Home Blog Page 35

আমি কোন দলের মুসলিম হব?

কোন মুসলিম দলে যোগ দিব? কোনটা সঠিক? নাস্তিক এবং কাদিয়ানীদের প্রশ্নের উত্তর!

প্লিজ, ধৈর্য্য সহকারে পুরোটা পড়ুন! না পড়ে কেউই লাইক/কমেন্ট করবেন না! ভালো লাগলে শেয়ার করুন! যাতে অনেক সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি দূর হয়!

লিখাটি সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে নাস্তিকরাই বেশি পোস্ট করে। তবে এটি কপি করে পোস্ট করতে দেখেছি অনেক কাদিয়ানীকেও। উভয়ের উদ্দেশ্য যে অভিন্ন তা যে কেউই বুঝতে পারে যদি মগজটা একটু খাটায়! আমি লিখাটি হুবহু এখানে তুলে ধরে সেটির জবাব দেয়ার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ। (লিখাটি নিচে উল্লেখ করছি)।

  • মনে করুন, আমি ইসলামধর্ম গ্রহণ করে মুসলিম হব কিন্তু আমি কোন মুসলিম হব? শীয়া মুসলিম, সুন্নি মুসলিম, হানাফি মুসলিম, হাম্বলি মুসলিম, শাফেঈ মুসলিম, মালেকি মুসলিম, আহলে হাদিস, আহলে সুন্নাত, তরিকত, হাকিকত, মারেফাত, চিশতিয়া, নকশেবন্দিয়া, দেওবন্দী, মাজার পূজারি, পীর পূজারি ইত্যাদি কোন মুসলিম দলে যোগ দিব। কোনটা সঠিক?

আর সংবিধান হিসেবে কোনটা গ্রহণ করবো বা মেনে চলবো? কোনটা সঠিক? প্রশ্নটা তাদের কাছে যারা নামের আগে আল্লামা, মওলানা, মুফাসসির, মুহাদ্দিস, শায়েখ, মাদানী, মাক্কি, পীর, সুফি, দরবেশ, সাধু অর্থাৎ যারা নিজেদের মহা পন্ডিত মনে করেন তাদের কাছে উত্তর চাই! (নাস্তিক আর কাদিয়ানিদের প্রশ্নটি সমাপ্ত হল)।

আমার জবাব,

প্রশ্নকারীকে আমার জিজ্ঞাসা, সত্যিই কি আপনি মুসলিম হতে চান? তাহলে নবী করীম (সা:)-এর যুগে, সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের যুগে যারা মুসলিম হয়েছিলেন আপনি অন্তত তাদের মত মুসলিম হয়ে যান। কেননা, সূরা বাকারা’র মধ্যে آمنوا كما آمن الناس -(অর্থাৎ তোমরা ঈমান আনয়ন করো যেরূপ এই লোকেরা ঈমান এনেছে) উল্লেখ আছে। এই আয়াত পরিষ্কার বলে দিচ্ছে, ঈমান আনতে হবে সাহাবায়ে কেরামের ন্যায়। ‘তাফসীরে তাবারী’ সহ সকল তাফসীরকারকের মতে, উক্ত আয়াতে الناس -(আন-নাস) হতে সাহাবায়ে কেরামের কথাই বুঝানো হয়েছে।

তাফসীরে তাবারী হতে ‘আন-নাস’ এর ব্যাখ্যা : عن ابن مسعود و عن ناس من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم অর্থ আয়াতে ‘আন-নাস’ দ্বারা মুহাম্মদ (সা:)-এর সাহাবীদের বুুুুুঝানোই উদ্দেশ্য। Click in here

আপনার প্রশ্ন ছিল, ‘কোন মুসলিম দলে যোগ দেব‘। কোনটা সঠিক?

উত্তরে বলব, আপনি সাহাবায়ে কেরামের ঈমান ও আমলের আদলে বর্তমানে যাদের ঈমান ও আমলের মিল দেখতে পাবেন আপনার উপর জরুরি হয়ে পড়বে তাদের দলে যোগ দেয়া। আশাকরি জবাব পেয়েছেন!

এবার হয়ত প্রশ্ন আসতে পারে, উপরে উল্লিখিত মুসলিম দলগুলোর কী হবে? তারা কি মুসলিম নন?

এর উত্তরে আমিও যদি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনি উল্লিখিত মুসলিম দলগুলোর মধ্যে আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয়পার্টি, এলডিপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জাসদ, বাসদ, গণফোরাম, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, জামাতে ইসলাম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, তরিকত ফেডারেশন, জাকের পার্টি, ইসলামিক ফ্রন্ট ইত্যাদি আরো যা যা আছে—তাদেরকেও কিজন্য অন্তর্ভুক্ত করলেন না? তবে কি আপনি এদেরকে মুসলিম মনে করেন না?

এখন হয়ত বলবেন, আরে ভাই এগুলো তো রাজনৈতিক দল! এগুলো কি ওগুলোর ভেতরে থাকার মত?

ধন্যবাদ আপনাকে। আপনার কথাতেই আসা যাক। তাহলে আপনি ওগুলোর মধ্যে হানাফি মুসলিম, হাম্বলি মুসলিম, শাফেঈ মুসলিম, মালেকি মুসলিম এগুলোও টানলেন কেন? এগুলো তো ভিন্ন ভিন্ন কোনো মুসলিম ফেরকা নয়! বরং এগুলো হচ্ছে, চারটা ফিকহি গবেষণা (মাযহাব) মাত্র। উল্লেখ্য, শরীয়তের ইখতিলাফি মাসয়ালায় গবেষক ইমামদের গবেষণামূলক ফতুয়াকে মাযহাব বলে। মাযহাব কিন্তু আরো বহু ছিল। তন্মধ্যে ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরি, দাউদে জাহেরি, ইমাম ইসহাক প্রমুখ এর মাযহাব অন্যতম। কিন্তু নানা কারণে ঐ চারটা মাযহাব প্রসিদ্ধি লাভ করেছে এবং উম্মতে মুসলিমার মধ্যে কুরআন হাদীসের পর অদ্যাবধি বলবৎ রয়েছে।

বলতে পারেন, আরে ভাই মাযহাব আবার কী? আমি বলব, আপনার সমস্যা তো এখানেই। আপনি তো মাযহাবই বুঝেন না! মাযহাব এর সংজ্ঞা কী? উৎপত্তি কখন থেকে এবং কিভাবে ও কেন? এসব পড়াশোনা ছাড়াই আপনি কিভাবে বুঝবেন যে, মাযহাব কী? সুতরাং এজন্য আপনার মত আমিও কি বলতে পারিনা যে, এমতাবস্থায় এগুলো কি ওগুলোর ভেতরে থাকার মত?

তারপর ওই একই কারণে আপনি ওগুলোর মধ্যে আহলে হাদিস, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত, তরিকত, হাকিকত, মারেফাত, চিশতিয়া, নকশেবন্দিয়া, দেওবন্দী ইত্যাদি এগুলোও টেনে আনতে পারেন না! তার কারণ, আহলে হাদীস এটি পবিত্র কুরআনের পর হাদীসের উপর আমল করার বিষয়ে জোরদার ভুমিকা পালনকারী মুসলিমদেরই একটি অংশ। এরা সালাফি কিংবা হাম্বলি মাযহাবের ফিকহের আদলে সৃষ্ট একটি আধুনিক মুসলিম জনগোষ্ঠী। যারা সব সময় শিরক বিদয়াতের বিরুদ্ধে আপোষহীন ও সদা তৎপর। ফলে এঁদের ভিন্ন ভাবে চিত্রায়িত করার কোনো সুযোগই নেই। সুতরাং এজন্য আপনার মত আমিও কি বলতে পারিনা যে, এমতাবস্থায় এগুলো কি ওগুলোর ভেতরে থাকার মত?

তারপর ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত‘ এর নামও দেখা যাচ্ছে। এখানে বলে রাখতে চাই, এই নামে বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক সংগঠনও রয়েছে। যারা ইসলামিক ফ্রন্ট (দলটির প্রতীক মোমবাতি – লিখক) নামেও আখ্যায়িত। এমতাবস্থায় এটিও একই বিচারে ওগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনা!

তারপর তরিকত, হাকিকত, মারেফাত, চিশতিয়া, নকশেবন্দিয়া ইত্যাদি এগুলো ইসলামের একটি বিভাগ তাসাউফ এর কয়েকটি পদ্ধতির ভিন্ন ভিন্ন নাম। যেমন বাংলাদেশ সরকারের অনেকগুলো মন্ত্রনালয়ের মধ্যে একটি মন্ত্রণালয় হল অর্থ-মন্ত্রনালয়। মনে করুন, তাসাউফটাও ইসলামের তেমনি একটি আত্মশুদ্ধি-মূলক বিভাগ। সেহেতু এটিও একই বিচারে ওগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনা! উল্লেখ্য, “তরিকত” আলাদা কিছু না, বরং তাসাউফ এরই একটি সংক্ষিপ্ত আরবী নাম।

তারপর ‘দেওবন্দী‘। এর ন্যায় আপনি আরো অনেক শব্দও উল্লেখ করতে পারতেন। তন্মধ্যে বেরলবি, ফুলতুলি, সোনাকান্দা, শরশীনা, জৈনপুরী, ফুরফুরা, আজানগাছি ইত্যাদি অন্যতম। এগুলো নামে ভিন্ন ভিন্ন হলেও মূলে সব একই। আকায়েদুল ইসলামিয়্যাহ এর ক্ষেত্রে এদের সবাই অভিন্ন মতানুসারী। ফলে ইসলামি স্কলারশিপদের পরিভাষায় এগুলো “মানহাজ” (MANHAJ) নামেই পরিচিত। যার সোজাসাপটা অর্থ, চয়েস বা শরীয়তসম্মত পছন্দনীয় পন্থা।

যেমন, কারো টুপি গোল, কারোটা উঁচা, কারো দুই কলি, কারোটা পাঁচ কলি, কারোটা হলুদ, কারো বা সবুজ ইত্যাদি। তবে হ্যাঁ, আকায়েদুল ইসলামিয়্যা এর মধ্যে যেসব বিষয়ে স্কলারশিপদের জন্য সালাফের নির্দেশিত পন্থায় সুস্পষ্ট দলিলের মাধ্যমে ভিন্ন মত পোষণ করার সুযোগ রয়েছে সেটি ভিন্ন কথা। যেমন, আল্লাহ হাজের। এর তাৎপর্য কারো মতে, আল্লাহ’র ইলম সর্বত্রে হাজির, জাত নয়। কারো মতে, এর তাৎপর্য হল, আল্লাহতায়ালা আপনা ক্ষমতাবলে আরশ সহ সৃষ্টি জগতের সর্বত্রে হাজির তা ঠিক, কিন্তু সেটির ধরণ কেমন তা আমাদের জানা নেই। বলে রাখা দরকার, কোনো ব্যক্তি বিশেষের নিজেস্ব ভুল আকীদা কখনো ইসলাম বা মুসলিম বিশ্বের উপর বর্তাবেনা।

যাইহোক, বলতে ছিলাম এর প্রত্যেকটি যদিও বা নামে ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু মূলে একই। যেমন উদাহরণ স্বরূপ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষকলীগ, শ্রমিকলীগ ইত্যাদি এগুলো নামে ভিন্ন ভিন্ন হলেও গোড়ায় সবাই আওয়ামীলীগ। কেননা আওয়ামীলীগ এর দলীয় গঠনতন্ত্রের বাহিরে এদের কেউই ব্যতিক্রম কোনো চেতনা বা চিন্তা লালন করেন না, করার সুযোগও নেই। এমতাবস্থায় এগুলোও একই বিচারে ওসবের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনা!

এরপর থাকল, মাজার পূজারি, পীর পূজারি। আরে জনাব! এগুলোও বুঝি টানতে গেলেন! ইসলামের কোন দলিলে মাজার বা পীর পূজাকে জায়েজ করা হল একটু বলবেন? জানি, বলতে পারবেন না। আসলে নাস্তিকদের কাজই হল যখন আশানুরূপ কোনো উপায় দেখেনা তখন এদিক-ওদিক থেকে ময়লা আবর্জনা যাই পাবে কুড়িয়ে এনে হলেও ইসলামের বদনাম করাই তাদের স্বভাব। এখানে মনে রাখতে হবে, মাজার জেয়ারত করা মানে পূজা নয়। আবার হাক্কানী পীরের হাতে তাসাউফ এর সবক নেয়াও পীর পূজা নয়। মনে রাখবেন, শব্দের অপব্যবহার করা খুবই অন্যায়।

তারপর বাকি থাকল “সুন্নি মুসলিম“। জ্বী হ্যাঁ, সুন্নী মুসলিম বলতে মুসলমানদের মূলধারার অনুসারীদেরই বুঝানো হয়ে থাকে। হাদীসের ما انا عليه و اصحابى -(নবীজী বলেন, আমি এবং আমার সাহাবীদের দল যেই মত ও পথে রয়েছি…তিরমিজি শরীফ, কিতাবুল ফিতান) শব্দেরই সংক্ষিপ্ত রূপ ‘সুন্নী মুসলিম’। যেটির দীর্ঘবাক্য, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত। হাদীসের উক্ত আবেদন মূলত পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত آمنوا كما آمن الناس -(অর্থাৎ তোমরা ঈমান আনয়ন করো যেরূপ এই লোকেরা ঈমান এনেছে) আয়াতেরই বহিঃপ্রকাশ। কাজেই, আপনাকে মুসলিম হতে হলে পবিত্র কুরআন আর হাদীসের নির্দেশনা মেনে অবশ্যই সুন্নী মুসলিমের মতই মুসলিম হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

তবে একটি কথা না বললেই নয়, তা হল এই ফেতনা ফাসাদের যুগে সুন্নী মুসলিমদের মধ্যে যে দলের ঈমান আমল আপনার বিচার-বিবেচনায় ما انا عليه و اصحابى -(মা আনা আলাইহি ওয়া আসহা-বী)-এর আদলে সুপ্রতিষ্ঠিত মনে হবে আপনার উচিত, সে দলের মুসলিমদের মধ্যে শামিল হয়ে যাওয়া। হোক সেটি দেওবন্দী, বেরলবি, আহলে হাদীস কিংবা সালাফি। মানে রাখবেন, এগুলোর প্রত্যেকটাই ইসলাম নামক ট্রেনের একেকটা বগি। আপনি যে বগিতেই থাকুন না কেন, গন্তব্যে অবশ্যই পৌঁছবেন। যদিও বা বগিগুলোর ক্লাস নিয়ে একটু বিশ্লেষণ আছে! কোনটা ফার্স্ট ক্লাস, কোনটা সেকেন্ড ক্লাস ইত্যাদি!

উল্লেখ্য, বর্তমানে সুন্নী মুসলিমরা চারটি মাযহাবে মিশে আছেন। ফলে আপনি দেওবন্দী, বেরলবি, আহলে হাদীস যেই হোন; আপনার আমল আকীদা অবশ্যই কোনো না কোনো মাযহাবের সাথে মিলে যাবেই। তার মানে মাযহাব বা মানহাজ কিংবা তাসাউফ এর কারণে মুসলিমরা শাখাগতভাবে ভিন্ন কোনো নামে চয়িত হলেও মৌলিকত্বের বিচারে এদের কেউই ইসলামের গন্ডি থেকে বহিষ্কৃত নন। সুতরাং ‘কোন মুসলিম দলে যোগ দেব’ প্রশ্নটিই বরং অবান্তর ও অজ্ঞতাবশত বৈ নয়।

এখন বাকি রইল, শীয়া। ঐতিহাসিকভাবে এর পেছনে একটা গুঢ় তাৎপর্য অবশ্যই রয়েছে। এরা ইসলামেরই একটি ফেরকা। এদের বিচারে এরাও সঠিক। তবে বর্তমানে এঁদের মধ্যে অনেক বেশি সংশোধনী এসেছে। তাদেরই চরমপন্থী রাফেজী (ইমামীয়া) যারা তাদের বাহিরে অন্যান্য শীয়া মতবাদের অনুসারীদের সাথে আহলে সুন্নাহ’র খুব বড় কোনো মতবিরোধ নেই। পাক মুফতীয়ে আজম মুফতি রফি উসমানী (রহ.) এঁদের মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত বলে মতামত দিয়েছেন। সেহিসেবে আমিও একজন সুন্নী মুসলিম হিসেবে বিশ্বাস করি যে, রাফেজি (ইমামীয়া) শীয়ারা যদিও ইসলামেরই অন্যতম একটি ফেরকা কিন্তু তারা আর যাইহোক না কেন, অন্তত ما انا عليه و اصحابى (আমি এবং আমার সাহাবীরা যে মত ও পথের উপর রয়েছে) এর আদলে সুপ্রতিষ্ঠিত মূলধারার মুসলিমদের বাহিরে। কেননা তাদের অন্যতম একটা মত হল, সাহাবায়ে কেরামের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অনুকরণযোগ্য নহে। ইত্যাদি। আশাকরি প্রশ্নকারী সঠিক ও যথাযথ উত্তর পেয়েছেন।

কাদিয়ানীদের উদ্দেশ্যে আমার জিজ্ঞাসা :

এই পর্যায়ে কাদিয়ানীদের জিজ্ঞেস করতে চাই, আপনারা অন্যদের মত যদি ইসলামী কোনাে ফেরকা কিংবা আহলে সুন্নাহর অন্তর্গত কোনাে মুসলিম হয়ে থাকেন তাহলে মির্যা কাদিয়ানীও কলেমা’র মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র মর্মার্থে শামিল—এমন কুফুরী কথাও আপনাদের ‘কালিমাতুল ফছল’ বইতে উল্লেখ থাকবে কেন? কিংবা মির্যা কাদিয়ানীকে ত্যাগ করার দরুন কোনাে ব্যক্তি মুরতাদ আখ্যায়িত হবে কেন?

ডকুমেন্ট সহ দেখতে ক্লিক করুন : ক্লিক

তাই অপ্রিয় হলেও সত্য, সাধারণ কাদিয়ানীদের বুঝে আসুক বা না আসুক, সত্য এটাই যে, কাদিয়ানীয়ত নতুন একটি ধর্ম। ফলে এটি ইসলামের কোনাে ফেরকারই অন্তর্ভুক্ত নয়। অতএব যারা এখনাে এই দলের অন্তর্ভুক্ত আছেন তাদের উচিৎ, আমার কথাগুলাে নিজ দায়িত্বে ও অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাচাই করে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করা। আল্লাহতালা সবাইকে বুঝার তাওফিক দিন।

কাদিয়ানীরা কম-বেশী বর্তমানে ১৪ দলে বিভক্ত এবং তাদের প্রত্যেকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটগুলোও ভিন্ন ভিন্ন : ক্লিক

লিখাটির কোথাও কোনোভাবে ভুল হলে সেজন্য আমিই দায়ী থাকব। ভুল ধরে দিলে অবশ্যই সংশোধন করে নেব।

ওয়াসসালাম।

  • লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
  • এডমিন www.markajomar.org
  • কাদিয়ানী বিষয়ক স্পেশালিষ্ট গবেষক ও লিখক।

ত্রিশ আয়াতের ভুল ব্যাখ্যার খন্ডনমূলক জবাব

ত্রিশ আয়াতের অপব্যাখ্যা খণ্ডন-বইটি ডাউনলোড করুন।

ত্রিশ (৩০) আয়াতের ভুল ব্যাখ্যার খন্ডনমূলক জবাব :

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

প্রথমে প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্নের এডভান্স উত্তর দেয়া হবে। মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর বইতে লিখা আছে, ‘তাওয়াফফী’ এমন কোনো শব্দ নয় যার তাফসীর কেউ নিজ ইচ্ছেমতো করতে পারে। (হামামাতুল বুশরা ৯৯ [বাংলা])। তিনি এর ব্যাখ্যাকারী হিসেবে কুরআন, হাদীস এবং সাহাবাদের তাফসীরসহ যুগ-ইমামগণের মতের প্রয়োজন রয়েছে বলে লিখে গেছেন। সুতরাং এখানে শব্দটির বিশ্লেষণ অনুরূপভাবেই করা হবে যাতে কোনো কাদিয়ানী আপত্তি তুলতে না পারে।

প্রশ্ন হতে পারে যে, সূরা আলে ইমরান আয়াত নং ৫৫ এর ন্যায় শব্দের আগ-পাছ করে মর্মার্থ নেয়ার আর কোনো দৃষ্টান্ত কুরআন মাজীদে রয়েছে কিনা? এর উত্তর হল, জ্বী হ্যাঁ। এমনি ধরণের বিশেষ বিশেষ রহস্যের কারণে শব্দ আগে-পিছে হওয়ার ভুরি ভুরি নজির কুরআন মাজীদে রয়েছে। তন্মধ্যে সূরা আলে ইমরান এর ৪৩ নং আয়াত অন্যতম। আল্লাহতালা মরিয়ম (আ:) সম্পর্কে বলেন, واسجدى واركعى مع الراكعين অর্থাৎ তুমি সিজদা কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর। এখানে প্রথমে সেজদা তারপর রুকুর কথা আসছে। রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত ইবনে আব্বাস (সা.) থেকেই শব্দ আগে-পিছে করে মর্মার্থ নেয়ার প্রমাণ রয়েছে পৃথিবীর প্রায় সব তাফসীরগ্রন্থে।

আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, তবে কেন আল্লাহতালা মুহাম্মদ (সা:)-কে আকাশে নেননি?

এর জবাব মির্যা কাদিয়ানীর বই থেকে দিচ্ছি। মির্যা সাহেব লিখেছেন : “মুহাম্মদ (সা:)-কে মে’রাজের রাতে সশরীরে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল। সকল সাহাবীর এটাই বিশ্বাস।” (রূহানী খাযায়েন ৩/২৪৭)। সুতরাং বুঝা গেল, আল্লাহতালা তাঁর প্রিয় হাবীবকেও আকাশে নেননি বলা আপনার পুরোপুরি অজ্ঞতা ছাড়া কিছুই না।

আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে আল্লাহতালা বিশেষভাবে ঈসা (আ:)-কে কেন এজন্য নির্বাচিত করলেন?

আমরা এর জবাব বিখ্যাত মুফাসসির আবুল লাইস সামরকন্দী (রহ:)-এর কিতাব থেকে জেনে নেব যিনি আজ থেকে হাজার বছর পূর্বে ৩৭৩ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। এই মহান ইমাম কর্তৃক আরবী ভাষায় রচিত ‘তাফসীরে সামরকন্দী’ এর ১ম খন্ডের ২৭২ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে ‘ঈসা (আ:) আল্লাহর নিকট শেষনবীর উম্মত হতে চেয়ে দোয়া করেছিলেন। তাই আল্লাহতালা তাঁর উক্ত দোয়া কবুল করেছেন।’ (সূরা আলে ইমরান আয়াত নং ৫৫ এর তাফসীর অংশ দ্রষ্টব্য)।

আপনি আরও প্রশ্ন করতে পারেন, ‘আল্লাহর দিক কোনটি? তিনি তাঁকে তাঁর কোন্ দিকে তুলিয়া লইয়াছেন?’

জবাব এই যে, পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে تعرج الملائكة و الروح اليه (তা’রুজুল মালা-ইকাতু ওয়াররূহু ইলাইহি) অর্থাৎ ফেরেশতারা এবং রূহ (জিবরাইল) আল্লাহর দিকে আরোহন করেন এমন একটি দিনে যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর (সূরা মা’আরিজ/৭০:০৪)। এখানে ফেরেশতারা আল্লাহ’র কোন্ দিকে আরোহন করে বলা হল, বলুন! আশা করি জবাব পেয়ে গেছেন।

এই প্রশ্নের আরেকটি উত্তর হল, মির্যা কাদিয়ানীর রচনাবলীর সমষ্টি ‘রূহানী খাযায়েন’ (১৭:১০৮) এর মধ্যে পরিষ্কার লিখা আছে,

  خدا کی طرف اور وہ اونچی ہے جسکا مقام انتہائے عرش ہے۔

(বাংলা উচ্চারণ) : খোদা কি তরফ আওর উয়ো উঁচি হে জেসকা মোক্বাম ইনতিহায়ে আ’রশ হে। অর্থাৎ “খোদার দিক হল উপরের দিক। যেটির শেষ সীমানা আরশে আজীম।”

আপনি এও প্রশ্ন করতে পারেন যে, যদি মসীহ বর্তমান যুগ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ না করে থাকেন সেক্ষেত্রে এটাও সাব্যস্ত হবে, খ্রিস্টানরা আজ পর্যন্ত শিরিকে এবং পথ ভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হয়নি যেভাবে ‘ফালাম্মা তাওয়াফফাইতানী কুনতা আন্তার রাকীবা আলাইহিম’ আয়াত থেকে প্রতিভাব হয়।

এর জবাব হচ্ছে প্রথমত, ঈসা (আ:) সংক্রান্ত توفى হতে যুগ-ইমামগণের কেউই ‘মৃত্যু’ অর্থ নেননি। বরং ইমাম শাওক্বানী (রহ.) ‘তাওয়াফফাইতানী’ এর মর্মার্থ সুস্পষ্ট করতে লিখেছেন,

يعنى فلما رفعتنى الى السماء

অর্থাৎ ‘যখন আপনি আমাকে আকাশে উঠিয়ে নিলেন।’ তাফসীরের কিতাবগুলোতে আরও উল্লেখ আছে, اى قبضتنى بالرفع الى السماء অর্থাৎ ‘আপনি আমাকে (যখন) আকাশে উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমে নিয়ে নিলেন।’ মনে রাখা উচিত, আয়াতটির পরেই উল্লেখ আছে ‘ওয়া ইন তাগফিরলাহুম ফা-ইন্নাকা আন্তাল আজীজুল হাকীম’ (অর্থাৎ যদি তুমি তাহাদিগকে ক্ষমা কর তাহা হইলে নিশ্চয় তুমিই মহা পরাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়)। এখন নির্বোধরা এই আয়াতের ‘তাগফিরলাহুম’ (تغفرلهم) শব্দ নিয়েও কিজন্য চিন্তা করেনা? এখান থেকে তারা কেন শিক্ষা লাভ করেনা যে, ঈসা (আ:) কেয়ামত দিবসে যাদের পক্ষে সাক্ষী হবেন তারা শুধুমাত্র তাঁর ইহ-জীবদ্দশায় বিদ্যমান থাকা একত্ববাদী ঈসায়ীগণই উদ্দেশ্য! কারণ ঈসা (আ:) এমন কারো পক্ষে কখনোই আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হবেন না, যে মুশরিক কিংবা ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী!

দ্বিতীয়ত, এবার প্রশ্নকর্তার প্রতিউত্তরে আসা যাক। সবার নিকট যে ব্যাপারটি পরিষ্কার তা হল, খ্রিস্টান ধর্ম-বিশ্বাসে ত্রিত্ববাদি মতবাদ সাধু সেন্ট পৌলই ঢুকিয়ে ছিল। মূলধারার সমস্ত মুসলমানের বিশ্বাস হল, ঈসা (আ.)-কে তাঁরই তেত্রিশ বছর বয়সে যখন সশরীরে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় তারই পরবর্তী কোনো এক সময় সেন্ট পৌল খ্রিস্টান ধর্মবিশ্বাসে ত্রিত্ববাদের মতবাদ ঢুকিয়ে দেয়। অধিকন্তু কাদিয়ানীদের মতবাদও তাই। (দেখুন, রূহানী খাযায়েন ২০/৩৭৫)।

তদুপরি তাদের (কাদিয়ানীদের) আরেকটি বিশ্বাস হচ্ছে, ঈসা (আ.) ১২০ বা ১২৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাই প্রশ্ন আসে, এমতাবস্থায় খ্রিস্টান ধর্ম-বিশ্বাসে বিকৃতির ঘটনা ঈসা (আ.)-এর ইহ-জীবদ্দশাতেই ঘটল না কিভাবে? সুতরাং দৃঢ়ভাবে বলতে পারি যে, এই আয়াত (ফালাম্মা তাওয়াফফাইতানী) দ্বারাও ঈসা (আ.) মারা গিয়েছেন বলিয়া সাব্যস্ত হয় না। যাইহোক, আয়াতটির ঐ অংশের সঠিক অনুবাদ হচ্ছে, ‘আর যখন আপনি আমাকে তুলিয়া লইলেন….’ (অনুবাদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)। বিস্তারিত সামনে।

জনৈক কাদিয়ানীর প্রশ্ন, আল্লাহতালার বাণী: (অনুবাদ) সমস্ত আহলে কিতাব তাঁর (ঈসা) মৃত্যুর আগে আগেই তাঁর (ঈসা) প্রতি ঈমান আনবে (সূরা নিসা, আয়াত নং ১৫৯)। কিন্তু একথা সঠিক নয়। কেননা হাদীসে আছে যে, দাজ্জালের সাথে ৭০,০০০ আহ্‌লে কিতাব যোগ দেবে, আর সে নিজেও আহ্‌লে কিতাবের অন্তর্গত হবে। সে মসীহ্‌র প্রতি ঈমান আনবে না এবং কাফির অবস্থাতেই মারা যাবে। অতএব এ যুক্তি ভ্রান্ত, পক্ষান্তরে এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, হযরত ঈসা (আ.) ইন্তেকাল করেছেন। এখন এর কী উত্তর দেবেন! (উত্তর এখান থেকে পড়ুন)।

এবার দুইটি পালটা প্রশ্ন :

ক. ঈসা (আ:) ইতিপূর্বে ইন্তেকাল করে থাকলে উক্ত আয়াতে ভবিষ্যৎবাচক ক্রিয়াপদ দ্বারা “আহলে কিতাবীরা ঈমান আনবে” এ কথার কী মানে?

খ. আয়াতের ‘মওতিহি’ (موته) এর “হি” (هِ) (ইংরেজি : his) একবচনের সর্বনামপদটি ‘আহলে কিতাবী’র জন্য হয়ে থাকলে তবে ঐ আহলে কিতাবীর জন্য পরের আয়াতে ‘আলাইহিম শাহীদা’ (عَلَيْهِمْ شَهِيدًا)-এর মধ্যে কেন “হিম” (هم)  (ইংরেজি : they) বহুবচনাত্মক সর্বনাম নেয়া হল? অতএব যেহেতু একই বাক্যে একই উদ্দেশ্যের সর্বনাম বিভিন্ন হওয়া ব্যাকরণিক নীতির অন্তরায়, সেহেতু নিশ্চিতভাবে বলা যায় আয়াতে قَبْلَ مَوْتِهِ   অংশের শেষোক্ত “হি” সর্বনামটি দ্বারা আহলে-কিতাবীদের বুঝানো হয়নি, বরং এককভাবে হযরত ঈসা (আ:)-কেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে।

আপনি প্রশ্ন করতে পারেন যে, ঈসা (আ.)-এর আগমন ‘নবী’ হিসেবে না হলে মুসলিম শরীফের হাদীসে ‘নাবিউল্লাহ’ শব্দে উল্লেখ হল কিজন্য? এর জবাবে বলব, আগমনকারী ঈসা বলতে রূপক কোনো ঈসা হবেন না, বরং তিনি বনী ইসরাইলি জাতির জন্য প্রেরিত হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.)ই। যেজন্য রাসূল (সা.) তার আগমনী ভবিষ্যৎবাণীতে ‘আল্লাহর নবী ঈসা’ বলে সম্বোধন করে গেছেন, যাতে মসীহ দাবীদার ভন্ডরা সাধারণদের প্রতারিত করতে না পারে। উম্মতে মুহাম্মদীয়ার বিশ্বাস হল, আগমনকারী ঈসা (আ.) নবুওয়তের দায়িত্বে থাকবেন না, বরং তিনি স্রেফ একজন “উম্মতি” হিসেবে আসবেন। কাজেই এখন কাদিয়ানীদের উদ্দেশ্যে আমরা পালটা প্রশ্ন করতে চাই যে, আপনাদের মতানুসারে, হযরত ঈসা (আ.) এসে “নবী” হলে তখন কি তাঁর “উম্মত” ও হবেনা? অবশ্যই হবে! কারণ নবীর উম্মত থাকবেনা, এটা কিভাবে হতে পারে? এখন ‘ঈসা’ দাবীদার মির্যা কাদিয়ানীর অনুসারীরা কি নিজেদেরকে তার (অর্থাৎ মির্যা কাদিয়ানীর) উম্মত মনে করেন? কী জবাব দেবেন?

আপনি আরও প্রশ্ন করতে পারেন, ঈসা (আ:)-এর যুগে এবং তাঁরই মৃত্যুর আগে সমস্ত আহলে কিতাবী (ইহুদ-খ্রিস্টান) মুমিন হয়ে গেলে তখন পবিত্র কুরআনের ০৫:৬৪ আয়াত অনুসারে আহলে কিতাবীদের মাঝে الى يوم القيامة তথা ‘কেয়ামত পর্যন্ত’ শত্রুতা সঞ্চারিত থাকে কিভাবে? (উত্তর এখান থেকে পড়ুন)।

  • ত্রিশ আয়াতের অপব্যাখ্যার খন্ডন শুরু হল :

মির্যা কাদিয়ানী আর তার অনুসারীরা পবিত্র কুরআনের প্রায় ৩০টি আয়াতের অপব্যাখ্যা দ্বারা ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে গেছে বলে মিথ্যা দাবী করে থাকে। অথচ আয়াতগুলো নবী, সাহাবী, তাবেয়ীর সোনালী যুগেও ছিল। তাদের সকলে বিশ্বাস করতেন যে, ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু শেষ যুগে হবে। কেননা তাঁর জীবনকে আল্লাহ শেষ যামানা পর্যন্ত দীর্ঘ করে দিয়েছেন। কাজেই যে সমস্ত আয়াতের অপব্যাখ্যা দ্বারা কাদিয়ানীরা বর্তমানে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে গেছে বলে মিথ্যা দাবী করছে তারা কি তাদের উক্ত দাবীর মধ্য দিয়ে একথাও প্রমাণ করতে চাচ্ছে না যে, পবিত্র কুরআনের অনুবাদ কিংবা ব্যাখ্যা আগেকার যুগের কেউই বুঝেনি, মির্যা কাদিয়ানী আর তার বর্তমান যুগের মুরিদরাই শুধু বুঝেছেন! নাউযুবিল্লাহ।

সে যাইহোক, এখানে তাদের উল্লেখযোগ্য কিছু আয়াতের অপব্যাখ্যার খন্ডনপূর্বক সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

1 হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে আল্লাহর বাণী ‘ইন্নী মুতাওয়াফফীকা ওয়া রাফিউকা ইলাইয়্যা’ (انى متوفيك و رافعك الى)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : ‘হে ঈসা নিশ্চয় আমি তোমাকে নিয়ে নিচ্ছি এবং তোমাকে নিজের কাছে তুলিয়া লইতেছি….।’ (সূরা আলে ইমরান ৫৫, অনুবাদ, কাদিয়ানী খলীফা হেকিম নূরুদ্দীন কৃত ‘তাসদীকে বারাহীনে আহমদীয়া’ খ-১ পৃ-৮)।

ব্যাখ্যা : এই আয়াতে “মুতাওয়াফফীকা” (متوفيك) শব্দটি বাবে তাফা’উল (تفعل) থেকে ইসমে ফায়েল এর ছিগাহ; অর্থ ‘তোমাকে নিয়ে নেব’ বা ‘তোমার মেয়াদকাল পূর্ণ করব’ (ভবিষ্যৎকালবাচক)। কেননা এর মূলধাতু (মাদ্দাহ) ‘ওয়াফইউ’ (وفى)। এখন জানার বিষয় হল, তাহলে ঐ নিয়ে নেয়ার ঘটনাটি কিরূপে সংঘটিত হয়েছিল? আল্লাহতালা সূরা নিসার ১৫৮ নং আয়াতে ‘রাফা’আহুল্লাহু ইলাইহি’ (رفعه الله اليه) দ্বারা সুস্পষ্টভাবে তার উত্তরও দিয়ে রেখেছেন। অর্থাৎ তাঁকে উপরে (আকাশে) উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমেই নিয়ে নেয়া হয়েছে (অতিতকালবাচক)। তাই আয়াতটি দ্বারা ঈসা (আ.)-কে মৃত প্রমাণ করতে চাওয়া নিজেদের অজ্ঞতা ছাড়া কিছুই না। তবে হ্যাঁ ‘তাওয়াফফা’ (توفى)-এর রূপক অর্থ মৃত্যু নেয়া হলে তখন তা বিশিষ্ট সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাক্যের মধ্যে শব্দের تقديم-تأخير (আগ-পিছ)-এর নীতি গ্রহণ করতে হবে। আর তখন আয়াতটির অর্থ দাঁড়াবে, ‘ইয়ানি রাফেউকা ছুম্মা মুতাওয়াফফীকা ফী আখিরিয যামান’ (يعنى رافعك ثم متوفيك فى اخر الزمان) অর্থাৎ তোমাকে উঠিয়ে নেব অতপর শেষযুগে তোমাকে ওফাত (মৃত্যু) দেব। (ইমাম সুয়ূতী রচিত ‘দুররে মানছুর’ খ-৩ পৃ-৫৯৮; ‘মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ’ দ্রষ্টব্য)।

বলে রাখা জরুরী, সহীহ বুখারী’র কিতাবুল ইলম অধ্যায়ে (হা/ ৭৫ ইফা) একটি হাদীসে উল্লেখ আছে, রাসূল (সা:) ইবনে আব্বাসের জন্য দোয়া করেছেন اَللَّهُمَّ عَلِّمْهُ الْكِتَابَ অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি তাঁকে কুরআন শিখিয়ে দিন।’ এখন তাহলে চিন্তা করুন, ইবনে আব্বাস (রা.)-এর তাফসীর কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, মির্যা কাদিয়ানীর ৮৩টি বইয়ের সমষ্টি ও ২৩ খন্ডে প্রকাশিত রচনা-সমগ্রটির নাম ‘রূহানী খাযায়েন’ বা আধ্যাত্মিক ভান্ডার। মির্যা কাদিয়ানী সেটির প্রায় চার স্থানে ‘ইন্নী মুতাওয়াফফীকা’-এর অনুবাদের মধ্যে ‘তাওয়াফফা’ হতে ‘মৃত্যু’ অর্থ নেননি। অথচ সবখানেই শব্দটির কর্তা আল্লাহ এবং কর্ম (মাফউল) মানুষই ছিল। যথা-

  • ১. মে তুজকো পুরি নে’মত দোংগা [উর্দূ]। অর্থাৎ আমি তোমাকে পূর্ণ নেয়ামত দেব। (বারাহীনে আহমদীয়া, রূহানী খাযায়েন ১/৬২০)।
  • ২. মে তুজে কামেল আজর বখশোঁগা [উর্দূ]। অর্থাৎ আমি তোমাকে পরিপূর্ণ পুরষ্কার দেব। (বারাহীনে আহমদীয়া, রূহানী খাযায়েন ১/৬৬৪-৬৫)।
  • ৩. মে তুজে এসি যলীল অওর লা’নতি মউতুঁ চে বাছাঁওগা [উর্দূ]। অর্থাৎ আমি তোমাকে এমন অপমানকর ও অভিশপ্ত মৃত্যু হতে রক্ষা করব। (সিরাজে মুনীর, রূহানী খাযায়েন ১২/২৩)।

কিন্তু অধিকাংশ কাদিয়ানীর ‘তাওয়াফফা’ শব্দের ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার দরুন ভাবেন যে, তাদের কনসেপ্টই সঠিক, বিপরীতে সব ভুল। জেনে আরো অবাক হবেন, তাদের দৈনিক ‘আল ফজল’ [উর্দূ] (তাং ২১-আগস্ট-১৯১৭ইং) সংখ্যায় পরিষ্কার লিখা আছে যে, “কিছু মানুষ ভুলক্রমেই ‘তাওয়াফফা’র অর্থ করে মৃত্যু। কিন্তু এই অর্থ সঠিক না। বরং তার অর্থ ‘রূহ কবজ’ করা।”

কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, মির্যা সাহেব তার রচনার ঐ চার জায়গায় ‘রূহ কবজ’ অর্থটিও নেননি। ওহে আহমদী/কাদিয়ানীবন্ধুরা! একটু তো ইনসাফ করবেন!! অন্যান্য ক্ষেত্রে যে শব্দটির মৃত্যু অর্থ ত্যাগ করলেন আর সেই শব্দটিকে-ই ঈসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে মৃত্যু অর্থে নিলেন! এটি আপনাদের কেমন ন্যায় বিচার?

কাদিয়ানীদের বইগুলোতে বাইবেল থেকে অনেক উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে। এখানে আমি শুধু সে হিসেবেই একটি উদ্ধৃতি টানছি। বাইবেলের নতুন নিয়মে লিখা আছে “যীশু যখন জৈতুন পর্বতমালার ওপর বসেছিলেন, তখন তাঁর শিষ্যরা একান্তে তাঁর কাছে এসে তাঁকে বললেন, আমাদের বলুন, কখন এসব ঘটবে, আর আপনার আসার এবং এযুগের শেষ পরিণতির সময় জানার চিহ্নই বা কি হবে? এর উত্তরে যীশু তাদের বললেন, ‘দেখো! কেউ যেন তোমাদের না ঠকায়। আমি তোমাদের একথা বলছি কারণ অনেকে আমার নামে আসবে আর তারা বলবে, ‘আমি খ্রীস্ট।’ আর তারা অনেক লোককে ঠকাবে।” (বাইবেল : মথি, অধ্যায় নং ২৪ পদ নং ৩-৫)। কাদিয়ানীদের নিকট বাইবেল যদি অথেনটিক কোনো সোর্স হয় তবে অন্তত যীশুর এই বক্তব্য দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, আগমনকারী যীশুখ্রিস্ট ‘রূপক’ কেউ হবেন না।

2 হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে আল্লাহর বাণী (بل رفعه الله اليه)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : ‘বরং আল্লাহ তাহাকে তাহার নিকট তুলিয়া লইয়াছেন।’ (০৪:১৫৮,অনুবাদ ইসলামিক ফাউন্ডেশন/ইফা)।

ব্যাখ্যা : এই আয়াতে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু সম্পর্কে ইংগিতেও কোনো কথা নেই। বরং এই আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহতালা নিজের অলৌকিক শক্তি দ্বারা ঈসা (আ.)-কে জীবিত অবস্থায় সশরীরে আকাশে তুলে নিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হল, আয়াতের কোথাও তো ‘আকাশ’ শব্দের উল্লেখ নেই, তাই এর ‘রাফা’ অর্থ শুধুমাত্র রূহ উঠিয়ে নেয়াই বুঝাল কিনা? তার জবাব হল, আয়াতের কনটেক্স বা প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান করে দেখুন, এই আয়াতে ঈসাকে সশরীরে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার কথাই বুঝিয়েছে। কারণ ইহুদীরা যখন উনার বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্র করল (কুরআন ০৩:৫৪) এবং পাকড়াও করতে তাকে ঘিরে সবাই সমবেত হল (তারীখে ইবনে আসাকীর ৪৭/৪৭২; দুররে মানছূর ৩/৫৯৫); ঠিক সেই মুহূর্তে সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী মহান আল্লাহ তাঁকে নিজের কাছে উঠিয়ে নেন। তিনি জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে তাঁকে এইভাবেই সাহায্য করেন এবং সশরীরে আকাশে উঠিয়ে নিতে নির্দেশ করেন।

বলে রাখা জরুরী যে, রূহ উঠিয়ে নেয়ার দায়িত্বে জিবরাইল (আ.) নন, বরং আজরাইল (আ.)। দেখুন সূরা আস-সিজদাহ আয়াত নং ১১; (قل يتوفكم ملك الموت)। অথচ ঈসা (আ.)-এর ‘রাফা’ জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে আকাশে হয়েছিল। দেখুন, সহীহ মুসলিম এর সমপর্যায়ের সনদে বর্ণিত হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর হাদীস (وَرُفِعَ عِيْسَى مِنْ رَوْزَنَةِ فِيْ الْبَيْتِ إِلَى السَّمَاءِ) অর্থাৎ ‘ঈসাকে বাড়ীর বায়ুপথ (Airspace) দিয়ে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসীর)।

তারপর হযরত ঈসা (আ.) শেষযুগে আকাশ থেকে নাযিল হবেন, একথাও সহীহ হাদীসে এসেছে। হযরত আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) বলেছেন ثم ينزل عيسى بن مريم من السماء অর্থাৎ ‘অতপর মরিয়ম পুত্র ঈসা আকাশ থেকে নাযিল হবেন।’ দেখুন মসনাদে বাজ্জার, হাদীস নং ৯৬৪২; বিশিষ্ট হাদীসবিশারদ ইমাম নূরউদ্দীন আল হাইছামী (রহ.) লিখেছেন و رجاله رجال الصحيح غير بن المنذر و هو ثقة অর্থাৎ হাদীসটির সূত্রে উল্লিখিত সকল বর্ণনাকারী সহীহ (বুখারী)’র শুধু আলী ইবনে আল মুনযির ছাড়া, তবে তিনিও একজন বিশ্বস্থ বর্ণনাকারী। (দেখুন, মাজমাউয যাওয়ায়েদ খ-৭ পৃ-৩৪৯)। এভাবে একাধিক সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণ করা যাবে যে, আগমনকারী ঈসা ‘রূপক’ কেউ নন, বরং তিনি সেই ঈসা যার সম্পর্কে স্বয়ং হযরত মুহাম্মদ (সা.) দুইজন ফেরেশতার মাধ্যমে বায়তুল মুকাদ্দাস শহরে (ফিলিস্তিনে) নিচে নেমে আসবেন বলেই ভবিষ্যৎবাণী করে গেছেন।

3 ঈসা (আ.) কেয়ামতের দিন আল্লাহতালাকে বলবেন (فلما توفيتنى)-এর সঠিক তাৎপর্য ।

আয়াত : ‘কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলিয়া লইলে তখন তুমিই তো ছিলে তাহাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক এবং তুমিই সর্ববিষয়ে সাক্ষী।’ (০৫:১১৭/ অনুবাদ, ইফা)।

ব্যাখ্যা : কেয়ামত দিবসে মহান আল্লাহ’র একটি প্রশ্নের প্রতিউত্তরে হযরত ঈসা (আ.) বলবেন, فلما توفيتنى অর্থাৎ ‘যখন তুমি আমাকে তাওয়াফফা করলে তথা তুলিয়া লইলে’। মির্যা কাদিয়ানীর নিকটেও যুগ ইমাম ও মুজাদ্দিদ হিসেবে স্বীকৃত ইমাম আল্লামা শাওক্বানী (রহ.) উক্ত আয়াতাংশের তাফসীরে লিখে গেছেনو انما المعنى فلما رفعتنى الى السماء (ওয়া ইন্নামাল মা’না ফালাম্মা রফা’তানী ইলাস সামায়ি) অর্থাৎ ‘আয়াতাংশের শুধু এ অর্থই যে, আপনি যখন আমাকে আকাশে তুলিয়া লইলেন।’ কেননা পবিত্র কুরআনে ‘তাওয়াফফা’ শব্দটি তিনখানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যথাক্রমে মৃত্যু (৩৯:৪২), ঘুম (০৬:৬০) এবং রাফা বা তুলিয়া নেয়া (০৩:৫৫, ০৫: ১১৭), দেখুন, ফাতহুল ক্বাদীর ৭/৪০৬; সূরা মায়েদা ১১৭। এই ক্ষেত্রে মৃত্যু, ঘুম এবং সশরীরে উঠিয়ে নেয়া, এই সমস্ত অর্থ রূপক আর ‘নিয়ে নেয়া বা পূর্ণকরা’ (কুরআন/০৪:১৫) তার প্রকৃত অর্থ। সুতরাং আয়াতটিও কাদিয়ানীদের মতের পক্ষে দলিল হয়নি।

4 ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর আগে আগে (قبل موته) তাঁর উপর প্রত্যেক আহলে কিতাবি ঈমান আনয়ন প্রসঙ্গে ।

আয়াত : কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে তাঁর (ঈসা) মৃত্যুর পূর্বে তাঁহাকে বিশ্বাস করিবেই এবং কিয়ামতের দিন সে (ইতিপূর্বে যাহারা তাঁহাকে আল্লাহর পুত্র আখ্যা দিয়েছিলো) তাহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে। (০৩: ১৫৯, অনুবাদ ফছলুল খেতাম, লিখক মির্যায়ী খলীফা হেকিম নূরউদ্দীন)।

ব্যাখ্যা : এই আয়াত বরং ঈসা (আ.) বর্তমানেও জীবিত থাকার পক্ষেই মজবুত দলিল। কারণ যদি বলা হয় যে, ঈসা (আ.) পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছেন তখন প্রশ্ন আসবে যে, তবে কি বর্তমানে আহলে কিতাবীদের প্রত্যেকে ঈমান আনয়ন করে মুসলমান হয়ে গেল? কিন্তু নির্বোধদের বুঝানোর সাধ্য কার? কাদিয়ানীরা এই ধরণের প্রশ্ন থেকে বাঁচার জন্য আয়াতের অর্থ নেয় এই রূপ : ‘আহলে কিতাবীদের প্রত্যেকে নিজ নিজ ধারণা অনুযায়ী ক্রুশীয় ঘটনার উপর ঈমান আনবে।’ কিন্তু প্রকৃত সত্য হল, তারা নিজ নিজ ক্রুশীয় ঘটনার উপর তো এখনো বিশ্বাসী হয়ে আছে। তাহলে তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ মৃত্যুর পূর্বে ক্রুশীয় ঘটনার উপর ঈমান আনয়নের অর্থ কি ঐ একই বিশ্বাসের উপর অটল থাকা? যদি তাই হয় তাহলে নিজেদের মৃত্যুর পূর্বের ঈমান আর জীবদ্দশাতে ধারণকৃত ঈমান এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রইল কোথায়? সুতরাং এই আয়াত দিয়েও মির্যা কাদিয়ানী কর্তৃক ঈসা (আ.)-কে মৃত সাব্যস্ত করতে চাওয়া পুরোপুরি বাতিল, সত্যের সাথে যার লেশমাত্র সম্পর্কও নেই। এই পর্যায় কাদিয়ানীদের প্রাসঙ্গিক বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর আমি আমার ওয়েবসাইটে দিয়ে রেখেছি। নিচে টীকা দ্রষ্টব্য।

5 ঈসা (আ.) সম্পর্কে আল্লাহর বাণী (وما المسيح ابن مريم)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : মারইয়াম তনয় মসীহ তো কেবল একজন রাসূল। তাহার পূর্বে বহু রাসূল গত হইয়াছে। (০৫: ৭৫ ইফা)।

ব্যাখ্যা : এই আয়াতে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু সম্পর্কে সরাসরি কিংবা ইংগিতেও কিছু বলা কওয়া নেই। বরং তার পরের আয়াতগুলো দ্বারা বুঝা যায় যে, খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদী মতবাদ খন্ডন করার জন্য এই আয়াতে ঈসা আর তাঁর মায়ের পানাহারের কথা উল্লেখ করেছেন। কেননা খ্রিস্টানরা তাঁদেরকে উপাস্য হিসেবে বিশ্বাস করে। অথচ সত্যিকারের উপাস্য যিনি তিনি সব সময় পানাহারের ঊর্ধ্বে, বরং ঊর্ধ্ব থেকেও ঊর্ধ্বে। উল্লেখ্য, কাদিয়ানী নির্বোধরা আয়াতটির শানে নুযূল তথা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায় এবং নিজেদের মতবাদকে সামনে রেখে মতলবসিদ্ধ ব্যাখ্যার পেছনে দৌঁড়ায়। তারা বলে, যেহেতু ঈসা আর তাঁর মা উভয়ই পূর্বে খাবার গ্রহণ করতেন, এখন করেন না। কাজেই এর কারণ হল তারা এখন জীবিত নেই। অথচ আয়াতের প্রসঙ্গের সাথে এর কোনোই সম্পর্ক নেই।

6 পবিত্র কুরআনের বাণী (وما جعلناهم جسدا)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : ‘এবং আমি তাহাদের এমন দেহবিশিষ্ট করি নাই যে, তাহারা আহার্য গ্রহণ করিত না, তাহারা চিরস্থায়ীও ছিল না।’ (২১:০৮ ইফা)।

ব্যাখ্যা : এই আয়াতেও ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু সম্পর্কে সরাসরি কিংবা ইংগিতেও কিছু বলা কওয়া নেই। বড়জোর এটি মক্কার মুশরিকদের একখানা প্রশ্নের জবাব মাত্র। কিন্তু কাদিয়ানী নির্বোধরা এই আয়াত দিয়ে যুক্তি দেয় যে, অত্র আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর কোনো প্রেরিত পুরুষই না খেয়ে বাঁচতে পারতেন না। অতএব ঈসা (আ.)ও আল্লাহর এই নিয়মের বিরুদ্ধে নন বলে তিনিও বেঁচে নেই, মারা গেছেন। কিন্তু আফসোস! এই নির্বোধরা যদি আয়াতের প্রসঙ্গ এড়িয়ে না যেত তাহলে তাদের পক্ষে এইরূপ জঘন্য মতলবসিদ্ধ ব্যাখ্যার খিস্তিখেউড় করা কোনোদিনও সম্ভব হত না। আয়াতের প্রাসঙ্গিকতা এই যে, তাফসীরে কুরতুবীতে এসেছে, কাফেরদের আপত্তি ছিল, মুহাম্মদ (সা.) নবী হলে সাধারণ মানুষের মতই পানাহার করতেন না এবং জীবিকা উপার্জনের জন্য হাটবাজারে চলফেরা করতেন না। আলোচ্য আয়াতে তাদের উত্তর দেয়া হয়েছে যে, যেসব নবীকে তোমরা নবী ও রাসূল বলে স্বীকার করতে তারাও তো মানুষই ছিল, তারা মানুষের মত পানাহার করতেন এবং হাটবাজারে চলাফেরা করতেন। বুঝা গেল, পুরো ব্যাপারটাই ইহকালীন জীবনের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ফলে ইহজগতের বাহিরে অবস্থানকারী ঈসা (আ.)-কে এর সাথে একীভূত করার প্রচেষ্টা মূর্খতা ছাড়া কিছুই না।

7 আল্লাহতালার বাণী (قد خلت من قبله الرسل)-এর প্রকৃত মর্মার্থ।

আয়াত : মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র, তাহার পূর্বে বহু রাসূল গত হইয়াছে। (০৩:১৪৪ ইফা)।

ব্যাখ্যা : মনে রাখতে হবে যে, “গত হওয়া” মানে মরে যাওয়াই নয়, বরং সশরীরে কোথাও স্থানান্তরিত হয়ে গেছে এমন ব্যক্তিও “গত হওয়া” অর্থে শামিল। কুরআনে এর বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। দেখুন পবিত্র কুরআন ০২:১৪, ৩৫:২৪। তবে উক্ত আয়াতের শানে নুযূল দ্বারা বুঝা যায় যে, মুহাম্মদ (সা.) খোদা নন, বরং তিনি পূূর্বের নবী রাসূলগণের মতই একজন রাসূল, রাসূলগণের মত তাঁর জন্যও মৃত্যুর মাধ্যমে ইহজগত হতে পরজগতে স্থানান্তর হওয়া অবধারিত; তাই তাঁর মৃত্যুতে তোমাদের এত বিচলিত হওয়ার কিছুই নেই, উক্ত আয়াত দ্বারা এটাই সবাইকে বার্তা দেয়া উদ্দেশ্য। কাজেই আয়াতের অর্থ দাঁড়াল ‘মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র, তাহার পূর্বে রাসূল-ই আগমন করিত।’ এভাবে অর্থ নেয়া হলে তখন নির্বোধদের পক্ষে আর কোনো কাসুন্দি করার সুযোগ থাকেনা। উল্লেখ্য, মির্যা কাদিয়ানী তার একটি রচনায় নিজেও قد خلت من قبله الرسل এর অর্থ করেছেন “আর তাঁর পূর্বে রাসূল-ই আগমন করিত।” (রূহানী খাযায়েন ৬/৮৯)।

বিস্তারিত পড়ুন ক্লিক

পবিত্র কুরআনের উক্ত আয়াতটি ‘খালাত’ (خلت) শব্দে না হয়ে ‘মাতাত’ (ماتت) শব্দেও হতে পারত! কুরআন কি এই ব্যতিক্রমী শব্দচয়ন দ্বারাও আমাদের বার্তা দিচ্ছে না যে, ঈসা (আ.) বর্তমানেও জীবিত, তিনি এখনো মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করেননি! অন্যথা ‘মাতাত’ এর পরিবর্তে ‘খালাত’ (خلت) শব্দের প্রয়োগের রহস্যটা কী?

কিন্তু কাদিয়ানীদের কোনো কোনো লিটারেচারে আয়াতটির ‘ক্বদ খালাত’ শব্দ দ্বারা ‘মারা গিয়াছে’ অর্থও নেয়া হয়েছে এমনকি ‘আর-রসুল’ দ্বারা ‘সমস্ত রাসূল’ অর্থও নেয়া হয়েছে। তাদের বিশ্বাস হল, এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করিয়াছেন। এই মর্মে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে ইজমা (ঐক্যমত)-ও প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তাদের এই কথার উত্তরে শুধু এটুকু বলতে চাই, লানাতুল্লাহি আলাল কাজেবীন।

এই পর্যায় তাদের উদ্দেশ্যে আমি প্রশ্ন করতে চাই যে, আপনাদের দাবী হচ্ছে من قبله الرسل এর মধ্যকার الرسل এর ال (আলিফ+লাম) নাহুর পরিভাষায় শুধুই الاستغراقى (আল ইস্তিগরাক্বি বা নিঃশর্তভাবে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তি) যা সমস্ত রাসূলকে ‘গত হওয়া মর্মে’ অন্তর্ভুক্ত করবে। সে হিসেবে আপনারা কি বিশ্বাস করবেন যে, হযরত জিবরাইল (আ.) সহ সমস্ত ফেরেশতাও মুহাম্মদ (সা.)-এর পূর্বে মৃত্যুবরণ করিয়াছেন!? যেহেতু পবিত্র কুরআন অনুযায়ী জিবরাইল (আ.)ও একজন রাসূল বা বাণীবাহক (সূরা মরিয়ম আয়াত ১৯)। পবিত্র কুরআন অনুযায়ী মুক্তভাবে ফেরেশতাদেরও আল্লাহর পক্ষ হতে রাসূল (বাণীবাহক) হিসেবে মনোনীত করার প্রমাণ রয়েছে (সূরা হাজ্জ আয়াত ৭৫)। এখন এর কী উত্তর?

তাদের জন্য দুঃসংবাদ যে, এই আয়াত নাযিল হওয়ার ছয় বছর পর অর্থাৎ হিজরী নবমবর্ষে যখন নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধি দল রাসূল (সা.)-এর নিকট এলেন, তখন তিনি বললেন, “আপনারা কি জানেন যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব এবং মৃত্যু ঈসার নিকট আসবে?” (তাফসীরে তাবারী ৬/১৫৪, তাফসীরে ইবনে আবী হাতিম ৯/৪০৮ দ্রষ্টব্য)। এছাড়াও হযরত আলী (রা.)-এর খাস শিষ্য ও বিশিষ্ট তাবেয়ী ইমাম হাসান বছরী (রহ.) থেকে একদম সুস্পষ্টরূপে বর্ণিত আছে তিনি বলেছেন,

قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِلْيَهُوْدِ إِنَّ عِيْسَى لَمْ يَمُتْ، وَإَنَّهُ رَاجِعُ إِلَيْكُمْ قَبْلَ يَوْمِ الْقِيَامَةِ

অর্থাৎ রাসূল (সা.) জনৈক ইহুদীকে বলেছেন নিশ্চয় ঈসা মসীহ তিনি মৃত্যুবরণ করেননি। তিনি নিশ্চয় কেয়ামতের পূর্বে তোমাদের নিকট ফিরে আসবেন। (সূত্র, সুনানে তাবারী ৩৩৩৮, হাদীস নং ৫৭৪৭; তাফসীরে দুররে মানছুর ২৬৪, ইমাম সুয়ূতী)। এই সম্পর্কে অন্য জায়গায় বিস্তারিত লিখা হয়েছে।

  • উল্লেখ্য, উপরের আয়াতটি কাদিয়ানীবাদের সব চেয়ে বড় দলিল! আর সেটির খণ্ডনে উপরে যেভাবে লিখা হয়েছে তাতে তারা কোনোভাবেই সন্তুষ্ট হবেনা। সেজন্য এই টপিকের উপর আমি খণ্ডনমূলক যেভাবে জবাব দিয়ে থাকি সেটি একদমই ব্যতিক্রমী। এটি শুধুই দ্বিপাক্ষিক ডিবেটের সময়ই প্রয়োজন পড়বে। অথবা সেসব ব্রেইন ওয়াশ ঝগড়াটে ও আনাড়ি কাদিয়ানীদের মুখ বন্ধ করে দিতেই।
  • পড়ুন : কাদিয়ানীবাদের ওফাতে মসীহ’র সব চেয়ে বড় দলিলের খণ্ডন

8 আল্লাহর বাণী (وما جعلنا لبشر من قبلك الخلد)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : ‘আমি তোমার পূর্বেও কোনো মানুষকে অনন্ত জীবন দান করি নাই; সুতরাং তোমার মৃত্যু হইলে উহারা কি চিরস্থায়ী হইয়া থাকিবে?’ (২১:৩৪ ইফা)।

ব্যাখ্যা : কাদিয়ানী নির্বোধদের কথা কী আর বলব! তারা এই আয়াত থেকেও ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর রসদ পাওয়ার দাবী করে। তাদের বিশ্বাস, এই আয়াত থেকেই সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, রাসূল (সা.)-এর পূর্বেকার সকল নবীই ইন্তেকাল করেছেন বলে ঈসা (আ.)-ও তার ভেতর শামিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, এরা আয়াতটি নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপটের দিকে একদমই দৃষ্টি দেয় না। যদি দৃষ্টি দিত তাহলে তারা নিজেদের কখনোই এমন নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিত না। এবার আয়াতটির নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট জেনে নিন। মক্কার কাফেররা রাসূল (সা.)-এর ব্যাপারে বলত, সে তো একদিন মারাই যাবে। আল্লাহতালা এরই প্রতিউত্তরে বলেন, মৃত্যু তো প্রত্যেক মানুষের জন্য অবধারিত, মুহাম্মদ (সা.)-ও এই নিয়ম বহির্ভূত নয়। কারণ সেও একজন মানুষ। আর আমি কোনো মানুষকে অমরত্ব দান করিনি। এখানে পুরো বিষয়টাই যেহেতু ইহ-জগত সংশ্লিষ্ট সেহেতু উক্ত আলোচ্যাংশে ঈসা (আ.)-কেও টেনে এনে মৃত সাব্যস্ত করতে চাওয়া আদতে কুরআনের উদ্দেশ্যকেই পরিবর্তন করার নামান্তর।

9 আল্লাহর বাণী (تلك الامة قد خلت لها ما كسبت)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : ‘সেই ছিল এক উম্মত, তাহা অতীত হইয়াছে। তাহারা যাহা অর্জন করিয়াছে তাহা তাহাদের। তোমরা যাহা অর্জন কর তাহা তোমাদের। (০২:১৪১ ইফা)।

ব্যাখ্যা : এই আয়াতের আগের এবং পরের আয়াতগুলো দেখলে বুঝা যায়, এখানে একথাগুলো ইহুদীদের উদ্দেশ্যে ছিল। তাদেরকে বলা হচ্ছে যে, তোমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে যারা আম্বিয়া ও সৎলোক ছিলেন তাদের সাথে সম্পর্ক জুড়ে তোমাদের কোনো লাভ নেই। রাসূল (সা.)-ও পরিষ্কার বলে রেখেছেন যে, ‘যার কার্যকলাপ তাকে পিছিয়ে দেয়, তার বংশমর্যাদা তাকে এগিয়ে দিতে পারবে না’ (সহীহ মুসলিম অধ্যায় যিকির ও দোয়া, পরিচ্ছেদ তেলাওয়াতে কুরআনের জন্য একত্রিত হওয়ার ফজিলত)। কাজেই উক্ত আয়াত যেন বলতে চাচ্ছে, পূর্বপুরুষদের নেকী দ্বারা তোমাদের কোনো লাভ হবেনা এবং তাঁদের পাপের কারণে তোমরা পাকড়াও হবেনা। তাঁদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদেরকে এবং তোমাদের কৃতকর্মের জন্য তাঁদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবেনা। পবিত্র কুরআনে এসেছে ‘কেউ অপরের বোঝা বহন করবেনা।’ (সূরা ফাত্বির ৩৫:১৮)। ‘আর মানুষ তাই পায়, যা সে করে।’ (সূরা নাজম ৫৩:৩৯)। যাইহোক, কাদিয়ানীদের উদ্ধৃত এই আয়াতের সাথেও ঈসা (আ.) জীবিত না মৃত—এর কোনো প্রাসঙ্গিকতাই নেই।

10 আল্লাহর বাণী (و اوصانى بالصلوة و الزكوة)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : ‘যেখানেই আমি (ঈসা) থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করিয়াছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন যত দিন জীবিত থাকি তত দিন সালাত ও যাকাত আদায় করিতে’। (১৯:৩১ ইফা)।

ব্যাখ্যা : এই আয়াতে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর কোনো উল্লেখই নেই। এখানে যে বিষয়টি বলে রাখা জরুরী তা হল, আয়াতটিতে ঈসা (আ.)-এর প্রতি সালাত আর যাকাতের ওসীয়ত পালনের হুকুম শুধুমাত্র পার্থিব জীবনের সাথেই সম্পর্কিত। কেননা সালাত আর যাকাত পালনের কোনো যোগ্যতাই আকাশে নেই। তাই যারা ঈসা (আ.) আকাশে থাকলে তিনি সেখানে সালাত কিভাবে পড়ছেন, যাকাত কিভাবে দিচ্ছেন ইত্যাদী উদ্দেশ্যমূলক যুক্তির অন্তরালে তাঁকে মৃত সাব্যস্ত করতে চাচ্ছেন, তারা মূলত অন্ধকারেই রয়েছেন। তাদেরকে আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, সালাতের জন্য নির্দিষ্ট সময় আর যাকাতের জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা জরুরি কিনা?

উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে বলুন, আকাশের নিয়ম-কানুন কি ইহজগতের মত? সেখানকার সময় কি ইহজগতের মতই সূর্যের উদয় ও অস্ত যাওয়ার নিয়মের আওতায়? যদি তেমনটা না হয় তাহলে ঈসা (আ.) যে সালাত আদায় করতে ইহ-পরিমন্ডলে আদিষ্ট সেই সালাত তিনি আকাশেও কিভাবে পড়ছেন—এমন আজগুবি প্রশ্ন কেন? আর আকাশে তিনি যাকাত কাকে দেবেন?

সুতরাং বুঝা গেল তাঁর সাথে এগুলোর সম্পর্ক শুধু ইহজগতের সাথে। কে জানি বলেছিল, ঈসা (আ.) আবার পৃথিবীতে আসলে তখন কি তাঁর বয়স কয়েক হাজার বছর হয়ে যাবেনা? এমন নির্বোধ প্রশ্নকারীকে আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, তিরমিজি শরীফে একটি হাদীস আছে, জান্নাতবাসী প্রত্যেক পুরুষ ابناء ثلاث و ثلاثين অর্থাৎ তেত্রিশ বছরের যুবক থাকবে। এখন এই জান্নাতি যুবকরা সেখানে কোটি কোটি বছর থাকার পরেও তেত্রিশ বছরের যুবক থাকতে পারলে হযরত ঈসা (আ.) ঐশী ভ্রমণ শেষে পুনরায় তেত্রিশ বছর বয়সে কেন ফিরতে পারবে না?

11 আল্লাহর বাণী (و يوم اموت و يوم ابعث حيا) সম্পর্কিত সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মলাভ করিয়াছি, যেদিন আমার মৃত্যু হইবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি উত্থিত হইব। (১৯:৩৩ ইফা)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধ কাদিয়ানীরা ঈসা (আ.)-কে মৃত সাব্যস্ত করতে এই আয়াত দ্বারাও একদম অপ্রাসঙ্গিক একটি যুক্তির অবতারণা করে বলে থাকে যে, আয়াতটিতে ঈসা (আ.)-এর জীবনের তিনটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে। জন্ম, মৃত্যু আর পুনরুত্থান। এখানে তাঁর আকাশে যাওয়া এবং শেষ যুগে পৃথিবীতে পুনরায় ফিরে আসার কথা নেই। অথচ এই দুইটি ঘটনাও তাঁকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র এক মর্যাদায় ভূষিত করে থাকে। ফলে প্রমাণিত হয় যে, এই উভয় ধারণাই মিথ্যা। তাদের এই বক্তব্যের উত্তর দিয়েছেন বিশিষ্ট যুগ ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.)। তিনি বলেছেন, ঈসা (আ.) মূলত এই কথাগুলোর মাধ্যমে খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদী মতবাদের খন্ডন করে নিজেকে তাঁর বান্দা হওয়ার ঘোষণা দিতে চেয়েছিলেন। সংক্ষেপে। (তাফসীরে ইবনে কাসীর)। আয়াতে তাঁর জন্ম, মৃত্যু আর পুনরুত্থানের ব্যাপারটি উল্লেখ করার যেই প্রাসঙ্গিকতা তার সাথে অবশিষ্ট ঘটনা দুটির সম্পর্ক নেই বলেই তিনি তা উল্লেখ করেননি। আফসোস! কাদিয়ানী জ্ঞানপাপীরা এখানেও আয়াতের প্রসঙ্গ গোপন রেখে মনগড়া ব্যাখ্যার পিছু নিয়ে থাকে।

12 আল্লাহর বাণী -(و منكم من يرد الى ارذل العمر)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : তোমাদের মধ্যে কাহারও কাহারও মৃত্যু ঘটান হয় এবং তোমাদের মধ্যে কাহাকেও কাহাকেও প্রত্যাবৃত্ত করা হয় হীনতম বয়সে যাহার ফলে উহারা যাহা কিছু জানিত সে সম্বন্ধে উহারা সজ্ঞান থাকে না। (২২:০৫ ইফা)।

ব্যাখ্যা : এখানে ঈসা (আ.)-কে মৃত সাব্যস্ত করতে নির্বোধদের যুক্তি এরকম, ঈসা (আ.) আজ প্রায় দুই হাজার বছর অব্ধি বেঁচে থাকতে পারেন না। বেঁচে থাকলে এই আয়াত অনুযায়ী তিনি নিশ্চয়ই দারুণভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছেন, জ্ঞানহারাও হয়ে পড়েছেন। অথচ কোনো নবীকে আল্লাহ এমন অথর্ব অবস্থায় উপনীত করেননি। কিন্তু কাদিয়ানীদের জন্য দুঃসংবাদ হচ্ছে, তারা ইহলৌকিক সময়ের অবস্থা আর পারলৌকিক সময়ের অবস্থার সাথে কোনো পার্থক্য করেনা। অথচ আল কুরআনে (৭০:৪) আল্লাহর একদিন আমাদের গণনায় ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) বছর (كان مقداره خمسين الف سنة) বলেও উল্লেখ আছে। সে হিসেবে ঈসা (আ.) আরো অন্তত ৪৮ হাজার বছর অতিবাহিত করতে হবে যদি তাঁকে তাঁর ঐশী সফরে মাত্র একদিন অতিবাহিত করতে হয়। কিন্তু এই সূ² কথাগুলো ঐসব নির্বোধদের বুঝানোর সাধ্য কার? পরিশেষে কথা হল, উল্লিখিত আয়াত দ্বারা মূলত পার্থিব জীবনে মানুষের সৃষ্টির সূচনা ও শারিরীক হ্রাস বৃদ্ধির সাধারণ নিয়ম সম্পর্কেই আলোকপাত করা হয়েছে। আমরাও বিশ্বাস করি যে, হযরত ঈসা (আ.) পৃথিবীতে পুনরায় আগমন করার পর তিনিও একটা সময় ইন্তেকাল করবেন। সুতরাং এই আয়াত দ্বারা মোটেও সাব্যস্ত হয় না যে, তিনি বর্তমানেও মৃত, জীবিত নেই।

13 আল্লাহর বাণী -(ولكم فى الارض مستقر و متاع الى حين)এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : আমি বলিলাম, তোমরা একে অন্যের শত্রুরূপে নামিয়া যাও, পৃথিবীতে কিছুকালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রহিল (০২:৩৬ ইফা)।

ব্যাখ্যা : কাদিয়ানী নির্বোধদের দাবী হচ্ছে, এই আয়াত কোনো মানুষকে এই মাটির দেহ নিয়ে আকাশে যাওয়া এবং সেখানে থাকাকে প্রতিহত করছে। অথচ তাদের এই দাবীকে মেনে নিলে তখন মুহাম্মদে আরাবী (সা.)-এর ঐতিহাসিক চির-বিস্ময়কর ঐশী ভ্রমণ (মেরাজ)-কে অস্বীকার করতে হয়। হযরত ইদরিস (আ.)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার যে কথা স্বয়ং কুরআনেই (মরিয়ম/১৯:৫৭) এসেছে সেটিও অমান্য করতে হয়। যা কখনো কোনো মুমিনের জন্য সম্ভব নয়। অধিকন্তু ইমাম ইবনে কাসীরও লিখেছেন যে, ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন رفع الى السماء الرابعة فمات بها অর্থাৎ ইদরিসকে চতুর্থ আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয় অতপর তিনি সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। এবার আমি ঐ ব্রেইন ওয়াশ/কাল্টদের ভ্রান্তি নিরসনে বলতে চাই, উক্ত আয়াত হতে উদ্দেশ্য হল, ইবলিশ শয়তান কর্তৃক আদি পিতা-মাতা আদম হাওয়াকে জান্নাতে পদস্খলন করতে চাওয়ার বিষয়ে বিশ্ববাসীকে জানান দেয়া। আয়াতটিতে এও উল্লেখ রয়েছে যে, বনী আদম পৃথিবীতে এসেছে সামান্য কিছুদিনের জন্য। এখন এখানে কোন্ শব্দে বুঝানো হয়েছে যে, মাটির দেহের কোনো মানুষ মোটেও ঐশী ভ্রমণে যেতে পারবেনা? সুতরাং এই আয়াত দ্বারাও তিনি (ঈসা) বর্তমানেই মৃত, তা মোটেই সাব্যস্ত হয় না।

14 আল্লাহর বাণী (ومن نعمره ننكسه فى الخلق) আয়াতের সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : আমি যাহাকে দীর্ঘ জীবন দান করি প্রকৃতিগতভাবে তাহার অবনতি ঘটাই। তবুও কি উহারা বুঝে না? (৩৬:৬৮ ইফা)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধ কাদিয়ানীরা এই আয়াত উল্লেখপূর্বক দাবী করে যে, আয়াতটিও ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু ঘটে যাওয়ার প্রতি ইংগিত। কারণ শারীরিক দিক থেকে ক্ষয় হয়ে যাওয়ার পূর্বেই অর্থাৎ দৈহিক শক্তি, তাকত ও ক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার মত দুরাবস্থায় উপনীত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ তাঁকে মৃত্যু দান করেছেন এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের জন্য দুঃসংবাদ হচ্ছে, উক্ত আয়াত হতেই যদি ঈসা (আ.)-কে মৃত সাব্যস্ত করা যেত তাহলে স্ববিরোধী নির্যা কাদিয়ানীর নিম্নোক্ত বক্তব্যের কোনো মানেই হয় না। এই যে, তিনি কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণ করেছেন ‘ঈসা (আ.)-এর দ্বিতীয়বারের আগমন করা এবং তাঁর মাধ্যমে ইসলাম সমগ্র দুনিয়ায় প্রচার প্রসার লাভ করার প্রতিশ্রুতিতে ফোরকানী ইশারা এই আয়াতে (সূরা আত-তওবাহ ৩৩) রয়েছে।’ দেখুন, রূহানী খাযায়েন ১/৫৯৩।

এবার নির্বোধদের সংশয় নিরসনে উত্তরে বলতে চাই, মূলত আয়াতটিতে পার্থিব জীবনে মানুষের শারীরিক হ্রাস বৃদ্ধির সাধারণ নিয়ম সম্পর্কেই আলোকপাত করা হয়েছে। আমরাও বিশ্বাস করি যে, হযরত ঈসা (আ.)ও ফিরে এসে যথাসময় উক্ত নিয়মের মুখোমুখি হবেন।

15 আল্লাহর বাণী (ثم جعل من بعد قوة ضعفا و شيبة)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : আল্লাহ, তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেন দুর্বল অবস্থায়, দুর্বলতার পর তিনি দেন শক্তি; শক্তির পর আবার দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। (৩০:৫৪ ইফা)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধ কাদিয়ানীরা এই আয়াতটিও উল্লেখ করে বলে থাকে যে, এই আয়াত দ্বারাই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, ঈসা (আ.)ও পরিণত বয়সে মারা গেছেন। কেননা কোনো মানুষই খোদার সৃষ্টি প্রাকৃতিক নিয়মের বাহিরে নন, তিনি সাধারণ কিবা নবী-রাসূল যেই হোন না কেন! অথচ নির্বোধদের জানা নেই যে, মির্যা কাদিয়ানীর একটি রচনায় উল্লেখ আছে যে, ‘খোদাতায়ালার যে খোদায়ী এবং খোদায়িত্ব তাঁর সীমাহীন কুদরত বা শক্তি এবং তাঁর অগণিত রহস্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাঁকে কানূনের আকারে কোনো সীমার মধ্যে আবদ্ধ করা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়।’ (আল্লাহ ও তাঁর গুণাবলী পৃ-৫৭, প্রকাশকাল ২৭ মে ১৯৯৮ইং। যাইহোক, ঈসা (আ.) বর্তমানে আকাশে (ঐশী ভ্রমণ) থাকায় তিনি বর্তমানে ইহজাগতিক ও প্রাকৃতিক নিয়মের আওতাভুক্ত নন। ফলে তাঁকে এক্ষুণি প্রাকৃতিক নিয়মে আবদ্ধ করে ‘মৃত’ বলে সিদ্ধান্ত দেয়া নেহাতই মূর্খতা বৈ কিছুই না। অধিকন্তু আয়াতটির ব্যাখ্যায় হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর শিষ্য বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত কাতাদাহ (রহ.) বলেছেন, প্রথম দুর্বলতা হচ্ছে শুক্র আর শেষ দুর্বলতা হচ্ছে বৃদ্ধ বয়স যখন তার চুল সাদা হয়ে যেতে থাকে। (তাফসীরে তাবারী)। যাইহোক, আমরাও বিশ্বাস করি যে, ঈসা (আ.) আবার যখন পার্থিব জীবনে ফিরে আসবেন তখন আল্লাহ চাইলে তিনিও প্রকৃতির উক্ত নিয়মের বাহিরে থাকবেন না।

16 আল্লাহর বাণী -(انما مثل الحيوة الدنيا كماء انزلناه من السماء)এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : বস্তুত পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত এইরূপ যেমন আমি আকাশ হইতে বারি বর্ষণ করি যদ্দ্বারা ভূমিজ উদ্ভিদ ঘন-সন্নিবিষ্ট হইয়া উদগত হয়, যাহা হইতে মানুষ ও জীবজন্তু আহার করিয়া থাকে। (১০:২৪ ইফা)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধরা আয়াতটি দ্বারাও ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে যাওয়ার প্রমাণ এইভাবেই পেশ করে যে, এই আয়াতে বলা হয়েছে, পার্থিব জীবন প্রাকৃতিক নিয়মেরই অধীনে। এ প্রাকৃতিক নিয়ম লংঘন করার ক্ষমতা মানুষের নেই, ঈসা (আ.)-এরও ছিলনা। যে যুগে একজন মানুষের গড় আয়ু ধরুন নব্বই বছর ছিল। ঈসা (আ.) না হয় দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন কিন্তু সেই দীর্ঘায়ু তো শত শত বছর হতে পারে না। অতএব ঈসা (আ.) মারা গেছেন, বেঁচে নেই। (নাউযুবিল্লাহ)। উত্তরে বলতে চাই, এই নির্বোধরা কি হযরত আদম (আ.)-এর ৯৬০ বছর, নূহ (আ.)-এর ৯৫০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা, আসহাবে কাহাফের ৩০৯ বছর সময় শুধু ঘুমেই কেটে যাওয়ার ঘটনা অস্বীকার করতে পারবে? তারা কি বরেণ্য কোনো একজন যুগ ইমামের উদ্ধৃতি দিয়ে এগুলোর একটিও রদ করতে পারবে? আহা! এদের কথাবার্তা শুনলে যে কেউই বলতে বাধ্য হয় যে, এরা এতই ব্রেইনওয়াশ যে নিজের চিন্তাশক্তিটা পর্যন্ত এরা নষ্ট করে ফেলেছে! এরা এখানে ইহজগতের যে নিয়ম দ্বারা এমন একজনকে পরিমাপ করছে যে কিনা এই মুহূর্তে পার্থিব ইহজগতেরই বাহিরে।

17 আল্লাহর বাণী -(ثم انكم بعد ذالك لميتون)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : ইহার পর তোমরা অবশ্যই মরিবে। (২৩:১৫ ইফা)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধ কাদিয়ানীরা এই আয়াত দিয়েও ঈসা (আ.)-কে কিভাবে মৃত সাব্যস্ত করছে দেখুন। তারা বলে যে, এই আয়াতেও প্রাকৃতিক নিয়মের অলঙ্গনীয়তার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। এই নিয়মের অধীনে সব কিছুই, প্রতিটি মানুষই। অতএব ঈসা (আ.)ও এই নিয়মের আয়ত্তে যথাসময় ইন্তেকাল করেছেন। জবাবে বলতে চাই, ঈসা (আ.) বর্তমানে যেহেতু প্রাকৃতিক নিয়ম-কানুনের অধীনে নেই, সেহেতু এই মুহূর্তে উনার উপর প্রকৃতির এই নিয়ম-কানুন কোনোভাবেই প্রয়োগ হবেনা।

উল্লেখ্য, বাহায়ী জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা হোসাইন আলী নূরী বাহাউল্লাহও (১৮১৭-১৮৯২ইং) নিজেকে নবুওয়ত ও রেসালতের দাবী করার পাশাপাশি ১৮৬৩ সালে ইরান থেকে বাগদাদে নির্বাসনে থাকাবস্থায় ‘মসীহ’ হওয়ার দাবী করেছিলেন। তার কিতাবুল আকদাস পৃ-৭১ দ্রষ্টব্য। বাহাউল্লাহ ইরানী তার উক্ত দাবীর উপর প্রায় ২৯ বছর জীবিত ছিলেন। বর্তমানে পৃথিবীতে ২১৮টির অধিক রাষ্ট্রে প্রায় ৮০০ জাতি ও বর্ণের মানুষের মাঝে বাহায়ীধর্ম প্রচলিত। অতএব বুঝা গেল, মির্যার মত ইতিপূর্বে আরো অনেকে নিজেকে শুধু নিজেকে ‘রূপক ঈসা’ দাবী করার হীনস্বার্থেই ঈসা (আ.)-কে মৃত সাব্যস্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল। কেউ সফল হয়নি, মির্যা কাদিয়ানীও না।

18 আল্লাহর বাণী (ثم يهيج فتراه مصفرا ثم يجعله حطاما)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : তুমি কি দেখ না, আল্লাহ আকাশ হইতে বারি বর্ষণ করেন, অতপর উহা ভূমিতে নির্ঝররূপে প্রবাহিত করেন এবং তদ্দ্বারা বিবিধ বর্ণের ফসল উৎপন্ন করেন, অতপর ইহা শুকাইয়া যায়। ফলে তোমরা ইহা পীতবর্ণ দেখিতে পাও, অবশেষে তিনি উহা খড়-কুটায় পরিণত করেন? ইহাতে অবশ্যই উপদেশ রহিয়াছে বোধশক্তিসম্পন্নদের জন্য। (৩৯:২১ ইফা)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধ কাদিয়ানীরা এই আয়াত দিয়েও ঈসা (আ.)-কে মৃত সাব্যস্ত করার জন্য বলে থাকে যে, এই আয়াতেও প্রাকৃতিক নিয়ম বা কানুনে কুদরতের কথা বলা হয়েছে, যা কেউ লঙ্গন করতে পারেনা। জবাবে বলব, প্রথমত এধরণের প্রশ্নের উত্তর একটু আগেই অন্যখানে বহুবার দেয়া হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, এই আয়াতের সম্পূর্ণ বিষয়বস্তু ইহকালীন অবস্থার সাথে সম্পর্কযুক্ত। ফলে এর সাথে ঈসা (আ.)-কে জড়ানো পুরোই অপ্রাসঙ্গিক। বরং অত্র আয়াতে বুঝানো হয়েছে যে, এই পার্থিব দুনিয়ার মুহাব্বত একদমই অনর্থক। কারণ অতি অল্প সময়ের মধ্যে এটি ধ্বংস হয়ে যাবে। তার চাকচিক্য ও সতেজতা, তার শ্যামলতা ও সৌন্দর্য এবং তার আমোদ-প্রমোদ, আরাম-আয়েশ ক্ষণকালের জন্য।

19 আল্লাহর বাণী (الا انهم ليأكلون الطعام)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : তোমার পূর্বে আমি যে সকল রাসূল প্রেরণ করিয়াছি তাঁহারা সকলেই তো আহার করিত ও হাটেবাজারে চলাফেরা করিত। হে মানুষ। আমি তোমাদের মধ্যে এক-কে অপরের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ করিয়াছি। তোমরা ধৈর্যধারণ করিবে কি? তোমার প্রতিপালক সমস্ত কিছু দেখেন। (২৫:২০ ইফা)।

ব্যাখ্যা : কাদিয়ানী নির্বোধরা এই আয়াত দ্বারাও বুঝাতে চায় যে, ঈসা (আ.)-এর ক্ষেত্রেও ইহজগতের এই সমস্ত খাবার-দাবার ইত্যাদীর কোনো প্রকার ব্যতিক্রম ঘটেনি। অর্থাৎ তিনি এখন আর ইহজগতে নেই, ইহজগতের ন্যায় আহারও করেন না। তার মানে তিনি মারা গেছেন। প্রতিউত্তরে বলতে চাই, ঈসা (আ.) ইহজগতে আবার ফিরে আসার আগ পর্যন্ত এইভাবে কেয়াস করে তাঁকে মৃত সাব্যস্ত করা মস্তবড় পাগলামি ছাড়া কিছুই না। যেহেতু এই আয়াতের প্রেক্ষাপট বলছে যে, আয়াতটি ইসলামের প্রাথমিকযুগের মুশরিকদের কতেক ধারণাকে অহেতুক আখ্যা দিতেই নাযিল হয়েছিল। কারণ মুশরিকদের ধারণা ছিল যিনি নবী হন তিনি খাবার গ্রহণ করেন না, হাটেবাজারে চলাফেরা করেননা। আল্লাহতালা তাদের আপত্তি খন্ডন করে বলেন, মুহাম্মদ (সা.) সহ পূর্বের সমস্ত নবী রাসূল মানুষই ছিলেন, খাবারও গ্রহণ করেছেন, সাংসারিক প্রয়োজনে হাটে-বাজারেও গিয়েছেন। কাজেই এগুলো কোনোভাবেই নবুওয়তী মর্যাদার পরিপন্থী নয়, যেমনটি তোমরা অজ্ঞতাবশত ভাবছো (তাফসীরে কুরতুবী)।

এবার নির্বোধদের উদ্দেশ্যে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ‘আসহাবে কাহাফ’ কুদরতে ইলাহীর মাধ্যমে ৩০৯ বছর যাবত পানাহার ছাড়াই বেঁচে থাকতে পারলে এখন ঈসা (আ.) কিজন্য পারবেন না? অথচ রাসূল (সা.) বলেছেন,

يجزى اهل السماء من التسبيح و التقديس

অর্থাৎ তাসবীহ এবং তাকদীস (আল্লাহর নামে যিকির আযকার) ঐশী জগতবাসীর খাবারের জন্য যথেষ্ট। (দেখুন, মেশকাত শরীফ হাদীস নং ৬২৯৪)। ইমাম ইবনু কাইয়ুম (রহ.) লিখেছেন, ‘মসীহ ইবনে মরিয়ম জীবিত, ইন্তেকাল করেননি আর (আকাশে) তাঁর খাবার দাবার ফেরেশতার মতই। (দেখুন, আত-তিবইয়ান ফী আক্বসামিল কুরআন পৃ- নং ২৫৫, ইবনু কাইয়ুম)।

20 আল্লাহর বাণী (اموات غير احياء وما يشعرون ايان يبعثون) -এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : উহারা আল্লাহ ব্যতীত অপর যাহাদের আহবান করে তাহারা কিছুই সৃষ্টি করে না, তাহাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়। তাহারা নিষ্প্রাণ নির্জীব এবং কখন তাহাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করা হইবে সে বিষয়ে তাহাদের কোনো চেতনা নাই। (১৬:২০-২১ ইফা)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধ কাদিয়ানীদের বক্তব্য হচ্ছে, এই আয়াত অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলছে যে, আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে উপাস্যরূপে ডাকা হয় সবাই নির্জীব ও নিষ্প্রাণ। সুতরাং ঈসা (আ.)ও এখন মৃত বলেই প্রমাণিত হচ্ছে। কেননা খ্রিস্টানরা তাঁকে খোদারপুত্র খোদা বলেই ডাকে। প্রতিউত্তরে বলতে চাই যে, উক্ত আয়াতের اموات তথা নির্জীব শব্দ হতে মুশরিকদের হাতে বানানো জড়পদার্থ প্রতিমাগুলোই বিশেষভাবে উদ্দেশ্য। এতে পথভ্রষ্ট আহলে কিতাবীদের উপাস্য সেসব সম্মানীত ব্যক্তিবর্গ শামিল নন যাঁদের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে পূর্ব থেকেই কল্যাণ নির্ধারিত। যেমন বিবি মরিয়ম, আল্লাহর নবী হযরত উজায়ের, ঈসা। এই সম্পর্কে আল্লাহতালা বলেন,

ان الذين سبقت لهم منا الحسنى اولئك عنها مبعدون

অর্থাৎ ‘আমার পক্ষ থেকে যাদের জন্য পূর্বেই কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদেরকে তা থেকে দূরে রাখা হবে (২১:১০১)।’ এতেই প্রমাণিত হয় যে, আয়াতে اموات বা নির্জীব শব্দটি ‘খাস’; ‘আম’ নয়। কিন্তু যদি আয়াতটির اموات হতে বিনা ব্যতিক্রমে সবাইকে উদ্দেশ্য নেয়া হয় তখন নিচের প্রশ্নগুলোর কোনোই জবাব থাকেনা।

১. যেহেতু ঐ আয়াতেই এসেছে ‘পুনরুত্থান সম্পর্কে যাদের কোনো খবর নেই’। তাই প্রশ্ন হল, তবে কি নবীগণও পুনরুত্থান সম্পর্কে বেখবর তথা অসচেতন? নাউযুবিল্লাহ।

২. সূরা আম্বিয়া আয়াত নং ৯৮ এর মধ্যে আল্লাহতালা সে সমস্ত উপাস্যকেও জাহান্নামের জ্বালানি বলেছেন মুশরিকরা যাদের উপাসনাকারী। তাই প্রশ্ন হল, তবে কি কাদিয়ানীরা এ হিসেবে উজায়ের এবং ঈসাকেও জাহান্নামের জ্বালানি মনে করবে? নাউযুবিল্লাহ।

21 আল্লাহর বাণী (ولكن رسول الله و خاتم االنبيين)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নয়; বরং সে আল্লাহর রাসূল এবং নবীগণের আগমনীধারা সমাপ্তকারী। (৩৩:৪০)। ‘খাতামান নাবিয়্যীন’ অর্থ নবীগণের সমাপ্তকারী (রূহানী খাযায়েন ৩/৪৩১, লিখক মির্যা কাদিয়ানী)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধ কাদিয়ানীদের বক্তব্য হল, ‘খাতামান নাবিয়্যীন’ সংক্রান্ত এ আয়াতে একথা ব্যক্ত করা হয়েছে যে, মহানবীর আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে পূর্ববর্তী নবীগণের আগমনের সিলসিলাহ বা ধারাক্রম শেষ হয়ে গেছে। অতএব ঈসা (আ.) এর পুনরাগমনের ধারণাটা কল্পিত প্রসূত। অর্থাৎ তিনি মারা গেছেন, আর আসবেন না। এই নির্বোধরা আসলে জানেই না যে, ‘শেষনবী’ এর সংজ্ঞায় কী বলা হয়েছে? যদি তারা তা জানত তাহলে ঈসা (আ.)-এর পুনরাগমনের বিশ্বাসকে কখনোই ‘খাতামান নাবিয়্যীন’ শীর্ষক আয়াতের বিরোধী মনে করত না।

এবার তাহলে জেনে নিন, “শেষনবী” এর সংজ্ঞায় ইমাম যামাখশারী (মৃত. ৪৬৭ হিজরী) কী লিখেছেন। তিনি লিখেছেন ‘আমি মনে করি, মুহাম্মদ (সা.) সর্বশেষ নবী—একথার অর্থ হল তাঁর পরে আর কাউকে নবী বানানো হবেনা, আর ঈসা (আ.)-কে তো তাঁর আগেই নবী বানানো হয়েছে। আর তিনি যখন পুনরাগমন করবেন তখন তিনি মুহাম্মদ (সা.)-এর শরীয়তের উপর একজন আগমনকারী হবেন এবং তাঁর কেবলার দিকেই সালাত আদায়কারী হবেন, যেমন নাকি তিনিও অপরাপর উম্মতগণের মত একজন উম্মতই।’ (তাফসীরে কাশশাফ খ-২২ সূরা আহযাব ৪০)।

তাছাড়া তাফসীরে সমরকান্দী-এর ১ম খন্ডের ২৭২ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে ‘ঈসা (আ.) আল্লাহর নিকট শেষনবীর উম্মত হতে চেয়ে দোয়া করেছিলেন। তাই আল্লাহতালা তাঁর উক্ত দোয়া কবুল করেছেন।’ (সূরা আলে ইমরান আয়াত নং ৫৫ এর তাফসীর)। মির্যা কাদিয়ানীর বইতেও লিখা আছে, “আগমনকারী মসীহ’র জন্য আমাদের নবী করীম (সা.) নবুওয়ত শর্ত করেননি।” (রূহানী খাযায়েন ৩/৫৯)।

সুতরাং প্রমাণিত হয়ে গেল যে, ঈসা (আ.)-এর পুরনাগমন নবুওয়তের দায়িত্ব সহকারে হবেনা, শুধুমাত্র একজন উম্মতে মুহাম্মদী হিসেবে হবে। যেহেতু তাঁর পুনরাগমনে নবুওয়তের দরজায় ধাক্কা লাগবেনা। ফলে ‘খাতামান নাবিয়্যীন’ সংক্রান্ত আয়াত কোনোভাবেই ঈসা (আ.)-এর পুনরাগমনের বিরোধিতা করেনা।

22 আল্লাহর বাণী (وما ارسلنا من قبلك الا رجالا نوحى اليهم)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : তোমার পূর্বে আমি ওহীসহ পুরুষই প্রেরণ করিয়াছিলাম, তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীগণকে জিজ্ঞাসা কর। (১৬:৪৩ ইফা)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধ কাদিয়ানীরা এই আয়াতের মর্মার্থ বাইবেলের নাম ভেঙ্গে উপস্থাপন করে বলে থাকে যে, এই আয়াতের নির্দেশ মতে ইহুদী ও খ্রিস্টানদের কিতাবগুলোর মধ্যে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাওয়া যাবে যে, পূর্ববর্তী কোনো নবীর পুনরাগমন হতে রূপকভাবে অন্য কারো আগমনকে বুঝায়। কেননা ইহুদীদের বিশ্বাস ছিল, আকাশ হতে ইলিয়া নবীর আগমন হবে, তার পূর্বে ‘মসীহ’ আসতে পারেনা। কিন্তু যীশু (ঈসা) এসে বলেছিলেন যে, যাকারিয়ার পুত্র যোহন বা ইয়াহ্ইয়াই হলেন ইলিয়া (এলিজা বা এলিয়াস)।

উত্তরে বলতে চাই, প্রকৃতপক্ষে এই আয়াত দ্বারা বুঝানো উদ্দেশ্য যে, ইতিপূর্বে যত রাসূলই প্রেরিত হয়েছিলেন তারা প্রত্যেকে মানুষ ছিলেন। অতএব যদি মুহাম্মদও একজন মানুষ হন তাহলে এটা কোনো নতুন কথা নয় যে, তোমরা তাঁর মানুষ হওয়ার কারণে তাঁর রেসালতকে অস্বীকার করবে। কিন্তু কাদিয়ানীরা নিজেদের উদ্দেশ্যকে পোক্ত করতে কিভাবে দরাকে সরা বানিয়ে দিল তা নিশ্চয়ই দেখেছেন। যাইহোক, এবার তথাকথিত ‘ইলিয়া’ নবী নিয়ে তাদের কাসুন্দির পোস্টমর্টেম করছি।

প্রথমত, বাইবেলের সবকয়টি সংস্করণই বর্তমানে বিকৃত ও পরিবর্তিত। দ্বিতীয়ত, ইউহান্নাহ বা যোহনের ইঞ্জিলেই লেখা আছে, “তদানিংকালের জেরুজালেমের নেতৃস্থানীয় ইহুদী নেতাদের প্রশ্নের উত্তরে ইউহান্নাহ তথা যোহন নিজেই ইলিয়া হওয়া অস্বীকার করেছেন।” মির্যা কাদিয়ানীও একথা স্বীকার করে লিখে গেছেন। দেখুন রূহানী খাযায়েন ২১/৪২-৪৩। কাজেই ইলিয়া সংক্রান্ত বাইবেলের উক্ত তথ্যটি সত্য নয়, বরং মিথ্যা। কেননা যোহন বা ইয়াহ্ইয়া (ইউহান্নাহ) যদি নিজেই নিজের ‘ইলিয়া’ হওয়া অস্বীকার করে থাকেন তাহলে এটাও নিশ্চিত সত্য যে, ঈসা (আ.) কখনো যোহনকে ‘ইলিয়া’ আখ্যা দেননি। অন্যথা দুইজনের যে কোনো একজন মিথ্যাবাদী হয়ে যাচ্ছেন, যা কখনো নবীর বৈশিষ্ট্য হতে পারেনা। সুতরাং ইলিয়া সংক্রান্ত পুরো ঘটনাটিই জাল ও বাতিল। ফলে এর উপর কথিত রূপক মসীহর ভিত্তি স্থাপন করতে চাওয়া এবং তারই কিয়াস করে শেষযুগে আগমনকারী ঈসাকে (আ.) রূপক দাবী করা সম্পূর্ণরূপে বাতিল।

23 আল্লাহর বাণী -(يأيتها النفس المطمئنة ارحعى الى ربك راضية مرضية)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : হে প্রশান্তচিত্ত! তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়া আস সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হইয়া। (৮৯:২৭-৩০ ইফা)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধ কাদিয়ানীরা এই আয়াত হতে ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু আবিষ্কার করে কিভাবে জেনে নিন। তাদের বক্তব্য হল, এই আয়াতে বলা হয়েছে যে, মৃত্যুর পরে শান্তিপ্রাপ্ত আত্মা জান্নাতের মধ্যে জান্নাতবাসীগণের সঙ্গী হয়। মৃত্যুর পূর্বে কেউ জান্নাতবাসী হয় না। মেরাজের বিবরণে বুখারীর হাদীসে বলা হয়েছে যে, মহানবী (সা.) হযরত ঈসা (আ.)-কে জান্নাতবাসীগণের মধ্যে দেখেছেন। অতএব, বুঝা গেল মৃত্যুর পরেই ঈসা (আ.) জান্নাতে প্রবেশ করেছেন। এখন এর জবাবে আমার পাল্টা চ্যালেঞ্জ থাকল, ঈসা (আ.)-কে দেখেছেন ‘জান্নাতে বা জান্নাতবাসীগণের মধ্যে’ এইরূপ শব্দচয়নে কোনো কথা নেই, এটি বরং কাদিয়ানীদের বানানো কথা। যদি কারো সাহস থাকে তাহলে দশ লক্ষ টাকার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন। দ্বিতীয়ত, ইবনে মাজাহ এর ৪০৮১ নং হাদীসে মেরাজ সংক্রান্ত একটি হাদীসে রয়েছে যে,

فَرُدَّ الْحَدِيْثُ اِلَى عِيْسَى ابْنِ مَرْيَمَ قَالَ قَدْ عُهِدَ اِلَى فِيْمَا دُوْنَ وَجْبَتُهَا فَاَمَّا وَجْبَتُهَا فَلَا يَعْلَمُهَا اِلَّا اللهِ عَزَّ وَ جَلَّ

“…অতপর কেয়ামতের বিষয়টি ঈসা (আ.)-এর নিকট পেশ করা হলে তিনি বলেন, আমার কাছ থেকে কেয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে দুনিয়ায় ফেরার প্রতিশ্রুতি নেয়া হয়েছে। কিন্তু কেয়ামতের সঠিক জ্ঞান আল্লাহ ব্যতীত কারো কাছে নেই।”

পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ৪৬ নং আয়াত ويكلم الناس فى المهد و كهلا এর মধ্যে ‘ইয়ুকাল্লিমু’ (তিনি কথা বলবেন) ভবিষ্যৎবাচক ক্রিয়াপদ দ্বারা ঈসা (আ.) প্রৌঢ় বয়সেও মানুষের সাথে কথা বলবেন মর্মে আল্লাহর এই প্রতিশ্রুতিটাও তাঁর দুনিয়ায় ফিরে আসার সমর্থনে শক্তিশালী ইংগিতবিশিষ্ট। উল্লেখ্য, প্রাচীন আরবী অভিধানগ্রন্থ ‘লিসানুল আরব’-এর মধ্যে রয়েছে, ‘কাহল’ বা প্রৌঢ় বয়স বলতে ৩৪ থেকে ৫১ বছরের মধ্যবর্তী বয়সকেই বুঝানো হয়। আর ইসলামিক সমস্ত অথেনটিক সোর্সগুলো ঘেঁটে দেখুন, ঈসা (আ.)-এর জীবন-ইতিহাস ৩৩ বছরের বাহিরে খুঁজে পাবেন না।

24 আল্লাহর বাণী (الله الذى خلقكم ثم رزقكم ثم يميتكم ثم يحييكم)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : আল্লাহই তোমাদেরকে সৃষ্টি করিয়াছেন, অতপর তোমাদেরকে রিযিক দিয়াছেন, তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাইবেন ও পরে তোমাদেরকে জীবিত করিবেন। (৩০:৪০ ইফা)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধ কাদিয়ানীদের বক্তব্য হচ্ছে আয়াতটিতে মানব-জাতির চারটি পর্যায় বা অবস্থার কথা বলা হয়েছে। এটাই আল্লাহ’র সৃষ্ট প্রাকৃতিক নিয়ম। সবাই এ নিয়মের আওতায়। জন্মগ্রহণ, বুদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়া, মৃত্যুবরণ করা এবং পুনরুত্থিত হওয়া। এর ব্যতিক্রম ঘটবেনা। ঈসা (আ.)-এর জীবনেও না। সুতরাং ঈসা (আ.)ও এই নিয়মের আওতায় হিসেবে তিনি এখন আকাশে থাকতে পারেন না, বরং মৃতুবরণ করে কবরে রয়েছেন। জবাবে বলতে চাই যে, আচ্ছা ঈসা (আ.)-এর জন্মটা তো পিতা বিহীন এবং কোনো ইনসানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়াই হয়েছিল। তাহলে প্রচলিত নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটলো না কিভাবে? খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদী মতবাদের খন্ডনের জন্য কি এটুকুই যথেষ্ট নয় যে, প্রকৃত ঈশ্বর জন্ম হন না; অথচ তারা যাঁকে ঈশ্বর বানিয়ে বসে আছে তিনি জন্ম নিয়েছেন?

আহা আফসোস! নির্বোধ কাদিয়ানীরা বুঝলো না যে, আল্লাহর প্রতিটি কাজই হেকমতপূর্ণ। তাঁর কোনো কাজই অনর্থক নয়। আর তিনি আপনা সিদ্ধান্তে স্বাধীন, কোনো নিয়মই তাঁকে আটকাতে পারেনা। আসল কথা হল, ঈসা (আ.)-এর পুরো জীবনটাই দুনিয়ার মানুষদের জন্য একটি পরীক্ষা। বিনা পিতায় সৃষ্টি হওয়ায় চির দুশমন ইহুদী-জাতি তাঁকে জারজ সন্তান আখ্যা দিয়ে নিজেদের পরকাল ধ্বংস করেছে। খ্রিস্টানরা তাঁকে ঈশ্বরপুত্র বলে নিজেদের বিচারবুদ্ধি আর পরকাল দুটোই নষ্ট করেছে। পৃথিবীর শেষ লগ্নে এসে মুসলিম জাতির মধ্যে কাদিয়ানী, বাহায়ী সম্প্রদায় তাঁর সশরীরে ঐশী ভ্রবণ ও দুনিয়ায় আবার ফিরে আসাকে অমান্য করে শুধু ইসলামের মূলধারা থেকে বেরিয়ে যায়নি, বরং খতমে নবুওয়তের আকীদাকেও অস্বীকার করে বসেছে। ফলে তারা ইসলামের গন্ডি থেকে আপনা-আপনি বহিষ্কৃত হয়ে গেছে।

এবার ঈসা (আ.)-কে আল্লাহ কিভাবে পরীক্ষামূলক হিসেবে সৃষ্টি করলেন তার একটি প্রমাণ সূরা আলে ইমরান এর ৮১ নং আয়াত থেকে নিন। এখানে আল্লাহতালা রূহের জগতে সমস্ত নবী রাসূল থেকে শেষনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ঈমান আনয়ন ও আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি নেয়ার কথা রয়েছে, যেমন, و اذ اخذ الله ميثاق النبيين অর্থাৎ যখন আল্লাহ নবীগণ থেকে প্রতিশ্রুতি নিলেন…। নবীগণও সে সময় আল্লাহর দেয়া প্রতিশ্রুতি গ্রহণপূর্বক বলেছিলেন اقرارنا তথা ‘আমরা স্বীকার করলাম’। হযরত ইবনে আব্বাস এবং আলী প্রমুখ থেকেও এইধরণের মতামত প্রমাণিত। (তাফসীরে তাবারী দ্রষ্টব্য)। আল্লাহতালা হযরত ঈসা (আ.)-কে উঠিয়ে নিয়ে গেছেন যাতে দুনিয়ায় আবার ফিরে আসার মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়ত এবং রেসালতের উপর ঈমান গ্রহণ ও তার শরীয়ত বরণ দ্বারা রূহের জগতে গৃহীত প্রতিশ্রুতি অন্যান্য সকল নবী রাসূলের পক্ষ হতে বাস্তবায়িত হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে বিষয়গুলো এত পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকার পরেও নির্বোধরা সাত অন্ধের হাতি দেখা অন্ধ বধিরদের মতই আচরণ করছে। পরিতাপের বিষয় যে, তারা তাদের পন্ডিতদের এগুলো জিজ্ঞেসও করেনা!

25 আল্লাহর বাণী -(كل من عليها فان و يبقى وجه ربك)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : ভূপৃষ্ঠে যাহা কিছু আছে সবই নশ্বর (ধ্বংসশীল), অবিনশ্বর কেবল তোমার প্রতিপালকের সত্তা যিনি মহিমাময় মহানুভব। (৫৫:২৬-২৭ ইফা)।

ব্যাখ্যা : এই আয়াত দিয়ে কাদিয়ানীরা যে খোঁড়া যুক্তির জোড়াতালি প্রদর্শন করে সেটি হল, এই আয়াত দ্বারা বুঝা গেল পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্ট সবই ধ্বংসশীল। সৃষ্টির এই ধ্বংসধারার একটা পরিসমাপ্তি ঘটে মৃত্যুর সঙ্গে, সেই মৃত্যু যে কোনোভাবেই হোক। সবাই এই প্রাকৃতিক নিয়মের আওতায়। হযরত ঈসা (আ.)ও এর বাহিরে নন। অতএব তাঁরও দেহ গঠনের পূর্ণত্বে পৌঁছার পর ক্ষয়েরধারা থেকে মুক্ত ছিলনা বলে তাও প্রাকৃতিক নিয়মে যথাসময়ে ক্ষয়প্রাপ্তির স্তরে পৌঁছে গেছে অর্থাৎ তিনি (ঈসা) মারা গেছেন। (কাদিয়ানীদের বক্তব্য শেষ হল)। উত্তরে বলতে চাই, জ্বী হ্যাঁ; আমরা মুসলমানরাও বিশ্বাস করি যে, হযরত ঈসা (আ.) যখন ফিরে আসবেন তখন যথাসময় মৃত্যুবরণও করবেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তো তিনি ইহজগতের ধরাছোঁয়ার সম্পূর্ণ বাহিরে।

26 আল্লাহর বাণী -(ان المتقين فى جنة و نهر)এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : মুত্তাকীরা থাকিবে স্রোতস্বিনী বিধৌত জান্নাতে, যোগ্য আসনে, সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী আল্লাহর সান্নিধ্যে। (৫৪:৫৪-৫৫ ইফা)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধ কাদিয়ানীরা আয়াতটির মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে বলতে চায়, জান্নাতে প্রবেশ করে মানুষ মৃত্যুর দুয়ার দিয়েই, অন্য কোনো উপায়ে নয়। অতএব ‘বাল রাফা’আহুল্লাহু ইলাইহি’ এর অর্থ যখন করা যে, ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর সান্নিধ্যে তুলে নেয়া হয়েছে তখন তো এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তিনি (আ.) মৃত্যুর পরেই আল্লাহর দিকে উন্নীত হয়েছেন। যেহেতু ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি’ এর ‘ইলাইহি’ এবং ‘বাল রাফা’আহুল্লাহু ইলাইহি’ এর ‘ইলাইহি’ সমার্থক ও সমান তাৎপর্যবহ। আর খোদার দিকে উন্নীত হয়ে কেউ আর পৃথিবীর দিকে পতিত হয় না। সুতরাং ঈসা (আ.) খোদার দিকে উন্নীত হয়েছেন বলেই তাঁর আর পৃথিবীর দিকে পতিত হওয়ার সুযোগ নেই অর্থাৎ তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। (কাদিয়ানীদের বক্তব্য শেষ হল)। জবাবে বলতে চাই, নির্বোধদের কি জানা নেই যে, হযরত ঈসা (আ.)-এর রাফা অর্থাৎ তুলে নেয়ার ঘটনা যদি ফেরেশতা আজরাইলের মাধ্যমে ঘটত তবেই না তাঁর ‘রাফাহুল্লাহু’ আর ইন্নালিল্লাহি-এর ‘ইলাইহি (اليه)’ একই তাৎপর্য বহনকারী হত! এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পূর্বে করা হয়ে গেছে। সূরা নিসা’র ৫৮ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় [ক্রমিক নং ২] দেখুন!

27 আল্লাহর বাণী (ان الذين سبقت لهم منا الحسنى اولئك عنها مبعدون)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : যাহাদের জন্য আমার নিকট হইতে পূর্ব হইতে কল্যাণ নির্ধারিত রহিয়াছে তাহাদেরকে উহা (জাহান্নাম) হইতে দূরে রাখা হইবে। (২১:১০১ ইফা)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধরা এখানেও কাসুন্দির ত্যানা পেঁচিয়ে বলে যে, এখানে ঈসা (আ.)-এর ন্যায় উজায়ের (আ.)-এর কথাও উল্লেখযোগ্য। যেহেতু ইহুদীরা উজায়ের (আ.)-এরও পূজা করত এবং আল্লাহর পুত্র সাব্যস্ত করত। অথচ তাদের কেউই নিজেদের উপাস্য হবার দাবী করেননি। ফলে উজায়ের যেমন জান্নাতি হয়েছেন মৃত্যুর পরে, ঈসা (আ.)ও অনুরূপ জান্নাতি হয়েছেন মৃত্যুর পর। (কাদিয়ানীদের বক্তব্য শেষ হল)। উত্তরে বলতে চাই যে, আয়াতটির প্রসঙ্গ নিয়ে যারাই চিন্তা করে থাকেন তাদের নিকট গোপন থাকেনি যে, নির্বোধরা কত হীন কায়দায় আয়াতের বিষয়বস্তুকে বিকৃত করেছে। অথচ আয়াতের মানশা বা উদ্দেশ্য হচ্ছে কোনো কোনো মানুষের মনে এ প্রশ্ন জাগতে পারে যে ঈসা, উজায়ের, ফেরেশতা ও বহু সৎলোকেরও তো উপাসনা করা হয়ে থাকে, তাহলে এরাও কি তাদের ইবাদতকারীদের সাথে জাহান্নামে যাবে? আল্লাহতালা তাদের এই শঙ্কা দূর করতেই আয়াতটি নাযিল করেছেন। আসলে সত্যি বলতে কোনো গোষ্ঠী দলিল-প্রমাণে একদমই দেউলিয়া হয়ে গেলে অবস্থা যা হয় কাদিয়ানীদেরও হুবহু তাই হয়েছে!

28 আল্লাহর বাণী (اين ما تكونوا يدرككم الموت و لو كنتم فى بروج مشيدة)-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাইবেই, এমনকি সুউচ্চ সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান করিলেও। (০৪:৭৮ ইফা)।

ব্যাখ্যা : উক্ত আয়াত হতে নির্বোধ কাদিয়ানীরা যে যুক্তি দাঁড় করে সেটি হচ্ছে, আয়াতটি দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, মৃত্যুর হাত থেকে কারো রেহাই নেই। এখনও কেউ নিস্তার পাচ্ছেনা, ভবিষ্যতেও পাবেনা, অতীতেও কেউ পায়নি। ঈসা (আ.)ও না। কেননা আল্লাহর চিরন্তন রীতি বা নিয়মে কোনো ব্যতিক্রম নেই। সুতরাং ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে যাওয়ার পক্ষে এই আয়াত অত্যন্ত বলিষ্ঠ দলিল। (কাদিয়ানীদের বক্তব্য শেষ হল)। উত্তরে জিজ্ঞেস করতে চাই যে, আচ্ছা উক্ত আয়াতের সঠিক মর্মার্থ হযরত মুহাম্মদ (সা.) ভালো জানতেন নাকি কাদিয়ানীরা ভালো জানে? একজন প্রকৃত শিক্ষিত মুসলমান অবশ্যই বিশ্বাস করবে যে, পবিত্র কুরআনের প্রতিটি আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা ও মর্মবাণী মুহাম্মদ (সা.)ই সবার চেয়ে ভালো বুঝতেন। তাহলে এবার শুনুন, হযরত মুহাম্মদ (সা.) হযরত ঈসা (আ.)-এর দীর্ঘ-জীবন সম্পর্কে কী বলে গেছেন। তিনি (সা.) বলেছেন,

مَدَّ فِىْ عُمْرِهِ حَتَّى اَهْبَطَ مِنَ السَّمَاءِ اِلَى الْاَرْضِ وَ يَقْتُلُ الدَّجَالَ

অর্থাৎ আল্লাহতালা তাঁর (ঈসা) হায়াত দীর্ঘায়িত করে দিয়েছেন, যাতে তিনি আকাশ থেকে দুনিয়ায় নেমে আসেন এবং দাজ্জালকে হত্য করেন। (দেখুন ইমাম জালাল উদ্দীন সুয়ূতী রহ. সংকলিত ‘দুররে মানছূর’ খ-২ পৃ-৩৫০)। সুতরাং বুঝা গেল, আল্লাহর সুন্নাহ বা রীতিনীতিকে কাদিয়ানীরা যেভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে তা পুরোপুরি সঠিক নয়।

29 আল্লাহর বাণী وما اتاكم الرسول فخذوه و ما نهكم عنه فانتهوا-এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : রাসূল তোমাদিগকে যাহা দেয় তাহা তোমরা গ্রহণ কর এবং যাহা হইতে তোমাদিগকে নিষেধ করে তাহা হইতে বিরত থাক এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আল্লাহ তো শাস্তিদানে কঠোর। (৫৯:০৭ ইফা)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধরা এই আয়াত দিয়েও কাসুন্দি করে বেড়ায়। বলতে পারেন সে কাসুন্দিটা কী রকম? তাহলে শুনুন, তারা বলে যে, এই আয়াতের দাবী হল, মানুষের হায়াত মউতের ব্যাপারে রাসূল (সা.) কী বলেছেন তা আমাদের দেখা উচিত। এই ব্যাপারে একটি হাদীসে এসেছে, এই পৃথিবীর বুকে (على ظهر الارض) এমন কেউ নেই যে, শত বছর গত হয়ে যাবে তবু জীবিতই থেকে যাবে। সুতরাং এর দ্বারা প্রমাণিত হল যে, ঈসা (আ.)ও আর বেঁচে নেই। কারণ তিনি বেঁচে থাকলে এখন তাঁর বয়স দুই হাজার বছর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। (কাদিয়ানীদের বক্তব্য শেষ হল)।

জবাবে এই নির্বোধদের জিজ্ঞেস করতে চাই যে, হাদীসটির সাথে হযরত ঈসা (আ.)-এর সম্পর্ক কোথায়? তাঁর অবস্থান কি পৃথিবীর বুকে না বাহিরে? তাঁর অবস্থান যে পৃথিবীর বুকে নন, বরং বাহিরে; একথার প্রমাণের জন্য কি আল্লাহ এবং তাঁর শেষনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বক্তব্য আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়? এখানে আরেকটি কথা ক্লিয়ার করা দরকার যে, দুনিয়ার নিয়ম কানুনের সাথে ঐশী জগতের নিয়ম কানুনকে যারা তুলনা করে বলতে চাচ্ছেন যে, হযরত ঈসা (আ.) বেঁচে থাকলে এখন তাঁর বয়স দুই হাজার বছর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে তারা মূলত অন্ধাকারেই আছেন। কারণ সময় বা ঞরসব ঐশী জগতে গতিশীল নয়, বরং স্থীর। তাই সেখানে ঈসা (আ.)-এর বয়স বাড়বেনা বরং আগের জায়গায় অর্থাৎ তেত্রিশই থাকবে। মুসলিম শরীফের হাদীসের খন্ডাংশ اذا طأطأ رأسه قطر (তিনি যখন মাথা নিচু করবেন তখন সদ্য গোসলখানা থেকে বেরিয়ে আসা ব্যক্তির মাথা থেকে যেভাবে পানি ঝরতে থাকে সেভাবে তার মাথা থেকে পানির ফোটা ঝরতে থাকবে) ঐশী জগতে সময় দুনিয়ার ন্যায় গতিশীল নয়, সে কথার দিকেই ইংগিত। (মুসলিম শরীফ, কিতাবুল ফিতান)। উল্লেখ্য, ঈসা (আ.)-কে যখন আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল তিনি তখন সদ্য গোসলখানা থেকে গোসল সেরে বের হয়েছিলেন… (وَرَأسُهُ يَقْطُرُ مَاءُ), (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২য় খন্ড দ্রষ্টব্য)।

30 আল্লাহর বাণী (او ترقى فى السماء و لن نؤمن لرقيك حتى تنزل علينا كتابا نقرؤه) -এর সঠিক তাৎপর্য।

আয়াত : ‘অথবা তোমার একটি স্বর্ণ নির্মিত গৃহ হইবে, অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করিবে, কিন্তু তোমার আকাশ আরোহণে আমরা কখনও ঈমান আনিব না যতক্ষণ তুমি আমাদের প্রতি এক কিতাব অবতীর্ণ না করিবে যাহা আমরা পাঠ করিব। বল (হে মুহাম্মদ)! পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক। আমি তো হইতেছি কেবল একজন মানুষ; একজন রাসূল।’ (১৭:৯৩)।

ব্যাখ্যা : নির্বোধ আর প্রতারকের দল উক্ত আয়াতটি দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে এই বলে ধোকা দেয় যে, এই আয়াতে কারীমা থেকে জানা যায় যে, কাফেররা মহানবী (সা:)-কে সশরীরে আকাশে উঠে যেতে বলেছিল এবং সেখান থেকে একটি কিতাব নিয়ে অবতীর্ণ হতে বলেছিল। কিন্তু তিনি (সা.) তাদেরকে সেই নিদর্শন দেখাতে অস্বীকার করেছিলেন এই বলে যে, তিনি আল্লাহর রাসূল বটে, কিন্তু তিনি তো মানুষ মাত্র। আর মানুষের পক্ষে তো নিজে নিজেই আকাশে উঠে যাওয়া সম্ভব নয় আর আল্লাহও এভাবে কাউকে সশরীরে আকাশে উঠিয়ে নেন না। (কাদিয়ানীদের বক্তব্য শেষ হল)।

জবাবে বলতে চাই যে, এই জ্ঞানপাপীর দল আয়াতের মূল কনসেপ্ট আড়াল করার জন্য বরাবরের মত এখানেও প্রতারণা জাল সেঁটেছে। তারা কাফেরদের আরও যে সমস্ত দাবী ছিল সেগুলো চোখবুঁজে এড়িয়ে যায়। কাফেরদের আপ টু বটম দাবীগুলোর উপর চোখ বুলালে একজন সচেতন মানুষ মাত্র কাদিয়ানীদের প্রতারণা বুঝতে পারবে। এই দেখুন, কাফেরদের দাবীগুলো এই রকম ছিল যে,

১. ভুমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করতে হবে।

২. খেজুর ও আংগুরের বাগানের ফাঁকে ফাঁকে নদী-নালা প্রবাহিত করতে হবে।

৩. আকাশকে খন্ড বিখন্ড করে তাদের (কুরাইশ কাফেরদের) উপর ফেলতে হবে।

৪. আল্লাহ এবং ফেরেশতাদেরকে তাদের সামনে উপস্থিত করতে হবে।

৫. মহানবী (সা.)-এর জন্য একটি স্বর্ণ-নির্মিত প্রাসাদও থাকতে হবে।

তার পরেই আল্লাহতালা আয়াত নাযিল করেছেন এই বলে যে, ‘কুল সুবহানা রাব্বী হাল কুনতু ইল্লা বাশারার রাসূলা’। অর্থাৎ বল (হে মুহাম্মদ)! পবিত্র মহান আমার প্রতিপালক। আমি তো হইতেছি কেবল একজন মানুষ; একজন রাসূল।’ এই আয়াতে মুশরিকরা শুধুমাত্র আকাশে আরোহণের প্রস্তাব দিয়ে ক্ষ্যান্ত থাকেনি, বরং তাদের সম্পূর্ণ দাবীটা ছিল এরকম যে, “তোমার আকাশ আরোহণে আমরা কখনও ঈমান আনিব না যতক্ষণ তুমি আমাদের প্রতি এক কিতাব অবতীর্ণ না করিবে যাহা আমরা পাঠ করিব।” খুব খেয়াল করুন!

  • মক্কার কাফেররা পরিষ্কার বলেছিল যে, “(و لن نؤمن لرقيك) ‘ওয়া লান নু’মিনা লি-রুকিয়্যিকা অর্থাৎ তোমার আকাশ আরোহণে আমরা কখনও ঈমান আনিব না”

তাহলে প্রশ্ন আসে, কাফেরদের মূল দাবীটা কী ছিল? কাদিয়ানীরা কত নিকৃষ্ট মিথ্যাবাদী আর প্রতারক হলে কাফেরদের মূল দাবীকে আড়াল করে কত সূ²ভাবে আমাদের গোমরা করতে পারে চিন্তা করুন!

এই জন্যই আমি বলি যে, কোনো গবেষক বা অবিজ্ঞ আলেম ছাড়া কাদিয়ানীদের এই সমস্ত প্রতারণা সহজে সবার পক্ষে ধরা সম্ভব নয়।

এবার পাঠকবৃন্দ! নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, এই প্রতারকের দল কত সূক্ষ্ম প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে আয়াতের খন্ডিত বক্তব্যে দুনিয়াকে বোকা বানাতে চাচ্ছে?

এখন তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম যে, ঐ আয়াত ‘আল্লাহ কাউকে সশরীরে আকাশে উঠিয়ে নেন না’ বলেই কনসেপ্ট দেয়, যদি তাই হয় তাহলে আদম এবং হাওয়া দুইজনকে জান্নাত (আকাশ) থেকে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া সম্পর্কে আল্লাহর কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটির কী ব্যাখ্যা দেবেন? পবিত্র কুরআনে এসেছে,

‘হে আদম সন্তান! শয়তান যেন তোমাদের বিভ্রান্ত না করে, যেভাবে সে তোমাদের পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল; সে তাদের পোশাক টেনে নিচ্ছিল, যাতে সে তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখাতে পারে। নিশ্চয় সে ও তার দলবল তোমাদেরকে দেখে যেখানে তোমরা তাদেরকে দেখ না। নিশ্চয় আমি শয়তানদেরকে তাদের জন্য অভিভাবক বনিয়েছি, যারা ঈমান গ্রহণ করে না।’ (সূরা আ’রাফ ২৭)।

শেষকথা,

এখানে শুধুমাত্র তাদের অপব্যাখ্যার খন্ডন মূলক জবাব দেয়া হল, আমাদের আকীদার সপক্ষে তেমন কোনো প্রমাণই দেয়া হয়নি।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী |

এমন ব্যাকগ্রাউন্ড যার সে কিভাবে ইমাম মাহদী দাবী করতে পারে?

এই সমস্ত চরিত্রহীন বৈশিষ্ট্যের বিচারে মির্যা কাদিয়ানীর ইমাম মাহদী দাবীও গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনা!

  • আসুন! ইমাম মাহদী দাবীদার মির্যা কাদিয়ানী সাহেবকে প্রথমেই একজন “সত্যবাদী” প্রমাণ করা যায় কিনা দেখি!

প্রিয় আহমদীবন্ধুরা! আপনারা যারা মির্যা কাদিয়ানী সাহেবকে “ইমাম মাহদী” বিশ্বাস করেন তাদের নিকট আমার প্রশ্নটি নিম্নরূপ :

১. অসংখ্য সহীহ হাদীসে বর্ণিত প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদী’র কোনো একটি পরিচয়ের সাথেও যার কোনো মিল না থাকা

২. পিতা গোলাম মর্তুজার পেনশনের ৭০০ রূপী নিয়ে উধাও হয়ে চার বছর পর্যন্ত বাড়ীঘরে আর ফিরে না আসা আর ঐ পাঁচ-পঞ্চাশের ঘটনায় উদ্ভট ব্যাখ্যা’র মাধ্যমে চাঁদা দাতাদের সাথে খেয়ানতপূর্ণ আচরণ করা

৩. নিজের জামাতকে ব্রিটিশ সরকারের রোপিত চারাগাছ আখ্যা দেয়া এবং দখলদার ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালে মাতৃভূমি উদ্ধারে স্বাধীনতাকামী ভারতীয় মুসলমান প্রজাদের অজ্ঞ, নোংরা চালচলনের মানুষ, অভদ্র ও পাপী বলে নিন্দা ও গালমন্দ করা, তাদের বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়াকে অবৈধ ও হারাম বলা এমনকি ব্রিটিশ সরকারের আনুগত্য করাকে ইসলামেরই একটি অংশ বলা

৪. অর্থ উপার্জনের জন্য ওহীর দোহাই দিয়ে “বেহেশতি মাক্ববেরাহ” নামে ধর্মের মোড়কে কবর ব্যবসার প্রচলন করা

৫. বেগানা মহিলাদের দিয়ে শরীর ম্যাসেজ করা

৬. মুহাম্মদী বেগম নামের একটি মেয়েকে বিয়ের জন্য তার পরিবারকে আমৃত্যু চাপ দেয়া, মেয়েটির অন্যখানে বিয়ে হয়ে যাওয়া সত্ত্বে তার অভিভাবকদের (মেয়েটিকে ফিরে এনে হলেও) তখনও বিয়ে দিতে চাপ অব্যাহত রাখা এবং তার সাথে মেয়েটির বিয়েকে খোদার অখন্ডনীয় নির্দেশ আখ্যা দেয়া অতপর বিয়ে করতে ব্যর্থ হওয়া

৭. লাহোরের পলিমারের দোকান থেকে নিয়মিত “টনিক মদ” কেনা ও আপনা বিশ্বস্ত শিষ্য ডাক্টার বাশারাত আহমদ—’র সাক্ষ্যমতে প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতাকে প্রশমিত করতে সেটি পান করা

৮. ১৮৮৪ সালে নুসরাত জাহানকে বিবাহ করার পর যৌন উত্তেজক ঔষধ “জদঝামে ইশক” নামীয় অষ্টধাতুর আফিম মিশ্রিত মেডিসিনকে খোদার ইলহামি ড্রাগ আখ্যা দিয়ে সেবন করা

৯. আপনা খাস ও বিশ্বস্ত শিষ্য (১৯০৫ সালে হিন্দু থেকে কাদিয়ানী হওয়া) শায়খ আব্দুর রহমান মিছরী’র স্বীকারোক্তি অনুসারে একজন জেনাকার সাব্যস্ত হওয়া

১০. আপনা শিষ্য কথিত মুফতি(!) মুহাম্মদ সাদেক রচিত ‘যিকরে হাবীব’ পুস্তক অনুসারে থিয়েটার (সিনেমা) দেখা

১১. মুখে পান রেখে নামায পড়া

১২. আমৃত্যু যাকাত না দেয়া, হজ্ব না করা এবং ইতিকাফ না করা

১৩. মস্তিষ্কে ব্যাধি এবং বহুমুত্র রোগী হওয়া

১৪. নিজ স্বীকারোক্তি মতেই মিরাক (সিজোফ্রেনিয়া) এবং হিস্টিরিয়া (মূর্ছারোগ) ব্যাধিতে আক্রান্ত থাকা

১৫. মহানবী (সা:)-এর শানে গোস্তাখিমূলক কবিতার পাঠককে ‘জাজাকাল্লাহ’ বলে সমর্থন করা এবং স্বীয় রচনাবলীর পাতায় পাতায় বিরোধীদেরকে অশ্লীল ভাষায় গালি দেয়া

১৬. পবিত্র কুরআনের আয়াত সমূহের অর্থ ইচ্ছাকৃতভাবেই বিকৃত করে তার উপর যুক্তি দাঁড় করা

১৭. নিজের মতকে সঠিক প্রমাণ করতে সহীহ হাদীসের বিপরীতে দুর্বল আর জাল হাদীস দিয়ে দলিল দেয়া, কখনো প্রধান প্রধান মুহাদ্দিসদের নামেও মিথ্যাচার করা

১৮. কখনো হাদীসের শব্দ গায়েব করে ফেলা, কখনো বা হাদীসের উপর নিজ যুক্তি আর খ্রিস্টানদের রচনাবলীকে প্রাধান্য দেয়া

১৯. হাদীস নয় এমন বানোয়াট কথাকে রাসূল (সা:)-এর হাদীস বলে চালিয়ে দেয়া এবং

২০. কথায় কথায় অহেতুক ভবিষ্যৎবাণী করা অতপর সেটি বাস্তবতার মুখ না দেখলে তখন সেটিকে বাস্তব করে দেখানোর জন্য তাবীল আর রূপক ব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়া ইত্যাদী যেই লোকটির প্রকৃত চরিত্র, সে কিভাবে আপনাদের (কাদিয়ানী অনুসারীদের) বিচারে আল্লাহর প্রেরিত ও প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদী হতে পারে? (উপরের ১-২০ নং এর রেফারেন্স, নিচের ফুটনোট থেকে দেখুন)।

ফুটনোট :

১. বিশেষ করে সুনানে আবুদাউদ, মাহদী অধ্যায় এর মাহদী সংক্রান্ত ১১টি হাদীস দ্রষ্টব্য। মির্যার সাথে সেগুলোর ১টিও মিল নেই। ২. মির্যাপুত্র মির্যা বশির আহমদ এম.এ কর্তৃক পাঁচ খন্ডে রচিত ‘সীরাতে মাহদী’ (উর্দু, নতুন এডিশন) খন্ড ১ পৃষ্ঠা নং ৩৮; বর্ণনা নং ৪৯। পঞ্চাশ খন্ডে বই লিখার ওয়াদা, রূহানী খাযায়েন (উর্দু) খন্ড ৯ পৃষ্ঠা নং ২১। ৩. মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত (উর্দু), নতুন এডিশন খন্ড ৩ পৃষ্ঠা ২১-২২ (ব্রিটিশ সরকারের রোপিত চারাগাছ); হামামাতুল বুশরা (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ৭২; বারাহীনে আহমদিয়া (বাংলা) খন্ড ৩ পৃষ্ঠা নং ৮, প্রকাশকাল ডিসেম্বর ২০১৭ ইং (স্বাধীনতাকামীরা অজ্ঞ, নোংরা ও পাপী), রূহানী খাযায়েন খন্ড ৬ পৃষ্ঠা নং ৩৮০ (ব্রিটিশ সরকারের আনুগত্য ইসলামের অংশ)। ৪. আল ওসীয়্যত (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ২২; ভাষান্তর, এ.এইচ.এম আলী আনোয়ার, পুনঃ মুদ্রন জুন ২০১৪ ইং।

৫. সীরাতে মাহদী (উর্দু), বর্ণনা নং ৭৮০ এবং ৯১০। ৬. রূহানী খাযায়েন খন্ড ৫ পৃষ্ঠা নং ৫৭৩ (আল্লাহ আমাকে বলেছেন, যদি অন্য কারো সাথে এই মেয়ের বিয়ে হয় তাহলে তার [মুহাম্মদী বেগম] জন্যও কল্যাণ নেই, তোমার [আহমদ বেগ] জন্যও কল্যাণ নেই); রূহানী খাযায়েন খন্ড ১১ পৃষ্ঠা নং ৬০ (আমি তোমার নিকট তাকে ফিরিয়ে দেবই, মির্যার ওহী); রূহানী খাযায়েন খন্ড ৫ পৃষ্ঠা নং ৩২৫ (তার নিকট আত্মীয়দের সমস্ত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে হলেও শেষমেষ সে বিধবা হয়ে আমার বিবাহে আসবেই)। ৭. মির্যায়ী মুরিদ হাকিম মুহাম্মদ হুসাইন কুরাইশী রচিত ‘খুতূতে ইমাম বনামে গোলাম’ (উর্দু) পৃষ্ঠা নং ৫; সেই সময় প্রতি-বোতল বাজারমূল্য ছিল পাঁচ দেরহাম, লাহোরি মুভমেন্ট এর ‘পয়গামে ছুলহে’ ৪ই মার্চ ১৯৩৫ইং। ৮. সীরাতে মাহদী ১/৫৪৮, বর্ণনা নং ৫৬৯ (আফিম সংক্রান্ত)। ৯. কাদিয়ানীদের দৈনিক উর্দু সংবাদপত্র আল ফজল তাং ৩১শে আগষ্ট ১৯৩৮ ইং (শায়খ আব্দুর রহমান মিছরীর স্বভাব চরিত্র বিশ্বস্ত এবং নির্মল ও পরিচ্ছন্ন, রূহানী খাযায়েন ১১/৩২৫; তিন’শ তের এর মধ্যে তার সিরিয়াল নং ২৫৫, রূহানী খাযায়েন খন্ড ১১ পৃষ্ঠা নং ৩২৮ দ্রষ্টব্য)।

১০. যিকরে হাবীব (উর্দু) পৃষ্ঠা নং ১৪; ‘দা’ওয়ায়ে নবুওয়ত ওয়া মুজাদ্দিয়ত’ শিরোনাম দ্রষ্টব্য। ১১. সীরাতে মাহদী পৃষ্ঠা ৬০৬ নতুন এডিশন, বর্ণনা নং ৬৩৮। ১২. সীরাতে মাহদী বর্ণনা নং ৬৭২। ১৩. তাযকেরাতুশ শাহাদাতাইন (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ৪৯। ১৪. সীরাতে মাহদী বর্ণনা নং ১৯ ও ৩৭২। ১৫. দৈনিক আল ফজল (উর্দু) ২২ ই আগস্ট ১৯৪৪, পৃষ্ঠা ৪ কলাম ১; আখবারে বদর (উর্দূ) ২৫ শে অক্টোবর ১৯০৬ ইং (মুহাম্মদ সাঃ এর চেয়েও মর্যাদায় সামনে বেড়ে যাওয়া), খানকির ছেলে (রূহানী খাযায়েন খন্ড ৫ পৃষ্ঠা নং ৫৪৮), শুয়োর (রূহানী খাযায়েন খন্ড ১১ পৃষ্ঠা নং ৩৩৭), বেশ্যার বংশ (রূহানী খাযায়েন খন্ড ৮ পৃষ্ঠা নং ১৬৩), হারাম জাদাহ (রূহানী খাযায়েন খন্ড ৯ পৃষ্ঠা নং ৩১), হে মরা খাওয়া মৌলবী (রূহানী খাযায়েন খন্ড ১১ পৃষ্ঠা নং ৩০৫), হিন্দুর বাচ্চা (রূহানী খাযায়েন খন্ড ১১ পৃষ্ঠা নং ৫৯), তাদের উপর হাজার অভিশাপ (রূহানী খাযায়েন খন্ড ১১ পৃষ্ঠা নং ৩৩০) ইত্যাদি প্রায় পাঁচশতের অধিক শব্দে গালি দেয়ার দীর্ঘ লিস্ট রয়েছে। ১৬. আল ওসীয়্যত (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ১৫ মির্যার বিকৃত অনুবাদ “(সূরা মায়েদা ১১৭)…তখন আবার আমি কিভাবে জানতাম যে, আমার পরে তারা কোন বিপথগামিতায় নিপতিত হয়েছিল”। প্রমাণস্বরূপ এখানে মাত্র ১টি দেখানো হল। ১৭. হামামাতুল বুশরা (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ২৩ ও ১৫০ (দাজ্জালের গাধা প্রসঙ্গে), পৃষ্ঠা নং ৩৬ (ঈসা আঃ ১২০ বছর জীবিত থাকা প্রসঙ্গে), পৃষ্ঠা নং ৮১ (সূরা নিসা আয়াত নং ১৫৯-কে স্বীয় যুক্তি দ্বারা বাতিল করা), পৃষ্ঠা নং ১০৩ (প্রধান প্রধান মুহাদ্দিসগণও ঈসার মৃত্যুর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়া প্রসঙ্গে), পৃষ্ঠা নং ১৫০ (আকাশ থেকে ঘোষণা শুনা যে, মাহদী আল্লাহর খলিফা প্রসঙ্গে), পৃষ্ঠা নং ১৫৮ (ইমাম বুখারীর নামে মিথ্যাচার)।

১৮. হামামাতুল বুশরা (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ১৫৮ (ঈসা আঃ আফীক পাহাড়ে নাযিল প্রসঙ্গে। এখানে ‘আকাশ’ শব্দ বাদ দিয়ে লিখা হয়েছে। অথচ মূল হাদীসগ্রন্থে ‘আকাশ’ শব্দ এখনো আছে। কাঞ্জুল উম্মাল, হাদীস নং ৩৯৭২৬ দ্রষ্টব্য) ইত্যাদি। ১৯. হামামাতুল বুশরা (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ২৩ (ফেরেশতা দাজ্জালের মুখ সিরিয়ার দিকে ঘুরিয়ে দেবে সেখানে সে ধ্বংস হবে প্রসঙ্গে), ২৬ (রাসূল সাঃ স্বপ্নে দেখেছেন, দাজ্জাল তার দুইহাত দুই ব্যক্তির কাঁধে রেখে কাবা শরীফ তাওয়াফ করছে), ৩১, ৩২ (মাহদী হিজরী বা ইসলামী শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে আসবেন প্রসঙ্গে), ৩৩, ৬১, ৬৫, ৬৬, ৬৯, ৮৩, ১৫১-১৫৪ (‘দাব্বাতুল আরয’ নামক কীটের পা মাটিতে এবং মাথা গগনচুম্বী প্রসঙ্গে), আল ওসীয়্যত (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ১৪ (হাদীসের নামে মিথ্যা উদ্ধৃতি : نبى الله و امامكم منكم অর্থাৎ তিনি নবী ও উম্মতী দুই-ই হবেন। অথচ এইরূপ শব্দচয়নে কোনো হাদীস নেই) ইত্যাদি। মির্যার অজ্ঞতাপূর্ণ অথবা খেয়ানতপূর্ণ কয়েকটি উক্তি হামামাতুল বুশরা (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ৩০, ৩৪, ৪৭, ৪৯, ৫৬ হতে। ২০. এজন্য আমার লেখিত ‘আহমদীবন্ধু ইসলামে ফিরে এসো’ বইটিও দেখা যেতে পারে। আমি মনে করি, মির্যা কাদিয়ানীকে আবিষ্কার করতে এতটুকু জানাই যথেষ্ট।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

লোহা, লেবাস, গবাদিপশু ইত্যাদি এগুলোও কি আকাশ থেকে নাযিল হয়েছে?

আল-কুরআনে লোহা, পোশাক, গবাদিপশু ইত্যাদি নাযিল হওয়ার আয়াত ও কাদিয়ানীদের ভ্রান্তি নিরসন :

আলোচনা শুরুর আগে কাদিয়ানীদের প্রশ্ন-সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো দেখে নিন :

১. সূরা হাদীদ আয়াত : ২৭। আল্লাহতালা বলেন, ওয়া আনযালনা আলাইকুমুল হাদীদা অর্থাৎ আমি তোমাদের জন্য লোহা নাযিল করেছি।

২. সূরা আ’রাফ আয়াত : ২৬। আল্লাহতালা এখানে ‘ক্বদ আনযালনা’র পরে বলেছেন, ‘আলাইকুম লিবাসা’ অর্থাৎ আমরা তোমাদের জন্য লেবাস (পোশাক) অবতীর্ণ করেছি।

৩. সূরা যুমার আয়াত : ৬। আল্লাহতালা এ আয়াতে ‘আনযালা’র পরে বলেছেন, ‘লাকুম মিনাল আন’আমি ছামানিয়াতা আঝওয়াজ’। অর্থাৎ তিনি (আল্লাহ) তোমাদের জন্য আট জোড়া গবাদিপশু নাযিল করেছেন’।

৪. সূরা ত্বালাক আয়াত : ৯। আল্লাহতালা এই আয়াতের ‘ক্বদ আনযালাল্লাহু’ এর পরেই বলেছেন, ইলাইকুম যিকরা। অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের প্রতি কুরআন নাযিল করেছেন। তার পরের আয়াতে আছে ‘রাসূলা’ অর্থাৎ রাসূল নাযিল করেছেন (কাদিয়ানীদের অনুবাদ অনুসারে)।

  • বলে রাখতে চাই যে, ইমাম সুয়ূতী (রহ:) সহ সকল যুগ ইমাম সূরা ত্বালাক এর ৯ নং আয়াতের ‘ক্বদ আনযালাল্লাহু’ এর পরের আয়াতে ‘রাসূলান’ এর তাফসীরে লিখেছেন এখানে رسولًا এর পূর্বে أَرسَلْنَا ক্রিয়াপদ ঊহ্য মেনে নিতে হবে। ফলে অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহতালা অবতীর্ণ করেছেন উপদেশ (কুরআন) এবং প্রেরণ করেছেন এক রসূল। অতএব, এই আয়াত দ্বারা “রাসূল (সা:)ও আকাশ থেকে নাযিল হলেন কিনা” কাদিয়ানীদের এই প্রশ্ন চরম মূর্খতাপূর্ণ বৈ নয়।

একটি প্রশ্নের জবাব :

  • কাদিয়ানীদের প্রশ্নটি এরকম, “নাযিল” শব্দ থাকলেই কোনো জিনিস ‘আকাশ’ থেকে অবতীর্ণ হওয়াকে আবশ্যক করেনা। যদি ‘নাযিল’ হওয়া মানে ‘আকাশ’ থেকেই অবতীর্ণ হওয়াকে আবশ্যক করত তখন প্রশ্ন আসবে যে, তবে কি আয়াতের আট জোড়া গবাদিপশুও আকাশ থেকে নাযিল হয়েছিল? লেবাস বা পোশাক পরিচ্ছেদও কি আকাশ থেকে ছিল? রাসূল অবতীর্ণ হওয়াটাও কি আকাশ থেকে বুঝাল? যেহেতু এখানে নাযিল হওয়ার অর্থ আকাশ থেকে নাযিল হওয়াকে বুঝায়নি সেহেতু ঈসা (আ:) সম্পর্কেও যেই ‘নাযিল’ অর্থাৎ অবতীর্ণ হওয়ার কথা এসেছে তার-ও একই অর্থ উদ্দেশ্য হবে। অর্থাৎ ঈসা (আ:) নাযিল হওয়ার মানে ‘আকাশ থেকে’ অবতীর্ণ হওয়া উদ্দেশ্য নয়। (কাদিয়ানিদের বক্তব্য শেষ হল)।

আমার জবাব : জ্বী হ্যাঁ, আমরাও আপনাদের উক্ত যুক্তির সাথে একমত হতে পারতাম যদি হযরত ঈসা (আ:) সম্পর্কে “নাযিল” শব্দের পাশাপাশি একাধিক সহীহ হাদীসে মিনাস সামায়ি (من السماء) বা ‘আকাশ থেকে নাযিল হবে’ শব্দ-ও উল্লেখ না থাকত এবং হাদীসের মধ্যে হযরত ঈসা (আ:)-এর আগমনী ভবিষ্যৎবাণীতে ‘রুজূ’ (رجوع) তথা ঈসা (আ:) দ্বিতীয়বার ফিরে আসবেন, এজাতীয় শব্দ-ও না হত। অধিকন্তু হযরত ঈসা (আ:)-এর আগমনী ভবিষ্যৎবাণীতে রাসূল (সা:) শপথ বাক্যসহ সংবাদ দেয়ার প্রমাণও রয়েছে। ফলে দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হল যে, আগত ঈসা (আ:) রূপক কোনো ঈসা নন এবং এতদ-সংক্রান্ত হাদীসগুলোর ‘নুযূল’ শব্দটিও প্রকৃত অর্থের বাহিরে রূপক অর্থে উদ্দেশ্য নয়!

এবার জবাবের খোলাসা :

বিজ্ঞ পাঠকবৃন্দ! এই পর্যায় ‘মিনাস সামায়ি’ (من السماء অর্থাৎ আকাশ থেকে) শীর্ষক অনেকগুলো হাদীসের মধ্য হতে শুধুমাত্র একটি সহীহ হাদীস পেশ করছি, বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবু হোরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন,

كيف انتم إذا نزل ابن مريم من السماء فيكم و امامكم منكم

অর্থাৎ তখন তোমাদের কেমন (আনন্দের) হবে যখন ইবনে মরিয়ম (ঈসা) মিনাস সামায়ি তথা আকাশ থেকে তোমাদের মাঝে নাযিল হবেন আর তখন তোমাদের ইমাম (মাহদী) তোমাদের মধ্য হতে হবেন। [দেখুন, সুনানে বায়হাক্বীর সংকলক কর্তৃক সংকলিত ‘আল আসমা ওয়াস সিফাত’ ২/৩৩১; হাদীস নং ৮৯৫, বাবু ক্বওলিল্লাহি আজ্জা ওয়া জাল্লা লি-ঈসা ইন্নী মুতাওয়াফ্ফীকা ওয়া রাফিউকা ইলাইয়্যা; হাদীসের মান : সহীহ]।

স্ক্রিনশট :

তাওয়াতূর পর্যায়ের অসংখ্য হাদীস দ্বারা ঈসা (আ:) এর নাযিল হওয়া মানে আকাশ থেকে-ই নাযিল হওয়া উদ্দেশ্য। ক্লিক করুন >> 235

এখন প্রশ্ন হল, ঈসা (আ:)-এর আগমনী ভবিষ্যৎবাণীতে তাঁর (আ:) আগমন সম্পর্কে হাদীসে ‘রুজূ’ (رجوع) শব্দ থাকলে তাতে কিজন্য ঈসা (আ:) প্রকৃতপক্ষেই আকাশ থেকে ফিরে আসা সঠিক সাব্যস্ত হবে? মির্যা কাদিয়ানী সাহেব থেকে কি এধরণের কোনো কথার প্রমাণ আছে?

এর উত্তর হল, জ্বী হ্যাঁ। আপনি ‘রূহানী খাযায়েন’ এর ২৩ নং খন্ডের ২২৯ নং পৃষ্ঠাটি খুলে দেখুন, মির্যা সাহেব লিখেছেন, ঈসা (আ:) এর আগমন সম্পর্কে হাদীসে ‘রুজূ’ (رجوع) শব্দ থাকলে তখনি তাঁর (আ:) ফিরে আসার ঘটনা প্রকৃতপক্ষে “আকাশ থেকেই” ঘটবে বলে সাব্যস্ত হবে। যেজন্য মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী কর্তৃক স্বীকৃত বিগত তেরশত শতাব্দির সমস্ত মুজাদ্দিদ ও যুগ ইমাম সবাই ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন যে, আগত ঈসা ইবনে মরিয়ম মানে বনী ইসরাইলী ঈসা ভিন্ন কেউ নন এবং তিনি এখনো আকাশে জীবিত আছেন।

তাহলে ঈসা (আ:)-এর দুনিয়ায় ফিরে আসা শীর্ষক ‘রুজূ’ (رجوع) শব্দ সম্বলিত হাদীসটি কী?

জ্বী জনাব! হাদীসটি এই যে, (ক) রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন,

و ان الله رفعه بجسده و أنه حى الآن و سيرجع إلى الدنيا فيها ملكا ثم يموت

অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহতালা তাঁকে (ঈসা) সশরীরে উঠিয়ে নেন এবং তিনি এখনো জীবিত। অতিসত্বর তিনি পৃথিবীতে রুজূ করবেন তথা ফিরে আসবেন। তখন তিনি পৃথিবীতে একজন বাদশাহ হবেন। তারপর তিনি মৃত্যুবরণ করবেন।” (দেখুন হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ হতে বর্ণিত, ইবনে সা’আদ [মৃত: ২৩০হিজরী] সংকলিত ‘আত-তবকাতুল কাবীর‘ : খন্ড ১ পৃষ্ঠা ৩৫-৩৬; প্রকাশনায়, মাকতাবাতুল খানজী, কায়রো মিশর)।

() রাসূল (সা:) জনৈক ইহুদীকে লক্ষ্য করে বলেছেন,

ان عيسى لم يمت و أنه راجع إليكم قبل يوم القيامة

অর্থাৎ নিশ্চয়ই ঈসা (আ:) মৃত্যুবরণ করেননি। তিনি নিশ্চয়ই কেয়ামতের আগে তোমাদের নিকট ফিরে আসবেন। (তাফসীরে তাবারী ৫/৪৪৮)।

তারপর জানার বিষয় হল, হাদীসে শপথ বাক্যসহ কোনো সংবাদ বর্ণিত থাকার দরুন সংবাদটি প্রকৃত অর্থের বাহিরে রূপক অর্থে উদ্দেশ্য হবে না, এমন কোনো কথাও কি মির্যা কাদিয়ানীর রচনায় উল্লেখ আছে?

এর জবাব হল, আপনি মির্যা কাদিয়ানীর রচনাবলীর সমষ্টি ‘রূহানী খাযায়েন’ এর ৭ নং খন্ডের ১৯২ নং পৃষ্ঠাটি খুলে দেখুন। মির্যা সাহেব স্পষ্টতই লিখে গেছেন, ‘শপথ করে কোনো কথা বলা একথারই প্রমাণ বহন করে যে, নিশ্চয়ই খবর তথা হাদীসটি আক্ষরিক অর্থেই ধর্তব্য হবে। সেখানে রূপক অর্থ করা চলবেনা। নতুবা শপথ করে লাভ কী হল?’ (আরো দেখুন, হামামাতুল বুশরা, বাংলা অনূদিত পৃষ্ঠা নং ২৭)।

আর আমরা জানি, সহীহ বুখারীর কিতাবুল আম্বিয়ার ৩২৬৪ নং হাদীসে হযরত ঈসা (আ:) এর নাযিল সম্পর্কিত বর্ণনা শুরুতে রাসূল (সা:)-এর দ্ব্যর্থহীনভাবে শপথবাক্য ‘ওয়াল্লাযী নাফসি বিয়াদিহি (والذي نفسى بيده) …’ উল্লেখ রয়েছে। এতে একদম পরিস্কার হয়ে গেল যে, ঈসা (আঃ) এর নাযিল হওয়া মানে প্রকৃতপক্ষেই আকাশ থেকে তাঁর অবতীর্ণ হওয়া-ই উদ্দেশ্য! নতুবা ‘শপথ’ ব্যক্ত করে লাভ কী হল? প্রায় দেড়’শ সহীহ হাদীস রয়েছে যদ্দ্বারা ঈসা (আ:) এর পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত। উপরের লিংক থেকে দেখে নিন। সুতরাং ঈসা (আ:) এর “নাযিল” শব্দের সাথে অন্যান্য গুলোর “নাযিল” শব্দকে বিশেষ কোনো ক্বারীনা ছাড়া এক ও অভিন্ন মনে করার কোনো কারণ নেই। সংক্ষেপে।

  • এবার জানার বিষয় হল, হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ:) ভিন্ন অন্যান্য ক্ষেত্রে ‘নাযিল’ শব্দের প্রকৃত অর্থ পরিত্যাজ্য হয়ে কাছাকাছি ভিন্ন অর্থ নেয়ার কারণ কী?

এর জবাব হল, বরেণ্য তাফসীরবিদগণের তাফসীরে ঈসা (আ:) ভিন্ন অন্যান্য ক্ষেত্রে ‘নাযিল’ শব্দের প্রকৃত অর্থ ত্যাগ করে তার কাছাকাছি ভিন্ন অর্থ নেয়ার প্রধান কারণ হল, সেসব আয়াতে উল্লিখিত ‘নাযিল’ শব্দের প্রকৃত অর্থ ইসলামের আদিম ও তিন স্বর্ণযুগ থেকেই পরিত্যাজ্য এবং তার কাছাকাছি ভিন্ন অর্থ গ্রাহ্য। যেহেতু সেসব আয়াতের ‘নাযিল’ শব্দের বিশ্লেষণে রাসূল (সা:) কিংবা কোনো একজন সাহাবী বা তাবেয়ীর তাফসীরেও ‘মিনাস সামায়ি’ তথা আকাশ থেকে শব্দ উল্লেখ পাওয়া যায়না। অথচ এর বিপরীতে হযরত ঈসা (আঃ)-এর “নাযিল” শব্দের প্রকৃত অর্থ নেয়ার পক্ষে বহু ক্বারীনা (قرينة) তথা নিদর্শন এবং উপযুক্ত দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান।

শেষকথা: তাফসীরশাস্ত্রে যাদের সামান্যতম হলেও ধারণা আছে তারা জানেন যে, পবিত্র কুরআনের অনুবাদ নেয়ার ক্ষেত্রে কুরআনের অপরাপর আয়াত আর সুন্নাহ উভয়ের সামঞ্জস্যতার বিধান মানা আবশ্যক। যার যেভাবেই খুশি অর্থ নেয়া সুস্পষ্ট বিকৃতি আর মুলহিদানা চরিত্রের শামিল! তাই সালফে সালেহীনগণ এই নিয়মের ভিত্তিতেই পবিত্র কুরআনের অনুবাদ করে গেছেন। মজার ব্যাপার হল, এরূপ স্বতঃসিদ্ধ ও সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়মের সমর্থনে খোদ মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীও লিখে গেছেন। ‘রূহানী খাযায়েন’ এর ১০ নং খন্ডের ৮৬ নং পৃষ্ঠাটি খুলে দেখুন! পরিষ্কার লিখা আছে,

  • “প্রথম হল কুরআন শরীফ। কিন্তু স্মরণ রাখা চাই যে, কুরআনের কোনো আয়াতের সেই মর্মার্থই আমাদের নিকট (সঠিক বলে) বিবেচিত যার পক্ষে কুরআনের অপরাপর আয়াত সাক্ষ্য দিয়ে থাকে। কেননা কুরআনের কোনো কোনো আয়াত অপর আয়াতের ব্যাখ্যাকারী। এমনকি কুরআনের পরিপূর্ণ ও অকাট্য মর্মের উদঘাটন যদি কুরআনের অপরাপর স্থানগুলো দ্বারাও সহজলভ্য না হয়ে থাকে তখন তার জন্যও শর্ত হচ্ছে কোনো সহীহ, মারফূ ও মুত্তাসিল হাদীসও তার (আয়াতের) ব্যাখ্যাকারী হবে।”

এখন যেসব কাদিয়ানী-উম্মত ‘কুরআন থাকতে হাদীসে যেতে হবে কেন?’ এরূপ চটকদার ও মূর্খতাপূর্ণ যুক্তির আড়ালে নিজেদের ঈমানকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঢেলে দিচ্ছেন তারা এবার মির্যা গোলাম আহমদকে কী বলবেন? কেননা সে নিজেও কুরআনের সঠিক মর্মার্থ উদঘাটন করতে মারফূ ও মুত্তাসিল স্তরের সহীহ হাদীসকে আয়াতের ব্যাখ্যাকারী বলে লিখে গেছেন! তাই তাওয়াতূর পর্যায়ের অসংখ্য হাদীস দ্বারা যেখানে ঈসা (আ:)-এর “নাযিল” হওয়া মানে আকাশ থেকে অবতীর্ণ হওয়াই উদ্দেশ্য, সেখানে লোহা, লেবাস, গবাদিপশু ইত্যাদি “নাযিল” এর কুরআনিক শব্দকে হযরত ঈসা (আ:)-এর “নাযিল” এর অ-কুরআনিক শব্দের মুকাবিলায় দাঁড় করতে চাওয়া কতটা গণ্ডমূর্খতা তা নিজেরাই একবার চিন্তা করে দেখুন! আশাকরি জবাব পেয়েছেন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
তাং ০১/১২/২০

কাদিয়ানীরা বর্তমানে কত দলে বিভক্ত জেনে নিন

কাদিয়ানীরা কম-বেশী বর্তমানে ১৪ দলে বিভক্ত এবং তাদের প্রত্যেকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটগুলোও ভিন্ন ভিন্ন :

  • উল্লেখ্য কাদিয়ানীরা মুসলমানদের তাচ্ছিল্য করে বলে, আরে আরে তোমরা মুসলিমরা ৭৩ ভাগে বিভক্ত আর অপরদিকে আমরা (অর্থাৎ কাদিয়ানীরা) শুধুই এক দল, অথচ তাদের এই দাবী শতাব্দীর জঘন্য মিথ্যা।

কাদিয়ানীদের কয়েকটি দলের নাম হল,

১. জামাতে আহমদীয়া ইন্দোনেশিয়া গ্রুপ। এদের আকীদা হল, এরা মির্যা কাদিয়ানীকে শুধুমাত্র একজন শিক্ষক মানেন। নবী রাসূল মানেন না।

২. জামাতে আহমদীয়া লাহোরী মুভমেন্ট। এই দলের বর্তমান প্রধান প্রফেসর আব্দুল করীম সাঈদ (www.aaiil.org). এই দল দুটি হেকিম নূরুদ্দীন এর মৃত্যুর পরপরই সৃষ্টি হয়েছিল। এরাও তাকে নবী রাসূল মানে না।

৩. জামাতে আহমদীয়া ইসলাহ পছন্দ। এই দলের বর্তমান প্রধান আব্দুল গাফফার জম্বাহ (www.alghulam.com). এদের অন্যতম বিশ্বাস, আব্দুল গাফফার জম্বাহ-ই কথিত মুসলেহ মওউদ।

৪. গ্রীন আহমদীয়া। এই দলের প্রধান, মির্যা রফি আহমদ (www.greenahmadiyyat.org). এরাও মির্যাকে নবী রাসূল মানেনা। উল্লেখ্য ইনি কাদিয়ানীদের দ্বিতীয় খলিফা মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ আহমদের ছেলেদের একজন। কাদিয়ানী চতুর্থ খলিফা নির্বাচনের সময়ে সে খলিফা নির্বাচিত হয়েছে বলে শোনা যায়। (এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই -লিখক) কিন্তু মির্যা তাহির আহমদ পরবর্তীতে খলিফা হওয়ায় তিনি নিজেও ‘গ্রীন আহমদীয়া‘ প্রতিষ্ঠা করেন। তবে সে যে খলিফা হতে চেয়েছিল এটা নিশ্চিত। যতদূর জানা যায়, মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ আহমদ এর দুই সংসার ছিল। দুই সংসারে মোট ২৮ জন সন্তান ছিলো। ‌ফলে ১৯৬৪ সালে পিতার মৃত্যুর পর এদের মধ্যে ক্ষমতার মসনদ নিয়ে গন্ডগোল হয়, হওয়াটাই স্বাভাবিক।

৫. জামাতে আহমদীয়া আল-মুসলিমীন। এই দলের প্রধান জাফর উল্লাহ ডায়মন্ড (www.jaam-international.org).

৬. জামাতে আহমদীয়া হাকীকী। এই দলের প্রধান, নাসির আহমদ সুলতানী (www.ahmadiyyah.org).

৭. জামাতে আহমদী কাদিয়ানী (মাহমূদী) গ্রুপ। এই দলের বর্তমান প্রধান মির্যা মাসরূর আহমদ কাদিয়ানী (www.alislam.org).

৮. আনওয়ারুল ইসলাম মুভমেন্ট অফ আফ্রিকা। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান আলহাজ্ব জিব্রিল মার্টিন (https://wiki.qern.org/ahmadiyya/organisations/qadiani/anwar-ul-islam-movement-of-nigeria). দলটি নাইজেরিয়াতে (আফ্রিকা) খুব তৎপর। আলহাজ্ব জিব্রিল মার্টিন (২০ নভেম্বর ১৮৮৮ – ১৩ জুন ১৯৫৯) সম্পর্কে জানা যায় যে, তিনি একজন নাইজেরিয়ান আইনজীবী এবং শিক্ষাবিদ ছিলেন যিনি নাইজেরিয়ান আইন পরিষদের সদস্য ছিলেন। নাইজেরিয়ার স্বাধীনতার পর তিনি নাইজেরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের হজ পিলগ্রিমস বোর্ডের চেয়ারম্যানও ছিলেন। তিনি নাইজেরিয়ার আহমদীয়া জামাতের একজন বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন। তিনি মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদের সময়টিতেই কাদিয়ানী জামাত থেকে আলাদা হয়ে যান এবং নিজেই নতুন দল গঠন করেন। বর্তমানে নাইজেরিয়ার অধিকাংশ এলিট শ্রেণীর কাদিয়ানী তারই অনুসারী। (উইকিপিডিয়া)।

৯. আহমদীয়া সহীহ ইসলাম। এই দলের বর্তমান প্রধান মুনীর আহমদ আজিম (www.jamaat-ul-sahih-al-islam.com).

১০. আহমদীয়া জায়েদখান গ্রুপ। এই দলের প্রধান, জায়েদখান। দলটির কিছু তৎপরতা জার্মানিতে চোখে পড়ার মত।

১১. আহমদীয়া তাহের নাসিম গ্রুপ। এই দলের প্রধান তাহের নাসিম। তিনি ৩০ই জুলাই ২০২০ইং পাকিস্তানের পেশোয়ারে একটি আদালতে শুনানিকালে গাজি খালেদখান নামক এক যুবকের গুলিতে নিহত হন।

১২. তিমাহপুরী গ্রুপ। এই দলের প্রধান আব্দুল্লাহ তিমাহপুরী। সে মির্যা কাদিয়ানীর মুরিদ ছিল এবং মির্যা কাদিয়ানীর জীবদ্দশাতেই নবুওয়তের দাবী করেছিল।

১৩. আহমদীয়া আসাদশাহ গ্রুপ। এই দলের প্রধান, আসাদশাহ। সেও কয়েক বছর পূর্বে আমেরিকায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়।

১৪. লাহোরী ইন্দোনেশিয়ান গ্রুপ। এরা মির্যা কাদিয়ানীর মুরিদ মুহাম্মদ আলী লাহোরীর চিন্তাধারায় প্রভাবিত ও তার গ্রুপ থেকেই ছিটকে পড়া হলেও মূলত কাদিয়ানী জামাতেরই একটি ফেরকা। এই হল বর্তমান কাদিয়ানী জামাতের বিভক্তির সংক্ষিপ্ত তালিকা। আস্তে আস্তে এ তালিকা আরো দীর্ঘ হচ্ছে। সুতরাং কাদিয়ানীদের দাবী, তারা একটিমাত্র দল; তাদের এই কথা জঘন্য মিথ্যা। বাকি দলগুলোর প্রধানদের ছবি এবং অবশিষ্ট দলীয় অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ঠিকানা আস্তে আস্তে যুক্ত করে দেব, ইনশাআল্লাহ।

সহজে কাদিয়ানী চেনার উপায়

কাদিয়ানীদের রচনাবলীতে মুসলমানদের কাফের-হারামজাদাহ, বেশ্যার পোলা, মুশরিক, জাহান্নামি আখ্যা দেয়া (প্রমাণসহ)

পবিত্র কুরআন দ্বারাও ঈসা (আ.) এখনো জীবিত থাকা ও দুনিয়ায় দ্বিতীয়বার আগমন করা সুস্পষ্ট ইংগিতে প্রমাণিত

সূরা তওবাহ আয়াত ৩৩ দ্বারাও ঈসা (আ.) জীবিত থাকা প্রমাণিত

তথ্য সংগ্রহে : প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

শাহ কাশ্মীরী রহ. এর কবরের নেম প্লেটে ‘খাতামুল ফুক্বাহা ওয়াল মুহাদ্দিসীন’ লিখার জবাব

হযরত আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) এর কবরের নেম-প্লেটে “খাতামুল বা খাতিমুল ফুক্বাহা ওয়াল মুহাদ্দিসীন” উল্লেখ থাকা এবং কাদিয়ানিদের ওয়াস-ওয়াসাপূর্ণ আপত্তির জবাবে আজকের এই লিখা,

  • তাদের আপত্তি :
  • তাদের বক্তব্য হল, ‘খাতাম’ অর্থ শ্রেষ্ঠ, কিন্তু ‘শেষ’ নয়। সে হিসেবে ‘খাতামুন নাবিয়্যীন’ অর্থ শেষনবী নয় বরং শ্রেষ্ঠ নবী। অতএব মুহাম্মদ (সা:) এর পর আর কোনো নবী নেই বলা ঠিক নয়, বরং নবী আছে তবে নতুন শরীয়তবাহক নবী নেই। মুহাম্মদ (সা:) এই হিসেবেই ‘শেষনবী’। কারণ, খাতাম অর্থ ‘শেষ’ হলে তখন প্রশ্ন আসবে, শাহ কাশ্মীরী রহ. কিভাবে খাতামুল মুহাদ্দিসীন হলেন? তবে কি তাঁর পরে কেয়ামত পর্যন্ত আর কোনো মুহাদ্দিস হবেনা? এখন যারা মুহাদ্দিস আছেন তারা কি মুহাদ্দিস নন?

আপত্তির জবাব :

১. আগে বলুন, কাদিয়ানী প্রথম খলিফা হেকিম নূরুদ্দীন এর এই বক্তব্য সম্পর্কে আপনারা কী বলবেন?

হেকিম নূরুদ্দীন সাহেব নিজেই কিন্তু বলে গেছেন যে, মুহাম্মদ (সা.) এর পর আর কোনো নবী নেই। (সূত্র : হযরত মৌলভি নুরউদ্দীন (রা.) খলীফাতুল মসীহ আউয়াল, পৃষ্ঠা নং ৯১ দ্রষ্টব্য)।

২. আমাদের পূর্ববর্তী কোনো বুযূর্গের কবরের উপর কোনো মাকতুবাতের ভেতর “খাতামাল মুহাদ্দিসীন” অথবা এ জাতীয় যে সমস্ত লিখা রয়েছে তা সমসাময়িক অবস্থার সাথেই খাস বা নির্দিষ্ট। ভবিষ্যতের সাথে সেটির কোনো সম্পর্কই নেই। কেননা মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবগত নয়। কাজেই ঐ সমস্ত লিখা হতে শুধুমাত্র এ অর্থই উদ্দেশ্য হতে পারে যে, পূর্বে যত জন হাদীসের পন্ডিত অতীত হয়েছেন তাদের যোগ্যতা ও তাকওয়ার বিচারে শাহ আনওয়ার কাশ্মীরী (রহ.) এই সময়ের সেই সিলসিলার সর্বশেষ একজন মুহাদ্দিস। সুতরাং এ অর্থ গ্রহণ করার মধ্যে কোনো দোষ থাকার কথা নয়।

যদি তর্কের খাতিরে কাদিয়ানীদের উক্ত আপত্তি তেমনই মেনে নিই তাহলেও কোনো অসুবিধা থাকেনা। কেননা, কোনো ওলী বুযূর্গ, পীর মাশায়েখের নিজেস্ব কোনো খেয়াল বা রায় শরীয়তের মধ্যে দলীল হিসেবে ধর্তব্য হবেনা।

মির্যা কাদিয়ানীর পুত্র মির্যা বশির আহমদ এম.এ তিনি তার লেখিত “কালিমাতুল ফছল” বইটির ৯৩ নং পৃষ্ঠায় কাদিয়ানী লাহোরী গ্রুপের প্রধান মুহাম্মদ আলী লাহোরীর একটি বক্তব্যকে খন্ডন করতে গিয়ে কাদিয়ানিদের প্রথম খলিফা(?) হাকিম নূরুদ্দিন সম্পর্কে লিখেছেন,

اگر بفرض محال مان بہی لیا جاوئے کہ حضرت خلیفہ اول کا یہی خیال تہا جو مولوی محمد علی صاحب نے ظاہر کیا ہے تو تب بہی کوی حرج واقع نہیں ہوتا کیونکہ حضرت خلیفہ اول مامور نہیں تہے کہ عقائد میں ان کا فیصلہ ہمارے لئے حجت ہو۔

অর্থাৎ “যদি মেনেও নিই যে, মৌলভি মুহাম্মদ আলী লাহোরীর যেই আকীদা সেটি খলিফা-এ আউয়াল (হাকিম নূরুদ্দিন)’রও আকীদা, তবুও কোনো সমস্যা নেই। কেননা হযরত খলিফা-এ আউয়াল মামূর (প্রত্যাদিষ্ট) ব্যক্তি ছিলেন না যে, আক্বায়েদের (ধর্মমত) ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য দলিল হতে পারে!”

কাদিয়ানিদের জিজ্ঞেস করা চাই :

হাকিম নূরুদ্দিন সাহেব যিনি কাদিয়ানী জামাতের প্রথম খলিফা(?), তার সম্পর্কে মির্যা বশির আহমদ এম.এ লিখেছেন সে মামূর তথা প্রত্যাদিষ্ট ছিলেন না; তাই আক্বায়েদের ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্ত নাকি আপনাদের জন্য কোনো দলিল নয়! এমতাবস্থায় শাহ আনওয়ার কাশ্মীরী (রহ:) এর কবরের উপর স্থাপিত নেম-প্লেটটিতে “খাতিমুল বা খাতামুল ফুকাহা ওয়াল মুহাদ্দিসীন” শব্দটি যিনি লিখলেন তিনি যদি এই অর্থেই লিখেন যে, সত্যি-ই শাহ আনওয়ার কাশ্মীরী (রহ:) এর পর আর কোনো ফকিহ কিবা মুহাদ্দিস নেই, তার এই সিদ্ধান্তটাও আমাদের মুসলিম উম্মাহার ইজমার বিপরীতে ধর্তব্য হবে কেন? সেও কি মামূর মিনাল্লাহ?

এখন যদি তিনি প্রকৃতপক্ষেই “মামূর মিনাল্লাহ” হয়ে থাকেন তাহলে সেটি প্রমাণ করার দায়িত্ব নিশ্চয়ই আপনাদের, তাই নয় কি? যদি প্রমাণ করতে পারেন যে, তিনি অনুরূপ কেউ, তখনি কেবল আপনাদের উক্ত আপত্তি আমাদের পক্ষে আমলে নেয়ার মত কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে! তার আগে নয়!

আপনারা যেখানে হাকিম নূরুদ্দিন এর মত একজন কথিত খলিফা-এ আউয়ালের সিদ্ধান্তকে দলিল মানতে নারাজ সেখানে কোথায়কার কে কী লিখল তাতে আল্লাহর কালাম, রাসূল (সা.) এর অসংখ্য হাদীস, ইজমায়ে সাহাবা এবং যুগ ইমামদের অগনিত বক্তব্য সবগুলো কি মুহুর্তেই হাওয়া হয়ে যাবে? আপনাদের এই কেমন ইনসাফ!!

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

খতমে নবুওয়ত সম্পর্কিত সনদ সহ তিনটি সহীহ হাদীস

খতমে নবুওয়ত সম্পর্কিত সনদ সহ তিনটি সহীহ হাদীস

১। নবী করীম (ﷺ) এর শেষ নবী হওয়ার বিবরণ (باب ذِكْرِ كَوْنِهِ صلى الله عليه وسلم خَاتَمَ النَّبِيِّينَ) :

সনদ সহ হাদীসের আরবী অংশ :

‏‏ حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا عَفَّانُ، حَدَّثَنَا سَلِيمُ بْنُ حَيَّانَ، حَدَّثَنَا سَعِيدُ، بْنُ مِينَاءَ عَنْ جَابِرٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏”‏ مَثَلِي وَمَثَلُ الأَنْبِيَاءِ كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى دَارًا فَأَتَمَّهَا وَأَكْمَلَهَا إِلاَّ مَوْضِعَ لَبِنَةٍ فَجَعَلَ النَّاسُ يَدْخُلُونَهَا وَيَتَعَجَّبُونَ مِنْهَا وَيَقُولُونَ لَوْلاَ مَوْضِعُ اللَّبِنَةِ‏”‏ ‏.‏ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ فَأَنَا مَوْضِعُ اللَّبِنَةِ جِئْتُ فَخَتَمْتُ الأَنْبِيَاءَ”‏ ‏.‏ وَحَدَّثَنِيهِ مُحَمَّدُ بْنُ حَاتِمٍ، حَدَّثَنَا ابْنُ مَهْدِيٍّ، حَدَّثَنَا سَلِيمٌ، بِهَذَا الإِسْنَادِ مِثْلَهُ وَقَالَ بَدَلَ أَتَمَّهَا أَحْسَنَهَا ‏.‏

অর্থ হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আমার দৃষ্টান্ত এবং নবীগণের দৃষ্টান্ত সে ব্যক্তির দৃষ্টান্তের ন্যায়, যে একটি গৃহ নির্মাণ করল এবং সে তা সম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ করল কিন্তু একখানি ইটের জায়গা ব্যতীত। লোকেরা তাতে প্রবেশ করতে লাগল এবং তা দেখে বিস্মিত হতে লাগল এবং বলাবলি করতে লাগল, যদি এ একখানি ইটের জায়গা খালি না থাকত (তবে কতই না ভাল হতো)! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি হলাম সে ইটের জায়গা। আমি আগমন করলাম এবং নবীগণের ধারাক্রম সমাপ্ত করলাম

রেফারেন্স : সহীহ মুসলিম (ইফা) অধ্যায়ঃ ৪৫/ ফযীলত (كتاب الفضائل) হাদিস নম্বরঃ ৫৭৬৪।

জ্ঞাতব্য : মুহাম্মদ ইবনু হাতিম (রহ.) … সালীম ইবনু হাইয়ান (রহ.) সনদে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি أَتَمَّهَا (পরিপূর্ণ)-এর স্থলে أَحْسَنَهَا (সুন্দর করেছে) বলেছেন।

হাদীসের ইংলিশ ভার্সন :

  • Jabir reported Allah’s Messenger (ﷺ) as saying: The similitude of mine and that of the Apostles is like that of a person who built a house and he completed it and made it perfect but for the space of a brick. People entered therein and they were surprised at it and said: Had there been a brick (it would have been complete in all respects). Allah’s Messenger (ﷺ) said: I am that place where the brick (completing the building is to be placed), and I have come to finalise the chain of Apostles. This hadith has been narrated through another chain of transmitters but with a slight variation of wording.

২। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর নামসমূহ (باب فِي أَسْمَائِهِ صلى الله عليه وسلم) :

হাদীসটির সনদ সহ আরবী অংশ :

حَدَّثَنِي زُهَيْرُ بْنُ حَرْبٍ، وَإِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، وَابْنُ أَبِي عُمَرَ، – وَاللَّفْظُ لِزُهَيْرٍ – قَالَ إِسْحَاقُ أَخْبَرَنَا وَقَالَ الآخَرَانِ، حَدَّثَنَا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، سَمِعَ مُحَمَّدَ، بْنَ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ أَنَا مُحَمَّدٌ وَأَنَا أَحْمَدُ وَأَنَا الْمَاحِي الَّذِي يُمْحَى بِيَ الْكُفْرُ وَأَنَا الْحَاشِرُ الَّذِي يُحْشَرُ النَّاسُ عَلَى عَقِبِي وَأَنَا الْعَاقِبُ‏.‏ وَالْعَاقِبُ الَّذِي لَيْسَ بَعْدَهُ نَبِيُّ .‏

অর্থ : হযরত জুবায়ের ইবনু মুত’ঈম (রা.) থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি মুহাম্মদ (প্রশংসিত), আমি আহমদ (অত্যধিক প্রশংসাকারী), আমি আল-মাহী (বিলুপ্তকারী) এমন ব্যক্তি যে, আমার মাধ্যমে কুফরকে বিলুপ্ত করা হবে। আমি আল-হাশির (একত্রকারী) এমন ব্যক্তি যে, আমার পেছনে লোকদের সমবেত করা হবে। আমি আল-আকিব (সর্বশেষ), আর আল-আকীব ঐ ব্যক্তি যার পর কোনো নবী নেই।

রেফারেন্স : সহীহ মুসলিম (ইফা) অধ্যায়ঃ ৪৫/ ফযীলত (كتاب الفضائل) হাদীস নম্বরঃ ৫৮৯৪।

হাদীসটির ইংলিশ ভার্সন :

  • Jubair b. Mut’im reported on the authority of his father that he heard Allah’s Messenger (ﷺ) as saying: I am Muhammad and I am Ahmad, and I am al-Mahi (the obliterator) by whom unbelief would be obliterated, and I am Hashir (the gatherer) at whose feet mankind will be gathered, and I am ‘Aqib (the last to come) after whom there will be no Prophet ‏.‏

৩। কতিপয় মিথ্যুক বের না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত হবে না (بَابُ مَا جَاءَ لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَخْرُجَ كَذَّابُونَ ):

হাদীসের সনদ সহ আরবী অংশ :

حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ، حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ، عَنْ أَيُّوبَ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَبِي أَسْمَاءَ الرَّحَبِيِّ، عَنْ ثَوْبَانَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَلْحَقَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِي بِالْمُشْرِكِينَ وَحَتَّى يَعْبُدُوا الأَوْثَانَ وَإِنَّهُ سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي ثَلاَثُونَ كَذَّابُونَ كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيٌّ وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لاَ نَبِيَّ بَعْدِي”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ ‏.‏

অর্থ : হযরত ছাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের কিছু গোত্র মুশরিকদের সাথে শামিল না হওয়া পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। এমনকি এরা মূর্তিপূজা পর্যন্তও করবে। অচিরেই আমার উম্মতে ত্রিশজন অতি মিথ্যাবাদীর আবির্ভাব হবে। তারা প্রত্যেকেই দাবী করবে যে, তারা নবী, অথচ আমিই শেষ নবী, আমার পরে কোন নবী নাই। সহীহ, মিশকাত ৫৪০৬, সহীহাহ ১৬৮৩, তিরমিজী হাদীস নম্বরঃ ২২১৯ (আল মাদানী প্রকাশনী)। আবু ঈসা আত-তিরমিজী রহঃ বলেন, এ হাদীসটি হাসান ও সহীহ।

রেফারেন্স : সূনান তিরমিজী (ইফাঃ) অধ্যায়ঃ ৩৬/ ফিতনা (كتاب الفتن عن رسول الله ﷺ) হাদিস নম্বরঃ ২২২২।

ফুটনোট : ‘আমার উম্মতে ত্রিশজন অতি মিথ্যাবাদীর আবির্ভাব হবে’ হাদীসের এই কথার ব্যাখ্যায় সহীহ বুখারীর বিশ্ববিখ্যাত ব্যাখ্যাকারক ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (৭৭৩-৮৫২ হিজরী কায়রো, মিশর) লিখেছেন,

و انما ﺍﻟﻤﺮﺍﺩ ﻣﻦ ﻗﺎﻣﺖ ﻟﻪ ﺷﻮﻛﺔ ﻭﺑﺪﺕ ﻟﻪ ﺷﺒﻬﺔ

(উচ্চারণ, ওয়া ইন্নামাল মুরাদু মান ক্বামাত লাহু শাওকাতুন ওয়া বাদাত লাহু শুবহাতুন)।

অর্থাৎ এই ত্রিশজন মিথ্যাবাদী বলতে বিশেষভাবে ওরাই উদ্দেশ্য যাদের দাপট প্রতিষ্ঠা পাবে এবং (সাধারণ মানুষের ভেতর) তাদের তৎপরতার কারণে মারাত্মক সন্দেহ সৃষ্টি হবে। (ফাতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী : খন্ড ১২ পৃষ্ঠা ৩৪৩)। অর্থাৎ এর মানে এই নয় যে, ত্রিশের পরের নবুওয়ত দাবীদারগণ “সত্য” বলে গণ্য হবে!

এবার ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ:) সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন, (উইকিপিডিয়া, বাংলা)

হাদীসটির ইংলিশ ভার্সন :

  • Thawban narrated that the Messenger of Allah(s.a.w) said: “The Hour shall not be established until tribes of my Ummah unite with the idolaters, and until they worship idols. And indeed there shall be thirty imposters in my Ummah,each of them claiming that he is a Prophet. And I am the last of the Prophets, there is no Prophet after me.”

উৎস : বাংলা হাদীস অ্যাপস (Apps) থেকে কপিকৃত।

ইসলামের এই শিক্ষার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মির্যা কাদিয়ানীর নবী রাসূল দাবী :

মির্যা গোলাম কাদিয়ানী লিখেছেন,

‘মোটকথা আমি মুহাম্মদ ও আহমদ (সঃ) হওয়ার কারণে আমার নবুওয়ত ও রেসালত লাভ হয়েছে, স্বকীয়তায় নয়, ‘ফানাফির রসূল’ হয়ে অর্থাৎ রসূলের মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করে পেয়েছি। সুতরাং এতে ‘খাতামান্নাবীঈনের’ অর্থে কোন ব্যতিক্রম ঘটলো না। পক্ষান্তরে ঈসা আলায়হেসসালাম আবার (এ পৃথিবীতে) আসলে (খাতামান্নাবীঈনের অর্থে) নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম ঘটবে।’

(দেখুন ‘এক গলতি কা ইযালা’ বা একটি ভুল সংশোধন পৃষ্ঠা নং ৫; [বাংলায় অনূদিত], দ্বিতীয় বাংলা সংস্করণ ২০০১ ইং; অনুবাদক মৌলভী মোহাম্মদ; মূল লিখক, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী; রচনাকাল ১৯০১ইং, প্রকাশনায় আহমদীয়া মুসলিম জামা’ত বাংলাদেশ)।

  • কাদিয়ানীদের বই পুস্তক এবং পত্র পত্রিকায় হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে যেসব মর্মার্থে “শেষনবী” মান্য করার দাবী করে তা জানতে এখানে ক্লিক করুন

অতএব, খাতামুন নাবিয়্যীন মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ এর পর নবুওয়ত দাবী করায় মির্যা কাদিয়ানী একজন মিথ্যাবাদী ও ইসলাম থেকে খারিজ এবং কাফের জাতির অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রমাণিত। ফলে তার অনুসারী কাদিয়ানী সম্প্রদায়ও কাফের জাতির অন্তর্ভুক্ত হিসেবেই গণ্য হবে। যদিও তারা আমাদের মতই কলেমা পড়ে, নামাজ রোজা ইত্যাদি করেনা কেন! সংক্ষেপে।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

তাহলে সেই ‘বহু রাসূল’ কারা যারা এখনো জীবিত

কাদিয়ানীদের একটি প্রশ্ন ও আমার জবাব :

প্রিয় কাদিয়ানীবন্ধুরা! আমি চাই আমার এই লিখা আপনাদের কারো বদ-হজমের কারণ না হয়। কাজেই যাদের হজম শক্তি দুর্বল তারা দূরত্ব বজায় রাখবেন!

  • কথায় আছে, আগের দিন বাঘে খাইছে। সবারই জানা, এখন সময় বদলে গেছে। সে সাথে শুধু জাগতিক শিক্ষাদীক্ষা আর প্রযুক্তির উন্নতি-ই হয়নি বরং দ্বীনি শিক্ষাদীক্ষারও খুবই উন্নতি হয়েছে। এখন প্রায় ঘরে ঘরে মওলানা মুফতি মুহাদ্দিস কিংবা দাওয়াত ও তাবলীগের দাঈ খুঁজে পাবেন। একদম সাধারণ থেকে সাধারণ মানুষও আগের মত এখন আর যাই বলবেন তাই মুখবুজে শুনে হজম করেনা, প্রশ্নও করে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, এখন এরাও দ্বীনি শিক্ষায় আগের মত পিছিয়ে নেই, মোটামুটি অগ্রসরমান। আর তাই অন্তত এটুকু হলেও বলতে শিখেছে, শায়খ বা হুজুর! হাদীসটি কি সহীহ না দ্বয়িফ? যদিও সে সহীহ আর দ্বয়িফের সংজ্ঞা ভালো করে বুঝিয়ে বলতে পারবেনা, ধারণা একটু হলেও আছে তা মানতে হবে। এটি খুবই ভালো দিক। আর এমনটি কেনই বা হবেনা, তথ্যপ্রযুক্তির এই বিশ্বায়নের যুগেও কেউ কি স্বেচ্ছায় পিছিয়ে থাকতে পারে? পারেনা! তাই বলেছি, আগের দিন বাঘে খাইছে।

একথা বলার উদ্দেশ্য?

তাহলে শুনুন, সেই ১৯৯৪ কি ৯৫ সালের কথা। তাহাফফুজে খতমে নবুওয়তের আন্দোলন তখন গোটা দেশব্যাপী সাড়া জাগানিয়া ছিল। কিন্তু সেসব আন্দোলন কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে তা সচেতন জনতাই ভালো বলতে পারেন। আমি তখন খুব ছোট ছিলাম। কিন্তু এখন দীর্ঘ চিন্তাভাবনা শেষে আমি যা বুঝলাম তা এককথায় প্রকাশ করলে ওই সব আন্দোলনের সুফল ‘সামান্যই’ ছিল। যেহেতু তখন স্যোসাল মিড়িয়া ছিলনা, ছিলনা যোগাযোগ ব্যবস্থার কোনো উন্নতি। আর সে ‘সামান্যই’ হচ্ছে, দেশের বেশিরভাগ মানুষের কানে এটুকু পৌছানো যে, কাদিয়ানীরা কাফের! আসলে এইটুকুও বা কম কিসের?

কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, ছুম্মা আলহামদুলিল্লাহ! খুশির খবর হল, বর্তমানে রদ্দে কাদিয়ানীয়তের উপর খতমে নবুওয়ত আন্দোলন এর নামে ভুঁইফোঁড় ব্যানারগুলো সমষ্টিগতভাবে যতটা খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে তার চেয়ে ৫০ গুণ বেশি খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন নাম-ঠিকানা ও ব্যানার বিহীন অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যাদের প্রায় সকলেই এই বিষয়ে পরিপূর্ণ অবিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত। আর তা সম্ভব হচ্ছে শুধুমাত্র ইখলাস আর সুশৃঙ্খল মেহনতের মাধ্যমে। এককথায়, বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমেই তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সফলতার মুখ দেখতে পাচ্ছে। ফলে আমার হিসেবে গোটা বাংলাদেশে গত ২০১৬ সালের পর থেকে আজকের দিন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ এর বেশি কাদিয়ানী মির্যার ধোকা আর প্রতারণা বুঝতে পেরে স্বেচ্ছায় তাওবা পড়ে ইসলামে ফিরে এসেছে! এইজন্য মাঠ পর্যায়ে ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অবিজ্ঞ মু’আল্লিমদের অনেক বেশি দাওয়াতি কাজ করতে হয়েছে। আর তাই কাদিয়ানীদের ভাবা উচিত, আজকের সময়টা আর সেই ‘৯৪ এবং ‘৯৫ এক না। আরে আমি তো নিশ্চিত, আগামী আর কয়েকটা বছর পর বাংলাদেশের তাহাফফুজে খতমে নবুওয়তের ব্যানার বিহীন সংগ্রামীরা বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে খুব দ্রুতই একটা ইতিহাস সৃষ্টি করবে, ইনশাআল্লাহ। আর সেজন্যই বলেছি আগের দিন বাঘে খাইছে!

আসি মূলকথায়,

কাদিয়ানীদের কথিত খলীফাতুল মসীহ আউয়াল হেকিম নূরুদ্দীন এর ‘ফসলূল খেতাব’ (রচনাকাল ১৮৮৭ইং) পুস্তকের ২৮ নং পৃষ্ঠার স্ক্রিনশট সহ উদ্ধৃতি দিয়ে গত লিখায় তাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছিলাম যে, দেখ দেখ সূরা আলে ইমরানের ১৪৪ নং আয়াতের ‘ক্বদ খালাত মিন কবলিহির রসুল’ এর অর্থে সেখানেও “বহু রাসূল গত হইয়াছে” লিখা আছে। বিস্তারিত আগের পোস্টে দেখুন। আগের পোস্ট এখানে

এর পরিপ্রেক্ষিতে তারা একদম লা-জওয়াব ছিল। কিন্তু ইজ্জত বাঁচাতে শেষমেশ প্রসঙ্গ পাল্টে আমাকে প্রশ্ন করল, তাহলে মুহাম্মদ (সা.)-এর পূর্বে আরো বহু রাসূল যারা জীবিত তারা আর কে কে আছেন? আসুন তাদের এই প্রশ্নটিরও জবাব দিই!

আরও জীবিত “বহু রাসূল” কে কে আছেন?

প্রথমত, “বহু” এর প্রয়োগ এবং ব্যবহারিক তাৎপর্য বুঝতে হবে। সমস্ত আর বহু—এই দুইয়ের মাঝে আদৌ কোনো পার্থক্য আছে কি নেই! যদি কোনো পার্থক্য না থাকে তখন তো প্রশ্ন আসবে যে, তাহলে কাদিয়ানীদের অনুবাদকৃত কুরআনে তারা “বহু রাসূল” এর স্থলে “সমস্ত রাসূল” এইরূপ অর্থ কেন করল? অতএব পার্থক্য নিশ্চয়ই রয়েছে এটাই অনস্বীকার্য। তাহলে সে পার্থক্যটা কী? সেই পার্থক্যটা বুঝার আগে আমি এখানে ইংরেজি দুটো শব্দ দিচ্ছি। many আর All এই দুইয়ের পার্থক্য যাদের বুঝে আসবে তাদের জন্য ওই দুটোর পার্থক্য বুঝাও সহজ হবে।

এখানে বলে রাখতে চাই, হেকিম নূরুদ্দীন সাহেব উক্ত বইটি কাদিয়ানী মতাদর্শে দীক্ষিত হওয়ারও আরো প্রায় চার বছর পর ১৮৮৭ সালে স্বয়ং মির্যা কাদিয়ানীর নির্দেশে ও তারই তত্ত্বাবধানে লিখেছিলেন। একথাগুলো উক্ত বইয়ের (উর্দু) ১নং পৃষ্ঠাতেও রয়েছে।

(স্ক্রিনশট-১)

তিনি বইটি খ্রিস্টানদের খন্ডন করতেই মোট চার খন্ডে লিখেছেন। জম্মুর মহারাজা তিনি হেকিম নূরুদ্দীনকে পুঞ্চের রাজপুত্রের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে পুঞ্চে পাঠালে তিনি সেখানে প্রায় একবছর সময়ব্যাপী বইটি লিখেন এবং লিখার সময় তিনি পত্র ও লেখনীর মাধ্যমে মির্যার কাছ থেকে অব্যাহত নির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা লাভ করেন। সকল বিষয়ে তিনি মির্যার পরামর্শ চাইতেন। এ সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন ‘হযরত মৌলভী নূরউদ্দীন (রা.) খলীফাতুল মসীহ আউয়াল’ পৃষ্ঠা নং ৭৪-৭৫; প্রথম সংস্করণ বাংলা ২৭ মে ২০০৮ইং।

(স্ক্রিনশট-২)

দ্বিতীয়ত, উদাহরণ দিচ্ছি,

মনে করুন, প্রিন্সিপাল সাহেব ক্লাস নাইনের ছাত্রদের তার অফিসে আসতে নির্দেশ দিল। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই ছাত্ররা এসে উপস্থিত হল। কিন্তু একজন ছাত্র যে কোনো কারণে তখনো এসে উপস্থিত হতে পারেনি। প্রিন্সিপাল সাহেব এমতাবস্থায় জিজ্ঞেস করলেন, সকলে বা সবাই কি এসেছো?

এখানে ওই যে একজন এখনো এসে উপস্থিত হলনা তজ্জন্য প্রিন্সিপালের উক্ত প্রশ্নের উত্তরটা এই পর্যায় কী হবে বলুন!

সকলে এসেছে—উত্তর কি কখনোই এটা হতে পারে? একজন সুশিক্ষিত ব্যক্তির নিরপেক্ষ মন কী বলে?

এখানে প্রিন্সিপালের প্রশ্নের উত্তরে নিচের যে কোনোটাই সদুত্তর হতে পারে।

অনেকে এসেছে” কিংবা “বহু সংখ্যক এসেছে“।

অতএব যেহেতু বহু মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদীস বলছে যে, ঈসা (আ:) এখনো মৃত্যুবরণ করেননি সেহেতু সূরা আলে ইমরানের ১৪৪ নং আয়াতের “আর-রসুল” এর যেই অর্থ (বহু রাসূল) খোদ হেকিম নূরুদ্দীন সাহেবও নিয়েছেন সেটাই সঠিক এবং ব্যাকরণ সিদ্ধও বটে। আর সেজন্য বিপরীতে আরও “বহু রাসূল” জীবিত থাকা দাবী করবেনা। বরং “বহু রাসূল” অর্থ নেয়ার জন্য যে কোনো একজন রাসূলই জীবিত থাকা যথেষ্ট। অতএব কাদিয়ানীদের উপরিউক্ত যুক্তি পুরোটা অবান্তর। তবুও তাদের শান্তনার জন্য আমার কাছে একটা জবাব অবশ্যই রয়েছে। তা হল,

আগের সেই বহু রাসূল তারা কারা?

(১) এর উত্তরে আমার জবাব হল, মির্যা কাদিয়ানী হযরত মূসা (আ.) সম্পর্কে লিখেছে ‘লাম ইয়ামুত’ (لم يمت) অর্থাৎ তিনি মৃত্যুবরণ করেননি। দেখুন রূহানী খাযায়েন খন্ড নং ৮ পৃষ্ঠা নং ৬৮-৬৯। আরো দেখুন, হামামাতুল বুশরা (বাংলা) পৃষ্ঠা ৬২। অতএব আপনাদের বিচারে মূসা (আ.) এখনো জীবিত বুঝা গেল।

(২) পবিত্র কুরআনে (১৯:১৯) আল্লাহতালা হযরত জিবরাইল (আ.)-কেও ‘রাসূল‘ শব্দে আখ্যা দিয়েছেন। যেমন হযরত মরিয়ম (আ.)-এর নিকট জিবরাইল (আ.)-কে পাঠানো হলে তিনি তাঁকে সম্বোধন করে যে কথা বলেছিলেন আল্লাহ তায়ালা সেটি পবিত্র কুরআনে হুবহু সেভাবেই উল্লেখ করে দিয়েছেন। জিবরাইল (আ.) বলেছেন, إنما انا رسول ربك অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রভুর একজন রাসূল বা বার্তাবাহক। এখানে জিবরাইল (আ.) “রাসূল” শব্দে আখ্যায়িত হয়েছেন। আর তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মেরও পূর্ব থেকেই ছিলেন এখনো জীবিতই আছেন। সূরা হাজ্জ আয়াত নং ৭৫ দেখুন, আল্লাহ বলেছেন, الله يصطفى من الملائكة رسلا و من الناس অর্থ তিনি ফেরেশতাদের মধ্য থেকে রাসূল মনোনীত করেন এবং মানুষের মধ্য থেকেও। এতেও বুঝা যাচ্ছে যে, من قبله الرسل এর মধ্যে ‘সমস্ত রাসূল’ অর্থ নেয়া ঠিক হবেনা। অন্যথা জিবরাইল (আ.) সহ অনেক ফেরেশতাকেও বর্তমানে মৃত্যুবরণকারী বিশ্বাস করতে হবে। অথচ বহু হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত রয়েছে যে, ফেরেশতাদের মৃত্যু কেয়ামতের পূর্ব মুহূর্তেই হবে, আগে নয়।

(৩) আমাদের মুসলিম উম্মাহার সর্বসম্মতিক্রমে “ঈসা” (আ.) এখনো জীবিত আছেন।

তাহলে কাদিয়ানীর মতে মূসা (আ.), পবিত্র কুরআনের কতেক আয়াত অনুযায়ী জিবরাইল এবং আরও বেশ কয়জন ফেরেশতা। কুরআন ও হাদীসের আলোকে ঈসা আলাইহিমুস সালাম। অন্ততপক্ষে তিন বা ততোধিক ‘আল্লাহ’র রসুল‘ জীবিত সাব্যস্ত হলো কিনা? কাদিয়ানীদের জন্য আফসোস! তারা এর পরেও তোতাপাখির মত সে একই কথা বলে বেড়াবে যে, তাহলে আরও জীবিত বহু রাসূল তারা কারা? সংক্ষেপে লিখলাম।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

মির্যা কাদিয়ানীর নবী দাবীর ডজন প্লাস রেফারেন্স

কাদিয়ানীরা মুসলমানদের ব্যাপারে কেমন ধারণা রাখে? এখানে ক্লিক করুন।

এক নজরে মির্যা কাদিয়ানী সাহেবের “নবী রাসূল” দাবীর রেফারেন্স তার এবং তার পুত্র আর আহমদী জামাতের নেতাদের কতেক বইপুস্তক থেকে :

  • মির্যা কাদিয়ানী সম্পর্কে উইকিপিডিয়া থেকে জানুন
  • এবার ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করছি-
  • (এক) কাদিয়ানীদের প্রকাশিত “নবুওয়ত ও খিলাফত” বইয়ের ৭৬ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর ঘোষণা : “আল্লাহ’র নির্দেশ মুতাবেক আমি একজন নবী।” প্রামাণ্য স্ক্যানকপি

(দুই) নবুওয়তি প্রাসাদের “সর্বশেষ ইট” হবার দাবী। যেমন, মির্যা সাহেব লিখেছেন, ‘নেয়ামতপ্রাপ্তদের প্রাসাদের একখানা ইটের জায়গা শূন্য ছিল। আল্লাহ ইচ্ছা করলেন যে, তিনি ভবিষ্যৎবাণী পূর্ণ করতে সর্বশেষ ইটের জায়গাটি পরিপূর্ণ করে প্রাসাদটি সম্পন্ন করবেন। আর আমিই হলাম সেই শূন্য জায়গার অবশিষ্ট ইট।’ (অনুবাদ শেষ হল)। দেখুন, খোতবায়ে ইলহামিয়্যাহ, রূহানী খাযায়েন ১৬/১৭৭-৭৮ ; উল্লেখ্য মির্যা কাদিয়ানীর ৮৩টি বইয়ের সমষ্টি হল ২৩ খন্ডে প্রকাশিত রূহানী খাযায়েন।

(তিন) শেষনবীর দ্বিতীয় প্রকাশ ও প্রতিবিম্ব নবী হবার দাবী। রূহানী খাযায়েন ১৮/২১২।

(চার) শরীয়তি নবী হওয়ার দাবী। রূহানী খাযায়েন ১৫/৪৩২; ১৭/৪৩৫-৩৬।

(পাঁচ) মুহাম্মদী ধারাবাহিকতায় শেষনবী হবার দাবী। রূহানী খাযায়েন ২০/৬৯-৭০; ১৯/৬১।

উল্লিখিত দাবীটি অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মদীয়ার মধ্যে ‘সর্বশেষ প্রেরিত পুরুষ’ বলে পরিষ্কার কুফুরী মতবাদটি কাদিয়ানী জামাতের এদেশীয় প্রকাশনী থেকেও বিভিন্ন বইপুস্তকে আমরা দেখতে পাই। (দেখুন, ইসলাম ও এ দেশের অন্যান্য ধর্মমত পৃষ্ঠা নং ৪২ এবং ৪৯, অনুবাদক: কাদিয়ানী ন্যাশনাল আমীর আব্দুল আউয়াল)।

(ছয়) সুস্পষ্টভাবে নবী এবং রাসূল হওয়ার দাবী। মির্যা কাদিয়ানীর ভাষ্যমতে, আমার দাবী- আমি একজন নবী ও রাসূল। মালফূজাত ৫/৪৪৭; নতুন উর্দূ এডিশন অনলাইন ভার্সন।

(সাত) হযরত মূসা (আ:)-এর মত একজন রাসূল দাবী। মালফূজাত ৫/২৭; নতুন এডিশন।

(আট) মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দীন লিখেছেন, “আমাদের জন্য ফরজ হচ্ছে, আমরা যেন অ-আহমদীদের মুসলমান স্বীকার না করি এবং তাদের পেছনে সালাত না পড়ি। কেননা তারা (অ-আহমদীরা) আমাদের দৃষ্টিতে খোদাতালার একজন নবীকে অস্বীকারকারী।” মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এর রচনাবলীর সমষ্টি আনওয়ারুল উলূম ৩/১৪৮, ৬/১৫১; অনলাইন এডিশন।

(নয়) তিনি আরও লিখেছেন যে, নবুওয়তের মাসয়ালার জট মির্যা কাদিয়ানীর উপর ১৯০১ সালের পরেই খুলেছে। তার মানে, তিনি ইতিপূর্বে যেসব শব্দের (উম্মতি/বুরুজী) আশ্রয় নিয়ে নবী দাবী করেছিলেন সেটি এখন (১৯০১ সালের পর থেকে) রহিত, সেসব দ্বারা এখন আর কেউ দলিল দিতে পারবেনা। এতে সাব্যস্ত হল যে, তিনি ১৯০১ সালের পর থেকে আপনা নবী দাবী সংক্রান্ত বিশ্বাসের ভেতর পরিবর্তন এনেছেন। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি দ্রষ্টব্য

(দশ) মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ লিখেছেন, میں نے حضرت مسیح موعود کی متعلق یہ خیال پہلا یا ہے کہ آپ فی الواقع نبی ہیں অর্থাৎ “আমি হযরত মসীহ মওউদ (মির্যা কাদিয়ানী) সম্পর্কে এ বিশ্বাস প্রচার করেছি যে, তিনি এই সময়ের একজন নবী।” – (আয়ানায়ে সাদাক্বাত ১১০)। মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এর রচনাবলীর সমষ্টি আনওয়ারুল উলূম ৬/১১০; অনলাইন এডিশন। (মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদ এর ২৬ খন্ডে প্রকাশিত উর্দূ রচনাবলীর সমষ্টি انوار العلوم ডাউনলোড করুন এখান থেকে)।

(এগার) মির্যা কাদিয়ানীর “রাসূল” হওয়ার দাবী। আল্লাহতালা নাকি কাদিয়ানে তাঁর রাসূল পাঠিয়েছেন। দাফেউল বালা (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ১২।

(বারো) নবী এবং রাসূল হওয়ার দাবী। দেখুন, একটি ভুল সংশোধন (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ৩,৫,৮,১০।

(তের) রাসূল হওয়ার দাবী। আল ওসীয়্যত (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ২০, ষষ্ঠ প্রকাশ, মে ২০২৩ ইং।

(চৌদ্দ) আল্লাহতালা নাকি মির্যাকেই “নবী” নামে খাস করেছেন। হাকীকাতুল ওহী (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ৩৩০।

(পনের) মুহাম্মদী ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ নবী এই অধম (মির্যা কাদিয়ানী) । তাযকিরাতুশ শাহাদাতাইন (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ৮২।

(ষোল) আল্লাহ তায়ালার নাকি ওয়াদা ছিল উম্মতে মুহাম্মদীয়ার মধ্যে একজন “রাসূল” পাঠানোর। যে কিনা মাহদী ও মসীহ হবেন। দেখুন, ঈসা (আ:)-এর মৃত্যুতে ইসলামের জীবন, লিখক শাহ মুস্তাফিজুর রহমান পৃষ্ঠা নং ৩৭ (১১তম পুনঃমুদ্রণ, জানুয়ারী ২০১৮ ইং)। স্ক্রিনশট এই যে,

(সতের) কাদিয়ানীদের প্রকাশিত ‘উম্মতিনবী‘ বইয়ের ৯ নং পৃষ্ঠাটি থেকে দেখুন, মির্যা কাদিয়ানীকে একই সাথে নবী এবং উম্মতী দুটোই বলে মেনে নেয়া হয়েছে। স্ক্রিনশট এই যে,

উল্লিখিত দাবীটি মির্যা কাদিয়ানীর রচিত উর্দূ ভাষার রচিত ‘মালফুযাত‘ গ্রন্থের খন্ড নং ৫ এবং পৃষ্ঠা নং ৩৫৩ থেকেও দেখা যেতে পারে। স্ক্রিনশট এই যে,

কাদিয়ানী জামাতের অথেনটিক অফিসিয়াল উর্দূ পত্রিকা যা ‘ভারতের কাদিয়ান’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে, নাম দৈনিক ‘আল ফজল‘ তাং ২৬-০৬-১৯২২ইং। পত্রিকাটির পাতা নং ৬ থেকে মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এর উদ্ধৃতিটি নিচে বাংলায় অনুবাদ করছি, তিনি লিখেছেন-

“আমরা যেহেতু হযরত মির্যা সাহেবকে ‘নবী‘ মেনে থাকি আর গয়ের আহমদীরা (অ-কাদিয়ানীরা) তাঁকে ‘নবী’ মানেনা, সেজন্য কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী যে কোনো একজন নবীর অস্বীকারকারীও কাফের হওয়ায় গয়ের আহমদীরা কাফের।” (সম্পূর্ণ বক্তব্যটি কাদিয়ানীদের দ্বিতীয় খলীফার বয়ান থেকেই উদ্ধৃত করা হল)। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি এই-

এখন প্রশ্ন হল, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী সাহেবের তো কথিত তৃতীয় শ্রেণীর নবী (জিল্লি, বুরুজি) দাবী ছিল। আর মির্যা বশির আহমদ এম.এ সাহেবের বক্তব্য অনুসারে, ‘খোদা আপনা বাণীতে (কুরআনে) কখনোই জিল্লি, বুরুজি শব্দ ব্যবহার করেননি।’ (কালিমাতুল ফছল ২৮)।

এমতাবস্থায় মির্যা গোলাম আহমদকে অস্বীকার করলে সেটি কুরআনের শিক্ষার বিরুদ্ধে গেল কিভাবে? কুরআনে উল্লিখিত কোনো নবী কি তৃতীয় শ্রেণীর (কথিত বুরুজি জিল্লি) নবী? অবশ্যই না।

সুতরাং সাব্যস্ত হয়ে গেল যে, মির্যা কাদিয়ানীর কথিত বুরুজি আর জিল্লি শব্দের আশ্রয় নিয়ে নবী দাবীটা শুধুই একটি প্রতারণাই ছিল। মূলত সে মুক্ত অর্থেই একজন নবী দাবীদার ছিল। যা তার কথিত মুসলেহ মওউদ মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদের বক্তব্য হতেও সুস্পষ্ট। নতুবা উপরের প্রশ্নটির কী জবাব?

শেষকথা

  • উপরের রেফারেন্সগুলোর একটিও কোনো কাদিয়ানী স্থানীয় জনপ্রশাসনের উপস্থিতিতে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারলে আমি তাকে নগদে ১ লক্ষ টাকা পুরুষ্কার দেব; আর প্রমাণ করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে তাকে অবশ্যই তাওবা পড়ে ইসলাম কবুল করতে হবে এবং প্রকাশ্যে কাদিয়ানীয়ত ছাড়ার ঘোষণা দিতে হবে। যোগাযোগ 01629941773 (ইমু & ওয়ার্ডশপ)।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

আদম (আ:) কি প্রথম মানুষ নন? কাদিয়ানী মতবাদের খন্ডন

হযরত আদম (আ:) কি একই সাথে প্রথম নবী এবং প্রথম মানুষ নন? কাদিয়ানীদের একটি ইসলাম পরিপন্থী কুফুরী আকীদার দাঁতভাঙা জবাব :

কাদিয়ানীদের বইগুলো অসম্ভব রকমের স্ববিরোধ কথাবার্তায় ভরা! এদের মু’আল্লিমদের যদি প্রশ্ন করেন যে, হযরত আদম (আ:)-ই আমাদের আদি-পিতা ছিলেন, তোমরা কি এটা মানো? তারা জবাবে বলবে, না আমরা এটা মানিনা! তারা তাদের মতের পক্ষে অনেক যুক্তি এবং পবিত্র কুরআন থেকে আয়াত উল্লেখ করে অপব্যাখ্যাও দিতে চাইবে!

কিন্তু এই যে একখানা বইয়ের স্ক্রিনশট দেখতে পাচ্ছেন, এটিও কিন্তু তাদেরই বই। মির্যা কাদিয়ানীর ১৯০৪ সালের সেপ্টেম্বরে লাহোরে একটি জনসমাবেশে তারই একটি লেকচারের বঙ্গানুবাদ। এই বইয়ের ৪৮ নং পৃষ্ঠায় দেখুন পরিষ্কারভাবে আগের মতবাদেরই বিপরীতে লিখা আছে,

  • “পূর্ববর্তী সকল সভ্যতার পর যে আদম (আ:) আগমন করেন, যিনি আমাদের সবার আদি পিতা, পৃথিবীতে তাঁর আগমনের যুগ থেকে বর্তমান মানব সভ্যতা সূচিত হয়েছে। আর এই (সমস্ত) সভ্যতার পূর্ণ চক্রের আয়ু সাত হাজার বছর পর্যন্ত প্রসারিত।”

উল্লিখিত লেখনী হতে বুঝা গেল, মানব সভ্যতার পূর্ণ চক্রের আয়ু ‘সাত হাজার বছর’ বলে মির্যা কাদিয়ানী আরও যা বললেন অর্থাৎ মানুষের আদি পিতা হযরত আদম (আ.) ও তাঁর যুগ থেকেই মানবসভ্যতা সূচিত হয়। আর সাত হাজার বছর পরপরই উক্ত সভ্যতার পরিসমাপ্তি ঘটবে তথা কেয়ামত সংঘটিত হয়ে যাবে।

  • মির্যা সাহেবের রচনাবলীতে স্ববিরোধ কথার পরিষ্কার চাপ বিদ্যমান। তার কোনো কোনো লিখনীতে আদম (আ.)-কে প্রথম মানব বলে অস্বীকার করার কথা থাকলেও তিনি তার উক্ত বক্তব্যে প্রথম মানব বলে হযরত আদম (আ.)-কেই উল্লেখ করে গেছেন। কিন্তু অধিকাংশ কাদিয়ানীর এসবে কোনো ধারণা নেই।

অপ্রিয় হলেও সত্য তাদের বইগুলো পড়লে যে কেউই এভাবে অসংখ্য স্ববিরোধ কথাবার্তার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাবেন।

যাইহোক, এবার সামনে চলুন!

কাদিয়ানীধর্ম এর অনুসারীরা ডারউইন এর বিবর্তনবাদ তত্ত্ব কুরআনের সাথে মিশিয়ে বলতে চায় প্রথম মানব আদমের পূর্বেও বহু বন্য মানুষ ছিল । নাউযুবিল্লাহ। এর মানে এদের বিশ্বাস হল, হযরত আদম (আ:) প্রথম মানব ছিলেন না, বরং তাঁর পূর্বেও মানব গোষ্ঠী ছিল! তাই এদের উদ্দেশ্যে এখানে আমি কিছু দলিল ও যুক্তি-নির্ভর প্রশ্ন উত্থাপন করছি। আমি তাদের বিবেকের নিকট প্রশ্নগুলোর উত্তর চাইব! তাই প্রথমেই একটি আয়াত দিয়েই শুরু করছি,

আল্লাহতালা ইরশাদ করেন :

إن مثل عيسى عند الله كمثل آدم خلقه من تراب ثم قال له كن فيكون অর্থাৎ নিঃসন্দেহে আল্লাহ’র নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত হচ্ছে আদমেরই মতো। তিনি তাঁকে মাটি দিয়ে তৈরী করেছিলেন তারপর তাঁকে বলেছিলেন, হয়ে যাও! সঙ্গে সঙ্গে হয়ে গেলেন (সূরা আল ইমরান – ৫৯)।

সম্পর্কিত আলোচনা : মহান আল্লাহ পিতা বিহীন ঈসা (আ:)-কে সেভাবেই সৃষ্টি করেছেন যেভাবে প্রথম মানব আদমকে সৃষ্টি করেছিলেন। আদমের সাথে ঈসার দৃষ্টান্ত এটাই। উক্ত আয়াতে আবার বলা হল, আদমকে মাটি দ্বারাই সৃষ্টি করা হয়েছে এবং হয়ে যাও বলতেই পূর্ণাঙ্গ রক্তে মাংসে পরিণত হয়ে গেছে, এই আয়াতে ইহা একেবারেই সুস্পষ্ট। অতএব, আদমের পূর্বে কোনো মানুষ ছিল না বলেই অকাট্যরূপে প্রমাণিত। ডারউইনের ভ্রান্ত মতবাদকে বিজ্ঞান আখ্যা দিয়ে মহাগ্রন্থে আল কুরআনের আয়াতকে বিকৃত করে ব্যতিক্রম কিছু সাব্যস্ত করার আর কোনো সুযোগই থাকেনি।

হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন, হযরত আদম (আ:)ই যদি প্রথম মানুষ হন তাহলে তখন তো আর কোনো মানুষই জগতে ছিলো না। এমতাবস্থায় তিনি কাদের জন্য নবী হয়ে আসলেন কিংবা কোন সম্প্রদায়ের জন্য প্রেরিত হলেন? এতেই বুঝা যায়, মূলত যিনি প্রথম আদম তিনি নবুওয়তের অধিকারী হযরত আদম নন, বরং ভিন্ন একজন। (কাদিয়ানীদের দাবী ও যুক্তি শেষ হল)।

  • তাদের উক্ত দাবী এবং যুক্তির জবাব একদম শেষেই দেয়া হবে। তার আগে তাদেরই উক্ত দাবী এবং যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে আমি তাদের উদ্দেশ্যে পালটা কিছু প্রশ্ন করতে চাই।

১। পবিত্র কুরআনে কয়জন আদম এর উল্লেখ আছে? কয়েকজন আদমের নাকি শুধুই একজন আদমের? এর জবাব আগে দিন! যদি বলেন, কয়েকজন আদমের কথাই উল্লেখ আছে। তাহলে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ উল্লেখ করুন।

২। এই প্রশ্নটি বুঝার সুবিধার্থে প্রথমে হাদীসটি পড়ুন। সহীহ বুখারীর কিতাবুল আম্বিয়া পর্বের অধ্যায় নং ৫০ এবং হাদীস নং ৩১০০ দেখুন, হাদীসের আরবী,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ ـ رضى الله عنه ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ لاَ تُقْتَلُ نَفْسٌ ظُلْمًا إِلاَّ كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا، لأَنَّهُ أَوَّلُ مَنْ سَنَّ الْقَتْلَ

অর্থ, আবদুল্লাহ‌ ইবনু মাসঊদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কোনো ব্যাক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে, তার এ খুনের পাপের একাংশ আদম (আ.)-এর প্রথম ছেলের (কাবিলের) উপর বর্তায়। কারণ সেই সর্বপ্রথম হত্যার প্রচলন করেছে।” এবার প্রশ্নটি এই,

এই হাদীসটিও কাদিয়ানী মতবাদের অসারতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয় কি? কেননা, আদম যদি কয়েকজনই হত তাহলে অন্তত এই হাদীসে সেদিকে ইংগিত নেই কেন? যেজন্য এখানে আদম (আ.)-এর সন্তান ‘কাবিল‘ এর যে ব্যাপারটি আলোচিত হল, এর পরিপ্রেক্ষিতে কাদিয়ানীদের প্রতি যে প্রশ্নটি উঠে আসে তা হল, তবে কি তাদের (কাদিয়ানীদের) কনসেপ্ট অনুসারে আরও যত আদম ছিলেন তাদের সন্তানদের মধ্য হতে কেউই কখনো খুন-খারাবি করেনি? যদি করে থাকে তাদের আলোচনা কোথায়?

৩। আর যদি বলেন, শুধুই একজন আদমের কথাই উল্লেখ আছে, তাহলে আমার নিচের এই প্রশ্নটির কী জবাব?

আমার প্রশ্নটি হল :

আল্লাহতালা সূরা আল বাক্বারা এর ৩০ নং আয়াতে আদম (আ:) সম্পর্কে ফেরেশতাদের সম্বোধন করে বলেছিলেন, “ইন্নী জা’ইলুন ফিল আরদ্বি খলীফা” অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি (খলীফা) মনোনীত করব। এখানে আদমকে ভবিষ্যতের একজন “খলীফা” তথা আল্লাহর প্রতিনিধি বা একজন নবী হওয়ার সংবাদ দেয়া হয়েছে। তারপর একই সূরার ৩৫ নং আয়াতে আদম হাওয়া দুইজনের ব্যাপারে এসেছে, “উসকুন আন্তা ওয়া ঝাউজুকাল জান্নাতা” অর্থাৎ তুমি এবং তোমার স্ত্রী দুইজনই জান্নাতে অবস্থান কর।

উপরের দুইটি আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট হল যে, আদম এবং হাওয়া দুইজনই পৃথিবীতে আসার আগে জান্নাতে ছিলেন এবং আদম (আ:) পরবর্তীতে নবুওয়তের অধিকারী হয়েছেন। বর্তমান দুনিয়ার সমস্ত মানুষ তারই বংশধর, ফলে তাদেরকে বলা হয় বনি-আদম বা আদমের সন্তান-সন্ততি।

একই সূরার ৩৬ নং আয়াতে এসেছে, “ওয়া কুলনাহবিতূ বা’দ্বুকুম লি-বা’দ্বিন আদ্বু-উ ওয়ালাকুম ফিল আরদ্বি মুস্তাতাক্বাররুন ওয়া মাতা-‘উন ইলা-হীন।” অর্থাৎ আমি তাদের বললাম, তোমরা একজন আরেকজনের দুশমন হিসেবে এখান থেকে নেমে পড়ো, তোমাদের (পরবর্তী) বাসস্থান (হচ্ছে) পৃথিবী, সেখানে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদের জন্যে জীবনের (যাবতীয়) উপকরণ থাকবে।”

সহীহ মুসলিম শরীফ এর ৮৫৪ নং হাদীসে উল্লেখ আছে, আদম (আ:)-কে জুমাবার সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁকে জুমাবারেই জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিলেন। সূরা আ’রাফ এর ২৭ নং আয়াতটিও এর পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ। আল্লাহতালা বলেন, “ইয়া বানী আদামা লা ইউফতিনান্নাকুমুশ শায়ত্ব-না কামা আখরাজা আবাওয়াইকুম মিনাল জান্নাতি।” অর্থাৎ হে আদম সন্তান! শয়তান তোমাদেরকে যেন ফেতনায় ফেলে না দেয় যেমনিভাবে তোমাদের আদি মাতা-পিতাকে সে জান্নাত থেকে বের করে দিয়েছিল।

উল্লেখ্য, আদি মাতা-পিতা আদম হাওয়াকে ফাঁদে ফেলতে শয়তানের জন্য জান্নাতে প্রবেশ করার প্রয়োজন ছিলনা। কেননা আল্লাহতালা শয়তানকে অনেক দূর থেকে মানুষকে প্ররোচিত করার সক্ষমতা দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের সূরা আ’রাফ এর ২০ নং আয়াত “ফা ওয়াসওয়াসা লাহুমা” অর্থাৎ সে তাদের দুইজনকে প্ররোচিত করেছিল, পরিষ্কার উল্লেখ আছে। অতএব শয়তান তাদের দুইজনকে জান্নাতের বাহির থেকেই প্ররোচিত করেছিল, ভেতরে প্রবেশ করতে হয়নি; বুঝা গেল।

এই দীর্ঘ আলোচনার পরের অংশ দ্বারা বুঝা গেল, জান্নাত (আকাশ) থেকে যাঁকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেয়া হল তিনি একই সাথে পৃথিবীর প্রথম মানুষও। অন্যথা তাঁর সাথে আদি-মাতা হযরত হাওয়া (حواء) এর কী সম্পর্ক?

কিংবা আল্লাহতালা আদম-হাওয়া এবং শয়তান তিনোজনকে “ইহবিতূ” (ا) বহুবচনে কিজন্য বললেন, ‘তোমরা নেমে যাও’ যদি এই আদমের আগেও মানব মণ্ডলীর অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকত?

আরো প্রশ্ন আসে, এই আদমের আগেই যদি মানব গোষ্ঠী পৃথিবীতে বিদ্যমান থাকত তাহলে আল্লাহতালা কিজন্য “ওয়া লাকুম ফিল আরদ্বি মুস্তাকাররুন” অর্থাৎ এখান থেকে নেমে পড়ো, তোমাদের (পরবর্তী) বাসস্থান (হচ্ছে) পৃথিবী, সেখানে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদের জন্যে জীবনের (যাবতীয়) উপকরণ থাকবে”-এভাবে বললেন? এতে কি প্রমাণিত হয়না যে, এই আদমই প্রথম মানুষ যিনি পৃথিবীতে আদি-মাতা হাওয়া সহ জান্নাত থেকে নেমে আসার পরবর্তী সময়ে নবুওয়তের অধিকারী হয়েছিলেন!? অন্যথা পবিত্র কুরআন থেকেই আপনাদের তথাকথিত প্রথম মানুষটির অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হবে যিনি উক্ত আয়াতে উল্লিখিত আদম (আ:) ছাড়া দ্বিতীয় আর কেউ!

এবার তাদের বালখিল্য টাইপের উক্ত প্রশ্নের উত্তর :

  • তাদের প্রশ্ন ছিল, হযরত আদম (আ:)ই যদি প্রথম মানুষ হন তাহলে তখন তো আর কোনো মানুষই জগতে ছিলো না। এমতাবস্থায় তিনি কাদের জন্য নবী হয়ে আসলেন কিংবা কোন সম্প্রদায়ের জন্য প্রেরিত হলেন?

জবাব হল, আচ্ছা প্রশ্নকারী কি আমাকে একথা প্রমাণ করে দিতে পারবেন যে, হযরত আদম (আ:)-কে যখন জান্নাত থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেয়া হচ্ছিল তিনি তখনই নবুওয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন? নাকি আদম (আ:) পৃথিবীতে নেমে আসার পরবর্তীতে যথাসময়ে নবুওয়ত লাভ করেছিলেন? প্রশ্নকারীদের প্রতি কেয়ামত পর্যন্ত আমার চ্যালেঞ্জ থাকল, তারা কখনো প্রমাণ করতে পারবেনা যে, হযরত আদম (আ:) যখন পৃথিবীতে নেমে আসেন তাঁকে আল্লাহতালা তখনই নবুওয়ত দান করেছিলেন! বরং আমাদের বিশ্বাস হল, আল্লাহতালা আদম (আ:)-কে পৃথিবীতে নামিয়ে দেয়ার পরবর্তীতে যথাসময়ে নবুওয়ত দান করেছিলেন। অতএব কাদিয়ানীদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উল্লিখিত প্রশ্ন পুরোই অসার সাব্যস্ত হল।

শেষকথা হল, কাদিয়ানীরা মূলত এইধরনের আরো বহু ইসলামপরিপন্থী মতাদর্শ পোষণ করার কারণে তারা ইসলাম থেকে খারিজ এবং কাফের জাতির অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এদের সমুদয় ঈমান বিধ্বংসী কুফুরী আকীদা থেকে রক্ষা করুন। আমীন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী