Home Blog Page 36

১৮৯৪ সালে সংঘটিত চন্দ্র সূর্যগ্রহণ কি কাদিয়ান থেকেও দেখা গেছে?

3

প্রশ্নকর্তা : মাহদীয়তের আলামত একই রমযানে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ হওয়া, এটি রাসূল (সা:) থেকে কিংবা কোনো সাহাবী থেকে বর্ণিত কোনো হাদীস? তাছাড়া ৬ ই এপ্রিল ১৮৯৪ সালে সংঘটিত গ্রহণ কাদিয়ান থেকেও দৃশ্যমান হওয়ার দাবীটা কতটুকু সত্য?

উত্তরদাতা : প্রথমত, মাহদীয়তের আলামত হিসেবে হাদীস নামক বর্ণনাটি ‘দারে কুতনী’ নামক হাদীসের একটি কিতাবে পাওয়া যায়। যেটি রাসূল (সাঃ)-এর কথা নয়, কোনো সাহাবীরও কথা নয়। হ্যাঁ এটি মুহাম্মদ বিন আলী বিন হোসাইন-এর নিজের একখানা বক্তব্য (তিনি আবূ জা’ফর আল-বাকের নামেও পরিচিত)। ‘দারে কুতনী’ কিতাবটির “বাবুল ছিফাতি সালাতিল খুসূফ” শীর্ষক পৃষ্ঠাটি খুলে দেখুন, সেখানেই দেখতে পাবেন যে, হাদীসটির সনদ (ধারাবাহিক সূত্র) মুহাম্মদ বিন আলী (রহঃ) পর্যন্ত গিয়ে থেমে যায়।

দ্বিতীয়ত, বর্ণনাটি বহু কারণে দলিল প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। তার কারণ ইমাম বাকের এর নামে যেই সূত্রে (সনদ) এটি বর্ণিত হয়েছে সেটির Chain of narration তথা বর্ণনাসূত্র মারাত্মক পর্যায়ের দুর্বল। এ সম্পর্কে প্রমাণ্য কিছু উক্তি নিম্নরূপ –

  • আমর ইবনে শামির : ইমাম ইবনে হাব্বান (রহ:) তিনি এর একজন রাবী তথা বর্ণনাকারী ‘আমর ইবনে শামির’-কে “শীয়া” আখ্যায়িত করে বলেছেন, এই লোক রাসূল (সা:)-এর সাহাবীদের গালমন্দ করত। দেখুন ইবনে হাব্বান (রহ:) রচিত ‘আল-মাজরূহীন মিনাল মুহাদ্দিসীন’। বিস্তারিত দেখুন ইমাম যাহাবী (রহ:) রচিত ‘মীযানুল ইতিদাল’ খন্ড নং ২ পৃষ্ঠা নং ২৬২।

ইমাম নাসাঈ (রহ:) ‘আদ-দ্বু’আফা ওয়াল মাতরূকীন’ কিতাবে লিখেছেন, এই ব্যক্তি মাতরূকুল হাদীস তথা হাদীসের জগতে পরিত্যাজ্য। ইমাম ইবনে আবী হাতিম (রহ:) এবং ইমাম বুখারী (রহ:) উনারাও বলেছেন, এই লোক মুনকারুল হাদীস তথা হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য। (দেখুন, ‘তালখিছুল মুসতাদরিক’ খন্ড নং ১ পৃষ্ঠা নং ২৪৬)।

এখানে বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার ইমাম ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহঃ) রচিত ‘লিসানুল মীযান’ এর উদ্ধৃতি পেশ করছি। তিনি লিখেছেন : عمرو بن شمر الجعفي الكوفي الشيعي أبو عبد الله عن جعفر بن محمد وجابر الجعفي والأعشم روى عباس عن يحيى ليس بشيء وقال الجوزجاني زائغ كذاب وقال بن حبان رافضي يشتم الصحابة ويروي الموضوعات عن الثقات وقال البخاري منكر الحديث قال يحيى لا يكتب حديثه অর্থাৎ আমর ইবনে শামির (রাবী নং ১০৭৫) সে একজন শীয়া রাবী, সঙ্কীর্ণমনা, চরম মিথ্যাবাদী, রাফেজি, সাহাবাদের গালমন্দকারী, বিশ্বস্ত রাবীদের নাম ভেঙ্গে জাল হাদীস বর্ণনাকারী, মুনকারুল হাদীস, তার হাদীস লেখাযোগ্য নয় ইত্যাদি। অতএব, জ্ঞানীদের নিকট এখন আর গোপন থাকেনি যে, সূত্রে অবস্থিত এমন একজন রাবী তথা বর্ণনাকারী সম্পর্কে এইরকম ৮ প্রকারের জরাহ (আপত্তি) উল্লেখ থাকার পরে এটি কোনোভাবেই আর গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা!

  • জাবের আল-জা’ফী : সনদের আরেকজন রাবী হচ্ছেন, জাবের আল-জা’ফী (মৃত : ১২৮ হিজরী)। ইমাম ইবনে হাব্বান (রহঃ) বলেছেন, এই ব্যক্তি ইহুদী বংশোদ্ভূত আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা এর দলভুক্ত ছিল। সে হযরত আলী (রাঃ) সম্পর্কে পুনঃজন্ম হবার আকীদা রাখত। সে বলত, আলী দুনিয়াতে দ্বিতীয়বার জন্মিবেন । ইবনে হাব্বান রচিত ‘আল-মাজরূহীন, বাবুল আঈন দ্রষ্টব্য। (দেখুন, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহঃ) রচিত ‘তাহযীবুত তাহযীব’ খন্ড নং ১ পৃষ্ঠা নং ২৮৫) ।

ইমাম সুফিয়ান আস সাওরী, ইমাম হুমাইদী, ইমাম বুখারী, ইমাম মুহাম্মদ বিন সালমান বিন ফারিস প্রমুখ সবাই বলেছেন, এই ব্যক্তি “পুনঃজন্ম” মতবাদে বিশ্বাসী ছিল। আর ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) তার সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, “আমি জাবের আল-জা’ফী অপেক্ষা অতি মিথ্যাবাদী আর কাউকে দেখিনি।” (দেখুন, ইবনে আবী আদী রচিত ‘আল কামিল ফী দ্বু’আফায়ির রিজাল’ খন্ড নং ২ পৃষ্ঠা নং ১১৩)। এখন নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করে বলুন তো এই ধরণের বর্ণনা কিরূপে দলিলপ্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য হবে? সব চেয়ে বড় কথা হল, এটি না রাসূল (সাঃ)-এর বক্তব্য আর না কোনো সাহাবীর বক্তব্য; কারোর-ই বক্তব্য নয়।

তৃতীয়ত, তর্কের খাতিরে রেওয়ায়েতটি কিছুক্ষণের জন্য যদি সঠিক মেনে নিই, তবুও বিপত্তি থেকেই যায়। কারণ, বর্ণনাটির ভাষ্য হল “ইন্না লি-মাহদীনা আয়াতাঈনি লাম তাকূনা মুনযু খালক্বিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি”। ‘দারেকুতনী’র উল্লিখিত বর্ণনাটিতে পরিষ্কার লেখা আছে “আমাদের মাহদীর দুটি আলামত বা নিদর্শন এমন রয়েছে যা নভোমণ্ডল আর ভূমন্ডলের জীবন ইতিহাসে সংগঠিত হয়নি”। এবার লক্ষ্য করুন। যে দুটি নিদর্শন (একই রমযানে চন্দ্র এবং সূর্যগ্রহণ লাগা)—’র কথা বলা হচ্ছে সেটি যেন এইরূপ নিদর্শন যা ইতিপূর্বে আর কখনো সংঘটিত হয়েছে – এমন না।

অথচ ইতিহাস সাক্ষী, একই রমযানে চন্দ্রসূর্য গ্রহণ লাগার ঘটনা শত-সহস্রবার ঘটেছে। আপনি Encyclopedia of Britannica ছাড়াও আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র ওয়েব সাইটে গিয়েও দেখতে পারেন, সেখানে ‘গ্রহণ’ সম্পর্কে গবেষণাধর্মী বেশ কিছু তথ্য পাবেন। খ্রিস্টপূর্ব ৭৬৩ বছর থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৬৬৪ বছর অব্ধি চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের উপর বিশদ তথ্য-উপাত্ত দেখতে পাবেন। এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ব্রিটানিকা দাবী করেছে, প্রত্যেক ২২৩ বছর পরপর এইরূপ “গ্রহণ” এর পুনঃবৃত্তি বহুলাংশে ঘটে থাকে। ইতিপূর্বে এই ‘গ্রহণ’ যেই মাসে, যেই পদ্ধতিতে এবং যেই সময়টিতে হয়েছিল পরবর্তী ২২৩ বছর পরেও সেটি অভিন্ন নিয়মে ঘটে থাকবে। এই হিসেবে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে যে, গত অষ্টাদশ শতাব্দীতে হিজরীর ১২৬৭ (১৮৫১ইং) হতে হিজরী ১৩১২ এর ভেতর মাত্র (১৩১২-১২৬৭) পয়তাল্লিশ বছরের ব্যবধানে একই রমযানে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের ঘটনা পাঁচবার (০৫) ঘটেছিল।

কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের পাক্ষিক আহমদী সাময়িকির ১৫ই এপ্রিল ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ সংখ্যাতেও একথাগুলো উল্লেখ আছে। নিচে দেখুন-

(ক) ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে (১২৬৭ হিজরী মুতাবেক) চন্দ্রগ্রহণ এবং সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। সে সময় চন্দ্রগ্রহণ হয় ১৩ই জুলাই এবং সূর্যগ্রহণ হয় ২৮ই জুলাই। তখন একমাত্র মাহদী দাবীদার ছিলেন ইরান বংশোদ্ভূত বাহায়ী জামাতের প্রতিষ্ঠাতা আলী মুহাম্মদ বাব। তার মাহদীয়ত দাবির ৫ বছর পরেই এটি সংঘটিত হয়। কারণ তিনি ১৮৪৮ সালে নিজেকে ইমাম মাহদী দাবী করেন। মজার ব্যাপার হল, সেই শতাব্দীতে মুহাম্মদ আহমদ সুদানী (সুদান, আফ্রিকা) সাহেবও মাহদী দাবী করেছিলেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে। তার বয়স যখন ২৮ বছরে পদার্পণ করে তখনো ১২৮৯ হিজরীতে (১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দ) একই রমযানে উভয়গ্রহণ সংঘটিত হয়। তেমনি পরের বছরও ১২৯০ হিজরীতে (১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দ) উভয়গ্রহণ আবার সংঘটিত হয়। কিন্তু সেই সময় মাহদী দাবিদার কেউ ছিলনা। তবে হ্যাঁ পরবর্তীতে ১৮৮১ সালে তথা উভয়গ্রহণ সংঘটিত হবার পরবর্তী আট (৮) বছরের মাথায় মুহাম্মদ আহমদ সুদানী সাহেব নিজেকে ইমাম মাহদী দাবী করেন। সেই সময় মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ছিলেন মাত্র ১২ বছরের কিশোর। এ পর্যন্ত গ্রহণের তিনবারের তথ্য পাওয়া গেল।

(খ) তারপর ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে চন্দ্রগ্রহণ হয় ২১ই মার্চ এবং সূর্যগ্রহণ হয় ৬ই এপ্রিল। তখন মাহদী দাবীদার ছিলেন ভারতের পাঞ্জাবের মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীএই সময় সূর্যগ্রহণ এশিয়ার নানা দেশসহ ভারতের নানা স্থান থেকে সামান্য দৃশ্যমান হলেও পাঞ্জাব (কাদিয়ান) থেকে সেটি মোটেও দৃশ্যমান ছিলনা। এটি আমার মুখের কথায় নয়, বরং নাসার বিজ্ঞানীদের ওয়েবসাইটে এইরকমই উল্লেখ পাওয়া যায়। (নাসার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মানচিত্র দুটি দেখুন)। Click in here

(গ) তারপর ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ১১ই মার্চ চন্দ্রগ্রহণ হয় আর সূর্যগ্রহণ হয় ২৬ই মার্চ। সে সময় আমেরিকা বংশোদ্ভূত মিস্টার জোহন আলেকজান্ডার ডুঈ (মৃত ১৯০৭ ইং) সাহেব ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে নিজেকে মসীহ মওউদের অগ্রদূত বলে দাবী করেন। এই পর্যায় মিস্টার ডুঈ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একথা ঠিক, কিন্তু আমার কথা সেখানে না; কথা হল, একই রমযানে উভয় গ্রহণ ১৮৯৫ সালেও সংঘটিত হওয়াতে কি পরিষ্কার হয়ে গেল না যে, এটি প্রকৃতির সাধারণ নিয়মই বটে, কোনো নিদর্শন তিদর্শন এগুলা কিচ্ছুনা !? নইলে প্রশ্ন আসবে,

(১) উক্ত গ্রহণ দুটি প্রকৃতপক্ষেই মাহদীয়তের বিশেষ কোনো নিদর্শন হলে তখন এইধরণের কোনো হাদীস সরাসরি রাসূল (সা:) কিংবা কোনো সাহাবী থেকেও কী কারণে বর্ণিত হয়নি?

(২) আরো প্রশ্ন আসবে, দারে কুতনী নামক কিতাবের বর্ণনাটির ভাষ্যমতে : آيتين لم تكونا (আয়াতাঈনি লাম তাকূনা) অর্থাৎ এই দুটি এমন নিদর্শন যা (ইতিপূর্বে আর) সংঘটিত হয়নি’- তাহলে রাসূল (সা:) এর যুগ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এটি কম করে হলেও প্রায় ১০৯ বার কী কারণে সংঘটিত হল? যদিও বা নাসা’র বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে আজ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজারেরও অধিক এই ধরণের গ্রহণের ঘটনা ঘটেছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। এখন এর কী জবাব?

উল্লেখ্য, তাকূনা (تكونا) শব্দটি দ্বিবাচক স্ত্রীলিঙ্গ ক্রিয়াপদ। তার কারণ, তাকূনা শব্দটির মুবতাদা (উদ্দেশ্য/Subject) হচ্ছে (শুরুতে লাম হরফে যর-র কারণে যের এর অবস্থায়) ‘আইয়াতাঈনি’ (آيتين); যেটির বচন ও লিঙ্গও যথাক্রমে, দ্বিবাচক স্ত্রীলিঙ্গ। অতএব কাদিয়ানীরা শব্দটির ভুলভাল বিশ্লেষণ দিয়ে নিজেদের অবোধ অনুসারীদের বোকা বানাতে চাওয়ায় এখন তাদেরকে অনতিবিলম্বে ক্ষমা চাওয়া উচিত! আল্লাহ সবাইকে কথাগুলো নিরপেক্ষতার সাথে ভেবে দেখার তাওফিক দিন, আমীন!!

  • লিখাটি লাইক/শেয়ার/কপি করে প্রচার করুন! অথবা আরো কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে কমেন্টে নক করুন!

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

সূরা আত তাকভীরের মধ্যে কি ইমাম মাহদীর আগমনী পূর্ব লক্ষণ রয়েছে?

0

প্রশ্নকর্তা : সূরা আত তাকভীর এর আয়াত নং ১ হতে ১১ -তে কী আছে? কাদিয়ানীদের দাবী, আয়াতগুলো নাকি ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের যুগ লক্ষণ ও আলামত সম্পর্কিত? জানতে চাই!

উত্তরদাতা : আমরা মুসলমানগণ বিশ্বাস করি যে, কেয়ামতের পূর্ব মুহূর্তে ইমাম মাহদী জন্ম নেবেন। তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটবে পবিত্র মক্কায় হজ্জের সময়। তিনি প্রথম বয়াত নেবেন মক্কায় রুকন ও মাক্বামে ইবরাহিমের মধ্যবর্তী জায়গায়। এভাবে আরো বেশকিছু পরিচিতি পাওয়া যায়। আর এগুলো শুধুমাত্র পবিত্র হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত।

কিন্তু অনলাইনে জনৈক কাদিয়ানী মুরিদ (আব্দুল মাবুদ, চট্টগ্রাম) দাবী করে বললেন যে, সূরা আত তাকভীরের মধ্যে নাকি হযরত ইমাম মাহদীর আগমনী লক্ষণ ও ভবিষৎবাণী এসেছে! যেগুলোর প্রতিটি লক্ষণই ভারতীয় বংশোদ্ভূত কাদিয়ানের মির্যা গোলাম আহমদ (মৃত : ১৯০৮ইং)’র মাধ্যমে পূর্ণ হয়ে গেছে। নিচে তার অভিব্যক্তিগুলো পড়ে দেখুন –

  • “নূরুন্নবী ভাই (আমাকে লক্ষ্য করে) আপনাকে আগেও বলেছি, যুগের মাহদী (তথা মির্যা কাদিয়ানী)কে না মানার কারণে আপনি ঈমানহারা, আপনার অন্তরচক্ষু অন্ধ। আপনি তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ চান। আল্লাহ আপনার অন্তরচক্ষু খুলে দেবেন। আপনাকে একটি প্রশ্ন করি, সূরা আত তাকভীর এর আলোকে মাহদীর আসার আলামতকাল গত হয়ে গেছে (আরো) ১৩০ বৎসর আগে। (তাই) আপনি যদি বলেন মাহদী আসে নাই, তাহলে তো আপনি কুরআনকেই মিথ্যাবাদী বানালেন। আপনি অমুকে কী তাফসীর করছে, তমুকে কী তাফসীর করছে; ইহা না দেইখা নিজে কুরআনকে গবেষণামূলক পড়েন । কুরআন নিজেই আপনাকে পথ দেখাবে….।”

এবার সূরা আত তাকভীরে এমন কী আছে তা দেখা যাক,

প্রিয় পাঠক! আমি এখানে সূরাটির ১ থেকে ১১ নং আয়াতগুলো অনুবাদসহ তুলে ধরছি। আমার নিকট দীর্ঘ পড়াশোনা দ্বারা মনে হয়েছে যে, পুরো সূরাটির বিষয়বস্তু কেয়ামত সংঘটিত হওয়া মুহূর্তের ঘটনাবলীর সাথে সম্পর্কিত। সংক্ষেপে দুচারটে বলছি। আয়াতের প্রথমেই এসেছে, ইযাশ শামছু কু’ভিরাত (আরবী : إذا الشمس كورت)….এখানে “তাকভীর” (تكوير) এর এক অর্থ – জ্যোতিহীন হওয়া। হযরত হাসান বছরী (রহ.) এই তাফসীর করেছেন। এর অপর অর্থ নিক্ষেপ করাও হয়ে থাকে। হযরত রবী ইবনে খায়সাম (রহ.) এই তাফসীর করেছেন। আয়াতের তাৎপর্য এই যে, সূর্যকে সমুদ্রে দুমড়ে মুষড়ে নিক্ষেপ করা হবে এবং সূর্যের উত্তাপে সারা সমুদ্র অগ্নিতে পরিণত হবে। দুই তাফসীরই সঠিক। কেননা, এটা সম্ভবপর যে, প্রথমে সূর্যকে জ্যোতিহীন করে দেয়া হবে, অত:পর সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হবে (তাফসীরে মা’আরিফুল কুরআন দ্রষ্টব্য)। এখন আমার প্রশ্ন হল, সূর্য জ্যোতিহীন হওয়া এবং সমুদ্রে দুমড়ে মুষড়ে নিক্ষেপ করা এসব কিভাবে ইমাম মাহদীর আগমনী পূর্বলক্ষণ হতে পারে? তখন তো পুরোদস্তুর কেয়ামতের মহাপ্রলয় ঘটতে থাকবে। প্রাণীকুল নাস্তনাবুদ হতে থাকবে। তো এগুলো ইমাম মাহদীর লক্ষণ হলে ইমাম মাহদী ওই সময় এসে কী করবেন? জনমানবশূন্য আর ধ্বংসাবশেষ দুনিয়াতে ইমাম মাহদীর কাজ কী? জ্ঞানীদের একথা গুলো ভাবিয়ে তুলবে কিনা? সহীহ বুখারীতেও আবু হোরায়রা (রা.) এর রেওয়ায়েতক্রমে রাসূল (সা.) বলেন, কেয়ামতের দিন চন্দ্র সূর্য সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হবে। যাইহোক, হাদীস শরীফের আলোকে এভাবে যতই ঘেঁটে দেখতে চাইবেন ততই সূরা আত তাকভীরের প্রকৃত বিষয় আপনার সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

তাই একেবারে নিশ্চিত হয়েই বলতে পারি, সূরাটির আলোচ্য বিষয়ের সাথে ইমাম মাহদীর আগমনী পূর্বলক্ষণ কিংবা মির্যা কাদিয়ানীর অস্তিত্ব খোঁজে পাওয়ার সাথে বিন্দুবিসর্গ সম্পর্কও নেই। তবে হ্যাঁ, কেউ যদি রূপকের কাসুন্দি করে কিবা গাঁজাখুরি ব্যাখ্যা দিয়ে মির্যা কাদিয়ানীকে সূরা আত তাকভীরের আয়াতগুলোতে খোঁজে পাওয়ার দাবী করে সেটি ভিন্নকথা।

  • মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর নবুওয়ত ও রেসালতের দাবী করার ডকুমেন্ট তারই লেখিত পুস্তক হতে Click in here

প্রিয় পাঠক! লেখার কলেবর সংক্ষেপ রাখতে এতটুকুতেই চলমান আলোচনার ইতি টানছি। আলোচ্য আয়াতগুলো অনুবাদসহ তুলে দিলাম।

إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ
01

যখন সূর্য আলোহীন হয়ে যাবে,

وَإِذَا النُّجُومُ انكَدَرَتْ
02

যখন নক্ষত্র মলিন হয়ে যাবে,

وَإِذَا الْجِبَالُ سُيِّرَتْ
03

যখন পর্বতমালা অপসারিত হবে,

وَإِذَا الْعِشَارُ عُطِّلَتْ
04

যখন দশ মাসের গর্ভবতী উষ্ট্রীসমূহ উপেক্ষিত হবে;

وَإِذَا الْوُحُوشُ حُشِرَتْ
05

যখন বন্য পশুরা একত্রিত হয়ে যাবে,

وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ
06

যখন সমুদ্রকে উত্তাল করে তোলা হবে,

وَإِذَا النُّفُوسُ زُوِّجَتْ
07

যখন আত্মাসমূহকে যুগল করা হবে,

وَإِذَا الْمَوْؤُودَةُ سُئِلَتْ
08

যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে,

بِأَيِّ ذَنبٍ قُتِلَتْ
09

কি অপরাধে তাকে হত্য করা হল?

وَإِذَا الصُّحُفُ نُشِرَتْ
10

যখন আমলনামা খোলা হবে,

وَإِذَا السَّمَاء كُشِطَتْ
11

যখন আকাশের আবরণ অপসারিত হবে। (আয়াতগুলোর বিশ্লেষণ পড়ুন)।

শেষকথা, তারা কিভাবে সাধারণ মানুষকে ধোকা দিয়ে বোকা বানায় তা এবার ভালোভাবেই বুঝে নিন! বিচারের ভার আপনার নিরপেক্ষ বিবেকের উপর ছেড়ে দিলাম।

লেখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

ইমাম মাহদী একজন ‘জমিদার বংশীয়’ হবেন এটি কি হাদীস?

0

ইমাম মাহদী জমিদার বংশীয় হবেন, বিপাশা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত ‘কাদিয়ান’ গ্রাম থেকে আত্মপ্রকাশ করবেন, বলিয়া হাদীসের নামে কাদিয়ানীদের প্রতারণার জবাব:

প্রশ্নকর্তা : হাদীসের কোথাও ইমাম মাহদী একজন ‘জমিদার বংশীয়’ হবেন এইরূপ উল্লেখ আছে কি?

উত্তরদাতা : না, এইরূপ কোনো হাদীস খোঁজে পাওয়া যায়না। তবে নবুওয়তের মিথ্যাদাবীদার মির্যা কাদিয়ানী আর তার অনুসারীদের বইতে এই ধরণের অনেক কিছুই উল্লেখ আছে, যা ভুল এবং বানোয়াট। মূলত তারা হযরত আলী (রা:) হতে বর্ণিত একটি হাদীসে নিজেদের ভুল অনুবাদ থেকেই এই রকমটি মনে করে থাকে। এবার জেনে নেয়া যাক, হযরত আলী (রা:) থেকে বর্ণিত হাদীসটিতে এমন কী উল্লেখ আছে! হাদীসে একটি শব্দ এসেছে ‘হারিছ হাররাছ’। তাই প্রশ্ন আসবে, এই ‘হারিছ হাররাছ’টা কে? জবাবে বলা হবে যে, সুনানে আবুদাউদ এর “কিতাবুল মাহদী” অংশে একই বর্ণনাকারী থেকে হাদীসটির আরবী ইবারত ( Text) দেখলে বুঝা যায় ওই হারিছ হাররাছ নামীয় ইনি এমন এক ব্যক্তি যিনি ওই সময়ে আত্মপ্রকাশকারী হযরত ইমাম মাহদীর সাহায্যে “ওরায়ুন্নাহার তথা মধ্য এশিয়া” থেকে সৈন্যসামন্ত নিয়ে সম্মুখে এগিয়ে আসবেন। তার পূর্ণ নাম হবে হারিছ বিন হাররাছ (الحارث بن حراث) তথা হাররাছ এর পুত্র হারিছ। এবার অনুবাদসহ সংশ্লিষ্ট হাদীসটি নিচে দেখুন! হাদীস :

قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏: يَخْرُجُ رَجُلٌ مِنْ وَرَاءِ النَّهْرِ يُقَالُ لَهُ الْحَارِثُ بْنُ حَرَّاثٍ عَلَى مُقَدِّمَتِهِ رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ مَنْصُورٌ يُوَطِّئُ أَوْ يُمَكِّنُ لآلِ مُحَمَّدٍ كَمَا مَكَّنَتْ قُرَيْشٌ لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَجَبَ عَلَى كُلِّ مُؤْمِنٍ نَصْرُهُ ‏.‏ أَوْ قَالَ إِجَابَتُهُ ‏

অর্থাৎ : রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন “ওরায়ুন্নাহার তথা মধ্য এশিয়া থেকে হারিছ বিন হাররাছ (الحارث بن حراث) নামীয় এক ব্যক্তি বের হবে। তাঁর আগে “মানছুর” নামের অপর এক ব্যক্তি বের হবে। তিনি মুহাম্মদ (এখানে মুহাম্মদ বলতে ইমাম মাহদীকে বুঝানো উদ্দেশ্য। কেননা তার নাম মুহাম্মদ হবে)-এর অনুসারীর সাহায্যে এসে (বাহিনীতে) মিলিত হবেন ও তাঁকে শক্তিশালী করবেন; যেইরূপ কুরাইশরা রাসূল (সা:)-কে সাহায্য করেছিলো। (সেই সময়কার) সকল মুমিনের উচিত তাঁকে (ইমাম মাহদীকে) সাহায্য করা এবং তাঁর আহবানে সাড়া দেয়া।” রেফারেন্স, আবুদাউদ কিতাবুল মাহদী, হা/৪২৪০ [ইফা]; আরো দেখুন, ইমাম সুয়ূতী (রহঃ) রচিত ‘আল আ’রফুল ওয়ারদী ফী আখবারিল মাহদী’ পৃষ্ঠা নং ২৭-২৮। (অনুবাদ শেষ হল)। হাদীসের মান, জঈফ।

وراء النهر ‘ওরাউন নাহার’ এর ভৌগোলিক সীমারেখা দেখুন ক্লিক

প্রিয় পাঠকবৃন্দ! সুনানে আবুদাউদ শরীফের এই হাদীস দ্বারা একদম পরিষ্কার হয়ে গেল যে, হারিছ হাররাছ এটি হারিছ ইবনে হাররাছ এর সংক্ষিপ্ত রূপ। মূলত হারিছের পুত্র হাররাছ-এরূপই বুঝানো উদ্দেশ্য। এবার ‘ওরায়ুন্নাহার’ এর ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে জেনে নিন!

  • ওরায়ুন্নাহার (Wa’raun Nahar) এর ভৌগলিক পরিচয় :

ওরায়ুন্নাহার (ইংরেজি : Central Asia) হল, মধ্য এশিয়ার কিছু দেশ (বিশেষত, সমরকন্দ, বুখারা, তিরমিয, তাসখন্দ ইত্যাদি)’র ভূ-বেষ্টিত এলাকা! অঞ্চলটির সীমানার অনেকগুলো সংজ্ঞা আছে, যার কোনোটিই পুরোপুরি সর্বজনগৃহীত নয়। ঐতিহাসিকভাবে অঞ্চলটি বিভিন্ন যাযাবর জাতি ও সিল্ক রোডের সাথে সম্পর্কিত। ফলে অঞ্চলটি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন জাতি, দ্রব্য ও সাংস্কৃতিক ধারণাসমূহের আদানপ্রদানের অঞ্চল হিসেবে কাজ করেছে। মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আছে কাজাকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, এবং অন্যান্য ছোট ছোট রাষ্ট্র যেমন – আজারবাইজান (কাস্পিয়ান সাগরের অপর পাড়ে অবস্থিত)। ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকেও অনেক সময় এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। (সূত্র : উইকিপিডিয়া)।

আপনি গুগলে আরবীতে ‘ওরায়ুন্নাহার’ (وراء النهر) লিখে সার্চ দিয়ে দেখুন, শব্দটির পুরো ডিটেলস মানচিত্রসহ বেরিয়ে আসবে। তখন আপনি নিজেও জেনে অবাক হবেন যে, কাদিয়ানীরা মধ্য-এশিয়ার ভৌগলিক সীমানার হাত পা ভেঙ্গে ‘বিপাশা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত গ্রাম বলিয়া মির্যার জন্মস্থান কাদিয়ান’-কে কিভাবে অপব্যাখ্যার নিশানায় পরিণত করল! শুধু কি তাই? না না, তারা ‘হাররাছ ইবনে হারিছ’ এর সংক্ষিপ্ত রূপ ‘হাররাছ হারিছ’ শব্দকে জমিদার বংশীয় বলেও ব্যাখ্যা দিতে ভুলেনি!

আহা! এ কি নিকৃষ্ট বিকৃতি! কি সব উদ্ভট ব্যাখ্যা!! কি যে অসম্ভব ধোকা!!! অথচ রাসূল (সা:) হাদীসটির আলোকে ইমাম মাহদীর বাহিনীর সাহায্যে এগিয়ে আসা তদানীংকালের একটি মুসলিম সৈন্যদলের নেতৃত্বদানকারী হারিছের পুত্র হাররাছ নামীয় ব্যক্তির ভৌগলিক অবস্থান কোথায় হবে সে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করতে চাচ্ছিলেন! মধ্য এশিয়ার মানচিত্র (উইকিপিডিয়া হতে সংগৃহীত) দেখুন, চীন, পাকিস্তান আর ইন্ডিয়া এই দেশগুলো নির্দিষ্ট সীমারেখার সম্পূর্ণ বাহিরে ও বরাবরই এশিয়ার অভ্যন্তরে অবস্থিত। এমতাবস্থায় ‘কাদিয়ান’ গ্রামটিও মধ্য এশিয়ার সীমানার বাহিরেই থাকল কিনা? অবশ্যই। উফ! ওরা কিভাবে এতবড় প্রতারণার খেল খেলতে পারল!!

শেষে শুধু এইটুকু বলব, এখনো সময় আছে, রাসূল (সা:)-এর হাদীস, ইসলামের ইতিহাস আর ভৌগলিক অবস্থানের ভুলভাল ব্যাখ্যার কবলে পড়ে আল্লাহর ওয়াস্তে আর বিভ্রান্ত হবেন না! ফিরে আসুন, ইসলামের পুরণো ছাতার নিচে; আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মূলস্রোতে!

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

ইমাম মাহদীর নামের শেষে ‘আলায়হেস সালাম’ বলা

0
  • ইমাম মাহদী যদি “নবী” না হন তাহলে তাঁর নামের পর ‘আলায়হেস সালাম’ (সংক্ষেপে আঃ) কেন লিখা হয় বা বলা হয়? কাদিয়ানীদের প্রশ্ন ও আমার জবাব :

আমার জবাব, পবিত্র কুরআন বলছে, ওয়া খাতামান নাবিয়্যীন (খতম করনে ওয়ালা নবীয়ুঁ কা [উর্দূ]) অর্থাৎ তিনি (মুহাম্মদ সাঃ) নবীগণের আগমনীধারা সমাপ্তকারী। সূরা আহযাব, আয়াত নং ৪০; অনুবাদ- রূহানী খাযায়েন খন্ড ৩ পৃষ্ঠা ৪৩১; মূল মির্যা কাদিয়ানী। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, ১ যদি আমার পরে কেউ নবী হত তাহলে উমর ইবনে খাত্তাবই নবী হত। অন্য জায়গায় তিনি সাঃ আরো ইরশাদ করেছেন, ২ আমি আখেরি নবী আর তোমরা আখেরি উম্মত। তিনি আঃ এও ইরশাদ করেছেন, ৩ আমার মাধ্যমে নবীগণের আগমনীধারা খতম করে দেয়া হয়েছে। তিনি আঃ আরেক জায়গায় ইরশাদ করেছেন, ৪ আমার পরে আর কোনো নবী নেই তবে অচিরেই বহু খলিফা হবে। তিনি আঃ এও ইরশাদ করেছেন, ৫ নিশ্চয়ই রেসালত এবং নবুওয়তের ধারা বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং আমার পর না কোনো নবী রয়েছে আর না কোনো রাসূল রয়েছে। সংক্ষেপে। সুতরাং বুঝা গেল, মুহাম্মদ সাঃ এর পরে নবুওয়তের ধারা বন্ধ, তাঁর পরে আল্লাহতালা আর কাউকে নবী বানাবেন না। উদ্ধৃতিগুলোর রেফারেন্স নিন্মরূপ!

রেফারেন্স :- ১ তিরমিজি শরীফ। ২ ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতান বাবুদ দাজ্জাল। ৩ সহীহ বুখারী। ৪ সহীহ বুখারী কিতাবুল মানাকিব। ৫ তিরমিজি শরীফ।

উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা দ্বারা বুঝতে পারলাম যে, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর পরে যে কোনো প্রকারের নবুওয়তের দাবীদার মিথ্যুক এবং দাজ্জাল তথা প্রতারক ও মুসাইলামা কাজ্জাবেরই উত্তরসূরী। সেযাইহোক, এখন প্রশ্ন আসে যে, তাহলে শেষযুগে প্রেরিত প্রতীক্ষিত ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল মাহদী ওয়াল ফাতেমি ওয়াল হাসানী ওয়াল কুরাইশী এর নামের শেষে কিজন্য ‘আলায়হেসসালাম’ লিখা হয় বা বলা হয়? তার কারণ কী?

উত্তর হচ্ছে, কুরআন কিংবা হাদীস থেকে কেউই দেখাতে পারবেনা যে, মাহদীর নামের শেষে ‘আলাইহেসসালাম’ লিখা হয়েছে। আমি চ্যালেঞ্জ করলাম, কেউ পারলে প্রমাণ করুন! আর সেজন্যই মাহদীর নামের শেষে দোয়াস্বরূপ ‘আলায়হেসসালাম’ লিখা বা বলার জন্য আপনার আর আমার মতই সাধারণ মানুষরাই দায়ী। যদিও বা কোনো কোনো যুগ ইমাম এবং মুজাদ্দিদ ইমাম মাহদীর নামের শেষে ‘আলাইহেসসালাম’ লিখা বা বলার পক্ষে ছিলেন না। মুজাদ্দিদে আলফে সানী হযরত শায়খ আহমদ সারহেন্দী (রহ:) তাদেরই মধ্যে অন্যতম। তিনি ইমাম মাহদীর নামের শেষে ‘রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’ লিখেছেন। প্রমাণ স্বরূপ তারই মাকতূবাত কিতাবের স্ক্রিনশট দেখুন (৪/৫৮৭; দপ্তরে আউয়াল, উর্দু এডিশন) । কিন্তু তিনি ‘আলায়হেসসালাম’ লিখতে কোথাও বারণ করেছেন কিনা তা জানা নেই।

কতিপয় মনীষীর নামের পরে ‘আলায়হেসসালাম’ লিখা বা বলা প্রসঙ্গে :

আমরা জানি, হযরত লোকমান হাকিম, হযরত খিজির, হযরত বিবি আছিয়া, হযরত বিবি মরিয়ম প্রমুখ এঁদের কেউই নবী ছিলেন না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এঁদের সকলের নামের শেষে ‘আলায়হেসসালাম’ বা ‘আলায়হাসসসালাম’ (লিঙ্গভেদে হি/হা যোগে) থাকে। তদ্রূপ হযরত ইমাম মাহদীর নামের শেষেও ‘আলায়হেসসালাম’ লিখার অর্থ এই নয় যে, তিনি নবী হবেন!

ইমাম মাহদীর নামের শেষে ‘আলায়হেসসালাম’ লিখার কারণ :

তার কারণ এইও হতে পারে যে, শেষ যুগে আগমনকারী ইমাম মাহদী নবী করীম সাঃ এর আহলে বাইয়েত হতে ও ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা-র পুত্র হযরত হাসানের ওরশে কুরাইশ বংশে জন্মিবেন (সুনানু আবুদাউদ, কিতাবুল মাহদী অধ্যায়) বলেই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে তারও নামের শেষে ‘আলায়হেসসালাম’ লিখতে নিরুৎসাহিত করা হয়না। এই পর্যায়ে কেউ কেউ হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন যে, আহলে বাইয়েত এর সদস্যদের নামের শেষে ‘আলায়হেসসালাম’ লিখা বা বলার দলিল কোথায়?

উত্তরে বলতে চাই যে, সহীহ বুখারী শরীফের “কিতাবুল ফাজায়েলে সাহাবাহ” অধ্যায়ের (হাদিস নং ৩৭১১, অধ্যায় নং ৬২; আত-তাওহিদ প্রকাশনী) “বাবুল মানাক্বিবে ফাতিমা” শীর্ষক পর্বে নবীজীর কলিজার টুকরো হযরত ফাতিমার নামের শেষে ‘আলায়হাসসালাম’ (عليها السلام) ব্যবহার করা হয়েছে । একই হাদীস গ্রন্থের অর্থাৎ বুখারী শরীফের “বাবুল মানাক্বিবি ক্বরাবাতি রাসূলিল্লাহ ওয়া মানাক্বিবাতি ফাতিমা আলাইহাসসালাম বিনতে নবী” শীর্ষক আলোচনায় (পর্ব নম্বর-৪১/১২) “আলায়হাসসালাম” ব্যবহার করা হয়েছে। ইমাম বুখারী রহঃ এর কৃত অনুরূপ শিরোনামই প্রমাণ করে যে, আহলে বাইয়েত তথা নবী-পরিবারের সদস্যদের নামের শেষে ‘আলাইহেসসালাম’ (যার অর্থ, তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক) লিখা বা বলার অনুমতি রয়েছে। তবে বলতেই হবে এইরূপ উৎসাহিত করা হয়নি। অন্যথা মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহঃ ইমাম মাহদীর নামের শেষে ‘রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’ লিখতেন না।

সুনানু তিরমিজি গ্রন্থে একটি পরিচ্ছেদ এর শিরোনাম আছে “মানাক্বিবুল হাসান ওয়াল হুসাইন আলায়হেমাসসাল্লাম”। তারই সংশ্লিষ্ট একটি হাদীসের (হাদীস নং ৩৭৭৪) খন্ডাংশ اذ جاء الحسن والحسين عليهما السلام যাইহোক, ইমাম হাসান আর হুসাইন এঁদের দুইজনের নামের শেষে (দ্বিবচনে) ‘আলায়হেমাসসালাম’ উল্লেখ থাকাটাও প্রমাণ করে যে, এটি আহলে বাইয়েত এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আর শেষ যুগে আগমনকারী হযরত ইমাম মাহদী যেহেতু আহলে বাইয়েত থেকে কুরাইশ বংশে (আরবে তথা মদীনায়) জন্মিবেন সেহেতু ওই একই বৈশিষ্ট্যের কারণেই তাঁর নামের শেষেও ‘আলায়হেসসালাম’ লিখতে বা বলতে নিরুৎসাহিত করা হয়না। তবে মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহঃ এর লিখনী দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে, উত্তম হল ‘রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’-ই লিখা বা বলা। ওয়াল্লাহু আ’লাম!

শেষকথা : কাদিয়ানী সম্প্রদায় মির্যা গোলাম কাদিয়ানীকে নবী সাব্যস্ত করতে ইমাম মাহদীর নামের শেষে ব্যবহৃত ‘আলায়হেসসালাম’ এর প্রসঙ্গ টেনে এনে যুক্তি দিতে চায়। অথচ উপরের দীর্ঘ আলোচনা হতে আমরা বুঝলাম যে, ইমাম মাহদীর নামের শেষে ‘আলায়হেসসালাম’ এর ব্যবহার তিনি ” নবী” একথা বুঝাতে নয়, বরং তিনি আহলে বাইয়েত এর মধ্য হতে এবং একজন কুরাইশী হবেন-এদিকেই ইংগিত করতে। অন্যথা হযরত লোকমান, হযরত খিজিরসহ তাঁদের সবাই এমনকি জিব্রাইল, মিকাইল, ইস্রাফিল ও আজরাইল ফেরেশতাগণও কাদিয়ানীদের একই যুক্তিতে নবী হয়ে যাচ্ছেন! আল্লাহ আমাদের বুঝার তাওফিক দিন।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

আখেরি যামানার আলেমরা ‘উলামাউহুম শাররুম’ হওয়া হাদীসের পর্যালোচনা

0
  • আখেরি যামানার আলেমরা ‘উলামাউহুম শাররুম’ হওয়া প্রসঙ্গে

কাদিয়ানীরা কথায় কথায় বলে আলেমরা নিকৃষ্ট! হাদীস শরীফে আখেরি যামানার আলেমদের “নিকৃষ্ট” বলা হয়েছে! কিন্তু তারা উক্ত হাদীসের কথাগুলোর প্রসঙ্গ কখনো খতিয়ে দেখেনা যে, হাদীসের “উলামাউহুম শাররুম—জাতীয় কথাগুলো প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের আগের না পরবর্তী যুগের সাথে সম্পর্কিত? চিন্তাশীলদের নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলবে। মনে করুন, ইমাম মাহদী এসে আবার চলেও গেছেন অথচ নিকৃষ্ট জীব খ্যাত দুষ্ট মৌলভীদের দৌরাত্ম পর্যায়ক্রমে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েই চলছে, বন্ধ হচ্ছেনা; এমতাবস্থায় খুব সহজেই জনমনে প্রশ্ন দেখা দেবে যে, তাহলে ইমাম মাহদীর আগমনে ফায়দা হল কী? আকাশে সূর্য উদিত হলে পৃথিবী কোনোভাবেই কি অন্ধকারে ঢাকা পড়তে পারে? কখনো না। কাজেই, কাদিয়ানীদের বিশ্বাস, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ইমাম মাহদী, এটি নির্জলা মিথ্যা বৈ নয়।

এখানে আরেকটি কথা উল্লেখ করা জুরুরি, যাদের চোখ আছে তারা নিশ্চয়ই দেখে থাকবেন এবং যাদের অন্তর আছে তারা অবশ্যই উপলব্ধি করবেন যে, উল্লিখিত ৪টি- যুগলক্ষণই কিন্তু প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের পূর্বের সময়কে ইংগিত দিচ্ছে। যথা, ইসলাম শুধু নামমাত্র থাকবে, কুরআনের শুুধুমাত্র পাণ্ডুলিপি অক্ষত থাকবে, মসজিদগুলো হিদায়াতশূন্য হয়ে যাবে আর তখন তোমাদের আলেমগণ আকাশের নিচে নিকৃষ্ট জীবে পরিণত হবে!

সুতরাং বর্তমানে যেহেতু বহু আলেম দুনিয়া লোভী, খেয়ানতকারী ও হাদীসের ভাষায় ‘উলামাউহুম শাররূম’ হওয়াই দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করছে সেহেতু পরিষ্কার হয়ে গেল, প্রকৃত ইমাম মাহদী (মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল মাহদী ওয়াল ফাতেমি ওয়াল হাসানী ওয়াল কুরাইশী)’র আগমন এখনো বাকি। তবে ইনশাআল্লাহ খুব শীঘ্রই তাঁর আগমন হবে। ওয়াল্লাহু আ’লাম।

শেষকথা, সব বাতিল মতবাদের অনুসারীরাই নিজেদের ইসলাম পরিপন্থী মতবাদ টিকিয়ে রাখতে সর্বাগ্রে উলামায়ে কেরামের উপর চড়াও হয়। নির্বিচারে সব আলেমকে ঘৃণা আর সমালোচনার নিশানা বানায়। যাতে তাদের বিভ্রান্ত অনুসারীরা আলেমদের কাছে না যায়। মূলত আলেমদের কাছ থেকে তাদের বিপথগামী অনুসারীদের দূরে রাখার অসৎ উদ্দেশ্যেই তারা নির্বিচারে হাদীসগুলো প্রসঙ্গ ছাড়াই উদ্ধৃত করে! আল্লাহ তাদের সহীহ বুঝ দিন। আমীন।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

ইউনুছ ইবনে মাত্তা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নন, হাদীসের ব্যাখ্যা

0
  • মির্যা কাদিয়ানীর স্ববিরোধী কথাবার্তার বদনাম ঘোচাতে রাসূল (সাঃ) এর হাদীসের উপর কাদিয়ানীদের আপত্তি ও তার খন্ডন!

কাদিয়ানীদের আপত্তিমূলক প্রশ্নটি হল, হাদীসে এসেছে, রাসূল (সা:) বলেছেন, যে আমাকে ইউনুছ ইবনে মাত্তা অপেক্ষা উত্তম বলবে সে মিথ্যা বলল । (তিরমিযী হা/৩২৪৫)। অথচ তিনি (সা:) আরেক হাদীসে ইরশাদ করেছেন, আমি সমস্ত বনী আদমের সর্দার কিন্তু তাতে আমার নিজের কোনো গৌরব নেই… (তিরমিযী হা/৩৬১৫)। বাহ্যিকভাবে তিনি (সা:) স্ববিরোধী উক্তি করলেন কিনা? এমতাবস্থায় মির্যা কাদিয়ানীর ক্ষেত্রে কিজন্য স্ববিরোধী উক্তির আপত্তি করা হবে??

জবাব ও খন্ডনঃ উপরের বক্তব্য দু’টির জবাব বিশিষ্ট যুগ ইমাম ও মুহাদ্দিস মোল্লা আলী ক্বারী (রহ:) এর কিতাব “মেরকাত শরহে মেশকাত” থেকে নিচে অনুবাদ আকারে তুলে ধরছি।

(مَنْ قَالَ: أَنَا خَيْرٌ) أَيْ: فِي النُّبُوَّةِ (مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى لَقَدْ كَذَبَ) : لِأَنَّ الْأَنْبِيَاءَ كُلَّهُمْ مُتَسَاوُونَ فِي مَرْتَبَةِ النُّبُوَّةِ، وَإِنَّمَا التَّفَاضُلُ بِاعْتِبَارِ الدَّرَجَاتِ، وَخُصَّ يُونُسُ بِالذِّكْرِ لِأَنَّ اللَّهَ تَعَالَى وَصَفَهُ بِأَوْصَافٍ تُوهِمُ انْحِطَاطَ رُتْبَتِهِ حَيْثُ قَالَ: (فَظَنَّ أَنْ لَنْ نَقْدِرَ عَلَيْهِ)

অর্থাৎ, রাসূল (সা:) এর বাণী “যে বলবে আমি ইউনুছ ইবনে মাত্তা অপেক্ষা উত্তম…”—এই কথাটি মূলত শুধুই নবুওয়তের ক্ষেত্রে ধর্তব্য হবে। ফলে তার অর্থ দাঁড়ায়, যে ব্যক্তি বলবে আমি ইউনুছ ইবনে মাত্তা অপেক্ষা নবুওয়তের ক্ষেত্রেও উত্তম তবে সেই ব্যক্তি মিথ্যা বলল। কেননা নবীগণের সকলে নবুওয়তের মর্যাদায় এক ও অভিন্ন। তবে কতিপয় সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষত্ব নিশ্চয়ই রয়েছে। এক্ষেত্রে ইউনুছ (আ:) এর বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হল, আল্লাহতালা পবিত্র কুরআনে তাঁকে নানা বিশেষণ দ্বারা বিশেষিত করে তাঁর মর্যাদা বর্ণনা করেছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: فَظَنَّ أَنْ لَنْ نَقْدِرَ عَلَيْهِ অর্থাৎ সে (ইউনুছ) মনে করেছিল আমি তাঁর উপর (পৃথিবীটা) কখনোই সংকীর্ণ করব না। (মেরকাত শরহে মেশকাত : ৯/৩৬৪৫)।

  • মহাগ্রন্থ আল কুরআন থেকেও রাসূল (সা:) এর উল্লিখিত হাদীস দুইখানার পক্ষে সমর্থন পাওয়া যায়। যেমন যথাক্রমে ২টি আয়াত :

আল্লাহতালা বলেন: لا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ অর্থঃ তাহারা বলে, আমরা তাহার রাসূলগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করিনা (সূরা বাক্বারা ২৮৫)। অন্য জায়গায় এসেছে, আল্লাহ বলেন: تلك الرسل فضلنا بعضهم على بعض অর্থঃ এই রাসূলগণ, তাহাদের মধ্যে কাহাকেও কাহারও উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়াছি (সূরা বাকারা ২৫৩)।

খুব খেয়াল করুন, সূরা বাক্বারার ২৮৫ নং আয়াতে নবীদের মাঝে পার্থক্য নিরূপণ না করা সম্পর্কে উল্লেখ আছে। তারপর অন্য আয়াতে নবীগণের মাঝে পরস্পর অপেক্ষা বিশেষভাবে মর্যাদাবান বলেও উল্লেখ রয়েছে। তাই মোল্লা আলী কারী (রহ:) একজন যুগ ইমাম হিসেবে যেই ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন সেটি পবিত্র কুরআনের আলোকেই দিয়ে গেছেন বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। কেননা স্বয়ং মির্যা কাদিয়ানী নিজেও লিখেছে, মুজাদ্দিদ ব্যক্তি কুরআনের বুঝপ্রাপ্ত হন এবং ঐশী নিদর্শনসহ আগমন করে থাকেন। (রূহানী খাযায়েন ১৪/২৮৮) সুতরাং আপনাদের উত্থাপিত আপত্তি পুরোপুরি অসার সাব্যস্ত হল। বিশিষ্ট মুফাসসীর, ইমাম কুরতুবী (রহ:) এর বক্তব্য হতেও হুবহু এমন ব্যাখ্যাই পাওয়া যায়। নিচে দেখুন!

ইমাম কুরতুবী (রহ:) লিখেছেন: ‘আন্নাল মান’আ মিনাত তাফদ্বীল। ইন্নামা হুয়া মিন জিহাতিন নাবুওয়্যাতি আল্লাতি হিয়া খাছলাতুন ওয়াহিদাতুন। লা তাফাদ্বালা ফীহা। ওয়াত তাফদ্বীলু ফী যিয়াদাতিল আহওয়াল ওয়াল খুছূছ ওয়াল কারামাত ওয়াল আল-ত্বাফ।’ অর্থাৎ অবশ্যই নবীগণের এককে অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিতে নিষেধ রয়েছে। আর তা নিশ্চিতভাবে ও শুধু কেবল নবুওয়তের ক্ষেত্রে। যেহেতু নবুওতের ক্ষেত্রে সবার মান সমান। তাতে কেউ অন্যের উপর শেষ্ঠত্ব রাখেনা। অধিকন্তু শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে, কতেক বিশেষত্ব, সম্মান আর দয়ার আধিক্যতার ক্ষেত্রে। (আল মুয়াসসাসাতুল ফিকহিয়্যাহ : ৪০/৪৯)। আশাকরি যুগ ইমাম মোল্লা আলী ক্বারী আর ইমাম কুরতুবী রাহিমাহুমাল্লাহু দুইজনের জ্ঞানগর্ভ সামঞ্জস্যতার বিধান ও বিশ্লেষণ দ্বারা সমাধান পেলেন।

জ্ঞানীদের নিকট পরিস্কার যে, মূলত হাদীস দুটির ভেতরে কোনো স্ববিরোধিতা নেই। কাজেই মির্যা কাদিয়ানীর স্ববিরোধী কথাবার্তা হালাল করতে হাদীসের উপর আক্রমণ করার চেষ্টা পুরোপুরি বৃথা গেল! সংক্ষেপে উত্তর দিলাম।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

আকাশে মৃতদের সাথে জীবিত ব্যক্তিও থাকতে পারা

0

প্রশ্নকর্তা : ঈসা (আঃ) দ্বিতীয় আসমানে জীবিত আছেন, এর দলিল দিন! তারপর একটি প্রশ্নের উত্তর দিন, ঈসা (আঃ) যদি দ্বিতীয় আসমানে জীবিত থেকে থাকেন তাহলে তো মানতে হবে যে, আসমানে অন্যান্য মৃতদের সাথেই জীবিত রয়েছেন! অথচ মৃত আর জীবিত একত্রে থাকতে পারেনা! এর কী জবাব?

উত্তর : আপনার প্রশ্নের উত্তরে একটু পরে আসছি। তার আগে আমাকে দুটি প্রশ্নের উত্তর দিন! (১) মৃত আর জীবিত একত্রে থাকতে পারেনা, এই কথার দলিল কী? কুরান হাদীসে কি এমন কোনো কথা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবেও এসেছে? (২) তর্কের খাতিরে মানলাম যে, আকাশে মৃতদের সাথে জীবিতরা একত্র হওয়া সম্ভব না! এমতাবস্থায় মেরাজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কি মৃত ছিলেন যে, ফলে তাঁর পক্ষে সাত আসমানে মৃত নবীগণের সাথে সাক্ষাৎ করা সম্ভব হয়েছিল!?

এবার প্রাসঙ্গিক আলোচনায় চলুন! হযরত ঈসা (আঃ) দ্বিতীয় আসমানে থাকা মর্মে সহীহ বুখারীতে এসেছে “ছুম্মা ছ’য়িদা হাত্তা আতাস সামায়াছ ছানিয়াহ” অর্থাৎ অতপর (জিবরাইল আমাকে নিয়ে) দ্বিতীয় আকাশে এসে পৌঁছলেন। (রাসূল সাঃ আরো বলেন) “ফালাম্মা খালাছতু ফা ইযা ইয়াহইয়া ওয়া ঈসা ওয়া হুমা ইবনা খা-লাতিন।” অর্থাৎ এরপর আমরা যখন সেখানে পৌঁছলাম তখন সেখানে ইয়াহইয়া এবং ঈসা আলাইহিমাস সালাম-কে দেখলাম। তাঁরা উভয়ই খালাত ভাই। দেখুন, সহীহ বুখারী কিতাবু আ-হাদীসিল আম্বিয়া, অধ্যায় ৫০; হা/৩১৮৯ (ইফা)।

প্রাপ্ত শিক্ষা ও কাদিয়ানী যুক্তির খন্ডন : উপরের হাদীস আমাদের বলছে, ঈসা আঃ বর্তমানে দ্বিতীয় আকাশে স্বশরীরে জীবিত। কিন্তু প্রশ্ন হল, তবে কি অন্যান্য নবীগণও আকাশে স্বশরীরে জীবিত?

উত্তরে বলব, না, বরং শুধুমাত্র ঈসা (আঃ)-ই দ্বিতীয় আকাশে স্বশরীরে জীবিত! তার কারণ প্রথমত বহু সহীহ হাদীসে এসেছে আল্লাহতালা ঈসা (আঃ)-কে স্বশরীরে আকাশে জীবিত উঠিয়ে নিয়েছেন এবং তিনি শীঘ্রই পৃথিবীতে ফিরে আসবেন (আত-ত্ববকাতুল কোবরা লি-ইবনে সা’আদ ১/৩৬-৩৭ দ্রষ্টব্য)। কিন্তু এইভাবে কোনো কথাই অন্যান্য নবীগণ সম্পর্কে কোনো হাদীসে পাওয়া যায়না। দ্বিতীয়ত, মেরাজের আরেকটি হাদীসে পরিষ্কার উল্লেখ আছে যে, হযরত ঈসা (আঃ) বলেছেন, আল্লাহ তাঁর কাছ থেকে দুনিয়াতে পুনরায় ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। একথা সুনানু ইবনে মাজাহ’র হাদীসেও এসেছে। হাদীসের ভাষ্য : “ফা-রুদ্দাল হাদীসু ইলা ঈসা ইবনে মরিয়ম ফা-ক্বলা ক্বদ ও’হিদা ইলাইয়্যা ফী-মা দূনা ওয়াজবাতিহা ফা-আম্মা ওয়াজবাতুহা ফা-লা ই’য়ালামুহা ইল্লাল্লাহু”। অর্থাৎ অতপর (কেয়ামতের) বিষয়টি ঈসা বিন মরিয়ম (আঃ)-এর নিকট পেশ করা হলে তিনি বলেন, আমার থেকে কেয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে দুনিয়াতে প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি নেয়া হয়েছে। কিন্তু কেয়ামতের সঠিক জ্ঞান আল্লাহ ব্যতীত কারো কাছে নেই। (ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৪০৮১)। কিন্তু অন্য আর কোনো নবী-ই এইধরনের কোনো কথা বলেননি। এই সমস্ত কারণে কাদিয়ানীদের উক্ত প্রশ্ন – তবে কি অন্যান্য নবীগণও স্বশরীরে জীবিত, এটি সম্পূর্ণরূপে বাতিল। সংক্ষেপে।

তাদের আরেকটি যুক্তি হল, মৃত আর জীবিত একত্রে থাকতে পারেনা। তাই ইয়াহইয়া (আঃ) আর সাথে অবস্থানকারী ঈসা (আঃ) তিনিও মৃত প্রমাণিত! আমার জবাব, (১) পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে উল্লেখ আছে, মৃতরা কেয়ামতের আগে পুনরায় ফিরে আসবেনা। অথচ রাসূল (সাঃ) সহীহ বুখারীর কিতাবুল আম্বিয়া অংশে ঈসা (আঃ) সম্পর্কে শপথ করে ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে বলেছেন, ঈসা (আঃ) অচিরেই নাযিল হবেন। সুনানে ইবনে মাজাহ’র উক্ত হাদীসেও আপনারা দেখেছেন, ঈসা (আঃ) নিজেই নিজের পুনরায় ফিরে আসা সম্পর্কে প্রতিশ্রুতির কথা জানান দিয়েছেন। এখন মির্যায়ী উক্ত যুক্তি বাতিল না হলে তখন কাদিয়ানীদের নিকট নিচের প্রশ্নটির আর কোনো জবাব থাকেনা! প্রশ্নটি হল, তবে কি প্রতিশ্রুত সেই ঈসা ইবনে মরিয়ম পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য আকাশে আবার জীবিত হবেন? (২) তর্কের খাতিরে মানলাম, দ্বিতীয় আকাশে ইয়াহইয়া (আঃ) আর ঈসা (আঃ) দুইজনই মৃত, কিন্তু সেই দুই মৃত ব্যক্তির সাথে নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাক্ষাৎ কিভাবে সম্ভব হল? নাকি এবার মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সাক্ষাতকেও অস্বীকার করে বসবেন? দয়া করে ধূর্ত মির্যায়ী উগরানো বমি অন্ধের মতো না ছেঁটে নিজের মগজটা এবার একটু খাটাবেন! সত্য বলতে, মৃত আর জীবিত একত্রে থাকতে পারেনা, মির্যায়ী এই অপযুক্তি মূলত রাসূল (সাঃ) এর হাদীসকে অমান্য করার বড় চালাকি বৈ কিছুই না!

সেযাইহোক, আপনাদের উল্লিখিত যুক্তির খন্ডনে আমি শুধু একটি প্রশ্ন করব।

আপনাদের যুক্তি হল, মৃত আর জীবিত একত্রে থাকতে পারেনা! তাই আমার পাল্টা প্রশ্ন, আপনাদের উক্ত যুক্তি যদি সঠিক হয় তাহলে বায়তুল মুকাদ্দাসে আমাদের প্রিয় নবী (সাঃ)-এর পক্ষে আপনা জীবিত অবস্থায় সেখানে মৃত্যুবরণকারী অন্যান্য নবীগণের সাথে একত্রিত হওয়া কিভাবে সম্ভব হল? তিনি (সাঃ) তো বায়তুল মুকাদ্দাসে আগত সমস্ত নবীর নামাযের ইমামতিও করেছিলেন। ফলে তিনি ‘ইমামুল আম্বিয়া’ উপাধিতে ভূষিত হন। কাজেই মৃত আর জীবিত একত্রে থাকতে পারেনা, এটি একটি বাতিল ও দুর্বল যুক্তি বৈ নয়।

এবার প্রাসঙ্গিক বিষয়ে একজন যুগ ইমামের উদ্ধৃতি তুলে ধরব। শায়খ ইবনুল কাইয়্যুম রহঃ লিখেছেন :

أُسْرِىَ برسول الله ـ صلى الله عليه وسلم ـ بجسده على الصحيح من المسجد الحرام إلى بيت المقدس، راكبًا على البُرَاق، صحبة جبريل ـ عليهما الصلاة والسلام ـ، فنزل هناك، وصلى بالأنبياء إمامًا، وربط البراق بحلقة باب المسجد‏، ثم عرج به تلك الليلة من بيت المقدس إلى السماء الدنيا

অর্থাৎ সহীহ হাদীস অনুসারে রাসূল সাঃ এর ইসরাহ (ঊর্ধ্ব জগত ভ্রমণ) হযরত জিবরাঈল আঃ এর সাহচর্যে থেকে স্বশরীরে ও মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আক্বসা পর্যন্ত বোরাক যোগে আরোহন অবস্থায় সংঘটিত হয়েছিল। অতপর তিনি বোরাক থেকে নিচে অবতারণ করেন এবং বোরাককে মসজিদুল আকসার এক কোণে বেধে (সেই বরকতময় রাতে সম্মিলিত) নবীগণকে নিয়ে ইমামতির মাধ্যমে তিনি সালাত আদায় করেন। অতপর তিনি জিবরাইলের সাথে বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে প্রথম আসমানের উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্বাকাশে পাড়ি দেন। (রেফারেন্স : যাদুল মা’আদ পৃষ্ঠা নং ৪৭)। এবার হয়ত প্রসঙ্গ এড়িয়ে আপনা জান ছুটাতে আপনারা মেরাজ স্বশরীরে জাগ্রত অবস্থায় হওয়া-ও অস্বীকার করতে পারেন। তখন উত্তরে বলব, এই সম্পর্কে আপনাদের নিকটেও মুজাদ্দিদ ও যুগ ইমাম হিসেবে মাননীয় শায়খ ইবনুল কাইয়্যুম (রহঃ) এর উদ্ধৃতি দ্বারা একটু আগেই মেরাজ স্বশরীরে হওয়ার প্রমাণ দেখেছেন। এই পর্যায় আপনাদের মির্যা কাদিয়ানীর মেরাজ সংক্রান্ত একটি উদ্ধৃতি পেশ করে আজকের মত আলোচনা এখানেই শেষ করব, ইনশাআল্লাহ।

মেরাজ সম্পর্কে মির্যা কাদিয়ানী তার “মালফূযাত” বইতে লিখেছেন,

উর্দু উচ্চারণ : হামারা ইয়ে মাযহাব হারগেয নিহি কে উয়ো এক খাব থা ইয়া স্রেফ রূহ গী, বলকে হাম তু কাহাতে হেঁ কে রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কো আঈনে বিদারী মে মেরাজ হুয়া আওর এক লতিফ জিসিম বিহি সাথ থা। “অর্থাৎ মেরাজ স্বপ্নযোগে বা আধ্যাত্মিকভাবে হয়েছিল এটা আমাদের মতামত নয়, বরং আমরা তো বলে থাকি যে, মেরাজ জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল এবং সূক্ষ্মতর একটি শরীরও সাথে ছিল।” (মির্যা কাদিয়ানীর রচিত মালফূযাত [উর্দু] খন্ড ৫ পৃষ্ঠা ১৩৪; নতুন এডিশন)।

এখানে বলে রাখা দরকার, মির্যার উল্লিখিত বক্তব্যে মেরাজ যে, স্বপ্নযোগে ছিলনা, বরং জাগ্রত অবস্থায়ই ছিল; অন্তত এইটুকু তো পরিষ্কার হল। তারপর বাকি থাকল “সূক্ষ্ণতর শরীর” বিষয়টি। আমি বলি, সূক্ষ্মতর শরীর এর ব্যাখ্যা আর যাইহোক না কেন, অন্ততপক্ষে মেরাজ যে “জাগ্রত অবস্থায়”-তেও হয়েছিল তা কিন্তু কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারেন না! আল্লাহ আমাদেরকে সত্যটা যতই কঠিন হোক তা যেন সহজেই বুঝার এবং গ্রহণ করার তাওফিক দিন, আমীন।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

আযানের আগে সালাত ও সালাম পাঠ করার বিধান কী?

0
  • আযানের আগে পরে সালাত ও সালাম :

প্রশ্নকর্তা : আযানের আগে সালাত ও সালাম পাঠ করার বিধান কী?
উত্তরদাতা : ইমাম ইবনে হাজার আল-হায়সামী (রহ.)-এর কিতাব {الفتاوى الكبرى} ‘আল ফাতাওয়াল কোবরা’ এর ১ম খন্ডের ১৩১ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে ان الصلاة و السلام على نبى قبل الآذان ليست السنة ‘আন্নাস সালাতা ওয়াস সালামা আলান নাবিয়্যি কবলাল আযান লাইছাত সুন্নাতুন।’ অর্থাৎ আযানের পূর্বে নবী করীম (সা.)-এর প্রতি সালাত ওয়া সালাম পাঠকরা সুন্নাত নয়। (ফেইসবুক থেকে পড়ুন)
প্রশ্নকর্তা : তাহলে দেশের কোথাও কোথাও এটি কোন্ দলিলে প্রচলিত?
উত্তরদাতা : আল্লাহই ভাল জানেন। তবে যতটুকু জানা যায় তা হল, আযানের পরে উচ্চৈঃস্বরে (মাইকে) সালাত ওয়া সালাম পাঠের প্রচলন হয়েছিল ৭৯১ হিজরীতে সুলতান নাসির সালাউদ্দিন ইবনে আইয়ুবের শাসনামলে এবং তারই নির্দেশে। এর প্রমাণ ইমাম আবুল আব্বাস ইবনে হাজার আল হাইছামী রচিত ‘আল ফাতাওয়াল কুবরা‘ এর আযান অধ্যায়ের ১৯১ নং পৃষ্ঠায় রয়েছে (নিচে স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য)। এই তথ্য ইমাম সাখাবী (রহ.) থেকে তাঁরই রচিত {القول البديع فى الصلاة على الحبيب الشفيع} ‘আল ক্বওলুল বাদী ফিস-সালাতি আলাল হাবীবিশ শাফী’ কিতাবেও রয়েছে। কিন্তু ইমাম জালালুদ্দিন আস-সুয়ূতী (রহ.) থেকে এই তারিখ ৭৮১ হিজরী উল্লেখ রয়েছে। (দেখুন ইমাম সুয়ূতী রচিত {حسن المحاضرة فى تاريخ مصر و القاهرة} হুসনুল মুহাযারাহ ফী তারীখে মিশর ওয়াল কাহেরাহ)। সুতরাং বুঝা গেল, এটি সুন্নত নয়। আরো বুঝা গেল, এটি অন্ততপক্ষে সাহাবায়ে কেরামের যুগেরও প্রায় ৬৭১ বছর পরে ফেতনা ফাসাদের যুগে উদ্ভাবন হয়। তাই জ্ঞানীদের উচিৎ হবে, বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে সাধারণ মানুষকে আন্তরিকতার মাধ্যমে যথাসাধ্য বুঝিয়ে আদিম ও সহজ সরল পন্থায় ফিরে আনতে চেষ্টা করা। প্রয়োজনে দুই পক্ষের বিজ্ঞ আলেম উলামাগণ দ্বারা উত্তম বিতর্ক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংশয় নিরসনে উদ্যোগ নেয়া। তবে কিন্তু যেখানে বুঝাতে গেলে ঝগড়া বাধার সম্ভাবনা থাকবে সেখানে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ছবর আর দোয়ার মাধ্যমে নিরব থাকাই উত্তম। কেননা পবিত্র কুরআন বলছে, {الفتنة اشد من القتل} আল ফিতনাতু আশাদ্দু মিনাল ক্বাতলি। অর্থাৎ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হত্যা থেকে জঘন্য।

বাবুল আযান, পৃষ্ঠা ১৯১, ইমাম ইবনে হাজার আল হাইছামী
  • লিখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

নবীজী (সা:)-কে হাজির নাজির বিশ্বাস করা যাবে কিনা?

0
  • হাজির নাজির :

প্রশ্নকর্তা : নবীজীকে হাজির নাজির বিশ্বাস করা যাবে কিনা?
উত্তরদাতা : আগে বলুন হাজির নাজির কাকে বলে?
প্রশ্নকর্তা : আমার জানা মতে, যিনি কোথাও উপস্থিত হন এবং সব কিছু দেখেন তাকে হাজির নাজির বলে।
উত্তরদাতা : কিন্তু পবিত্র কুরআন তো বলছে, মৃত্যুর পর কেয়ামতের পূর্বে আর কারো জন্য পৃথিবীতে ফিরে আসার অনুমতি নেই! (সূরা মুমিনূন ৯৯-১০৩)। এখন আপনি কি মনে করেন যে, নবীজী পবিত্র কুরআনের এই বিধান লঙ্গন করবেন? নাউযুবিল্লাহ।
প্রশ্নকর্তা : না, কিন্তু আহলে সুন্নাহ’র পবিত্র বিশ্বাস তো এই যে, নবীজী (সা:) বরযখী তথা দুনিয়া আর কেয়ামতের মধ্যবর্তী জগতে জীবিত এবং রিযিকপ্রাপ্ত। তাহলে তো তিনি বরযখী জগতের বাহিরেও আল্লাহ্ চাহিলে বিশেষ কোনো পন্থায় নিশ্চয়ই যাওয়া আসা করার অনুমতি পাবেন, তাই নয় কি?
উত্তরদাতা : আপনার কথার সাথে আমিও একমত। কিন্তু আল্লাহ্ যে চাহিবেন না, সে কথা তো আগেই ‘কাল্লা ইন্নাহা কালিমাতুন হুয়া ক্বায়েলুহা’ (২৩:১০০) আয়াতে বলে দিয়েছেন। সেযাইহোক, তিনি (সা:) যে বরযখী জগতের বাহিরে আসতে অনুমতি পেয়েছেন তার কী দলিল আছে? তর্কের খাতিরে কিছুক্ষণের জন্য যদি মেনে নিই, নবীজী (সা:) বরযখী জগতের বাহিরেও যাওয়া আসা করেন; তখন তো প্রশ্ন আসবে, তিনি রাওজা শরীফ ত্যাগ করে বাহিরে কোথাও চলে গেলে সেই মুহুর্তে যেসব হাজী সাহেব মদীনায় নবীজীর রাওজা শরীফে উপস্থিত হয়ে ‘ওয়াস সালাতু ওয়াস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ’ পাঠ করবেন তখন কি তারা জনমানবহীন একটি খালি কবরকে সালাম করছেন না? উম্মতে মুহাম্মদিয়ার জন্য এর চেয়ে বড় কষ্টদায়ক আর কী হতে পারে? এই অবস্থায় কোটি কোটি উম্মতে মুহাম্মদিয়া অস্বস্তিকর অবস্থায়ও পড়বে কিনা?
প্রশ্নকর্তা : কোনো কোনো বক্তা তো বলে থাকেন, নবীজী মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠানগুলোতে আসা যাওয়া করেন!
উত্তরদাতা : না এটি তাদের মনগড়া কথাবার্তা, যা সঠিক দলিল প্রমাণ আর যুক্তির কষ্টিপাথরে একদমই টিকেনা। সেযাইহোক, আচ্ছা যেসব বক্তা এমন কথা বলেন তাদেরকে আজই জিজ্ঞেস করবেন তারা নিজেদেরকে নবীজীর ‘সাহাবী’ মনে করেন কিনা? কেননা নবীজী যখন মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠানে আসবেন তখন তো তিনি তাদেরকেও দেখবেন, তাই নয় কি? কারণ, সাহাবীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যারা ঈমানের সহিত নবীজীর সোহবত (সাহচর্য) লাভ করবে এবং ঈমানের উপর মৃত্যুবরণ করবে তারা সাহাবী। ফলে বুঝা গেল, সাহাবী হতে হলে নবীকে চর্মচোখে দেখা জুরুরি নয়, বরং নবীজীর সাহচর্য পাওয়াই জুরুরি। কেননা বহু সাহাবী এমনও ছিলেন যারা জন্মান্ধ। যেমন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রা:) প্রমুখ। এখন এর কী জবাব?
প্রশ্নকর্তা : পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে ‘ইয়াকূনুর রাসূলু আলাইকুম শাহীদা’ (০২:১৪৩) তাহলে বলুন, তিনি হাজির নাজির না হয়ে কেয়ামতের দিন স্বীয় উম্মতের পক্ষে সাক্ষ্যদানকারী কিভাবে হবেন?
উত্তরদাতা : এখানে ‘শাহীদান’ বলতে সাক্ষ্যদানকারী বুঝায়নি, বরং ‘সত্যায়নকারী’ বুঝানো হয়েছে। কারণ কেয়ামতের দিন নবীগণের পক্ষে ও তাঁদের উম্মতদের দায়েরকৃত অভিযোগ খন্ডনে উম্মতে মুহাম্মদিয়ার ঐতিহাসিক সাক্ষ্যদানের পর্বটি নবীজী কর্তৃক সত্যায়িত হবে। তাই এই আয়াতে ‘শাহীদান’ অর্থ ‘সাক্ষ্যদানকারী’ নেয়া আয়াতের পটভুমি (Context)’র বিচারে সঠিক নয়। (দেখুন সহীহ বুখারী ২/৬৪৫, আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত হাদীস)। আচ্ছা, আল্লাহতালা তো কোনো এক ঘটনা-প্রেক্ষিতে নবীজী সম্পর্কে এও বলেছেন ‘ওয়া মা কুনতা মিনাশ শাহিদীন’ (ক্বাছাছ ৪৪)। অর্থাৎ আর আপনি (তখন) শাহিদ ছিলেন না। এবার এই ‘শাহিদ’ এর কী হবে?
প্রশ্নকর্তা : কবরের ভেতর নবীজির দিকে সম্বোধন করে মাইয়্যেতকে ফেরেশতা প্রশ্ন করবেন ‘ওয়া মান হাযার রাজুল’ ( و من هذا الرجل)? এখানে ‘হাযা’ (This/هذا) শব্দটি তো নিকটবর্তী কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে বুঝাতে আসে!
উত্তরদাতা : কোনো ব্যক্তি বা বস্তু সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করার কারণে অনেক সময় প্রচলিত ব্যাকরণের বিরুদ্ধেও চলে যায়। তার অন্যতম উদাহরণ, হযরত ইবরাহিম (আ:) কর্তৃক ‘হাযা’ শব্দ দ্বারা চন্দ্র-সূর্যের দিকে ইংগিত করা। যেমন, তিনি বলেছিলেন ‘হাযা রাব্বী’ (কুরআন ৬:৭৮)। অর্থাৎ ইহা আমার প্রভু। এখানেও কিন্তু ‘মুশারুন ইলাইহি’ (সম্বোধিত বস্তু) চন্দ্র। যা নিকটে নয়, বরং দূরে। উল্লেখ্য, এটি নবুওতপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বেকার ঘটনা, তাই এই জন্য তিনি অভিযুক্ত হবেন না।

  • লিখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

নবীজী (সা:)-এর ছায়া বা প্রতিবিম্ব ছিল কিনা?

  • নবীজী (সা:) এর ছায়া বা প্রতিবিম্ব :
  • প্রশ্নকর্তা : নবীজী (সা:)-এর ছায়া বা প্রতিবিম্ব ছিল কিনা?

উত্তরদাতা : নবীজী (সা:)-এর ছায়া বা প্রতিবিম্ব ছিল কিনা, এর চাক্ষুষ প্রমাণ কেবল মাত্র ওরাই দিতে পারেন যারা নবীজীকে কাছ থেকে দেখেছেন এবং দিবারাত্রি উনার পাশেই থেকেছেন! সে হিসেবে এই তালিকায় আমরা সর্বপ্রথম উনার (সা:) স্ত্রী তারপর উনার খুব কাছের সাহাবীদের স্থান দেব। উনাদের মাধ্যমে সহীহ ও মারফূ (তথা ধারাবাহিক বর্ণনাসূত্র নবীজী পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকা) সনদে কোনো একটি বর্ণনা দ্বারাও যদি প্রমাণিত হয় যে, উনার ছায়া মুবারক ছিল কিংবা ছিলনা; যেটাই হোক সেটাই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। কেননা ঈমানের দাবী হচ্ছে, দ্বীনের ব্যাপারে নিজকে নিরপেক্ষ রাখা ও সত্যকে বিনাবাক্যে লুফে নেয়া।

(ক) উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত, হযরত যয়নব (রা:) তিনি নবীজীর ছায়া দেখা সম্পর্কে পরিস্কার বলেছেন : ‘ফা রাআইতু জিল্লাহু (فرأيت ظله)।’ অর্থাৎ আমি তাঁর ছায়া দেখেছি। (মুসনাদে আহমদ ৭/৪৭৪; হাদীস নং ২৬৩২৫ দ্রষ্টব্য)।

(খ) উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়্যাহ বিনতে হোইয়াই (রা:) হতেও বর্ণিত আছে, তিনি বলেন : ‘ইয্ আনা বি-জিল্লি রাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুক্ববিলুন (ذ أنا بظل رسول الله صلى الله عليه وسلم مقبل)।’ অর্থাৎ ইত্যবসরে আমি আল্লাহ’র রাসুলের ছায়ার নাগাল পেয়ে গেলাম (মুসনাদে আহমদ ৬/১৩২); হাদীস নং ২৫০০২; হাদীসের সব রাবী ছিক্বাহ)।

(গ) নবীজী (সা:)-এর দীর্ঘ দশ বছরের খাদেম হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা:) হতে মারফূ সনদে ও একদম সহীহসূত্রে বর্ণিত আছে, নবীজী (সা:) কোনো এক ঘটনাপ্রেক্ষিতে বলেছেন : ‘রাআইতু জিল্লি ওয়া জিল্লাকুম ফীহা’ (رأيت ظلى و ظلكم فيها)। অর্থাৎ তার মধ্যে আমি আমার এবং তোমাদের ছায়া দেখেছি। সংক্ষেপে। (সহীহ ইবনে খোজায়মা ২/৫০, হাদীস নং ৮৯; মুসতাদরিক আল হাকেম ৫/৬৪৮; হাদীস নং ৮৪৫৬; হাদীসের মান, সহীহ)। ইমাম রাজী (রহ:) লিখেছেন, ‘ফী’ বর্ণটি অভিধানে ‘অতি নিকটে’ অর্থ বুঝাতেও ব্যবহৃত হয়। যেমন সূরা আন-নমল আয়াত নং ৮; মূসা (আ:) সম্পর্কে ‘আন বূরিকা মান ফীননার’ (অর্থাৎ বরকতময় হোক তিনি যিনি আগুনের মধ্যে আছেন…) উল্লেখ আছে। অথচ তূর পর্বতমালায় তখন তিনি আগুনের অভ্যন্তরে ছিলেন না, বরং অতি নিকটে বা কোনো এক পাশেই ছিলেন (তাফসীরে কাবীর ২৪/১৮৩)। কাজেই উক্ত হাদীসে ‘আগুনের মধ্যে’ মানে আগুনের অতি নিকটে বা আগুনের এক পাশে, এই অর্থই উদ্দেশ্য। হতে পারে তখন ছায়াগুলো নবীজীর পেছনে চলে গিয়েছিল। কিন্তু তাতেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ হাদীসে এও উল্লেখ আছে যে, নবীজী (সা:) নামাজ অবস্থায় আপনা পেছনেও তদ্রূপ দেখতে পান যেভাবে সামনে দেখেন। যেমন তিনি বলেছেন : ‘ইন্নী লা-আরাকুম মিন ওরায়ী কামা আরাকুম’। (উমাদাদুল ক্বারী শরহে সহীহ বুখারী, কিতাবুস সালাত, অধ্যায় নং ৪০)। সুতরাং এরপরেও যাদের বিশ্বাস যে, নবীজী (সা:)-এর ছায়া মুবারক থাকা সঠিক নয় তাদের নিরপেক্ষ বিবেকের নিকট প্রশ্ন, আপনারা ‘ছায়া না থাকা’ এর সমর্থনে অন্তত একটি হাদীসও কি দেখাতে পারবেন যেটির সনদ (সূত্র) ‘মারফূ’ এবং গয়রে মাজরূহ ও বিশুদ্ধ! অথচ উপরে উল্লিখিত হাদীসগুলোর সনদ যেমন গয়রে মাজরূহ ও বিশুদ্ধ তেমনি আনাস ইবনে মালেক (রা:)-এর বর্ণিত হাদীসের সনদ ‘মারফূ’ পার্যায়েরও। সংক্ষেপে।

  • প্রশ্নকর্তা : নবীজী (সা.) এর ছায়া মোবারক মাঝেমধ্যে মাটিতে পতিত না হবার কারণ কী ছিল?

উত্তরদাতা : আচ্ছা বলুন দেখি! সূর্যের কিরণে নবীজীর ছায়া না পড়া কিংবা ছায়া দেখতে না পারার ব্যাখ্যা কি ‘ছায়া না থাকা’? নিশ্চয়ই ছায়া না থাকা নয়। বরং ছায়া থাকা সত্ত্বেও মাঝেমধ্যে তা মাটিতে না পড়াই ছিল নবীজীর মুজিজা। অন্যথা উল্লিখিত সহীহ হাদীসগুলোর প্রকাশ্য বিরুদ্ধাচরণ ছাড়া আর কিছুই না! সেযাইহোক, এবার সূর্যের কিরণে নবীজীর ছায়া মাটিতে না পড়ার অন্যতম কারণ কী ছিল তা তাফসীরে মাদারিক প্রণেতার কাছ থেকে জেনে নিন! তিনি লিখেছেন: ‘লি-আল্লা ইয়াক্বা’আ ইনসানু ক্বাদামাহু আলা যালিকাজ জিল্লি’ (لئلا يقع انسان قدمه على ذالك الظل)। অর্থাৎ আল্লাহতালা নবীজীর ছায়া মুবারক মাটিতে পতিত করেন না, যাতে কেউ উনার ছায়াকে মাড়াতে না পারে। (পারা নং ১৮ দ্রষ্টব্য)। এবার বলুন, বর্তমান যুগের এই সমস্ত বক্তাদেরকে বিশ্ববিখ্যাত ‘তাফসীরে মাদারিক’ প্রণেতার চেয়েও কি অধিক জ্ঞানী মানবেন?

লিখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক