আমরা কিজন্য কোনো আহমদী নামের কাদিয়ানীবন্ধুকে সালাম দিই না কিংবা তাদের দেয়া “সালাম” এর উত্তর নিই না? এর জবাব স্বয়ং মির্যা কাদিয়ানী থেকেই দেয়া হল। তিনি নিজেই স্বীকার করে লিখে গেছেন যে, কাফেরদের জন্য আসসালামু আলাইকুম – শব্দচয়নে লিখা (এবং বলা) অনুচিত।
উল্লেখ্য, শায়খ হোসাইন বাটালভী রহঃ তদানীন্তন সময়কার একজন সুনামধন্য আহলে হাদীস মাসলাকের বিশিষ্ট স্কলার ছিলেন। তাঁর পূর্ণ নাম আবু সাঈদ মুহাম্মদ হোসাইন বাটালভী। তিনি আর মির্যা কাদিয়ানী দুইজনই সমবয়সী ও বাল্যবন্ধু ছিলেন। দুইজনই ‘গুল আলী শাহ’ নামক একজন শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু মির্যা কাদিয়ানী ব্রিটিশ সরকারের প্ররোচনায় খতমে নবুওয়তকে অস্বীকার করে যখনি ‘নবী’ দাবী করলেন তখনি দুইজনের পুরনো বন্ধুত্বে ফাটল ধরা শুরু করে।
শায়খ বাটালভী (রহ.) মির্যাকে বারবার বুঝাতে চেষ্টা করেন এবং ভন্ডনবী মুসাইলামা কাজ্জাবের পথ থেকে ফিরে আসতে তাগিদ দেন। নানা সময় এই নিয়ে তার নিকট পত্রও প্রেরণ করেন। কিন্তু পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের পূজারি ও দুনিয়া আসক্ত মির্যা কাদিয়ানী স্ব অবস্থানেই অটল থাকলেন। তিনি ঈমানের বিনিময়ে দুনিয়াকেই প্রাধান্য দেন এবং ব্রিটিশ বিরোধী আযাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধ শিবিরেই নাম লিখালেন এবং জিহাদের বিরুদ্ধে ফতুয়াবাজি শুরু করেন। তাপরবর্তীতে শায়খ হোসাইন বাটালভী (রহ.) সহ সকলের সম্মিলিত ফতুয়া অনুসারে মির্যা কাদিয়ানী নিঃসন্দেহে একজন মুরতাদ ও কাফের আখ্যায়িত হন। স্ক্রিনশট
কাদিয়ানিরা কাফের কেন? ডকুমেন্ট সহ জানতে পড়ুন ক্লিক
১। আপনি বলেছেন হযরত মুহাম্মদ (সা:) বলেছেন “আমার পরে নবী নাই”। আবার আপনারাই আল্লাহর নবী ঈসা নাবীউল্লাহ’র আসার অপেক্ষা করেন। এটা কি আপনাদের মোনাফেকী নয়?
২। নবীদেরকে খতম করনেওয়ালা বলতে আপনি কী বুঝেন? সব নবীই তো হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর ইন্তেকালের আগেই মারা গেছেন। তাহলে হযরত মুহাম্মদ (সা:) নবীদের খতম করলেন কিভাবে?
৩। হাদীস শরীফে ভবিষ্যতে আগমনকারী হযরত ঈসা (আ:)-কে নাবীউল্লাহ বা আল্লাহ’র নবী শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। তাহলে কি আপনি এটি মানেন যে, ঈসা (আ:) আল্লাহ’র নবীর পদে থাকবেন?
৪। পবিত্র কুরআনে ঈসা (আ:)-কে ‘রসূলান ইলা বানী ইসরাঈলা’ বলা হয়েছে। তিনি আবার যখন আসবেন তখন কি কুরআনের এই অংশ বাতিল হবে?
(বানান ও শব্দচয়ন পরিমার্জিত সহ)।
জবাব :
[১] হাদীসের ভাষ্য, লা নাবিয়্যা বা’দী (لا نبى بعدى) অর্থাৎ আমার পরে নবী নাই, এই হাদীস কাদিয়ানিরা মানে কিনা জানিনা। যদি সত্যিই মেনে থাকে তাহলে “আমার পরে” এইরূপ কথার পরেও তারা মির্যার নবুওয়ত দাবী মেনে নিতে পারে কিভাবে?
এবার প্রশ্ন মতে উত্তরে আসি। প্রশ্নকারীর উক্ত প্রশ্নটি ভুলেভরা। কেননা রাসূল (সা:) এর উক্ত ভবিষ্যৎবাণীতে আগমনকারী ঈসা (আ:) এমন একজন নবী যার পুনরায় আগমন দ্বারা নবুওয়তের দরজায় ধাক্কা লাগবেনা। কারণ তিনি নতুনভাবে নবুওয়ত প্রাপ্ত হবেন না। সুতরাং “আমার পরে” (بعدى) একথার তাৎপর্য হল, মুহাম্মদ (সা:) এর পরে আর কোনো নবীর জন্ম হবেনা। কাজেই এই হাদীস ঈসা (আ:) এর আগমনের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করেনা বলেই প্রশ্নকারীর প্রশ্নটাই পুরোপুরি অমূলক ও বাতিল।
[২] ‘খাতামুন নাবিয়্যীন’ হতে “নবীগণের খতমকারী (ختم کرنےوالا نبیوں کا)” হুবহু এই অর্থ মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীও নিয়েছেন। দেখুন, রূহানী খাযায়েন ৩/৪৩১। এখন এর কী মর্মার্থ সেটিও আমি মির্যা কাদিয়ানীর বই থেকে দিচ্ছি। মির্যা সাহেব পরিষ্কার লিখেছেন, ‘ওয়া লা-কির রাসূলাল্লাহি ওয়া খাতামান নাবিয়্যীন’ আয়াতাংশও এই কথার সত্যায়ন করে থাকে যে, প্রকৃতপক্ষে আমাদের নবীর উপর নবুওয়ত খতম বা শেষ হয়ে গেছে। দেখুন কিতাবুল বারিয়্যা, রূহানী খাযায়েন ১৩/২১৭-১৮। সুতরাং যা বুঝার বুঝতে পেরেছেন। তাই এর বেশি আমি আর কিছু বলতে চাই না।
[৩] দারুন প্রশ্ন করেছেন। কাদিয়ানীদের জন্য দুঃসংবাদ হল এই হাদীসটিতে আগমনকারী ঈসা (আ:)-কে রাসূল (সা:) ‘নাবীউল্লাহ ঈসা ইবনে মরিয়ম‘ (نبى الله عيسى بن مريم বা আল্লাহর নবী ঈসা ইবনে মরিয়ম) শব্দে সম্বোধন করা। এতেই সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, যার আগমন করা সম্পর্কে হাদীসে উল্লেখ আছে তিনি নিশ্চিতভাবে কোনো রূপক ব্যক্তি নন। বরং তিনি এমন একজন যিনি ইতিপূর্বে নাবীউল্লাহ তথা আল্লাহর নবী ছিলেন। সুবহানাল্লাহ। এর প্রমাণ হল, হাদীসে আগমনকারী ঈসা (আ:) সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণীটা শপথবাক্য সহকারে বর্ণিত হওয়া। ফলে হাদীসে উল্লিখিত ঈসা দ্বারা রূপক কাউকে বুঝাবেনা। কেননা, শপথ বাক্য সহকারে বর্ণিত ভবিষ্যৎবাণীর বিষয়টি নিশ্চিতভাবে হাকিকি অর্থে উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। আর এই একই কথা খোদ মির্যা কাদিয়ানীও লিখে গেছেন। দেখুন, হামামাতুল বুশরা (বাংলা) পৃষ্ঠা নং ২৭। সুতরাং প্রশ্নকারীর মগজে এগুলো লোড না নিলে তাতে আমাদের আফসোস করা ছাড়া আর কী বা করার আছে!
[৪] পবিত্র কুরআনে রাসূলান ইলা বনী ইসরাঈলা – উল্লেখ আছে বলেই তো আমরা (মুসলিম উম্মাহা) সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করি যে, তার দ্বিতীয়বারের আগমন হবে “(مصدقا بمحمد و على ملته) মুছাদ্দিকান বি মুহাম্মাদিন ওয়া আ’লা মিল্লাতিহি” অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা:)-এর রেসালতের সত্যায়নকারী এবং একজন উম্মত হিসেবে। এককথায় উনার পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসাটা নবুওয়তের দায়িত্ব সহকারে হবে না, বড়জোর একজন ন্যায়পরায়ণ প্রশাসক ও শরীয়তে মুহাম্মদীর উপর আমলকারীরূপে হবে। সুতরাং প্রশ্নকারী একজন নির্বোধ বলেই এ সমস্ত অর্বাচীন টাইপের প্রশ্ন করেছে। সত্য বলতে এসব প্রশ্নের অধিকাংশই পাকি কাদিয়ানী মহারথী রাবওয়ার মুবাশ্বির আহমদ খালনের মত মালাউনদের নাপাক মগজ থেকে উগরানো বৈ নয়।
যাইহোক, কাদিয়ানীদেরই উক্ত প্রশ্নের আলোকে আমিও তাদেরকে পালটা প্রশ্ন করতে চাই, সূরা আস-সাফ এর ৬ নং আয়াতে ঈসা (আ:)-এর ভবিষ্যৎবাণীটা এভাবে এসেছে যে, (يأتى من بعدى إسمه احمد) ‘ইয়াতি মিম বা’দিসমুহু আহমদ’ অর্থাৎ তার (ঈসা) পর আহমদ (তথা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নামীয় ব্যক্তি আগমন করবেন। তাই প্রশ্ন আসে, উক্ত ভবিষ্যৎবাণী শীর্ষক আয়াতটি কি বর্তমানে বাতিল বলে গণ্য হবে? নাউযুবিল্লাহ। যেহেতু যার আসার কথা তিনি গত ১৪শ বছর আগেই এসে গেছেন! এখন এর কী জবাব?
বিদগ্ধ হাদীস বিশারদদের দৃষ্টিতে “ওয়া লাল মাহদী ইল্লা ঈসা ইবনে মরিয়ম” – খন্ডিত অংশের বর্ণনাটি কিজন্য দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য, জানতে পড়ুন!
সম্প্রতি ব্রাদার রাহুল ভাইয়ের একটি ভিডিও এর জবাবে কাদিয়ানীদের বর্তমান ন্যাশনাল আমীর জনাব আব্দুল আউয়াল সাহেবের চরম খেয়ানত ও প্রতারণাপূর্ণ বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত জবাব এটি। কারণ তিনি উক্ত বর্ণনাটিকে সহীহ প্রমাণ করতে নানা মিথ্যা, খেয়ানত আর হটকারিতাপূর্ণ চতুরতার আশ্রয় নিয়েছেন। যা একজন জ্ঞানপাপীর পক্ষেই সম্ভব!
প্রাসঙ্গিক লিখা দুটি পড়া জরুরি – (১) ওয়া লাল মাহদী ইল্লা ঈসা ইবনু মরিয়াম – হাদীসের খণ্ডাংশটির সঠিক অর্থ Click
(২) প্রকৃত ইমাম মাহদী আর কাদিয়ানিদের মির্যা গোলাম আহমদ এই দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্য গুলো Click
পর্ব ১
ওয়া লাল মাহদী ইল্লা ঈসা ইবনে মরিয়ম – খণ্ডিত অংশের এই বর্ণনাটি সূত্রের বিচারে সমস্ত হাদীস বিশারদের মতে যঈফ তথা দুর্বল । একথা লিখেছেন, বিশিষ্ট যুগ ইমাম মোল্লা আলী ক্বারী (রহঃ)। (মেরকাত, কিতাবুল ফিতান, বাবু আশরাতিস সা’আহ باب أشراط الساعة, ভলিয়ম নং ১০)।
বর্ণনাটির সনদ বা চেইন প্রসঙ্গে
উক্ত বর্ণনাটি যে চেইনে (Chain/সনদ) বর্ণিত হয়েছে সেখানে সূত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা না হওয়ার সমস্যা বিদ্যমান। তেমনি সূত্রের “মুহাম্মদ বিন খালিদ আল জানাদী” একজন অজ্ঞাত ও অপরিচিত ব্যক্তি বলেও অধিকাংশ হাদীস বিশারদ মত ব্যক্ত করেছেন। তাছাড়া ইমাম যাহাবী’র মীযানুল ই’তিদাল কিতাবে পরিষ্কার করে এই দুটি কথাও উল্লেখ আছে যে, (ভিন্ন আরেকটি চেইন হিসেবে – লিখক) সূত্রের “আবান ইবনে সালেহ” এইধরনের কোনো বর্ণনা “হযরত হাসান বসরী” থেকে শ্রবণ করা প্রমাণিত নয়। তেমনি এই সূত্রের “ইউনুস ইবনে আব্দুল আ’লা” নামক রাবীও হযরত ইমাম শাফেয়ী থেকে শ্রবণ করেননি। মজার ব্যাপার হল, ইমাম শাফেয়ীও এধরণের কোনো বর্ণনা “মুহাম্মদ বিন খালিদ আল জানাদী” হতে শ্রবণ করেননি। ইমাম ইয়াহইয়া বিন মাঈন (রহ:) নিজেও একথা বলেছেন বলে ইমাম যাহাবী এবং ইমাম ইবনে ছুলাহ (মৃত. ৬৪৩ হিজরী) দুইজনই লিখে গেছেন। সুতরাং এইরূপ বহু কারণে উক্ত বর্ণনাটি দলিল প্রমাণ হিসেবে অগ্রহযোগ্য। কারো কারো মতে বানোয়াটও। এবার বিস্তারিত।
এবার বর্ণনাটির অন্যতম সমালোচিত বর্ণনাকারী “মুহাম্মদ বিন খালিদ আল জানাদী”-محمد بن خالد الجندى সম্পর্কে যুগ বিখ্যাত হাদীস বিশারদদের মতামত দেখুন:-
১- ইমাম আবুল ফাতহ আল আযদী : তার বর্ণনার পেছনে পড়া যাবেনা। ২- ইমাম আবু আব্দুল্লাহ হাকেম নিশাপুরী : সে একজন মাজহুল (অজ্ঞাত) বর্ণনাকারী। ৩- ইমাম বায়হাক্বী : সে একজন অজ্ঞাত বর্ণনাকারী। ৪- শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ : তার বর্ণনা দ্বারা দলিল দেয়া যাবেনা। ইমাম শাফেয়ীর কিতাব ‘মুসনাদে শাফেয়ী’-এর মধ্যে এই হাদীস নেই। ৫- সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাকারক ইবনে হাজার আসকালানী : সে একজন অজ্ঞাত বর্ণনাকারী। ৬- ইমাম ইবনে কাসীর : সে মাজহুল নন যেমনটি ইমাম হাকেম (রহ:) মনে করেন। বরং ইবনে মাঈন থেকে বর্ণিত আছে, তিনি তাকে ছিকাহ আখ্যা দিয়েছেন (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)। ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.)-এর এই বক্তব্যে সাধারণদের জন্য বিভ্রান্ত হবার কোনো কারণ নেই। কেননা ইবনে মাঈন (রহ.)-এর ঐ বক্তব্যটি ইবনে মাঈনের নামে প্রচার হলেও সেটি প্রকৃতপক্ষে অপ্রমাণিত। যেজন্য স্বয়ং ইমাম যাহাবী (রহ.) নিজেও এটি লিখার সময় والله اعلم বা আল্লাহই ভালো জানেন, বলে লিখে গেছেন। এ সম্পর্কে আরও জানতে পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
এই পর্যায় কাদিয়ানী আমীর জনাব আব্দুল আউয়াল সাহেব যে জঘন্য খেয়ানত আর প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন সেটি নিচে উল্লেখ করা হল,
তিনি ইবনে মাঈন (রহ.) এর নাম ভেঙ্গে ইবনে কাসীর (রহ.)-এর উদ্ধৃতিতে ঐ কথাটি খুব জোরালোভাবে উল্লেখ করলেও ইবনে মাঈনের বক্তব্যের পরের অংশটি আস্তে করে এড়িয়ে যান। ইবনে মাঈন থেকে ঐ একই বক্তব্যের শেষাংশে এটিও লিখা আছে و روى عنه ثلاثة رجال سوى الشافعي অর্থাৎ আর তার কাছ থেকে ইমাম শাফেয়ী ব্যতীত তিন ব্যক্তিই বর্ণনা করত। (দেখুন, ইমাম যাহাবী’র মীযানুল ই’তিদাল ৩/৫৩৫ দ্রষ্টব্য)।
এতে সুস্পষ্ট প্রমাণিত হল যে, ঐ “লাল মাহদী” – ওয়ালা বর্ণনাটির সূত্র মুনকাতি তথা বিচ্ছিন্ন। কেননা মুহাম্মদ ইবনে খালিদ আল জানাদি থেকে ইমাম শাফেয়ী কিছুই বর্ণনা করেননি বলে খোদ ইবনে মাঈন (রহ.) থেকেও প্রমাণিত। সুতরাং কাদিয়ানীদের জন্য মোটেও উচিত হবেনা যে, ইবনে মাঈন (রহ.)-এর সম্পূর্ণ বক্তব্যের কিছু অংশ বাদ দিয়ে আর কিছু অংশ নেয়া! এটি মস্তবড় খেয়ানত (জালিয়াতি) নয় কি? তাই জনাব আব্দুল আউয়াল তার এই জালিয়াতির জন্য অন্তত স্বজাতির নিকট ক্ষমা চাওয়া উচিত! কেননা তার অনুসারীদের অনেকে এমনও রয়েছেন যারা সরলমনে তার কথা বিনাবাক্যে বিশ্বাস করে ফেলেন!
৭- ইমাম যাহাবী : এই বর্ণনা মুনকার বা অগ্রহণযোগ্য। সনদে উল্লিখিত ইউনুস নামক ব্যক্তি হযরত শাফেয়ী থেকে এই বর্ণনা শুনেনি। ৮- বিশিষ্ট হাদীস বিশারদ ইমাম আব্দুর রহমান ইবনে ইয়াহইয়া আল-মু’আল্লিমী : و لم يثبت هذا عن ابن معين অর্থাৎ হযরত ইয়াহইয়া বিন মাঈন হতে তার ছিকাহ (বিশ্বস্ত) হওয়ার কথাটি প্রমাণিত নয়। ৯- রিজালশাস্ত্রের হেভিওয়েট স্কলার ইমাম ছাগানী : এই বর্ণনা মওদ্বু বা বানোয়াট। ১০- ইমাম নাসাঈ : সে (মুহাম্মদ বিন খালিদ আল জানাদী) একজন মুনকার বা অগ্রহণযোগ্য। ১১- ইমাম ইবনু আব্দিল বার : তিনি দুর্বল এবং মাতরূক বা পরিত্যাজ্য এবং و لا يثبت هذا الحديث অর্থাৎ এটি হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়। ১২- ইমাম ত্বীবি (রহ:) খণ্ডিত অংশের অর্থ করেছেন, معناه لا مهدى كاملا معصوما إلا عيسى بن مريم অর্থাৎ এর অর্থ হল, তখন ঈসা ইবনে মরিয়ম-ই একজন নিষ্পাপ ও পরিপূর্ণ সুপথপ্রাপ্ত হবেন (মেরকাত কিতাবুল ফিতান, টীকা দ্রষ্টব্য)।
রেফারেন্স : ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী’র তাহযীবুত তাহযীব ৯/১২৬; আল আ’মালী, ইমাম ইবনে ছুলাহ ৪৮-৫২; ইমাম যাহাবী’র মীযানুল ই’তিদাল ৩/৫৩৫।
বিস্তারিত ২য় পর্বে আসছে। সবাই লিখাটি প্রচার করে মিথ্যাবাদী আর প্রতারকদের মুখোশ উন্মোচন করে দিন।
অর্থাৎ আবূ খায়সামা যুহায়র ইবনু হারব (অন্য সনদে) মুহাম্মাদ ইবনু মিহরান রাবী (রহঃ) … নাওয়াস ইবনু সামআন (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা সকালে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করলেন। আলোচনাকালে তিনি কখনো আওয়াজ ছোট করলেন, আবার কখনো আওয়াজ বড় করলেন। ফলে আমরা মনে করলাম যে, দাজ্জাল বৃক্ষরাজির এ ঝাড়ের মধ্যেই বুঝি এসে পড়েছে। অতঃপর আমরা সন্ধ্যায় আবার তাঁর নিকট গেলাম। তিনি আমাদের মাঝে এর কিছু আলামত দেখতে পেয়ে বললেন, তোমাদের কি অবস্থা? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি সকালে দাজ্জাল সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং এতে আপনি কখনো আওয়াজ ছোট করেছেন, আবার কখনো বড় করেছেন। ফলে আমরা মনে করেছি যে, দাজ্জাল বুঝি এ ঝাড়ের মধ্যেই বিদ্যমান। এ কথা শুনে তিনি বললেন, দাজ্জাল নয়, বরং তোমাদের ব্যাপারে অন্য কিছুর আমি অধিক আশংকা করছি।
শোনো, আমি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় যদি দাজ্জালের আবির্ভাব হয় তবে আমি নিজেই তাকে প্রতিহত করব। তোমাদের প্রয়োজন হবে না। আর যদি আমি তোমাদের মাঝে না থাকা অবস্থায় দাজ্জালের আবির্ভাব হয়, তবে প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি নিজের পক্ষ হতে একে প্রতিহত করবে। প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আল্লাহ তাআলাই হলেন আমার পক্ষ হতে তত্ত্বাবধায়ক। দাজ্জাল যুবক এবং কোঁকড়া চুল বিশিষ্ট হবে। তার চক্ষু হবে স্ফীত আঙ্গুরের ন্যায়। আমি তাকে কাফির আবদুলউযযা ইবনু কুতনের সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করছি। তোমাদের যে কেউ দাজ্জালের সময়কাল পাবে সে যেন সূরা কাহাফের প্রথমোক্ত আয়াতসমূহ পাঠ করে। সে ইরাকওসিরিয়ার মধ্যপথ হতে আবির্ভূত হবে। সে ডানে-বামে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। হে আল্লাহর বান্দাগণ! অবিচল থাকবে।
আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সে পৃথিবীতে কত দিন অবস্থান করবে? উত্তরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, চল্লিশ দিন পর্যন্ত। এর প্রথম দিনটি এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিন এক মাসের সমান এবং তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের সমান হবে। অবশিষ্ট দিনগুলো তোমাদের দিনসমূহের মতই হবে।
আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! যেদিন এক বছরের সমান হবে, উহাতে এক দিনের সালাতই কি আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে? জবাবে তিনি বললেন, না, বরং তোমরা এদিন হিসাবে ঐ দিনের পরিমাণ নির্ধারণ করে নিবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! দাজ্জাল পৃথিবীতে তার গতির দ্রুততা কেমন হবে? তিনি বললেন, বাতাসে পরিচালিত মেঘের ন্যায়। সে এক সম্প্রদায়ের নিকট এসে তাদেরকে কুফুরীর দিকে আহবান করবে। তারা তার উপর ঈমান আনয়ন করবে এবং তার ডাকে সাড়া দিবে। অতঃপর সে আকাশকে হুকুম করবে। আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে এবং ভূমিকে নির্দেশ দিবে, ভূমি গাছ-পালা ও শষ্য উদগত করবে।
এরপর সন্ধ্যায় তাদের গবাদী পশুগুলো পূর্বের তূলনায় অধিক লম্বা, কুঁ’জ, প্রশস্ত স্তন এবং উদরপূর্ণ অবস্থায় তাদের নিকট ফিরে আসবে। অতঃপর দাজ্জাল অপর এক সম্প্রদায়ের নিকট আসবে এবং তাদেরকে কুফুরীর প্রতি আহবান করবে। তারা তার কথাকে উপেক্ষা করবে। ফলে সে তাদের নিকট হতে ফিরে চলে যাবে। অমনি তাদের মাঝে দুর্ভিক্ষ ও পানির অনটন দেখা দিবে এবং তাদের হাতে তাদের ধন-সম্পদ থাকবে না। তখন দাজ্জাল এক পতিত স্থান অতিক্রমকালে উহাকে সম্বোধন করে বলবে, তুমি তোমার গুপ্তধন বের করে দাও। তখন যমীনের ধন-ভাণ্ডার বের হয়ে তার অনুগমন করবে, যেমন মৌমাছি তাদের সর্দারের অনুগমন করে।
অতঃপর দাজ্জাল এক যুবক ব্যক্তিকে ডেকে আনবে এবং তাকে তরবারি দ্বারা আঘাত করে তীরের লক্ষ্যস্থলের ন্যায় দু’ফাঁক করে ফেলবে। অতঃপর সে পুনরায় তাকে ডাকবে। যুবক দীপ্তমান হাস্যোজ্জল চেহারায় তার দিকে এগিয়ে আসবে। এ সময় আল্লাহ রাববুল আলামীন মরিয়মের পুত্র ঈসা (আলাইহিস সালাম)-কে প্রেরণ করবেন। তিনি দুই হাত দুই ফিরিশতার ডানায় রেখে দুইটি হলুদ বর্ণের চাদর পরিধান করে দামেশক নগরীর পূর্ব প্রান্তে শ্বেত মিনারের নিকটে অবতরণ করবেন। যখন তিনি তার মাথা ঝুঁকাবেন তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম তাঁর শরীর থেকে গড়িযে পড়বে। তিনি যে কোনো কাফিরের নিকট যাবেন সেই তাঁর শ্বাসের বাতাসে ধ্বংস হয়ে যাবে। তাঁর দৃষ্টি যতদুর পর্যন্ত যাবে তাঁর শ্বাসও ততদূর পর্যন্ত পৌছবে। তিনি দাজ্জালকে তালাশ করতে থাকবেন। অবশেষে তাকে লূদ নামক পটকের কাছে পেয়ে যাবেন এবং তাকে হত্যা করবেন। অতঃপর ঈসা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঐ সম্প্রদায়ের নিকট যাবেন, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা দাজ্জালের ফিতনা থেকে হিফাজত করেছেন। তাদের নিকট গিয়ে তিনি তাদের চেহারায় হাত বুলিয়ে জান্নাতে তাদের স্থানসমূহ সম্পর্কে সংবাদ দিবেন।
এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর প্রতি এ মর্মে ওহী (ইলহাম) করবেন যে, আমি আমার এমন কিছু বিশেষ বান্দা আবির্ভূত করছি, যাদের সাথে কারোরই যুদ্ধ করার ক্ষমতা নেই। সুতরাং তুমি আমার বান্দাদের তূর পর্বতে সমবেত কর। তখন আল্লাহ তাআলা ইয়াজুয-মাযুয সম্প্রদায়কে প্রেরণ করবেন। তারা প্রতিটি উঁচু ভূমি হতে ছুটে আসবে। তাদের প্রথম দলটি তবরিস্তান উপসাগরের নিকট এসে এর সমুদয় পানি পান করে নিঃশেষ করে দিবে। অতঃপর তাদের সর্বশেষ দলটি এ স্থান দিয়ে যাত্রাকালে বলবে, এ সমুদ্রে এক সময় অবশ্যই পানি ছিল। তারা আল্লাহর নবী ঈসা (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর সঙ্গীদেরকে অবরোধ করে রাখবে। ফলে তাদের নিকট একটি বলদের মাথা বর্তমানে তোমাদের নিকট একশ দিনারের মূল্যের চেয়েও অধিক উৎকৃষ্ট প্রতিপন্ন হবে।
তখন আল্লাহর নবী ঈসা (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর সঙ্গীগণ আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। ফলে আল্লাহ তা’আলা ইয়াজুয-মাজুজ সম্প্রদায়ের প্রতি আযাব প্রেরণ করবেন। তাদের ঘাড়ে এক প্রকার পোকা হবে। এতে একজন মানুষের মৃত্যুর ন্যায় তারাও সবাই মরে খতম হয়ে যাবে। অতঃপর ঈসা (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর সঙ্গীগণ পাহাড় হতে যমীনে নেমে আসবেন। কিন্তু তারা অর্ধ হাত জায়গাও এমন পাবেন না যেথায় তাদের পঁচা লাশ ও লাশের দুর্গন্ধ নেই। অতঃপর ঈসা (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর সঙ্গীগণ পুনরায় আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবেন। তখন আল্লাহ তাআলা উটের ঘাড়ের ন্যায় লম্বা এক ধরনের পাখি প্রেরণ করবেন। তারা তাদেরকে বহন করে আল্লাহর ইচ্ছা মাফিক স্থানে নিয়ে ফেলবে।
এরপর আল্লাহ এমন মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন যার ফলে কাঁচা-পাকা কোনো ঘরই তাকে বাধাগ্রস্ত করবে না। এতে যমীন বিধৌত হয়ে পরিচ্ছন্ন পিচ্ছিল মৃত্তিকায় পরিণত হবে। অতঃপর পুনরায় যমীনকে এ মর্মে নির্দেশ দেয়া হবে যে, হে যমীন! তুমি আবার শস্য উৎপন্ন কর এবং তোমার বরকত ফিরিয়ে দাও। সেদিন একদল মানুষ একটি ডালিম ভক্ষণ করবে এবং এর বাকলের নিচে লোকেরা ছায়া গ্রহণ করবে। দুধের মধ্যে বরকত হবে। ফলে দুগ্ধবতী একটি উটই ছোট ছোট অনেক গোত্রের জন্য যথেষ্ট হবে, দুগ্ধবতী একটি গাভী এক বড় গোত্রীয় মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে এবং যথেষ্ট হবে দুগ্ধবতী একটি বকরী এক দাদার সন্তানের (গোষ্ঠীর) জন্য। এ সময় আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত আরামদায়ক একটি বাতাস প্রেরণ করবেন। এ বাতাস সমস্ত ঈমানদার লোকদের বগলে গিয়ে লাগবে এবং সমস্ত মুমিন মুসলমানদের রুহ কবয করে নিয়ে যাবে। তখন একমাত্র মন্দ লোকেরাই এ পৃথিবীতে বাকি থাকবে। তারা গাধার ন্যায় পরস্পর একে অন্যের সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে। এদের উপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে। (অনুবাদ শেষ হল)।
পরিশেষ, মুসলিম শরীফের উক্ত হাদীসটি কাদিয়ানী জামাতের আমীর বা নেতৃত্বস্থানীয় কেউ কি পুরোটা আপনাদের কখনো পড়িয়ে শুনিয়েছিলেন? আমার বিশ্বাস, উত্তর হবে ‘না’। কেন পড়িয়ে শুনান না, তা এবার নিশ্চয়ই বুঝে আসার কথা। কেননা হাদীসটিতে চার চার বার ঈসা নাবীউল্লাহ এসেছে ঠিক, কিন্তু হাদীসটি পুরোপুরি যার পড়াশোনা আছে অন্তত সে ভালো ভাবেই বুঝতে পারবে যে, এই নাবিউল্লাহ বলতে ভারতের চেরাগ বিবির ছেলে মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী কোনোভাবেই উদ্দেশ্য হতে পারেনা। ফলে তার নবী দাবীকে বৈধতা দিতে হাদীসটির ‘চার চার বারের ঈসা নাবিউল্লাহ’-এর প্রসঙ্গ টানারও কোনো অর্থ থাকেনা। নতুবা হাদীসটির অন্যান্য বর্ণনাসমূহের কী অর্থ? সেগুলোও মির্যার সাথে মিলিয়ে দেখানো কি সম্ভব? মজার ব্যাপার হল, মির্যা কাদিয়ানী নিজের মুখেই স্বীকার করে লিখে গেছে যে, নবুওয়তি ওহীর দ্বার বন্ধ। যেমন তিনি লিখেছেন,
অর্থাৎ “তাদের পরিষ্কার জানা আছে যে, আমরাও নবুওয়তের দাবীদারের প্রতি অভিশাপ দিই এবং লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ-এর প্রবক্তা এবং হযরত (সা:) এর খতমে নবুওয়তের উপর ঈমান রাখি এবং ওহীয়ে নবুওয়ত (وحى نبوت) বন্ধ তবে (আমরা) ওহীয়ে বেলায়তের (وحى ولايت) প্রবক্তা যেটি মুহাম্মদ (সা:)-এর নবুওয়তকে আশ্রিত করে ও তাঁরই অনুকরণে আউলিয়ায়ে কেরামের অর্জিত হয়ে থাকে। যে আমাদের প্রতি এর চেয়ে বেশি কোনো কথার অভিযোগ করবে সে যেন তাকওয়া আর সততাই পরিত্যাগ করল।” (মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত খ-২ পৃষ্ঠা ২৯৭-৯৮; নতুন এডিশন)।
এখন প্রশ্ন আসে,
(১) তাহলে মির্যা সাহেব নবী রাসূল দাবী করতে পারেন কিভাবে?
(২) এমনকি মুসলিম শরীফের “নাবীউল্লাহ” শব্দকে আশ্রিত করে কিভাবে বলতে পারলেন যে, যেহেতু আগত ঈসাকে হাদীসে নাবীউল্লাহ বলা হয়েছে সেহেতু তিনি (মির্যা সাহেব) ঈসা দাবীর ভিত্তিতে একজন নবীও? জ্ঞানীদের নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলবে।
(কাদিয়ানীরা তাদের মির্যা গোলাম আহমদের স্ববিরোধী কথার পক্ষে ওকালতি করতে গিয়ে হাদীসের মধ্যেও অসঙ্গতি থাকার মিথ্যা আপত্তি পেশ করে, এখানে এমনি একটি অভিযোগ উল্লেখপূর্বক খণ্ডন করা হবে, ইনশাআল্লাহ)
প্রশ্নকর্তা (কাদিয়ানী) :- মির্যা সাহেবের কথায় স্ববিরোধিতা খোঁজেন অথচ আপনাদের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কথাতেও স্ববিরোধিতা ছিল! যেমন তিনি এক জায়গায় (সুনানু তিরমিজী, হাদীস নং ৩২৪৫) বলেছেন, তাঁকে যে ইউনুস ইবনে মাত্তা (আ.) অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলবে সে মিথ্যা বলল (وَمَنْ قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى فَقَدْ كَذَبَ)। আবার আরেক জায়গায় (সহীহ মুসলিম হাদীস নং ২২৭৮) বলেছেন, তিনি কেয়ামত দিবসে সকল বনী আদমের সাইয়েদ বা নেতা হবেন (أَنَا سَيِّدُ وَلَدِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ)। এখন এর কী জবাব?
অভিযোগ খণ্ডন, কাদিয়ানীদের জন্য দুঃসংবাদ এই কারণে যে, তাদের কাদিয়ানের কৃষ্ণ ও নবুওয়তের দাবীদার মির্যা সাহেবও উক্ত অভিযোগের জবাবে লিখেছেন, “যদি ঐ হাদীসগুলো সহীহও হয় তবু তাঁর ঐ কথা (শুধুমাত্র) বিনয় প্রদর্শনের জন্যই ছিল (وہ بطور انکسار اور تزلل ہے)।” (দেখুন, রূহানী খাযায়েন ৫/১৬৩ মির্যায়ী রচনাসমগ্র)। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি :-
মির্যায়ী রচনাসমগ্র
এখন বিনয় প্রদর্শনের জন্য কোনো বিশেষ মর্যাদাবান ব্যক্তি যদি বলেন যে, তোমরা আমাকে কারো চাইতে শ্রেষ্ঠ বলোনা, তবে কি তিনি এমন কথায় স্ববিরোধী প্রবক্তা বলে অভিযুক্ত হবেন? অন্তত মির্যা কাদিয়ানীর দৃষ্টিকোণ থেকেও উত্তর হবে, না; তিনি অভিযুক্ত হবেন না। এখন প্রশ্ন হল, মির্যা কাদিয়ানী সাহেব যে সমস্ত বক্তব্যের কারণে অভিযুক্ত সেগুলোও কি বিনয় সংক্রান্ত? নিশ্চয়ই না। এবার হাদীস দুটোর ব্যাখ্যায় আসি,
মেশকাত কিতাবের শরাহ মেরকাতের লিখক মোল্লা আলী (রহ.) লিখেছেন, “রাসূল (সা.)-এর বাণী ‘যে বলবে আমি ইউনুস ইবনে মাত্তা অপেক্ষা উত্তম…’ এই কথাটি মূলত নবুওয়তের ক্ষেত্রে ধর্তব্য হবে। ফলে তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, যে ব্যক্তি বলবে আমি ইউনুস ইবনে মাত্তা অপেক্ষা নবুওয়তের ক্ষেত্রেও উত্তম তবে সেই ব্যক্তি মিথ্যা বলল। কেননা নবীগণের সকলে নবুওয়তের মর্যাদায় এক ও অভিন্ন। তবে কতিপয় সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষত্বতা নিশ্চয়ই রয়েছে (أَيْ: فِي النُّبُوَّةِ :(مَنْ قَالَ: أَنَا خَيْرٌ مِنْ يُونُسَ بْنِ مَتَّى لَقَدْ كَذَبَ) لِأَنَّ الْأَنْبِيَاءَ كُلَّهُمْ مُتَسَاوُونَ فِي مَرْتَبَةِ النُّبُوَّةِ، وَإِنَّمَا التَّفَاضُلُ بِاعْتِبَارِ الدَّرَجَاتِ)।” দেখুন, মেরকাত খণ্ড নং ৯, হা/ক্রমিক নং ৩৬৪৫। এই একই ব্যাখ্যা ইমাম কুরতুবী (রহ.)-এর কাছ থেকেও প্রমাণিত। তিনি লিখেছেন, অবশ্যই নবীগণের এককে অন্যের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিতে নিষেধ রয়েছে। আর তা নিশ্চিতভাবে ও শুধু কেবল নবুওয়তের ক্ষেত্রে। যেহেতু নবুওয়তের ক্ষেত্রে সবার মান সমান। তাতে কেউ অন্যের উপর শেষ্ঠত্ব রাখেনা। অধিকন্তু শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে, কতেক বিশেষত্ব, সম্মান আর দয়ার আধিক্যতার ক্ষেত্রে (ان المعنى من التفضيل. انما هو من جهة النبوة التى هى خصلة واحدة لا تفاضل فيها. و التفضيل فى زيادة الاحوال و الخصوص و الكرمات و الالطاف)। দেখুন, আল-মুয়াসওআ’তুল ফিকহিয়্যাহ [الموسوعة الفقهية] ৪০/৪৯, কিতাবটি অনলাইনে সর্বমোট ৪৫ খণ্ডে পাওয়া যায়; গ্রন্থনা ও প্রকাশনায়, আওকাফ ও ইসলামিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়, কুয়েত।
অতএব আমরা প্রমাণ করে দিলাম যে, রাসূল (সা.)-এর কথায় সামান্যতমও স্ববিরোধিতার চাপ নেই। কাজেই মির্যা সাহেবের অগণিত মিথ্যা আর অসঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্যের পক্ষে ওকালতি করার জন্য রাসূল (সা.)-এর দিকে আঙুল উঠাবেন না। এটি নিঃসন্দেহে একজন সত্য নবী ও রাসূলের শানে চরম বেয়াদবির শামিল। পরিশেষে কাদিয়ানীদের প্রতি আমার প্রশ্ন, মির্যা কাদিয়ানীর যেসব কথাবার্তায় স্ববিরোধিতার অভিযোগ করা হয় সেগুলাও কি বিনয় সম্পর্কিত? আফসোস! ব্রেইন ওয়াশ কাল্টদের বুঝানোর সাধ্য কার!
মির্যায়ী খলীফা হেকিম নূরুদ্দীন সম্পর্কে একটি জঘন্য মিথ্যাচার ও তার খন্ডন
কিছুদিন আগের কথা। জনৈক আহমদী (কাদিয়ানী) আমাকে বললেন, তাদের (অর্থাৎ কাদিয়ানীদের) প্রথম খলীফা হেকিম নূরুদ্দীন (১৮৪১-১৯১৪ইং) নাকি দেওবন্দেও পড়াশোনা করেছিল!
আমি প্রথমে কিছুক্ষণ হাসলাম তারপর তাকে প্রতিউত্তরে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাকে এই উদ্ভট কথা কে শুনাল? উত্তরে বললেন, আমাদের মু’আল্লিমরাই তো আমাদের বলেছেন!
আমি বললাম, তাহলে বলুন তো হেকিম নূরুদ্দীনের জন্ম কত সালে? তিনি বললেন, ১৮৪১ সালে। আমি তাকে বললাম, দারুল উলুম দেওবন্দ কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা জানেন?
বললেন, না; তা তো জানিনা!!
বললাম, ৩১ মে, ১৮৬৬ সালে। আর তখন হেকিম নূরুদ্দীন ২৫ বছরের একজন টগবগে যুবক। তাহলে এবার নিজেই চিন্তা করুন, দারুলউলুম দেওবন্দ (সাহারানপুর জেলা) যখন সবেমাত্র শিশু; মাত্র একখানা ডালিম গাছের নিচে আলিফ বা তা ছা জীম…পাঠদানের মাধ্যমে হাতে গুণে কয়েকজন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করল সেখানে ২৫ বছরের যুবক হেকিম নূরুদ্দীন কেন ভর্তি হবেন? হলে, কোন ক্লাশে হবেন? আপনাদের যুক্তি কী বলে? বিষয়টি পুরোই হাস্যকর নয় কি? দারুলউলুম দেওবন্দ সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন।
এটি হেকিম নূরউদ্দীন এর জীবনীগ্রন্থ। এখানে লিখা আছে, তিনি শাহ আব্দুল গণী (রহ.)-এর নিকট মদীনায় উপস্থিতহন। সুতরাং এতেও পরিষ্কার হল যে, নূরউদ্দীন শাহ সাহেবের ছাত্র হলেও তদ্দ্বারা তিনি দেওবন্দের ছাত্র হওয়াকে প্রমাণ করেনা। কেননা দেওবন্দ মদীনায় নয়, ভারতে (সাহারানপুর জেলা) অবস্থিত।
হেকিম নূরুদ্দীন মূলত একজন জেনারেল শিক্ষিত। তিনি একাডেমিক পদ্ধতিতে ভারতবর্ষের কোনো দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে পড়েছেন বলে প্রমাণিত নয়। তার বাড়ী হল, পাঞ্জাবের শাহপুর জেলার ভেরা নামক স্থানে। তিনি জীবনে কখনো কোনো মাদরাসায়ও পড়েছিলেন বলে জানা যায়না। তবে যতটুকু জানা যায় তা হল, তিনি একজন জেনারেল লাইনের পড়ুয়া এবং স্বীয় পিতা আর বড় ভাই সোলতান আহমদের সহযোগিতায় প্রাইভেট শিক্ষকদের মাধ্যমে ধর্মীয় কিছু বই পুস্তক অধ্যায়ন করেছিলেন মাত্র। সুতরাং তার দেওবন্দে পড়াশুনা করার তথ্যটি একদমই অসত্য এবং ডাহামিথ্যে।
হেকিম নূরুদ্দীন সম্পর্কে জানা যায় যে, তার বয়স যখন ১৬ বা ১৭ তখন তাকে রাওয়ালপিন্ডিতে ‘নর্মাল স্কুলে’ ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। সেখানে ৪ বছর পড়াশুনা শেষে তিনি মাত্র ২১ বছর বয়সে শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত হন। ভেরা শহরের কয়েক মাইল দূরে ঝিলাম নদীর ওপারে অবস্থিত শহর পীন্ডদাদন খান স্কুলের প্রধান শিক্ষক হন। তিনি সেখানে ৪ বছর ছিলেন। সেখান থেকে চলে এসে আগেরমত আবার ঘরোয়াভাবে নিজে নিজে বইপত্র পড়া আরম্ভ করেন আরো প্রায় দুই বছর পর্যন্ত। তার বয়স যখন ২৭ বছর পূর্ণ হল তখন তিনি লাহোর যান এবং সেখান থেকে পদব্রজে রামপুর যান উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে। তিনি সেখানে প্রায় ৩ বছর ছিলেন।
তারপর তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে অধ্যয়নের জন্য লক্ষ্ণৌর হাকীম আলী হোসেনের নিকট চলে যান। তখন তার বয়স ত্রিশের কোটায়। সেখানে ২ বছর অবস্থান করেন। তিনি তার তেত্রিশ বছর বয়সে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে মিরাঠে যান। তারপর ভূপালে যান। তারপর দিল্লি যান। সেখান থেকে হিজাজে। হিজাজ থেকে তিনি নিজ শহর ভেরায় ফিরে এসে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত হন। তারপর তিনি একটি সময়ের ব্যবধানে কাশ্মীরের মহারাজার প্রধান চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পান। তখন তার বয়স ছত্রিশের কোটায় । হেকিম নূরুদ্দীন সাহেব মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর সাথে প্রথম যখন সাক্ষাৎ করেন তখন তার বয়স ছিল তেতাল্লিশ বছর (১৮৮২ সাল)। এ তথ্যগুলো মির্যায়ী ঘরানার রচনাবলী হতেই এখানে উল্লেখ করেছি। (দেখুন, মোহাম্মদ জাফরুল্লাহ খান রচিত ‘হযরত মৌলভী নূরউদ্দিন খলীফাতুল মসীহ আউয়াল’ পৃষ্ঠা নং ১৩-৩৭)।
তাহলে এখন বলুন, এমতাবস্থায় হেকিম নূরুদ্দীন সাহেব দারুলউলুম দেওবন্দ (সাহারানপুর জেলা) কখন গেলেন? সুতরাং সস্তা জনপ্রিয়তা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে দারুলউলুম দেওবন্দের নামে এই ধরণের অসত্য আর অযুক্তিক প্রচারণা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
মির্যা কাদিয়ানীর ৫ খণ্ডে প্রকাশিত “মালফুযাত” গ্রন্থের ৫ নং খন্ডের ২১ নং পৃষ্ঠাটি দেখলেই বুঝা যাবে যে, সে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে কিভাবে হটকারিতার আশ্রয় নিয়েছিল। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি নিম্নরূপ। আজকের এ লিখাটিতে ইমাম মাহদীর পরিচয় সম্পর্কে তার বিভ্রান্তিকর লিখনীর খণ্ডনমূলক উত্তর দেয়া হবে।
মির্যার আপত্তি –
১. কেউ বলে থাকেন ইমাম মাহদী ফাতেমী হবেন অর্থাৎ তিনি ফাতেমা (রা.) এর বংশে জন্মিবেন।
২. কেউ বলেন, তিনি আব্বাসী হবেন অর্থাৎ তিনি হযরত আব্বাস ইবনে আবী তালিবের বংশে জন্মিবেন।
৩. কেউ বলেন, তিনি (হাসানী এবং) হোসাইনী হবেন অর্থাৎ তিনি হযরত (হাসান এবং) হোসাইন (রা.) এর বংশে জন্মিবেন।
অর্থাৎ উম্মু সালামাহ (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, মাহদী আমার পরিজন থেকে ফাতিমার সন্তানদের বংশ থেকে আবির্ভূত হবে। আব্দুল্লাহ ইবনু জা‘ফর বলেন, আমি আবুল মালীহকে আলী ইবনু নুফাইলের প্রশংসা করতে এবং তার গুণাবলী বর্ণনা করতে শুনেছি।
উল্লেখ্য, মির্যা কাদিয়ানীর বক্তব্য হল, “হযরত মাহদী সম্পর্কে ফাতেমার সন্তান থেকে তাঁর আগমনী যে সংবাদ হাদীস সমূহে এসেছে আমি সেই হাদীসে বর্ণিত মাহদী নই।”
দেখুন, রূহানী খাযায়েন ২১/৩৫৬।
২। ইমাম মাহদী হযরত আব্বাস (রা.)-এর বংশেও হবেন কিভাবে তা বুঝে নিন! প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদী পিতার দিক থেকে ফাতেমা (রা.)-এর পুত্র হযরত হাসান এবং নবীজীর চাচা হযরত আব্বাস উভয়ের বংশধর হবেন। কেননা হযরত হাসানের সাথে হযরত আব্বাসের পুত্র আল-ফজলের মেয়ে উম্মে কুলছুমের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে জন্মগ্রহণ করেন মুহাম্মদ আল-আসগর, জাফর, হামজা এবং ফাতেমা।
দেখুন তবক্বাতে ইবনে সা’আদ ৬/৩৫২।
এমতাবস্থায় এই উম্মে কলছুমের যে কোনো সন্তানের ঔরস থেকে ইমাম মাহদীর পিতা জন্ম গ্রহণ করার দ্বারা তিনি প্রকারান্তরে হযরত আব্বাস (রা.)-এর ঔরস থেকেও জন্ম লাভ করলেন বলে গণ্য হবেন! সুতরাং ১ আর ২ নং এর মাঝে আর কোনো মতানৈক্য রইল না।
৩। ইমাম মাহদী হযরত ইমাম হাসান এবং হোসাইন উভয়েরই বংশ থেকেও হওয়া কিভাবে সম্ভব তাও বুঝে নিন! ইতিপূর্বে তো জানলেন যে, প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদী পিতার দিক থেকে ফাতেমা (রা.)-এর পুত্র হযরত হাসান (রা.)-এর ঔরস থেকে হবেন। এখন জেনে নেব যে, ইমাম মাহদী হযরত হোসাইন (রা.)-এর বংশেও হতে পারা সম্ভবপর কিভাবে? এর জবাব হল, ইমাম হাসান আর ইমাম হোসাইন দু’জনের সন্তানদের মধ্যকার বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ইতিহাস যাদের ভালোভাবে জানা আছে তারা কখনোই এ জাতীয় বর্ণনা দ্বারা বিভ্রান্ত হবেনা।
ইতিহাস প্রমাণ করে যে, ইমাম হোসাইন বিন আলী (রা.) এর একটি কন্যা ছিলেন ফাতেমা। তার বিয়ে হয়েছিল ইমাম হাসান বিন আলীর পুত্র হাসান আল মুছান্নাহ (৩৭-৯৭ হিজরী)-এর সাথে। হাসান আল মুছান্নাহ’র মায়ের নাম ছিল খাওলাহ বিনতে মানযূর। তাদের সংসারে জন্মগ্রহণ করেন, আব্দুল্লাহ আল-মুহায, ইবরাহীম আল-গুমার, হাসান আল-মুছাল্লাছ প্রমুখ। (সূত্র : মুনতাহিল আ-মা-ল ফী তাওরীখিন নাবী ওয়াল আ-ল, ১/৬৫১-৫৩; শায়খ আব্বাস আল-ক্বিম্মী)।
আপনাদেরকে আরও একটি তথ্য দেব। হযরত হাসান বিন আলী (রা.) এর ‘ফাতেমা‘ নামে একজন কন্যা ছিল। তাঁকে বিয়ে দেয়া হয় ইমাম হোসাইন (রা.) এর পুত্র আলী যয়নুল আবেদীন এর সাথে। সে ঘরে প্রায় ষোলজন সন্তান সন্ততি জন্ম লাভ করেন। তাই নিশ্চিত ভাবে বিশ্বাস করতে পারি যে, এরই বৈবাহিক সূত্রধরে আগত ইমাম মাহদীর পিতা একই সঙ্গে হাসানী এবং হোসাইনী দুটোই হবেন। ফলে তাদের সংসারে জন্মগ্রহণকারী প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদী একই সঙ্গে হাসানী এবং হোসাইনী হওয়াও সম্ভব। সুতরাং উল্লিখিত সলিউশনের বিচারে ইমাম মাহদী একই সঙ্গে ফাতেমী, আব্বাসী, হাসানী এবং হোসাইনী সবই হতে পারেন! এতে কোনোভাবেই বৈপরীত্য নেই।
৪। ইমাম মাহদী জন্মিবেন, একথা দ্বারা মির্যা সাহেব হাদীসের মধ্যে কী ধরণের বৈপরীত্য থাকার আপত্তি তুললেন আমার জানা নেই। যেহেতু আমরা মুসলমানরাও বিশ্বাস করি যে, প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদী জন্মিবেন আর প্রতিশ্রুত ঈসা মসীহ (আ.) আকাশ থেকে নাযিল হবেন।
৫। ইমাম মাহদী গুহা হতে প্রকাশিত হবেন, এটা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের কনসেপশন নয়। বরং এই ধরণের প্রবক্তাদের মতে ঐ মাহদীর জন্ম আজ হতে ১১৮৭ চন্দ্রবছর আগে ২২৫ হিজরিতে ইরাকের (বর্তমান রাজধানী বাগদাদের উত্তরে) পবিত্র সামেরা শহরে হয়েছিল। নাম মুহাম্মদ আল মাহদী। পিতার নাম ইমাম হাসান আল আসগরি। সুতরাং ডালেচালে খিঁচূড়ি পাকানোর কোনো কারণ নেই।
উল্লেখ্য, আনুমানিক ১৮৪৪ সালে শীয়া মতবাদ থেকে বিচ্ছিন্ন বাহাই ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন যে আলী মুহাম্মদ বা’ব ছিলেন পুনরাবির্ভূত দ্বাদশ ইমাম ও মাহদী।
৬। উম্মতের মধ্য হতে হবেন, একথা দ্বারাও মির্যা সাহেব হাদীসের মধ্যে কী ধরণের বৈপরীত্য থাকার আপত্তি তুললেন আমার জানা নেই। মির্যা কাদিয়ানী যদি এখন বেঁচে থাকতেন তাহলে আমি তাকে জিজ্ঞেস করতাম যে, আহলে বাইয়েতের সদস্যগণ কি উম্মতে মুহাম্মদীয়ার গণ্ডীর বাহিরে? নিশ্চয়ই না। এখানে ঐ বর্ণনাটি দ্বারা সূক্ষ্মভাবে প্রমাণিত হয় যে, ইমাম মাহদী আর ঈসা দুইজনই আলাদা দুই চরিত্রের। নতুবা হাদীসে ‘তিনি জন্মিবেন’ একথা অর্থ কী? নিশ্চয়ই এর অর্থ হল, ইমাম মাহদী আর ঈসা একই চরিত্রের হবেন না, বরং তাদের একজন নাযিল হবেন আর অন্যজন জন্মিবেন! অতএব, বৈপরীত্য থাকার আপত্তি পুরোই বাগাড়ম্বর বৈ নয়।
৭। ঈসা (আ.)-ই মাহদী, একথা দ্বারা তো তখনি হাদীস সমূহের মধ্যে বৈপরীত্য থাকার আপত্তি সঠিক হত যদি এই বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য হত। মির্যা কাদিয়ানী নিজেই তো তার “হামামাতুল বুশরা” (বাংলা অনূদিত) গ্রন্থের ১৬১ নং পৃষ্ঠায় একে দূর্বল, ক্রটিপূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য বলে লিখে গেছেন।
অতএব, বুঝা গেল প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদীর মাতা কিংবা পিতার বংশক্রম ইমাম হাসান এবং ইমাম হোসাইন দুইজনের সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই কোনো কোনো বর্ণনায় ইমাম মাহদীর বংশ হিসেবে ইমাম হোসাইন (রা.)-এরও উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রধানতম কারণ এটাই। গভীরভাবে চিন্তা করলে যে কেউই বুঝতে পারবে যে, হাদীসগুলোর কোনো কোনোটির সনদের মধ্যে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও মূলত মতনের ক্ষেত্রে কোনো বৈপরীত্য নেই। সংক্ষেপে।
হাদীস শরীফ বাতিল ও গুরুত্বহীন সাব্যস্ত করতে কাদিয়ানী এবং মুনকিরীনে হাদীস গোষ্ঠী কর্তৃক পবিত্র কুরআনের আয়াতের বিকৃত অনুবাদ ও নিকৃষ্টতর অপব্যাখ্যা আর তার খন্ডন :
খন্ডনমূলক জবাব : প্রথমে ওদের পক্ষ হতে আয়াতটির বিকৃত অনুবাদ উল্লেখ করছি। তারপর ইসলামিক ফাউণ্ডেশন হতে প্রকাশিত কুরআনুল কারীমের অনুবাদগ্রন্থ হতে সূরা জাশিয়া’র ৬ নং আয়াতটিসহ উপর থেকে কয়েকটি আয়াতের অনুবাদ-ও তুলে ধরা হবে যাতে পূর্বাপর সবগুলো আয়াতের সমন্বিত সারকথা উপলব্ধি করতে সহজ হয়। আসুন, প্রথমে ৬ নং আয়াতটি দেখে নিই। আল্লাহতালা বলেন,
কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বইতে এর বিভিন্ন অনুবাদ দেখা যায়। একটি জায়গায় তারা এর অর্থ করেছে,
“ওই সব আল্লাহ’র আয়াত, যা আমি আপনার নিকট যথাযথভাবে উল্লেখ করছি। অতএব, আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর তারা কোন হাদীসকে বিশ্বাস করবে?”
কিন্তু মজার ব্যাপার হল, তাদের প্রকাশিত কুরআনের অনুবাদকৃত কপিতে উক্ত আয়াতটির অনুবাদ করা হয় আরেক ভাবে যেটি ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত’ তথা মূলধারার মুসলমানদের অনুবাদের একদমই কাছাকাছি কিংবা হুবহু একই। এই যে তাদের সেই অনুবাদ নিম্নরূপ:-
“এইগুলি আল্লাহ’র নিদর্শন যাহা আমরা তোমার প্রতি যথাযথভাবে বর্ণনা করিতেছি। অতএব তাহারা আল্লাহ ও তাহার নিদর্শনাবলীর (অস্বীকার করার) পর কোন কথার উপর ঈমান আনিবে।” স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য:-
এবার যুক্তিক খন্ডনমূলক জবাব :
হাদীস অস্বীকারকারীরাই মূলত পবিত্র কুরআনের উল্লিখিত আয়াতের উদ্দেশ্যমূলক ও বিকৃত অনুবাদ দাঁড় করে বলে থাকে যে, “দেখ দেখ! আল্লাহতালা নিজেই বলছেন, তারা আয়াত বাদ দিয়ে কোন হাদীসের উপর বিশ্বাস রাখতে চায়!” বুঝা গেল, হাদীস গুরুত্বহীন, বরং কুরআনই সব। শুধু কুরআন হলেই চলবে, হাদীসের গুরুত্ব নেই। নাউযুবিল্লাহ। এরা আসলে দলিল প্রমাণের দিক থেকে পুরোপুরি দেউলিয়া, সম্পূর্ণ মিসকিন। হাদীসের কষ্টিপাথরেই এরা বাতিল সাব্যস্ত হয়ে যায় বলেই এরা এইরকম বিকৃত অনুবাদ আর শয়তানি যুক্তি দিয়ে হাদীসের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলার স্পর্ধা দেখায়। সত্যি বলতে সব বাতিল পন্থীর এই একই বৈশিষ্ট্য, হাদীসকে তারা পথের কাঁটা হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে।
তো এবার সূরা আল-জাশিয়ার ঐ ৬ নং আয়াতের তাৎপর্য কী?
উত্তরে বলতে চাই, সূরা আল জাশিয়ার ৬ নং আয়াতে ‘আয়াত’ এবং ‘হাদীস’ শব্দ দুইখানা আক্ষরিক অর্থে যথাক্রমে ‘নিদর্শনাবলী‘ এবং ‘কথা বা বাণী‘ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যার দরুন, ঐ ‘আয়াত’ (ايات) শব্দকে ‘আয়াতে কুরআনী’ আর ‘হাদীস’ (حديث) শব্দকে ‘হাদীসে নববী’ উদ্দেশ্য নেয়া সম্পূর্ণ ভুল। উক্ত সূরার ৩ থেকে ৫ নং আয়াতের বর্ণনাভঙ্গি আর সেটি নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপটের বিচারে হাদীস অস্বীকারকারীদের ঐ ধরনের মর্থার্থ শতভাগ কুরআনের ভেতর তাহরিফ তথা বিকৃতিরই শামিল।
এবার জানার বিষয় হল, উক্ত সূরার আয়াত নং ৩ হতে ৫ এর মধ্যেও কি “আয়াত” (ايات) শব্দ রয়েছে?
উত্তরে বলা হবে যে, জ্বী হ্যাঁ রয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সেগুলোর কোনো একটিও ‘আয়াতে কুরআনী’ অর্থে উদ্দেশ্য নেয়া হয়না। তদ্রূপ ৬ নং আয়াত (فَبِاَیِّ حَدِیۡثٍۭ بَعۡدَ اللّٰہِ وَ اٰیٰتِہٖ یُؤۡمِنُوۡنَ)-এর মধ্যেও যে ‘আয়াত’ (ايات) শব্দ রয়েছে সেটিও একইভাবে ‘আয়াতে কুরআনী’ অর্থে উদ্দেশ্য হবেনা। এবার সূরা আল-জাশিয়ার আয়াত নং ৩-৬ পর্যন্ত সবগুলোর অনুবাদ দেখুন! ইসলামিক ফাউণ্ডেশন থেকে প্রকাশিত অনুবাদ কপি দ্রষ্টব্য।
আয়াতগুলোর অনুবাদ :-
সূরা আল জাশিয়া আয়াত নং ৩। “নিশ্চয় আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে নিদর্শন (আয়াত/اٰیٰتُ) রয়েছে মুমিনদের জন্য।”
সূরা আল জাশিয়া আয়াত নং ৪। “তোমাদের সৃষ্টিতে এবং জীবজন্তুর বিস্তারে নিশ্চিত নিদর্শন (আয়াত/اٰیٰتُ) রয়েছে বিশ্ববাসীর জন্য।”
সূরা আল জাশিয়া আয়াত নং ৫। “নিদর্শন (আয়াত/اٰیٰتُ) রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য, দিবারাত্রির পরিবর্তনে এবং আল্লাহ আকাশ থেকে রিযিক (বৃষ্টি) বর্ষণ দ্বারা; জমিনকে তার মৃত্যুর পর তদ্দারা পুনর্জীবিত করেন এবং বায়ুর পরিবর্তনে।”
খেয়াল করুন, সূরা আল-জাশিয়ার ৬ নং আয়াতের উপরোল্লিখিত ৩-৫ নং পর্যন্ত সবগুলো আয়াতের মধ্যে “আয়াত” শব্দের উল্লেখ রয়েছে। যেখানে সবগুলোর “আয়াত” শব্দ দ্বারা ‘নিদর্শন বা নিদর্শনাবলী’-ই উদ্দেশ্য। এরপরের লাইনেই অর্থাৎ ৬ নং আয়াতেই আল্লাহতালা বলেন,
যার সঠিক অনুবাদ হল, ওই সব আল্লাহ’র নিদর্শন (আয়াত), যা আমি আপনার নিকট যথাযথভাবে আবৃত্তি করছি। অতএব, আল্লাহ ও তাঁর নিদর্শনাবলীর পর তারা (কাফেররা) কোন কথায় বিশ্বাস করবে?
প্রিয় কাদিয়ানী অবুঝ ভাই ও বোনেরা! এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, আপনাদের তথাকথিত আহমদী মুরুব্বী নামের ভদ্রলোকগুলো হাদীসকে গুরুত্বহীন সাব্যস্ত করতে কুরআনের আয়াতকে কত নিষ্ঠুরভাবে বিকৃত করে উপস্থাপন করে দরাকে সরা বানাচ্ছেন!
পরিশেষে আমার একটি প্রশ্ন!
আমরা আয়াতটির শানে নুযূল দ্বারা বুঝতে পারলাম যে, আয়াতটির ঐ কথাগুলো বিশেষ করে মক্কার মুশরিকদের উদ্দেশ্যেই ছিল। তাদেরকেই বলা হয়েছিল যে,
“আল্লাহর নাযিল করা এই কুরআন, যাতে রয়েছে তাঁর একত্ববাদের বহু প্রমাণাদি, যদি তারা এর উপরও ঈমান না আনে, তবে আল্লাহর কথাকে বাদ দিয়ে কার কথার উপর এবং তাঁর নিদর্শনাবলীকে ছেড়ে আর কোন্ এমন নিদর্শন আছে যার উপর তারা ঈমান আনবে?” (তাফসীর দ্রষ্টব্য)। এখন প্রশ্ন হল,
কাফের আর মুশরিকরা যে জায়গায় কুরআনের বাণীই অমান্য করে যাচ্ছে, অবাধে আল্লাহর সাথে কুফুরি আর শিরকে লিপ্ত রয়েছে সেখানে তাদেরকে হাদীস শরীফের গুরুত্ব দেখানোর যুক্তিকতা কিসের? আল্লাহ’র বাণী
এর মধ্যে…… তারা কোন হাদীসের উপর বিশ্বাস করবে, এখন এর কী তাৎপর্য দাঁড়াল? এতে কি কাদিয়ানীদের কথা অনুসারে একথা বোধগম্য হচ্ছেনা যে, মনে হয় কাফের আর মুশরিকদের নিকট তখন আয়াতে কুরআনী অপেক্ষা হাদীসের প্রতি টানটা বেশি ছিল! যার দরুন তাদের উদ্দেশ্যে সতর্কতা জারি করে বলতে হল যে, “আল্লাহ’র আয়াতকে বাদ দিয়ে তারা কোন হাদীসকে বিশ্বাস করবে!!
খুবই হাস্যকর!!
কথা এখানেই সমাপ্ত করছি। সত্যের অনুসন্ধানীদের জন্য প্রকৃত বিষয়টি এতটুকুতেই যথেষ্ট হবে বলেই আমার বিশ্বাস। ওয়াসসালাম।
সারা দুনিয়ায় কাদিয়ানীরা সংখ্যায় কত, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেয়ে আমি মির্যায়ী রচনাবলি থেকে নানা সময়ের নানা রকম যেসমস্ত গোঁজামিল তথ্যের মুখোমুখি হলাম তা নিচে উল্লেখ করছি।
১৯৯৩-২০০৫ ইং বাইয়াতের নামে ধোকাবাজিঃ
সম্প্রতি একটি হিসেব :
প্রাসঙ্গিক আলোচনায় যাওয়ার আগে কাদিয়ানীদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট www.alislam.org এর একটি পৃষ্ঠার স্ক্রিনশট এখানে তুলে ধরছি। পাতাটি দেখতে ক্লিক করুন। এখানে এই ১০ মিলিয়নের হিসেবটি ২০০৩ সালের পরের। এখানে পরিষ্কার উল্লেখ আছে, সারা বিশ্বে তারা সংখ্যায় মাত্র ১০ মিলিয়ন বা ১ কোটি আর তাদের জামাত ২০০টি দেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
মির্যা কাদিয়ানীর সময়কার হিসেব :
১। মির্যা কাদিয়ানী সাহেব তার জীবদ্দশায় ১৯০৮ সালে লিখেছেন, মোট আহমদী (কাদিয়ানী) জনসংখ্যা তিন লাখের কাছাকাছি। (বারাহীনে আহমদীয়া পঞ্চম খন্ড, রূহানী খাযায়েন ২১/১০৮)।
২। মির্যা কাদিয়ানী সাহেব তার জীবদ্দশায় ১৯০৭ সালে লিখেছেন, মোট আহমদী (কাদিয়ানী) জনসংখ্যা কয়েক লাখ। (হাকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন ২২/৫৭০, টিকা)।
৩। মির্যা কাদিয়ানী সাহেব তার জীবদ্দশায় ১৯০৫ সালে লিখেছেন, মোট আহমদী (কাদিয়ানী) জনসংখ্যা চার লাখ। (চশমায়ে মা’আরিফত, রূহানী খাযায়েন ২৩/৪০৬)।
৪। মির্যা কাদিয়ানী সাহেব তার জীবদ্দশায় ১৯০২ সালে লিখেছেন, মোট আহমদী (কাদিয়ানী) জনসংখ্যা এক লাখের চেয়ে বেশি। (তুহফাতুন নাদওয়া, রূহানী খাযায়েন ১৯/১০১)।
এখানে হিসেবের গোজামিলটা হল, ১৯০২ সালে বললেন এক লাখের চেয়ে একটু বেশি। আবার ১৯০৫ সালে যে সংখ্যাটি মির্যার দাবী অনুসারে চার লাখ, সেই সংখ্যা ১৯০৮ সালে মাত্র তিন লাখের কাছাকাছি! গোঁজামিল হয়ে গেল না? আমার জানার বিষয় হল, সামনের দিকে না বেড়ে বরং পেছনে ব্রেক মারল কেন?
৫। মির্যা কাদিয়ানী সাহেব তার জীবদ্দশায় ১৮৯৯ সালে লিখেছেন, মোট আহমদী (কাদিয়ানী) জনসংখ্যা দশ হাজারের চেয়ে একটু বেশি। (রূহানী খাযায়েন ১৩/৪২২)। কিন্তু তিনি দুই বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৮৯৭ সালে লিখেছেন, তার প্রতিষ্ঠিত নতুন ফেরকাটির মোট জনসংখ্যা তিন শত আট (৩০৮) জন। (জরুরাতুল ইমাম, রূহানী খাযায়েন ১৩/৫১৪)। তিনি আবার ১৯০০ সালে লিখেন, মোট আহমদী (কাদিয়ানী) জনসংখ্যা ত্রিশ হাজারের কাছাকাছি। (রূহানী খাযায়েন ১৭/২৮)। এখানে প্রশ্ন হল, যেই সংখ্যাটি তিন বছর আগে মাত্র ৩০৮ ছিল সেটি মাত্র ৩ বা ৪ বছরের ব্যবধানে কিভাবে ৩০,০০০ হতে পারে? আচ্ছা তাও না হয় মানলাম, কিন্তু ১৯০২ সালে সেই সংখ্যা এক লাখের-ও অধিক বলে যে দাবীটা করা হল সেটি কিভাবে মানা যায়? যদি ব্যাপারটা এমনই হত তাহলে সেই সময়কার মিডিয়াগুলোয় এই নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশিত হয়নি কেন?
এবার বর্তমান সময়ের হিসেব :
৬। মোট আহমদী জনসংখ্যা ১১ মিলিয়ন অর্থাৎ ১ কোটি ১০ লক্ষ। (সূত্র, আহমদীয়া গ্রেজেট, তারিখ জুন ১৯৯৫ ইং)। মির্যা তাহের আহমদ এর সময়কার তাদেরই একটি অফিসিয়াল শুমারি। কিন্তু মির্যা তাহের আহমদ এর মৃত্যুর পর ইংল্যান্ড থেকে তাদের নতুন শুমারি অনুসারে আহমদী জনসংখ্যা ২০০ মিলিয়ন অর্থাৎ ২০ কোটি বলে প্রকাশ করা হয়। (সূত্র, প্রেস রিলিজ, তাং ০৯-সেপ্টেম্বর-২০০৩ ইং)। এখন প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক, যে সংখ্যাটি ৯ বছর আগে মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ সেটি মাত্র ৯ বছরের ব্যবধানে তবে কি রকেটে চড়েই ২০ কোটিতে পৌঁছলো? মিথ্যাচারের-ও একটা লিমিট থাকা চাই!
৭। মোট আহমদী (কাদিয়ানী) জনসংখ্যা কয়েক মিলিয়ন অর্থাৎ ২০০ মিলিয়ন (২০ কোটি)। এর অধিকাংশই পাকিস্তানে। (সূত্র, কাদিয়ানীদের অফিসিয়াল দৈনিক আল ফজল, ৪ই জুন ২০১২ ইং পাতা ৪, কলাম ১)।
স্ক্রিনশট
এটি তাদের দৈনিক আল ফজল পত্রিকা। তাং ৪-৬-২০১২ ইং। ৪ নং পাতার ১নং কলাম দ্রষ্টব্য। এখানে পরিষ্কার করে লিখা আছে, ২০১২ সালে তারা নাকি সংখ্যায় ২০০ মিলিয়নে পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ ২০ কোটিতে তারা পৌঁছে গেছেন। আর এরই অধিকাংশ নাকি পাকিস্তানে!
এখানে বলে রাখতে চাই যে, লন্ডন থেকে ডক্টর সাদাত সাহেব থেকে একটি রিপোর্টে উল্লেখ আছে যে, ২০১৮ সালের জুলাইয়ে পাক ইসলামাবাদ হাইকোর্টের চীফ জাস্টিস শওকত আজীজ সিদ্দিকি সাহেবের নেতৃত্বে পাক হুকুমতের পক্ষ হতে কাদিয়ানীদের উপর চালানো আদম শুমারীর রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তানে আহমদীদের (কাদিয়ানীদের) মোট জনসংখ্যা ১ লক্ষ ৪২ হাজার। উল্লেখ্য, পাক লাহোরের জেহলম জেলার সাবেক কাদিয়ানী নায়েবে সদর আমীর প্রফেসর মালিক মনোয়ার আহমদ সাহেব ২০০১ সালে সপরিবারে ইসলাম কবুল করার পর একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বর্তমানে পাকিস্তানে কাদিয়ানীরা সংখ্যায় কোনোভাবেই আড়াই লাখের বেশি হবেনা। এরা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে অর্থাৎ ব্রিটিশ, কানাডা, জার্মান, সুইডেন, নাইজেরিয়া, তানজানিয়া, নাইজার, ঘানা-সহ আফ্রিকার দেশ সমূহে কাদিয়ানী মতবাদের প্রচারকার্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
আমি তাদের ২০ কোটি সংখ্যা দাবী নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। যেহেতু এসব তাদের ব্যাপার। কিন্তু আমার আপত্তি হল, তাদের একখানা গোঁজামিল হিসেব নিয়ে। তারা বলল, তারা ২০০ মিলিয়ন আর তার অধিকাংশই নাকি পাকিস্তানে। তাহলে এবার হিসেব কষে নিন! যদি তারা ২০০ মিলিয়ন তথা ২০ কোটি হন তাহলে তাদেরই কথা অনুসারে অন্তত অধিকাংশ বাদ দিলাম, শুধু অর্ধেকটাই ধরি; তখন পাকিস্তানে তারা সংখ্যায় দাঁড়াচ্ছে ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি। আর যদি তাদের কথা অনুসারে অধিকাংশই ধরি, তাহলে আরো ১ বা ২ কোটি যুক্ত করে মোট ১১ অথবা ১২ কোটি ধরতে হচ্ছে। এখন আমার প্রশ্ন হল, সত্যিই কি কাদিয়ানী সম্প্রদায় সংখ্যায় পাকিস্তানে ঐ ১১ বা ১২ কোটি?? কখনোই নয়। উল্লেখ্য, বর্তমানে পাকিস্তানে জনসংখ্যা মোট ১৮ কোটি! তাহলে এবার জেনে নেয়া যাক, আন্তর্জাতিক বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ায় পাকিস্তানে কাদিয়ানীদের সংখ্যা নিয়ে কাদিয়ানীদেরই প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে কী লিখা আছে! উইকিপিডিয়ায় লিখা আছে, বর্তমানে পাকিস্তানে কাদিয়ানীরা সংখ্যায় ৪ মিলিয়ন অর্থাৎ ৪০ লক্ষ! (যদিও প্রকৃত হিসেবে তারা কোনো ভাবেই দেড় লাখের বেশি হবেনা – লিখক)।
এখন তাহলে হিসেব কিভাবে মিলাবেন? যদি ২০০ মিলিয়নের মধ্যে অধিকাংশই পাকিস্তানে থেকে থাকে তাহলে ঐ ৪০ লক্ষ দ্বারা কিভাবে ১১ বা ১২ কোটির হিসেব চুকাবেন? এসব মিথ্যা আর প্রতারণা নয় কি? সাধারণ কাদিয়ানীদেরকে এসব মিথ্যা আর গোঁজামিল দিয়ে আর কতকাল ধোকা দেবেন আপনারা? আপনাদের পুরো গেইমটাই কি এসব মিথ্যা আর গোঁজামিল দ্বারা বুমেরাং হয়ে গেল না??
৮। মোট আহমদী (কাদিয়ানী) জনসংখ্যা ১৫০ মিলিয়ন (১৫ কোটি)। (সূত্র, কাদিয়ানীদের অফিসিয়াল দৈনিক আল ফজল, ২৪ই অক্টোবর ২০১৩ ইং পাতা ৪, কলাম ৪)।
এখানে প্রশ্ন দাঁড়ায়, যেই সংখ্যাটি ২০১২ সালে ২০ কোটি সেই সংখ্যা পরবর্তী বছরে অর্থাৎ ২০১৩ সালে মাত্র ১৫ কোটি কেন হবে? তাহলে বাকি ৫ কোটি কি কাদিয়ানী ছেড়ে চলে গেল?
৯। মোট আহমদী (কাদিয়ানী) জনসংখ্যা ২০০ মিলিয়ন (২০ কোটি)। জামাত বিস্তৃত হয়েছে এমন রাষ্ট্র সংখ্যা মোট ১৭৩ টি। (সূত্র, ইংলিশ মিডিয়া “প্রেস রিলিজ” লন্ডন, তাং ৭ই জুলাই ২০০৫ ইং। কাদিয়ানীদের লন্ডন ভিত্তিক নিজেস্ব কেন্দ্রীয় তথ্য প্রকাশ।
১০। মোট আহমদী (কাদিয়ানী) জনসংখ্যা ৮০ মিলিয়ন (৮ কোটি)। জামাত বিস্তৃত হয়েছে এমন রাষ্ট্র সংখ্যা মোট ১৯২ টি। (সূত্র, ইংলিশ মিডিয়া “প্রেস রিলিজ” লন্ডন, তাং ১৭ই আগস্ট ২০০৯ ইং)। কাদিয়ানীদের লন্ডন ভিত্তিক নিজেস্ব কেন্দ্রীয় তথ্য প্রকাশ। এখানেও একই প্রশ্ন, ২০০৫ সালে যে সংখ্যাটি ২০০ মিলিয়ন হবে সেই সংখ্যাটি পরবর্তী ৪ বা ৫ বছরের মাথায় সামনের দিকে না বেড়ে বরং মাত্র ৮০ মিলিয়নে এসে কেন দাঁড়াল? তবে কি বাকি ১২০ মিলিয়ন গায়েব হয়ে গেল? সমীকরণ তো মিলেনা! কাদিয়ানী নেতারা অন্তত নিচের এই হিসেবেটিরও কী উত্তর দেবেন? প্রেস রিলিজ এর স্ক্রিনশট :-
আনুমানিক ১৯৬০ সালের দিকে কাদিয়ানীদের শীর্ষ মুরুব্বি পাকবংশোদ্ভূতজালালুদ্দিন আশ-শামস কর্তৃক এই রচনা-সমগ্রটির রূপ দেয়া হয়। যাতে মির্যার বইগুলো এক সঙ্গে একই পান্ডুলিপিতে খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। এর বর্তমান রিপ্রিন্ট সন ২০০৮ ইং।