Home Blog Page 16

নুযূলে ঈসা সম্পর্কে ইবনে হাজম আল-জাহেরী

প্রশ্ন, হযরত ঈসা (আ.) জীবিত নাকি মৃত এ সংক্রান্ত বিষয়ে ইমাম ইবনে হাজম জাহেরী আল উন্দুলুসী (রহ.)-এর আকীদা কেমন ছিল?

উত্তর, উনার আকীদাও আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অনুরূপ ছিল। আর তার প্রমাণ অনেক ভাবে দেয়া যাবে। আজকে এখানে এই বিষয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করব। তবে আলোচনার পূর্বে একটি প্রশ্নের উত্তর ক্লিয়ার করতে চাই। নির্বোধ কাদিয়ানী সম্প্রদায় ইবনে হাজম (রহ.)-এর আল মুহাল্লা (المحلى) কিতাব থেকে একটি উদ্ধৃতি পেশ করে বলে যে, এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে তিনিও ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে গেছে মর্মে বিশ্বাস করতেন। ইবনে হাজম (রহ.) এর দীর্ঘ বক্তব্যের খণ্ডাংশটি এই রকম,

وَلَمْ يُرِدْ عِيسَى – عَلَيْهِ السَّلَامُ – بِقَوْلِهِ {فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي} [المائدة: ١١٧] وَفَاةَ النَّوْمِ، فَصَحَّ أَنَّهُ إنَّمَا عَنَى وَفَاةَ الْمَوْتِ

অর্থাৎ আয়াতে উল্লিখিত فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي হতে ঈসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে وَفَاةَ النَّوْمِ উদ্দেশ্য নয়, সঠিক হল, নিশ্চয়ই (এখানে) ওফাত থেকে وفاة الموت ই উদ্দেশ্য। (ক্লিক)।

পাঠকবৃন্দ! এই নির্বোধরা কতটা সিলেক্টিভ আর প্রতারক হলে ইবনে হাজম (রহ.)-এর উপর এমন কথাও রটাতে পারে, চিন্তা করুন। আমি ইবনে হাজম (রহ.)-এর অন্যান্য রচনা হতে ঈসা (আ.) সম্পর্কে তাঁর প্রকৃত আকীদা কেমন ছিল তা আজ আপনাদের দেখাব। তবেই ইবনে হাজম (রহ.)-এর উল্লিখিত বক্তব্যের সঠিক মর্মার্থ আপনাদের নিকট পানির মত স্বচ্ছ এবং পরিষ্কার হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

এবার ‘আল মুহাল্লা‘ কিতাবে ইমাম ইবনে হাজমের উল্লিখিত ব্যাখ্যার তাৎপর্য কী তা জেনে নিন! তারপরেই তাঁর অপরাপর রচনার আলোকে আকীদায়ে হায়াতে মসীহ নিয়ে লিখব, ইনশাআল্লাহ। ইবনে হাজম (রহ.)-এর ভাষ্যমতে,

  • “আমার দৃষ্টিতে (এখানে) ওফাত এর সঠিক অর্থ হল ‘ওফাতুল মওত’ (দুনিয়াতে পুন. আগমনের পর তাঁকে মৃত্যুর মাধ্যমে নিয়ে নেয়া)-ই বুঝানো উদ্দেশ্য (ইবনে হাজমের এই উক্তি ইবনে আব্বাসের و فى آخر الزمان তথা ঈসার মৃত্যু শেষযুগে হবে, উক্তির সাথে মিলে যায়)। (তিনি আরো লিখেছেন) যারা বলবে ঈসা (আ:)-কে হত্যাকরা হয়েছে এবং ক্রুশে ছড়ানো হয়েছে তারা কাফের, মুরতাদ এমনকি কুরআনকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করায় এবং ইজমার বিপরীতে আকীদা রাখায় তাদের রক্ত হালাল [তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া বৈধ]।”

(রেফারেন্স, ইবনে হাজম রচিত ‘আল-মুহাল্লা বিল আছার’ খ-১/মাসয়ালা নং ৪১)। নিচে আল মুহাল্লা (المحلى) কিতাবটির সংশ্লিষ্ট স্ক্যানকপি :

ইবনে হাজমের আকীদা :

ইমাম ইবনে হাজম (রহ.)-এর একই রচনা ‘আল মুহাল্লা’ (المحلى لابن حزم) কিতাবের ৯ম খণ্ডের ৩৮৭ নং পৃষ্ঠায় লিখা আছে,

وإنما الإنجيل عند جميع النصارى لا نحاشي منهم أحدا أربعة تواريخ: ألف أحدها: متى وألف الآخر: يوحنا وهما عندهم حواريان. وألف الثالث: مرقس وألف الرابع: لوقا، وهما تلميذان لبعض الحواريين عند كل نصراني على ظهر الأرض. ولا يختلفون: أن تأليفها كان على سنين من رفع عيسى عليه السلام

অর্থাৎ ‘ইঞ্জিল বা গসপেল সমস্ত খ্রিস্টানদের নিকট বিশ্বাসযোগ্য, আমরা তার রচিতা ইতিহাসের চারজনের কাউকেই এড়িয়ে চলি না। রচয়িতাদের একজন মথি এবং অন্যজন ইউহান্না বা জন, তারা দুজনই যিশুর শিষ্য। তৃতীয়জন মার্ক এবং চতুর্থজন লুক এবং তারা পৃথিবীর প্রতিটি খ্রিস্টানদের মতে যিশুর কোনো না কোনো শিষ্যের শিষ্য, এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য নেই। এই গসপেল ঈসা মসীহ (আ.)-কে উঠিয়ে নেয়ার বছরগুলিতে রচিত হয়েছিল।’

  • এখানে ইমাম ইবনে হাজমের সর্বশেষ কথাটি নিয়ে চিন্তা করুন। তিনি ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে গেছে বলে মনে করলে তবে কেন বললেন,
  • أن تأليفها كان على سنين من رفع عيسى عليه السلام
  • অর্থ- “এই গসপেল ঈসা মসীহ-কে উঠিয়ে নেয়ার বছরগুলিতে রচিত হয়েছিল।”
  • উল্লেখ্য, গসপেল রচনাকারীদের উল্লিখিত সবাই ১২০ খ্রিস্টাব্দের অনেক পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেছেন (উইকিপিডিয়া দ্রষ্টব্য)।
  • কাজেই কাদিয়ানীদের মতে ঈসা (আ.)-এর রাফা (উঠিয়ে নেয়া) ১২০ খ্রিস্টাব্দে হলে তখন আমাদেরকে এটিও মেনে নিতে হয় যে, গসপেলের উক্ত লিখকগণ ১২০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী বছরগুলোতেই গসপেল লিখেছিলেন! অথচ গবেষক মাত্রই জানেন, এইরূপ বিশ্বাসের সাথে সত্যের লেশমাত্র সম্পর্কও নেই। অপ্রিয় হলেও সত্য, ইতিহাসের বাস্তবতাকেও অস্বীকার করা ছাড়া কাউকেই কাদিয়ানী মতবাদ গিলানো সম্ভব না। তারপর তিনি একই গ্রন্থের (المحلى لابن حزم) ১ম খণ্ডের ৯ নং পৃষ্ঠায় আরও লিখেছেন,
  • مسألة: إلا أن عيسى ابن مريم عليه السلام سينزل وقد كان قبله عليه السلام أنبياء كثيرة ممن سمى الله تعالى ومنهم لم يسم ; والإيمان بجميعهم فرض. برهان ذلك ؛ ماحدثنا عبد الله بن يوسف, حدثنا أحمد بن فتح, حدثنا عبد الوهاب بن عيسى, حدثنا أحمد بن محمد, حدثنا أحمد بن علي, حدثنا مسلم بن الحجاج, حدثنا الوليد بن شجاع وهارون بن عبد الله وحجاج بن الشاعر ; قالوا: “حدثنا حجاج, و, هو ابن محمد, عن ابن جريج قال: أخبرنا أبو الزبير أنه سمع جابر بن عبد الله يقول: “سمعت النبي صلى الله عليه وسلم يقول: “لا تزال طائفة من أمتي يقاتلون على الحق ظاهرين إلى يوم القيامة”. قال: ” فينزل عيسى ابن مريم صلى الله عليه وسلم فيقول أميرهم: تعال صل لنا. فيقول: لا, إن بعضكم على بعض أمراء, تكرمة الله هذه الآمة”
  • অর্থাৎ ঈসা (যীশু) অচিরেই নেমে আসবেন শীর্ষক অধ্যায় (باب الا ان عيسى سينزل)। মাসয়ালা : মরিয়ম পুত্র ঈসা (আ.) অচিরেই অবতরণ করবেন। তাঁর পূর্বেও অনেক নবী ছিলেন, আল্লাহতালা যাদের কারো কারো পরিচয় ব্যক্ত করেছেন আবার কারো কারো পরিচয় ব্যক্ত করেননি। তবে তাদের সকলের প্রতি ঈমান রাখা ফরজ তথা আবশ্যক। (ইমাম ইবনে হাজম উপরিউক্ত মাসয়ালা দেয়ার পর প্রমাণ হিসেবে সহীহ মুসলিম থেকে ঈসা মসীহ’র পৃথিবীতে নেমে আসার একটি বর্ণনাও উল্লেখ করেন। দীর্ঘ হাদীসটির শেষে এসেছে, فينزل عيسى ابن مريم صلى الله عليه وسلم অর্থ-অতপর ঈসা ইবনে মরিয়ম নেমে আসবেন)।

এখানে ইবনে হাজমের বক্তব্য أن عيسى ابن مريم عليه السلام سينزل وقد كان قبله عليه السلام أنبياء كثيرة (মরিয়ম পুত্র ঈসা অচিরেই অবতরণ করবেন। তাঁর পূর্বেও অনেক নবী ছিলেন)। এখন তিনি ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু হয়ে গেছে বলে মনে করলে তবে কি তিনি তথাকথিত রূপক ঈসার আগমনের বয়ান দিলেন?

কথিত রূপক ঈসা’র মতবাদের ফেরিওয়ালাদের জন্য দুঃসংবাদ হল, ইবনে হাজম (রহ.) কিন্তু তার অপর আরেকটি রচনা ‘আল ফসলু ফিল মিলালি ওয়াল আহওয়ায়ি ওয়ান নাহলি’ (الفصل في الملل والأهواء والنحل) নামীয় কিতাবে আগমনকারী ঈসাকে পরিষ্কার শব্দে ‘বনী ইসরাইলী’ ঈসা (من نزُول عِيسَى عَلَيْهِ السَّلَام الَّذِي بعث إِلَى بني إِسْرَائِيل) বলেই আখ্যা দিয়েছেন। এই যে তিনি লিখেছেন,

وَقد صَحَّ عَن رَسُول الله صلى الله عَلَيْهِ وَسلم بِنَقْل الكواف الَّتِي نقلت نبوته واعلامه وَكتابه أَنه أخبر أَنه لَا نَبِي بعده إِلَّا مَا جَاءَت الْأَخْبَار الصِّحَاح من نزُول عِيسَى عَلَيْهِ السَّلَام الَّذِي بعث إِلَى بني إِسْرَائِيل وَادّعى الْيَهُود قَتله وصلبه فَوَجَبَ الْإِقْرَار بِهَذِهِ الْجُمْلَة وَصَحَّ أَن وجود النُّبُوَّة بعده عَلَيْهِ السَّلَام بَاطِل لَا يكون الْبَتَّةَ وَبِهَذَا يبطل أَيْضا قَول من قَالَ بتواتر الرُّسُل وَوُجُوب ذَلِك أبدا وَبِكُل مَا قدمْنَاهُ مِمَّا أبطلنا بِهِ قَول من قَالَ بامتناعهما الْبَتَّةَ إِذْ عُمْدَة حجَّة هَؤُلَاءِ هِيَ قَوْلهم إِن الله حَكِيم والحكيم لَا يجوز فِي حكمته أَن يتْرك عباده هملاً دون إنذار

অর্থাৎ রসূল (সা.) থেকে অতিব দৃঢ়তার সাথে ও বিশুদ্ধাকারে তাঁর নবুওয়ত, নিদর্শনাদি এবং তার কিতাবের (কুরআন) বিষয়ে বর্ণিত আছে যে, তিনি সংবাদ দিয়েছেন, তাঁর পরে আর কোনো নবী নেই; তবে বহু বিশুদ্ধ হাদীস বনী ইসরাইলের প্রতি প্রেরিত হযরত ঈসা (আ.)-এর নেমে আসা (নুযূল) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, ইহুদীরা যাঁকে হত্যা এবং ক্রুসে ছড়ানোর দাবী করে থাকে। সুতরাং এই বাক্যটি দ্বারা এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা আবশ্যক হয়ে গেছে। (আল ফসলু ফিল মিলালি ওয়াল আহওয়ায়ি ওয়ান নাহলি খ-১/পৃ-৭৭, ইবনে হাজম)। কিতাবটির স্ক্রিনশট :-

তিনি একই রচনার ৪নং খণ্ডের ১৩৮ নং পৃষ্ঠায় আরও লিখেছেন,

هذا مع سماعهم قول الله تعالى {ولكن رسول الله وخاتم النبيين} وقول رسول الله صلى الله عليه وسلم لا نبي بعدي فكيف يستجيزه مسلم أن يثبت بعده عليه السلام نبيا في الأرض حاشا ما استثناه رسول الله صلى الله عليه وسلم في الآثار المسندة الثابتة في نزول عيسى بن مريم عليه السلام في آخر الزمان

অর্থাৎ এটা তাদের (জানা) শোনা আছে যে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ’র বাণী {কিন্তু তিনি আল্লাহ’র রসূল এবং নবীদের সমাপ্তি} এবং রাসূল (সা.)-এর বাণী, আমার পরে আর কোনো নবী নেই। এমতাবস্থায় কিভাবে একজন মুসলিম তাঁকে (ঈসাকে) তাঁর পরে পৃথিবীতে একজন নবী প্রতিষ্ঠা করার অনুমতি দিতে পারে? শেষ যুগে মরিয়ম তনয় ঈসা (আ.)-এর নেমে আসার ব্যাপারে আল্লাহ’র রসূল (সা.) ব্যতিক্রম যা বলে গেছেন তা প্রমাণিত।

এখানে ইবনে হাজম (রহ.) কতটা সুস্পষ্ট করে নিজের আকীদা পেশ করেছেন তা চিন্তা করুন! আগমনকারী ঈসা আবার এসে নবীর দায়িত্বে থাকবেন না বা একজন নবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের অনুমতি পাবেন না, তিনি বিষয়টি ক্লিয়ার করে যেন কাদিয়ানীদের বিশ্বাসের গোড়ায় কুঠারাঘাত করলেন! তিনি তার পরই লিখলেন,

الآثار المسندة الثابتة في نزول عيسى بن مريم عليه السلام في آخر الزمان

অর্থ- “শেষ যুগে মরিয়ম তনয় ঈসা (আ.)-এর নেমে আসার ব্যাপারে আল্লাহ’র রসূল (সা.) ব্যতিক্রম যা বলে গেছেন তা প্রমাণিত”।

এখন বলুন, ইবনে হাজম (রহ.)-এর আকীদা সুস্পষ্ট করতে এর চেয়ে বেশি আর কী হতে পারে? কিন্তু সাধারণ কাদিয়ানীরা তো বটে, অধিকাংশ মু’আল্লিম বা মুরুব্বি পর্যায়ের কাদিয়ানীরাও ইবনে হাজম (রহ.)-এর উল্লিখিত আকীদা সম্পর্কে পুরোই অন্ধকারে। আল্লাহ তাদের সঠিক জ্ঞান বুদ্ধি দান করুন।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

আমি একজন সাধারণ শিক্ষিত হয়ে কাদিয়ানীদের সাথে ডিবেট করব কিভাবে?

একজন জেনারেল শিক্ষিত ও দ্বীনি ভাইকে তাঁর আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে আমার ব্যক্তিগত গাইড লাইন :

চিকিৎসক :

আমি পেশায় একজন দন্ত চিকিৎসক (ডেন্টিস্ট)। ইসলাম নিয়ে জানার ও পড়ার আগ্রহ প্রবল। অবসর সময় যেটুকু পাই তাতে কিছুটা দেওয়ার চেষ্টা করি। গতকাল আমার চেম্বারে একজন পেশেন্ট পাই যার সাথে আমার ডাক্তার-রোগীর সম্পর্ক প্রায় ৫-৬ বছর। আগে কখনো এটা অনুভব করিনি বা বুঝিনি যে ওনি কাদিয়ানী বা ভিন্ন আকিদার। যাইহোক, হঠাৎ ওনি নিজ থেকে আমাকে প্রশ্ন করে বসলেন ঈসা (আ) জীবিত নাকি মৃত? সরাসরি উত্তরে যা বলেছি তা হলো এই যে, ঈসা (আ) পৃথিবীতে আসবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করবেন এটাই সত্য এবং পবিত্র কোরআন তাই ইঙ্গিত করে। ওরা তো তা বরাবরই অস্বীকার করে বলে, ঈসা (আ) মৃত। কাজেই আসবার প্রশ্নই উঠেনা। পরে আমি বির্তক এড়িয়ে রোগী দেখায় মনোযোগী হই। রোগী শেষ করে দেখি আমার চেম্বারে ওয়েটিং রুমে ওনি ফোন করে ওনাদের ঈমামকে নিয়ে এলেন এই বিষয়ে ডিবেট করতে যা ওই মুহুর্তে আমি মোটেও তা করতে প্রস্তুত নয়, কারণ তাদের বিষয়ে আমার জানাশোনা কম। পরে আমার কাছ থেকে ব্যক্তিটি আগামী শুক্রবার রাত ১০ টা বসবেন বলে সময় চান। আর আমি পড়াশোনা করে এই বিষয়ে দলিল পেশ করবো বলে সময় দি। এখন এই বিষয়ে আপনার জানাশোনা কোনো বির্তাকিক কি আছেন যে কিনা চট্টগ্রামে ২ নং গেইটের আশেপাশে থাকেন বা দাওয়াত করে আনা যাবে। জাযাকাল্লাহ খাইরান।

আমি :

আমার সাথেও একবার ওদের ৪ জন মু’আল্লিম ডিবেটে বসেছিল। আমি জানতে চেয়েছিলাম, তর্কের খাতিরে ধরুন যে, ঈসা (আ.) জীবিত নেই। এখন তাই বলে কি মির্যা কাদিয়ানী হাদীসে বর্ণিত সেই ঈসা (আ.) হয়ে যাবেন? এভাবে ঈসা মসীহ হওয়ার দাবী তো বাহায়ী জামাতের বাহাউল্লাহও ১৮৬৩ সালের দিকে করে ছিল। সেও মির্যা কাদিয়ানীর মতই ‘বাহায়ী জামাত’ প্রতিষ্ঠা করে গেছে। বর্তমানে তারা পৃথিবীর প্রায় ২১৮ টি দেশে আছে। তারা সংখ্যায় ৭০ লাখেরও বেশি। অনলাইন থেকে উইকিপিডিয়া (জনপরিসংখ্যান) দেখুন। এখন এরকম ভাবে ঈসা বা ‘রূপক ঈসা’ দাবীর যৌক্তিকতা থাকলে বাহাউল্লাহ ইরানী সম্পর্কে কী বলবেন? বাহাউল্লাহ একই সাথে নবী রাসূল খোদা যেমন দাবী করেছিল, তেমনিভাবে এগুলো মির্যা কাদিয়ানীও করে গেছেন। কাজেই দুইটাই সমানে সমান। আগে এর সমাধান কী হবে বলুন! (এভাবে প্রশ্ন রাখবেন)।

বলে রাখা জরুরি, মসীহ মওউদ দাবীকারী বাহাউল্লাহ ইরানী (১৮১৭-১৮৯২) নবী রাসূল দাবী করার পর আরও প্রায় চল্লিশ বছর বেঁচেছিলেন। নিচে কাদিয়ানীদের অফিসিয়াল উর্দূ দৈনিক পত্রিকা আল হিকাম (তাং ১৭-১১-১৯০৪, পাতা নং ১৯) স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য।

তিনি : জ্বী, আসলে তাদের বিষয়ে আমার জানাশোনা একেবারেই কম। তাই গত রাতে আপনার পেইজ এবং ওয়েবসাইট থেকে অনেক লিখাই পড়ার চেষ্টা করি।

আমি : ওরা আপনার নিকট মির্যা কাদিয়ানীর নবী রাসূল আর খোদা দাবীর প্রমাণ চাইলে এই লিংকটি ওপেন করে দেখাবেন (ক্লিক)। আর এই ভিডিও ৪টিও (যদি প্রয়োজন হয়) প্লে করে দেখাবেন। যেমন, কাদিয়ানীর নবী দাবী (সিরিজ ১) (ইউটিউব)
কাদিয়ানীর নবী দাবী (সিরিজ ২) (ইউটিউব)
কাদিয়ানীর নবী দাবী (সিরিজ ৩) (ইউটিউব)
কাদিয়ানীর নবী দাবী (সিরিজ ৪) (ইউটিউব)

আর আপনি এই সিরিয়ালে কথা অব্যাহত রাখবেন। আপনি বরাবরই একটা কথা বলবেন, সেটি হচ্ছে আমি একজন সাধারণ মানুষ, আলেম নই (আবার বিজ্ঞ ও গবেষক আলেম ছাড়া সব সময় সব ধর্মীয় বিষয়ে সলিউশন দেয়া সম্ভবও হয়না), সুতরাং আমি আপনাদের সাথে ইলমি (একাডেমিক) আলোচনা করব না। আমি সাধারণ জ্ঞানে যা বুঝি সেই আলোকেই আপনাদেরকে কিছু প্রশ্ন করব। আর হ্যাঁ, দরকার হলে আমি প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী সাহেবকে নিয়ে আপনাদের সাথে বসার ব্যবস্থা করব, যদি আপনারা রাজি থাকেন এবং লিখিতভাবে ডিবেটে বসার প্রতিশ্রুতি দেন। (এভাবে কথা বলে আপনি তাদেরকে নিচের প্রশ্নগুলো করবেন)।

তিনি : ইনশাআল্লাহ, অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা; মুহতারাম!

আমি : প্রশ্নগুলো করবেন এভাবে। এই যে এখানে (নিচের লিংক দ্রষ্টব্য) কতগুলো আকিদার বিষয়ে আপনাদের বললাম, এগুলো কি মুসলমানদের আকিদা (বিশ্বাস) হতে পারে? অথচ আপনারা এসব আকিদা পোষণ করে ইসলাম থেকে বেরিয়ে গেছেন।

এখানে ক্লিক করুন

ওরা এগুলো প্রমাণ করতে চাইলে বলবেন যে, বইগুলো যদি আপনাদেরই হয় তাহলে আপনারা বইগুলো আমার নিকট নিয়ে আসুন। আমি প্রয়োজনে প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী সাহেবকে সাথে নিয়ে আপনাদের সাথে আবার বসব, ইনশাআল্লাহ। আর যদি বইগুলো নিয়ে না আসেন কিংবা পুনরায় না বসেন তাহলে একদম দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয়ে যাবে যে, আপনাদের সম্পর্কে আমি যা যা উত্থাপন করলাম তার সবই সত্য এবং বাস্তব, আপনারা যে সত্য নন; সেটা প্রকারান্তরে আপনারাই প্রমাণ করে দিলেন।

তিনি : অসংখ্য ধন্যবাদ, মুহতারাম। আমি আপনার পেইজ থেকে গত রাতে অনেক গুলো আর্টিকেল পড়েছি। মির্যা কাদিয়ানীর স্ববিরোধ কথার সিরিজ ১ থেকে ৪২ পর্যন্ত আমি পড়েছি আর আজকে প্রিন্ট করে নেব।

আমি : মাশাআল্লাহ। আপনাকে তারা বরাবরই ঈসা (আ.) জীবিত নাকি মৃত—এই টপিকে টেনে নিতে চাইবে। কারণ এদের শিক্ষার হাতেগড়ি এই কন্টেন্ট পর্যন্তই। এর বাহিরে এদের পুটলিতে আর কোনো জমাজাটি নেই। তাছাড়া এদের বেশিভাগই একদম নিম্নবিত্ত থেকে উঠে আসা ও সাধারণ শিক্ষিত। এদের ইমাম মাহদী, নুযূলে ঈসা, আকীদায়ে খতমে নবুওয়ত ইত্যাদি কনসেপশন আগাগোড়াই কাদিয়ানী সিলেবাসের মধ্যেই বাক্সবন্দী। ইসলামের মূলধারার কোনো তাফসীর, হাদীস, সাহিত্য বা উসূল সংক্রান্ত কোনো কিতাবই তারা পড়ে দেখেনি। তাই তাদের সাথে ইলমি (একাডেমিক) বিতর্ক মূল্যহীন। যেজন্য এদের সাথে এদেরই প্রকাশনীর বইপুস্তক দেখিয়ে কথা বলতে হবে। আপনি তাদেরকে যুক্তি দিবেন, মনে করুন আমি (তর্কের খাতিরে) মেনে নিলাম যে, ঈসা (আ.) মারা গেছেন, তিনি আর আসবেন না। আপনাদের বিশ্বাস মতে একজন রূপক ঈসাই আসবেন। কিন্তু আমি মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে মানলাম না, বরং আমি মনে করি যে, সে একজন মিথ্যাবাদী ও প্রতারক। এখন আপনারা কি আমাকে ঈসা (আ.) মারা গেছেন—এমন বিশ্বাসের কারণেই মুসলমান বলে স্বীকৃতি দেবেন?

  • বলে রাখা জরুরি, ঈসা (আ.) জীবিত নাকি মৃত—এমন বিশ্বাস ইসলামের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ই নয়। আর একথা স্বয়ং মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীই তার রচনায় লিখে গেছেন। (দেখুন, আহমদী ও গয়ের আহমদীদের মধ্যে পার্থক্য, পৃ-১)। ঢাকা বকশিবাজার (কাদিয়ানী আস্তানা) থেকে আপনারাই বইটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছেন। নিচে বইটির প্রচ্ছদ এবং সংশ্লিষ্ট পাতাটির স্ক্যানকপি দেখুন!

যাইহোক এখন আপনাদের উত্তর যদি এমন হয় যে, শুধু ঈসা (আ.) মারা গেছেন বলে বিশ্বাস করলে হবেনা, বরং মির্যা সাহেবের দাবীগুলোর প্রতি ঈমান আনা আবশ্যক; নইলে আপনি অমুসলিম হিসেবে গণ্য হবেন (মির্যা কাদিয়ানীর কথিত ওহী ইলহামের সংকলন তাযকিরাহ পৃ-৫১৯, স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য)!

তাহলে তো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, ঈসা (আ.)-এর বাঁচা মরার বিষয়টি মূল আলোচ্য বিষয় না, বরং মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে স্বীকৃতি দেয়া! যদি তাই হয় তাহলে সর্বপ্রথম মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর ব্যক্তিত্ব নিয়ে কথা বলুন! আমি দেখতে চাই, তিনি ন্যূনতম একজন সত্যবাদীও ছিলেন কিনা? আর তিনি যা যা দাবী করে গেছেন তিনি সেসব কিছু দাবী করার মত যোগ্যতাও রাখতেন কিনা?

তিনি : মাশাআল্লাহ, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা! আল্লাহ এইজন্য আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন!

আমি : শুকরিয়া! তারপর আপনি মির্যার এই মিথ্যাচার গুলো পেশ করবেন। তার আগে দুইপক্ষ যার যার আলোচনার জন্য নির্ধারিত সময় নিয়ে নেবেন, কেউ কারো নির্ধারিত সময় সাইড-টক করবেনা। ত্রিশ মিনিট সময় হাতে নেবেন। আর মিথ্যাচারগুলো সামনে পেশ করতে থাকবেন। নিচের লিংকগুলো ওপেন করবেন।

প্রথমে দেখে নিন আল্লাহ’র প্রতি মিথ্যা আরোপকারী সম্পর্কে মির্যার সুস্পষ্ট ফতুয়া

আল্লাহর নামে মুসলেহ মওউদ স্বরূপ একটি পুত্র সন্তানের মিথ্যা ভবিষ্যৎবাণী (মিথ্যা-১)

মির্যা কাদিয়ানী নিজের বয়স নিয়ে আল্লাহর নামে মিথ্যাচার (মিথ্যা-২)

মির্যার ৫টি মিথ্যা ভবিষ্যৎবাণী (মিথ্যা-৩)

পণ্ডিত লেখরাম সম্পর্কে মির্যার মিথ্যা ভবিষ্যৎবাণী (মিথ্যা-৪)

হাদীসের নামে মির্যা কাদিয়ানীর ডজনখানেক জঘন্য মিথ্যাচার (মিথ্যা-৫)

বাইবেলের তিনটি পুস্তকের নামে মির্যার মিথ্যা উদ্ধৃতি (মিথ্যা-৬)

শায়খ সারহেন্দী (রহ.) এর নামে একই বক্তব্য দুই জায়গায় দুইরকম (মিথ্য-৭)

মসীহ’র রূহানীভাবে আসার কথা নাকি বাইবেলে এসেছে! (মিথ্যা-৮)

হযরত ইউনুস (আ.)-এর নামে জঘন্য মিথ্যাচার (মিথ্যা-৯)

কাশ্মীরের শ্রীনগরে সমাহিত ইউজে আসেফকে ঈসা (আ.) সাব্যস্ত করতে মির্যার যত ধরনের মিথ্যা আর ধোকাবাজি! (মিথ্যা-১০)

এরপর মির্যা কাদিয়ানীর স্ববিরোধী কথার বাক্সটি খুলবেন। আমার সংগৃহীত প্রায় ৪২টি স্ববিরোধ কথার প্রমাণ পেশ করবেন। লিংকটি ওপেন করবেন।

তারপর মির্যা কাদিয়ানী একজন সিজোফ্রেনিয়া, হিস্টিরিয়া এবং মৃগী রোগীও ছিল, ব্যাপারটির প্রমাণ পেশ করবেন। লিংকটি ওপেন করবেন।

সর্বশেষে কথার পরিসমাপ্তি করে বলবেন, যে ব্যক্তির জীবন চরিত্র এত নিম্নমানের, মিথ্যা প্রতারণা যার নিত্যনৈমিত্তিক স্বভাবের অংশ, আবার একজন সিজোফ্রেনিয়া (মস্তিষ্ক বিকৃত, পাগল) রোগীও সে আর যাইহোক না কেন, অন্তত আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত কেউ হতে পারেনা। কেননা মিথ্যাবাদীর প্রতি স্বয়ং আল্লাহই লানত দিয়ে রেখেছেন। তাহলে বান্দার সংশোধনের জন্য সেই আল্লাহ একজন মিথ্যাবাদীকে কেন মনোনীত করবেন? আর একজন মিথ্যাবাদীর কথায় আমরাও বা কিভাবে আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারি? সে তো শয়তানের কথাকেও আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে চালিয়ে দিতে পারে, তাই নয় কি? এই যে পবিত্র কুরআনও একই কথা বলছে। অর্থাৎ মিথ্যাবাদী আর পাপীষ্ঠ যারা তাদেরকে শয়তানই নানা বিষয়ে প্ররোচনা দিয়ে থাকে, যা তারা সৃষ্টিকর্তার পক্ষ হতে মনে করে ধোকা খায়। যেমন, আল্লাহতালা আয়াত নাযিল করেছেন, ہَلۡ اُنَبِّئُکُمۡ عَلٰی مَنۡ تَنَزَّلُ الشَّیٰطِیۡنُ অর্থ, আমি তোমাদেরকে জানাব কি, কার নিকট শয়তান অবতীর্ণ হয়? تَنَزَّلُ عَلٰی کُلِّ اَفَّاکٍ اَثِیۡمٍ অর্থ, ওরা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেকটি ঘোর মিথ্যাবাদী পাপিষ্ঠের নিকট। (সূরা আশ-শু’আরা ২৬:২২১-২২)।

সংক্ষিপ্ত তাফসীর :

কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে শয়তানের কোনো হাত নেই। কারণ শয়তান তো মিথ্যুক এবং পাপিষ্ঠদের (জ্যোতিষী, গণক ও নবুওয়তের মিথ্যাদাবীদার প্রভৃতিদের) নিকট আসে যায়, নবী ও নেককার লোকেদের নিকট আসে না (তাফসীরে আহসানুল বয়ান)।

তারপর অপেক্ষা করতে থাকবেন, মির্যায়ী/কাদিয়ানী মতের অনুসারী ডিবেটাররা আপনার প্রশ্নের কী উত্তর দেন!

(অসমাপ্ত)

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী
শিক্ষাবিদ ও গবেষক।

‘নিশ্চয়ই তারা প্রত্যেকে মরণশীল’ বাক্যটি হতে উদ্দেশ্য কারা?

0

সূরা যুমার আয়াত নং ৩০ (إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ) এর সঠিক বিশ্লেষণ ও ভ্রান্তি নিরসন

যে বা যারাই রাসূল (সা.)-এর হাদীস, সাহাবীদের আছার (ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ) কিংবা নির্ভরযোগ্য তাফসীরকারকদের তাফসীরের বিপরীতে কুরআনকে নিজের মত করে বুঝার দুঃসাহস করবে তারা নিশ্চিত পদস্খলিত হবেই হবে। সূরা যুমার, আয়াত নং ৩০, আল্লাহ তালা বলছেন, إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ অর্থাৎ নিশ্চয়ই আপনি মরনশীল এবং নিশ্চয় তারাও মরনশীল। নির্ভরযোগ্য তাফসীর ‘তাফসীরে তাবারী‘-তে আয়াতটির “নিশ্চয় তারাও” বলতে কাদের বুঝানো উদ্দেশ্য? এ সম্পর্কে সবার পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি।

তাফসীরে তাবারী’র স্ক্রিনশটটি দেখুন, এখানে লিখা আছে,

القول في تأويل قوله تعالى : إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ (30)
يقول تعالى ذكره لنبيه محمد صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّم: إنك يا محمد ميت عن قليل, وإن هؤلاء المكذّبيك من قومك والمؤمنين منهم ميتون .

অর্থ- إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ আল্লাহর এই কথার ব্যাখ্যা হচ্ছে, এখানে তিনি স্বীয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে উল্লেখ করে বলেছেন, হে মুহাম্মদ (সা.)! নিশ্চয়ই আপনি সামান্য কিছুদিনের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করবেন আর আপনার সম্প্রদায়ের (মক্কার মুশরিকদের) যারা আপনাকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী এবং ঈমানদারগণ তারা প্রত্যেকে মরণশীল অর্থাৎ মৃত্যুবরণকারী। (অনুবাদ সমাপ্ত)। স্ক্রিনশট এই,

আয়াতের শানে নুযূল দেখলে ব্যাপারটি আরও ক্লিয়ার হয়ে যাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, আয়াতে উল্লিখিত ‘আর নিশ্চয়ই তারাও মরনশীল’ (وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ) হতে অজ্ঞতাবশত কেউ কেউ পূর্বেকার নবী রাসূলগণকেই উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে, যা নির্ভরযোগ্য তাফসীর, সাহাবীদের শিক্ষা এবং আরবী ব্যাকরণের সুস্পষ্ট পরিপন্থী।

আরবী ব্যাকরণের সুস্পষ্ট পরিপন্থী কিভাবে?

উত্তর, আয়াতটিতে مَّيِّتُونَ (প্রত্যেকে মরনশীল) ইসমে ফায়েল এর বহুবচন। তার অর্থে ভবিষ্যতের অর্থ গৃহীত। সে হিসেবে কাদিয়ানীসহ আরও যারা আয়াতটির ঐ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ দ্বারা পূর্বেকার সব নবী রাসূলকে উদ্দেশ্য নেন তাদেরকে জিজ্ঞেস করতে চাই, এখন তাহলে কি مَّيِّتُونَ বলে আল্লাহ অন্যান্য নবীগণের মৃত্যু ভবিষ্যতে হবে, বুঝালেন?

কেয়ামত পর্যন্ত তাদের নিকট এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই। আল্লাহ আমাদের ঈমানকে এই আখেরি যামানায় কাদিয়ানী সহ প্রত্যেক অশিক্ষিত আর মূর্খদের অনুমান নির্ভর কথাবার্তা হতে হেফাজত করুন। (লিখাটি ফেইসবুক থেকে কাদিয়ানীদের বিভিন্ন কমেন্ট সহ)।

  • প্রাসঙ্গিক আরেকটা লিখা এখানে ক্লিক করুন!

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

দেওবন্দী বেরলবি কলেমা কি আসলেই এমন?

0

দেওবন্দী বেরলবি আহলে হাদীস কিবা সালাফি যেই মাসলাকের কথাই উল্লেখ করেন না কেন, কেউই এখন আর ধোয়া তুলসীপাতা থাকেনি। হিংসা বিদ্বেষ কিবা নির্বুদ্ধিতার কারণেই হোক, একে অন্যের পায়জামা খুলে গলায় পরানোর প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। আপনি স্যোসাল মিডিয়ার দিকে একটু দৃষ্টি বুলালেই আমার কথাগুলোর প্রমাণ পেয়ে যাবেন। এদের সব ঘরানাই নিজেদের পূর্ববর্তী মুরুব্বীদের নাম ভেঙ্গে চলার চেষ্টা করে ঠিক কিন্তু বর্তমানের কোনো পক্ষই এখন আর নিজেদের পূর্ববর্তী মুরুব্বীদের নকশ ও নমুনার উপর পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নেই।

পূর্ববর্তী সালাফদের কিতাব পত্র মুতালা’আ করার প্রচলনও এদের প্রায় সবার কাছ থেকে আস্তে আস্তে বিদায় নিতে শুরু করেছে। আমাকেও অনেকে দেওবন্দী ঘরানার ভাবেন। অনেকে আহলে হাদীসও মনে করেন। আসলে আমি সার্বিকভাবে চিন্তা করে দেখেছি, ইসলামের নামে এই সমস্ত দলাদলি প্রান্তিকতা ছাড়া আর কিছুই না।

আমরা দ্বীনের অসংখ্য শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে আগে থেকেই চিন্তা করে রাখি যে, ব্যক্তি যদি নিজ ঘরানার বাহিরে হয় তাহলে হবেনা। আর যদি পছন্দের কেউ হন তাহলে চোখবন্ধ করেই সব মেনে নেব। এগুলো শুধুমাত্র নানা দলাদলির কারণেই। এই দলাদলিটা এত জঘন্য পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে, কুরআন হাদীসের পরোয়া পর্যন্ত করা হচ্ছেনা। যে যেই ঘরানার সে সেই ঘরানার বুজুর্গ ব্যক্তিকে বিনা বিচারে রাহবার মেনে নিয়ে থাকে। পছন্দের মানুষের কথাকে ওহীর সমপর্যায় ধরে নিয়ে থাকি। এগুলোকে ধর্মীয় পরিভাষায় ‘তায়াচ্ছুফ’ (পক্ষপাতদুষ্ট) বলা হয়। কম বেশি প্রায় সব পক্ষই এই ভাইরাসে আক্রান্ত। বুঝতেছিনা, কাকে ছেড়ে কাকে নিয়ে বলব। আজকের এই লিখাটি কীজন্য লিখতে বাধ্য হলাম তা পরে বলব।

কাদিয়ানীরা কাফের এবং ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত, একথা আমরা সবাই মানি। মির্যা কাদিয়ানী নবী রাসূল দাবী করেছে, নিজেকে খোদা হবার দাবীও করেছে; এগুলো সব প্রমাণিত সত্য কথা। আমাদের সব ঘরানার মুসলিম উম্মাহা তাদের উক্ত কুফুরির ভিত্তিতে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে এক ও অভিন্ন। কিন্তু আমরা এতই নির্বোধ যে, নিজেরাই যখন নিজেদের পায়জামা উন্মোচনে ব্যতিব্যস্ত, তখন সুযোগ পেয়ে বসে ঈমানচোরের দল ‘কাদিয়ানী জামাত’।

কিছু উদাহরণ দিলে বুঝতে সহজ হবে। আল ইমদাদ (الامداد), একটি সাময়িকী, সফর ১৩৩৬ হিজরী সংখ্যা নং ৮, জিলদ ৩ পৃ-৩৫। সেখানে দেওবন্দীদের মুরুব্বি মওলানা আশরাফ আলী থানভি সাহেবের জনৈক মুরিদের একটি স্বপ্নের কারগুজারি বর্ণিত হয়েছে। মুরিদ তো মুরিদই। কিন্তু এটা কোন টাইপের মুরিদ সেটাই বুঝলাম না। মুরিদ নাকি একবার তার পীর সাহেবকে স্বপ্নে দেখলেন। বহুত লম্বা কেচ্ছা। এত সময় নাই রে ভাই, শর্টকাট বলছি। স্বপ্নে পীর সাহেবের দর্শন পেলেন। মুখ দিয়ে কলেমা জারি হল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আশরাফ আলী রাসূলুল্লাহ।‘ নাউযুবিল্লাহ। মুরিদ নিজেই ঘটনা বর্ণনা দিচ্ছেন আর বলছেন, আমি নিজেও বুঝতেছি যে, এটা ভুল করছি কিন্তু জবান আমার নিয়ন্ত্রণে ছিলনা। তাই খুবই ভীতসন্ত্রস্ত হলাম আর কান্নাকাটি করলাম। ঘটনা একটু লম্বা। আমি সারকথা বললাম। এতে বেরলবি ভাইদের ঈমানি দণ্ড দাঁড়িয়ে গেল। কারণ এই সুযোগ বারবার আসেনা। দেওবন্দীদের পায়জামা আজই খুইল্লা ফালাইতে হইবে। দেওবন্দীরা আশরাফ আলীর নামে কলেমা বানাইয়া ফেললো! হায় হায়, কাফের কাফের!!

আপনি স্যোসাল মিডিয়া, গুগল সার্চ করে দেখুন। দেওবন্দীদের নামে এধরণের আরও অসংখ্য অভিযোগ পাইবেন। অথচ ঘটনা ঘটলো কী আর কুস্তিগির পায়জামা উন্মোচনকারীরা ঘটা করে প্রচার করলো কী!

সাধারণ মানুষের কী দরকার, এসবে কান দেবার! খেয়ে দেয়ে বুঝি আর কাজকাম নেই তারগো! অথচ দেওবন্দী মুরুব্বী থানভী সাহেব মুরীদের উক্ত স্বপ্নের তাবীরও (ব্যাখ্যা) দিয়েছেন, যা ‘আল ইমদাদ’ (মাহে জমাদিউস সানী ১৩৩৬ হিজরী, পৃ-১৯) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়ে এসেছে। যাইহোক, এই নেন দেওবন্দীদের সেই কথিত কলেমা। কুস্তিগিরগণ যেটার আগামাথা বাদ দিয়েই দেওবন্দীদের পায়জামা খুলতেই বা-জমাত কোমরে গিট বাইন্ধা দৌড় দিয়েছে। (স্ক্রিনশট)।

আরে থামুন, বেরলবিরা দেওবন্দীদের পায়জামা খুলে শিরোপা জয় করে যখনি বাসায় গিয়ে পৌঁছলো তখনি হঠাৎ করে কী এক কাণ্ড ঘটে গেল, দেখে কারো পরনে পায়জামা নেই। সবাই তালা বাবা আর ছালা বাবার যোগ্য শিষ্যের ন্যায় ল্যাংটা বাবা হয়ে গেল। কী ঘটলো! জ্বী হ্যাঁ, দেওবন্দীরাই সেই ঘটনা ঘটালেন! তারাও কম কিসের, পায়জামা যখন কুরবানি দিয়েছি, ইজ্জত যখন খুইয়ে ফেলেছি তাহলে আর বসে থাকি কেমনে! কুরআনি আইন বাস্তবায়ন করতে নামলেন, পায়জামার বদলে এবার তারাও পায়জামা চায়। যেই চিন্তা সেই কাজ! বেরলবি কলেমা আবিষ্কার করে ছাড়লেন! বাপরে বাপ, কী গবেষণা! ফলে বেরলবিরা বাসায় গিয়ে নিচের দিকে তাকাতে না তাকাতেই দেওবন্দীরা তাদের পায়জামা খুলে দমাদম বিশ্বকাপ জিতিয়ে ফেললেন।

হযরত গাউসে আলী শাহ কালান্দার কাদেরী রচিত ‘তাযকিরায়ে গাউসিয়া‘ বইয়ের ৩২৪ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য। লিখা আছে, প্রখ্যাত পীর হযরত আবুবকর শিবলী (রহ.)-এর দুইজন মুরিদ তাঁর নিকট এসে বাইয়েত গ্রহণ করলেন। তিনি তাদের মধ্যে একজনকে বললেন, পড় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু শিবলী রাসূলুল্লাহ‘। আমি বলি, এধরণের গল্প পুরাই বানোয়াট। বিশিষ্ট বুজুর্গ হযরত শিবলী (রহ.) কখনো এধরণের কথা তার মুরিদকে বলতে পারেন না। কাজেই ঘটনা যাইহোক, অবশেষে দেওবন্দীরা বেরলবিদের তথাকথিত কলেমা আবিষ্কার করে ফেললেন। (স্ক্রিনশট)।

আসলে দুইটাই নষ্টামি। এদের অতি উৎসাহী কর্মকাণ্ডের দরুণ সাধারণ মানুষ আজ দিশেহারা। আলেম সমাজের উপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা আর ভরসা এদের এসব কারণেই বিদায় নিচ্ছে।

কুস্তিগিরদের পায়জামা উন্মোচন প্রতিযোগিতা স্টেডিয়ামের গেলারি থেকে উপভোগ করতেছিলেন আহলে হাদীস নামক সহীহ ডিলাররা। যখনি দুইপক্ষের কুস্তি শেষে শিরোপা জয়ীদের কারোরই পায়জামা নেই দেখলেন, তখনি বড়সড় একটা হাততালি হয়ে গেল। যা দেখে শিরোপা জয়ীরা আর সহ্য করতে পারলেন না। আহলে হাদীসদের পায়জামাও খুইল্লা নেবেন, এমনি প্রতিজ্ঞা তাদের। যেই চিন্তা সেই কাজ! কিছুদিন পরে একই ভাগ্য বরণ করলেন এরাও। এখন কথা হল, অবশেষে কার কী লাভ হল?

কাদিয়ানী শীয়া আহলে কুরআন তথা হাদীস অস্বীকারকারীদেরই আমরা সুযোগ করে দিলাম কিনা? এদের পক্ষে এবার সুযোগ তৈরি হয়ে গেল কিনা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অনুসারীদের রদ করে সাধারণদের কাছে টানার!?

অথচ শিরোপা জয়ীদের কেউই কারো ক্ষেত্রে ইনসাফ করেননি, পুরোপুরি ঘটনা খোলাসা করে তাহকিকের সাথে আসল সত্যটা তুলে ধরেনি। যদি পুরো বিষয়টি সব পক্ষই আমানতের সাথে দেখত তাহলে প্রমাণ হত যে, এইসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্য কোনো পক্ষই দায়ী নন। বড়জোর এটি ব্যক্তি বিশেষের সাথে সম্পর্কিত। দেওবন্দী বেরলবি আহলে হাদীস কোনো পক্ষের সাথেই কলেমার উদ্ভট ঘটনাটি সম্পর্কিত নয়, বরং সব পক্ষই বিশ্বাস করেন যে, সমস্ত মুসলমানের কলেমা যা, সেটাই তাদের কলেমা; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ

পরিশেষে বলব, এই সমস্ত কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করুন। উম্মাহার এই চরম দুর্দিনে প্রকৃত দাঈ সুলভ আচরন করুন। যুব সমাজকে ইরতিদাদের দিকে ঝুঁকতে প্রত্যক্ষ কিবা পরোক্ষভাবেও কোনো ভুমিকা রাখবেন না। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দিন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

বাহাউল্লাহ ইরানীর মসীহ মওউদ দাবী

কাদিয়ানীদের লিটারেচার হতে বাহাউল্লাহর মসীহ দাবীর প্রমাণ,

প্রশ্ন : বাহাউল্লাহ ইরানী সাহেব মসীহ মওউদ দাবী করেছিলেন, এর প্রমাণ কী?

উত্তর : আজকের এই লিখাটি লিখার উদ্দেশ্য হল, কাদিয়ানী তথা মির্যায়ী লিটারেচার সমূহে একটি তথাকথিত মূলনীতি খুব জোরেশোরে উচ্চারিত হতে দেখি, তা হল, রাসূল (সা.)-এর মোট নবুওয়তের ২৩ বছর জীবন-জিন্দেগি অতিক্রম করা কোনো মিথ্যা নবুওয়তের দাবীদারের জন্য সম্ভব নয়, যদি কখনো কোনো দাবীদার তা অতিক্রম করতে সক্ষম হয় তাহলে সে সত্যবাদী বলেই সাব্যস্ত হবে। তাদের দাবী হল, সূরা আল হাক্কাহ আয়াত নং ৪৪-৪৬ অনুসারে কোনো মিথ্যা দাবীদারকে আল্লাহ কখনো ছাড় দেননা, পাকড়াও করে থাকেন। এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ কোনোভাবেই ন্যূনতম ২৩ বছরের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অবকাশ দেননা। এই নির্বোধরা তারপর বলে থাকে, মির্যা কাদিয়ানী আপনা দাবীতে প্রায় ২৩ বছরেরও অধিক সময় অতিক্রম করেছিলেন, আল্লাহ তাকে সেই দীর্ঘ সময়ব্যাপী পাকড়াও করেননি। সুতরাং মির্যা কাদিয়ানী মিথ্যাবাদী নন, বরং সত্য। (এই হচ্ছে তাদের মূলনীতি)।

আমি আজকে এখানে তাদের সেই মনগড়া মূলনীতির গঠনমূলক দাঁতভাঙা উত্তর দেব, ইনশাআল্লাহ। প্রথমত, কাদিয়ানীদের উল্লিখিত মূলনীতি ঠিক নয়, বরং আগাগোড়াই গলদ। এই সম্পর্কিত আলোচনায় একটু পরেই আসছি। দ্বিতীয়ত, সূরা আল হাক্কাহ, আয়াত নং ৪৪-৪৬ কোনো ভাবেই সেরকম কোনো মূলনীতির জন্য সাপোর্টিং এভিডিয়েন্স নয় যেভাবে কাদিয়ানীরা বিশ্বাস করে।

  • সূরা আল-হাক্কাহ আয়াত ৪৪-৪৬, আল্লাহতালা বলেন, وَ لَوۡ تَقَوَّلَ عَلَیۡنَا بَعۡضَ الۡاَقَاوِیۡلِ অর্থ, সে যদি আমার নামে কিছু রচনা করে চালাতে চেষ্টা করত।’ لَاَخَذۡنَا مِنۡہُ بِالۡیَمِیۡنِ অর্থ, তবে অবশ্যই আমি তার ডান হাত ধরে ফেলতাম’। ثُمَّ لَقَطَعۡنَا مِنۡہُ الۡوَتِیۡنَ অর্থ, এবং কেটে দিতাম তার জীবন-ধমনী।‘ বলে রাখা জরুরি যে, এই শাস্তি কেবলমাত্র সত্যনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যাপারে বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। এ থেকে উদ্দেশ্য তাঁর সত্যতার বিকাশ। এতে কোনো মূলনীতির কথা বর্ণনা করা হয়নি যে, যে ব্যক্তিই নবী হওয়ার মিথ্যা দাবী করবে, তাকেই সত্বর শাস্তি প্রদান করব। কাজেই নবুওয়তের কোনো মিথ্যা দাবীদারকে এই ভিত্তিতে সত্য সাব্যস্ত করা যাবে না যে, দুনিয়াতে সে আল্লাহর পাকড়াও থেকে যেহেতু রেহাই পেয়েছে সেহেতু সে সত্য। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাবলী থেকেও প্রমাণিত যে, নবুওয়তের অনেক মিথ্যা দাবীদারকে আল্লাহ ঢিল দিয়েছেন এবং তারা দুনিয়াতে তাঁর পাকড়াও থেকে নিরাপত্তা লাভ করেছে। যেজন্য আল্লাহর ঐ শাস্তির ধমককে মূলনীতি মনে করে নিলে তখন নবুওয়তের বহু মিথ্যা দাবীদারদেরকে সত্য নবী বলে মেনে নিতে হবে। বাহায়ী জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা হোসাইন আলী নূরী ওরফে বাহাউল্লাহ তন্মধ্যে অন্যতম। কারণ বাহাউল্লাহ (১৮১৭-১৮৯২) সাহেবও নবী রাসূল এবং মসীহ মওউদ দাবী করার পর আরও প্রায় চল্লিশ বছর বেঁচে ছিলেন। (দৈনিক আল হিকাম, ১৭ নভেম্বর ১৯০৪ ইং পৃ. ১৯)।

বাহাউল্লাহ’র নবুওয়তে ওহী এবং মসীহ মওউদ দাবী :

(১) বাহায়ী জামাতের প্রতিষ্ঠাতা জনাব বাহাউল্লাহ সাহেব ১২৬৯ হিজরীতে নিজেকে ‘প্রতিশ্রুত মসীহ‘ বলে দাবী করেছিলেন। আর তিনি পরবর্তীতে ১৩০৯ হিজরী পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। (দৈনিক আল-হিকাম (الحكم)। উল্লেখ্য, আল-হিকাম একটি উর্দূ পত্রিকা। এটি কাদিয়ানী জামাতের নিজেস্ব একটি অফিসিয়াল পত্রিকা, গুরুদাসপুর জেলার (পাঞ্জাব, হিন্দুস্তান) কাদিয়ান দারুল আমান থেকে ১৮৯৭ সাল থেকে সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশিত হয়ে আসলেও পরবর্তীতে এটি ১৯০৬ সাল থেকে ‘দৈনিক‘ পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। পত্রিকাটির ডাউনলোড লিংক।

(২) বাহাউল্লাহ ইরানী সাহেব দাবী করেছিলেন যে, আমার প্রতি খোদার ওহী প্রকাশিত হয়েছে। (রেফারেন্স, দৈনিক আল হিকাম, ভলিউম ৮, নম্বর ৯, তারিখ ১৭ নভেম্বর ১৯০৪, পৃ. ১৯)।

(৩) বাহাউল্লাহ ইরানী সাহেব প্রতিশ্রুত মসীহ দাবীর পর আরও প্রায় চল্লিশ বছর বেঁচেও ছিলেন এবং তিনি শেষ পর্যন্ত তার দাবিতে অবিচল ছিলেন। আমি এ পর্যায় কাদিয়ানীদের প্রকাশিত অফিসিয়াল উর্দূ ‘দৈনিক’ আল হিকাম পত্রিকা থেকে হুবহু অনুবাদ করছি-

“তৃতীয় প্রশ্ন যেটি উপেক্ষা করার মত কোনো সুযোগ নেই। জনাব মহাশয়! ‘ওয়া লাও তাক্বাওয়ালা আ’লাইনা বা’দাল আক্বাবিল’ কথায় অটল থেকেই যেকথাটা জিজ্ঞাসা করতে চাচ্ছি। তা হচ্ছে, এর কারণ কী রয়েছে যে, বাহাউল্লাহ সাহেব ‘ওহী’ লাভ করার দাবী করার পরেও চল্লিশ বছর বেঁচেছিলেন! তার সর্বমোট বয়স হয়েছিল ‘আশি’ বছর। সে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনা ঐ দাবীতে অটল ছিল। সে দাবী করেছিল ১২৬৯ হিজরীতে। সে কিন্তু এ দাবী জীবনের শেষ সময়ে ১৩০৯ হিজরীতে করেনি। সে আলী মুহাম্মদ ‘বাব’ এর খলীফা ছিলনা, বরং বাব স্বয়ং বলেছে যে, সে তার চেয়েও উঁচু মাপের হবে, বাব যা করতে পারেনি, তা সে করে যাবে। তার আকীদা কেমন ছিল তা যদিও অজানা, কিন্তু এটি তো পরিষ্কার যে, সে বলেছে ‘আল্লাহ আমার প্রতি ওহী নাযিল করেছেন’।” (প্রশ্নকর্তা – জনৈক আহমদী গুজরাটি)।

দৈনিক আল হিকাম পৃ-৯, তাং ১৭ নভেম্বর ১৯০৪ ইং

বলাবাহুল্য, উক্ত মির্যায়ী মুরিদের প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়ার দুঃসাহস করেনি পত্রিকাটির এডিটর। বরং সে পরোক্ষভাবেই বাহাউল্লাহ ইরানীর ‘মসীহ’ দাবী এবং দীর্ঘ সময় অব্দি জীবন লাভ করার ঐতিহাসিক ঘটনা মেনে নেয়। নিচে পুরো স্ক্রিনশট তুলে ধরা হল। বিজ্ঞ পাঠক, সময় নিয়ে পড়ে নেবেন।

পরিশেষ :

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! এবার নিজেরাই চিন্তা করুন, এই কাদিয়ানী সম্প্রদায় মির্যা কাদিয়ানীর নবুওয়ত দাবী হালাল করার জন্য কতটা নিচে নামতে পারে! কিভাবে জঘন্য ব্যাখ্যা আর অযথা যুক্তিতর্কেও জড়াতে পারে! এদের ঐ মনগড়া যুক্তি সঠিক মানলে তখন বাহাউল্লাহ ইরানী আর তার ‘বাহায়ী জামাত’ও সত্য হয়ে যায়! আর তখন মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর ‘মসীহ‘ দাবীকে অকপটে মিথ্যা ও বাতিল বলা ছাড়া কোনো উপায় থাকেনা।

বলে রাখা জরুরি, বাহায়ীদের প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যান অনুসারে ১৯৮৬ সালে বিশ্বে বাহাই ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা ছিলো ৪০ লক্ষ ৭৪ হাজার, এবং বৃদ্ধির হার ছিল ৪.৪%। বাহায়ী সূত্রমতে ১৯৯১ পর্যন্ত সারা বিশ্বে বাহায়ী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫০ লক্ষেরও বেশি। ওয়ার্ল্ড ক্রিশ্চিয়ান এনসাইক্লোপিডিয়া, ২০০১ সালের এক জরিপে (পৃ. ৪) প্রকাশ করে যে, ২০০০ সালে বিশ্বে বাহাই অনুসারীর ছিলো সংখ্যা প্রায় ৭০ লক্ষ ১০ হাজার, এবং ২১৮টি দেশে এদের অনুসারী রয়েছে। এদের কেবলা আক্কা (বর্তমান ইসরাইলের হাইফা শহর), নামায তিন ওয়াক্ত, নারী পুরুষের মাঝে পর্দার বিধান নেই। এদের হিসেবে ১৯ দিনে এক মাস, ১৯ মাসে ১ বছর। তাদের রোজাও মাত্র ১৯টি। এদের মধ্যে নামায মাত্র তিন ক্যাটাগরির মানুষের জন্য। বৃদ্ধদের জন্য কোনো নামায নেই। আর পানি পাওয়া না গেলে তখন তিনবার ‘বিসমিল্লাহিল আত্বহার’ বলে শরীরে ফুঁ দিয়েও নামায পড়া জায়েজ। এদের উপাসনালয় সমূহ সব ধর্মের অনুসারীদের জন্য উন্মুক্ত। বাহাউল্লাহ ইরানী একই সাথে একজন নবী ও রাসূল দাবীদারও।

ইলাহিয়তের দাবীও ছিল। তার সুস্পষ্ট বক্তব্য, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়ত ও রেসালতের ক্রমধারা তথা ইসলাম বারো শত বছর পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল, তারপর থেকে ইসলাম রহিত ও বাতিল। এখন থেকে শুধুই বাহাউল্লাহর নবুওয়ত ও রেসালত চলবে। বাহাউল্লাহর পুত্র আব্দুল বাহা’র রচনা মতে, বাহায়ীরা তাঁদের বর্তমান দূত বাহাউল্লাহ’র আবির্ভাবের ১০০০ বছরের মধ্যে ঈশ্বরের আর কোনো দূতের আবির্ভাবে বিশ্বাস করে না। বাহাউল্লাহর মৃত্যুর পর তার পুত্র আব্বাস এফেন্দী ওরফে আব্দুলবাহা তারপর শোঘি এফেন্দী বাহায়ী জামাতের হাল ধরেন। তারপর ১৯৬৩ সালের পর থেকে নেতৃত্বের চরম দ্বন্দ্ব দেখা দেয়ায় বাহায়ী জামাত সিট অফ দ্য ইউনিভার্সাল হাউস অফ জাস্টিস, (বাহায়ীদের পরিচালনা পর্ষদ) দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে প্রধানকেন্দ্র হাইফা (ইসরাইল) থেকে। প্রধানতম ধর্মগ্রন্থ কিতাবুল আক্বদাস, আল বয়ান এবং কিতাবুল ইতক্বান। মুসলিম উম্মাহার সকল স্কলারের সর্বসম্মত ফতুয়ায় বাহায়ী জামাত ইসলামের গণ্ডি থেকে বহিষ্কৃত ও একটি স্বতন্ত্র ধর্মমত। তবে বর্তমানে বাহাউল্লাহ’র গুরু আলী মুহাম্মদ বাব এর অনুসারীরা ছোটখাটো অনেক ভাগে বিভক্ত। তন্মধ্যে বাবী সুবহে আযলী, বাবী বাহাউল্লাহ, বাহায়ী-আব্বাস এফেন্দী, বাহায়ী-মির্যা মুহাম্মদ আলী অন্যতম। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন! আমীন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

মুহাম্মদ ইবনে খালিদ আলজানাদীকে ইবনু মাঈন (রহ.) সিকাহ বলা

প্রশ্ন : ইমাম ইবনু মাঈন (রহ.) মুহাম্মদ ইবনে খালিদ আল জানাদীকে কি ‘সিকাহ’ বলেছেন?

উত্তর : ইমাম ইবনু মাঈন (রহ.) মুহাম্মদ ইবনে খালিদ আল জানাদীকে “সিকাহ” (বিশ্বস্ত) বলার কথাটি প্রমাণিত নয়। ইমাম আবু সা’আদ আস সাম’আনী أبو سعد السمعاني (৫০৬-৫৬২) রচিত কিতাবুল আনসাব (كتاب الأنساب) এর তৃতীয় খণ্ডের ৩৫১ নং পৃষ্ঠায় (রাবী নং ৯৫৫, অধ্যায় নং ৯৪১) পরিষ্কার করে লিখা আছে, لم يثبت هذا عن ابن معين অর্থাৎ ইমাম ইবনু মাঈন (রহ.) সম্পর্কে এই দাবীর ভিত্তি নেই। বিশিষ্ট হাদীস বিশারদ ইমাম আব্দুর রহমান ইবনে ইয়াহইয়া আল-মু’আল্লিমী [الامام المعلمى] আশ-শাফেয়ী (১৩১৩-১৩৮৬ হিজরী)ও একই কথা বলেছেন। যেমন তিনি লিখেছেন, و لم يثبت هذا عن ابن معين অর্থাৎ হযরত ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন হতে তার ছিকাহ (বিশ্বস্ত) হওয়ার কথাটি প্রমাণিত নয় [ইবনুস সুলাহ কৃত ‘আল আমালী’ (الأمالى لابن الصلاح) পৃষ্ঠা নং ৫২]।

কাজেই ইবনু মাঈন (রহ.)-এর নাম ভেঙ্গে কাদিয়ানী আমীর জনাব আব্দুল আউয়াল সাহেব যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি সঠিক নয়। তিনি খুব সম্ভব জেনে-বুঝেই তার ভক্তদের প্রতারিত করেছেন। অনেকটা আসহাবে কাহাফের ঐ সাত যুবককে ঘুমন্ত দাজ্জাল বলে ব্যাখ্যা দেয়ার মতই।

মজার ব্যাপার হল, বিশ্ববিখ্যাত ইমাম ইবনুস সুলাহ (রহ.)ও পরিষ্কার করে বলে গেছেন, فان هذا لم يثبت له وصف العدالة অর্থাৎ ‘তবে অবশ্য তার (মুহাম্মদ ইবনে খালিদ আলজানাদী) ক্ষেত্রে কোনো রকম আদালত (ন্যাপরায়ণতা/বিশ্বস্ততা/গ্রহণযোগ্য) এর কোনো গুণাগুণ প্রমাণিত নয়।’ [আল আমালী পৃষ্ঠা নং ৫২, ইমাম আবু উমর ইবনুল মুফতি সালাহউদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনে উসমান ইবনে মূসা আল কুরদি আশ শাহরুযুরী আল মুছুলি ইবনুস সুলাহ (৫৭৭-৬৪৩ হিজরী)]।

অধিকন্তু আব্দুল আউয়াল সাহেব ইমাম ইবনু মাঈন (রহ.)-এর আরেকটি কথাও পুরোপুরি এড়িয়ে যান। সেটি হল, ইমাম ইবনু মাঈন (রহ.) বলেছেন, و روى عنه ثلاثة رجال سوى الشافعي অর্থাৎ আর তার (মুহাম্মদ ইবনে খালিদ আল জানাদী) কাছ থেকে তিন ব্যক্তিই হাদীস বর্ণনা করেছেন, ইমাম শাফেয়ী (কোনো কিছুই) বর্ণনা করেননি। ইমাম যাহাবী লিখেছেন, সনদের ইউনুস ইবনে আব্দুল আ’লা এর সূত্রে একটি দল এটি বর্ণনা করেছে। কিন্তু বিশুদ্ধ কথা হল, والصحيح انه لم يسمعه منه অর্থাৎ ইউনুস ইমাম শাফেয়ীর কাছ থেকে বর্ণনাটি শুনেননি। (দেখুন, ইমাম যাহাবী’র মীযানুল ই’তিদাল ৩/৫৩৫ দ্রষ্টব্য)। আবার বর্ণনাটির আরেক রাবী ابان ابن ابى عياش (আবান ইবনে আবী আয়্যাশ) সম্পর্কে ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) লিখেছেন, و هو متروك অর্থাৎ সে একজন পরিত্যাজ্য ও মিথ্যাবাদী। (তাহযীবুত তাহযীব ৯/১৪৪, ইবনে হাজার আসকালানী)। এমনকি তাহযীবুল কামাল কিতাবের ২৫ নং খণ্ডের ১৫০ নং পৃষ্ঠায় (রাবী নং ৫১৮১) পরিষ্কার লিখা আছে, قال الشافعى ما هذا من حديثى و لا حدثت به، كذب على يونس অর্থাৎ ইমাম শাফেয়ী বলেছেন যে, এটি আমার বর্ণিত কোনো হাদীস নয়। আমি এমন হাদীস বর্ণনা করিনি। ইউনুস (-এর সূত্রে) আমার উপর অসত্য আরোপ করেছে। এছাড়া প্রায় ডজনের অধিক স্কলারদের মতে و لا المهدى الا عيسى ابن مريم শীর্ষক রেওয়ায়েতটি দুর্বল এবং মুনকার ও মিথ্যাবাদী রাবী দ্বারা বর্ণিত। আফসোস! কাদিয়ানীদের নিকট এই স্তরের বর্ণনাও অথেনটিক ও দলিলযোগ্য! তারা ইমাম যাহাবীর আংশিক বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ইবনু মাঈনের যেই মতটির প্রচার করে বেড়ায় সেটি ভিত্তিহীন ও অপ্রমাণিত হওয়া স্বয়ং ইমাম যাহাবী (রহ.) এর উক্ত কথা হতেও সুস্পষ্ট। কিন্তু কাদিয়ানীরা কত জঘন্য প্রতারক হলে সত্য-মিথ্যা মিশ্রিত করে কালোকে সাদা বানানোর স্পর্ধা দেখাতে পারে, চিন্তা করুন! আমরা তাদেরকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করলাম।

এখানে কয়েকটি বিষয় সুস্পষ্ট,

(১) ইমাম ইবনু মাঈন (রহ.) মুহাম্মদ ইবনে খালিদ আল জানাদীকে “সিকাহ” বলার ব্যাপারটি ইমাম যাহাবী সহ বেশ কয়জন ইমামই অপ্রমাণিত বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। (তার কারণ নিচে উল্লেখ করা হবে)। (২) যে বর্ণনায় و لا المهدى الا عيسى ابن مريم অংশটিও রয়েছে সেটিতে সূত্রের বিচারে انقطاع তথা সূত্র-বিচ্ছিন্নতার ক্রুটি রয়েছে। কারণ মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, উক্ত সনদে উল্লিখিত মুহাম্মদ ইবনে খালিদ আল জানাদী থেকে ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর سماع তথা শ্রবণ প্রমাণিত নয়। ইমাম যাহাবী (রহ.) মীযানুল ইতিদাল কিতাবে এসব পরিষ্কার করে দিয়ে গেছেন। রেফারেন্স উপরে দেয়া হয়েছে, আবার দেখুন।

এবার জানার বিষয় হল, ইমাম যাহাবী সহ অন্যান্য ইমামগণ ইমাম ইবনু মাঈন (রহ.)-এর “সিকাহ” (বিশ্বস্ত) বলার মতটি অপ্রমাণিত বলেছেন কেন?

এর উত্তর হল, বর্ণনাটির সনদে উল্লিখিত ইউনুস ইবনে আব্দুল আ’লা (রহ.) একটি গল্প বলেছেন। গল্পটি ‘মানাকেবুশ শাফেয়ী‘ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। গ্রন্থকার ইমাম আবুল হাসান মুহাম্মদ ইবনে হোসাইন আল আবুরী (ابو الحسن محمد بن الحسين الاّبري) (রহ.) [মৃত. ৩৬৩ হিজরী] গল্পটি সনদ সহ উল্লেখ করেছেন। সনদ সহ গল্পটি এরকম, فقال: اخبرني محمد بن عبد الرحمن الهمذاني ببغداد قال: حدثنا محمد بن مخلد وهو العطار وقال : حدثنا أحمد بن محمد بن المؤل العدوي قال: قال لي يونس بن عبد الأعلى : جاءني رجل قد وخطه الشيب سنة ثلاث عشر يعني و مائتين عليه مبطنة وازير يسألني عن هذا الحديث فقال لي : من محمد بن خالد الجندي ؟ فقلت : لا ادري . فقال لي : هذا مؤذن الجند وهو ثقة . فقلت له : انت يحيى بن معين ؟ فقال نعم…الخ

অর্থাৎ (সনদ/সূত্র) মুহাম্মদ ইবনে আব্দুর রহমান আল হামদানী, মুহাম্মদ ইবনে মুখলাদ, আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুয়াল আল-আদাবী। (গল্পটি হচ্ছে), আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুয়াল আল-আদাবী বলেছেন, আমাকে ইউনুস ইবনে আব্দুল আ’লা বলেছেন, আমার নিকট এক ব্যক্তি এসে এই হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন যে, মুহাম্মদ ইবনে খালিদ আল জানাদী সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? আমি বললাম, আমি জানিনা। তখন সে আমাকে বলল, সে ইয়েমেনের “আল-জানাদ” এলাকার একজন মুয়াজ্জিন আর সে একজন সিকাহ। অত:পর আমি তাকে বললাম, তুমি কি ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন? তিনি বললেন, জ্বী হ্যাঁ। (মানাকেবুশ শাফেয়ী)। অনুরূপ গল্পটি ইমাম যাহাবী’র ‘তাহযীবুত তাহযীব’ এর মধ্যেও (৯/২৪৪) উল্লেখ রয়েছে, তবে সেখানে এর কোনো সনদ উল্লেখ করা হয়নি।

এবার উক্ত গল্পের সনদ ও আনুষাঙ্গিক কিছু শিক্ষা:-

গল্পটি কয়েকটি কারণে প্রমাণযোগ্য নয়। ফলে এর উপর ডিফেন্ড করে এমন একজন রাবীকে ইবনু মাঈন (রহ.) “সিকাহ” বলেছেন বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছা অসম্ভব, যাকে জরাহ-তাদীলের ইমামগণ সর্বসম্মতিক্রমে অজ্ঞাত (مجهول) এবং দুর্বল বলেই সিদ্ধান্ত দিয়ে গেছেন। কেননা,

(১) ইউনুস ইবনে আব্দুল আ’লা-এর মত একজন হাদীসের প্রসিদ্ধ বর্ণনাকারী মুহাম্মদ ইবনে খালিদ আল জানাদীর ব্যাপারে জানতে চেয়ে ইবনু মাঈনের প্রশ্নের উত্তর দেবেন অথচ ইবনে মাঈনকেই তিনি তখন চিনলেন না, বরং ইবনে মাঈন নিজের পরিচয় দিয়ে নিজেকে পরিচিত করতে হল, এটা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। কারণ সেই যুগে ইবনু মাঈন (রহ.)-এর মত প্রসিদ্ধ একজন ব্যক্তিকে ইউনুস ইবনে আব্দুল আ’লা চেনবেন না, তা হতে পারেনা।

(২) আর গল্পের ধারাবাহিক সূত্রে “আহমদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুয়াল আল-আদাবী” নামীয় এমন এক ব্যক্তি রয়েছেন যাকে খতিব আল বাগদাদী (রহ.) তার ‘তারিখে বাগদাদ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি ইউনুস ইবনে আব্দুল আ’লা এবং হাসান ইবনে উরফা হতে রেওয়ায়েতকারী। কিন্তু তার সম্পর্কে কোনো জরাহ এবং আদল কিছুই খোঁজে পাওয়া যায়না, ফলে সে এক প্রকারের অজ্ঞাত (مجهول) রাবীই বলে গণ্য হন। সুতরাং যে বর্ণনাসূত্রে এধরণের রাবীও রয়েছে সেই সূত্রে প্রাপ্ত কোনো গল্পের তথ্যের উপর কিভাবে ডিফেন্ড করা যায়? কিভাবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে অপরাপর সমস্ত ইমামের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে, ইবনু মাঈন (রহ.) মুহাম্মদ ইবনে খালিদ আল জানাদীকে “সিকাহ” বা বিশ্বস্ত বলেছেন? অধিকন্তু ইমাম যাহাবী সহ অনেকেই এই মতের বিরুদ্ধে অনাস্থা দিয়েছেন এবং প্রমাণিত নয় বলেও অভিমত দিয়ে গেছেন।

সুতরাং, এমতাবস্থায় তাকওয়া আর নিরপেক্ষ বিবেকের দাবী হল, ইমামগণের সর্বসম্মত মতামতের প্রতিই শ্রদ্ধা রাখা ও অগ্রাধিকার দেয়া। মেশকাত কিতাবের ব্যাখ্যাগ্রন্থ “মেরকাত” এর লিখক মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.) লিখেছেন, এই বর্ণনা সূত্রের বিচারে সমস্ত হাদীস বিশারদের সর্বসম্মতিক্রমে জঈফ তথা দুর্বল (ضعيف باتفاق المحدثين) । (মেরকাত, কিতাবুল ফিতান, বাবু আশরাতিস সা’আহ باب أشراط الساعة, ভলিয়ম নং ১০, পৃষ্ঠা নং ১০১)। এতেও প্রমাণ হয় যে, ইবনে মাঈনের নামে চালিয়ে দেয়া কথিত ‘সিকাহ’ এর মতটি অপ্রমাণিত ও মিথ্যা। অন্যথা মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.) কখনো এর দুর্বল হবার সিদ্ধান্তে “সর্বসম্মতিক্রমে” শব্দ ব্যবহার করতেন না। অতএব, কাদিয়ানীদের জন্য কোনোভাবেই উচিত হবেনা, এই ধরনের একটি পরিত্যাজ্য ও মুনকার রেওয়ায়েতের উপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া, যা অপরাপর অসংখ্য সহীহ হাদীস ও তাওয়াতূর পর্যায়ের হাদীস এবং উম্মাহার ইজমায়ী আকীদার বিরুদ্ধে! (প্রয়োজনীয় স্ক্রিনশট সংযুক্ত)।

সংক্ষেপে,

প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী এম. এ

ইন্নি মুতাওয়াফফীকা (انى متوفيك) এর তাৎপর্য

তাওয়াফফা, মুতাওয়াফফীকা, লাম্মা তাওয়াফফাইতানী প্রসঙ্গে ধারণা

পবিত্র কুরআনের انى متوفيك و رافعك الى এর সঠিক তাৎপর্য

পবিত্র কুরআন এর আয়াত : انى متوفيك و رافعك الى সম্পর্কে সংক্ষেপে একটু লিখছি-

উক্ত আয়াতের তাফসীরে রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে দুইটি তাৎপর্য বর্ণিত আছে, (১) আয়াতের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী অর্থ, নিশ্চয়ই আমি তোমার মেয়াদকাল পূর্ণ করব (অথবা নিশ্চয়ই আমি তোমাকে নিয়ে নেব) এবং তোমাকে আমার নিকট উঠিয়ে নেব। (সূরা আলে ইমরান, ৫৫)।

(২) متوفيك এর توفى ক্রিয়াপদকে মাজাজি বা রূপক অর্থে গ্রহণ করলে তখন ইবনে আব্বাস (রা.) যেভাবে অনুবাদ করেছেন ঠিক সেভাবেই অনুবাদ করা আবশ্যক। তাফসীরে ‘দুররে মানসূর’ কিতাবের তৃতীয় খণ্ডে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, اى رافعك ثم متوفيك فى آخر الزمان অর্থ- হে ঈসা! তোমাকে উঠিয়ে নেব, অত:পর শেষ যুগে তোমাকে মৃত্যু দেব

  • প্রশ্নকর্তা, ইবনে আব্বাস (রা.)-এর তাফসীর মানতে কেন বাধ্য আমরা?

উত্তর, যেহেতু আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর জন্য দোয়া করেছেন, اللهم علمه الكتاب অর্থ- হে আল্লাহ আপনি তাঁকে কুরআন শিখিয়ে দিন। (বুখারী, কিতাবুল ইলম)।

এখন চিন্তার বিষয় যে, ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কোনো একটি অনুবাদ বা তাৎপর্যের সাথে আহমদী তথা কাদিয়ানীদের অনুবাদ বা শিক্ষার কানাকড়িও মিল নেই! হায়! ইলাহি জামাত!!

  • প্রশ্নকর্তা, কিন্তু ইবনে আব্বাস (রা.) انى متوفيك এর অর্থ তো انى مميتك অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মৃত্যু দেব—এভাবেও করেছেন। বুখারী, কিতাবুত তাফসীর দেখুন।

উত্তর, ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সব কয়টি বর্ণনাকে বাদ দিয়ে তার খণ্ডিত বক্তব্যের বিচারে আমরা কিভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি! আমরা ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত রেওয়ায়েতগুলো যা কোথাও কোনো কোনো সনদে দীর্ঘ বাক্যে এসেছে, কোথাও বা আরেক সনদে আংশিক বাক্যে এসেছে; এখন পূর্ণ তাকওয়া আর আমানতদারির দাবী কি তার খণ্ডিত বাক্যের উপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া, নাকি সবগুলো বর্ণনার সর্বসম্মতিক্রমে চূড়ান্ত ফয়সালায় যাওয়া? বিচারের ভার আপনার নিরপেক্ষ বিবেকের উপর সোপর্দ করলাম।

  • প্রশ্নকর্তা, তাহলে এই একই কনসেপ্টে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে আর কী কী রেওয়ায়েত এসেছে?

উত্তর, এসেছে তো অনেক। আমি এখানে বিশুদ্ধ সনদে মাত্র তিনখানা ‘গয়রে মাজরূহ রেওয়ায়েত’ তুলে ধরছি,

(ক) ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি সূরা আলে ইমরান, আয়াত নং ৫৫ يا عيسى انى متوفيك و رافعك الى এর ব্যাখ্যামূলক অর্থ করেছেন, اى رافعك ثم متوفيك فى آخر الزمان অর্থ- হে ঈসা! তোমাকে উঠিয়ে নেব, অত:পর শেষ যুগে তোমাকে মৃত্যু দেব। (সূত্র, মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, তাফসীরে দুররে মানসূর, ইমাম জালালুদ্দিন আস-সুয়ূতী)।

(খ) ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, و أَن اللهَ رَفَعَهُ بِجَسَدِهِ وَأَنهُ حَيُ الْآنَ و سَيَرْجِعُ الي الدنيا فيها مَلِكاً ثم يَموتُ كما يموتُ الناسُ. অর্থ- নিশ্চয় আল্লাহতালা তাঁকে (ঈসা) সশরীরে উঠিয়ে নেন এবং তিনি এখনো জীবিত। অতিসত্বর তিনি পৃথিবীতে পুনরায় ফিরে আসবেন। আর তিনি পৃথিবীতে একজন বাদশাহ (শাসক) হবেন। তারপর তিনি অন্যান্য মানুষের ন্যায় মৃত্যুবরণ করবেন।” [সূত্র, আত তবকাতুল কোবরা লি-ইবনে সা’আদ : ১/৩৫-৩৬; ‘যিকরুল কুরূনি ওয়াস সানীনি আল্লাতি বাইনা আদাম ওয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ শীর্ষক পর্ব, মাকতাবাতুল খান্জি, কায়রো মিশর]।

(গ) ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, فأُلْقِىَ عَليه شِبْهُ عيسى، ورُفِعَ عيسى من روزنة في البيت إلى السماء. অর্থ- তারপর তাকে (জনৈক শিষ্যকে) ঈসা’র অবিকল সাদৃশ করে দেয়া হল এবং ঈসাকে তাঁর বাড়ীর বাতায়ন পথে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হল। (সূত্র, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া খণ্ড ২, হাদীসের সনদ সম্পর্কে ইবনে কাসীর রহ. বলেছেন وهذا إسناد صحيح إلى ابن عباس على شرط مسلم. অর্থাৎ ইবনে আব্বাস (রা:) পর্যন্ত এই সনদটি সহীহ এবং ইমাম মুসলিম (রহ:) কৃত শর্তের উপরই প্রতিষ্ঠিত)।

আমার প্রাণপ্রিয় আহমদীবন্ধুরা! আসুন, অন্ততঃ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বুঝের সাথে আমরা সবাই আমাদের বুঝটিকে ঘষামাজা করে নিই।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

কথিত ‘ছায়া হজ্জ’ বনাম ‘মক্কার হজ্জ’ সম্পর্কে

কাদিয়ানীবন্ধুদের আরেকটি ধর্মবিশ্বাস তাদের সালানা জলসা ‘ছায়া হজ্জ’! তাদের উক্ত বিশ্বাসের খোলাসা হচ্ছে, মক্কার হজ্জ মূলত কোনো উপকারী হজ্জই নহে যতক্ষণ না তাদের (কাদিয়ানীদের) ‘সালানা জলসা’তে শরিক হবে। সহজ করে বললে, তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে, মক্কায় অনুষ্ঠিত মুসলিম উম্মাহার এই হজ্জ সম্পূর্ণ রসহীন তথা নিষ্ফল, কোনো উপকারিতা নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর প্রবর্তিত ‘সালানা জলসা’ (বার্ষিক সম্মেলন) পালন করা না হবে। নিচের স্ক্রিনশট থেকে দেখে নিন!

মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এর একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি টেনে পয়গামে সুলহে পত্রিকায় লাহোরী মুভমেন্ট এর এডিটর ডাক্তার বাশারত আহমেদ সাহেব লিখেছেন,

پچہلے دنوں خلیفہ صاحب نے ظلی حج کا اعلان کیا اور بتایا کہ مکہ کا حج چونکہ اپنے مقصد حقیقی کو کہو چکا ہے اور ایک رسمی عبادت کی شکل میں رہ گیا ہے اسلئے اللہ تعالیٰ نے قادیان میں ایک اور ظلی حج مقرر کیا ہے

অর্থাৎ দিন কতেক আগে খলীফা (মির্যা বশির উদ্দিন) সাহেব জিল্লী হজ্জের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘মক্কার হজ্জ যেহেতু আপনা আসল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলেছে এবং গতানুগতিক শুধুই একটি ইবাদতের রূপ ধারণ করেছে, সেহেতু আল্লাহতালা কাদিয়ানে দ্বিতীয় আরেকটি জিল্লী হজ্জ চালু করে দিয়েছেন।’ (সূত্র “পয়গামে সুলহে” পাতা ৪, কলাম ২, তাং ১৯/০৪/১৯৩৩ ইং)। কথিত এই জিল্লি হজ্জ সম্পর্কে আরও কিছু উদ্ভট বর্ণনা সম্পর্কে জানতে পরবর্তী স্ক্যানকপি গুলোও দেখা যেতে পারে।

  • মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ এর ‘খুতুবাতে মাহমুদ’ গ্রন্থেও লিখা আছে যে, জলসাও হজ্জের মত (স্ক্রিনশট সহ পড়ুন) Click

ডকুমেন্ট পরিচিত : পয়গামে সুলহে, কাদিয়ানী জামাতের দ্বিতীয় বৃহত্তর গ্রুপের অফিসিয়াল পত্রিকা। আমার নিকট মনে হচ্ছে, এটি প্রতি তিন দিবস অন্তর প্রকাশিত হয়ে থাকে। মির্যা কাদিয়ানীর সিনিয়র সহচর মুহাম্মদ আলী লাহোরী’র প্রতিষ্ঠিত ‘লাহোরি মুভমেন্ট’ কর্তৃক লাহোর থেকে প্রকাশিত। তাদের কেন্দ্রীয় ওয়েব সাইট www.aaiil.org থেকে এর পিডিএফ গুলো ডাউনলোড করা যায়। পত্রিকাটি মূলত তাদেরই প্রতিপক্ষ গ্রুপ তদানিন্তন কাদিয়ানী দ্বিতীয় খলীফা মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ গ্রুপের অফিসিয়াল দৈনিক পত্রিকা ‘আল ফজল’-কে ডিফাইন করতেই বের হত। তাদের মধ্যে প্রথমাবস্থায় বিরোধিতার সূত্রপাত ঘটে ১৯১৪ সালে তাদের প্রথম খলিফা হেকিম নূরউদ্দিনের মৃত্যুর পর। তখন কাদিয়ানী জামাতের একটি অংশ এবং মির্যার স্ত্রী নুসরাত জাহানের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদকে খলীফা নির্বাচন করা হয়। অথচ তখন মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ বয়সে খুব ছোট, মাত্র ২৭ বছরের ছিল। আর অপর দিকে মির্যা কাদিয়ানীর ঘনিষ্ঠ সহচর মুহাম্মদ আলী লাহোরীও দ্বিতীয় খলীফার জন্য প্রার্থী হয়ে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ব্যর্থ হন। তারপর তিনি কাদিয়ানী অনুসারীদের বৃহত্তর একটি অংশ নিয়ে ‘লাহোরি মুভমেন্ট‘ গঠন করেন। বর্তমানে ‘লাহোরি মুভমেন্ট’ এর পঞ্চমতম আমীরের যুগ চলছে, নাম প্রফেসর আব্দুল করীম সাঈদ লাহোরী।

কাদিয়ানীদের সব চেয়ে বড় গ্রুপ ‘আহমদীয়া কমিউনিটি’-এর বর্তমান পঞ্চম খলীফা মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদের প্রপৌত্র মির্যা মাসরূর আহমদ। তাদের এই বৃহত্তর দুটি গ্রুপের মধ্যকার বুনিয়াদী ইখতিলাফ ৪টি। যথা-

(১) মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী নবী নন, তার ‘নবী’ দাবীটা শুধুই আক্ষরিক অর্থে বিবেচিত হবে, মূলত তার নবী শব্দ থেকে ‘মুহাদ্দাস‘ উদ্দেশ্য।

(২) মির্যা সাহেবকে অস্বীকার করা দ্বারা কেউ অমুসলিম বা কাফের হবেনা, বড়জোর ‘ফাসেক’ এবং পরকালে ‘শাস্তির উপযুক্ত’ বলে গণ্য হবে।

(৩) মির্যা সাহেবের ভবিষ্যৎবাণী অনুযায়ী সেই ‘মুসলেহ মওউদ’ মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ নন। কেননা ‘মুসলেহ মওউদ’-এর ভবিষ্যৎবাণী মির্যা সাহেবের আসমানী বিবি মুহাম্মদী বেগমের সাথে সম্পর্কিত ছিল। মির্যা সাহেবের সাথে উক্ত আসমানী বিবির বিবাহ সংঘটিত হবার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। (বলে রাখা জরুরি, লাহোরিরা বিশ্বাস করে, আসমানী বিবির সাথে মির্যা সাহেবের বিবাহ জান্নাতে হবে)। (৪) ‘জামাত’ পরিচালনা জন্য ‘খিলাফত পদ্ধতি’ নয়, বরং একটা ‘আঞ্জুমান’ তথা পরিচালনা পর্ষদ হতে হবে। কেননা, খিলাফতের ক্রমধারা নবী থেকে আরম্ভ হয়। অতএব মির্যা সাহেবের নবী দাবীটা যেহেতু ‘মুহাদ্দাস’ অর্থে ধর্তব্য, সেহেতু মির্যা সাহেব থেকে খিলাফতের ক্রমধারা আরম্ভ হওয়া সম্ভব নয় (লাহোরী গ্রুপের বক্তব্য শেষ হল)।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

ইউনুস নবীর নামে মির্যা কাদিয়ানীর মিথ্যাচার

মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর বই থেকে ধারাবাহিক আরেকটি “মিথ্যাচার”-এর প্রমাণ,

মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন, “খোদাতালা ইউনুস নবীকে অকাট্যভাবে চল্লিশ দিন পর্যন্ত (তার জাতির উপর) আজাব (শাস্তি) প্রদান করার ওয়াদা দিয়েছিলেন। এই ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) একটি অকাট্য ওয়াদা ছিল, যেখানে কোনোরূপ শর্ত ছিল না।” (আঞ্জামে আথহাম, রূহানী খাযায়েন ১১/৩০)। প্রামাণ্য স্ক্রিনশট দ্রষ্টব্য

  • উল্লেখ্য, قطعى তথা ‘অকাট্য বিধান’ শুধুমাত্র পবিত্র কুরআনের সাথেই সম্পর্কিত। আরেকটা কথা বলে রাখা জরুরি তা হচ্ছে, এ ধরণের কোনো কথার সোর্স ইঞ্জিল হলেও হবেনা। কারণ মির্যা কাদিয়ানী ইঞ্জিল সম্পর্কে পরিষ্কার স্টেটমেন্ট দিয়ে গেছেন এভাবে যে,
  • خدا نے ہمیں تو یہ بتلایا ہے کہ عیسائی مذہب بالکل مرگیا ہے اور انجیل ایک مردہ اور نا تمام کلام ہے
  • অর্থাৎ ‘খোদা আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ঈসায়ীধর্ম পুরোপুরি মৃত্যুবরণ করেছে আর ইঞ্জিল একটি মৃত ও অসম্পূর্ণ বাণী।’ (দাফেউল বালা, রূহানী খাযায়েন ১৮/২৪০)।

এখন প্রশ্ন হল, পবিত্র কুরআনের কোথায় বা কোন আয়াতে এধরণের কথা আছে যদি আমাদের একটু দেখিয়ে দিতেন! খুবই কৃতজ্ঞ হতাম। নইলে আবারও সাব্যস্ত হবে যে, মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর অসংখ্য মিথ্যার মধ্যে এটিও একটি!

আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বললে কী হুকুম?

এ পর্যায় তারই রচিত “হাকীকাতুল ওহী” বই থেকে একটা চমৎকার লিখা তুলে ধরব, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার প্রতি মিথ্যা আরোপ করা কত বড় অপরাধ? এমন প্রশ্নের উত্তরে পবিত্র কুরআনের সূরা আল আ’রাফ আয়াত নং ৩৭ উল্লেখ করে মির্যা সাহেব লিখছেন, “অর্থাৎ বড় কাফের দুইটিই আছে। প্রথমটি হইল, যে খোদা সম্পর্কে মিথ্যা বলে এবং দ্বিতীয়টি হইল, যে খোদার কালামকে অস্বীকার করে।” (হাকীকাতুল ওহী পৃষ্ঠা নং ১৩০, বাংলা অনূদিত কপি)। প্রামাণ্য স্ক্যানকপি,

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

মির্যার স্ববিরোধীতা-৪১

কোথাও লিখলেন, আদম প্রথম মানুষ নন, তার আগেও মানুষের প্রজন্ম দুনিয়াতে ছিল। আবার কোথাও লিখেছেন, আদমই সৃষ্টিকূলের মধ্যে সর্বপ্রথম মানুষ এবং সর্বপ্রথম খলিফা, আর আমি তারই সদৃশ সর্বশেষ খলিফা!

  • মির্যা কাদিয়ানীর জনৈক মুরিদের দাবী, আদম (আ.) প্রথম মানুষ ছিলেন না। এখানে তার প্রশ্নের উত্তরে লিখতে চাই!
  • জনৈক কাদিয়ানী অনুসারীর উক্ত মন্তব্যের উপর আমার পালটা ছোট্ট একটি প্রশ্ন এই যে,
  • যদি আদম (আ.)-ই প্রথম মানুষ না হন তাহলে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র হাবিল (বাইবেল মতে হেবল) কিজন্য আপন ভগ্নি আকলিমাকে বিয়ে করতে বাধ্য হন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসীর ১/৯৩)। পৃথিবীতে আদম (আ.) এর আগেও মানব সভ্যতা পূর্ব থেকেই চলে আসলে তবে তো হাবিলের বিয়ের জন্য কন্যাও থাকবে! তা সত্ত্বেও আপন ভগ্নির সাথে বিয়ে কেন? হযরত আদম (আ.)-ই বা এই নিয়ম কিভাবে অনুমোদন দিতে পারেন? সহীহ বুখারী সহ প্রায় সকল হাদীস সংকলনে একথা পরিষ্কার এসেছে,
  • إنَّ من أفضَلِ أيَّامِكُم يومَ الجمُعةِ، فيهِ خُلِقَ آدمُ عليهِ السَّلامُ
  • অর্থ- আল্লাহ আদমকে জুমার দিন আসরের পর সৃষ্টি করেছেন। সুনানু নাসাঈ, হাদীস নং ১৩৭৩, হাদীসের মান: সহীহ
  • এখন এগুলো কি সব আজাইরা কিচ্ছা? নাউযুবিল্লাহ। এবার নিন কুরআন থেকে! সূরা বাক্বারা’র আয়াত নং ৩০; আল্লাহতালা যখন পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানানোর ইচ্ছে প্রকাশ করলেন তখন ফেরেশতারা আপত্তি উত্থাপন করে বললেন,
  • اتجعل فيها من يفسد فيها و يسفك الدماء؟
  • অর্থ- আপনি কি এমন একটি জাতি দুনিয়ায় সৃষ্টি করতে চান যারা বিশৃঙ্খলা করবে এবং রক্তপাত করবে….?
  • এখন প্রশ্ন, আদম (আ.)ই যদি প্রথম মানুষ না হন তাহলে ফেরেশতারা কোন আদমের ব্যাপারে ঐ আপত্তিখানা উত্থাপন করেছিলেন?

কোনো উত্তর থাকেনা!

আর আপনি পবিত্র কুরআনের যেসব উদ্ধৃতি দিয়েছেন সেসবে মোটেও আপনার মত (বিশ্বাস) সাব্যস্ত হয়না। আপনি আয়াত উল্লেখ করেন। আমি আপনার মিথ্যা আর অজ্ঞতা দুটোই পরিষ্কার করে দেব, ইনশাআল্লাহ।

মির্যা কাদিয়ানীর স্ববিরোধীতা :

এবার মির্যা কাদিয়ানীর স্ববিরোধ কথাগুলো জেনে নিন! তিনি লিখেছেন, (ক)

‘আমরা এটি দাবী করিনা যে, মানুষের এই সমগ্র প্রজন্ম যা বর্তমানে পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিদ্যমান এটি এই সর্বশেষ আদমেরই প্রজন্ম! আমরা তো মনে করি যে, এই আদমের পূর্বেও মানব প্রজন্ম ছিল।‘ (দেখুন, মালফুযাত ৫/৬৭৫; মির্যা কাদিয়ানী, উর্দূ এডিশন)।

তিনি তার আরেকটি বক্তব্যে একই মত ব্যক্ত করে এভাবে লিখেছেন যে, (খ)

ہمارے آدم سے پہلے بھی کئی امتیں دنیا میں ہو چکی ہیں اس لیے یہ بھی کچھ تعجب کی بات نہیں کہ آریہ لوگ جو کروڑا برسوں کا دعوی کرتے ہیں ان پر وبال آنے کے بعد کچھ لڑکیاں ان کی باقی رہ گئی ہوں انہیں لڑکیوں سے حضرت آدم کے لڑکوں سے نکاح کرلیا ہو

অর্থাৎ ‘আমাদের আদমের আগেও পৃথিবীতে অনেক জাতি ছিল, তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই যে আর্য জাতি, যারা লক্ষ লক্ষ বছর দাবি করে। তাদের উপর বিপর্যয় নেমে আসার পর তাদের কিছুসংখ্যক মেয়ে দুনিয়ায় তখনও থেকে যায়। সেই মেয়েদের সাথে হযরত আদম (আ.)-এর পুত্রদের বিবাহ হয়।’ (দেখুন, আরিয়া ধরম, রূহানী খাযায়েন ১০/৪০)।

এবার স্ববিরোধ কথা :

মির্যা কাদিয়ানী লিখেছেন, (ক)

پھر بعد اس کے ہم دیکھتے ہیں کہ پہلا بیٹا تو نوع انسان میں سے آدم ہی تھا چنانچہ انجیلیں اس بات کا اقرار کرتی ہے اور یہ تو معلوم ہے۔۔۔۔۔۔

অর্থাৎ ‘এরপর আমরা দেখি যে, মানব প্রজাতির মধ্যে সর্বপ্রথম মানব ছিলেন আদমই। ইঞ্জিলসমূহ একথারই সাক্ষ্য দেয়। আর একথা তো জানাই আছে যে, বুযূর্গি (সম্মাননা) প্রথমোক্তেরই হয়ে থাকে। আর এমন কাউকে তো বুযূর্গই বলা যায় না যে (ঈসা আ: এর প্রতি ইংগিত- অনুবাদক) পরে আসেন এবং প্রথমোক্তের কাছ থেকে কোনো কথা মুখে তুলে নেন। আর খোদাতালা তো আদমকে নিজ হাতে এবং স্বীয় আকৃতিতে (গুণে) সৃষ্টি করেছেন এবং খুব ভালোবাসার মাধ্যমে তিনি তাঁর অভ্যন্তরে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন।’ (দেখুন, নূরুল হক, রূহানী খাযায়েন ৮/১০৫)।

তিনি আরেক জায়গায় লিখেছেন, (খ)

‘এই জন্যই নিয়তির দাবী হল, যে মানুষটা সর্বশেষ খলিফা হবেন তিনি ঐ আদমের সদৃশ হবেন যিনি সমস্ত খলিফার সর্বপ্রথমে ছিলেন এবং সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম মানুষ ছিলেন। যার প্রতি খোদাতালা রূহ ফুঁকিয়ে ছিলেন।’ (দেখুন, খুতবাতুল ইলহামিয়্যাহ, রূহানী খাযায়েন ১৬/২৫৬)।

তিনি আরেক জায়গায় লিখেছেন, (গ)

খোদাতালা আদমকে ষষ্ট দিবসে জুমাবারে আসরের পর সৃষ্টি করেছেন। তাওরাত, কুরআন এবং হাদীসসমূহ হতে এটাই সাব্যস্ত হয়। আর খোদাতালা মানুষের জন্য সাতটি দিবস নির্ধারিত করেছেন। এই দিবসগুলোর মুকাবিলায় খোদার প্রতিটি দিবস হাজার বছরের সমান। এর আলোকে উদ্ভাবন করা হয়েছে যে, আদম থেকে নিয়ে দুনিয়ার বয়স সাত হাজার বছর। আর ষষ্ঠতম হাজার যা ষষ্ঠতম দিবসের মুকাবিলায়, সেটি আদমে ছানী বা দ্বিতীয় আদমের (এখানে ‘দ্বিতীয় আদম’ বলে মির্যা নিজের সত্তাকে ইংগিতে বুঝিয়েছে-অনুবাদক) প্রকাশের দিবস। (দেখুন, যামিমা বারাহিনে আহমদীয়া, রূহানী খাযায়েন ২১/২৬০)।

(ক্রমানুসারে প্রামাণ্য স্ক্যানকপি দ্রষ্টব্য)

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী