Home Blog Page 27

আদি পিতা আদম (আ.)-এর ইহলৌকিক বয়স কত ছিল?

আদম (আ.) এর ইহলৌকিক বয়স ছিল একহাজার বছর কিন্তু সেখান থেকে ষাট অথবা চল্লিশ বছর তিনি হযরত দাউদ (আ.)-কে দিয়ে দেন!

  • আজকের আলোচনার বিষয় হচ্ছে, কাদিয়ানীদের একটি বিভ্রান্তিকর তথ্য-বিকৃত দাবী ও তার দালিলিক ও যুক্তিক খণ্ডন – হযরত আদম (আ.) আর নূহ (আ.) এর ইহলৌকিক দীর্ঘ আয়ুকাল (যথাক্রমে ৯৪০, ৯৫০ বছর) হতে ভিন্ন কোনো অর্থ উদ্দেশ্য কি? এই সম্পর্কে অত্র আর্টিকেল এর শেষে দেখুন!

হযরত আদম (আ.) এর ইহলোকিক আয়ুকাল :

ইবনে আক্বীলাহ আল মক্কী (রহ.) (মৃত. ১১৫০ হিজরী) বিরচিত (الزيادة والإحسان في علوم القرآن – محمد بن أحمد بن سعيد الحنفي المكيّ، شمس الدين، المعروف بابن عقيلة) ‘আয-যিয়াদাহ ওয়াল ইহসান ফী উলূমিল কুরআন‘ (খ-৭) এর মধ্যে লিখা আছে, ইমাম ইবনে কাসীর সংকলিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ এর মধ্যে মারফূ সনদে হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) এবং আবূ হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, হযরত আদম (আ.)-এর ইহলৌকিক বয়স এক হাজার বছরের তথ্যটি লাওহে মাহফূজে লিপিবদ্ধ ছিল। কিতাবটির ডাউনলোড স্ক্যান কপি। উপরের স্ক্রিনশটটি দ্রষ্টব্য। এই সম্পর্কে সহীহ ও হাসান পর্যায়ের আরেকটি হাদীস এই রকম,

গ্রন্থ : মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত); অধ্যায় : পর্ব-২৫, শিষ্টাচার (كتاب الآداب)। হাদীস নম্বর : ৪৬৬২।

তৃতীয় অনুচ্ছেদ – সালাম :

আবূ হোরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন আল্লাহতালা আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন এবং তাঁর মধ্যে প্রাণ দান করলেন, তখন আদম (আ.) হাঁচি দিলেন এবং আল্লাহতালার অনুমতিক্রমে তাঁর প্রশংসা করে ‘‘আলহামদুলিল্লাহ’’ বললেন। আল্লাহতালা তাঁকে বললেন, হে আদম! আল্লাহ তোমাকে রহম করুন। এখন তুমি ঐ উপবেশনকারী মালায়িকাহ্’র (ফেরেশতাদের) কাছে যাও, যাঁরা বসে আছে। আর তাঁদেরকে বলো ‘‘আসসালামু ‘আলাইকুম’’ (তোমাদের প্রতি আল্লাহ শান্তি বর্ষণ করুন)। তিনি গিয়ে বললেন, ‘‘আসসালামু ‘আলাইকুম’’। মালায়িকাহ্ জবাবে বললেন, ‘‘আলাইকাস সালামু ওয়া রহমাতুল্লহ’’ (তোমার প্রতি আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক)। অতঃপর তিনি তাঁর প্রতিপালকের নিকট ফিরে আসলেন। আল্লাহতালা বললেন, এটাই তোমার এবং তোমার সন্তানদের পারস্পরিক অভিবাদন। তখন আল্লাহতালা তাঁকে নিজের দু’হাত দেখিয়ে বললেন, তুমি এ দু’টির যে কোনো একটি পছন্দ কর। তখন তাঁর উভয় হাত মুষ্টিবদ্ধ ছিল। আদম (আ.) বললেন, হে প্রভু! আমি তোমার ডান হাতকে পছন্দ করলাম। আল্লাহতালার উভয় হাতই ডান হাত এবং কল্যাণকর। অতঃপর আল্লাহতালা তাঁর হাত খুলতেই দেখা গেল, তাতে আদম (আ.)-এর সন্তানগণ রয়েছে।

তখন আদম (আ.) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! এরা কারা? আল্লাহতালা বললেন, এরা তোমার সন্তান। তখন দেখা গেল, প্রত্যেক ব্যক্তির আয়ুষ্কাল তাঁর দু’চোখের মাঝে অর্থাৎ- কপালে লিপিবদ্ধ আছে। তন্মধ্যে উজ্জ্বলতর এক ব্যক্তি রয়েছে। আদম (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, হে প্রভু! এ ব্যক্তি কে? আল্লাহতালা বললেন, এ ব্যক্তি তোমার অন্যতম সন্তান ‘‘দাউদ’’। তাঁর আয়ু আমি চল্লিশ বছর লিখেছি। আদম (আ.) বললেন, ‘‘হে প্রভু! তাঁর আয়ু বাড়িয়ে দিন’’। আল্লাহতালা বললেন, আমি তো তাঁর এতটুকু আয়ুষ্কাল লিখে রেখেছি। আদম (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, হে রব! আমি আমার আয়ু হতে ষাট বছর দান করলাম। আল্লাহতালা বললেন, ‘‘ঠিক আছে, তুমি আর তোমার সন্তান দাউদ জানে’’ অর্থাৎ এটা তোমার ব্যাপার। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর আল্লাহতালার ইচ্ছানুযায়ী আদম (আ.) জান্নাতে বসবাস করেন। অতঃপর তাঁকে জান্নাত হতে বের করে দেয়া হল। আদম (আ.) নিজের বয়সের বছরগুলো গণনা করতে লাগলেন, (যখন তাঁর আয়ুষ্কাল নয়শ’ চল্লিশ বছর শেষ হয়ে গেল) তখন তাঁর কাছে মৃত্যুর মালাক (ফেরেশতা) আসলেন। আদম (আ.) তাঁকে বললেন, তুমি তো আগে এসেছ, আমার জন্য এক হাজার বছর আয়ুষ্কাল লেখা রয়েছে। মৃত্যুর মালাক বললেন, জ্বি-হ্যাঁ, কিন্তু আপনি আপনার সন্তান দাঊদ (আ.)-কে ষাট বছর আয়ু দান করেছেন। তখন আদম (আ.) অস্বীকার করলেন। এ কারণে তাঁর সন্তানগণও অস্বীকার করে থাকেন এবং আদম (আ.) ভুলে গেছেন, তাই তাঁর সন্তানগণও ভুলে যায়। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেদিন হতে লিখে রাখতে এবং সাক্ষী রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। (সুনানু তিরমিযী)[1]

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَمَّا خَلَقَ اللَّهُ آدَمَ وَنَفَخَ فِيهِ الرُّوحَ عَطَسَ فَقَالَ: الْحَمْدُ لِلَّهِ فَحَمِدَ اللَّهَ بِإِذْنِهِ فَقَالَ لَهُ رَبُّهُ: يَرْحَمُكَ اللَّهُ يَا آدَمَ اذْهَبْ إِلَى أُولَئِكَ الْمَلَائِكَةِ إِلَى مَلَأٍ مِنْهُمْ جُلُوسٍ فَقُلِ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ. فَقَالَ: السَّلَامُ عَلَيْكُمْ. قَالُوا: عَلَيْكَ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ. ثُمَّ رَجَعَ إِلَى رَبِّهِ فَقَالَ: إِنَّ هَذِهِ تَحِيَّتُكَ وَتَحِيَّةُ بَنِيكَ بَيْنَهُمْ. فَقَالَ لَهُ اللَّهُ وَيَدَاهُ مَقْبُوضَتَانِ: اخْتَرْ أَيَّتَهُمَا شِئْتَ؟ فَقَالَ: اخْتَرْتُ يَمِينَ رَبِّي وَكِلْتَا يَدَيْ رَبِّي يَمِينٌ مُبَارَكَةٌ ثُمَّ بَسَطَهَا فَإِذَا فِيهَا آدَمُ وَذُرِّيَّتُهُ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ مَا هَؤُلَاءِ؟ قَالَ: هَؤُلَاءِ ذُرِّيَّتُكَ فَإِذَا كُلُّ إِنْسَانٍ مَكْتُوبٌ عُمْرُهُ بَين عَيْنَيْهِ فَإِذا فيهم رجلٌ أضوؤهُم – أَوْ مِنْ أَضْوَئِهِمْ – قَالَ: يَا رَبِّ مَنْ هَذَا؟ قَالَ: هَذَا ابْنُكَ دَاوُدُ وَقَدْ كَتَبْتُ لَهُ عُمْرَهُ أَرْبَعِينَ سَنَةً. قَالَ: يَا رَبِّ زِدْ فِي عُمْرِهِ. قَالَ: ذَلِكَ الَّذِي كَتَبْتُ لَهُ. قَالَ: أَيْ رَبِّ فَإِنِّي قَدْ جَعَلْتُ لَهُ مِنْ عُمْرِي سِتِّينَ سَنَةً. قَالَ: أَنْتَ وَذَاكَ. قَالَ: ثُمَّ سَكَنَ الْجَنَّةَ مَا شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ أُهْبِطَ مِنْهَا وَكَانَ آدَمُ يَعُدُّ لِنَفْسِهِ فَأَتَاهُ مَلَكُ الْمَوْتِ فَقَالَ لَهُ آدَمُ: قَدْ عَجَّلْتَ قَدْ كَتَبَ لِي أَلْفَ سَنَةٍ. قَالَ: بَلَى وَلَكِنَّكَ جَعَلْتَ لِابْنِكَ دَاوُدَ سِتِّينَ سَنَةً فَجَحَدَ فَجَحَدَتْ ذُرِّيَّتُهُ وَنَسِيَ فَنَسِيَتْ ذُرِّيَّتُهُ قَالَ: «فَمن يؤمئذ أَمر بِالْكتاب وَالشُّهُود» رَوَاهُ التِّرْمِذِيّ

[1] হাদীসের মান, হাসান ও সহীহ : তিরমিযী হাদীস নং ৩৩৬৮, আবূ ইয়া‘লা হাদীস নং ৬৬৫৪, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬১৬৭, ‘বায়হাক্বী’র আস-সুনানুল কুবরা হাদীস নং ২১০২৫।

প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণ :

এ হাদীস থেকে প্রমাণ হয় যে, হযরত আদম (আ.)-এর ইহলৌকিক বয়স ৪০ বা ৬০ বছর কম এক হাজার বছর। হাদীসের ভাষ্যমতে (وَقَدْ كَتَبْتُ لَهٗ عُمْرَهٗ) অর্থাৎ আমি তাকে আমার বয়স থেকে দিলাম। এর আসল অর্থ হল, বয়স বৃদ্ধির জন্য আল্লাহর নিকটে আবেদন করা। কারণ আল্লাহতালা ব্যতীত এটা কেউ করতে পারে না। এ হাদীসে ষাট বছর প্রদানের কথা উল্লেখ থাকলেও অন্য বর্ণনায় চল্লিশ বছর দেয়ার কথা উল্লেখ হয়েছে। ভিন্ন এ হাদীসের সমাধানে কোনো হাদীস বিশারদ বলেন যে, প্রথমে তিনি চল্লিশ বছর দিতে চেয়েছিলেন। পরে আরো বিশ বছর দিয়ে ষাট বছর হয়েছে। যেমন আল্লাহতালা মূসা (আ.)-কে প্রথমে ত্রিশ দিনের ওয়া‘দা দিয়ে আবার চল্লিশ দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি করেন। (সূরাহ্ আল আ‘রাফ ৭ : ১৪২)।

অথবা এটা বর্ণনাকারীর পক্ষ থেকে সন্দেহ হয়ে গেছে। তাই তিনি একবার চল্লিশ বছর বলেছেন এবং অন্যবার ষাট বছর বলেছেন। অথবা কখনো চল্লিশ বছরকে আসল বয়স এবং ষাট বছরকে দান বলেছেন। অথবা কখনো ষাট বছরকে আসল বয়স এবং চল্লিশ বছরকে দান বলেছেন। (মিরকাতুল মাফাতীহ, যুগ ইমাম মোল্লা আলী ক্বারী রহ.)।

হযরত নূহ (আ.)-এর ইহলৌকিক আয়ু নিয়ে কাদিয়ানীদের বিভ্রান্তিকর দাবীর খণ্ডনমূলক জবাব :

হযরত আদম (আ.)-এর ইহলৌকিক জীবন সম্পর্কে তো বললাম, এবার হযরত নূহ (আ.)-এর ইহলৌকিক জীবন সম্পর্কে আসি। ছানী আদম খ্যাত হযরত নূহ (আ.) ছিলেন আদমপুত্র হযরত শীষ (আ.)-এর বংশধর। যিনি সাড়ে নয়শত বছর জীবিত ছিলেন। পবিত্র কুরআন নিজেই এই সম্পর্কে বলছে যে,

وَ لَقَدۡ اَرۡسَلۡنَا نُوۡحًا اِلٰی قَوۡمِہٖ فَلَبِثَ فِیۡہِمۡ اَلۡفَ سَنَۃٍ اِلَّا خَمۡسِیۡنَ عَامًا ؕ فَاَخَذَہُمُ الطُّوۡفَانُ وَ ہُمۡ ظٰلِمُوۡنَ

অর্থাৎ “আর আমি (আল্লাহ) অবশ্যই নূহকে তাঁর কওমের নিকট প্রেরণ করেছিলাম। সে তাদের মধ্যে পঞ্চাশ কম একহাজার বছর অবস্থান করেছিল। অতঃপর মহা-প্লাবন তাদের গ্রাস করল, এমতাবস্থায় যে, তারা ছিল জালিম।” (সূরা আনকাবূত ২৯:১৪)।

কাদিয়ানীদের বর্তমান (বাংলাদেশী) ন্যাশনাল আমীর জনাব আব্দুল আউয়ালকে এই অকাট্য ও সার্বজনীন স্বীকৃত বিষয়গুলো সরাসরি অস্বীকার করতে দেখা গেছে। সে বলেছে, এ থেকে আক্ষরিক অর্থে দীর্ঘ কোনো আয়ুষ্কাল বুঝানো হয়নি, বরং এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, উনাদের (আদম, নূহ) শিক্ষা ও দাওয়াত পৃথিবীতে যথাক্রমে চল্লিশ বা ষাট বছর কম প্রায় এক হাজার বছরব্যাপী আর সাড়ে নয়শত বছরব্যাপী টিকে থাকা। এই ক্ষেত্রে কুরআন হাদীসের অকাট্য দলিল-প্রমাণের মুকাবিলায় কাদিয়ানী আমীরকে মস্তিষ্কপ্রসূত বেশ কিছু দুর্বল যুক্তির অবতারণা করতেও দেখা গেছে, যা মূলত তাদের মির্যা তাহের আহমদের নানা তাবিল-কাসুন্দিরই চর্বিতচর্বন বৈ নয়।

আর এতে তাদের উদ্দেশ্য একটাই, ঈসা (আ.)-এর দ্বিতীয় আগমনী বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। কাদিয়ানীদের জন্য দুঃসংবাদ হচ্ছে, তাদের ঐ সমস্ত রূপকের কাসুন্দি বিশেষকরে হযরত নূহ (আ.)-এর ক্ষেত্রে কিছুতেই হালে পানি পায় না। কেননা পবিত্র কুরআনের আয়াতটিতে স্পষ্টতই বলা হচ্ছে যে হযরত নূহ (আ.) নিজ গোত্রের মাঝে অবস্থান করেছিলেন পঞ্চাশ কম এক হাজার বছর, মানে সাড়ে নয়শত বছর। পক্ষান্তরে নির্বোধ এই কাদিয়ানী আমীর এখানে ধরে নিলেন যে, নিজ গোত্রের মাঝে নূহ (আ.) অবস্থান করার অর্থ তাঁর দাওয়াত ও শিক্ষার প্রভাব সাড়ে নয়শত বছরব্যাপী পৃথিবীতে টিকে থাকা! হায় কত যে নিকৃষ্ট তাবিল!

আর যদি কাদিয়ানী নেতার ঐ যুক্তির সাথে তর্কের খাতিরে আমি একমত হই তাহলেও প্রশ্ন আসবে যে, তবে কি পৃথিবীতে ইবরাহীম (আ.)-কে নতুন শরীয়ত সহকারে হযরত নূহ (আ.)-এর দাওয়াতের প্রভাব বর্তমান থাকাকালেই পাঠানো হল? অবশ্যই না। কারণ হযরত নূহ (আ.)-এর জন্ম হয়েছিল হযরত আদম (আ.)-এর ইন্তেকালের ১২৬ অথবা ১৪৬ বছর পরে। ইমাম আবু হাতিম ইবনে হাব্বান স্বীয় ‘সহীহ ইবনে হাব্বান’ গ্রন্থে একথা লিখেছেন। আর সহীহ বুখারীতে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সূত্রে একটি বর্ণনায় রয়েছে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন كان بين آدم ونوح، عشرة قرون অর্থাৎ আদমের ইহকালে পদার্পণ আর নূহ-এর জন্মগ্রহণ এই দুইয়ের মধ্যভাগে এক হাজার বছরের দীর্ঘবিরতি ছিল। এখন কাদিয়ানী আমীরের অহেতুক প্রশ্ন ‘আদম (আ.)-এর ইহলৌকিক জীবন ৯৬০ বছরকে আক্ষরিক অর্থে নেয়া হলে তারই জীবদ্দশায় নূহ (আ.)-কেও তাঁর নিকট বাইয়েত নিতে হয়েছে মানতে হয়’– পুরাই হটকারিতা বৈ নয়!

আরো প্রশ্ন আসে, হযরত আদম (আ.)-এর উক্ত ৯৬০ বছরের দীর্ঘ আয়ুকাল হতে তাঁর শিক্ষা বা দাওয়াতের প্রভাবকাল সময় উদ্দেশ্য হলে তখন তিনি যে হযরত দাউদ (আ.)-কে নিজের আয়ু থেকেই চল্লিশ কিংবা ষাট বছর প্রদান করলেন বলে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হল সেটিরও বা কী ব্যাখ্যা?

অধিকন্তু হযরত নূহ (আ.) সংক্রান্ত আয়াতটির প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করলে একজন সাধারণ মানুষও সহজে বুঝতে পারবে যে, সেখানে নূহ (আ.)-এর ইহলৌকিক আয়ুকাল নিয়ে কথা শেষ করেই বলা হচ্ছে যে, তারপর প্লাবন তাদের গ্রাস করলো। এখন যদি কাদিয়ানী আমীরের সস্তা যুক্তিগুলো কয়েক সেকেণ্ডের জন্য মেনে নিই তাহলেও ঐ হিসেব অনুযায়ী হযরত নূহ (আ.)-এর ইন্তেকালের ৭০০ বা ৮০০ বছর পরেই মহা প্লাবন সংঘটিত হয়েছিল বলে মানতে হয়! কিন্তু কোনো কাদিয়ানী কি মানবে এটা? কস্মিনকালেও নয়। মজার ব্যাপার হল, ইবলিশ শয়তানের ইহলৌকিক জীবনকে আল্লাহতালা কেয়ামত দিবস পর্যন্ত দীর্ঘ করে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআন দ্বারা এটিও সুস্পষ্ট প্রমাণিত। দেখুন, সূরা আ’রাফ আয়াত ১৫, সূরা হিজর আয়াত ৩৮। তাই কাদিয়ানী আমীর কি এখানেও উক্ত কাসুন্দি নিয়ে হাজির হয়ে বলবেন যে, এর দ্বারাও আক্ষরিক অর্থ উদ্দেশ্য নয়, বরং ইবলিশ শয়তানের শিক্ষা এবং দাওয়াতের প্রভাবই বুঝানো উদ্দেশ্য! জ্ঞানীদের নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলবে!!

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

ঈসা (আ.)-এর ইহলৌকিক বয়স কি ১২০ বছর?

কাদিয়ানীদের বিভ্রান্তিকর দাবীর খণ্ডনে

কাদিয়ানীদের মতে ঈসা (আ.)-এর ইহলৌকিক বয়স ১২০ বছর ছিল, এটি সঠিক নয় কেন?

কাদিয়ানীদের মতে ঈসা (আ.)-এর বয়স হয়েছিল ১২০ বছর! আর একথার প্রমাণ হিসেবে তারা একখানা হাদীসও উল্লেখ করে থাকে। তাদের জন্য আফসোস হল, তারা কখনো যাচাইও করে দেখেনি যে, তাদের উল্লিখিত হাদীসটি সূত্র এবং মতনের দিক থেকেও অথেনটিক কিনা? ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.)-এর উদ্ধৃতিতে কাদিয়ানীরা নানা সময় নানা কিছু পেশ করে থাকে। সেই হিসেবে উক্ত প্রসঙ্গে ইবনে কাসীর (রহ.)-এর নিজেস্ব একটি বক্তব্য এখানে পেশ করতে চাই, তিনি (রহ.) তাঁর রচিত ‘আল জামেউল মাসানিদ ওয়াস সুনান‘ (جامع المسانيد والسنن) গ্রন্থে (৩২৭০) লিখেছেন,

أن يكون عيسى بن مريم – عليه السلام – قد عُمر قبل رفعه مائة وستًّا وعشرين سنة، وهذا خلاف المشهور من أنه رفع وله ثلاث وثلاثون سنة،

অর্থাৎ ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.)-এর বয়স তাঁকে উঠিয়ে নেয়ার পূর্বে ১২৬ বছর ছিল মর্মে কথাটি সুপ্রসিদ্ধ মতের বিরোধী। কারণ প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে, তাঁকে উঠিয়ে নেয়ার সময় তাঁর বয়স হয়েছিল তেত্রিশ বছর। তাছাড়া শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানী (রহ.)ও পরিষ্কার করে লিখে গেছেন যে, এই ধরনের বর্ণনা সূত্রের বিচারে খুবই দুর্বল।

ইমাম বুখারী তো পরিষ্কার বলে দিয়েছেন যে, لا يكاد يتابع فى حديثه অর্থাৎ ‘এর সনদে উল্লিখিত মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে উসমান নামীয় বর্ণনাকারীর হাদীসটির অনুসরণ করার মত কোনো গ্রহণযোগ্যতাই তার নেই।’ (আস-সিলসিলাতুয য’য়ীফাহ ৯/৪২৫; ক্রমিক নং ৪৪৩৪; শায়খ আলবানী রহ.)।

অনুরূপ আরও যারা উক্ত রাবী তথা বর্ণনাকারীর উপর জরাহ (আপত্তি) করেছেন, তাদের মধ্যে ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (ফাতহুল বারী ৬/৩৮৪), ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনে আসাকির, ইমাম যাহাবী ও ইমাম বাজ্জার প্রমুখ অন্যতম। স্ক্রিনশট দেখুন!

বলে রাখতে চাই, মির্যা কাদিয়ানীর বইতে লিখা আছে, যে হাদীস ইমাম বুখারীর কৃত শর্তের বিপরীত সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। (দেখুন, রূহানী খাযায়েন খণ্ড ১৭ পৃষ্ঠা নং ১১৯-২০)।

এখন কি তারপরও ঐ ১২০ বছর ওয়ালা বর্ণনাটির চর্বিতচর্বণ করতে থাকবেন? নিজের উপর একটু তো ইনসাফ করবেন!

মজার ব্যাপার হল, উল্লিখিত স্কলারদের সবাই বলেছেন, ঈসা (আ.)-কে যখন উঠিয়ে নেয়া হয় তখন তার বয়স ছিল ৩৩ বছর। উল্লিখিত ১২০ বছর ওয়ালা বর্ণনা হেতু ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) লিখেছেন, যখন তাঁকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে তখন তাঁর বয়স কত ছিল তা নিয়ে মতবিরোধ হয়ে গেল। কারো মতে তেত্রিশ বছর আবার কারো মতে (এই বর্ণনার কারণে তাঁর ইহলৌকিক বয়স) ১২০ বছর। হাফেজুল হাদীস ইমাম ইবনে আসাকির (রহ.) লিখেছেন, বিশুদ্ধ কথা হল,

ان عيسى لم يبلغ هذا العمر

অর্থাৎ নিশ্চয়ই ঈসা এই বয়সে পৌঁছেননি। কিন্তু এরপরেও কাদিয়ানী সম্প্রদায় বলতেই থাকবে যে, না না; ঈসা (আ.)-এর ইহলৌকিক বয়স ১২০ বছরই হয়েছিল!

যেমন জনৈক কাদিয়ানী মতের অনুসারী জনাব Nasim Ahmed তাদের মধ্যে অন্যতম। যেজন্য আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম যে, আপনি যদি ১২০ বছরের ঐ দুর্বল সূত্রের বর্ণনাটিকে চেপে ধরে বসে থাকতে চান, তাহলে নিচের প্রশ্নটির কী উত্তর?

প্রশ্ন হচ্ছে, ঐ ১২০ বছর ওয়ালা বর্ণনার শুরুতে কিন্তু এও উল্লেখ আছে, “লাম ইয়াকুন নাবিয়্যুন কানা বা’দাহু নাবিয়্যুন ইল্লা আ’শা নিছফা উমরিন আল্লাজী কানা ক্ববলাহু” (لم يكن نبى كان بعده نبى الا عاش نصف عمر الذى كان قبله) । অর্থাৎ ‘প্রত্যেক নবী তাঁর পূর্বের নবীর অর্ধেক আয়ুষ্কাল অবশ্যই পেয়েছেন (অনুবাদ, হামামাতুল বুশরা [বাংলা] ৩৬)।’

সে হিসেবে আমার প্রশ্ন হল, হযরত ইদরীস (আ:) এর পরেই হযরত নূহ (আ:)-এর আগমন হয়। আর হযরত ইদরীস (আ.)-এর বয়স হয়েছিল মাত্র ৮২ বছর। অপরদিকে নূহ (আ:)-এর বয়স ছিল ৯৫০ বছর। এখন ঐ ১২০ বছর ওয়ালা বর্ণনাটি যদি গ্রহণযোগ্যই হয় তাহলে সে হিসেবে হযরত নূহ (আ.)-এর বয়স কেন হযরত ইদরীস (আ.)-এর বয়সের অর্ধেক মাত্র ৪১ বছর হল না?

এভাবে প্রশ্ন করা শুরু করলে শেষ হবেনা। কারণ হযরত আদম (আ.) ১০৬০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছিলেন। এখন প্রত্যেক নবী তাঁর পূর্ববর্তী নবীর বয়সের অর্ধেক পেয়ে থাকার বর্ণনা সঠিক হলে তখন আদম (আ.)-এর বয়স লক্ষ নয়, বরং কোটি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ছোট্ট একটি উদাহরণ দিচ্ছি, আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-এর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। সে হিসেবে উনার পূর্ববর্তী নবীর বয়স তাঁর দ্বিগুণ হতে গেলে তা কোনোভাবেই ১২৬ বছরের কম হতে পারবেনা। একই ভাবে তাঁরও পূর্ববর্তী নবীর বয়স তাঁর অপেক্ষা দ্বিগুণ ধরলে হবে ২৫২ বছর। এভাবে উপর দিকে যথাক্রমে ৫০৪ বছর, ১০০৮ বছর, ২০১৬ বছর, ৪০৩১ বছর, ৮০৬২ বছর দাঁড়াবে। একটা পর্যায়ে ১ লক্ষ বা ২ লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী রাসূলগণের বয়স সীমা পেরিয়ে আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর বয়স কয়েক কোটি হয়ে যাবে কিনা? আফসোস! কাদিয়ানীরা কখনো এই সমস্ত অসঙ্গতি চিন্তাও করেনা!

যদি মূসা এবং ঈসা জীবিত থাকত তাহলে…

ওহে কাদিয়ানীবন্ধু! এরপরেও কি নিজের সুস্থ মস্তিষ্কের সাথে বুঝাপড়া করবেনা?

মজার ব্যাপার হল, ঐ হাদীসটিকে যদি মির্যা সাহেবের মতে সহীহ ধরা হয় তাহলে কিন্তু মির্যা সাহেব আরো একবার মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হবেন। কেননা তখন একই প্রশ্ন মির্যা ক্ষেত্রেও আসবে। আর তা হল, এই জ্যামিতিক হিসাবে নবী দাবীদার খোদ মির্যার বয়সটিও হওয়া উচিত ছিল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ৬৩ বছরের অর্ধেক অর্থাৎ ন্যূনতম ৩১ বছর। কিন্ত আফসোস এটাও সম্ভবপর হয়নি! বরং মির্যা কাদিয়ানী (১৮৩৯/৪০-১৯০৮) মারা যান ৬৮/৬৯ বছর বয়সে! তো সমীকরণ কিভাবে মিলাবেন? মির্যা কাদিয়ানীর জন্ম তারিখ তারই রচনাতে দেখুন।

সত্য বলতে, কাদিয়ানীরা এর সঠিক উত্তর কখনো দেবেনা। কেননা এতে তাদের ১২০ বছর ওয়ালা অগ্রহণযোগ্য বিশ্বাসের কবর রচিত হবে! যাইহোক, এই ধরণের অসঙ্গতিপূর্ণ কোনো কথা অন্তত আল্লাহর প্রেরিত পুরুষগণ কখনো বলবেন না, এমনটাই স্বাভাবিক। তাই বলা যায় যে, এটি প্রকৃতপক্ষে ঐ বর্ণনারই একজন রাবী মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে উসমানেরই নিজেস্ব ও বানোয়াটি ছিল। মূলত এর অসঙ্গতির কারণ এটাই।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

খতমে নবুওয়ত আর খতমে কুরআন ও সংশয় নিরসন

0

খতমে নবুওয়ত আর খতমে কুরআন! কাদিয়ানীদের উদ্দেশ্যমূলক আবোল তাবোল যুক্তির প্রতিউত্তরে

কাদিয়ানী – মোল্লারা(!) নবুওয়ত শেষ বুঝাতে ‘খতমে নবুওয়ত’ কথাটি খুব বলে থাকে; তাহলে ‘খতমে কুরআন’ এর কী অর্থ? অথচ প্রতি রমাযানে হাজারো হাফেজে কুরআন ‘খতমে কুরআন’ করছেন!

মুসলমান – জবাবটা কি কাদিয়ানীদের প্রধান গুরু মির্যা গোলাম আহমদ এর রচনা থেকে দেব?

কাদিয়ানী – হুম, আচ্ছা দিন!

মুসলমান – মির্যা গোলাম আহমদ নিজেও প্রকাশ্যে নবুওয়তের দাবী করার পূর্বে (আনুমানিক ১৮৯৭ সালে) লিখেছে,

  • ان سب باتوں کو مانتا ہوں جو قرآن اور حديث کی رو سے مسلم الثبوت ہیں. اور سیدنا مولانا حصرت محمد مصطفیٰ صلى الله عليه وسلم ختم المرسلين کے بعد کسی دوسرے مدعی نبوت اور رسالت کو کازب اور کافر جانتا ہوں. میرا یقین ہے کہ وحی رسالت حضرت آدم صفی اللہ سے شروع ہوئی اور جناب رسول اللہ محمد مصطفیٰ صلی اللہ علیہ و سلم پر ختم ہو گئی

(উচ্চারণ) “উন সব বাতূ কো মানতা হোঁ যূ কুরআন অওর হাদীস কি রো ছে মুসাল্লামুছ ছবূত হেঁ অওর সাইয়েদানা ওয়া মওলানা হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খতমুল মুরসালীন কে বা’দ কেসি দোসরে মুদ্দায়ীয়ে নবুওয়ত অওর রেসালত কো কাজিব অওর কাফের জানতা হোঁ। মেয়েরা একীন হে, কে ওহীয়ে রেসালত হযরত আদম ছফিউল্লাহ চে শুরু হুয়ি অওর জনাবে রাসূলুল্লাহ মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফর খতম হো গি।”

অনুবাদ, কুরআন হাদীস দ্বারা যেসব বিষয় দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত আমি সেসব বিষয় মান্য করি। সায়্যেদিনা মওলানা হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাতমুল মুরসালিন)’র পরে কেউ নবুওয়ত আর রিসালতের দাবি করলে সে মিথ্যাবাদী ও কাফের। আমার ইয়াক্বিন (বিশ্বাস), ওহী এবং রেসালত ছফিউল্লাহ হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু হয়ে জনাব রাসূলুল্লাহ মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র উপর সমাপ্ত হয়ে গেছে। (মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত ১/২৩০-৩১; উর্দূ এডিশন ও অনলাইন ভার্সন)।

মির্যা কাদিয়ানীর রচনা-সংকলন ‘মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত ১/২৩০-৩১

এখন বলেন, জবাব কি আরো লাগবে?

কাদিয়ানী – বুঝাই দেন!

মুসলমান – মির্যার উপরিউক্ত রচনায় পরিষ্কার করে বলা হয়েছে যে, ওহী-রেসালাত হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু এবং মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) পর্যন্ত এসে শেষ বা সমাপ্ত।

আর এটাকেই এককথায় ‘খতমে নবুওয়ত’ বলা হয়। অর্থাৎ নবুওয়তের ধারাক্রম মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) পর্যন্ত এসে শেষ বা সমাপ্ত। এবার আসি ‘খতমে কুরআন’ নিয়ে।

‘খতমে কুরআন’ এর সাধারণ অর্থ হচ্ছে কুরআন পাঠের সমাপ্তি। আরেকটু সহজ করে বলছি, যখন কেউ পবিত্র কুরআনের ১১৪টি সূরার মধ্য হতে সূরা ফাতেহা থেকে শুরু করে সর্বশেষ সূরা—সূরা আন নাস পর্যন্ত এসে পৌঁছে তখন তাকে ‘খতমে কুরআন’ বা কুরআন পাঠের শেষ বা সমাপ্তি বলা হয়।

এখন প্রশ্ন হল, ‘খতমে কুরআন’ এর পরেও কি ভিন্ন ধরণের কথিত জিল্লি বুরুজি খতমের নতুন কোনো ধারণা থাকতে পারে? অবশ্যই না। তাহলে ‘খতমে নবুওয়ত’ অর্থাৎ ওহীয়ে নবুওয়তের ক্রমধারা শেষ বা সমাপ্তির পরেও মির্যায়ী উম্মতেরা ভিন্ন ধরণের কথিত জিল্লি বুরুজি নবুওয়তের নতুন কোনো ধারণা কোত্থেকে আমদানি করে?

আমি জানিনা, কাদিয়ানীরা খতমে কুরআন এর কনসেপ্ট দিয়ে ‘খতমে নবুওয়ত’ এর বুনিয়াদি শিক্ষার বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলে কোন যুক্তিতে?

বলাবাহুল্য, প্রতি রমাযানে হাজারো হাফেজে কুরআন ‘খতমে কুরআন’ করার সাথে ‘খতমে নবুওয়ত’ এর সম্পর্ক ঠিক সেভাবেই যেভাবে উপরে পেশ করা হয়েছে। কাদিয়ানীদের জন্য দুঃসংবাদ এইজন্য যে, ‘খতমে কুরআন”-কে তারা যে আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করে ‘খতমে নবুওয়ত’ এর মুখোমুখি করে দাঁড় করতে চাচ্ছে সেটি সম্পূর্ণ হাস্যকর। কেননা ‘খতমে কুরআন’-এর সম্পর্ক উম্মাহার আমলের সাথে, যার ধারাক্রম চিরতরে রুদ্ধ—এভাবে কোথাও বলা নেই। অপরদিকে ‘খতমে নবুওয়ত’ এর বিষয়টির সম্পর্ক ঈমানীয়তের সাথে। আর সেটি রাসূল (সা.)-এর পবিত্র বাণী لا نبى بعدى (আমার পরে আর কোনো নবী নেই) থেকেই চয়িত। অসংখ্য হাদীস দ্বারা সেটির ধারাক্রম চিরতরে রুদ্ধ—এভাবেই বলা আছে। সুতরাং দুটি দুই জিনিস। খতমে নবুওয়ত এর উপর ২০টি সহীহ বর্ণনা – পড়া যেতে পারে।

আল্লাহ আমাদেরকে সহীহ বুঝ দান করুন।

জনৈক কাদিয়ানীর প্রশ্ন, আপনি শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর দিন, সব সমস্যার সমাধান হবে। শেষ যুগে আগমনকারী ঈসা (আ.) নবী হয়ে আসবেন কি না? উত্তর এখানে

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

জাফরান রং-এর কাপড় পরার শরয়ী হুকুম

0

একটি অজ্ঞতাপূর্ণ সংশয় ও তার দালিলিক জবাব

প্রশ্ন : বুখারীর একটি হাদীসে এসেছে, পুরুষদের জন্য জাফরানের রং-এর কাপড় পরিধান করা নিষিদ্ধ। তাহলে ঈসা (আ.)-এর ঐ দুইখানা চাদরের রং জাফরানের কিভাবে হতে পারে?

হাদীসটি এই, عن انس قال نهى النبى صلى الله عليه و سلم أن يتزعفر الرجل অর্থ- আনাস (রা.) হতে বর্ণিত আছে, নবী (সা.) পুরুষদের জাফরানী রং-এর কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৮৪৬, মুসলিম ৩৭/২৩, হাদীস ২১০১, আহমদ ১২৯৪১; আধুনিক প্রকাশনী ৫৪২০, ইফা ৫৩১৬)। হাদীসটির সঠিক তাৎপর্য কী? তবে কি পুরুষদের জন্য জাফরানী রং-এর কাপড় পরিধান করা শরীয়তে নিষিদ্ধ বুঝাল? এ সম্পর্কে জানাবেন।

উত্তর : এই হাদীসের সঠিক মর্মার্থ বিশিষ্ট হাদীস বিশারদগণ এভাবে দিয়েছেন যে, نهى النبي -صلى الله عليه وسلم- أن يصبغ الرجل جسده أو ثيابه بالزعفران، وكان ذلك من طيب النساء، فنهي الرجال عن ذلك منعًا من التشبه অর্থ – ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষের শরীর ও কাপড়কে জাফরান দ্বারা রঙ্গিন করতে নিষেধ করেছেন। এ ছিল মহিলাদের সাজ সজ্জা। তাই পুরুষদেরকে এ থেকে নিষেধ করার কারণ হচ্ছে (মহিলাদের) সাদৃশ্য থেকে বিরত রাখা।’

এতে বুঝা যায় যে, কাপড়টি জাফরানী রং-এর বুনানো হওয়াকে নিষেধ করেনি, বরং পরিধানকারী আপনা পরিধেয় বস্ত্রে জাফরান নামক সুগন্ধী উপাদান মিশানো কিংবা সাজসজ্জা গ্রহণ করা, এ সমস্ত কার্যকলাপকেই নিষেধ করা উদ্দেশ্য। বিশিষ্ট যুগ ইমামগণ থেকেও হাদীসটির অনুরূপ তাৎপর্য পাওয়া যায়। যেমন, ইমাম তিরমিযি (রহ.), ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) উনারা লিখেছেন, এই হাদিসে ‘আই-ইয়াতাজা’ফারার রাজুল’ (ان يتزعفر الرجل) দ্বারা উদ্দেশ্যে হচ্ছে, পুরুষরা তাদের শরীরকে জাফরান দ্রব্য দ্বারা সুগন্ধমণ্ডিত করা। এটিই অপছন্দনীয়। হাদীসে জাফরানী রং-এর কাপড় পরিধান করা নিষিদ্ধ বুঝায়নি, বরং পুরুষগণ নিজেদের আকর্ষণীয় করার জন্য জাফরান দ্রব্য দ্বারা শরীরকে সুগন্ধমণ্ডিত করতে নিষেধ করা হয়। এই ব্যাখ্যা আরো বহু হাদীস বিশারদ দিয়ে গেছেন। ইমাম তিরমিযি (রহ.) সংকলিত সুনানে তিরমিযি’র ৪র্থ খণ্ডের ৪৪৮ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য। আর ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) আরো কী লিখেছেন দেখুন, وأما نهيه أن يتزعفر الرجل : فالمراد به أن يُخَلِّق بَدَنَه بالزعفران [أي : يتطيب به ، والخلوق هو طيب مركب فيه زعفران] ، فإن طيب الرجل ما ظهر ريحه وخفي لونه. انتهى من “شرح عمدة الفقه”

অর্থ—’এই হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য, পুরুষগণ জাফরান দ্বারা নিজেদের শরীর সুগন্ধমন্ডিত করা। সুগন্ধকারক বস্তুর অন্যতম উপাদান হচ্ছে, জাফরান। কেননা পুরুষের সুগন্ধির মধ্যে ঘ্রাণ প্রকাশ পায় কিন্তু রং অস্পষ্ট থাকে।’ (শরহে উমদাতুল ফিকহ, পৃষ্ঠা ৩৪৩; আরবী অভিধান, তাজুল উরূস ২৫/২৬০)।

বলাবাহুল্য, হাদীসটির উক্ত অনুবাদের মধ্যে “কাপড়” শব্দ উল্লেখ করা ঠিক হয়নি। অনুবাদকের ভুলের কারণেই সম্ভবত এইধরণের প্রশ্ন উঠেছে।

আরো সহজে বুঝার জন্য বলছি, হাদীসটির উদ্দেশ্য হল, পুরুষদেরকে ‘জাফরান’ দ্রব্য ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে, সাজ-সজ্জার জন্য সুগন্ধি দ্রব্য ‘জাফরান’ ব্যবহার আর জাফরানী রং-এর বুনানো কাপড় পরিধান, দুটি এক জিনিস নয়। বুঝার জন্য ছোট্ট আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি, হাদীসে স্বর্ণ ব্যবহার করতে পুরুষকে নিষেধ করা হয়। এখন তাই বলে কি স্বর্ণের রং-এর বুনানো (সোনালী কালারের) জামা কাপড় পরিধান করাও নিষিদ্ধ হবে? নিশ্চয়ই না।

তারপর বলে রাখা জরুরি যে, ঈসা (আ.)-এর দ্বিতীয়বার আগমনকালে তাঁর পরনে যে দুটি চাদর থাকবে সেটির আরবী শব্দ হচ্ছে, بين مهرودتين (বাইনা মাহরূদাতাইন)। (ক্লিক) হাদীস বিশারদগণের মাঝে এটির তাৎপর্য নির্ণয়ের ক্ষেত্রে দুটি প্রসিদ্ধ মত পরিলক্ষিত হয়। কেউ কেউ বলেছেন, এর দ্বারা চাদর দুটির রং জাফরানের রং-এর হওয়া উদ্দেশ্য। তবে বিশিষ্ট হাদীস বিশারদ ইমাম আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ ইবনু মুসলিম ইবনু কুতাইবাহ আদ-দিনাওয়ারী রহ. (মৃত্যু ৮৮৯ খ্রিস্টাব্দ) এটির ব্যাখ্যায় صفراوين (ছফরাওয়াইন) তথা দুটি হলুদ বর্ণের। উল্লেখ্য, মির্যা কাদিয়ানী নিজেও এর অর্থ ‘দুটি হলুদবর্ণের চাদর‘ নিয়েছেন। দেখুন, তাযকিরাতুশ শাহাদাতাইন (বাংলা অনূদিত) পৃষ্ঠা নং ৪৯। স্ক্রিনশট –

জাফরানী রং বা কালার

এই যে ছবিতে জাফরানের রং দেখতে পাচ্ছেন। এই কালারের বুনানো জামা-কাপড় বা পরিধেয় বস্ত্র ব্যবহার করা নিষিদ্ধ নয়। কারণ হাদীসের শব্দটি হচ্ছে, ان يتزعفر الرجل তথা পুরুষের জাফরান ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। আশাকরি উত্তর পেয়েছেন।

লিখক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

কাদিয়ানীবাদ মুসলিম দেশ সমূহের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি কিভাবে?

0

ঐতিহাসিক ‘বেলফোর ঘোষণা‘ থেকে কাদিয়ানীবাদ : সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অশনি সংকেত

ভুমিকা ছাড়াই বলছি। বাংলাদেশে আহমদীয়া তথা কাদিয়ানীবাদ ধীরেধীরে বেলফোর ঘোষণার ঐতিহাসিক পটভূমির দিকেই এগুচ্ছে সম্পূর্ণ পর্দার আড়ালে। এতে জনমনে প্রতিনিয়ত আতংক বাড়ছে বৈ নয়। মানে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেভাবে ফিলিস্তিনিদের ভিটামাটি কেড়ে নিয়ে ইহুদীবাদীদের বসাতে ‘বেলফোর ঘোষণা’ নামক চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল, অনুরূপ কাদিয়ানীবাদের অনুসারীদের পুনর্বাসিত করতে আরেকটা ‘বেলফোর ঘোষণা’ সময়ের অপেক্ষা মাত্র। আর এই জন্যই যুক্তরাজ্য ভিত্তিক BBC সহ প্রায় সমস্ত গণমাধ্যম কাদিয়ানীবাদের পক্ষে সরব। যা আমরা প্রায়শই দেখছি। তথ্য-প্রমাণাদি সামনে দেখুন।

উল্লেখ্য, বেলফোর ঘোষণা (তারিখ ২ নভেম্বর ১৯১৭) হল, ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের একজন নেতা ব্যারন রথচাইল্ডের কাছে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র সচিব আর্থার জেমস বেলফোরের লেখা একটি চিঠি। জায়নিস্ট ফেডারেশন অব গ্রেট ব্রিটেন এন্ড আয়ারল্যান্ড নামক সংগঠনের কাছে পাঠানোর জন্য চিঠিটি তাকে দেয়া হয়। চিঠিটিতে প্রথম স্বাক্ষরকারী ছিলেন যুক্তরাজ্যের সেই পররাষ্ট্র সচিব আর্থা‌র জেমস বেলফোর। এর উদ্দেশ্য, ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে ফিলিস্তিনে ইহুদি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য সমর্থনের নিশ্চয়তা। চিঠির মূল কপিটি ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে আজো সংরক্ষিত আছে। চিঠিতে লিখা ছিল,

বেলফোর এবং তার প্রেরিত চিঠি
  • His Majesty’s government view with favour the establishment in Palestine of a national home for the Jewish people, and will use their best endeavours to facilitate the achievement of this object, it being clearly understood that nothing shall be done which may prejudice the civil and religious rights of existing non-Jewish communities in Palestine, or the rights and political status enjoyed by Jews in any other country.

ইতিমধ্যে বাংলাদেশের উত্তরাংশে পঞ্চগড়ের সদর জেলা, সাতক্ষীরার সুন্দরবনে কাদিয়ানীবাদের অনুসারীদের অপতৎপরতা চোখে পড়ার মত। দেশের অনেক এলাকার নামও তারা পরিবর্তন করে ‘আহমদনগর’ রেখে দিয়েছে। তারা প্রতিদিনই এই সমস্ত জেলায় শত শত একর জমি ক্রয় করে মাটিভরাট করছে এবং সারা দেশ থেকে তাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিজ অনুসারীদের একত্রিত করতে শুরু করেছে। সত্যমিথ্যা নিশ্চিত করতে তদন্ত হওয়া উচিত, তবেই দেখা যাবে; সেখানে স্থানীয়দের চেয়ে বহিরাগতদের সংখ্যাই অনেক বেশি।

অপ্রিয় হলেও সত্য, এই কাদিয়ানীবাদকে মনে করা হয়, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আরেকটি ‘ছায়ারাষ্ট্র’। তার অন্যতম কারণ, কাদিয়ানীবাদের অনুসারীরা দেশের যেই প্রান্তেই থাকুক না, তারা ঢাকার বকশিবাজারের কাদিয়ানীকেন্দ্রের নির্দেশ মানতে বাধ্য, আর্থ-সামাজিক বা পারিবারিক সর্বক্ষেত্রে তারা শুধুমাত্র তাদেরই কেন্দ্রের সীদ্ধান্ত মানতে বাধ্য, কোনোভাবেই নিজেদের মনোনীত প্রতিনিধির (ন্যাশনাল আমীর, সদর আমীর, সদর নায়েবে আমীর) দুয়ার ছেড়ে দেশের কোনো প্রতিনিধির দুয়ারে যাওয়ার অনুমতি নেই। প্রত্যেক কাদিয়ানীবাদের সদস্যকে নিজের আয়ের ১৬% চাঁদা প্রতিমাসে কাদিয়ানীবাদের ফাণ্ডে জমা দেয়া বাধ্যতামূলক। কাদিয়ানীবাদ ত্যাগ করে সম্প্রতি যতজনই ইসলামে ফিরে এসেছেন তাদের প্রত্যেকে এমনই ভয়ংকর তথ্য ফাঁস করেছেন। নও মুসলিম জনাব আনোয়ার সাদাত তাদের মধ্যে অন্যতম। শুনতে ভিডিওটিতে ক্লিক করুন – ক্লিক

উল্লেখ্য, বি-বাড়িয়ার (তিতাস নদীর তীরবর্তী) কান্দিপাড়া গ্রামের নও মুসলিম (সাবেক কাদিয়ানী) আনোয়ার সাদাত সহ এক সাথে ২০ জন কাদিয়ানীবাদ ত্যাগ করেছেন ২০১৬ সালে। তাছাড়া গত ৭ই মার্চ ২০২২ ইং জাতীয় প্রেসক্লাবে আব্দুস সালাম হলে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং দেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে বক্তব্যদানকালে উলামা প্রতিনিধিদলের একজন শীর্ষ স্কলারশিপ বক্তা তার বক্তব্যেও এই বিষয়গুলো তুলে ধরেন এবং সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জাতীয় প্রেসক্লাবে ঐ বক্তার ২০ মিনিটের বক্তব্যটির ডকুমেন্টারি ভিডিও লিংক – ক্লিক

সুতরাং এতে সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, বিশ্ব পরাশক্তিগুলো ঐতিহাসিক ‘বেলফোর’ যুক্তি মতে যেভাবে ফিলিস্তিনে ইহুদীবাদের পুনর্বাসনে ষড়যন্ত্র করেছিল সেই একই কায়দায় কাদিয়ানীবাদকেও বাংলাদেশে পুনর্বাসন করতে তারা মরিয়া। ইতিমধ্যে তারই প্রক্রিয়া অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অনেকদূর অগ্রসরমান বললেও ভুল হবেনা। এর কয়েকটি কারণ হল,

১- কাদিয়ানীবাদের উদ্ভব হয় ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ ভারতে ও বর্তমান পাকিস্তানের লুধিয়ানা শহরে (আহমদ চরিত ৮, প্রকাশকাল মে, ২০০৯)। কিন্তু আজকের এই দিন পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও এরা নির্দিষ্ট কোনো ভুখণ্ডের অধিকারী হতে পারেনি। যদিও আলাদা ভুখণ্ডের উদ্দেশ্যে ১৯৬৪ সালের পর থেকে তাদের তৃতীয় খলীফা মির্যা নাসের আহমদের মাধ্যমে আফ্রিকার নাইজার, ঘানা, তানজানিয়া এবং আলজেরিয়া সহ বেশ কিছু দেশে সংখ্যা বৃদ্ধির জোরালো চেষ্টা বহু আগ থেকে শুরু হয়েছে। বলাবাহুল্য, যখনি তারা কোনো ভুখণ্ডের উপর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে তখনি তারা যে কোনো মূল্যে হোক ঐ ভুখণ্ডের উপর আধিপত্য কায়েম করতে বদ্ধপরিকর। যেহেতু তাদের লক্ষ্য হচ্ছে, ৩০০ (তিন’শ) বছরের মধ্যে সারা পৃথিবী কব্জায় নিয়ে একই নেতার মাধ্যমে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। মির্যা কাদিয়ানীর পুত্র ও তাদের কথিত দ্বিতীয় খলীফা বশির উদ্দিন মাহমুদের রচনাবলীর সমষ্টি ‘আনওয়ারুল উলূম‘ এর মধ্যে একদম পরিষ্কার ভাষায় তার পিতার কথিত ইলহামের উদ্ধৃতিতে সারা বিশ্ব কব্জায় নেয়ার ইংগিত উল্লেখ রয়েছে। এই সম্পর্কে মির্যা কাদিয়ানীর রচিত ‘তাযকিরাতুশ শাহাদাতাইন‘ (বাংলায় প্রকাশকাল, ২৭ শে মে ২০০৯ ইং) পৃষ্ঠা নং ৮০ দেখা যেতে পারে।

মির্যা কাদিয়ানীর রচনা

সম্প্রতি পাকিস্তানের সাড়ে ৯ বর্গ মাইল শহর চনাবনগরের দিকে তাকিয়ে দেখলেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, কাদিয়ানীবাদ সেখানে কত ধূর্ততার সাথে আরেকটি ছায়া-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে; কিভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পূর্ণ বাহিরে থেকেই নিজেস্ব ফোর্স-মিলিটারি দ্বারা সব কিছু পরিচালনা করছে, জানলে চোখ কপালে উঠে যাবে! জানতে এখনি গুগল করতে পারেন! অতএব, কাদিয়ানীবাদকে যারাই এতদিন শুধুই ধর্মীয়-ইস্যু ভেবে চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন এখন নিশ্চয়ই অনুভব করবেন যে, এদের ব্যাপারটি ধর্মীয় ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং খতরনাক রাজনৈতিক ইস্যুতেও বিশ্লেষণের দাবী রাখে।

২- আন্তর্জাতিক বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া’র তথ্যমতে বর্তমানে তারা সারা দুনিয়ার প্রায় ৬৬টি রাষ্ট্রে পরাশক্তিগুলোর লেজুড়বৃত্তি হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। লাহোরি জামাত রয়েছে ১৯টি রাষ্ট্রে। কোথাও ১টি পরিবার, কোথাও মাত্র ৫/১০টি পরিবার। উদাহরণ স্বরূপ প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলীয় দ্বীপ ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশ ‘মার্শাল আইসলেন্ড‘। ২০০৯ সাল পর্যন্ত সেখানে কাদিয়ানী জামাতের সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ জন। উইকিপিডিয়ায় সেই দেশটিও তালিকাভুক্ত হওয়া থেকে বাদ পড়েনি। যাইহোক, তাদের নেতারা গণমাধ্যমে হরহামেশাই নিজেদেরকে নির্যাতিত-নিপীড়িত হিসেবে জাহির করে যাতে খুব শীঘ্রই বিশ্বব্যাপী মানুষের সহানুভূতি লাভ করতে পারে। অনেকটা ইহুদিবাদী হলোকাস্ট চরিত্রেরই নব্য-সংস্করণ। এর উদ্দেশ্য, বিশ্বের পরাশক্তিগুলো যেন তাদের পুনর্বাসনের জন্যও সেইম ইহুদীদের মতই আরেকটি পৃথক মানচিত্র ও আলাদা রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। তার প্রমাণ অনেক দেয়া যাবে।

  • উল্লেখ্য, ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। তখন জার্মানীর নাৎসি নেতা প্রেসিডেন্ট এডলফ হিটলার প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদী নিধন করে। ব্রিটিশরা ইহুদী নিধনকে সহজে তুলে ধরার জন্য ‘হলোকাস্ট’ শব্দটি ব্যবহার করা শুরু করে। হলোকাস্ট ইহুদীদের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ট্র্যাজেডি হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এই হলোকাস্টের ঘটনা ইহুদীদের জন্য এমন এক রাষ্ট্রের উত্থানের সূচনার পয়েন্ট হয়ে ওঠে যেখানে ইহুদীরা সুরক্ষা এবং শান্তি খুঁজে পেতে পারে।

জ্ঞানীদের নিশ্চয়ই জানা আছে যে, ১৮ ই জুলাই ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রিয়া সাহা যখন আমেরিকায় গিয়ে রাষ্ট্র বিরোধী প্রপাগাণ্ডা ছড়িয়েছিল সেই সময়টিতেই পাকিস্তানের চনাবনগরের আব্দুশ শকুর নামক একজন কাদিয়ানী-ও আমেরিকা গিয়েছিল এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিকট পাকিস্তান গভমেন্টের বিরুদ্ধে প্রিয়া সাহা’র অনুরূপ জঘন্য মিথ্যাচার করেছিল। মুসলিমরা নাকি সেখানে তাদের বাড়ীঘর এবং দোকানপাট জ্বালিয়ে দিয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি! এরা অদূর-ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধেও একেকজন প্রিয়া সাহার ভুমিকায় উত্তীর্ণ হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিকট পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে একজন পাকিস্তানি কাদিয়ানীর প্রপাগাণ্ডামূলক অভিযোগ দায়ের করার দৃশ্য, তাং ১৮ জুলাই ২০১৯ ইং

সেযাইহোক, পশ্চিমা দুনিয়ার দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে। কারণ একে তো এই দেশটি নানা পীর-তরিকার উর্বর ভূমিতে পরিণত। ফলে এই জায়গার সহজ সরল মানুষগুলোকে প্রতারণামূলক “তরিকা”-এর আড়ালে সুকৌশলে ধর্মান্তরিত করাও সম্ভব। আর এই সুযোগটাই ‘ঈসায়ী-খ্রিস্টানরা’ তরিকাবন্দি নামে যেমন লুপে নিয়েছে; তেমনি কাদিয়ানীবাদের মিশনীরাও নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধিতে সেটি কাজে লাগাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, এই ক্ষেত্রে পশ্চিমা দুনিয়ার ইন্টারেস্ট (ফায়দা) হল, ইসলামের মোড়কে তাদেরই পছন্দের একখানা “নকল ইসলাম” প্রতিষ্ঠা করা, যেমনটি ইহুদীবাদী সাধু সেন্ট পৌল ইঞ্জিলের পরিবর্তে বাইবেল রচনা করে গোটা খ্রিস্টানিটির স্বরূপ বদলে ফেলেছিল। অবাক করা ব্যাপার হল, কাদিয়ানীবাদের নিকটেও পশ্চিমা দুনিয়ার পছন্দের “নকল ইসলাম” এর অপর নাম দেয়া হয়েছে ‘ইসলাম আহমদীয়ত’। পশ্চিমা দুনিয়ার পক্ষে এই কাজ কোনো দুরূহ নয় এই জন্যই যে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কাদিয়ানীবাদের পরমবন্ধু। যে দেশটির “কাদিয়ান” (পাঞ্জাব) গ্রাম তাদের তীর্থস্থানও। এখানে বলে রাখা দরকার, পশ্চিমা দুনিয়ার দৃষ্টি ইতিপূর্বে যদিও পাকিস্তানের দিকে ছিল কিন্তু ৭ই সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে পাক সরকার তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম সংখ্যালঘু ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে পশ্চিমারা সেই দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেয় আমাদের দিকে।

ইসরায়েলে নিয়োজিত কাদিয়ানী আমীর (ডানে কালোটুপি) শরীফ উদাহ -এর সাথে ভারত সরকার নরেন্দ্র মোদির করমর্দন। পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট নেতা নিয়াহু।

৩- কাদিয়ানীবাদের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী (১৮৩৯-১৯০৮)। তারই বিভিন্ন রচনাবলী হতে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় যে, সে ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষাকারী ও একনিষ্ঠ এজেন্ট হিসেবে জীবনোৎসর্গকারী ছিল। এর বহু প্রমাণ দেয়া যাবে। তারই ভাষ্যমতে, “আমি বরাবরই আমার মত প্রকাশ করেছি যে, ইসলামের দুইটি অংশ। প্রথমত, আল্লাহর আনুগত্য করা। দ্বিতীয়ত, এই (ব্রিটিশ) সরকারের আনুগত্য করা যে নিরাপত্তা দিয়েছে।” (মির্যা কাদিয়ানীর রচনাসমগ্র ‘রূহানী খাযায়েন’ খ-৬/পৃ-৩৮০)।

অপ্রিয় হলেও সত্য, মির্যা কাদিয়ানী নিজেকে ব্রিটিশের লাগানো চারাগাছ বলে পরিচিত হতেও পছন্দ করতেন। এ সম্পর্কে তার সম্পূর্ণ বক্তব্যটি এরকম,

“নিজেদের হাতে রোপিত এই চারাগাছটির ব্যাপারে খুব সতর্কতা ও অনুসন্ধানের সাথে অগ্রসর হবেন এবং আপনার অধীনস্তদের বলবেন তারা যেন এই পরিবারের ত্যাগ ও নিষ্ঠার কথা মনে করে আমার দলের প্রতি সদয় দৃষ্টি জ্ঞাপন করেন। আমাদের পরিবার ইংরেজ সরকারের কল্যাণে নিজেদের খুন বইয়ে দিতে ও জীবন দিতেও দ্বিধা করেনি আর না এখনো দ্বিধা করছে।” (মাজমু’আয়ে ইশতিহারাত খ-৩/পৃ-২১-২২ নতুন এডিশন ও অনলাইন ভার্সন)।

এতেই বুঝা যায় যে, ব্রিটিশদের জন্য তার আত্ম-ত্যাগের কোনো শেষ ছিলনা। কাজেই ব্রিটিশরা অতটা নিমকহারাম নয় যে, তারা তার সেই ত্যাগের কথা ভুলে যাবে, কোনো প্রতিদান দেবেনা! আর তাই আরেকটি ‘বেলফোর ঘোষণা’ চুক্তি হওয়াও কোনো বিচিত্র নয়।

৪- বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ডেভিড ক্যামেরন সরকারের কনজার্ভেটিভ পার্টিতে প্রভাবশালী এমনও অনেকে রয়েছে যারা কাদিয়ানীবাদের শুধু সমর্থক নয়, বরং অনুসারীও। লর্ড তারিক মাহমুদ আহমদ। (জন্ম ৩ই এপ্রিল ১৯৬৮ইং, লন্ডন) তাদেরই মধ্য হতে অন্যতম। তার পৈত্রিক নিবাস ভারতের পাঞ্জাব। তিনি যুক্তরাজ্যের ডেভিড ক্যামেরন সরকারের কনজার্ভেটিভ পার্টির একজন মন্ত্রী। তিনি জন্মসূত্রে কাদিয়ানী এবং ব্রিটেনের কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের একজন সদস্য। একই সাথে ব্রিটেনের দক্ষিণ এশিয়া, জাতিসঙ্ঘ ও কমনওয়েলথ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীও।

লর্ড তারেক মাহমুদ আহমদে

উইকিপিডিয়ার তথ্যানুসারে তিনি সাধারণ কোনো কাদিয়ানী নন, বরং তিনি কাদিয়ানী জামাতের একজন রক্ষণশীল ঘরানার ব্যক্তি এবং তিনি ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সহ-সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এএমওয়াই নামের একটি ব্রিটিশ ‘কাদিয়ানী যুব সংগঠনের‘। এই লর্ড তারিক মাহমুদ বাংলাদেশে যতবারই এসেছেন তিনি ততবারই ঢাকার বকশিবাজারস্থ কাদিয়ানীবাদের আস্তানা পরিদর্শন করেছেন, কাদিয়ানী নেতাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এখানে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, লর্ড তারিক মাহমুদ বাংলাদেশে এত ঘনঘন কী উদ্দেশ্যে সফর করছেন? এর অন্তরালে সাবেক যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র সচিব আর্থার জেমস বেলফোরের অনুরূপ নতুন কোনো নীল নকশার ইংগিত নয় তো?

৫- কাদিয়ানীবাদের মৌলিক বিশ্বাস হচ্ছে, তাদের মতবাদের বাহিরে কেউই মুসলমান নন। কাদিয়ানীবাদের কথিত দ্বিতীয় খলীফা মির্যাপুত্র বশির উদ্দিন মাহমুদের রচনা থেকে তুলে দিচ্ছি, দেখুন! তিনি লিখেছেন, کل مسلمان جو حضرت مسیح موعود کی بیعت میں شامل نہیں ہوئے خواہ انہوں نے حضرت مسیح موعود کا نام بھی نہیں سنا وہ کافر اور اسلام سے خارج ہیں۔ (آئینہ صداقت ; انوار العلوم) অর্থাৎ সকল মুসলমান, যারা হযরত মাসীহে মওউদ (মির্যা গোলাম আহমদ)-এর বাইয়েতে শামিল হয়নি, চাই তারা হযরত মাসীহে মওউদের নামও না শুনে থাকুক; সবাই কাফের এবং ইসলাম থেকে খারিজ। (আয়নায়ে সাদাকাত, আনওয়ারুল উলূম ৬/১১০; লিখক মির্যা বশির উদ্দিন মাহমুদ)।

পশ্চিমা বিশ্ব মূলত এই জন্যই এদেরকে দুনিয়ার সামনে ‘মূলধারার মুসলমান’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে চায় যাতে কনভার্টেট মুসলিমরা “কাদিয়ানীবাদ”-কেই মূলধারার ইসলাম মনে করে প্রতারিত হয় এবং একটি অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে যেন আরেকটি অন্ধকারে ঢুকে পড়ে। ভেবে দেখুন তো, এটি ইসলামের বিরুদ্ধে কত বড় খতরনাক চক্রান্ত! কত নিকৃষ্ট নিরব ষড়যন্ত্র! ব্রিটেনে এমন কিছু অমুসলিম কাদিয়ানীবাদকে “ইসলাম” ভেবে প্রতারিত হওয়ার একটি ভিডিও দেখুন। লিংক – ক্লিক

পরিশেষে, পশ্চিমা দুনিয়া কাদিয়ানীবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করাই প্রকারান্তরে ইসলাম এবং মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার শামিল। একথা আমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারব ততই আমাদের জন্য বিপদ আসান হবে। প্রিয় দেশ-প্রেমিকবন্ধুরা! আমি বিষয়টির প্রতি সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সংগ্রামী ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। যাতে অন্তত দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় হলেও বিষয়টিকে সিরিয়াসভাবে নেন। বলে রাখতে চাই, আমি এই প্রিয় মাতৃভূমিকে ভালোবাসি বলেই লিখাটি লিখতে বাধ্য হয়েছি। আল্লাহর নিকট দোয়া করছি, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সমস্ত চক্রান্তের শিকড় উপড়ে ফেলতে আমরা যেন সব সময় তৈরি থাকতে পারি, ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে সব ধরণের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করুন। আমীন। (লিখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন)।

ছবি : বেলফোর ও তার প্রেরিত চিঠি। উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

মির্যা কাদিয়ানী কি ইসলামের খাদেম?

0

মির্যা কাদিয়ানী কি নিজেকে ইসলামের খাদেম বা সেবক বলেই মনে করতেন?

প্রশ্নকর্তা : কাদিয়ানের মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর অনুসারীরা তাকে ইসলামের খাদেম বা সেবক বলে আখ্যা দিয়ে থাকে। এখন জানার বিষয় হল, মির্যা গোলাম আহমদ সাহেব নিজেকে সত্যিই কি এই রকমটাই মনে করতেন?

উত্তরদাতা : অপ্রিয় হলেও সত্য এই যে, মির্যা কাদিয়ানী সাহেব নিজেকে “খাদেমে ইসলাম” বা ইসলামের সেবক” মনে করতেন না, একথা তারই পুত্রধন মির্যা বশির আহমদ এম.এ সাহেব তার সীরাতে মাহদীতে লিখে রেখেছেন। ডাক্তার আব্দুল হাকিমখান মির্যা কাদিয়ানীর ২০ বছরের ঘনিষ্ট সহচর ছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে মির্যাকে মিথ্যুক আখ্যা দিয়ে ইসলামে ফিরে আসেন। ডাক্তার আব্দুল হাকিম সাহেব কাদিয়ানী থাকাকালীন মির্যাকে উদ্দেশ্য করে পত্র লিখেছিলেন। মির্যা সাহেব সেই পত্রে উল্লিখিত آپكا وجود خادم اسلام هے نه كه عين اسلام (আপনার আবির্ভাব ইসলামের একজন সেবক হিসেবেই, ইসলামের মূল হিসেবে নয়) ডাক্তার সাহেবের কথাটিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বরং নিজেকে একজন روح اسلام বা ইসলামের প্রাণ তথা মূল বলেই আখ্যা দিয়ে প্রতিউত্তর লিখেছেন। এইকথা তারই পুত্রের বইতে লিখা আছে। (দেখুন, সীরাতে মাহদী বর্ণনা নং ৬৬৫)।

এখন তার অনুসারীদের উদ্দেশ্যে আমার জিজ্ঞাসা, এমতাবস্থায় আপনারা কিজন্য কথায় কথায় তাকে ইসলামের একজন “সেবক” বলে আখ্যা দেন এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর একজন দাস বলেন? কোনো নবীর দাস কি ঐ নবীর আনীত দ্বীন ও শরীয়তের প্রাণ হতে পারে? জ্ঞানীদের নিশ্চয়ই ভাবিয়ে তুলবে।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

ইমাম মাহদীর নিকট প্রথম বাইয়েত নেয়ার সংখ্যাটি তিনশত তের হওয়া!

ইমাম মাহদীর নিকট প্রথম বাইয়েত নেবেন যারা তাদের সংখ্যাটি কত? তিনশত তের? এইধরনের কোনো সহীহ হাদীস কি রয়েছে? আজকে এই সম্পর্কে প্রামাণ্য কিছু আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ। প্রথমে এই সম্পর্কে হাদীসটির আরবী পাঠ নিচে দেখুন,

ইমাম নু’আইম বিন হাম্মাদ (রহ.) সংকলিত ‘আল ফিতান‘ গ্রন্থে হাদীসটি কয়েকটি সনদেই বর্ণিত আছে। সবগুলো সনদই জাল, মিথ্যা আর দুর্বল বলেই উল্লেখ রয়েছে। এখানে তন্মধ্য হতে যে বর্ণনাটি উল্লেখ করছি সেটি উক্ত ‘আল ফিতান’ এর হাদীস নং ৯৮৬ এবং ইমাম হাকেম (রহ.) এর ‘আল মুস্তাদরাক‘ এর ৮৫৩৭ নং হাদীস। হাদীসটির সনদ বা বর্ণনাসূত্র সহ উল্লেখ করছি, ইমাম নু’আইম বিন হাম্মাদ বলেন,

أبي يوسف المقدسي ، عَنْ عَبْدِ الْمَلِكِ بْنِ أَبِي سُلَيْمَانَ ، عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، عَنْ جَدِّهِ ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: فِي ذِي الْقَعْدَةِ تُجَاذِبُ الْقَبَائِلُ وَتُغَادِرُ ، فَيُنْهَبُ الْحَاجُّ ، فَتَكُونُ مَلْحَمَةٌ بِمِنًى ، يَكْثُرُ فِيهَا الْقَتْلَى ، وَيَسِيلُ فِيهَا الدِّمَاءُ ، حَتَّى تَسِيلَ دِمَاؤُهُمْ عَلَى عَقَبَةِ الْجَمْرَةِ ، وَحَتَّى يَهْرُبَ صَاحِبُهُمْ فَيَأْتِي بَيْنَ الرُّكْنِ وَالْمَقَامِ ، فَيُبَايَعُ وَهُوَ كَارِهٌ ، يُقَالُ لَهُ: إِنْ أَبِيتَ ضَرَبْنَا عُنُقَكَ ، يُبَايِعُهُ مِثْلُ عِدَّةِ أَهْلِ بَدْرٍ يَرْضَى عَنْهُمْ سَاكِنُ السَّمَاءِ وَسَاكِنُ الْأَرْضِ

অর্থাৎ আবু নু’আইম বিন হাম্মাদ এটি আবু ইউসুফ আল মাক্বদিসি থেকে তিনি আবুল মালেক ইবনে আবী সুলাইমান থেকে, তিনি আমর বিন শুয়াইব থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, আর তার পিতা তার দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ‘জিলক্বদ মাসে গোত্রে গোত্রে বিবাদ শুরু হবে। সে বছর হজ্ব নিষিদ্ধ থাকবে। মীনায় তীব্র লড়াই হবে। অধিকাংশ মানুষ তাতে মারা যাবে। প্রচুর রক্ত প্রবাহিত হবে। এমনকি রক্ত জামরাহ পর্যন্ত চলে আসবে। এ খুন চলতে থাকবে যতক্ষণ না মীনা থেকে লোকজন পালিয়ে যায়। তখন তিনি (ইমাম আল মাহদী) রুকনে ইয়ামিনী এবং মাকামে ইবরাহীমের মাঝখানে থাকবেন। তারপর তাঁর হাতে বাইয়েত হবে লোকজন। যদিও তিনি তা অপছন্দ করেন। তখন তাকে বলা হবে, যদি তুমি বাইয়েত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাও তাহলে তোমাকে হত্যা করা হবে। তখন তিনি বদর সংখ্যক (৩১৩জন) অনুসারীকে বাইয়েত করবেন। তার উপর আসমান ও জমিনের অধিবাসীগণ সন্তুষ্ট হবেন। (কিতাবুল ফিতান, হাদীস নং-৯৮৬)।

হাদীসের সনদ বা সূত্র বিশ্লেষণ :
উল্লিখিত হাদীসের বর্ণনাসূত্রে এক ব্যক্তি হলেন আবু ইউসুফ আল মাক্বদিসি। তার প্রকৃত নাম, মুহাম্মদ ইবনে আব্দুর রহমান আল মাক্বদিসি। ইমাম যাহাবী তার সম্পর্কে লিখেছেন هو متهم ، ليس بثقة অর্থাৎ সে (মিথ্যাবাদী হিসেবে) অভিযুক্ত, সে বিশ্বস্ত নয়। (মীযানুল ই’তিদাল রাবী নং ৭৮৪৯)। ইমাম আবুল ফাতহ আল আযদী (রহ.) বলেছেন كذاب، متروك الحديث অর্থাৎ সে ছিল একজন বড় মিথ্যাবাদী, তার বর্ণনাকৃত হাদীস মাতরূক তথা অগ্রহণযোগ্য। (সূত্র, ঐ)। সনদের দ্বিতীয় ব্যক্তি মুহাম্মদ ইবনে উবায়দুল্লাহ আল আ’র‍যামী। তার সম্পর্কে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেছেন ترك الناس حديثه অর্থাৎ লোকেরা তার হাদীস পরিত্যাগ করেছে। (মীযানুল ই’তিদাল রাবী নং ৭৯০৫)। ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (রহ.) বলেছেন لا يكتب حديثه অর্থাৎ তার হাদীস লিখাযোগ্য নয়। (সূত্র, ঐ)।

একটি প্রশ্নের উত্তর চাচ্ছি : আহমদী বা কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের নিরপেক্ষ বিবেকের নিকট একটি প্রশ্ন, আপনাদের মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী সাহেবের নানা বইপুস্তকেও উক্ত হাদীসটির উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে পুরোপুরি উল্লেখ পাওয়া যায়না, আবার যতটুকু পাওয়া যায় ততটুকুও গোঁজামিলে ভরা। যেমন তিনি লিখেছেন, “যেহেতু সহীহ হাদীসে আছে, ইমাম মাহদীর কাছে একটি কিতাব থাকবে যার মধ্যে ৩১৩ জন সাথীর নাম থাকবে। সে ভবিষ্যতবাণী আজ পূরণ হল।” (রূহানী খাযায়েন ১১:৩২৪)। কিন্তু এধরণের কোনো সহীহ কিংবা জঈফ হাদীস থাকাটাও প্রমাণিত নয়। এখন কথা হল, মির্যা সাহেব কিজন্য উপরিউক্ত সম্পূর্ণ হাদীসটি উল্লেখ না করেই অতিব সংক্ষেপে ও খণ্ডিতাংশ উল্লেখ করে গেছেন তা দেরিতে হলেও নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন। যদিও এই হাদীসটি সনদের বিচারে মোটেও অথেনটিক নয়, পুরোপুরি প্রত্যাখ্যাত কিন্তু আমি সেদিকে এই মুহূর্তে যেতে চাচ্ছিনা। এখানে আমার বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, একজন ইমাম মাহদী দাবীদার কিভাবে পারলেন, এখানেও পাঠককে ধোকা দিতে? পুরো হাদীসটি উল্লেখ করা হলে পাঠকবৃন্দ কি কখনোই মির্যা গোলাম আহমদ সাহেবকে হাদীসের ফরমান অনুযায়ী ইমাম মাহদী বিশ্বাস করবে? কখনোই না। কেননা, তখন প্রশ্ন আসবে যে, মির্যা সাহেবই যদি হাদীসের ফরমান অনুযায়ী প্রকৃতপক্ষে ইমাম মাহদী হন তবে তিনি কিজন্য উক্ত বাইয়েতটি রুকন এবং মাকামে ইবরাহীমের মধ্যবর্তী স্থানে সম্পন্ন করলেন না? অথচ মির্যা সাহেব বাইয়েত নিয়েছিলেন পাকিস্তানের শিয়ালকোট জেলায় ১৮৮৯ সালের দিকে। তাও তিনি তখন তার উক্ত বাইয়েত মাহদীয়তের উপর নেননি, নিয়েছিলেন তার মুজাদ্দিয়তের উপর। অথচ ইমাম মাহদী প্রথমে মুজাদ্দিয়তের উপর বাইয়েত নেবেন, এমন কোনো কথা কোথাও ইংগিতেও নেই। অন্ততপক্ষে এই একটি মানদণ্ডেও মির্যা গোলাম আহমদ এর মাহদী দাবী মিথ্যা আর প্রতারণা সাব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। মির্যা গোলাম আহমদ সাহেব মূলত এইজন্যই পুরো হাদীসটি উল্লেখ করার সাহস পাননি, কৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন। এখন এর চাইতে বড় জালিয়াতি আর প্রতারণা আর কী হতে পারে?

আপনার নিরপেক্ষ বিবেক কী বলে? এমন প্রতারক আদৌ কি ইমাম মাহদী দাবীতে সত্যবাদী হবেন? মির্যা কাদিয়ানীর প্রথম বাইয়েত মাহদীয়তের উপর ছিলনা, ছিল মুজাদ্দিয়তের উপর। ১৮৮৯ সালে। প্রমাণ দেখুন,

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

আহমদীয়া অমুসলিম জামা’ত এর ধর্মবিশ্বাস

এক নজরে কাদিয়ানী ধর্মবিশ্বাস

১৯০৩ এবং ১৯০৪ সালে পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলার সুপ্রিমকোর্টের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মৌলভি করম উদ্দীন জিহলমী সাহেবের সাথে দ্বিপাক্ষিক কথোপকথন অবস্থায় ও মাননীয় ম্যাজিস্ট্রেট জনাব লালা আথমারাম (لالہ آتمارام) এর সম্মুখে মির্যা কাদিয়ানী নিজের ধর্মমত নিম্নরূপ ব্যক্ত করেন যা তারই কথিত ‘কামরুল আম্বিয়া’ উপাধীপ্রাপ্ত পুত্রধন মির্যা বশির আহমদ এম.এ রচিত সীরাতে মাহদী বইয়ের তৃতীয় খন্ডের ৬৯৫ নং বর্ণনা অনুসারে নিচে উল্লেখ করছি :

মির্যা কাদিয়ানী বলেছেন :-
১- ঈসা (আ:) মারা গেছেন।
২- ঈসা (আ:) ক্রুসবিদ্ধ হয়েছেন এবং তাঁকে বেহুঁশ অবস্থায় শূলি থেকে নামানো হয়েছিল।
৩- ঈসা (আ:) সশরীরে আকাশে যাননি।
৪- ঈসা (আ:) আকাশ থেকে নাযিল হবেন না এবং কারো সাথে লড়াইও করবেন না।
৫- এমন কোনো মাহদী হবেনা যিনি দুনিয়ায় এসে খ্রিষ্টান আর অন্যান্য বিধর্মীর সাথে যুদ্ধ করবেন এবং অমুসলিমদেরকে ক্বতল (হত্যা) করবে ও ইসলামের বিজয় আনয়ন করবে।
৬- এই যুগে (শেষ যামানায়) জিহাদ করা অর্থাৎ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে লড়াই করা সম্পূর্ণ হারাম।
৭- এটা একদমই ভুল কথা যে, মসীহ মওঊদ (ঈসা) এসে ক্রুস ভাঙ্গবেন এবং শুয়োর মারবেন।
৮- আমি মির্যা গোলাম আহমদ মসীহ মওঊদ, মাহদী, ইমামুযযামান, মুজাদ্দিদ, প্রতিবিম্ব স্বরূপ রাসূল এবং আল্লাহর নবী এবং আমার উপর খোদার ওহী নাযিল হয়ে থাকে।
৯- মসীহ মওঊদ (মির্যা কাদিয়ানী) এই উম্মতের বিগত সমস্ত আউলিয়া হতে আফদ্বল (শ্রেষ্ঠ)।
১০- খোদাতালা মসীহ মওউদ (মির্যা কাদিয়ানী)’র সত্তায় সমস্ত নবীর সিফাত (গুণাবলী) এবং ফজিলত (শ্রেষ্ঠত্ব) একত্র করে দিয়েছেন।
১১- কাফের জাহান্নামে সর্বদা থাকবেনা।
১২- ইমাম মাহদী কুরাইশ বংশীয় হবেনা।
১৩- উম্মতে মুহাম্মদিয়ার মসীহ আর ইসরাইলী মসীহ দুইজনই ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি এবং মসীহে মুহাম্মদী (মির্যা কাদিয়ানী) তিনি ইসরাইলী মসীহ’র (হযরত ঈসা আঃ) চেয়ে আফদ্বল (শ্রেষ্ঠ)।
১৪- হযরত ঈসা (আ:) তিনি প্রকৃতপক্ষে কোনো মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করেননি।
১৫- হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর মেরাজ সশরীরে (জাগ্রত অবস্থায়) হয়নি।
১৬- খোদাতালার ওহী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যায়নি। (অনুবাদ সমাপ্ত হল)।

আশাকরি এইটুকুতেই পরিষ্কার হয়ে গেল যে, শেষনবী মুহাম্মদে আরাবী (সা:)-এর আনীত পবিত্র ইসলামের সুপ্রতিষ্ঠিত আক্বীদার মুকাবিলায় কাদিয়ানী আক্বীদার বীভৎস রূপটা কেমন! (সীরাতে মাহদী বইয়ের প্রদত্ত স্ক্রিনশট হতে উপরের কথাগুলো মিলিয়ে নিন)।

প্রামাণ্য স্ক্যানকপি

শেষকথা, কাদিয়ানী জামাতের মুরুব্বী পর্যায়ের উর্ধতন দায়িত্বশীলদের অনেকেই প্রতিনিয়ত একটি মিথ্যা বারবার উচ্চারণ করে থাকে, তা হল তাদের আর আমাদের (মুসলমানদের) মাঝে নাকি মৌলিক কোনো পার্থক্যই নেই; বেশি থেকে বেশি পার্থক্য শুধুই এটি যে, আগমনকারী ইমাম মাহদীকে তারা মেনে নিয়েছে আর বিপরীতে আমরা তাকে মেনে নিইনি! এবার চিন্তা করে দেখুন, কত নিকৃষ্ট মিথ্যাবাদী আর প্রতারক এরা। উল্লেখ্য, হযরত মুহাম্মদ (সা.) যেই ইমাম মাহদী সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী দিয়ে গেছেন এবং সহীহ সূত্রে বর্ণিত হাদীস সমূহ হতে ইমাম মাহদীর নাম, পিতার নাম, বংশপরিচয়, জন্মস্থান এবং হিজরত ও বাইয়েত সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে তার কোনো একটির সাথেও কাদিয়ানের সিজোফ্রেনিয়া রোগী মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর মিল পাওয়া যায়না। প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদী সম্পর্কে জানুন Click

অনুবাদক, প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী।

মির্যা কাদিয়ানী সত্যিই কি খোদা দাবীও করেছিল?

মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী এবং সিজোফ্রেনিয়া রোগ ও খোদা দাবী প্রসঙ্গে,

খোদা দাবীঃ

একজন মানুষ নিজেকে ‘খোদা‘ দাবী করতে পারে কিভাবে তা বুঝে আসেনা। হ্যাঁ, ইতিহাস সাক্ষী, এইরূপ দাবী ইতিপূর্বে অনেকেই করেছিল। যেমন পবিত্র কুরআনে ফেরাউন সম্পর্কে উল্লেখ আছে فَقَالَ أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَىٰ অর্থাৎ সে বলেছিল, আমি তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ একজন প্রভু। (সূরা নাযেয়াত ২৪)। তবে সিজোফ্রেনিয়া রোগ বিশেষজ্ঞগণ লিখে গেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত হয় তখন সে বেশ কিছু অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। তার কথাবার্তায় অসঙ্গতি দেখা দেবে, নিজকে নিজ সর্বদা নিরাপত্তাহীন অনুভব করবে, অন্যকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখবে। গায়েব থেকে অদৃশ্যের আওয়াজ শুনার দাবী করবে যা অন্যরা শুনতে পায় না। এই ধরনের রোগী যদি খুব বেশি ট্যালেন্টপুল (মেধাবী) হয় তখন সে নিজেকে খোদার প্রেরিত পুরুষ, নবী হবার দাবীও করে; কখনো কখনো খোদার প্রতিচ্ছবি কিংবা হুবহু খোদা দাবীও করে বসে।

সিজোফ্রেনিয়া রোগীঃ

সিজোফ্রেনিয়া শব্দটি ইংরেজি আর উর্দুতে এর প্রতিশব্দ হল মিরাক্ব কিবা মালিখোঁলিয়া। আরবী-বাংলা অভিধানে মিরাক্ব অর্থ ‘মস্তিষ্কবিকৃতি‘ লিখা আছে। এই রোগ বিশেষজ্ঞগণ আজ থেকে প্রায় ৬শত বছর আগেই লিখে গেছেন যে, এই রোগে আক্রান্তদের অধিকাংশই অদ্ভুত ধরণের আচরণ প্রদর্শন করতে থাকে। তন্মধ্যে নিজেকে ‘খোদা’ দাবী অন্যতম। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এশিয়ার উত্তর-পূর্ব উজবেকিস্তানের জারেফশান নদী উপত্যকায় অবস্থিত প্রসিদ্ধ শহর সমরকন্দ নগরে জন্মগ্রহণকারী বিশিষ্ট হেকিম বুরহান উদ্দীন নাফীস [মৃত. ১৪৩৮ খ্রি.] (নাফীস আল কিরমানী নামে প্রসিদ্ধ)ও একই তথ্য দিয়ে গেছেন। হেকিম নাফীস আল কিরমানী কর্তৃক বিরচিত ‘শরহুল আছবাব ওয়াল আ’লামাত‘ (شرح الاسباب و العلامات) খ-১ পৃ-৬৭-৭০ বইটি দ্রষ্টব্য।

ইরানের খোরাসান শহরের অধিবাসী হাকিম মুহাম্মদ আ’যম খান চিশতীও একই কথা লিখে গেছেন। তার রচিত একছীরে আ’যম (اكسير اعظم) বইটির খ-১ পৃ-১৮৮ দ্রষ্টব্য; فصل امراض دماغ طريق تشخيص ماليخوليا বা সিজোফ্রেনিয়া রোগনির্ণয়-এর পদ্ধতি ও মস্তিষ্ক ব্যাধীর পরিচ্ছেদ দেখা যেতে পারে। এখন একছীরে আ’যম নামক সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থকার সম্পর্কে একটু লিখতে চাই!

হাকিম মুহাম্মদ আ’যম খান চিশতী (মৃত্যু ১৩২০ হিজরী মুতাবিক ১৯০২ ইং), যিনি নাজিম জাহান নামে পরিচিত। তিনি চিকিৎসা-সম্রাট হাকিম শাহ আজম খান সিস্তানির পুত্র। তিনি কবি, সুপ্রসিদ্ধ ইউনানী চিকিৎসক, উপমহাদেশীয় ইসলামী জগতের ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম বিরল ব্যক্তিত্ব। তার প্রধান জন্মভূমি ছিল, সিস্তান খোরাসান। তার প্রপিতামহ হাকিম মুহাম্মদ কাজেমখান খোরাসান (ইরান) থেকে কাবুলে হিজরত করেছিলেন। হাকিম মুহাম্মদ আজম খানের বয়স যখন মাত্র ১৬ বছর, তখন তার পিতা মারা যান। তিনি তার পিতা এবং অন্যান্য উস্তাদগণের কাছ থেকে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন করেন এবং অনেক মূল্যবান অবদান রেখে যান। একছীরে আ’যম (৫ খণ্ডে) কিতাবটি তারই চিকিৎসা শাস্ত্রে অন্যতম। বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন।

অপ্রিয় হলেও সত্য, মির্যা কাদিয়ানীর দ্বিতীয় স্ত্রী নুসরাত জাহানের সংসারে ১৮৮৮ সালে জন্মগ্রহণকারী প্রথম ছেলে বশিরে আওয়াল এর মৃত্যুর পরপরই স্ত্রীর সাক্ষ্যমতে মির্যা গোলাম আহমদ মিরাক্ব তথা সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে যান। আর এই তথ্যটি মির্যার মেঝো ছেলে মির্যা বশির আহমদ এম.এ স্বীয় রচনা ‘সীরাতে মাহদী‘ এর ১ম খন্ডের বর্ণনা নং ১৯ এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন।

আধুনিক অনেক কাদিয়ানী এখানে উল্লিখিত বিষয়গুলো এখন আর অস্বীকার করেন না। কেননা গোটা অনলাইনজুড়ে সার্চ দিলেই মির্যা কাদিয়ানীর রচনাবলী (উর্দূ, বাংলায়) সহজে পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে সুস্পষ্টভাবে মির্যা গোলাম আহমদ (মৃত. ১৯০৮ইং)-এর সিজোফ্রেনিয়া, হিস্টিরিয়া এবং মৃগী রোগ থাকার বিষয়গুলো তারই লিখনি দ্বারা প্রমাণিত। এইজন্য তার ‘হাকীকাতুল ওহী‘ (পৃষ্ঠা নং ৩০৫, নভেম্বর ১৯৯৯ইং) বইটিও দেখা যেতে পারে। যাইহোক মির্যা গোলাম আহমদ সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার ব্যাপারটি একদমই সত্যি, সেখানে কারো জন্য সন্দেহ করার মোটেও সুযোগ নেই।

আর সেই মিরাক্ব বা সিজোফ্রেনিয়া রোগের অন্যতম উপসর্গ ছিল মির্যা গোলাম আহমদ এর ‘খোদা‘ হবার দাবী। এবার তারই বই থেকে স্ক্রিনশট সহ পুরো বৃত্তান্ত অনুবাদ আর উর্দু ইবারতের উচ্চারণ সহকারে নিচে তুলে ধরছি। দেখুন,

তিনি তার ‘কিতাবুল বারিয়্যাহ’ গ্রন্থে লিখেছেন,

‘میں نے اپنے ایک کشف میں دیکھا کہ میں خود خدا ہوں اور یقین کیا کہ وہی ہوں اور میرا اپنا کوئی ارادہ اور کوئی خیال اور کوئی عمل نہیں رہا اور میں ایک سوراخ دار برتن کی طرح ہو گیا ہوں’

“মে নে আপনে এক কাশফ মে দেখহা কে, মে খোদা হোঁ অওর একীন কিয়া কে ও-হি হোঁ; অওর মেরা কুয়ি ইরাদা অওর কুয়ি খিয়াল অওর কুয়ি আমল নেহি রাহা অওর মে এক ছুরাখ দার বরতন কি তরাহ হো-গিয়া হোঁ…।”

অর্থাৎ আর আমি নিজেকে কাশফ (অতি-জাগ্রত ধ্যান) অবস্থায় হুবহু খোদা হিসেবে দেখলাম এবং নিশ্চিত হলাম যে, নিশ্চিতই আমি তাই। তখন আমার কোনো ইচ্ছা, আশঙ্কা আর নিজের কোনো কর্মই অবশিষ্ট থাকেনি। আর আমি তখন একখানা নষ্ট পাত্রের ন্যায় হয়ে গেলাম। (কিতাবুল বারিয়্যাহ, রূহানী খাযায়েন ১৩/১০৩)। (প্রামাণ্য স্ক্যানকপি দ্রষ্টব্য)।

পাঠক! একজন খোদা দাবীদার কীভাবে নবীজী (সা.)-এর ভবিষ্যৎবাণীকৃত সেই ইমাম মাহদী হবার দাবী করতে পারে, বিচারের ভার আপনার নিরপেক্ষ বিবেকের উপর ছেড়ে দিলাম।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক
প্রিন্সিপাল নূরুন্নবী

শুধুই কালেমা তাওহীদ কি জান্নাত লাভের জন্য যথেষ্ট?

0

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের উত্তর হল, জ্বী হ্যাঁ। কালেমা তাওহীদ জান্নাত লাভের জন্য যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ, তবে অন্তত ফরজ, ওয়াজিব আমলসমূহ ত্যাগ করার ফলে সে পরকালে শাস্তিযোগ্য অপরাধী হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর আল্লাহ যদি কোনো ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহ করতে চান তা ভিন্ন বিষয়। আল্লাহ চাইলে আমল ত্যাগকরার ফলে শাস্তিও দিতে পারেন, চাইলে ক্ষমাও করতে পারেন! মোটকথা, তাওহীদের স্বীকারোক্তির ফলে এবং শিরিক থেকে আমৃত্যু পবিত্র থাকলে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামের কঠিনতম শাস্তি ভোগ করার পর যথাসময় মুক্তি পেতে সক্ষম হবে, ইনশাআল্লাহ।

.

এবার প্রশ্ন আসবে, তাহলে ‘যে আন্তরিকতার সাথে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু—এর স্বীকারোক্তি দেবে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে‘ এই ধরনের হাদীস দ্বারা আমলের কোনো গুরুত্ব নেই বলে বিশ্বাস করার সুযোগ থাকবে কিনা?

উত্তর হচ্ছে, উল্লিখিত হাদীসের ব্যাখ্যায় বিজ্ঞ হাদীস বিশারদগণ থেকে দুইটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তারা লিখেছেন, وقيل: هو في حق من قالها فمات بعدها قيل: إن ذلك كان قبل نزول الفرائض، في أوائل الدعوة في مكة অর্থ- কারো মতে, এটি এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে যে উক্ত কলেমা পাঠ করার পরপরই মৃত্যুবরণ করেছেন। কোনো কোনো ব্যাখ্যাকারক এটিও লিখেছেন যে, এই কলেমা পাঠ মক্কার সেই প্রাথমিক যুগের সাথে সম্পর্কিত যে সময়টিতে তখনও ফরজ-বিধানাবলী নাযিল হয়নি, শুধুমাত্র ঈমানের দাওয়াত চলছিল।

শারেহে বুখারী ইবনে হাজার আসকালানী, শারেহে মুসলিম ইমাম নববী প্রমুখও অনুরূপ মত ব্যক্ত করেছেন। এইজন্যই এ ধরনের হাদীস দ্বারা আমলের কোনো গুরুত্ব নেই বলে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। রাসূল (সা.) থেকে হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস দ্বারাও একথার পরিষ্কার ইংগিত বিদ্যমান। যেমন মুসলিম শরীফের ‘কিতাবুল ঈমান’ অধ্যায়ে এসেছে, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, من مات وهو يعلم أنه لا إله إلا الله دخل الجنة অর্থ- যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মৃত্যুবরণ করছে যে সে জানে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। উল্লেখ্য যে, জান্নাতে প্রবেশ করার দুটি পন্থা রয়েছে। একজন তওহীদে বিশ্বাসী গুনাহগার যদি প্রথম দফায় জান্নাতে প্রবেশ করতে না পারলেও কিন্তু শাস্তি ভোগ করার পরে হলেও সে প্রবেশ করতে পারবে, ইনশাআল্লাহ। হাদীসটিতে دخل الجنة বাক্যটি মুক্ত অর্থে। এতে সে আল্লাহ চাইলে প্রথমেও পারবে। নতুবা পরে হলেও প্রবেশ করবে। যেহেতু সে তাওহীদে বিশ্বাসী এবং শিরিক থেকে পবিত্র।

তবে এমন কোনো ব্যক্তির তাওহীদের স্বীকারোক্তি কখনো আল্লাহ কবুল করবেন না, যে আল্লাহর প্রেরিত কোনো বার্তাবাহকের রেসালতের স্বীকৃতি দেয়নি। যেমন, ইহুদি খ্রিস্টান জাতি। অথবা কোনো রেসালতের মিথ্যা দাবীদার মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর মত কোনো মিথ্যাবাদীকে নবী রাসূল মেনে নিয়ে ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে গেছে। যেমন, মরক্কোর সালেহ বিন তারিফের সালেহুল মুমিনীন জামাত, ভারতের মির্যা গোলাম আহমদের আহমদী জামাত, ইরানের আলী মুহাম্মদ বাবের বাবী জামাত ও ইরানের মির্যা হুসাইন আলী নূরী (বাহাউল্লাহ)’র বাহায়ী জামাত ইত্যাদী। আল্লাহু আ’লাম।

লিখক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক