Home Blog Page 16

ইমামগণের রচনায় খতমে নবুওয়ত প্রসঙ্গ ও ভ্রান্তি নিরসন

ইমামগণের কিতাব থেকে কাদিয়ানীদের কিছু প্রসঙ্গবহির্ভূত উদ্ধৃতি ও আমাদের পর্যবেক্ষণ

কাদিয়ানীদের রচনা হতে,

[১] হযরত ইমাম আব্দুল ওয়াহাব শি’রানি (রহ.) বলেন, قَوْلُہٗ صَلَّی اللّٰہُ عَلَیْہِ وَ سَلَّمَ فَلَا نَبِیَّ بَعْدِیْ وَلَا رَسُوْلَ الْمُرَادُ بِہٖ مُشْرِعَ بَعْدِیْ অর্থ নবীকরীম (সা.)-এর “আমার পর আর কোনো নবী নেই, রাসূলও নেই” (فَلَا نَبِیَّ بَعْدِیْ وَلَا رَسُوْلَ) একথার অর্থ হল, আমার পর শরীয়তধারী আর কোনো নবী নেই। (আল-ইয়াওয়াকিত ওয়াল জাওয়াহির, খণ্ড ২ পৃষ্ঠা ২৪)।

[২] সাইয়েদ আব্দুল করিম জিলানী (রহ.) বলেন, فَانْقَطَعَ حُکْمُ نُبُوَّۃِ التَّشْرِیْعِ بَعْدَہٗ وَکَانَ مُحَمَّدٌ ﷺ خَاتَمَ النَّبِیّیْنَ لِاَنَّہٗ جَآءَ بِالْکَمَالِ وَلَمْ یَجِیئْ اَحَدٌ بِذٰلِکَ অর্থ নবুওয়তে তাশরিয়ীর বিধান তাঁর (সা.) পরে শেষ হয়ে গেছে। অধিকন্তু মুহাম্মদ (সা.) নবীগণের খাতাম (সমাপ্তি) ছিলেন। কারণ তিনি শরীয়তের পূর্ণতা দিতে এসেছেন। এভাবে আর কেউই (ইতিপূর্বে) আসেনি। (আল ইনসানুল কামেল ১/৭৫, অধ্যায় নং ৩৬)।

[৩] হযরত মোল্লা আলী কারী (রহ.) বলেন, فَلاَ یُنَاقِضُ قَوْلُہٗ خَاتَمَ النَّبِیِّیْنَ اِذِ الْمَعْنَی اَنَّہٗ لاَ یَاتِیْ نَبِیٌّ یَنْسَخُ مِلَّتَہٗ وَ لَمْ یَکُنْ مِنْ اُمَّتِہٖ অর্থ… তাঁর (সা.) ঐ ভবিষ্যৎবাণী খাতামান্নাবীঈনের অর্থে কোনো বিরোধ সৃষ্টি করেনা। কেননা এর অর্থ হল, নবীকরীম (সা.) এর পর এমন কোনো নবী আসবেন না যিনি মহানবী (সা.)-এর দ্বীনকে রহিত করবেন, যেহেতু তিনি (অর্থাৎ ঈসা) তাঁর উম্মতের মধ্য থেকে নন। (মওযুআতে কবীর [তথা জাল হাদীসের বিশাল সংকলন ভাণ্ডার], পৃষ্ঠা: ৫৮-৫৯)।

[৪] হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.) বলেন, خُتِمَ بِہِ النَّبِیُّوْنَ اَیْ لَا یُوْجَدُ بَعْدَہٗ مَنْ یَأمُرُہُ اللّٰہُ سُبْحَانَہٗ بِالتَّشْرِیْعِ عَلَی النَّاسِ অর্থ নবীকরীম (সা.) এর মাধ্যমে সকল নবীর (আগমনী ক্রমধারা) শেষ হয়ে গেছে অর্থাৎ, তাঁর পর কোনো এমন ব্যক্তি আর হবেনা যাকে আল্লাহতালা শরীয়তসহ মানুষের কাছে প্রেরণ করবেন। (তাফহীমাতে ইলাহিয়াহ, তাফহীম নং ৫৪, পৃষ্ঠা ৮৫)।

[৫] হযরত মুহিউদ্দিন ইবনে আরবী (রহ.) বলেন, وَ ھٰذَا مَعْنٰی قَوْلِہٖ ﷺ اِنَّ الرَّسَالَۃَ وَالنُّبُوَّۃَ قَدِ انْقَطَعَتْ فَلَا رَسُوْلَ بَعْدِیْ وَ لَا نَبِیَّ اَیْ لَا نَبِیَّ بَعْدِیْ یَکُوْنُ عَلٰی شَرْعٍ یُخَالِفُ شَرْعِیْ بَلْ اِذْ کَانَ یَکُوْنُ تَحْتَ حُکْمِ شَرِیْعَتِیْ۔ অর্থ নবুওয়ত এবং রিসালাতের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। সুতরাং আমার পর কোনো রসূল নেই, নবীও নেই। এর মর্মার্থ হল, আমার পর এমন কোনো নবী নেই, যে আমার শরীয়তের বিপরীতে (নতুন শরীয়তের অনুসারী) হবেন। বরং যখন হতে যাবে (ঈসার আগমনের দিকে ইংগিত) তাহলে তিনি আমার শরীয়তের অধীনে হবেন। (ফতুহাতে মক্কীয়াহ্, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩)।

[৬] ইমাম তাহের পাটনী (রহ.) বলেছেন, وَھٰذَا اَیْضًا لَا یُنَافِیْ حَدِیْثَ لَانَبِیَّ بَعْدِیْ لِاَ نَّہٗ اَرَادَ لَا نَبِیَّ یَنْسَخُ شَرْعَہٗ অর্থ এই হাদীসও ‘আমার পর আর কোনো নবী নেই’ কথাটির বিরোধী নহে। কেননা একথার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাঁর শরীয়ত রহিত করতে পারে এমন নবী নেই। (মাজমাউল বিহারিল আনওয়ার পৃষ্ঠা ৮৫)।

ইমামগণের খণ্ডিত উক্তি সমূহ হতে কাদিয়ানীদের প্রমাণ করা উদ্দেশ্য হল, মির্যা কাদিয়ানীও একজন নবী, তবে তিনি শরীয়তবাহক নবী নন। যেহেতু হাদীসে শুধুমাত্র শরীয়তবাহক নবী আগমনকেই নিষেধ করে! নাউযুবিল্লাহ।

আমাদের পর্যবেক্ষণ :

এবার আমরা তাদের উল্লিখিত উদ্ধৃতিগুলোর উপর পাঠকদের সাথে পর্যবেক্ষণমূলক প্রাসঙ্গিক আলোচনায় ফিরে যেতে চাই! তার আগে নবুওয়তের ধারাক্রম অব্যাহত থাকার দাবীদার কাদিয়ানীদের উদ্দেশ্যে কয়েকটি সহীহ হাদীস পেশ করব এবং তারই ভিত্তিতে কয়েকটি প্রশ্ন রাখব!

[১] হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, وَأُرْسِلْتُ اِلی الْخَلْقِ کَافَّةً، وَخُتِمَ بِیَ النَّبیُّوْنَ অর্থ আমি সমগ্র সৃষ্টির জন্য প্রেরিত হয়েছি এবং আমার মাধ্যমে নবীগণের সমাপ্তি ঘটেছে। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল মাসাজিদ, হাদীস নং ১০৫৪)।

[২] হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, كَانَتْ بَنُوْ إِسْرَائِيْلَ تَسُوْسُهُمْ الأَنْبِيَاءُ كُلَّمَا هَلَكَ نَبِيٌّ خَلَفَهُ نَبِيٌّ وَإِنَّهُ لَا نَبِيَّ بَعْدِيْ وَسَيَكُوْنُ خُلَفَاءُ فَيَكْثُرُوْنَ অর্থ বনী ইসরাঈলের নবীগণ তাঁদের উম্মাতকে শাসন করতেন। যখন কোনো একজন নবী মারা যেতেন, তখন অন্য একজন নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন। আর আমার পরে কোনো নবী নেই। তবে অনেক খলীফাহ্ হবে। (সহীহ বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া হাদীস নং ৩৪৫৫, তাওহিদ প্রকাশনী)।

[৩] হযরত আবু হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেছেন, سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ لَمْ يَبْقَ مِنْ النُّبُوَّةِ إِلاَّ الْمُبَشِّرَاتُ অর্থ আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, মুবাশশ্বিরাত ব্যতীত নবুওয়তের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৯০)। এই ‘মুবাশ্বশিরাত’ (مُبَشِّرَاتِ) এর মর্মার্থ সুস্পষ্ট করে আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, لَمْ يَبْقَ مِنَ النُّبُوَّةِ إلَّا المُبَشِّراتُ. قالوا: وما المُبَشِّراتُ؟ قالَ: الرُّؤْيا الصَّالِحَةُ অর্থাৎ মুবাশ্বশিরাত ব্যতীত নবুওয়তের আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! মুবাশ্বশিরাত কী? তিনি (সা.) বললেন, সত্য স্বপ্ন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৯০)।

[৪] হযরত আবু যর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, یٰا أَبَا ذَرٍ أَوَّلُ الْاَنْبِیَاء آدَمُ وَآخِرُہ مُحَمَّدٌ অর্থ ‘হে আবু যর! সর্বপ্রথম নবী ছিলেন আদম আর সর্বশেষ নবী হচ্ছে মুহাম্মদ।’ ইমাম দায়লামী (রহ.) সংকলিত আল-ফেরদাউস বি-মাছূরিল খিতাব (الفردوس بمأثور الخطاب للدیلمی), ১/৩৯, হাদীস নং ৮৫।

[৫] হযরত উকবাহ ইবনে আমের (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, لَوْ كَانَ بَعْدِي نَبِيٌّ لَكَانَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ অর্থ আমার পরবর্তীতে কেউ নবী হলে অবশ্যই উমর ইবনুল খাত্তাবই নবী হতেন। (তিরমিযি হাদীস নং ৩৬৮৬, সহীহ)।

আকীদায়ে খতমে নবুওয়ত সম্পর্কিত ২০টি সহীহ হাদীস পড়তে এখানে ক্লিক করুন!

প্রাসঙ্গিক প্রশ্নগুলো :

প্রশ্নগুলো এই যে, উপরে উল্লিখিত হাদীসগুলোর উপর আপনাদের যদি বিশ্বাস থাকে তাহলে বলুন তো, রাসূল (সা.) খোদ নিজেই যেখানে মুক্ত অর্থে নিজেকে শেষনবী বলে আমাদের সংবাদ দিয়ে গেলেন, সেখানে নবুওয়তের ক্রমধারা অব্যাহত বলার স্পর্ধা দেখাতে পারে এমন সাধ্য কার? আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শিক্ষার বিরুদ্ধে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ কোমর বেঁধে দাঁড়িয়ে গেলেও তাতে কি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শিক্ষা বাতিল হয়ে যাবে? নিশ্চয়ই না। তাহলে আপনারা রাসূল (সা.)-এর শিক্ষার বিপরীতে এমন সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উপর কিভাবে আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারলেন যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শিক্ষাকে বাতিল করে দেয়? বলাবাহুল্য, রাসূল (সা.) এর যুগেও কয়েকজন নবুওয়তের দাবী করেছিল। মুসায়লামা তন্মধ্যে একজন। তার সম্পর্কে বর্ণনায় এসেছে যে, তার অনুসারীদের আযান এবং সালাতেও ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ‘ উচ্চারিত হত (প্রমাণ এখানে)। এর মানে এটা পরিষ্কার কথা যে, মুসায়লামা নিজেও শরীয়তবিহীন নবী দাবীদার ছিল। তা সত্ত্বেও সাহাবায়ে কেরাম তাকে ক্ষমা করেননি, তার নবুওয়ত দাবীর ব্যাখ্যা চাননি; তলোয়ারের ভাষায় তাকে সমুচিত জবাব দেয়া হয়। কাজেই, এবার শরীয়তবিহীন নবী আসার এই কাদিয়ানী-কনসেপ্ট উক্ত ঘটনা হতেও বাতিল হয়ে গেল কিনা? (সহজে কাদিয়ানী চেনার উপায় জানুন)।

এবার হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন যে, তাহলে কি ইমামগণ ঐ সমস্ত ব্যাখ্যায় ভুল করেছেন? উত্তরে বলব, আপনি কি ঐ সকল ইমামের সম্পূর্ণ বক্তব্য পড়ে দেখেছেন? দেখেননি! এমনকি আপনি ঐ সমস্ত ইমামের কিতাবগুলো থেকে আকীদায়ে খতমে নবুওয়ত সংক্রান্ত আলোচনাও পড়ে দেখেননি যে, তারা খতমে নবুওয়তের উপর উম্মতে মুহাম্মদীয়ার ইজমা কীরূপ শব্দচয়নে লিখে গেছেন! তাহলে জেনে নিন, মুহাম্মদ (সা.)-এর পর নবুওয়ত দাবীদারগণ উম্মতে মুসলিমার ইজমা মতে ‘কাফের’ হওয়া সম্পর্কে,

ইমাম ইবনে হাজার আল হাইছামী (الإمام ابن حجر الهيتمي) (রহ.) উম্মতে মুসলিমার ইজমা উল্লেখপূর্বক লিখেছেন, من اعتقد وحيًا من بعد محمد صلى الله عليه وآله وسلم كان كافرًا بإجماع المسلمين অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা.)-এর পর যে ব্যক্তি নবুওয়তে ওহী লাভ করার বিশ্বাস পোষণ করবে সে মুসলিম উম্মাহার সর্বসম্মতভাবে কাফের। (আল ফাতাওয়াল ফিকহিয়্যাতুল কোবরা [الفتاوى الفقهية الكبرى] ৪/১৯৪, আল মাকতাবাতুল ইসলামিয়া হতে প্রকাশিত)।

সব চেয়ে মজার ব্যাপার হল, যাদের খণ্ডিত বক্তব্যে আপনি/আপনারা বিভ্রান্তি ছড়ান তাদের প্রত্যেকের বিশ্বাস ছিল যে, ঈসা (আ.) জীবিত, আল্লাহ তাঁকে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। শেষযুগে তিনিই যথাসময়ে ফিরে আসবেন। মূলত সে কথারই খোলাসা করতে তারা উপরিউক্ত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অবতারণা করেছেন! আফসোস যে, আপনারা প্রসঙ্গ এড়িয়ে তাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে যাচ্ছেন! আপনারা শায়খ ইবনে আরাবী (রহ.)-এর ‘ফতুহাতে মাক্কিয়াহ’ গ্রন্থের যে পৃষ্ঠার খণ্ডিত বক্তব্যে নবুওয়তের ক্রমধারা অব্যাহত থাকার দলিল দেন সেই একই পৃষ্ঠার সম্পূর্ণ বক্তব্যটি পড়ে দেখলে যে কেউই বুঝতে পারবে যে, আপনারা (অর্থাৎ কাদিয়ানীরা) কিভাবে দরাকে সরা বানিয়ে দুনিয়ার সহজ সরল মানুষদের ঈমান নষ্ট করছে!

শায়খ ইবনে আরাবী (রহ.) লিখেছেন, وهذا معنى قوله صلى الله عليه وسلم إن الرسالة والنبوة قد انقطعت فلا رسول بعدي ولا نبي أي لا نبي بعدي يكون على شرع يخالف شرعي بل إذا كان يكون تحت حكم شريعتي ولا رسول أي لا رسول بعدي إلى أحد من خلق الله بشرع يدعوهم إليه فهذا هو الذي انقطع وسد بابه لا مقام النبوة فإنه لا خلاف إن عيسى عليه السلام نبي ورسول وأنه لا خلاف أنه ينزل في آخر الزمان حكما مقسطا عدلا بشرعنا لا بشرع آخر ولا بشرعه الذي تعبد الله به بني إسرائيل من حيث ما نزل هو به بل ما ظهر من ذلك هو ما قرره شرع محمد صلى الله عليه وسلم ونبوة عيسى عليه السلام ثابتة له محققة فهذا نبي ورسول قد ظهر بعده صلى الله عليه وسلم وهو الصادق في قوله إنه لا نبي بعده

অর্থাৎ রাসূল (সা.)-এর বাণী إن الرسالة والنبوة قد انقطعت فلا رسول بعدي ولا نبي (অর্থাৎ নিশ্চয়ই নবুওয়ত এবং রেসালতেরধারা বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং আমার পর আর কোনো রাসূল নেই, নবীও নেই)—একথার অর্থ হচ্ছে, আমার পর কোনো প্রকারের শরীয়তবাহক নবী নেই যে আমার শরীয়তের বর-খেলাফ করবেন বরং যখনই হতে যাবে তখন সে আমার শরীয়তের বিধিবিধানের অধীনে হবে এবং ‘ওয়া লা রাসূলা বা’দী’—একথার অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ’র সৃষ্টির প্রতি এমন কোনো রাসূলও আর নেই যিনি স্বতন্ত্র শরীয়ত দ্বারা তাদেরকে তাঁর দিকে দাওয়াত দেবেন। যেহেতু এটি (নবুওয়ত এবং রেসালতেরধারা) বন্ধ এবং তার দ্বারও চিরতরে রূদ্ধ, (এখন) নবুওয়তের আর কোনো প্রকারের মাক্বাম (স্তর)-ই অবশিষ্ট নেই। ফলে ঈসা (আ.) একজন নবী ও রাসূল থাকাটা (লা নাবিয়্যা বা’দী’ শীর্ষক হাদীস অংশের) বিরুদ্ধে যায় না। নিশ্চয়ই ঈসা (আ.) একজন ন্যায়পরায়ন শাসক হিসেবে শেষ যামানায় আমাদের শরীয়তের উপরই নাযিল হবেন। তিনি ভিন্ন কোনো শরীয়ত কিবা ওই শরীয়ত নিয়েও আসবেন না, যা তার প্রতি নাযিল হয়েছিল এবং ইসরাইল জাতি যেই শরীয়তের উপর আল্লাহ’র ইবাদত বন্দেগী করেছিল। বরং তাঁর পক্ষ থেকে শরীয়তে মুহাম্মদী-ই প্রকাশ পাবে যেটি তাঁর জন্য (পূর্ব থেকে) স্থির রয়েছে। পক্ষান্তরে নবুওয়তে ঈসা (তাঁর দ্বিতীয়বার আগমনের পর) স্থির ও বহাল থাকবে। কেননা তিনি-ও একজন নবী ও রাসূল ছিলেন। তাঁর পরেই হযরত সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আবির্ভাব ঘটেছিল। যিনি স্বীয় বাণী : إنه لا نبي بعده (অর্থাৎ নিশ্চয়ই তাঁর পরে আর কোনো নবী নেই) বাণীতে একজন সত্যবাদী।” (অনুবাদ শেষ হল)। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি :-

শায়খ মহী উদ্দিন ইবনে আরাবী (রহ.) এর সম্পূর্ণ বক্তব্যের খোলাসা দাঁড়ায় :

(ক) فهذا هو الذي انقطع وسد بابه لا مقام النبوة অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের পর নবুওয়তের আর কোনো প্রকারের মাক্বাম (স্তর)-ই অবিশিষ্ট নেই। কেননা তাঁর নবুওয়তপ্রাপ্তির মাধ্যমে বর্তমানে সকল প্রকারের নবুওয়ত ও রেসালতের দ্বার চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।

(খ) فإنه لا خلاف إن عيسى عليه السلام نبي ورسول وأنه لا خلاف أنه ينزل في آخر الزمان حكما مقسطا عدلا بشرعنا لا بشرع آخر ولا بشرعه الذي تعبد الله به بني إسرائيل من حيث ما نزل هو به অর্থাৎ ফলে ঈসা (আ.) একজন নবী ও রাসূল থাকাটা (লা নাবিয়্যা বা’দী’ শীর্ষক হাদীস অংশের) বিরুদ্ধে যায় না। নিশ্চয়ই ঈসা (আ.) একজন ন্যায়পরায়ন শাসক হিসেবে শেষ যামানায় আমাদের শরীয়তের উপরই নাযিল হবেন। তিনি ভিন্ন কোনো শরীয়ত কিবা ওই শরীয়ত নিয়েও আসবেন না, যা তার প্রতি নাযিল হয়েছিল এবং ইসরাইল জাতি যেই শরীয়তের উপর আল্লাহ’র ইবাদত বন্দেগী করেছিল।

পাঠকবৃন্দ! ইবনে আরাবীর সম্পূর্ণ বক্তব্য কাদিয়ানীরা কিজন্য আপনাদের সামনে পেশ করতে চায় না তা এবার নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন!

পরিশেষে আমি বলতে পারি যে, ইবনে আরাবীর বক্তব্যটিকে প্রসঙ্গ ছাড়াই কাদিয়ানীরা পেশ করে থাকে। যাতে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে দলে টানতে পারে ও মির্যা কাদিয়ানীর নবুওয়ত দাবীকে হালাল করতে পারে! আমি এখানে শুধুমাত্র ইবনে আরাবী (রহ.)-এর নামে তারা যে ভ্রান্তি ছড়ায় সেটিরই জবাব দিয়েছি। সত্য কথা হল, কাদিয়ানীরা এভাবেই অন্য প্রায় সকল উলামায়ে কেরামের বক্তব্যের আগপাছ বাদ দিয়ে কিংবা প্রসঙ্গ এড়িয়ে উদ্ধৃতি পেশ করে থাকে। যাতে অল্প শিক্ষিত ও জেনারেল শ্রেণীর মানুষদের বিশ্বাসে সন্দেহ তৈরি করে কাছে টানতে পারে! আল্লাহ আমাদের সবাইকে এদের যাবতীয় অপপ্রচার থেকে রক্ষা করুন। আমীন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
শিক্ষাবিদ ও গবেষক
তাং ১৩/১১/২০২২ইং

শাহজাদা ইউয আসেফ

আজকের এই লিখাটি পড়ে বুঝার আগে পাঠকের জন্য আরেকটি বিষয়ে জ্ঞান রাখা অপরিহার্য। সেটি হল, মির্যা কাদিয়ানীর দাবী হচ্ছে হযরত ঈসা মৃত্যুবরণ করেছেন এবং তাঁর কবর হল কাশ্মীরের শ্রীনগরে! প্রশ্ন করা হল, তাহলে সেখানকার কোন কবরটি ঈসা (আ.)-এর কবর? মির্যা কাদিয়ানীর ভাষ্যমতে, সেখানকার খানইয়ার মহল্লায় সমাহিত ‘ইউজে আসেফ’ নামীয় ব্যক্তিটাই মূলত ঈসা (আ.); তার কবরটাই হযরত ঈসা (আ.)-এর কবর! কিন্তু মির্যা কাদিয়ানী সাহেব পরবর্তীতে নিজেই নিজের ঐ সমস্ত কথাবার্তার কারণে কিভাবে পাকড়াও হলেন তা জানতে সংক্ষিপ্ত লিখাটি পড়ুন! (মুসলমানদের আকীদা ঈসা মসীহকে আল্লাহ সশরীরে জীবিত উঠিয়ে নিয়েছেন, তিনি এখনও মৃত্যুবরণ করেননি)।

কে এই ইউজে আসেফ?

প্রাচীন যুগের কিছু বইপুস্তক হতে এই ইউজে আসেফ (Yuz Asef) নামীয় ব্যক্তির ধারণা পাওয়া যায়! সে একজন মুসলিম ধর্মপ্রাণ ও বুযূর্গ খোদাভীরু হিন্দুস্তানী রাজপুত্র (কামালুদ্দিন পৃ-৫২৭, আরবী নোসখা)। হিন্দুস্তানের প্রাচীন ইতিহাস বলে, তার পিতা ছিল ভারতবর্ষের প্রভাবশালী একজন মূর্তিপূজক। সে ছিল পিতার একমাত্র পুত্র যে কিনা পিতার পৌত্তলিক ধর্ম ত্যাগ করে একত্ববাদী খোদারধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেন। তার একত্ববাদী ধর্মের প্রতি ঝোঁকটা ছিল প্রাকৃতিকভাবে। যদিও কাকতালীয়ভাবে তৎকালীন হাকিম বলোহর নামীয় জনৈক ধর্ম-পণ্ডিত দ্বারা তিনি পরে খুব বেশি প্রভাবিত হন। আনুমানিক হিজরী প্রথম বা দ্বিতীয় শতাব্দীর এই ঘটনা।

বলাবাহুল্য, মির্যা কাদিয়ানী সাহেব ইউজে আসেফ বা ইউযে আসেফ নামীয় ব্যক্তিটির বিস্তারিত পরিচয় জানতে যে কিতাব দুটির রেফারেন্স দিয়ে গেলেন তন্মধ্যে ফার্সি ভাষার ‘আ’ইনুল হায়াত‘ কিতাবটি অন্যতম। সেটির এক স্থানে উল্লেখ আছে যে,

اسی زمانہ میں بادشاہ کے فرزند نرینہ تولد ہوا اور اتنی مسرت ہوئی کہ قریب مرگ ہوگیا۔ اور یقین ہوگیا کہ بت پرستی کا عطا کردہ یہ انعام ہے – ملک کا تمام خزانہ زینت و آرائش میں ختم کردیا – لوگوں کو ایک سال تک خوشی٫ شادی عیش و نشاط کا حکم عام ہو گیا – فرزند ارجمند کا نام یوز آسف رکھا۔

অর্থাৎ এমন সময় রাজার একটি হৃষ্টপুষ্ট পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। এতে তিনি এতই খুশি হন যে, যেন মারা যাবেন! তার বিশ্বাস এই যে, এটি তার মূর্তিপূজার জন্য প্রদত্ত পুরস্কার। তিনি রাজ্যের সমস্ত ধন-সম্পদ ভোগ বিলাসে উজাড় করে দেন। জনগণের জন্য পূর্ণ এক বছর আমোদ ফুর্তি আর খুশি উদযাপনের ফরমান জারি করেন। সেই সুদর্শন সন্তানটির নাম রাখা হয় ইউজে আসেফ। (রূহুল হায়াত উর্দু তরজুমা আ’ইনুল হায়াত, পৃষ্ঠা ৩৬৪, মূল-মোল্লা মুহাম্মদ বাকের মজলিসি)। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি :-

  • প্রশ্ন, মির্যা কাদিয়ানী সাহেবের কোন বইতে তিনি লিখেছেন যে, ইউযে আসেফ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ‘কামালুদ্দিন’ (كمال الدين و تمام النعمة) কিতাবটি পড়ে দেখ!?

উত্তর, ইউযে আসেফ সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা লাভ করতে হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে রচিত প্রাচীনকালের একখানা কিতাব ‘কামালুদ্দীন ওয়া তামামুন নি’মাহ‘ পড়তে পরামর্শ দেন মির্যা কাদিয়ানী সাহেব। যেমন তার বইতে লিখা আছে,

و ان كنت تطلب التفضيل فاقرأ كتابا سمى بإكمال الدين تجد فيه كل ما تسكن الغليل

অর্থাৎ “আর তুমি যদি বিস্তারিত জানতে চাও তাহলে ‘কামালুদ্দীন‘ নামীয় কিতাবটি পড়তে পার! তুমি সেখানে এমন সব (তথ্য) পাবে যা প্রবল তৃষ্ণাকেও শান্ত করে দেবে।” (‘আল-হুদা’ এবং রূহানী খাযায়েন ১৮/৩৬২ দ্রষ্টব্য)। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি :-

আসলে মির্যা কাদিয়ানী সাহেব স্বপ্নেও ভাবেননি যে, একটা সময় তিনি তার যাবতীয় গোজামিল আর মিথ্যার জন্য পাকড়াও হবেন! তিনি হয়ত ভেবেছিলেন, আজ থেকে এগার/বারো শত বছর আগেকার রচিত বইগুলো সংগ্রহ করে তার উদ্ধৃতির সত্য-মিথ্যা যাচাই করে দেখবে এমন সাধ্য কার! কারই বা এত সময় আছে! মুরিদদের ব্রেইন ওয়াশ করে দেয়ার পর সে কি কখনো চিন্তাও করতে পরে যে, আমার এসমস্ত দাবী দাওয়ায় কোনো রূপ ভেজাল আছে কিনা?

৩০শে এপ্রিল ২০১০ ইং তারিখে প্রকাশিত বিবিসি (আরবী)-এর একটি অনুসন্ধানী নিউজ দেখলাম। সেখানে ইউজে আসেফ এর কবরের ছবি উল্লেখ করে নিচে লিখা হয়েছে,

اما السكان المحليون فيتعبرون ان المزار هو قبر لاثنين من العلماء المسلمين توفيا منذ قرون: يوزا آصف والسيد نصير الدين.

অর্থাৎ, এখানকার স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন যে, নিশ্চয়ই এই দুটো কবর দুইজন মুসলিম দরবেশের, এঁরা কতেক শতাব্দীতে মৃত্যুবরণ করেছেন। একজন ইউজে আসেফ আর অন্যজন সাইয়েদ নাসির উদ্দীন। বিবিসি (আরবী) নিউজ পোর্টালের লিংক দেখুন (নিচে স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য)।

বর্তমান ভারতের কাশ্মীরের খানইয়ার মহল্লায় সাইয়েদ নাসির উদ্দীন শাহ (রহ.)-এর কবরের পাশেই তার সমাধি। এ সম্পর্কে পড়া যেতে পারে ‘কামালুদ্দীন ওয়া তামামুন নি’মাহ’ (আরবী) এবং ‘আ’ইনুল হায়াত’ (রূহুল হায়াত নামীয় ফার্সি বইয়ের উর্দূ অনুবাদ) দুইখানা কিতাব। আরো বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন এই লিংকটিতে

এ সম্পর্কিত ২১টি পর্ব ফেসবুক ফেজ থেকে সুস্পষ্ট স্ক্রিনশট সহ পড়তে ক্লিক করুন

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক
প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

হাদীস অস্বীকারকারীদের ব্যাপারে স্বয়ং নবীজীর সতর্কবাণী

হাদীস অস্বীকারকারী | কথিত আহলে কুরআন দাবীদার

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।

ইন্নাল হামদা লিল্লাহ ওয়াসসালাতু ওয়াস-সালামু আ’লা রাসূলিল্লাহ! আম্মাবা’দূ…..! প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোনেরা! আমরা এখন পুরোপুরি একটি ফেতনার যুগে অবস্থান করছি! আজকে আপনাদের খেদমতে আমার একটি সতর্কবার্তা! তা হল, হাদীস অস্বীকারকারী (আহলে কুরআনদের) থেকে সকলকে সতর্ক থাকতে হবে। নইলে ওরা যে কোনো মুহূর্তে হাদীসে নববীর প্রতি আপনার মনে সংশয় তৈরি করে আপনাকে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে পারে। আর কখনো যদি এমন পরিস্থিতিতে পড়ে যান তাহলে আপনাকে অবশ্যই কোনো বিজ্ঞ ও গবেষক আলেমের সান্নিধ্যে গিয়ে সঠিকটা বুঝে নিতে হবে। আসলে যারা হাদীসে নববীর অস্বীকারকারী তারা মূলত ওহীর এক বিরাট অংশ ‘অপঠিত ওহী’ (وحى غير متلو) এবং একি সাথে রাসূল (সা.)-এর সীরাতেরও অস্বীকারকারী। অথচ কুরআন আমাদের ডেকে ডেকে বলছে, তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ (لقد كان لكم فى رسول الله اسوة حسنة)। সুবহানাল্লাহ!

বলাবাহুল্য, ইদানীং মুসলমান ছদ্মবেশী খ্রিস্টান (কথিত ঈসায়ী মুসলিম দাবীদার), শীয়া-রাফেজী, বাহায়ী ও কাদিয়ানীরাও হাদীস অস্বীকারকারীদের পেছন থেকে মদদ জোগাচ্ছে। অনলাইনে হাদীস অস্বীকারকারী লিখক ও প্রচারকদের ৯০% শীয়া এবং খ্রিস্টান মিশনারী! কিন্তু কিছুই বুঝে উঠার সুযোগ নেই। সে যাইহোক, এদের সম্পর্কে রাসূল (সা.) নিজেই চৌদ্দশত বছর আগেই সতর্ক করে গেছেন। এখানে শুধুমাত্র একখানা সহীহ হাদীস উল্লেখ করছি। হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِي رَافِعٍ، وَغَيْرُهُ، رَفَعَهُ قَالَ ‏ “‏ لاَ أُلْفِيَنَّ أَحَدَكُمْ مُتَّكِئًا عَلَى أَرِيكَتِهِ يَأْتِيهِ أَمْرٌ مِمَّا أَمَرْتُ بِهِ أَوْ نَهَيْتُ عَنْهُ فَيَقُولُ لاَ أَدْرِي مَا وَجَدْنَا فِي كِتَابِ اللَّهِ اتَّبَعْنَاهُ “

অর্থ, আবূ রাফে‘ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আমি যেন তোমাদের মধ্যে কাউকে এমন অবস্থায় না পাই যে, সে তার সুসজ্জিত আসনে হেলান দিয়ে বসে থাকবে এবং তার নিকট যখন আমার আদিষ্ট কোনো বিষয় অথবা আমার নিষেধ সম্বলিত কোনো হাদীস উত্থাপিত হবে তখন সে (তাচ্ছিল্যভরে) বলবে, আমি তা জানি না, আল্লাহতালার কিতাবে আমরা যা পাই, তারই অনুসরণ করবো।’ (জামে’ আত তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৬৩; আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬০৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৩২৪৯)।

আল্লাহতালা আমাদেরকে হাদীস অস্বীকারকারী এই নিকৃষ্ট ফেতনাবাজদের তাবৎ বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুক। কুরআন এবং সহীহ হাদীসের আলোকে জীবনকে পরিচালনা করার তাওফিক দান করুক। আমীন।

  • এই বইগুলো ডাউনলোড করুন,

আমরা হাদীস মানতে বাধ্য (আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাক)

হাদীস সংকলনের ইতিহাস (মওলানা আব্দুর রহীম)

হাদীস কেন মানতে হবে? (কামাল আহমাদ)

হাদীস কি আল্লাহর ওহী? (মুহাম্মদ ইকবাল ফাখরুল)

হাদীসের প্রামাণিকতা (সানাউল্লাহ নজির আহমদ)

হাদীসের প্রামাণিকতা (ডক্টর মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল গালিব)

লিখক,
শিক্ষাবিদ ও গবেষক
প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

নবীপুত্র ইবরাহীম যদি জীবিত থাকত

0

সিজোফ্রেনিয়া পাড়ার আরেকটা প্রতারণা, ইবরাহীম বেঁচে থাকলে তিনিই নবী হতেন….

এই প্রতারকদের সাহস হয়না মির্যা কাদিয়ানীকে মুক্ত অর্থে “নবী” বলতে। ইনিয়েবিনিয়ে আর শব্দের বক্রব্যাখ্যার মারপ্যাঁচ দিয়ে মির্যার নবী দাবীর বদনাম ঘোচাতে চেষ্টা করে। উম্মতি, বুরুজি আর জিল্লি সহ নানা শ্রেণীতে নবী-এর কনসেপশন তারা ভাগ করে ফেলে। উম্মতে মুসলিমার প্রতিষ্ঠিত ও সর্বসম্মত বিশ্বাসের হাত পা ভেঙে বিকলাঙ্গ করে ছাড়ে। এই একই মানুষগুলো মির্যার নবী দাবীকে বৈধতা দেয়ার জন্য خاتم النبيين (খাতামান নাবিয়্যিন) এর “খাতাম” শব্দকে আক্রমণের নিশানা বানিয়ে থাকে। শব্দটি থেকে আংটি, মোহর ইত্যাদি অভিনব অর্থ গ্রহণ করার মাধ্যমে নিজেদের রক্ষা করার-ও আপ্রাণ চেষ্টা করে। অথচ উম্মাহার সর্বান্তকরণে বিশ্বাস হচ্ছে, মুহাম্মদ (সা.)-এর পর নবুওয়তের দরজায় সীল লেগে গেছে। কেয়ামত পর্যন্ত এই সীল আর কারো জন্য খোলা হবেনা। কাজেই “খাতাম” শব্দের সাধারণ আরও যত অর্থই থাকুক না, এটি মুহাম্মদ (সা.)-এর ক্ষেত্রে ‘শেষ’ বা ‘সমাপ্তি’ অর্থেই ধর্তব্য হবে। আহা! এই নির্বোধদের বুঝানোর সাধ্য কার!

এদেরকে ঠান্ডা মাথায় জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় যে, মুহাম্মদ (সা.) শেষনবী—তা তো আমরাও বিশ্বাস করি। কিন্তু এই নির্বোধরা তাদের মূলধারার রচনাবলি সম্পর্কে এতই বেখবর যে, তারা কখনো খোঁজ করেও দেখেনা সেসব রচনায় মুহাম্মদ (সা.)-এর খতমে নবুওয়তের সিংহাসনকে কত জঘন্যভাবে আক্রমণের নিশানা বানানো হয়েছে! নতুবা তারা কীজন্য নবুওয়তে মুহাম্মদীর ‘সীল’ ভাঙ্গতে অনবরত যুদ্ধ করে যাবে! কেন অগণিত সহীহ হাদীসের বিপরীতে শাজ, মুনকার রেওয়ায়েতের পেছু নিতে চাইবে!

উম্মতে মুহাম্মদীয়ার সিলসিলায় শেষনবী মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, নাউযুবিল্লাহ।

ইউটিউবে তাদের একটা ভিডিও চোখে পড়লো। সেখানে তারা খতমে নবুওয়তের সীল ভাঙ্গার জবরদস্ত আক্রমণ চালিয়েছে। যদিও প্রতিটি আক্রমণই ব্যর্থ সাব্যস্ত হয়েছে। সূরা নিসা আয়াত নং ৬৯ দ্বারাও মির্যা কাদিয়ানীর নবী দাবীকে হালাল করতে যারপরনাই চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ আয়াতটির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে যিনি সামান্যতমও জ্ঞাত তিনি সহজেই ধরতে পারবেন যে, কাদিয়ানী নেতা ফিরোজ আলম আয়াতটির কত জঘন্যতম অপব্যাখ্যার পেছনে দৌঁড়াচ্ছেন! তিনি উক্ত ভিডিওতে আরও একখানা রেওয়ায়েত দিয়ে প্রমাণ করতে চাইছেন যে, মুহাম্মদ (সা.)-এর পরেও নবুওয়তের দরজা খোলা। নাউযুবিল্লাহ। রেওয়ায়েতটি হল, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, لو عاش ابراهيم لكان صديقا نبيا অর্থাৎ যদি ইবরাহীম [তথা হুজুর (সা:) এর সন্তান] জীবিত থাকত তবে সে সত্যবাদী ও নবী হতো।” (সুনানু ইবনে মাজাহ ১/১০৮; ‘তারীখু ইবনে আসাকীর ৩/২৯৫)।

রেওয়ায়েতটি উল্লেখ করার পর যুক্তি দিয়ে তিনি যেন বলতে চাচ্ছেন যে, যদি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরেও নবুওয়তের দরজায় সীল লেগে যেত তাহলে নবীজী কিজন্য আপনা সন্তান সম্পর্কে এইরূপ সংবাদ দিলেন? সুতরাং বিষয়টি ক্লিয়ার যে, নবুওয়তের দরজায় সীল লেগে যাওয়া সত্য নয়, বরং নবী আরও আসবে! (নাউযুবিল্লাহ)।

অথচ রেওয়ায়েতটির সনদ খুবই দুর্বল। কেননা এর সূত্রে ইবরাহীম ইবনে উসমান নামীয় রাবীকে মুহাদ্দিসগণ মুনকার (منكر الحديث) এবং মাতরূক (متروك الحديث) বলে আখ্যা দিয়েছেন। (দেখুন, তাহযীযুত তাহযীব ১/১৪৫)। আরও একটি সমস্যা হল, সনদে ইনকিতা (সূত্র-বিচ্ছিন্নতার ক্রুটি) বিদ্যমান। কেননা এর আরেকজন রাবী হিকাম ইবনে উতাইবাহ (الحكم بن عتيبة) সম্পর্কে লিখা আছে যে, ইবরাহীম ইবনে উসমান বর্ণনাটি তার কাছ থেকে শ্রবণ করা প্রমাণিত নয় (দেখুন, তাহযীযুত তাহযীব ২/৪৩৪)। যার ফলে সনদে তাদলীস-এর ক্রুটিও বিদ্যমান। তাই রেওয়ায়েতটি দলিল প্রমাণে গ্রহণযোগ্য নয়, বরং প্রত্যাখ্যাত। সে যাইহোক, এই মুহূর্তে ‘বর্ণনার তাহকিক’ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি নির্বোধদের বলতে চাই, তোমাদের কি নিচের হাদীস গুলো চোখে পড়ে না?

১। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে (হাদীসে কুদসীতে আল্লাহতালা বলেন) : لو لم أختم به النبيين لجعلت له ولدا يكون بعده نبيا অর্থাৎ যদি তাঁর (মুহাম্মদ) মাধ্যমে নবীগণের আগমনীধারা সমাপ্ত করে না দিতাম তাহলে আমি তাঁর পুত্রকে (নবী হিসেবে) অবশ্যই মনোনীত করতাম। যাতে সে তাঁর পর নবী হতে পারে। (ইমাম ইবনে জাওযি রহ. রচিত, যাদুল মাছীর ফী ইলমিত তাফসীর, সূরা আল আহযাব ৫/১৩৯ দ্রষ্টব্য)। স্ক্যানকপি

২। অন্য আরেকটি হাদীসে হযরত ওক্ববাহ ইবনে আমের (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: لَوْ كَانَ بَعْدِي نَبِيٌّ لَكَانَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ، فصححه الحاكم ووافقه الذهبي وحسنه الترمذيالترمذي، وكذا حسنه الألباني في صحيح الترمذي অর্থাৎ আমার পর যদি আর কোনো নবী থাকত তাহলে অবশ্যই উমর-ই নবী হত! (জামে তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং ৩৬৮৬; হাদীসের মান, সহীহ ও হাসান)।

এখন প্রশ্ন হল, এমতাবস্থায় আলোচ্য হাদীসটি দ্বারা কিভাবে নবুওয়তের দরজা খোলা রয়েছে, এমন কোনো মর্মার্থ দাঁড় করানো সঠিক হয়?

তর্কের খাতিরে মানলাম যে, আলোচ্য হাদীসটি (আপনাদের মতে) নবুওয়তের দরজা খোলা থাকার পক্ষেই ইংগিত। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, হাদীসটির কোন শব্দে বলা আছে যে, শুধুমাত্র কথিত জিল্লি বুরুজি শ্রেণীর নবুওয়তের দরজাই খোলা, অন্য শ্রেণীর (মুস্তাকিল, হাকিকি/শরীয়তবিহীন, শরীয়তবাহক) নবুওয়তের দরজা বন্ধ!?

কোনো উত্তর নেই!

শেষ আরেকটা প্রশ্ন করব! আলোচ্য মুনকার রেওয়ায়েতের “যদি ইবরাহীম [তথা হুজুর (সা:) এর সন্তান] জীবিত থাকত…” বলা দ্বারা যদি নবুওয়তের দরজা খোলা—একথা বুঝায় তাহলে আল্লাহতালার বাণী (সূরা আম্বিয়া-২২) “যদি আসমান-জমিনে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ থাকত…” (لَوْ كَانَ فِيهِمَآ ءَالِهَةٌ إِلَّا ٱللَّهُ لَفَسَدَتَا ۚ فَسُبْحَٰنَ ٱللَّهِ رَبِّ ٱلْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ) একথা থেকে কী ব্যাখ্যা নেবেন? আল্লাহ ছাড়া আরও অনেক বৈধ ইলাহ থাকার ইংগিত রয়েছে… এমন ব্যাখ্যাও কি নেবেন? নাউযুবিল্লাহ। জ্ঞানীদের নিশ্চয়ই বিষয়টি ভাবিয়ে তুলবে!

মহান আল্লাহর নিকট আপনাদের সবাইকে সোপর্দ করছি। তিনিই আপনাদের ভালো মত দেখে নেবেন! ওয়া মা আ’লাইনা ইল্লাল বালাগ!

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
শিক্ষাবিদ ও গবেষক

শীয়া-ইমামীয়াদের একটি কুফুরী আকীদা

শীয়াদের কুরআন বিকৃতির কুফুরী আকীদা

যে সব আকীদা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ইমামিয়া বা ইসনা আশারিয়া (১২ ইমামপন্থী) তথা ইরান-তেহরানের শিয়ারা একমত, তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, কুরআনে তাহরীফ হওয়া! নাউযুবিল্লাহ। পাকিস্তানের শিয়া সম্প্রদায়ের প্রখ্যাত আলেম মকবুল হোসাইন দেহলবী পবিত্র কুরআনের তরজমা করেছেন উর্দু ভাষায়, যার সত্যায়ন করেছেন সেই সময়ের ১২ জন প্রখ্যাত শিয়া গবেষকবৃন্দ! এই তরজমার ১২ পারা ১৬ রুকুতে ও পৃষ্ঠা নং ৪৭৯ -তে হাশিয়া (টিকা) যুক্ত করে তিনি লিখেছেন,

أن الخلفاء شاربي الخمر حرفوا القرآن لمقاصدهم

অর্থ, মদখোর খোলাফারা নিজ নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই কুরআনকে তাহরীফ তথা বিকৃত করেছে! (Click)

সেখানে আরও লিখা আছে, যতক্ষণ আমাদের ইমাম মাহদী গুহা থেকে আত্মপ্রকাশ করবেননা ততক্ষণ আমরা এই গলদ কুরআনই তিলাওয়াত করব! (নাউযুবিল্লাহ)।

শীয়াদের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য গ্রন্থ ‘উসূলুল কাফী’-তে লিখা আছে,

أن الذي يشك في كفر عمر فهو كافر. في أصول الكافي: (1 / 145) أن الخلفاء الثلاثة وبقية الصحابة كفروا بإنكارهم ولاية علي بن أبي طالب. ـ

অর্থাৎ “যে বা যারাই উমরের কুফুরীর ব্যাপারে সন্দেহ করবে সেও কাফের (উসূলুল কাফী ১/১৪৫), আলী বিন আবী তালেব এর বেলায়তের অস্বীকার করার দরুন অন্যান্য তিনজন খলীফাসহ অবশিষ্ট সকল সাহাবী কাফের।” নাউযুবিল্লাহ। শীয়াদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে সরাসরি পড়তে ক্লিক করুন।

প্রখ্যাত শীয়া স্কলার বাকের মাজলিসিও তার ‘বিহারুল আনওয়ার’ (بحار الأنوار – العلامة المجلسي – ج ٥٢ – الصفحة ٣٦٤) গ্রন্থে লিখেছেন,

141 – الغيبة للنعماني: أحمد بن هوذة، عن النهاوندي، عن عبد الله بن حماد، عن صباح المزني، عن الحارث بن حصيرة، عن ابن نباتة، قال: سمعت عليا عليه السلام يقول: كأني بالعجم فساطيطهم في مسجد الكوفة يعلمون الناس القرآن كما انزل، قلت: يا أمير المؤمنين أوليس هو كما انزل؟ فقال: لا، محي منه سبعون من قريش بأسمائهم وأسماء آبائهم، وما ترك أبو لهب إلا للازراء على رسول الله صلى الله عليه وآله لأنه عمه

ইবনু নুবাতাহ……..সূত্রে তিনি বলেন, “আমি আলী (আ.) কে বলতে শুনেছি “এটা এমন যেন আমি অনারবদের কূফার মসজিদে তাদের তাবু স্থাপন করতে দেখছি এবং মানুষকে কুরআন যেমন অবতীর্ণ হয়েছে তেমন শিক্ষা দিচ্ছি!” আমি বললাম: “হে আমিরুল মো’মিনীন, কুরআন কি তেমন নয় যেমন অবতীর্ণ হয়েছে?” তিনি বললেন: “না, তা নয়। কুরাইশদের সত্তর জনের নাম এর থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আবু লাহাবের নাম (কুরআনে) কেবল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কিছু মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। কারণ, তিনি তার চাচা।” (বিহারুল আনওয়ার ৫২/৩৬৪ শীয়া ইমাম বাকের মজলিসি)। কিতাবটির অনলাইন কপি পড়ুন

শীয়াদের প্রসিদ্ধ আরেকটি গ্রন্থ ‘আল ইরশাদ‘ (الإرشاد – الشيخ المفيد – ج ٢ – الصفحة ٣٨٦) এর মধ্যে লিখা আছে,

وروى جابر، عن أبي جعفر عليه السلام أنه قال: ” إذا قام قائم آل محمد عليه السلام ضرب فساطيط لمن يعلم الناس القرآن على ما أنزل الله جل جلاله فأصعب ما يكون على من حفظه اليوم، لأنه يخالف فيه التأليف “.

অর্থাৎ আবু জা’ফর……. থেকে তিনি বলেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারের সাহায্যে যখন যিনিই দন্ডায়মান হন তিনি ফাসাতিতকে প্রহার করেন যিনি মানুষকে কুরআন শিক্ষা দেন আল্লাহ তা যেভাবে অবতীর্ণ করেছেন সেটির বিপরীতে। ফলে তা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তাদের পক্ষে যারা আজ সেটিকে মুখস্থ করছেন। কারণ এটি কুরআন সংকলনের সাথে বিরোধপূর্ণ। (আল ইরশাদ ২/৩৮৬, শীয়া স্কলার শায়খ আল মুফীদ)। কিতাবটির অনলাইন কপি পড়ুন

অপ্রিয় হলেও সত্য, এই সম্প্রদায়ের যারা এধরণের মতবাদ পোষণ করেন তারা নিঃসন্দেহে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত ও কাফের জাতির অন্তর্ভুক্ত। শিয়াদের প্রখ্যাত গবেষক ও মুহাদ্দিস মির্যা হোসাইন নূরী আত তবারসী আমাদের এই কুরআন বিকৃতির দলিলে স্বতন্ত্র কিতাবও রচনা করেছেন! সেখানে তিনি দাবী করেছেন,

أن الشيخين لم يقبلا القرآن الذي كتبه علي

অর্থাৎ আলী রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু যেই কুরআন লিখেছেন সেটি শায়খাইন (হযরত আবু বকর ও উমর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহুমা) গ্রহণ করেননি!

(নাউযুবিল্লাহ)

তথ্যসূত্র :- ফাসলুল খিতাব ফী তাহরীফি কিতাবি রব্বিল আরবাব, তবারসী পৃ-৬৪।

এই কথাগুলো তাদের মৌলিক গ্রন্থগুলোতেও রয়েছে, ইনশাআল্লাহ সুযোগ হলে এই সম্পর্কে আরও তথ্যসহ লেখা হবে।

শেষকথা– শীয়া রাফেজি সম্প্রদায় ইসলামের মূলধারা থেকে ছিটকে পড়া এক পথভ্রষ্ট জাতি, তাদের বিপরীতে মুসলিম উম্মাহ “আহলুস সুন্নাহ” বা “সুন্নী” নামেই পরিচয় বহন করে থাকেন। যাতে সাধারণদের নিকট প্রকৃত মুসলমানদের “শীয়া” থেকে আলাদা করতে সহায়ক হয়। আল্লাহ আমাদেরকে শীয়া রাফেজি থেকে ঈমানের মত মহান এ দৌলত রক্ষা করুন। আমীন।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক।

নুযূলে ঈসা সম্পর্কে ইবনে হাজম আল-জাহেরী

প্রশ্ন, হযরত ঈসা (আ.) জীবিত নাকি মৃত এ সংক্রান্ত বিষয়ে ইমাম ইবনে হাজম জাহেরী আল উন্দুলুসী (রহ.)-এর আকীদা কেমন ছিল?

উত্তর, উনার আকীদাও আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অনুরূপ ছিল। আর তার প্রমাণ অনেক ভাবে দেয়া যাবে। আজকে এখানে এই বিষয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করব। তবে আলোচনার পূর্বে একটি প্রশ্নের উত্তর ক্লিয়ার করতে চাই। নির্বোধ কাদিয়ানী সম্প্রদায় ইবনে হাজম (রহ.)-এর আল মুহাল্লা (المحلى) কিতাব থেকে একটি উদ্ধৃতি পেশ করে বলে যে, এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে তিনিও ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে গেছে মর্মে বিশ্বাস করতেন। ইবনে হাজম (রহ.) এর দীর্ঘ বক্তব্যের খণ্ডাংশটি এই রকম,

وَلَمْ يُرِدْ عِيسَى – عَلَيْهِ السَّلَامُ – بِقَوْلِهِ {فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي} [المائدة: ١١٧] وَفَاةَ النَّوْمِ، فَصَحَّ أَنَّهُ إنَّمَا عَنَى وَفَاةَ الْمَوْتِ

অর্থাৎ আয়াতে উল্লিখিত فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي হতে ঈসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে وَفَاةَ النَّوْمِ উদ্দেশ্য নয়, সঠিক হল, নিশ্চয়ই (এখানে) ওফাত থেকে وفاة الموت ই উদ্দেশ্য। (ক্লিক)।

পাঠকবৃন্দ! এই নির্বোধরা কতটা সিলেক্টিভ আর প্রতারক হলে ইবনে হাজম (রহ.)-এর উপর এমন কথাও রটাতে পারে, চিন্তা করুন। আমি ইবনে হাজম (রহ.)-এর অন্যান্য রচনা হতে ঈসা (আ.) সম্পর্কে তাঁর প্রকৃত আকীদা কেমন ছিল তা আজ আপনাদের দেখাব। তবেই ইবনে হাজম (রহ.)-এর উল্লিখিত বক্তব্যের সঠিক মর্মার্থ আপনাদের নিকট পানির মত স্বচ্ছ এবং পরিষ্কার হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

এবার ‘আল মুহাল্লা‘ কিতাবে ইমাম ইবনে হাজমের উল্লিখিত ব্যাখ্যার তাৎপর্য কী তা জেনে নিন! তারপরেই তাঁর অপরাপর রচনার আলোকে আকীদায়ে হায়াতে মসীহ নিয়ে লিখব, ইনশাআল্লাহ। ইবনে হাজম (রহ.)-এর ভাষ্যমতে,

  • “আমার দৃষ্টিতে (এখানে) ওফাত এর সঠিক অর্থ হল ‘ওফাতুল মওত’ (দুনিয়াতে পুন. আগমনের পর তাঁকে মৃত্যুর মাধ্যমে নিয়ে নেয়া)-ই বুঝানো উদ্দেশ্য (ইবনে হাজমের এই উক্তি ইবনে আব্বাসের و فى آخر الزمان তথা ঈসার মৃত্যু শেষযুগে হবে, উক্তির সাথে মিলে যায়)। (তিনি আরো লিখেছেন) যারা বলবে ঈসা (আ:)-কে হত্যাকরা হয়েছে এবং ক্রুশে ছড়ানো হয়েছে তারা কাফের, মুরতাদ এমনকি কুরআনকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করায় এবং ইজমার বিপরীতে আকীদা রাখায় তাদের রক্ত হালাল [তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া বৈধ]।”

(রেফারেন্স, ইবনে হাজম রচিত ‘আল-মুহাল্লা বিল আছার’ খ-১/মাসয়ালা নং ৪১)। নিচে আল মুহাল্লা (المحلى) কিতাবটির সংশ্লিষ্ট স্ক্যানকপি :

ইবনে হাজমের আকীদা :

ইমাম ইবনে হাজম (রহ.)-এর একই রচনা ‘আল মুহাল্লা’ (المحلى لابن حزم) কিতাবের ৯ম খণ্ডের ৩৮৭ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে,

وإنما الإنجيل عند جميع النصارى لا نحاشي منهم أحدا أربعة تواريخ: ألف أحدها: متى وألف الآخر: يوحنا وهما عندهم حواريان. وألف الثالث: مرقس وألف الرابع: لوقا، وهما تلميذان لبعض الحواريين عند كل نصراني على ظهر الأرض. ولا يختلفون: أن تأليفها كان على سنين من رفع عيسى عليه السلام

অর্থাৎ ‘ইঞ্জিল বা গসপেল সমস্ত খ্রিস্টানদের নিকট বিশ্বাসযোগ্য, আমরা তার রচিতা ইতিহাসের চারজনের কাউকেই এড়িয়ে চলি না। রচয়িতাদের একজন মথি এবং অন্যজন ইউহান্না বা জন, তারা দুজনই যিশুর শিষ্য। তৃতীয়জন মার্ক এবং চতুর্থজন লুক এবং তারা পৃথিবীর প্রতিটি খ্রিস্টানদের মতে যিশুর কোনো না কোনো শিষ্যের শিষ্য, এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য নেই। এই গসপেল ঈসা মসীহ (আ.)-কে উঠিয়ে নেয়ার বছরগুলিতে রচিত হয়েছিল।’

  • এখানে ইমাম ইবনে হাজমের সর্বশেষ কথাটি নিয়ে চিন্তা করুন। তিনি ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে গেছে বলে মনে করলে তবে কেন বললেন,
  • أن تأليفها كان على سنين من رفع عيسى عليه السلام
  • অর্থ- “এই গসপেল ঈসা মসীহ-কে উঠিয়ে নেয়ার বছরগুলিতে রচিত হয়েছিল।”
  • উল্লেখ্য, গসপেল রচনাকারীদের উল্লিখিত সবাই ১২০ খ্রিস্টাব্দের অনেক পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছেন (উইকিপিডিয়া দ্রষ্টব্য)।
  • কাজেই কাদিয়ানীদের মতে ঈসা (আ.)-এর রাফা (উঠিয়ে নেয়া) ১২০ খ্রিস্টাব্দে হলে তখন আমাদেরকে এটিও মেনে নিতে হয় যে, গসপেলের উক্ত লিখকগণ ১২০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী বছরগুলোতেই গসপেল লিখেছিলেন! অথচ গবেষক মাত্রই জানেন, এইরূপ বিশ্বাসের সাথে সত্যের লেশমাত্র সম্পর্কও নেই। অপ্রিয় হলেও সত্য, ইতিহাসের বাস্তবতাকেও অস্বীকার করা ছাড়া কাউকেই কাদিয়ানী মতবাদ গিলানো সম্ভব না। তারপর তিনি একই গ্রন্থের (المحلى لابن حزم) ১ম খণ্ডের ৯ নং পৃষ্ঠায় আরও লিখেছেন,
  • مسألة: إلا أن عيسى ابن مريم عليه السلام سينزل وقد كان قبله عليه السلام أنبياء كثيرة ممن سمى الله تعالى ومنهم لم يسم ; والإيمان بجميعهم فرض. برهان ذلك ؛ ماحدثنا عبد الله بن يوسف, حدثنا أحمد بن فتح, حدثنا عبد الوهاب بن عيسى, حدثنا أحمد بن محمد, حدثنا أحمد بن علي, حدثنا مسلم بن الحجاج, حدثنا الوليد بن شجاع وهارون بن عبد الله وحجاج بن الشاعر ; قالوا: “حدثنا حجاج, و, هو ابن محمد, عن ابن جريج قال: أخبرنا أبو الزبير أنه سمع جابر بن عبد الله يقول: “سمعت النبي صلى الله عليه وسلم يقول: “لا تزال طائفة من أمتي يقاتلون على الحق ظاهرين إلى يوم القيامة”. قال: ” فينزل عيسى ابن مريم صلى الله عليه وسلم فيقول أميرهم: تعال صل لنا. فيقول: لا, إن بعضكم على بعض أمراء, تكرمة الله هذه الآمة”
  • অর্থাৎ ঈসা (যীশু) অচিরেই নেমে আসবেন শীর্ষক অধ্যায় (باب الا ان عيسى سينزل)। মাসয়ালা : মরিয়ম পুত্র ঈসা (আ.) অচিরেই অবতরণ করবেন। তাঁর পূর্বেও অনেক নবী ছিলেন, আল্লাহতালা যাদের কারো কারো পরিচয় ব্যক্ত করেছেন আবার কারো কারো পরিচয় ব্যক্ত করেননি। তবে তাদের সকলের প্রতি ঈমান রাখা ফরজ তথা আবশ্যক। (ইমাম ইবনে হাজম উপরিউক্ত মাসয়ালা দেয়ার পর প্রমাণ হিসেবে সহীহ মুসলিম থেকে ঈসা মসীহ’র পৃথিবীতে নেমে আসার একটি বর্ণনাও উল্লেখ করেন। দীর্ঘ হাদীসটির শেষে এসেছে, فينزل عيسى ابن مريم صلى الله عليه وسلم অর্থ-অতপর ঈসা ইবনে মরিয়ম নেমে আসবেন)।

এখানে ইবনে হাজমের বক্তব্য أن عيسى ابن مريم عليه السلام سينزل وقد كان قبله عليه السلام أنبياء كثيرة (মরিয়ম পুত্র ঈসা অচিরেই অবতরণ করবেন। তাঁর পূর্বেও অনেক নবী ছিলেন)। এখন তিনি ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে গেছে বলে মনে করলে তবে কি তিনি তথাকথিত রূপক ঈসার আগমনের বয়ান দিলেন?

কথিত রূপক ঈসা’র মতবাদের ফেরিওয়ালাদের জন্য দুঃসংবাদ হল, ইবনে হাজম (রহ.) কিন্তু তার অপর আরেকটি রচনা ‘আল ফসলু ফিল মিলালি ওয়াল আহওয়ায়ি ওয়ান নাহলি’ (الفصل في الملل والأهواء والنحل) নামীয় কিতাবে আগমনকারী ঈসাকে পরিষ্কার শব্দে ‘বনী ইসরাইলী’ ঈসা (من نزُول عِيسَى عَلَيْهِ السَّلَام الَّذِي بعث إِلَى بني إِسْرَائِيل) বলেই আখ্যা দিয়েছেন। এই যে তিনি লিখেছেন,

وَقد صَحَّ عَن رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم بِنَقْل الكواف الَّتِي نقلت نبوته واعلامه وَكتابه أَنه أخبر أَنه لَا نَبِي بعده إِلَّا مَا جَاءَت الْأَخْبَار الصِّحَاح من نزُول عِيسَى عَلَيْهِ السَّلَام الَّذِي بعث إِلَى بني إِسْرَائِيل وَادّعى الْيَهُود قَتله وصلبه فَوَجَبَ الْإِقْرَار بِهَذِهِ الْجُمْلَة وَصَحَّ أَن وجود النُّبُوَّة بعده عَلَيْهِ السَّلَام بَاطِل لَا يكون الْبَتَّةَ وَبِهَذَا يبطل أَيْضا قَول من قَالَ بتواتر الرُّسُل وَوُجُوب ذَلِك أبدا وَبِكُل مَا قدمْنَاهُ مِمَّا أبطلنا بِهِ قَول من قَالَ بامتناعهما الْبَتَّةَ إِذْ عُمْدَة حجَّة هَؤُلَاءِ هِيَ قَوْلهم إِن الله حَكِيم والحكيم لَا يجوز فِي حكمته أَن يتْرك عباده هملاً دون إنذار

অর্থাৎ রসূল (সা.) থেকে অতিব দৃঢ়তার সাথে ও বিশুদ্ধাকারে তাঁর নবুওয়ত, নিদর্শনাদি এবং তার কিতাবের (কুরআন) বিষয়ে বর্ণিত আছে যে, তিনি সংবাদ দিয়েছেন, তাঁর পরে আর কোনো নবী নেই; তবে বহু বিশুদ্ধ হাদীস বনী ইসরাইলের প্রতি প্রেরিত হযরত ঈসা (আ.)-এর নেমে আসা (নুযূল) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, ইহুদীরা যাঁকে হত্যা এবং ক্রুসে ছড়ানোর দাবী করে থাকে। সুতরাং এই বাক্যটি দ্বারা এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা আবশ্যক হয়ে গেছে। (আল ফসলু ফিল মিলালি ওয়াল আহওয়ায়ি ওয়ান নাহলি খ-১/পৃ-৭৭, ইবনে হাজম)। কিতাবটির স্ক্রিনশট :-

তিনি একই রচনার ৪নং খণ্ডের ১৩৮ নং পৃষ্ঠায় আরও লিখেছেন,

هذا مع سماعهم قول الله تعالى {ولكن رسول الله وخاتم النبيين} وقول رسول الله صلى الله عليه وسلم لا نبي بعدي فكيف يستجيزه مسلم أن يثبت بعده عليه السلام نبيا في الأرض حاشا ما استثناه رسول الله صلى الله عليه وسلم في الآثار المسندة الثابتة في نزول عيسى بن مريم عليه السلام في آخر الزمان

অর্থাৎ এটা তাদের (জানা) শোনা আছে যে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ’র বাণী {কিন্তু তিনি আল্লাহ’র রসূল এবং নবীদের সমাপ্তি} এবং রাসূল (সা.)-এর বাণী, আমার পরে আর কোনো নবী নেই। এমতাবস্থায় কিভাবে একজন মুসলিম তাঁকে (ঈসাকে) তাঁর পরে পৃথিবীতে একজন নবী প্রতিষ্ঠা করার অনুমতি দিতে পারে? শেষ যুগে মরিয়ম তনয় ঈসা (আ.)-এর নেমে আসার ব্যাপারে আল্লাহ’র রসূল (সা.) ব্যতিক্রম যা বলে গেছেন তা প্রমাণিত।

এখানে ইবনে হাজম (রহ.) কতটা সুস্পষ্ট করে নিজের আকীদা পেশ করেছেন তা চিন্তা করুন! আগমনকারী ঈসা আবার এসে নবীর দায়িত্বে থাকবেন না বা একজন নবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের অনুমতি পাবেন না, তিনি বিষয়টি ক্লিয়ার করে যেন কাদিয়ানীদের বিশ্বাসের গোড়ায় কুঠারাঘাত করলেন! তিনি তার পরই লিখলেন,

الآثار المسندة الثابتة في نزول عيسى بن مريم عليه السلام في آخر الزمان

অর্থ- “শেষ যুগে মরিয়ম তনয় ঈসা (আ.)-এর নেমে আসার ব্যাপারে আল্লাহ’র রসূল (সা.) ব্যতিক্রম যা বলে গেছেন তা প্রমাণিত”।

এখন বলুন, ইবনে হাজম (রহ.)-এর আকীদা সুস্পষ্ট করতে এর চেয়ে বেশি আর কী হতে পারে? কিন্তু সাধারণ কাদিয়ানীরা তো বটে, অধিকাংশ মু’আল্লিম বা মুরুব্বি পর্যায়ের কাদিয়ানীরাও ইবনে হাজম (রহ.)-এর উল্লিখিত আকীদা সম্পর্কে পুরোই অন্ধকারে। আল্লাহ তাদের সঠিক জ্ঞান বুদ্ধি দান করুন।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

আমি একজন সাধারণ শিক্ষিত হয়ে কাদিয়ানীদের সাথে ডিবেট করব কিভাবে?

একজন জেনারেল শিক্ষিত ও দ্বীনি ভাইকে তাঁর আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে আমার ব্যক্তিগত গাইড লাইন :

চিকিৎসক :

আমি পেশায় একজন দন্ত চিকিৎসক (ডেন্টিস্ট)। ইসলাম নিয়ে জানার ও পড়ার আগ্রহ প্রবল। অবসর সময় যেটুকু পাই তাতে কিছুটা দেওয়ার চেষ্টা করি। গতকাল আমার চেম্বারে একজন পেশেন্ট পাই যার সাথে আমার ডাক্তার-রোগীর সম্পর্ক প্রায় ৫-৬ বছর। আগে কখনো এটা অনুভব করিনি বা বুঝিনি যে ওনি কাদিয়ানী বা ভিন্ন আকিদার। যাইহোক, হঠাৎ ওনি নিজ থেকে আমাকে প্রশ্ন করে বসলেন ঈসা (আ) জীবিত নাকি মৃত? সরাসরি উত্তরে যা বলেছি তা হলো এই যে, ঈসা (আ) পৃথিবীতে আসবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করবেন এটাই সত্য এবং পবিত্র কোরআন তাই ইঙ্গিত করে। ওরা তো তা বরাবরই অস্বীকার করে বলে, ঈসা (আ) মৃত। কাজেই আসবার প্রশ্নই উঠেনা। পরে আমি বির্তক এড়িয়ে রোগী দেখায় মনোযোগী হই। রোগী শেষ করে দেখি আমার চেম্বারে ওয়েটিং রুমে ওনি ফোন করে ওনাদের ঈমামকে নিয়ে এলেন এই বিষয়ে ডিবেট করতে যা ওই মুহুর্তে আমি মোটেও তা করতে প্রস্তুত নয়, কারণ তাদের বিষয়ে আমার জানাশোনা কম। পরে আমার কাছ থেকে ব্যক্তিটি আগামী শুক্রবার রাত ১০ টা বসবেন বলে সময় চান। আর আমি পড়াশোনা করে এই বিষয়ে দলিল পেশ করবো বলে সময় দি। এখন এই বিষয়ে আপনার জানাশোনা কোনো বির্তাকিক কি আছেন যে কিনা চট্টগ্রামে ২ নং গেইটের আশেপাশে থাকেন বা দাওয়াত করে আনা যাবে। জাযাকাল্লাহ খাইরান।

আমি :

আমার সাথেও একবার ওদের ৪ জন মু’আল্লিম ডিবেটে বসেছিল। আমি জানতে চেয়েছিলাম, তর্কের খাতিরে ধরুন যে, ঈসা (আ.) জীবিত নেই। এখন তাই বলে কি মির্যা কাদিয়ানী হাদীসে বর্ণিত সেই ঈসা (আ.) হয়ে যাবেন? এভাবে ঈসা মসীহ হওয়ার দাবী তো বাহায়ী জামাতের বাহাউল্লাহও ১৮৬৩ সালের দিকে করে ছিল। সেও মির্যা কাদিয়ানীর মতই ‘বাহায়ী জামাত’ প্রতিষ্ঠা করে গেছে। বর্তমানে তারা পৃথিবীর প্রায় ২১৮ টি দেশে আছে। তারা সংখ্যায় ৭০ লাখেরও বেশি। অনলাইন থেকে উইকিপিডিয়া (জনপরিসংখ্যান) দেখুন। এখন এরকম ভাবে ঈসা বা ‘রূপক ঈসা’ দাবীর যৌক্তিকতা থাকলে বাহাউল্লাহ ইরানী সম্পর্কে কী বলবেন? বাহাউল্লাহ একই সাথে নবী রাসূল খোদা যেমন দাবী করেছিল, তেমনিভাবে এগুলো মির্যা কাদিয়ানীও করে গেছেন। কাজেই দুইটাই সমানে সমান। আগে এর সমাধান কী হবে বলুন! (এভাবে প্রশ্ন রাখবেন)।

বলে রাখা জরুরি, মসীহ মওউদ দাবীকারী বাহাউল্লাহ ইরানী (১৮১৭-১৮৯২) নবী রাসূল দাবী করার পর আরও প্রায় চল্লিশ বছর বেঁচেছিলেন। নিচে কাদিয়ানীদের অফিসিয়াল উর্দূ দৈনিক পত্রিকা আল হিকাম (তাং ১৭-১১-১৯০৪, পাতা নং ১৯) স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য।

তিনি : জ্বী, আসলে তাদের বিষয়ে আমার জানাশোনা একেবারেই কম। তাই গত রাতে আপনার পেইজ এবং ওয়েবসাইট থেকে অনেক লিখাই পড়ার চেষ্টা করি।

আমি : ওরা আপনার নিকট মির্যা কাদিয়ানীর নবী রাসূল আর খোদা দাবীর প্রমাণ চাইলে এই লিংকটি ওপেন করে দেখাবেন (ক্লিক)। আর এই ভিডিও ৪টিও (যদি প্রয়োজন হয়) প্লে করে দেখাবেন। যেমন, কাদিয়ানীর নবী দাবী (সিরিজ ১) (ইউটিউব)
কাদিয়ানীর নবী দাবী (সিরিজ ২) (ইউটিউব)
কাদিয়ানীর নবী দাবী (সিরিজ ৩) (ইউটিউব)
কাদিয়ানীর নবী দাবী (সিরিজ ৪) (ইউটিউব)

আর আপনি এই সিরিয়ালে কথা অব্যাহত রাখবেন। আপনি বরাবরই একটা কথা বলবেন, সেটি হচ্ছে আমি একজন সাধারণ মানুষ, আলেম নই (আবার বিজ্ঞ ও গবেষক আলেম ছাড়া সব সময় সব ধর্মীয় বিষয়ে সলিউশন দেয়া সম্ভবও হয়না), সুতরাং আমি আপনাদের সাথে ইলমি (একাডেমিক) আলোচনা করব না। আমি সাধারণ জ্ঞানে যা বুঝি সেই আলোকেই আপনাদেরকে কিছু প্রশ্ন করব। আর হ্যাঁ, দরকার হলে আমি প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী সাহেবকে নিয়ে আপনাদের সাথে বসার ব্যবস্থা করব, যদি আপনারা রাজি থাকেন এবং লিখিতভাবে ডিবেটে বসার প্রতিশ্রুতি দেন। (এভাবে কথা বলে আপনি তাদেরকে নিচের প্রশ্নগুলো করবেন)।

তিনি : ইনশাআল্লাহ, অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা; মুহতারাম!

আমি : প্রশ্নগুলো করবেন এভাবে। এই যে এখানে (নিচের লিংক দ্রষ্টব্য) কতগুলো আকিদার বিষয়ে আপনাদের বললাম, এগুলো কি মুসলমানদের আকিদা (বিশ্বাস) হতে পারে? অথচ আপনারা এসব আকিদা পোষণ করে ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেছেন।

এখানে ক্লিক করুন

ওরা এগুলো প্রমাণ করতে চাইলে বলবেন যে, বইগুলো যদি আপনাদেরই হয় তাহলে আপনারা বইগুলো আমার নিকট নিয়ে আসুন। আমি প্রয়োজনে প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী সাহেবকে সাথে নিয়ে আপনাদের সাথে আবার বসব, ইনশাআল্লাহ। আর যদি বইগুলো নিয়ে না আসেন কিংবা পুনরায় না বসেন তাহলে একদম দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, আপনাদের সম্পর্কে আমি যা যা উত্থাপন করলাম তার সবই সত্য এবং বাস্তব, আপনারা যে সত্য নন; সেটা প্রকারান্তরে আপনারাই প্রমাণ করে দিলেন।

তিনি : অসংখ্য ধন্যবাদ, মুহতারাম। আমি আপনার পেইজ থেকে গত রাতে অনেক গুলো আর্টিকেল পড়েছি। মির্যা কাদিয়ানীর স্ববিরোধ কথার সিরিজ ১ থেকে ৪২ পর্যন্ত আমি পড়েছি আর আজকে প্রিন্ট করে নেব।

আমি : মাশাআল্লাহ। আপনাকে তারা বরাবরই ঈসা (আ.) জীবিত নাকি মৃত—এই টপিকে টেনে নিতে চাইবে। কারণ এদের শিক্ষার হাতেগড়ি এই কন্টেন্ট পর্যন্তই। এর বাহিরে এদের পুটলিতে আর কোনো জমাজাটি নেই। তাছাড়া এদের বেশিভাগই একদম নিম্নবিত্ত থেকে উঠে আসা ও সাধারণ শিক্ষিত। এদের ইমাম মাহদী, নুযূলে ঈসা, আকীদায়ে খতমে নবুওয়ত ইত্যাদি কনসেপশন আগাগোড়াই কাদিয়ানী সিলেবাসের মধ্যেই বাক্সবন্দী। ইসলামের মূলধারার কোনো তাফসীর, হাদীস, সাহিত্য বা উসূল সংক্রান্ত কোনো কিতাবই তারা পড়ে দেখেনি। তাই তাদের সাথে ইলমি (একাডেমিক) বিতর্ক মূল্যহীন। যেজন্য এদের সাথে এদেরই প্রকাশনীর বইপুস্তক দেখিয়ে কথা বলতে হবে। আপনি তাদেরকে যুক্তি দিবেন, মনে করুন আমি (তর্কের খাতিরে) মেনে নিলাম যে, ঈসা (আ.) মারা গেছেন, তিনি আর আসবেন না। আপনাদের বিশ্বাস মতে একজন রূপক ঈসাই আসবেন। কিন্তু আমি মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে মানলাম না, বরং আমি মনে করি যে, সে একজন মিথ্যাবাদী ও প্রতারক। এখন আপনারা কি আমাকে ঈসা (আ.) মারা গেছেন—এমন বিশ্বাসের কারণেই মুসলমান বলে স্বীকৃতি দেবেন?

  • বলে রাখা জরুরি, ঈসা (আ.) জীবিত নাকি মৃত—এমন বিশ্বাস ইসলামের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ই নয়। আর একথা স্বয়ং মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীই তার রচনায় লিখে গেছেন। (দেখুন, আহমদী ও গয়ের আহমদীদের মধ্যে পার্থক্য, পৃ-১)। ঢাকা বকশিবাজার (কাদিয়ানী আস্তানা) থেকে আপনারাই বইটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছেন। নিচে বইটির প্রচ্ছদ এবং সংশ্লিষ্ট পাতাটির স্ক্যানকপি দেখুন!

যাইহোক এখন আপনাদের উত্তর যদি এমন হয় যে, শুধু ঈসা (আ.) মারা গেছেন বলে বিশ্বাস করলে হবেনা, বরং মির্যা সাহেবের দাবীগুলোর প্রতি ঈমান আনা আবশ্যক; নইলে আপনি অমুসলিম হিসেবে গণ্য হবেন (মির্যা কাদিয়ানীর কথিত ওহী ইলহামের সংকলন তাযকিরাহ পৃ-৫১৯, স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য)!

তাহলে তো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, ঈসা (আ.)-এর বাঁচা মরার বিষয়টি মূল আলোচ্য বিষয় না, বরং মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে স্বীকৃতি দেয়া! যদি তাই হয় তাহলে সর্বপ্রথম মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর ব্যক্তিত্ব নিয়ে কথা বলুন! আমি দেখতে চাই, তিনি ন্যূনতম একজন সত্যবাদীও ছিলেন কিনা? আর তিনি যা যা দাবী করে গেছেন তিনি সেসব কিছু দাবী করার মত যোগ্যতাও রাখতেন কিনা?

তিনি : মাশাআল্লাহ, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা! আল্লাহ এইজন্য আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন!

আমি : শুকরিয়া! তারপর আপনি মির্যার এই মিথ্যাচার গুলো পেশ করবেন। তার আগে দুইপক্ষ যার যার আলোচনার জন্য নির্ধারিত সময় নিয়ে নেবেন, কেউ কারো নির্ধারিত সময় সাইড-টক করবেনা। ত্রিশ মিনিট সময় হাতে নেবেন। আর মিথ্যাচারগুলো সামনে পেশ করতে থাকবেন। নিচের লিংকগুলো ওপেন করবেন।

প্রথমে দেখে নিন আল্লাহ’র প্রতি মিথ্যা আরোপকারী সম্পর্কে মির্যার সুস্পষ্ট ফতুয়া

আল্লাহর নামে মুসলেহ মওউদ স্বরূপ একটি পুত্র সন্তানের মিথ্যা ভবিষ্যৎবাণী (মিথ্যা-১)

মির্যা কাদিয়ানী নিজের বয়স নিয়ে আল্লাহর নামে মিথ্যাচার (মিথ্যা-২)

মির্যার ৫টি মিথ্যা ভবিষ্যৎবাণী (মিথ্যা-৩)

পণ্ডিত লেখরাম সম্পর্কে মির্যার মিথ্যা ভবিষ্যৎবাণী (মিথ্যা-৪)

হাদীসের নামে মির্যা কাদিয়ানীর ডজনখানেক জঘন্য মিথ্যাচার (মিথ্যা-৫)

বাইবেলের তিনটি পুস্তকের নামে মির্যার মিথ্যা উদ্ধৃতি (মিথ্যা-৬)

শায়খ সারহেন্দী (রহ.) এর নামে একই বক্তব্য দুই জায়গায় দুইরকম (মিথ্য-৭)

মসীহ’র রূহানীভাবে আসার কথা নাকি বাইবেলে এসেছে! (মিথ্যা-৮)

হযরত ইউনুস (আ.)-এর নামে জঘন্য মিথ্যাচার (মিথ্যা-৯)

কাশ্মীরের শ্রীনগরে সমাহিত ইউজে আসেফকে ঈসা (আ.) সাব্যস্ত করতে মির্যার যত ধরনের মিথ্যা আর ধোকাবাজি! (মিথ্যা-১০)

এরপর মির্যা কাদিয়ানীর স্ববিরোধী কথার বাক্সটি খুলবেন। আমার সংগৃহীত প্রায় ৪২টি স্ববিরোধ কথার প্রমাণ পেশ করবেন। লিংকটি ওপেন করবেন।

তারপর মির্যা কাদিয়ানী একজন সিজোফ্রেনিয়া, হিস্টিরিয়া এবং মৃগী রোগীও ছিল, ব্যাপারটির প্রমাণ পেশ করবেন। লিংকটি ওপেন করবেন।

সর্বশেষে কথার পরিসমাপ্তি করে বলবেন, যে ব্যক্তির জীবন চরিত্র এত নিম্নমানের, মিথ্যা প্রতারণা যার নিত্যনৈমিত্তিক স্বভাবের অংশ, আবার একজন সিজোফ্রেনিয়া (মস্তিষ্ক বিকৃত, পাগল) রোগীও সে আর যাইহোক না কেন, অন্তত আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত কেউ হতে পারেনা। কেননা মিথ্যাবাদীর প্রতি স্বয়ং আল্লাহই লানত দিয়ে রেখেছেন। তাহলে বান্দার সংশোধনের জন্য সেই আল্লাহ একজন মিথ্যাবাদীকে কেন মনোনীত করবেন? আর একজন মিথ্যাবাদীর কথায় আমরাও বা কিভাবে আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারি? সে তো শয়তানের কথাকেও আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে চালিয়ে দিতে পারে, তাই নয় কি? এই যে পবিত্র কুরআনও একই কথা বলছে। অর্থাৎ মিথ্যাবাদী আর পাপীষ্ঠ যারা তাদেরকে শয়তানই নানা বিষয়ে প্ররোচনা দিয়ে থাকে, যা তারা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ হতে মনে করে ধোকা খায়। যেমন, আল্লাহতালা আয়াত নাযিল করেছেন, ہَلۡ اُنَبِّئُکُمۡ عَلٰی مَنۡ تَنَزَّلُ الشَّیٰطِیۡنُ অর্থ, আমি তোমাদেরকে জানাব কি, কার নিকট শয়তান অবতীর্ণ হয়? تَنَزَّلُ عَلٰی کُلِّ اَفَّاکٍ اَثِیۡمٍ অর্থ, ওরা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী পাপিষ্ঠের নিকট। (সূরা আশ-শু’আরা ২৬:২২১-২২)।

সংক্ষিপ্ত তাফসীর :

কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে শয়তানের কোনো হাত নেই। কারণ শয়তান তো মিথ্যুক এবং পাপিষ্ঠদের (জ্যোতিষী, গণক ও নবুওয়তের মিথ্যাদাবীদার প্রভৃতিদের) নিকট আসে যায়, নবী ও নেককার লোকেদের নিকট আসে না (তাফসীরে আহসানুল বয়ান)।

তারপর অপেক্ষা করতে থাকবেন, মির্যায়ী/কাদিয়ানী মতের অনুসারী ডিবেটাররা আপনার প্রশ্নের কী উত্তর দেন!

(অসমাপ্ত)

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
শিক্ষাবিদ ও গবেষক।

‘নিশ্চয়ই তারা প্রত্যেকে মরণশীল’ বাক্যটি হতে উদ্দেশ্য কারা?

0

সূরা যুমার আয়াত নং ৩০ (إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ) এর সঠিক বিশ্লেষণ ও ভ্রান্তি নিরসন

যে বা যারাই রাসূল (সা.)-এর হাদীস, সাহাবীদের আছার (ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ) কিংবা নির্ভরযোগ্য তাফসীরকারকদের তাফসীরের বিপরীতে কুরআনকে নিজের মত করে বুঝার দুঃসাহস করবে তারা নিশ্চিত পদস্খলিত হবেই হবে। সূরা যুমার, আয়াত নং ৩০, আল্লাহ তালা বলছেন, إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ অর্থাৎ নিশ্চয়ই আপনি মরনশীল এবং নিশ্চয় তারাও মরনশীল। নির্ভরযোগ্য তাফসীর ‘তাফসীরে তাবারী‘-তে আয়াতটির “নিশ্চয় তারাও” বলতে কাদের বুঝানো উদ্দেশ্য? এ সম্পর্কে সবার পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।

তাফসীরে তাবারী’র স্ক্রিনশটটি দেখুন, এখানে লিখা আছে,

القول في تأويل قوله تعالى : إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ (30)
يقول تعالى ذكره لنبيه محمد صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّم: إنك يا محمد ميت عن قليل, وإن هؤلاء المكذّبيك من قومك والمؤمنين منهم ميتون .

অর্থ- إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ আল্লাহর এই কথার ব্যাখ্যা হচ্ছে, এখানে তিনি স্বীয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে উল্লেখ করে বলেছেন, হে মুহাম্মদ (সা.)! নিশ্চয়ই আপনি সামান্য কিছুদিনের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করবেন আর আপনার সম্প্রদায়ের (মক্কার মুশরিকদের) যারা আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী এবং ঈমানদারগণ তারা প্রত্যেকে মরণশীল অর্থাৎ মৃত্যুবরণকারী। (অনুবাদ সমাপ্ত)। স্ক্রিনশট এই,

আয়াতের শানে নুযূল দেখলে ব্যাপারটি আরও ক্লিয়ার হয়ে যাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, আয়াতে উল্লিখিত ‘আর নিশ্চয়ই তারাও মরনশীল’ (وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ) হতে অজ্ঞতাবশত কেউ কেউ পূর্বেকার নবী রাসূলগণকেই উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে, যা নির্ভরযোগ্য তাফসীর, সাহাবীদের শিক্ষা এবং আরবী ব্যাকরণের সুস্পষ্ট পরিপন্থী।

আরবী ব্যাকরণের সুস্পষ্ট পরিপন্থী কিভাবে?

উত্তর, আয়াতটিতে مَّيِّتُونَ (প্রত্যেকে মরনশীল) ইসমে ফায়েল এর বহুবচন। তার অর্থে ভবিষ্যতের অর্থ গৃহীত। সে হিসেবে কাদিয়ানীসহ আরও যারা আয়াতটির ঐ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ দ্বারা পূর্বেকার সব নবী রাসূলকে উদ্দেশ্য নেন তাদেরকে জিজ্ঞেস করতে চাই, এখন তাহলে কি مَّيِّتُونَ বলে আল্লাহ অন্যান্য নবীগণের মৃত্যু ভবিষ্যতে হবে, বুঝালেন?

কেয়ামত পর্যন্ত তাদের নিকট এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই। আল্লাহ আমাদের ঈমানকে এই আখেরি যামানায় কাদিয়ানী সহ প্রত্যেক অশিক্ষিত আর মূর্খদের অনুমান নির্ভর কথাবার্তা হতে হেফাজত করুন। (লিখাটি ফেইসবুক থেকে কাদিয়ানীদের বিভিন্ন কমেন্ট সহ)।

  • প্রাসঙ্গিক আরেকটা লিখা এখানে ক্লিক করুন!

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

দেওবন্দী বেরলবি কলেমা কি আসলেই এমন?

0

দেওবন্দী বেরলবি আহলে হাদীস কিবা সালাফি যেই মাসলাকের কথাই উল্লেখ করেন না কেন, কেউই এখন আর ধোয়া তুলসীপাতা থাকেনি। হিংসা বিদ্বেষ কিবা নির্বুদ্ধিতার কারণেই হোক, একে অন্যের পায়জামা খুলে গলায় পরানোর প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। আপনি স্যোসাল মিডিয়ার দিকে একটু দৃষ্টি বুলালেই আমার কথাগুলোর প্রমাণ পেয়ে যাবেন। এদের সব ঘরানাই নিজেদের পূর্ববর্তী মুরুব্বীদের নাম ভেঙ্গে চলার চেষ্টা করে ঠিক কিন্তু বর্তমানের কোনো পক্ষই এখন আর নিজেদের পূর্ববর্তী মুরুব্বীদের নকশ ও নমুনার উপর পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নেই।

পূর্ববর্তী সালাফদের কিতাব পত্র মুতালা’আ করার প্রচলনও এদের প্রায় সবার কাছ থেকে আস্তে আস্তে বিদায় নিতে শুরু করেছে। আমাকেও অনেকে দেওবন্দী ঘরানার ভাবেন। অনেকে আহলে হাদীসও মনে করেন। আসলে আমি সার্বিকভাবে চিন্তা করে দেখেছি, ইসলামের নামে এই সমস্ত দলাদলি প্রান্তিকতা ছাড়া আর কিছুই না।

আমরা দ্বীনের অসংখ্য শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে আগে থেকেই চিন্তা করে রাখি যে, ব্যক্তি যদি নিজ ঘরানার বাহিরে হয় তাহলে হবেনা। আর যদি পছন্দের কেউ হন তাহলে চোখবন্ধ করেই সব মেনে নেব। এগুলো শুধুমাত্র নানা দলাদলির কারণেই। এই দলাদলিটা এত জঘন্য পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে, কুরআন হাদীসের পরোয়া পর্যন্ত করা হচ্ছেনা। যে যেই ঘরানার সে সেই ঘরানার বুজুর্গ ব্যক্তিকে বিনা বিচারে রাহবার মেনে নিয়ে থাকে। পছন্দের মানুষের কথাকে ওহীর সমপর্যায় ধরে নিয়ে থাকি। এগুলোকে ধর্মীয় পরিভাষায় ‘তায়াচ্ছুফ’ (পক্ষপাতদুষ্ট) বলা হয়। কম বেশি প্রায় সব পক্ষই এই ভাইরাসে আক্রান্ত। বুঝতেছিনা, কাকে ছেড়ে কাকে নিয়ে বলব। আজকের এই লিখাটি কীজন্য লিখতে বাধ্য হলাম তা পরে বলব।

কাদিয়ানীরা কাফের এবং ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত, একথা আমরা সবাই মানি। মির্যা কাদিয়ানী নবী রাসূল দাবী করেছে, নিজেকে খোদা হবার দাবীও করেছে; এগুলো সব প্রমাণিত সত্য কথা। আমাদের সব ঘরানার মুসলিম উম্মাহা তাদের উক্ত কুফুরির ভিত্তিতে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে এক ও অভিন্ন। কিন্তু আমরা এতই নির্বোধ যে, নিজেরাই যখন নিজেদের পায়জামা উন্মোচনে ব্যতিব্যস্ত, তখন সুযোগ পেয়ে বসে ঈমানচোরের দল ‘কাদিয়ানী জামাত’।

কিছু উদাহরণ দিলে বুঝতে সহজ হবে। আল ইমদাদ (الامداد), একটি সাময়িকী, সফর ১৩৩৬ হিজরী সংখ্যা নং ৮, জিলদ ৩ পৃ-৩৫। সেখানে দেওবন্দীদের মুরুব্বি মওলানা আশরাফ আলী থানভি সাহেবের জনৈক মুরিদের একটি স্বপ্নের কারগুজারি বর্ণিত হয়েছে। মুরিদ তো মুরিদই। কিন্তু এটা কোন টাইপের মুরিদ সেটাই বুঝলাম না। মুরিদ নাকি একবার তার পীর সাহেবকে স্বপ্নে দেখলেন। বহুত লম্বা কেচ্ছা। এত সময় নাই রে ভাই, শর্টকাট বলছি। স্বপ্নে পীর সাহেবের দর্শন পেলেন। মুখ দিয়ে কলেমা জারি হল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আশরাফ আলী রাসূলুল্লাহ।‘ নাউযুবিল্লাহ। মুরিদ নিজেই ঘটনা বর্ণনা দিচ্ছেন আর বলছেন, আমি নিজেও বুঝতেছি যে, এটা ভুল করছি কিন্তু জবান আমার নিয়ন্ত্রণে ছিলনা। তাই খুবই ভীতসন্ত্রস্ত হলাম আর কান্নাকাটি করলাম। ঘটনা একটু লম্বা। আমি সারকথা বললাম। এতে বেরলবি ভাইদের ঈমানি দণ্ড দাঁড়িয়ে গেল। কারণ এই সুযোগ বারবার আসেনা। দেওবন্দীদের পায়জামা আজই খুইল্লা ফালাইতে হইবে। দেওবন্দীরা আশরাফ আলীর নামে কলেমা বানাইয়া ফেললো! হায় হায়, কাফের কাফের!!

আপনি স্যোসাল মিডিয়া, গুগল সার্চ করে দেখুন। দেওবন্দীদের নামে এধরণের আরও অসংখ্য অভিযোগ পাইবেন। অথচ ঘটনা ঘটলো কী আর কুস্তিগির পায়জামা উন্মোচনকারীরা ঘটা করে প্রচার করলো কী!

সাধারণ মানুষের কী দরকার, এসবে কান দেবার! খেয়ে দেয়ে বুঝি আর কাজকাম নেই তারগো! অথচ দেওবন্দী মুরুব্বী থানভী সাহেব মুরীদের উক্ত স্বপ্নের তাবীরও (ব্যাখ্যা) দিয়েছেন, যা ‘আল ইমদাদ’ (মাহে জমাদিউস সানী ১৩৩৬ হিজরী, পৃ-১৯) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়ে এসেছে। যাইহোক, এই নেন দেওবন্দীদের সেই কথিত কলেমা। কুস্তিগিরগণ যেটার আগামাথা বাদ দিয়েই দেওবন্দীদের পায়জামা খুলতেই বা-জমাত কোমরে গিট বাইন্ধা দৌড় দিয়েছে। (স্ক্রিনশট)।

আরে থামুন, বেরলবিরা দেওবন্দীদের পায়জামা খুলে শিরোপা জয় করে যখনি বাসায় গিয়ে পৌঁছলো তখনি হঠাৎ করে কী এক কাণ্ড ঘটে গেল, দেখে কারো পরনে পায়জামা নেই। সবাই তালা বাবা আর ছালা বাবার যোগ্য শিষ্যের ন্যায় ল্যাংটা বাবা হয়ে গেল। কী ঘটলো! জ্বী হ্যাঁ, দেওবন্দীরাই সেই ঘটনা ঘটালেন! তারাও কম কিসের, পায়জামা যখন কুরবানি দিয়েছি, ইজ্জত যখন খুইয়ে ফেলেছি তাহলে আর বসে থাকি কেমনে! কুরআনি আইন বাস্তবায়ন করতে নামলেন, পায়জামার বদলে এবার তারাও পায়জামা চায়। যেই চিন্তা সেই কাজ! বেরলবি কলেমা আবিষ্কার করে ছাড়লেন! বাপরে বাপ, কী গবেষণা! ফলে বেরলবিরা বাসায় গিয়ে নিচের দিকে তাকাতে না তাকাতেই দেওবন্দীরা তাদের পায়জামা খুলে দমাদম বিশ্বকাপ জিতিয়ে ফেললেন।

হযরত গাউসে আলী শাহ কালান্দার কাদেরী রচিত ‘তাযকিরায়ে গাউসিয়া‘ বইয়ের ৩২৪ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য। লিখা আছে, প্রখ্যাত পীর হযরত আবুবকর শিবলী (রহ.)-এর দুইজন মুরিদ তাঁর নিকট এসে বাইয়েত গ্রহণ করলেন। তিনি তাদের মধ্যে একজনকে বললেন, পড় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু শিবলী রাসূলুল্লাহ‘। আমি বলি, এধরণের গল্প পুরাই বানোয়াট। বিশিষ্ট বুজুর্গ হযরত শিবলী (রহ.) কখনো এধরণের কথা তার মুরিদকে বলতে পারেন না। কাজেই ঘটনা যাইহোক, অবশেষে দেওবন্দীরা বেরলবিদের তথাকথিত কলেমা আবিষ্কার করে ফেললেন। (স্ক্রিনশট)।

আসলে দুইটাই নষ্টামি। এদের অতি উৎসাহী কর্মকাণ্ডের দরুণ সাধারণ মানুষ আজ দিশেহারা। আলেম সমাজের উপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা আর ভরসা এদের এসব কারণেই বিদায় নিচ্ছে।

কুস্তিগিরদের পায়জামা উন্মোচন প্রতিযোগিতা স্টেডিয়ামের গেলারি থেকে উপভোগ করতেছিলেন আহলে হাদীস নামক সহীহ ডিলাররা। যখনি দুইপক্ষের কুস্তি শেষে শিরোপা জয়ীদের কারোরই পায়জামা নেই দেখলেন, তখনি বড়সড় একটা হাততালি হয়ে গেল। যা দেখে শিরোপা জয়ীরা আর সহ্য করতে পারলেন না। আহলে হাদীসদের পায়জামাও খুইল্লা নেবেন, এমনি প্রতিজ্ঞা তাদের। যেই চিন্তা সেই কাজ! কিছুদিন পরে একই ভাগ্য বরণ করলেন এরাও। এখন কথা হল, অবশেষে কার কী লাভ হল?

কাদিয়ানী শীয়া আহলে কুরআন তথা হাদীস অস্বীকারকারীদেরই আমরা সুযোগ করে দিলাম কিনা? এদের পক্ষে এবার সুযোগ তৈরি হয়ে গেল কিনা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অনুসারীদের রদ করে সাধারণদের কাছে টানার!?

অথচ শিরোপা জয়ীদের কেউই কারো ক্ষেত্রে ইনসাফ করেননি, পুরোপুরি ঘটনা খোলাসা করে তাহকিকের সাথে আসল সত্যটা তুলে ধরেনি। যদি পুরো বিষয়টি সব পক্ষই আমানতের সাথে দেখত তাহলে প্রমাণ হত যে, এইসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্য কোনো পক্ষই দায়ী নন। বড়জোর এটি ব্যক্তি বিশেষের সাথে সম্পর্কিত। দেওবন্দী বেরলবি আহলে হাদীস কোনো পক্ষের সাথেই কলেমার উদ্ভট ঘটনাটি সম্পর্কিত নয়, বরং সব পক্ষই বিশ্বাস করেন যে, সমস্ত মুসলমানের কলেমা যা, সেটাই তাদের কলেমা; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ

পরিশেষে বলব, এই সমস্ত কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করুন। উম্মাহার এই চরম দুর্দিনে প্রকৃত দাঈ সুলভ আচরন করুন। যুব সমাজকে ইরতিদাদের দিকে ঝুঁকতে প্রত্যক্ষ কিবা পরোক্ষভাবেও কোনো ভুমিকা রাখবেন না। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দিন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

বাহাউল্লাহ ইরানীর মসীহ মওউদ দাবী

কাদিয়ানীদের লিটারেচার হতে বাহাউল্লাহর মসীহ দাবির প্রমাণ
প্রশ্ন:

বাহাউল্লাহ ইরানি সাহেব মসীহ মওউদ দাবি করেছিলেন—এর প্রমাণ কী?

উত্তর:

আপনার প্রশ্নের উত্তরে আসার আগে কাদিয়ানি মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর একটি মৌলিক নীতির কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন।

কাদিয়ানীদের তথাকথিত মূলনীতি

কাদিয়ানি বা মির্যায়ী লিটারেচারে একটি বহুল প্রচারিত মূলনীতি হলো—“যদি কোনো ব্যক্তি মিথ্যা নবী হওয়ার ও আল্লাহর প্রত্যাদিষ্ট হওয়ার দাবী করে তাহলে সে মহানবী (সা.) এর নবুওয়াতের সময়কালের সমান জীবন কখনো লাভ করবেনা।” (আরবাঈন ৯৭, গোলাম আহমদ কাদিয়ানী)।

তাদের যুক্তি হলো, পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হাক্কাহ (৬৯:৪৪-৪৬)-এ আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, যদি রাসূল (সা.) আল্লাহর নামে কোনো কথা রচনা করতেন, তবে আল্লাহ তাঁকে কঠোরভাবে পাকড়াও করতেন। কাদিয়ানীদের মতে, এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, কোনো মিথ্যা দাবিদারকে আল্লাহ দীর্ঘ সময় অবকাশ দেন না।

এরপর তারা দাবি করে যে, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী তার দাবির পর প্রায় ২৩ বছরেরও বেশি সময় জীবিত ছিলেন; সুতরাং তিনি মিথ্যাবাদী নন, বরং সত্যবাদী।

আমি এখানে তাদের এই মনগড়া মূলনীতির জবাব উপস্থাপন করব।

সূরা আল-হাক্কাহর আয়াত দ্বারা কি এই মূলনীতি প্রমাণিত হয়?

প্রথমত, কাদিয়ানীদের উক্ত মূলনীতি আদৌ সঠিক নয়; বরং তা ভিত্তিহীন।

দ্বিতীয়ত, সূরা আল-হাক্কাহর ৪৪-৪৬ নম্বর আয়াত কোনোভাবেই এমন একটি সর্বজনীন নীতি প্রতিষ্ঠা করে না, যেভাবে কাদিয়ানীরা দাবি করে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ ۝ لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ ۝ ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ

অর্থাৎ, “সে যদি আমার নামে কিছু রচনা করে চালাতে চেষ্টা করত, তবে অবশ্যই আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম এবং তার জীবন-ধমনী কেটে দিতাম।”

এই আয়াত মূলত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সত্যতার প্রমাণস্বরূপ বর্ণিত হয়েছে। এখানে কোনো সাধারণ নীতি বর্ণিত হয়নি যে, ভবিষ্যতে নবুওয়তের প্রত্যেক মিথ্যা দাবিদারকে সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

যদি কাদিয়ানীদের ব্যাখ্যা মেনে নেওয়া হয়, তাহলে ইতিহাসে যেসব মিথ্যা নবুওয়ত-দাবিদার দীর্ঘ সময় জীবিত থেকেছে, তাদেরও সত্য নবী বলে স্বীকার করতে হবে। অথচ এটি স্পষ্টতই অযৌক্তিক।

বাহাউল্লাহ: কাদিয়ানীদের জন্য একটি বড় প্রশ্ন

এই প্রসঙ্গে বাহাই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা হোসাইন আলী নূরী (বাহাউল্লাহ)-এর উদাহরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাহাউল্লাহ (১৮১৭–১৮৯২) নিজেকে নবী, রাসূল এবং প্রতিশ্রুত মসীহ হিসেবে দাবি করেছিলেন। অথচ তিনি তার দাবি প্রকাশের পর আরও প্রায় চল্লিশ বছর জীবিত ছিলেন।

কাদিয়ানীদের নিজস্ব পত্রিকা দৈনিক আল-হিকাম (১৭ নভেম্বর ১৯০৪, পৃ. ১৯)-এ এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

যদি কাদিয়ানীদের তথাকথিত “২৩ বছরের নীতি” সত্য হয়, তাহলে বাহাউল্লাহও সত্যবাদী বলে গণ্য হওয়ার কথা। তখন মির্যা গোলাম আহমদের পক্ষে এককভাবে এই যুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।

বাহাউল্লাহর মসীহ ও ওহির দাবি

বাহাই ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাহাউল্লাহ নিজেকে যিশু (আ.)-এর “দ্বিতীয় আগমন” বা “খ্রিস্টের প্রত্যাবর্তন”-এর পূর্ণতা বলে দাবি করেন। তবে তিনি এটিকে আক্ষরিক পুনরাগমন নয়; বরং আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী প্রত্যাবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

১. প্রত্যাবর্তনের ধারণা

বাহাউল্লাহ তাঁর কিতাব-ই-ইকান-এ যুক্তি দেন যে, নবীদের “ফিরে আসা” বলতে তাদের শারীরিক পুনরাগমন বোঝায় না; বরং তাদের ঐশী গুণাবলি ও মিশনের পুনরাবির্ভাব বোঝায়।

২. ইলিয়াস ও ইয়াহইয়া (আ.)-এর উদাহরণ

বাহাই ব্যাখ্যায় বলা হয়, যিশু (আ.) জন দ্য ব্যাপ্টিস্টকে প্রত্যাশিত ইলিয়াস হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, যদিও তিনি আক্ষরিক অর্থে ইলিয়াস ছিলেন না। এখান থেকে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, “খ্রিস্টের প্রত্যাবর্তন”ও প্রতীকী অর্থে বোঝা উচিত।

৩. বাহাউল্লাহর নিজস্ব ঘোষণা

বাহাই ধর্মমতে, বাহাউল্লাহ সেই প্রতিশ্রুত ব্যক্তিত্ব, যার আগমনের সংবাদ বাইবেল, ইসলামি মসীহ-সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী এবং বাবের ঘোষণায় উল্লেখিত হয়েছে।

তবে উল্লেখ্য, এগুলো বাহাই ধর্মের নিজস্ব ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। মূলধারার ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম কিংবা সুন্নি-শিয়া ঐতিহ্য বাহাউল্লাহকে মসীহ মওউদ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।

আহমদিয়া সূত্রে বাহাউল্লাহর দাবি

আহমদিয়া লিটারেচারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাহাউল্লাহ ১২৬৯ হিজরিতে নিজেকে “প্রতিশ্রুত মসীহ” বলে দাবি করেন এবং ১৩০৯ হিজরি পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।

এছাড়া কাদিয়ানীদের অফিসিয়াল উর্দু দৈনিক আল-হিকাম-এ আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাহাউল্লাহ দাবি করেছিলেন—

“আল্লাহ আমার প্রতি ওহি নাজিল করেছেন।”

(দৈনিক আল-হিকাম, ভলিউম ৮, নং ৯, ১৭ নভেম্বর ১৯০৪, পৃ. ১৯)

একজন আহমদি পাঠক পত্রিকায় প্রশ্ন করেন:

“বাহাউল্লাহ ওহি লাভের দাবি করার পরও চল্লিশ বছর জীবিত ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি তার দাবিতে অটল ছিলেন। তাহলে ‘ওয়া লাও তাকাওয়ালা আলাইনা’ আয়াতের ব্যাখ্যা কী হবে?”

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পত্রিকার সম্পাদক এই প্রশ্নের কোনো প্রত্যক্ষ উত্তর দেননি। ফলে বাহাউল্লাহর দীর্ঘকাল জীবিত থাকা এবং তার দাবিতে অবিচল থাকার বিষয়টি কার্যত অস্বীকারও করা হয়নি।

উপসংহার

প্রিয় পাঠক!

যদি কাদিয়ানীদের উপস্থাপিত “২৩ বছরের নীতি” গ্রহণ করা হয়, তাহলে একই যুক্তিতে বাহাউল্লাহ এবং বাহাই ধর্মকেও সত্য বলে স্বীকার করতে হবে। কারণ বাহাউল্লাহ তার দাবি প্রকাশের পর প্রায় চল্লিশ বছর জীবিত ছিলেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নিজের দাবিতে অটল ছিলেন।

অতএব, কাদিয়ানীদের এই যুক্তি তাদের নিজেদের জন্যই একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এই যুক্তি গ্রহণ করলে কেবল মির্যা গোলাম আহমদের দাবিই নয়, ইতিহাসের অন্যান্য নবুওয়ত-দাবিদারদের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।

সুতরাং, সূরা আল-হাক্কাহর উক্ত আয়াতকে কেন্দ্র করে যে মূলনীতি কাদিয়ানীরা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তা কুরআন, ইতিহাস এবং যুক্তি—কোনোটির সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্য উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

(প্রামাণ্য স্ক্রিপ্ট নিম্নরূপ)

লেখক: প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী