প্রশ্নকর্তা, চারজন নবী কি এখনও জীবিত আছেন? ইসলামের অথেনটিক কোনো সোর্স দ্বারা কি এ কথা প্রমাণিত?
উত্তর, কোনো কোনো তাফসীরের কিতাবে অবশ্যই এ ধরনের কথাবার্তার উল্লেখ রয়েছে। জ্ঞানীদের নিশ্চয় জানা আছে যে, লোকমুখে প্রচলিত এমন কোনো কথা কোনো ইতিহাস বা তাফসীর গ্রন্থে শুধুমাত্র সংগ্রহের জন্যই। তাই এর অর্থ এ নয় যে, সেটি প্রমাণযোগ্য হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, হযরত ঈসা (আ.)-কে উঠিয়ে নেয়া এবং শেষ যামানায় তাঁর পুনরায় আগমনী সংবাদ পবিত্র কুরআনের নানা জায়গায় জোরালো ইংগিতে এবং বহু বিশুদ্ধ হাদীসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। ফলে বর্তমানেও তাঁর জীবিত থাকার বিশ্বাস ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যার উপর মুসলিম উম্মাহার ইজমা বা ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত। ফলে এর অস্বীকারকারী নিঃসন্দেহে ইসলামের গণ্ডি থেকে খারিজ হিসেবে গণ্য হবে।
মূল আলোচনা-
উম্মাহা’র বহু স্কলার বলেছেন, খিজির (আ.) এবং ইলিয়াস (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে গেছে। ইদ্রীস (আ.) এর মৃত্যু আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পর সেখানেই হয়ে গেছে। ইমাম সুয়ূতি, ইবনে আসাকীর সহ কতিপয় তাফসীরকারকের বরাতে ইলিয়াস, ইদ্রীস এবং খিজির এঁদের জীবিত থাকার কথা কোনোরূপ বর্ণনামূলক ছিলনা, বড়জোর সংগ্রহমূলক ছিল। এর প্রমাণ হচ্ছে, ইমাম হাকেম নিশাপুরী এবং ইমাম ইবনে কাসীরের মতো অনুসন্ধানবিদ আলেমগণ এসব রেওয়ায়েতকে বিশুদ্ধ মনে করেননি। কেননা এগুলো ইসরাইলি রেওয়ায়েত তথা ঈসায়ী লিটারেচার থেকে গৃহীত।
তাফসীরে মা’আরেফুল কোরআন গ্রন্থকার নিজেও এই মত ব্যক্ত করেছেন এবং বলেছেন, “সারকথা, হযরত ইলিয়াস (আ.)-এর জীবিত থাকার বিষয়টি কোনো নির্ভরযোগ্য ইসলামী রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত নয়”। (দেখুন, মা’আরেফুল কোরআন পৃ-১১৫৫; বাংলা)।
সুতরাং বিষয়টি ভালো ভাবে উপলব্ধি করা ব্যতীত যে বা যারাই বিতর্কে জড়াবেন তারা নিশ্চিত পদস্খলিত হবেন! কাদিয়ানী মু’আল্লিম আব্দুল মাবুদ সাহেব! আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। মা’আরেফুল কোরআন এর খন্ডিত লিখা দ্বারা আপনি দুনিয়াকে ধোকা দিতে চাচ্ছেন কেন? এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে এসেও কিভাবে এইরূপ অপরিপক্ক কার্যকলাপে সম্পৃক্ত হওয়ার দুঃসাহস করলেন! আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুন। স্ক্রিনশট :-
হযরত ঈসা (আ:) সম্পর্কে :
কাদিয়ানী সম্প্রদায় বরাবরই এই একটি জায়গায় খুব বেশি গোঁজামিলের আশ্রয় নিয়ে থাকে। তারা হযরত আবু বকর (রা.)-এর ঐতিহাসিক বক্তব্যের আগের প্রসঙ্গটি রহস্যজনকভাবে এড়িয়ে যায় যেখানে হযরত উমর (রা.) থেকে একথাটিও বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছিলেন যে বলবে মুহাম্মদ (সা.) মৃত্যুবরণ করেছেন আমি তাকে আমার এই তলোবারি দ্বারা হত্যা করব। তিনি আরও বলেছিলেন,
و انما رفع الى السماء كما رفع عيسى ابن مريم عليه السلام
এর মানে হল, “নিশ্চয়ই মুহাম্মদ (সা:)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে যেমনিভাবে ঈসা (আ:)-কে উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল।” (আল মিলাল ওয়ান নিহাল ১/২৪; ইমাম শাহরাস্তানী)। মির্যা কাদিয়ানী সাহেব নিজেও কথাটি উদ্ধৃত করেছেন। রূহানী খাযায়েন ১৫/৫৮১ দ্রষ্টব্য। কিন্তু কাদিয়ানী জ্ঞানপাপীরা হযরত উমর (রা.)-এর বক্তব্যের প্রথমাংশ বললেও শেষের অংশটুকু উদ্দেশ্যমূলকভাবে হজম করে ফেলে। আহা! কি সাংঘাতিক!!
স্ক্রিনশট
অথচ উমর (রা.)-এর ঐ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই হযরত আবুবকর (রা.) সূরা আলে ইমরান এর ১৪৪ নং আয়াত তুলে ধরে বয়ান দিয়েছিলেন যে,
من كان يعبد محمدا فان محمدا قد مات و من كان يعبد اله محمد فانه حى لا يموت و قرأ هذه الاية و ما محمد الا رسول قد خلت من قبله الرسل الخ
এর অর্থ হল, “যে মুহাম্মদ (সা.)-এর ইবাদত করে থাকে (সে যেন জেনে নেয়) মুহাম্মদ (সা.) মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যে মুহাম্মদ (সা.) এর প্রভুর ইবাদত করে থাকে (তার জেনে রাখা উচিত) নিশ্চয়ই তিনি জীবিত, মৃত্যুবরণ করেননি। (তারপর) আবুবকর এই আয়াত তেলাওয়াত করেন, وما محمد الا رسول قد خلت من قبله الرسل الخ (অর্থ-মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র তাহার পূর্বে অনেক রাসূল গত হইয়া গিয়াছে)”।
স্ক্রিনশট
সুতরাং এটি একথারই প্রমাণ যে, ঈসা (আ:) এর আকাশে উঠিয়ে নেয়ার আকিদা স্বয়ং সাহাবীদেরও। নইলে হযরত উমর (রা.) কেন একথা বললেন। আর আবুবকর (রা.)ও বা কেন উমরের ঐ কথার রদ (প্রত্যাখ্যান) করলেন না!? জ্ঞানীদের নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলবে! মজার ব্যাপার হল, একদম সহীহ সনদ দ্বারা হাদীসে বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আ.)-এর নাযিল হবে আকাশ থেকে। মুসনাদু বাজ্জার হাদীস নং ৯৬৪২, সনদ সহীহ।
হযরত খিজির (আ.) সম্পর্কে
কোনো কোনো ইসরাইলী রেওয়ায়েত দ্বারা যারা বলে থাকেন যে, খিজির (আ.) জীবিত, হজ্ব করেন মদীনায় মানুষের সাথে মোলাকাত করেন মুসাফিরদেরকে সাহায্য করেন। মনে রাখা উচিৎ, এমন কোনো কথা সহীহ্ নয়, বরং সহীহ ও বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, তিনিও ইন্তেকাল করেছেন। হযরত খিজির (আ.) ইন্তেকাল করেছেন বলে যারা অভিমত পেশ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম বুখারী (রহ.), ইবরাহীম আল হারবী (রহ.), আবুল হুসাইন ইবনুল মুনাদী (রহ:), ইবনুল জাওযী (রহ.)৷ ইবনুল জাওযী (রহ.) এ ব্যাপারে অধিকতর ভুমিকা রেখে গেছেন। এ সম্পর্কে তিনি পর্যাপ্ত দলিল প্রমাণ সহ একটি কিতাবও লিখে গেছেন। এ সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করুন।
লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী এম.এ
প্রশ্নকর্তা : সূরা আহযাব আয়াত নং ৭ এর মধ্যে উল্লেখ আছে “স্মরণ কর, আমি নবীদের নিকট হতে, তোমার নিকট হতে এবং নূহ, ইব্রাহীম, মূসা, মরিয়ম-তনয় ঈসার নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম; গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার।” এখানে মুহাম্মদ (সা.) সহ সমস্ত নবী-রাসূল থেকে আল্লাহতালা একখানা দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করার বলেছেন। তো সেই অঙ্গীকারটা কী? একজন নবীর আগমন সম্পর্কে কোনো অঙ্গীকার গ্রহণ নয় কি?
উত্তরদাতা : আয়াতটির সঠিক তাৎপর্য কী এ নিয়ে বহু কাদিয়ানী জ্ঞানপাপী আজও দ্বিধাদ্বন্দ্বে নিপতিত। ফলে তাদের অধিকাংশই মনে করছে যে, বোধহয় আয়াতটি নতুন একজন নবীর আগমনের বার্তা দিচ্ছে!! নাউযুবিল্লাহ। অথচ অত্র আয়াতে নতুন নবীর আগমনের বিন্দুমাত্র কোনো ইংগিতই নেই। প্রথমে আয়াত-
অর্থ- স্মরণ কর, আমি নবীদের নিকট হতে, তোমার নিকট হতে এবং নূহ, ইব্রাহীম, মূসা, মরিয়ম-তনয় ঈসার নিকট হতে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম; গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে এই দৃঢ় অঙ্গীকার বলতে কি বুঝানো হয়েছে? উত্তরে বলতে পারি, এটি ঐ অঙ্গীকার, যার বর্ণনা সূরা (الشورى) আশ-শূরার ৪২:১৩ নং আয়াতে রয়েছে এবং তা এই যে, اَنۡ اَقِیۡمُوا الدِّیۡنَ وَ لَا تَتَفَرَّقُوۡا فِیۡہِ অর্থ—”দ্বীন প্রতিষ্ঠা কর এবং তাতে বিভক্ত হয়ো না।” এবার সূরা আশ-শূরার ১৩ নং আয়াত ও তার অনুবাদ-
অর্থ- তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দ্বীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন নূহকে, আর যা আমরা ওহী করেছি আপনাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ‘ঈসাকে, এ বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে বিভেদ সৃষ্টি কর না।
আয়াতটিতে মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম প্রথমে থাকার কারণ সম্পর্কে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেই হাদীসে ইরশাদ করে গেছেন। তাফসীরে তাবারী-তে এসেছে, তিনি বলেছেন كنت اولهم فى الخلق و آخرهم فى البعث অর্থ আমি (যদিও) আবির্ভাবের দিক থেকে সবার শেষে (তবে কিন্তু) আমি সৃষ্টির দিক থেকে সবার প্রথম।
এখন বিস্ময়কর কথা হল, মহানবী (সা.) যে আয়াত দ্বারা নিজের খতমে নবুওয়তের প্রমাণ দিয়ে গেছেন সেই আয়াত দ্বারা কাদিয়ানীরা নবুওয়ত জারি থাকার প্রমাণ দিচ্ছে! অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পবিত্র কুরআনের সঠিক মর্মবাণী মহানবী (সা.)-এর চেয়েও কাদিয়ানীরা খুব ভালো বুঝে! নাউযুবিল্লাহ।
ইতিহাস আরো সাক্ষী, মুসায়লামা কাজ্জাব হযরত মুহাম্মদ (সা:)-কে তার সাথে আরবের উপর কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা ভাগাভাগি করার প্রস্তাব জানায়। ১০ম হিজরির শেষের দিকে সে শেষনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-কে একটি চিঠিতে লিখে :
من مسيلمة رسول الله إلى محمد رسول الله صلى الله عليه و سلم أما بعد، فلكم نصف الأرض ولنا نصفها، ولكن قريشا قوم يعتدون.
অর্থ—“আল্লাহর রাসুল মুসায়লামার পক্ষ থেকে আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের নিকট। আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমাকে আপনার নবুওয়তের অংশীদার করা হয়েছে। পৃথিবীর অর্ধেকটা আমাদের ভাগে এবং অপর অর্ধেক কুরাইশদের ভাগে। তবে কুরাইশরা সবসময় বাড়াবাড়ি করে থাকে।”
ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়,
মুসায়লামা কাজ্জাব মুহাম্মদ (সা:)-এর নবুওয়তেরও স্বীকারোক্তিকারী ছিল।
তার আযানেও ছিল اشهد ان محمدا رسول الله অর্থ- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, হযরত মুহাম্মদ (সা:) আল্লাহর একজন রাসূল।
সে পবিত্র কুরআনের উপরও বিশ্বাসী ছিল।
লিখেছেন, …..সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ:)
কিন্তু সে হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর যুগেই নবুওয়তের দাবী করে বসে। ফলে সে মুরতাদ ও কাফের হয়ে যায়। তার দাবী, আল্লাহতালা তার উপর বহু সূরা নাযিল করেছেন। তার মতে وَالْفِيلْ، وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْفِيلْ، لَهُ زَلُّومٌ طَوِيلْ. এটিও নাকি তার উপর নাযিল হয়েছিল। নাউযুবিল্লাহ।
ঐতিহাসিক ইয়ামামার যুদ্ধে মুসায়লামা কাজ্জাব ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে হযরত ওয়াহশি ইবনুল হারব (রা:)-এর খঞ্জরের আঘাতে নিহত হন। সেই যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন, মহাবীর হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা:)। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসীর)।
জনৈক কাদিয়ানী প্রশ্ন করল, মুসায়লামা কাজ্জাব হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা সত্ত্বেও সে মুসলমান হিসেবে গন্য হবেনা। কারণ হাদীসে বর্ণিত আছে, সে হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর নিকট বাইয়েত নেয়নি। সুতরাং সে মুরতাদ হয়েছিল নবুওয়তের দাবী করে—এভাবে মনে করার সুযোগ নেই। যেজন্য নবুওয়তের দাবী করায় মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী সাহেবকে মুরতাদ আখ্যা দেয়া ঠিক নয়।
উত্তরে বলতে চাই, আরে আপনারাই তো সহীহ বুখারীর একটি হাদীস উল্লেখ করে বলে থাকেন যে, “যে মুসলমানদের মতই সালাত পড়ে, বায়তুল্লাহকে কেবলা মানে আর মুসলমানদের যবেককৃত জন্তুর গোস্ত খায় সেই মুসলমান।” এখানে আপনাদের দাবী অনুযায়ী বাইয়েত এর শর্ত কেন নেই?
দ্বিতীয় কথা হল, মুসায়লামা কাজ্জাব স্বীয় নবুওয়ত দাবীর পূর্বে হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর রেসালতের স্বীকারোক্তি দেয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র বাইয়েতে শামিল না হওয়ার কারণে যদি মুসলমান হিসেবে গন্য না হয় তাহলে তো একই কারণে কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের কথিত উম্মুল মুমিনীন নুসরাত জাহানও আহমদীয়তের মধ্যে শামিল ছিল না! তার কারণ, সে মির্যা কাদিয়ানীর নিকট কখনো বাইয়েত নেয়নি। আমৃত্যু বাইয়েত ছাড়াই মির্যার সংসার করেছিল। সীরাতে মাহদী খ-১, বর্ণনা নং ২০ দ্রষ্টব্য।
অর্থ – “অধম (মির্যাপুত্র বশির আহমদ) জিজ্ঞেস করলাম যে, আপনি (মির্যার স্ত্রী) কবে বাইয়েত নিয়েছিলেন? আম্মাজান বললেন, আমার সম্পর্কে প্রসিদ্ধ আছে যে, আমি বাইয়েত থেকে বিরত থেকে বছর কতেক পরেই বাইয়েত করে নিয়েছি। (কিন্তু) এটি ভুল কথা। আমি কখনোই উনার থেকে পৃথক ছিলাম না, সব সময় সাথে ছিলাম। প্রথম থেকেই তিনি আমাকে বাইয়েতের অন্তর্ভুক্তই জানতেন এবং আমার জন্য আলাদাভাবে বাইয়েত করার প্রয়োজন মনে করেননি। তিনি বলেন, হযরত মসীহ মওউদ প্রথমাবস্থায় মসীহিয়ত এবং মাহদীয়তের দাবীদার ছিলেন না। বরং তিনি মুজাদ্দিদীয়তের উপরই বাইয়েত নিতেন।” (সীরাতে মাহদী, বর্ণনা নং ২০; খ-১)।
এখানে পরিষ্কার করে বলা আছে যে, اور اپنے لئے باقاعدہ الگ بیعت کی ضرورت نہیں سمجھی অর্থাৎ এবং আমার জন্য আলাদাভাবে বাইয়েত করার প্রয়োজন মনে করেননি। মোদ্দাকথা, মির্যা সাহেব স্বীয় স্ত্রীর কাছ থেকে আলাদাভাবে বাইয়েত নেয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। আর তাই মির্যা সাহেবের স্ত্রী নুসরাত জাহান আমৃত্যু বাইয়েত ছাড়াই ছিলেন।
এখন এর কী জবাব দেবেন?
