প্রশ্নকর্তা : “তাওয়াফফা” শব্দটি কুরআনের অসংখ্য স্থানে “মৃত্যু” অর্থের জন্য ব্যবহৃত হলে তবে সেটি শুধু মাত্র কুরআনের দুটি স্থানে (০৩:৫৫;০৫:১১৭) কিজন্য ‘মৃত্যু-ভিন্ন’ অর্থের জন্য ব্যবহৃত হবে?
উত্তরদাতা :
(ক) প্রশ্নকর্তার প্রশ্নে উত্থাপিত দাবীটা পুরোপুরি সঠিক নয়। কেননা পবিত্র কুরআনের (০৩:১৫; ০৬:৬০) আয়াত সহ প্রায় স্থানে উল্লিখিত “তাওয়াফফা” শব্দ “মৃত্যু” অর্থে ব্যবহার হয়নি।
(খ) প্রশ্নকর্তার উল্লিখিত দাবী সম্পূর্ণ মনগড়া ও তাফসীর শাস্ত্রীয় নীতি-বিরুদ্ধ একটি অর্বাচীন দাবী। তর্কের খাতিরে তার উক্ত দাবী মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য যদি মেনেও নিই তখন তার নিকট নিচের প্রশ্নটির আদৌ কোনো জবাব থাকেনা। প্রশ্নটি হল, পবিত্র কুরআনের অসংখ্য জায়গায় ‘আসহাবুন নার’ (আরবী : أَصْحَابَ النَّارِ) শব্দ ব্যবহার হয়েছে। তন্মধ্যে বাকারা/০২:৩৯,৮১,২১৭,২৫৭; আলে ইমরান/০৩:১১৬; আ’রাফ/০৭:৪৪,৫০; রা’আদ/১৩:০৫; যুমার/৩৯:০৮; মুমিন/৪০:০৬,৪৩; তাগাবুন/৬৪:১০; মুদ্দাচ্ছির/৭৪:৩১ অন্যতম। এখানে মাত্র ১৩টি স্থানের উল্লেখ করা হল। এছাড়া আরো বহু উদাহরণ দেয়া যাবে। কিন্তু পবিত্র কুরআনের ১১৪টি সূরার মধ্যে শুধুমাত্র সূরা মুদ্দাচ্ছির আয়াত নং ৩১ ছাড়া অন্য সবকয়টি স্থানে শব্দটির অর্থ হল “জাহান্নামীগণ“। সূরা মুদ্দাচ্ছির এর ৩১নং আয়াতে উল্লিখিত “আসহাবুন নার” (আরবী : أَصْحَابَ النَّارِ) অর্থ “জাহান্নামের তত্ত্বাবধায়ক বা ফেরেশতাগণ” (রেফারেন্স, তাফসীরে ইবনে কাসীর দ্রষ্টব্য)। এখন এর কী জবাব?
অর্থ : আর আমি ফেরেশতাদেরকেই জাহান্নামের তত্ত্বাবধায়ক বানিয়েছি। আর কাফিরদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ আমি তাদের সংখ্যা নির্ধারণ করেছি। যাতে কিতাবপ্রাপ্তরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে; আর মুমিনদের ঈমান বেড়ে যায় এবং কিতাবপ্রাপ্তরা ও মুমিনরা সন্দেহ পোষণ না করে। আর যেন যাদের অন্তরে রোগ আছে তারা এবং অবশিষ্টরা বলে, এরূপ উপমা দ্বারা আল্লাহ কী ইচ্ছা করেছেন? এভাবেই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন আর যাকে ইচ্ছা সঠিক পথে পরিচালিত করেন। আর তোমার রবের বাহিনী সম্পর্কে তিনি ছাড়া কেউ জানেন না। আর এ হচ্ছে মানুষের জন্য উপদেশমাত্র। (আল-কুরআন/৭৪:৩১)।
(গ)
মির্যা কাদিয়ানী খোদ্ নিজেও আপনা বইতে ‘তাওয়াফ্ফা’ শব্দের ভিন্ন ভিন্ন ৫ ধরণের অর্থ নিয়েছেন। তার লেখিত ৮৩টি বইয়ের সমষ্টি ২৩ খন্ডে প্রকাশিত রূহানী খাযায়েন থেকে সেই অর্থগুলো হচ্ছে ‘পূর্ণ নেয়ামত দানকরা’ [১:৬২০]; ‘পরিপূর্ণ পুরষ্কার দেয়া’ [১:৬৬৪-৬৫]; ‘অপমানকর ও অভিশপ্ত মৃত্যু হতে রক্ষাকরা’ [১২:২৩]; ‘জন্মগ্রহণকরা’ [১৯:৪৯]। তার কৃত অনুবাদের পাঁচ স্থানের মাত্র একটিতেই ‘তাওয়াফফা’ অর্থ মৃত্যু উল্লেখ রয়েছে। অথচ পাঁচ জায়গাতেই তারই কৃত ঊসূল-মতে ‘কর্তা আল্লাহ্ আর কর্ম প্রাণী’ই রয়েছে। তো এবার এখানে কী জবাব দেবেন?
পরিশেষে বলতে পারি, পবিত্র কুরআনের শব্দসমূহের অর্থ-প্রয়োগ সম্পর্কে দাবী করে এভাবে বলা সঠিক নয় যে, অমুক শব্দটি কুরআনের যতস্থানেই এসেছে সেটি সবখানে অমুক অর্থে ব্যবহার হলে তখন অমুক স্থানে তমুক ব্যতিক্রম অর্থে কিজন্য ব্যবহার হতে যাবে!? তার কারণ পবিত্র কুরআনের কোন শব্দটি কোন অর্থে ব্যবহৃত হল সে সম্পর্কে সব চেয়ে ভালো জানতেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারপর সাহাবায়ে কেরাম। তারপর সাহাবায়ে কেরামের শিষ্যরা তথা বিজ্ঞ তাবেয়ীগণ। তারপর তাবেয়ীদের শিষ্যরা তথা বিজ্ঞ আইম্মায়ে কেরাম ও তাফসীরকারকগণ। তাঁরা পবিত্র কুরআনকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস এবং সাহাবায়ে কেরামের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দ্বারা প্রতি যুগে সব ধরনের বিকৃতি থেকে রক্ষা করেছেন। ফলে তাঁদের ব্যাখ্যা ও বুঝের বিপরীতে যে কোনো ব্যাখ্যা ও বুঝ পুরোপুরি বাতিল এবং পরিত্যাজ্য।
কাদিয়ানীবন্ধুদের তথাকথিত “মুসলেহ মওউদ” কোনোভাবেই মির্যাপুত্র মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ নন! কিন্তু কেন? জানতে সম্পূর্ণ লিখাটি পড়ুন!
কাদিয়ানীবন্ধুদের তথাকথিত “মুসলেহ মওউদ” (বা মির্যা কাদিয়ানীর প্রতিশ্রুত পুত্র) মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ নন, বরং মির্যা কাদিয়ানী সাহেবের রচনাবলীর আলোকে “মুসলেহ মওউদ” মূলত মুহাম্মদী বেগমের গর্ভ থেকেই হওয়ার ছিল! মির্যা সাহেবের রচনাবলী থেকে বিষয়টি এখানে প্রমাণ করছি! আশাকরি বিষয়টি নিয়ে নিজেরাও একটু ভেবে দেখবেন!
প্রথমে কয়েকটি ধারণা :
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের নিচের কয়েকটি কথা ভালো মত মনে রাখতে হবে। যেমন, মির্যা সাহেবের সাথে তার প্রথমা স্ত্রী হুরমত বিবির বিয়ে হয় ১৮৫২ বা ৫৩ সালে । দ্বিতীয়া স্ত্রী নুসরাত জাহানের বিয়ে হয় ১৮৮৪ সালে দিল্লিতে। তার গর্ভে মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এর জন্ম হয় ১৮৮৯ সালে। তবে তার এক বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৮৮৮ সালে নুসরাতের গর্ভে বশির উদ্দিন নামে এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয় যিনি বশিরে আউয়াল নামে পরিচিত। তিনি ঐ বছরই মারা যান । মির্যা কাদিয়ানীর সাথে মুহাম্মদী বেগমের বিবাহের প্রথম ভবিষ্যৎবাণীটি ১৮৮৮ সালের দিকে ছিল। (রেফারেন্স, মির্যাপুত্র রচিত সীরাতে মাহদী খ-২; পৃষ্ঠা ৪৪৩-৪৪ রেওয়ায়েত নং ৪৭০, নতুন ও অনলাইন এডিশন)।
স্ক্রিনশট
তাহলে “মুসলেহ মওউদ” কে? এ সম্পর্কে আমার তাহকিক ও গবেষণা :
কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এর নেতৃত্বাধীন “কাদিয়ানী” গ্রুপের মতানুসারে মির্যা কাদিয়ানীর ভবিষ্যৎবাণীকৃত সেই কথিত মুসলেহ মওউদ হচ্ছেন তাদের দ্বিতীয় খলীফা মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ আহমদ (১৮৮৯-১৯৬৫ইং)। অপ্রিয় হলেও সত্য হল, মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ ই উক্ত “মুসলেহ মওউদ” ছিলেন এটি একেবারেই অসত্য। কাদিয়ানীদের দ্বিতীয় গ্রুপ “লাহোরি মুভমেন্ট” এরও একই বক্তব্য যে, মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ সেই মুসলেহ মওউদ নন, মির্যা কাদিয়ানী যার ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে গেছেন!
এখন প্রশ্ন হল, ১. তাহলে তথাকথিত সেই মুসলেহ মওউদ কে? ২. তার আদৌ জন্ম হয়েছে কিনা? ৩. অথবা কেয়ামতের পূর্বে তার কখনো জন্ম হওয়ার সুযোগ আর আছে কিনা? ৪. যদি আর কোনো সুযোগ না থাকে তবে কেন থাকবেনা? আজকের প্রবন্ধে এ কয়টি প্রশ্নের উত্তর দেব, ইনশাআল্লাহ।
উল্লেখ্য, কথিত মুসলেহ মওউদ এর কনসেপশনটি মির্যা কাদিয়ানীর একটি বানোয়াট ধারণা, তার সাথে ইসলামের বিন্দুবিসর্গ সম্পর্কও নেই।
প্রশ্ন নং ১ এর উত্তর হল, তথাকথিত সেই মুসলেহ মওউদ অন্য আর যেই হবে হোক কিন্তু তিনি যে কোনোভাবেই মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ নন, এটি দ্বিপ্রহরের সূর্যের মত পরিষ্কার। হ্যাঁ, মির্যা কাদিয়ানী সাহেবের ১৮৯৬ সালে রচিত ‘দ্বমীমায়ে রেসালায়ে আঞ্জামে আথহাম’ (উর্দু) এর ৫৩ নং পৃষ্ঠার উক্তি অনুসারে দ্ব্যর্থহীনভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, কথিত মুসলেহ মওউদ স্বীয় আসমানী বিবি মরহুমা মুহাম্মদী বেগমের গর্ভ হতেই জন্ম হওয়ার ছিল। এ সম্পর্কে মির্যা সাহেবের ভাষ্যটি নিম্নরূপ : اس پیشگوئی کی تصدیق کے لئے جناب رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم نے بھی پہلے سے ایک پیشگوئی فرمائی ہے کہ یتزوج و یولد لہ یعنی وہ مسیح موعود بیوی کرے گا اور نیز وہ صاحب اولاد ہو گا۔ اب ظاہر ہے کہ تز و ج اور اولاد کا ذکر کرنا عام طور پر مقصود نہیں۔کیونکہ عام طور پر ہر یک شادی کرتا ہے اور اولاد بھی ہوتی ہے اس میں کچھ خوبی نہیں بلکہ وہ خاص تزوج ہے جو بطور نشان ہوگا اور اولاد سے مراد وہ خاص اولاد ہیں جس کی نسبت اس عاجز کی پیشگوئی موجود ہے گویا اس جاگہ رسول اللہ صلی اللہ علیہ السلام ان سیاہ دل منکروں کو ان کے شبہات کا جواب دے رہے ہیں اور فرما رہے ہیں کہ یہ باتیں ضرور پوری ہوگی۔
অর্থাৎ এই ভবিষ্যৎবাণীর সত্যতার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুরু থেকেই একটি ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে গেছেন যে, তিনি (আগত মসীহ) বিয়ে করবেন এবং তাঁর সন্তান হবে অর্থাৎ মসীহ মওউদ বিয়ে করবেন এমনকি তাঁর সন্তানও হবে। এখন প্রকাশ থাকে যে, বিয়ে করা এবং সন্তান হওয়া সংক্রান্ত আলোচনা সাধারণ কোনো উদ্দেশ্যে নয়। কেননা সাধারণভাবে প্রত্যেকেই বিয়ে করে এবং সন্তানও হয়ে থাকে। এতে স্বতন্ত্র কোনো সৌন্দর্য বা বৈশিষ্ট্য থাকেনা। বরং এই (ভবিষ্যৎবাণী)-তে বিশেষ ধরনের বিয়েই উদ্দেশ্য যা নিদর্শনস্বরূপ এবং বিশেষ ধরনের সন্তান হওয়া উদ্দেশ্য যার ব্যাপারে এই অধমের ভবিষ্যৎবাণী রয়েছে। এই স্থানে (ঐ ভবিষ্যৎবাণীর মাধ্যমে) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সাল্লাম অস্বীকারকারী কৃষ্ণ হৃদয়ের ব্যক্তিদের সংশয়পূর্ণ জিজ্ঞাসার জবাব দিয়ে যেন বলতে চেয়েছেন যে, এই কথাগুলো অবশ্যই পূর্ণ হবে। (দ্বমীমায়ে রেসালায়ে আঞ্জামে আথহাম ৫৩, মির্যার ৮৩টি বইয়ের সমষ্টি ২৩ খন্ডে প্রকাশিত ‘রূহানী খাযায়েন’ ১১/৩৩৭)।
স্ক্রিনশট
মির্যা সাহেবের উল্লিখিত বক্তব্যের সারমর্ম এই যে,
১- হাদীসে মসীহ মওউদ এসে বিয়ে করা এবং তাঁর সন্তান হওয়ার কথা এসেছে। আর এটি রাসূল (সা:) কর্তৃক সত্যায়িত একটি ভবিষ্যৎবাণী।
২- প্রকাশ থাকে যে, বিয়ে করা এবং সন্তান হওয়া সংক্রান্ত আলোচনা সাধারণ কোনো উদ্দেশ্যে নয়। কেননা সাধারণভাবে প্রত্যেকেই বিয়ে করে এবং সন্তানও হয়ে থাকে। এতে স্বতন্ত্র কোনো সৌন্দর্য বা বৈশিষ্ট্য থাকেনা।
৩- এই (ভবিষ্যৎবাণী)-তে বিশেষ ধরনের বিয়েই উদ্দেশ্য যা নিদর্শনস্বরূপ এবং বিশেষ ধরনের সন্তান হওয়া উদ্দেশ্য যার ব্যাপারে এই অধমের ভবিষ্যৎবাণী রয়েছে।
এবার মির্যা সাহেব যে হাদীসটির খন্ডিত অংশ দুটো উদ্ধৃত করে তথাকথিত “মুসলেহ মওউদ” নামের বিশেষ ধরনের সন্তানের ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে গেছেন সে হাদীসের সম্পূর্ণ পাঠটি অনুবাদসহ দেখুন! হাদীসে এসেছে : ينزل عيسى ابن مريم إلى الأرض، فيتزوج ويولد له، ويمكث خمسا وأربعين سنة، ثم يموت، فيدفن معي في قبري، فأقوم أنا وعيسى ابن مريم في قبر واحد بين أبي بكر وعمر অর্থাৎ (সঠিক অনুবাদ) ঈসা ইবনে মরিয়ম পৃথিবীতে নাযিল হবেন। অতপর তিনি বিয়ে করবেন এবং তাঁর সন্তান হবে। তিনি পয়তাল্লিশ বছর অবস্থান করবেন। অতপর মৃত্যুবরণ করবেন। তারপর তিনি আমার সাথে আমার কবরে দাফন হবেন। অতপর আমি এবং ঈসা ইবনে মরিয়ম আবুবকর এবং উমরের মাঝে একই কবরে অবস্থান করবো। (সূত্র মেশকাত শরীফ, হাদীসের মান : দুর্বল)।
প্রাসঙ্গিক একটি কথা বলে রাখতে চাই যে, হাদীসটি সূত্রের বিচারে এতটা শক্তিশালী যে, এটি ভিন্ন ভিন্ন ৩টি সনদে বর্ণিত হয়েছে। ‘আল-মু’জামুল কাবীর‘ কিতাবের খন্ড নং ১৩ পৃষ্ঠা নং ১৫৯ এর মধ্যে একই অর্থবোধক আরেকটি হাদীস ভিন্ন আরেক সনদে পাওয়া যায়।
হাদীসটির “ঈসা ইবনে মরিয়ম আমার কবরের মধ্যে” দাফন হবে, এ কথার সঠিক তাৎপর্য নিয়ে কাদিয়ানীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধূম্রজাল সৃষ্টি করলেও বিশিষ্ট যুগ ইমাম মোল্লা আলী ক্বারী (রহ:) সেটির প্রকৃত অর্থ فى مقبرتى অর্থাৎ “আমার গোরস্থানে” এটাই বুঝিয়ে গেছেন। দেখুন, মেরকাত শরহে মেশকাত, কিতাবুল ফিতান ১০/১৬৬। ফলে এই সংক্রান্ত তাবৎ তাবীল আর রূপকের কাসুন্দি বরাবরের মতই প্রত্যাখ্যাত ও পরিত্যাজ্য!
মেরকাত শরহে মেশকাত, কিতাবুল ফিতান ; মোল্লা আলী ক্বারী রহঃ
অর্থাৎ আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা:) বলেছেন, ঈসা (আ:)-কে রাসূল এবং তাঁর দুই সাহাবী (আবুবকর, উমর)’র সাথে (একই কবরস্থানে) দাফন করা হবে। ফলে (সেখানে) তাঁর কবরটি চতুর্থতম কবর হবে।’ এই হাদীস উপরে উল্লিখিত হাদীসটির বিশ্লেষণকারী এবং ‘রাওজা শরীফ খুঁড়ে তার অভ্যন্তরে দাফন করার কথা বুঝাল কিনা’ সেই সংশয়টুকুরও তিরোহিতকারী। কেননা এই হাদীসে সুস্পষ্টই ‘ক্বাবরুহু রাবি’আন’ (ঈসার কবরটি সেখানে চতুর্থতম কবর) বলেই উল্লেখ রয়েছে।
ইমাম তিরমিযী (রহ:) এটি স্বীয় “আল-জামে” গ্রন্থে আগের ২টি সনদের বাহিরে ভিন্ন আরেক সনদেও উল্লেখ করে বলেছেন, এর সনদ হাসান এবং গরীব তথা সনদের কোনো কোনো ক্ষেত্রে বর্ণনাকারী অনূর্ধ্ব একজন।
অবশেষে প্রমাণিত হল, উপরের দীর্ঘ বক্তব্যের আলোকে প্রমাণ করতে পারলাম যে, মির্যার কথিত মুসলেহ মওউদ এর জন্ম তারই প্রতিশ্রুত ও আসমানী বিবি মুহাম্মদী বেগমের গর্ভ থেকেই হওয়ার ছিল। তিনি বিষয়টিকে হাদীস দ্বারা উদ্ধৃত করে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, اس پیشگوئی کی تصدیق کے لئے جناب رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم نے بھی پہلے سے ایک پیشگوئی فرمائی ہے کہ یتزوج و یولد لہ یعنی وہ مسیح موعود بیوی کرے گا اور نیز وہ صاحب اولاد ہو گا۔ অর্থাৎ এই ভবিষ্যৎবাণীর সত্যতার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুরু থেকেই একটি ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে গেছেন যে, তিনি (আগত মসীহ) বিয়ে করবেন এবং তাঁর সন্তান হবে অর্থাৎ মসীহ মওউদ বিয়ে করবেন এমনকি তাঁর সন্তানও হবে।
এবার হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন যে, মির্যা কাদিয়ানী সাহেব থেকে এধরণের আর কোনো ইংগিত তার অন্য আর কোনো রচনা হতেও বুঝা যায় কিনা?
উত্তরে বলা হবে যে, হ্যাঁ অবশ্যই। মির্যা কাদিয়ানী সাহেব ১০ই জুলাই ১৮৮৮ সালে আপনা একখানা ইশতিহার এর পরিশিষ্ট তুলে ধরে মুহাম্মদী বেগমের পরিবারের সাথে আত্মীয়তা করার উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে খোদ লিখেছেন : ایک عرصہ سے یہ لوگ جو میرے کنبے سے اور میرے اقارب ہیں کیا مرد اور کیا عورت مجہے میرے الہامی دعاوی میں مکار اور دکاندار خیال کرتے ہیں ۔۔۔۔۔۔اگر ان میں کچھ نور ایمان اور کانقشنس ہوتا اس رشتہ کی درخواست کی کچھ ضرورت نہیں تہی۔ سب ضرورتوں کو خدا تعالی نے پورا کردیا تہا۔ اولاد بہی عطا کئی اور ان میں سے وہ لڑکا بہی جو دین کا چراغ ہوگا۔ بلکہ ایک اور لڑکا ہونے کا قرب مدت تک وعدہ دیا جسکا نام محمود احمد ہوگا۔ اور اپنے کاموں میں اولوا کالعزم نکلے گا۔ پس یہ رشتہ جسکی درخواست کی گئی ہے محض بطور نشان کے ہے تا خدا تعالی اس کنبہ کے منکرین کو اعجوبہ قدرت دکہلا دے۔ ۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔۔خاکسار غلام احمد از قادیان ضلع گورداسپور ۔ پانزدہم جولائی 1888 عیسائی۔
অর্থাৎ (আলোচনাটি মুহাম্মদী বেগমের পিতা আহমদ বেগ এর পরিবার সংক্রান্ত—অনুবাদক) দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আমার গোষ্ঠী এবং নিকটাত্মীয়গণের যারাই পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে আমার ইলহাম আর দাবিসমূহকে প্রতারণা এবং কারসাজি মনে করত……..। যদি তাদের মধ্যে সামান্যতম ঈমানের জ্যোতি এবং কানেকশন থাকত তাহলে(ও) তাদের সাথে আত্মীয়তার প্রস্তাব করার কোনোই প্রয়োজন ছিল না। সকল প্রয়োজনীয়তা খোদাতায়ালা পূরণ করে দিয়েছেন। তিনি সন্তানও দান করেছেন এবং তাদের মধ্য থেকে এমন সন্তানও দান করেছেন যে দ্বীনের বাতি হবে। (তবে) নিকটতম সময়ে আরেকটি সন্তানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যার নাম মাহমুদ আহমদ হবে। যে আপনা মিশনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ চরিত্রের স্বাক্ষর রাখবে। সুতরাং এই (গোষ্ঠীর সাথে অর্থাৎ মুহাম্মদী বেগমের পরিবারের সাথে—অনুবাদক) আত্মীয়তার প্রস্তাব করা হয়েছে শুধুমাত্র (সেই) নিদর্শনটির জন্য। যাতে খোদাতালা এই গোষ্ঠীটির (আত্মীয়তার সম্পর্ক) অস্বীকারকারীদের স্বর্গীয় শক্তির বিরল এক দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করতে পারেন। নিবেদক, অধম গোলাম আহমদ গুরুদাসপুর উপজেলার কাদিয়ান থেকে। ১৫-জুলাই-১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে। (সূত্র: মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত ১/১৬০-৬২; নতুন ও অনলাইন এডিশন)।
স্ক্রিনশট
মির্যা সাহেবের উল্লিখিত বক্তব্যের সারমর্ম এই যে,
১- যদি তাদের মধ্যে (অর্থাৎ মুহাম্মদী বেগমের পরিবারের মধ্যে) সামান্যতম ঈমানের জ্যোতি এবং কানেকশন থাকত তাহলে(ও) তাদের সাথে আত্মীয়তার প্রস্তাব করার কোনোই প্রয়োজন ছিল না। ১০ ই জুলাই ১৮৮৮ সালে মির্যা সাহেব তৃতীয় বিয়ের প্রস্তাবের প্রয়োজনীয়তা যখন তুলে ধরছেন তখন নুসরাত জাহানের সাথে তার সংঘটিত বিয়ের বয়স ৪ বছর গত হতে চলল!
২- মির্যা সাহেব নুসরাত জাহান এর গর্ভ থেকে কতেক সন্তানপ্রাপ্তির কথাও জানান দেন। ততদিনে তার দুই সন্তানই জন্মেছিল, বশিরে আউয়াল এবং আছমত বিবি (সীরাতে মাহদী রেওয়ায়েত নং ৪৭০ দ্রষ্টব্য)। তিনি এখানে বশিরে আউয়াল সম্পর্কেই ‘দ্বীনের বাতি’ বলে আখ্যা দেন। যদিও তিনি সেই বছরেই মারা যান।
৩- মির্যা সাহেব এখানে দ্বিতীয় আরেকটি সন্তানের আগমনী সংবাদও উল্লেখ করেন। যার নাম রাখেন মাহমুদ আহমদ। তিনি তাকেই “মুসলেহ মওউদ” হিসেবে সম্বোধন করেন। কিন্তু এই মাহমুদ আহমদ এর সংবাদ দেয়ার পরপরই মির্যা মুহাম্মদী বেগমের পরিবারের সাথে আত্মীয়তার প্রসঙ্গটিও টেনে আনেন। যার ফলে নুসরাত জাহানের গর্ভে জন্ম নেয়া বশির উদ্দিন মাহমুদকে কথিত “মুসলেহ মওউদ” মনে করার আর কোনো সুযোগই থাকেনা। এই যে দেখুন মির্যা সাহেব কীভাবে কথাটি শেষ করে মুহাম্মদী বেগমের পরিবারের সাথে তার আত্মীয়তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য টেনে আনলেন! তিনি বলেন پس یہ رشتہ جسکی درخواست کی گئی ہے محض بطور نشان کے ہے تا خدا تعالی اس کنبہ کے منکرین کو اعجوبہ قدرت دکہلا دے۔ অর্থাৎ সুতরাং এই (গোষ্ঠীর সাথে অর্থাৎ মুহাম্মদী বেগমের পরিবারের সাথে—অনুবাদক) আত্মীয়তার প্রস্তাব করা হয়েছে শুধুমাত্র (সেই) নিদর্শনটির জন্য। যাতে খোদাতালা এই গোষ্ঠীটির (আত্মীয়তার সম্পর্ক) অস্বীকারকারীদের স্বর্গীয় শক্তির বিরল এক দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করতে পারেন।
জ্ঞানীদের নিশ্চয়ই এবার ভাবিয়ে তুলবে।
হয়ত আরও জানতে চাইবেন যে, আর কোথাও মুহাম্মদী বেগম সম্পর্কিত এ ধরনের কোনো কথার প্রমাণ আরও আছে কিনা?
উত্তরে বলব, জ্বী হ্যাঁ আছে। এই যে দেখুন, মির্যা কাদিয়ানী সাহেব তার তথাকথিত একটি ইলহাম يا آدم اسكن انت و زوجك الجنة . يا مريم اسكن انت و زوجك الجنة . يا احمد اسكن انت و زوجك الجنة এর তাৎপর্য উল্লেখ করে লিখেছেন, “বারাহীনে আহমদিয়া পুস্তকেও আজ থেকে (অর্থাৎ ১৯০০ সাল থেকে) ১৭ বছর পূর্বে ঐ ভবিষ্যৎবাণীর দিকেই ইংগিত রয়েছে যার রহস্য বর্তমানে আমার নিকট পরিষ্কার হয়ে গেছে। সেটি হল এই ইলহাম যা বারাহীনে আহমদিয়ার ৪৯৬ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে। এই ইলহামের মধ্যে ৩টি স্থানে زوج (সহধর্মিণী) শব্দ উল্লেখ আছে। আর ৩টি নাম (অর্থাৎ আদম, মরিয়ম এবং আহমদ) এই অধমেরই রাখা হয়েছে।………… এবং (বর্তমানে) তৃতীয় زوجہ (সহধর্মিণী) এর অপেক্ষায়। তার সাথে আহমদ নামকে শামিল করা হয়েছে। আর এই “আহমদ” শব্দটি ঐ কথার প্রতিই ইংগিত যে, ঐ সময় হামদ এবং প্রশংসা হবে। এটি একটি গুপ্ত ভবিষ্যৎবাণী।” (দ্বমীমায়ে রেসালায়ে আঞ্জামে আথহাম ৫৪, রূহানী খাযায়েন ১১/৩৩৮)।
স্ক্রিনশট
উপরের বক্তব্যটিতে মির্যা সাহেব দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, এই ইলহাম যা বারাহীনে আহমদিয়ার ৪৯৬ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে। এই ইলহামের মধ্যে ৩টি স্থানে زوج (সহধর্মিণী) শব্দ উল্লেখ আছে। আর ৩টি নাম (অর্থাৎ আদম, মরিয়ম এবং আহমদ) এই অধমেরই রাখা হয়েছে।………… এবং (বর্তমানে) তৃতীয় زوجہ (সহধর্মিণী) এর অপেক্ষায়। মির্যা সাহেব কিন্তু তৃতীয় সহধর্মিণীর সাথে বিয়ের অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তখনও যখন ১৯০০ সাল প্রায় শেষের দিকে গড়িয়ে গেছে। তা এজন্যই যে, মির্যা সাহেবের কথিত মুসলেহ মওউদ তার এই তৃতীয় সহধর্মিণীর গর্ভ থেকেই হবেন বলেই তিনি ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে রেখেছেন। আর তার সেই ভবিষ্যৎবাণীটি ১৮৯৬ সালে রচিত ‘দ্বমীমায়ে রেসালায়ে আঞ্জামে আথহাম’ (উর্দু) এর ৫৩ নং পৃষ্ঠায় কিভাবে বর্ণিত আছে তা উপরে নিশ্চয়ই পড়েছেন। প্রয়োজনে আবার পড়ে দেখুন। আমি আবারও বলছি, মির্যা সাহেব রাসূল (সা:)-এর হাদীসের উদ্ধৃতিতে মুহাম্মদী বেগমের সাথে তার বিয়ের প্রয়োজনীয়তাকে আশ্রয় করে ‘দ্বমীমায়ে রেসালায়ে আঞ্জামে আথহাম’ নামক পুস্তকে “মুসলেহ মওউদ” সংক্রান্ত ভবিষ্যৎবাণীটির পুনরাবৃত্তি যখন করছিলেন তখন মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এর বয়স ৮ বছর চলছে । সুতরাং এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদকে কথিত মুসলেহ মওউদ হিসেবে কাদিয়ানী লাহোরি মুভমেন্টও কেন স্বীকার করেননা!
মুহাম্মদী বেগম কে ছিলেন? তার সাথে মির্যা কাদিয়ানীর কী এমন ঘটেছিল? সম্পূর্ণ ঘটনা মির্যায়ী রচনা হতে তুলে ধরছি :
মুহাম্মদী বেগম :
মুহাম্মদী বেগম ছিলেন মির্যা কাদিয়ানীর এক নিকট আত্মীয়া এবং তার পুত্র ফজলে আহমদ এর চাচাত শালি হিসেবে মির্যার ঝিয়ারিও বলা যায় (মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত ১/২২১)। পিতা আহমদ বেগ। স্বামী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সুলতান মুহাম্মদ। মির্যার দাবী, খোদাতায়ালা নাকি তাকে ওহীর মাধ্যমে জানিয়েছেন, তার সাথে মুহাম্মদী বেগমের বিবাহ হবেই হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যদি মুহাম্মদী বেগমের বিবাহ কোনো কারণে অন্য কারো সাথে হয়েও যায়, খোদাতায়ালা তাঁকে বিধবা করে হলেও মির্যাকে ফিরিয়ে দেবেন। খোদাতায়ালার এই কথায় কোনো পরিবর্তন হবেনা। কিন্তু পরের ইতিহাস সবার জানা। মির্যা সাহেব ২৬-০৫-১৯০৮ ইং কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ওদিকে মুহাম্মদী বেগম তখনো স্বামীর সংসারেই ছিলেন, এমনকি মির্যার মৃত্যুর পরেও আরো প্রায় ৪০ বছর স্বামীর সংসার করেন। স্বামী সুলতান মুহাম্মদের মৃত্যু হয় ১৯৪৯ সালে আর মুহাম্মদী বেগম ১৯ শে নভেম্বর ১৯৬৬ সালে লাহোরে মৃত্যুবরণ করেন। তাদের আমৃত্যু সংসার-জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মির্যা কাদিয়ানীকে মিথ্যাবাদী প্রমাণে যথেষ্ট ছিল।
মির্যা কাদিয়ানীর সাথে মুহাম্মদী বেগমের বিয়ে না হওয়ায় তাদের পরবর্তী রচনাবলীতে অপব্যাখ্যা আর স্ববিরোধ বক্তব্যের তুফান ঘটানোর দৃষ্টান্ত :
কাদিয়ানীদের উর্দূ ভাষার দৈনিক পত্রিকা ‘আল-ফজল’ ০২-০৮-১৯২৪ ইং এর ২২ নং পাতায় মির্যা বশির উদ্দীন মাহমুদের উদ্ধৃতিতে লিখা আছে ‘হযরতের সাথে ওই মেয়েটির বিবাহ হওয়া মর্মে আল্লাহতায়ালার কোনোই ওয়াদা ছিলনা।’
স্ক্রিনশট >> দৈনিক আল-ফজল’ ০২-০৮-১৯২৪ ইং এর ২২ নং পাতা
এবার তাদের উর্দূ ভাষার আরেকটি দৈনিক পত্রিকা ‘আল-হিকাম’ ৩০-০৬-১৯০৫ ইং এর মধ্যে কী লিখা আছে দেখুন : “ইলহামে ইলাহীর শব্দটি হল, ছা-ইয়াকফীকা হুমুল্লাহু ওয়া ইউরাদ্দূ-হা ইলাইকা অর্থাৎ খোদা তোমার ঐ সমস্ত বিরুদ্ধবাদীদের মুকাবিলা করবেন এবং দ্বিতীয় কোথাও যার বিয়ে হয়ে গেছে খোদা তাকে তোমার নিকট ফিরিয়ে এনে দেবেন।”
স্ক্রিনশট >> দৈনিক ‘আল-হিকাম’ ৩০-০৬-১৯০৫ ইং
এবার তাদের ‘মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত’ পুস্তকে কী লিখা আছে দেখুন: ‘খোদাতায়ালা বলেছেন আমি এ মহিলাকে তার বিবাহের পর তার (অর্থাৎ মির্যা কাদিয়ানীর) নিকট ফিরিয়ে আনব।’ সূত্র : মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত ২/৪৩ নতুন এডিশন।
স্ক্রিনশট
এই তো গেল তাদের পিতা-পুত্রের স্ববিরোধ কথাবার্তার একটি প্রমাণ। এবার মির্যাকে বাঁচাতে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম কাদিয়ানী নেতারা সেটির কেমন উদ্ভট তাবীল (ব্যাখ্যা) দাঁড় করল নিচে দেখুন!
“ভবিষ্যৎবাণীতে উল্লিখিত কুমারী ও বিধবা উভয় অংশই তাঁর সহধর্মীনি হযরত নুসরত জাহান বেগম এর মধ্যমেই পূর্ণ হবার ছিল এবং সেভাবেই হয়েছে। অর্থাৎ তিনি কুমারী অবস্থায় তাঁর স্ত্রী হয়ে আসবেন এবং স্বামীর মৃত্যুতে বিধবা অবস্থায় রয়ে যাবেন।”
এই তাবীলটি তাদের অন্যতম প্রধান মুরুব্বী জালালুদ্দীন শামস সাহেবেরও। সংক্ষেপে।
পরিশেষে অবশিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর হল, মির্যা সাহেবের সাথে মুহাম্মদী বেগমের বিয়ে না হওয়ায় সেই কথিত মুসলেহ মওউদ এর আদৌ জন্ম হয়নি বলেই মানতে হবে। একই কারণে কেয়ামতের পূর্বে তার কখনো জন্ম হওয়ারও সুযোগ নেই। অতএব, যাদের বিবেক রয়েছে তারা বিবেক দিয়ে চিন্তা করবে, এই প্রত্যাশায় আজকের মত এখানেই শেষ করছি। ওয়াস-সালাম।
লিখক ও গবেষক প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী। তারিখ ২২.০২.২০২১ইং
মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (১৮৪০-১৯০৮) মহান আল্লাহ তায়ালার নাম ভেঙ্গে ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে লিখেছেন “আল্লাহতালা আমাকে সুস্পষ্ট শব্দে জানিয়ে দিয়েছেন যে তোমার বয়স ৮০ (আশি) বছর হবে। এতে ৫ অথবা ৬ বছর কম হবে বা বেশি হবে।” (রূহানী খাযায়েন ২১/২৫৮)।
তিনি তার নিজের জন্ম তারিখ সম্পর্কেও লিখে গেছেন। তিনি লিখেছেন, “আমি ১৮৩৯ অথবা ১৮৪০ সালে শিখদের আখেরি ওয়াক্তে জন্ম লাভ করেছি। আর আমি ১৮৫৭ সালে ১৬ অথবা ১৭ বছর বয়সী ছিলাম।” (রূহানী খাযায়েন ১৩/১৭৭)।
(প্রামাণ্য স্ক্যানকপি উপরে দেখুন)
প্রশ্ন করা যেতে পারে যে, মির্যা কাদিয়ানীর ভবিষ্যৎবাণী মিথ্যা সাব্যস্ত হল কিভাবে?
উত্তরে বলা হবে যে, মির্যা কাদিয়ানী তার উক্ত ভবিষ্যৎবাণী অনুসারে (৬৯+৬) ৭৫ বছর বয়সে অথবা (৬৯-৬) ৬৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করার কথা। কিন্তু তিনি মৃত্যুবরণ করেন (১৯০৮-১৮৩৯) ৬৯ বছর বয়সে।
মির্যা কাদিয়ানী সাহেব কিন্তু একথাও লিখে গেছেন যে, “যদি প্রমাণিত হয়ে যায় যে, আমার শত শত ভবিষ্যৎবাণী হতে কোনো একটিও মিথ্যা, তাহলে আমি স্বীকার করে নেব যে, আমি একজন মিথ্যাবাদী।”
রূহানী খাযায়েন খন্ড নং ১৮ পৃষ্ঠা নং ৪৬১।
হে আল্লাহ! তুমি এখনো যাদের অন্তরে মোহর মেরে দাওনি তারা যেন মৃত্যুর আগে আগে হিদায়াতের অমূল্য সম্পদ ঈমান থেকে বঞ্চিত হয়ে না যায়! তাদেরকে তুমি সঠিক চিন্তাশক্তি দান কর।
দিন কতেক পূর্বে “বাইবেল” এর এই উদ্ধৃতিটি যখন ইমেজ আকারে পোস্ট করেছিলাম তখন কাদিয়ানীবন্ধুদের অনেকে আমাকে কটাক্ষ করে বলেছিল ‘তুই মোল্লা একটা মিথ্যাবাদী’! তাই এখন সরাসরি স্ক্রিনশট থেকে তুলে দিলাম। যারা বাইবেলকে কুরআন হাদীসের বাহিরেও অন্যতম একটি প্রামাণিক সোর্স হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন তাদের জন্য উচিত হবেনা এর কিছু অংশ বিশ্বাস করা আর কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করা। সে হিসেবে বাইবেল এর এই জায়গাটিতে (মথি ২৪:৪-৫) যে কথাটি লিখা আছে সে সম্পর্কে অন্ততপক্ষে বাইবেল প্রেমি আহমদীবন্ধুদের নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলবে! অর্থাৎ মির্যা কাদিয়ানী সাহেবের “রূপক ঈসা” দাবীটা বাইবেলের এই উক্তি দ্বারা মানুষকে ‘ঠকানো’ বৈ আর কিছুই না প্রমাণ করবে! ফেইসবুকে পড়ুুন
এর উত্তরে যীশু তাদের বললেন, ‘দেখো! কেউ যেন তোমাদের না ঠকায়৷ (মথি 24:4)।
5 আমি তোমাদের একথা বলছি কারণ অনেকে আমার নামে আসবে আর তারা বলবে, ‘আমি খ্রীষ্ট৷’ আর তারা অনেক লোককে ঠকাবে৷ (মথি 24:5)।
প্রশ্ন :- “ওয়ামা ছালাবূহু” (০৪:১৫৭) এর প্রকৃত মর্মার্থ কী? তাত্ত্বিক ও যুক্তিকভাবে বুঝিয়ে দেবেন! আরো জানতে চাই যে, “ঈসার মৃত্যু নিশ্চিত করার পরে শূলী থেকে নামানো” বিশ্বাস কাদের?
জবাব :- আপনার প্রশ্নের মূল জবাবে একটু পরেই যাচ্ছি। প্রথমে জেনে নিন যে, পবিত্র কুরআনের ভাষায় : ইহুদীদের অন্যতম দাবী এই ছিল “আমরা মরিয়ম পুত্র ঈসাকে হত্যা করেছি”। ব্যস, তাদের দাবী এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ। এখন আল্লাহতালা তাদের দাবী খন্ডন করলেন কিভাবে তা জানা প্রয়োজন এবং বুঝাও প্রয়োজন!
খন্ডন :-
আল্লাহতালা তাদের উক্ত দাবী খন্ডন করতে গিয়ে ২টি শব্দ উল্লেখ করেছেন। (১) “তারা তাঁকে হত্যা করেনি।” তার মানে ইহুদীদের দাবীর খন্ডন হয়ে গেল। তারপরেই আল্লাহ বলছেন (২) “তারা তাঁকে শূলেও চড়ায়নি।” এখন ভাবনা জন্ম দেয় যে, ইহুদীদের দাবী তো শুধুই ১টি ছিল। অথচ আল্লাহতালা সেটির খন্ডন করেই পুনরায় বলছেন “তারা তাঁকে শূলেও চড়ায়নি।” এর রহস্য কী?
এর রহস্যের জট খুলতে চাইলে সূরা মায়েদার ১১০ নং আয়াতটি পড়ুন। আপনি দেখতে পাবেন যে, ঈসাকে হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের সম্পর্কে সেখানে পরিষ্কার শব্দে “কাফাফতু বনী ইসরাইলা আনকা অর্থাৎ তখন আমি [আল্লাহ] বনী ইসরাইলকে তোমা থেকে নিবৃত্ত রেখেছিলাম” উল্লেখ আছে।
খ্রিস্টানদের কিতাবেও পবিত্র কুরআনের উক্ত বক্তব্যের সমর্থনে পাওয়া যায় যে, ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার আগের দিন যীশু (আ:) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হওয়া থেকে ইহুদীদের কাছ থেকে রক্ষা করার জন্য (ম্যাথু ২৬:৩৯)। এবার তো পুরোই পরিষ্কার হয়ে গেল যে, ইহুদীরা ঈসাকে শূলে চড়াবে তো দূরে থাক, তারা বরং তাঁর কাছেও ঘেষতে পারেনি।
ফলাফল দাঁড়াল এই যে, ঈসা (আ:)-কে ইহুদীরা ‘শূলে না চড়ানো’ ব্যাপারটিও সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। তাই প্রশ্ন আগের মতই থেকে যাচ্ছে যে, তথাপি ইহুদীদের দাবীর খন্ডনে আল্লাহতালা “ওয়ামা ছালাবূহু” কেন বললেন?
এর জবাব হল, সেই সময়কার নিয়ম ছিল “মিথ্যাবাদী ও ভন্ড প্রতারক” শ্রেণীর অপরাধীদের হত্যার পর শূলে চড়িয়ে রাখা হত। ইহুদীরা ঈসা (আ:)-কে যেহেতু মিথ্যাবাদী ও প্রতারক আখ্যা দিত, তাই তারা তাঁকে হত্যা করতে যখনি জমায়েত হল তখনি আল্লাহতালা তাঁর থেকে ইহুদীদের নিবৃত রাখলেন এবং আকাশে উঠিয়ে নিলেন।
ঘটনাক্রমে ইহুদীরা ঈসা (আ:)-এর সাদৃশ্যপূর্ণ নিজেদেরই যে লোকটিকে শূলে চড়িয়েছিল সেই লোকটিকে তারা প্রকৃতপক্ষে ঈসা-ই ধারণা করেছিল। আল্লাহতালা পরের অংশে ইহুদীদের এ ধারণাকেও খন্ডন করে দিতে বলেছেন “ওয়ামা ছালাবূহু” (তাফসীরে জালালাইন)। তার মানে “তারা ঈসাকে হত্যা তো করেইনি, তাঁর মৃত্যুকে ‘অভিশপ্ত’ সাব্যস্ত করার অসৎ উদ্দেশ্যে শূলিতেও ঝুলিয়ে রাখতে পারেনি।”
তাহলে তাঁকে কী করা হয়েছিল? সোজা উত্তর – “ওয়ালাকিন শুব্বিয়া লাহুম অর্থাৎ কিন্তু তাদের (কোনো একজনকে ঈসার সাদৃশ্য করে দেয়ার ফলে) বিভ্রম হয়েছিল।”
তাদের বিভ্রম হওয়ার প্রেক্ষিতে বাস্তব ঘটনার স্বরূপ :-
এরূপ বিভ্রম হওয়ার ফলে তদানীন্তন ইহুদ এবং খ্রিষ্টানরাও ঈসার ব্যাপারে মতভেদে জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি পবিত্র কুরআনেও নিম্নরূপ এসেছে। আল্লাহতালা ফরমান : “যারা তার সম্বন্ধে মতভেদ করেছিল তারা নিশ্চয় এ সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল; এ সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোনো জ্ঞানই ছিলনা। এটি নিশ্চিত যে, তারা তাঁকে হত্যা করে নাই। (তারপর আল্লাহতালা আরো ফরমান) “বাল রাফা’আহুল্লাহু ইলাইহি” তথা বরং আল্লাহ তাঁকে তাঁর নিজের নিকট [আকাশে] তুলিয়ে নিয়েছেন। (বিস্তারিত তাফসীরের কিতাবে দেখে নিন)।
তবে এখানে যারা মনে করেন যে, “ছালাব” অর্থ – শূলিবিদ্ধ করে হত্যা করা, তাদের উদ্দেশ্যেই আমি সব সময় উত্তরে বলি যে, আপনার কথা ধরে নিলেও এটাই সাব্যস্ত হবে যে, ঈসাকে শূলেচড়ানো হয়নি। কারণ, “শূলিতে ঝুলানো+হত্যা করা” দুটোই কিন্তু আল্লাহতালা “ওয়া-মা” শব্দ দ্বারা খন্ডন করে দিয়েছেন।
এখন আপনি যদি দাবী করেন যে, ঈসাকে “শূলে ঝুলানো” হয়েছিল কিন্তু তিনি “হত্যা” হননি। উত্তরে বলা হবে যে, আপনার এ দাবী অবান্তর। কারণ, শূলে ঝুলিয়ে রাখার পূর্বে মৃত্যু নিশ্চিত করা যেখানে নিয়ম রয়েছে, সেখানে আপনাকে বিশ্বাস করতে হলে দুটোকেই এক সঙ্গে বিশ্বাস করতে হবে। অথচ আল্লাহতালা “ওয়া-মা” শব্দ দ্বারা পুরো ব্যাপারটিকেই খন্ডন করতে চেয়েছেন!! এ সূক্ষ্ম ব্যাপারটি আপনাদের ভাবিয়ে তুলেনা কেন?
“ঈসাকে মৃত্যু নিশ্চিত করার পরে শূলী থেকে নামানো হয়” এ বিশ্বাস কাদের? দেখে নিই ইতিহাস কী বলে?
ইদানীংকাল ওরা (কাদিয়ানিরা) ঘটা করে প্রচার করে চলেছে যে, ঈসা (আ:) জীবিত থাকা সম্পর্কিত মুসলমানদের বিশ্বাস নাকি খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস থেকে এসেছে। নাউজুবিল্লা। শুনে অবাক হবেন যে, ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। অর্থাৎ ইহুদ এবং খ্রিষ্টান উভয়ের বিশ্বাস মতে, ঈসাকে শূলিবিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু শুধুমাত্র খ্রিষ্টানরা একটু ব্যতিক্রম বিশ্বাস করে যে, “ঈসাকে শূলিবিদ্ধ করার পর ইহুদী কর্তৃক তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে শূলি থেকে তাঁকে নামানো হয়। পরে আল্লাহতালা তাঁকে কয়েক ঘন্টা পরে পুনরায় জীবিত করে আকাশে উঠিয়ে নেন।” অপ্রিয় হলেও সত্য, আহমদী তথা কাদিয়ানিদের যেই মতবাদ সেটি ইহুদীদের সাথে পুরোপুরি এবং খ্রিষ্টান জাতির সাথে আংশিক মিলে যায়। বাংলায় প্রবাদ আছে – উল্টো চমকিলেরে রাম!!
আমি আহমদী তথা কাদিয়ানীদের নিকট প্রশ্ন রাখতে চাই যে, মুসলমানদেরও বিশ্বাস কি এরূপ? অবশ্যই না। বরং মুসলমানদের বিশ্বাস হচ্ছে, “ইহুদীরা ঈসা (আ:)-কে শূলিবিদ্ধ করবে তো দূরে থাক, তারা তাঁর কাছেও ঘেষতে পারেনি। আল্লাহতালা তাঁকে নিরাপদে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন।”
শুনে আরো অবাক হবেন, ইতিহাস পড়লে বুঝা যায় যে, হযরত ঈসা (আ:) ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পরেও পুনরায় জীবন লাভ করা – এটি আঠার এবং উনিশ শতকের খ্রিস্টান যাজকদের আবিষ্কৃত, যা swoon hypothesis নামে পরিচিত। তার প্রথম ধারণা দেন খ্রিষ্টান যাজক কার্ল ফ্রেডরিচ বার্ডট (Karl Friedrich Bahrdt)। যিনি ছিলেন unorthodox German biblical scholar, theologian, and polemicist.
মির্যা কাদিয়ানী সাহেবের জন্মের আগেই সারা দুনিয়ার খ্রিষ্টানদের এ ক্রুশিয় ধারণা দিয়ে গেছেন খ্রিস্টান পণ্ডিতগণ। বিশ্বাস না হলে আপনি গুগল সার্চ দিয়ে দেখুন। যে বাইবেল থেকে এ ধারণা তৈরি হয়েছে সেই বাইবেল থেকে-ই দেখা যায় “ঈসা (আঃ)-এর মৃত্যু নিশ্চিত করার পর তাঁকে ক্রুশ থেকে নামানো হয়েছে।” নাউজুবিল্লা।
এখন চিন্তা করে বলুন- বর্তমান দুনিয়ার কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের সাথে খ্রিষ্টানদের উক্ত আকিদার হুবহু মিল পাওয়া যাচ্ছে কিনা? তাই উদরপিণ্ডি বুদোড় ঘাড়ে না চাপিয়ে শেষবারের মত আরেকবার ভেবে দেখুন- কোথাকার জল কোথায় ঢালছেন?
মির্যা কাদিয়ানীর বইতে বাইবেলের বক্তব্যকে বিকৃত করে উদ্ধৃত করার ডকুমেন্টারি প্রমাণ
মির্যা কাদিয়ানীর উদ্ধৃতি : তৌরাতে লিখা আছে, “নবুওয়তের মিথ্যা দাবিদার ক্রুশবিদ্ধ ও অভিশপ্ত হয় আর সত্য নবীদের মত আল্লাহর দিকে তার রাফা হয়না”—এটি বাইবেলের পুরাতন নিয়মের (২১:২৩) ঐ উক্তিতে ক্ষুনাক্ষরেও উল্লেখ নেই। বরং বাইবেলের সেই উক্তি অনুসারে যেটি বুঝা যাচ্ছে তা হল, মৃত্যুদণ্ড যেভাবেই হোক, ক্রুশে হতে হবে এটা আবশ্যক নয়; এমন যে কোনো ব্যক্তির মৃতদেহ, সে নবী কিবা গয়ের নবী যে কেউ হতে পারে, যদি কবর না দিয়ে সারা রাত ধরে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয় তবে সে লোকটি ঈশ্বরের দ্বারা অভিশপ্ত বলে বিবেচিত হবে। বাইবেলের বক্তব্যটির প্রতিপাদ্য বিষয় হল “মৃতদেহ” গাছে ঝুলিয়ে রাখা।
বাইবেল পুরাতন নিয়ম (তৌরাত) এর ভাষ্যটি এই “তোমরা সারা রাত ধরে সেই মৃতদেহকে গাছে ঝুলিয়ে রেখো না কিন্তু নিশ্চিতভাবে সেই একই দিনে সেই ব্যক্তিকে কবর দিও। কেন? কারণ গাছে ঝোলানো সেই লোকটি ঈশ্বরের দ্বারা অভিশপ্ত। প্রভু তোমাদের ঈশ্বর, তোমাদের যে দেশ দিচ্ছেন সেই দেশকে তোমরা কখনই অশুচি করবে না।” (বাইবেল পুরাতন নিয়ম, দ্বিতীয় বিবরণ 21:23)।
এখন কাদিয়ানীদের নিকট বাইবেলের এ বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হলে তখন তো তাদেরকেও খ্রিস্টানদের ন্যায় বিশ্বাস করতে হয় যে, সেই ক্রুশীয় ঘটনাকালেই ঈসা (আ:) মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এমতাবস্থায় কাদিয়ানীদের জন্য একথা দাবী করার আর কোনো সুযোগ থাকেনি যে, তিনি (আ:) সেই সময় জেরুজালেম ছেড়ে গোপনে কাশ্মীর পালিয়ে গিয়েছিলেন!!
আফসোস! আফসোস!!
“বাইবেল” এর পুরাতন নিয়ম এর বক্তব্যটির কত জঘন্য বিকৃতি ঘটিয়ে মির্যা কাদিয়ানী সাহেব গোটা দুনিয়াকে কত হীন কায়দায়, কত সূক্ষ্মভাবে ধোকা দিয়ে ললিপপ খাওয়াতে চেয়েছিলেন তা নিচের স্ক্যানকপি থেকে দেখুন।
নিচে মির্যার লেখিত “হামামাতুল বুশরা” (বাংলা অনূদিত) পৃষ্ঠা নং ৬৩ এর স্ক্রিনশট (ডানে) এবং খ্রিস্টানদের বাইবেল এর পুরাতন নিয়ম তথা তৌরাতের স্ক্যানকপি (বামে) তুলে ধরলাম। যাদের সত্য গ্রহণ করার সদিচ্ছা রয়েছে তারা নিশ্চয়ই এই নিকৃষ্ট মিথ্যাবাদী থেকে জান ছুটাতে আজই সিদ্ধান্ত নেবেন!!
হাদীসটির তাহকিক, শায়খ আলবানী (রহ.) লিখেছেন, এর সনদ খুবই যঈফ বা দুর্বল। (আস-সিলসিলাতুয য’ঈফাহ, নং ১৯৩৬; আলবানী রহ.)। Click
আমার কলিজার আহমদীবন্ধুরা! ‘শেষ যুগের নিকৃষ্ট আলেম’ সম্পর্কিত বর্ণনাটির সনদ (ধারাবাহিক বর্ণনা-সূত্র/Chain of narration) যে খুবই দূর্বল; ফলে এর কথাগুলো রাসূল (সা:) থেকে হওয়াটা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়—এ কথাগুলো কাদিয়ানী-নেতারা আপনাদেরকে কখনোই বলবেনা। কেন জানেন? যদি ওরা এটি বলতেন তাহলে আপনাদেরকে হক্কানী উলামায়ে কেরামের সংশ্রব থেকে কোনোভাবেই দূরে রেখে ধোকা দিতে পারতো না।
অধিকন্তু উলামায়ে কেরাম এর মর্যাদা সম্পর্কে আরো যেসব সহীহ সূত্রে বর্ণনা অগণিত হাদীসগ্রন্থে রয়েছে তারা জীবন চলে গেলেও আপনাদেরকে সেগুলো বলবেনা! এ দেখুন, হাক্কানী উলামায়ে কেরাম সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রাসুল (সাঃ) কত সুন্দর কথা বলে গেছেন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন,
انما يخسى الله من عباده العلماء
অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালাকে তার বান্দাদের মধ্যে আলেমরাই বেশী ভয় করে। (সুরা ফাতির আয়াত ২৮)।
অর্থাৎ কাসীর বিন ক্বায়স (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি দিমাশক-এর মাসজিদে আবুদ দারদা (রা:)-এর সাথে বসা ছিলাম, এমন সময় তার নিকট একজন লোক এসে বললো, হে আবুদ দারদা! আমি রাসূল (সা:)-এর শহর মদীনাহ থেকে শুধু একটি হাদীস জানার জন্য আপনার কাছে এসেছি। আমি শুনেছি আপনি নাকি রাসূল (সা:) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এছাড়া আর কোনো উদ্দেশে আমি আপনার কাছে আসিনি।
তার এ কথা শুনে আবুদ দারদা (রা:) বললেন, রাসূল (সা:)-কে আমি এ কথা বলতে শুনেছি, তিনি (সা:) বলেছেন, যে ব্যক্তি (কুরআন ও হাদীসের) ইলম সন্ধানের উদ্দেশ্যে কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাতের পথসমূহের একটি পথে পৌঁছিয়ে দিবেন এবং ফেরেশতারা ইলম অনুসন্ধানকারীর সন্তুষ্টি এবং পথে তার আরামের জন্য তাদের পালক বা ডানা বিছিয়ে দেন। অতঃপর আলিমদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকলেই আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা ও দু‘আ করে থাকেন, এমনকি পানির মাছসমূহও (ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে)। আলিমদের মর্যাদা মূর্খ-ইবাদাতকারীর চেয়ে অনেক বেশী। যেমন পূর্ণিমা চাঁদের মর্যাদা তারকারাজির উপর এবং আলিমগণ হচ্ছেন নবীদের ওয়ারিস। নবীগণ কোনো দীনার বা দিরহাম (ধন-সম্পদ) মীরাস (উত্তরাধিকারী) হিসেবে রেখে যান না। তাঁরা মীরাস হিসেবে রেখে যান শুধু ইলম। তাই যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করেছে সে পূর্ণ অংশগ্রহণ করেছে। (আহমাদ, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনু মাজাহ্ ও দারিমী)। রেফারেন্স, মেশকাত শরীফ , কিতাবুল ইলম হা/২১২ দ্রষ্টব্য। হাদীসের মান, সহীহ।
(খ) নবী কারীম (সা:) আরো এরশাদ করেছেন : فضل العالم علي العابد كفضلي علي ادناكم অর্থাৎ একজন আলেমের মর্যাদা একজন সাধারণ ইবাদত কারীর উপর, তোমাদের একজন সাধারণ ব্যক্তির উপর আমার মর্যাদার ন্যায়। (তিরমিজি শরিফ ২৬৮৬)।
(গ) নবী কারীম (সা:) আরও এরশাদ করেছেন,
ان العلماء ورثة الانبياء وانا لانبياء لم يو رثو دينارا و لا درهما و انما ورثو العلم
অর্থাৎ নিশ্চয় আলেমগণ নবীগণের ওয়ারিশ আর নবীগণ কখনো দিনার দিরহামের ওয়ারিস বানান না, তারা দ্বীনি শিক্ষার ওয়ারিস বানান। (মুসনাদে আহমাদ ২১৭১৫, সহীহ বুখারি ১/২৪, সুনানে আবু দাউদ ৩৬৪৯)।
(ঘ) হাদিস শরিফে হযরত আবু দারদা ও ইবনে মাসউদ (রা:) থেকে আরও বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা:) বলেছেন,
كن عالما او متعلما اومحبا اومتبعا و لا تكن الخامس فتهلك۔ قال قلت للحسن من الخامس قال المبتدع
অর্থাৎ তুমি আলেম হও। নয়তো আলেমেরছাত্র হও। নয়তো আলেমকে মহব্বতকারী হও। নয়তো আলেমের অনুসারী হও, পঞ্চম ব্যক্তি হয়োনা। তাহলে তোমার ধংস অনিবার্য। হাদিসে বর্ণিত হযরত হাসান (রহ:)-কে জিজ্ঞাসা করা হল, পঞ্চম ব্যক্তি কে? তিনি বলেন পঞ্চম ব্যাক্তি হচ্ছে বিদআতি। (আল ইবানাহ ইবনে বাত্তাহ হাদিস ২১০ আল মাদখাল বায়হাকি, হাদিস ৩৮১ জামিউ বায়ানিল ইলম ইবনু আব্দ বার হাদিস ১৪২)।
(ঙ) সুনানে দারেমীর ৩৭০ নং হাদিসে আরো এসেছে, রাসূল (সা:) বলেছেন, ওয়াইন্না খাইরাল খিয়ারি খিয়ারুল উলামা। অর্থাৎ এবং নিশ্চয় আলেমরাই সর্বশ্রেষ্ট মর্যাদার অধিকারী।
কিন্তু তারা (কাদিয়ানী পন্ডিতরা) আপনাদেরকে মগজ ধোলাই দিয়ে মনঃস্তাত্ত্বিকভাবে আজ যেমন নির্বোধ বানিয়ে রেখেছেন, যে কোনো ভাবেই সত্য উন্মোচন হয়ে গেলে তাদেরকে চাঁদা দেয়া বন্ধ করে দিতে পারেন এই আশংকায় ইসলামী স্কলার ও বিজ্ঞ আলেমের সংশ্রব থেকেও দূরে রাখতে হরহামেশা আপনাদের মন-মগজে তাদের ব্যাপারে যেই বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, তা কখনোই সম্ভব হতনা। তারা খুব ভালো করেই জানেন যে, তাদের সমুদয় প্রতারণাপূর্ণ কথাবার্তা, তাবিলাত, রূপকের কাসুন্দি সবই ধরা পড়ে যাবে; যদি আপনারা বিজ্ঞ আলেমদের সাথে এসব নিয়ে কথা বলতে আসেন!
হাদীসটির বর্ণনা-প্রসঙ্গ ও সার্বিক বিচারের আলোকে যা বুঝা যায় :
উল্লিখিত বর্ণনাটির কথাগুলো সার্বিক বিচারে পরিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এর কথাগুলো হযরত ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের পূর্বেকার সময়ের সাথেই সম্পর্কিত, পরবর্তীতে তাঁর মাধ্যমেই এর আমূল-পরিবর্তন সাধিত হতে থাকবে, ইনশাআল্লাহ। যেমন হাদীসে এসেছে, ইমাম মাহদীর যুগে সারা দুনিয়ায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। জুলুম নিপীড়ন এমনভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে যেভাবে ইতিপূর্বে তাতে সারা দুনিয়া ভরপুর হয়ে গিয়েছিল (দেখুন, ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতান হাদীস নং ৪০৭৭; হাদীসের মান – সহীহ) ।
খুব খেয়াল করুন, হাদীসটিতে শেষ যুগের বর্ণনা দিতে গিয়ে নিকৃষ্ট আলেম সম্পর্কিত কথাটির আগে আরও ৩টি কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
১. নাম ব্যতীত ইসলামের কিছুই অবশিষ্ট থাকবেনা।
২. তখন পবিত্র কুরআনের শুধুই অক্ষরগুলো অবশিষ্ট থাকবে, যার তাৎপর্য হল কুরআনের কোনো আইন কানূন (শাসন-ব্যবস্থা)ই সমাজে প্রতিষ্ঠিত থাকবে না।
৩. বাহ্যিকভাবে মসজিদগুলো ঝলমল করতে থাকবে কিন্তু হিদায়াত শূন্য পড়ে থাকবে।
উপরের কথাগুলোর পরেই এসেছে ‘তখন (সেই যুগের) তাদের (এক শ্রেনীর) আলেমরা আকাশের নীচে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট লোক হবে।
সুতরাং কাদিয়ানীদের জেনে রাখা জরুরি যে, তারা এ বর্ণনাটি খুব বেশি প্রচার-প্রসার করে প্রকারান্তরে নিজেরাই প্রমাণ করল যে, অন্তত এর দ্বারাও সাব্যস্ত হচ্ছে যে, প্রকৃত ইমাম মাহদীর আগমন এখনো বাকি! যেজন্য মির্যা কাদিয়ানীর ইমাম মাহদী দাবীও সঠিক নয়। কেননা, উক্ত বর্ণনার কথাগুলো নিয়ে চিন্তা করলে যে কেউই বুঝতে পারবে যে, এর সবই এ যুগেও আমরা আমাদের চোখের সামনে প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান দেখতে পাচ্ছি। যা আমাদের ডেকে ডেকে বলছে যে, ওহে জ্ঞানীরা! দুনিয়ার বিচক্ষণ ও সত্যানুসন্ধিৎসুরা! একটু ভেবে দেখো! ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের সময় ঘনিয়ে আসছে মাত্র। তার আগমনের পূর্ব যুগ-লক্ষণগুলো সবে মাত্র একেক করে পূর্ণতা পেতে চলেছে। তাই আজ থেকে আরো প্রায় ১৩০ বছর আগেই ইমাম মাহদী দাবীকারী ব্রিটিশ সরকারের রোপিত চারাগাছ খ্যাত মির্যা কাদিয়ানী (মৃত. ১৯০৮ইং) একজন মিথ্যাবাদী! নইলে সূর্য আকাশে উদিত হবে অথচ দুনিয়া অন্ধকারে ভাসবে, এটি হয় কিভাবে?? অতএব চিন্তা করে দেখো!
আল্লাহ আমাদেরকে বুঝার এবং চিন্তা করার তাওফিক দিন। আমীন।
প্রশ্নকর্তা : একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, এই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হতে চেয়ে প্রার্থনা করেছিলেন হযরত মূসা (আ:) কিন্তু আমাদের সমাজে হযরত ঈসা (আ:) সম্পর্কেও প্রচলিত আছে যে, তিনিও নাকি একই ধরণের প্রার্থনা করেছিলেন এবং আল্লাহ তায়ালা সেই প্রার্থনা কবুলও করেছেন!? এ সম্পর্কে দলিল সহ জানতে চাই!
উত্তরদাতা :
(ক)
প্রশ্নকারী যদি কোনো আহমদী তথা কাদিয়ানী হন তাহলে তাকে সবিনয়ে জানিয়ে দিতে চাই যে, ঈসা (আ:) নবী হিসেবে নয় বরং “উম্মত” হিসেবে আসবেন একথা স্বয়ং মির্যা কাদিয়ানীও লিখে গেছেন। যেমন তিনি লিখেছেন : ‘আনে ওয়ালে মসীহ কেলিয়ে হামারে সাইয়েদ ওয়া মওলা নে নবুওয়ত শর্ত নিহি ঠেহরায়ি (উর্দূ)
آنیوالے مسیح کے لیے ہمارے سید و مولا نے نبوت شرط نہیں ٹہرائ
অর্থাৎ আগমনকারী মসীহ’র জন্য আমাদের নবী করীম (সা:) নবুওয়ত শর্ত করেননি। (মির্যা কাদিয়ানীর ৮৩টি বইয়ের সমষ্টি ২৩ খন্ডে প্রকাশিত ‘রূহানী খাযায়েন’ খন্ড নং ৩ এর ৫৯ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)।
এখানে সুস্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে যে, আগত ঈসা (আ:) নবুওয়তের দায়িত্বে থাকবেন না। তার মানে দাঁড়াল, শেষ যুগে আগমনকারী ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ:) শুধুমাত্র একজন “উম্মত” হিসেবে আসবেন! রাসূল (সা:)-এর একাধিক হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত আছে যে, আগত ঈসা (আ:) “উম্মত” হিসেবে আসবেন। দলিল, আল-মু’জামুল আওসাত, হাদীস নং ৪৫৮০; হাদীসের মান : হাসান লি-গয়রিহি। আমি মনে করি, একজন কাদিয়ানী মতাবলম্বীর জন্য বিষয়টি বুঝার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।
এখন প্রশ্ন আসবে যে, এমতাবস্থায় মুসলিম শরীফের একটি হাদীসে ঈসা (আ:)-কে “নাবিউল্লাহ” তথা আল্লাহর নবী বলা হয়েছে কেন?
এর উত্তর হল,
আগত ঈসা কোনো রূপক ঈসা নন, বরং বনী ইসরায়েলের জন্য ইতিপূর্বে যিনি প্রেরিত হয়েছিলেন শেষ যুগে তিনি-ই পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসবে, এ কথাটি সুস্পষ্ট করে দিতেই হাদীসে “নাবিউল্লাহ” বলে ইংগিত দেয়া হয়েছে। যাতে রূপক ঈসা দাবীদারদের উদ্দেশ্যমূলক ও বিকৃত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দ্বারা সাধারণ মানুষ প্রতারিত হয়ে প্রকৃত ঈসাকে বাদ দিয়ে কথিত রূপক ঈসার জালে বন্দী হয়ে না যায়!
(খ)
হযরত মূসা (আ:) সম্পর্কিত যে বর্ণনাটিতে ‘উম্মতে মুহাম্মদীয়া’য় শামিল হতে চেয়ে তাঁর প্রার্থনা করার কথা রয়েছে এবং আবু না’ঈমের সীরাতগ্রন্থ ‘হুলিয়া’-তে যেটি উল্লেখও হয়েছে সেটির সনদ (ধারাবাহিক বর্ণনাসূত্র) সর্বসম্মত হাদীস বিশারদগণের অনুসন্ধান মতে খুবই দুর্বল। রিজালশাস্ত্রের অন্যতম স্কলার ইমাম ইয়াহ্ইয়া বিন মঈন, ইবনে আদী, ইমাম বুখারী, আবু যুর’আ প্রমুখ মুহাদ্দিসগণও বর্ণনাটির রাবীগণের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
[ইমাম যাহাবী (রহ:) রচিত ‘মীযানুল ইতিদাল’ ৩/৬৭ দ্রষ্টব্য]।
শায়খ আলবানী (রহ:) লিখেছেন, এর সূত্র খুবই দুর্বল ও বানোয়াট (ইমাম ইবনে আবী আ’ছেম রচিত কিতাবুস সুন্নাহ’র তাহ্কিক শায়খ আলবানীর ‘যিলালুল জুন্নাহ ফী তাখরীজিস্ সুন্নাহ ১/৩০৬ দ্রষ্টব্য)। ফলে বর্ণনার ঐ কথাগুলো প্রকৃতপক্ষে রাসূল (সা:)-এরই কথা কিনা তা নিশ্চিত নয়, বরং সন্দেহজনক।
পক্ষান্তরে প্রাচীনতম বরেণ্য তাফসীরগ্রন্থ “তাফসীরে সামরকন্দী”-তে হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ:)-এর ক্ষেত্রে ‘উম্মতে মুহাম্মদীয়া’য় শামিল হতে চেয়ে প্রার্থনা করার কথা রয়েছে সেটির সূত্র (Chain of narration) সম্পর্কে কোনো স্কলার থেকে নেতিবাচক মন্তব্য পাওয়া যায়না। বরং সিয়াহ সিত্তাহ’র অনেকগুলো হাদীসের আলোকে বর্ণনাটির কথাগুলো গ্রহণযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে মজবুত সমর্থন পাওয়া যায়। ফলে এর সনদ অপরাপর বর্ণনাগুলোর সমর্থনপুষ্ট হওয়ায় ‘হাসান লি-গয়রিহি’ (উসূলে হাদীসের পরিভাষায় যে হাদীসের সূত্র বিশুদ্ধ হওয়ার পার্সেন্টেজ ৯৯% তাকে হাসান হাদীস বলে – লিখক) স্তরে উন্নীত।
১. পবিত্র কুরআনের ইংগিত দ্বারাও ঈসা আঃ এখনো জীবিত থাকার প্রমাণ Click
২. ঈসা আ: -কে আকাশে জীবিত উঠিয়ে নেয়া ও সেখান থেকে অচিরেই নাযিল হওয়া মর্মে কয়েকটি হাদীস Click
প্রথমেই হযরত ঈসা (আ:) সম্পর্কিত বর্ণনাটির সম্পূর্ণ অনুবাদ পেশ করছি। যারা আরবি বুঝেন তাদের জন্য তাফসীরে সামরকন্দীর উক্ত পৃষ্ঠার স্ক্রিনশট দিয়ে রাখলাম :
আরবীটা দেখুন,
قوله تعالى: (اذ قال الله يا عيسى انى متوفيك و رافعك إلى) ففى الآية تقديم و تاخير و معناه انى رافعك من الدنيا إلى السماء، و متوفيك بعد أن تنزل من السماء على عهد الدجال . و يقال انه ينزل و يتزوج امرأة من العرب بعد ما يقتل الدجال، و تلد له ابنة فتموت ابنته، ثم يموت هو بعدما يعيش سنين، لأنه قد سأل ربه أن يجعله من هذه الأمة فاستجاب الله دعاه- (تفسير السمرقندي المسمى بحر العلوم لأبي الليث نصر بن محمد بن إبراهيم/السمرقندي، المتوفى سنة ٣٧٥. جلد ١ رقم الصفحة ٢٧٢ سورة آل عمران الآيات ٥٥-٥٨).
বাংলায় অনুবাদ দেখুন,
অর্থ, ‘আল্লাহতালার বাণী : যখন আল্লাহতালা বললেন, হে ঈসা নিশ্চয় আমি তোমাকে নিয়ে নিচ্ছি এবং তোমাকে নিজের কাছে তুলিয়া লইতেছি।’ (কুরআন ০৩:৫৫; অনুবাদ, মির্যায়ী প্রথম খলিফা হেকিম নূরুদ্দিন কৃত তাসদীকে বারাহীনে আহমদিয়া ১/৮) আয়াতটিতে অগ্রপশ্চাৎ হয়ে আছে। তার অর্থ নিশ্চয়ই আমি তোমাকে পৃথিবী থেকে আকাশে তুলিয়া লইতেছি এবং দাজ্জালের সমসাময়িক কালে আকাশ থেকে নাযিল করার পর তোমাকে নিয়ে নিচ্ছি। বলা হয়েছে যে, নিশ্চয়ই তিনি নাযিল হবেন, দাজ্জালকে হত্যা করার পর আরবের কোনো এক মহিলাকে বিবাহ করবেন, উনার এক কন্যা সন্তানের জন্ম হবে অতপর তিনি বছর কতেক শেষে মৃত্যুবরণ করবেন। কেননা তিনি (ঈসা) স্বীয় প্রভুর নিকট এই উম্মতের (উম্মতে মুহাম্মদীয়া) অন্তর্ভুক্ত হতে চেয়ে প্রার্থনা করেন। ফলে আল্লাহ দোয়া কবুল করেন।’
বাংলা অনুবাদ সমাপ্ত হল।
(রেফারেন্স, তাফসীরে সামরকন্দী, যার অপর নাম বাহরুল উলূম। রচিতা ইমামুল হুদা আবুল লাইস নাসির বিন মুহাম্মদ বিন আহমদ বিন ইবরাহীম আস-সামরকন্দী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, মৃত ৩৭৫ হিজরী, খন্ড নং ১ পৃষ্ঠা নং ২৭২; সূরা আলে ইমরান আয়াত ৫৫-৫৮)।
দৃষ্টি আকর্ষণ, পাঠকবৃন্দ! আপনারা খুবই লক্ষ্য করেছেন যে, পরিষ্কার শব্দে উল্লেখ রয়েছে যে,
لأنه قد سأل ربه أن يجعله من هذه الأمة فاستجاب الله دعاه
অর্থাৎ তিনি (ঈসা) স্বীয় প্রভুর নিকট এই উম্মতের (উম্মতে মুহাম্মদীয়া) অন্তর্ভুক্ত হতে চেয়ে প্রার্থনা করেন। ফলে আল্লাহ দোয়া কবুল করেন।’ আশাকরি, দলিল পেয়েছেন।
এবার তাফসীরে সামরকন্দী (রহ:) এর লিখক সম্পর্কে অতিব সংক্ষেপে জেনে নেব, বিস্তারিত আন্তর্জাতিক বিশ্বকোষ ‘উইকিপিডিয়া‘ থেকেও দেখে নিতে পারেন!
তাফসীরে সামরকন্দী (রহ:) এর লিখকের নাম ইমাম নাসির বিন মুহাম্মদ বিন আহমদ বিন ইবরাহীম। রাশিয়ার সামরকন্দ শহরে জন্ম। তিনি আবুল লাইস আস-সামরকন্দী নামে পরিচিত। আজ থেকে ১০৩৪ বছর আগে ৩৭৩/৩৭৫ হিজরীতে আয়েম্মায়ে মুজতাহিদীনের যুগে ইন্তেকাল করেন। তিনি ইসলামি বিশ্বে তদানীন্তন সময়কার ‘ইমামুল হুদা’ তথা হিদায়াতের ইমাম’ উপাধিতে ভূষিত হন।
এবার উল্লিখিত বর্ণনার সমর্থনে নিচে কয়েকটি হাদীস পেশ করছি। যাতে জ্ঞানীদের নিকট বর্ণনাটির কথাগুলো আরো দৃঢ়তার সাথে প্রমাণিত হয়ে যায়।
১. একটি হাদীসে এসেছে, ‘ছুম্মা ইয়ানযিলু ঈসা ইবনু মারইয়ামা মুছাদ্দিকান বি-মুহাম্মাদিন ও আ’লা মিল্লাতিহী’।
(আরবী) ثم ينزل عيسى بن مريم مصدقا بمحمد و على ملته
অর্থাৎ তারপর ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ:) নাযিল হবেন মুহাম্মদ (সা:)-কে সত্যায়নকারী হিসেবে ও তাঁরই উম্মত হয়ে। (আল-মু’জামুল আওসাত হাদীস নং ৪৫৮০; হাদীসের মান : হাসান)।
২. মেরাজের একটি হাদীসে উল্লেখ আছে “ফা রুদ্দাল হাদীসু ইলা ঈসা ইবনে মরিয়ম ফা-ক্বলা ক্বদ ও’হিদা ইলাইয়্যা ফী-মা দূনা ওয়াজবাতিহা ফা-আম্মা ওয়াজবাতুহা ফা-লা ই’য়ালামুহা ইল্লাল্লাহু আ’জ্জ ওয়া জাল্লা”।
فرد الحديث إلى عيسى ابن مريم قال: قد عهد إلي فيما دون وجبتها فأما وجبتها فلا يعلمها إلا الله عز وجل
অর্থাৎ অতপর কেয়ামতের বিষয়টি ঈসা (আ:)-এর নিকট পেশ করা হলে তিনি বলেন, আমার থেকে কেয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে দুনিয়াতে ফেরার প্রতিশ্রুতি নেয়া হয়েছে। কিন্তু কেয়ামতের সঠিক জ্ঞান আল্লাহ ব্যতীত কারো কাছে নেই। (সুনানু ইবনে মাজাহ : হাদীস নং ৪০৮১)।
অর্থাৎ হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত আছে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর (ঈসা) আয়ুষ্কাল বিলম্বিত করে দিয়েছেন। তিনি আকাশ থেকে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করবেন। (দুররে মানছূর ২/৩৫০)।
মনে রাখতে হবে যে, ঈসা (আ:) ছাড়া অন্য আর কোনো নবী দুনিয়াতে ফেরার কথা বলেননি। সুতরাং এতেও প্রমাণিত হয় যে, আকাশে ঈসা (আ:) অন্য নবীদের মত শুধুই আত্মিকভাবে নন, বরং সশরীরেই জীবিত আছেন। সে সাথে এটিও প্রমাণিত হয়ে যায় যে, হযরত ঈসা (আ:) কর্তৃক স্বীয় প্রভুর নিকট এই উম্মতের (উম্মতে মুহাম্মদীয়া) অন্তর্ভুক্ত হতে চেয়ে প্রার্থনা করা এবং সেটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কর্তৃক কবুল হওয়ার বিষয়টি একদম সত্য ও প্রমাণিত।
লিখার পরিধি সংক্ষেপ রাখতে আজ এটুকুর মধ্যেই ইতি টানছি। আমার কাজ হল, সত্যটা সাহস করে তুলে ধরা। এবার সেটি কে গ্রহণ করল আর কে করল না সেটি আমার দেখার বিষয় নয়। সবাইকে ধন্যবাদ। ওয়াসসালাম।
লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী। শিক্ষাবিদ ও গবেষক। তাং ২৬/১২/২০২০ ইং
কাদিয়ানীদের বইতে ঈসা (আ:)-কে মৃত প্রমাণের উদ্দেশ্যে উত্থাপিত একটি প্রশ্ন ও তার খন্ডনমূলক জবাব
কাদিয়ানী মুরুব্বী শাহ মুস্তাফিজুর রহমান রচিত ‘ঈসা আঃ এর মৃত্যুতে ইসলামের বিজয়’ বইয়ের খন্ডনে আমার রচিত ‘ঈসা আঃ এর মৃত্যু শেষ যুগে হবে’ বই থেকে নিচের উত্তরটি নেয়া।
প্রশ্ন :
খ্রিষ্টানদের পথভ্রষ্ট হয়ে যাওয়া সম্পর্কে কেয়ামতের দিনে এ ব্যাপারে আল্লাহ তাঁকে (ঈসা) অবহিত না করা পর্যন্ত ঈসা (আ:) তাঁর অনুসারীদের পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে কিছুই জানবেন না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ঈসা (আ:) যদি পুনরায় পৃথিবীতে আসেন, তাহলে কি তিনি দেখতে পাবেন না যে, খ্রিষ্টানরা তাঁকে খোদার পুত্র বানিয়ে তাঁর পূজা করছে? শিরক করছে? অবশ্যই দেখতে পাবেন এবং পৃথিবীতে পুনরায় এসে খ্রিষ্টানদের এই অধঃপতিত অবস্থা দেখে তাঁর পক্ষে খোদার কাছে একথা বলা কি সম্ভব হবে যে, তিনি এসব ব্যাপারে কিছুই জানতেন না? সম্ভব হবে না। কাজেই এক্ষেত্রে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত এটাই হবে যে, ঈসা (আ:)-এর ওফাতের পরেই খ্রিষ্টানরা শিরকে লিপ্ত হয়েছে, ধর্মচ্যুত হয়েছে।
খন্ডনমূলক জবাব :
সত্য বলতে, কাদিয়ানী মুস্তাফিজুর তিনি তার বইটিতে মির্যা কাদিয়ানীর ‘আল ওসীয়্যত’ (বাংলা অনূদিত) বইটির “তখন আবার আমি কিভাবে জানতাম যে, আমার পরে তারা কোন্ বিপথগামিতায় নিপতিত হয়েছিল” (পৃষ্ঠা নং ১৫) বিকৃত অনুবাদেরই চর্বিতচর্বন করে উপরের যুক্তিটার গোড়াপত্তন করেছেন। মির্যার বইগুলো এ সমস্ত আরো বহু আকর্ষণীয় মিথ্যা আর যুক্তিতে ভরপুর, যা লোকাল কোনো মৌলভীর পক্ষে ধরতে পারা সম্ভব নয়। এখানে পবিত্র কুরআনের নামে মির্যা কাদিয়ানীর মোটাদাগে দুইটি মিথ্যা তুলে ধরব।
[মিথ্যা : ১] আল্লাহ তায়ালা ঈসাকে খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে কেয়ামতের দিন অবহিত করবেন—এটি মির্যা কাদিয়ানীর সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা।
[মিথ্যা : ২] ঈসা (আ:) এসব ব্যাপারে কিছুই জানতেন না—এটিও ঈসা (আ:) এর নামে মির্যা কাদিয়ানীর জঘন্য মিথ্যা কথা।
একটু পরেই আমি তাদের সেসব জঘন্য মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন করব, ইনশাআল্লাহ। তার আগে পবিত্র কুরআনের সেই আয়াতদুটির অনুবাদ ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে অনূদিত কুরআনুল কারীম থেকে নিচে উল্লেখ করছি। আল্লাহতালা বলেন:
“[১১৬] আল্লাহ যখন (কেয়ামতের দিন) বলিবেন, হে মারইয়াম তনয় ঈসা! তুমি কি লোকদেরকে বলিয়াছিলে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে দুই ইলাহ রূপে গ্রহণ কর? সে বলিবে, তুমিই মহিমান্বিত! যাহা বলার অধিকার আমার নাই তাহা বলা আমার পক্ষে শোভন নয়। যদি আমি তাহা বলিতাম তবে তুমি তো তাহা জানিতে। আমার অন্তরের কথা তো তুমি অবগত আছ, কিন্তু তোমার অন্তরের কথা আমি অবগত নই; তুমি অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।
[১১৭] তুমি আমাকে যে আদেশ করিয়াছ তাহা ব্যতীত তাহাদের আমি কিছুই বলি নাই, তাহা এই : ‘তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত কর এবং যতদিন আমি তাহাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাহাদের কার্যকলাপের সাক্ষী; কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলিয়া লইলে তখন তুমিই তো ছিলে তাহাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাধায়ক এবং তুমিই সর্ববিষয়ে সাক্ষী’।”
বিজ্ঞপাঠক! এবার নিজেরাই ভেবে দেখুন, তারা উপরে যেই দুইখানা যুক্তি প্রদর্শন করলো আয়াতের সাথে তার সম্পর্ক কোথায়? উফ! কত নিকৃষ্ট মিথ্যাচার! কে জানে কত সহজ-সরল মুসলমান তাদের এই গোবেলসীয় মিথ্যার বলি হয়ে পথভ্রষ্ট হয়েছে!!
এবার তাদের সেই দুইখানা মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন করতে তাদের উদ্দেশ্যে মাত্র তিন (৩)টি পাল্টা প্রশ্ন :
[১] আল্লাহতায়ালা ঈসা (আ:)-কে যখন জিজ্ঞেস করবেন “তুমি কি লোকদেরকে বলিয়াছিলে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে দুই ইলাহ রূপে গ্রহণ কর”—সে সময় ঈসা (আ:) প্রতিউত্তরে কেন বলবেন যে, তুমি আমাকে যে আদেশ করিয়াছ তাহা ব্যতীত তাহাদের কিছুই বলি নাই! এতে কি প্রমাণিত হয় না যে, ঈসা (আ:) তখনও খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে জানবেন!
[২] ঈসা (আ:) পৃথিবীতে পুনরায় এসে খ্রিষ্টানদের ত্রিত্ববাদী মতবাদ অবস্থা দেখে না গেলে তিনি (লাম্মা আমাত্তানী) لما أمتني (অর্থাৎ যখন আপনি আমাকে মৃত্যুদান করলেন) এই শব্দ বাদ দিয়ে বরং (লাম্মা তাওয়াফ্ফাইতানী) لما توفيتني শব্দে কেন বলতে যাবেন? আল্লাহতায়ালা কি ভবিষ্যতের ব্যাপারে জানবেন না যে, ঈসা (আ:) ‘তাওয়াফফা’ এর ন্যায় এমন একটি দ্বৈত শব্দে বললে পরবর্তীতে মানুষের মাঝে এর প্রকৃত তাৎপর্য নিয়ে প্রচন্ড ঝগড়া বাধবে! এখন এর কী জবাব?
[৩] হাদীসে আছে, হাশরবাসীরা ঈসা (আ:) এর নিকটেও (শাফায়াতে কোবরা মুহূর্তে) শাফায়াতের আবেদন করলে তিনি তখন এই বলে অক্ষমতা প্রকাশ করবেন যে ‘ইন্নী উত্তুখিযতু ইলা-হান মিন দূনিল্লাহি ওয়া আন্নাহু লা ইউহিম্মুনিল ইয়াওমা ইল্লা নাফ্সী (আরবী : إنى اتخذت إلها من دون الله و أنه لا يهمنى اليوم إلا نفسى)।’ অর্থাৎ আমি আল্লাহ ব্যতীত একজন উপাস্যরূপে গৃহিত ছিলাম। তাই আজ (হাশর দিবসে) আমি শুধুমাত্র নিজেকে নিয়েই চিন্তিত। (রেফারেন্স, মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, কিতাবুল বি’ছি : ১/৩৭৩; হাদীস নং ১৮৫০৪, মসনদে আবী ইয়া’লা আল-মওছলী, হাদীস নং ২২৭৪; আবুদাউদ আত্-ত্বয়ালিসী ২/২২৬ ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত, হাদীসের মান : হাসান, রাবীদের সবাই সহীহাইন এর রাবী।)
তাই প্রশ্ন আসে, ঈসা (আ:) পৃথিবীতে পুনরায় ফিরে আসা ব্যতীত হাশরের দিবসে তিনি (আ:) কিভাবে জানতে পারবেন যে, খ্রিস্টানরা তাঁকে ইলাহ তথা উপাস্য রূপে গ্রহণ করেছিলো!? ভাবিয়ে তুলে কিনা?
এতেই প্রমাণিত হয় যে, তিনি দ্বিতীয়বার দুনিয়াতে আগমন করবেন বলেই খ্রিষ্টানদের ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে জানতে পারবেন। সুতরাং প্রমাণিত হল, এই সমস্ত আয়াত কোনোভাবেই ঈসা (আ:)-কে দুনিয়ায় তাঁর পুন: আগমনের আগে মৃত প্রমাণ করেনা।
আল্লাহতালা সরলমনা ও ইসলামি আকীদায় অপরিপক্ক এবং বিভ্রান্ত সকল কাদিয়ানীবন্ধুকে ইসলামের মূলধারায় ফিরে আসার তাওফিক দিন!
আল্লাহর দিক কোনটি? কাদিয়ানীদের উদ্দেশ্যমূলক একটি প্রশ্ন ও আমার জবাব
আপনি যখন পবিত্র কুরআন খুলেই তাদের (কাদিয়ানীদের) ভ্রান্ত আকীদার দাঁতভাঙা জবাব দিতে বলবেন যে, ভালো করে দেখুন, পবিত্র কুরআন বলছে,
(সূরা নিসা আয়াত ১৫৭) ‘চক্রান্তকারী ইহুদীরা ঈসা (আ:)-কে না হত্যা করেছিল আর না ক্রুশবিদ্ধও করেছিল; (শুধু ধাঁধার কারণে) তাদের কাছে এমনি একটা কিছু মনে হয়েছিল; (সঠিক ঘটনা না জানার কারণে) যারা এ ব্যাপারে মতবিরোধ করেছিল, তারাও (এতে করে) সন্দেহে পড়ে গেল, আর এ ব্যাপারে তাদের অনুমানের অনুসরণ করা ছাড়া সঠিক কোনো জ্ঞানই ছিলনা, (তবে) এটুকু নিশ্চিত, তারা তাকে হত্যা করেনি। (আয়াত ১৫৮) বরং আল্লাহ তায়ালাই তাকে তাঁর নিজের কাছে [কেউ কেউ অর্থ করেছেন, নিজের দিকে – লিখক] তুলে নিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা মহাপরাক্রমশালী ও মহাপ্রজ্ঞাময়।৷ – আল কুরআন।
কাদিয়ানীরা এইরূপ অকাট্য দলিলের মুকাবিলায় পুরোদস্তুর অক্ষম হয়ে সরলমনা মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে প্রশ্ন তুলে ‘আল্লাহর দিক কোনটি? তিনি তাঁকে তাঁর কোন্ দিকে তুলিয়া লইয়াছেন?’
তখন আমরাও তাদেরকে পাল্টা প্রশ্ন করি,
পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে تعرج الملائكة و الروح اليه (তা’রুজুল মালা-ইকাতু ওয়াররূহু ইলাইহি) অর্থাৎ ফেরেশতারা এবং রূহ (জিব্রাইল) আল্লাহর দিকে আরোহন করেন এমন একটি দিনে যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর (সূরা মা’আরিজ/৭০:০৪)।
এখানে ফেরেশতারা আল্লাহর কোন্ দিকে আরোহন করে বলা হল, বলুন! তখন তাদের কাছে আর কোনো জবাব থাকেনা।
রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ‘আল্লাহর দিকে উঠিয়ে নেয়া’ এর কী ব্যাখ্যা দিয়েছেন?
উত্তর হল, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) সহ প্রায় সমস্ত তাফসীরকারক অসংখ্য সহীহ হাদীসের আলোকে বলেছেন, ঈসা (আ:)-কে ‘আল্লাহর দিকে’ উঠিয়ে নেয়া হয় বলতে ‘আকাশে’ উঠিয়ে নেয়াই উদ্দেশ্য।
যেমন ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, ঈসা (আ:)-কে যখন পাকড়াও করতে ইহুদীরা একত্রিত হল তখন আল্লাহতায়ালা তাঁকে উদ্দেশ্য করে জানিয়ে দিলেন بانه يرفعه الى السماء و يطهره من صحبة اليهود অর্থাৎ নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে আকাশে তুলে নেবেন এবং ইহুদীদের নাগাল পাওয়া থেকে তাঁকে মুক্ত রাখবেন। (রেফারেন্স : ইমাম নাসায়ী সংকলিত হাদীসের কিতাব আস-সুনানুল কোবরা, হাদীস নং ১১৫৯০; তাফসীরে বায়দ্বাভী ২/১৮১)।
এবার ‘আল্লাহর দিক কোনটি’ একথার ব্যাখ্যা খোদ মির্যা কাদিয়ানী সাহেব কী দিয়েছেন সেটি জানব!
মির্যা কাদিয়ানী সাহেবের রচনাবলীর সমষ্টি ২৩ খন্ডে প্রকাশিত রূহানী খাযায়েন এর ১৭ নং খন্ডের ১০৮ নং পৃষ্ঠা খুলুন। সেখানে তিনি ‘আল্লাহর দিক কোনটি’ এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে –
خدا کی طرف اور وہ اونچی ہے جسکا مقام انتہائے عرش ہے۔ বাংলা উচ্চারণ – খোদা কি তরফ আওর উয়ো উঁচি হে জেসকা মোক্বাম ইনতিহায়ে আ’রশ হে।
অর্থাৎ খোদার দিক আর তা উপর দিক। যেটির শেষ সীমানা আরশে আজীম। (স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য)।
মির্যা কাদিয়ানীর রচনা হতেও ‘খোদার দিক’ কোনটি, এমন প্রশ্নের উত্তরে আমরা পরিষ্কার শব্দে ‘খোদার দিক যে উপরদিকযার শেষ সীমানা আরশে আজীম‘ তা প্রমাণ করতে পারলাম। চলমান বিষয়ের ইতি টেনে আজকের মত এখানেই শেষ করছি। আল্লাহ তায়ালা আপনাদের সত্যাটা বুঝার অতপর মানার তাওফিক দিন। আমীন।