Home Blog Page 7

ঈমান কি বাড়ে কমে? আমল কি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত?

0

ঈমান কি বাড়ে কমে?

ইমাম আবু হানিফা (রহিমাহুল্লাহ)-এর সময় খারিজিদের খুব উৎপাত ছিল। তারা কবিরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের কাফের মনে করতো এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করা এবং তাদের জান মালকে হালাল মনে করত। কারণ, তাদের মতে ঈমান আমলের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং আমল পরিত্যাগ করা মানে ঈমান পরিত্যাগ করা। এজন্য আমল যে ঈমানের মূল বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত নয় এবং আমল ত্যাগের কারণে যে কেউ কাফের হয় না, তাকে হত্যা করা তার মাল ছিনিয়ে নেয়া যে বৈধ নয়, তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়া ওলামায়ে কেরামের উপর আবশ্যক হয়ে পড়ে। সে দায়িত্ব‌ই পালন করেছিলেন ইমাম আবু হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ)। তিনি ফাতাওয়া দিলেন, ঈমান আর আ’মল সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। আ’মল দ্বারা ঈমানে শক্তি বৃদ্ধি হয়, তবে সেটি ঈমানের অংশবিশেষ নয়। তিনি এ ফাতাওয়ার সমর্থনে দলিল এবং যুক্তি দুটোই পেশ করেন।

ঈমান শব্দের মূল অর্থ হলো বিশ্বাস করা, সত্যায়ন করা। খারেজিদের নিকট ঈমানের মূল রুকন বা ভিত্তি তিনটি। যথা-

১. ঈমানের বিষয়গুলোকে অন্তরে বিশ্বাস করা,
২. মুখে স্বীকার করা,
৩. শরীয়ত মোতাবেক আমল করা।

তাদের নিকট এগুলোর একটি বাদ গেলেও ঈমান থাকবে না, তাই কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তি কাফের, যেহেতু সে আমল পরিত্যাগ করেছে আর আমল ঈমানের তিন রুকনের এক রুকন। উল্লেখ্য, প্রসিদ্ধ মাযহাব চতুষ্টয়ের তিনটি-ই আ’মলকে ঈমানের বাহিরের জিনিস বলে মত দিয়েছে।

বলাবাহুল্য, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের কতিপয় বিশেষজ্ঞ ঐ তিনটির সমষ্টিকে ঈমানের মূল রুকন বা ভিত্তি বললেও তাঁরা আমল পরিত্যাগকারীকে খারেজীদের মত ‘কাফের’ বলেন না। কিন্তু এটা তাঁদের এক ধরনের স্ববিরোধিতা বৈ নয়।

কারণ, বাকি দুই রুকনের মধ্যে সামান্য পরিমাণ ঘাটতি হলেও ঈমান বাতিল হয়, যেমন- কেউ বলল, আমি ফেরেশতায় বিশ্বাস করি না, তবে ঈমানের বাকি সব বিশ্বাস করি। এখানে ফেরেশতার প্রতি বিশ্বাসের কমতি হওয়ায় তার পুরো ঈমানই বাতিল হয়ে যাবে। তদ্রূপ কেউ বলল, আমি যাবুরকে আসমানী কিতাব হিসেবে স্বীকার করি না, কিন্তু ইসলামের বাকি সব মান্য করি। এ ব্যক্তি বাকি সব মানা সত্তেও কাফের বলে গণ্য হবে। তদ্রুপ কেউ যদি বলে, আমি পুরো কোরআন মানি তবে অমুক আয়াত মানি না। এই ব্যক্তি ও কাফের বলে গণ্য হবে। তদ্রূপ বাড়তি করলেও কাফের হবে। যেমন কেউ নিশ্চিতভাবে বলল শ্রীকৃষ্ণ নবী ছিল। অথচ এর স্বপক্ষে কোরআন হাদিসের কোন দলিল নেই। অথবা বলল বর্তমানে ও নবী আসা সম্ভব, তাহলে সে কাফের হবে। সুতরাং বুঝা গেল ঈমানের এই মৌলিক দুটি রুকনে বাড়তি কমতির কোনো সুযোগ নেই।

যেহেতু ঈমানের বিষয়বস্তুগুলোতে বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বাড়তি কিংবা কমতির সুযোগ নেই এ দৃষ্টিকোণ থেকেই ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ঈমান বাড়েও না কমেও না। এ মাসআলাটিকে ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “আল আলিমু ওয়াল মুতাআল্লিম”-এ অত্যন্ত সুন্দর ও চমকপ্রদভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আগ্রহীরা সেখানে দেখে নিতে পারেন।

যাইহোক, তাহলে মুহাদ্দিসদের কথা অনুযায়ী তৃতীয় রুকনে তথা আমলের ক্ষেত্রেও সামান্য পরিমাণ ছুটে গেলে পুরো ঈমান বাতিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু খারেজীদের মতো সেটা তারা বলছেন না, সুতরাং এটা প্রকৃতপক্ষে ঈমানের রুকন নয়। হ্যাঁ, যদি এটাকে ঈমানের পূর্ণতাদানকারী রুকন বলি, ঈমানের অস্তিত্ব আনয়নকারী রুকন না বলে তাহলে অসুবিধা নেই।যেমন- হাসান নামক ব্যক্তির মাথার সুন্দর চুল না থাকলেও ব্যক্তি হাসান অস্তিত্বে থাকে। তদ্রুপ তার নাক, কান, চোখ, হাত ও পা না থাকলেও ব্যক্তি হাসান আছে বলে গণ্য হবে। কিন্তু এগুলো থাকলে ব্যক্তির দৈহিক সৌন্দর্যও গঠন পূর্ণতা লাভ করে।

তদ্রুপ ঈমানের বিষয়বস্তুগুলোর প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস এবং মৌখিক স্বীকৃতি থাকা অবস্থায় ব্যক্তি আমল পরিত্যাগ করলেও তার ঈমান বিদ্যমান থাকে কিন্তু ঈমানের সৌন্দর্যবর্ধক জিনিস বিদ্যমান থাকে না। আর যখনি ঈমানের বিষয়বস্তুগুলোর কোন একটিতে অবিশ্বাস করার মাধ্যমে কমতি সাব্যস্ত হবে, তখনি কুফর আবশ্যক হবে।

সুতরাং আমরা বুঝলাম ইমাম আবু হানিফা রহ. ঈমান বাড়েও না কমেও না বলে বুঝিয়ে থাকেন ঈমানের বিষয়বস্তুতে কমতি বাড়তি হয় না। আর কোরআন হাদিসের যত জায়গায় ঈমান বাড়া এবং কমার কথা বলা হয়েছে সেগুলো দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ঈমানের সৌন্দর্য বাড়া, নূর বৃদ্ধি পাওয়া, ঈমানের বিষয়বস্তুতে বাড়তি কমতি উদ্দেশ্য নয়।

কারণ শত শত আমল থাকা সত্ত্বেও ঈমানের বিষয়বস্তুগুলোর কোন একটিতে সামান্য পরিমাণ অবিশ্বাস করলে সে কাফের বলে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে ঈমানের বিষয়বস্তুগুলোর প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস ও মৌখিক স্বীকৃতি থাকাবস্থায় সকল আমল বর্জন করলেও সে কাফের বলে গণ্য হবে না।

আবার কোন হালালকে হারাম মনে করলে কিংবা হারামকে হালাল মনে করলে সাথে সাথে কাফের হয়ে যাবে। অকাট্য দলিলে প্রমাণিত কোন গুনাহে লিপ্ত হ‌ওয়াকে হালাল মনে করলেও কাফের হয়ে যায়।‌ এসকল বিষয়ে মুহাদ্দিসদের সাথে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মুতাকাল্লিমদের কোন বিরোধ নেই।

সুতরাং বোঝা গেল ঈমান হলো অন্তরের বিষয় আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে ঈমান আনার কারণে আমল আবশ্যক হয়, আমলের কারণে ইমান আবশ্যক হয় না।

আমল যে মূল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত নয় এ ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফার বহু দলিল রয়েছে। ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে আমরা সেগুলো আলোচনা করব।

লিখক, অ্যাডমিন ফিকহ মিডিয়া

ফতুল্লায় বিগত ১০ বছরেও কেউ কাদিয়ানী হয়েছে বলে আমি শুনিনি

প্রশ্ন : বাংলাদেশে কাদিয়ানী মতবাদ সাধারণদের কী পরিমাণে কাছে টানতে পারছে?

উত্তর : এ সম্পর্কে বলতে গেলে, অতিব সামান্য। তাও সকালে কাদিয়ানী তো বিকেলে যে লাউ সেই কদু। অর্থাৎ যখনি কেউ বুঝতে পারে যে, কাদিয়ানীদের ফাঁদে পড়েছে, তখনি আর দেরি না করে তওবাহ করে এবং ইসলামে ফিরে আসে। আমৃত্যু কাদিয়ানীদের ধোকা আর প্রতারণার ব্যাপারে খুব বেশি সতর্ক হন।

এখানে একজন কাদিয়ানী অনুসারী জনৈক মিশনারী (মুবাল্লিগ) এর একটি মন্তব্য তুলে ধরছি। নারায়নগঞ্জের ফতুল্লা স্থানীয় জনাব মজিবুর রহমান শেখ। যিনি একজন কাদিয়ানী-আহমদীয়া ধর্মের অনুসারী। জনাব মজিবুর রহমান শেখ গত ২৮ বছর ধরে একজন কনভার্টেট কাদিয়ানী মুবাল্লিগ (ফতুল্লা, নারায়নগঞ্জ ঢাকা)।

সম্প্রতি তিনি স্যোসাল মিডিয়ায় মন্তব্য করেছেনঃ “আমার জানামতে আহমদীয়া মুসলিম জামাত ফতুল্লাহ গত ১০ বছরে একজনও বয়াত করেনি।” তিনি তার ঐ মন্তব্যে কাদিয়ানীদের চাপাবাজীর মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছেন। স্যোসাল মিডিয়ায় শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিকট নিজের অবিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করতে শুরু করেছেন। তিনি কোনো এক কারণে কাদিয়ানী জামাতের প্রতি ভীষণ বিরক্ত। সম্ভবতঃ কাদিয়ানী জামাতের অনুসারী ও নিজেদের মধ্যকার যে কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। যার ফলে তিনি জুলুম বা নিপীড়নের শিকার হন। যার জন্য বকশিবাজারস্থ তাদের কেন্দ্রে তিনি বিচার চেয়েও বিচার পাননি। অথচ বিচারের আশায় তিনি প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত ঢাকার বকশিবাজারে তাদের হেড কোয়ার্টার বা কেন্দ্রের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। নিচে তারই মন্তব্য গুলোর স্ক্রিনশট তুলে ধরছি, যাতে কাদিয়ানী জামাতের লোকদের মুখে মধু এবং অন্তরে বিষ থাকার বিষয়টি আরও খুব চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

জনাব মজিবুর রহমান শেখ সাহেবের এফ.বি একাউন্ট এর লিংক – মজিবুর রহমান শেখ

লিখক, মুহাম্মদ নূরুন্নবী এম.এ

তোমরা তা কামড়ে ধরো: একটি আপত্তির উত্তর,

তোমরা তা কামড়ে ধরো: হাদীসের বিশেষ শব্দ ও একটি আপত্তির একাডেমিক বিশ্লেষণ

ভূমিকা:

ইসলামবিরোধী ও সমালোচনামূলক লেখালেখিতে হাদীসের কিছু আরবী শব্দ—বিশেষ করে রূপক ও অলঙ্কারধর্মী (بلاغي) বাক্য—প্রায়ই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়।

এর একটি উদাহরণ হলো সহীহ হাদীসে ব্যবহৃত একটি অভিব্যক্তি, যেখানে বলা হয়েছে—

مَنْ تَعَزَّى بِعَزَاءِ الْجَاهِلِيَّةِ فَأَعِضُّوهُ وَلاَ تُكَنُّوهُ

এই হাদীসের কিছু শব্দকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। অথচ আরবী ভাষা, প্রাচীন বাগধারা এবং মুহাদ্দিসদের ব্যাখ্যা একে একটি স্পষ্ট নৈতিক নির্দেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।

মূল হাদীস (ইমাম বুখারীর আদাবুল মুফরাদ থেকে)

আরবী (হরকতসহ):

حَدَّثَنَا عُثْمَانُ الْمُؤَذِّنُ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَوْفٌ، عَنِ الْحَسَنِ، عَنْ عُتَيِّ بْنِ ضَمْرَةَ قَالَ: رَأَيْتُ عِنْدَ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ رَجُلًا تَعَزَّى بِعَزَاءِ الْجَاهِلِيَّةِ، فَأَعَضَّهُ أُبَيٌّ وَلَمْ يُكَنِّهِ، فَقَالَ: إِنِّي لَا أَهَابُ فِي هٰذَا أَحَدًا أَبَدًا، إِنِّي سَمِعْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَقُولُ: مَنْ تَعَزَّى بِعَزَاءِ الْجَاهِلِيَّةِ فَأَعِضُّوهُ وَلَا تُكَنُّوهُ

এর সহজ ও সাধারণ বাংলা অনুবাদ হতে পারে:

উতাই ইবনু দামরাহ (রহ.) বলেন, আমি উবাই ইবনু কা’ব (রা.)-এর কাছে এক ব্যক্তিকে দেখলাম, যে জাহেলি যুগের বংশগৌরব ও গোত্রীয় স্লোগান দিচ্ছিল। তখন উবাই (রা.) তাকে কঠোর ভাষায় ভর্ৎসনা করলেন এবং কোনো পরোক্ষ বা মার্জিত শব্দ ব্যবহার করলেন না। এরপর তিনি বললেন,
“এ ব্যাপারে আমি কাউকে পরোয়া করি না। আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি:
‘যে ব্যক্তি জাহেলি যুগের বংশীয় গৌরব ও গোত্রীয় আহ্বানকে আঁকড়ে ধরে, তোমরা তাকে কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করবে এবং ভদ্রতা বা ঘুরিয়ে কথা বলার আশ্রয় নেবে না।’

আরও আক্ষরিক অনুবাদ করলে শেষ অংশটি হবে:

“যে ব্যক্তি জাহেলি যুগের বংশগৌরবের ডাক দেয়, তাকে বলো যেন সে তার পিতার পুরুষাঙ্গ কামড়ে ধরে; এবং এ কথা ইঙ্গিতপূর্ণ বা ঘুরিয়ে না বলে স্পষ্টভাবেই বলো।”

নোট: তবে অধিকাংশ ব্যাখ্যাকার ব্যাখ্যা করেছেন যে, এর উদ্দেশ্য অশ্লীলতা নয়; বরং জাহেলি অহংকার ও গোত্রীয় গর্বের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভর্ৎসনা প্রকাশ করা। তাই সাধারণ পাঠকের জন্য ভাবানুবাদে “কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করো” অর্থটি বেশি বোধগম্য।

অন্য বর্ণনা (শব্দগত ভিন্নতা)

আরবী (হরকতসহ):

إِذَا الرَّجُلُ تَعَزَّى بِعَزَاءِ الْجَاهِلِيَّةِ فَأَعِضُّوهُ بِهَنِ أَبِيهِ وَلَا تُكَنُّوا.

শব্দ ও অর্থের মূল আপত্তি:

সমালোচকরা বিশেষ করে নিম্নোক্ত বাক্যাংশ নিয়ে আপত্তি তোলে—

فَأَعِضُّوهُ بِهَنِ أَبِيهِ

তারা এটিকে আক্ষরিক অর্থে “অশালীন বাক্য” হিসেবে উপস্থাপন করে।

একাডেমিক বিশ্লেষণ (ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি):

১. “أَعِضُّوهُ” শব্দের প্রকৃতি

আরবী ভাষায় এটি একটি রূপক ও বাগধারাগত (مجازي / بلاغي) অভিব্যক্তি।

এর অর্থ:

“তাকে কঠোরভাবে লজ্জিত করো / তার ভ্রান্ত অহংকার ভেঙে দাও”

২. “بِهَنِ أَبِيهِ” প্রসঙ্গ

এটি আরবী ভাষায় প্রচলিত একটি অতিশয়োক্তি ও তিরস্কারমূলক রূপক বাক্য, যার উদ্দেশ্য শাব্দিক অশ্লীলতা নয়, বরং—

বংশীয় অহংকার ও জাহিলি গর্বকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়া

৩. ইমাম মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর ব্যাখ্যা

তিনি বলেন—

مَعْنَاهُ مَنِ انْتَسَبَ إِلَى الْجَاهِلِيَّةِ… فَاذْكُرُوا لَهُ قَبَائِحَهُ… صَرِيحًا لَا كِنَايَةً

অনুবাদ (শুদ্ধ ও সহজ):

“এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি জাহিলি যুগের অহংকার ও গর্বকে পুনরুজ্জীবিত করে, তাকে তার বা তার পূর্বপুরুষদের নিন্দনীয় কাজসমূহ সরাসরি স্মরণ করিয়ে দাও, যাতে সে তা থেকে বিরত হয়।”

মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?

এই হাদীসের উদ্দেশ্য ছিল—

বংশীয় অহংকার ধ্বংস করা

সামাজিক বৈষম্য রোধ করা

ইসলামি ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা

আরবী ভাষার অলংকার (بلاغة) প্রসঙ্গ:

আরবী ভাষায় এমন বহু বাগধারা আছে যেখানে শাব্দিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়।

যেমন—

“رَغِمَ أَنْفُهُ”

অর্থ: “তার নাক ধূলায় ধূসরিত হোক”

প্রকৃত অর্থ: “সে অপমানিত/ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে”

একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত:

সহীহ মুসলিমে রাসূল (সা.) বলেন—

رَغِمَ أَنْفُهُ، ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُهُ…

এখানেও শাব্দিক অর্থ নয়, বরং রূপক অর্থ গ্রহণ করা হয়।

আপত্তির জবাব (একাডেমিকভাবে):

আপত্তি: “এটি অশালীন ভাষা”

জবাব:

১. আরবী ভাষায় এটি বাগধারা
২. মুহাদ্দিসগণ এর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন
৩. উদ্দেশ্য গালি নয়, সামাজিক সংশোধন
৪. প্রাচীন আরব সমাজে এটি প্রচলিত অলংকার

হাদীসের ব্যাখ্যাগত নীতি:

উসূলুল হাদীস অনুযায়ী—

কোনো শব্দকে শুধু আক্ষরিক অর্থে নয়,
বরং প্রসঙ্গ, ভাষা ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী বুঝতে হবে

উপসংহার:

এই হাদীসে ব্যবহৃত শব্দগুলোকে অশালীন বলা ভাষাগত ও গবেষণাগতভাবে সঠিক নয়।

বরং এটি ছিল—

সামাজিক সংস্কারমূলক নির্দেশ

বংশীয় অহংকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান

আরবী ভাষার স্বাভাবিক অলংকারিক অভিব্যক্তি

সুতরাং, এই হাদীসকে “অশালীনতা” হিসেবে উপস্থাপন করা মূলত ভাষাগত অজ্ঞতা ও প্রসঙ্গ বিচ্যুত ব্যাখ্যার ফল।

লেখক:
মুহাম্মদ নূরুন্নবী এম.এ
অ্যাডমিন- রদ্দে কাদিয়ানী অ্যাপস

হযরত ফাতিমা (রা.)-এর প্রতি প্রথম দুই খলীফা কি অন্যায় করেছিলেন?

প্রশ্ন : ইসলামের প্রথম দুই খলীফা হযরত ফাতেমার সাথে কি অবিচার করেছিলেন?

উত্তর : শীয়া রাফেজি সম্প্রদায়ের সোর্সগুলোয় এ ধরনের কিছু গল্প অবশ্যই বর্ণিত আছে। আহলুস সুন্নাহ’র বিশুদ্ধ কোনো হাদীস গ্রন্থে এ ধরনের কোনো গল্পের উল্লেখ নেই। তবে বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থের বাহিরে কিছু কিছু পুস্তকে এ সম্পর্কে উল্লেখ থাকলেও তার সনদ প্রমাণিত নয়। আবার কোনো কোনোটির বিবরণও একেক রকম।

দুই খলীফার প্রতি জঘন্য অপবাদ :

সব চেয়ে জঘন্য অপবাদটি হচ্ছে, ‘হযরত উমর (রা.) হযরত ফাতিমার পেটে আঘাত করেন, ফলে ফাতিমার গর্ভপাত ঘটে। পেট থেকে মুহসিনের প্রসব হয়ে যায়।’ নাউযুবিল্লাহ। এ জাতীয় বিভিন্ন গল্প কাহিনী শীয়াদের বইপুস্তক গুলোয় ভুরি ভুরি পাওয়া যায়। সত্যি বলতে, এধরণের ইতিহাস সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং অবাস্তব। সত্যের সাথে যার লেশমাত্র সম্পর্কও নেই।

তার কারণ, বর্ণনাগুলোর সিংহভাগই ভিত্তিহীন ও সনদ বিহীন। কিছু কিছু বর্ণনার সনদে ইনক্বিতাহ বা বিচ্ছিন্নতা বিদ্যমান, আবার কিছু কিছু সনদের রাবী বা বর্ণনাকারী জিন্দিক ও অবিশ্বস্ত হিসেবে অভিযুক্ত। আবার কোনো কোনো বর্ণনার মান শাজ পর্যায়ের।

আমি বর্ণনাগুলোর অনুবাদ সহ একটু পরেই উল্লেখ করব, ইনশাআল্লাহ। তার আগে উক্ত দুই খলীফা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) এর সাথে প্রাসঙ্গিক ঘটনাটির পটভূমি উল্লেখ করছি।

১১ হিজরীর ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার রাসূল (সা.) এর ইন্তেকাল হয়ে গেলে সাহাবীরা সকলে তাদের পরবর্তী অভিভাবক বা প্রতিনিধি কে হবেন তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান। রাসূল (সা.)-এর দাফন কার্য সম্পন্ন হওয়ার পরপরই সাহাবীগণ সাকিফা বনু সাইদাহ (سقيفة بنى ساعدة) এর মহল্লায় একত্রিত হন এবং আবূবকর (রা.)-এর নিকট দলে দলে খিলাফতের বয়’আত নিতে শুরু করেন। কিন্তু কয়েকজন সাহাবী তখনো বয়’আত নেননি, তারা বয়’আত নিতে দেরি করেন। তাদের মধ্যে হযরত আব্বাস, হযরত ফজল ইবনে আব্বাস, হযরত আলী, হযরত যোবায়ের ইবনুল আ’ওয়াম, হযরত মিক্বদাদ প্রমুখ অন্যতম। হতে পারে তারা রাসূল (সা.)-এর দাফন কার্য থেকে তখনও পুরোপুরি অবসর হতে পারেননি। তাই বয়’আত নিতে দেরি হচ্ছিল। হযরত আবুবকর (রা.) তাদেরকে অনুপস্থিত দেখে খবর নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেন এবং বেশকয়জন সাহাবীকে সহ হযরত উমর (রা.)-কে তাদের নিকট প্রেরণ করেন।

হযরত উমর (রা.) খবর নিয়ে জানতে পারলেন যে, তারা হযরত ফাতিমা (রা.)-এর বাড়ীতে অবস্থান করছেন। হযরত উমর (রা.) সহ সাহাবীগণ ফাতিমার বাড়ী গিয়ে পৌঁছেন। তাদেরকে খলীফা নির্বাচন সম্পর্কে অবিহিত করলেন। অত:পর বাড়ীর ভেতরে যারা অবস্থান করছিলেন তারা সবাই বের হয়ে আসেন এবং আবূবকর (রা.)-এর হাতে বয়’আতে প্রবেশ করেন। এ ছিল আসল ঘটনা। ঘটনাটি এভাবেই বিশুদ্ধ সূত্রে মুসনাদে আহমদ, মুস্তাদরাক লিল হাকিম গ্রন্থদ্বয়ে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত উমর (রা.) কি ফাতিমা (রা.) এর পেটে আঘাত করেছিলেন?

উত্তরে বলা হয় যে, এ ধরনের কোনো ইতিহাস প্রমাণিত নয়, বরং এ কথাটি প্রথম যে ব্যক্তিটি বলেছিল তার নাম ইবরাহীম আন নাজ্জাম আল মু’তাজিলি। তার দাবী হচ্ছে, ((إن عمر ضرب بطن فاطمة يوم البيعة، حتى ألقت المحسن من بطنها)) “নিশ্চয়ই উমর বয়’আতের দিন ফাতিমার পেটে আঘাত করেন, ফলে তাঁর পেট থেকে মুহসিনের গর্ভপাত হয়ে যায়।” – টাটকা জাল ও ভিত্তিহীন।

রেফারেন্স- আল ওয়াফী বিল ওয়াফিয়াত ৬/১৭, সালাহ উদ্দীন আছ-ছফদী আদ দিমাস্কী আশ-শাফেয়ী (মৃত. ৬৯৬ হি.)।

সম্পর্কিত তথ্যঃ উপরের বক্তব্যটি সম্পূর্ণ সনদ বিহীন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে এটি শীয়া দর্শনে প্রভাবিত ইবরাহীম আন নাজ্জামের নিজেস্ব উক্তি হিসেবে উল্লেখ পাওয়া যায়। নিচে ইবরাহীম আন নাজ্জাম এর বৃত্তান্ত উল্লেখ করছি,

ইমাম যাহাবী তাঁর ‘সিয়ার’ গ্রন্থে তার সম্পর্কে লিখেছেন ((كَانَ النَّظَّامُ عَلَى دِيْنِ البَرَاهِمَةِ المُنْكِرِيْنَ لِلنُبُوَّةِ وَالبَعْثِ وَيُخْفِي ذَلِكَ)) অর্থাৎ ইবরাহীম আন নাজ্জাম এমন একজন, যে পুনরুত্থান এবং নবুওয়তের অস্বীকারকারী ব্রাহ্মণ্য মতবাদের অনুসারী ছিল, অথচ সে তা গোপন রাখত। – (সিয়ারু আলামিন নুবালা, যাহাবী ১০/৫৪২)।

ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) ‘লিসানুল মীযান’ গ্রন্থে তার পুরো নাম এভাবে উল্লেখ করেছেন, ((إبراهيم بن سيار بن هانئ النظام أبو إسحاق البصري)) অর্থাৎ ‘ইবরাহীম ইবনে সাইয়ার ইবনে হানী আন নাজ্জাম আবূ ইসহাক্ব আল বছরী।’ ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) তার সম্পর্কে আরও লিখেছেন, ((من رؤوس المعتزلة متهم بالزندقة وكان شاعرا أديبا بليغا وله كتب كثيرة في الاعتزال والفلسفة ذكرها النديم. قال ابن قتيبة في “اختلاف الحديث” له: كان شاطرا من الشطار مشهورا بالفسق. ثم ذكر من مفرداته: أنه كان يزعم أن الله يحدث الدنيا وما فيها في كل حين من غير أن يفنيها , وجوز أن يجتمع المسلمون على الخطأ)) অর্থাৎ ‘সে ছিল মু’তাজিলি সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা। জিন্দিক বা ধর্মত্যাগী হিসেবেও অভিযুক্ত। তবে সে একজন কবি এবং সাহিত্যিক। তার বহু রচনা ছিল মু’তাজিলি মতবাদ এবং ফিলোসোফি দর্শনের উপর, শায়খ নাদীম তার লিখায় এ সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। ইমাম ইবনু ক্বদামাহ তার ‘ইখতিলাফুল হাদীস’ গ্রন্থে তার সম্পর্কে লিখেছেন, সে একজন ধূর্ত এবং অন্যায় ও অনৈতিকতার জন্য ছিল বিখ্যাত। ইবনু কুদামা ‘মুফরাদাত’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সে দাবী করত যে, সমগ্র পৃথিবী এবং এর মধ্যে আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, এর কিছুই বিনাশ হবেনা। সে আরও বলত, মুসলিমদের জন্য ভুলের উপর ঐক্যমত হওয়া বৈধ।’

ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) তার মৃত্যু সন লিখেছেন ((مات في خلافة المعتصم سنة بضع وعشرين ومئتين وهو سكران)) অর্থাৎ সে খলীফা মু’তাসিম এর শাসনামলে বছরা শহরে ২২০ হিজরীতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মারা যায়। (লিসানুল মীযান ১/২৯৫)।

বিশুদ্ধ সনদে এতদ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বর্ণনাটি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সহ আহলুস সুন্নাহ’র ইমামগণের কিতাবে যেভাবে উল্লেখ আছে,

হাদীসের আরবী ইবারত ও অনুবাদঃ

أسلم القرشي مولى عمر بن الخطاب رضي الله عنه، قال: حين بُويع لأبي بكر بعد رسول الله صلى الله عليه وسلم، كان علي والزبير يدخلان على فاطمة بنت رسول الله صلى الله عليه وسلم فيشاورونها ويرتجعون في أمرهم ، فلما بلغ ذلك عمر بن الخطاب خرج حتى دخل على فاطمة فقال: يا بنت رسول الله صلى الله عليه وسلم ! والله ما من أحد أحب إلينا من أبيك، وما من أحد أحب إلينا بعد أبيك منك، وايم الله ما ذاك بمانعي إن اجتمع هؤلاء النفر عندك إن أمرتهم أن يحرق عليهم البيت. قال: فلما خرج عمر جاؤوها فقالت: تعلمون أن عمر قد جاءني، وقد حلف بالله لئن عدتم ليحرقن عليكم البيت، وايم الله ليمضين لما حلف عليه، فانصرِفوا راشدين، فَرُوا رأيَكم ولا ترجعوا إلّيَّ ، فانصرفوا عنها ، فلم يرجعوا إليها حتى بايعوا لأبي بكر.

অর্থাৎ হযরত উমর ইবনু খাত্তাব (রা.) এর একজন কৃতদাস আসলাম আল কারশী, তিনি বলেন, যখন আল্লাহ’র রসূলের ইন্তেকালের পর আবু বকর (রা.)-এর নিকট বয়’আত নেয়া হচ্ছিল, তখন যোবায়ের এবং আলী দু’জনই আল্লাহ’র রসূলের কন্যা ফাতিমার বাড়ী যান এবং নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করতে থাকেন এবং কাজে বেপরোয়া ছিলেন। যখন এ সংবাদটি উমর ইবনু খাত্তাব (রা.)-এর নিকট পৌঁছল, তখন তিনি ফাতিমা (রা.)-এর নিকট যাওয়ার জন্য বের হন। তিনি বললেনঃ হে আল্লাহ’র রসূলের কন্যা! খোদার কসম, আমাদের কাছে আপনার পিতার চেয়ে প্রিয় আর কেউ নেই এবং আপনার পিতার পর আমাদের কাছে আপনার চেয়ে প্রিয় আর কেউ নেই। খোদার কসম, যদি এ দলটি আপনার নিকট সংঘবদ্ধ থাকে তাহলে তা আমাকে তাদের ঘর পুড়িয়ে দিতে রুখবেনা, যদি আপনি নির্দেশ দিন।

বর্ণনাকারী বলেন, যখন উমর চলে গেলেন, তখন তারা ফাতিমার নিকট আসলেন। ফাতিমা বললেন, তোমরা জানো যে, উমর আমার নিকট এসেছিলেন এবং তিনি আল্লাহর শপথ করেছিলেন যে, আপনারা যদি বয়’আত থেকে বিরত থাকেন তাহলে তিনি আপনাদের ঘর জ্বালিয়ে দেবেন। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি যে, তারা যা করার শপথ করেছেন তা তারা পূরণ করবে। সুতরাং আপনারা মনস্থির করুন আর আমার কাছে ফিরে আসবেন না। তারপর তারা তাঁর নিকট চলে গেলেন এবং আবু বকরের নিকট বয়’আত না করা পর্যন্ত ফিরে যাননি।

রেফারেন্সঃ মুসনাদে আহমদ, ফাজায়েলুস সাহাবা অধ্যায় ১/৩৬৪, মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ ৭/৪৩২, আল মুযাক্কার ওয়াত তাযকীর ১/৯১ ইবনু আবী আছিম, ইমাম বাজ্জারের সূত্রে আল ইস্তঈ’আব ৩/৯৭৫ ইবনু আব্দিল বার, তারীখে বাগদাদ ৬/৭৫ খতীবে বাগদাদ। প্রত্যেকের অভিন্ন সনদটি এইরূপ- محمد بن بشر ثنا عبيد الله بن عمر عن زيد بن أسلم عن أبيه به. শায়খ মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ (হাফি.) বলেছেন, وهذا إسناد صحيح এ সনদটি সহীহ

এবার ব্যতিক্রমী ও দুর্বল বর্ণনাগুলো নিম্নরূপ যেগুলোর মতন বা মূলপাঠ সূত্রের বিচারে অপ্রমাণিত,

. يقول البَلَاذُري (أحمد بن يحيى بن جابر البَلَاذُري البغدادي)ـ بعد لحادثة السقيفة المريرة ـ : إنّ أبا بكر أرسل إلى علي يريد البيعة، فلم يبايع، فجاء عمر و معه فتيلة، فتلقته فاطمة على الباب، فقالت فاطمة : يا ابن الخطاب أتراك محرقاً عليَّ بابي؟ قال : نعم، و ذلك أقوى فيما جاء به أبوك وجاء علي فبايع وقال : كنت عزمت أن لا أخرج من منزلي حتى أجمع يعني أحفظ القرآن

অর্থ- আহমদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে জাবের আল বালাজুরী আল-বাগদাদী বলেন, সাক্বীফায় সংঘটিত ঘটনার পর :- নিশ্চয়ই আবূবকর (রা.) বয়’আত গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে আলীর নিকট দূত প্রেরণ করেন। যেহেতু সে বয়’আত নেয়নি। ফলে উমর (রা.) একটি প্রদীপ সাথে নিয়ে (ফাতিমার বাড়ীর উদ্দেশ্যে) যাত্রা করেন। ফাতিমা তার সাথে বাড়ীর দরজায় দেখা করেন। তখন ফাতিমা জিজ্ঞেস করলেন, হে উমর! আপনি কি আমার দরজায় আগুল দিতে চাচ্ছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এটি আপনার পিতা যা নিয়ে এসেছেন তার চেয়েও ভারি। অত:পর হযরত আলী (রা.) বেরিয়ে আসেন এবং বয়’আত গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, আমি (মূলত) গৃহ থেকে বের না হবারই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যতক্ষণ না আমি কুরআন হিফয সম্পন্ন করছি। – আনসাবুল আশরাফ ২/১২, আল বালাজুরী। – দুর্বল

সম্পর্কিত তথ্যঃ ইমাম বালাজুরী (২৭০ হি.) এটি ‘আনসাবুল আশরাফ’ ২/১২-তে বর্ণনা করেছেন। বর্ণনার সনদের অভ্যন্তরীণ ক্রুটি হচ্ছে, সূত্র বিচ্ছিন্নতা। বর্ণনাকারীদের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হওয়া প্রমাণিত নয়। কেননা, এর সনদ হচ্ছে المدائني عن مسلمة بن محارب عن سليمان التيمي وعن ابن عون প্রথমতঃ এখানে মাসলামাহ বিন মাহারিব আয যিয়াদী আল কুফী সম্পর্কে রিজালশাস্ত্রের কিতাবগুলোয় জরাহ বা তা’দীল কোনো কথারই উল্লেখ নেই। তবে ইবনু হিব্বান তাকে সিকাহ’র অন্তর্ভুক্ত করেছেন। দ্বিতীয়তঃ সুলাইমান ইবনু তুরখান আত তাঈমী (سليمان ابن طرخان التيمي) এর মৃত্যু সন ১৪৩ হিজরী। কিন্তু সনদে উপরের দু’জনের মধ্যখানে ইনক্বিতা বা বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। অধিকন্তু মাসলামাহ বিন মাহারিব শুধুই হিজাজের রাবীগণ থেকে এবং উমর বিন আব্দুল আযীয থেকেই বর্ণনা করতেন (-আস সিক্বাত, ইবনু হিব্বান)। আর আব্দুল্লাহ ইবনু আ’ওন আল বছরী (وعبد الله بن عون أبو عون البصري) এর মৃত্যু সন বিশুদ্ধ মতে ১৫০ হিজরী। সুলাইমান এবং আব্দুল্লাহ কেউই ঘটনাটি সুনিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি, যদিও দু’জনই বিশ্বস্ত ছিলেন। ইমাম ইয়াহইয়া বিন সা’ঈদ আল কাত্তান বলেন, সুলাইমান ইবনু তুরখানের মুরসাল সন্দেহযুক্ত ও গুরুত্বহীন। আর তার শায়খ আল মাদাইনী যার পূর্ণ নাম-أبو الحسن علي بن محمد بن عبد الله الإخباري ; মৃত্যু সন ২২৪ হিজরী, তিনি হাদীস বর্ণনায় শক্তিশালী নন (ইবনু আদীর আল কামিল ৫/২১৩ দেখুন)। তবে লিসানুল মীযান গ্রন্থে ইবনু মা’ঈন থেকে তার তাওসীক্ব উল্লেখ আছে। ইমাম যাহাবীও তার বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন। যাইহোক, সর্বসাকুল্যে কথা হচ্ছে, বিশুদ্ধ বর্ণনার বিপরীতে ইমাম বালাজুরীর মুনকাতি সনদের এ বর্ণনার অতিরিক্ত অন্যান্য ঘটনা নির্ভরযোগ্য সনদে উত্তীর্ণ নয় বলে গ্রহণযোগ্য নয়।

এ ধরনের আরও কিছু দুর্বল বর্ণনা শব্দের কিছু পরিবর্তন সহ উল্লেখ রয়েছে, যেমন-

তারীখে তাবারী ৩/২০২।

‘আল ই’কদুল ফারীদ, ইবনু আব্দি রাব্বিহি আল উন্দুলুসী ৫/৩১। সংক্ষেপে।

সম্পূর্ণ লিখাটির সোর্স শায়খ মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ (হাফি.) এর Islamqa.info এ সাইট থেকে সংগৃহীত

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

কাদিয়ানীর নবুওয়ত একটি ব্রিটিশ পরিকল্পনা,

কাদিয়ানীর লেখিত বিভিন্ন বই পুস্তক থেকে হুবহু অনুবাদ সহ তার উত্থানের ঐতিহাসিক বিবরণ,

উনিশ শতকে যখন ব্রিটিশ শক্তি ভারত দখল করে নেয়, তখন স্বাধীনতা সংগ্রামের ইমাম হযরত শাহ মুহাদ্দেসে দেহলবী ফতোয়া দিয়েছিলেন, ভারত দারুল হরব এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ ফরজ। যার ফলশ্রুতিতে পুরো ভারতবর্ষে স্বাধীনতা সংগ্রামের লেলিহান শিখা জ্বলে ওঠে। এ জাতির আলেমসমাজ এবং স্বদেশের মুজাহিদগণ জীবন মুঠোয় নিয়ে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রতিটি মোড়ে প্রতিটি রণক্ষেত্রে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী ভল্লুকদের সাহসিকতার সঙ্গে তারা রুখে দাঁড়ান। এটা সত্য, ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুসলমান মুজাহিদগণ হেরে গেছেন। এ কারণে তারাই সাম্রাজ্যবাদী অমানবিক পৈশাচিক নির্যাতনের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। তবে তাঁদের জিহাদি প্রেরণা কমে যায়নি কখনো। ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলেছে অহর্নিশ।

ইংরেজদের বাজদৃষ্টি মুজাহিদগণের আত্মায় পোষিত এই অগ্নিবিপ্লবের কথা সচেতনভাবেই জানতো।  মুসলমান বিপ্লবীদের হৃদয় মৃত্তিকায় চাপাপড়া জিহাদের লেলিহানের কথা তারা জানত। এও জানত, যেকোনো সময় তা অগ্নিলাভার রূপ নিতে পারে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাজানো মঞ্চকে খাক করে দিতে পারে। এ ভয় থেকেই তারা ‘দলাদলি সৃষ্টি করো এবং শাসন করো’- এর ফর্মুলা জন্ম দেয়। মুসলিম জাতির জিহাদি জোশ, বিশ্বাসিক শক্তি, ঈমানি পূর্ণতা, কুরআন  ও সুন্নতের প্রতি আকুল ভালবাসাকে চিরতরে ধ্বংস করে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদকে চির প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদে একজন ‘সরকারী নবী’ সৃষ্টির প্রকল্প হাতে নেয়। বিষয়টি পরে ব্রিটিশ কমিশনের একটি প্রতিবেদন থেকে প্রতিভাত হয়ে ওঠে।

১৮৬৯ সালে স্যার উইলিয়াম হান্টারের নেতৃত্বে ইংরেজগোষ্ঠী ভারতবর্ষে একটি কমিশন দল প্রেরণ করেন। ইংরেজদের সম্পর্কে মুসলমানদের মনোভাব যাচাই এবং ভবিষ্যতে মুসলমানদের কিভাবে শেষ করে দেয়া যায়, তার একটা বাস্তব পরিকল্পনা তৈরিই ছিল এই কমিশনের লক্ষ্য। এই লক্ষ্যে তারা এক বছর ধরে এখানে থেকে মুসলমানদের বিভিন্ন অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে। ১৮৭০ সালে লন্ডনের ভয়েন্ট হাউজে একটি কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। তাতে কমিশনের প্রতিনিধিগণ ছাড়াও বিশেষভাবে ভারতবর্ষে নিযুক্ত মিশনারী পাদ্রিগণও অংশগ্রহণ করেন। উভয় দল ভিন্ন ভিন্নভাবে রিপোর্ট পেশ করেন। এ রিপোর্টটি পরে ‘দি এরাইভল অফ ব্রিটিশ অ্যাম্পায়ার ইন ইন্ডিয়া’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। স্যার উইলিয়াম হান্টার তার প্রতিবেদনে লিখেছেন, “মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস হলো, কোনো বিদেশি শাসনের অধীনে বেঁচে থাকার সুযোগ নেই। তাই বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে জিহাদ করা অত্যাবশ্যক। জিহাদের এই মর্মবাণীর প্রতি তাদের অন্তরে রয়েছে উত্তাল আকুলতা। তারা জিহাদের জন্য সদা প্রস্তুত থাকে। তাদের এই মনোভাব যে কোনো সময় তাদেরকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে।”

এ দিকে পাদ্রী সম্প্রদায় তাদের রিপোর্টে বলছে,

  • Report of missionary fathers.
  • majority of the population of the country blindly follow their press their Spritual leaders at this stage. we succeed in finding out would be ready to daclare himself a Zilli Nabi (apostolic prophet). then the large number of people will relly round him. but for this puopose, it is very difficult to persuade someone from the Muslim masses. if this problems solved, the prophethood of such a pesson can flourish under the patronage of the government. we have already over powered the native government mainly persuing policy of seeking help from the traitors. that is a deffitary point of view, now when we have sway over every nook of the country and there is peace and order everywhere, we ought to undertake measure which might create internal unrest among the country. [Extact from the printed report India office library, London]
  • “রাষ্ট্রের অধিবাসীদের অধিকাংশই ধর্মীয় নেতাদের অন্ধ অনুসরণ করে। এক্ষেত্রে যদি আমরা এমন কাউকে খুঁজে বের করতে পারি, যে এই কাজের জন্য প্রস্তুত হবে; নিজেকে ‘ছায়ানবী‘ হিসেবে ঘোষণা করবে। তাহলে একটি বিরাট জনগোষ্ঠী তার পাশে জড়ো হবে। কিন্তু এই লক্ষ্য সাধনের জন্য সাধারণ মুসলমানদের কাউকে উৎসাহিত করা কঠিন। যদি এই সমস্যা সমাধান হয়, তাহলে এই ব্যক্তির নবুওয়াতের বিষয়টিকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এগিয়ে নেয়া যায়। আমরা ইতিপূর্বে গাদ্দারদের সহযোগিতায় ভারতের শাসকদের প্রজা বানিয়েছি। কিন্তু সে ছিল ভিন্ন বিষয়। তখন সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে গাদ্দারদের প্রয়োজন ছিল। এখন যখন রাষ্ট্রের সকল প্রান্তে আমাদের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বহমান; তখন আমাদের এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে যাতে রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।” [প্রিন্টেড রিপোর্ট, ইন্ডিয়া অফিস লাইবেরি, লন্ডন ]

এই রিপোর্টের আলোকে আমরা ব্রিটিশ পরিকল্পনাটি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি। মূলত এই পরিকল্পনার অধীনেই ব্রিটিশ প্রশাসন শীয়াদের মধ্য থেকে মির্যা হুসাইন আলী নূরীকে (যিনি বাহাউল্লাহ নামে প্রসিদ্ধ) আর সুন্নীদের মধ্য থেকে মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে স্বপ্রণীত নবুয়তের স্টেজে দাঁড় করিয়ে দেয়। মির্যা কাদিয়ানীর তৎপরতাগুলো সামান্য খুঁটিয়ে দেখলেই আমরা সহজে এই বিশ্বাসে উপনীত হতে পারব যে, কাদিয়ানীর নবুওয়াত ব্রিটিশদের তৈরি, তাদের হাতেই লালিত হয়েছে এবং বেড়ে উঠেছে তাদেরই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। আর এ কথা স্বয়ং কাদিয়ানীও তার বিভিন্ন রচনায় স্বীকার করেছে। যেমন, লক্ষ করুন!

বৃটিশ রাণী ভিক্টোরিয়াকে এক চিঠিতে লিখেছেন,

“হে মহামহিম ভারত সম্রাজ্ঞী! আপনার মহিমা এবং সুনাম মুবারক হোক! খোদার দৃষ্টি (তথা করুণা) সে দেশের উপরই রয়েছে, যে দেশের উপর রয়েছে আপনার দৃষ্টি, খোদার রহমত (তথা সাহায্য) সে জনতার উপরই রয়েছে যে জনতার উপর রয়েছে আপনার হাত (তথা হুকুমত)। আপনার পবিত্র নিয়ত (আকাঙ্খা) এর ফলশ্রুতিতেই আল্লাহ আমাকে (রূপক ‘মসীহ’ বানিয়ে) প্রেরণ করেছেন।” (সেতারায়ে কায়সারিয়া, রূহানী খাযায়েন ১৫/১২০, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী)।

কাদিয়ানী তার এ লিখায় অকপটে বলেই দিয়েছে যে, আল্লাহ নাকি তাকে বৃটিশ রাণীর পবিত্র নিয়ত (আকাঙ্খা) এর ফলশ্রুতিতেই দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন।” প্রামাণ্য স্ক্যানকপি দ্রষ্টব্য।

পাঞ্জাবের লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে এক আর্জিতে লিখেছেন,

“নিজেদের হাতে রোপিত এই চারাগাছটির ব্যাপারে খুব সতর্কতা ও অনুসন্ধানের সাথে অগ্রসর হবেন এবং আপনার অধীনস্তদের বলবেন তারা যেন এই পরিবারের ত্যাগ ও নিষ্ঠার কথা মনে করে আমার দলের প্রতি সদয় দৃষ্টি জ্ঞাপন করেন। আমাদের পরিবার ইংরেজ সরকারের কল্যাণে নিজেদের খুন বইয়ে দিতে ও জীবন দিতেও দ্বিধা করেনি আর না এখনো দ্বিধা করছে।” (মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত ৩/২১-২২; নতুন এডিশন)।

আরেকটি রচনায় লিখেছেন,

“আমার (ধর্ম)মত এটাই যা আমি প্রতিবার প্রকাশ করে থাকি তা হল, ইসলামের দুটি অংশ। একটি হল খোদাতালার আনুগত্য করা আর দ্বিতীয়টি হল, এই (ব্রিটিশ) সরকারের আনুগত্য করা যে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করেছে এবং জালেমদের হাত থেকে আপনা ছায়ার নিচে আশ্রয় দিয়েছে। সেটি হল ব্রিটিশ সরকার।” (রূহানী খাযায়েন ৬/৩৮০)।

আরেক জায়গায় লিখেছেন,

“আমার জীবনের অধিকাংশই এই ইংরেজ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা আর সহযোগিতার মধ্যেই অতিবাহিত হয়েছে। আমি জিহাদ নিষিদ্ধ করে ইংরেজ সরকারের আনুগত্যের উপর এই পরিমাণ কিতাব (পুস্তক) রচনা করেছি এবং (এত অধিক পরিমাণ) প্রচারপত্র প্রকাশ করেছি যদি ঐ পত্রাবলী এবং পুস্তকগুলি একত্রিত করা হয় তাহলে তা দ্বারা ৫০টি আলমারি ভর্তি হয়ে যাবে। আমি এই সমস্ত কিতাব তামাম আরব, মিশর, সিরিয়া, কাবুল এবং রোম (ইউরোপ-ইতালি) দেশেও পৌঁছে দিয়েছি। আমার সদাসর্বদা প্রচেষ্টা এটাই থাকে যে, মুসলমানরা যেন এই (ইংরেজ) সরকারের প্রকৃত খয়েরখাঁ হয়ে যায় এবং খুনি মাহদী এবং খুনি মসীহ সংক্রান্ত ভিত্তিহীন বর্ণনাসমূহ এবং জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধকারী সমস্ত মাসয়ালা তাদের অন্তরসমূহ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় যেগুলো আহাম্মকদের অন্তরসমূহ খারাপ করে দিয়েছে।” (রূহানী খাযায়েন ১৫/১৫৫-৫৬)।

তিনি অন্য একটি রচনায় লিখেছেন,

“আমি বিশ বছর পর্যন্ত ইংরেজ সরকারের প্রতি আনুগত্যের শিক্ষাই দিয়ে যাচ্ছি। আমি আমার মুরিদদের মাঝে এই হিদায়াতই (নির্দেশনা) জারি রেখেছি। তাহলে কিভাবে সম্ভব হতে পারে যে, আমি এই সমস্ত হিদায়াতের বিপরীতে কোনো প্রকারের সরকার-দ্রোহী অভিসন্ধির শিক্ষা দিচ্ছি! অথচ আমি জানি যে, আল্লাহতালা স্বীয় খাস অনুগ্রহে এই সরকারকেই আমার এবং আমার জামাতের আশ্রয়স্থল বানিয়েছেন। এই সরকারের ছায়াতলে আমাদের জন্য যে নিরাপত্তা অর্জিত সেটি না মক্কা শরীফে রয়েছে আর না মদীনায় আর না রোম সম্রাটের কনস্টানটিনোপলের সিংহাসনেও।” (রূহানী খাযায়েন ১৫/১৫৬)।

আরেকটি রচনায় লিখেছেন,

“আমি ইংরেজ সরকারের যে সেবা করেছি তা হলো, এ দেশে এবং অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রে প্রায় পঞ্চাশ হাজার বই পুস্তক এবং প্রচারপত্র ছাপিয়ে বিতরণ করেছি। এ সব রচনায় আমি বলেছি, ইংরেজ সরকার আমাদের মুসলমানদের কল্যাণকামী বন্ধু। তাই ইংরেজ সরকারের নিষ্ঠাপূর্ণ আনুগত্য প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ।” (সেতারায়ে কায়সারিয়া-৪, রূহানী খাযায়েন ১৫/১১৪, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী)।

সুতরাং নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে যে, কাদিয়ানীর কথিত নবুওয়ত ব্রিটিশ সরকারেরই একটি পরিকল্পিত প্রজেক্ট। ব্রিটিশরাই নিজেদের ক্ষমতা টিকানোর উদ্দেশ্যে তাকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে দাঁড় করিয়েছিল। একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিকের পক্ষেও কখনো সম্ভব নয় যে, দখলদার বিদেশীদের দখলদারিত্বের পক্ষে জীবন উৎসর্গ করা, পঞ্চাশটি আলমারি ভর্তি লিখনী দিয়ে সাহায্য করা। কাজেই তার মাহদী, মসীহ কিংবা ‘ছায়ানবী’ ইত্যাদি দাবীসমূহ বাতুলতা আর ভেল্কিবাজি ছাড়া আর কিছুই না।

মির্যা গোলাম আহমদের নবুওয়ত দাবী প্রকৃত অর্থেই, রূপক বা ভিন্ন অর্থে ছিলনা

মির্যায়ী রচনাবলী থেকে তথ্যপ্রমাণ সহ নিম্নরূপ,

নবী ও রাসূল দাবী

আমার দাবী, আমি নবী এবং রাসূল। (দৈনিক আল হাকাম ৫ই মার্চ ১৯০৭ইং, মালফুযাত ১০/১২৭ পুরাতন এডিশন, ৫/৪৪৭ নতুন এডিশন)।

শোনো! প্রত্যেক আহমদী এ বিশ্বাসে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, সেই পবিত্র, মহৎ ও ধর্মভীরু ব্যক্তিত্ব যাকে অনেকে মির্যা কাদিয়ানী বলে থাকে, তিনি আল্লাহর মনোনীত একজন নবী। (নবুওয়ত ও খেলাফত ১৭, আহমদীয়া মুসলিম জামা’ত, বকশিবাজার ঢাকা)।

আল্লাহর আদেশ মোতাবেক আমি একজন নবী। আমি এই দাবী অস্বীকার করলে আমার পাপ হবে। (আখবারে আ’ম ২৬ মে ১৯০৮ ইং, নবুওয়ত ও খেলাফত ৭৬)।

তিনিই সত্য খোদা যিনি কাদিয়ানে তার রাসূল প্রেরণ করেছেন। (দাফেউল বালা ১২, রূহানী খাযায়েন ১৮/২৩১ মির্যায়ী রচনাসমগ্র যা ২৩ খণ্ডে প্রকাশিত)।

আমি একজন রাসূলও এবং নবীও অর্থাৎ আমি প্রেরিত হয়েছি এবং খোদার পক্ষ থেকে আমি গায়েবের সংবাদ প্রাপ্তও। (একটি ভুল সংশোধন, রূহানী খাযায়েন ১৮/২১১)।

যারা একজন সম্মানিত রাসূলকে গ্রহণ করল না, তারা ধ্বংস হয়ে গেছে। ভাগ্যবান সে যে আমাকে চিনতে পেরেছে। আমি খোদার সকল পথের শেষ পথ। আমি তার সকল নূরের শেষ নূর। দুর্ভাগা সে যে আমাকে প্রত্যাখ্যান করল। কারণ, আমি ছাড়া সব অন্ধকার। (কিশতিয়ে নূহ, রূহানী খাযায়েন ১৯/৬১)।

আমি সে খোদার নামে কসম করে বলছি যার হাতে আমার প্রাণ, তিনিই আমাকে পাঠিয়েছেন এবং তিনিই আমার নাম নবী রেখেছেন। (হাকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন ২২/৫০৩)।

এতে কি সন্দেহ যে, আমার ভবিষ্যৎবাণীগুলোর পর দুনিয়াতে ভূমিকম্প ও অন্যান্য আপদ-বিপদ একের পর এক শুরু হওয়া আমার সত্যতার একটি নিদর্শন। মনে করা উচিত, পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে আল্লাহর রাসূলকে অস্বীকার করলে তখন অন্য অপরাধীদেরও পাকড়াও করা হয়। (হাকীকাতুল ওহী উর্দূ ১৬১)।

খোদাতালা কাদিয়ানে এই ধ্বংসাত্মক মহামারী থেকে রক্ষা করবেন। কেননা এটা তাঁর রাসূলের রাজধানী। (দাফেউল বালা ১০)।

তিনি (অর্থাৎ গোলাম আহমদ) নবী। আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেই সকল শব্দে নবী বলেছেন, যে সকল শব্দ দ্বারা কুরআন ও হাদীসে পূর্ববর্তী নবীদের আখ্যায়িত করা হয়েছে। (হাকীকাতুন নবুওয়ত ৭০, মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ)।

মির্যা কাদিয়ানীর পুত্র এবং কাদিয়ানীদের দ্বিতীয় খলীফা মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ (মৃত. ৭ই নভেম্বর ১৯৬৫ ইং) লিখেছেন,

  • اگر میرے گردن کے دونوں طرف تلوار بھی رکھ دی جائے اور مجھے کہا جائے کہ تو یہ کہو کہ آنحضرت صلی اللہ علیہ وسلم کی بعد کوئی نبی نہیں آئےگا تو میں اس سے کہوں گا کہ تو جھوٹا ہے اور کذاب ہے آپ کے بعد نبی آسکتے ہیں اور ضرور آسکتے ہیں

অর্থ-“যদি আমার গর্দানের দুই পাশে তলোয়ারও ধরে রাখা হয় আর আমাকে বলতে বলা হয় যে, তুমি বল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর আর কোনো নবী আসতে পারেনা! তাহলে আমি অবশ্যই বলব যে, তুমি মিথ্যাবাদী ও মহা মিথ্যুক। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর নবী আসতে পারে, অবশ্যই আসতে পারে।” (আনওয়ারে খিলাফাত পৃষ্ঠা ৬৭, উর্দূ অনলাইন এডিশন, মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ)।

মির্যা বশির উদ্দীন একই গ্রন্থের আরেক জায়গায় পরিষ্কার লিখেছেন,

  • اور (انہیں) یہ سمجھ لیا جائے کہ خدا کے خزانے ختم ہوگی اس لئے کسی کو کچھ نہیں دے سکتا اسی طرح یہ کہتے ہیں کہ خواہ کتنا ہی زہد اور اتقاء میں بڑھ جائے پرہیزگاری اور تقوی میں کئی نبیوں سے اگے گزر جائے معرفت الہی کتنی ہی حاصل کر لے لیکن خدا اس کو کبھی نبی نہیں بنائے گا اور کبھی نہیں بنائے گا ان کا یہ سمجھنا خدا تعالی کی قدر کو ہی نہ سمجھنے کی وجہ سے ہیں ورنہ ایک نبی کیا میں تو کہتا ہوں ہزاروں نبی ہوں گے

অর্থ-“তারা মনে করছে যে, আল্লাহতালার ভাণ্ডার শেষ হয়ে গেছে, তাই তিনি (এখন) কাউকে কিছুই দেন না। তেমনিভাবে এও বলে যে, কোনো কেউ দুনিয়াবিরাগী এবং খোদাভীরুতায় ও তাকওয়া আর পরহেজগারীতে কতেক নবী অপেক্ষায় যতই অগ্রে পৌঁছে যায় না কেন, সে যত বেশিই খোদার মা’রেফত (দর্শন) লাভ করেনা কেন; কিন্তু খোদা তাকে কখনোই নবী বানাবেন না। তাদের এইরূপ মনে করার কারণ হচ্ছে খোদাতালার মর্যাদা বুঝতে না পারা। অন্যথা নবী শুধুই একজন কেন! আমি তো বলি, হাজার হাজার নবী হবেন।” (আনওয়ারে খিলাফাত পৃষ্ঠা ৬৪, উর্দূ অনলাইন এডিশন, মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ)।

কাদিয়ানীদের তথাকথিত দ্বিতীয় খলীফা মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ তাঁর পিতার “নবী” দাবীর বিষয়টিকে মূল্যায়ন করে লিখেছেন,

جب حضرت مسیح موعود نبی ثابت ہوگئے، ایسے ہی نبی جیسے دوسرے انبیاء علیہم السلام تو پھر ان کے بھی وہی حقوق ہیں جو دوسرے انبیاء کے ہیں-

অর্থাৎ হযরত মসীহ মওউদ (মির্যা সাহেব) যখন একজন নবী বলে সাব্যস্ত হয়ে গেল, ঠিক তেমনি একজন নবী; যেমন অন্যান্য নবীগণ, তখন তো উনার-ও অনুরূপ অধিকার থাকবে যেভাবে অন্যান্য নবীগণের রয়েছে। (কাদিয়ানীদের অফিসিয়াল উর্দূ পত্রিকা দৈনিক আল ফজল পৃ-১০ কলাম ৩, তারিখ ৩০-১২-১৯১৬ ইং)।

  • মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদের এ কথা থেকে প্রমাণিত হয়ে গেল যে, মির্যা কাদিয়ানী প্রকৃতপক্ষেই একজন “নবী” দাবীদার ছিল। অতএব, তার অনুসারীদের বিভিন্ন রচনা কিবা বক্তৃতায় সেটিকে “উম্মতি-বুরুজী-জিল্লি” শব্দে ব্যাখ্যা দিতে চাওয়া সুস্পষ্ট একটা ধোকা ও প্রতারণা। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং প্রশ্নবাণে আত্মরক্ষার হীন-কৌশল ছাড়া আর কিছুই না।

সুতরাং এতে কী সন্দেহ যে, প্রতিশ্রুত মসীহ কুরআন কারীমের অর্থ বিচারেও নবী এবং অভিধানের অর্থ বিচারেও নবী। (হাকীকাতুন নবুওয়ত ১১৬, মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ)।

অতএব ইসলামি শরীয়ত নবী শব্দের যে ব্যাখ্যা দেয় সে ব্যাখ্যা হিসেবে হযরত মির্যা সাহেব কিছুতেই রূপক নবী নন, বরং প্রকৃত অর্থেই নবী। (হাকীকাতুন নবুওয়াত ১৭৪, মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ)।

নবী হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে আমরাও মির্যা গোলাম আহমদকে পূর্ববর্তী নবীগণের মতোই নবী মনে করি। (হাকীকাতুন নবুওয়াত ২৯২, মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ)।

১৯০১ সাল পর্যন্ত মির্যা সাহেবের ধারণা ছিল যে, আমার নবুওয়ত অপূর্ণাঙ্গ ও খণ্ডিত, যেন তিনি ছায়ানবী। কিন্তু ১৯০১ সালে আল্লাহর ওহী তাকে মনোযোগী করে যে, তার নবুওয়ত অপূর্ণাঙ্গ কিংবা খণ্ডিত নয়, বরং তার নবুওয়ত ঠিক সেই রকম যেমন ছিল পূর্ববর্তী সকল নবীর। এই ওহীর পর তার আকীদা পরিবর্তন হয়ে যায়। পরে তিনি আর নিজের নবুওয়তকে অপূর্ণাঙ্গ ও খণ্ডিত বলেননি। (হাকীকাতুন নবুওয়াত ১২০, মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ)।

১৯০১ সালের পূর্বের যেসব উদ্ধৃতিতে তিনি নবী হওয়াকে অস্বীকার করেছেন, এখন তা রহিত হয়ে গেছে এবং সেগুলো থেকে প্রমাণ উপস্থাপন করা এখন ভুল। (হাকীকাতুন নবুওয়াত ১২১, মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ)।

পূর্বেও তাকে নবী নামে ডাকা হতো। কিন্তু তিনি তার ব্যাখ্যা করতেন। এরপর আল্লাহ তায়ালা যখন বারবার ইলহামের মাধ্যমে তাকে নবী বলে ডাকছিলেন, তখন তিনি উপলব্ধি করলেন যে, আসলে তিনি নবীই, অন্য কিছু নন। যেমনটি পূর্বে মনে করতেন। নবী শব্দটি যা তার ইলহামে ব্যবহৃত হত তা একেবারেই দ্ব্যর্থহীন ও স্পষ্ট, ব্যাখ্যার সুযোগ নেই। (হাকীকাতুন নবুওয়ত ১২৪, মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ)।

  • লিখক, মুহাম্মদ নূরুন্নবী এম.এ
  • কাদিয়ানী মতবাদ বিশেষজ্ঞ

কওমী মাদরাসার চাঁদা ও চামড়া কালেকশনে সিস্টেমেটিক সংস্কার সময়ের দাবী

বর্তমানে ক্বওমী মাদরাসাগুলো জনগণের সাহায্য সহযোগিতায় চলার যে পদ্ধতিটা দেখা যাচ্ছে এটা মূলত আমাদের আকাবিরদের তরীকার বিপরীত। দেওবন্দে কালেকশনের জন্য আলাদা মুহাসসিল আছে। এটা উস্তাদ ছাত্রের কাজ নয়।

আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে উস্তাদ ছাত্ররা এটা আঞ্জাম দেয়। কোরবানির সময় ছাত্রদের দিয়ে চামড়া কালেকশন করার বিষয়টা সব সময় আমাদের বিবেকে বাঁধে, আমাদেরকে পীড়া দেয়। একই বাড়ির সামনে ছাত্র-উস্তাদ দাঁড়িয়ে আছেন চামড়ার জন্য, ভিক্ষুক দাঁড়িয়ে আছে গোশতের জন্য। বাড়িওয়ালা ভিক্ষুকদেরও ধমকাচ্ছে, ছাত্র-শিক্ষকদেরও ধমকাচ্ছে। বাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়ার ঘটনাও তো আমাদের সামনেই ঘটেছে। এমন দৃশ্যগুলো আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। এছাড়াও আরও কত লাঞ্ছনাকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। তা তো আমরা নিজ চোখেই দেখেছি। আবার অল্প সময়ে ভালো পরিমাণ অর্থ আয় হওয়াতে কমিটির লোকেরা এটা কোনোভাবেই বন্ধ করতে সম্মত হয় না। তাছাড়া রমজান মাসে কালেকশনের জন্য শিক্ষকদের বাধ্য করাও আমাদের মাদরাসাগুলোতে বিচিত্র নয়। সে কালেকশন করতে গিয়ে তাদের মান-মর্যাদা ঠিক থাকবে কিনা তা দেখার যেন কেউ নেই।

হযরত থানবী (রহ.) এর বক্তব্য ছিল, কোনো ছাত্র তো নয়; কোনো শিক্ষকও কালেকশন করতে যাবে না। এমনকি যদি এর জন্য মাদরাসার সংখ্যা কমে যায়, তাও দীনের জন্য ভালো। তাই আমরা আমাদের এখানে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছি যেন ছাত্র-শিক্ষক সকলেরই ইজ্জত সুরক্ষিত থাকে। কালেকশনের জন্য তারা মানুষের বাড়ি-বাড়ি যাবে না। চামড়ার কালেকশন করবে না। এমনিভাবে উস্তাদরাও রমজানে যাকাত কালেকশনের জন্য রশিদ বই নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করবে না।

হ্যাঁ, নিজের ইজ্জত রক্ষা করে যতটুকু করা যায় তা করবে। পারলে করবে, না পারলে না করবে। কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থনৈতিক বিষয়টা আমরা সামনে রেখে তা’লীম গ্রহণে আসলাফ ও আকাবিরের যে চেতনা ও পদ্ধতি ছিল তা আবার ফিরিয়ে আনার চিন্তা করেছি। অর্থাৎ ইলম হাসিলের পথে ছাত্র তার সাধ্যমত খরচ করবে। যেমন সালাফের যামানায় ইলম হাসিলের যাবতীয় খরচ শিক্ষার্থী নিজে বহন করত। কারও কারও জীবনীতে পাওয়া যায়, বাবার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পদের পুরোটাই ইলমের পথে ব্যয় করে দিয়েছেন।

তাই আমাদের চিন্তা হল প্রতিষ্ঠান নয়; শিক্ষার্থী নিজেই নিজের খরচ বহন করবে। সাধারণত আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ম হল, নির্ধারিত নম্বর পেলে মাসিক প্রদেয় মওকুফ হয়ে যায়। কিন্তু এই ফিকির সামনে রেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিই, মাসিক প্রদেয় ফ্রি হওয়ার সম্পর্ক থাকবে সামর্থ্যের সাথে, নম্বরের সাথে নয়। নম্বর বিবেচ্য হবে কেবল ভর্তির ক্ষেত্রে। নম্বর পেলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে, না হয় না।

এর অর্থ এই নয় যে, এখানে কেবল ধনীরাই সুযোগ পাবে। ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবার জন্য অবারিত সুযোগ থাকবে। তবে প্রত্যেকেই সাধ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে; স্বচ্ছলতা নেই বলে সে কিছুই দিবে না- এমন যেন না হয়। যে যতটুকু পারে ততটুকুই দিবে, বাকিটুকু প্রতিষ্ঠান বহন করবে। খরচ করতে অভ্যস্ত হওয়া ইলমের জন্য যেমন দরকার তেমনি দরকার নিজের ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য। এই অভ্যাস না থাকলে ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। একজন লোক যত বড়ই হোক যদি অন্যকে দেওয়ার অভ্যাস তার মাঝে গড়ে না উঠে, কেবল গ্রহণ করেই সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে কোনদিন তার মানসিকতা বড় হয় না। তার প্রতি মানুষের ভক্তি-শ্রদ্ধা জন্মায় না। মানুষ তাকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখে না। তাই সমাজে সে কোনো প্রভাবও রাখতে পারেনা, সে গলে যায় অর্থবিত্তের সামনে। এজন্য কেবল যোগ্যতাই যথেষ্ট নয়, যোগ্যতার ব্যবহারের জন্য এই ব্যক্তিত্বকেও ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

  • আল্লামা আবুল বাশার সাইফুল ইসলাম হাফিজাহুল্লাহ।
  • শাইখুল হাদীস : জামিয়াতুল উলূমিল ইসলামিয়া৷
  • মুহাম্মাদপুর, ঢাকা৷

লিখক, মুহাম্মদ নূরুন্নবী এম এ, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

কাদিয়ানী মতবাদের পোস্টমর্টেম

প্রশ্নোত্তরে কাদিয়ানী মতবাদের অসারতা সহজ সরল ভাবে নিচে বুঝিয়ে দেয়া হল,

কাদিয়ানীবন্ধুঃ

ঈসা এবং মাহদী কি একই ব্যক্তি হবেন, নাকি ভিন্ন ব্যক্তি হবেন?

এর উত্তর হচ্ছে, যদি কুরআন থেকে প্রমাণিত হয় হযরত ঈসা (আ.) মারা গিয়েছেন, তার মানে হচ্ছে সেই বনী ইসরাইলী ঈসা (আ.) আর কখনো পৃথিবীতে আসবেন না। কুরআন থেকে প্রমাণিত যে, বনী ইসরাঈলী ঈসা মারা গেছেন। তাই তাঁর দ্বিতীয়বার আগমনের কোনো সুযোগ নাই (কাদিয়ানীদের বক্তব্য)।

সরল উত্তরঃ

পবিত্র কুরআনের নামে এগুলো কাদিয়ানীদের জঘন্য মিথ্যাচার। কারণ ইসলামের গত চৌদ্দশত বছরেও এধরণের দাবী কোনো বরেণ্য যুগ ইমাম, ফকীহ, মুফাসসির, মুহাদ্দিস কেউই করেননি। সুতরাং এধরণের দাবী ও মতবাদ সম্পূর্ণ বাতিল ও বিদয়াতি মতবাদ। সত্যের সাথে যার লেশমাত্র সম্পর্কও নেই। বরং অসংখ্য আয়াতে ঈসা (আ.)-এর পুনরায় আগমনী ইংগিত থাকা প্রমাণিত, উম্মতে মুহাম্মদীয়ার ইজমাও এর উপর বিদ্যমান যে, মরিয়ম পুত্র হযরত ঈসা (আ.)-এর পুনঃআগমন অকাট্য সত্য এবং এ বিশ্বাস ইসলামে তাওয়াতূর স্তরীয় বিশ্বাস।

এখন কাদিয়ানীদের মতে, কুরআন দ্বারা বনী ইসরাঈলী ঈসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গেছেন বলে প্রমাণিত হলে, তখন পবিত্র কুরআন থেকে এ কথাও প্রমাণ করে আমাদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, কুরআনে ঈসা (আ.)-এর আসার যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা হতে কাদিয়ানের চেরাগ বিবির পুত্র মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীই উদ্দেশ্য। কেননা মির্যা গোলাম আহমদ নিজেই তার আরেক রচনায় স্বীকার করে লিখেছেন,

اب ثبوت اس بات کا کہ وہ مسیح موعود جس کے آنے کا قران کریم میں وعدہ دیا گیا ہے یہ عاجز ہی ہے

অর্থ-“এখন একথা সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, পবিত্র কুরআনে যেই মসীহ মওউদের আসার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে সে এই অধমই।” (রূহানী খাযায়েন ৩/৪৬৮)।

স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য

উল্লেখ্য, মির্যা কাদিয়ানীর ৮৩টি রচনার সমষ্টি ২৩ খণ্ডে প্রকাশিত রূহানী খাযায়েন, যার বাংলা অর্থ- আধ্যাত্মিক ভাণ্ডার।

কাদিয়ানীবন্ধুঃ

হযরত রসূল করীম (সা.) ঈসা (আ.) এর অবতরণের কথা বলেছেন। এর মানে হল, শেষ যুগে যিনি আগমন করবেন তিনি ঈসা (আ.)-এর সদৃশ হবেন। এর সমাধান তিনি নিজেই বলে গেছেন। হাদিসে উল্লেখ আছে,

((لاَ يَزْدَادُ الأَمْرُ إِلاَّ شِدَّةً وَلاَ الدُّنْيَا إِلاَّ إِدْبَارًا وَلاَ النَّاسُ إِلاَّ شُحًّا وَلاَ تَقُومُ السَّاعَةُ إِلاَّ عَلَى شِرَارِ النَّاسِ وَلاَ الْمَهْدِيُّ إِلاَّ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ))

অর্থাৎ, দিনে দিনে বিপদাপদ বৃদ্ধি পেতেই থাকবে। দুনিয়াতে অভাব অনটন ও দুর্ভিক্ষ বাড়তেই থাকবে। কৃপণতা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে। নিকৃষ্ট লোকদের উপর কিয়ামত সংঘটিত হবে। মাহদী ঈসা ইবনে মরিয়ম ব্যতিরেকে অপর কেউ নন। (ইবনে মাজাহ, বাবু শিদ্দাতিয্যামান, হাদীস নং-৪০৩৯)। অতএব, যিনি ঈসা তিনিই মাহদী।

সরল উত্তরঃ

বর্ণনাটি সহীহ নয়। সর্বসম্মত ইমামগণের মতে এর সনদ বা সূত্র খুবই দুর্বল ও মুনকার (মেরকাত শরহে মেশকাত, কিতাবুল ফিতান ১০/১০১, মোল্লা আলী ক্বারী)। ইমাম মিজ্জি (রহ.) এর সনদে উল্লিখিত ‘মুহাম্মদ বিন খালিদ আল জানাদী’ (محمد ابن خالد الجندى) নামক বর্ণনাকারী সম্পর্কে লিখেছেন, সে অপরিচিত এবং মাতরূক তথা পরিত্যাজ্য। দেখুন, তাহযীবুল কামাল : খণ্ড নং ২৫ পৃষ্ঠা নং ১৪৬; রাবী নং ৫১৮১)। ইমাম শাওক্বানী (রহ.) বলেন, ইমাম সাগানী আল হিন্দী-الصغانى (মৃত. ৬৫০ হি.) ‘তাযকিরাতুল মওযূ’আত’ কিতাবে (১/২২৩) লিখেছেন, এ হাদীস জাল তথা বানোয়াট (আল ফাওয়ায়েদুল মাজমু’আহ-الفوائد المجموعة ১/৫১০)।

মজার ব্যাপার হল, মির্যা কাদিয়ানী নিজেও তার রচনায় স্বীকার করে লিখে গেছেন যে, এর সনদ খুবই দুর্বল, ফলে এর উপর নির্ভর করা যাবেনা। দেখুন, হামামাতুল বুশরা (বাংলা অনূদিত) পৃষ্ঠা নং ১৬১। তাছাড়া যুগ ইমামগণ বর্ণনাটির “ওয়া লাল মাহদী ইল্লা ঈসা”-((وَلَا الْمَهْدِىْ اِلَّا عِيْسَى بْنُ مَرْيَمَ)) উপবাক্যটির অর্থ করেছেন ((مَعْنَاهُ وَ لَا مَهْدِىٌّ كَامِلُ اَوْ مَعْصُوْمُ اِلَّا عِيْسَى ابْنُ مَرْيَمَ)) ‘তখন ঈসা ইবনে মরিয়ম ব্যতীত নিষ্পাপ বা পরিপূর্ণ সুপথপ্রাপ্ত আর কেউ নন1।’ এ অনুবাদ করেছেন, ইমাম কুরতুবি, ইমাম ইবনুল কাইয়ুম এবং ইবনে কাসীর প্রমুখ। দেখুন, আল আহাদীসুয য’ঈফাহ ১/৮৯, শায়খ আলবানী।

মজার ব্যাপার হল, মির্যা গোলাম কাদিয়ানী তার রচনার এক জায়গায় লিখেছেন, ((آنحضرت صلی اللہ علیہ وسلم بھی مہدی تہے)) অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সা.)ও ‘মাহদী’ ছিলেন। দেখুন, রূহানী খাযায়েন খণ্ড নং ১৪, পৃষ্ঠা নং ৩৯৪। সুতরাং বুঝা গেল, আক্ষরিক অর্থে শুধু ঈসা (আ.) কেন, বরং যে কোনো সুপথপ্রাপ্ত পুরুষকেও ‘মাহদী’ শব্দে সম্বোধন করা যেতে পারে। তাতে সবাইকে একই ব্যক্তি বুঝাবেনা। যাইহোক, সর্বশেষ কথা হচ্ছে, বর্ণনাটি ‘সহীহ’ মানলেও কাদিয়ানীদের যে শিক্ষা ও মতবাদ সে ধরনের কোনো কিছুই এর দ্বারা ইংগিতেও প্রমাণিত হয় না।

কাদিয়ানীবন্ধুঃ

রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ((يُوْشِكُ مَنْ عَاشَ مِنْكُمَ اَنْ يَلْقَى عِيْسَى بْنَ مَرْيَمَ إِمَامًا مَهْدِيًّا وَحَكَمًا عَدَلًا فَيَكْسِرُ الصَّلِيْبَ وَيَقْتُلُ الْخِنْزِيْرَ وَيَضَعُ الْجِزْيَةَ وَتَضَعُ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا))

অর্থঃ “তোমাদের মধ্যে তখন যারা জীবিত থাকবে তারা ঈসা ইবনে মরিয়মকে ইমাম মাহদী হিসেবে পাবে যিনি শাসক ও ন্যায় বিচারক হিসেবে আগমন করবেন। এরপর তিনি ক্রুশ ধ্বংস করবেন, শূকর হত্যা করবেন এবং জিযিয়া বা যুদ্ধকর বন্ধ করবেন আর তখন অস্ত্রযুদ্ধ রহিত হবে।” (মুসনাদ আহমদ বিন হাম্বল, হাদীস নং ৯০৬৮, প্রকাশনা: দারূল আহহীয়াউত্তুরাস আল আরাবী, বৈরুত, লেবানন)।

সরল উত্তরঃ

হাদীসটি সহীহ, তবে এটিও কাদিয়ানীদের শিক্ষা ও মতবাদকে ইংগিতেও সমর্থন করেনা। কেননা, হাদীসটিতে পরিষ্কার শব্দে وَيَضَعُ الْجِزْيَةَ অর্থাৎ ঈসা (আলাইহিস সালাম) এসে ‘যুদ্ধকর’ রহিত করবেন, উল্লেখ আছে। জ্ঞানীদের জানা আছে যে, যুদ্ধকর রহিত করার এ সক্ষমতা বেসামরিক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। বরং এ ধরনের সক্ষমতা শুধুই রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী প্রশাসনিক ব্যক্তির-ই রয়েছে। কাজেই এ হাদীসটিও অকাট্য ইংগিত দিচ্ছে যে, আগমনকারী ঈসা হতে প্রকৃত ঈসা ইবনে মরিয়মই উদ্দেশ্য, যিনি আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত হবেন এবং যথাসময়ে উম্মাহার নেতৃত্বে থেকে রাষ্ট্র ক্ষমতা লাভ করবেন এবং রাসূল (সা.)-এর ফরমান অনুযায়ী তিনি রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করে “যুদ্ধকর” স্থগিত করবেন।

বলে রাখা জরুরি যে, মির্যা গোলাম আহমদ সারা জীবনে মেম্বার চেয়ারম্যান হতে পারা তো দূরের কথা, তিনি কোনোদিন সর্বনিম্ন “গ্রাম সরকার” বা চকিদার-ও ছিলেন না। সুতরাং এ হাদীস জীবন গেলেও তার সাথে খাপ খাবেনা।

এবার হাদীসটির সঠিক অনুবাদ জেনে নিইঃ

রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন,

((يُوْشِكُ مَنْ عَاشَ مِنْكُمَ اَنْ يَلْقَى عِيْسَى بْنَ مَرْيَمَ إِمَامًا مَهْدِيًّا وَحَكَمًا عَدَلًا فَيَكْسِرُ الصَّلِيْبَ وَيَقْتُلُ الْخِنْزِيْرَ وَيَضَعُ الْجِزْيَةَ وَتَضَعُ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا))

অনুবাদঃ “তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে তারা অবশ্যই অচিরেই মরিয়ম পুত্র ঈসার সাথে মিলিত হবে, যিনি একজন ন্যায়বিচারক এবং সুপথপ্রাপ্ত নেতা হবেন, তিনি ক্রুশ চূর্ণ করবেন, শুয়োর হত্যা করবেন, যুদ্ধকর রহিত করবেন, এবং ধর্মযুদ্ধ তার সমস্ত যুদ্ধ-সরাঞ্জাম ভারমুক্ত করবে।”

এখানে হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে বিশেষণমূলক (মুরাক্কাবে তাওসীফী) যৌগিক উপবাক্য ((إِمَامًا مَهْدِيًّا)) অর্থ- “একজন সুপথপ্রাপ্ত ইমাম”। কাদিয়ানীরা এর ব্যকরণ-বিরুদ্ধ অনুবাদ তো করেই, তার উপর অপব্যাখ্যা দিয়ে বলে যে, এতে নাকি এটাই বুঝানো উদ্দেশ্য যে, ঈসা আর ইমাম মাহদী দু’জন মূলত একই। নাউযুবিল্লাহ। মূর্খতারও একটা সীমা থাকা দরকার। আফসোস! এ নির্বোধরা এতই বেপরোয়া যে, একই ধরণের আরো যত বিশেষণমূলক হাদীস রয়েছে তারা সেগুলোর উদ্দেশ্য নিয়ে একদমই চিন্তা করেনা।

যেমন, হযরত জারির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন ((ﻭَإجْعَلْهُ هَادِيًا مَهْدِيًّا)) অর্থাৎ হে আল্লাহ আপনি তাকে “একজন সুপথপ্রাপ্ত হিদায়াতকারী” বানিয়ে দিন (বুখারী কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার)।

তারপর হযরত মু’আবিয়া (রা.) সম্পর্কেও বলা হয়েছে যে, ((اَللَّهُمَّ إجْعَلْهُ هَادِيًا مَهْدِيًّا وَ إهْدِ بِهِ)) অর্থাৎ হে আল্লাহ আপনি তাঁকে “একজন সুপথপ্রাপ্ত হিদায়াতকারী” বানিয়ে দিন আর তার মাধ্যমে [মানুষকে] হিদায়াত দান করুন। (তিরমিযী কিতাবুল মানাকিব)।

তদ্রুপ হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে আরেকটি হাদীসে এসেছে ((إِمَامًا عَادِلاً وَ قَاضِيًاً)) “তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ ও বিচারক ইমাম…”। দেখুন, ইমাম আবু বকর আশ-শাফেয়ী (মৃত ৩৫৪ হিজরী) সংকলিত, আল ফাওয়ায়িদুশ শাহীর বিল গাইলানিয়াত : হাদীস নং ৭৯৩ ও ৮২৪।

এখন প্রশ্ন হল, তবে কি রাসূল (সা.) জারির ইবনে আব্দুল্লাহ আর হযরত মু’আবিয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) তাঁদের দু’জনকেও প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদী বুঝালেন?

হাদীসটিকে অপরাপর সহীহ হাদীসগুলোর সাথে মিলিয়ে পড়ার পর পাঠকের নিকট পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, হাদীসটিতে ঈসা (আ.)-কে শুধু আক্ষরিক অর্থেই ‘মাহদী’ আখ্যা দেয়া হয়েছে। যার দরুন হযরত ফাতেমা (রা.)-এর বংশ থেকে আসন্ন শেষ যুগের প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদীর ধারণা বাতিল হয়ে যাবেনা। কারণ, আক্ষরিক অর্থে আবুবকর, উমর, উসমান এবং আলীকেও রাসূল (সা.) একত্রে ‘আল-মাহদিয়্যীন’ ((فعليكم بسُنَّتي وسُنَّةِ الخُلَفاءِ الرَّاشِدينَ المَهْدِيِّينَ)) বলেছেন। দেখুন, তিরমিযী শরীফ, কিতাবুল ইলম হা/২৬৭৬, সনদ সহীহ। আর সে হিসেবে তথা আক্ষরিক অর্থে শুধু ঈসা (আ.) নয়, বরং সকল নবী-ই ছিলেন ‘মাহদী’ তথা সুপথপ্রাপ্ত। আশাকরি, উত্তর পেয়েছেন।

কাদিয়ানীবন্ধুঃ

রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন,

كَيْفَ أَنْتُمْ إِذَا نَزَلَ ابْنُ مَرْيَمَ فِيكُمْ وَإِمَامُكُمْ مِنْكُمْ

অর্থ “তোমাদের অবস্থা তখন কেমন হবে, যখন ইবনে মরিয়ম তোমাদের মধ্যে আবির্ভূত হবেন এবং (তিনি) তোমাদের মধ্য হতে তোমাদের ইমাম হবেন (কাদিয়ানী অনুবাদ)।” (বুখারী-৩৪৪৯, মুসলিম, কিতাবুল ঈমান-২৮৩)।

সরল উত্তরঃ

কাদিয়ানীদের অনুবাদে নিকৃষ্ট তাহরিফ (বিকৃতি) রয়েছে। অথচ সঠিক অনুবাদ হচ্ছে,

“তোমাদের অবস্থা তখন কেমন (আনন্দের) হবে, যখন ইবনে মরিয়ম তোমাদের মধ্যে নাযিল হবেন আর তোমাদের ইমাম (মাহদী) তোমাদেরই মধ্য থেকে হবেন (ফাতহুল বারী, ইবনু হাজার আসকালানী রহ.)।” (বুখারী-৩৪৪৯, মুসলিম, কিতাবুল ঈমান-২৮৩)।

সরল উত্তরঃ

এ হাদীসটি বরং কাদিয়ানীদের শিক্ষা ও মতবাদেরই সম্পূর্ণ বিরোধী। প্রথমতঃ তার কারণ, হাদীসটিতে “ইবনু মরিয়ম” বলা হয়েছে। যার অর্থ- মরিয়মের পুত্র। কিন্তু মির্যা গোলাম আহমদের মায়ের নাম ছিল চেরাগ বিবি। সুতরাং মিললো না।

দ্বিতীয়তঃ এ হাদীসের ((ابْنُ مَرْيَمَ فِيكُمْ وَإِمَامُكُمْ مِنْكُمْ)) উপবাক্যটি পরিষ্কার বলছে যে, ইমাম মাহদী এবং ঈসা ইবনে মরিয়ম দু’জনই শেষযুগে পৃথিবীতে সমসাময়িক হবেন। সহীহে বুখারীর উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) ফাতহুল বারী গ্রন্থে বিভিন্ন হাদীসবিদগণের উদ্ধৃতির পরিপ্রেক্ষিতে জোরালো যে মতটিকে সুস্পষ্ট করে গেছেন তা হচ্ছে, হাদীসটির ((وَإِمَامُكُمْ مِنْكُمْ)) “আর তোমাদের ইমাম তোমাদেরই মধ্য হতে হবেন” এর দ্বারা ইমাম মাহদীকেই বুঝানো উদ্দেশ্য। (ফাতহুল বারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া হাদীস নং ৩৪৪৯)।

ইবনে মাজাহ’র দাজ্জাল সম্পর্কিত আবূ উমামাহ’র দীর্ঘ হাদীসে এসেছে,

((كُلُّهُمْ أَىْ الْمُسْلِمُوْنَ بِبِيْتِ الْمُقَدَّسِ وَ اِمَامُهُمْ رَجُلٌ صَالِحٌ قَدْ تَقَدَّمَ لِيُصَلِّى بِهِمْ, اِذْ نَزَلَ عِيْسَى فَرَجَعَ الْاَمامُ يَنْكُصُ لِيَتَقَدَّمَ عِيْسَى, فَيَقِفُ عِيْسَى بَيْنَ كَتِفَيْهِ ثُمَّ يَقُوْلُ: تَقَدَّمْ فَاِنَّهَا لَكَ اُقِمَتْ))

অর্থ- “মুসলমানগণ বায়তুল মুকাদ্দাসে (সালাতের জন্য অপেক্ষা রত) থাকবে। তখন তাদের ইমাম থাকবেন জনৈক নেককার ব্যক্তি। তিনি তাদের সালাত পড়ানোর জন্য সামনে অগ্রসর হবেন। এমতাবস্থায় হঠাৎ (তারা দেখতে পাবে) ঈসা অবতরণ করছেন। ফলে ইমাম সাহেব পেছনে সরে আসবেন যাতে ঈসা সামনে অগ্রসর হন। হযরত ঈসা তাঁর কাঁধের মাঝখান বরাবর এসে দাঁড়াবেন, তারপর (ইমামকে) বলবেন ‘আপনিই অগ্রসর হোন, ইক্বামত আপনার জন্যই দেয়া হয়েছে’। ইমাম আবুল হাসান আল খাস’ঈ আল আবিদী ‘মানাকিবে শাফেয়ী’ গ্রন্থে বলেন, মুতাওয়াতির ভাবে বহু হাদীস বর্ণিত আছে যে, নিশ্চয়ই ঈসা (আ.) এই উম্মতের (ইমাম) মাহদীর পেছনেই সালাত আদায় করবেন। তিনি এটি ইবনে মাজাহ’র হাদীসে আনাস থেকে বর্ণিত [মুনকার রেওয়ায়েত] ((وَلَا مَهْدِيّ إِلَّا عِيسَى)) “ঈসা ব্যতীত আর কোনো মাহদী নেই” (কাদিয়ানী অনুবাদ)-এরই রদ করার উদ্দেশ্যে উল্লেখ করেছেন।

ইমাম আবূ ঝার আল হারাভী বলেন, ইমাম আল যাওযাকী কোনো কোনো মুতাকাদ্দিমীনের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ((وَإِمَامكُمْ مِنْكُمْ)) “তখন তোমাদের ইমাম তোমাদেরই মধ্য থেকে হবেন” এ কথার অর্থ হচ্ছে, তিনি (ঈসা) পবিত্র কুরআন দিয়েই রাষ্ট্রপরিচালনা করবেন, ইঞ্জিল কিতাব দিয়ে নয়। ইমাম ইবনে তীন বলেন, ((وَإِمَامكُمْ مِنْكُمْ)) এর অর্থ ((أَنَّ الشَّرِيعَةَ الْمُحَمَّدِيَّةَ مُتَّصِلَةٌ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامِ وَ أَنَّ كُلَّ قَرْنٍ طَائِفَةٌ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ فِي الخ)) “নিশ্চয়ই শরীয়তে মুহাম্মদীয়া কেয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে এবং প্রতি শতাব্দীতে আহলে ইলমগণ থেকে একটি দল (তার সেবায়) বিদ্যমান থাকবে”। ফাতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী। (অনুবাদ সমাপ্ত হল)।

এখন হয়ত কাদিয়ানীবন্ধু বলবে যে, আগত ঈসা একজন “রূপক ঈসা”। কাজেই, হাদীসটির “ইবনু মরিয়ম” বলতেও “রূপক মরিয়ম পুত্র” উদ্দেশ্য! কিন্তু কাদিয়ানীবন্ধুরা হয়ত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর বইগুলো খেয়াল করে পড়লে জানার কথা যে, তিনি নিজেই তার একটি রচনায় লিখেছেন,

“রাসূল (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর ভিত্তিতে কসম খেয়ে যা বলেছেন তার ব্যতিক্রম কীভাবে হতে পারে? এই ক্ষেত্রে এই কসমটি সাব্যস্ত করছে প্রদত্ত সংবাদটি বাহ্যিক অর্থেই পূর্ণ হবে এর রূপক অর্থ করা যাবেনা আর কোনো ব্যতিক্রমও হবেনা। আর যদি তাই হয় তাহলে কসম খেয়ে কী লাভ? অতএব অনুসন্ধিৎসু ও গবেষকের ন্যায় চিন্তা করে দেখ।” দেখুন, হামামাতুল বুশরা (বাংলা অনূদিত) পৃষ্ঠা নং ২৭।

কি বুঝলেন?…. কসমটি সাব্যস্ত করছে প্রদত্ত সংবাদটি বাহ্যিক অর্থেই পূর্ণ হবে এর “রূপক” অর্থ করা যাবেনা!

এখন যিনি নিজেই “রূপক” অর্থ করা যাবেনা বলছেন তাকেই আপনারা কসম সম্বলিত হাদীসের আলোকে আপনারা “রূপক” মসীহ বলে চিৎকার করতেছেন! এটা কি নিজের আক্বল ও বিবেকের সাথে ঠাট্টা মশকরা করা নয়?

এ দেখুন, কসম বা শপথ বাক্য সহকারে বর্ণিত সহীহ বুখারীর হাদীসটি অর্থ সহ,

সহীহ বুখারী (ইফা), অধ্যায়ঃ ৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আ.) (كتاب أحاديث الأنبياء), হাদীস নম্বরঃ ৩২০৫, ((حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ، أَخْبَرَنَا يَعْقُوبُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، حَدَّثَنَا أَبِي، عَنْ صَالِحٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، أَنَّ سَعِيدَ بْنَ الْمُسَيَّبِ، سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏’‏ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَيُوشِكَنَّ أَنْ يَنْزِلَ فِيكُمُ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَدْلاً، فَيَكْسِرَ الصَّلِيبَ، وَيَقْتُلَ الْخِنْزِيرَ، وَيَضَعَ الْجِزْيَةَ، وَيَفِيضَ الْمَالُ حَتَّى لاَ يَقْبَلَهُ أَحَدٌ، حَتَّى تَكُونَ السَّجْدَةُ الْوَاحِدَةُ خَيْرًا مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا ‏’.‏ ثُمَّ يَقُولُ أَبُو هُرَيْرَةَ وَاقْرَءُوا إِنْ شِئْتُمْ ‏(‏وَإِنْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلاَّ لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكُونُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا‏)‏‏.‏))

অনুবাদঃ ‘ইসহাক (রহ.) … আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, কসম সেই সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ, অচিরেই তোমাদের মাঝে মরিয়মপুত্র ঈসা (আ.) শাসক ও ন্যায় বিচারক হিসেবে অবতরণ করবেন। তিনি ‘ক্রুশ’ ভেঙ্গে ফেলবেন, শুয়োর মেরে ফেলবেন এবং তিনি জিজিয়া (রাষ্ট্রীয় কর) পরিসমাপ্তি ঘটাবেন। তখন সম্পদের স্রোতে বয়ে চলবে। এমনকি কেউ তা গ্রহণ করতে চাইবে না। তখন আল্লাহকে একটি সিজদা করা সমগ্র দুনিয়া এবং তার মধ্যকার সমস্ত সম্পদ থেকে বেশী মূল্যবান বলে গণ্য হবে। এরপর আবূ হুরায়রা (রা.) বলেন, তোমরা ইচ্ছা করলে এর সমর্থনে এ আয়াতটি পড়তে পারঃ কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে তাঁর [ঈসা (আ.) এর] মৃত্যুর পূর্বে তাঁকে বিশ্বাস করবেই এবং কিয়ামতের দিন তিনি তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবেন। (সহীহ বুখারী, হা/৩২০৫; ঈসা ইবনে মরিয়ম নাযিল হওয়া শীর্ষক পরিচ্ছেদ)।

হাদীসটির শুরুতেই কসম বা শপথ বাক্যটি আরেকবার দেখুন,

“রাসূল (সা.) বলেছেন, কসম সেই সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ, অচিরেই তোমাদের মাঝে মরিয়মপুত্র ঈসা (আ.) শাসক ও ন্যায় বিচারক হিসেবে অবতরণ করবেন।”

এখন এর কী উত্তর?

(লিখাটির উপর কারো কোনো মন্তব্য থাকলে তা মন্তব্যের জায়গায় লিখুন)

  1. আহাদীসুয যু’ঈফাহ শায়খ আলবানী রহ. খ ১ পৃ ৮৯, আল কওলুল মুখতাসার, ইবনু হাজার আল হাইতামী পৃ-৩২ ↩︎

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক
প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
Principal NurunNabi
তাং ১৫/০৬/২৪

যার নেক নিয়ত পূর্ণ করতেই মির্যা কাদিয়ানী দুনিয়ায় আসলেন

প্রশ্ন : মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর ভাষ্যমতে তার দুনিয়ায় আগমন কার আকাঙ্খা পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে ছিল?

উত্তর : তদানীন্তন সময়কার প্রতাপশালী ব্রিটিশ নারী ভিক্টোরিয়ার আকাঙ্খা পূর্ণ করার উদ্দেশ্যেই ছিল তার দুনিয়ায় আগমন। এ সম্পর্কে মির্যা কাদিয়ানীর ভাষায় নিচে খেয়াল করুন, তিনি লিখেছেন-

اے بابرکت قیصرۂ ہند تجھے یہ تیری عظمت اور نیک نامی مبارک ہو۔ خدا کے نگاہی اس ملک پر ہیں جس پر تیری نگاہی ہیں۔ خدا کی رحمت کا ہاتھ اس رعایا پر ہے جس پر تیرا ہاتھ ہے تیری ہی پاک نیتوں کی تحریک سے خدا نے مجھے بھیجا ہے۔

“হে মহামহিম ভারত সম্রাজ্ঞী! আপনার মহিমা এবং সুনাম মুবারক হোক! খোদার দৃষ্টি (তথা করুণা) সে দেশের উপরই রয়েছে, যে দেশের উপর রয়েছে আপনার দৃষ্টি, খোদার রহমত (তথা সাহায্য) সে জনতার উপরই রয়েছে যে জনতার উপর রয়েছে আপনার হাত (তথা হুকুমত)। আপনার পবিত্র নিয়ত (তথা আকাঙ্খা) এর ফলশ্রুতিতেই আল্লাহ আমাকে (রূপক ‘মসীহ’ বানিয়ে) প্রেরণ করেছেন।”

রেফারেন্স : সেতারায়ে কায়সারিয়া, রূহানী খাযায়েন ১৫/১২০, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী

পরিশেষ : কাদিয়ানীরা বলে, মির্যা গোলাম আহমদ যুগের আকাঙ্খা পূর্ণ করতেই নাকি দুনিয়ায় এসেছিলেন। অথচ মির্যা গোলাম আহমদ লিখেছেন, তিনি রাণী ভিক্টোরিয়ার নেক নিয়ত ও আকাঙ্খা পূর্ণ করতেই দুনিয়ায় এসেছেন!

আমাদের প্রশ্ন, আমরা তাহলে কার কথা সত্য মেনে নেব?

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

এমদাদুস সুলুক গ্রন্থে নবীজীর ছায়া ও নূর এর তাৎপর্য সম্পর্কে

0

এমদাদুস সুলুক গ্রন্থের একটি ভুল সংশোধন ও সতর্কতা প্রসঙ্গে,

এমদাদুস সুলুক গ্রন্থে ‘নবী করীম (সা.)-এর ছায়া থাকা এবং তিনি আল্লাহর নূর দ্বারা সৃষ্ট – মর্মে দলীলবিহীন ও মনগড়া যত সব আকীদার উল্লেখ রয়েছে সেসব আকীদা থেকে আমি আল্লাহর নিকট পানাহ চাচ্ছি! কারণ আমি ‘আকীদা’ এর ক্ষেত্রে শুধুই কুরআন এবং সহীহ হাদীস অত:পর মাতুরিদি ধারার ব্যাখ্যামূলক আকীদারই একনিষ্ঠ অনুসারী। এর বিপরীতে কোনো ব্যক্তি কী বলল তা আমার নিকট কোনো গুরুত্ব রাখেনা। হোক সে ব্যক্তি মর্যাদা ও সম্মানে অনেক বড় জ্ঞানী, কুতুবে জামান কিংবা মুজাদ্দিদে দাওরান!

মূল আলাপে আসা যাক,

মওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহিমাহুল্লাহ। একজন সমসাময়িক বিজ্ঞ স্কলার ও ফকীহ। আধ্যাত্মিক ধারার একজন বিখ্যাত পীর সাহেব। উনার অন্যতম রচনা ‘এমদাদুস সুলুক’। রচনাটি আধ্যাত্মিক কনসেপ্ট এর উপরই রচিত। এর মূল ভাষা ফার্সী, সেটিকে উর্দূতে ভাষান্তর করেছেন মওলানা আশেক ইলাহী মিরাঠি।

আমি এখানে বইটির উর্দূ এডিশন এর ২০১ এবং ২০২ নং পৃষ্ঠা থেকে বাংলায় অনুবাদ করে দিচ্ছি। পাঠকবৃন্দ খুব ভালো করে উর্দূর সাথে আমার অনুবাদটি মিলিয়ে নেবেন। এখানে যে বিষয়টির আলোকপাত করতে চাচ্ছি সেটি হচ্ছে, মওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী সাহেবের একটি আকীদা, যা তিনি সম্পূর্ণ মনগড়া ব্যাখ্যার আলোকে চিত্রিত করে গেছেন। তিনি লিখেছেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছায়া ছিলনা, তিনি আরও লিখেছেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিনি আল্লাহর নূর দ্বারা সৃষ্টি হন এবং তাঁর নূর দ্বারা মুমিনগণ সৃষ্টি হন। অথচ তিনি এর সমর্থনে কোনো দলীল প্রমাণ উল্লেখ করেননি, কোনো নির্ভরযোগ্য হাদীস থেকে কিছুই উদ্ধৃত করেননি। যদিও বা একজন কুতুবে জামান খ্যাত, দারুলউলুম দেওবন্দের শীর্ষস্থানীয় একজন মান্যবর আলেম এবং ফকীহ থেকে এধরণের দলীল বিহীন ও মনগড়া আকীদা কেউই আশা করেনা, করতে পারেনা।

আমি একজন হানাফী মাযহাবের ফলোয়ার ও মাতুরিদি ধারার ব্যাখ্যামূলক আকীদার অনুসারী। সে হিসেবে আমি মওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী সাহেবের উক্ত আকীদার সমর্থন না হানাফী মাযহাবের স্বীকৃত কোনো কিতাবে পেয়েছি, আর না মাতুরিদি ধারার ব্যাখ্যামূলক আকীদার কোনো কিতাবে পেয়েছি, কোথাও পাইনি। বরং নির্ভরযোগ্য অসংখ্য হাদীসের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক হিসেবেই দেখতে পাই। অথচ একথা কারোরই অজানা নয় যে, কুরআন এবং বিশুদ্ধ হাদীসের বিপরীতে শুধুমাত্র দুর্বল রেওয়ায়েত কিংবা উম্মাহার প্রধান প্রধান ইমামগণের নিজেস্ব মত দ্বারা আকীদার কোনো বিষয় কখনোই সাব্যস্ত হয়না।

এবার রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী সাহেবের কিতাব থেকে হুবহু অনুবাদ তুলে ধরছি। যাতে উম্মাহ তাঁর মত একজন বিশিষ্ট ফকীহ ও আল্লামার নিজেস্ব মত ও বক্তব্য দ্বারা বিভ্রান্ত না হন। মওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী লিখেছেন,

প্রামাণ্য স্ক্যানকপি সহ এখানে

(এমদাদুস সুলুক পৃ-২০১ থেকে শুরু) আল্লাহ তায়ালা পরিষ্কার ভাষায় বলেন, ((قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى)) অর্থাৎ নিশ্চয়ই সে ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে নিজের নফসের তাযকিয়া ও পরিশুদ্ধি করেছে। (সূরা আ’লা আয়াত ১৪)।

অর্থাৎ মোজাহাদার তরবারি দ্বারা নফসের কামনা বাসনার কদার্যতা কেটে ফেলেছে। উল্লেখ্য সায়ের ও পরিভ্রমনের কারণে মানুষের নফস আলোকিত হয়ে যায়। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা আপন হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে বলেছেন, ((قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ)) অর্থাৎ নিঃসন্দেহে আল্লাহতালার পক্ষ থেকে নূর ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে। (সূরা মায়েদা আয়াত ১৫)। এখানে ‘নূর’ দ্বারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম-এর পবিত্র সত্তা উদ্দেশ্য।

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ((يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا وَدَاعِيًا إِلَى ٱللَّهِ بِإِذْنِهِۦ وَسِرَاجًا مُّنِيرًا)) অর্থাৎ হে নবী! নিশ্চয়ই আমি আপনাকে একজন সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা, ভয়প্রদর্শনকারী, আল্লাহর দিকে তারই নির্দেশে আহ্বানকারী এবং সিরাজাম মুনীরা তথা আলোকবর্তিকা প্রদীপ স্বরূপ বানিয়ে প্রেরণ করেছি (সূরা আহযাব আয়াত ৪৬)।

‘মুনীর’ অর্থ আলোকদাতা। যিনি অন্যকে আলো প্রদান করেন। যদি অন্যকে আলোকিত করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব হতো, তাহলে এ যোগ্যতা ও কামাল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভেতরে পাওয়া যেত না। কারণ তিনি তো আদম সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আপন সত্তাকে এত পুতঃপবিত্র বানিয়ে নিয়েছিলেন যে, নির্মল নূরে পরিণত হয়েছিলেন। পরন্তু আল্লাহতালাও তাঁকে ‘নূর’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রসিদ্ধ মতে সাব্যস্ত আছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো ছায়া ছিল না। অথচ দেহ বলতেই তার ছায়া থাকে। কেবল নূরেরই কোনো ছায়া থাকে না। যেভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নূর বা আলোকবর্তিকা ছিলেন, তেমনিভাবে তাঁর অনুসারীদের অন্তরাত্মা ভালো করে তাদেরকেও নূরে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই তাদের কারামতের বর্ণনা দ্বারা কিতাব ভরপুর। এমনকি সেগুলো এত প্রসিদ্ধ যে, বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না।

আল্লাহতায়ালা বলেন, ((وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ نُورُهُمْ يَسْعَى بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ يَقُ)) অর্থাৎ যারা আমার হাবীবের প্রতি ঈমান এনেছে তাদের নূর তাদের সামনে এবং ডানে ছুটাছুটি করতে থাকবে। (সূরা তাহরীম আয়াত ৮)। আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন, ((يَوْمَ تَرَى ٱلْمُؤْمِنِينَ وَٱلْمُؤْمِنَٰتِ يَسْعَىٰ نُورُهُم بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَٰنِهِم)) অর্থ- স্মরণ কর সেদিনটি যেদিন মুমিন পুরুষ ও নারীদের দেখবে, তাদের নূর ছুটছে তাদের সামনে ও ডানে। (সূরা হাদীদ আয়াত ১২)।

(তারপর ‘এমদাদুস সুলুক‘ পৃ-২০২ থেকে শুরু) আল্লাহতালা আরো বলেছেন, ((يَوْمَ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انظُرُونَا نَقْتَبِسْ مِن نُّورِكُمْ)) অর্থ- ঐ দিনকে স্মরণ কর, যেদিন মুমিনদের নূর তাদের সামনে ও ডানে ছুটবে। মুনাফিকরা বলবে, একটু থামো! আমরাও তোমাদের আলো থেকে কিছু জ্যোতি নেব। (সূরা হাদীদ আয়াত ১৩)।

আলোচ্য আয়াতগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ দ্বারা ঈমান ও নূর উভয়টি সাধিত হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তায়ালা আপন নূর দ্বারা আমাকে সৃষ্টি করেছেন, আমার নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন সকল মুমিনকে।”

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ দোয়াও করেছেন, “আমার পরওয়ারদিগার! আমার কান, চোখ ও কলবকে নূর বানিয়ে দিন, বরং আমাকেই নূর বানিয়ে দিন।” যদি মানুষের নফস আলোকিত হওয়া অসম্ভব হতো, তাহলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ দোয়া কখনোই করতেন না। কেননা উলামায়ে কেরামের ঐক্যমতে অসম্ভব কাজের দোয়া করাও নিষেধ। হযরত আবুল হাসান নূরী (রহ.)-কে ‘নূরী’ বলার কারণ হচ্ছে, বহুবার তার থেকে নূর দেখা গিয়েছিল। এভাবে অসংখ্য আউলিয়া, সাধারণ ও শহীদের কবর থেকে নূর উঠতে দেখা যায়।

এটি মূলত তাঁদের পবিত্র আত্তারই ‘নুর’। কেননা যখন নফসের কাজ উচ্চাঙ্গের হয়ে যায়, তখন তার নূর সম্পূর্ণ শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর তা শরীরের মেজাজ ও স্বভাবে পরিণত হয়। এরপর যদি নফ্স শরীর থেকে আলাদাও হয়ে যায়, তবুও সে শরীর নূরের অনুরূপ উৎস ও কেন্দ্রস্থল থেকে যায়, যেমন ছিল জীবদ্দশায় নফস বাকি থাকা অবস্থায়।

(সম্পূর্ণ দুই পৃষ্ঠার অনুবাদ সমাপ্ত হল)

রেফারেন্সঃ এমদাদুস সুলুক (امداد السلوك ), ২০১-২০২, মূল লিখক মওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী, উর্দূ অনুবাদ মওলানা আশেক ইলাহী মিরাঠি।

শেষকথাঃ উপরে তার দীর্ঘ আলোচনা হতে আমি যা বুঝলাম তার আলোকে বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, মওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী সাহেব রাসূল (সা.)-কে ‘রূপকার্থেই নূর’ বলেছেন। নইলে তিনি একই লাইনের শেষাংশে ‘মুমিনগণ তাঁর নূর দ্বারা সৃষ্টি’ – একথার কোনো অর্থই থাকেনা। তিনি এ ক্ষেত্রে দলীল বিহীন আরেকটি কথা লিখেছেন যে, “প্রসিদ্ধ মতে সাব্যস্ত আছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো ছায়া ছিল না।” তাঁর উপস্থাপনার ধরণ থেকে দুটি বিষয়ের যে কোনো একটি খুবই পরিষ্কার। তা হচ্ছে,

১. ছায়া ছিল না – এটি তাঁর আকীদা ছিলনা। বড়জোর তিনি ‘প্রচলিত আকীদা’ অনুসারেই এটি উদ্ধৃত করেছিলেন মাত্র। যেহেতু তিনি কোনো নস তথা গ্রহণযোগ্য কোনো প্রমাণ ছাড়াই এটি লিখেছেন এমনকি কথার শুরুতেই ‘প্রসিদ্ধ মতে’- শব্দে শর্ত আরোপ করেছেন।

২. ছায়া ছিল না, এটি তাঁর নিজেস্ব আকীদা, আর একথাই বাস্তব বলে বুঝা যায়। যেহেতু তিনি রাসূল (সা.)-কে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে ‘নূর’ সাব্যস্ত করার ধারাবাহিকতায় ঐ কথাটুকু টেনে এনেছেন। আর শেষে লিখেছেন, “অথচ দেহ বলতেই তার ছায়া থাকে। কেবল নূরেরই কোনো ছায়া থাকে না।”

তিনি এটুকু বলেই কথা শেষ করেননি। বরং তিনি একই লাইনের শেষাংশে আরও লিখেছেন,

“যেভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নূর বা আলোকবর্তিকা ছিলেন, তেমনিভাবে তাঁর অনুসারীদের অন্তরাত্মা ভালো করে তাদেরকেও নূরে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।”

বলাবাহুল্য যে, মওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী সাহেব তাঁর ঐ কথা দ্বারা সাধারণদের মনে একটা প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেলেন। সেটি হচ্ছে, তাহলে কি একই যুক্তিতে রাসূল (সা.)-এর সকল অনুসারীর-ও ছায়া থাকেনা বলেই সাব্যস্ত হল না? অবশ্যই সাব্যস্ত হচ্ছে। নতুবা “তেমনিভাবে তাঁর অনুসারীদের অন্তরাত্মা ভালো করে তাদেরকেও ‘নূরে’ পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলেন”- তার এ কথার কী অর্থ?

আসলে মওলানা গাঙ্গুহী সাহেবের উপরিউক্ত কথাবার্তাগুলো শতভাগ আধ্যাত্মিক ও রূপকার্থেই ধর্তব্য ; নইলে তাঁর উক্ত কথাবার্তায় যে পরিমাণে অসঙ্গতি বিদ্যমান, তা বলাইবাহুল্য।

লিখক, মুহাম্মদ নূরুন্নবী এম.এ অ্যাডমিন ফিকহ মিডিয়া

তারিখ ১৫/০৫/২৪