শেষকথা হল, মুসায়লামা কাজ্জাব ইতিপূর্বে মুসলমানদের মধ্যে শামিল ছিল বলেই সে নবুওয়ত দাবী করায় শুধু মুরতাদ সাব্যস্ত হয়নি, একজন কাজ্জাব (বড় মিথ্যাবাদী)ও সাব্যস্ত হয়। সুতরাং এই একই কারণে মির্যা কাদিয়ানীও মুরতাদ ও কাফের। এতে যার বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকবে সেও কাফের হয়ে যাবে।
প্রশ্ন : ঈসা (আ.) শেষ যামানায় “আকাশ” থেকে নাযিল হবেন— এ মর্মে ‘আকাশ’-এর আরবি السَّمَاءِ (আস্-সামাʼই) শব্দটি কি কোনো সহীহ হাদীসে এসেছে?
উত্তর : জি, অবশ্যই এসেছে। হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.) শেষ যামানায় পৃথিবীতে আকাশ থেকে অবতরণ করবেন। যদিও সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের কিছু বর্ণনায় হুবহু «مِنَ السَّمَاءِ» (মিনাস্-সামাʼই) অর্থাৎ “আকাশ থেকে” শব্দদ্বয় উল্লেখ নেই, তবে অন্যান্য একাধিক সহীহ হাদীসে তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং আগমনকারী ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.)-কে “রূপক ঈসা” বলে ব্যাখ্যা করা বা কাদিয়ানীদের এ-সংক্রান্ত বিশ্বাস সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও বাতিল।
কাদিয়ানী সাহিত্য থেকেও প্রমাণ :
মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী নিজেকে ‘মসীহ’ দাবি করা সত্ত্বেও তাঁর রচনাবলীর সংকলন ‘রূহানী খাযায়েন’-এর ৫ম খণ্ডের ৪০৯ নং পৃষ্ঠায় লিখেছেন—
অর্থ : হায় আফসোস তাদের জন্য! তারা জানে না যে, নিশ্চয়ই মসীহ আকাশ থেকে তাঁর সমস্ত জ্ঞানসহ অবতরণ করবেন। তিনি পৃথিবী থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করবেন না। অথচ তারা উপলব্ধি করে না।
এখানে «مِنَ السَّمَاءِ» (মিনাস্-সামাʼই) শব্দগুচ্ছ দ্বারা স্পষ্টভাবে “আকাশ থেকে” অবতরণের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী তাঁর রচনাবলীর একাধিক স্থানে স্বীকার করেছেন যে, শেষ যুগে আগমনকারী হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.) আকাশ থেকে (مِنَ السَّمَاءِ) অবতরণ করবেন— এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান রয়েছে।
যেমন তিনি লিখেছেন—
’’اسی لیے اُس کی نسبت نبیِ معصوم کی پیشگوئی میں آیا ہے کہ وہ آسمان سے نازل ہوگا‘‘
উর্দু উচ্চারণ :ইসী লিয়ে উস কি নিসবত নবী-এ-মা‘সূম কি পেশগোঈ মেঁ আয়া হ্যায় কে ওহ আসমান সে নাযিল হোগা।
অর্থ : “এই কারণেই তাঁর সম্পর্কে নিষ্পাপ নবীর ভবিষ্যদ্বাণীতে এসেছে যে, তিনি (ঈসা) আসমান থেকে অবতরণ করবেন।” (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা-২৬৮; রচনাকাল: ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দ)।
কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের নিকট বিষয়টি বিস্ময়কর মনে হলেও বাস্তবতা হলো, মির্যা কাদিয়ানী তাঁর রচনার আরেক স্থানে আরও স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন—
مثلاً صحیح مسلم کی حدیث میں جو یہ لفظ موجود ہے کہ حضرت مسیح جب آسمان سے اُتریں گے تو اُن کا لباس زرد رنگ کا ہوگا
উর্দু উচ্চারণ :মিসালান, সহীহ মুসলিম কি হাদীস মেঁ যা ইয়ে লফয মওজূদ হ্যায় কে, হযরত মাসীহ যখন আসমান সে উতারেঙ্গে তো উন কা লিবাস জরদ রং কা হোগা।
অর্থ : “যেমন সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে এই শব্দ বিদ্যমান রয়েছে যে, হযরত মসীহ যখন আকাশ থেকে অবতরণ করবেন, তখন তাঁর পোশাক হবে হলুদ বর্ণের।” (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড-৩, পৃষ্ঠা-১৪২)।
মির্যা সাহেব একই বক্তব্য তাঁর ‘মালফুযাত’ গ্রন্থের ৫ম খণ্ডের ৩৩ নং পৃষ্ঠাতেও উল্লেখ করেছেন (উর্দু, ৪র্থ সংস্করণ দ্রষ্টব্য)।
ইসলামী নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাবলি থেকে :
প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম বায়হাক্বী (রহ.) তাঁর ‘আল-আসমা ওয়াস-সিফাত’ গ্রন্থে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, যেখানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, হযরত ঈসা (আ.) আকাশ থেকে (مِنَ السَّمَاءِ) অবতরণ করবেন।
এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে— সহীহ বুখারীর যে সনদে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে, সেখানে তো ‘সামা’ (আকাশ) শব্দটি নেই। তাহলে ইমাম বায়হাক্বী (রহ.)-এর বর্ণনায় ‘সামা’ বা ‘আকাশ’ শব্দটি কোথা থেকে এলো?
এর উত্তর হলো, হাদীসের বিভিন্ন সনদ ও রেওয়ায়াতে একই ঘটনার অতিরিক্ত শব্দ বা ব্যাখ্যামূলক বর্ণনা সংরক্ষিত থাকে। কোনো একটি সনদে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত বিষয় অন্য একটি সহীহ বা গ্রহণযোগ্য সনদে বিস্তারিতভাবে উল্লেখিত হওয়া হাদীসশাস্ত্রে সুপরিচিত ও স্বীকৃত বিষয়। (প্রামাণ্য কিছু স্ক্রিনশট নিম্নরূপ)।
মুসনাদে বাজ্জার গ্রন্থ থেকে –
হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে একটি টনটনে সহীহ ও মারফূ এবং মুত্তাসিলুস সানাদে বর্ণিত হাদীস পেশ করছি যেখানে পরিষ্কার শব্দে উল্লেখ আছে যে, হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম “আকাশ থেকে” নাযিল হবেন। সনদসহ হাদীসটি,
অনুবাদঃ “ইমাম বাজ্জার (রহ.) আলী ইবনুল মুনযির থেকে, তিনি মুহাম্মদ ইবনে ফুদাইল থেকে, তিনি আসেম ইবনে কুলাইব থেকে তিনি হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) বলেন: আমি আবুল কাসিম, সত্যবাদী ও সত্যপ্রতিপাদিত রাসূল (সা.)-কে বলতে শুনেছি: “মানুষের মধ্যে মতভেদ ও বিভক্তির যুগে পূর্ব দিক থেকে একচোখা দাজ্জাল, অর্থাৎ পথভ্রষ্টতার মসীহ, আবির্ভূত হবে। আল্লাহ যতদূর ইচ্ছা করবেন, সে পৃথিবীর ততদূর পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। সে চল্লিশ দিন অবস্থান করবে। সেই দিনগুলোর প্রকৃত দৈর্ঘ্য কত হবে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। তখন মুমিনরা অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। এরপর হযরত ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.) আকাশ থেকে অবতরণ করবেন এবং মানুষের ইমামতি করবেন। তিনি যখন দুই রাকাত সালাত আদায় করে মাথা উঠাবেন, তখন বলবেন: ‘سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ’ অর্থাৎ, ‘আল্লাহ তাঁর প্রশংসাকারীর প্রশংসা শুনেছেন।’ এরপর (আল্লাহর ফয়সালায়) দাজ্জাল নিহত হবে এবং মুমিনগণ বিজয় লাভ করবে।” তারপর রাসূলুল্লাহ (সা.) শপথ করে বলেন: “নিশ্চয়ই এ সংবাদ সত্য। আর এটি নিকটবর্তীও বটে। কেননা যা কিছু আসন্ন, তা-ই নিকটবর্তী।”
রেফারেন্স : আল বাহরুয যুখার বা মুসনাদে বাযযার হাদীস নং ৯৬৪২, সংকলক : ইমাম আবূ বকর আহমদ ইবনে আমর আল বাযযার রাহিমাহুল্লাহ, (মৃত. ২৯২ হিজরী)।
ইমাম নূরুদ্দীন আল হাইছামী (রহ.) রচিত ‘মাজমাউয যাওয়ায়েদ’ গ্রন্থে হাদীসটির সনদে বিদ্যমান রাবীগণ সম্পর্কে লিখেছেন,
অর্থাৎ “এর সকল বর্ণনাকারী সহীহ (বুখারী)’র বর্ণনাকারী তবে আলী ইবনুল মুনযির ছাড়া। কিন্তু সেও একজন সিকাহ তথা বিশ্বস্ত রাবী।” খণ্ড নং ৭ পৃষ্ঠা নং ৩৪৯।
প্রামাণ্য স্ক্যানকপি দ্রষ্টব্য
ধূর্ত কাদিয়ানীদের মুখোশ উন্মোচন
অপ্রিয় হলেও সত্য, কাদিয়ানী লেখকরা অনেক সময় হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা.)-এর খিলাফত প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে সংঘটিত ঐতিহাসিক ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গোপন করে থাকেন। সেই ঘটনায় হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর পক্ষ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছিলেন—
অর্থ : “বরং তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, যেমন ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.)-কে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল।”
(আল-মিলাল ওয়ান-নিহাল, ১/২; ইমাম শাহরাস্তানী)
লক্ষণীয় বিষয় হলো, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী নিজেও তাঁর রচনায় এই বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড-১৫, পৃষ্ঠা-৫৮১)।
কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, অনেক কাদিয়ানী বক্তা ও লেখক হযরত উমর (রা.)-এর বক্তব্যের প্রথম অংশ উল্লেখ করলেও শেষের অংশ— «وَإِنَّمَا رُفِعَ إِلَى السَّمَاءِ كَمَا رُفِعَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ» — ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যান। অথচ এই অংশে সুস্পষ্টভাবে হযরত ঈসা (আ.)-এর আসমানে উত্তোলনের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ব্যাপারে তুলনামূলক উদাহরণ হিসেবে তা উপস্থাপিত হয়েছে।
প্রামাণ্য স্ক্যানকপি দ্রষ্টব্য
অথচ হযরত উমর (রা.)-এর উক্ত বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা.) উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামের সামনে দাঁড়িয়ে কুরআনের আয়াত দ্বারা বিষয়টির সংশোধন করেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তিকালের বাস্তবতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে—
অর্থ : “শোনো! যে ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা.)-এর ইবাদত করত, সে জেনে রাখুক যে, মুহাম্মদ (সা.) ইন্তিকাল করেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করে, সে জেনে রাখুক যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব; তিনি কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩৬৬৮)।
“বরং তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, যেমন ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.)-কে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল।”
কিন্তু হযরত আবূ বকর (রা.) তাঁর এই বক্তব্যের জবাবে ঈসা (আ.)-এর আসমানে উত্তোলনের বিষয়টি অস্বীকার করেননি; বরং তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তিকালের প্রমাণে কুরআনের আয়াত পেশ করেছেন। ফলে ঐতিহাসিকভাবে এ কথা স্পষ্ট যে, হযরত ঈসা (আ.)-এর আসমানে উত্তোলনের বিষয়টি সাহাবায়ে কেরামের নিকট সুপরিচিত ও স্বীকৃত একটি বিশ্বাস ছিল। অন্যথায় হযরত উমর (রা.) এমন উপমা দিতেন না এবং তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রতিবাদও উত্থাপিত হতো।
এ বিষয়টি নিঃসন্দেহে চিন্তাশীল ও ন্যায়পরায়ণ পাঠকদের গভীরভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবে।
এ লেখাগুলোও পড়া যেতে পারে
কুরআনের কোথায় আছে ঈসা (আ:)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, কাদিয়ানীদের একটি মূর্খতাসুলভ প্রশ্নের উত্তর। Click (FB থেকে)।
১- পবিত্র কুরআন দ্বারাও প্রমাণিত ঈসা (আঃ) এখনো জীবিত এবং তিনি দ্বিতীয়বার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। Click
ইন্নালহামদা লিল্লাহ ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আ’লা রাসূলিল্লাহ! আম্মা বা’দু…। ইসলামের প্রথম কয়েক প্রজন্ম ধরে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের যে আকীদা প্রচলিত ছিলো তা ছিলো মূলধারার আকীদা। এ আকীদা ছিলো খুবই সংক্ষিপ্ত ও প্রাঞ্জল। এ সময় আলাদা আলাদাভাবে আকীদার একেকটি বিষয় নিয়ে স্বতন্ত্র পুস্তিকা লিখা হতো। যেমন- কিতাবুত-তাওহীদ, কিতাবুল-ঈমান ইত্যাদি। পরবর্তীতে এই মূলধারার আকীদার সব বিষয় একত্রে সন্নেবেশিত করে যে কিতাব আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে তা হচ্ছে ইমাম ত্বহাবীর ‘আকীদাতুত-ত্বহাবী‘।
এ গ্রন্থটি সহ অন্যান্য খন্ড খন্ড পুস্তিকাগুলো আকীদার একেবারে মৌলিক বিষয়ে আলোকপাত করে। কিন্তু ততদিনে ইসলামী থিওলজী গ্রীক দর্শন সহ পারসিক ভাবাদর্শে আক্রান্ত হতে শুরু করে। ইসলামী আকীদার প্রতি এমন কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়া হয় যার উত্তর না দেয়া হলে বুদ্ধিবৃত্তিক দৌড়ে ইসলামী আকীদা তার নির্যাস হারাবে। এ সমস্যার উত্তরণে অনেকেই এগিয়ে আসেন। কিছু আলেম মূলধারার সংক্ষিপ্ত আকীদার হালকা প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দিয়ে চুপ থাকাকে নিরাপদ মনে করলেন। এক্ষেত্রে উনাদের আদর্শ ছিলেন ইমাম মালেক (রহঃ) যিনি অতিরিক্ত প্রশ্ন করাকে বিদআত সাব্যস্ত করেছিলেন। এই স্বল্প পরিসরের ব্যাখ্যা যারা গ্রহণ করে আকীদার চর্চা করেন তারা পরবর্তীতে ‘সালাফী’ আকীদার ধারক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
কিন্তু এই যৎসামান্য ব্যাখ্যা দিয়েও গ্রীক আগ্রাসন ঠেকানো যাচ্ছিলো না। মানুষ যিনদিক হতে শুরু করে। ফলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মূলধারার আরেকটি ব্যাখ্যাদানকারী উপধারা প্রবাহিত হয়। যারা প্রতিটি বর্ণনার সফল ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করে। এ কাজে প্রসিদ্ধি লাভ করেন ইমাম আবুল হাসান আশআরি ও ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদি। উনারা মূলত গ্রীক দর্শনের আঘাত প্রতিহত করতে ‘ইলমুল কালাম’ প্রয়োগ করেন। ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেও বেশ কিছু মতভেদ দেখা যায়।
পরবর্তীতে যারা এই বিস্তর ব্যাখ্যার অনুসারী হিসেবে ইসলামী আকীদা চর্চা করেন তারা আশআরি কিংবা মাতুরিদি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মনে রাখা উচিত, এই ব্যাখ্যাগুলো আকীদার উচ্চতর গবেষণা হিসেবে ধর্তব্য।
গ্রীকের আগ্রাসন শেষ। কিন্তু ইমাম আশআরি কিংবা মাতুরিদির রেখে যাওয়া ব্যাখ্যা তো শেষ হয়ে যায় নি। আকীদার উচ্চতর গবেষণার শিক্ষার্থীরা যুগে যুগে এইসব ব্যাখ্যা নিয়ে আরও বর্ধিত গবেষণা চালিয়ে গেছে। অবশ্য প্রত্যেক সময়ের অজ্ঞেয়বাদী, সংশয়বাদী ও যিনদিকদের উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর দিতে এইসব আশআরী ও মাতুরিদি ব্যাখ্যা মুসলিমদের সাহস যুগিয়েছে।
সুতরাং আমরা বলতে পারি, ইসলামী আকীদার একেবারে মূলধারাটি হলো প্রাইমারীর মতো। সালাফি আকীদা আরেকটু বর্ধিত হয়ে অনেকটা ইন্টারমিডিয়েটের মতো। আর আশআরী-মাতুরিদি আকীদা হলো হাইয়ার এডুকেশন। এখন সহজেই বুঝতে পারবেন- একজন মুসলিমকে প্রকৃত মুমিন হতে হলে ঠিক কোন পর্যায়ের আকীদা লালন করতে হবে? আহলে সুন্নাত অয়াল জামাতের মূলধারার আকীদাই একজন মুসলিমের নাজাতের জন্য যথেষ্ট। তবে বাদ বাকি সালাফি, আশআরি কিংবা মাতুরিদি আকীদাও আহলে সুন্নাতের বাহিরে নয়।
যারা সালাফী আকীদার বিরোধিতা করতে গিয়ে আশআরী-মাতুরিদি আকীদাকে সামনে দাঁড় করাচ্ছেন, কিংবা মাতুরিদি-আশআরী আকীদাকে গলদ সাব্যস্ত করতে গিয়ে সালাফী আকীদার দাওয়াত দিচ্ছেন উভয় পক্ষই আহলে সুন্নাতের মূলধারার আকীদাকে অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করছেন। এসব বর্ধিত আকীদা ইসলামের শত্রুদের জন্য ব্যাখ্যাকৃত করা হয়েছিলো। নিজেদের মধ্যে মূলধারার আকীদা বাদ দিয়ে যারা বিতর্কে জড়িয়ে পরে তারা প্রকৃত আকীদার দাঈ হবে কিনা আমার সন্দেহ আছে।
সাধারণ মুসলিম ভাইদের বলবো। আপনারা আতঙ্কিত না হয়ে আকীদার মূলধারার চর্চা করুন। অতি উৎসাহী হয়ে সালাফী-আশআরী-মাতুরিদি আকীদা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার আগে মৌলিক আকীদা জানুন। আর আখেরাতের নাজাতের জন্য এটুকু আকীদাই যথেষ্ট। এই আকীদা নিয়েই সাহাবীরা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। যারা ছিলেন ইসলামের সবচেয়ে নিখুঁত প্রজন্ম।”
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। ইন্নাল হামদা লিল্লাহ ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আ’লা রাসূলিল্লাহ। আম্মাবা’দু…. প্রিয় পাঠকবৃন্দ! অপ্রিয় হলেও সত্য, এভাবেই মিথ্যা, ধোকা আর প্রতারণা সহ জঘন্য দ্বিচারিতার উপর প্রতিষ্ঠিত কাদিয়ানীধর্ম!! এই যে এ দুটি পৃষ্ঠাই আমার কথার প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।
কেননা মির্যা কাদিয়ানী সুস্পষ্টভাবে তার দাওয়াত যারা কবুল করেনি তিনি তাদেরকে খোদার ইলহামের নামে “অমুসলিম” বলে আখ্যা দিয়ে লিখে গেছেন! (তাযকিরাহ ৫১৯ দ্রষ্টব্য)।
অপরদিকে তাদেরই বর্তমান গদ্দিনিসীন (কথিত খলিফা) মির্যা মাসরূর আহমদ সাহেব সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করতে কত হীনতার সাথে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বক্তব্যে বললেন,
“আহমদীয়া জামাত আল্লাহ ও রাসূল (সা:)-এর নির্দেশ অনুসারে প্রত্যেক কালিমা পাঠকারীকে মুসলমান মনে করে। কোনো মুসলমানের মুসলমান হওয়ার জন্য পবিত্র কলেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ পাঠ করাই যথেষ্ট।” (সূত্র: বাইতুল ফতুহ মসজিদ, যুক্তরাজ্য- জুমার খুতবা ০২-ডিসেম্বর-২০১১ইং, পাক্ষিক আহমদী তাং ১৫-১২-২০১২ ইং, পৃষ্ঠা নং ৬ দ্রষ্টব্য)।
আকীদায়ে খতমে নবুওয়ত সম্পর্কিত ২০টির-ও অধিক সহীহ হাদীস (আরবী ও বাংলা অনুবাদসহ) পড়ুন –
ভারতীয় বংশোদ্ভূত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (১৮৩৯-১৯০৮) নিজেকে নবী দাবী করেছিল ৷ অথচ কুরআন হাদীসের সুস্পষ্ট মেসেজ হচ্ছে, নবী মুহাম্মদ (সা:) মুক্ত ও স্বাধীন অর্থে সর্বশেষ নবী ৷ তারপর ওহীয়ে নবুওয়তেরধারা চিরতরে রুদ্ধ। আমি নিম্নে কেবল ২০টির-ও অধিক হাদীস শরীফ পেশ করছি ৷
প্রসঙ্গত, আরবী ভাষায় খাতাম এবং খাতিম শব্দ দুটি লিসানুল আরব অভিধানবেত্তার মতানুসারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু’খানা গুণবাচক নাম। সে হিসেবে শব্দদুটি সমার্থক। পবিত্র কুরআনে ‘খাতামান নাবিয়্যীন’ মূলত ‘খাতিমান নাবিয়্যীন’ এরই অর্থ প্রদানকারী। এ থেকে آخرهم (নবীগণের সর্বশেষ) অর্থই উদ্দেশ্য। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি নিম্নরূপ,
[১] সহীহ বুখারী হাদীস নং ৪৪১৬, قَالَ أَلَا تَرْضَى أَنْ تَكُوْنَ مِنِّيْ بِمَنْزِلَةِ هَارُوْنَ مِنْ مُوْسَى إِلَّا أَنَّهُ لَيْسَ نَبِيٌّ بَعْدِي অর্থ- রাসুল (সা.) আলী (রা.)- কে বললেন, তুমি কি এ কথায় রাজী নও যে, তুমি আমার কাছে সে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হারূন (আ.) যে মর্যাদায় মূসার কাছে অধিষ্ঠিত ছিলেন । পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, হারূন (আ.) নবী ছিলেন আর আমার পরে কোনো নবী নেই৷
[২] সহীহ বুখারী হাদীস নং ৩৫৩২, ৪৮৯৬, قال رسول الله.. وَأَنَا الْعَاقب অর্থ- রাসুল (সা.) বলেন আমার একটি নাম আক্বিব (তথা সর্বশেষে আগমনকারী) ৷
[৩] সহীহ বুখারী হাদীস নং ৩৫৩৫, أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِنَّ مَثَلِيْ وَمَثَلَ الأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِيْ كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بَيْتًا فَأَحْسَنَهُ وَأَجْمَلَهُ إِلَّا مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ زَاوِيَةٍ فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُوْنَ بِهِ وَيَعْجَبُوْنَ لَهُ وَيَقُوْلُوْنَ هَلَا وُضِعَتْ هَذِهِ اللَّبِنَةُ قَالَ فَأَنَا اللَّبِنَةُ وَأَنَا خَاتِمُ النَّبِيِّينَ অর্থ- রাসুল (সা.) বলেন, আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণের অবস্থা এমন যে, এক ব্যক্তি যেন একটি গৃহ নির্মাণ করল ৷ তাকে সুশোভিত ও সুসজ্জিত করল৷ কিন্তু এক পাশে একটি ইটের জায়গা খালি রয়ে গেল। অতঃপর লোকজন এর চারপাশে ঘুরে আশ্চর্য হয়ে বলতে লাগল ঐ শূন্যস্থানের ইটটি লাগানো হল না কেন! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমিই সে ইট। আর আমিই সর্বশেষ নবী।
[৪] সহীহ বুখারী হাদীস নং ৬৯৯০, أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ لَمْ يَبْقَ مِنْ النُّبُوَّةِ إِلاَّ الْمُبَشِّرَاتُ অর্থ- আবূ হোরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, সু-সংবাদ বহনকারী বিষয়াদি ব্যতীত নবুওয়তের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
[৫] সহীহ বুখারী হাদীস নং ৩৪৫৫, إِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِيْ وَسَيَكُوْنُ خُلَفَاءُ অর্থ- আমার পরে কোনো নবী নেই। তবে অনেক খলীফাহ্ হবে।
[৬] সহীহ বুখারী হাদীস নং ৬১৯৪, حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، قُلْتُ لاِبْنِ أَبِي أَوْفَى رَأَيْتَ إِبْرَاهِيمَ ابْنَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَاتَ صَغِيرًا، وَلَوْ قُضِيَ أَنْ يَكُونَ بَعْدَ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم نَبِيٌّ عَاشَ ابْنُهُ، وَلَكِنْ لاَ نَبِيَّ بَعْدَهُ. অর্থ- ইসমা‘ঈল হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ইবনু আবূ আওফা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি নবী (সা.)-এর পুত্র ইবরাহীম-কে দেখেছেন? তিনি বললেন, তিনি তো বাল্যাবস্থায় মারা গিয়েছেন। যদি মুহাম্মদ (সা.)-এর পরে অন্য কেউ নবী হবার বিধান থাকত তবে তাঁর পুত্র জীবিত থাকতেন। কিন্তু তাঁর পরে কোনো নবী নাই।
[৭] সহীহ বুখারী হাদীস নং ২৬৪১, وَإِنَّ الْوَحْيَ قَدْ انْقَطَعَ অর্থ- নিশ্চয় ওহী বন্ধ হয়ে গেছে ৷
[৮] সহীহ বুখারী হাদীস নং ৪৯৩৬, سَهْلُ بْنُ سَعْدٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ بِإِصْبَعَيْهِ هَكَذَا بِالْوُسْطَى وَالَّتِيْ تَلِي الإِبْهَامَ بُعِثْتُ وَالسَّاعَةُ كَهَاتَيْنِ. অর্থ- সাহল ইবনু সা‘দ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি দেখেছি, রাসুল (সা.) তাঁর মধ্যমা ও বুড়ো আঙ্গুলের নিকটবর্তী অঙ্গুলিদ্বয় এভাবে একত্র করে বললেন, কেয়ামত (কিয়ামত) ও আমাকে এমনিভাবে পাঠানো হয়েছে।
[৯] সহীহ বুখারী হাদীস নং ৭১২১, قَالَ لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تَقْتَتِلَ فِئَتَانِ عَظِيمَتَانِ يَكُونُ بَيْنَهُمَا مَقْتَلَةٌ عَظِيمَةٌ دَعْوَتُهُمَا وَاحِدَةٌ وَحَتَّى يُبْعَثَ دَجَّالُونَ كَذَّابُونَ قَرِيبٌ مِنْ ثَلاَثِينَ كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم অর্থ- তিনি বলেছেন, কেয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ দু’টি বড় দল পরস্পরে মহাযুদ্ধে লিপ্ত না হবে। উভয় দলের দাবী হবে অভিন্ন। আর যতক্ষণ ত্রিশের কাছাকাছি মিথ্যাচারী দাজ্জাল-এর প্রকাশ না পাবে তারা প্রত্যেকেই নিজেকে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল বলে দাবি করবে ৷
[১০] সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৬১১৪, فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ” أَمَا تَرْضَى أَنْ تَكُونَ مِنِّي بِمَنْزِلَةِ هَارُونَ مِنْ مُوسَى إِلاَّ أَنَّهُ لاَ نُبُوَّةَ بَعْدِي অর্থ- রসূলুল্লাহ (সা.) বললেন তুমি কি এতে আনন্দবোধ করো না যে, আমার নিকট তোমার সম্মান মূসা (আ.)-এর নিকট হারূন (আ.)-এর মতো। এ কথা ভিন্ন যে, আমার পর আর কোনো নবুওয়ত নেই ।
[১১] সহীহ মুসলিম হাদীস নং ১০৫৪, وَأُرْسِلْتُ إِلَى الْخَلْقِ كَافَّةً وَخُتِمَ بِيَ النَّبِيُّونَ অর্থ- আমাকে সমগ্র সৃষ্টির জন্য (নবী করে) পাঠানো হয়েছে। আর আমাকে দিয়ে নবীদের আগমন-ধারা সমাপ্ত করা হয়েছে।
[১২] সহীহ বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া হাদীস নং ৩৪৫৫, হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, كَانَتْ بَنُوْ إِسْرَائِيْلَ تَسُوْسُهُمْ الأَنْبِيَاءُ كُلَّمَا هَلَكَ نَبِيٌّ خَلَفَهُ نَبِيٌّ وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِيْ وَسَيَكُوْنُ خُلَفَاءُ فَيَكْثُرُوْنَ অর্থ বনী ইসরাঈলের নবীগণ তাঁদের উম্মাতকে শাসন করতেন। যখন কোনো একজন নবী মারা যেতেন, তখন অন্য একজন নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোনো নবী নেই। তবে অনেক খলীফাহ্ হবে। (তাওহিদ প্রকাশনী)।
[১৩] সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৯০, হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেছেন, سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ لَمْ يَبْقَ مِنْ النُّبُوَّةِ إِلاَّ الْمُبَشِّرَاتُ অর্থ আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, মুবাশশ্বিরাত ব্যতীত নবুওয়তের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এই ‘মুবাশ্বশিরাত’ (مُبَشِّرَاتِ) এর মর্মার্থ সুস্পষ্ট করে আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, لَمْ يَبْقَ مِنَ النُّبُوَّةِ إلَّا المُبَشِّراتُ. قالوا: وما المُبَشِّراتُ؟ قالَ: الرُّؤْيا الصَّالِحَةُ অর্থাৎ মুবাশ্বশিরাত ব্যতীত নবুওয়তের আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! মুবাশ্বশিরাত কী? তিনি (সা.) বললেন, সত্য স্বপ্ন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৯০)।
[১৪] ইমাম দায়লামী (রহ.) সংকলিত আল-ফেরদাউস বি-মাছূরিল খিতাব (الفردوس بمأثور الخطاب للدیلمی), ১/৩৯, হাদীস নং ৮৫, হযরত আবু যর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, یٰا أَبَا ذَرٍ أَوَّلُ الْاَنْبِیَاء آدَمُ وَآخِرُہ مُحَمَّدٌ অর্থ ‘হে আবু যর! সর্বপ্রথম নবী ছিলেন আদম আর সর্বশেষ নবী হচ্ছে মুহাম্মদ।’
[১৫] তিরমিযি হাদীস নং ৩৬৮৬, হযরত উকবাহ ইবনে আমের (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, لَوْ كَانَ بَعْدِي نَبِيٌّ لَكَانَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ অর্থ আমার পরবর্তীতে কেউ নবী হলে অবশ্যই উমর ইবনুল খাত্তাবই নবী হতেন। (সহীহ)।
[১৬] সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৩২৬৯, فَإِنِّي آخِرُ الأَنْبِيَاءِ وَإِنَّ مَسْجِدِي آخِرُ الْمَسَاجِدِ অর্থ- অতএব অবশ্যই আমি নবীগণের সমাপ্তি এবং আমার মসজিদ সর্বশেষ মসজিদ ৷ (অন্য রেওয়ায়েতে আছে, [আরবী] مسجدى آخر مساجد الأنبياء অর্থ- নিশ্চয়ই আমার মসজিদ নবীগণের প্রতিষ্ঠিত মসজিদ সমূহের মধ্যে সর্বশেষ মসজিদ [সূত্র- আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব])।
[১৭] সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৬২১২, وَلَكِنْ أَبْكِي أَنَّ الْوَحْىَ قَدِ انْقَطَعَ مِنَ السَّمَاءِ অর্থ- কিন্তু আমি এজন্য কাঁদছি যে, আকাশ হতে ওহী (তথা ওহীয়ে নবুওয়ত) আসা বন্ধ হয়ে গেল।
[১৮] সহীহ মুসিলম হাদীস নং ৫৮৫৪, مَثَلِي وَمَثَلُ الأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِي كَمَثَلِ رَجُلٍ ابْتَنَى بُيُوتًا فَأَحْسَنَهَا وَأَجْمَلَهَا وَأَكْمَلَهَا إِلاَّ مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ زَاوِيَةٍ مِنْ زَوَايَاهَا فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُونَ وَيُعْجِبُهُمُ الْبُنْيَانُ فَيَقُولُونَ أَلاَّ وَضَعْتَ هَا هُنَا لَبِنَةً فَيَتِمَّ بُنْيَانُكَ . فَقَالَ مُحَمَّدٌ صلى الله عليه وسلم ” فَكُنْتُ أَنَا اللَّبِنَ অর্থ- আমার দৃষ্টান্ত ও আমার পূর্বেকার নবীগণের দৃষ্টান্ত সে লোকের উপমার মতো যে কতকগুলো গৃহ বানালো, তা সুন্দর করল ও সুদৃশ্য করল এবং পূর্ণাঙ্গ করল; কিন্তু তার কোনো একটির কোণে একটি ইটের স্থান ব্যতীত। লোকেরা সে ঘরগুলোর চারদিকে চক্কর দিতে (ঘুরেঘুরে দেখতে) লাগল আর সে ঘরগুলো তাদের মুগ্ধ করতে লাগল। পরিশেষে তারা বলতে লাগল, এখানে একখানি ইট লাগালেন না কেন? তাহলে তো আপনার অট্টালিকা পূর্ণাঙ্গ হত। অতঃপর মুহাম্মদ (সা.) বলেন যে, আমি-ই সে (শূন্যস্থানের) ইটখানি।
[১৯] সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৬০২৬, الأَنْبِيَاءُ إِخْوَةٌ مِنْ عَلاَّتٍ وَأُمَّهَاتُهُمْ شَتَّى وَدِينُهُمْ وَاحِدٌ فَلَيْسَ بَيْنَنَا نَبِيٌّ অর্থ- নবীগণ একই পিতার সন্তানের মতো। তাদের মাতা ভিন্ন। তাদের দীন একটিই। আর তাঁর (ঈসা) এবং আমার মাঝে কোনো নবী নেই।
[২০] শামায়েলে তিরমিযি হাদীস নং ২৮৩, فَقَالَ : ” أَنَا مُحَمَّدٌ ، وَأَنَا أَحْمَدُ ، وَأَنَا نَبِيُّ الرَّحْمَةِ ، وَنَبِيُّ التَّوْبَةِ ، وَأَنَا الْمُقَفَّى ، وَأَنَا الْحَاشِرُ ، وَنَبِيُّ الْمَلاحِمِ অর্থ- তিনি বললেন, আমি মুহাম্মদ, আমি আহমদ, আমি নবীউর রহমত (রহমতের নবী) আমি নবীউত তাওবা (তাওবার নবী), আমি মুকাফফী (পরে আগমনকারী), আমি হাশির (একত্রকারী অর্থাৎ আমার সময়ের পরপরই হাশরের ঘটনা ঘটবে), আমি মালাহিমের নবী (জিহাদকারী)।
[২১] আবু দাউদ হাদীস নং ৪২৫২, سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي كَذَّابُونَ ثَلَاثُونَ، كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيٌّ، وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لَا نَبِيَّ بَعْدِي অর্থ- অবিলম্বে আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশজন মিথ্যাবাদীর আবির্ভাব ঘটবে, তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে নবী বলে দাবী করবে। অথচ আমিই সর্বশেষ নবী এবং আমার পরে আর কোনো নবী নেই।
[২২] তিরমিযি হাদীস নং ২২৭২, ان الرِّسَالَةَ وَالنُّبُوَّةَ قَدِ انْقَطَعَتْ فَلاَ رَسُولَ بَعْدِي وَلاَ نَبِيَّ অর্থ- নিশ্চয় রিসালাত ও নবুওয়তের ধারাবাহিকতা সমাপ্ত হয়ে গেছে। অতএব, আমার পরে আর কোনো রাসূলও প্রেরিত হবে না এবং নবীও হবে না।
প্রিয়বন্ধুরা, উপরিউক্ত ২০টির-ও অধিক সহীহ হাদীসের আলোকে দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্টত প্রমাণিত যে, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে নবুওয়তের ধারাবাহিকতা সমাপ্ত হয়ে গেছে। তাই তিনি সর্বশেষ নবী ও রাসূল ৷ তাঁর পর আর কোনো প্রকারের নতুন কোনো নবীও নেই রাসূলও নেই৷
লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী শিক্ষাবিদ ও গবেষক হ্যালো-
কাদিয়ানীবন্ধুরা! অপ্রাসঙ্গিক কমেন্ট করা বাদ দিয়ে আসুন, চ্যালেঞ্জ কবুল করুন! মূল পোস্টের লিংক : ক্লিক করুন
আপনি সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত প্রশ্নটি করতে পারেন কিন্তু শতভাগ নিশ্চিত থাকুন যে, উত্তর পাবেন না! শুধু তোতাপাখির মত সেই একই কথা শুনবেন – তোমরা ঈসাকে মরিতে দাও, তবেই ইসলামের জীবন রক্ষা হবে!! আসল কথা হল, ঈসাকে মারতে পারলেই তবে মির্যা কাদিয়ানীর “রূপক ঈসা” দাবীর ষোলকলা পূর্ণ হবে! হায়রে মতলববাজ!! মতলববাজি কি সব সময় গোপন থাকবে!! কিন্তু অধিকাংশ সিজোফ্রেনিয়া পাড়ার নির্বোধ কাল্টগুলা বুঝেনা, আর বুঝানোর সাধ্যও বা আছে কার!!
এবার প্রশ্ন দুটির উত্তর দিন অন্যথা শুধু দৌড়ের ওপরে থাকুন…….
প্রশ্ন ১- পবিত্র কুরআন থেকে এমন একটি আয়াত উল্লেখ করুন যেখানে ঈসা (আ:)-এর নাম বা তৎসংশ্লিষ্ট সর্বনামপদ উল্লেখপূর্বক অতীতকালবাচক এমন কোনো ক্রিয়াপদও উল্লেখ আছে অভিধানে যেটির প্রকৃত অর্থ মৃত্যুও নেয়া হয়েছে আর মির্যা কাদিয়ানীর জন্মের পূর্বে যত যুগ ইমাম গত হয়েছেন তাদের মধ্য থেকে স্রেফ কোনো একজনও ঐ আয়াত দ্বারা ঈসা (আ:)-কে মৃত বলেছেন বা মনে করতেন! আসুন, এইরকম কোনো আয়াত যদি পেশ করতে পারেন তাহলে করুন!
প্রশ্ন ২- পবিত্র হাদীস থেকে শুধু এমন একটি হাদীস উল্লেখ করুন যেখানে ঈসা (আ:)-এর নাম বা তৎসংশ্লিষ্ট সর্বনামপদ উল্লেখপূর্বক অতীতকালবাচক এমন কোনো ক্রিয়াপদও উল্লেখ আছে অভিধানে যেটির প্রকৃত অর্থ মৃত্যুও নেয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে ঐ হাদীসটির সনদ সহ উল্লেখ করতে হবে। আপনাদের আরো সহজ করে দিচ্ছি যে, ঐ সনদটি মারফূ/মুরসাল/মওকুফ যে কোনটাই হোক, তবে সনদের (Chain of narration) কোনো রাবী তথা বর্ণনাকারী সম্পর্কে জরাহ তা’দীলের বরেণ্য কোনো মুহাক্কিকের (হাদীস-শাস্ত্রবিদ) এমন কোনো নেতিবাচক উক্তি থাকতে পারবেনা যার ফলে সনদের বিচারে ঐ হাদীসটি জাল কিংবা পরিত্যাজ্য হিসেবে গণ্য হয়!
আসুন, আমার এই চ্যালেঞ্জ কবুল করুন। যদি চ্যালেঞ্জ কবুল করতে না পারেন তাহলে এই টপিকে ত্যানা-প্যাচানো বাদ দিয়ে মির্যা কাদিয়ানীর জীবন-চরিত্র নিয়ে আলোচনায় আসুন!
প্রশ্নকর্তা : ‘ইবনে কাসীর’-এর মধ্যে উল্লেখ আছে ‘কোনো কোনো হাদীসে রয়েছে, যদি হযরত মূসা ও হযরত ঈসা (ইহ-জগতে) জীবিত থাকতেন তবে তাঁদেরও আমার আনুগত্য ছাড়া কোনো উপায় থাকত না।’ ফলে কাদিয়ানী সম্প্রদায় এই রেওয়ায়েত দিয়ে হযরত ঈসা (আ:)-কে মৃত বলে আখ্যা দেয়। এখন এর কী উত্তর?
উত্তরদাতা : প্রথমত, উক্ত বর্ণনা সম্পূর্ণ একটি সনদবিহীন। ফলে এটি আকীদাগত তো বটে; কোনো ফাজায়েল বর্ণনাতেও অথেনটিক (প্রমাণযোগ্য) নয়। যেজন্য এ সম্পর্কে কথা বলাও সময় নষ্ট। আর তর্কের খাতিরে এটি অথেনটিক মেনে নিলেও এর দ্বারা ঈসা (আ.) মৃত সাব্যস্ত হবেন না। তার কারণ, এর দ্বারা ‘ইহ-জগতে’ নবীগণের কেউই আর জীবিত নেই, বুঝানো উদ্দেশ্য। কেননা ‘আনুগত্যের’ সম্পর্ক শুধুই ইহজগতের সাথে। অধিকন্তু রাসূল (সা.)-এর অন্য একটি হাদীসে আছে, নবীগণের সবাই যার যার কবরে জীবিত ও সালাত পড়েন। হাদীসটি সহীহ (পড়ুন)। সুতরাং এতেও প্রমাণিত হল যে, ইবনে কাসীরের বর্ণনাটি দ্বারা শুধুই ‘ইহ-জগতে’ জীবিত নেই, বলে বুঝানো উদ্দেশ্য। অন্যথা সমস্ত নবী ইহজাগতিক জীবনের বাহিরে যার যার অবস্থানে প্রত্যেকে জীবিত। এ ক্ষেত্রে শুধু ঈসা (আ.) একটুখানি ব্যতিক্রম, তিনিও জীবিত, কবরে নয়, বরং আকাশে। অন্যান্য হাদীসে এর প্রমাণ বিদ্যমান।
উল্লেখ্য, ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) বর্ণনাটি সূরা আম্বিয়া আয়াত নং ৩৪ এর তাফসীর অংশে এনেছেন। (তাফসীরে ইবনে কাসীর এর মূল কিতাব অনলাইন থেকে)।
দ্বিতীয়ত, ইমাম ইবনে কাসীর (রহ:) একই পৃষ্ঠায় আরো তিনখানা হাদীস উল্লেখ করেছেন কিন্তু সেগুলোর একটিতেও ‘ঈসা’ (আ:)-এর নামের উল্লেখ নেই। কাদিয়ানীরা এই হাদীসগুলোর প্রেক্ষাপট সুকৌশলে এড়িয়ে যান। পক্ষান্তরে ইবনে কাসীর (রহ:)-এর ব্যক্তিগত অভিমতও কাদিয়ানী জ্ঞানপাপীরা উদ্ধৃত করেন না। অথচ ইবনে কাসীর কর্তৃক সনদ (সূত্র) বিহীন রেওয়ায়েতটির সংগ্রহ অথেনটিক মনে করে নয়, বরং লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে মর্মে-ই ছিল। আফসোস! নির্বোধ কাদিয়ানী জ্ঞানপাপীরা ব্যাপারটি জেনে-বুঝেই নিজ অনুসারীদের প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত করে চলছে। পবিত্র কুরআনেও অন্যদের কথাকে সংগ্রহ রূপে তুলে ধরার দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন আল্লাহতালা মুশরিকদের একটি বক্তব্য তুলে ধরেছেন এইভাবে : ‘যদি তোমরা তোমাদের মতই একজন মানুষের আনুগত্য করো, তবে তোমরা নিশ্চিতরূপেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে’ (মুমিনূন/২৩:৩৪)। এখন আপনি কি এটিকে অথেনটিক (প্রমাণ) ধরে বলতে চাইবেন যে, যেহেতু নবীগণও মানুষ ছিলেন সেহেতু আমরা তাদের আনুগত্য করে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চাই না? অবশ্যই চাইবেন না। শায়খ আ’লাভী (রহ:) তাফসীরে ইবনে কাসীরের বর্ণনাটির ‘ঈসা’ শব্দের বৃদ্ধি সম্পর্কে লিখেছেন, ولم يعزه لأحد، ولم أجده في أيٍّ من كتب الحديث التي بين يدي، وسألت عنه الألباني يرحمه الله هاتفيَّاً، فقال: إن زيادة ((عيسى)) منكرة لا أصل لها. অর্থাৎ তিনি (ইবনে কাসীর) একে কারো দিকে নেসবত করেননি। আর আমি ‘ঈসা’ সম্বলিত এমন কোনো রেওয়ায়েত আমার সামনে থাকা হাদীসের কোনো কিতাবেই (খুঁজে) পাইনি। (তাই) আমি শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ:)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেসও করেছিলাম। তিনি প্রতিউত্তরে বলেছেন, ان زيادة عيسى منكرة لا اصل لها অর্থ উক্ত বর্ণনায় ‘ঈসা’ শব্দের বৃদ্ধিকরণ মুনকার তথা অগ্রহণযোগ্য, আর এর কোনো ভিত্তিও নেই।
রেফারেন্স, তাখরীজু আহাদীস ওয়া আছার কিতাব ফী যিলালিল কুরআন (تخريج احاديث و آثار كتاب فى ظلال القرآن), শায়খ আ’লাভী বিন আব্দিল কাদের আস-সাক্বাফ (علوي بن عبد القادر السَّقَّاف)। ‘তাখরীজু আহাদীস‘ কিতাবটি দেখা যেতে পারে।
আর এতে যেন কেউ বিভ্রান্ত না হয় সেজন্য তিনি (ইবনে কাসীর) ঈসা (আ:) সম্পর্কে নিজেস্ব অভিমতও লিখে দিয়েছেন। হযরত ইবনে কাসীর (রহ:)-এর নিজেস্ব অভিমত বাদ দিয়ে ‘ঈসা’ সম্বলিত ঐ রেওয়ায়েতের সংগ্রহকে তাঁর নিজের অভিমতরূপে উপস্থিত করা নিতান্তই হীনরুচির পরিচায়ক ও তাকওয়ার খেলাফ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ইবনে কাসীরের নিজেস্ব অভিমত এই যে, তিনি তাঁর উক্ত গ্রন্থে সূরা নিসার ১৫৮-৫৯ নং আয়াতের তাফসীরে আরো বেশকিছু হাদীস উল্লেখপূর্বক শিরোনাম উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘ذكر الأحاديث الواردة في نزول عيسى بن مريم إلي الأرض من السماء في آخر الزمان قبل يوم القيامة অর্থাৎ ‘কেয়ামতের পূর্বে শেষ যুগে আকাশ থেকে পৃথিবীতে ঈসা ইবনে মরিয়ম এর অবতরণ করা বিষয়ক হাদীসগুলোর আলোচনা।’ সুতরাং কাদিয়ানীরা ইবনে কাসীরের নামে ‘ঈসা’ সম্বলিত যে অংশ উদ্ধৃত করে থাকে তা যে ইবনে কাসীরেরও কোনো অভিমত নয় তা প্রমাণ করার জন্য তাঁর এই উদ্ধৃত অংশই যথেষ্ট। স্ক্রিনশট :-
হাদীসের ঐ কথার প্রেক্ষাপট :
রাসূল (সা:)-এর ঐ কথার প্রেক্ষাপট এই যে, রাসূল (সা:) একদা হযরত উমর (রা:)-এর হাতে তাওরাতের একটি পৃষ্ঠা দেখতে পান। তখন তিনি (সা:) তাঁকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন : وَعَنْ جَابِرٌ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ أَتَاهُ عُمَرُ فَقَالَ إِنَّا نَسْمَعُ أَحَادِيثَ مِنْ يَهُودَ تُعْجِبُنَا أَفْتَرَى أَنْ نَكْتُبَ بَعْضَهَا؟ فَقَالَ: «أَمُتَهَوِّكُونَ أَنْتُمْ كَمَا تَهَوَّكَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى؟ لَقَدْ جِئْتُكُمْ بِهَا بَيْضَاءَ نَقِيَّةً وَلَوْ كَانَ مُوسَى حَيًّا مَا وَسِعَهُ إِلَّا اتِّبَاعِي» . رَوَاهُ أَحْمد وَالْبَيْهَقِيّ فِي كتاب شعب الايمان
অর্থাৎ হযরত জাবের (রা:)-এর সূত্রে নবী করীম (সা:) থেকে বর্ণিত আছে , একদা যখন উমর (রা:) তাঁর (রাসূল) নিকট এসে বললেন, আমরা ইহুদীদের কাছ থেকে এমন বহু কথা শুনি যা আমাদের অবাক করে দেয়। এখন আমরা তার কোনো কোনোটি লিপিবদ্ধ করাকে আপনি কিভাবে দেখছেন? তিনি বললেন, তোমরা কি ইহুদী ও খ্রিস্টানদের মতই দিশেহারা? আমি তোমাদের নিকট খাঁটি ও স্বচ্ছ জিনিস (দ্বীন) নিয়ে এসেছি। (আজকে) যদি মূসাও বেঁচে থাকতেন, তবে আমার অনুসরণ করা ব্যতীত তাঁর কোনো উপায় ছিল না।
সূত্র, ইমাম আহমদ এটি মসনাদে আহমদ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, ইমাম আল-বায়হাকী স্বীয় গ্রন্থের শু’আবুল ঈমান পর্বে এটি বর্ণনা করেছেন। হাদীসের মান : শায়খ আলবানী (রহ:) হাদীসটির সনদকে হাসান বলেছেন।
এখানে গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে, রাসূলের (সা:) ঐ কথায় ঈসা (আ:) এর নাম উল্লেখ থাকার কোনো কারণ নেই। যেহেতু তাওরাত কিতাব ঈসা (আ:)-এর উপর নাযিল হয়নি। অতএব, ঐ সূত্রহীন মুনকার রেওয়ায়েতটি দ্বারা ঈসা (আঃ)-কে মৃত দাবী করা সম্পূর্ণ বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য।
কাদিয়ানীরা “লূদ” শব্দকে ‘লুধিয়ানা’ বলেও অপব্যাখ্যা দেয়! অথচ সহীহ হাদীস তাদের ঐ সমস্ত ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ বিরোধী!!
কাদিয়ানীবন্ধুরা! আপনারা হাদীসের “লূদ” শব্দকে পাকিস্তানের ‘লুধিয়ানা’ কিভাবে বলতে পারেন বা আপনাদের কথিত মাহদী ও সিজোফ্রেনিয়া রোগীটাও বা এরকম একটা অপব্যাখ্যা কিভাবে দিতে পারলেন?
অথচ সহীহ হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত যে, “লূদ” হচ্ছে ফিলিস্তিনের একটি শহরের নাম। আপনি ইন্টারনেটেও সার্চ দিলে দেখবেন, একদম পরিষ্কার করে লিখা আছে যে, “লূদ বর্তমান ইসরাইল অধিকৃত ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূখন্ডের একটি ছোট শহর, যা তেলআবিব থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। ইসরাইলের প্রধানতম বিমানবন্দর বেন গুরিয়ান বিমানবন্দর এই শহরটির নিকটেই অবস্থিত।” (ইন্টারনেট)।
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ)-এর হাদীসে “লূদ” যে ফিলিস্তিনের একটি স্থান, তা পরিষ্কার ভাবে প্রমাণিত। হাদীসের আরবি উচ্চারণ — “ফিলিস্তিন বি-বাবে লূদ (فلسطين بباب لد)”।
(হাদীসটি মসনাদে আহমদ গ্রন্থেও বর্ণিত হয়েছে, রাবীদের মধ্যে ‘হাযরমি বিন লাহিক’ ছাড়া সবাই সহীহ বুখারি এবং মুসলিম শরীফের রাবী, তবে তিনিও একজন ছিকাহ বা বিশ্বস্ত রাবী)।