন বলে খোদ মসীহ (আ.)ই ইংগিত দিয়েছিলেন’ একথা মিথ্যা সাব্যস্ত হল কিনা? উল্লেখ্য, গালীল হচ্ছে প্রাচীন ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে শামের একটি জনপদ, বর্তমানে এটি উত্তর ইসরায়েল ও দক্ষিণ লেবাননে অবস্থিত একটি অঞ্চল। সংক্ষেপে উত্তরগুলো দেয়া হল।

যীশুকে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, এর প্রমাণ বাইবেল থেকেও আমরা দিতে পারব, ইনশাআল্লাহ :

“যীশু আশীর্বাদ করতে করতে তাঁদের ছেড়ে আকাশে উঠে যেতে লাগলেন আর স্বর্গে উন্নীত হলেন৷” (মার্ক ১৬/১৯-২০; লুক ২৪/৫১)।

“যীশু যখন যাচ্ছেন, আর প্রেরিতরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন, ঠিক সেই সময সাদা ধবধবে পোশাক পরা দুই ব্যক্তি তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেন৷”

“সেই দুই ব্যক্তি প্রেরিতদের বললেন, ‘হে গালীলের লোকেরা, তোমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছ কেন? এই যে যীশু, যাকে তোমাদের সামনে থেকে স্বর্গে তুলে নেওযা হল, তাঁকে যেভাবে তোমরা স্বর্গে যেতে দেখলে, ঠিক সেই ভাবেই তিনি ফিরে আসবেন৷” (প্রেরিত ১/১০-১১; ২/৩৩)। একজন জ্ঞানী মাত্রই বুঝতে পারবেন যে, বাইবেল এ শ্লোক দ্বারাও পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কাদিয়ানীদের রূপক মসীহ’র কনসেপ্টটাই সুস্পষ্ট ধোকা আর প্রতারণা।

  • ঈসা (আ.)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া সংক্রান্ত ইসলামিক অথেনটিক কয়েকটি সোর্স এখানে তুলে ধরেছি। পড়তে ক্লিক করুন।

পরিশেষ, হেদায়েতের প্রকৃত মালিক আল্লাহ। তিনি যাকে ইচ্ছে হিদায়াত দেবেন। আমি অনেক কষ্ট করে তথ্যগুলো জোগাড় করেছি। যাতে একজন কাদিয়ানীও নিরপেক্ষভাবে সত্যটা বুঝে ঈমানের ঝাণ্ডাতলে ফিরে আসতে পারে। আল্লাহ হাফেজ।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী, শিক্ষাবিদ ও গবেষক